মঙ্গলবার, ৮ এপ্রিল, ২০২৫

আত্মদর্শন (৪১) শরীর বিদ্যা মা'রিফাতের এক পন্থা



আত্মদর্শন পর্ব - ৪১
📚কিমিয়ায়ে সাদাত ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)

শরীর বিদ্যা মা'রিফাতের এক পন্থা 
 যে বিদ্যা অধ্যয়ন করিলে শরীরের গঠন প্রণালী ও বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের উপকারিতা ও উপযোগিতা অবগত হওয়া যায় তাহাকে শরীর বিদ্যা বলে। ইহা এক বড় বিদ্যা। তথাপি ইহা শিখিতে লোকে বড় একটা ইচ্ছা করে না, কেহ শিখিলেও কেবল চিকিৎসা শাস্ত্রে পটুতালাভের জন্যই শিখিয়া থাকে। চিকিৎসা শাস্ত্র স্বয়ং অসম্পূর্ণ ও হাকীকতবিহীন। চিকিৎসা বিদ্যার আবশ্যকতা থাকিলেও ধর্মের সঙ্গে ইহার কোন সম্পর্ক নাই। কিন্তু কোন ব্যক্তি যদি আল্লাহর বিচিত্র শিল্প-কৌশল বুঝিবার উদ্দেশ্যে ইহা শিক্ষা করে তবে সে নিজে নিজেই আল্লাহ্র অনস্ত গুণাবলীর মধ্যে তিনটি গুণ অবগত হইতে পারিবে। 
প্রথমত, এই কৌশলপূর্ণ মানব-দেহের সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ্ পূর্ণ ক্ষমতাশীল। তিনি যাহা চাহেন তাহাই করিতে পারেন। তিনি যে এক বিন্দু শুক্র হইতে এই অত্যাশ্চর্য কৌশলময় মানবদেহ সৃষ্টি করিয়াছেন, ইহা অপেক্ষা অধিক বিস্ময়ের বিষয় দুনিয়াতে আর কিছুই নাই। যিনি এক বিন্দু নির্জীব শুক্র হইতে এরূপ অত্যাশ্চর্য মানব দেহ সৃষ্টি করিয়াছেন, মৃত্যুর পর পুনর্জীবিত করা তাহার পক্ষে অতি সহজ। 
দ্বিতীয়ত, সেই সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ্ এত বড় জ্ঞানী যে, তাঁহার অসীম জ্ঞান সমস্ত বিশ্বজগত আবৃত করিয়া রাখিয়াছেন। কারণ, এই আশ্চর্য কৌশলময় সৃষ্টি পূর্ণজ্ঞান ব্যতীত সম্ভব নহে। 
তৃতীয়ত, বান্দার প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ, দান ও দয়ার সীমা নাই। কারণ, মানুষের জন্য যে সকল জিনিস অত্যাবশ্যক- যাহা না হইলে মানুষ বাঁচিয়া থাকিতে পারে না, তৎসমুদয় তিনি দয়া করিয়া দান করিয়াছেন , যেমন— হৃদপিণ্ড, ফুসফুস , মস্তিষ্ক ইত্যাদি। আবার মানুষের অভাব মিটাইবার জন্য , তাহার আরামের নিমিত্ত যাহা কিছু প্রয়োজন তৎসমুদয়ও তিনি পর্যাপ্ত পরিমাণ দান করিয়াছেন, যেমন- হস্ত, পদ, জিহ্বা, চক্ষু এবং অন্যান্য পদার্থ। শুধু উহাই নহে , বরং যাহা তাহার জীবনের জন্য অত্যাবশ্যক নহে এবং তাহার অভাব মিটাইবার জন্যও প্রয়োজনীয় নহে এমন কতকগুলি বস্তুও তিনি মানুষকে কেবল শোভাসৌন্দর্য বর্ধনের জন্য প্রদান করিয়াছেন, যথা- কেশের কৃষ্ণতা, ওষ্ঠের রক্তিমা, ভ্রূযুগলের বক্রতা, নয়ন-পক্ষের সমতা প্রভৃতি। নর-নারী যেন এই সমস্ত গুণে বিভূষিত হইয়া সুন্দর দেখায়, এই জন্যই আল্লাহ্ তা'আলা দয়া করিয়া তৎসমুদয় দান করিয়াছেন দয়াময় আল্লাহ্র এই কৃপা শুধু মানব জাতির জন্যই সীমাবদ্ধ নহে, বিশ্বের সমস্ত পদার্থ ও প্রাণীই আল্লাহ্ তা'আলার এই অনুগ্রহ লাভ করিয়াছে এমনকি, মশা-মাছি, কীট-পতঙ্গ ইত্যাদি ক্ষুদ্র প্রাণীকেও তিনি তাহাদের প্রয়োজনীয় এবং সৌন্দর্য ও শ্রীবর্ধক যাবতীয় বস্তু দান করিয়াছেন এবং উহাদিগকে নানাবিধ রঙ্গে বিভূষিত করিয়াছেন। - এই জন্যই মানবদেহের আকৃতি ও গঠন-ক্রিয়াতে আল্লাহর যে ক্ষমতা ও জ্ঞান প্রযুক্ত হইয়াছে তৎপ্রতি গভীরভাবে মনোনিবেশ করাকে তাহার গুণ- পরিচয়ের কুঞ্জী বলা হয়। এই কারণেই শরীর- বিদ্যার শ্রেষ্ঠত্ব। চিকিৎসকের ইহার আবশ্যকতা আছে বলিয়া ইহার কোন শ্রেষ্ঠত্ব নাই। যেরূপ কাব্যের সৌন্দর্য ও রচনার কৌশল এবং শিল্প- কার্যের বৈচিত্র যত অধিক অবগত হওয়া যায় ততই কবি ও শিল্পীর শ্রেষ্ঠত্ব হৃদয়ে অনুভূতি হয় তদ্রূপ মানবদেহের বিচিত্র গঠন , অদ্ভুত নির্মাণ কৌশল মনোযোগের সহিত দেখিলে নিপুণতম শিল্পী আল্লাহ্র শ্রেষ্ঠত্ব ও মহত্ব উপলব্ধি করা চলে। এইজন্য শরীর বিদ্যা ( Anatomy ) আত্মদর্শনের এক উপায়। 

শরীর-বিদ্যা অপেক্ষা আত্মবিদ্যা শ্রেষ্ঠ 

আত্মদর্শন (৪০) মানবদেহে বিশ্বজগতের নমুনা



আত্মদর্শন পর্ব - ৪০
📚কিমিয়ায়ে সাদাত ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)

মানবদেহে বিশ্বজগতের নমুনা 
মানবদেহ ক্ষুদ্র হইলেও ইহাতে সমস্ত বিশ্বের নমুনা রহিয়াছে। বিশ্বজগতে যাহা আছে তৎসমুদয়ের নমুনা এই ক্ষুদ্র দেহে পাওয়া যায়, দেহের অস্থিখণ্ড জগতের পাহাড়তুল্য, ঘাম বৃষ্টিসদৃশ, লোমসমূহ বৃক্ষ, মস্তিষ্ক আকাশ এবং ইন্দ্রিয়সমূহ নক্ষত্ররাজি স্বরূপ। এই সকলের বিবরণ বহু বিস্তৃত। মোট কথা , জগতে যত প্রকার সৃষ্ট জীব আছে যেমন - শূকর , কুকুর, সিংহ, ব্যাঘ্র, ফেরেশতা প্রভৃতি জীবজন্তুর সাদৃশ্য মানব শরীরে বিদ্যমান আছে। ইহা পূর্বেও বলা হইয়াছে। এমনকি, মানব সমাজের ব্যবসায়- বাণিজ্য প্রভৃতির নমুনাও মানব শরীরে পাওয়া যায়। যে শক্তি পাকস্থলীতে ভূক্তদ্রব্য হজম করে তাহা বাবুর্চিতুল্য। যে শক্তি ভূক্তদ্রব্যকে রসে পরিণত করত হৃদপিণ্ড ও অন্যান্য যন্ত্রাদিতে পৌছাইয়া দেয় উহা তেলী সদৃশ । যে শক্তি পরিপক্ক রসকে হৃদপিণ্ডে লোহিতবর্ণ রক্তে পরিণত করে তাহাকে রংরজক বলা যাইতে পারে। যে শক্তি রক্তকে মাতৃস্তনে দুগ্ধে ও পুরুষের অণ্ডকোষে শ্বেতশুক্রে পরিণত করে তাহাকে ধোপা বলা চলে। যে শক্তি ভূক্ত দ্রব্য ও রক্তকে একস্থান হইতে অন্যস্থানে লইয়া যায় তাহাকে ভারবাহী মুটিয়া বলা যায়। যে শক্তি পানিকে ফুসফুস ও মুত্রনালী দিয়া প্রবাহিত করে, সে ভিস্তিতুল্য। যে ব্যক্তি ভুক্তদ্রব‍্যের অসার ভাগ উদর হইতে বাহিরে নিক্ষেপ করে, সে মেথরস্বরূপ। যে শক্তি শরীরকে বিনষ্ট ও ধ্বংস করিবার জন্য প্লীহা ও যকৃৎকে আপন আপন কার্য হইতে ক্ষান্ত করে তাহাকে ধ্বংসকারী প্রতারক বলা যায়। যে শক্তি পিত্তজনিত ও অন্যান্য রোগ বিদূরীত করে তাহাকে সম্ভ্রান্ত বিচারক বলা চলে এই সমস্তের বিরবণ বহু বিস্তৃত। তোমার পরিচর্যায় বহু শক্তি নিযুক্ত রহিয়াছে, কিন্তু তুমি নিতান্ত মোহমুগ্ধ অবস্থায় গাফিল হইয়া রহিয়াছ, ইহা যেমন ভালরূপে বুঝিতে পার এইজন্য এতগুলি কথা বলা হইল। ঐ সকল শক্তি দিবারাত্র তোমার কাজে মশগুল আছে, ইহারা কখনও নিজ নিজ কার্যে অবহেলা করে না এবং অবসরও গ্রহণ করে না। তুমি তাহাদের খবরও জান না এবং যে আল্লাহ্ তাহাদিগকে তোমার কাজের জন্য সৃষ্টি করিয়াছেন তাঁহার প্রতি কৃতজ্ঞতাও স্বীকার করিতেছ না। অপর পক্ষে কোন ব্যক্তি যদি তাহার গোলামকে তোমার খেদমতে একদিনের জন্যও নিযুক্ত করে তবে সারাজীবন তাহার নিকট কৃতজ্ঞ থাক। পরম করুণাময় আল্লাহ্ তোমার দেহ রক্ষার্থে কত শত সহস্র খেদমতগার তোমার খেদমতের জন্যও নিযুক্ত রাখিয়াছেন এবং তাহারা তোমার জীবতাবস্থায় এক মুহূর্তের জন্যও তোমার খেদমত হইতে বিরত থাকে না তথাপি তুমি তাঁহার স্মরণ করিতেছ না। 

শরীর বিদ্যা মা'রিফাতের এক পন্থা 

আত্মদর্শন (৩৯) মানব দেহের বৈচিত্র



আত্মদর্শন পর্ব - ৩৯
📚কিমিয়ায়ে সাদাত ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)

মানব দেহের বৈচিত্র
মানবাত্মা সম্বন্ধে উপরে যাহা বলা হইল তাহাই এ গ্রন্থে যথেষ্ট। কেহ ইহার অধিক জানিতে চাহিলে আমা কর্তৃক লিখিত 'আজায়েযুল কুলুব' গ্রন্থ পাঠ করিবেন। কিন্তু এই দুই গ্রন্থ পাঠ করিলেই যে পূর্ণ আত্মপরিচয় লাভ হইবে, তাহা নহে। কারণ আত্মা পুরা মানুষের এক অংশ ; অপর অংশ শরীর এবং উক্ত গ্রন্থদ্বয়ে আত্মার গুণসমূহের কতকগুলি মাত্র বর্ণিত হইয়াছে। দেহ নির্মাণের মধ্যেও বহু বৈচিত্র্য রহিয়াছে। মানুষের প্রতিটি বাহ্য অঙ্গ ও প্রতিটি আভ্যন্তরিক যন্ত্রের মধ্যে অসংখ্য বৈচিত্র্য ও অনন্ত কৌশল রহিয়াছে। মানব দেহে বহু সহস্র শিরা, স্নায়ু ও অস্থিখণ্ড আছে । ইহাদের প্রতিটির আকৃতি ও গুণ বিভিন্ন প্রকার এবং প্রতিটির উদ্দেশ্য বিভিন্ন। তোমরা অনেকেই এই বিষয়ে অবগত নও। কেবল এতটুকু জান যে, ধারণ করিবার জন্য হস্ত, চলিবার জন্য পদ এবং বলিবার জন্য জিহ্বার সৃষ্টি হইয়াছে। কিন্তু জানিয়া রাখ, আল্লাহ্ তা'আলা দশটি পর্দা দিয়া চক্ষু তৈয়ার করিয়াছেন এবং দশটি পর্দা বিভিন্ন প্রকারের। এই দশটির মধ্যে শুধু একটির অভাব হইলে দৃষ্টিশক্তির ব্যাঘাত ঘটে। এই সকল পর্দা কেন সৃষ্ট হইয়ছে এবং ইহাদের একটির অভাবে দৃষ্টিশক্তির কেন ব্যাঘাত ঘটে, তাহা হয়ত তোমরা জান না। এখন ভাবিয়া দেখ, চক্ষু একটি বাহিরের অঙ্গ এবং এ সম্বন্ধে বহু বিদ্বান লোক অনেক গ্রন্থ প্রণয়ন করিয়াছেন। এমতাবস্থায় এই বাহ্য অঙ্গের অবস্থাও যখন সম্পূর্ণরূপে অবগত হইতে পার না তখন হৃদপিণ্ড, প্লীহা, যকৃৎ, ফুসফুস প্রভৃতি আভ্যন্তরিক যন্ত্রাদি কেন প্রস্তুত হইয়াছে, তাহা না জানাতে কি বিস্ময়ের কারণ আছে? আমাদের ভুক্তদ্রব্য পাকস্থলীতে পরিপক্ক হয় এবং উহাকে রক্তে পরিণত করত সমস্ত দেহের গঠন ও রক্ষণের উপযোগী করিবার জন্য হৃদপিণ্ডের সৃষ্টি হইয়াছে। হৃৎপিণ্ডে রক্ত বিশোধিত হওয়ার সময় নিচে কিছু গাদ সঞ্চিত হয় এবং এই গাদ শ্লেষ্মায় পরিণত হয়। প্লীহা এই শ্লেষ্মা লইয়া ইহাকে একপ্রকার হরিদ্রবর্ণ ফেনায় পরিণত করে। ইহাই পিত্তরস। যকৃত এই পিত্তরস ছাঁকিয়া রক্তকে পরিষ্কার করে। হৃদপিণ্ড হইতে রক্ত বাহির হওয়ার সময় ইহাকে বিভিন্ন উপাদানের সমতা থাকে না এবং উহা খুব পাতলা থাকে। ফুসফুস হইতে পানি ছাঁকিয়া লয় এবং রক্ত তখন গাদ ও পিত্তরস হইতে বিমুক্ত সমতাপ্রাপ্ত হইয়া শিরায় শিরায় সমস্ত শরীরে প্রবাহিত হয়। যকৃতে পীড়া হইলে ইহা আর রক্ত ছাঁকিয়া পরিষ্কার করিতে পারে না। এই কারণেই পাণ্ডুরোগ ও নানারূপ পিত্তরোগ জন্মে। প্লীহার কোন রোগ দেখা দিলে রক্তের সহিত গাদ থাকিয়া যায় । তখন ইহার রক্তের সহিত সমস্ত শরীরে প্রবেশ করিয়া নানারূপ রোগের উৎপন্ন করে। ফুসফুসের কোন বিকার দেখা দিলে রক্তে পানি থাকিয়া যায় এবং এই কারণেই জলন্দর রোগের উৎপন্ন হয়। একই প্রকার মানবদেহের বাহ্য ও আভ্যন্তরিক প্রত্যেক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ আল্লাহ্ তা'আলা পৃথক পৃথক কার্যের উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করিয়াছেন। ইহাদের মধ্যে একটির অভাব হইলেই সমস্ত দেহ বিগড়াইয়া যায়৷ 

মানবদেহে বিশ্বজগতের নমুনা 

আত্মদর্শন (৩৮) মা'রিফাতের অবিনশ্বর



আত্মদর্শন পর্ব - ৩৮
📚কিমিয়ায়ে সাদাত ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)

মা'রিফাতের অবিনশ্বর
ভোগেচ্ছা ও পার্থিব বস্তুর সুখের সম্বন্ধ একমাত্র শরীরের সঙ্গেই থাকে। মৃত্যুকালে এই সম্বন্ধ আপনা-আপনিই ছুটিয়া যায় এবং সেই সমস্ত ভোগেচ্ছা ও লোভ-লালসা চরিতার্থ করিবার জন্য লোকে যত পরিশ্রম করে তাহাও ব্যর্থ হয়। অপর পক্ষে আল্লাহর মারিফাতের আনন্দ আত্মার সহিত সম্বন্ধযুক্ত, মৃত্যুর পর ইহা দ্বিগুণ বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হইবে। কারণ, আত্মা মরিবে না, এবং মারিফাত স্থায়ী থাকিবে , বরং মৃত্যুর পর আত্মা অধিকতর উজ্জ্বল হইয়া উঠিবে। তখন আত্মা দুনিয়ার মোহ ও রিপুসমূহের প্রভাব হইতে একেবারে মুক্ত হইয়া পাড়িবে; এইজন্যই মা'রিফাতের আনন্দ অধিকতর বৃদ্ধি পাইবে। এই বিষয়ে বিস্তৃত বিবরণ এই গ্রন্থের শেষভাগে ‘পরিত্রান’ খণ্ডে ‘মহব্বত' অধ্যায়ে দেওয়া হইবে। 

মানব দেহের বৈচিত্র

আত্মদর্শন (৩৭) আল্লাহর মা'রিফাতে আত্মার পরম তৃপ্তি



আত্মদর্শন পর্ব - ৩৭
📚কিমিয়ায়ে সাদাত ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)

আল্লাহর মা'রিফাতে আত্মার পরম তৃপ্তি 
এখন অবশ্যই বুঝিতে পারিয়াছ যে , জ্ঞানের মধ্যে আত্মার তৃপ্তি নিহিত আছে। ইহাও জানিয়া রাখ, যে বস্তু যত উৎকৃষ্ট ও মহৎ হইবে তৎসম্বন্ধীয় জ্ঞান আত্মার নিকট তত আনন্দদায়ক হইবে। এইজন্যই কেহ মন্ত্রিত্বের রহস্য জানিতে পারিলে আনন্দিত হয়। তৎ পর সেই ব্যক্তির নিকট যদি বাদশাহের রহস্য উদ্ঘাটিত হইয়া পড়ে এবং সে রাজ্যসংক্রান্ত সব বিষয়ের জ্ঞান লাভ করে তবে তাহার আনন্দ আরও বহুগুণে বৃদ্ধি পাইবে। দাবা খেলায় পটুতা প্রদর্শন অপেক্ষা যে ব্যক্তি গণিতশাস্ত্রের সাহায্যে গ্রহ-নক্ষত্রাদির আকার, আয়তন ইত্যাদি নির্ণয় করিতে পারে সে অধিক আনন্দ উপভোগ করিয়া থাকে। যে ব্যক্তি দাবা খেলায় পটু সে দাবার গুটিস্থাপনে সক্ষম ব্যক্তি অপেক্ষা অধিক আনন্দ পাইয়া থাকে। এইরূপ পরিজ্ঞাত বিষয় যত অধিক উৎকৃষ্ট হইবে তৎসম্বন্ধীয় জ্ঞানও তত অধিক উৎকৃষ্ট ও আনন্দদায়ক হইবে। আল্লাহ্ সর্বাপেক্ষা উৎকৃষ্ট। তাহার কারণেই সৃষ্টি মর্যাদা লাভ করিয়াছে এবং তিনি সমস্ত বিশ্বের বাদশাহ। বিশ্বের সমস্ত আশ্চর্য বস্তু তাঁহারই শিল্প নৈপুণ্যের নিদর্শন। সুতরাং অন্য কোন বিষয়ের জ্ঞান তাঁহার মা'রিফাতের তুল্য উৎকৃষ্ট ও আনন্দদায়ক হইতে পারে না। তাঁহার দীদার অপেক্ষা উৎকৃষ্ট দীদার আর নাই এবং আত্মা তাঁহার দীদার লাভের জন্যই উৎসুক। কারণ, যে উদ্দেশ্যে যে বস্তু সৃষ্ট হইয়াছে সেজন্যই উহা উৎসুক হইয়া থাকে। যাহার হৃদয়ে আল্লাহর মা'রিফাত লাভের আগ্রহ নাই সে এমন পীড়িত ব্যক্তির ন্যায় যাহার আহারে ইচ্ছা নাই এবং রুটি অপেক্ষা মাটিই তাহার নিকট অধিক ভাল লাগে। চিকিৎসা করাইয়া এমন রোগীর মাটিভক্ষণের ইচ্ছা বিদূরিত করত আহারে রুচি পুনরায় জন্মাইতে না পারিলে সে দুনিয়াতে বড় হতভাগ্য এবং সে ক্রমশ ধ্বংসপ্রাপ্ত হইবে। এইরূপ, যে হৃদয়ে আল্লাহর মা'রিফাত অপেক্ষা অপর বস্তুর আগ্রহ অধিক সে হৃদয়ও পীড়াগ্রস্ত। এমন আত্মা দুর্ভাগা হইয়া পরকালে ধ্বংসপ্রাপ্ত হইবে। 

মা'রিফাতের অবিনশ্বর

আত্মদর্শন (৩৬) আল্লাহর মা'রিফাতে মানবের সৌভাগ্য নিহিত



আত্মদর্শন পর্ব - ৩৬
📚কিমিয়ায়ে সাদাত ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)

আল্লাহর মা'রিফাতে মানবের সৌভাগ্য নিহিত—
এখন হয়ত জিজ্ঞাসা করিতে পার , কিরূপে বুঝিব যে , আল্লাহ্ তা'আলার মা'রিফাতে মানুষের সৌভাগ্য নিহিত আছে ? উহার উত্তর বুঝিবার পূর্বে কয়েকটি কথা জানা আবশ্যক। যে কাজে সুখ ও আরাম পায়, সেই কাজেই তাহার সৌভাগ্য নিহিত আছে। আবার প্রকৃতি যাহা চায় তাহাতেই সুখ ও আরাম আছে এবং যে জন্য যাহাকে সৃষ্টি করা হইয়াছে প্রকৃতি তাহাই চাহিয়া থাকে — যেমন কামনার বস্তু পাইলেই কামপ্রবৃত্তি পরিতৃপ্ত হয়,  শত্রুর প্রতিশোধ গ্রহণ করিলেই ক্রোধ-প্রবৃত্তি চরিতার্থ হয় ; সুন্দর বস্তু দর্শনে চক্ষু তৃপ্ত হয় এবং সুমিষ্ট স্বর শ্রবণে কর্ণ চারিতার্থ হয়। এইরূপ, যে কার্যের জন্য আত্মা সৃষ্ট হইয়াছে এবং যাহা ইহার প্রকৃতি অনুযায়ী তাহাতেই আত্মার তৃপ্তি নিহিত আছে। প্রত্যেক বস্তুর স্বরূপ-দর্শন ও প্রত্যেক বিষয়ের সত্যানুসন্ধান আত্মার কার্য এবং উহাই আত্মার প্রকৃতি। বাসনা-কামনা চতুষ্পদ জন্তুরও আছে এবং পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে ইহারাও জড়পদার্থের অবস্থা অবগত হইতে পারে। কিন্তু স্বরূপ দর্শন ও সত্যানুসন্ধান আত্মা ব্যতীত অন্য কোন ইন্দ্রিয় দ্বারা করা যায় না। এজন্যই অজ্ঞাত বস্তুর জ্ঞান লাভ করিতে মানব মনে এত আগ্রহ এবং অজ্ঞাত বস্তুর জ্ঞান লাভ করিয়া মানুষ গর্ব করে। এমনকি কেহ যদি দাবা খেলার ন্যায় মন্দ কার্যও শিখিতে ইচ্ছা করে এবং যে ব্যক্তি এ বিষয়ে পটু তাহাকে যদি কেহ নিষেধ করিয়া বলে য, এ খেলা আর কাহারও শিখাইও না তবে এই নিষেধ প্রতিপালন করা তাহার পক্ষে কঠিন হইয়া পড়ে। আর সে যে এক বিস্ময়কর খেলা জানে এই আনন্দে সে বাহাদুরী দেখাইতে চায়। 

আল্লাহর মা'রিফাতে আত্মার পরম তৃপ্তি 

আত্মদর্শন (৩৫) আম্বিয়া-আউলিয়া ও আলিমগণের মরতবার তুলনা



আত্মদর্শন পর্ব - ৩৫
📚কিমিয়ায়ে সাদাত ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)

আম্বিয়া-আউলিয়া ও আলিমগণের মরতবার তুলনা 
আম্বিয়া ও আউলিয়াগণের কাশ্ফ (অন্তর্দৃষ্টি) পরশমণিতুল্য এবং আলিমগণের ইল্ম স্বর্ণসদৃশ। আর স্বর্ণের মালিক অপেক্ষা পরশমণির মালিকের শ্রেষ্ঠত্ব সর্ববিষয়ে অধিক। কিন্তু এ স্থলে একটি সূক্ষ্ম বিষয়ও আছে। মনে কর, এক ব্যক্তির নিকট এতটুকু পরশমণি আছে যাহার সাহায্যে এক শতের অধিক স্বর্ণমুদ্রা প্রস্তুত করা যায় না ; কিন্তু অপরজনের নিকট সহস্র স্বর্ণমুদ্রা আছে। এমতাবস্থায় দ্বিতীয় ব্যক্তি অপেক্ষা প্রথম ব্যক্তির শ্রেষ্ঠত্ব কিছুতেই অধিক হইতে পারে না। বর্তমানকালে পরশমণি প্রস্তুত বিদ্যার বহু পুস্তক প্রকাশিত হইয়াছে, এ সম্বন্ধে অনেক কথাবার্তা সমাজে প্রচলিত হইয়াছে এবং বহু লোক ইহার অনুসন্ধানে তৎপর হইয়াছে। কিন্তু ইহার হাকীকত অতি অল্প লোকেই জানেন। বহু অনুসন্ধানকারী এ বিষয়ে প্রতারিত হইয়া থাকে। আজকালকার সূফীদের অবস্থাও ঠিক এইরূপই হইয়া দাঁড়াইয়াছে। প্রকৃত সূফীইজম তাহাদের মধ্যে নাই। কেহ কেহ ইহার সামান্য অংশ পাইয়াছেন। সুফী ইজমে পূর্ণতা লাভ করিয়াছেন এমন লোকের সংখ্যা নিতান্ত বিরল। এমতাবস্থায় যাহার মধ্যে সূফীদের অবস্থার কিঞ্চিমাত্র প্রকাশ পাইয়াছে তিনি কখনই প্রত্যেক আলিম অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ হইতে পারে না। কারণ, অধিকাংশ সূফীর ভাগ্যে এমন অবস্থা ঘটে যে, প্রথম প্রথম তাঁহাদের প্রতি সূফীদের ভাব সামান্য প্রকাশ পাইতে আরম্ভ হয়, কিন্তু উহা অধিক দিন স্থায়ী না হইয়া অচিরেই বন্ধ হইয়া যায় এবং তাঁহারা আর পূর্ণতা লাভ করিতে পারেন না। আবার এমন কতক সূফী আছেন যাঁহাদের উপর অলীক পাগলামী ও অসার কল্পনা প্রবল থাকে অথচ উহাকে তাঁহারা সত্য বলিয়া মনে করেন। স্বপ্নে যাহা দেখা যায় তাহার মধ্যে সত্য-মিথ্যা উভয়ই থাকে। সূফীদের অবস্থার মধ্যেও তদ্রূপ সত্য-মিথ্যার মিশ্রণ থাকে। যে সকল সূফী এমন কামিল হইয়াছেন যে, যে ইলূম অপর লোকে উস্তাদের নিকট শিক্ষা করে তাহা তাঁহারা বিনা উস্তাদে স্বয়ং আল্লাহ্ হইতে লাভ করিয়া থাকেন তাঁহারা ধর্ম-শাস্ত্রভিজ্ঞ আলিম হইতে শ্রেষ্ঠ। কিন্তু এই সূফী নিতান্ত বিরল। অতএব, সূফীগণের আসল জ্ঞানের পথে ও তাঁহাদের শ্রেষ্ঠত্বে বিশ্বাস স্থাপন কর। একালের ভণ্ড সূফীদের আচরণ দেখিয়া প্রকৃত সূফীগণের প্রতি অশ্রদ্ধা প্রকাশ করিও না। ভণ্ড সূফীদের যাহারা ইলম ও আলিমকে তিরস্কার করে তাহারা নিজেদের মূর্খতার কারণেই ইহা করিয়া থাকে।

আল্লাহর মা'রিফাতে মানবের সৌভাগ্য নিহিত

আত্মদর্শন (৩৪) জাহেল ভণ্ড সূফী



আত্মদর্শন পর্ব - ৩৪
📚কিমিয়ায়ে সাদাত ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)

জাহেল ভণ্ড সূফী 
অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন কোন ব্যক্তি যদি বাহ্য ইল্‌মকে প্রকৃত ইলমের পথে অন্তরাল বলেন তবে তাঁহার কথা অবিশ্বাস না করিয়া বুঝিবার চেষ্টা কর। কিন্তু আজকাল কতক লোক বাহির হইয়াছে, তাহারা অবৈধকে বৈধ বলিয়া থাকে। এই হতভাগারা রিপুর দাস। অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তিগণের অবস্থা তাহারা কখনই প্রাপ্ত হয় নাই ; কেবল সূফীদের রচিত কতকগুলি রহস্যময় বাক্য মুখস্থ করিয়া রাখিয়াছে। পরহিযগারী দেখাবার জন্য বারবার শরীর ধৌত করে, সূফীদের পোশাক-পরিচ্ছদ, জায়নামায ইত্যাদি দ্বারা শরীর সজ্জিত রাখে এবং ইল্ল্ম ও আলিমগণের নিন্দা করিতে থাকে। তাহারা মানুষের মধ্যে শয়তান, আল্লাহ্ ও রাসূলের দুশমন ; তাহারা হত্যার উপযোগী। কারণ আল্লাহ্ ও তদীয় রাসূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইল্ম ও আলিমের প্রশংসা করিয়াছেন এবং সমস্ত জগতবাসীকে ইল্ল্ম শিখিবার জন্য আহ্বান করিয়াছেন। এই হতভাগারা সূফীদের অবস্থা প্রাপ্ত হয় নাই এবং ইল্ল্মও শিখে নাই। এমতাবস্থায় ইল্ম ও আলিমের নিন্দা করা তাহাদের পক্ষে কিরূপে বৈধ হইতে পারে? এই সকল হতভাগা এমন ব্যক্তির ন্যায় যে লোকমুখে শুনিয়াছে পরশমণি স্বর্ণ অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ ; কারণ, ইহার সাহায্যে অপরিমিত স্বর্ণ প্রস্তুত করা যায়। এই বিশ্বাসের বশীভূত হইয়া সে তাহার সম্মুখে স্থাপিত অপরিমিত স্বর্ণরাশি গ্রহণ না করিয়া বলিতে লাগিল- “ স্বর্ণ কি কাজে লাগে? ইহার মূল্যই বা কতটুকু? আমি পরশমণি চাই, পরশমণিই স্বর্ণের মূল।” এই বলিয়া সে স্বর্ণ গ্রহণ করিল না। অথচ সে পরশমণি কখনও দেখেও নাই এবং জানেও না যে, ইহার দর্শন কেমন পদার্থ। এই প্রকার লোক নিতান্ত হতভাগা, নিঃস্ব ও অতৃপ্ত থাকে৷  'স্বর্ণ অপেক্ষা পরশমণি শ্রেষ্ঠ' বাক্য আওড়াইয়া ইহার আনন্দে বেচারা বিভোর থাকে এবং এই প্রকার আরও বহু লম্বা লম্বা কথা বানাইতে থাকে। 

আম্বিয়া-আউলিয়া ও আলিমগণের মরতবার তুলনা 

আত্মদর্শন (৩৩) জাহেরী ইলম রূহানী ইল্‌মের অন্তরায়



আত্মদর্শন পর্ব - ৩৩
📚কিমিয়ায়ে সাদাত ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)

জাহেরী ইলম রূহানী ইল্‌মের অন্তরায় 
এ পর্যন্ত যাহা বর্ণিত হইল তাহাতে মানবাত্মার শ্রেষ্ঠত্ব বুঝা গেল এবং সূফীগণের পথ কি, তাহাও প্রকাশ পাইল। তুমি হয়ত শুনিয়া থাকিবে যে, সুফীগণ বলেন, জাহেরী ইল্ল্ম তাঁহাদের পথের অন্তরায় এবং হয়ত তুমি ইহা অস্বীকারও করিয়া থাকিবে। তুমি একথা অবিশ্বাস করিও না। সূফীগণের একথা সত্য। কারণ, তুমি যদি জড়জগত ও জড়জগতের জ্ঞান লইয়াই মশগুল থাক তবে তুমি সূফীগণের উন্নত অবস্থা হইতে দূরে বহুদূরে এক পর্দার অন্তরালে পড়িয়া থাকিবে। মানবাত্মা কূপসদৃশ। পাঁচ ইন্দ্রিয় যেন এই কূপের পাঁচটি নালা ইন্দ্রিয়রূপ নালাপথে বাহিরজগতের জ্ঞানীরূপ পানি সর্বদা আত্মারূপ কূপে আসিয়া সঞ্চিত হইতেছে। কূপের তলদেশ হইতে পরিষ্কার পানি বাহির করিবার তোমার ইচ্ছা থাকিলে প্রথমে নালা কয়টিকে বন্ধ করিয়া দাও, যাহাতে বাহিরের পানি ভিতরে আসিতে না পারে। তত্পর কূপে সঞ্চিত সমস্ত পানি ও কর্দমাদি বাহির করিয়া ফেল। অবশেষে কূপের তলদেশে খনন কর। তাহা হইলে দেখিবে , পাতাল হইতে পরিষ্কার পানি আসিয়া কূপ পরিপূর্ণ করিয়া ফেলিবে। যতক্ষণ পূর্বসঞ্চিত পানিতে কৃপ পরিপূর্ণ থাকে এবং বাহির হইতে পানি আসিবার পথ খোলা থাকে ততক্ষণ পাতাল হইতে নির্মল পানি উঠিতে পারে না। এইরূপ , যতক্ষণ বাহ্য জ্ঞান মন হইতে বিদূরীত না হইবে ততক্ষণ আত্মার অভ্যন্তর হইতে বিশুদ্ধ জ্ঞান উৎপন্ন হইবে না। কিন্তু আলিম যদি অর্জিত ইল্‌ম হইতে স্বীয় হৃদয় খালি করিয়া ফেলে এবং উহাতে লিপ্ত না থাকে তবে তদ্রূপ ইল্‌ম তাহার জন্য অন্তরাল হয় না বরং তাহার অন্তর্চক্ষু খুলিয়া যায় এবং নির্মল ইলম তাহার হৃদয়ে উৎপন্ন হইতে থাকে। এমনিভাবে জড়জগতের সহিত ইন্দ্রিয়সমূহের সম্মিলনে হৃদয়ে যে সকল খেয়ালের উদয় হয় তৎসমুদয় হইতে হৃদয় মুক্ত রাখিলে উহা আর তত্ত্বজ্ঞানের পথে অন্তরাল হইবে না। অর্জিত ইল্‌ম এ পথে অন্তরাল কেন হয় এ সম্বন্ধে একটি উদাহরণ দেওয়া যাইতেছে। মনে কর, এক ব্যক্তি আহলে সুন্নত ওয়াল জামাআতের আকিদাসমূহ শিক্ষা করিয়াছেন, এ বিষয়ে তর্ক-বিতর্কের যাবতীয় আবশ্যক দলিল প্রমাণাদিও সংগ্রহ করিয়াছেন, নিজকে সম্পূর্ণরূপে উহাতেই লিপ্ত রাখিয়াছেন এবং বিশ্বাস করিয়া লইয়াছেন যে, এই ইল্‌ম ব্যতীত আর ইল্মই নাই। এমতাবস্থায় তাহার হৃদয়ে কোন নূতন জ্ঞানের উদ্ভব হইলে তিনি বলিবেন- “যাহা আমি শিখিয়াছি ইহা তাহার বিপরীত এবং যাহা আমার জ্ঞানের বিপরীত তাহা মিথ্যা।” এই প্রকার লোকের জন্য কোন কিছুর হাকীকত উপলব্ধি করা একেবারে অসম্ভব। কারণ সাধারণ লোককে তাঁহারা যে আকীদা শিখাইয়া থাকেন তাহা হাকীকতের ছাঁচমাত্র, আসল হাকীকত নহে। অস্থি হইতে যেমন মজ্জা বাহির হয় তদ্রূপ সেই ছাঁচ হইতে যে প্রকৃত সত্য প্রকাশিত হয় তাহাকেই আসল হাকীকত ও পূর্ণ মা'রিফাত বলে। যে আলিম ধর্মবিশ্বাস দৃঢ় করিবার জন্য কেবল তর্ক-বিতর্কের কৌশল শিক্ষা করেন তাঁহার প্রতি হাকীকত প্রকাশ পায় না। কারণ এমন আলিম মনে করেন,- “সমস্ত ইল্মই আমি শিখিয়া লইয়াছি।” এইরূপ ধারণাই প্রকৃত জ্ঞানের পথে তাহার অন্তরাল হইয়া দাড়ায়। যাহারা সামান্য ইল্‌ম শিখিয়াছেন তাঁহাদের মনে এই ধারণা বলবান থাকে। এই জন্যই তাঁহারা প্রকৃত জ্ঞান হইতে বঞ্চিত ও পর্দার অন্তরালে থাকেন। কিন্তু যে আলিম তদ্রূপ ধারণা করেন না তাঁহার নিকট অর্জিত ইল্‌ম কিছুমাত্র বাধা জন্মায় না ; বরং অজ্ঞানতার সমস্ত পর্দা তাঁহার সম্মুখ হইতে বিদূরিত হয়, তাঁহার কাশ্ফ হইতে থাকে এবং তিনি পূর্ণতা লাভ করেন। প্রথম হইতে জ্ঞানের পথে যাহার পদ দৃঢ় হয় নাই তাহার পথ হইতে তদ্রূপ আলিমের পথ খুব ভয়শূন্য ও সরল। যে ব্যক্তি আলিম নহে সে হয়ত দীর্ঘকাল কোন মিথ্যা খেয়ালে জড়িত থাকে এবং ফলে সামান্য সন্দেহই তাহার পক্ষে প্রবল অন্তরাল হইয়া দাঁড়ায়। কিন্তু আলিম এরূপ বিপত্তি হইতে নিরাপদে থাকেন। 

জাহেল ভণ্ড সূফী 

আত্মদর্শন (৩২) ওলী ও পয়গম্বগণের গুণ সাধারণের ধারণাতীত



আত্মদর্শন পর্ব - ৩২
📚কিমিয়ায়ে সাদাত ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)

ওলী ও পয়গম্বগণের গুণ সাধারণের ধারণাতীত 
মোটকথা এই, উপরে যে তিন প্রকার গুণের কথা বলা হইল উহা ছাড়া আর বহু উৎকৃষ্ট গুণ তাঁহাদের আছে যাহার ছায়াও সাধারণের মধ্যে নহে এবং আমরা সৎসমুদয় বুঝিয়া উঠিতে পারি না । আল্লাহ্ তা'আলা  ব্যতীত যেমন কেহ আল্লাহকে চিনতে পারে না, তদ্রূপ পয়গম্বরকেও পয়গম্বর ব্যতীত অপর কেহই সম্যকরূপে চিনতে পারে না। তবে পয়গম্বর নিজকে এবং তদপেক্ষা শ্রেষ্ঠ পয়গম্বর তাঁহাকে চিনতে পারেন। মানুষের মধ্যে পয়গম্বরগণের মর্যাদা কেবল পয়গম্বরগণই জানেন। আমরা ইহার অধিক আর কিছুই জানি না। আমরা যদি নিদ্রার অবস্থা না জানিতাম এবং কেহ আমাদিগকে বলিত- “অমুক ব্যক্তি বেহুঁশ ও নিশ্চল অবস্থায় কিছুক্ষণ ভূতলে পতিত ছিল তখন সে দেখিতে ও শুনিতে পায় নাই এবং কি ঘটিয়াছে তাহাও বুঝিতে পারে নাই, কতক্ষণ পর আবার দেখিতে শুনিতে লাগিল, তবে ইতিপূর্বে তাহার কি অবস্থা হইয়াছিল তাহা সে নিজেও বুঝিতে পারিত না এবং আমরাও উহা বিশ্বাস করিতাম না। কারণ, মানুষ যাহা দেখে নাই তাহা বিশ্বাস করিতে পারে না। এজন্যই আল্লাহ্ তা'আলা  বলেন  : “বরং যে বিষয় (কুরআন) তাহাদের জ্ঞানে বেড় পাইল না এবং যাহার মত তাহাদের নিকট পরিষ্কার হইল না ইহাকে তাহারা মিথ্যা জানিল।” আল্লাহ্ অন্যত্র বলেন : “আর যখন তাহারা (কুরআনের দ্বারা) পথ পায় নাই তখন নিশ্চয়ই বলিবে যে, ইহা একটি পুরাতন মিথ্যা।” ওলী ও পয়গম্বরগণের এমন গুণ আছে যাহার সন্ধানও অপর লোকে জানে না এবং তাঁহারা ইহার কারণে এক অনির্বচনীয় সুখাস্বাদ ভোগ করেন ও অলৌকিক অবস্থা প্রাপ্ত হন। এই কথা শুনিয়া তুমি আশ্চর্যবোধ করিও না। কারণ, তুমি জান যে কবিতার প্রতি যাহার আসক্তি নাই, সুরভঙ্গি নাই, সুরভঙ্গিতে সে কোন আনন্দ পায় না। কবিতার প্রতি অনাসক্ত ব্যক্তিকে কেহই কবিতার মাধুর্য বুঝাইতে পারে না, কেননা সে দর্শন কবিতা সম্বন্ধে কোন খবরই রাখে না। এইরূপ জন্মান্ধ ব্যক্তি বর্ণ-বৈচিত্র্য ও দর্শনের সুখ অনুভব করিতে পারে না। এ বিষয়েও আশ্চর্যবোধ করিও না যে, আল্লাহ্ পয়গম্বরগণকে নবুয়ত প্রদান করার পর আরও কতকগুলি এমন গুণ ও অবস্থা প্রদান করেন যাহা তৎপূর্বে তাঁহারা কল্পনাও করিতে পারেন নাই।

জাহেরী ইলম রূহানী ইল্‌মের অন্তরায় 

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...