মঙ্গলবার, ২৮ নভেম্বর, ২০২৩

হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (৬) দায়িত্ব তত্ত্ব



📚 হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (পর্ব-৬)
✍🏻শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ্ মুহাদ্দেসী দেহলভী (রহঃ)

দায়িত্ব তত্ত্ব-
আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ 
আমি নভঃমণ্ডলীপৃথিবী ও পাহাড়-পর্বতের সামনে আমার আমানত পেশ করলাম। তারা সে দায়িত্ব বহন করতে অস্বীকার করল। তারা ভয় পেয়ে গেল। অথচ মানুষ সে দায়িত্ব নিল। কারণতারা বড়ই জালিম ও জাহিল। এটা এ কারণেই ঘটল যেআল্লাহ মুনাফিক ও মুশরিক নর-নারীকে শাস্তি দেবেন এবং মুমিন নর-নারীকে অনুগ্রহীত করবেন। আল্লাহ বড়ই ক্ষমাশীল ও দয়ালু (সূরা আহযাবঃ আয়াত ৭২-৭৩)

ইমাম গাজ্জালী ও ইমাম বায়জারী (রঃ) প্রমুখ এটা সুস্পষ্ট করে দিয়েছেন যেএ আয়াতের আমানত’ অর্থ হল আল্লাহ দত্ত দায়িত্ব। আকাশ ও পৃথিবীর অন্য সবাই সভয়ে এ দায়িত্ব পারিহার করেছে। মানুষ এ দায়িত্ব বুঝে নেয়ার কারণেই আল্লাহর আনুগত্যের জন্য যেমন পুরস্কার পাবেতেমনি তাঁর নাফরমানীর জন্য শাস্তিও পাবে। অন্যান্যের কাছে এ দায়িত্ব পেশ করার উদ্দেশ্য হল তাদের যোগ্যতা যাচাই করে নেয়া। তাদের অস্বীকার থেকে প্রমাণিত হয়এত বড় গুরুদায়িত্ব বহনের শক্তি ও সাহস তাদের নেই। মানুষ তা গ্রহণ করে নিজেদের যোগ্যতম বলে প্রমাণ দিল। 

এ ক্ষেত্রে আমার বক্তব্য এইএখানে আল্লাহ পাকের মানুষ বড়ই জালিম ও জাহিল’ মন্তব্যটি মানুষের যোগ্যতার কারণ ইংগিত করেছে। জালিম তাকেই বলা হয়ইনসাফ করার যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি জুলুম করে। তেমনি জাহিল তাকেই বলা যায়জ্ঞানার্জনের যোগ্যতা নিয়ে যে ব্যক্তি মূর্খ থাকে। বস্তুত মানুষ ছাড়া সব সৃষ্টিই হয় শুধু আলিম ও আদিল। তাদের ভেতরে অত্যাচার ও মূর্খতার কোন স্থানই নেই। যেমনফেরেশতা। নয় তারা শুধুই জালিম ও জাহিল। ইলম ও আদলের কোন যোগ্যতাই তাদের নেই। যেমন চতুষ্পদ জন্তু। সুতরাং উক্ত আমানত গ্রহণের যোগ্যতা কেবল তাদেরই থাকতে পারে যাদের ক্ষমতা প্রকৃতিজাত নয়উপার্জনক্ষম। তারপর আয়াতে ( لِّیُعَذِّبَ) শব্দের লাম’ পরিণতি অর্থে এসেছে। অর্থাৎ দায়িত্ব গ্রহণের পরিণতি হল সুখ ও দুঃখ। 

এক্ষণে যদি আপনি সঠিক ব্যাপার বুঝতে চানতা হলে প্রথমে ফেরশতার কথাই খেয়াল করুন। ফেরেশতাদের না আছে ক্ষুৎ-পিপাসানা ভয়-ভাবনা। তেমনি জৈবিক লালসারাগঅহংকার ইত্যাকার বলতে কিছুই নেই। তাদের রুজী রোজগার কিংবা স্বাস্থ্য রক্ষার বালাই নেই। এক কথায় জীবজগতের কোন প্রয়োজনেরই তাদের পরোয়া নেই। তারা থাকেন। তাই কোন বাঞ্ছিত বিধান প্রবর্তনের কিংবা বিরূপ বা অনুকূল মনোভাব গ্রহণের ঐশী নির্দেশ পাওয়া মাত্র সংগে তারা মনে-প্রাণে তা বাস্তবায়নের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েন।

এবারের পশুদের কথা খেয়ার করুন। সেগুলোর অবস্থা শোচনীয়। কতশত মন্দ স্বভাবের পশুদের সাথে তারা আষ্টেপিষ্টে জড়িত। তারা জৈবিক আনন্দ ছাড়া কিছুই বুঝেনা। তাই বস্তুগত স্বার্থভোগ-লালসা ও উত্তেজনার উত্তাল তরংগে তারা ডুবে থাকে। 
অবশেষে মানুষের দিকে লক্ষ্য করুন। আল্লাহ তা'আলা তাঁর পরিপূর্ণ কৌশল প্রয়োগ দ্বারা মানুষের ভেতর পরস্পর বিরোধী দুটো শক্তিরই সমাবেশ ঘটিয়েছেন।
(১) ফেরেশতা প্রকৃতি (বিবেক)। এ প্রকৃতি মানুষের মৌলিক প্রাণ থেকৈ প্রেরণা পায় এবং সেই প্রাণ থেকে তার মৌলিক প্রাণকে অহরহ প্রেরণা যোগায় (যৌগিক প্রাণ মানুষের গোটা দেহে ছড়িয়ে থাকে)। মৌলিক প্রাণের প্রেরণা গ্রহণই ফেরেশতা প্রকৃতির বৈশিষ্ট্য এবং তার ওপরেই সে প্রেরণা প্রাধান্য বিস্তার করে। 
(২) পশু প্রকৃতি (প্রবৃত্তি অন্য সব পশুর ভেতর যে জৈব প্রবৃত্তি রয়েছে সেটাই মানুষের পশু প্রকৃতির ভিত্তি ও উৎস। যে চার উপাদানের মানুষের যৌগিক প্রাণের সৃষ্টিএ প্রকৃতিতেও তা বর্তমান। পশু প্রকৃতি সম্পূর্ণ স্বাধীণ হয়। মৌলিক প্রাণও তার নির্দেশ মেনে নেয়। 
এও স্মরণ থাকা চাইএ দুই শক্তির ভেতর পারস্পরিক দ্বন্দ্ব চলে। কখনও বিবেক প্রবৃত্তিকে ওপরে টানতে চায়। কখনও আবার প্রবৃত্তি বিবেককে টেনে নিচে নামাতে চায়। সেক্ষেত্রৈ বিবেক পরাজিত হলে প্রবৃত্তির প্রভাব প্রকাশ পায় এবং প্রবৃত্তি পরাজিত হলে বিবেকের প্রভাব প্রকাশ পায়। আল্লাহ তা'আলা তো দুটোই প্রকাশের সযোগ দেন। উপার্জণকারী যেটাই উপার্জন করতে চায়তিনি সাধারণত সেটা দেন। যদি কেউ পশু স্বভাবের প্রাধান্য দিতে চায়আল্লাহ তার পথ খুলে দেন। পক্ষান্তরে কেউ যদি ফেরেশতা প্রকৃতির প্রাধান্য রাখতে চায়আল্লাহ পাকও তাকে তার ব্যবস্থা করে দেন। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ 
আল্লাহর পথে যে ব্যক্তি দান করে ও আল্লাহকে ভয় করে এবং ন্যায় কাজকে সমর্থন করেআমি তার জন্য পূণ্য কাজ সহজ করে দেই। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি কার্পণ্য করে ও আল্লাহকে ভয় করেনা এবং সত্যপথকে মিথ্যা বলে আখ্যায়িত করেআমি তার জন্য পাপ কাজ সহজ করে দেই (সুরা লাইলঃ ৫-১০)

অন্যত্র আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ 
(হে রসুল) আপনার প্রভুর অবদানে আমি দলমত নির্বিশেষে ধন্য করে থাকি। এদলকেও দেইও দলকেও দেই। কারণআপনার প্রভু ইহলোকে তাঁর দান-দাক্ষিণ্য কারো জন্য বন্ধ রাখেন না (সুরা বনি ইসরাইল : আয়াত- ২০)

প্রত্যেক শক্তি বা প্রকৃতিতেই সুখ ও দুঃখ রয়েছে। নিজ প্রকৃতির অনুকূল ব্যাপারের অনুভূতিকে বলে সুখ এবং প্রতিকূল ব্যাপার সহ্য করার নাম দুঃখ। দেখুনমানুষকে যখন অবশ (ক্লোরোফর্ম) করার মত কিছু প্রয়োগ করা হয়তখন কোন কিছুই তাকে কষ্ট দিতে পারে না। যদি তার কোন অংগ আগুনে জ্বালানো হয় তা সে টের পাবেনা। কিন্তু যখন তার অবশ অবস্থা কেটে যায়এবং পুনরায় অনুভূতি ফিরে আসে তখন কিরূপ কষ্ট দেখা দেয় তাও জানেন। 

মানুষের অবস্থার সাথে গোলাপ ফুলের বেশ সাদৃশ্য রয়েছে চিকিৎসকরা বলেছেনতার ভেতর তিনটি শক্তি বিদ্যমান। একমৃত্তিকা প্রকৃতি। ঘষে দিয়ে গায়ে লাগালে তা প্রকাশ পায়। দুইজলীয় প্রকৃতি। চিপে পান করলে তা জানা যায়। তিনবায়বীয় প্রকৃতি। তার পরিচয় ঘ্রাণেই মিলে। 

এ সব আলোচনা থেকে জানা গেলমানুষের যোগ্যতাই দায়িত্ব দাবী করে। সুতরাং আল্লাহ তাদের যে দায়িত্ব দিয়ে জবাবদিহির ব্যবস্থা করেছেন সেটা তাদের দাবীরই অনুকূল। তেমনি তাদের ভেতরকার ফেরেশতা প্রকৃতি (বিবেক) এ দাবীই জানায়তার অনুকূল ও উপযোগী কাজগুলো তার জন্য ফরজ (অপরিহার্য) করা হোক এবং প্রতিকূল ও অনুপযোগী পশু প্রকৃতির কাজগুলো হারাম (অবৈধ) করা হোক। তা হলেই সে শাস্তি থেকে বেঁচে গিয়ে শান্তি লাভ করতে পারবে। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

 সপ্তম পরিচ্ছেদ--

হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (৫) প্রাণের রহস্য



📚 হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (পর্ব-৫)
✍🏻শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ্ মুহাদ্দেসী দেহলভী (রহঃ)

প্রাণের রহস্য 
আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ 
“(হে রসূল) তারা (ইয়াহুদীরা) আপনার কাছে প্রাণের রহস্য জানতে চাইছেআপনি বলে দিনপ্রাণ আল্লাহর নির্দেশ বৈ কিছুই নয় বরং তোমাদের খুব নগণ্য জ্ঞানই দান করা হয়েছে। (সূরা বনী ইস্রাঈলঃ আয়াত ৮৫) 
ইবনে মাসউদের বর্ণনায় তিনি (আউতিতুম) স্থলে (ওআ'তু) পাঠ করেছেন। তার অর্থ দাঁড়ায় তাদের নগণ্য জ্ঞান দেয়া হয়েছে। এই তাদের’ থেকে বুঝা যায়প্রশ্নকারীরা ইহুদী ছিল। তা ছাড়া এ আয়াত থেকে সুস্পষ্ট প্রমাণ মিলেনা যেমুসলমানদের কেউ প্রাণের রহস্য জানতেন না। কিছু লোকের অবশ্য সেরূপ ধারণা রয়েছে। শরীয়ত প্রবর্তক যে ব্যাপারে চুপ ছিলেনসে ব্যাপারে কারো কিছু জানা সম্ভবই নয়এটা ভুল কথা। বরং কোন কোন ক্ষেত্রে শরীয়ত দাতা এ জন্য নীরব ভূমিকা নিয়েছেন যেসেরূপ সূক্ষ্ম ও জটিল বিষয় দুচারজনে বুঝলেও সর্ব সাধারণের বোধগম্য হবেনা।
আপনার জানা প্রয়োজনপ্রাণের রহস্য আপনি সর্বপ্রথম যতটুকু বুঝতে পারেন তা হল এইপ্রাণী জগতের আয়ুস্কালের ভিত্তি ও উৎসই হল প্রাণ। যতক্ষণ তা যে প্রাণীর দেহে অবস্থা করেসেটা জীবিত থাকে এবং যখনই প্রাণ দেহ ছেড়ে চলে যায়প্রাণীটি মারা যায়। 
আরও একটু গভীরে তলিয়ে দেখতে পাবেনদেহের ভিতর সূক্ষ্ম ও হালস্কা উষ্ণতার অস্তিত্ব মিলে। রক্তপিত্তকফ ইত্যাকার দেহের চার চীজের নিখুঁত ও নির্ভুল সংমিশ্রণে তা কলবের ভিতর জন্ম নেয়। তারপর তা অনুভূতিগতি ও বোধ শক্তির ধারককে (দেহকে) রুজীর আহরণে বয়ে চলে এবং তাতে চিকিৎসাদিরও দখল থাকে। 
অভিজ্ঞতা থেকে আরও জানা যায়সেই উষ্ণ পিণ্ড হাল্কা ও ভারী এবং পরিচ্ছন্ন ও অপরিচ্ছন্ন হওয়া নির্ভর করছে উপরি বর্ণিত শক্তিগুলোর ওপর। উক্ত শক্তিগুলো থেকে যে প্রক্রিয়া সৃষ্টি হয়তার প্রতিক্রিয়া সেটার ওপর প্রভাব বিস্তার করে। 
এ জানা যায়যখন সেই উষ্ণপিণ্ডের জন্ম ও রূপ লাভের সাথে সংশ্লিষ্ট কোন অংগে কোন বিপত্তি দেখা দেয়তখন উষ্ণপিণ্ডেও গোলযোগ দেখা দেয়। এও জানা যায় উষ্ণ পিণ্ডের জন্ম লাভ জীবনের ও মিটে যাওয়া মৃত্যুর কারণ হয়। ভাসা ভাসা দৃষ্টিতে তো মনে হয় এ উষ্ণ পিণ্ডই প্রাণ। কিন্তু যদি গভীর দৃষ্টিতে লক্ষ্য করা যায়তাহলে বুঝা যায়সেটা প্রাণের নিম্নতম স্তর মাত্র। ফুলের সাথে ঘ্রাণের যে সম্পর্ক কিংবা আগুনের সাথে কয়লারশরীরের সাথে তার ততটুকু সম্পর্ক। 

আরও গভীরে তলিয়ে দেখলে বুঝা যায়এ উষ্ণপিণ্ড প্রাণ নয়বরং মূল প্রাণের ধারক বা খোলস এবং শরীরের সাথে তার সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে বস্তু। তার প্রমাণ হল এইআমরা বারংবার দেখছি শিশু যুবক এবং যুবক বৃদ্ধ হয়। তেমনি তার শরীরের মৌল উপাদান রক্তকফপিত্ত ইত্যাদি পরিবর্তন হয়ে চলে। তাই তার সংমিশ্রণে যে প্রাণের অস্তিত্ব দেখতে পাই তা আগের চাইতে বহুগুণ বেড়ে যায়। আবার দেখিশিশু ছোট থেকে বড় হয়কালো কিংবা সাদা হয়আলেম কিংবা জাহেল হয়। এভাবে তার অবস্থার বহুবিধ বিবর্তন ঘটেঅথচ ব্যক্তিত্বটি একই থেকে যায়। 

এখানে যদি কেউ (তার অবস্থা পরিবর্তন হওয়া বা না হওয়া নিয়ে) তর্ক-বিতর্ক চালায় তো আমি জবাবে বলবএ পরিবর্তনটি আমি ধরে নিয়েছি মাত্র। নইলে এতে তো সন্দেহ নেই যেতার অবস্থার প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হতেই থাকে। অথচ ব্যক্তিটি একই থেকে যায়। কিংবা এ ভাবে জবাব দেব যেশিশুটির নিজ অবস্থানে বহাল থাকা তো মেনে নেবকিন্তু তার অবস্থা নিজ অবস্থানে বহাল থাকতে পারেনা। এ থেকেই প্রমাণিত হলশিশুটি আসল বস্তু ও তার অবস্থা নকল বস্তু। 

সুতরাং এটাই সুপ্রমাণিত হলযে বস্তুর অস্তিত্ব মানুষকে জীবিত রাখে তা উক্ত প্রাণ বা উষ্ণপিণ্ড নয়। তেমনি দেহ তো নয়ই। ব্যক্তিত্বটিও নয়যা বাহ্যত মনে হয়। বরং প্রাণ হল সংমিশ্রণ মুক্ত একক ও স্বতন্ত্র এক জিনিস। তা হল এমন এক নূর বিন্দু বা আলোকপিণ্ড যা পরিবর্তনশীল অবস্থা কিংবা বিভিন্ন পদার্থের সংমিশ্রণ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ও স্বতন্ত্র। এ আসল প্রাণ সত্তাটি ছোট ও বড়রকালো ও সাদার ও অন্যান্য বিপরীত ধর্মী বিভিন্ন অবস্থার ভেতর একই রকম থাকে। কোনরূপ বিবর্তন বা বিভক্তি স্বীকার করেনা। 

অবশ্য সেই আসল প্রাণ সত্তার সম্পর্ক (বাহ্য দৃষ্টির প্রাণ সত্তা) তাপপিণ্ডের সাথেই রয়েছে। সেটার কারণেই দেহের অস্তিত্ব বিরাজমান থাকে। কারণদেহ তো উষ্ণপিণ্ড সৃষ্টির চার উপাদা থেকেই অস্তিত্ববান। পক্ষান্তরে মূল প্রাণ জগতের এমন একটি খিড়কী যে পথে সে যে যে উপাদানে জড় প্রাণের সৃষ্টি তা সবই সেখান থেকে পেয়ে যায়। এখন থেকে গেল বিবর্তনের বিবরণী। পার্থিব উপাদানের সেটাই স্বভাব। দেখুনরোদ ও রোদের তাপ ধোপার ধোয়া কাপড় শুকিয়ে সাদা করেঅথচ ধোপাকে পুড়ে কালো করে। এও তেমনি ব্যাপার। 

আমরা বিশুদ্ধ মন ও মননের এটাই সিদ্ধান্ত যেদেহে যদি জড় প্রাণের উৎপাদন শক্তি না থাকেতাহলে জড় প্রাণ সেখান থেকে বিদায় নেয়। এরই নাম মৃত্যু! জড় প্রাণ থেকে মূল প্রাণের নাম মৃত্যু নয়। তাই যখন ধ্বংসকারী ব্যাধিতে জড় প্রাণ তথা তাপপিণ্ড হাওয়া হয়ে যায়তখনও আল্লাহর কৌশলগত কারণে মূল প্রাণ দেহের সাথে সম্পর্ক রেখে চলে। আপনি যদি কোন শিশির বায়ু ষোল আনা বের করে ফেলার জন্য আপ্রাণ প্রয়াস চালানএমনকি বায়ু আকর্ষণ করতে গিয়ে শিশি ভেংগে ফেলারও উপক্রম করেনতথাপি তাতে কিছু না কিছু বায়ু থেকেই যাবে। তা আবার শিশিতে ছড়িয়ে জড়িয়ে যাবে। এটুকুই তো বায়ু প্রকৃতির গূঢ়তম রহস্য বা অপরিবর্তনীয় ও অখণ্ড সত্তা। তেমনি যৌগিক প্রাণের মূলেও এক রহস্যময় অপরিবর্তনীয় ও অবিভাজ্য সত্তা রয়েছে এবং সেটাই মৌলিক প্রাণ। 
মৌলিখ প্রাণের নির্ধারিত এক সীমা ও পরিমাপ রয়েছে। তার ব্যতিক্রম হতে পারে না। মানুষ যখন মারা যায়তখন তার যৌগিক প্রাণ অন্যরূপ ধারণ করে। তখন মৌলিক প্রাণের কারণে তার যৌথ অনুভূতির যতটুকু অবশিষ্ট থাকেছাড়া জগতের সাহায্যে তা এরূপ শক্তি অর্জন কর যেদেখাশোনা ও কথা বলার সব কাজই তাতে সম্ভব হয়। অর্থাৎ দেহ তখন এক অবচেতন মনের অধিকারী হয়। 
নভোমণ্ডলীতে একই ধরনের শক্তি কাজ করছে। তাই যৌগিক প্রাণ ছায়াজগতের প্রভাবে আলো কিংবা আঁধারের পরিচ্ছদে ভূষিত হওয়ার ক্ষমতা লাভ করে। এ থেকে অন্তর্বর্তী জগতের (আলমে বরযখ) অদ্ভুত ঘটনাবলী সম্ভব হয়। তারপর যখন ইস্রাফীলের শিংগায় ফুঁক দেয়া হবে (যেভাবে শিংগায় সুর ধ্বনি দিয়ে দেহজগতে প্রাণের সঞ্চার ঘটিয়ে সৃষ্টির ধারা অব্যাহত রাখার স্থায়ী ব্যবস্থা করা হয়েছিল) তখন মৌলিক প্রাণের (আমরুল্লাহ) প্রভাবে সেটাকে দেহরূপ ভূষণ কিংবা ছাড়া ও কায়াজগতের মাঝামাঝি ধরনের এক দেহে দান করা হবে। 
তারপর থেকে শুরু হবে সত্য সংবাদ দাতার সংবাদগুলোর এককের পর এক বাস্তবায়ন। যেহেতু যৌগিক প্রাণের সংযোগ রয়েছে মৌলিক প্রাণের সাথেতাই এ প্রাণ ইহ ও পরকাল দুটোর প্রভাব লাভ করবে। আত্মিক জগতের সাথে সংযোগ তার ভেতর ফেরেশতাসুলভ স্বভাব জন্মাবে এবং জড় জগতের প্রভাব তার ভেতর পশুসুলভ স্বভাবের উদ্ভব ঘটাবে। 

প্রাণ (রূহ) তত্ত্ব সম্পর্কে ভূমিকা আলোচনা করেই আমার ক্ষান্ত হওয়া উচিত। এ বিষয়ের এ মূল তত্ত্বটুকু মেনে নেয়ার পর এর শাখা-প্রশাখা বিন্যাস ও বিভিন্ন প্রশ্নের সমাধান প্রয়োজন। আর তা এর চাইতে কোন উন্নততর বিষয়ের আলোচনায় প্রসংগত এর সব রহস্যজাল ছিন্ন হবার আগেই হওয়া চাই।

হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (৪) আল্লাহর অনড় বিধান



📚 হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (পর্ব-৪)
✍🏻শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ্ মুহাদ্দেসী দেহলভী (রহঃ)

আল্লাহর অনড় বিধান -
আল্লাহর প্রকৃতিতে তুমি কোন পরিবর্তন দেখতে পাবেনা(সূরা আহযাবঃ ৬২)
কুরআনের উক্ত আয়াতের ওপর এ অধ্যায়ে আলোচা করা হবে।

এ কথা সুস্পষ্ট যেসৃষ্টি জগতে আল্লাহর কিছু কাজ তাঁর প্রবর্তিত কোন না কোন প্রাকৃতিক শক্তির ভিত্তিতে বিন্যস্ত হয়ে থাকেন। উদ্ধৃতি ও যুক্তিবুদ্ধি উভয় থেকেই এর সমর্থন মিলে। মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেনআল্লাহ তা'আলা গোটা দুনিয়ার এক মুষ্টি মাটি দিয়ে আদমকে তৈরী করেছেন। এ কারণে আদম সন্তান লালকালো কিংবা দুয়ের মাঝামাঝি বর্ণের এবং নম্র বা রুক্ষ ও ভাল বা মন্দ প্রকৃতির হয়ে থাকে। 
একবার আবদুল্লাহ ইবনে সালাম রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-কে প্রশ্ন করলেনহে আল্লাহর রাসূল ! বাচ্চা কি ভাবে মা কিংবা বাপের অনুরূপ হয়তিনি (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) জবাব দিলেনযদি বাপের বীর্য অগ্রগামী হয়তা হলে বাপের অনুরূপ হয় এবং মায়ের বীর্য অগ্রগামী হলে মায়ের অনুরূপ হয়। তেমনি সবাই জানেবিষ পানে কিংবা তরবারীর ঘায়ে মানুষকে মৃত্যু ঘটে। মায়ের জরায়ুতে বীর্য প্রবিষ্ট হলে সন্তান জন্ম নেয়। তরকারী ও গাছ পালা কর্ষণ ও পানি সিঞ্চনে উৎপন্ন হয়। ঠিক এ শক্তির উপস্থিতির কারণেই মানুষকে (শরীয়তের) দায়িত্ব চাপানো হয়েছে। আদেশ ও নিষেধের মাধ্যমে তাদের পুরস্কার ও তিরস্কারের যোগ্য বিবেচনা করা হয়েছে। আল্লাহর সৃষ্ট ও প্রাকৃতিক শক্তি কয়েক শ্রেণীতে বিভক্ত। (১) যে শক্তি জড় উপাদানের গুণাগুণ (তাপশুষ্কতাআর্দ্রতা ইত্যাদি) সৃষ্টি করে। (২) রূপান্তর ও শ্রেণীভেদের ক্ষেত্রে আল্লাহ পাক যে শক্তিকে সক্রিয় রেখেছেন। (৩) যে শক্তি জগজগতে আত্মপ্রকাশের পূর্বে ছায়া জগতে সব কিছুর বিকাশ ঘটায়। (৪) পরিমার্জিত ও পুণ্য চরিত্রের মানুষের জন্য উচ্চতম পরিষদের মনে-প্রাণে দোয়া ও তাদের পরিপন্থীদের জন্য মনে-প্রানে বদ দোয়া থেকে যে শক্তির উদ্ভব হয়। (৫) শরীয়ত তথা আল্লাহর বিধি-নিষেধের শক্তি। যে শক্তির প্রভাবে তার অনুসারীরা সাফল্য অর্জন করে ও উপেক্ষাকারীরা ব্যর্থথার মুখ দেখে (৬) যে শক্তি সৃষ্টির কারণ হয়ে আসে। আল্লাহ পাক কোন কিছু সৃষ্টি হওয়ার নির্দেশ জারী করলে তার কারণটি আগে সৃষ্টি হয়। এ কারণটি শক্তিরূপে সৃষ্টির কাজ দেয়। আল্লাহ চান সৃষ্টিজগতটি কার্যকারণ শৃঙ্খলে আবদ্ধ থাক। অন্যথায় বিশৃঙ্খল অবস্থা সৃষ্টিজগত ধ্বংস করে দেবে। এ ষষ্ঠ শক্তির উদাহরণ প্রসংগে নবী করিম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উনার এ বক্তব্য নেয়া যায়, "আল্লাহ যদি চান অমুক ব্যক্তির অমুক স্থানে মৃত্যু হোকতখন তার সেখানে পৌছার একটি কারণ সৃষ্টি হয়ে যায়"। 

এ সব কথা হাদীস ও যুক্তি দ্বারা সুপ্রমাণিত হয়ে আছে।

*** টিকা- [সব কথার সারকথা হল এইআল্লাহ এ সব স্বনির্ধারিত প্রাকৃতিক রীতি বা শক্তির মাধ্যমে কাজ করে থাকেন। কেউ কাউকে তরবারীর আঘাত করলে তিনি মৃত্যু দান করেন। বীর্য ছাড়া সন্তান উৎপাদনের শক্তি আল্লাহর থাকা সত্ত্বেও সেটাকেই তিনি এ জগতে মানব জন্মের মাধ্যম করেছেন।]***

জানা প্রয়োজনযে সব মাধ্যম শক্তির ভিত্তিতে তিনি নিজ মর্জী ও নির্দেশ কার্যকরী করেনকখনও সেগুলো পরস্পর বিরোধী সংঘাতে লিপ্ত হয়। তখন তিনি যে শক্তির প্রাধান্য লাভ অধিকতর মংগলদায়ক মনে করেনসেটাকে জয়ী করেন। হাদীসে যে রয়েছেদাঁড়ি পাল্লা আল্লাহর হাতে রয়েছে এবং যে পাল্লা ভারী করতে চান সেটাই ভারী হয় এবং আল্লাহ যে বলেছেনস্রষ্টা সতত সৃজনশীল কাজে নিরত বা ব্যস্তএ দুটো বক্তব্যের তাৎপর্য এটাই।কখনও শক্তির প্রাধান্য হয় উপকরণের শ্রেষ্ঠত্বের কারণে। কখনও তা হয় কল্যাণ-শক্তির শ্রেষ্ঠত্বের কারণে। কখনও সৃষ্টিকে ব্যবস্থাপনার ওপর প্রাধান্য দেয়া হয়। এ ছাড়াও বিভিন্ন কারনে শক্তির পারস্পরিক দ্বন্দ্বে একটির ওপর অপরটি প্রাধান্য পেয়ে থাকে। 

আমরা শক্তির দ্বন্দ্বের সময়ে ভালোভাবে জানতে পাইনাকোনটি এ ক্ষেত্রে সঠিক। তবে যেটা জয়ী হয়ে রূপলাভ করেসেটাকে নিঃসন্দেহে সঠিক ভাবতে পারি। এর ভেতরেই কল্যাণ নিহিত। আমার এ বক্তব্যটি ভেবে-চিন্তে দেখলে এর থেকে অনেক সমস্যা ও জটিলতারই সমাধান পাওয়া যাবে। 

***[সকল কর্মই আল্লাহ্ তা'আলার ইচ্ছায় সম্পাদন হয়ে থাকে। সুতরাং সর্বাবস্থায় আল্লাহ্ তা'আলার ইচ্ছার উপর সন্তুষ্ট থাকাই ইমানদারের উচিত। যেমন ইব্রাহিম খলিলুল্লাহ্ (আঃ) উনি আগুন থেকে রক্ষা করার জন্য আল্লাহর কাছে মিনতি করেননি। বরং সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। সুতরাং সকল পরিনতিতে শোকর গুজার করাই উচিত। তবেই আল্লাহ্ তা'আলার সন্তুষ্টি অর্জন সম্ভব।*** তারকার ভিতরের লাইন কয়টি বইয়ের অংশ নয় ]

গ্রহ-নক্ষত্রের শক্তি সম্পর্কে বলা চলেএর গতিবিধি দ্বারা গরম-ঠাণ্ডা বা দিন-রাতের হ্রাস-বৃদ্ধি হওয়ার মত সাধারণ কাজ অবশ্যই ঘটে থাকে। তেমনি জোয়ার ভাটাও দেখা যায়। হাদীসে আছে, “যখন ভোরে তারা দেখা দেয়সূর্য বিদায় নেয়। অর্থাৎ এটাই রীতি। কিন্তু এ সবের প্রভাবে ধনী-গরীব হওয়াদুঃখ-সুখ পাওয়া কিংবা দুর্ভিক্ষ-মহামারী দেখা দেয়ার কোন শরীয়ত সম্মত প্রমাণ নেই। মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বরং এ সব নিয়ে মাথা ঘামাতেও নিষেধ করেছেন। তিনি বলেন, ‘জ্যোতিষী হওয়া ও যাদুকর হওয়া একই কথা’ (হারাম পেশা)। আরবের জাহেলরা যে বলতঅমুক গ্রহ বা নক্ষত্রের উদয় বা অস্তের কারণে বৃষ্টি হয়েছেতিনি তার বিরুদ্ধে কঠোর সতর্ক বাণী উচ্চারণ করেছেন। 

এ ক্ষেত্রে আমার বক্তব্য এইমহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উনার শরীয়ত এ কথা কোথাও বলেনি যেগ্রহ-নক্ষত্রের গতিবিধির ভেতর আল্লাহ এমন কোন শক্তি রাখেননি যা প্রকৃতির বিবর্তনের লীলায় কোনই অংশ রাখে না। তবে এটাও ঠিক যেমহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) জ্যোতিষী হতে নিষেধ করেছেন। জ্যোতিষী বা গণকদার জীনদের কাছে জিজ্ঞেস করে করে অজানা খবর জানত। তাই তিনি জ্যোতিষীর কাছে যাওয়া ও তাদের কথার ওপর বিশ্বাস করাকে অত্যন্ত খারাপ জানতেন। জ্যোতিষীর কার্যকলাপ সম্পর্কে তার কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলতেনফেরেশতারা যখন আকাশে আল্লাহর কোন সিদ্ধান্ত আলোচনা করেনশয়তান তখন সে খবর আড়ি পেতে শুনে নিয়ে পালায় এবং (ভক্ত) জ্যোতিষীদের তা শুনায়। জ্যোতিষী সেই একটি সত্যের সাথে একশ মিথ্যা মিলিয়ে লোকদের শুনায়। 

আল্লাহ তাআলা বলেনহে ঈমানাদর সমাজ ! যারা কুপরী কাজ করল তাদের মত হয়োনা। আর তোমাদের সেই ভাইদের মত হয়োনা যারা তোমাদের ব্যাপারে বললযদি তারা অভিযানে গিয়ে যুদ্ধে অংশ না নিয়ে আমাদের কাছে থাকততাহলে মারা যেতনানিহত হতনা। 

মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেনতোমাদের ভাল কাজই শুধু তোমাদের জান্নাত দেবেনা (আল্লাহ ছাড়া)। তিনি আরও বলেনতুমিই তো একমাত্র দয়ালু বন্ধু। তুমি তো দয়ার হাত বাড়িয়েই রয়েছ। মোটকথা জ্যোতিষ শাস্ত্র নিষিদ্ধ করার ভেতর অজস্র কল্যাণকর উদ্দেশ্য রয়েছে।

পরবর্তী পর্ব

হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (৩) মালা-ই-আলা (সর্বোচ্চ পরিষদ)



📚 হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (পর্ব-৩)
✍🏻শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ্ মুহাদ্দেসী দেহলভী (রহঃ)

মালা-ই-আলা  (সর্বোচ্চ পরিষদ) 
আল্লাহর সর্বোচ্চ পরিষদের মহামান্য ফেরেশতাদের বর্ণনাই এ পরিচ্ছেদের উদ্দেশ্য। আল্লাহ তা'আলা স্বয়ং বলছেনঃ 
 আরশ মুআল্লার বাহক ও তা বেষ্টনকারী পরিষদ আল্লাহর প্রশংসা ও পবিত্রতা বর্ণনায় নিরত থাকেন এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ প্রত্যয় নিয়ে ঈমানদার বান্দাদের জন্য ক্ষমা চাইতে থাকেন। তাঁরা বলতে থাকেনহে আমাদের প্রভু ! সব কিছুই ঘিরে আছে তোমার জ্ঞান ও করুণা ! (আপনি সবই জানেন ও সবার প্রতি আপনার সহৃদয় সৃষ্টি)। তাই যে বান্দারা আপনার দিকে মুখ ফিরিয়েছে ও আপনার দেখানো সরল পথ অনুসরণ করেছেতাদের আপনি ক্ষমা করুন। তাদের দোযখের আগুন থেকে রেহাই দেন। হে আল্লাহ ! তাদের ও তাদের বাপ-মাস্ত্রী-পুত্রদের যারা ঈমানদার তাদের সবাইকে চিরন্তর জান্নাতের বাসিন্দা করুন। তাদের জান্নাত দানের আপনি ওয়াদা করেছেন। আপনিই সর্বশক্তিমান ও শ্রেষ্ঠতম কুশলী। হে মাবুদ ! তাদের অকল্যাণ থেকে বাঁচায়ে রাখুন। আপনি সেদিন যাদের অকল্যাণ থেকে বাঁচাবেনতার ওপর বড়ই দয়া দেখানো হবে। এটাই চরম সাফল্যপরম অভীষ্ট লাভ।(সূরা মুমিনঃ আয়াতঃ ৭-৯)

রাসূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেনআল্লাহ তায়ালা যখন আরশ থেকে কোন ফরমান জারী করেনতখণ ভয়ে ফেরেশতাদের পাখা ও পালক ঝড়পেটা হতে থাকে। তাতে পাথরে জিঞ্জীর আছড়ানোর মত ঝনৎকার শ্রুত হয়। তারপর যখন তাদের অন্তর থেকে ভয় ও অস্থিরতা দূর হয়তখন একে অপরকে জিজ্ঞেস করেনআল্লাহ পাক কি নির্দেশ দিলেনতখন কেউ বলে দেনতিনি অমুক সত্যটি প্রকাশ করেছেন এবং তিনিই সর্বোন্নত ও শ্রেষ্ঠতম। 

অন্য এক বর্ণনায় এরূপ বলা হয়েছেআল্লাহ পাক যখন কোন নির্দেশ দেনতখন আরশবাহী ফেরেশতারা তাঁর তাসবীহ পাঠ করতে থাকেন। তারপর তা অনুসরণ করেন আরশের পার্শ্বস্ত মজলিস সদস্যরা। এ ভাবে পর্যায়ক্রমে পার্শ্বষ্থ নিম্নতর আকাশেরএমনকি দুনিয়ার ফেরেশতা পর্যন্ত তাসবীহ পাঠের অনুসরণ করে চলে। অবশেষে আরশের নিম্ন দিকের ফেরেশতারা আরশবাহী ফেরেশতাদের প্রশ্ন করেনপ্রভু তোমাদের কি নির্দেশ দিলেনতখন তাঁরা প্রভুর নির্দেশ বলে দেন এবং তা আবার পর্যায়ক্রমে শ্রুত হয়ে সপ্ত আকাশ পেরিয়ে দুনিয়ার ফেরেশতাদের কাছে পৌঁছে যায়। 

অন্যত্র তিনি বলেনআমি তাহাজ্জুদের জন্যে জেগে উঠে ওজু সেরে আল্লাহ যতখানি তাওফিক দিলেন নামায পড়লাম। নামাযের ভেতরেই তন্দ্রা এল এবং ঘুমিয়ে পড়লাম। যখন গভীর নিদ্রায় নিমগ্ন হলামদেখতে পেলামআল্লাহ তা'আলা অত্যন্ত পবিত্র রূপে জ্যোতির্ময় হয়েছেন। তিনি বলছেনহে হাবীব (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ! আমি জবাব দিলামহে আমার প্রতিপালক ! আমি উপস্থিত রয়েছি। তিনি প্রশ্ন করলেনসর্বোচ্চ পরিষদের ফেরেশতারা কোন সম্পর্কে আলোচনা করছেআরজ করলামআমার তো জানা নেই। তিনি একে একে তিনবার একই প্রশ্ন করলেন এবং আমিও একই উত্তর দিলাম। 

**** [এখানে একটি কথা উল্লেখ করাটা জরুরী যে, যদি রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) সর্বোচ্ছ পরিষদের ফেরেশতাদের খবর না জানতেন আল্লাহ্ তা'আলা প্রশ্নইবা কেন করলেন? হয়ত মনে প্রশ্ন জাগতে পারে তাহলে তিনি (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) জানা নেই কেন বললেন? তার জবাবে বলতে পারি সেটা হল আদব রক্ষা করা। উদাহরণ স্বরুপ বলতে পারি, বিদায় হজ্জের খুতবা দেয়াকালে রসূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) সাহাবীয়েকেরামের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, আজকের এই দিন কোন দিন? সকলে সমস্বরে আরজ করলেন আপনিই ভাল জানেন ইয়া রসূলুল্লাহ্ ! তাহলে জিজ্ঞাসই বা কেন করা হল? তাছারা সাহাবীদের কি জানা ছিলনা সেই দিন আরাফার দিন? জানা না থাকলে আরাফার ময়দানে কেন সমবেত হলেন সবাই? এখানে এটাই হল শিক্ষনীয় আদব। বেয়াদবেরা তার উল্টাটা বুঝবে। তারা বুঝবে জানা থাকলেতো বলে দিতেন।]**** 

***উপরের তারকার ফাকে লাইন কয়টি বইয়ের লিখা নয়, আমার নিজের মতামত প্রকাশ করলাম মাত্র। যারা একমত নহেন তারা এড়িয়ে যান।***

তারপর মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বললেনআমি দেখলামতিনি আমার কাঁধের ওপর হাত রাখলেন এবং আমি তাঁর আঙ্গুলের অগ্রভাগের শীতলতা অন্তর দিয়ে অনুভভ করলাম। তারপর সে কথাগুলো আমার কাছে সুস্পষ্ট হল। তাঁর প্রশ্নের জবাবও আমার জানা হয়ে গেল। অতঃপর আল্লাহ পাক সম্বোধন করলেনহে হাবীব ! আমি জবাব দিলামহে আমার প্রভু ! আমি হাজির আছি। তখন তিনি প্রশ্ন করলেনহে হাবীবউচ্চতম পরিষদ কোন ব্যাপারে আলোচনা করছেআরজ করলামজামাতের (নামাযের) জন্য পথ চলানামজের পর (ইবাদতের জন্য) মসজিদে বসে থাকা এবং কষ্টের ভেতরেও পুরোপুরি ওজু করা।

তিনি আবার প্রশ্ন করলেনএ ছাড়া আর কি আলোচনা করছে তারাআরজ করলামমর্যাদার বিভিন্ন স্তর সম্পর্কে। প্রশ্ন করলেনসেগুলো কিআরজ করলামমিসকীন খাওয়ানোসবিনয়ে কথা বলা এবং সবার ঘুমের সময়ে ইবাদত করা (তাহাজুজদ পড়া)।

অন্য এক জায়গায় তিনি (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, "আল্লাহ যখন কোন বান্দাকে ভালবাসেন এবং বন্ধুরূপে গ্রহণ করেনতখন জিব্রাঈলকে ডেকে বলেনআমি অমুককে ভালবাসিতুমিও তাকে ভালবাস"। সেমতে জিব্রাঈল তাকে ভালবাসেন। তারপর আকাশমণ্ডলীতে ঘোষণা করে দেয়া হবেঅমুক ব্যক্তি আল্লাহর বন্ধুতাকে সবাই ভালবাস। তাই আকাশের সবাই তাকে ভালবাসবেন। এভাবে তাকে পৃথিবীতেও জনপ্রিয় করা হয়। অর্থাৎ সবার অন্তরে তার ভালবাসা জন্ম নেয়। তেমনি আল্লাহ যখন কাউকে খারাপ ঘৃণা করতে থাকেন। সেমতে জিব্রাঈল তাকে ঘৃণা করবেন। তারপর আকাশ-মণ্ডলীর সবাইকে জানিয়ে দেয়া হবেঅমুক ব্যক্তিকে আল্লাহ পাক ঘৃণা করেনতোমরাও তাকে ঘৃণা কর। তা শুনে সেখানে সবাই তাকে ঘৃণা করবে। অবশেষে সেই ঘৃণা পৃথিবীতেও দেখা দেবে। 

মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) অন্যত্র বলেনকেউ যদি নামাযের পর মসজিদে বসে থাকেতাকে ফেরেশতারা ততক্ষণ দোয়া করেন যতক্ষণ না সে তাদের র্কষ্ট দেয় এবং অপবিত্র হয়। তাঁরা এ দোয়া করেনহে আমার প্রভু! তাকে ক্ষমা কর। হে আমার প্রভু! তাকে দয়ার দৃষ্টিতে দেখ। 

তিনি (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আরও বলেনপ্রতি ফজরে দুজন ফেরেশতা নেমে আসেন। একজন বলেনহে আমার প্রভু! দাতা ও (উদার হস্তে) খরচকারীকে তুমি প্রতিদানে আরও বাড়িয়ে দাও। দ্বিতীয় ফেরেশতা বলেনহে আমার প্রভুবখিলকে বাড়িয়ে দিও না এবং তার সম্পদ ধ্বংস কর"। 

উল্লেখ্য যেশরীয়ত থেকে এ কথা প্রমাণিত হয়েছেআল্লাহ পাকের কিছু উত্তম বান্দা রয়েছেন। তাঁরা হলেন উচ্চ মর্যাদার আল্লাহ নৈকট্যপ্রাপ্ত ফেরেশতা। যে ব্যক্তি নিজকে পুণ্যবান রূপে গড়ে তোলেন এবং নিজকে সম্পূর্ণ নির্দোষ রেখে পূত চরিত্রের অধিকারী হনএবং মানব সমাজের সংস্কার ও কল্যাণ সাধনে ব্রতী হনসেই ফেরেশতারা তার জন্য সর্বদা দোয়া করতে থাকেন। ফলে তার ওপর রহমত ও বরকত নাযিল হয়। এ ফেরেশতারা আল্লাহর নাফরমান ও ফেতনা সৃষ্টিকারী বান্দাদের ওপর বদ-দোয়া ও অভিসম্পাত দিতে থাকেন। তাদের এ বদ-দোয়া ও অভিসম্পাতের কারণে পরিণামে নাফরমানদের অনুতপ্ত হতে হয়। আর সে কারণেই নিম্নতর আকাশের ও পৃথিবীর বাসিন্দাদের অন্তরে তাদের প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি হয়। খারাপ ব্যবহার করার জন্য ইলহামেও জানানো হয়। তার ফলে পৃথিবীতেও তারা দুর্ব্যবহার পায়নশ্বর দেহ থেকে আত্মা ও বিচ্ছিন্ন হবার পরেও পায়। 

এ ফেরেশতারা আল্লাহ ও তাঁর বান্দাদের ভেতর দূত হিসেবে কাজ করেন। তাঁরা বনি আদমের অন্তরে ভাল কথা জাগিয়ে দেন। তাঁরা যে কোন ভাবে অন্তরের ভাল ভাবগুলো জাগ্রত রাখার ব্যবস্থা করেন। আল্লাহ পাক যেভাবে তাঁদের যেখানে চান সমবেত করে মজলিস বসান। তাঁদের এ মর্যাদা ও অবস্থার জন্য পৃথক পৃথক নামে তাঁদের ডাকেন। কখনও রফীকুল আলা’ (উঁচুস্তরের বন্ধু)কখনও নুদীউল আলা’ (ঊর্ধ্বতম মজলিস) ও কখনও মালা-ই-আলা (উচ্চতম পরিষদ) বলে আখ্যায়িত করেন। পুণ্যবান ও নৈকট্য লাভকারী লোকদের আত্মাও তাদের ভেতর শামিল হয়। আল্লাহ পাক বলেন, 'হে নিশ্চিন্ত আত্মাসমূহ! সানন্দে তোমাদের প্রভুর কাছে চলে এস ও আমার বান্দাদের সাথে গিয়ে মিলিত হও এবং আমার জান্নাতে এসে বাস কর। (সূরা ফাজরঃ আয়াত ২৮-৩০) 

রাসূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেনআমি জাফর ইবনে আবু তালিবকে ফেরেশতা রূপে জান্নাতে অন্যান্য ফেরেশতারা সাথে পাখায় ভর করে উড়তে দেখেছি। 

আল্লাহর সব বিধি-বিধান ও সিদ্ধান্ত প্রথমে মালা-ই-আলায় অবতীর্ণ হয়। দুনিয়ার যে সব কাজ তাৎপর্যময় ও কল্যাণধর্মী তা এই মুবারক রাতে নির্ধারিত হয়” আল্লাহর এ বাণী সংশ্লিষ্ট ব্যাপারগুলো উচ্চতম পরিষদে নির্ধারিত হয়ে থাকে। কোন না কোন ভাবে শরা-শরীয়ত এখানেই স্থিরিকৃত হয়। 

স্মরণ রাখা প্রয়োজনউচ্চতম পরিষদে তিন শ্রেণীর সদস্য রয়েছেন। প্রথম শ্রেণীর দায়িত্বে রয়েছে আল্লাহর মংগলময় ব্যবস্থাবলী। মুসা (আঃ)-কে পথ প্রদর্শনের জন্য যে নূর দ্বারা আল্লাহ আগুন সৃষ্টি করেছিলেনতা থেকেই এ শ্রেণীর ফেরেশতাদের তৈরী করে তাতে পবিত্র আত্মাগুলোর সংযোগ ঘটানো হয়েছে। 

দ্বিতীয় শ্রেণীর জন্ম হয়েছে মৌল উপাদানগুলোর সংঘাতসৃষ্ট সূক্ষ্মতম ও পরম হাল্কা এক বিশেষ তাপ ও দ্যুতি থেকে। তারপর তাকে এমন উঁচু পর্যায়ের আত্মার সংযোগ ঘটানো হয়েছে যা জীব জগতের পংকিল প্রাণ প্রবাহ থেকে স্পষ্টত স্বতন্ত্র হয়ে ধরা দেয়। 

তৃতীয় শ্রেণীর সদস্য হলেন আল্লাহর নৈকট্য লাভকারী মানবাত্মারা। তাঁরা জীবিতাবস্থায় পুণ্যব্রতের দ্বারা মালা-ই-আলার মর্যাদা পান। অবশেষে তাঁদের আত্মা থেকে দেহরূপ আবরণটুকু খসে পড়লে তাঁরা সেখানে গিয়ে শামিল হন। তখন থেকে তাঁরা মালা-ই-আলার সদস্যরূপে গণ্য হন। 

মালা-ই-আলার আসল কাজ হল প্রতিনিয়ত নিজ প্রভুর দিকে নিবিষ্ট থাকা এবং অন্য কোন ব্যস্ততাকে সেই পথে অন্তরায় হতে না দেয়া। আল্লাহ তা;আলা যে বলেছে ন, “মালা-ই-আলা” সতত আল্লাহর স্তুতি গেয়ে ফিরে ও তাঁর পবিত্রতা বর্ণনায় মুখর থাকে এবং তাঁর ওপর সুদৃঢ় ঈমান রাখে” তার তাৎপর্য এটাই। তা ছাড়া তাঁদের অন্তরকে আল্লাহ খোদায়ী জীবন ব্যবস্থা পছন্দের ও গ্রহণের জন্য প্রস্তুত রাখেন। তেমনি তাঁরা আল্লাহ বিরোধী অন্যায় জীবন ব্যবস্থাকে খারাপ জানেন ও ঘৃণা করেন। তারা ঈমানদারের পাপের জন্য ক্ষমা চাইতে থাকেন?” আল্লাহর এ বাণীর তাৎপর্য এটাই, যা নিচে বর্ণিত হল।

উচ্চতম পরিষদের সর্বোচ্চ মর্যাদার ফেরেশতারা সেই পূণ্যত্মার চার পাশে নূরের সমাবেশ ঘটান ও তাদের সাথে মেলামেশা করেন। তারপর এরা সবাই মিলে একাত্ম হয়ে যান এবং নাম পান হাজিরাতুর কুদুস’ বা পবিত্র পার্লামেন্ট। 

এ পবিত্র পার্লামেন্টে এরুপ পরামর্শ করা হয় যেবনি আদমের পার্থিব ও অপার্থিব কার্যাবলীর ব্যবস্থাপনার জন্য এবং তাদের সমস্যাবলী দূর করার জন্য কোন এক ব্যক্তিকে পূর্ণত্ব দেয়া ও তার নির্দেশ অন্য সবার ভেতরে প্রতিপাল্য করা প্রয়োজন। সে ব্যক্তিটি হবেন সেই যুগের উত্তম ব্যক্তি। এ পরামর্শ অনুসারেই যোগ্য লোকদের অন্তরে এ ইলহাম (কথা) ঢেলে দেয়া হয় যেসেই ব্যক্তির অনুগত হয়ে তারা এমন এক জাতিতে পরিণত হবে যারা গোটা বনি আদমের সেবায় আত্মনিয়োগের যোগ্যতা অর্জন করবে। এ পরামর্শের প্রেক্ষিতেই এমন বিদ্যার চর্চা বেড়ে যায় ও দীক্ষা চলতে থাকে যা থেকে জাতি সংশোধিত হয় এবং পথের দিশা পায়। 

উক্ত ইলহাম কখনও ওহী হয়ে আসেকখনও স্বপ্নে দেখতে পায়কখনও গায়ব আওয়াজ শোনেকখনও বা হাজিরাতুল কুদুসের প্রতিনিধি সেই ব্যক্তিটির (নবীর) সাথে দেখা করে সরাসরি বলে দেয়। এ কারণেই সেই ব্যক্তিত্বের সহচর ও অনুচররা তাঁকে সাহায্য করতে প্রস্তুত থাকে। ফলে তাঁর সাফল্য ও মংগলের উপকরণ ও সম্ভাবনা বেড়ে যায়। তাঁর দুশমন ও আল্লাহর পথে প্রতিবন্ধক সৃষ্টিকারীর ওপর অভিসম্পাত বর্ষিত হয় এবং সেটা তাদের ব্যর্থতা ও দুঃখ-দুর্দশার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মোট কথানবুয়তের অন্যায় মূলনীতির এটা অন্যতম। এ ফেরেশতাদের এরূপ স্বতন্ত্র ও স্থায়ী সিদ্ধান্তকে বলা হয় তাঈদে রূহুল কুদুস’ বা পব্রি পার্লামেন্টের সহায়তাএটা যাঁরা লাভ করেন তাঁরা নানারূপ অলৌকিক কাজ করেন ও মানুষের অসাধ্য কার্যাবলী সাধন করে থাকেন। এটাকেই বরে 'মুজিযা'। 

এ দ্বিবিধ মালা-ই-আলার এক স্তর নীচে কিছু সংখ্যক ব্যক্তি রয়েছেন। তারা উচ্চতম মর্যাদার অধিকারী না হলেও তাদের প্রের্রণার সূক্ষ্ম ও হাল্কা তাপে সবার ভেতর এক সরল প্রকৃতি জন্ম নেয়। এ সরল প্রকৃতির সৃষ্টিরা শুধু প্রেরণা ও নির্দেশনা লাভের অপেক্ষায় থাকে। তারই প্রভাব স্রষ্টার যোগ্যতা ও প্রভাব গ্রহণের ক্ষমতার ভেতরে যখন সমতা স্থাপিত হয়তখন তারা নিজ অস্তিত্ব ভুলে জান-মাল বাজী রেখে প্রভাবিত কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ে। পশু-পাখী নিজের প্রাকৃতিক প্রয়োজনে যেভাবে ছুটে যায়তেমনি ছুটে যায় তারা ওপর ওয়ালার ইংগিতে। 

সুতরাং তাঁদের কাজই হচ্ছে মানুষ ও জীবজন্তুর ভেতর প্রভাব সৃষ্টি করা। সে সবের ধ্যান-ধারনা ও ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষাকে তাঁরা নিজেদের অভিপ্রায় অনুসারে পরিচালিত করেন। যদি কোন পাথর নড়ে কিংবা চঞ্চল হয়কোন বুজুর্গ ফেরেশতা সেটাকে চঞ্চল ও গতিশীল করেন। তেমনি কোন শিকারী যখন নদীতে জাল ফেলেনতখন একদল ফেরেশতা কোন কোন মাছের ভেতর জালে ফেঁসে যাবার ইচ্ছা সৃষ্টি করেন এবং কোন মাছকে ভেগে যাবার ভাবনা দান করেন। সেমতে কোন ফেরেশতা রশি টেনে ধরে এবং কোন ফেরেশতা রশি ঢিল দেয়। মাছগুলোও জানে না তাদেরকে কি করছে ও কেন করছে। তাদের মনে যা ইলহাম হয় তা-ই তারা করে যায়। তেমনি দুদল সৈন্য যখন লড়াইয়ে লিপ্ত হয়তখন ফেরেশতারা এসে এক দলের প্রাণে সাহস ও অস্ত্র চালনার শক্তি যোগান এবং অন্য দলের প্রাণে দুর্বলতা ও হাতে শিথিলতা এনে দেন। তাদের উদ্দেশ্য থাকে যার কর্মে যে পরিণতি রয়েছে সেটাকে বাস্তবায়িত করে দেয়া। কখনও তাঁদের ওপর নির্দেশ আসে মানুষকে সুখ-শান্তি কিংবা দুঃখ-দুর্দশা পৌঁছে দেয়ার। তখন তারা সে কাজে আত্মনিয়োগ করে। 

এ ফেরেশতাদের বিপরীত দিকে এমন একটি দল রয়েছে যাদের ভেতর রয়েছে খেলো প্রকৃতির রাগ ও পাপ প্রবণতা। তারা উত্তপ্ত আঁধার থেকে জন্ম নেয়। তাদের বলা হয় শয়তান। এ শয়তানরাই ফেরেশতাদের প্রয়াস ব্যর্থ করার জন্য পাল্টা প্রচেষ্টা চালিয়ে থাকে।

পরবর্তী পর্ব- (চতুর্থ পরিচ্ছেদ)

হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (২) আলম-ই-মিছাল বা (স্বরূপ জগত)



হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (পর্ব-২)
শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ্ মুহাদ্দেসী দেহলভী (রহঃ)

আলম-ই-মিছাল বা (স্বরূপ জগত) 
জানা প্রয়োজনঅনেক হাদীসই প্রমাণ করেছেএ রূপ জগতের পশ্চাতে এক স্বরূপ জগত রয়েছে। সেখানে মানুষের দোষ-গুণ ইত্যাদি নিজরূপে অস্তিত্ব ধারণ করে। বস্তু জগতে যতকিছু দেখা দেয় আগে তা সেই কর্ম জগতে রূপ পায়। এখানে যা পাই তা ঠিক ওখানের মতই। সাধারণের চোখে অনেক বস্তুর অস্তিত্ব ধরা দেয়না। সেগুলো সেখানে শরীরী হয়ে বিচরণ করে। মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেন, "আল্লাহ যখন মায়া-মমতা সৃষ্টি করলেনতখন সে দাঁড়িয়ে বলতে লাগলযে ব্যক্তি আত্মীয়তা বিচ্ছেদের ব্যাপারে তোমাকে ভয় করবে এবং তোমার আশ্রয় চাইবেসে আমার কাছে ঠাঁই পাবে"। তিনি আরও ইরশাদ করেন, "সূরা বাকারা ও সূরা আলে ইমরান কেয়ামতের দিন দুখণ্ড মেঘ বা দুটো ছাতা কিংবা দুঝাঁক পাখীর মত ছায়া হয়ে আসবে এবং তারা তাদের পাঠকদের পক্ষ হয়ে কথা বলবে"। তিনি এও বলেন, "কেয়ামতের দিন সব কৃতকর্ম হাজির হবে। প্রথমে আসবে নামাযতারপর সদকাতারপর রোজা ইত্যাদি"। অন্যত্র তিনি ইরশাদ করেন, "হাশরের মাঠে পাপ ও পুণ্য দেহ ধারণ করে দাঁড়িয়ে যাবে। পুণ্যবানকে সুসংবাদ শুনাবে পুণ্য এবং পাপ পাপীকে বলবেপালাওপালাও। কিন্তু পাপী তখন পালাবার পথ পাবেনা"। আর এক স্থানে তিনি ইরশাদ করেন, "কেয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা দুনিয়ার অন্যান্য দিনগুলো যথাযথভাবে উপস্থিত করবেন। কিন্তু জুমআর দিনটিকে অত্যন্ত শান-শওকতের সাথে হাজির করবেন"। অন্যত্র তিনি বরেন, "কেয়ামতের দিন পৃথিবীকে আল্লাহ নীল রংয়ের দাঁত একং কুৎসিত ও প্রশস্ত মুখবিশিষ্ট এক অতি বৃদ্ধারূপে দাঁড় করাবেন"। 

একবার তিনি (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, "হে মানবমণ্ডলী! আমি যা দেখছি তা কি তোমরা দেখতে পাচ্ছআমি তো তোমাদের ঘরে ঘরে বৃষ্টির মত ফেতনা-ফাসাদ বর্ষিত হতে দেখছি"। মিরাজ সম্পর্কিত হাদীসে তিনি বলেন, "হঠাৎ আমার সামনে চারটি প্রস্রবণ দেখা দিল। দুটি আত্মিক ও দুটি বাহ্যিক। আমি প্রশ্ন করলামহে জিব্রাঈল ! এ সব কিতিনি জবাব দিলেনআত্মিক দুটো জান্নাতের ও বাহ্যিক দুটো হল নীল ও ফোরাতের স্রোত"। সূর্য গ্রহণের হাদীস প্রসংগে তিনি বললেন, "আমাকে জান্নাত ও জাহান্নামের রূপ দেখানো হয়েছে"। অন্য বর্ণনা মতে তিনি বললেন, "কেবলাস্থিত দেয়াল ও আমার মাঝখানে বেহেশত ও দোযখ স্বরূপে দেখানো হলো"। এ হাদীসে এ কথাও বলা হয়েছেতিনি বেহেশতের ফলের একটি গুচ্ছ নেবার জন্য হাত বাড়ালেন। তাতে এও আছে, "তিনি দোযখের আগুনের তেজে উহ উহ করে পিছিয়ে এলেন এবং সে আগুনে হাজীদের জিনিসপত্রের চোরকে ও বিড়াল উপোসে মারার ঘঠনার সেই মহিলাকে দেখতে পেলেন। তেমনি জান্নাতে তিনি পিপাসার্ত কুকুরকে পানি পান করিয়ে বাঁচাবার গণিকাটিকে দেখতে পেলেন।" এটা সুস্পষ্ট যেমহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ও মসজিদের মেহরাবের মধ্যবর্তী সংকীর্ণ জায়গায় বেহেশত-দোযখের যে পরিধি সবার জানা রয়েছে তা বাহ্যত কিছুতেই ঠাঁই পেতে পারে না। অথচ অন্যত্র তিনি বলেছেনদেখলাম, ‘জান্নাত এত কণ্ঠকাকীর্ণ যে প্রবৃত্তির তা অসহ মনে হয়এবং জাহান্নাম এত কুসুমাস্তীর্ণ যেপ্রবৃত্তির তা খুবই পছন্দনীয়। তারপর জিব্রাঈল বললেননিনএখন দেখে নিন তাদের 

অন্যত্র তিনি (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেনযখন বিপদের অবতীর্ণ হয়তখন দোয়া তার সাথে লড়াই করে এবং ঠেকিয়ে রাখে। তিনি আরও বলেন, "আল্লাহ জ্ঞান সৃষ্টি করে বললেনকাছে এস। সে কাছে এল। তারপর বললেনচলে যাও। তখন সে চলে গেল।" 

একস্থানে তিনি (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, "এ পুস্তক দুটো আল্লাহর তরফ থেকে পাঠানো হল"। তিনি আরও বলেন, "মৃত্যুকে দুম্বারূপ দিয়ে বেহেশত ও দোযখের মাঝখানে জবাই করা হবে"। 

আল্লাহ তাআলা বলেন, "আমি মরিয়মের কাছে এক ফেরেশতা পাঠালামসে এক যুবকরূপে তার সামনে দেখা দিল"। হাদীসে প্রমাণ মিলেজিব্রাঈল যখন মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর কাছে আসতেনতিনি তাঁকে দেখতে পেতেন এবং তাঁর সাথে বলতেন। অথচ উপস্থিত অন্য সবাই দেখতে পেতেন না। এও প্রমাণিত হয়েছেমুমিনের কবর দৈর্ঘ্যে ও প্রস্থে সত্তর গজ প্রশস্ত হয়ে যায়। পক্ষান্তরে কাফেরের কবর সংকীর্ণ হতে হতে তার পাঁজরের হাড় এদিক থেকে ওদিকে নিয়ে যায়। হাদীসে এও রয়েছেকবরে ফেরেশতা এসে মৃতের কাছে জিজ্ঞাসাবাদ করে এবং তার কৃতকর্ম বিশেষ এক রূপ নিয়ে দেখা দেয়। এও আছেমরণ কালে যে ফেরেশতা প্রাণ বয়ে নিয়ে আসে তার হাতে হয় রেশমী বস্ত্রনয় তো চট থাকে। আরও আছেকবরে মৃত ব্যক্তিকে (যারা কাফের) ফেরেশতারা গুর্জ ও হাতুড়ি পেটা করবে। তখন তার চীৎকার জীন ও মানুষ ছাড়া চতুর্দিকে সবাই শুনতে পাবে । অন্যত্র আছেপ্রতিটি কাফেরের ওপর কবরে নিরানব্বইটি আজদাহা লেলিয়ে দেয়া হয়। কেয়ামত পর্যন্ত সেগুরো তাকে দংশন ও ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করতে থাকে। 

তিনি (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আরও বলেন, ‘মৃতকে (মুমিনকে) যখন কবরে রাখা হয়তখন তার মনে হয়সূর্য ডুবছে। তাই সে বসে চোখ ডলতে ডলতে ফেরেশতাদের বলেআমাকে ছেড়ে দাওতো নামাযটা পড়ে নিই। হাদীসে প্রমাণ মিলেকেয়ামতের দিন হাশরে উপনীতদের আল্লাহতায়ালা বিভিন্ন রূপে নিজ জ্যোতি প্রদর্শন করাবেন। এও আছে, ‘মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) যখন আল্লাহর সমীপে যাবেনতখন তিনি কুরসির ওপর উপবিষ্ট থাকবেন। আরও আছে, ‘আল্লাহ তা'আলা বনী-আদমের সাথে সামনা সামনি বলবেন। মোট কথা এ ধরনের অসংখ্য হাদীস রয়েছে। 

এ সব হাদীস যারা দেখবেতাদের তিনটি অবস্থার যে কোন একটি দেখা দেবেই। হয় কেউ এর প্রকাশ্য অর্থই গ্রহণ করবে। তাকে আমার বর্ণিত স্বরূপ জগতটি মেনে নিতে হবে। আহলে  হাদীসের রীতি এটাই। আল্লামা জালালুদ্দিন সুয়ুতী (রহঃ) বলেনআমি তো হাদীসের প্রকাশ্য অর্থ গ্রহণ করি এবং এটাই আমার মজহাব। 

কেউ হয়ত বলবেআসলে এসবের কোন কিছুই অস্তিত্ব নেবেনাশুধু খেয়ালী দৃষ্টিতেই তা পরিদৃষ্ট হবে। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রঃ) তিনি আল্লাহর "সেদিনের অপেক্ষা কর যেদিন আকাশ ধোঁয়াটে মনে হবে" এ বাণী ব্যাখ্যা প্রসংগে বলেনতাঁর সময়ে একবার দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল এবং তখন অনশনক্লিষ্ট দেহ নিয়ে ওপরে তাকালে গোটা আকাশ ধোঁয়াটে মনে হত। ইবনে মাজেফুন থেকে বর্ণিত আছেযে হাদীসেই কেয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা বান্দার দৃষ্টি এভাবে বদলে দেবেন যাতে করে তারা সেরূপ দেখতে পাবে। তারা দেখবে যেন তিনি এসে তাদের সাথে কথা বলছেন। অথচ না তিনি মূলত নিজ অবস্থান থেকে বিন্দুমাত্র নড়ছেননা কারো সাথে কথা বলছেন। বান্দার এ অবস্থা এজন্য ঘটানো হবে যেন তারা বুঝতে পায় আল্লাহ সব কিছুই করতে পারেন। 

কেউ হয়তবা বলবেএ সব হাদীসের অন্যরূপ তাৎপর্য রয়েছে। সে সব তাৎপর্যের জন্য এ সব রূপকের আশ্রয় নেয়া হয়েছে। আমার বক্তব্য হলএ তৃতীয় মতটি কোন সত্যানুসারীর নয়। 

ইমাম গাজ্জালী (রঃ) কবর আজাব সম্পর্কে বলতে দিয়ে এ তিনটি অবস্থা সম্পর্কেই ভালভাবে পর্যালোচনা করেছেন। তিনি বলেনঃ এ ধরনের হাদীসের বাহ্যিক অর্থ তো ঠিকতবে তার অন্তর্নিহিত রহস্য রয়েছে। অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্নদের কাছে তা সুস্পষ্ট হয়ে ধরা দেয়। যে ব্যক্তি এগুলোর রহস্য জানেনা এবং কোন কিছুর অন্তর্নিহিত তত্ত্ব যার কাছে ধরা দেয়নাতার অন্তত প্রকাশ্য অর্থগুলো অস্বীকার করা উচিত নয়। বরং সত্য বরে সেগুলো মেনে নেয়া উচিত। কারণএটা ঈমানের নূন্যতম দাবী 

কেউ যদি বলেআমি কাফেরের কবর উন্মুক্ত করে দেখেছি এবং বহুদিন ধরে তার লাশ পড়ে থাকতে দেখেছি। কিন্তু বর্ণিত অবস্থাগুলো কখনও পরিদৃষ্ট হয়নি। তাই চোখে দেখা ব্যাপারের বিপরীত কথাকে কি করে সত্য বলে মেনে নেব

তার জবাব হল এইএ ধরনের কথা মানতে গেলে মানুষের তিনটি অবস্থা দেখা দেয়।

(১) প্রথম অবস্থাটি সব চাইতে বিশুদ্ধসুস্পষ্ট ও সমর্থনযোগ্য। তা হল এইএসব কথা মূলত সত্য। নিঃসন্দেহে অজগর সাপ মৃত কাফেরকে দংশন করে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করছে। তবে এ পার্থিব চোখে আপনি সেই অপার্থিব ব্যাপারটি দেখতে পাবেন কেনপারলৌকিক সব ঘটনাই তো আত্মিক ও অপার্থিব। দেখুনজিব্রাঈলের (আঃ) অবতরণ সম্পর্কে সাহাবারা (রাঃ) কিরূপ আস্থা রাখতেন। অথচ তাঁরা তাঁকে দেখতে পেতেন না। তথাপি তাঁরা বিশ্বাস করতেন যেমহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) যথার্থই জীব্রাঈলকে (আঃ) দেখতে পেতেন। এক্ষণে আপনারা যদি মহানবীর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উনার হাদীসগুলো অবাস্তব বলে মনে করেন তো তাঁর কাছে ফেরেশতার আগমন ও ওহী অবতীর্ণ হবার কথা কি করে বিশ্বাস করবেন

সুতরাং প্রথমে আপনাদের ঈমানের নবায়ন ও সংস্কার প্রয়োজন। যদি আপনি এ ঈমান রাখেন যেকিছু ব্যাপার মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) দেখতেনকিন্তু উম্মতরা দেখার ক্ষমতা রাখেনাতাহলে মৃতের ব্যাপারে যা যা বলা হল তা মানতে দ্বিধা আসবে কেনফেরেশতা যেরূপ মানুষ ও জীব-জন্তুর মত ননতেমনি মৃতকে দংশন করার অজগর ও বিচ্ছু পার্থিব অজগর ও বিচ্ছুর মত নয়। বরং সেই অপার্থিব অজগর অন্য কিছুর তৈরী সাপ। তাইতা দেখতে অন্য ধরনের দৃষ্টি ও অনুভব শক্তি থাকা চাই। 

(২) দ্বিতীয় অবস্থার মানুষেরা বলেনআপনারা নিদ্রিত ব্যক্তির স্বপ্নে সাপে কাটার কথা মনে করুন। স্বপ্নে সে দংশন জ্বালায় তীব্রতাও অনুভব করে। সে জাগ্রতের মতই দংশন জ্বালায় চীৎকার করে উঠে ও ঘর্মাক্ত হয়। কখনও সে শয়নস্থল থেকে লাফিয়ে ওঠে। এ সবই সে ব্যক্তি দেখে ও অনুভব করে। কিন্তু বাহ্যত আপনি নিদ্রিতকে চুপচাপ পড়ে থাকতে দেখছেন। না তার কাছে সাপ দেখছেননা ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন দেহ। অথচ স্বপ্নদ্রষ্টা তো সাপ-বিচ্ছু যেমন দেখছেতেমনি তার দংশন জ্বালাও অনুভব করছে।
আপনাদের দৃষ্টিকোণ থেকে এসব হল দৃষ্টি অগোচর ব্যাপার। তথাপি স্বপ্নের সাপের দংশন জ্বালা স্বপ্নমগ্নের জন্য যখন জাগ্রত সাপের দংশন জ্বালার মতই কষ্টদায়কতখন এ দুসাপের ভেতর তারতম্য কোথায়
(৩) তৃতীয় অবস্থাটা এইআপনারা ভালভাবেই জানেনসাপ স্বয়ং দুঃখ-কষ্ট নয়দুঃখ-কষ্ট রয়েছে তার বিষে। এমনকি বিষও দুঃখ-কষ্ট নয়দুঃখ-কষ্ট তার প্রভাবজাত জ্বালায়। এখন যদি বাস্তব বিষ ছাড়া অন্য কিছু থেকেও সেই জ্বালা অনুভূত হয়তাও তার থেকে আদৌ কম দুঃখদায়ক শাস্তি নয়। তবে সেই শাস্তির দুঃখকে সাধারণের উপলব্ধির উপযোগী করতে হলে বাস্তব কারণের উল্লেখ সম্ভব নয়। যেমন যৌন সুখ যদি কাউকে নারীর স্পর্শ ছাড়া উপলব্ধি করাতে হয় তা হরে নর-নারীর যৌন মিলনের উল্লেখ ছাড়া বুঝানো সম্ভব হয় না। এটা কার্যকারণ বুঝবার জন্য প্রয়োজন। যেন কারণ থেকে অনিবার্য কার্যের উপলব্ধি ঘটে। কার্যত যদিও কারণ অনুপস্থিততথাপি তার বর্ণনার মাদ্যমে তাহা জ্ঞাত করানোই উদ্দেশ্য। লক্ষ্যবস্তু কারণ নয়কার্য। 
বলা বাহুল্যমানুষের এ জীবনের কু-অভ্যাসগুলোই মৃত্যুকালে তাকে দুঃখ-কষ্ট দেবার জন্য মওজুদ থাকে। সেগুলোর অনুশোচনা তাকে সাপের মতই দংশন করতে থাকে। যদিও তার অন্তরে সাপ উপস্থিত থাকে না।

পরবর্তী পর্ব- (তৃতীয় পরিচ্ছেদ)
মালা-ই-আলা  (সর্বোচ্চ পরিষদ) 

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...