রবিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৩

তওবা - (পর্ব - ১১) পূর্ণাঙ্গ তওবা ও তার শর্তাবলী

 

তওবা - (পর্ব - ১১)
পূর্ণাঙ্গ তওবা ও তার শর্তাবলী

পূর্বেই বর্ণিত হয়েছে যে, তওবা সেই অনুশোচনাকে বলা হয়, যার ফলস্বরূপ সংকল্প অস্তিত্ব লাভ করে। নিজের এবং প্রেমাস্পদের মাঝে গোনাহের প্রাচীর খাড়া হওয়ার জ্ঞান হচ্ছে এই অনুশোচনার কারণ। সুতরাং তওবার অংশ হচ্ছে জ্ঞান, অনুশোচনা ও সংকল্প। এই অংশত্রয়ের প্রত্যেকটির জন্যে রয়েছে পূর্ণাঙ্গতার পরিচয় ও স্থায়িত্বের শর্তাবলী। এগুলো বর্ণনা করা জরুরী। জ্ঞানের বর্ণনা হচ্ছে তওবার কারণ বর্ণনার নামান্তর, যা পরে উল্লিখিত হবে। এখানে প্রথমে অনুশোচনা বলা হয় অন্তরের ব্যথাকে, যা প্রেমাস্পদকে হারানোর সংবাদ শুনে সৃষ্টি হয়। এর পরিচয় হচ্ছে অত্যধিক দুঃখ ও বেদনা হওয়া, অশ্রু বিসর্জন করা এবং প্রচুর কান্নাকাটি করা; যেমন কেউ আপন সন্তান অথবা কোন প্রিয়জনের বিপদ সম্পর্কে অসহ্য যন্ত্রণা অনুভব করে এবং প্রচুর কান্নাকাটি করে।


এখন প্রশ্ন হল নিজের প্রাণের চেয়ে অধিক প্রিয় আর কি, জাহান্নামের অগ্নির চেয়ে বড় বিপদ আর কি এবং গোনাহের চেয়ে বেশী আযাব নাযিল হওয়ার প্রমাণ কোন্‌টি? বরং একজন মানুষ যাকে চিকিৎসক বলা হয়, সে যদি কোন ব্যক্তিকে বলে দেয়, তোমার পুত্র দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়েছে এবং সে অতিসত্ত্বর মারা যাবে, তবে তৎক্ষণাৎ সে দুঃখ ভারাক্রান্ত হয়ে পরে এবং কান্নাকাটি শুরু করে দেয়। অথচ পুত্র প্রাণাধিক প্রিয় নয় এবং ডাক্তারও আল্লাহ ও রসূলের চেয়ে অধিক জ্ঞানী ও সত্যবাদী নয়। এ থেকে জানা গেল যে, মানুষের উচিত নিজের দুরবস্থার জন্যে অধিক দুশ্চিন্তা ও দুঃখ করা। দুঃখ, দুশ্চিন্তা ও অনুতাপ যত বেশী হবে, সে পরিমাণে গোনাহ দূর হওয়ার আশা করা যাবে। মোটকথা, অন্তরের বিনম্রতা এবং অশ্রুপাত হল বিশুদ্ধ অনুশোচনার লক্ষণ। হাদীসে বর্ণিত আছে, তওবাকারীদের সংসর্গ অবলম্বন কর। তাদের অন্তর খুব নরম থাকে। অন্তরে গোনাহের স্বাদের পরিবর্তে তিক্ততা প্রতিষ্ঠিত হওয়াও অনুশোচনার একটি লক্ষণ। 


বর্ণিত আছে, বনী ইসরাঈলের এক ব্যক্তি গোনাহ করার পর অনেক বছর পর্যন্ত এবাদতে মশগুল থাকে। কিন্তু তওবা কবুল হওয়ার কোন লক্ষণ প্রকাশ পেল না। অগত্যা সে সমসাময়িক পয়গম্বরের কাছে সুপারিশ প্রার্থী হল। পয়গম্বর আল্লাহর দরবারে তার জন্য দোয়া করলেন। আল্লাহ পাক এরশাদ করলেন: আমার ইযযত ও প্রতাপের কসম, যদি ভূ-পৃষ্ঠের সকলেই তার জন্যে সুপারিশ করে, তবুও আমি তার তওবা কবুল করব না- যতক্ষণ পর্যন্ত যে গুনাহ থেকে সে তওবা করেছে, তার স্বাদ তার অন্তরে থাকবে।

এখানে কেউ প্রশ্ন করতে পারে যে, গোনাহ স্বাভাবিকভাবেই মানুষের কাছে সুস্বাদু হয়ে থাকে। সুতরাং এর তিক্ততা অন্তরে প্রতিষ্ঠিত হবে কিরূপে? জওয়াব এই যে, মনে কর কেউ বিষ মিশ্রিত মধু পান করল। অধিক মিষ্ট হওয়ার কারণে সে পান করার সময় বিষ টের পেল না। এরপর সে অসুস্থ হয়ে পড়ল, চুল বিক্ষিপ্ত হয়ে গেল এবং সর্বাঙ্গ শক্ত হয়ে গেল। এখন যদি কেউ তার সামনে পূর্ববৎ বিষ মিশ্রিত মধু পেশ করে এবং সেও চরম ক্ষুধার্ত ও পিপাসার্ত হয়, তবে সে এই মধুকে ঘৃণা করবে কি না? যদি বল করবে না তবে এটা অভিজ্ঞতার পরিপন্থী। নিয়ম এই যে, এহেন কষ্ট ভোগ করার পর যদি কেউ খাঁটি মধুও পেশ করে, তবে একরূপ রঙ দেখে তা-ও প্রত্যাখ্যান করবে। কথায় বলে চুন খেয়ে মুখ পুড়লে দৈ দেখলেও ভয় লাগে। অতএব, তওবাকারী ব্যক্তি অন্তরে গোনাহের যে তিক্ততা অনুভব করে, তাও এমনিভাবে বুঝা দরকার। প্রথমে সে জানে, প্রত্যেক গোনাহের স্বাদ মধুর মত মিষ্ট। কিন্তু তার প্রতিক্রিয়া বিষের অনুরূপ। এরূপ বিশ্বাস না হওয়া পর্যন্ত তওবা খাঁটি ও সাচ্চা হয় না। কিন্তু এরূপ বিশ্বাস খুব বিরল। তাই তওবা এবং তওবাকারীও বিরল। সকলেরই এক অবস্থা। তারা আল্লাহর প্রতি বিমুখ এবং গোনাহে অবিচল


এখন সংকল্প সম্পর্কে বলা যাক। এটা অনুশোচনা থেকে উৎপন্ন হয় এবং তিনটি কালের সাথেই এর সম্পর্ক। 

বর্তমানকালে সংকল্পের অর্থ এই যে, যে নিষিদ্ধ কাজ করে যাচ্ছে, তা বর্জন করবে এবং যে ফরয কর্ম করার উদ্যোগ নিয়েছে, তা তখনই আদায় করে নেবে। অতীতকালে সংকল্পের মানে এই যে, পূর্বে যে ত্রুটি হয়ে গেছে, তা পূরণ করবে। 

ভবিষ্যতকালে সংকল্পের উদ্দেশ্য হল মৃত্যু পর্যন্ত এবাদত-বন্দেগী অব্যাহত রাখবে এবং গোনাহ বর্জন করবে।

অতীতকালের সাথে সম্পর্কের দিক দিয়ে তওবা বিশুদ্ধ হওয়ার শর্ত এই যে, চিন্তা করে বের করবে কোন্ দিন সে বালেগ হয়েছিল। এটা জানা হয়ে গেলে সেদিন থেকে আজ পর্যন্ত যতটুকু বয়স হয়েছে, তার এক এক বছর, মাস ও দিনের মধ্যে খোঁজ করে দেখবে কোন্ এবাদতে সে ত্রুটি করেছে অথবা কি পরিমাণ গোনাহ করেছে। যদি জানা যায় যে, কতক নামায সে পড়েনি, তবে সেই নামাযের কাযা পড়বে। এরূপ নামাযের সঠিক সংখ্যা জানা না গেলে বালেগ হওয়ার দিন থেকে হিসাব করে যে পরিমাণ নামায নিশ্চিতরূপে আদায় করা হয়েছে, সেগুলো বাদ দিয়ে অবশিষ্ট নামাযের কাযা পড়বে। এরূপ নামাযের সংখ্যা আন্দাজ করে নেয়াও জায়েয। রোযার ক্ষেত্রেও এভাবে আন্দাজ করে নেবে, কয়টি রোযা রাখা হয়নি। এরপর সেগুলোর কাযা করে নেবে। যাকাত না দিয়ে থাকলে নিজের সমস্ত ধন -সম্পদকে দেখবে, কবে থেকে তার মালিকানায় এসেছে। তবে এতে বালেগ হওয়ার শর্ত নেই। কেননা, নাবালেগের মালেও যাকাত ফরয হয়। অতঃপর হিসাব করে প্রবল ধারণা অনুযায়ী যে পরিমাণ যাকাত ওয়াজিব হবে, তা আদায় করে দেবে। এ হচ্ছে এবাদতে খোঁজাখুঁজি করে ত্রুটি জানা ও তা পূরণ করার পদ্ধতি।


গোনাহের ক্ষেত্রে উপায় এই যে, বালেগ হওয়ার শুরু থেকে তওবার দিন পর্যন্ত নিজের সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের গোনাহ দিন ও ঘন্টায় চিন্তা করবে এবং পৃথক পৃথক গোনাহ সম্পর্কে অবগতি লাভ করবে। এরপর দেখবে এসব গোনাহের কোন্ কোন্‌টি আল্লাহর হক সম্পর্কিত এবং কোন্ কোন্‌টি বান্দার হক সম্পর্কিত। যে সকল গোনাহ্ আল্লাহর হক সম্পর্কিত, সেগুলো থেকে তওবার উপায় হচ্ছে দুঃখ ও অনুতাপ করা এবং প্রত্যেক গোনাহের বিনিময়ে সৎকর্ম করা। এমতাবস্থায় যে পরিমাণ গোনাহ হবে, সে পরিমাণে সৎকর্ম করতে হবে। কারণ, হাদীসে আছে — "তুমি যেখানেই থাক, আল্লাহকে ভয় কর এবং গোনাহের পশ্চাতে সৎকর্ম সম্পাদন কর;" বরং কোরআন পাকে বলা হয়েছে, “সৎকর্ম পাপকে মিটিয়ে দেয়”।

এই বিনিময়ের কয়েকটি দৃষ্টান্ত এই যে, যদি কেউ বাদ্যযন্ত্র শুনে থাকে, তবে তার বিনিময়ে ততক্ষণ কোরআন, ওয়ায অথবা যিকর শুনবে। মসজিদে নাপাক অবস্থায় বসে থাকলে, ততক্ষণ এতেকাফের নিয়তে বসে এবাদতে মশগুল হবে। উযু ছাড়া কোরআন মজীদ স্পর্শ করে থাকলে তার সম্মান করবে, অধিক পরিমাণে তেলাওয়াত করবে এবং চুম্বন করবে। মদ্যপান করে থাকলে হালাল উপার্জনের শরবত সদকা করবে। উদ্দেশ্য এই যে, প্রত্যেক গোনাহের বিপরীত পদ্ধতি দ্বারা সেই গোনাহের বিপরীত সৎকর্মের আলো ছাড়া দূর হবে না। উদাহরণতঃ কাল রঙ দূর করতে হলে সাদা রঙ প্রয়োগ করতে হবে। উত্তাপ ও শৈত্য দ্বারা তা দূর হবে না। গোনাহ দূর করার জন্যে এ পদ্ধতি অধিক ফলপ্রসূ ও সহজ – যদিও এক প্রকার এবাদত অব্যাহতভাবে করতে থাকলেও কিছুটা ফল লাভের আশা আছে। বিপরীত পদ্ধতি দ্বারা গোনাহ দূর হওয়ার কারণ এই যে, দুনিয়ার মোহ সকল গোনাহের মূল শিকড়। দুনিয়ার অনুগামী হওয়ার প্রভাবে অন্তর দুনিয়ার প্রতি তুষ্ট থাকে এবং তৎপ্রতি আগ্রহান্বিত হয়। 

অতএব, মুসলমান ব্যক্তির উপর এমন বিপদ আসা জরুরী, যা দ্বারা তার অন্তর দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। কেননা, দুঃখ ও বেদনার কারণে অন্তর দুনিয়া থেকে আলাদা হয়ে যায়। এটাও তার জন্যে গোনাহের কাফফারা হয়ে যায়।


হাদীসে আছে, কতক গোনাহের জন্য কেবল দুঃখ ও বেদনাই হয়ে থাকে। হযরত আয়েশা (রাঃ) বর্ণিত এক রেওয়ায়েতে এরশাদ হয়েছে— যখন বান্দার গোনাহ বেশী হয়ে যায় এবং কাফফারার জন্যে আমল থাকে না, তখন আল্লাহ তা'আলা তাকে অনেক দুঃখ ও কষ্টে ফেলে দেন এবং এ দুঃখ-কষ্টই তার গোনাহের কাফ্ফা হয়ে যায়।


এখানে প্রশ্ন হতে পারে যে, মানুষের দুঃখ-কষ্ট অধিকাংশ ধন-সম্পদ, সন্তান-সন্ততি ও জাঁকজমকের কারণে হয়ে থাকে। এটা গোনাহ। সুতরাং গোনাহের কাফফারা গোনাহ কিরূপে হবে? এর জওয়াব এই যে, ধনসম্পদ ও সন্তান-সন্ততির মহব্বত গোনাহ এবং এগুলো থেকে বঞ্চিত থাকা এ গোনাহের বিনিময়। মহব্বতের চাহিদা অনুযায়ী ভোগ করলে পূর্ণ দোষী হত। 

বর্ণিত আছে, হযরত জিবরাঈল বন্দীশালায় হযরত ইউসুফ (আঃ)-এর কাছে গমন করলে তিনি জিবরাঈলকে জিজ্ঞেস করলেন : সেই দরদী বৃদ্ধ অর্থাৎ হযরত এয়াকুব (আঃ)-কে কি অবস্থায় রেখে এসেছেন? জিবরাঈল (আঃ) বললেন : তিনি আপনার জন্যে যে দুঃখ সয়েছেন, তা এমন একশ' জন মহিলার দুঃখের সমান, যাদের সন্তান মারা গেছে। তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন : তিনি আল্লাহর কাছে এই দুঃখ-কষ্টের সওয়াব কি পরিমাণে পাবেন? উত্তর হল : তিনি শহীদের অনুরূপ সওয়াব পাবেন। এ থেকে বুঝা গেল, দুঃখ-কষ্টও আল্লাহর হকের কাফ্ফারা হয়ে থাকে।


পরবর্তী পর্ব

বান্দার হক সম্পর্কিত তওবা

শনিবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৩

তওবা - (পর্ব - ১০) সগীরা গোনাহ কিরূপে কবীরা হয়ে যায়



তওবা - (পর্ব - ১০)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

সগীরা গোনাহ কিরূপে কবীরা হয়ে যায়—

জানা উচিত যে, সগীরা গোনাহ কয়েকটি কারণে কবীরা হয়ে যায়। তন্মধ্যে একটি হচ্ছে অব্যাহতভাবে করে যাওয়া। এ কারণেই বলা হয়েছে যে, কোন গোনাহ অব্যাহতভাবে করা হলে তা সগীরা নয় এবং যে কোন গোনাহ এস্তেগফার (ক্ষমা প্রার্থনা) সহকারে করা হলে তা কবীরা নয়। এর সারমর্ম এই যে, যদি কোন ব্যক্তি একটি কবীরা গোনাহ করে বিরত থাকে এবং অন্য কবীরা গোনাহ না করে, তবে এতে ক্ষমা পাওয়ার আশা অধিক সেই সগীরা গোনাহের তুলনায়— যা অব্যাহতভাবে করা হয়। দৃষ্টান্তস্বরূপ যদি শক্ত পাথরের উপর এক এক ফোটা পানি অব্যাহতভাবে পতিত হতে থাকে, তবে এক সময়ে পাথরে চিহ্ন দেখা দেবে । পক্ষান্তরে যদি সকল ফোটার পানি একত্রিত করে এক সাথে সেই পাথরের উপর ঢেলে দেয়া হয়, তবে কোন চিহ্ন দেখা দেবে না। অব্যাহতভাবে করার এই প্রভাবের প্রতি লক্ষ্য করেই রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করেন– “সর্বোত্তম আমল তাই, যা অব্যাহতভাবে করা হয়। যদিও তা পরিমাণে কম হয়। এ হাদীস থেকে জানা গেল যে, স্থায়ী আমল কম হলেও উপকারী। এর বিপরীতে আরও জানা গেল যে, অনেক আমল যা মানুষ একবারে করে নেয়, তা অন্তরের পবিত্রতায় কম উপকারী হয়ে থাকে। এমনিভাবে সগীরা গোনাহ যদি অব্যাহতভাবে করা হয়, তবে তা অন্তরকে মলিন ও তমসাচ্ছন্ন করার ব্যাপারে অধিক প্রভাবশালী হবে। তবে একথা ঠিক যে, অগ্রে ও পশ্চাতে সগীরা গোনাহ না করে সহসাই কবীরা গোনাহ করার দৃষ্টান্ত খুবই বিরল। উদাহরণতঃ হত্যাকারী সহসাই কাউকে হত্যা করে না যে পর্যন্ত পূর্ব থেকে শত্রুতা না হয়। এমনিভাবে প্রত্যেক কবীরা গোনাহ করার মধ্যে প্রাসঙ্গিকভাবে শুরুতে ও শেষে সগীরাও করা হয়। যদি কোন ক্ষেত্রে সগীরা ব্যতিরেকেই সহসা কবীরা গোনাহ হয়ে যায় এবং পুনর্বার তা না করা হয়, তবে সম্ভবত এই কবীরা গোনাহ মাফ হওয়ার আশা সেই সগীরার তুলনায় বেশী, যা আজীবন করা হয়। সগীরা গোনাহ কবীরা হয়ে যাওয়ার আরও একটি কারণ হচ্ছে গোনাহকে ছোট মনে করা। কেননা, এটাই নিয়ম যে, মানুষ নিজের গোনাহকে যত বড় মনে করবে, আল্লাহ তা'আলার কাছে তা ততই ছোট হবে এবং গোনাহকে যত সগীরা মনে করবে, তা ততই কবীরা হবে : কারণ, গোনাহকে বড় মনে করা এ বিষয়ের প্রমাণ যে, অন্তরে গোনাহের প্রতি বিতৃষ্ণা ও ঘৃণা বিদ্যমান রয়েছে। ফলে, অন্তরে এর প্রভাব বেশী হয় না। পক্ষান্তরে গোনাহকে ছোট মনে করলে বুঝা যায়, অন্তরে এর প্রতি টান রয়েছে। এ কারণেই অন্তরে এর প্রভাব বেশী হয়। আর এ কারণেই মানুষ অসাবধানতায় কোন পাপ করে ফেললে তজ্জন্য পাকড়াও করা হয় না। কেননা, এ অবস্থায় অন্তর প্রভাবিত হয় না। হাদীস শরীফে আছে, “ঈমানদার ব্যক্তি তার গোনাহকে এমন মনে করে যেন মাথার উপর একটি পাহাড় এসে গেছে এবং এক্ষণি তা মাথার উপর পড়ে যাবে। পক্ষান্তরে মুনাফিক তার গোনাহকে এমন মনে করে– যেন নাকের ডগায় মাছি বসেছে এবং তাকে উড়িয়ে দিয়েছে। ঈমানদারের অন্তরে গোনাহের এই গুরুত্বের কারণ এই যে, সে আল্লাহ তা'আলার প্রতাপ সম্পর্কে সম্যক অবগত। যখন সে চিন্তা করে যে, এই গোনাহের মাধ্যমে সে কার অবাধ্যতা করেছে, তখন সগীরা গোনাহও তার দৃষ্টিতে কবীরা প্রতিভাত হয়। বর্ণিত আছে, আল্লাহ তা'আলা কোন এক নবীকে এই ওহী প্রেরণ করেন যে, উপঢৌকন কম;এদিকে লক্ষ্য করো না, বরং দেখ– যে প্রেরণ করেছে সে কতটুকু মহান। তোমার পাপ ছোট– এদিকে দেখো না, বরং ভেবে দেখ, এ পাপ করে তুমি কার মোকাবিলা করেছ ? এদিক দিয়েই জনৈক সাধক বলেন : সগীরা গোনাহের কোন অস্তিত্বই নেই। যে বিষয়ে আল্লাহ তা'আলার বিরোধিতা হয়, তা কবীরা-ই বটে৷ 


সগীরা গোনাহ কবীরা হয়ে যাওয়ার আরেকটি কারণ হচ্ছে গোনাহ করে উল্লসিত হওয়া এবং গর্ব করা। অতএব, মানুষ সগীরা গোনাহের যত বেশী স্বাদ পাবে, ততই তা কবীরা হবে। অন্তরকে তমসাচ্ছন্ন করার ব্যাপারে তার প্রভাবও বেশী হবে। এমনকি কতক গোনাহগার তাদের গোনাহের জন্যে বাহবা পেতে চায় এবং গোনাহ করে খুব আস্ফালন করে। উদাহরণতঃ কোন কোন ব্যবসায়ী বলে- দেখ, আমি খারাপ মাল কিভাবে চালিয়ে দিলাম এবং ক্রেতাকে ধোকা দিয়ে দিলাম। বলা বাহুল্য, এসব কারণে সগীরা গোনাহ কবীরা হয়ে যায়। আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে সময় দেয়া ও সহ্য করাকে তাঁর অনুগ্রহ মনে করে নিলেও সগীরা গোনাহ কবীরা হয়ে যায়। এই অনুগ্রহ মনে করার কারণে গোনাহগার ব্যক্তি গোনাহ বর্জন করতে অলসতা করে। সে জানে না যে, এই সময় দেয়ার পেছনে আল্লাহ তা'আলার উদ্দেশ্য হচ্ছে আরও বেশী গোনাহ করে নিক। সুতরাং বাস্তবে যা ক্রোধের কারণ, তাকেই অনুগ্রহের কারণ মনে করে নেয়া হয়। আল্লাহ তা'আলা এরশাদ করেন- “তারা মনে মনে বলে : আমাদের কথার কারণে আল্লাহ আমাদেরকে শাস্তি দেন না কেন”? তাদের জন্যে জাহান্নাম যথেষ্ট। তারা তাতে প্রবেশ করবে। এটা অত্যন্ত মন্দ জায়গা। গোনাহ করে তা বলে বেড়ানো অথবা অপরের সামনে গোনাহ করার কারণেও সগীরা গোনাহ কবীরা হয়ে যায়। কেননা, এতে প্রথমত, আল্লাহর পক্ষ থেকে যে গোপন রাখা হয়, তা ভেঙ্গে দেয়া হয়। দ্বিতীয়ত, অপরকে এ গোনাহের প্রতি উৎসাহিত করা হয়। ফলে, এক গোনাহের মধ্যে যেন দু’গোনাহ হয়ে যায়। হাদীসে বর্ণিত আছে, সকল মানুষের দোষ মার্জনা করা হবে ; কিন্তু যারা গোনাহ করে ফাঁস করে দেয়, তাদেরকে ক্ষমা করা হবে না। অর্থাৎ কেউ রাতের বেলায় দোষ করল, যা আল্লাহ তা'আলা গোপন রাখলেন। কিন্তু সকালে গাত্রোখান করে সে আল্লাহর পর্দাকে ছিন্ন করল এবং আপন গোনাহ প্রকাশ করে দিল। এরূপ ব্যক্তির দোষ মার্জনা করা হবে না। গুণ প্রকাশ করা, দোষ গোপন করা এবং গোপন বিষয় ফাঁস না করা বান্দার প্রতি আল্লাহ তা'আলার অন্যতম নেয়ামত। যে ব্যক্তি নিজের দোষ প্রকাশ করে দেয়, সে এই নেয়ামতের নাশোকরী করে। জনৈক বুযুর্গ বলেন  প্রথমত, মানুষের কোন গোনাহ না করা উচিত। যদি করেও, তবে অপরকে উৎসাহিত না করা উচিত। গোনাহগার ব্যক্তি আলেম ও অনুসৃত হলেও সগীরা গোনাহ কবীরা হয়ে যায়। আলেম ব্যক্তি যখন কোন সগীরা গোনাহ করে এবং তার অনুসরণে অন্যরাও তা করতে থাকে, তখন এ গোনাহ আলেম ব্যক্তির জন্যে কবীরা হয়ে যাবে। 

উদাহরণতঃ রেশমী বস্ত্র পরিধান করা, সন্দেহযুক্ত ধনসম্পদ গ্রহণ করা, শাসকবর্গের কাছে আসা-যাওয়া করা, তাদের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করা এবং মুসলমানের মর্যাদাহানি করা ইত্যাদি। 

মানুষ আলেমের এ ধরনের দোষের সনদ পেশ করে থাকে। আলেম মরে যায় কিন্তু তার অনিষ্ট অব্যাহত থাকে। বলা বাহুল্য, যে ব্যক্তির সাথে সাথে তার পাপও মরে যায়, সে চমৎকার ব্যক্তি। হাদীসে আছে— যে ব্যক্তি কুপ্রথা চালু করে , সে নিজে সেই কাজ করার জন্যে গোনাহগার হবে এবং অন্য যারা এ কাজ করবে, তাদের পাপও তার উপর বর্তাবে এমতাবস্থায় যে, তাদের পাপ হ্রাস করা হবে না। অর্থাৎ যারা করবে তাদের পাপ আলাদা হবে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আমি সেই আমল লিখি, যা তারা অগ্রে পাঠায় এবং সেই আমল, যার চিহ্ন তাদের পেছনে থাকে”। 

এখানে ‘পেছনের চিহ্ন’ বলে সেই আমলকে বুঝানো হয়েছে, যা আমলকারীর মৃত্যুর পরও অব্যাহত থাকে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন আলেমের দুর্ভোগ অপরের অনুসরণের কারণে হয়ে থাকে। সে ভুল করলে তওবা করে নেয় ; কিন্তু মানুষ এরপরও তার অনুসরণ করতে থাকে এবং কাজটিকে ছড়াতে থাকে। জনৈক বুযুর্গ বলেন : আলেমের দোষ নৌকা ভেঙ্গে যাওয়ার মত। এতে নৌকা নিজেও নিমজ্জিত হয় এবং যাত্রীদেরকেও ডুবিয়ে দেয়। বনী ইসরাঈলের জনৈক আলেম মানুষকে বেদআত শিক্ষা দিয়ে গোমরাহ করত। পরবর্তীতে তার তওবা নসীব হয় এবং সে দীর্ঘকাল পর্যন্ত মানুষের সংস্কারে নিয়োজিত থাকে। আল্লাহ তা'আলা সমসাময়িক পয়গম্বরের কাছে এই মর্মে ওহী পাঠালেন যে, তাকে বলে দাও, 

“যদি তুমি কেবল আমারই দোষ করতে, তবে আমি তোমাকে মাফ করে দিতাম। কিন্তু তুমি তো বহু মানুষকে গোমরাহ করেছ, যে কারণে আমি তাদেরকে দোযখে নিক্ষেপ করেছি"। 

এ থেকে বুঝা গেল, আলেমদের দুটি বিষয় করা উচিত। প্রথমত, তারা মূলতই গোনাহ বর্জন করবে। দ্বিতীয়ত, যদি গোনাহ হয়ে যায়, তবে তা প্রকাশ করবে না। 

আলেমদের গোনাহের শাস্তি যেমন বেশী হয়, তেমনি তাদের পুণ্যকর্মের সওয়াবও অন্যদের অনুসরণের কারণে বেশী হয়। উদাহরণতঃ যদি আলেম বাহ্যিক সাজসজ্জা ও দুনিয়ার মোহ বর্জন করে এবং অল্প দুনিয়া নিয়ে সন্তুষ্ট থাকে, তার এই রীতি অন্যরাও অবলম্বন করে, তবে অন্যরা যে পরিমাণ সওয়াব পাবে, তার সমস্তই সে-ও পাবে।


পরবর্তী পর্ব—

পূর্ণাঙ্গ তওবা ও তার শর্তাবলী

তওবা - (পর্ব - ৯) জান্নাত ও দোযখের স্তর পাপ ও পুণ্যের স্তরের উপর নির্ভরশীল

 


তওবা - পর্ব - ৯
জান্নাত ও দোযখের স্তর পাপ ও পুণ্যের স্তরের উপর নির্ভরশীল 

📚এহইয়াউ উলুমিদ্দীন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)


প্রকাশ থাকে যে, দুনিয়ার জীবন আখেরাতের মোকাবিলায় জাগরণের মোকাবিলায় স্বপ্নের মত। হাদীস দ্বারা এটা প্রমাণিত। 

বলা হয়েছে— মানুষ নিদ্রিত। যখন তারা মরে যাবে, জাগ্রত হবে। জাগরণের বিষয় যখন স্বপ্নে আসে, তখন তা দৃষ্টান্তের মত মনে হয়। ফলে, তা'বীর তথা ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয়। এমনিভাবে আখেরাতের জাগরণে যে অবস্থা হবে, তা দুনিয়ার স্বপ্নে দৃষ্টান্তস্বরূপই প্রকাশ পেতে পারে। অর্থাৎ, স্বপ্নের মত এ অবস্থাও ব্যাখ্যা সাপেক্ষ হবে। এখানে আমরা স্বপ্নের ব্যাখ্যা সম্পর্কিত তিনটি কাহিনী নমুনাস্বরূপ উল্লেখ করছি। 

বর্ণিত আছে, এক ব্যক্তি হযরত ইবনে সীরীনের খেদমতে এসে আরয করল : আমি স্বপ্নে দেখেছি, আমার হাতে একটি নামাঙ্কিত মোহর রয়েছে। তা দ্বারা আমি মানুষের মুখে এবং যৌনাঙ্গে মোহর করছি। তিনি বললেন : মনে হয় তুমি মুয়াযযিন, রমযানে সোবহে সাদেক হওয়ার পূর্বে আযান দাও। লোকটি বলল : আপনি ঠিকই  বলেছেন। 


অন্য এক ব্যক্তি এসে বলল  : আমি স্বপ্নে দেখেছি তৈলকে তৈলবীজের মধ্যে ঢালছি। তিনি বললেনঃ তুমি কোন বাদী ক্রয় করে থাকলে তার অবস্থা তদন্ত করে দেখ। মনে হয় সে তোমার জননী। কেননা, তৈলের মূল হচ্ছে তৈলবীজ। এ থেকে বুঝা যায় যে, লোকটি তার মূল অর্থাৎ জননীর কাছে যায়। এরপর লোকটি তদন্ত করে জানতে পারল যে, তার বাঁদী বাস্তবিকই তার জননী ছিল। 


অন্য এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলঃ আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, মোতির হার শূকরের গলায় পরিধান করাচ্ছি। হযরত ইবনে সীরীন বললেন : মনে হয় তুমি জ্ঞানের বিষয়াদি অযোগ্য লোকদেরকে শিখিয়ে যাচ্ছ। বাস্তবে তাই ছিল। এসব ব্যাখ্যা থেকে জানা গেল রূপক বিষয়বস্তুকে কিভাবে বর্ণনা করা হয়। রূপক বিষয় বলে আমাদের উদ্দেশ্য এমন বিষয়, যাকে প্রতীক হিসেবে দেখলে শুদ্ধ ও সঠিক মনে হয়, আর বাহ্যিক আকৃতির প্রতি লক্ষ্য করলে মিথ্যা মনে হয়। উদাহরণতঃ প্রথম স্বপ্নের ব্যাখ্যায় যদি মুয়াযযিন কেবল বাহ্যিক আংটির প্রতি দেখত এবং তা দ্বারা মোহর করা বুঝত, তবে এ স্বপ্নকে মিথ্যা মনে করতে বাধ্য হত। কেননা, এ কাজ সে কখনও করেনি। কিন্তু মর্ম ও প্রতীকের প্রতি লক্ষ্য করার ফলে স্বপ্নটি সত্য হয়ে গেল। কারণ, মোহর করার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে বাধা দেয়া। মুয়াযযিন রমযান মাসে সোবহে সাদেকের পূর্বে আযান দিয়ে মানুষকে পানাহারে বাধা দিত। 

পয়গম্বরগণকে আদেশ করা হয়েছে তারা যেন মানুষের সাথে তাদের বুদ্ধির পরিমাপ অনুযায়ী কথাবার্তা বলেন। মানুষের বুদ্ধির পরিমাপ এই যে, তারা নিদ্রিত। নিদ্রিত ব্যক্তির কাছে বস্তুর স্বরূপ রূপক আকারেই উদঘাটিত হয়। তাই পয়গম্বরগণও মানুষের সাথে রূপক ভঙ্গিতে কথাবার্তা বলেন, যাতে তারা মূল উদ্দেশ্য বুঝে নেয়, যদিও বাহ্যিক শব্দ দ্বারা অন্য কিছু অর্থ হয়। মৃত্যুর পর মানুষ যখন জাগ্রত হবে, তখন বুঝবে, পয়গম্বরগণের কথা ঠিকই ছিল। 

উদাহরণতঃ হাদীসে বলা হয়েছে– "মুমিনের অন্তর আল্লাহর দু'অঙ্গুলির মধ্যস্থলে অবস্থিত” আলেমগণ ব্যতীত কেউ এ হাদীসের মর্ম বুঝে না। মূর্খদের দৃষ্টি কেবল এর শাব্দিক অর্থের উপর থাকে। কেননা, তারা ‘তাড়ীল’ নামক তাফসীর সম্পর্কে অজ্ঞ। ফলে, তারা শাব্দিক অর্থ অনুযায়ী আল্লাহ তা'আলার হাত ও অঙ্গুলি সপ্রমাণ করে। (নাউযুবিল্লাহ) 

এমনিভাবে অপর এক হাদীসে আছে - “আল্লাহ আদমকে নিজের আকৃতিতে সৃষ্টি করেছেন”  এতে মূর্খরা কেবল বাহ্যিক আকৃতি ও রং বুঝে নিয়ে আল্লাহ তা'আলাকেও এমনি মনে করে। অথচ তিনি এ সকল বিষয় থেকে পবিত্র। এসব কারণেই কতক লোক আল্লাহ তা'আলার গুণাবলীর ব্যাপারে দারুণ 

হোঁচট খেয়েছে। এমনকি, তারা আল্লাহর কালামকে অক্ষর ও শব্দভুক্ত মনে করে নিয়েছে। আখেরাতের বিষয় সম্পর্কে যে সকল দৃষ্টান্ত হাদীসে বর্ণিত রয়েছে কেউ কেউ সেগুলোকে অস্বীকার করে একারণে যে, তাদের কাছে বাহ্যিক শব্দই উদ্দেশ্য। আর বাহ্যিক শব্দের মাঝে বৈপরীত্য লক্ষ্য করা যায়। উদাহরণতঃ হাদীসে আছে– “কিয়ামতের দিন মৃত্যুকে সাদা ভেড়ার আকারে উপস্থিত করে যবাহ করা হবে”। ধর্মদ্রোহী বোকারা এটা মানে না এবং পয়গম্বরণের প্রতি মিথ্যারোপ করে। প্রমাণ এই যে, মৃত্যু একটি অশরীরী বস্তু, আর ভেড়া শরীরী। অতএব, অশরীরী বস্তুর শরীরী হয়ে যাওয়া অসম্ভব। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা এসব নির্বোধকে আপন রহস্যাবলীর মারেফত থেকে অনেক ক্রোশ দূরে রেখেছেন। 

তিনি বলেনঃ “কেবল বিজ্ঞ ব্যক্তিরাই এসব রহস্য হৃদয়ঙ্গম করতে পারে”। মূর্খরা একথাও জানে না যে, কেউ যদি কাউকে বলে :  আমি স্বপ্নে একটি ভেড়া দেখেছি, যাকে মানুষ মহামারী বলে। ভেড়াটি পরে যবাহ হয়ে গেছে। একথা শুনে শ্রোতা জওয়াব দিল :  তুমি চমৎকার স্বপ্ন দেখেছ। মনে হয়, মহামারী খতম হয়ে যাবে। কেননা, যবাহ করা জন্তুর ফিরে আসা কল্পনাতীত। এখানে ব্যাখ্যাদাতাও সত্যবাদী এবং যে স্বপ্ন দেখেছে, সে-ও সত্যবাদী। আসলে স্বপ্ন দেখানো যে ফেরেশতার কাজ, সে নিদ্রিত ব্যক্তিকে “লওহে মাহফুযের” বিষয়টি দৃষ্টান্তের অনুরূপ বুঝিয়ে দিয়েছে। কেননা, নিদ্রিত ব্যক্তির পক্ষে দৃষ্টান্ত ছাড়া বুঝা সম্ভব ছিল না। এখন আমরা আসল উদ্দেশ্যের দিকে ফিরে আসছি। আমাদের উদ্দেশ্য এই যে, পাপ ও পুণ্যের ভিত্তিতে জান্নাত ও দোযখের স্তরসমূহের বিভাজন দৃষ্টান্ত ছাড়া বুঝা অসম্ভব। সুতরাং আমরা যে দৃষ্টান্ত বর্ণনা করব, তা দ্বারা অর্থ ও উদ্দেশ্য বুঝে নিতে হবে, আকার ও শব্দের পেছনে পড়া যাবে না"।

আখেরাতে মানুষের অনেক প্রকার হবে। সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্যে তাদের স্তর ও উপলব্ধির সীমাহীন তফাৎ হবে। যেমন, দুনিয়ার সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্যের ব্যাপারে তাদের তফাতের অন্ত নেই। এ ব্যাপারে দুনিয়া ও আখেরাতে কোন পার্থক্য নেই। কেননা, উভয় জগতের পরিচালক একমাত্র লা-শরীক আল্লাহ। তার চিরন্তন তরীকা ও পদ্ধতিও একই রকম। যেহেতু আমরা স্তরসমূহ গণনা করতে অক্ষম, তাই এগুলোর শ্রেণী সীমিত করে বর্ণনা করছি।


কিয়ামতের দিন মানুষ চার শ্রেণীতে বিভক্ত হবে। 

প্রথম ধ্বংসপ্রাপ্ত, দ্বিতীয় শাস্তিপ্রাপ্ত, তৃতীয় মুক্তিপ্রাপ্ত এবং চতুর্থ সফলকাম।

দুনিয়াতে এর দৃষ্টান্ত এই যে, কোন বাদশাহ যুদ্ধ করে কোন দেশ জয় করলে তার অধিবাসীদের কতককে হত্যা করে— এরা প্রথম শ্রেণী, কতককে দীর্ঘকাল জেলে আটকে রাখে— এরা দ্বিতীয় শ্রেণী, কতককে ছেড়ে দেয় — এরা তৃতীয় শ্রেণী এবং কতককে পুরস্কৃত করে — এরা চতুর্থ শ্রেণী।


বাদশাহ ন্যায়পরায়ণ হলে এসব আচরণ বিনা কারণে হবে না। হত্যা তাদেরকেই করবে, যারা তার অধিকারকে অস্বীকার করবে এবং তার বন্ধুর শত্রু হবে। 

জেলে তাদেরকে পাঠাবে— যারা তার আধিপত্য স্বীকার করবে; কিন্তু আনুগত্য ও খেদমতে ত্রুটি করবে। 

মুক্তি তাদেরকে দেবে, যারা কেবল তার বশ্যতা মেনে নেবে। 

পুরস্কৃত তাদেরকে করবে, যারা আজীবন তার খেদমত ও সহযোগিতায় দিনাতিপাত করবে। 

এরপর এটাও জরুরী যে, যে যেরূপ খেদমত করবে, সে অনুপাতেই সে পুরস্কার পাবে। হত্যাও বিভিন্ন প্রকার বের হবে। কারও শুধু গর্দান নেয়া হবে এবং কাউকে নাক, কান ও হাত-পা কেটে হত্যা করা হবে। অর্থাৎ অস্বীকারের স্তর অনুযায়ী হত্যাও বিভিন্ন স্তর হবে। 

অনুরূপভাবে যাদেরকে জেল দেয়া হবে, তাদেরও বিভিন্ন স্তর হবে— কাউকে কম সময়ের এবং কাউকে বেশী সময়ের। বলা বাহুল্ , প্রত্যেক শ্রেণীর স্তর অসংখ্যা ও অগণিত হতে পারে। অনুরূপভাবে কিয়ামতে এই চার শ্রেণীর স্তর অসংখ্য হবে। 

উদাহরণতঃ চতুর্থ শ্রেণী যারা সফলকাম হবে, তাদের কেউ জান্নাতে আদনে, কেউ জান্নাতে মাওয়ায় এবং কেউ জান্নাতুল ফেরদাউসে দাখিল হবে। শাস্তিপ্রাপ্ত শ্রেণীর মধ্যে কেউ অল্পদিন, কেউ হাজার বছর এবং কেউ সাত হাজার বছর শাস্তি ভোগ করবে। এরা সকলের পেছনে দোযখ থেকে বের হবে।

 এখন আমরা প্রত্যেক শ্রেণীর স্তর বিভাজন বর্ণনা করার প্রয়াস পাব। 

প্রথম শ্রেণী ধ্বংসপ্রাপ্তদের স্থর– 

তারা সে লোক, যারা আল্লাহর রহমত প্রার্থনা করে না। কেননা, উল্লিখিত দৃষ্টান্তে বাদশাহর কাছে তারাই হত্যাযোগ্য ছিল, যারা বাদশাহের সন্তুষ্টি, সম্মান ও পুরস্কার প্রার্থনা করত না। 

বলা বাহুল্য, এটা হচ্ছে কাফেরদের শ্রেণী। তারা আল্লাহর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে কেবল দুনিয়ার পূজারী হয়ে থাকে এবং আল্লাহ, তাঁর রসূল ও ঐশী গ্রন্থসমূহকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে। কেননা, আল্লাহর নৈকট্যশীল হওয়া এবং তাঁর দীদারের গৌরব অর্জন করাই হচ্ছে পারলৌকিক সৌভাগ্য। ঈমান ব্যতীত এই নেয়ামত অর্জন করা সম্ভব নয়। কাফেররা এটা অস্বীকার করে। তাই তারা এই নেয়ামত থেকে চিরতরে বঞ্চিত থাকবে।


 দ্বিতীয় শ্রেণী শাস্তিপ্রাপ্তদের স্থর। 

তারা সেই লোক, যারা মূলত ঈমানদার ; কিন্তু ঈমান অনুযায়ী আমলে ত্রুটি করে। উদাহরণতঃ তারা ঈমান রাখে যে, আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারও এবাদত করা যাবে না। এখন যদি কেউ আপন প্রবৃত্তির অনুসরণ করে, তবে তার উপাস্য সেই প্রবৃত্তিই হবে। সে কেবল মুখে মুখে তাওহীদ বলে। সত্যিকার তাওহীদ তার মধ্যে নেই। সত্যিকার তাওহীদ তখন হবে, যখন “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” বলার পর আল্লাহ ব্যতীত সবকিছু পরিত্যাগ করে এবং সরল পথে কায়েম থাকে, যা এই আয়াতে বর্ণিত হয়েছে— “নিশ্চয় যারা বলে, আমাদের রব আল্লাহ্, এরপর সুদৃঢ় থাকে। প্রত্যেক মানুষের মধ্যে সরলপথ থেকে কিছু না কিছু বিচ্যুতি অবশ্যই রয়েছে। কারণ, প্রত্যেকেই প্রবৃত্তির অনুসরণ অবশ্যই করে— যদিও তা সামান্য ব্যাপারে হয়। ফলে, নৈকট্যের স্তরেও ত্রুটি দেখা দেয়। সুতরাং প্রত্যেকেরই শাস্তি হবে। কিন্তু এই শাস্তির তীব্রতা ও স্বল্পতা ঈমানের শক্তি এবং প্রবৃত্তির অনুসরণ কমবেশী হওয়ার উপর নির্ভরশীল হবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন : "তোমাদের প্রত্যেকেই সেটা অতিক্রম করবে। এটা তোমার পালনকর্তার অনিবার্য সিদ্ধান্ত। এরপর আমি খোদাভীরুদেরকে উদ্ধার করব এবং যালেমদেরকে সেথায় নতজানু অবস্থায় রেখে দেব”। 

এ কারণেই আগেকার দিনের বুযুর্গগণ ভয় করতেন এবং বলতেন  : আল্লাহর ওয়াদা অনুযায়ী দোযখ ভোগ নিশ্চিত এবং রক্ষা পাওয়া সন্দেহযুক্ত। এটাই আমাদের ভয়ের কারণ। হাদীসদৃষ্টে জানা যায়, সকলের শেষে যে ব্যক্তি দোযখ থেকে বের হবে, সে সাত হাজার বছর পরে বের হবে। কেউ কেউ মুহূর্তের মধ্যে দোযখের ওপারে চলে যাবে। কেউ বিদ্যুৎ গতিতে চলে যাবে। তাদের এক দণ্ডও দোযখে অবস্থান করতে হবে না। এক দণ্ড এবং সাত হাজার বছরের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন অনেক স্তর রয়েছে।- 

এখন আমরা বলছি, যে ব্যক্তি মূল ঈমানকে শক্তিশালী করে সকল কবীরা গোনাহ থেকে বেঁচে থাকবে, সকল ফরয কর্ম অর্থাৎ পাঞ্জেগানা নামায উত্তমরূপে আদায় করবে এবং মাত্র কয়েকটি সগীরা গোনাহই তার যিম্মায় থাকবে, যা সে উপর্যুপরি করেনি, মনে হয় তার কেবল হিসাবই নেয়া হবে— কোন প্রকার আযাব হবে না। হিসাবের সময় তার পুণ্যের পাল্লা ভারী হয়ে যাবে। কেননা, হাদীসে বর্ণিত আছে, পাঞ্জেগানা নামায, জুমআ এবং রমযানের রোযা মধ্যবর্তী সকল গোনাহের জন্যে কাফফারা হয়ে যায়। কবীরা গোনাহ থেকে বেঁচে থাকা যে সগীরা গোনাহের জন্যে কাফফারা হয়ে যায়, একথা কোরআনের আয়াত দ্বারাই প্রমাণিত। কাফফারা হওয়ার সর্বনিম্ন স্তর হচ্ছে হিসাব রোধ করতে না পারলেও আযাব রোধ করা। সুতরাং এরূপ ব্যক্তি হিসাব শেষ হওয়ার পর সুখে থাকবে। যে ব্যক্তি একটি অথবা বেশী কবীরা গোনাহ করে এবং ফরয কর্মও কতক বর্জন করে, সে মৃত্যুর পূর্বে খাটি তওবা করলে এমন হয়ে যাবে, যেমন সে কোন গোনাহই করেনি। আর যদি তওবার পূর্বে মারা যায়, তবে মৃত্যুর সময় তার অবস্থা আশংকাজনক হবে। উপর্যুপরি গোনাহ করা অবস্থায় মারা গেলে তার ঈমান না থাকা বিচিত্র নয়"।


তৃতীয় শ্রেণী মুক্তিপ্রাপ্তদের স্থর– 

তারা সেই লোক, যারা কেবল আযাব থেকে বেঁচে যাবে। তারা কোন খেদমত করেনি তাই পুরস্কার পাবে না এবং কোন দোষও করেনি তাই আযাবও হবে না। এ অবস্থা কাফেরদের মধ্য থেকে উন্মাদ, বালক ও অজ্ঞানদের হবে এবং সেসব লোকের হবে, যাদের কাছে জনপদ থেকে আলাদা থাকার কারণে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছেনি। এরূপ লোকেরা না আল্লাহকে জানে, না তাঁকে অস্বীকার করে। ফলে, এবাদত ও গোনাহ কিছুই করে না। একারণেই তারা জান্নাতেও থাকবে না এবং দোযখেও যাবে না ; বরং জান্নাত ও দোযখের মধ্যবর্তী এক জায়গায় অবস্থান করবে, যাকে শরীয়তের পরিভাষায় ‘আ’রাফ’ বলা হয়। এটা কোরআনের আয়াত ও হাদীস দ্বারা নিশ্চিতরূপে প্রমাণিত। তবে বিশেষ কোন সম্প্রদায় সম্পর্কে বলা হয় যে, তারাও অকাট্যরূপে আ'রাফে থাকবে — এটা অনিশ্চিত ; যেমন কাফেরদের বালকদের আ'রাফে থাকা অকাট্য নয়। কারণ বালকদের ব্যাপারে হাদীসও বিভিন্নরূপ বর্ণিত রয়েছে। একবার জনৈক বালক মারা গেলে হযরত আয়েশা (রাঃ) বললেন : সে জান্নাতের পাখীদের অন্যতম। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কিরূপে জানলে ? এতে ব্যাপারটি অস্পষ্ট হয়ে গেল। 


চতুর্থ শ্রেণী সফলকাম যারা তাদের স্থর:

তারা সে লোক, যারা অনুকরণ ছাড়াই আল্লাহ তা'আলাকে চিনে নেয়। তারাই নৈকট্যশীল ও অগ্রগামী। তারা বর্ণনাতীত নেয়ামত ও সম্ভোগপ্রাপ্ত হবে। এ সম্পর্কে কোরআনে যা উল্লিখিত হয়েছে, তাই বর্ণনা করা যায়। আল্লাহর বর্ণনার অধিক কে কি বলবে ? যেহেতু এ জগতে এর বিস্তারিত বর্ণনা অসম্ভব, তাই আল্লাহ তা'আলা সংক্ষেপে বলে দিয়েছেন : 

“তাদের চক্ষু শীতল হওয়ার জন্য আল্লাহ তাদের জন্যে যা যা গোপন রেখেছেন, তা কেউ জানে না”।

এক হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ পাক এরশাদ করেন : 

“আমি আমার সৎকর্মপরায়ণ বান্দাদের জন্যে এমন বস্তু প্রস্তুত রেখেছি, যা কোন চক্ষু দেখেনি, কোন কর্ণ শুনেনি এবং কোন মানুষের কল্পনায় উদয় হয়নি”।

খোদাপ্রেমিকদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সে অবস্থাই হয়, যা এ জগতে কোন মানুষের কল্পনায় আসতে পারে না। জান্নাতের হুর, প্রাসাদ, ফলমূল, দুধ, মধু, পানীয়, কংকন ও অলংকারের প্রতি তাদের আদৌ কোন মোহ থাকে না। তাদেরকে এসব বস্তু দেয়া হলে তারা এতেই সন্তুষ্ট থাকবে না ; বরং দীদার তথা আল্লাহকে দেখার আনন্দ লাভ করার জন্যে তারা উদগ্রীব থাকবে, যা হবে চূড়ান্ত সৌভাগ্য ও অপার আনন্দ। একারণেই হযরত রাবেয়া বসরীকে যখন জিজ্ঞেস করা হল, জান্নাতে আপনার ঔৎসুক্য কি হবে ? তখন তিনি বললেন : প্রথমে গৃহকর্তা, এরপর গৃহ। মোটকথা, খোদাপ্রেমিকদের অন্তর গৃহকর্তা অর্থাৎ আল্লাহ পাকের মহব্বতেই ডুবে থাকে৷ গৃহ অর্থাৎ জান্নাতের সাজ-সজ্জার প্রতি তাদের মোটেই ভ্রূক্ষেপ নেই। এমনকি, এই মহব্বতের কারণে তারা নিজেদের সম্পর্কেও বেখবর থাকে। ফলে, দৈহিক কষ্ট অনুভব করে না। এ অবস্থাকে বলা হয় ‘ফানা ফিল মাহবুব’ ( প্রেমাস্পদে লীন)। 



পরবর্তী পর্ব

সগীরা গোনাহ কিরূপে কবীরা হয়ে যায়

বৃহস্পতিবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৩

তওবা - (পর্ব - ৮) গুনাহের প্রকারভেধ





তওবা - (পর্ব - ৮) 
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

গুনাহের প্রকারভেদ—
যে সকল গোনাহ থেকে তওবা করা হয়–
উল্লেখ্য, তওবার অর্থ হল গোনাহ পরিত্যাগ করা। কোন কিছু পরিত্যাগ করা তখনই সম্ভব, যখন তাকে জেনে নেয়া যায়। তওবা ওয়াজিব বিধায় গোনাহসমূহ চেনাও ওয়াজিব। যে কাজ করলে আল্লাহ তা'আলার আদেশের বিরুদ্ধাচরণ হয়, তাই গোনাহ। এর বিস্তারিত বিবরণ দিতে গেলে খোদায়ী বিধি-বিধানাবলী শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বর্ণনা করতে হবে। অথচ আমাদের উদ্দেশ্য তা নয়। তাই নিম্নে সংক্ষেপে গোনাহসমূহের প্রকারভেদ তিনটি শিরোনামে লিপিবদ্ধ করা হচ্ছে। 


গুনাহের প্রথম বিভাজন—

মানুষের স্বভাব ও চরিত্র অনেক। কিন্তু যেগুলো দ্বারা গোনাহ অস্তিত্ব লাভ করে, সেগুলো চার প্রকারে সীমিত- 

প্রতিপালকসুলভ স্বভাব, শয়তানসুলভ স্বভাব, পশুসুলভ স্বভাব এবং হিংস্র স্বভাব—

(১)-প্রতিপালকসুলভ স্বভাৰ অহংকার, গর্ব, স্বৈরাচার, প্রশংসাপ্রীতি, সম্মান ও বিভপ্রীতি ইত্যাদি জন্ম দেয়। এ স্বভাব থেকে এমন সব কবীরা গোনাহ উৎপন্ন হয়, যেগুলোকে মানুষ গোনাহ গণ্য করে না। অথচ সেগুলো অত্যন্ত মারাত্মক ও অধিকাংশ গোনাহের মূল হয়ে থাকে। 

(২)-শয়তানসুলভ স্বভাব থেকে হিংসা, অবাধ্যতা, কূটকৌশল, ষড়যন্ত্র, ঝগড়া-বিবাদ ইত্যাদি বিষয় গজিয়ে উঠে। নিফাক, বেদআত ও পথভ্রষ্টতাও এর অন্তর্ভুক্ত। 

(৩)-পশুসুলভ স্বভাব থেকে যেসব বিষয় অংকুরিত হয়, সেগুলো হচ্ছে তীব্র লোভ ও লালসা, উদর ও যৌনাঙ্গের স্পৃহা, ব্যভিচার ও সমকামিতা, চুরি, এতীমের মাল আত্মসাৎ করা, হারাম অর্থ সঞ্চয় ইত্যাদি।

(৪)-হিংস্র স্বভাবের ভেতর থেকে বের হয়ে আসে ক্রোধ, বিদ্বেষ, পরশ্রীকাতরতা, মারপিট, গালিগালাজ, হত্যা ইত্যাদি।

মানুষের মধ্যে এ চারটি স্বভাব জন্মগতভাবে একের পর এক আগমন করে। সর্বপ্রথম পশুসুলভ স্বভাব প্রবল হয়। এরপর হিংস্রস্বভাব প্রকাশ পায়। এ স্বভাবদ্বয় একত্রিত হয়ে বুদ্ধি-বিবেককে প্রতারিত করে এবং এ থেকেই শয়তানী স্বভাব জোরদার হয়। সবশেষে প্রতিপালকসুলভ স্বভাব অর্থাৎ, গর্ব, অহংকার, ইযযত ও বড়ত্বের স্পৃহা এবং সকলের উপর সরদারী করার ইচ্ছা মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। মোটকথা, এই স্বভাব চতুষ্টয়ই হচ্ছে গোনাহ ও নাফরমানীর উৎস। এরপর এগুলো থেকে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে গোনাহ ছড়িয়ে পড়ে। তন্মধ্যে কিছু গোনাহ বিশেষভাবে অন্তরের সাথে সম্পর্কযুক্ত; যেমন কুফর, নিফাক, মন্দ-বেদআত ইত্যাদি। কিছু গোনাহ চক্ষু ও কর্ণের সাথে, কিছু উদর ও যৌনাঙ্গের সাথে এবং কিছু হাত ও পায়ের সাথে সম্পৃক্ত। এগুলো সব সুস্পষ্ট বিধায় বিশদ বর্ণনার প্রয়োজন নেই। 


গুনাহের দ্বিতীয় বিভাজন

গোনাহ দু'প্রকার।

(ক) যা আল্লাহ তা'আলা ও মানুষের মধ্যে হয়ে থাকে; যেমন নামায, রোযা ও অন্যান্য বিশেষ ফরযসমূহ পালন না করা। 

(খ) যা মানুষের পারস্পরিক হকের সাথে সম্পর্কযুক্ত হয়ে থাকে। যেমন যাকাত না দেয়া, কাউকে হত্যা করা, কারও ধন-সম্পদ ছিনতাই করা, গালি দেয়া ইত্যাদি।

যে সকল গোনাহ মানুষের পরস্পরের সাথে সম্পর্কযুক্ত, সেগুলো থেকে অব্যাহতি পাওয়া খুবই কঠিন। পক্ষান্তরে যে সকল গোনাহ আল্লাহ তা'আলা ও মানুষের সাথে সম্পৃক্ত, সেগুলোর মধ্যে ক্ষমা পাওয়ার আশা প্রবল- যদি তা শিরক না হয়। 


হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে : 

>“আমলনামা তিন প্রকার। এক প্রকার ক্ষমা করা হবে, এক প্রকার ক্ষমা করা হবে না এবং এক প্রকার ছেড়ে দেয়া হবে না।"

প্রথম প্রকার আমলনামা যা ক্ষমা করা হবে, সেসব গোনাহ, যা আল্লাহ তা'আলা ও মানুষের সাথে সম্পর্কযুক্ত। 

দ্বিতীয় প্রকার আমলনামার অর্থ শিরক। এটা ক্ষমা করা হবে না। 

তৃতীয় প্রকার আমলনামার মানে মানুষের পারস্পরিক গোনাহ। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ক্ষমা না করা পর্যন্ত এসব গোনাহের চুলচেরা হিসাব হবে। 


গুনাহের তৃতীয় বিভাজন

গোনাহের তৃতীয় বিভাজন এই যে, গোনাহ হয় সগীরা হবে, না হয় কবীরা। এগুলোর সংজ্ঞা সম্পর্কে বিভিন্ন জনের বিভিন্ন উক্তি বর্ণিত আছে।

কেউ কেউ বলেন  : সগীরা বলতে কোন গোনাহ নেই; বরং যে বিষয়ে খোদায়ী আদেশের বিরুদ্ধাচরণ হবে, তা কবীরাই হবে। এই উক্তি অগ্রাহ্য। কেননা, সগীরা গোনাহের অস্তিত্ব কোরআন ও হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। 

আল্লাহ তা'আলা বলেন  : 

>“যে বিষয়ে তোমাদেরকে নিষেধ করা হয়, তার মধ্য থেকে যদি কবীরাগুলো থেকে বেঁচে থাক, তবে আমি তোমাদের মন্দ কাজসমূহকে সরিয়ে দেব এবং তোমাদের সম্মানের স্থানে দাখিল করব”।  

অন্য এক আয়াতে বলা হয়েছে- 

>“তোমরা বেঁচে থাক কবীরা তথা বড় গোনাহ থেকে এবং নির্লজ্জতা থেকে ছোট ছোট মলিনতা বাদে”। 

হাদীস শরীফে আছে- 

>“পাঞ্জেগানা নামায এবং এক জুমআ অন্য জুমআ পর্যন্ত মধ্যবর্তী সকল গোনাহ দূর করে দেয়- যদি বড় গোনাহ থেকে আত্মরক্ষা করা হয়”।

আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আসের রেওয়ায়েতে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেন : 

>“কবীরা গোনাহ হচ্ছে আল্লাহর সাথে শরীক করা, পিতামাতার নাফরমানী করা, কাউকে হত্যা করা এবং মিথ্যা কসম খাওয়া”।


কবিরা গুনাহের সংখ্যা 

কবীরা গোনাহের সংখ্যা সম্পর্কে সাহাবী ও তাবেঈগণের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। 

হযরত ইবনে মসউদ (রাঃ) এর সংখ্যা চার এবং হযরত উমর (রাঃ) সাত বর্ণনা করেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমরের মতে নয়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) যখন জানতে পারলেন যে, ইবনে উমর (রাঃ) কবীরা গোনাহের সংখ্যা সাত বলেন, তখন তিনি বললেন : সাত বলার চেয়ে সত্তর বলাই অধিক সঙ্গত। 

হযরত ইবনে আব্বাস একথাও বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা যা নিষিদ্ধ করেছেন তাই কবীরা। 

কেউ কেউ বলেন  :  আল্লাহ তা'আলা যে গোনাহের কারণে দোযখের ওয়াদা করেছেন, তা কবীরা। 

কারও কারও মতে যে গোনাহের কারণে দুনিয়াতে “হদ” অর্থাৎ , শাস্তি ওয়াজিব হয়, তা কবীরা। 

কেউ কেউ বলেন, কবীরা গোনাহের সংখ্যা অজানা, যেমন শবে কদরের বিশেষ মুহূর্ত অস্পষ্ট ও অনির্দিষ্ট। 

হযরত ইবনে মসউদ (রাঃ)-কে এর সংখ্যা জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেন  : সূরা নেসার শুরু থেকে (নিসা : ৩১) পর্যন্ত যতগুলো গোনাহ আল্লাহ তা'আলা নিষিদ্ধ করেছেন, সে সবগুলোই কবীরা।

আবূ তালেব মক্কী (রহঃ) বলেন  :  কবীরা গোনাহ সত্তরটি। হাদীস থেকে এবং হযরত ইবনে আব্বাস, ইবনে মসউদ ও ইবনে উমর (রঃ) প্রমুখের উক্তি থেকে এগুলো আমি সংগ্রহ করেছি। 

তন্মধ্যে চারটি অন্তরে অর্থাৎ শিরক, গোনাহ উপর্যুপরি করে যাওয়া, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া এবং তাঁর শাস্তিকে ভয় না করা। 

আর চারটি জিহ্বার সাথে সম্পর্কযুক্ত। অর্থাৎ- মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া, সৎপুরুষকে ব্যভিচারের অপবাদ দেয়া, অসত্যকে সত্য প্রতিপন্ন করার জন্যে মিথ্যা কসম খাওয়া এবং জাদু করা। 

তিনটি উদর সম্পর্কিত― 

মদ্য পান করা, এতীমের অর্থ অন্যায়ভাবে আত্মসাৎ করা এবং জেনেশুনে সুদ খাওয়া। 

দুটি যৌনাঙ্গের সাথে সম্পর্কিত। অর্থাৎ ব্যভিচার ও সমকামিতা। দু'টি হাতের সাথে সম্পর্কিত; অর্থাৎ হত্যা ও চুরি। একটি পায়ের সাথে সম্পর্কিত; অর্থাৎ যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়ন করা। 

একটি সমস্ত দেহের সাথে সম্পর্কযুক্ত। অর্থাৎ, পিতামাতার  নাফরমানী করা। 

এই উক্তি যদিও কাছাকাছি; কিন্তু এতেও পূর্ণতা হয় না। কেননা, বাস্তবে কমবেশী হতে পারে। উদাহরণতঃ এ উক্তি অনুযায়ী সুদ খাওয়া ও এতীমের অর্থ আত্মসাৎ করা কবীরা গোনাহ। এটা ধন সম্পর্কিত গোনাহ। 

প্রাণ সম্পর্কিত গোনাহ হত্যা লেখা হয়েছে। চক্ষু উৎপাটিত করা, হাত কাটা ইত্যাদি লেখা হয়নি। এমনিভাবে এতীমকে মারা ও তার অঙ্গ কর্তন করা নিঃসন্দেহে কবীরা গোনাহ। 

এ ছাড়া হাদীসে একটি গালির পরিবর্তে দু’গালি দেয়া এবং মুসলমানের মানহানি করাকেও কবীরা গোনাহ বলা হয়েছে।

হযরত আবূ সাঈদ খুদরী প্রমুখ সাহাবী বলেনঃ তোমরা এমন আমল কর, যা তোমাদের মতে চুলের় চেয়েও অধিক সূক্ষ্ম; কিন্তু আমরা রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহিমের ওয়াসাল্লাম)-এর আমলে এসব আমলকে কবীরা গোনাহ মনে করতাম। 

কিন্তু এতগুলো উক্তি সত্ত্বেও কেউ যদি চুরি সম্পর্কে জানতে চায় যে, এটা কবীরা কি না, তবে কবীরার অর্থ ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে অবগত না হওয়া পর্যন্ত এটা যথাযথরূপে জানা সম্ভবপর নয়। কেননা, কবীরা শব্দটি শাব্দিক দিক দিয়ে অস্পষ্ট। অভিধানে অথবা শরীয়তে এর কোন বিশেষ অর্থ নেই। 

কবীরা ও সগীরা আপেক্ষিক বিষয়াদির অন্যতম। যা গোনাহ তা কতক গোনাহের তুলনায় বড় এবং কতক গোনাহের তুলনায় ছোট হতে পারে। অর্থাৎ, উপরের দিকে দেখলে ছোট এবং নিচের দিকে দেখলে বড় মনে হবে। 

উদাহরণতঃ পর-নারীর সাথে শয়ন করা যিনার তুলনায় কম এবং কেবল চোখে দেখার তুলনায় বেশী গোনাহ। কিন্তু যেহেতু কোরআন মজীদে এবং হাদীস শরীফে কবীরা গোনাহ থেকে বেঁচে থাকার আদেশ রয়েছে, তাই কবীরা অর্থ জানা একান্ত জরুরী। নতুবা আদেশ পালিত হবে কিরূপে ? 

অতএব, এ সম্পর্কে সুচিন্তিত বিষয় এই যে, শরীয়তে গোনাহ তিন প্রকার। 

(এক) যার বড় হওয়া সকলেরই জানা। (দুই) যা ছোট গোনাহ বলে গণ্য। (তিন) যার সম্পর্কে শরীয়তের বিধান কিছুই জানা নেই। এরূপ সন্দিগ্ধ ও অস্পষ্ট গোনাহ জানার জন্যে কোন পূর্ণাঙ্গ সংজ্ঞা পাওয়ার আশা করা বৃথা। কেননা, এটা তখনই সম্ভব হত, যখন রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) এ সম্পর্কে বলে দিতেন যে, দশটি অথবা পাঁচটি গোনাহ কবীরা। এরপর স্পষ্টরূপে বর্ণনা করে দিতেন যে, এই এই দশটি অথবা এই এই পাঁচটি। কিন্তু বাস্তবে এরূপ হয়নি; বরং কতক রেওয়ায়েতে কবীরার সংখ্যা তিন এবং কতক রেওয়ায়েতে উল্লেখ করা হয়েছে সাত। এরপর আরও বর্ণিত আছে যে, এক গালির বিনিময়ে দু’গালি দেয়া অন্যতম কবীরা। অথচ এটা পূর্বোক্ত তিনের মধ্যেও অন্তর্ভুক্ত নয় এবং সাতের মধ্যেও নয়। এ থেকে জানা গেল যে, কবীরাকে কোন বিশেষ সংখ্যায় সীমিত করা রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম)-এর উদ্দেশ্য ছিল না। অতএব, শরীয়ত প্রবর্তক নিজেই যখন কোন সংখ্যা নির্দিষ্ট করেননি, তখন অন্যারা তা গণনা করার আশা কিরূপে করতে পারে? সংখ্যা নির্দিষ্ট না করার কারণ সম্ভবত এই ছিল, যাতে মানুষ কবীরা গোনাহকে ভয় করতে থাকে এবং এই ভয়ের কারণে সগীরা গোনাহ থেকেও বেঁচে থাকে; যেমন শবে-কদরকে এ জন্যে অস্পষ্ট রাখা হয়েছে, যাতে মানুষ এর জন্যে মেহনত অব্যাহত রাখে। 

অবশ্য আমাদের দ্বারা কবীরার প্রকারভেদ সঠিকভাবে বলে দেয়া এবং এর খুঁটিনাটি বিষয়াদি প্রবল ধারণা ও অনুমানের উপর ছেড়ে দেয়া সম্ভব। এছাড়া, যে গোনাহটি সর্ববৃহৎ কবীরা, তারও সংজ্ঞা বলে দিতে পারি; কিন্তু যেটি সর্বকনিষ্ঠ সগীরা গোনাহ, তার সংজ্ঞা দেয়া সম্ভব নয়। শরীয়তের প্রমাণাদি ও অন্তর্দৃষ্টির আলোকে আমরা জানি সকল শরীয়তের মুখ্য উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষ আল্লাহ তা'আলার নৈকট্য লাভ করুক এবং দীদারে ইলাহীর সৌভাগ্য অর্জন করুক। কিন্তু যে পর্যন্ত মানুষ আল্লাহর সত্তা, তাঁর গুণাবলী, ঐশীগ্রন্থ ও রসূলগণকে না চিনবে এ সৌভাগ্য অর্জিত হতে পারে না। নিচের আয়াতে এদিকেই ইশারা করা হয়েছে- 

>“মানুষ ও জিনকে সৃষ্টি করার উদ্দেশ্য হচ্ছে যাতে তারা আমার বান্দা হয়ে যায়”। বান্দা তখন বান্দা হয়, যখন নিজের মালিকের প্রতিপালকত্ব ও নিজের দাসত্বকে চিনে। এটাই রসূল প্রেরণের আসল উদ্দেশ্য। কিন্তু পার্থিব জীবন ছাড়া এই উদ্দেশ্য পূর্ণ হয় না। তাই দুনিয়াকে আখেরাতের কৃষিক্ষেত্র বলা হয়েছে। 

এ থেকে জানা গেল যে, আখেরাতের খাতিরে দুনিয়ার হেফাযতও জরুরী। 


আখেরাতের খাতিরে দুনিয়া সম্পর্কিত বিষয় দুটি। একটি প্রাণ, অপরটি ধন-সম্পদ। অতএব, যে গোনাহ দ্বারা খোদায়ী মারেফতের দরজা বন্ধ হয়ে যায়, তা সর্ববৃহৎ কবীরা। 

এরপর সেই কবীরার পালা আসে, যা দ্বারা জীবিকার দ্বার রুদ্ধ হয়। কেননা, জীবিকা দ্বারাই প্রাণীর জীবন। সুতরাং আসল উদ্দেশ্যে পৌঁছার জন্যে যথাক্রমে তিনটি বিষয়ের হেফাযত জরুরী হল। প্রথম, অন্তরে খোদায়ী মারেফতের হেফাযত। দ্বিতীয়, দেহে প্রাণের হেফাযত। তৃতীয়, ধন-সম্পদের হেফাযত। এ বিষয়ত্রয়ের উপর ভিত্তি করেই গোনাহের বিভক্তি হয়ে থাকে। অর্থাৎ সর্ববৃহৎ গোনাহ সেটি, যা খোদায়ী মারেফতের অন্তরায় হয়। 

এর নিচে সে গোনাহ, যা মানুষের প্রাণরক্ষায় বিঘ্ন সৃষ্টি করে।

এরপর সেই গোনাহ— যা দ্বারা জীবিকার দ্বার রুদ্ধ হয়। এই তিনটি বিষয় সম্পর্কে কোন ধর্মেই মতভেদ হতে পারে না। অতএব, কবীরা গোনাহের তিনটি স্তর রয়েছে। 


(এক) যা আল্লাহ ও রসূলের মারেফতের পরিপন্থী। একে বলা হয় কুফর। এর ঊর্ধ্বে কোন কবীরা নেই৷ এর মধ্যে রয়েছে আল্লাহর আযাবকে ভয় না করা এবং তাঁর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া। আল্লাহর সত্তা, গুণাবলী ও ক্রিয়াকর্ম সম্পর্কিত সকল প্রকার বেদআতও এর কাছাকাছি।


(দুই) প্রাণ সম্পর্কিত কবীরা। সুতরাং কাউকে হত্যা করা কবীরা গোনাহ। তবে কুফরের তুলনায় কম৷ কেননা, কুফরের কারণে মূল উদ্দেশ্য ফওত হয়ে যায়। আর হত্যার কারণে উদ্দেশ্যের উপায় বিনষ্ট হয়ে যায়। কেননা, পার্থিব জীবন খোদায়ী মারেফতের ওসীলা। হত্যা করলে এই ওসীলা লোপ পায়। হাত-পা কর্তন করা এবং মারপিট করা, যা মৃত্যুর কারণ হয়, তাও কবীরা গোনাহের মধ্যে গণ্য। তবে ইচ্ছাকৃত হত্যা অধিক কঠোর কবীরা। যিনা ও সমকামিতাও এই স্তরের মধ্যে দাখিল। সমকামিতা এ জন্যে দাখিল যে, যখন ধরে নেয়ার পর্যায়ে সকলেই পুরুষদের সাথে যৌনকর্ম সম্পাদন করতে শুরু করবে, তখন মানুষের বংশ বন্ধ হয়ে যাবে। সুতরাং হত্যার মাধ্যমে মানুষের অস্তিত্ব বিলুপ্ত করা যেমন কবীরা গুনাই, তেমনি যিনা ও ব্যভিচারও কবীরা গুনাহ। কেননা, তার দ্বারা যদিও বংশ বিস্তার বন্ধ হয় না; কিন্তু বংশ বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে এবং পারস্পরিক উত্তরাধিকার খতম হয়ে যায়। ফলে, জীবনের শৃঙ্খলাই বিনষ্ট হয়ে যায়। তবে যিনা হত্যার তুলনায় কম কবীরা।" 


(তিন) ধন-সম্পদ সম্পর্কিত কবীরা। সুতরাং একে অন্যের ধন-সম্পদ চুরি করে, ছিনতাই করে অথবা অন্য কোন অবৈধ উপায়ে হস্তগত করা জায়েয নয়। তবে একের ধন-সম্পদ অন্যে নিয়ে নিলে তা ফেরত দেয়া সম্ভব। খেয়ে ফেললে বা ব্যয় করে ফেললে মূল্য অথবা বিনিময় দিতে পারে। এ দিক দিয়ে ধন-সম্পদ নেয়া তেমন গুরুতর নয়। হাঁ, যদি এভাবে নেয় যে, ক্ষতিপূরণ অসম্ভব হয়ে যায়, তখন এটা কবীরা গোনাহ হওয়া উচিত। এভাবে নেয়ার সম্ভাব্য পন্থা চারটি । 

(১) গোপনে নেয়া, যাকে চুরি বলা হয়। এতে কেন নিল, তা অজানা থাকার কারণে ক্ষতিপূরণ সম্ভব নয়। 

(২) এতীমের সম্পদ আত্মসাৎ করা। বয়সের স্বল্পতা হেতু এতীম নালিশ করতে অক্ষম বিধায় এটাও গোপন পন্থার অন্তর্ভুক্ত। 

(৩) মিথ্যা সাক্ষ্যদানের মাধ্যমে কারও আর্থিক ক্ষতি করা। 

(৪) মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়ে গচ্ছিত সামগ্রীর মালিক হয়ে যাওয়া। 

এ চারটি পন্থা হারাম হওয়ার ব্যাপারে শরীয়তসমূহের মধ্যে মতভেদ থাকতে পারে। যদিও এগুলোর কোন কোনটিতে শরীয়ত কোন শাস্তি নির্ধারণ করেনি। কিন্তু পর্যাপ্ত নিন্দাবাণী উচ্চারণ করেছে এবং পার্থিব শৃঙ্খলা বিধানে এগুলোর যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে। তাই এগুলো কবীরা হওয়াই সঙ্গত। সূদ খাওয়ার মধ্যে কেবল এতটুকুই রয়েছে যে, অপরের ধন-সম্পদ তার সন্তুষ্টিক্রমে খাওয়া হয়। কিন্তু এতে শরীয়তের সন্তুষ্টি নেই। আর ধন ছিনতাইয়ের মধ্যে কারও সন্তুষ্টি থাকে না। এতদসত্ত্বেও ছিনতাই কবীরা গোনাহ নয়। কাজেই সূদ খাওয়া কবীরা না হওয়া দরকার। কারণ, এতে ধনের মালিকের সম্মতি থাকে এবং কেবল শরীয়তের সম্মতি অনুপস্থিত থাকে। যদি বলা হয় যে, শরীয়তে সূদ সম্পর্কে কঠোর নিষেধাজ্ঞা এবং পারলৌকিক শাস্তির কথা বলা হয়েছে, এতে কবীরা হওয়াই বুঝা যায়, তবে ছিনতাই ইত্যাদি যুলুমের ব্যাপারেও তো এরূপই বলা হয়েছে। এগুলোরও কবীরা হওয়া উচিত। অথচ এগুলো কবীরার তালিকায় দাখিল না হওয়াই প্রবল ধারণা।


এখন আবু তালেব মক্কী বর্ণিত কবীরাসমূহের মধ্যে গালি দেয়া, মদ্যপান করা, জাদু করা, জেহাদের ময়দান থেকে পলায়ন করা এবং পিতা-মাতার নাফরমানী করা সম্পর্কে আলোচনা করা দরকার। এগুলোর মধ্যে মদ্যপান কবীরা গোনাহ হওয়া উপযুক্ত। 

প্রথমত, এ কারণে যে, শরীয়ত এ সম্পর্কে কঠোর শাস্তিবাণী উচ্চারণ করেছে। 

বিতীয়ত, যুক্তির নিরিখেও এরূপ হওয়া উচিত। যুক্তি এই যে, প্রাণের হেফাযত করা যেমন জরুরী, বুদ্ধির হেফাযত করাও তেমনি জরুরী। কারণ, বুদ্ধি ছাড়া প্রাণ বেকার। এতে বুঝা গেল যে, মদ্যপান করে বুদ্ধি লুপ্ত করাও কবীরা গোনাহ। কিন্তু এই যুক্তি এক ফোঁটা মদের বেলায় প্রযোজ্য নয়। কেননা, এতে বুদ্ধি লোপ পায় না। সুতরাং এক ফোঁটা মদমিশ্রিত পানি পান করলে তা কবীরা না হওয়া উচিত; বরং একে নাপাক পানি বলা উচিত। কিন্তু শরীয়ত মদের জন্যে শাস্তি নির্ধারণ করেছে বিধায় একে কবীরা গণ্য করা হয়। শরীয়তের সকল রহস্য সম্পর্কে ওয়াকিফহাল হওয়া মানুষের সাধ্যে নেই। সুতরাং এর কবীরা হওয়ার ব্যাপারে ইজমা প্রমাণিত হলে তা মেনে নেয়া ওয়াজিব। 

অপবাদ আরোপের অবস্থা এই যে, এতে কেবল মানহানি হয়। মানের মর্যাদা ধন-সম্পদের তুলনায় কম। অপবাদের অনেকগুলো স্তর রয়েছে। সর্ববৃহৎ স্তর হচ্ছে যিনার অপবাদ আরোপ করা। শরীয়তে এটা খুব গুরুতর ব্যাপার। তাই এর জন্যে শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছে। আমার প্রবল ধারণা, শরীয়তে যেসব গোনাহের কারণে “হদ” তথা শাস্তি ওয়াজিব হয়, সাহাবায়ে কেরাম সেগুলোকে কবীরা গণ্য করতেন। এদিক দিয়ে অপবাদ আরোপও কবীরা। 

জাদুর অবস্থা এই যে, যদি তাতে কুফরী কথাবার্তা না থাকে, তবে কবীরা গোনাহ। নতুবা এর গুরুত্ব ততটুকুই হবে, যতটুকু ক্ষতি এর দ্বারা হবে; যেমন জীবন নাশ করা, রুগ্ন হওয়া ইত্যাদি। 

যুদ্ধের সারি থেকে পলায়ন করা এবং পিতা-মাতার নাফরমানীও কিয়াস অনুযায়ী এমন যে, এ সম্পর্কে মত প্রকাশে বিরত থাকাই উপযুক্ত। এ ছাড়া এটা অকাট্যরূপে জানা আছে যে, যিনা ছাড়া মানুষকে অন্য কোন গালি দেয়া, মারা, যুলুম করা অর্থাৎ ধন ছিনিয়ে নেয়া, গৃহ থেকে উৎখাত করে দেয়া কবীরার অন্তর্ভুক্ত নয়। কেননা, কবীরা গোনাহের সর্বোচ্চ সংখ্যা সতের বর্ণিত আছে। এগুলো সেই সাতের মধ্যে উল্লিখিত নেই। এমতাবস্থায় যদি পলায়ন করা এবং পিতামাতার নাফরমানী করাকেও কবীরা বলা থেকে বিরত থাকা যায়, তবে তা অবান্তর হবে না। কিন্তু হাদীসে পলায়ন ও পিতামাতার নাফরমানীকে কবীরা নামে অভিহিত করা হয়েছে। এদিক দিয়ে এগুলোকে কবীরার তালিকায় দাখিল করা উচিত।


 পূর্বোল্লিখিত এক আয়াতে বলা হয়েছে  : তোমরা কবীরা গোনাহ থেকে বেঁচে থাকলে আমি তোমাদের ত্রুটি-বিচ্যুতি মাফ করে দেব। এ থেকে জানা যায়, কবীরা গোনাহ থেকে বেঁচে থাকলে তা সগীরা গোনাহের জন্যে কাফ্‌ফ্ফারা হয়ে যায়। বলা বাহুল্য, এটা সর্বাবস্থায় নয়; বরং তখন কাফ্‌ফারা হবে, যখন সামর্থ ও ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও বেঁচে থাকে। 

উদাহরণতঃ যদি কোন ব্যক্তি কোন নারীর সাথে যিনা করতে সক্ষম হয় এবং মনে আগ্রহও থাকে, এরপর সে নিজেকে বিরত রাখে এবং শুধু দেখে ও স্পর্শ করেই ক্ষান্ত থাকে, তবে যে অন্ধকার দেখা অথবা স্পর্শ করার কারণে তার অন্তরে সৃষ্টি হবে, তার তুলনায় নিজেকে যিনা থেকে বাঁচিয়ে রাখার কারণে নূর বেশী হবে। কাফ্‌ফারা হওয়ার অর্থ এটাই। কিন্তু যদি সেই ব্যক্তি পুরুষত্বহীন হয়, অথবা কোন কারণে সহবাসে অক্ষম হয়, তবে তার বিরত থাকা কাফ্‌ফারা হবে না। 

এমনিভাবে যে ব্যক্তি মদ্যপানে মোটেই আগ্রহী নয়, এমনকি তা হালাল হলেও পান করত না, তার মদ্যপান থেকে বিরত থাকা সেসব ছোট গোনাহের জন্যে কাফফারা হবে, যা মদ্যপানের সূচনাতে হয়ে থাকে। কবীরা যেহেতু আখেরাত সম্পর্কিত বিধানাবলীর অন্যতম, তাই শরীয়তে এর সঠিক সংখ্যা ও পূর্ণাঙ্গ সংজ্ঞা বর্ণিত হয়নি। উদ্দেশ্য, মানুষ যাতে নির্ভীক ও শংকামুক্ত হয়ে সগীরা গোনাহসমূহে লিপ্ত হয়ে না পড়ে। 


হযরত আবু হুরায়রার রেওয়ায়েতে রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন এক নামায অন্য নামাযের সময় পর্যন্ত কাফফারা হয় এবং এক রমযান অন্য রমযান পর্যন্ত কাফফারা হয় তিনটি গোনাহ ছাড়া— শিরক, সুন্নত বর্জন ও চুক্তি ভঙ্গকরণ। সাহাবায়ে কেরাম প্রশ্ন করলেন  : সুন্নত বর্জন ও চুক্তি ভঙ্গ বলতে উদ্দেশ্য কি ? তিনি বললেন : দল থেকে বের হয়ে যাওয়া সুন্নত বৰ্জন এবং কারও সাথে চুক্তি করার পর তলোয়ার নিয়ে তার সাথে যুদ্ধ করার জন্যে বের হয়ে পড়া চুক্তি ভঙ্গকরণ। 




পরবর্তী পর্ব

জান্নাত ও দোযখের স্তর পাপ ও পুণ্যের স্তরের উপর নির্ভরশীল

বুধবার, ২৬ জুলাই, ২০২৩

তওবা - (পর্ব - ৭) শর্তসহ তওবা কবুল হয়



তওবা - (পর্ব - ৭) 
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

শর্তসহ তওবা কবুল হয়—
নিঃসন্দেহে প্রত্যেক বিশুদ্ধ তওবা কবুল হয়। যারা অন্তশ্চক্ষুর আলোকে দেখে তারা জানে যে, সুস্থ ও নীরোগ অন্তর আল্লাহর কাছে মকবুল হয়ে থাকে এবং প্রকৃতিগতভাবে অন্তর নীরোগ সৃজিত হয়। এর সুস্থতা কেবল গোনাহের অন্ধকার ও মালিন্য আচ্ছন্ন হয়ে যাওয়ার কারণে বিনষ্ট হয়। অনুশোচনার অনল এ মালিন্যকে ভস্মীভূত করে দেয় এবং সৎকর্মের নূর অন্তরের চেহারা থেকে গোনাহের তিমির দূর করে দেয়। গরম পানি ও সাবান ব্যবহার করলে যেমন কাপড়ের ময়লা পরিষ্কার হয়ে যায়, তেমনি তওবা ও অনুতাপের ফলে অন্তরের নাপাকী দূর হয়ে অন্তর পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন হয়ে যায়। 

অতএব মানুষের উচিত, কেবল অন্তরকে পাক ও সাফ রাখা, যাতে আল্লাহর কাছে মকবুল হয়। কোরআনের ভাষায় এই কবুল হওয়ার নাম সাফল্য। 

বলা হয়েছে–

>“যে অন্তরকে পরিশুদ্ধ রেখেছে, সে সফলতা অর্জন করেছে”।

কারও কারও ধারণা, তওবা বিশুদ্ধ হলেও তা কবুল হয় না। তাদের এই ধারণা এরূপ ধারণার অনুরূপ যে, সূর্য উদিত হলেও অন্ধকার দূর হয় না অথবা সাবান দিয়ে ধৌত করলেও কাপড়ের ময়লা পরিষ্কার হয় না। 

হাঁ, যদি ময়লার স্তর কাপড়ের কলিজার মধ্যে প্রবেশ করে যায়, তবে সাবান দিয়ে তা দূর করা যাবে না। এমনিভাবে উপর্যুপরি গোনাহের কারণে যে অন্তরে মরিচা ও মোহর লেগে যায়, তার তওবা নিষ্ফল। কেউ কেউ মাঝে মাঝে কেবল “তওবা তওবা” বলে থাকে। এরূপ তওবার কোন মূল্য নেই। এটা এমন, যেমন ধোপা মুখে বলে, আমি কাপড় ধোলাই করেছি। তাঁর এই মৌখিক কথায়ই কাপড় পরিষ্কার হয়ে যাবে কি, যে পর্যন্ত কাপড়ের ময়লা ছাড়ানোর কৌশল ব্যবহার না করবে। প্রকৃত তওবা থেকে যারা গা বাঁচাতে চায়, এটা তাদেরই অবস্থা। দুনিয়ার প্রতি অতিমাত্রায় আসক্ত ব্যক্তিদের উপর এ অবস্থাই প্রবল। 

এখন তওবা কবুল হওয়ার পক্ষে কোরআন ও হাদীস থেকে প্রমাণ পেশ করা হচ্ছে। 

আল্লাহ্ তা'আলা বলেন-

>“তিনি আল্লাহ, যিনি আপন বান্দাদের তরফ থেকে তওবা কবুল করেন এবং গোনাহসমূহ মার্জনা করেন”।  

>“আল্লাহ গোনাহ মার্জনাকারী এবং তওবা কবুলকারী”।  

তওবা কবুল হওয়ার ব্যাপারে আরও অনেক আয়াত রয়েছে। হাদীস শরীফে আছে, 

>“আল্লাহ তা'আলা বান্দার তওবার কারণে অধিক সন্তুষ্ট হন”। 

বলা বাহুল্য, সন্তুষ্ট হওয়ার মর্তবা কবুল করার ঊর্ধ্বে। 

অন্য এক হাদীসে বলা হয়েছে- 

>“যে ব্যক্তি রাতের বেলায় সকাল পর্যন্ত এবং দিনের বেলায় সন্ধ্যা পর্যন্ত গোনাহ করে, তার তওবা কবুল করার জন্যে আল্লাহ তা'আলা বাহু প্রসারিত করেন। এটা পশ্চিম দিক থেকে সূর্যোদয় পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে”। 

এখানে বাহু প্রসারিত করার অর্থ তওবা তলব বা কামনা করা বুঝা যায়। যে তলব করে, সে কবুলকারীর ঊর্ধ্বে। কেননা, কোন কোন কবুলকারী তলব করে না কিন্তু তলবকারীর জন্য কবুলকারী হওয়া অপরিহার্য। 


অন্য এক হাদীসে আরও বলা হয়েছে : 

>“যদি তোমরা আকাশ পর্যন্ত বিস্তৃত গোনাহ কর, এরপর অনুতপ্ত হও, তবে অবশ্যই আল্লাহ তোমাদের তওবা কবুল করবেন”।  

হাদীসে আরও বলা হয়েছে- 

>“মানুষ কোন গোনাহ করে, এরপর এর কারণে জান্নাতে দাখিল হয়ে যায়”  সাহাবায়ে কেরাম আরয করলেন এটা কিরূপে ? তিনি বললেনঃ গোনাহ থেকে তওবা করে তাকেই দৃষ্টিতে রাখে এবং সেই গোনাহ থেকে বিরত থাকে। অবশেষে এর দৌলতে জান্নাতে দাখিল হয়। 

রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আরও বলেন  :

“যে গোনাহ থেকে তওবা করে, সে সেই ব্যক্তির মত, যার কোন গোনাহ নেই।


বর্ণিত আছে, জনৈক হাবশী রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর খেদমতে আরয করল  ‘আমি গোনাহ করতাম’ –বলুন, আমার তওবা কবুল হবে কি না? 

তিনি (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বললেন  : অবশ্যই তওবা কবুল হবে। 

লোকটি চলে গেল, এরপর আবার ফিরে এসে আরয করল : ইয়া রসূলাল্লাহ ! (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আমি যখন গোনাহ করতাম, তখন আল্লাহ আমাকে দেখতেন কি না?

তিনি (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বললেন : হাঁ, দেখতেন । 

একথা শুনেই হাবশী এমন সজোরে চীৎকার করে উঠল যে, সাথে সাথে তার প্রাণবায়ু বের হয়ে গেল।

বর্ণিত আছে, যখন আল্লাহ তা'আলা শয়তানকে নিজের দরবার থেকে তাড়িয়ে দিলেন, তখন শয়তান অবকাশ প্রার্থনা করল। আল্লাহ তাকে কিয়ামত পর্যন্ত অবকাশ দিলেন। 

শয়তান বলল,

>“আপনার ইযযতের কসম, যে পর্যন্ত মানুষের দেহে প্রাণ থাকবে, আমি তার অন্তর থেকে বের হব না”। 

এরশাদ হল-

>“আমিও আমার ইযযত ও প্রতাপের কসম খেয়ে বলছি- যে পর্যন্ত মানুষের মধ্যে প্রাণ থাকবে, সে পর্যন্ত তাদের তওবা প্রত্যাখ্যান করব না”। 

অন্য এক হাদীসে বলা হয়েছে– 

>“পুণ্যকাজ মন্দকাজকে বিদূরিত করে। যেমন পানি ময়লাকে বিদূরিত করে”। 

তওবা কবুল হওয়ার বিষয়ে এমনি ধরনের আরও অসংখ্য হাদীস বর্ণিত রয়েছে। এ সম্পর্কে মনীষীগণের উক্তিও কম নয়। 


হযরত সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িব (রাঃ) বলেন: 

>“আল্লাহ প্রত্যাবর্তনকারীদেরকে ক্ষমা করেন”। 

আয়াতের মর্ম এই যে, যদি কেউ গোনাহ করার পর তওবা করে এবং এরপরও গোনাহ করে এবং এরপর তওবা করে, তবে আমি তার তওবা কবুল করব। 

তালেক ইবনে হাবীব বলেনঃ আল্লাহ তা'আলার হক আদায় করা বান্দার পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু যেহেতু সে সকালে তওবা করে এবং সন্ধ্যায় তওবা করে, তাই ক্ষমার আশা করা যায়। 

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রাঃ) বলেন–> "যে ব্যক্তি কোন অপরাধ করে, সে যদি সেই অপরাধ স্মরণ করে মনে মনে ভীত হয়, তবে সে অপরাধ তার আমলনামা থেকে মিটে যায়"। 

জনৈক বুযুর্গ বলেন মানুষ মাঝে মাঝে গোনাহ করে এবং দীর্ঘকাল পর্যন্ত অনুতাপ করতে থাকে। অবশেষে সে এর দৌলতে জান্নাতে দাখিল হয়ে যায়। তখন শয়তান বলে, চমৎকার হত যদি আমি তাকে গোনাহে লিপ্ত না করতাম। 

এক ব্যক্তি হযরত ইবনে মসউদ (রাঃ)-কে প্রশ্ন করল : “আমি একটি গোনাহ করেছি, আমার তওবা কবুল হবে কি না”? তিনি প্রথমে তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। এরপর তাকিয়ে লোকটিকে অশ্রুসজল দেখতে পেয়ে বললেন জান্নাতের আটটি দরজা আছে, সবগুলো খুলে এবং বন্ধ হয়; কিন্তু তওবার দরজা কখনও বন্ধ হয় না। সেখানে একজন ফেরেশতা মোতায়েন রয়েছে। তুমি নিরাশ না হয়ে ভাল আমল করে যাও। 

আবদুর রহমান ইবনে আবুল কাসেমের দরবারে একবার কাফেরের তওবা এবং এই আয়াত সম্পর্কে আলোচনা শুরু হল : 

>“যদি তারা বিরত হয়, তবে অতীতে যা হয়েছে, ক্ষমা করা হবে”। 

আবদুর রহমান বললেন : আমি আশা করি আল্লাহর কাছে মুসলমানের অবস্থা কাফেরের তুলনায় ভাল হবে। আমি এই রেওয়ায়েতপ্রাপ্ত হয়েছি যে, মুসলমানের তওবা করা যেন ইসলাম গ্রহণের পর আবার ইসলাম গ্রহণ করা। 

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম বলেন : আমি তোমাদের কাছে যে হাদীস বর্ণনা করি, তা নবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) থেকে শুনে অথবা ঐশীগ্রন্থ থেকে দেখে বর্ণনা করি। 

বান্দা গোনাহ করার পর যদি এক মুহূর্ত অনুতাপ করে, তবে পলক মারারও পূর্বে সেই গোনাহ দূর হয়ে যায়। 

হযরত উমর (রাঃ) বলেনঃ তওবাকারীদের কাছে বস। কারণ, তাদের অন্তর অধিক নম্ৰ থাকে।

জনৈক বুয়ুৰ্গ বলেন যদি আমি তওবা থেকে বঞ্চিত থাকি, তবে এটা আমার জন্যে মাগফেরাত থেকে বঞ্চিত থাকার তুলনায় অধিক ভয়ের কারণ। এরূপ বলার কারণ এই যে, তওবার জন্যে মাগফেরাত অপরিহার্য। তওবা কবুল হলে মাগফেরাত হয়েই যাবে। তওবা কবুল হওয়ার ব্যাপারে এতটুকু বর্ণনাই যথেষ্ট । 

এখন কেউ প্রশ্ন তুলতে পারে যে, এটা তো মুতাযেলা সম্প্রদায়ের কথা যারা বলে যে, তওবা কবুল করা আল্লাহর উপর ওয়াজিব। এর জওয়াব এই যে, আমৱা যে “ওয়াজিব” বলি, তার অর্থ “জরুরী”। যেমন কেউ বলে - সাবান দিয়ে কাপড় ধৌত করলে ময়লা দূর হওয়া ওয়াজিব অথবা পিপাসার্ত ব্যক্তি পানি পান করলে পিপাসা দূর হওয়া ওয়াজিব, অথবা কাউকে দীর্ঘ সময় পানি পান করতে না দিলে পিপাসা লাগা ওয়াজিব, অথবা কেউ সদাসর্বদা পিপাসার্ত থাকলে তার মরে যাওয়া ওয়াজিব। মুতাযেলা সম্প্রদায় যে অর্থে ওয়াজিব বলে, সে অর্থে এসব বিষয়ের মধ্যে কোনটিই ওয়াজিব নয়। আমাদের উদ্দেশ্য এতটুকু যে, আল্লাহ তা'আলা এবাদতকে গোনাহের কাফফারা করেছেন এবং পাপকে মিটানোর জন্যে পুণ্য সৃষ্টি করেছেন, যেমন পানিকে পিপাসা নিবৃত্ত করার জন্যে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহর কুদরতে এর বিপরীত হওয়ারও অবকাশ রয়েছে। 

   সারকথা, আল্লাহর উপর কোনকিছুই ওয়াজিব নয়। কিন্তু তিনি যে বিষয়ের ইচ্ছা করেছেন, তা হওয়া অবশ্যই ওয়াজিব। এখানে আরও একটি প্রশ্ন হতে পারে যে, তওবাকারীদের প্রত্যেকেই তওবা কবুল হওয়ার ব্যাপারে সন্দেহ করতে থাকে; অথচ যে পানি পান করে, সে পিপাসা নিবৃত্তির ব্যাপারে সন্দেহ করে না। অতএব, তওবাকারী সন্দেহ করবে কেন? জওয়াব এই যে, তওবা বিশুদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে যে সকল জরুরী শর্ত রয়েছে, সেগুলো পাওয়া গেল কি না, সন্দেহ সে বিষয়েই হয়ে থাকে । পানি পান করার ক্ষেত্রে এরূপ কোন শর্ত নেই।তওবা বিশুদ্ধ হওয়ার শর্তাবলী ইনশাআল্লাহ  পরে বর্ণনা করা হবে।

পরবর্তী পর্ব

যে সকল গোনাহ থেকে তওবা করা হয়

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...