বৃহস্পতিবার, ২৫ মে, ২০২৩

যুহদ তথা সংসার অনাসক্তি - ২



যুহদের ফযীলত -

আল্লাহ তা'আলা এরশাদ করেন- 

>“কারূন তার সম্প্রদায়ের সামনে জাঁকজমক সহকারে উপস্থিত হল। যারা পার্থিব জীবন কামনা করত, তারা বলল আহা, কারূনকে যা দেয়া হয়েছে, তা যদি আমাদেরকেও দেয়া হত ! প্রকৃতই সে মহাভাগ্যবান। আর যাদেরকে জ্ঞান দেয়া হয়েছিল, তারা বলল : ধিক তোমাদেরকে, যে ঈমানদার, তার জন্যে আল্লাহ প্রদত্ত সওয়াবই শ্রেষ্ঠ”।

এ আয়াতে যুহদকে আলেমদের সাথে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। এটা যুহদের চূড়ান্ত প্রশংসা। আরও বলা হয়েছে— 

>“সবর করার কারণে তারা তাদের পুরস্কার দু’বার পাবে”।

তাফসীরকারগণ বলেন : যারা দুনিয়াতে যুহদ করতে গিয়ে সবর করেছে, আয়াতে তাদেরকে বুঝানো হয়েছে। আল্লাহ আরও বলেন–

>“যে ব্যক্তি আখেরাতের ফসল কামনা করে, আমি তার ফসল বাড়িয়ে দেই৷ আর যে দুনিয়ার ফসল চায়, তাকেও দুনিয়ার কিছু অংশ দেই এবং সে আখেরাতে কিছুই পাবে না”।

আরও বলা হয়েছে-

>“আমি কাফেরদের কতককে পরীক্ষা করার জন্যে পার্থিব যে চাকচিক্য ভোগ করতে দিয়েছি, সেদিকে আপনি কখনও লক্ষ্য করবেন না। আপনার পালনকর্তার রিযক শ্রেষ্ঠ ও দীর্ঘস্থায়ী”।

অন্য আয়াতে আছে  - 

>“তারা অখেরাতের বিপরীতে পার্থিব জীবনকে পছন্দ করে৷ এটা কাফেরদের বিশেষণ”।

এ থেকে জানা যায়, মুমিন সেই, যে এর বিপরীত বিশেষণে বিশেষিত হয়। অর্থাৎ, আখেরাতকে পছন্দ করে। 


রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেন : 

>“যে ব্যক্তি দুনিয়ার কর্ম নিয়েই ব্যস্ত থাকে, আল্লাহ তা'আলা তার কাজ বিশৃঙ্খল ও রূযী অনিশ্চিত করে দেন। সে দারিদ্র্যের সম্মুখীন হয়। তার দুনিয়া ততটুকু অর্জিত হয়, যতটুকু লিখিত আছে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি কেবল আখেরাতের চিন্তা করে, আল্লাহ তা'আলা তার প্রচেষ্টাকে সংহত এবং জীবিকাকে সুরক্ষিত রাখেন। তার অন্তর ধনী হয়ে যায় এবং দুনিয়া লাঞ্ছিত হয়ে তার কাছে ধরা দেয়”।

এক হাদীসে আছে, 

>“যখন তোমরা কাউকে চুপ থাকতে ও দুনিয়াতে যুহদ করতে দেখ, তখন তার নিকটবর্তী হওয়ার চেষ্টা কর। কেননা, তাকে প্রজ্ঞা শিখানো হয়”।

আল্লাহ বলেন  : 

>“যে প্রজ্ঞাপ্রাপ্ত হয়, সে অশেষ কল্যাণপ্রাপ্ত হয়”।

অন্য এক হাদীসে এরশাদ হয়েছে : 

>“যদি তুমি আল্লাহর মহব্বত চাও, তবে দুনিয়াতে যুহদ অবলম্বন কর”।  এতে যুহদকে মহব্বতের কারণ বলা হয়েছে। 


আহলে বায়ত থেকে বর্ণিত এক হাদীসে বলা হয়েছে :

>”যুহদ ও পরহেযগারী মানুষের অন্তরসমূহে ঘুরাফেরা করে। যদি ঈমান ও লজ্জাশীল কোন অন্তর পায়, তবে সেখানে থেকে যায়। অন্যথায় চলে যায়।

হযরত হারেসা (রাঃ) একবার রসূলূল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-উনার খেদমতে আরয করলেন আমি নিশ্চিতই ঈমানদার।

তিনি বললেন তোমার ঈমানের  স্বরূপ কি? 

হারেসা (রাঃ) আরয করলেন : আমি নিজেকে দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছি। দুনিয়ার পাথর ও সোনা আমার কাছে সমান। আমি যেন জান্নাত ও দোযখের মধ্যস্থলে আমার রবের আরশের কাছে দাঁড়িয়ে আছি। রসূলূল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বললেন : তুমি ঠিকই  চিনেছ! এখন এর উপর কায়েম থেকো। অতঃপর তিনি বললেন :  “আল্লাহ তাঁর এই বান্দার অন্তর ঈমানের আলোকে আলোকিত করেছেন”।

এখানে লক্ষণীয় যে, হযরত হারেসা (রাঃ) ঈমানের স্বরূপ যুহদের মাধ্যমে ব্যক্ত করেছেন।


এক আয়াতে অছে,  

>“আল্লাহ যাকে পথ প্রদর্শন করতে চান, তার অন্তর ইসলামের জন্যে উন্মোচিত করে দেন”।

এই অন্তর উন্মোচনের অর্থ সম্পর্কে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বললেন যখন নূর প্রবেশ করে, তখন তার জন্যে বক্ষ খুলে যায়। সাহাবায়ে কেরাম আরয করলেন এর কোন লক্ষণ আছে কি? তিনি বললেন  : হাঁ, এর লক্ষণ হচ্ছে ধ্বংসশীল দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা, আখেরাতের দিকে প্রত্যাবর্তন করা এবং মৃত্যুর পূর্বে তার প্রস্তুতি নেয়া । এখানে যুহদকে ইসলামের লক্ষণ সাব্যস্ত করা হয়েছে।


এক হাদীসে বলা হয়েছে- 

>“তোমরা আল্লাহর কাছে যথার্থ লজ্জা কর”। 

সাহাবীগণ আরয করলেন “আমরা তো আল্লাহর কাছে লজ্জা করি”। 

তিনি বললেন  : “না, কর না। কারণ, তোমরা এমন ঘর নির্মাণ কর, যাতে বসবাস কর না এবং এমন সামগ্রী সঞ্চয় কর, যা ভোগ কর না”। এই হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, এই উভয় বিষয় আল্লাহর প্রতি লজ্জাবোধ করার পরিপন্থী।


একবার এক স্থান থেকে একটি প্রতিনিধি দল রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর খেদমতে উপস্থিত হয়ে আরয করল আমরা মুমিন। তিনি বললেন  : তোমাদের মুমিন হওয়ার পরিচয় কি? তারা বলল “বিপদে সবর করা, সুখ-সাচ্ছন্দ্যে শোকর করা, আল্লাহর নির্দেশে সন্তুষ্ট থাকা এবং শত্রুর উপর বিপদ এলে আনন্দিত না হওয়া”।

রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করলেন যদি তোমরা এমনি হও, তবে যা খাওয়ার নয়, তা সঞ্চয় করবে না, যে ঘর বসবাস করার নয়, তা নির্মাণ করবে না এবং যে বস্তু ত্যাগ কর, তার আগ্রহ করবে না । এই হাদীসে যুদহকে ঈমানের পরিশিষ্ট বলা হয়েছে। 

হযরত জাবের (রাঃ) বলেন : 

রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) খোতবায় এরশাদ করলেন  : 

>“যে ব্যক্তি ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলবে এবং এর সাথে অন্য কিছু মিশ্রিত করবে না, তার জন্যে জান্নাত ওয়াজিব”।

হযরত আলী (রাঃ) দাঁড়িয়ে আরয করলেন : ইয়া রসূলাল্লাহ! অন্য কিছু মিশ্রিত না করার মানে কি? এর ব্যাখ্যা করে দিন। 

তিনি বললেন : “এর অর্থ হচ্ছে দুনিয়াকে প্রিয় মনে করা”। 


কিছু লোক রসূলগণের মত কথাবার্তা বলে, কিন্তু কাজ যালেম শাসকবর্গের মত। অতএব, যার মধ্যে এসব বিষয়ের কোন কিছু নেই, তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব। 


হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন : একবার রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর ক্ষুধার অবস্থা দেখে আমি কান্না সামলাতে পারিনি।

আরয করলাম, ইয়া রসূলাল্লাহ ! “আপনি আল্লাহ তা'আলার কাছে খাদ্য প্রার্থনা করেন না কেন”?

তিনি বললেন : “হে আয়েশা, সেই সত্তার কসম, যার কবযায় আমার প্রাণ, যদি আমি আমার পরওয়ারদেগারের কাছে স্বর্ণের পাহাড় প্রার্থনা করতাম, তবে আল্লাহ আমার ইচ্ছামত স্বর্ণের পাহাড় বশীভূত করে দিতেন এবং সে (পাহাড়) আমার সাথে সাথে চলত। কিন্তু আমি দুনিয়ার ক্ষুধাকে তৃপ্তির উপর, দারিদ্র্যকে ধনাঢ্যতার উপর এবং দুঃখকে খুশীর উপর অবলম্বন করে নিয়েছি। হে আয়েশা ! দুনিয়া মোহাম্মদ ও তার পরিবারবর্গের জন্যে উপযুক্ত নয়। আয়েশা! আল্লাহ তা'আলা বড় বড় পয়গম্বরগণের জন্যে যা পছন্দ করেছেন, আমার জন্যেও তাই পছন্দ করেছেন। যে আদেশ তাদেরকে দিয়েছেন, আমার জন্যে তাই মনোনীত করেছেন”।


কোরআন পাকে আল্লাহ তা’আলা বলেছেন :  “অন্যান্য পয়গম্বরগণ যেমন সবর করেছেন, আপনিও তেমনি সবর করুন”।

আল্লাহর কসম, আমি তাঁর আনুগত্য থেকে পালাতে পারি না। তাদের মত আমিও যথাসাধ্য সবর করব। আল্লাহর তাওফীক ছাড়া সবর করার শক্তিও নেই। 


হযরত উমর (রঃ)-এর খেলাফতকালে যখন অনেক দেশ বিজিত হল, তখন তাঁর কন্যা উম্মুল মুমিনীন হযরত হাফসা (রাঃ) পিতার খেদমতে আরয করলেন  : যখন দূর-দূরান্ত থেকে প্রতিনিধিদল আপনার কাছে আসে তখন আপনি মিহিন বস্ত্র পরিধান করুন এবং আপনি নিজেও খান এবং অপরকেও খেতে দিন। হযরত উমর (রঃ) বললেনঃ হে হাফসা, তোমার তো জানা আছে যে, স্বামীর অবস্থা তার পত্নীই অধিক জানে। হযরত হাফসা বললেন : হাঁ, অবশ্যই। তিনি বললেনঃ তোমাকে কসম দিয়ে জিজ্ঞেস করছি— তুমি কি জান না যে, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) তিনি এত বছর নবী রইলেন কিন্তু তিনি ও তাঁর পরিবারবর্গ কখনও দিনের খাদ্য তৃপ্ত হয়ে খেতে পারেননি। তারা দিনে খেলে রাতে অভুক্ত থাকতেন এবং রাতে খেলে দিনে অভুক্ত থাকতেন। 

তুমি জান, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) এত বছর পয়গম্বর ছিলেন, কিন্তু খয়বর বিজিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি ও তাঁর পরিবারবর্গ পেট ভরে খোরমাও খেতে পারেননি। তুমি জান, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) একটি কম্বল দু’ভাজ করে তার উপর শয়ন করতেন। এক রাত্রিতে কেউ সেটাকে চার ভাঁজ করে দিল। তিনি তার উপর খুব সুখে নিদ্রা গেলেন। অতঃপর জেগে এরশাদ করলেন  : তোমরা আমাকে রাত্রি জাগরণে বাধা দিয়েছ। এখন থেকে কম্বলকে আগের মত দু'ভাজ করে বিছাবে। 

হযরত উমর (রঃ) বললেনঃ হে হাফসা ! তুমি আরও জান, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) পরার কাপড় ধোয়ার জন্যে খুলতেন এবং ধুয়ে রৌদ্রে দিতেন। ইতিমধ্যে বেলাল (রঃ) এসে নামাযের কথা জানাত। নামাযে যাওয়ার জন্যে উনার কাছে অন্য কাপড় থাকত না। তাই সে কাপড় শুকালেই তিনি নামাযে যেতেন। তুমি জান, বনী কুফরের জনৈকা মহিলা রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উনার জন্যে দুটি চাদর, একটি লুঙ্গি ও একটি উত্তরীয় তৈরি করেছিল এবং এগুলোর মধ্যে প্রথমে একটি চাদর পাঠিয়ে দিয়েছিল। কারণ, অন্যগুলো তখনও তৈরি হয়নি। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এই একটি মাত্র চাদরই গায়ে জড়িয়ে নামাযে বের হলেন। চাদরের দুই প্রান্ত ঘাড়ের কাছে বেঁধে নিয়েছিলেন। কারণ, তখন তাঁর দেহে অন্য কোন কাপড় ছিল না। এভাবেই তিনি নামায পড়লেন। মোটকথা, হযরত উমর কন্যার কাছে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর যুহদের অবস্থা এত বেশী বর্ণনা করলেন যে, হযরত হাফসা কাঁদতে লাগলেন এবং তিনিও সজোরে হু হু করে কেঁদে উঠলেন। মনে হচ্ছিল যেন এখনই তাঁর প্রাণবায়ু বেরিয়ে যাবে। কোন কোন রেওয়ায়েতে হযরত উমর (রঃ)-এর আরও কথা বর্ণিত আছে 

***************

#যুহদ

#এহইয়া_উলুমিদ্দীন

#ইসলাম_ই_মুক্তির_দিশা

@everyone

মঙ্গলবার, ২৩ মে, ২০২৩

বিভ্রান্তির নিন্দা ও স্বরূপ - ১

বিভ্রান্তি (পর্ব– ২)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
———————
বিভ্রান্তির নিন্দা ও স্বরূপ (১ম পর্ব)
কাফেরদের বিভ্রান্তি ও তার প্রতিকার
বিভ্রান্তির নিন্দার জন্যে নিম্নোক্ত দুটি আয়াতই যথেষ্ট-
>"পার্থিব জীবন যেন তোমাদেরকে বিভ্রান্ত না করে এবং বিভ্রান্ত না করে তোমাদেরকে আল্লাহ থেকে বিভ্রান্তকারী শয়তান"॥
>"কিন্তু তোমরা নিজেরাই নিজেদেরকে বিপদগ্রস্ত করেছ, তোমরা, আমার অমঙ্গলের প্রতীক্ষা করেছ এবং সন্দেহ পোষণ করেছ। মোহ তোমাদেরকে আল্লাহর আদেশ (অর্থাৎ মৃত্যু) আসা পর্যন্ত বিভ্রান্ত করে, রেখেছে এবং বিভ্রান্তকারী শয়তান তোমাদেরকে আল্লাহ থেকে বিভ্রান্ত করেছে"॥
রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়া-সাল্লাম) এরশাদ করেন : “সাবধানী ব্যক্তিদের নিদ্রা কতই না চমৎকার”।
মোটকথা, শিক্ষার শ্রেষ্ঠত্ব ও মূর্খতার নিন্দায় কোরআন ও হাদীসে যা কিছু বর্ণিত আছে, সবই বিভ্রান্তির নিন্দার জন্যে দলীল। কেননা, বিভ্রান্তিও এক প্রকার মূর্খতা।
বিভ্রান্তির স্বরূপ হল শয়তানের ধোকার কারণে এমন কোন বিষয় সম্পর্কে দৃঢ় বিশ্বাস পোষণ করা, যা মনের খেয়ালখুশী ও খাহেশের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ।
সুতরাং যে ব্যক্তি কোন অসার ধারণার বশবর্তী হয়ে বর্তমান কিংবা ভবিষ্যতের কোন কল্যাণে বিশ্বাসী হয়, সে বিভ্রান্ত। অধিকাংশ মানুষই আপন কল্যাণের ধারণা রাখে। অথচ তাদের এ ধারণা ভুল। এ থেকে জানা গেল যে, অধিকাংশ মানুষই বিভ্রান্ত। তবে কোন কোন মানুষের বিভ্রান্তি অপরের তুলনায় স্পষ্টতর ও কঠোরতর হয়ে থাকে।
কঠোরতর বিভ্রান্তি দু’প্রকার
(১)–কাফেরদের বিভ্রান্তি ও
(২)–গোনাহগারদের বিভ্রান্তি।
কোন কোন কাফেরকে পার্থিব জীবন বিভ্রান্ত করে রেখেছে এবং কতককে শয়তান। যারা পার্থিব জীবন দ্বারা বিভ্রান্ত, তারা বলে - নগদ বাকীর চেয়ে উত্তম। পার্থিব জীবন নগদ এবং পরকাল বাকী। সুতরাং পার্থিব জীবনই উত্তম এবং একেই অবলম্বন করা উচিত। তারা আরও বলে- ইহকাল নিশ্চিত এবং পরকাল সংশয়িত। নিশ্চিত বিষয় সংশয়িত বিষয়ের তুলনায় উত্তম হয়ে থাকে। সংশয়ের কারণে নিশ্চিতকে বর্জন করা ঠিক নয়। এ ধরনের প্রমাণাদি সম্পূর্ণ অসার এবং শয়তানের প্রমাণাদির অনুরূপ। সে বলেছিল >"আমি আদমের চেয়ে উত্তম। কারণ, তুমি আমাকে আগুনের দ্বারা সৃষ্টি করেছ এবং তাকে সৃষ্টি করেছ মাটির দ্বারা"।
এ ধরনের বিভ্রান্তির প্রতিকার দু’প্রকারে সম্ভব।
(১)– সত্যিকার ঈমান দ্বারা
(২)– যুক্তি, প্রমাণের মাধ্যমে
সত্যিকার ঈমান দ্বারা চিকিৎসা হল আল্লাহ তা'আলার নিম্নোক্ত উক্তিসমূহকে সত্য বলে বিশ্বাস করা
>"তোমাদের কাছে যা আছে, তা নিঃশেষ হয়ে যাবে এবং আল্লাহর কাছে যা আছে, তা অক্ষয় থাকবে।এবং পরকাল উৎকৃষ্টতর ও চিরস্থায়ী"
>"পার্থিব জীবন তো বিভ্রান্তির সামগ্রী বৈ নয়"॥
>"পার্থিব জীবন যেন তোমাদেরকে বিভ্রান্ত না করে"॥
সেমতে রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়া-সাল্লাম) যখন এসব আয়াতের বিষয়বস্তু অনেক কাফের দলের গোচরীভূত করেন, তখন তারা কালবিলম্ব না করে ইসলামে দীক্ষিত হয়ে যায় এবং কোন দলীলের অপেক্ষা করেনি। কেউ কেউ এসে আরয করত —
ইয়া রসূলআল্লাহ্ ! (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়া-সাল্লাম) আমরা আপনাকে কসম দিয়ে জিজ্ঞেস করছি, সত্যিই কি আল্লাহ আপনাকে রসূল করে পাঠিয়েছেন? তিনি জওয়াবে বলতেন : ‘হাঁ’। এরপরই তারা মুসলমান হয়ে যেত। সাধারণের এই ঈমান ছিল বিভ্রান্তির গণ্ডির বাইরে। এটা এমন, যেমন কোন বালক তার পিতার কথাকে সত্য বলে বিশ্বাস করে নেয়, যদিও কারণ জানা থাকে না।
যুক্তি, প্রমাণের মাধ্যমে চিকিৎসা হল যেসব যুক্তির ভিত্তিতে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়, সেগুলোকে যুক্তির মাধ্যমেই খণ্ডন করা। উদাহরণতঃ উপরে কাফেরদের একটি বিভ্রান্তিকর যুক্তি উল্লিখিত হয়েছে যে, পার্থিব জীবন নগদ এবং পরকাল বাকী। আর নগদ বাকীর চেয়ে উত্তম। সুতরাং পার্থিব জীবনই অবলম্বন করা উচিত। এই যুক্তিতে দুটি বাক্য রয়েছে। প্রথম বাক্য হচ্ছে পার্থিব জীবন নগদ এবং পরকাল বাকী। এ বাক্যটি নিঃসন্দেহে সত্য। কিন্তু দ্বিতীয় বাক্যটি ( অর্থাৎ নগদ বাকীর চেয়ে উত্তম ) সর্বাবস্থায় সত্য নয়। এর মধ্যেই ধোকা নিহিত। কেননা, নগদ ও বাকীর পরিমাণ ও উদ্দেশ্যের মধ্যে সমান সমান হলে তো বাক্যটি সত্য; কিন্তু যদি নগদ বাকীর তুলনায় পরিমাণে কম হয়, তবে বাকীই উত্তম। দেখ, যে কাফেররা উপরোক্ত যুক্তি প্রদর্শন করে, তারাই ব্যবসায়ে এক টাকা নগদ এজন্যে বিনিয়োগ করে, যাতে দশ টাকা বাকী অর্জন করতে পারে। তখন তারা বলে না যে, নগদ। বাকীর চেয়ে উত্তম। সুতরাং বাকীর আশায় নগদ এক টাকা বিনষ্ট করা উচিত নয়। এমনিভাবে চিকিৎসক যদি রোগীকে উৎকৃষ্ট খাদ্য ও ফলমূল খেতে নিষেধ করে, তবে রোগের ভয়ে তৎক্ষণাৎ সে তা পরিত্যাগ করে অথচ এসব খাদ্যের স্বাদ নগদ এবং রোগ-যন্ত্রণা ভবিষ্যতে ভোগ করতে হবে। ব্যবসায়ীরা ভবিষ্যত সুখের আশায় জলে ও স্থলে কত বিপদাপদের ঝুঁকি নিয়ে ব্যবসায়ে নিয়োজিত থাকে এবং কারও কল্পনায় একথা আসে না যে, নগদ বাকীর চেয়ে উত্তম।
সারকথা এই যে, পরবর্তী সময়ে যদি দশ টাকা পাওয়া যায়, তবে তা এক টাকা নগদের চেয়ে উত্তম। এখন দুনিয়ার জীবন ও আখেরাতের জীবনকে তুলনা করলে দুনিয়ার জীবন ‘কিছুই না’ বলা যায়। উদাহরণতঃ মানুষ বেশীর চেয়ে বেশী একশ' বছর বাঁচে। এ বয়সকে আখেরাতের বয়সের সাথে তুলনা করলে তা তার এক কোটি ভাগের একের সমানও হয় না। সুতরাং দুনিয়াতে কেউ এক ছেড়ে দিলে আখেরাতে লাখ লাখ; বরং অগণিত পাবে। আর যদি প্রকারের দিকে লক্ষ্য করা যায়, তবে দুনিয়ার আনন্দে সর্বপ্রকার মালিন্য, কষ্ট ও বিপদ নিহিত থাকে। কিন্তু আখেরাতের আনন্দ- নিঝঞাট, স্বচ্ছ ও পাক-পবিত্র। মোটকথা, ‘নগদ বাকীর চেয়ে উত্তম’ - একথাটিই ভ্রান্ত ও ধোকা। এ ভ্রান্তির কারণ হচ্ছে শুনা কথায় বিশ্বাস করে নেয়া এবং এটা চিন্তা না করা যে, নগদ বাকীর চেয়ে উত্তম তখন, যখন উভয়ের পরিমাণ ও উদ্দেশ্য সমান হয়।
কাফেরদের আরও একটি যুক্তি হল নিশ্চিত বিষয় অর্থাৎ ইহকাল সন্দিগ্ধ বিষয় অর্থাৎ আখেরাতের চেয়ে উত্তম। এ যুক্তিটি প্রথমটির তুলনায় অধিকতর ঠুনকো। কেননা, এর উভয় বাক্যই ভিত্তিহীন। উদাহরণতঃ নিশ্চিত বিষয় সন্দেহযুক্ত বিষয়ের চেয়ে উত্তম - এটা তখন সত্য, যখন উভয়টি সমান হয়- অন্যথায় নয়। বলা বাহুল্য, ব্যবসায়ী ব্যক্তি কষ্ট নিশ্চিতরূপেই করে এবং তার লাভ সন্দেহযুক্ত থাকে। বিদ্যার্থ বিদ্যান্বেষণে নিশ্চিতই পরিশ্রম ও অধ্যবসায় করে এবং তার ইস্পিত ডিগ্রী পর্যন্ত পৌছার বিষয়টি সন্দিগ্ধ থাকে। অনুরূপভাবে রোগী ঔষধের তিক্ততা অবশ্যই অনুভব করে। এতদসত্ত্বেও তার আরোগ্য লাভের বিষয়টি থাকে অনিশ্চিত। এসমস্ত ক্ষেত্রে সকলেই সন্দেহযুক্ত বিষয়ের জন্যে নিশ্চিত বিষয়কে বর্জন করে। ব্যবসায়ী বলে, যদি আমি ব্যবসা না করি, তবে কষ্ট করব এবং ভুখা থাকব। ব্যবসায়ে পরিশ্রম কম এবং মুনাফা বেশী। রোগী বলে, ঔষধের তিক্ততা রোগের পরিণাম অর্থাৎ মৃত্যু ভয়ের তুলনায় অনেক কম। সুতরাং যে ব্যক্তি আখেরাতের ব্যাপারে সন্দেহই করে, তার বলা উচিত- জীবনের গোণাগুণতি কয়েকটি দিন সবর করা আমার জন্যে সেসব বিষয়ের তুলনায় উত্তম, যা আখেরাত সম্পর্কে মানুষ বলে থাকে। কেননা, ধরে নেয়া যাক, যদি আখেরাত মিথ্যাই হয়, তবে তাতে আমার ক্ষতি কি? জীবনের কয়েক দিনের বিলাসই তো নষ্ট হবে। জীবন লাভের পূর্বেও তো কতকাল অতিবাহিত হয়েছে, তখন আমি বিলাস করিনি। সুতরাং ধরে নেব, আমি অস্তিত্বই লাভ করিনি। পক্ষান্তরে যদি আখেরাত সত্য হয়ে যায়, তবে অনন্তকাল পর্যন্ত নরক যন্ত্রণা ভোগ করতে হবে , যা আমি সহ্য করতে পারব না।
হযরত আলী (রাঃ) জনৈক খোদাদ্রোহীকে বলেছিলেন : তুমি যা বলছ, তা সত্য হলে আমাদের উভয়ের কোন ক্ষতি নেই। আর যদি আমার কথা সত্য হয়ে যায়, তবে আমি মুক্তি পাব, আর তুমি বরবাদ হয়ে যাবে। হযরত আলী (রাঃ) এরূপ বলার কারণ এটা ছিল না যে, আখেরাত সম্পর্কে সন্দিহান ছিলেন; বরং খোদাদ্রোহীর বিশ্বাস অনুযায়ী তিনি বক্তব্য রেখেছিলেন এবং বুঝিয়ে দিয়েছিলেন যে, তার আখেরাত অস্বীকার করা নিতান্তই অযৌক্তিক ও ভ্রান্ত।
কাফেরদের যুক্তির দ্বিতীয় বাক্য হচ্ছে ‘আখেরাত সন্দিগ্ধতা’।
মূলত এটাও ভুল; বরং আখেরাত ঈমানদারদের মতে সুনিশ্চিত। এর দলীল দ্বিবিধ। এক, ঈমান, বিশ্বাস এবং পয়গম্বর ও সুধীজনের অনুকরণ। পয়গম্বর ও সুধীজনদের অনুসরণ করলে আখেরাত সম্পর্কিত সকল বিভ্রান্তির অবসান হয়ে যায়। জনসাধারণের বিশ্বাস এমনি ধরনের। এটা এমন, যেমন কোন রােগী তার রােগের ঔষধ কি, জানে না। এরপর সকল চিকিৎসক ও কবিরাজ এ বিষয়ে একমত হয়ে গেল যে, এ রােগের ঔষধ অমুক গাছের মূল। এখন রােগী চিকিৎসকদের মুখে একথা শুনামাত্রই নিশ্চিতরূপে বিশ্বাস করে নেবে এবং তাদের কাছে এর কোন প্রমাণ চাইবে না।
আখেরাত নিশ্চিত হওয়ার দ্বিতীয় দলীল পয়গম্বরগণের জন্যে ওহী এবং ওলীগণের জন্য ইলহাম। এরূপ ধারণা করা উচিত নয় যে, নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়া-সাল্লাম) কেবল জিবরাঈল (আঃ)-এর কাছ থেকে শুনে আখেরাতের বিশ্বাসী হয়েছিলেন। বরং পয়গম্বরগণের জন্যে প্রত্যেক বস্তুর স্বরূপ হুবহু খুলে দেয়া হয় এবং তারা সেই স্বরূপকে অন্তশ্চক্ষু দ্বারা এমনভাবে দেখে নেন, যেমন আমরা চর্মচক্ষু দ্বারা কোন ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তুকে দেখি। অতএব, তাঁরা যেসব সংবাদ দেন, স্বচক্ষে দেখে সংবাদ দেন- কেবল শুনে দেন না। সুতরাং আখেরাত সম্পর্কে নবী করীম ((সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়া-সাল্লাম))-উনার বিশ্বাস ও আমাদের বিশ্বাসের মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাৎ।
কোন কোন ঈমানদার ব্যক্তি যখন নিজের কথাবার্তা ও বিশ্বাসের মাধ্যমে আল্লাহর বিধানাবলী অমান্য করে এবং কামনা-বাসনা ও গোনাহে লিপ্ত হয়ে সৎকর্ম বর্জন করে, তখন তারাও আখেরাত সম্পর্কিত উপরোক্ত বিভ্রান্তিতে কাফেরদের সাথে শরীক হয়ে যায়। কেননা, তারাও পার্থিব জীবনকে আখেরাতের উপর অগ্রাধিকার দেয়। অবশ্য মূল ঈমানের কারণে তারা চিরন্তন আযাব থেকে বেঁচে যাবে এবং কিছুকাল দোযখ ভোগ করার পর মুক্তি পাবে। তবে তারা যে বিভ্রান্ত, এতে কোন সন্দেহ নেই। কারণ, তারা স্বীকার করে যে, আখেরাত দুনিয়ার চেয়ে উত্তম। কিন্তু দুনিয়ার প্রতি ঝোঁক থাকা এবং দুনিয়াকে অবলম্বন করার কারণে কেবল ঈমান চিরন্তন সাফল্য লাভের জন্যে যথেষ্ট নয়। কোরআন শরীফ এর সাক্ষী। আল্লাহ বলেন
>"নিশ্চয় আমি ক্ষমাশীল সেই ব্যক্তির জন্যে, যে তওবা করে, ঈমান আনে, সৎকর্ম করে, অতঃপর সৎপথে থাকে”।
মোটকথা, যারা দুনিয়া নিয়েই সন্তুষ্ট, এর আনন্দ-উল্লাসে নিমজ্জিত এবং মৃত্যুকে খারাপ মনে করে, তারাই বিভ্রান্ত, কাফের হোক কিংবা মুসলমান। এ পর্যন্ত কাফেরদের বিভ্রান্তি ও তার প্রতিকার বর্ণিত হল।

গোনাহগারদের বিভ্রান্তি বর্ণনা—
এখন গোনাহগারদের বিভ্রান্তি বর্ণনা করা হচ্ছে। তারা বলে - আল্লাহ তা'আলা ক্ষমাশীল। আমরা তার ক্ষমা আশা করি। অতঃপর এই আশার উপর ভিত্তি করে তারা সৎকর্মও বর্জন করে। তারা এর নাম রাখে “রাজা” অর্থাৎ আল্লাহর প্রতি আশাবাদ। কারণ তারা জানে “রাজা” ধর্মের একটি প্রশংসনীয় বিষয়। মাঝে মাঝে তাদের এই আশাবাদের একটি দলীল হয়ে থাকে তাদের পিতৃপুরুষদের সৎকর্মপরায়ণ ও উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন হওয়া; যেমন সৈয়দ হওয়া। খোদাভীতি ও পরহেযগারীতে পূর্বপুরুষদের বিপরীত হওয়া সত্ত্বেও তারা ধারণা করে যে, আল্লাহর কাছে তারা বাপ-দাদার চেয়েও বুযুর্গ। কেননা, বাপ-দাদারা খোদাভীতি ও পরহেযগারী সত্ত্বেও ভয়ে কম্পমান থাকতেন; কিন্তু তারা সকল প্রকার পাপাচার সত্ত্বেও নির্ভীক হয়ে থাকে। এটা চরম বিভ্রান্তি। তাদের মনে শয়তান এই ধারণা সৃষ্টি করেছে। যে, যে কাউকে মহব্বত করে, সে তার বংশধরকেও মহব্বত করে। আল্লাহ তা'আলা যেহেতু তোমাদের বাপ-দাদাকে প্রিয় জানতেন, তাই তোমাদেরকেও প্রিয় জানবেন। অতএব, তোমাদের কর্ম করার প্রয়োজন কি? অথচ তারা একথা স্মরণ করে না যে, হযরত নূহ ( আঃ ) নিজের পুত্রকে নৌকায় নিজের সঙ্গে তুলতে চেয়েছিলেন এবং দোয়া করেছিলেন পরওয়ারদেগার, আমার পুত্র আমার পরিবারভুক্ত। কিন্তু আল্লাহর পক্ষ থেকে উত্তর হল - "হে নূহ ! নিশ্চয় সে তোমার পরিবারভুক্ত নয়। সে তো অসৎ"।
হযরত ইবরাহীম ( আঃ ) নিজের পিতার জন্যে দোয়া করেন; কিন্তু তা-নামনযুর হয়। মোটকথা, উপরোক্ত ধারণা ধোকা ও বিভ্রান্তি ছাড়া আর কিছুই নয়। আল্লাহ তা'আলা কেবল অনুগতদেরকেই ভালবাসেন এবং গোনাহগারকে অপছন্দ করেন যেমন, পিতা অনুগত হলে তার সন্তানরা গোনাহগার হলেও আল্লাহ। পিতাকে অপছন্দ করেন না। তেমনি পিতাকে মহব্বত করার কারণে তার গোনাহগার পুত্রকেও মহব্বত করেন না। এ ক্ষেত্রে মূল কথা হচ্ছে-
>"একজনের পাপের বোঝা অন্যজন বহন করবে না"।
যে ব্যক্তি ধারণা করে যে, পিতার তাকওয়া ও খোদাভীতির কারণে সেও মুক্তি পেয়ে যাবে, সে এমন, যেমন কেউ মনে করে যে, পিতা পেট ভরে খেলে তারও পেট ভরে যাবে এবং সে পানি পান করলে তারও তৃষ্ণা মিটে যাবে। অথচ এরূপ মনে করা সম্পূর্ণ অবান্তর। এ থেকে জানা গেল যে, তাকওয়া ফরযে আইন। এতে পিতার তাকওয়া পুত্রের জন্যে যথেষ্ট হবে না। কিয়ামতের দিন তাকওয়ার ভিত্তিতেই বিচার হবে। তবে যে ব্যক্তির উপর আল্লাহর ক্রোধ অধিক হবে না, তার জন্যে সুপারিশের অনুমতি হবে এবং সুপারিশ তার জন্যে লাভজনক হবে।
এখন প্রশ্ন হয়, গোনাহগার ব্যক্তি বলে থাকে, আল্লাহ ক্ষমাশীল। আমি তার ক্ষমা আশা করি। তার এ দুটি বাক্যই তো নির্ভুল এবং মনে লাগে। এতে বিভ্রান্তি কিসের?
জওয়াব এই যে, শয়তান মানুষকে এমনি ধরনের বাক্য দ্বারা বিভ্রান্ত করে, যা বাহ্যত গ্রহণযোগ্য এবং ভেতরে প্রত্যাখ্যাত । বলা বাহুল্য, বাহ্যিক কথা সুন্দর না হলে মন বিভ্রান্ত হবে কেন? রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়া-সাল্লাম) এই উক্তির রহস্য ফাঁস করে দিয়েছেন। এক হাদীসে তিনি বলেন -
>"বিজ্ঞ সেই ব্যক্তি, যে নিজের নফসকে অনুগত করে, মৃত্যু পরবর্তী সময়ের জন্যে আমল করে এবং নির্বোধ সেই ব্যক্তি, যে খেয়াল-খুশীর অনুগামী হয় এবং আল্লাহর কাছে আশা-আকাক্ষা করতে থাকে।
সুতরাং বাস্তবে এই হচ্ছে আমলহীন আশা-আকাঙ্ক্ষা, শয়তান যার নাম পাল্টে 'রাজা' দিয়েছে। মূর্খরা এতেই বিভ্রান্ত হয়ে গেছে। অথচ 'রাজা' শব্দের ব্যাখ্যা আল্লাহ তাআলা এভাবে করেন,-
>"নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে এবং যারা হিজরত করেছে ও আল্লাহর পথে জেহাদ করেছে, তারাই আল্লাহর রহমত আশা করে। অর্থাৎ তারাই আশা করার যোগ্য।
হযরত হাসান (রহঃ)-কে কেউ জিজ্ঞেস করল: কোন কোন লোক বলে-আমরা আল্লাহর কাছে আশা রাখি এবং আমল করি না। তিনি বললেন : এটা তাদের খামখেয়ালী। যে ব্যক্তি কোন বস্তু আশা করে, সে তার অন্বেষণ করে। আর যে ব্যক্তি কোন বস্তুকে ভয় করে, সে তার কাছ থেকে দূরে পালায়। মুসলিম ইবনে ইয়াসার বলেন : আমি একদিন এত জোরেশোরে সেজদায় গেলাম যে, আমার সামনের দুটি দাত ভেঙ্গে গেল। এটা দেখে কেউ বলল : আমরা তো আল্লাহর কাছে মাগফেরাত আশা করি। এজন্যে আমল করি না। মুসলিম জওয়াব দিলেন : এটা কস্মিনকালেও 'রাজা' তথা আশা নয়। মানুষ যে বিষয় আশা করে, তা তালাশ করে।
এর একটি দৃষ্টান্ত এই যে, এক ব্যক্তি আশা করে যে, সে সন্তানের পিতা হবে; অথচ সে এখনও বিবাহই করেনি কিংবা বিবাহ করে থাকলেও স্ত্রীর সাথে সহবাস করেনি। এরূপ ব্যক্তির সন্তানের পিতা হওয়ার আশা খামখেয়ালী নয় তো কি? এমনিভাবে যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার ক্ষমা ও রহমত আশা করে এবং তার ঈমানই নেই কিংবা ঈমান থাকলেও সৎকর্ম করেনি কিংবা সৎকর্মের সাথে সাথে অসৎকর্মও ছাড়েনি, সেও খামখেয়ালীতে লিপ্ত।
জানা উচিত যে, আশা দু’জায়গায় করা ভাল। এক, আপাদমস্তক গোনাহগার ব্যক্তি। তার মনে যখন তওবা করার কল্পনা জাগে, তখন শয়তান তাকে এই বলে বিভ্রান্ত করে যে, তোর তওবা কবুল হবে না। এতে শয়তানের উদ্দেশ্য থাকে, তাকে নিরাশ করে দেয়া। এমতাবস্থায় নৈরাশ্য দূর করে আশা করা ওয়াজিব। সে স্মরণ করবে যে, আল্লাহ ক্ষমাশীল, তওবা কবুলকারী এবং তওবা একটি এবাদত, যা দ্বারা গোনাহ দূর হয়ে যায়। কোরআন শরীফে এর সমর্থন রয়েছে। আল্লাহ তা’আলা বলেন :
>"বলে দিন, হে আমার বান্দা ! যারা নিজেদের উপর যুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ সমস্ত গোনাহ ক্ষমা করবেন। কারণ, তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। তোমরা আল্লাহর দিকে ফিরে এস।
অতএব, মানুষ যখন তওবা সহকারে ক্ষমার আশা করবে, তখন তাকে আশাবাদী বলা উচিত হবে। নতুবা গোনাহ অব্যাহত রেখে মাগফেরাতের আশা করা খামখেয়ালী। দুই, যে ব্যক্তি নফল এবাদতে ক্রটি করে এবং কেবল ফরয এবাদত করেই ক্ষান্ত থাকে, সে যদি নিজের জন্যে আল্লাহর সেই সমস্ত নেয়ামত ও ওয়াদা আশা করে, যা তিনি সৎকর্মপরায়ণদেরকে দিয়েছেন এবং এই আশার আনন্দে নফল এবাদতের প্রতি মনোনিবেশ করে, তবে তার এই আশা উত্তম। আল্লাহ বলেন
>"অবশ্যই সফলকাম হয়েছে মুমিনরা, যারা আপন নামাযে বিনয় নম্র, যারা অসার কার্যকলাপ থেকে বিরত থাকে, যারা যাকাতদানে সক্রিয়, যারা আপন যৌনাঙ্গকে সংযত রাখে। তবে তাদের স্ত্রী ও অধিকারভুক্ত দাসীদের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হলে তারা তিরস্কৃত হবে না। কেউ এদের ছাড়া অন্যকে কামনা করলে সে হবে সীমালঙ্ঘনকারী এবং যারা আমানত ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে এবং যারা তাদের নামাযে যত্নবান, তারাই হবে অধিকারী ফেরদাউসের, যাতে তারা চিরকাল থাকবে"।
সুতরাং প্রথমোক্ত আশা দ্বারা তওবার প্রতিবন্ধক নৈরাশ্য খতম হয়ে যায় এবং দ্বিতীয় আশা দ্বারা এবাদতে স্ফূর্তির অন্তরায় অলসতা দূর হয়ে যায়। সারকথা, যে আশা তওবা করতে উদ্বুদ্ধ করে, তাকে বলা হয় 'রাজা' । আর যে আশা এবাদতে অলসতার কারণ হয়, তাকে বলা হয় বিভ্রান্তি ও খামখেয়ালী।
আজকাল অধিকাংশ লোক আমলে অলসতা করে । তারা আল্লাহর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে আখেরাতের জন্যে চেষ্টা-চরিত্র করে না। এর কারণ এটাই যে, ভারা বিভ্রান্তিতে পড়ে আছে, যাকে 'রাজা' মনে করে নিয়েছে। রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়া-সাল্লাম) এরশাদ করেছেন—
>এই উম্মতের শেষ যুগে বিভ্রান্তি প্রবল হবে। বাস্তবে তাই দেখা যায়। প্রথম যুগের লোকেরা অব্যাহতভাবে এবাদত করতেন। তারা যা-ই আমল করতেন, তাদের অন্তর ভয়ে পরিপূর্ণ থাকত; অথচ তারা সারারাত আল্লাহর এবাদতে কাটিয়ে দিতেন। এতদসত্ত্বেও নির্জনে নিজের জন্য কান্নাকাটি করতেন। কিন্তু বর্তমান যুগের অবস্থা এর বিপরীত। এখন মানুষ গোনাহে ডুবে থাকে, দুনিয়া নিয়ে সদা ব্যস্ত থাকে এবং আল্লাহর প্রতি বিমুখ থাকে। এরপরও তারা শংকাহীন ও প্রশান্ত দৃষ্টিগোচর হয়। তারা বলে আমরা আল্লাহর অনুগ্রহ ও কৃপার উপর আস্থা রাখি এবং তাঁর রহমত ও মাগফেরাত আশা করি। তারা যেন দাবী করে আমরা আল্লাহর রহমত ও অনুগ্রহ এতটুকু জানি, যতটুকু পয়গম্বর ও সাহাবায়ে কেরাম জানতেন না।
হযরত মাকাল ইবনে ইয়াসার (রাঃ) -এর রেওয়ায়েতে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়া-সাল্লাম) বলেন : এক সময় আসবে, যখন পরনের বস্ত্রের ন্যায় কোরআন মানুষের অন্তরে পুরাতন হয়ে যাবে। মানুষের কেবল আশা-আকাঙ্ক্ষাই থেকে যাবে এবং এর সাথে ভয় মোটেই থাকবে না। কোন কাজ করলে তারা বলবে, এটা কবুল হবে এবং কোন অসাজ করলে বলবে এটা ক্ষমা পেয়ে যাব। এই হাদীস থেকে জানা গেল যে, মানুষ ভয়ের জায়গায় লালসাকে ব্যবহার করবে এবং কোরআনে উল্লিখিত ভয়ের আয়াত সম্পর্কে মূখ হয়ে যাবে। আল্লাহ তা'আলা খৃস্টানদের এ অবস্থাই বর্ণনা করে বলেন "তাদের পেছনে আগমন করল কিতাবের উত্তরাধিকারীগণ, যারা তুচ্ছ জীবনের সামগ্রী গ্রহণ করে এবং বলে আমাদেরকে ক্ষমা করা হবে।

পরবর্তী পর্বের জন্য নিচে ক্লিক করুন

বিভ্রান্তি সকল দুর্ভাগ্যের মূল

  


বিভ্রান্তি (পর্ব– ১)

✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
বিভ্রান্তি সকল দুর্ভাগ্যের মূল
প্রকাশ থাকে যে, সাবধানতা ও সতর্কতা মানুষের সৌভাগ্যের চাবিকাঠি আর বিভ্রান্তি ও অসাবধানতা দুর্ভাগ্যের সেতুবন্ধ। মানুষের প্রতি ঈমান ও মাগফেরাতের চেয়ে আল্লাহ তা’আলার বড় কোন নেয়ামত নেই এবং বক্ষের উন্মুক্ততা ছাড়া ঈমান ও মাগফেরাত লাভের কোন উপায় নেই। এমনিভাবে কুফর ও গোনাহের চেয়ে বড় কোন অনিষ্ট নেই এবং আন্তরিক অন্ধত্ব ও মূর্খতা ছাড়া অন্য কিছু এই অনিষ্টের কারণ হয় না। চক্ষুষ্মন ব্যক্তিবর্গকে আল্লাহর পক্ষ থেকে যে অন্তর দান করা হয়েছে, তার শানে কোরআন পাকে বলা হয়েছে :
>"দীপাধারের মত, যার মধ্যে আছে একটি প্রদীপ, প্রদীপটি একটি কাচের আবরণের মধ্যে রক্ষিত। কাচের আবরণটি একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র সদৃশ, যা প্রজ্বলিত হয় পবিত্র যায়তুন বৃক্ষের তৈল থেকে, যা পূর্বমুখীও নয় পশ্চিমমুখীও নয়, অগ্নিসংযোগ না করলেও মনে হয় তার তৈল আলো দিচ্ছে। নূরের উপর নূর"।
পক্ষান্তরে গাফেলদের অন্তরের অবস্থা এরূপ বর্ণিত হয়েছে-
>"অতল সমুদ্রের মত, যাকে উদ্বেলিত করে তরঙ্গের পর তরঙ্গ, যার উপরে ঘনমেঘ, এক অন্ধকারের উপর আর এক অন্ধকার, যখন সে হাত বের করে, তখন তা দেখে না। আল্লাহ যাকে জ্যোতি দান করেন না, তার কোন জ্যোতি নেই"॥
আল্লাহ তা'আলা সাবধানী লোকদের অন্তর ইসলামের জন্যে উন্মুক্ত করে দেন এবং গাফেল ও বিভ্রান্তদেরকে অন্তশ্চক্ষু দান করেন না। তারা খেয়াল-খুশীকেই নিজেদের পথপ্রদর্শক মনে করে।
মোটকথা, বিভ্রান্তি সকল দুর্ভাগ্যের মূল এবং সমস্ত বিনাশের উৎস বিধায় এর সেসব পথ বর্ণনা করা অত্যন্ত জরুরী, যেগুলো দিয়ে এই বিভ্রান্তি অধিক পরিমাণে আগমন করে।
গাফেল ও বিভ্রান্তদের শ্রেণী যদিও অনেক। কিন্তু চারটি শ্রেণীতে সবাই অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়।
(১) - আলেম
(২) - আবেদ
(৩) - সূফী (এবং)
(৪) - ধনাঢ্য ব্যক্তি।
এসব দলেরও অনেক উপদল রয়েছে এবং তাদের বিভ্রান্তির কারণসমূহও বিভিন্নরূপ। উদাহরণতঃ কোন কোন লোক শরীয়তের অস্বীকৃত কর্মকে সকর্ম বলে মনে করে। যেমন, অবৈধ ধন-সম্পদ দ্বারা মসজিদ নির্মাণ করে তাতে কারুকার্য করে এবং একে সওয়াবের কাজ মনে করে। কেউ এ ব্যাপারে পার্থক্য করে না যে, নিজের জন্যে চেষ্টা-চরিত্র করে, না আল্লাহর জন্যে করে। কেউ জরুরী কাজ বাদ দিয়ে অপ্রয়োজনীয় কাজে ব্যস্ত থাকে। আবার কেউ ফরয কাজ বর্জন করে নফল কাজে মশগুল থাকে।
নিম্নে আমরা বিভ্রান্তির নিন্দা ও স্বরূপ উদাহরণসহ বর্ণনা করার পর সর্বপ্রথম আলেম তথা শিক্ষিত ব্যক্তিদের বিভ্রান্তি বর্ণনা করার প্রয়াস পাব।


রবিবার, ২১ মে, ২০২৩

মহব্বত (পর্ব- ৪) খোদায়ী মহব্বত শক্তিশালী হওয়ার উপায়



 মহব্বত (পর্ব- ৪)
এহইয়াউ উলুমিদ্দীন - ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
খোদায়ী মহব্বত শক্তিশালী হওয়ার উপায়

আখেরাতে সে ব্যক্তি সর্বাধিক সৌভাগ্যবান হবে, আল্লাহ তা'আলার সাথে যার মহব্বত অধিকতর শক্তিশালী হবে। কেননা, আখেরাতের অর্থ হচ্ছে আল্লাহ তা'আলার কাছে গিয়ে সাক্ষাতের সৌভাগ্য অর্জন করা। বলা বাহুল্য, দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর যখন আশেক তার মাশুকের কাছে যাবে, তার দীদারে চিরতরে ধন্য হবে, কোনরূপ বাধা থাকবে না এবং মালিন্য ও বিচ্ছিন্নতার কোন আশংকা থাকবে না, তখন কি অভাবনীয় খুশী ও অপার আনন্দই না তার অর্জিত হবে ! কিন্তু এই আনন্দ মহব্বতের শক্তি অনুপাতে হবে।
মহব্বত যত বেশী হবে, আনন্দও তত বেশী হবে—
দুনিয়াতে কোন ঈমানদার আল্লাহর মহব্বত থেকে খালি নয়। কিন্তু মহব্বতের আধিক্য যাকে এশ্ক বলা হয়, তা অনেকের মধ্যে নেই। এই এশ্ক অর্জনের উপায় দু'টি –
(১) দুনিয়ার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা এবং মন থেকে গায়রুল্লাহর মহব্বত বের করে দেয়া। কেননা, মন হচ্ছে পান পাত্রের মত। যদি পাত্রে পানি থাকে, তবে তাতে সিরকা রাখার অবকাশ থাকে না। আল্লাহ তা'আলা কাউকে দুটি মন দেননি যে, একটির দ্বারা আল্লাহকে মহব্বত করবে এবং অপরটি দ্বারা গায়রুল্লাহকে মহব্বত করবে। আল্লাহকে সর্বান্তকরণে চাওয়াই হচ্ছে পরিপূর্ণ মহব্বত। যে পর্যন্ত অপরের দিকে মনোযোগ রাখবে, সে পর্যন্ত মন অপরের সাথে একপ্রকার মশগুল থাকবে এবং যে পরিমাণ অপরের সাথে মশগুল থাকবে সে পরিমাণ মনে আল্লাহর মহব্বত কম হবে। এই একাগ্রতার দিকেই এ আয়াতসমূহে ইঙ্গিত রয়েছে :
>“বলুন আল্লাহ, এরপর তাদেরকে তাদের অসার চিন্তায় খেলা করতে দিন”।
আল্লাহ্ আরো বলেন
>“নিশ্চয় যারা বলে, আমাদের পালনকর্তা আল্লাহ, এরপর তাতে দৃঢ় থাকে”। কালেমায়ে তাইয়েবা “লাইলাহা ইল্লাল্লাহ” - এর উদ্দেশ্যই তাই। অর্থাৎ কোন মাবুদ ও মাহবুব আল্লাহ ছাড়া নেই। বলা বাহুল্য, মাহবুবই মাবুদ হয়ে থাকে। তাই আল্লাহ বলেন—
>“দেখতো, যে মাবুদ করে নিয়েছে তার খেয়ালখুশীকে”!
রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহি ওয় আলিহী ওয়া-সাল্লাম) বলেন –
>“সর্বনিকৃষ্ট মাবুদ, যার পূজা করা হয় পৃথিবীতে, সে হচ্ছে খেয়ালখুশী”।
অন্য এক হাদীসে আছে -
>“যে খাঁটি মনে ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ্' বলে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে”। এখানে খাঁটি অর্থ অন্তরকে আল্লাহর জন্যে খাঁটি করা, যাতে অপরের অংশীদারিত্ব না থাকে এবং আল্লাহ তা'আলাই অন্তরের মাবুদ, মাহবুব ও মকসুদ হওয়া। যার এই অবস্থা, দুনিয়া তার জন্যে জেলখানা। কারণ, মাহবুবের সাথে সাক্ষাতে দুনিয়া একটি বাধা। মৃত্যু তার জন্যে জেল থেকে মুক্তি পাওয়া এবং মাহবুবের কাছে যাওয়া। যার মাহবুব এক সত্তা এবং সে জেলখানায় থেকে দীর্ঘ প্রতীক্ষা করে, সে যদি জেল থেকে মুক্তি পেয়ে মাহবুবের সাথে মিলিত হয় এবং অনন্তকাল পর্যন্ত অনাবিল সুখে কাল কাটায়, তবে সে কতই না সৌভাগ্যশালী।

(২) মহব্বত শক্তিশালী হওয়ার আরেক উপায় হচ্ছে খোদায়ী মারেফত শক্তিশালী হওয়া ও অন্তরে তা বিস্তৃত হওয়া। দুনিয়ার যাবতীয় সম্পর্ক থেকে অন্তর পাক হওয়ার পর তা অর্জিত হয়। যেমন, শস্যক্ষেত্রকে সকল আগাছা থেকে সাফ করার পর তাতে বীজ বপন করা হয়। অন্তরকে এভাবে পাক করার পর তাতে মহব্বত ও মারেফতের বৃক্ষ উৎপন্ন করা হয়। এ বৃক্ষের নাম কালেমায়ে তাইয়েবা, যার দৃষ্টান্ত আল্লাহ পাক বর্ণনা করেছেন—
আল্লাহ কালেমায়ে তাইয়েবার দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেছেন, যা পবিত্র বৃক্ষের ন্যায়, যার মূল শিকড় মযবুত এবং শাখা আকাশে বিস্তৃত। নিম্নোক্ত আয়াতে এদিকেই ইশারা করা হয়েছে :
>“তারই দিকে উত্থিত হয় পবিত্র কালাম ও সৎকর্ম”।
এখানে পবিত্র কালামের অর্থ মারেফাতের বাহক ও খাদেমের মত। অন্তরকে পবিত্র করে তার পবিত্রতা অক্ষুণ্ণ রাখাই যাবতীয় সৎকর্মের উদ্দেশ্য। এভাবে মারেফত অর্জিত হলে তার পেছনে মহব্বত অবশ্যই থাকবে। মহব্বত থাকলে আনন্দও থাকবে।
———————
পরবর্তী পর্ব –
মহব্বত ও মারেফতে মানুষের বিভিন্ন অবস্থা

মহব্বত (পর্ব- ৩) মহব্বতের যোগ্য একমাত্র আল্লাহর সত্তা



মহব্বত (পর্ব- ৩)
এহইয়াউ উলুমিদ্দীন - ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

মহব্বতের যোগ্য একমাত্র আল্লাহর সত্তা 
এহইয়াউ উলুমিদ্দীন - ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

মহব্বতের উপরোক্ত পাঁচটি কারণ আল্লাহ তা'আলার সত্তা ছাড়া অন্য কারও মধ্যে একত্রে পাওয়া যাওয়া সম্ভব নয়। তাই বাস্তবে মহব্বতের যোগ্যও তাঁর সত্তা অন্য কেউ নয়। কেউ যদি আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে মহব্বত করে এবং এ মহব্বতকে আল্লাহর সাথে কোনরূপে সংযুক্ত না করে, তবে এটা হবে মূর্খতা। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহি ওআলিহী ওয়া-সাল্লাম))-এর মহব্বত উত্তম। কেননা, এটা হুবহু আল্লাহর মহব্বত। আলেম ও মুত্তাকী লোকদের মহব্বতও তদ্রূপ। কেননা, প্রেমাস্পদের প্রেমাস্পদও প্রেমাস্পদ হয়ে থাকে। সুতরাং অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তিবর্গের মতে আল্লাহ তা'আলা ছাড়া অন্য কেউ মাহবুব কিংবা মহব্বতের যোগ্য নয়। এর ব্যাখ্যার জন্যে আমরা উল্লিখিত পাঁচটি কারণ উল্লেখ করে প্রমাণ করব, এগুলো সব আল্লাহ তা'আলার মধ্যেই একত্রে পাওয়া যায়, অন্য কারও মধ্যে একটি অথবা দু'টি পাওয়া যায় মাত্র এখন

আল্লাহ্ ই মহব্বতের যোগ্য কারণ– ১
প্রথম কারণ সম্পর্কে চিন্তা করুন–
মানুষ নিজের সত্তাকে মহব্বত করে এবং তার স্থায়িত্ব কামনা করে— ধ্বংস, নাস্তি ও ত্রুটি চায় না। এটা প্রত্যেক জীবিত মানুষের মজ্জাগত বিষয়। কেউ এ থেকে মুক্ত নয়। এটাই আল্লাহর মহব্বত দাবী করে। কেননা, যে ব্যক্তি নিজ সত্তা ও পালনকর্তাকে চেনে, সে নিশ্চিতরূপেই জানে, তার অস্তিত্ব তার নিজের পক্ষ থেকে নয়; বরং তার সত্তার অস্তিত্ব, স্থায়িত্ব ও পূর্ণতা আল্লাহর পক্ষ থেকে। তিনিই তার অস্তিত্বের স্রষ্টা এবং তিনিই পূর্ণতার গুণাবলী সৃষ্টি করে তাকে পূর্ণতা দান করেছেন। অন্যথায় মানুষ নিজ সত্তার দিক দিয়ে নিছক নাস্তি। আল্লাহ তা'আলা নিজ কৃপায় অস্তিত্ব দান না করলে এবং অস্তিত্বের পর তাঁর অনুগ্রহ সঙ্গে না থাকলে মানুষ নিঃসন্দেহে নাস্তনাবুদ হয়ে যাবে। অতএব পালনকর্তা, মারেফত অর্জনকারী ব্যক্তি যখন নিজের সত্তাকে মহব্বত করবে, তখন সে সত্তাকেও অবশ্যই মহব্বত করবে, যার দ্বারা তার সত্তা অস্তিত্ব লাভ করেছে। যদি সে সত্তাকে মহব্বত না করে, তবে সে নিজের সত্তা ও পালনকর্তা উভয়টি সম্পর্কেই অজ্ঞ। কেননা, মহব্বত মারেফত তথা চেনা ও জানার ফল। মারেফত না হলে মহব্বতও হবে না। মারেফত দুর্বল হলে মহব্বতও দুর্বল হবে এবং মারেফত শক্তিশালী হলে মহব্বতও শক্তিশালী হবে। এ কারণেই হযরত হাসান বসরী (রহঃ) বলেন : যে ব্যক্তি নিজের রবকে চিনবে, সে তাঁকে মহব্বত করবে এবং যে ব্যক্তি দুনিয়াকে চিনবে, সে তাঁর প্রতি অনাসক্ত হবে। একথা কল্পনাও করা যায় না যে, মানুষ নিজের সত্তাকে মহব্বত করবে, অথচ রবকে মহব্বত করবে না। কারণ, রবের মাধ্যমেই তার সত্তার প্রতিষ্ঠা।
যে ব্যক্তি প্রখর সূর্যকিরণে অতিষ্ঠ হয়ে ছায়াকে মহব্বত করে, সে বৃক্ষকেও মহব্বত করবে, যার মাধ্যমে ছায়া প্রতিষ্ঠা পায়। ছায়ার সাথে বৃক্ষের যে সম্পর্ক, প্রত্যেক বিদ্যমান বস্তুরও আল্লাহর সাথে সে সম্পর্ক।
আল্লাহ্ ই মহব্বতের যোগ্য কারণ– ২
দ্বিতীয় কারণ, এমন ব্যক্তিকে মহব্বত করা, যে টাকা-পয়সা ও কথার মাধ্যমে সাহায্য করে এবং শত্রুর শত্রুতা দূরীকরণে ও অনিষ্ট প্রতিহরণে সহায়তা করে। বলা বাহুল্য, এরূপ ব্যক্তি মহব্বতের পাত্র না হয়ে পারে না। এ কারণটি দাবী করে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে মহব্বত করা যাবে না। কেননা, বাস্তবে আল্লাহ তা'আলাই অনুগ্রহকারী। কোন ব্যক্তি যদি তোমাকে তার সমস্ত ধন-ভাণ্ডার দিয়ে দেয় এবং যেভাবে ইচ্ছা ব্যয় করার অধিকার প্রদান করে, তবে তুমি ধারণা করবে, এটা এই ব্যক্তির তরফ থেকে তোমার প্রতি অনুগ্রহ। অথচ এটা ভ্রান্ত। কেননা, এ অনুগ্রহের পেছনে কয়েকটি বিষয় রয়েছে। এক, স্বয়ং অনুগ্রহকারীর অস্তিত্ব। দুই, তার ধন-সম্পদ থাকা। তিন, ধনের উপর তার অধিকার থাকা। চার, বিশেষভাবে তোমাকে দেয়ার তার ইচ্ছা। এখন প্রশ্ন, এই অনুগ্রহকারীকে কে সৃষ্টি করেছে? তার ধন-সম্পদ কে সৃষ্টি করেছে? তার ক্ষমতা ও ইচ্ছার সৃষ্টিকর্তা কে? তার মনে এ প্রেরণা কে সৃষ্টি করেছে যে, ‘তোমাকে দান করার মধ্যে তার কোন পার্থিব অথবা পারলৌকিক উপকার আছে? এক কথায়, সব প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে, আল্লাহ্ তা'আলাই সব সৃষ্টি করেছেন। তিনিই তার অন্তরে এ ধারণা প্রতিষ্ঠিত করে দিয়েছেন যে, তোমাকে দান করার মধ্যেই তার ইহলৌকিক ও পারলৌকিক কল্যাণ নিহিত। সুতরাং সে তোমাকে দান করতে বাধ্য এবং এর বিপরীত করতেই পারে না। সুতরাং সে সত্তাই প্রকৃত অনুগ্রহকারী যিনি তাকে তোমার জন্যে বাধ্য করেছেন। হাঁ, ধন-ভাণ্ডার সে ব্যক্তির অধিকারে থাকাটা অবশ্য ইঙ্গিত দেয় যে, সম্ভবত অনুগ্রহকারী সে-ই। এ সম্পর্কে জানা দরকার, ব্যক্তি দান করে আল্লাহ তা'আলার অনুগ্রহের মাধ্যম হয় মাত্র। অর্থাৎ, তোমাকে দেয়ার জন্যেই আল্লাহ তাকে ধন-ভাণ্ডার দিয়েছেন। সুতরাং সে না দিয়ে কি করবে? সে তো পয়ঃপ্রণালীর অনুরূপ। পয়ঃপ্রণালী নিজের উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত করতে বাধ্য। এ ছাড়া মানুষ যখন অনুগ্রহ করে, তখন নিজের প্রতিই অনুগ্রহ করে। অন্য কোন সৃষ্টির প্রতি তার অনুগ্রহ করা অসম্ভব। কারণ, মানুষ যখন দান করে, তখন তার বিনিময় পূর্বেই আন্দাজ করে নেয়- আখেরাতে সওয়াবের আকারে অথবা দুনিয়াতে দানশীলতার সুখ্যাতি অর্জন করা কিংবা অপরের মন জয় করে তাকে অনুগত ও বশীভূত করা ইত্যাদি। মানুষ কখনও তার ধন-সম্পদ পানিতে ফেলে দেয় না। কারণ, এতে কোন লাভ নেই। এমনিভাবে সে তার অর্থ-কড়ি অন্যের হাতে বিনা লাভেই তুলে দেয় না। তোমাকে যখন সে ধন দেয়, তখন তার উদ্দেশ্য তুমি নও; বরং তুমি তার অর্থ গ্রহণ করে তার উদ্দেশ্য হাসিলের ওসিলা হও মাত্র। অতএব, সে অনুগ্রহ তোমার প্রতি নয়— নিজের প্রতিই করে। তোমাকে দান করে সে বিনিময়ে যা পাবে, সেটা যদি তার কাছে প্রধান ও অগ্রগণ্য না হত, তবে সে কখনও তোমার হাতে ধন তুলে দিত না। অতএব, মহব্বত ও শোকরের যোগ্য সে নয়।

আল্লাহ্-ই মহব্বতের যোগ্য কারণ- ৩
তৃতীয় কারণ অর্থাৎ, কোন ব্যক্তিসত্তাকে অনুগ্রহ না পেয়েও মহব্বত করা। এটাও মানুষের স্বভাবে নিহিত। উদাহরণতঃ এক বাদশাহ সম্পর্কে খবর পাওয়া গেল, সে এবাদতকারী, ন্যায়পরায়ণ, প্রজাহিতৈষী ও বিনম্র স্বভাব বিশিষ্ট। অপরদিকে অন্য এক বাদশাহ সম্পর্কে সংবাদ পাওয়া গেল, সে অত্যাচারী, অহংকারী, পাপাচারী এবং প্রজার অধিকার খর্বকারী। তুমি উভয় বাদশাহ থেকে এতদূরে অবস্থান করছ যে, তাদের কোন অনুগ্রহ অথবা যুলুম তোমা পর্যন্ত পৌঁছতে পারে না। এতদসত্ত্বেও তুমি প্রথম বাদশাহকে মহব্বত এবং দ্বিতীয় বাদশাহকে ঘৃণা করবে। তোমার এই মহব্বতও আল্লাহ তা'আলার মহব্বত দাবী করে, এমনকি চায়, তুমি আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে মহব্বত না কর। কেননা, সর্বস্তরের মানুষের প্রতি অনুগ্রহ ও কৃপাকারী তিনিই। তিনিই প্রথমে বাদশাহকে সৃষ্টি করে তাকে প্রয়োজনীয় সাজ-সরঞ্জাম সরবরাহ করেছেন।
আল্লাহ্-ই মহব্বতের যোগ্য কাণ– ৪
চতুর্থ কারণ অর্থাৎ , সৌন্দর্যশালীকে মহব্বত করা। এখানে মহব্বতকারী সৌন্দর্য ছাড়া অন্য কোন উপকারের ভিত্তিতে মহব্বত করে না। এটাও মানুষের স্বভাবের অন্তর্ভুক্ত। সৌন্দর্য দু’প্রকার । এক, বাহ্যিক, যা চর্মচক্ষে দেখা যায় । দুই, অভ্যন্তরীণ, যা অন্তর্দৃষ্টি দ্বারা অনুভব করা যায়। সৌন্দর্য মাত্রই অনুভবকারীর কাছে প্রিয়। যদি অন্তর্দৃষ্টির দ্বারা অনুভব করা হয়, তবে মহব্বত আন্তরিক হবে । যেমন, পয়গম্বর, ওলী ও সচ্চরিত্রবানদের মহব্বত। এক্ষেত্রে মহব্বত হয়; কিন্তু এই মাহবুবদের মুখমণ্ডল দৃষ্টির অন্তরালে থাকে। তবে অভ্যন্তরীণ মুখমণ্ডল অর্থাৎ, তাদের গুণাবলী দৃষ্টির সামনে থাকে। উদাহরণতঃ কেউ রসূল অথবা সিদ্দীকে আকবর অথবা ইমাম শাফেঈকে মহব্বত করলে এর কারণ হবে, তাঁদের গুণাবলী তথা জ্ঞান-গরিমা তাকে মুগ্ধ করেছে। অথচ তাঁদের গুণাবলী আল্লাহ তা'আলার গুণাবলীর সামনে অসম্পূর্ণ। অতএব, আল্লাহর গুণাবলীর কারণে মহব্বত আরও বেশী হবে।
আল্লাহ্-ই মহব্বতের যোগ্য কারণ- ৫
পঞ্চম কারণ অর্থাৎ, পারস্পরিক মিল হওয়া। মহব্বতের মধ্যে এরও দখল রয়েছে। কেননা, যে বস্তু যে বস্তুর সাথে সামঞ্জস্যশীল, সে সেদিকেই আকৃষ্ট হয়। এ কারণেই ছোটরা ছোটদেরকে এবং বড়রা বড়দেরকে মহব্বত করে। মিল কখনও বাহ্যিক বিষয়ের হয়ে থাকে। যেমন, ছোটদের মিল ছোটদের সাথে। আবার কখনও গোপন বিষয়ে হয়ে থাকে, যা অন্যেরা জানে না । যেমন, ঘটনাক্রমে দু’ব্যক্তির মধ্যে বন্ধুত্ব হয়ে যায়, অথচ তার পূর্বে কখনও একে অপরকে দেখে না এবং তাদের মধ্যে স্বার্থের কোন আদান-প্রদান থাকে না। এ গোপন মিলও মানুষ এবং আল্লাহ তাআলার মধ্যে মহব্বত দাবী করে। কেননা, আল্লাহ ও মানুষের মধ্যে এমন অভ্যন্তরীণ বিষয়সমূহে মিল রয়েছে, যার কিছু অংশ পুস্তকে লিপিবদ্ধ করা যায় এবং কিছু লিপিবদ্ধ করা সম্ভব নয়; বরং সেগুলো যবনিকার অন্তরালে গোপন থাকতে দেয়াই সমীচীন, যাতে সাধকরা সাধনায় সিদ্ধিলাভের পর নিজেরাই জেনে নেয়। যে মিল লিপিবদ্ধ করার যোগ্য, তা হচ্ছে যেসব গুণ অনুসরণ করার আদেশ আল্লাহ তা'আলা দিয়েছেন, সেগুলোতে তাঁর নিকটবর্তী হওয়া। আল্লাহ পাক এরশাদ করেছেন : “তোমরা আল্লাহর চরিত্রে চরিত্রবান হয়ে যাও”। অর্থাৎ, জ্ঞান-গরিমা, সহনশীলতা, অনুগ্রহ, কৃপা, অপরের কুল্যাণ সাধন, জীবে দয়া, অপরের হিতাকাঙ্ক্ষা ইত্যাদি খোদায়ী গুণসমূহ অর্জন কর। কেননা, এগুলোর প্রত্যেকটি গুণ মানুষকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে। পক্ষান্তরে যে মিল পুস্তকে লেখা যায় না, তা এমন বিশেষ মিল, যা কেবল মানুষের মধ্যে পাওয়া যায় — ফেরেশতাদের মধ্যে নয়। এদিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে এই আয়াতে— “তারা আপনাকে রূহ্ সম্পর্কে প্রশ্ন করে। বলে দিন — রূহ্ আমার পালনকর্তার আদেশের অংশ।” এতে বলা হয়েছে যে, রূহ মানুষের
জ্ঞান-বুদ্ধির সীমার বাইরে। নিম্নোক্ত আয়াতে আরও স্পষ্ট করে বলা হয়েছে : “অতঃপর আমি যখন তাকে সুগঠিত করব এবং তার মধ্যে আমার রূহ্ ফুঁকে দেব”) বলা বাহুল্, এই গোপন মিলের কারণেই আল্লাহ তা'আলা ফেরেশতাদেরকে নির্দেশ দিলেন আদমকে সেজদা করতে। এই মিলের দিকে ইঙ্গিত রয়েছে এ আয়াতে : “হে আদম, আমি আপনাকে পৃথিবীতে আমার প্রতিনিধি করেছি”।
বলা বাহুল্য, মানুষ কেবল এ মিলের কারণেই আল্লাহ তা'আলার প্রতিনিধিত্ব করার অধিকারী হয়েছে। নিম্নোক্ত হাদীসেও এদিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে : “আল্লাহ আদম (আঃ)-কে নিজের আকৃতিতে সৃজন করেছেন।” এ থেকে কোন কোন স্বল্প- জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তি আল্লাহর জন্যে দেহ ও আকৃতি গড়ে নিয়েছেন (নাউযুবিল্লাহ)। নিম্নোক্ত হাদীসে কুদসীতেও এই মিলের প্রতি ইঙ্গিত পাওয়া যায়। আল্লাহ পাক হযরত মূসা (আঃ)-কে বললেন : আমি অসুস্থ হয়েছি, তুমি আমার কুশল জিজ্ঞাসা করনি। হযরত মূসা (আঃ) আরয করলেন : ইলাহী, এটা কিরূপে সম্ভব? উত্তর হল : আমার অমুক বান্দা অসুস্থ হয়েছিল। তুমি তার অবস্থা জিজ্ঞাসা করনি। তুমি যদি তার অবস্থা জিজ্ঞাসা করতে, তবে আমাকে তার কাছে পেতে। বলা বাহুল্য, আল্লাহ ও মানুষের মধ্যকার এই মিল তখন প্রকাশ পায়, যখন মানুষ ফরয কর্মসমূহ পালন করার পর নফল এবাদতে মশগুল হয়। যেমন, অন্য একটি হাদীসে কুদসীতে বলা হয়েছে : “বান্দা সর্বদা নফল এবাদত দ্বারা আমার নৈকট্য অর্জন করতে থাকে। অবশেষে আমি তাকে মহব্বত করি। যখন মহব্বত করি, তখন তার কান হয়ে যাই, যার মাধ্যমে সে শুনে, তার চোখ হয়ে যাই, যার দ্বারা সে দেখে এবং তাঁর জিহ্বা হয়ে যাই, যাতে সে কথা বলে।” মোটকথা, মিল ও মহব্বতের একটি বড় কারণ, যা অধিক শক্তিশালী, উৎকৃষ্ট ও অচিন্তনীয়। এর অস্তিত্ব খুবই বিরল। মহব্বতের উপরোক্ত পাঁচটি কারণই আল্লাহ তা'আলার মধ্যে আক্ষরিক অর্থে একত্রিত রয়েছে এবং সবগুলো উচ্চস্তরে রয়েছে। এমতাবস্থায় অন্তর্দৃষ্টি বিশিষ্ট মনীষীগণের মতে একমাত্র আল্লাহর মহব্বতই গ্রহণযোগ্য হতে পারে। মানুষের মধ্যে কোন ব্যক্তি যদি এগুলোর মধ্য থেকে কোন এক কারণে মাহবুব হয়, তবে অন্য ব্যক্তিরও সে কারণে মাহবুব হওয়া সম্ভব। এটা অংশীদারিত্ব, যা মহব্বতের ক্ষেত্রে অসম্পূর্ণতার প্রমাণ। কিন্তু আল্লাহ তা'আলার সাথে তাঁর চূড়ান্ত প্রতাপ ও সৌন্দর্যের গুণাবলীতে কোন শরীক বর্তমানেও নেই, ভবিষ্যতেও সম্ভব নয়। সুতরাং প্রমাণিত হল যে, আসল মহব্বতের হকদার সেই সত্তা, যাতে কখনও অপরের অংশীদারিত্ব নেই।
============
(পরবর্তী পর্ব– খোদায়ী মহব্বত শক্তিশালী হওয়ার উপায়)

অহংকার ও আত্মপ্রীতি (পর্ব- ১)

 অহংকার ও আত্মপ্রীতি (পর্ব- ১)

——————–
অহংকার ও আত্মপ্রীতি মারাত্মক ব্যাধি-
রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়া-সাল্লাম) এরশাদ করেন যে, আল্লাহ তা'আলা বলেন : “অহংকার আমার চাদর এবং মহত্ত্ব আমার পরিধেয়। যে ব্যক্তি এ দুটি বিষয়ে আমার সাথে বিরোধ করে, আমি তাকে চুরমার করে দেব। অন্য এক হাদীসে আছে : “তিনটি বিষয় বিনাশকারী।
> এক, কৃপণতা, মানুষ যার অনুগত হয়।
> দুই, মানসিক প্রবৃত্তি, মানুষ যার অনুগামী হয়।
> তিন, আত্মপ্রীতি।
অতএব, অহংকার ও আত্মপ্রীতি মারাত্মক ব্যাধি। অহংকারী ও আত্মপ্রিয় ব্যক্তি রুগ্ন এবং আল্লাহর দুশমন। এ খণ্ডে বিনাশকারী বিষয়সমূহ বর্ণনা করাই আমাদের উদ্দেশ্য বিধায় অহংকার ও আত্মপ্রীতি সম্পর্কে আলোচনা করা নেহায়েত জরুরী। নিম্নে দুটি বিষয়কে পৃথক পৃথক বর্ণনা করা হচ্ছে ।

অহংকারের নিন্দা —
কোরআন পাকে বহু স্থানে আল্লাহ তা'আলা অহংকার ও অহংকারীদের নিন্দা বর্ণনা করেছেন। যেমন এরশাদ হয়েছে :—
> “যারা পৃথিবীতে অন্যায়ভাবে দাম্ভিকতা করে, আমি তাদেরকে আমার নিদর্শনাবলী থেকে হটিয়ে দিব”।
(সূরা আ'রাফ : ১৪৫)
> “এমনিভাবে আল্লাহ অন্তরে মোহর এঁটে দেন প্রত্যেক দাম্ভিক অবাধ্যের”।
> “তারা ফয়সালা চাইতে লাগল এবং ব্যর্থ হল প্রত্যেক অবাধ্য হটকারী”।
> “আল্লাহ অহংকারীদেরকে ভালবাসেন না”।
> “তারা মনে মনে খুব অহংকার করে এবং মারাত্মক সীমালঙ্ঘন করে”।
> “নিশ্চয় যারা আমার এবাদতে অহংকার করে, তারা লাঞ্ছিত হয়ে জাহান্নামে প্রবেশ করবে”।

মোটকথা, অহংকারের নিন্দা কোরআন মজীদে বহু জায়গায় বর্ণিত হয়েছে।

রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়া-সাল্লাম) বলেন,–
“যার অন্তরে সরিষাদানা পরিমাণ অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে দাখিল হবে না এবং যার অন্তরে সরিষাদানা পরিমাণ ঈমান থাকবে, সে দোযখে প্রবেশ করবে না”।

আবূ সালমা ইবনে আবদুর রহমান বর্ণনা করেন – একবার হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ও আবদুল্লাহ ইবনে উমর মারওয়ায় একত্রিত হলেন। সেখানে কিছুক্ষণ অবস্থানের পর প্রথমোক্ত জন চলে গেলেন এবং শেষোক্ত জন দাঁড়িয়ে কাঁদতে লাগলেন। লোকেরা কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন : আবদুল্লাহ ইবনে আমর আমাকে একটি হাদীস শুনিয়ে গেলেন যে, রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়া-সাল্লাম)-কে তিনি বলতে শুনেছেন, “যে ব্যক্তির অন্তরে একটি সরিষাদানা পরিমাণ অহংকার থাকবে, আল্লাহ তা'আলা তাকে অধোমুখী করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন”।
অন্য এক হাদীসে এরশাদ হয়েছে- মানুষ নিজেকে এত উঁচুতে নিয়ে যায় যে, পরিণামে সে অহংকারীদের তালিকাভুক্ত হয়ে যায়। ফলে যে শাস্তি অহংকারীরা পায়, তা সে-ও পায়।

হযরত সোলায়মান (আঃ) একদিন মানুষ, জিন ও পশুপক্ষীদেরকে ময়দানে সমবেত হতে আদেশ করলেন। সেমতে দু'লাখ মানুষ, জিন ইত্যাদি সমবেত হল। অতঃপর হযরত সোলায়মান (আঃ) এত উঁচুতে উঠলেন যে, ফেরেশতাদের তাসবীহ তাঁর শ্রুতিগোচর হল। এরপর তাঁকে নিম্নে নামানো হল, এমনকি তাঁর পদযুগল সমুদ্র স্পর্শ করল। সেখানে তিনি এই আওয়াজ শুনতে পেলেন—
যদি তোমাদের প্রভু অর্থাৎ সোলায়মানের অন্তরে কণা পরিমাণও অহংকার থাকে, তবে তাকে যতটুকু উপরে উঠানো হয়েছে, তার চেয়েও বেশী পাতালে নামিয়ে দেব।

বর্ণিত আছে, জান্নাত ও দোযখের মধ্যে কথোপকথন হল। দোযখ বলল : আমি অহংকারী ও শক্তিধরদেরকে পাব। জান্নাত বললঃ তা হলে আমি কি অপরাধ করলাম যে, দুর্বল ও অক্ষমরাই আমার মধ্যে স্থান পাবে?
আল্লাহ তা'আলা জান্নাতকে বললেন : তুমি আমার রহমত। আমি যাকে ইচ্ছা তোমার মাধ্যমে রহমত দেব। অতঃপর দোযখকে বললেন : তুই আমার আযাব। আমি যাকে ইচ্ছা, তোর মাধ্যমে আযাব দেব এবং জান্নাত ও দোযখ উভয়কে পরিপূর্ণ করে দেব।
এক হাদীসে এরশাদ হয়েছে— “দুষ্ট বান্দা সে-ই, যে জবরদস্তি ও সীমালঙ্ঘন করে এবং সর্বশক্তিমানকে ভুলে যায়। দুষ্ট বান্দা সেই, যে যুলুম করে ও অহংকার করে এবং মহান আল্লাহর প্রতি মনোযোগ দেয় না। মন্দ বান্দা সেই, যে ভ্রান্তি ও ক্রীড়াকৌতুকে মত্ত যাকে এবং কবরে মাটি হয়ে যাওয়ার কথা স্মরণ করে না। অধম বান্দা সেই, যে অবাধ্যতায় সীমা ছাড়িয়ে যায় এবং সূচনা ও পরিণতির কথা একবারও ভেবে দেখে না।

হযরত ছাবেত (রাঃ) বলেন : জনৈক ব্যক্তি রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়া-সাল্লাম)-এর খেদমতে আরয করল – অমুক ব্যক্তি সাংঘাতিক অহংকারী। তিনি বললেন : তার কি মৃত্যু নেই?
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ)-এর বাচনিক রেওয়ায়েতে রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়া-সাল্লাম) বলেন, হযরত নূহ (আঃ)-এর ওফাত নিকটবর্তী হলে তিনি আপন পুত্রদ্বয়কে ডেকে বললেন : আমি তোমাদেরকে দুটি বিষয় থেকে নিষেধ করছি এবং দুটি বিষয়ের আদেশ করছি। শিরক ও অহংকার থেকে নিষেধ করছি এবং কালেমায়ে তাইয়েবার আদেশ করছি। কেননা, আকাশ ও পৃথিবী এবং এতদুভয়ের মধ্যবর্তী সবকিছু যদি এক পাল্লায় রাখা হয় এবং কালেমায়ে তাইয়েবা অন্য পাল্লায় রাখা হয়, তবে কালেমায়ে তাইয়েবার পাল্লাই ভারী হবে। দ্বিতীয় যে বিষয়ের আদেশ করছি, তা হচ্ছে “সোবহানাল্লাহি ওয়া বেহামদিহী”। কেননা, এরই মাধ্যমে প্রত্যেক বস্তুকে রিযিক দেয়া হয়।

হযরত ঈসা (আঃ) এরশাদ করেন, মোবারক সেই বান্দা, যাকে আল্লাহ তা'আলা তাঁর কিতাব শিক্ষা দেন এবং সে নিরহংকার হয়ে দুনিয়া ত্যাগ করে।
অন্য এক হাদীসে আছে- “কিয়ামতের দিন অহংকারীরা পিপীলিকার আকৃতিতে পুনরুত্থিত হবে। মানুষ তাদেরকে, পদতলে পিষ্ট করে চলবে। সর্বপ্রকার লাঞ্ছনা তাদেরকে ঘিরে রাখবে। দোযখীদের পুঁজ ও কাদা তাদেরকে পান করতে দেয়া হবে”। হযরত আবূ হুরায়রা (রঃ)-এর রেওয়ায়েতে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়া-সাল্লাম) বলেন : “প্রতাপশালী ও অহংকারী লোক কিয়ামতে পিঁপড়ার আকারে উত্থিত হবে। মানুষ তাদেরকে পায়ের নিচে পিষ্ট করবে। কেননা, তারা দুনিয়াতে আল্লাহকে হেয় মনে করেছিল”।
মোহাম্মদ ইবনে ওয়াসে বলেন : আমি বেলাল ইবনে আবী বুরদার কাছে গিয়ে বললাম, তোমার পিতা আমার কাছে তার পিতার বাচনিক রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়া-সাল্লাম)-এর এই হাদীসটি বর্ণনা করেছিলেন— দোযখে “মুহিব” নামক একটি জঙ্গল আছে। আল্লাহ পাকের ইচ্ছা অহংকারীরা তাতে বাস করুক। সুতরাং হে বেলাল, তুমি নিজেকে অহংকারমুক্ত রাখ। অন্য এক হাদীসে বলা হয়েছে- যে ব্যক্তি তিনটি বিষয় থেকে মুক্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করবে, সে জান্নাতে দাখিল হবে- এক, অহংকার, দুই, ফরয এবং তিন, খিয়ানত তথা বিশ্বাস ভঙ্গকরণ।


(পরবর্তী পর্ব অহংকারের নিন্দায় মনীষীদের উক্তি)

বিবাহের ফযীলত:— (পর্ব– ১)



 বিবাহের ফযীলত:— (পর্ব– ১)

প্রকাশ থাকে যে, বিবাহ ধর্ম কাজে সহায়ক, শয়তানের চক্রান্ত থেকে আত্মরক্ষার সুদৃঢ় প্রাচীর এবং উম্মতের সংখ্যা বৃদ্ধির প্রধান উপায়। এই সংখ্যাবৃদ্ধির মাধ্যমে নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) অন্যান্য পয়গম্বরের মোকাবিলায় গর্ব করবেন। এ দিক দিয়ে বিবাহের কারণাদি অনুসন্ধান, সুন্নতসমূহের রক্ষণাবেক্ষণ এবং আদব সম্পর্কে আলোচনা খুবই সমীচীন। আমরা এর উদ্দেশ্য, প্রকার ও প্রয়োজনীয় বিধানাবলী তিনটি পরিচ্ছেদে বর্ণনা করছি। প্রথম পরিচ্ছেদে বিবাহের ফযীলত ও বিবাহের প্রতি বিমুখতা।
বিবাহের ফযীলত—
বিবাহের ফযীলত ও শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে আলেমগণ মতভেদ করেছেন। কেউ কেউ এর ফযীলত এমনি বর্ণনা করেন যে, বিবাহ করা আল্লাহর এবাদতের জন্যে নির্জনবাস অপেক্ষা উত্তম। কেউ ফযীলত স্বীকার করেন, কিন্তু নারী সহবাসের উদ্দীপনা না থাকলে এবাদতের জন্যে নির্জনবাসকে উত্তম বলেন। কেউ কেউ বলেন : আমাদের এ যুগে বিবাহ না করাই শ্রেয়ঃ। আগেকার যুগে এর ফযীলত ছিল। তখন মহিলাদের বদভ্যাস ছিল না। এখন বাস্তব সত্য কি, তা পক্ষ ও বিপক্ষের হাদীস বর্ণনা এবং বিবাহের উপকারিতা ও অপকারিতা ব্যাখ্যা করার পরই জানা যাবে। তাই আমরা এ পরিচ্ছেদটি চার ভাগে বিভক্ত করছি।
বিবাহের ফষীলত সম্পর্কিত আয়াত:—
> “তোমাদের বিধবাদেরকে বিবাহ দাও।” এখানে (বিবাহ দাও) ব্যবহৃত হয়েছে, যাতে বিবাহ ওয়াজিব বুঝা যায়।
> “স্বামীদেরকে বিয়ে করে নিতে তাদেরকে বাধা দিয়ো না”।
এখানে বিয়েতে বাধাদান নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পয়গম্বরগণের প্রশংসা ও গুণকীর্তনে এরশাদ হয়েছে :
> “আমি আপনার পূর্বে অনেক রসূল প্রেরণ করেছি এবং তাদেরকে স্ত্রী ও সন্তান সন্ততি দিয়েছি”।
একথা অনুগ্রহ ও কৃপা প্রকাশের স্থলে বলা হয়েছে। আল্লাহ তা’আলা তাঁর ওলীগণের প্রশংসাও করছেন,
> “তারা তাঁর কাছে সন্তান সন্ততির জন্যে আবেদন করেন”। সেমতে বলা হয়েছে যারা বলে, পরওয়ারদেগার,
> “আমাদেরকে আমাদের স্ত্রী ও সস্তান-সন্ততির তরফ থেকে চক্ষুর শীতলতা দান করুন এবং আমাদেরকে পরহেযগারদের অগ্রদূত করুন”।
বলা হয়, আল্লাহ তাআলা তাঁর পবিত্র কিতাবে সেই পয়গম্বরগণেরই উল্লেখ করেছেন, যারা সপত্নীক ছিলেন। হাঁ, দুজন পয়গম্বর হযরত ইয়াহইয়া ও হযরত ঈসা (আঃ) এর ব্যতিক্রম। তাঁদের মধ্যে ইয়াহইয়া (আঃ) সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, তিনি বিবাহ করেছিলেন; কিন্তু সহবাস করেননি। কেবল বিবাহের ফযীলত অর্জন ও বিবাহের পদ্ধতি প্রতিষ্ঠিত করার জন্যে বিবাহ করেছিলেন। হযরত ঈসা (আঃ) যখন পুনরায় পৃথিবীতে আগমন করবেন, তখন বিবাহ করবেন এবং সন্তানাদিও হবে।

—————-
(পরবর্তী পর্ব– বিবাহের ফযীলত সম্পর্কিত হাদীস)

মঙ্গলবার, ২ মে, ২০২৩

মহব্বত (পর্ব- 2) মহব্বতের স্বরূপ ও কারণাদি



মহব্বত (পর্ব- ২)

এহইয়াউ উলুমিদ্দীন - ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)


মহব্বতের স্বরূপ ও কারণাদি :

চেনা ও জানা ছাড়া মহব্বত হতে পারে না। মানুষ তাকেই মহব্বত করে, যাকে সে চেনে। জড় পদার্থ মহব্বত করে না। কারণ, তার মধ্যে চেনার শক্তি নেই। তাই মহব্বত একমাত্র মানুষের বৈশিষ্ট্য। মানুষ যেসব বস্তু চেনে ও জানে, সেগুলো তিন প্রকার।

(১) মানুষেরই স্বভাবের সাথে সামঞ্জস্যশীল ও আনন্দদায়ক।

(২) মানব-স্বভাবের পরিপন্থী ও কষ্টদায়ক।

(৩) আনন্দ ও কষ্ট কোন কিছুই দেয় না।

এ তিন প্রকার বস্তুর মধ্যে যে বস্তু চিনলে ও জানলে মানুষ আনন্দ ও সুখ পায়, সে বস্তুই মানুষের প্রিয় হয়ে থাকে। আর যে বস্তু চিনলেও জানলে কষ্ট হয়, সে বস্তু অপ্রিয় হয়ে থাকে। যে বস্তু চেনা-জানার পর কষ্টও হয় না, সুখও হয় না, সেটাকে প্রিয়-অপ্রিয় কোন কিছুই বলা যায় না।

কোন বস্তু প্রিয় হওয়ার অর্থ, মানব-স্বভাবে তার প্রতি ঝোঁক থাকা, আর অপ্রিয় হওয়ার অর্থ ঝোঁকের পরিবর্তে ঘৃণা থাকা। সুতরাং যে বস্তু থেকে আনন্দ পাওয়া যায়, সে বস্তুর প্রতি স্বভাবের ঝোঁক থাকার নাম মহব্বত। এই ঝোক যদি পাকাপোক্ত ও শক্তিশালী হয়ে যায়, তবে তাকে বলা হয় এক। এ হচ্ছে মহব্বতের স্বরূপ, যা জানা অত্যন্ত জরুরী।


মহব্বতের প্রথম কারন-

মহব্বতের প্রথম কারণ হল মহব্বত চেনা ও জানার অনুগামী। চেনা ও জানার হাতিয়ার হচ্ছে ইন্দ্রিয়। ইন্দ্রিয় বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত বিধায় মহব্বতও বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত হবে। কেননা, প্রত্যেক ইন্দ্রিয় দ্বারা একটি বিশেষ বস্তুকে চেনা যায় এবং বিশেষ বস্তু থেকেই আনন্দ পাওয়া যায়। উদাহরণত : চোখের আনন্দ দেখার বস্তুসমূহে। কানের আনন্দ হৃদয়গ্রাহী সঙ্গীত ও মনোমুগ্ধকর কণ্ঠস্বরে। নাকের আনন্দ উৎকৃষ্ট সুগন্ধিতে। আস্বাদন শক্তির আনন্দ সুস্বাদু খাদ্যে। স্পর্শ শক্তির আনন্দ মৃদুতা ও কোমলতায়। এসব বস্তু ইন্দ্রিয়কে আনন্দ দেয় বিধায় এগুলো প্রিয়।

রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া-সাল্লাম) এরশাদ করেন "তোমাদের দুনিয়া থেকে আমার কাছে তিনটি বস্তু প্রিয়, তা হল- সুগন্ধি, নারী এবং আমার চোখের শীতলতা নামাযে।

এখানে তিনি সুগন্ধিকে প্রিয় বলেছেন। বলা বাহুল্য, এতে চোখ ও কানের কোন অংশ নেই; বরং এতে কেবল ঘ্রাণশক্তির অংশ রয়েছে। নারীকে প্রিয় বলা হয়েছে। এতে ঘ্রাণ শক্তির অংশ নেই; বরং দৃষ্টিশক্তি ও স্পর্শ শক্তির অংশ রয়েছে।

পঞ্চ-ইন্দ্রিয়ের আনন্দে মানুষের সাথে চতুষ্পদ জন্তুও শরীক। অতএব, মহব্বতকে শুধু পঞ্চ-ইন্দ্রিয়ের মধ্যে সীমিত করলে আল্লাহ তা'আলার মহব্বত হতে পারে না। কেননা, আল্লাহ তা'আলা ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে চেনেন ও জানেন না। এমতাবস্থায় মানুষের বৈশিষ্ট্য যে মহব্বত, তা নিষ্ফল সাব্যস্ত হবে এবং ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়- যা দ্বারা মানুষ জন্তু-জানোয়ার থেকে পৃথক এবং যাকে বুদ্ধি, নূর, অন্তর ইত্যাদি বলা যায়, তা মিথ্যা হয়ে যাবে। এটা অবান্তর। কেননা, অন্তদৃষ্টি চর্মচক্ষুর তুলনায় অধিক শক্তিশালী। অন্তর চোখের তুলনায় অধিক চেনে ও জানে। 

অর্থসম্ভার- যা বুদ্ধি দ্বারা জানা যায়, তার সৌন্দর্য চোখে দেখা আকৃতিসমূহের তুলনায় অনেক বেশী। অতএব, অন্তর যে সকল ইন্দ্রিয় বহির্ভুত বিষয় অনুভব করে এবং অনুভব করে আনন্দ পায়, সে আনন্দও অধিক পূর্ণাঙ্গ হবে। কেননা, সুস্থ স্বভাবের ঝোক সেদিকে অধিক জোরদার হবে। এই ঝোকের নামই হল মহব্বত। এমতাবস্থায় যে খোদায়ী মহব্বতকে অস্বীকার করবে, সে চতুষ্পদ জন্তুর স্তরে অবস্থান করবে অথবা পঞ্চ-ইন্দ্রিয়ের অনুভূতিকে ছাড়িয়ে যেতে পারে।

প্রত্যেক জীবিত ব্যক্তির কাছে সর্বপ্রথম প্রিয় বস্তু হচ্ছে তার নিজের সত্তা। নিজ সত্তাকে মহব্বত করার উদ্দেশ্য হল, তার স্বভাবের মধ্যে আপন অস্তিত্ব ও তার স্থায়িত্বের বাসনা এবং নাস্তি ও ধ্বংসের প্রতি অনীহা। এটা আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে মানুষের মজ্জার অন্তর্গত। সত্তার মহব্বতের কারণেই মানুষ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের নিরাপত্তা, ধন-সম্পদ, সন্তান-সন্ততি, পরিবার-পরিজন ও বন্ধু-বান্ধবকে মহব্বত করে। এগুলোর প্রতি মহব্বতের কারণ সয়ং এগুলোর সত্তা নয়; বরং এগুলোর মাধ্যমে নিজের অস্তিত্বের স্থায়িত্ব ও পূর্ণতা নিশ্চিত হয় বলে। এ কারণেই মানুষ তার পুত্রকে মহব্বত করে, যদিও পুত্রের দ্বারা তার কোন উপকার হয় না এবং নানাবিধ কষ্ট ও পীড়া সইতে হয়। কেননা, তার মৃত্যুর পর পুত্রই হবে তার স্থলাভিষিক্ত। সে যেন বংশের স্থায়িত্বের মধ্যেও নিজের এক প্রকার স্থায়িত্ব দেখতে পায়। এমনিভাবে আত্মীয়-স্বজনের মহব্বত নিজ সত্তার মহব্বতের পূর্ণতার কারণেই হয়ে থাকে। কারণ, আত্মীয়-স্বজনের কারণে সে নিজেকে শক্তিশালী মনে করে এবং তাদের কৃতিত্বকে নিজের গৌরব মনে করে। এই বক্তব্য থেকে জানা গেল, প্রত্যেক মানুষের কাছে তার সত্তা, সত্তার পূর্ণতা ও তার স্থায়িত্ব মহব্বতের বিষয়। এ হচ্ছে মহব্বতের প্রথম কারণ।


মহব্বতের দ্বিতীয় কারণ-

মহব্বতের দ্বিতীয় কারণ হল অনুগ্রহ। কথায় বলে, মানুষ অনুগ্রহের দাস। অনুগ্রহকারীকে মহব্বত করা মানুষের মজ্জাগত স্বভাব। হাদীসে বর্ণিত আছে-"হে আল্লাহ ! কোন পাপাচারীর অনুগ্রহ আমার উপর রাখিয়েন-না। রাখলে আমার অন্তর তাকে মহব্বত করবে। এতে ইঙ্গিত হয়, অনুগ্রহকারীকে আন্তরিকভাবে মহব্বত করার ব্যাপারটি বাধ্যতামূলক। এটি এড়ানো যায় না। এ কারণেই মানুষ কখনও এমন ব্যক্তিকে মহব্বত করে, যার সাথে তার কোন আত্মীয়তার সম্পর্ক নেই-নিছক অপরিচিত।


মহব্বতের  তৃতীয় কারণ-

মহব্বতের তৃতীয় কারণ হল কোন বস্তুকে সেই বস্তুর সত্তার কারণে মহব্বত করা, তার কাছ থেকে কোন উপকার পাওয়ার কারণে নয়; বরং সে বস্তুর সত্তাই সাক্ষাৎ উপকার। এ মহব্বতকে হাকিকী তথা সত্যিকার মহব্বত বলা হয়। এরূপ মহব্বতের স্থায়িত্ব আশা করা যায়। উদাহরতঃ রূপ-সৌন্দর্যের মহব্বত কেবল রূপ ও সৌন্দর্যের কারণেই হয়। এতে সৌন্দর্য চেনা ও অনুভব করাই সাক্ষাৎ আনন্দ। এখানে ধারণা করা উচিত নয় যে, সুশ্রী অবয়বের মহব্বত কাম-বাসনা চরিতার্থ করা ও বাসনা করা ছাড়া সম্ভব নয়। উচিত এজন্যে নয় যে, কাম-বাসনা চরিতার্থ করা একটি ভিন্ন আনন্দ এবং স্বয়ং রূপও ভিন্ন আনন্দদায়ক। যেমন সবুজের সমারোহ ও বহমান পানিকে মহব্বত করা হয়, কিন্তু তা এ জন্যে নয় যে, এগুলোতে পানাহারের উপকার আছে। দেখা ছাড়া এগুলোতে অন্য কোন আনন্দ নেই। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-সাল্লাম) সবুজ শ্যামল বনানী ও বহমান পানিকে খুব মহব্বত করতেন। সকল সুস্থ মন বাগবাগিচা, ফুল, সুশ্রী জন্তু-জানোয়ার, মনোহারী ফলের বৃক্ষ এবং সুন্দর চিত্রের দিকে দৃষ্টিপাত করা আনন্দের কারণ মনে করে। এমনকি, মানুষ এগুলোর দ্বারা মনের দুঃখ দূর করে। এমন কোন রূপ-সৌন্দর্য নেই, যা অনুভব করাতে আনন্দ নেই। এখন যদি প্রমাণিত হযয়ে যায় যে, আল্লাহ তা'আলা সৌন্দর্যশীল, তবে যার দৃষ্টিতে তার সৌন্দর্য ফুটে উঠবে, তার কাছে অবশ্যই তিনি মহব্বতের পাত্র হবেন। হাদীসে বলা হয়েছে - আল্লাহ সৌন্দর্যশালী। তিনি সৌন্দর্যকে ভালবাসেন।


মহব্বতের চতুর্থ কারণ-

মহব্বতের চতুর্থ কারণ স্বয়ং রূপ-সৌন্দর্য। এখানে রূপ ও সৌন্দর্যের অর্থ বর্ণনা করা জরুরী। ভাবুক ও কল্পনা-বিলাসীদের মতে যার দৈহিক গড়ন সুসমঞ্জস, আকার-আকৃতি সঠিক এবং রং উজ্জ্বল গৌর, সে রূপবান ও সৌন্দর্যশালী। অধিকাংশ মানুষের মতেও যা দৃষ্টিকে তৃপ্তি দেয়, তাই সুন্দর। তাই তাদের ধারণা, যে বস্তু দৃষ্টিগোচর হয় না, যার আকার-আকৃতি নেই, রং ও বর্ণ এবং এবং কল্পনায় প্রতিষ্ঠিত হয় না, তার রূপবান ও সৌন্দর্যশালী হওয়া সম্ভব নয়। যখন সৌন্দর্যশীল হবে না, তখন তাকে অনুভব করে আনন্দ হবে না। এটা তাদের বিরাট ভ্রান্তি। কেননা, দৃষ্টিগ্রাহ্য হওয়া, গড়ন সুসমঞ্জস হওয়া এবং রং উজ্জ্বল হওয়ার মধ্যেই সৌন্দর্য সীমিত নয়। উদাহরণতঃ আমরা বলি, এই হস্তলিপি সুন্দর, এই কণ্ঠস্বর সুন্দর। এখানে গড়ন, আকার-আকৃতি ও রং কিছুই নেই। অতএব, বুঝা গেল, মুখাকৃতি ও অবয়বের মধ্যেই সৌন্দর্য সীমিত নয়। প্রত্যেক বস্তুর সৌন্দর্যের মাপকাঠি হচ্ছে তার মধ্যে তার উপযুক্ত ও সম্ভাব্য সকল গুণের সমাবেশ ঘটা। যখন কোন বস্তুর মধ্যে সম্ভাব্য সকল গুণের সমাবেশ হয়ে যাবে, তখন সে বস্তু হবে সর্বাঙ্গ-সুন্দর। যদি কতক গুণের সমাবেশ ঘটে, তবে সৌন্দর্যও সে তুলনায়ই হবে। উদাহরণতঃ আমরা সে ঘোড়াকে সুন্দর বলব, যার মধ্যে সুশ্রী আকার-আকৃতি, রং-ঢং দ্রুতগতি ইত্যাদি সম্ভাব্য গুণ পূর্ণ মাত্রায় থাকে।

জানা দরকার, সৌন্দর্য ইন্দ্রিয়গাহ বিষয়াদির মধ্যেই সীমিত নয়; বরং ইন্দ্রিয় বহির্ভূত বিষয়াদির মধ্যেও বিদ্যমান। উদাহরণতঃ আমরা বলি এই চরিত্র কত সুন্দর। এই বিদ্যা কত ভালো। চরিত্র ও বিদ্যার মধ্যে কোনটিই পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের দ্বারা অনুভূত হয় না; বরং অন্তদৃষ্টির নূর দ্বারা এগুলো উপলব্ধি করা হয়। এসব গুণ মানুষের প্রিয় এবং যারা এসব গুণে গুণান্বিত, তারাও প্রিয়। উদাহরণতঃ মানুষের এটা মজ্জাগত স্বভাব যে, তারা পয়গম্বরগণকে এবং সাহাবায়ে কেরামকে মহব্বত করে। অথচ তাদের কাউকে চোখে দেখেনি। মাযহাবসমূহের ইমামগণের মহব্বতও তেমনি। বলা বাহুল্য, তাদের এই মহব্বত বাহ্যিক আকার-আকৃতির কারণে নয়। বাহ্যিক আকার-আকৃতি তো কবে মাটির সাথে মিশে গেছে; বরং তাদের মহব্বতের কারণ হচ্ছে ধর্মীয় গুণাবলী যেমন, তাকওয়া, এলেম, ধর্ম প্রচার, শরীয়ত সম্পর্কে গবেষণা ইত্যাদি। এসব গুণের সৌন্দর্য অনুভব করা অন্তদৃষ্টির নূর ছাড়া সম্ভব নয়।


মহব্বতের পঞ্চম কারণ-

মহব্বতের পঞ্চম কারণ আত্মিক মিল, যা মহব্বতকারী ও মাহবুবের মধ্যে থাকে। প্রায়ই দু'ব্যক্তির মধ্যে প্রগাঢ় মহব্বত হতে দেখা যায়; কোন সৌন্দর্য ও উপকার পাওয়ার কারণে নয়; বরং কেবল আত্মিক মিলের কারণে। হাদীস শরীফে আছে- আত্মাসমূহের যেগুলো পরস্পর পরিচিত হয়েছে, সেগুলো পরস্পর মহব্বতের বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে, আর যেগুলো পরিচিত হয়নি, সেগুলো পৃথক হয়ে গেছে।

উপরোক্ত বর্ণনা থেকে মহব্বতের পাঁচটি কারণ পাওয়া গেল। (এক) নিজের অস্তিত্বের পূর্ণতা ও স্থায়িত্বের মহব্বত। ( দুই ) অনুগ্রহের কারণে মহব্বত। (তিন) কোন বস্তুর সত্তার কারণে মহব্বত করা। (চার) স্বয়ং রূপ-সৌন্দর্যের কারণে মহব্বত করা। (পাঁচ) আত্মিক মিলের কারণে মহব্বত। যদি এ কারণগুলো একই ব্যক্তির মধ্যে বিদ্যমান থাকে, তবে নিঃসন্দেহে মহব্বত বহুগুণ বেশী হবে।


(পরবর্তী পর্ব- মহব্বতের যোগ্য একমাত্র আল্লাহর সত্বা)


@everyone

 

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...