বৃহস্পতিবার, ২৩ মে, ২০২৪

খাসায়েসুল কুবরা (১) রসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর সৃষ্টি ও নবুওয়ত সকল পয়গাম্বরের অগ্রে



খাসায়েসুল কুবরা (পর্ব– ১)

📚খাসায়েসুল কুবরা ✍🏻জালালুদ্দীন সিয়ুতী (রহঃ)

রসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর সৃষ্টি  নবুওয়ত সকল পয়গাম্বরের অগ্রে—

আল্লাহ তা'আলা এরশাদ করেছেন– "স্মরণ করুন যখন আমি নবীগণের কাছ থেকে তাদেরঅঙ্গীকার গ্রহণ করলাম"।

ইবনে আবী হাতেম স্বীয় তফসীর গ্রন্থে এবং আবূ নায়ীম তাঁর "আদ্দালায়েল” গ্রন্থে উপরোক্তআয়াতের তফসীর প্রসঙ্গে কাতাদাহহাসান  আবু হুরায়রা (রাঃথেকে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর এই উক্তি উদ্ধৃত করেছেন- “আল্লাহ তায়ালাআমাকে সকল পয়গাম্বরের অগ্রে সৃষ্টি করেছেন এবং সকলের শেষে প্রেরণ করেছেন। কারণেই তিনি আমার কাছ থেকে অঙ্গীকারও সকলের অগ্রে নিয়েছেন।

আবূ সহল কাত্তান স্বীয় 'ইমামীগ্রন্থে সহল ইবনে সালেহ হামদানী থেকে রেওয়ায়েত করেছেনযেতিনি আবু জাফর মোহাম্মদ ইবনে আলীকে জিজ্ঞাসা করলেননবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লামসকলের শেষে প্রেরিত হয়েও সকল পয়গাম্বরের অগ্রেকিরূপে হলেনজবাবে আবু জাফর মোহাম্মদ ইবনে আলী বললেন : আল্লাহ তায়ালা যখনআদম (আঃ)-এর ঔরস থেকে তাঁর সমস্ত বংশধরকে সৃষ্টি করেনতখন তাদের কাছ থেকেসাক্ষ্য নেন যেআমি কি তোমাদের প্রতিপালক নইজবাবে সকলের অগ্রে হযরত মোহাম্মদ(সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লামবললেন: (بلیহ্যাঁ।  কারণেই তিনি সকলপয়গাম্বরের অগ্রেযদিও তিনি প্রেরিত হয়েছেন সকলের শেষে।

আহমদবোখারী (স্ব-স্ব ইতিহাস গ্রন্থে), তিবরানীহাকেম  আবূ নায়ীম সাহাবী মায়সারাতুলফজর (রাঃথেকে রেওয়ায়েত করেনতিনি জিজ্ঞাসা করলেন : ইয়া রসূলাল্লাহআপনিকখন নবী মনোনীত হয়েছেনতিনি বললেনযখন আদম (আঃআত্মা  দেহের মধ্যবর্তীঅবস্থায় ছিলেন।

আহমদহাকেম  বায়হাকী ইরবায ইবনে সারিয়া (রাঃথেকে বর্ণনা করেছেন যেতিনিরসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উনাকে  কথা বলতে শুনেছেনআমি আল্লাহ তায়ালার কাছে “উম্মুল কিতাবে" (লওহে মাহফুযেতখন নবী ছিলামযখনআদম (আঃমৃত্তিকায় লুটোপুটি খাচ্ছিলেন। হাকেমবায়হাকী  আবূ নায়ীম হযরত আবুহুরায়রা (রাঃথেকে বর্ণনা করেননবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উনাকে জিজ্ঞাসা করা হলআপনাকে কখন নবী নিযুক্ত করা হলতিনি বললেনঃ তখনযখন আদম (আঃসৃষ্টি  আত্মা ফুঁকার মধ্যবর্তী পর্যায়ে ছিলেন।

আবূ নায়ীম সালেজী থেকে রেওয়ায়েত করেনহযরত ওমর (রাঃরসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উনাকে প্রশ্ন করেনআপনি কখন নবী নিযুক্ত হয়েছেনউত্তর হলতখনযখন আদম (আঃমৃত্তিকায় লুটোপুটি খাচ্ছিলেন।

ইবনে সা' ইবনে আবুল জাদআ (রাঃথেকে বর্ণনা করেনতিনি রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-কে জিজ্ঞাসা করলেনআপনি কবে নবী মনোনীতহয়েছেনতিনি বললেন : তখনযখন আদম (আঃরুহ  দেহের মাঝখানে ছিলেন।'

ইবনে সা' মুতরিফ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে শাখীর (রাঃথেকে বর্ণনা করেন যেএক ব্যক্তিরসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উনাকে প্রশ্ন করলঃ আপনি কবেনবী হিসাবে মনোনীত হয়েছেনতিনি বললেনআদম (আঃযখন রুহ  দেহের মাঝখানেছিলেনতখন আমার কাছ থেকে অঙ্গীকার নেওয়া হয়।

তিবরানী  আবূ নায়ীম আবু মরিয়ম গামমানী থেকে রেওয়ায়েত করেনতিনি বলেছেনজনৈক বেদুঈন নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উনাকে জিজ্ঞাসাকরল : আপনার নবুওয়তের পূর্বে কি কি ঘটনা সংঘটিত হয়েছিলতিনি বললেন : সকলপয়গাম্বরের ন্যায় আল্লাহ তায়ালা আমার কাছ থেকেও অঙ্গীকার নেন। ইবরাহীম (আঃআমার আগমনের জন্যে দোয়া করেন। ঈসা (আঃআমার আগমনের সুসংবাদ দেন।এছাড়া আমার জননী স্বপ্নে দেখেনতাঁর পদযুগল থেকে একটি প্রদীপ প্রজ্বলিত হয়েছেযারআলোকে সিরিয়ার রাজপ্রাসাদ পর্যন্ত আলোকিত হয়ে গেছে।

জ্ঞাতব্য বিষয়

শায়খ তকীউদ্দীন সুবকী (রহঃস্বীয় গ্রন্থে আয়াতের ( لَتُؤْمِنُنَّ بِه وَلَتَنْصُرْنَهُ - তোমরাঅবশ্যই তাঁর প্রতি ঈমান আনবে এবং তাঁর সাহায্য করবে।অংশের তফসীর প্রসঙ্গে বলেনএই অংশে নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর বিরাট মাহাত্ম্যবর্ণনা করা হয়েছে এবং ইঙ্গিত করা হয়েছে যেতিনি অতীত পয়গাম্বরগণের আমলে প্রেরিতহলে তাঁদেরও নবী হতেন। কেননাতাঁর নবুওয়ত রেসালত সকল কাল  সকল সৃষ্টিতেপরিবেষ্টিত এবং শামিল।  কারণেই তিনি এরশাদ করেছেনআমি সমগ্র সৃষ্টির জন্যেনবীরূপে প্রেরিত হয়েছি। এই "সমগ্র সৃষ্টি” বলতে কেবল ভবিষ্যৎ সৃষ্টিই নয়বরং অতীতসৃষ্টিও শামিল আছে।  জন্যেই তো তিনি বলেছেনআমি তখনও নবী ছিলামযখন আদম(আঃ)-এর মৃত্তিকানির্মিত প্রতিকৃতি রুহ থেকে খালি ছিল।

কোন কোন আলেম এই শেষোক্ত হাদীসের অর্থ এই বর্ণনা করেছেন যেরসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লামআল্লাহ তায়ালার জ্ঞানে তখনও নবী ছিলেন। আমরাবলিএটা ঠিক নয়। কেননাআল্লাহ তায়ালার জ্ঞান তো সকল বস্তু  সকল ঘটনাতেইপরিবেষ্টিত। আদম সৃষ্টির প্রাক্কালে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর নবুওয়তের বিশেষভাবে উল্লেখ করা কেবল খোদায়ী জ্ঞান বর্ণনা করার জন্যে নয়বরং কথা বলা উদ্দেশ্য যেতাঁর নবুওয়ত সে সময়েই প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল।  কারণেই আদম(আঃচক্ষু খুলেই আরশে "মোহাম্মাদুর রসূলুল্লাহলিখিত দেখতে পান। যদি এই অর্থ নেয়াহয় যেরসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লামআল্লাহ তায়ালার জ্ঞানেভবিষ্যৎ নবী ছিলেনতবে এটা কেবল তাঁর বৈশিষ্ট্য নয়বরং সকল পয়গাম্বরই আল্লাহরজ্ঞান অনুযায়ী ভবিষ্যৎ নবী ছিলেন।  থেকে জানা গেলকেবল রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এরই বৈশিষ্ট্য ছিল যেসকল পয়গাম্বরের পূর্বে তাঁকেনবুওয়তের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করা হয়। এরপর গুরুত্ব সহকারে এই বৈশিষ্ট্য ঘোষণা করাহয়েছেযাতে তাঁর উম্মত তাঁর উচ্চ মর্যাদার সাথে পরিচিত হয়ে যায় এবং এটা উম্মতের জন্যেকল্যাণ  বরকতের কারণ হয়।

এখানে কেউ প্রশ্ন করতে পারে যেনবুওয়ত একটি গুণ। তাই এই গুণে যিনি গুণান্বিত হবেনতাঁর বিদ্যমান থাকা জরুরী। এছাড়া নবুওয়তের জন্যে চল্লিশ বছর বয়ঃক্রম নির্ধারিত।এমতাবস্থায় রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লামপ্রেরিত হওয়ার পূর্বেইকিরূপে নবী মনোনীত হয়ে গেলেনতখন তো তিনি জন্মগ্রহণও করেননি এবং প্রেরিতও হননি।

আমি বলিআল্লাহ তায়ালা দেহ সৃষ্টি করার পূর্বে রুহ সৃষ্টি করেছেন। তাই উল্লিখিত হাদীসে ইশারা নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর পবিত্র রুহ অথবা তাঁর হকীকত তথা স্বরূপের দিকে হতে পারে। আল্লাহ তায়ালা সকল স্বরূপ “আসলতথা আদিকালে সৃষ্টি করে রেখেছেন। তিনি যখন ইচ্ছা করেন  সকল স্বরূপের মধ্য থেকে কোনএকটিকে অস্তিত্ব জগতে আনয়ন করেন।  সব স্বরূপের সামগ্রিক উপলব্ধি করতে আমরা অক্ষম। কেবল আল্লাহ তা'আলা সমস্ত স্বরূপ সম্পর্কে ওয়াকিফহাল অথবা যাদেরকে তিনিআপন নূরের আলোকে স্বরূপ পর্যন্ত পৌঁছার সামর্থ্য দান করেছেন। নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর পবিত্র স্বরূপ আদম সৃষ্টির পূর্বেই আল্লাহ তায়ালাসৃষ্টি করেছেন এবং তাঁকে নবুওয়তের গুণে ভূষিত করেছেন। তাই তিনি তখনই নবী হয়ে যান।আরশে তাঁর পবিত্র নাম লিখিত হয় এবং ফেরেশতাগণসহ সমগ্র সৃষ্টিকে আল্লাহর দরবারেতাঁর সুউচ্চ মর্যাদা সম্পর্কে জ্ঞাত করে দেয়া হয়যদিও তিনি শারীরিক দিক দিয়ে আল্লাহ প্রদত্তসমস্ত গুণ  বৈশিষ্ট্যসহ  দুনিয়ায় পরে আগমন করেন। আবির্ভাবধর্ম প্রচার এবং বাহ্যিকজগতে নবুওয়তের যোগ্য হওয়ার দিক দিয়ে তিনি নিঃসন্দেহে সকল পয়গাম্বরের পশ্চাতেকিন্তু তাঁর পবিত্র স্বরূপ এবং কিতাব  আদেশ দানের দিক দিয়ে তিনি আদম (আঃ)-এরওঅগ্রে।

এতে কোন সন্দেহ নেই যেবিশ্ব চরাচরে যা কিছু ঘটেআল্লাহ তায়ালা সে সম্পর্কে আদিকালথেকে জ্ঞাত। আমরা যৌক্তিক  শরীয়তের প্রমাণাদি দ্বারা সে সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করি। আর সাধারণ মানুষ তখন জানতে পারেযখন সেই ঘটনা বাহ্য জগতে সংঘটিত হয়ে যায়।উদাহরণতঃ নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-উনার নবুওয়ত সম্পর্কে সাধারণ মানুষ তখন জ্ঞাত হয়েছেযখন তাঁর প্রতি কোরআন অবতরণ শুরু হয়েছেএবং জিবরাঈল (আঃতাঁর কাছে আসতে শুরু করেছেন।


আল্লাহ তায়ালার যে সকল কর্ম কোন বিশেষ পাত্রে আল্লাহর কুদরতইচ্ছা ও ক্ষমতার চিহ্নস্বরূপ হয়ে থাকেকোরআন অবতরণ সেগুলোর মধ্যে একটি। এর দুটি স্তর রয়েছে। প্রথম স্তর সাধারণ মানুষের জন্যে প্রকাশ পায় এবং দ্বিতীয় স্তরে সেই পাত্রের জন্যে আল্লাহর এই কর্মথেকে পূর্ণতা অর্জিত হয়ে যায়। যদিও মানুষ এই পূর্ণতা সম্পর্কে জানতে পারে নাবরংআমরা "খবরে-ছাদেক” তথা বিশুদ্ধ হাদীসের মাধ্যমে এই পূর্ণতা সম্পর্কে অবগত হই। নবীকরীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লামসমগ্র সৃষ্টির সেরা সৃষ্টি। তাই তিনি সমগ্রসৃষ্টির মধ্যে সর্বাধিক পূর্ণতাপ্রাপ্ত এবং সর্বাধিক মনোনয়নযোগ্য। সহীহ হাদীসের মাধ্যমেআমরা জানতে পারি যেনবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লামকেনবুওয়তের পূর্ণতা  মানবতার পূর্ণতার মর্যাদা হযরত আদম (আঃকে সৃষ্টি করার পূর্বেই দানকরা হয়েছিল। আল্লাহ তায়ালা মানব সৃষ্টির পূর্বেই সকল নবীর পবিত্র আত্মাসমূহের কাছথেকে তাঁর সম্পর্কে অঙ্গীকার নিয়েছিলেন যেতাঁরা সকলেই তার প্রতি ঈমান আনবে এবংতাঁকে সাহায্য করবে। উদ্দেশ্যসকল নবী জেনে নিক যেতিনি সকলের অগ্রে এবং সর্বশ্রেষ্ঠ।তিনি নবীগণের জন্যেও তেমনি নবী  রসূলযেমন সকল মানুষের জন্যে। তাই

(لَتُؤْمِنُنَّ بِهِوَلَتَنْصُرْنَهُ)

বাক্যাংশে কসমের 'লামঅক্ষরটি দাখিল করা হয়েছে।


পরবর্তী পর্ব

নবীগণের কাছ থেকে ঈমান  সাহায্যের অঙ্গীকার নেয়া খেলাফতের জন্যে বয়াত নেয়ারঅনুরূপ



সোমবার, ২০ মে, ২০২৪

দাকায়েকুল আখবার- (৩০) বেহেশ্তী বাহন বোরাকের বিবরণ



📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ৩০)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

বেহেশ্তী বাহন বোরাকের বিবরণ-
হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, বোরাক এক প্রকার বেহেশতী জানোয়ার । ইহার দুইটি পাখা আছে। ইহা আকাশে ও পৃথিবীতে উড়িতে সক্ষম। ইহার মুখ মানুষের মত ও আরবী ভাষায় কথাবার্তা বলিবে। মুখমণ্ডল সুপ্রশস্ত ও সিং অত্যন্ত মোটা হইবে, কিন্তু উভয় কর্ণদ্বয় সবুজ জবরজদ নির্মিত অত্যন্ত চিকন হইবে। উহার লেজ গাভীর লেজের মত লোহিত স্বর্ণাভ ও শরীর গরু কিংবা ময়ূরের মত এবং ইহার আকৃতি গর্দভ হইতে বড় ও খচ্ছর হইতে ছোট হইবে। বিদ্যুৎসম দ্রুতগামী হইবে! এইজন্য ইহাকে বলা হইবে বোরাক বা বিদ্যুৎ।
হুযুর করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উহাতে চড়িবার ইচ্ছা করিলে ইহা নড়াচড়া করিয়া বলিবে, “আমার আল্লাহর মান-সম্মানের শপথ, হাসেমী, কোরায়েশী, আবতায়ী বংশের নবী-আবদুল্লাহর পুত্র হযরত মুহাম্মদ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-কে ভিন্ন অন্য কাহাকেও আমার পিঠে সওয়ার লইতে আমি দিব না।” তখন মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিবেন, “ওহে বোরাক! সেই হাসেমী, আবতায়ী ও কোরায়েশী হযরত মুহাম্মদ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) হইলাম আমিই।”
তারপর মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বোরাকে সওয়ার হইয়া আরশের নীচে পৌছিয়া সিজদায় পড়িয়া যাইবেন! আল্লাহ তা'আলা তাঁহাকে সম্বোধন করিয়া বলিবেন, “হে মুহাম্মদ! মস্তক উত্তোলন করুন! কেননা আজ এবাদতের দিন নহে। আজ পাপ-পুণ্যের বিনিময়ে বেহেশত-দোযখ লাভ ও হিসাব নিকাশের দিন। মাথা উঠাইয়া নিজ উম্মতের জন্য শাফায়াত করুন। আপনার শাফায়াত কবুল করা হইবে। তারপর হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ফরিয়াদ করিবেন, “হে আল্লাহ! আপনার মর্যাদার শপথ, আমি কি শুধুমাত্র স্বীয় উম্মতের জন্যই শাফায়াত করিব?" আল্লাহ তা'আলা তাঁহাকে প্রবোধ দিয়া বলবেন, “হে মুহাম্মদ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)! আপনি যাহাতে সন্তুষ্ট থাকেন তাহাই হইবে। যেমন আল্লাহ পাক এরশাদ করিয়াছেন- (“ওয়ালা ছাউফা ইউত্বিকা রাব্বুকা ফাতারদ্বা”।) "আপনার পালনকর্তা আপনাকে এত প্রাচুর্য দেবেন যে, আপনি সন্তুষ্ট হয়ে যাবেন।"।(সুরা আদ-দোহা : ৫)
তারপর আল্লাহ তা'আলা আকাশকে প্রবল বারি বর্ষণের নির্দেশ দিবেন। সঙ্গে সঙ্গে চল্লিশ দিন পর্যন্ত অনর্গল বৃষ্টিপাত হইবে। ফলে প্রত্যেক জিনিসের উপর বারহাত পুরু পানি জমিবে। সেই পানির দ্বারা আল্লাহ তা'আলা সমস্ত জীবকে শস্য-দানার মত তড়িৎ পুনরাকৃতি দান করিবেন এবং আকাশ ও যমিনকে একত্রে জড়াইয়া হাতের মুঠিতে তুলিয়া বলিবেন, “বল, অদ্যকার বাদশাহী কাহার? সবাই নিরুত্তর থাকিবে। পুনঃপুনঃ তিনবার জিজ্ঞাসা করিয়াও যখন উত্তর মিলিবে না, তখন স্বয়ং তিনি ঘোষণা করিবেন, “কেবল মাত্র অনন্ত শক্তিশালী আল্লাহর জন্যই।” পুনরায় বলিবেন, “সেই গর্বোন্নত রাজা-মহারাজাগণ আজ কই? আর যাহারা আমার প্রদত্ত পদ ও ভোগ্যবস্তু ভোগ করিবার পরও আমি ব্যতীত অন্যের এবাদত করিয়াছে, তাহারাই বা আজ কোথায়?” তারপর পর্বতশৃঙ্গ তুলার মত উড়িয়া যাইবে এবং আল্লাহ তা'আলা পৃথিবীকে পরিবর্তন করতঃ উহাতে বেহেশতের বাগান ও সাদা রূপার মত বেহেশতে পরিবর্তন করিবেন হযরত আয়েশা (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, একদিন আমি রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-কে প্রশ্ন করিলাম, “যেদিন পৃথিবী পৃষ্ঠ পরিবর্তিত হইয়া যাইবে, সেদিন মানুষ কোথায় দাঁড়াইবে?” উত্তরে আঁ হযরত (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম), বলিলেন, “হে আয়েশা! তুমি একটি জটিল প্রশ্নের অবতারণা করিয়াছ। জানিয়া রাখ, সেদিন মানুষ পুলছিরাতের উপর অবস্থান করিতে থাকিবে।”

পরবর্তী পর্ব 

রবিবার, ১৯ মে, ২০২৪

দাকায়েকুল আখবার- (২৯) সৃষ্ট জগতের পুনরুত্থান



📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ২৯)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

সৃষ্টি জগতের পুনরুত্থান -
হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ যখন জীব জগতের পুনরুত্থানের আশা করিবেন, তখন জিব্রাইল (আঃ), হযরত মিকাইল (আঃ) হযরত ইস্রাফীল (আঃ) ও হযরত আজরাইল (আঃ)-কে পুনর্জীবিত করিলে হযরত ইস্রাফীল (আঃ) আরশের উপর হইতে সিঙ্গা হাতে তুলিয়া স্বীয় হস্তে ধারণ করিবেন। তারপর আল্লাহ তায়ালা বেহেশতের তত্ত্বাবধানকারী রেদওয়ান ফেরেশতার নিকট গমন করিতে নির্দেশ দিবেন। তাহারা উপস্থিত হইয়া বলিবেন, “হে রেদওয়ান! আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ অনুসারে হযরত মুহাম্মদ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ও তাঁহার ঈমানদার উম্মতের জন্য বেহেশতকে সাজাও।” অতঃপর তাহারা বেহেশত হইতে দুইটি বেহেশতী লেবাছ, লেওয়ায়ে হাম্দ ও একটি বোরাক আনয়ন করিবেন। চতুষ্পদ জন্তুর মধ্যে সর্বপ্রথম বোরাকই জীবিত হইবে। বোরাককে সজ্জিত করিবার জন্য আল্লাহ তা'আলা তাহাদিগকে নির্দেশ দান করিবেন; সুতরাং তাহার লাল ইয়াকুতে আচ্ছাদিত জিনপোষ, সবুজ জিনপোষ, জবরজদ তৈরী লাগাম এবং হলুদ ও সবুজ রংয়ের দুইটি পরিচ্ছদে ইহাকে সাজাইয়া হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর পবিত্র রওজার নিকট উপস্থিত করিতে বলিবেন; কিন্তু সুসমতল পৃথিবী পৃষ্ঠে পবিত্র রওজা শরীফকে চিহ্নিত করিতে না পারিলে অকস্মাৎ নূরে মুহাম্মদি রওজা শরীফ হইতে সুদূর আকাশের প্রান্ত পর্যন্ত খাম্বার মত জাহির হইবে। ইহা দেখিয়া হযরত জিব্রাইল (আঃ) হযরত ইস্রাফীল (আঃ)-কে বলিবেন, “হে ইস্রাফীল! আপনি মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-কে আহ্বান করুন। কারণ আপনার দ্বারাই সমস্ত জীবজগৎ পুনর্জীবন লাভ করিবে।” উত্তরে তিনি বলিবেন, “হে জিব্রাইল! আপনিই সম্বোধন করুন! কেননা পৃথিবীতে আপনি তাঁহার দোস্ত ছিলেন। তিনি সলজ্জভাবে তাহা প্রত্যাখ্যান করিলে হযরত ইস্রাফীল (আঃ) হযরত মিকাইল (আঃ)-কে বলিবেন, “আপনি আঁ হযরত (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-কে পুনরুত্থানের নিমিত্ত আহ্বান করুন।” কিন্তু কোন সাড়া পাওয়া যাইবে না। তারপর সকলে হযরত আজরাইল (আঃ)-কে আহ্বান করিতে বলিবেন, “হে পবিত্র রূহ! পবিত্র শরীরে ফিরিয়া আসুন।” এইবারও উত্তর পাওয়া যাইবে না। পরিশেষে হযরত ইস্রাফীল (আঃ) জোর গলায় বলিবেন, “হে পবিত্র রূহ! আল্লাহ পাকের দীদার ও হিসাব নিকাশের জন্য উত্থিত হউন।” এমন সময় রওজা শরীফ চৌচির হইয়া যাইবে। ইহাতে বসিয়াই নবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) পবিত্র মাথা ও দাড়ি মোবারকের ধূলাবালি মুছিয়া থাকিবেন। হযরত জিব্রাইল (আঃ) তাঁহাকে হোল্লা পরিধান করিয়া বোরাকে আরোহণের জন্য আবেদন করিলে হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিবেন, “বল বন্ধু! আজ কোন দিন?" প্রত্যুত্তরে তিনি বলিবেন—“আজ বিরহ-বিচ্ছেদ ও মিলনের দিন! আজ তিরস্কার, অনুতাপ, লজ্জা ও অপমানের দিন!” 
হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিবেন, “হে দোস্ত! আমাকে সুসংবাদ প্রদান করুন। অন্যথায় আমি উঠিব না।” জিব্রাইল (আঃ) মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-উনাকে বোরাক, লওয়ায়ে হাম্দ, বেহেশতী হোল্লার কথা বিবৃত করিবেন, হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিবেন, “হে দোস্ত! আমি এই খবর জিজ্ঞাসা করি নাই। মূলতঃ আমার পাপী উম্মতদের কথা জিজ্ঞাসা করিতেছি? তাহাদিগকে কি আপনি পুলছিরাতের উপর ছাড়িয়া দিয়া আসিয়াছেন?” জিব্রাইল (আঃ) উত্তর করিবেন, “হে মুহাম্মদ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)। আল্লাহর শপথ, এই পর্যন্ত পুনরুত্থানের সিঙ্গা বাজানো হয় নাই।” ইহা শ্রবণান্তে আঁ হযরত (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিবেন, “এখন আমার প্রাণে শান্তি আসিয়াছে এবং আঁখিদ্বয় সুস্থির হইয়াছে।" অতঃপর তিনি হোল্লা ও তাজ পরিধান করতঃ বোরাখে আরোহণপূর্বক যাত্রা করিবেন।

পরবর্তী পর্ব-
বেহেশ্তী বাহন বোরাকের বিবরণ

দাকায়েকুল আখবার- (২৮) মাখলুকাতের লয়প্রাপ্তি



📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ২৮)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

মাখলুকাতের লয়প্রাপ্তি-
জীবকুলের নিধন কার্য শেষ হইলে আল্লাহ তায়ালা সর্বপ্রথম বিশাল পানিরাশি ধ্বংস করিবার জন্য আজরাইল (আঃ)-কে নির্দেশ দিবেন। যেমন ঘোষণা করিয়াছেন-“তাঁহার পবিত্র সত্তা ব্যতীত সমস্ত কিছুই বিলয় হইবে।” আজরাইল (আঃ) পানিকে বলিবেন, "হে পানিরাশি! তোমাদের মেয়াদ শেষ হইয়া গিয়াছে। অতএব তোমরা ধ্বংস হইয়া যাও!” পানি আর্তনাদ করিবার জন্য অনুমতি প্রার্থনা করিবে। অনুমতি লাভ করিয়া পরস্পর চীৎকার করিয়া বলিবে, “হে তরঙ্গরাজি ও আশ্চর্য বস্তুসমূহ! তোমরা কই! আল্লাহ তা'আলা তোমাদের ধ্বংসের নির্দেশ জারী করিয়াছেন। তোমরা লয়প্রাপ্ত হও।” তারপর আজরাইল (আঃ) উচ্চৈঃস্বরে নির্দেশ করিবেন এবং পানিরাশি নিশ্চিহ্ন হইয়া যাইবে, যেন দুনিয়াতে কখনও পানি ছিল না। তারপর পর্বতসমূহের নিকট আজরাইল (আঃ) উপস্থিত হইয়া বলিবেন, “হে পর্বতমালা! তোমাদের মেয়াদ ফুরাইয়া গিয়াছে। অতএব তোমরা ধ্বংস হইয়া যাও।” পর্বতমালা চীৎকার করিয়া বলিবে, “কোথায় আমার বিশাল শৃঙ্গ ও শক্তি বল। অবশ্যই আল্লাহর নিকট হইতে ধ্বংসের সংবাদ আসিয়াছে।” তারপর আজরাইল (আঃ) পর্বত শীর্ষে ভীষণ গর্জন করিবেন। ফলে সমস্ত পর্বতমালা আগুনের তাপে বিগলিত সীসার ন্যায় গলিয়া যাইবে। তারপর আজরাইল (আঃ) পৃথিবীকে বলিবেন, “হে পৃথিবী! তোমার মেয়াদ ফুরইয়া গিয়াছে; সুতরাং তুমি আল্লাহ তা'আলার নির্দেশে ধ্বংসপ্রাপ্ত হও।” পৃথিবী ক্রন্দন করিবার আরজ করিয়া অনুমতি লাভ করতঃ বলিবে, “হে আমার গচ্ছিত ধনরাশি, বৃক্ষ-লতা, নদী-সাগর ও লতাপাতা, তোমরা কই?” তারপর আজরাইল (আঃ) ভূমিতলে প্রচণ্ড গর্জন করিলে এই পৃথিবী ধ্বংসপ্রাপ্ত হইয়া যাইবে। সুউচ্চ দেওয়ালগুলি ধ্বসিয়া যাইবে এবং পানিরাশি অতলগর্ভে বিলীন হইবে। পরিশেষে আজরাইল (আঃ) আকাশে আরোহণ করতঃ ভীষণ নাদে গর্জন করিলে চন্দ্র-সূর্যে পূর্ণ গ্রহণের সূচনা হইবে এবং তারকাপুঞ্জ খসিয়া পড়িতে থাকিবে। অতঃপর আল্লাহ তায়ালা আজরাইল (আঃ)-কে জিজ্ঞাসা করিবেন, “হে আজরাইল! সৃষ্টজগতে আর কাহারা বাকী রহিয়াছে?” প্রত্যুত্তরে আজরাইল (আঃ) বলিবেন, “হে আল্লাহ! আপনি চিরস্থায়ী, চিরঞ্জীব। আপনি ব্যতিত হযরত জিবরাইল (আঃ), হযরত মিকাইল (আঃ), হযরত ইস্রাফীল (আঃ), আরশবাহী ফেরেশতাগণ ও এই নিকৃষ্ট বান্দা অবশিষ্ট রহিয়াছে।” তখন আল্লাহ তা'আলা নির্দেশ করিবেন, “হে আজরাইল! তুমি কি আমার এই ঘোষণা শ্রবণ কর নাই যে, আমি নূতন দিন এবং তোমার আমলের সাক্ষ্যদাতা, প্রতিটি প্রাণীই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করিবে। তুমি আমারই সৃষ্ট পদার্থ; সুতরাং তোমাকেও মরিতে হইবে।” তারপর আজরাইল (আঃ) হযরত জিব্রাইল (আঃ) ও অন্যান্যদের জান কবজ করিবার পর স্বয়ং নিজের রূহ কবজ করিয়া মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করিবেন।
অপর এক হাদীসে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ তা'আলা হযরত আজরাইল (আঃ)-কে নির্দেশ দিবেন, “হে আজরাইল! উঠ এবং হেহেশত ও দোযখের মাঝখানে মৃত্যুমুখে পতিত হও।' সেই সময় আল্লাহ্ তা\আলা ছাড়া অন্য কেহই জীবিত থাকিবে না! তারপর আল্লাহ্ তা'আলার রেজামন্দি অনুসারে দীর্ঘকাল পর্যন্ত জীবজগৎ ও বস্তুজগৎ বিলুপ্ত হইয়া থাকিবে। মোট কথা, আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছুই অবশিষ্ট থাকিবে না।

পরবর্তী পর্ব
সৃষ্ট জগতের পুনরুত্থান

দাকায়েকুল আখবার- (২৭) সিঙ্গা ফুৎকারে প্রাণী জগতের অস্থিরতা



📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ২৭)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

সিঙ্গা ফুৎকারে প্রাণী জগতের অস্থিরতা-
হযরত ইস্রাফীল (আঃ)-এর প্রথম ফুৎকারের ভীষণ শব্দে সমস্ত প্রাণী অস্থির, বেকারার হইয়া যাইবে; কিন্তু যাহাদিগকে আল্লাহ পাক রক্ষা করিবেন, তাহারা অস্থির হইবে না। প্রথম ফুৎকারের সাথে সাথে পাহাড়-পর্বত উড়িয়া যাইবে, নভোমণ্ডলও নদীবক্ষে আন্দোলিত নৌকার মত প্রকম্পিত ও দুলিতে থাকিবে। গর্ভবতীদের গর্ভ নষ্ট হইয়া যাইবে। মাতা স্বীয় দুগ্ধপোষ্য শিশুর কথা বিস্মৃত হইবে। আর শয়তানগণ এদিক সেদিক পলায়ন করিতে থাকিবে এবং তারকাপুঞ্জ তাহাদের উপর বর্ষিতে থাকিবে। চন্দ্র-সূর্য গ্রহণ আরম্ভ হইবে ও তাহাদের উপর নভোমণ্ডলকে বিস্তৃত করিয়া দেওয়া হইবে। বালক বৃদ্ধ হইয়া যাইবে। যেমন আল্লাহ পাক ঘোষণা করিয়াছেন- (“ইন্না যাল্যালাতুছ্ ছাআতি শাইউন্‌ আজীম”।) “অবশ্যই প্রলয় কম্পন অত্যন্ত ভয়াবহ জিনিস”। এই অবস্থা চল্লিশ বৎসর পর্যন্ত দীর্ঘ হইবে।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এই আয়াত পাঠ করিলেন যে, “হে মানব সকল! তোমাদের প্রতিপালককে ভয় কর, নিশ্চয়ই কিয়ামতের কম্পন অতি ভীষণ।” তারপর তিনি সাহাবাদিগকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “এই অবস্থা কখন হইবে বলিতে পার?” সাহাবাগণ আরজ করিলেন, “আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূল অধিকতর জ্ঞানী।” তিনি বলিলেন, “এই অবস্থা সেইদিন হইবে, যেদিন আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম (আঃ)-কে ডাকিয়া বলিলেন-'হে আদম উঠ এবং তোমার গোনাহগার সন্তানদিগকে দোযখে প্রেরণ কর। তখন হযরত আদম (আঃ) ফরিয়াদ করিবেন, হে আল্লাহ! প্রতি হাজার হইতে কি পরিমাণ প্রেরণ করিব?' আল্লাহ তা'আলা বলিবেন, 'হে আদম! প্রতি হাজার হইতে একজনকে বেহেশতের জন্য রাখিয়া অবশিষ্ট নয়শত নিরানব্বইজনকে দোযখে পাঠাও।' এইকথা সাহাবাদের নিকট অত্যন্ত ভারী মনে হইল এবং তাঁহারা বিষণ্নচিত্তে কাঁদিতে লাগিলেন। তারপর হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করিয়া সাহাবাদিগকে উদ্দেশ্য করিয়া বলিলেন, “আমার আশা, অবশ্যই তোমরা এক-চতুর্থাংশ বেহেশ্তী হইবে।” আঁ হযরত (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) পুনরায় বলিলেন, “আমি আশা করি নিশ্চয়ই তোমাদের অর্ধাংশ বেহেশ্তী হইবে।” ইহা শ্রবণ করিয়া সাহাবাগণ সন্তুষ্ট হইলেন। হুযুর করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আরও বলিলেন, “তোমরা খোশ খবরী গ্রহণ কর যে, তোমরা অন্যান্য উম্মতের তুলনায় একপাল উটের ভিতর একটি বকরী তুল্য হইবে এবং তোমরাই হাজারের মধ্যে একজন হইবে।”

হযরত আবু হোরাইরা (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করিয়াছেন, “আল্লাহ পাক তাঁহার একশত রহমতের একভাগ মাত্র জগতের কীট-পতঙ্গ, পশু-পক্ষী, মানব-দানব ইত্যাদিকে দান করিয়াছেন।” এই একভাগের ফলেই তাহারা পরস্পরে স্নেহ-মমতা, প্রেম-প্রণয় ও ভালবাসায় মত্ত হয়। আর আল্লাহ তা'আলা স্বীয় অবশিষ্ট নিরানব্বই রহমত দ্বারা রোজ কিয়ামতে বান্দাদের প্রতি রহমত ও দয়া করিবেন। তারপর আল্লাহ পাক হযরত ইস্রাফীল (আঃ)-কে মৃত্যুর জন্য সিঙ্গা ফুঁকিবার নির্দেশ দিবেন। অমনি তিনি, হে উলঙ্গ রূহ সকল! যথাশীঘ্র আল্লাহর হুকুমে বাহির হইয়া যাও, বলিয়া জোরে সিঙ্গার ফুৎকার প্রদান করিবেন। তখনই নভোমন্ডলের ও ভূমণ্ডলের সবকিছু মৃত্যু-মুখে পতিত হইবে; কিন্তু শহীদগণ আল্লাহর অভিপ্রায়ে রক্ষা পাইবে। যেমন এরশাদ হইয়াছে- (“ওয়ালা তাছাবান্নাল্লাজিনা কুতিলু ফী ছাবিলিল্লাহি আওয়াতা, বাল্ আহইয়াউন্ ইন্দা রাব্বিহিম ইউরযাকুন!”) "যাহারা আল্লাহর পথে নিহত হইয়াছে, তাহাদিগকে মৃত মনে করিও না, বরং তাহরা স্বীয় প্রতিপালকের নিকট জীবিত থাকিয়া উপজীবিকা আস্বাদন করিতেছে"। হাদীস শরীফে আছে যে, আল্লাহ তা'আলা শহীদগণকে পাঁচটি শ্রেষ্ঠ মর্যাদা প্রদান করিতেছেন, যাহা নবীগণকেও দান করেন নাই। এই প্রসঙ্গে হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করিয়াছেন – (১) সমস্ত শহীদগণের রূহ আল্লাহ তা'আলা কবজ করেন, কিন্তু আমার ও অন্যান্য নবীগণের রূহ আজরাইল (আঃ) কবজ করিয়া থাকেন। (২) মৃত্যুবরণের পর সমস্ত নবীগণকে গোসল দেওয়া হয়, এমন কি আমাকেও গোসল দেওয়া হইবে, কিন্তু শহীদগণকে গোসল দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। (৩) আমার এবং অন্যান্য নবীগণের জন্য ভিন্ন কাফন দিতে হয়, কিন্তু শহীদগণের ভিন্ন কাফনের দরকার হয় না। (৪) আমাকে এবং অন্যান্য নবীগণকে মৃত বলিয়া অভিহিত করা যায়, কিন্তু শহীদগণকে মৃত বলিয়া আখ্যায়িত করা যায় না। (৫) আমি এবং অন্যান্য নবীগণ আল্লাহ তা'আলার নিকট নিজ নিজ উম্মতের জন্য সুপারিশ করিবেন, কিন্তু শহীদগণ রোজ কিয়ামতে সমস্ত উম্মতের জন্য শাফায়াত করিবেন। 
আরও বর্ণিত আছে যে, রোজ কিয়ামতে আল্লাহ তায়ালা বারজনকে মৃত্যুর হাত হইতে রক্ষা করিবেন। তাহারা হইবেন -(১) হযরত জিব্রাইল (আঃ), (২) হযরত মিকাইল (আঃ), (৩) হযরত ইস্রাফীল, (আঃ) (8) আজরাইল (আঃ) এবং আরশ বহনকারী আটজন (৫-১২) বিশিষ্ট ফেরেশ্তা। তখন সৃষ্টজগতে জ্বিন-ইন্‌সান, পশু-পক্ষী ও মানব, শয়তান বলিতে কিছুই থাকিবে না। তারপর আল্লাহ তায়ালা আজরাইল (আঃ) কে উদ্দেশ্য করিয়া হুকুম করিবেন, “হে আজরাইল (আঃ)! আমি তোমার নিমিত্ত পূর্ববর্তী ও পরবর্তী মানুষের সমতুল্য সাহায্যকারী পয়দা করিয়াছি আর তোমাকে সাত আকাশ ও ভূমণ্ডলের সৃষ্ট পদার্থের সমতুল্য শক্তি প্রদান করিয়াছি। আজ তোমাকে গজব ও ক্রোধের লেবাছে সাজাইতেছি। যাও, এই মুহূর্তে ইবলিস্ শয়তানের উপর ভীমনাদে আক্রমণ কর এবং পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত মানব-জ্বিনের দ্বিগুণ, চতুগুণ কষ্ট সহকারে তাহার রূহ কবজ কর আর তোমার সহকারী সত্তর হাজার দোজখের ফেরেশতাকে 'লজ্জা' নামক দোজখ হইতে সত্তর হাজার জিঞ্জির সঙ্গে লইতে নির্দেশ কর।” তারপর আজরাইলের নির্দেশক্রমে দোযখের দরওয়াজা খুলিয়া যাইবে এবং সত্তর হাজার দোযখের ফেরেশ্তা সমসংখ্যক জিঞ্জির লইয়া তাঁহার সামনে উপস্থিত হইবে। তখন আজরাইল এমন ভয়ঙ্কর মূর্তি ধারণ করিবেন যে, যদি সাত আকাশ ও ভূমণ্ডলের অধিবাসীবৃন্দ তাঁহার সেই মূর্তি অবলোকন করিত, তবে সকলেই মরিয়া যাইত। আজরাইল (আঃ) অভিশপ্ত ইবলিসকে দেখিয়াই এমন জোরে ধমক দিবেন যে ইহাতে সে বেহুঁশ হইয়া যাইবে এবং ভয়ঙ্কর শব্দ করিতে শুরু করিবে। যদি নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের অধিবাসীগণ তাহার সেই বিকট শব্দ শ্রবণ করিত তবে সকলেই বেহুঁশ হইয়া যাইত।
অতঃপর আজরাইল (আঃ) তাহাকে রুদ্ররোষে বলিবেন, 'হে পাপিষ্ট! অপেক্ষা কর! এখনই তোকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করাইতেছি। তুই দীর্ঘদিন জীবমান ছিলি, আর তোর দ্বারা অনেক লোক পথভ্রষ্ট হইয়াছে।” ইহা শ্রবণ করিয়া ইবলিস্ পূর্ব প্রান্তে পলায়ন করিতে ছুটিয়া যাইবে, কিন্তু সেখানেও হযরত আজরাইল (আঃ) কে দেখিতে পাইবে। পুনরায় সে পৃথিবীর পশ্চিম প্রান্তে গিয়া আত্মগোপন করিতে চেষ্টা করিবে কিন্তু সেখানেও আজরাইল (আঃ)-কে দেখিতে পাইবে। পরিশেষে নিরুপায় হইয়া পৃথিবীর মধ্যস্থলে হযরত আদম (আঃ) এর কবরের পার্শ্বে উপস্থিত হইয়া বলিবে- 'হে আদম! তোমারই জন্য আমি লাঞ্ছিত ও অপমানিত হইয়াছি এবং আল্লাহর করুণা হইতে বঞ্চিত হইয়াছি। তারপর আজরাইল (আঃ) কে জিজ্ঞাসা করিবে, “হে আজরাইল! বল কিরূপে তুমি আমার প্রাণ বধ করিবে?" আজরাইল (আঃ) বলিবেন, 'হে দুরাত্মা ইবলিস! সায়ীর নামক জাহান্নামের শাস্তি ও আগুনের পাত্র দ্বারা তোর পাপাত্মাকে সংহার করিব।" তারপর ইবলিস্ ভূমিতে গড়াগড়ি দিতে থাকিবে। তখন দোযখের ফেরেশতাগণ কালালিবের অস্ত্র দ্বারা তাহাকে চতুর্দিক হইতে আঘাত করিতে থাকিবে এবং তীর ও বর্শার দ্বারা তাহাকে ক্ষত-বিক্ষত করিবে। আবশেষে জীবনপাতের কঠিন যন্ত্রণা ভোগ করিয়া ইবলিস্ মৃত্যুমুখে পতিত হইবে।

পরবর্তী পর্ব
মাখলুকাতের লয়প্রাপ্তি

দাকায়েকুল আখবার- (২৬) সিঙ্গায় ফুৎকার, পুনরুত্থান ও হাশরের বিবরণ



📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ২৬)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

সিঙ্গায় ফুৎকার, পুনরুত্থান ও হাশরের বিবরণ-
সিঙ্গার তত্ত্বাবধানকারী হইলেন হযরত ইস্রাফীল (আঃ)। আল্লাহ তা'আলা লৌহে মাহফুজকে আকাশ ও পৃথিবীর মাঝখানের দূরত্বের সাতগুণ বেশী প্রশস্ত সাদা মণিমুক্তা দ্বারা তৈরী করিয়া আরশের সহিত ঝুলন্ত রাখিয়াছেন। রোজ কিয়ামত পর্যন্ত যাহা কিছু সংঘটিত হইবে, সবকিছুই ইহাতে লিখা রহিয়াছে।

হযরত ইস্রাফিল (আঃ)এর চারিটি পাখা রহিয়াছে। প্রথমটি পূর্বদিকে, দ্বিতীয়টি বিস্তৃত রহিয়াছে। আর তৃতীয়টির উপর তিনি নিজে অধিষ্ঠিত আছেন। চতুর্থটি দ্বারা তিনি আল্লাহ তা'আলার ভয়ে নিজ মুখমণ্ডল এবং মাথা আচ্ছাদিত রাখিয়াছেন। আল্লাহ তা'আলার ভয়ে তিনি এতই ভীত ও লজ্জিত যে, নিজ পাখায় মাথা ঢাকিয়া আরশে মোয়াল্লার খাম্বা বুকে রাখিয়া আনত মস্তকে পড়িয়া রহিয়াছেন আর আল্লাহ তা'আলার ভযে ক্ষুদ্র পাখীর মত সংকুচিত থাকেন। আল্লাহ তা'আলা যখন ‘লৌহে মাহফুজে' কোন আদেশ-নিষেধ জারী করেন, তখন তিনি নিজ মুখের পর্দা খুলিয়া উহার দিকে লক্ষ্য করেন। হযরত ইস্রাফিল (আঃ) অন্যান্য ফেরেশ্তাদের তুলনায় আরশের অতি নিকটে রহিয়াছেন। তবুও তাঁহার এবং আরশের মধ্যে সত্তর হাজার পর্দা রহিয়াছে। একটি হইতে অন্যটির দূরত্ব পাঁচশত বৎসরের রাস্তা। অনুরূপ হযরত ইস্রাফিল (আঃ) ও হযরত জিব্রাইল (আঃ) এর মধ্যে সত্তর হাজার পর্দা রহিয়াছে এবং দুই পর্দার দূরত্ব পাঁচশত বৎসরের রাস্তা। তিনি স্বীয় দক্ষিণ রানের উপর সিঙ্গা সংস্থাপন করতঃ উহার অগ্রভাগ মুখে দিয়া আল্লাহ তা'আলার নির্দেশের অপেক্ষায় সতর্ক রহিয়াছেন। আল্লাহর নির্দেশে তিনি উহাকে সজোরে ফুৎকার দিবেন। যখন পৃথিবীর আয়ু শেষ হইয়া আসিবে, তখন উহা তাহার কপালের সন্নিকট হইবে। তারপর তিনি আল্লাহর নির্দেশে নিজ পাখাগুলি দেহের উপর একত্রিত করতঃ খুব জোরে সিঙ্গা বাজাইবেন। এমন সময় হযরত আজরাইল (আঃ) সাত যমিনের নীচে একহাত ও আকাশের উপরে অন্যহাত রাখিয়া ইহাদের বাসিন্দাদের প্রাণ সংহার, করিবেন। পরিশেষে পৃথিবীতে ইবলিস্ মরদুদ ও আকাশে হযরত জিব্রাইল (আঃ), হযরত মিকাইল (আঃ) হযরত ইস্রাফিল (আঃ) ও হযরত আজরাইল (আঃ) এবং আল্লাহ তা'আলা যাহাদিগকে রক্ষা করিবেন, তাহাদের ব্যতীত অন্য সকলেই মৃত্যুবরণ করিবে। যেমন পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করা হইয়াছে,- (“ওয়া নুফিখা ফিছ্ছুরী ফাছাইক্বা মান্ ফিছ ছামাওয়াতি ওয়াল্ আরদ্বি ইল্লা মান্ শাআল্লাহ্”)  "সিঙ্গা ফুৎকারের সাথে সাথে নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের সকলেই বেহুঁশ হইয়া পড়িবে; কিন্তু আল্লাহ তা'আলা যাহাদিগকে মর্জি করিবেন, তাহারা নিরাপদ থাকিবে"।

হযরত আবু হোরায়রা (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, বিশ্বনবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিয়াছেন—“আল্লাহ তা'আলা হযরত ইস্রাফিল (আঃ)-এর সিঙ্গাকে চারি শাখাবিশিষ্ট তৈরী করিয়াছেন। সিঙ্গার দুই শাখা পূর্ব-পশ্চিমে প্রলম্বিত রহিয়াছে। তৃতীয় শাখা সাত যমিনের নীচে ও চতুর্থ শাখা সাত 'আকাশের উপরে স্থাপিত। উহাতে রূহের আকারানুসারে অসংখ্য ছিদ্র রহিয়াছে; যেমন নবীগণের রূহের জন্য একটি, জ্বিনদের রুহের জন্য একটি, মানবাত্মার জন্য একটি, শয়তানের জন্য একটি ইত্যাদি। তাহা ছাড়া জীব-জন্তু, পোকা-মাকড় এমনকি মশা-মাছির জন্যও এক একটি ছিদ্র রহিয়াছে। হযরত ইস্রাফিল (আঃ)-কে আল্লাহ তা'আলা সেই কাজে নিয়োগ করিয়াছেন। অতএব তিনি সর্বদা সিঙ্গা মুখে করিয়া আল্লাহ তা'আলার নির্দেশের অপেক্ষায় আছেন। আল্লাহ তা'আলার হুকুম মাত্র তিনি সজোরে সিঙ্গা ফুৎকার দিবেন। হযরত ইস্রাফিল (আঃ) তিনবার সিঙ্গায় ফুৎকার দিবেন। প্রথমবারে সমুদয় সৃষ্টজীব ভীত ও আতঙ্কগ্রস্ত হইবে। দ্বিতীয় বারে সকলেই মৃত্যুবরণ করিবে। তৃতীয়বারে সবাই পুনরুত্থিত হইবে।”

হযরত হোজায়ফা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-কে জিজ্ঞাসা করিলেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)! সিঙ্গার ফুৎকারে মানুষের অবস্থা কিরূপ হইবে?" প্রত্যুত্তরে হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিলেন, “হে হোজায়ফা! আমার রূহ যাহার হাতে রহিয়াছে তাঁহার শপথ করিয়া বলিতেছি, সিঙ্গা ফুৎকার দেওয়া মাত্রই কিয়ামত সংঘটিত হইবে। এমন অবস্থা হইবে যে, মুখের নিকটে উঠানো লোকমা খাইবার অবসর মিলিবে না-ইহা হস্ত হইতে পড়িয়া যাইবে, পরিধেয় বস্ত্র সামনে থাকিবে সত্য কিন্তু পরিধান করিবার সাহস ও শক্তির অভাব হইবে। পানির পাত্র সামনে থাকিলেও উহা হইতে পানি পান করা অসম্ভব হইবে।

পরবর্তী পর্ব
সিঙ্গা ফুৎকারে প্রাণী জগতের অস্থিরতা-






বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...