রবিবার, ২৫ জুন, ২০২৩

জিহ্বার বিপদাপদ- (পর্ব - ১) জিহ্বার বিপদাশংকা ও চুপ থাকার ফযীলত

   

 


জিহ্বার বিপদাপদ - (পর্ব - ১)
এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

জিহ্বার বিপদাশংকা ও চুপ থাকার ফযীলত--
জানা উচিত, জিহ্বার কারণে বিপদাশংকা অনেক বড় এবং এ থেকে আত্মরক্ষা করার একমাত্র উপায় হচ্ছে চুপ থাকা। এ কারণেই শরীয়তে চুপ থাকার প্রশংসা ও উৎসাহ প্রদান লক্ষ্য করা যায়। রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম)) এরশাদ করেন- “যে চুপ থাকে, সে মুক্তি পায়”।

তিনি আরও বলেন- “চুপ থাকা প্রজ্ঞা ও সাবধানতা। কিন্তু কম লোকই চুপ থাকে”।
আবদুল্লাহ্ ইবনে সুফিয়ানের পিতা রেওয়ায়াত করেন, আমি রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম))-এর খেদমতে আরজ করলাম : ইসলাম সম্পর্কে এমন একটি কথা বলে দিন, যেন আপনার পরে কারও কাছে কিছু জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন না হয়। তিনি বললেন -“বল, আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করলাম; এরপর সরল পথে কায়েম থাক”। আমি আরজ করলাম : আমি কি বিষয় থেকে বেঁচে থাকব? তিনি জিহ্বার দিকে হাতে ইশারা করে বললেন : “এ থেকে বেঁচে থাক”।
ওকবা ইবনে আমের বলেন : আমি রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম))-এর খেদমতে আরজ করলাম : মুক্তির উপায় কি? তিনি (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম) বললেন : “জিহ্বাকে সংযত রাখ, গৃহে থাক এবং গোনাহের জন্যে ক্রন্দন কর”। তিনি আরও বলেন : “যে আমাকে জিহ্বা ও লজ্জাস্থানের নিশ্চয়তা দেবে, আমি তাকে জান্নাতের নিশ্চয়তা দেব”।
অন্য এক হাদীসে আছে- “যে ব্যক্তি উদর, লজ্জাস্থান ও জিহ্বার অনিষ্ট থেকে বেঁচে থাকে, সে সকল অনিষ্ট থেকেই নিরাপদ থাকে। কেননা, অধিকাংশ লোক এ তিনটি খাহেশ দ্বারাই বিপন্ন হয়”।
রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম)-কে জিজ্ঞেস করা হল, কোন বিষয়ের কারণে মানুষ অধিক পরিমাণে জান্নাতে যাবে? তিনি বললেন “আল্লাহর ভয় ও সচ্চরিত্রতার কারণে”। আবার প্রশ্ন করা হল, কোন বিষয়ের- কারণে বেশীর ভাগ লোক জাহান্নামে যাবে? তিনি বললেন : “দুটি খালি বস্তুর কারণে- মুখ ও লজ্জাস্থান”। এখানে মুখের অর্থ জিহ্বার বিপদাপদও হতে পারে। কেননা মুখ জিহ্বার পাত্র এবং মুখের অর্থ পেটও হতে পারে। কেননা, পেট ভরার পথ মুখই।
হযরত মুয়ায (রাঃ) রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম)-কে প্রশ্ন করলেন : সর্বোত্তম আমল কোনটি? তিনি (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম) আপন জিহ্বা বের করে তার উপর অঙ্গুলি রাখলেন; অর্থাৎ চুপ থাকা সর্বশ্রেষ্ঠ আমল।
সায়ীদ ইবনে জোবায়রের রেওয়ায়াতে রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম) বলেন : যখন সকাল হয়, তখন সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ জিহ্বাকে বলে, আমাদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় কর। তুমি সোজা থাকলে আমরাও সোজা থাকব। আর তুমি বক্র হলে আমাদের অবস্থাও তদ্রূপ হবে। হযরত ওমর (রাঃ) একবার হযরত আবু বকর (রাঃ)-কে আপন জিহ্বা ধরে টানতে দেখে জিজ্ঞেস করলেন : হে নায়েবে রসূল, আপনি এ কি করছেন? তিনি বললেন : সে আমাকে অনেক নাকানি-চুবানি খাইয়েছে। রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করেন : দেহের মধ্যে এমন কোন অঙ্গ নেই, যে আল্লাহর কাছে জিহ্বার ক্ষিপ্রতার অভিযোগ করে না।
হযরত ইবনে মসউদ (রাঃ) সাফা পাহাড়ে আরোহণ করে বলতেন : “হে জিহ্বা, ভাল কথা বল, গনীমত পাবে এবং অনিষ্ট থেকে অনুতপ্ত হওয়ার পূর্বে চুপ কর, বিপদমুক্ত থাকবে”।
লোকেরা জিজ্ঞেস করল : এটা আপনি নিজের পক্ষ থেকে বলছেন? তিনি বললেন : না। আমি রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি- বনী আদমের অধিকাংশ গোনাহ্ তার জিহ্বার মধ্যে। হযরত ওমর (রাঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করেন-
“যে জিহ্বা সংযত রাখে আল্লাহ তার দোষ গোপন রাখেন, যে ক্রোধ দমন করে, আল্লাহ তাকে আযাব থেকে রক্ষা করেন; যে আল্লাহর সামনে ওযর পেশ করে, আল্লাহ তার ওযর কবুল করেন”।
হযরত আবু হোরায়রার রেওয়ায়াতে রসূলুল্লাহ (সাঃ)
“যে আল্লাহতে ও পরকালে বিশ্বাস করে, সে যেন ভাল কথা বলে অথবা চুপ থাকে।
হযরত ঈসা (আঃ)-এর খেদমতে লোকেরা আরয করল : এমন আমল বলে দিন, যদ্দ্বারা জান্নাত লাভ করা যায়। তিনি বললেন : কখনও কথা বলো না। লোকেরা বলল : এটা তো অসম্ভব। তিনি বললেন : ভাল কথা ছাড়া মুখ থেকে কিছু বের করো না।
হযরত সোলায়মান (আঃ) বলেন : যদি ধরে নেয়ার পর্যায়ে কথা বলা রূপা হয়, তবে চুপ থাকা স্বর্ণ হবে।
এক হাদীসে আছে, মুমিনের জিহ্বা অন্তরের পেছনে থাকে। কথা বলার আগে অন্তরে চিন্তা করে, এর পর কথা বলে। মোনাফেকের জিহ্বা অন্তরের অগ্রে থাকে। সে চিন্তা-ভাবনা ছাড়াই যা মনে চায় বলে দেয়।
হযরত আবু বকর (রাঃ) কথা থেকে বিরত থাকার জন্যে মুখে কংকর রাখতেন। তিনি জিহ্বার দিকে ইশারা করে বলতেন, সে আমাকে অনেক অধঃপতিত করেছে।
হযরত তাউস (রঃ) বলেন : আমার জিহ্বা হিংস্র জন্তু। ছেড়ে দিলে আমাকে গিলে ফেলবে।
হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন : আমীর মোয়াবিয়ার দরবারে লোকজন কথা বলছিল; কিন্ত আহনাফ ইবনে কায়স (রাঃ) চুপচাপ বসেছিলেন। মোয়াবিয়া তাঁকে বলল : আপনি কিছুই বলছেন না কেন? তিনি বললেন : যদি মিথ্যা বলি, আল্লাহর ভয় লাগে, আর যদি সত্য বলি, তবে তোমার ভয় লাগে। এগুলো হচ্ছে চুপ থাকার ফযীলত।
চুপ থাকা যে শ্রেষ্ঠ এর কারণ, কথা বলার মধ্যে শত শত বিপদাশংকা থাকে। ভুল, মিথ্যা, গীবত, চোগলখোরী, রিয়া, কপটতা, নির্লজ্জতা, কথা কাটাকাটি, আত্মপ্রশংসা, বাড়িয়ে বলা, হ্রাস করা, অপরকে কষ্ট দেয়া, গোপন বিষয় ফাঁস করা ইত্যাদি সব গর্হিত কর্ম জিহ্বার কারণেই হয়ে থাকে। জিহ্বা সঞ্চালন কঠিন মনে হয় না; এর অন্তরে স্বাদ অনুভূত হয়। কথা বলায় অভ্যস্ত ব্যক্তি জিহ্বা বশে রাখবে, যেখানে বলা দরকার সেখানেই বলবে এবং যে কথা বলা উচিত নয়, তা থেকে বিরত থাকবে এটা খুবই বিরল। কেননা, কোন্ কথা বলার যোগ্য এবং কোনটি যোগ্য নয়, তা জানা খুবই কঠিন। তাই কথা বলার মধ্যে নিরাপত্তা রয়েছে। এছাড়া চুপ থাকার আরও কিছু ফায়দা আছে। তা হচ্ছে, এতে সাহস সংহত থাকে, ভয়ভীতি কায়েম থাকে এবং যিকির ও এবাদতের জন্যে অবসর হাতে আসে। চুপ থাকলে কথা বলার বিপদ থেকে দুনিয়াতে মুক্তি অর্জিত হয় এবং পরকালে হিসাব থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া যায়। আল্লাহ পাক এরশাদ করেন : “মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে, তা লেখার জন্যে তৎপর প্রহরী তার কাছেই রয়েছে”।
চুপ থাকা যে উত্তম, এর যৌক্তিক প্রমাণ হচ্ছে, কথা চার প্রকার।
(১) যার মধ্যে ক্ষতিই ক্ষতি নিহিত।
(২) যার মধ্যে উপকারই উপকার নিহিত।
(৩) যার মধ্যে ক্ষতি ও উপকার উভয়টি নিহিত।
(৪) যার মধ্যে ক্ষতিও নেই উপকারও নেই।
প্রথম প্রকার কথার ক্ষেত্রে চুপ থাকা জরুরী। তৃতীয় প্রকারে যদি উপকারের চেয়ে ক্ষতি বেশী হয়, তবে তাতেও চুপ থাকা জরুরী। চতুর্থ প্রকার কথা বলা অযথা সময় নষ্ট করার নামান্তর। সুতরাং বলার যোগ্য একমাত্র দ্বিতীয় প্রকার কথাই রয়ে গেল। শব্দান্তরে কথার এক চতুর্থাংশ কথা বলাও বিপন্মুক্ত নয়। কেননা এতে কতক গোপন বিপদ যেমন রিয়া, লৌকিকতা, আত্মপ্রীতি, গীবত, চোগলখোরী ইত্যাদি মিশ্রিত হয়ে যায়। বক্তা টেরও পায় না। তাই কথা বলার মধ্যে সর্বদা বিপদাশংকা লেগেই থাকে। যে ব্যক্তি আমাদের বিশদ বর্ণনা অনুযায়ী কথা সম্পর্কে সম্যক অবগত হয়ে যাবে, সে নিশ্চিতরূপেই হৃদয়ঙ্গম করবে যে, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম)-এর ‘যে চুপ থাকে, সে মুক্তি পায়’ উক্তিটি কতদূর সঠিক। এক্ষণে আমরা কথা সংশ্লিষ্ট বিপদের ধারাবাহিক বর্ণনা শুরু করছি।


অনর্থক কথাবার্তা

বৃহস্পতিবার, ১৫ জুন, ২০২৩

স্ত্রীর প্রতি স্বামীর কর্তব্য – ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

 স্ত্রীর প্রতি স্বামীর কর্তব্য 



স্বামীর উপর স্ত্রীর প্রচুর হক ও অধিকার রয়েছে। স্বামী স্ত্রীর প্রতি সদা সদয় ও ন্যায়সঙ্গত ব্যবহার করবে। স্ত্রীর কোন আচরণ অপছন্দ হলে ছবর ও ধৈর্য ধারণ করবে; কারণ বুদ্ধি-বিবেকের দিক থেকে তারা অপূর্ণ। আল্লাহ্ পাক ইরশাদ করেন  : 

“আর তাদের সাথে সদ্ভাবে জীবন যাপন কর”। (নিসা : ১৯

আল্লাহ্ তা'আলা স্ত্রীদের সাথে সদ্ব্যবহার ও হক আদায়ের প্রতি গুরুত্বারোপ করে ইরশাদ করেন : 

“আর এই নারীগণ তোমাদের নিকট হতে এক দৃঢ় অঙ্গীকার নিয়ে রেখেছে”। (নিসা  : ২১) 

আরও ইরশাদ করেছেন  

“(তোমরা সদ্ব্যবহার কর ) সহচরদের সাথেও”। ( নিসা : ৩৬

এক ব্যাখ্যা অনুযায়ী ‘সহচরদের’ দ্বারা স্ত্রীদেরকে বুঝানো হয়েছে।


হুযূর আকরাম (সল্লাল্লাহু আলাইহি  ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) দুনিয়া যাপনের  অন্তিম সময় যখন তাঁর জবান মুবারক আড়ষ্ট ও আওয়াজ ক্ষীণ হয়ে আসছিল তখন ওসীয়ত করেছিলেন  : “নামায, নামায । তোমাদের অধীনস্থ দাস-দাসীকে তাদের শক্তি-সামর্থের বাইরে কখনও বোঝা চাপিয়ো না। স্ত্রীদের সাথে সদ্ব্যবহার ও তাদের হক আদায়ের বিষয়ে আল্লাহ্‌কে ভয় কর; তারা বস্তুতঃ তোমাদের হাতে বন্দী”।


স্ত্রীদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করার বিশেষ তাৎপর্য হচ্ছে, আল্লাহর বিধান ও আমানতের অধীনে তাদেরকে গ্রহণ করা হয়েছে এবং আল্লাহর দেওয়া বাক্যের মাধ্যমেই তাদের গোপনাঙ্গ তোমাদের জন্য হালাল হয়েছে। 

হুযূর আকরাম (সল্লাল্লাহু আলাইহি  ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আরও ইরশাদ করেছেনঃ “যে ব্যক্তি তার স্ত্রীর কষ্টদায়ক আচরণে ধৈর্য ধারণ করবে, আল্লাহ্ তা'আলা তাকে মুসীবতের উপর হযরত আইয়ূব আলাইহিস্ সালামের ছবর-সমতুল্য সওয়াব দান করবেন। আর যে স্ত্রীলোক তার স্বামীর অসদাচরণে ধৈর্যধারণ করবে, আল্লাহ্ তা'আলা তাকে ফেরাউনের স্ত্রী হযরত আছিয়ার সমতুল্য সওয়াব দান করবেন”। 


মনে রেখো- স্ত্রীকে শুধু কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত থাকার নাম স্ত্রীর সাথে সদ্ব্যবহার ও তার হক আদায় নয়; বরং প্রকৃত হক আদায় ও সদ্ব্যবহার হচ্ছে, স্ত্রীর পক্ষ থেকে কোনরূপ অসদ্ব্যবহার ও কষ্ট প্রদান হলে তাতে ধৈর্যধারণ করা, সে ক্রোধান্বিত হলে বা উত্তেজিত হলে তা অম্লান বদনে সয়ে নেওয়া। এ ব্যাপারে হযরত নবী করীম (সল্লাল্লাহু আলাইহি  ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উনার আদর্শের অনুকরণ করা চাই। তাঁর বিবিগণ কখনও তাঁর সাথে তর্ক করতেন কিংবা তাদের কেউ তাঁর থেকে পৃথক একাকীত্বেও রাত্রি যাপন করেছেন । 


একদা হযরত উমর (রঃ)-এর স্ত্রী তাঁর সাথে তর্কে লিপ্ত হলে তিনি যখন বললেন- কিহে ! তুমি আমার সাথে তর্ক করছো ? হযরত উমরের স্ত্রী বললেন  : রাসূলুল্লাহ্ ( সল্লাল্লাহু আলাইহি  ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উনার বিবিগণ যে ক্ষেত্রে তাঁর সাথে তর্ক করেন; অথচ তিনি আপনার চেয়ে শ্রেষ্ঠ, আমি কেন অপরাধী হবো? হযরত উমর (রঃ) বল্‌লেন  : বড় দুর্ভাগ্য হবে হাবসা যদি সে হুযূরের সাথে তর্ক করে থাকে। অতঃপর তিনি (আপন কন্যা) হযরত হাবসাকে বল্‌লেন  : “আবূ কুহাফার পুত্র আবূ বকরের কন্যার (আয়েশার) প্রতি তোমার অন্তরে যেন কোনরূপ হিংসার উদ্রেক না হয়। মনে রেখো- সে রাসূলুল্লাহ্ (সল্লাল্লাহু আলাইহি  ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর পরম প্রিয় ও ভালবাসার পাত্র- এমনিভাবে তিনি হযরত হাবসাকে রাসূলুল্লাহ্ (সল্লাল্লাহু আলাইহি  ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর সাথে তর্কের বিষয়ে সতর্ক করে আরও উপদেশ দিয়েছেন। 


বর্ণিত আছে, একদা হুযূরের কোন স্ত্রী তাঁর বুকে জোরে হাত মেরে ধাক্কার ন্যায় দিয়েছিলেন। এ জন্যে স্ত্রীর মাতা তাকে শাসন করে ধমক দিচ্ছিলেন। হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বল্‌লেন  :  তাকে ছেড়ে দিন তারা তো আমার সাথে এর চেয়ে আরও অধিক করে থাকে। 

একদা হযরত আয়েশা (রঃ) এবং হুযূর আকরাম (সল্লাল্লাহু আলাইহি  ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর মাঝে বাদানুবাদ হয়। তাঁরা দু'জনেই হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রঃ)–কে মধ্যস্থ (সালিস-বিচারক) সাব্যস্ত করে তাঁকে খবর দিলে তিনি উপস্থিত হলেন। হুযূর বলেন  : হে আয়েশা ! তুমি আগে বলবে না আমি আগে বলবো ? হযরত আয়েশা বলেন  : আপনিই আগে বলুন এবং দেখুন : সত্য ছাড়া কিছু বলবেন না। এ কথা শুনে হযরত আবূ বকর (রঃ) ক্রোধান্বিত হয়ে তাকে পদাঘাত করলেন, ফলে তাঁর মুখ থেকে রক্ত বের হয়ে এল। আর বললেন  : ওহে নিজের দুশমন ! রাসূলুল্লাহ্ (সল্লাল্লাহু আলাইহি  ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) কি কখনও অসত্য বলতে পারেন ? হযরত আয়েশা (রঃ) ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সল্লাল্লাহু আলাইহি  ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরই আশ্রয় নিলেন এবং তাঁর পিছন পার্শ্বে গিয়ে বসে রইলেন। তখন হুযূর আকরাম (সল্লাল্লাহু আলাইহি  ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বল্‌লেন  : হে আবূ বকর ! তোমাকে আমরা এই কাজ করার জন্য ডাকি নাই এবং এটা আমার পছন্দও নয়। 


একদা হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রঃ) রাগ হয়ে কথার ভিতর বলে ফেলেছেন  : আপনি তো মনে করেন যে, খুব আল্লাহর নবী হয়ে গেছেন। এ কথা শুনেই তিনি (সল্লাল্লাহু আলাইহি  ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) হেসে দিলেন। এ ছিল তাঁর স্ত্রীর সাথে সুন্দর সদ্ব্যবহার ও উন্নত চরিত্রের আদর্শ। ( এ সব ক্ষেত্রে নুবুওয়তের শানে বে-আদবী, অস্বীকৃতি, কিংবা অন্য কোন ধরণের প্রশ্নই উঠে না; এ ছিল তাদের মধ্যকার অম্ল-মধুর সম্পর্কের অভিব্যক্তি, খাঁটী ঈমানদারের জন্য তা উপলব্ধি করা মোটেই কঠিন কিছু নয়। হুযূর আকরাম (সল্লাল্লাহু আলাইহি  ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) হযরত আয়েশা (রঃ) কে বল্‌তেন  :  আমি তোমার সন্তোষ কি ক্রোধের অবস্থা পূবাহ্নেই আঁচ করতে পারি। হযরত আয়েশা আরজ করলেন; আপনি কিরূপে তা বুঝতে পারেন ইয়া রাসূলাল্লাহ্ ! তিনি বললেনঃ তুমি যখন খুশী থাক, তখন কথা বলতে গিয়ে বল  : না, মুহাম্মদের প্রভুর কসম, আর যখন রাগান্বিত থাক তখন বল  : না ,ইব্রাহীমের প্রভুর কসম। হযরত আয়েশা (রঃ) বলেন  : ইয়া রাসূলাল্লাহ্ ! তখন আমি কেবল আপনার নামটাই উচ্চারণ করি না। (কিন্তু আপনার মহব্বত ও প্রেম-ভক্তি আমার অন্তঃকরণে গেঁথে থাকে) হুযূর আকরাম (সল্লাল্লাহু আলাইহি  ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর অন্তরে তাঁর বিবিগণের মধ্যে প্রথম হযরত আয়েশার মহব্বতই হয়েছে। তিনি বলতেন  ; “হে আয়েশা ! আবূ যরা’ তার স্ত্রীর জন্য যেমন ছিল, আমিও তোমার পক্ষে তদ্রূপ । তবে আমি তোমাকে তালাক দিবো না”। 

হুযূর আলাইহিস্ সালাম তাঁর অন্যান্য বিবিগণকে বলতেন  : তোমরা আয়েশার ব্যাপারে আমাকে কোনরূপ কষ্ট দিও না; কেননা, আল্লাহর কসম তোমাদের মধ্যে একমাত্র তাঁরই সাথে শয্যাগ্রহণ অবস্থায় আমার প্রতি ওহী নাযিল হয়েছে। (সুতরাং তাঁর মর্তবা আল্লাহ্ তা'আলার নিকট খুবই উঁচু) 


হযরত আনাস (রঃ) বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ্ (সল্লাল্লাহু আলাইহি  ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) স্ত্রীলোকদের প্রতি এবং ছোটদের প্রতি সকল মানুষ অপেক্ষা দয়ার্দ্রচিত্ত ছিলেন” ।রাসূলুল্লাহ্ (সসল্লাল্লাহু আলাইহি  ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) তাঁর বিবিগণের সাথে নেহাৎ সরল-সহজ ও সাদাসিধা আচার-আচরণে অভ্যস্ত ছিলেন। তিনি তাঁদের সাথে কথা, কার্যে ও চরিত্রে উদার নীতি অবলম্বন করে চলতেন। তিনি তাদের সাথে কৌতুক-আনন্দও করতেন। একদা তিনি হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রঃ)-এর সাথে দৌড় প্রতিযোগিতা করেছিলেন। এতে হযরত আয়েশা (রঃ) অগ্রগামী হয়ে যান। পরবর্তী সময়ে পুনরায় একবার যখন প্রতিযোগিতা হয়, তখন তিনি অগ্রসর হয়ে গেলেন। এবার তিনি বলেন  : দেখ হে আয়েশা ! আমি কিন্তু পূর্বেরটা শোধ করে দিলাম। বিবিদের মনে আনন্দ আনয়নের জন্য তিনি এরূপ করতেন। 

বর্ণিত আছে, তিনি আপন স্ত্রীদের সাথে সর্বজন অপেক্ষা কৌতুকী ছিলেন। হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রঃ) বর্ণনা করেন যে, হাবাশার কিছু লোক আশূরার দিনে খেলা-ধূলা করছিল। রাসূলুল্লাহ্ (সল্লাল্লাহু আলাইহি  ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আমাকে বল্‌লেন  : তুমি কি এদের খেলা-ধূলা দেখবে? আমি সম্মতিসূচক উত্তর দিলে তিনি তাদেরকে ডেকে পাঠালেন। দরজায় দাঁড়িয়ে দু’দিকে দু’হাত দরাজ করে তা ধরে রাখলেন। আমি তাঁর এক হাতের উপর চিবুক রেখে তাদের খেলা দেখছিলাম। কিছুক্ষণ পর তিনি বলেন  : বস্ বস্, এখন শেষ কর। আমি বল্লাম - না, আরও কিছুক্ষণ দেখবো। এভাবে কিছুক্ষণ পর পর দু'তিনবার তিনি আমাকে ক্ষান্ত করতে বলেন। অবশেষে আরও একবার যখন বলেন, তখন আমি ক্ষান্ত করলে তিনি তাদেরকে যেতে বললেন; তারা চলে গেল। 


হযরত রাসূলে আকরাম (সল্লাল্লাহু আলাইহি  ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ছিলেন সমস্ত মু'মিনদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা পূর্ণ ঈমানের অধিকারী, সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ চরিত্রের অধিকারী এবং আপন স্ত্রীদের সাথে সর্বাপেক্ষা অমায়িক ও বিনম্র স্বভাবের অধিকারী। তিনি বলেছেন  : “তোমাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা উৎকৃষ্ট তারা যারা তাদের স্ত্রীদের সাথে সদ্ব্যবহারে উৎকৃষ্ট। আমি আমার স্ত্রীদের সাথে সদ্ব্যবহারে তোমাদের মধ্যে সর্বোৎকৃষ্ট”। 

হযরত উমর (রঃ) কঠিন হওয়া সত্ত্বেও বল্‌ছেন  : তোমরা নিজ গৃহে স্ত্রীদের সাথে শিশুসুলভ মন নিয়ে থাক; পুরুষোচিত যোগ্যতার যেখানে প্রয়োজন সেখানে তা দেখাবে”। 

হযরত লুকমান (রহঃ) বলেন  ; “বুদ্ধিমানের উচিত সে যেন ঘরের পরিবেশে বাচ্চার মত থাকে, আর সমাজে পুরুষের ন্যায় থাকে” ।হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, “আল্লাহ্ তা'আলা রুক্ষ স্বভাবসম্পন্ন পাষাণ হৃদয় লোককে পছন্দ করেন না”। এর অর্থ হচ্ছে, যারা আপন স্ত্রীদের সাথে এরূপ স্বভাবের আচরণ করে এবং মনের দিক থেকে দাম্ভিক ও অহংকারী হয়। কুরআনে ব্যবহৃত- (উতুল) শব্দের মর্মও তাই, অর্থাৎ স্ত্রীদের সাথে রুক্ষ আচরণকারী। 

হযরত জাবের (রঃ) জনৈকা বিধবা স্ত্রীলোককে বিবাহ করলে পর রাসূলুল্লাহ্ (সল্লাল্লাহু আলাইহি  ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)  তাঁকে বলেছেন “তুমি কুমারী কন্যা বিবাহ করলে না কেন ? তুমি তার সাথে কৌতুক করতে এবং সেও তোমার সাথে কৌতুক করতো”।

এক বেদুঈন মরুচারীনি স্ত্রীলোক স্বামীর মৃত্যুর পর তার প্রশংসা করে বলছিল  : “গৃহে প্রবেশ করার পর তিনি সদা হাস্যমুখ থাকতেন আর বাইরে সমাজে তিনি থাকতেন স্বল্পভাষী ও গাম্ভীর্যের অধিকারী। ঘরে যৎকিঞ্চিৎ যা–ই পেতেন খেয়ে নিতেন, ঘরের কোন বস্তু হারিয়ে গেলে তেমন কোন যোগ-জিজ্ঞাসা করতেন না। 

”স্ত্রীর প্রতি সদ্ব্যবহার ও শিষ্টাচারের মধ্যে এটিও একটি যে, খোলা মেলা, সরলতা ও বিনম্র স্বভাবের আতিশয্যে তাদের বাসনা পূরণে সীমা লংঘন না করা চাই, যার ফলে তাদের নৈতিক চরিত্র বিনষ্ট হয়ে যায় এবং তোমার প্রতি ভক্তি-প্রযুক্ত ভয় দূর হয়ে যায়। বরং ন্যায়-পরায়ণ ও মধ্যপন্থী থাকা চাই এবং ভক্তি-শ্রদ্ধা কায়েম থাকে- এরূপ আচরণ করা চাই। যদি তাদের থেকে শরীয়তের খেলাফ বা ইসলামী রীতি-নীতি বিরোধী কার্যকলাপ সংঘটিত হয়, তবে সাথে সাথে প্রতিবাদ ও শাসন করা চাই। 


হযরত হাসান (রঃ) বলেনঃ “আল্লাহর কসম, সর্ববিষয়ে যে ব্যক্তি স্ত্রীর কামনা-বাসনার পায়রবী করে, পরিণামে সে দোযখে নিক্ষিপ্ত হবে”। 

হযরত উমর (রঃ) বলেনঃ “অনেক সময় স্ত্রীদের কথা বা পরামর্শের বিপরীত করার মধ্যেই কল্যাণ নিহিত থাকে”। 

জনৈক জ্ঞান-তাপসের উক্তি হচ্ছে, স্ত্রীদের সাথে তোমরা পরামর্শ কর, আবার (অনেক ক্ষেত্রে) পরামর্শের বিপরীতও কর”। 

হুযূর আকরাম (সল্লাল্লাহু আলাইহি  ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেছেনঃ “স্ত্রী বশীভূত পুরুষ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়”। এর কারণ হচ্ছে, ক্রমান্বয়ে সে তার দাসে পরিণত হয়; অবশেষে স্ত্রীর আজ্ঞাবহ হয়ে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে ধ্বংসের গহ্বরে গিয়ে পড়ে। অথচ আল্লাহ্ তা'আলা পুরুষকে নারীর কর্তা বানিয়েছেন; কিন্তু সে তা উল্টিয়ে দেয়। ফলে, সে শয়তানের অনুসারী হয়, যেমন পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে  : “(শয়তান বলে) আমি তাদেরকে আরও শিক্ষা দিবো, যেন তারা আল্লাহর সৃষ্ট আকৃতিকে বিকৃত করে দেয়”। ( নিসা ১১৮ ) পুরুষের উচিত ছিল, সে কর্তা হয়ে থাকবে, না অধীন। আল্লাহ্ পাক পুরুষদের সম্বন্ধে বলেছেন  : “পুরুষগণ নারীদের শাসনকর্তা”। ( নিসা : ৩৪

আল্লাহ্ তা'আলা সূরা ইউসুফে স্বামীকে ‘সর্দার’ বলে অভিহিত করেছেন, ইরশাদ হয়েছে : “এবং উভয়ে সেই রমনীর সর্দার (স্বামী)-কে দরজার নিকট দাঁড়ানো অবস্থায় পেল”। (ইউসুফ  : ২৫

ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) বলেছেন  ; “তিনটি শ্রেণী এমন রয়েছে যদি তাদের সম্মান কর, তবে তারা তোমাকে হেয় করবে (১) স্ত্রী, (২) খাদেম (চাকর), (৩) ঘোড়া”। 

এ উক্তির দ্বারা হযরত ইমামের উদ্দেশ্য হলো, যদি কেবল সম্মান আর সদয় ব্যবহারই করা হয়, সেইসাথে সময় সময় প্রয়োজনে কোনরূপ প্রতিবাদ ও শাসন না করা হয়, তবে পরিণতি এরূপই দাড়ায়।



স্বামীর প্রতি স্ত্রীর কর্তব্য

স্বামীর প্রতি স্ত্রীর কর্তব্য – ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)



 স্বামীর প্রতি স্ত্রীর কর্তব্য
📚আত্মার আলোকমণি ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

এ সম্পর্কিত মৌলিক ও সারকথা এই যে, বিবাহ-বন্ধন প্রকৃতপক্ষে দাসত্ব-অধীনতারই একটি প্রকার। বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপিত হওয়ার পর স্ত্রী স্বামীর জন্যে এক প্রকার আজ্ঞাবহ দাসীরূপ হয়ে যায়। তখন তার কর্তব্য হয়— স্বামীর অভীপ্সিত প্রতি কাজে আনুগত্য করা। তবে শর্ত এই যে, তা কোনরূপ আল্লাহর অবাধ্যতা ও পাপকার্য না হওয়া চাই। স্বামীর আনুগত্যে স্ত্রীর কর্তব্য ও দায়িত্ব— এ সম্পর্কিত প্রচুর রেওয়ায়াত হাদীসগ্রন্থসমূহে বর্ণিত হয়েছে। এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেছেন  : “যে স্ত্রীলোক তার স্বামীকে খুশী রেখে দুনিয়া থেকে বিদায় নেয়, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে”। 

এক ব্যক্তি সফরে (প্রবাসে) গমনকালে তার স্ত্রীর কাছ থেকে অঙ্গীকার নিয়েছিল যে, সে তার অনুপস্থিতির সময় কালে উপর (তলা) থেকে নীচে অবতরণ করবে না। নীচে স্ত্রীর পিতা অবস্থান করতেন। একদা তিনি ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েন। নীচে নেমে পিতাকে দেখা ও সেবা-শুশ্রূষার জন্য অনুমতি চেয়ে স্ত্রী রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উনার  নিকট লোক পাঠালো। তিনি বললেন  : তাকে বল, সে যেন স্বামীর অনুগতই থাকে। এরপর পিতা মারা যান। পুনরায় অনুমতি চেয়ে লোক পাঠালে হুযূর বললেন  : তাকে বল, সে যেন স্বামীর অনুগতই থাকে। অতঃপর পিতার দাফনকার্য সম্পন্ন হলে রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) স্ত্রীর নিকট পয়গাম পাঠালেন যে, “স্বামীর আনুগত্যের কারণে আল্লাহ্ তা'আলা তোমার পিতাকে মাফ করে দিয়েছেন”। (বিধানটি স্বতন্ত্র ; কেননা ক্ষেত্রবিশেষে এ হুকুমের তারতম্যও হতে পারে।) 

হুযূর আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেছেন  : “যে নারী পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়ে, রমযানের রোযা রাখে, আপন সতীত্ব রক্ষা করে এবং স্বামীর বাধ্য থাকে, সে তার প্রভুর জান্নাতে প্রবেশ করবে”।

প্রণিধানযোগ্য যে, এ হাদীসে রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) স্বামীর বাধ্যতার বিষয়টিকে ইসলামের বুনিয়াদী বিষয়াবলীর সাথে উল্লেখ করে তৎপ্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন।


হুযূর আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) স্ত্রীলোকদের প্রসঙ্গে বলেছেন  : “গর্ভধারীনি স্ত্রীলোক, সন্তানের মা, সন্তানকে দুধ পান করানোর কষ্ট স্বীকারকারীনি, সস্তানের প্রতি দয়া ও স্নেহ প্রদর্শনকারীনি- এরা যদি স্বামীর প্রতি অবাধ্যতার আচরণ না করে, যা সাধারণতঃ করে থাকে, তাহলে তাদের মধ্যে নিয়মিত নামাযী মহিলারা অবশ্যই জান্নাতে প্রবেশ করবে”। 

হুযুর আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেছেন  : “আমি জাহান্নামে দৃষ্টি নিক্ষেপ করেছি; দেখি- সেখানের অধিকাংশ অধিবাসী নারী সমাজ। তারা জিজ্ঞাসা করলো কেন এমন হবে ইয়া রাসূলাল্লাহ্। তিনি বললেনঃ তারা অতি মাত্রায় অভিশাপ বর্ষণ করে এবং স্বামীদের প্রতি অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে”।

অন্য এক রেওয়ায়াতে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)  ইরশাদ করেন  : “আমি জান্নাতে দৃষ্টিপাত করেছি; দেখি- নারী সমাজ সেখানে খুবই কম । (বর্ণনাকারী বলেন ) আমি জিজ্ঞাসা করলাম, এর কারণ কি ? তিনি বললেন স্বর্ণ ও যাফরান (রঙ্গিন পোষাক) এ দুই লালের আকর্ষণ ও মোহ তাদেরকে বিমুখ করে রেখেছে”।  হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রঃ) বলেন  : একজন যুবতী মেয়েলোক রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর খেদমতে উপস্থিত হয়ে আরজ করলো  : “ইয়া রাসূলাল্লাহ্ ! আমার এখন উঠতি বয়স বিয়ের জন্যে আমার পয়গাম আসছে; কিন্তু আমি বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনকে অপছন্দ করছি। আপনি বলুন ; স্বামীর প্রতি স্ত্রীর দায়িত্ব ও কর্তব্য কি রয়েছে? তিনি বললেনঃ আপাদমস্তক স্বামীর শরীর পীড়িত হয়ে যদি পুঁজে ভরে যায় আর স্ত্রী তার সেবা-শুশ্রুষায় আপন জিহ্বা দ্বারা লেহন করে, তবু তার কৃতজ্ঞতা আদায় হবে না। মেয়েলোকটি বললো  : তাহলে কি আমি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হবো না? রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম বললেননা, তুমি বিবাহ বস; কারণ এতেই মঙ্গল নিহিত রয়েছে।


হযরত ইবনে আব্বাস (রঃ) বর্ণনা করেন যে, খাস্আম গোত্রের এক মহিলা হুযুর আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর খেদমতে উপস্থিত হয়ে আরজ করলো : ইয়া রাসূলাল্লাহ্ ! আমি একজন বিধবা স্ত্রীলোক; আমার বিবাহ বসার ইচ্ছা আছে, আপনি বলুন- স্বামীর হক কি? তিনি বললেন : “স্ত্রীর ঊপর স্বামীর হক হচ্ছে, সে যখন তার স্ত্রীকে শয্যায় আহ্বান করে, তখন সে উটের পিঠে উপবিষ্ট থাকলেও যেন তার কাছে এসে উপস্থিত হয়। স্বামীর আরও হক হচ্ছে যে, তার অনুমতি ব্যতীত স্ত্রী গৃহের কোন বস্তু কাউকে দিবে না। যদি দেয় তবে গুনাহ্ স্ত্রীর হবে আর সওয়াব স্বামীর হবে। স্বামীর আরেকটি হক হচ্ছে, তার অনুমতি ব্যতীত স্ত্রী নফল রোযা রাখবে না। যদি এরূপ করে তবে এটা অযথা পানাহার থেকে বিরত থেকে কষ্ট করা হবে; কোনরূপ সওয়াব হবে না। স্ত্রী যদি স্বামীর অনুমতি ব্যতীত ঘর থেকে বের হয়, তবে পুনরায় ঘরে ফিরে না আসা পর্যন্ত অথবা তওবা না করা পর্যন্ত ফেরেশতাগণ তাকে অভিশাপ দিতে থাকে। হুযূর আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন : “আমি যদি অন্য কাউকে সেজদা করতে আদেশ করতাম তাহলে নারীদেরই বলতাম তাদের স্বামীদের সেজদা করতে”। কারণ স্ত্রীদের উপর স্বামীদের হক গুরুতর। 

তিনি আরও ইরশাদ করেছেনঃ স্ত্রীলোকেরা আল্লাহ্ তা'আলার একান্ত নিকটতর সান্নিধ্যপ্রাপ্ত হয় তখন, যখন তারা আপন গৃহের অভ্যন্তরে অবস্থান করে।গৃহের আঙ্গিনায় আদায়কৃত তাদের নামায মসজিদে আদায়কৃত নামায হতে উত্তম।গৃহাভ্যন্তরে আদায়কৃত নামায গৃহের আঙ্গিনায় আদায়কৃত নামায হতে উত্তম। গৃহের অন্দর কুঠরীতে আদায়কৃত নামায (সাধারণ) গৃহাভ্যন্তরে আদায়কৃত নামায হতে উত্তম”। পর্দার হেফাযতের জন্যেই এ হুকুম হয়েছে। এ জন্যেই তিনি ইরশাদ করেছেন  : “স্ত্রীলোক স্বয়ং পর্দা; ঘর থেকে বের হলেই শয়তান উকি-ঝুকি মারতে থাকে”।

 তিনি আরও ইরশাদ করেছেন  : “স্ত্রীলোকের পর্দা এগারটি, বিবাহের পর স্বামী তার জন্যে একটি পর্দা; মৃত্যুর পর কবর তার জন্যে দশটি পর্দা”। মোটকথা, স্ত্রীর উপর স্বামীর অনেক হক রয়েছে; তন্মধ্যে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ হক হচ্ছে দুটি : - (এক) আপন সতীত্বরক্ষা ও পর্দা পালন। (দুই) প্রয়োজনের অতিরিক্ত কিছু স্বামীর কাছে দাবী না করা। 

আদর্শ পূর্বসূরীগণের নীতি ছিল, তাদের কেউ যখন জীবিকার জন্য ঘর থেকে বের হতেন, তখন তাদের স্ত্রী-কন্যাগণ বলতেন “অবৈধ উপার্জন

থেকে বেঁচে চলবেন; আমরা ক্ষুধার যন্ত্রণা ও অন্যান্য কষ্ট সহ্য করে নিবো। তবুও দোযখের আগুন সহ্য করতে পারবো না”


তাঁদেরই মধ্যকার একজনের ঘটনা,– একদা সফরের এরাদা করলেন। পাড়া-প্রতিবেশী কেউ তার এ সফর কামনা করছিল না; তারা সে লোকের স্ত্রীকে বললো  : আপনি তার এ সফরে সম্মতি দিচ্ছেন কেন, অথচ তিনি তার অনুপস্থিতিকালীন খরচাদি আপনাদেরকে দিয়ে যাচ্ছেন না ? স্ত্রী জবাব দিলেন  :  আমি তার সাথে পরিচিত হওয়ার পর থেকে তাকে শুধু একজন ভোজন-বিলাসীই পেয়েছি; রিযিকদাতা হিসাবে তাকে পাই নাই, বরং প্রকৃত রিযিকদাতা একমাত্র আল্লাহ্ পাকই; এ কথার উপর আমি পূর্ণ ঈমান রাখি। তিনি যাচ্ছেন; যান, কিন্তু আসল রিযিকদাতা তো রয়েছেন। 


হযরত রাবেয়া বিনতে ইসমাঈল (রহঃ) হযরত আহ্‌মদ ইব্‌নে আবী হওয়ারী (রহঃ)-এর নিকট বিবাহের পয়গাম পাঠিয়েছিলেন। তিনি ইবাদত— বন্দেগীতে মগ্ন থাকতেন। তাই অসম্মতি প্রকাশ করে জবাব দিয়ে পাঠিয়েছেন যে, আমার কর্মমগ্নতার (ইবাদত-বন্দেগীর) কারণে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনের ইচ্ছা বাদ দিয়ে রেখেছি। হযরত রাবেয়া বল্‌লেন আমিও আপনার ন্যায় কাজে (ইবদাতে) মগ্ন থাকি; তদুপরি আমার বিবাহের খাহেশও নাই, কিন্তু আমার পূর্ববর্তী স্বামী থেকে আমি যে প্রচুর সম্পদ পেয়েছি; আমার ইচ্ছা হয় আপনি সেগুলো আপনার অন্যান্য বন্ধুজন ও তাপস্যগণের মধ্যে খরচ করুন। আর সে সঙ্গে আমিও তাঁদের পরিচিতি লাভে ধন্য হই। এ ভাবে খোদা-প্রাপ্তির একটি পথ আমার জন্যে হয়ে যায়। এ কথা শুনে তিনি বল্‌লেন  :  তাহলে আমার শায়খ-গুরুজনের নিকট পরামর্শ করে নিই। তাঁর শায়খ হযরত আবূ সুলাইমান দারানী (রহঃ) এতকাল তাকে বৈবাহিক জীবন অবলম্বন করতে নিষেধ করতেন, আর বলতেন আমাদের লোকদের মধ্যে যারাই বিবাহ করেছে, তাদের অবস্থা অন্য রকম হয়ে গেছে (অর্থাৎ পার্থিব ঝামেলায় পড়ে কিছু যিকির-আযকার ও ধ্যান-সাধনা ছেড়ে দিয়েছে)। হযরত সুলাইমান দার্রানী (রহঃ) উক্ত মহিলার উক্তি ও অবস্থা জেনে তাকে পরামর্শ দিলেন, তুমি তাকে স্ত্রীরূপে গ্রহণ করে নাও তিনি আল্লাহর ওলী সিদ্দীকীনদের ন্যায় উক্তি করেছেন। 

আহ্‌মদ ইব্‌নে আবী হাওয়ারী (রহঃ) বলেন  : অতঃপর আমি তাঁকে বিবাহ করে নিলাম। কিন্তু ঘরে আমার; বসবাস করার মত কিছুই ছিলনা। এমন ছিল যে, গোসল করা তো দূরের কথা, খাওয়া-দাওয়ার পর হাত ধোয়ার ফুরসৎ পায় না এমন ব্যক্তির ন্যায় শীঘ্র বের হয়ে আসতাম। পরবর্তীতে আমি আরও বিবাহ করেছি। কিন্তু এই প্রথমা স্ত্রী আমাকে উন্নত খাওয়া-দাওয়া করাতো সব সময় উৎফুল্ল রাখতো আর বলতো- যান, সদা আনন্দিত থাকুন এবং অন্যান্য স্ত্রীদের জন্য শক্তি সঞ্চয় করুন। 


শ্যাম দেশের এ হযরত রাবেয়া (রহঃ) -এর সেই মর্তবা ছিল, যে মর্তবা ছিল বসরা নিবাসী হযরত রাবেয়া বসরিয়া (রহঃ) -এর। 

স্ত্রীলোকের পক্ষে এটা অপরিহার্য কর্তব্য যে, স্বামীর সম্মতি না জেনে তার সম্পদে কিছুমাত্র এদিক-সেদিক করবে না। হুযূর আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশ হচ্ছে, স্ত্রীলোক স্বামীর বিনা অনুমতিতে অন্য কাউকে কিছু খাওয়াবে না। হ্যাঁ, কোন খাদ্যবস্তু বিনষ্ট হয়ে যাওয়ার আশংকা দেখা দিলে তা ভিন্ন কথা। স্বামীর অনুমতি নিয়ে কোন অভাবীকে অন্ন দান করলে, স্বামীর সমপরিমাণ সওয়াব সে পাবে। পক্ষান্তরে, বিনা অনুমতিতে এরূপ করলে সে গুনাহগার হবে আর স্বামীর আমলনামায় সওয়াব লিপিবদ্ধ হবে। কন্যার প্রতি মাতা-পিতার কর্তব্য হচ্ছে, মাতা-পিতা তাদের প্রতিটি কন্যা-সন্তানকে পূর্বাহ্নেই শিষ্টাচার শিক্ষা দিবে। উন্নত আচার-ব্যবহার ও সুন্দর আচরণনীতি, স্বামীর সাথে ঘর - সংসার করার প্রয়োজনীয় ও সুন্দর তরতীব ও নিয়ম-পদ্ধতি শিখাবে। বর্ণিত আছে, হযরত উসামাহ্ বিনৃতে খারেজাহ্ ফাযারী ( রঃ ) তার কন্যাকে স্বামীর সোপর্দ করার সময় উপদেশ দিয়েছিলেনএতদিন তুমি পাখীর বাসার ন্যায় একটি ক্ষুদ্র পরিসরে অবস্থান করছিলে। এখন তুমি একটি অপরিচিত প্রশস্ত পরিবেশে যাচ্ছ— তোমাকে এমন এক শয্যা গ্রহণ করে নিতে হবে যেটি সম্পর্কে তোমার কোনই পরিচিতি নাই। এমন সাথীকে আপন করে নিতে হবে, যার সাথে পূর্ব থেকে কোনই সম্পর্ক নাই। সম্পূর্ণ নূতন সম্পূর্ণ অপরিচিত। কাজেই তুমি তার জন্যে যমীনস্বরূপ হয়ে যাও, সে তোমার জন্য আসমানস্বরূপ হবে। তুমি তার জন্য বিছানাস্বরূপ হয়ে যাও, সে তোমার জন্য সুদৃঢ় স্তম্ভস্বরূপ হবে। তুমি তার বাদী হয়ে যাও, সে তোমার গোলাম হয়ে যাবে। কোন কাজে বা কথায় খোঁচা দিওনা বা অতিরজ্ঞন করো না, সে তোমাকে সরিয়ে দিবে। তুমি তাকে দূরে রেখো না, সে তোমাকে দূর করে দিবে। সে তোমার নিকটবর্তী হলে, তুমি তার আরও নিকটবর্তী হও। আর সে যদি তোমাকে পরিহার করে চলে, তবে তুমি তার থেকে সরে পড়। সর্বদা লক্ষ্য রাখবে— তোমা থেকে সে যেন সব সময় ভাল শুনে, ভাল দেখে, ভাল আঁচ করে। বুখারী ও মুসলিম শরীফে বর্ণিত এক হাদীসে আছে, হযরত মায়মূনাহ্ (রঃ) হুযূরের অনুমতি না নিয়ে নিজের বাঁদীকে আযাদ করে দিয়েছিলেন । নির্ধারিত দিনে তার নিকট উপস্থিত হয়ে হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিষয়টি জানতে পেরে বলেছিলেন : “তোমার ভাই - বোনদেরকে যদি বাঁদীটি দান করে দিতে তবে তুমি অধিক সওয়াবের ভাগী হতে” 

জনৈক জ্ঞানী ব্যক্তি তার স্ত্রীকে উপদেশ দিয়েছেন “মার্জনার দৃষ্টি রাখ, তাহলে ভালবাসা স্থায়ী হবে। আমার অসন্তোষের মুহূর্তে নিশ্চুপ থেকো, তাহলে কল্যাণ হবে, ঢোলের ন্যায় আমাকে আঘাত করো না, কারণ জানা নাই অদৃশ্যের অন্তরালে কি লুকিয়ে রয়েছে। অধিক মাত্রায় অভিযোগ করো না, এতে ভালবাসা হ্রাস পায় ; অন্তর তোমায় অস্বীকার করতে পারে ; অন্তরের উপর আমারও হাত নাই। অস্তঃকরণে আমি যেমন ভালবাসা লক্ষ্য করেছি, তেমনি তাতে শত্রুতাও অবস্থান করে, তবে ভালবাসা শত্রুতাকে দূর করতে সক্ষম।



স্ত্রীর প্রতি স্বামীর কর্তব্য


অন্তর বা হৃদয় (পর্ব- ৬) অন্তরের গুণাবলী ও উদাহরণ



অন্তর বা হৃদয় (পর্ব- ৬) 

📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)


অন্তরের গুণাবলী ও উদাহরণ : 

জানা উচিত, মানব সৃষ্টি ও গঠনে চারটি মিশ্রণ আছে, গযে কারণে তার মধ্যে হিংস্র, শয়তানী, পৈশাচিক ও স্বর্গীয় —

এই চার প্রকার গুণের সমাবেশ ঘটেছে। মানুষের গঠনে ক্রোধ আছে বিধায় সে হিংস্র প্রাণীসুলভ কাজ-কর্ম করে এবং শত্রুতা, বিদ্বেষ, হাতাহাতি ও গালিগালাজ করে। কামভাবের মিশ্রণ থাকার কারণে সে পশুসুলভ কর্ম অর্থাৎ, লোভ, লালসা, হিংসা ইত্যাদিতে লিপ্ত হয়। মানুষ স্বয়ং স্বতন্ত্র দৃষ্টিতে খোদায়ী আদেশ; যেমন আল্লাহ বলেন − “বলুন, রূহ্ আমার পালনকর্তার আদেশের অংশ”। এ কারণে সে প্রভুত্ব দাবী করে। এছাড়া সে স্বাতন্ত্র্য, প্রভুত্ব, উপাস্যতা ও নিষ্ঠুরতা ইত্যাদি বিষয় পছন্দ করে। সকল জ্ঞান-বিজ্ঞান সম্পর্কে ওয়াকিফহাল হওয়ার আকাঙ্ক্ষা করে। তাকে জ্ঞানী বলা হলে সে পুলকিত হয় এবং মূর্খ বলা হলে নাখোশ হয়। বলাবাহুল্য, সকল বিষয়ের স্বরূপ অবগত হওয়া এবং সকলের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দাবী করা পালনকর্তার অন্যতম গুণাবলী। মানুষের মধ্যে শয়তানী গুণাবলীও রয়েছে, যদ্দরুন সে দুষ্ট বলে কথিত হয়। সে নিজের মতলব ছলচাতুরী, প্রতারণা ও প্রবঞ্চনার মাধ্যমে হাসিল করে এবং উপকারের প্রতিদানে অপকার করে। এগুলো শয়তানের স্বভাব। মানুষের উপরোক্ত চারটি মিশ্রণ তার অন্তরে সমাবেশিত আছে। সুতরাং তার মজ্জার মধ্যে যেন শূকর, কুকুর, শয়তান ও প্রজ্ঞাশীল সত্তা বিদ্যমান রয়েছে। শূকর হচ্ছে তার কামস্বভাব। কেননা, শূকর তার বর্ণ ও আকৃতির কারণে নিন্দনীয় নয়; বরং অতিরিক্ত লোভ ও অধিক আহারের কারণে সে নিন্দার পাত্র। কুকুর হচ্ছে মানুষের ক্রোধ। কেননা, কুকুর যে দংশন করে, তা তার আকার-আকৃতির কারণে নয়; বরং তার মধ্যে হিংস্রতা ও শত্রুতা নিহিত থাকার কারণে। এমনিভাবে মানুষের অভ্যন্তরেও হিংস্র প্রাণীর মত কষ্ট প্রদান ও ক্রোধ এবং শূকরের মত লোভ-লালসা মওজুদ রয়েছে। সুতরাং শূকর তার লোভ-লালসার কারণে অশ্লীল ও নিষিদ্ধ কাজের প্রতি আহ্বান করে এবং হিংস্র প্রাণী ক্রোধের কারণে যুলুম ও নিপীড়নের দিকে আহ্বান করে। অপর দিকে শয়তান তাদের লোভ ও ক্রোধকে উত্তেজিত্ব করতে থাকে। সে তাদের মূর্খতাকে তাদের দৃষ্টিতে শোভনীয় করতে থাকে। মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধি যা প্রজ্ঞাবান সত্তার মত, তাকে শয়তানের কলাকৌশল প্রতিহত করার আদেশ দেয়া হয়েছে। সুতরাং সে যদি তাই করে, তবে পরিস্থিতি অনেকটা ঠিক থাকবে। দেহের রাজত্বে ন্যায়বিচার প্রকাশ পাবে এবং সবকিছু সঠিক পথে পরিচালিত হবে। পক্ষান্তরে যদি প্রজ্ঞাবান সত্তা অর্থাৎ, জ্ঞান-বুদ্ধি এদেরকে পরাভূত করতে সক্ষম না হয়, তবে এরা তাকে দাবিয়ে রাখে এবং তার কাছ থেকে খেদমত গ্রহণ করে। তখন তাকে কুকুরকে সন্তুষ্ট রাখার এবং শূকরের পেট ভরার কৌশল খুঁজতে হয়। সে সর্বক্ষণ কুকুর ও শূকরের গোলাম থেকে যায়। অধিকাংশ লোকের অবস্থা তাই। তাদের বেশীরভাগ চেষ্টা পেট ও কামনা-বাসনার সেবায় ব্যয়িত হয়। আশ্চর্যের বিষয়, তারা মূর্তিপূজারীদেরকে ঘৃণা করে এবং মূর্তিপূজার নিন্দায় সোচ্চার থাকে, কিন্তু যদি স্বয়ং তাদের অবস্থার উপর থেকে যবনিকা সরিয়ে দেয়া এবং কাশফওয়ালাদের ন্যায় তাদের অবস্থাকে মূর্ত করে জাগ্রত অবস্থায় অথবা স্বপ্নে দেখানো হয়, তবে দেখা যাবে, তারা কখনও শূকরের সামনে সেজদা করেছে এবং কখনও তার আদেশ ও ইঙ্গিতের জন্যে অপেক্ষা করেছে । অথবা দেখা যাবে, তারা এক ক্ষেপা কুকুরের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে তার এবাদত ও পূজা-অর্চনা করছে। এতে করে তারা আপন শয়তানকে সন্তুষ্ট করার জন্য সচেষ্ট থাকে। কেননা, শয়তান শূকর ও কুকুরকে মানুষের কাছ থেকে খেদমত নেয়ার জন্যে প্ররোচিত করে। ফলে তারা আসলে শূকর ও কুকুরের পূজা করে না; বরং শয়তানের আরাধনা করে ।


 মোট কথা, মানুষ যদি তার চলাফেরা, নিশ্চলতা, কথাবার্তা, চুপ থাকা এবং উঠাবসার প্রতি গভীর দৃষ্টিপাত করে, তবে দেখা যাবে, সমস্ত দিন সে কেবল এসব বস্তুরই এবাদতে সচেষ্ট থাকে। এটা চূড়ান্ত পর্যায়ের অন্যায়। কেননা, এর ফলে সে মালিককে চাকর, প্রভুকে দাস এবং প্রবলকে দুর্বল সাব্যস্ত করে। মালিক ও প্রভু হওয়ার যোগ্য ছিল জ্ঞানবুদ্ধি, যাকে মানুষ কামনারূপী শূকর, ক্রোধরূপী কুকুর ও শয়তানের অনুগত সেবাদাসে পরিণত করে দেয়। এই আনুগত্যের ফল দাঁড়ায়, তার অন্তরে বিভিন্ন মন্দ স্বভাবের মরিচা পড়তে থাকে এবং পরিণামে সে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। কামনারূপী শূকরের আনুগত্যের ফলে যে সকল মন্দ স্বভাব মাথাচাড়া দিয়ে উঠে, সেগুলো হচ্ছে নির্লজ্জতা, দুশ্চরিত্রতা, ব্যয়বহুলতা, কৃপণতা, লোভ-লালসা, হিংসা-দ্বেষ ইত্যাদি। আর ক্রোধরূপী কুকুরের আনুগত্য থেকে উদ্ভূত মন্দ স্বভাবগুলো হচ্ছে আত্মপ্রশংসা, আত্মম্ভরিতা, অহংকার, বিদ্রূপ, অপরকে হেয় জ্ঞান করা, অনিষ্ট সাধন করা ইত্যাদি । পক্ষান্তরে ক্রোধ ও কামনাপ্রীতির ফলে শয়তানের আনুগত্য থেকে উদ্ভূত মন্দ স্বভাবগুলো হচ্ছে, প্রতারণা, ধূর্তামি, ছলচাতুরী, প্রবঞ্চনা, আত্মসাৎকরণ, অশ্লীল কথন ইত্যাদি । অপরপক্ষে যদি মানুষের জ্ঞানবুদ্ধি প্রবল হয় এবং কামনারূপী শূকরকে প্রতিহত করা হয়, তবে অন্তরে অনেক সদগুণ জন্মলাভ করে । যেমন- জ্ঞান, প্রজ্ঞা, বিশ্বাস, বস্তুনিচয়ের স্বরূপ সম্পর্কিত মারেফত, জ্ঞান-গরিমায় সকলের উপর শ্রেষ্ঠত্ব ইত্যাদি। এছাড়া এমতাবস্থায় কামনা ও ক্রোধের পূজা করতে হয় না। কামনারূপী শূকরকে প্রতিহত করলে আরও যেসকল সৎস্বভাব উৎপন্ন হয়, সেগুলো হচ্ছে, সাধুতা, অল্পে তুষ্টি, স্থিরতা, সংসারনির্লিপ্ততা, খোদাভীতি, প্রফুল্লতা, লজ্জাশীলতা ইত্যাদি । অনুরূপভাবে ক্রোধশক্তিকে নত ও পরাভূত রাখলে এবং প্রয়োজনীয় সীমায় আনয়ন করলে বীরত্ব, দয়া, আত্মনিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা, স্থৈর্য, ধৈর্য, ক্ষমা, দৃঢ়তা, সাহসিকতা ইত্যাদি সৎস্বভাবের বিকাশ ঘটে । সুতরাং অন্তরকে আয়না মনে করা উচিত, যার মধ্যে এসব বিষয়ের প্রভাব একের পর এক প্রতিফলিত হতে থাকে, কিন্তু উপরোক্ত সৎস্বভাবসমূহের প্রভাবে অন্তররূপী আয়নার চমক ও জ্যোতি অধিকতর বৃদ্ধি পায় । অবশেষে তাতে আল্লাহ্’র দ্যুতি বিকশিত হয় এবং প্রার্থিত ধর্মীয় বিষয়াদির স্বরূপ উদঘাটিত হয়ে যায় । এই প্রকার অন্তরের দিকে ইঙ্গিত করেই হাদীসে এরশাদ হয়েছে - “যখন আল্লাহ্ তাআলা কোন বান্দার কল্যাণ সাধন করতে চান, তখন তার জন্যে একটি উপদেশদাতা অন্তর নির্দিষ্ট করে দেন”। এরূপ অন্তরেই আল্লাহ্ তাআলার যিকির অবস্থান গ্রহণ করে। আল্লাহ্ বলেন : “শুনে রাখ, আল্লাহ্ যিকির দ্বারাই অন্তর প্রশান্তি লাভ করে। পক্ষান্তরে যে সকল নিন্দনীয় প্রভাব অন্তরের উপর ছায়াপাত করে, সেগুলো কাল ধোঁয়ার মত হয়ে থাকে। এগুলোর কারণে অন্তররূপী আয়না ক্রমশ কালবর্ণ ধারণ করতে থাকে, অবশেষে আল্লাহ্ থেকে আড়াল হয়ে যায়। কোরআন মজীদে এ অবস্থাকেই  ‘মোহর মারা ও ‘মরিচা পড়া’ বলা হয়েছে। এক আয়াতে বলা হয়েছে , “বরং তারা যা উপার্জন করত, তা তাদের অন্তরে মরিচা ধরেছে”।  অন্য আয়াতে আছে - “আমি ইচ্ছা করলে তাদেরকে তাদের গোনাহের কারণে পাকড়াও করব এবং তাদের অন্তরের উপর মোহর এঁটে দেব, ফলে তারা শ্রবণ করবে না”!  মোটকথা, অধিক গোনাহের কারণে যখন অন্তরের উপর মোহর লেগে যায়, তখন অন্তর সত্যোপলব্ধির ব্যাপারে অন্ধ হয়ে যায়। সে আখেরাতের বিষয়াদি হালকা ও দুনিয়ার কাজ গুরুত্বপূর্ণ মনে করে এবং এতেই সর্বশক্তি ব্যয় করে। সে যখন আখেরাতের অবস্থা শ্রবণ করে, তখন এক কানে শুনে অন্য কান দিয়ে বের করে দেয়। এই উপদেশ তার মধ্যে স্থান করে না এবং তওবার প্রতি উৎসাহ সৃষ্টি করে না। এরূপ ব্যক্তিদের অবস্থা হচ্ছে –‘তারা আখেরাত থেকে নিরাশ হয়ে গেছে, যেমন কবরবাসীদের বিষয়ে কাফেররা নিরাশ হয়ে গেছে।' কোরআন ও হাদীসে বর্ণিত অন্তর কাল হওয়ার অর্থও তাই। মায়মুন ইবনে মহরান বলেন  : বান্দা যখন গোনাহ করে, তখন তার অন্তরে একটি কাল দাগ পড়ে। তওবা করলে এ দাগ মিটে যায়। এর পর পুনরায় গোনাহ্ করলে এই দাগ আরও বেড়ে যায় এবং বাড়তে বাড়তে অবশেষে সমগ্র অন্তর কাল হয়ে যায়। এরই অপর নাম মরিচা। রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করেন, “মুমিনের অন্তর পরিষ্কার। তাতে প্রদীপ জ্বলে। আর কাফেরের অন্তর কাল ও অধোমুখী”। এ থেকে জানা গেল, আল্লাহ্ তাআলার আনুগত্য ও কামপ্রবৃত্তির বিরোধিতা অন্তরকে ঔজ্জ্বল্য দান করে এবং আল্লাহর নাফরমানীর কারণে অন্তর কাল হয়ে যায়। সুতরাং যে গোনাহ করে, তার অন্তর কাল হয়ে যায়। যদি কেউ গোনাহের পরে সৎকাজ করে পূর্বের প্রভাব মিটিয়ে দিতে চায়, তবে কাল দাগ মিটে গেলেও নূরের মধ্যে কিছু ত্রুটি থেকে যায় ! যেমন— আয়নায় ফুঁ মেরে পরিষ্কার করার পর আবার ফুঁ মেরে পরিষ্কার করলে কিছু না কিছু পঙ্কিলতা থেকেই যায় ৷ নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন  : “অন্তর চার প্রকার । (১) পরিষ্কার অন্তর। তাতে প্রদীপ জ্বলে। এটা মুমিনের অন্তর। (২) কাল অধোমুখী অন্তর। এটা কাফেরের অন্তর। (৩) গেলাফে আবৃত মুখ বাঁধা অন্তর। এটা মোনাফেকের অন্তর। (৪) এমন অন্তর, যাতে ঈমান ও নেফাক উভয়টি রয়েছে। এতে ঈমানের প্রভাব এমন, যেমন সবুজ ঘাসকে পবিত্র পানি আরও সতেজ করে তোলে। আর নেফাকের প্রভাব এমন, যেমন পুঁজ ক্ষতস্থানকে আরও বিস্তৃত করে দেয়। অতএব ঈমান ও নেফাকের মধ্যে যেটি প্রবল হবে, অন্তরের অবস্থা তদনুরূপ হয়ে যাবে। আল্লাহ্ তাআলা বলেনঃ “নিশ্চয় যারা খোদাভীরু, শয়তানের কল্পনা স্পর্শ করতেই তারা  আল্লাহকে স্মরণ করে এবং তৎক্ষণাৎ চক্ষুষ্মান হয়ে যায়”। এ আয়াত ব্যক্ত করে যে, আল্লাহর স্মরণ দ্বারা অন্তরের ঔজ্জ্বল্য অর্জিত হয়। আর যারা খোদাভীরু, তারাই আল্লাহকে স্মরণ করে। অতএব জানা গেল, খোদাভীতি স্মরণ তথা যিকিরের ফটক, যিকির কাশফের দরজা এবং কাশফ হচ্ছে বৃহৎ নূর অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলার দীদারের দ্বার । 


পরবর্তী পর্ব – 

জ্ঞানার্জনের দিক দিয়ে অন্তরের দৃষ্টান্ত

অন্তর বা হৃদয় (পর্ব- ৫) মানব অন্তরের বৈশিষ্ট্য – ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)



অন্তর বা হৃদয় (পর্ব- ৫) 

📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

মানব অন্তরের বৈশিষ্ট্য

প্রকাশ থাকে যে, আমরা যে সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও ইন্দ্রিয়  সম্পর্কে বর্ণনা করেছি, সেগুলো আল্লাহ তাআলা সকল জন্তু-জানোয়ারকেও দান করেছেন। উদাহরণতঃ কাম-ক্রোধ এবং বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ ইন্দ্রিয় সকল প্রাণীরই অর্জিত আছে। সেমতে ছাগল যখন ব্যাঘকে দেখে ফেলে, তখন তার শত্রুতা মনে মনে আঁচ করে তৎক্ষণাৎ পলায়ন করে। এ থেকে জানা যায়, পশুর মধ্যেও অভ্যন্তরীণ উপলব্ধি বিদ্যমান আছে। এখন আমরা এমন বিষয় বর্ণনা করব যা একান্তভাবে মানুষের মধ্যে পাওয়া যায়, যার কারণে সে সৃষ্টির সেরা এবং খোদায়ী নৈকট্য লাভের যোগ্য হয়েছে। এরূপ বিষয় দুটি -একটি জ্ঞান ও অপরটি ইচ্ছা। ইহলৌকিক ও পারলৌকিক বিষয়াদির জ্ঞান না ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিষয়সমূহের গণ্ডির মধ্যে দাখিল, না জন্তু-জানোয়ার এতে মানুষের সাথে শরীক। বরং সামগ্রিক জাজ্বল্যমান বিষয় সমূহের জ্ঞানও মানুষের বৈশিষ্ট্য। উদাহরণতঃ মানুষ এই জ্ঞান রাখে যে, এক ব্যক্তির একই সময়ে একই অবস্থায় দু’স্থানে বিদ্যমান হওয়া অসম্ভব। ইচ্ছার মানে, মানুষ যখন জ্ঞান দ্বারা কোন কাজের পরিণতি চিন্তা করে এবং তাতে কল্যাণ দেখে, তখন তার মনে সেই কল্যাণ হাসিল করার একটা আগ্রহ সৃষ্টি হয়। একেই বলা হয়েছে ইচ্ছা। এটা কামনার ইচ্ছার বিপরীত। উদাহরণতঃ কামনা ইনজেকশনের প্রতি অনীহা পোষণ করে, কিন্তু জ্ঞান তার ইচ্ছা করে এবং এর জন্যে টাকা-পয়সা পর্যন্ত ব্যয় করে। যদি আল্লাহ্ তাআলা জ্ঞান সৃষ্টি করতেন এবং ইচ্ছাকে সৃষ্টি না করতেন, তবে জ্ঞানের সিদ্ধান্ত নিষ্ফল হয়ে যেত। মোটকথা, মানুষের অন্তরস্থিত জ্ঞান ও ইচ্ছা পশুকুলের মধ্যে নেই; বরং প্রথমে শিশুদের মধ্যেও থাকে না। কেননা, প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর তাদের মধ্যে ইচ্ছার উদ্ভব হয়, কিন্তু কাম, ক্রোধ, বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ ইন্দ্রিয় সমস্তই তাদের মধ্যে বিদ্যমান থাকে। হাঁ, শিশুর মধ্যে এসব জ্ঞান অর্জিত হওয়ার দুটি স্তর আছে। প্রথম স্তর হচ্ছে তার অন্তরে জাজ্বল্যমান বিষয়সমূহের জ্ঞান এসে যাওয়া। এই স্তরে প্রমাণসাপেক্ষ বিষয়সমূহের জ্ঞান তার মধ্যে অর্জিত হবে না, কিন্তু সে তা অর্জিত হওয়ার কাছাকাছি চলে যাবে। দ্বিতীয় স্তর হচ্ছে কর্ম, অভিজ্ঞতা ও চিন্তাভাবনার মাধ্যমে জ্ঞান অর্জিত হওয়া জ্ঞানের স্তরটি মনুষ্যত্বের সর্বোচ্চ শিখর, কিন্তু এতে অসংখ্য ও অশেষ ধাপ রয়েছে এবং জ্ঞানের আধিক্য ও স্বল্পতার দিক দিয়ে মানুষে মানুষে অনেক তফাৎ হয়। এছাড়া জ্ঞান অর্জনের পন্থার মধ্যেও তফাৎ হয়। কতক অন্তর প্রথম ধাপেই মুকাশাফা ও ইলহাম দ্বারা এ জ্ঞান অর্জন করে নেয়। কতক অন্তর অধ্যবসায় ও শিক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে অর্জন করে। এতেও অনেকে মেধাবী এবং কতক স্থূলবুদ্ধিসম্পন্ন হয়। এক্ষেত্রে নবী, আলেম, ওলী ও বিজ্ঞজনের স্তর বিভিন্নরূপ এবং উন্নতির কোন শেষ সীমা নেই। কেননা, জ্ঞাতব্য বিষয়সমূহের কোন সীমা-পরিসীমা নেই। এতে সেই পয়গম্বরের মর্যাদা সর্বোচ্চ, যার সামনে সকল স্বরূপ কেবল মুকাশাফা ও ইলহামের মাধ্যমে উদঘাটিত হয়ে যায়। এই সৌভাগ্যের বদৌলতই বান্দা আল্লাহ্ তাআলার নৈকট্য লাভ করে এবং এসব স্তরে উন্নতি করাই সাধকদের মনযিল। এসব মনযিলের কোন শেষ নেই ; বরং প্রত্যেক সাধক যে মনযিলে উপনীত হয়, তার সেই মনযিল ও নীচের মনযিলের অবস্থা জানা থাকে, কিন্তু সম্মুখের মনযিল সম্পর্কে তার কিছুই জানা থাকে না। তবে মাঝে মাঝে গায়েবের প্রতি বিশ্বাসস্বরূপ সেসব মনযিলকে সত্য বলে বিশ্বাস করে; যেমন আমরা নবুওয়ত ও নবীর প্রতি বিশ্বাস রাখি এবং তাঁদের অস্তিত্বকে সত্য বলে জানি; কিন্তু নবুওয়তের স্বরূপ নবী ব্যতীত কেউ জানে না। 

আল্লাহ্ তাআলার রহমত সকলের জন্যে ব্যাপক। এতে কারও সাথে আল্লাহর পক্ষ থেকে কৃপণতা নেই, কিন্তু এই রহমত সেসব অন্তরে প্রকাশ পায়, যারা রহমতের অপেক্ষায় থাকে। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন  : তোমাদের জীবনের দিনগুলোতে আল্লাহ্ তাআলার রহমতের অনেক প্রবাহ আসে। অতএব তোমরা এর অপেক্ষায় থাক। রহমতের অপেক্ষায় থাকার মানে, অন্তরকে পাক সাফ রাখবে এবং দুশ্চরিত্রতা ও মালিন্য থেকে বেঁচে থাকবে। এই দুশ্চরিত্রতা ও মলিনতার কারণেই কতক অন্তরে খোদায়ী নূর অনুপস্থিত থাকে। নতুবা আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে কোন কার্পণ্য ও বাধা থাকে না। কেননা, অন্তরের অবস্থা পাত্রের মত। পাত্রে যতক্ষণ পানি ভর্তি থাকে, তাতে বায়ু প্রবেশ করতে পারে না। অনুরূপভাবে যখন অন্তর গায়রুল্লাহ্র সাথে ব্যাপৃত থাকে, তখন তাতে খোদায়ী মারেফত প্রবেশ করে না! নিম্নোক্ত হাদীসে এ বিষয়ের দিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে  : “যদি শয়তান আদম সন্তানদের অন্তরের চারপাশে ঘুরাফেরা না করত, তবে তারা আকাশের ফেরেশতা ও স্বর্গলোক দেখতে পেত”। সার কথা, মানুষের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে জ্ঞান ও প্রজ্ঞা। সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞান হচ্ছে আল্লাহর সত্তা, তাঁর গুণাবলী ও কর্মের জ্ঞান। এতেই মানুষের পূর্ণতা এবং এই পূর্ণতার কারণে সৌভাগ্য ও খোদায়ী দরবারে উপস্থিতি অর্জিত হয়। সুতরাং যেব্যক্তি তার সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে এমনভাবে কাজে নিয়োজিত করে, যদ্দ্বারা তার জ্ঞানার্জনে সহায়তা হয়, সে ফেরেশতাদের অনুরূপ এবং তাদের মধ্যে গণ্য হওয়ার যোগ্য। যে সকল মহিলা হযরত ইউসুফ (আঃ)-কে দেখতে এসেছিল, আল্লাহ তাআলা কোরআনে তাদের এই উক্তি উদ্ধৃত করেছেন  :  “সে তো মানুষ নয় ! সে তো একজন সম্ভ্রান্ত ফেরেশতা!” পক্ষান্তরে যেব্যক্তি তার সমস্ত সাহসিকতা দৈহিক আরাম-আয়েশে ব্যয় করে এবং চতুষ্পদ জন্তুদের মত খেয়ে যায়, সে পশুর স্তরে দাখিল হয়ে নিছক আনাড়ি বলদ হবে, না হয় শূকরের ন্যায় লোভী হবে। অথবা কুকুরের ন্যায় ঘেউ ঘেউকারী হবে। অথবা উটের ন্যায় বিদ্বেষকারী হবে। অথবা চিতাবাঘের ন্যায় দাম্ভিক হবে। অথবা শৃগালের ন্যায় ধূর্ত হবে। এই সবগুলো বিষয় কোন একজনের মধ্যে বিদ্যমান থাকলে সে হবে পুরাপুরি বিতাড়িত শয়তান। মানুষের সৌভাগ্য পূর্ণরূপে এ বিষয়ের মধ্যেই নিহিত যে, সে আল্লাহর দীদারকে নিজের লক্ষ্য স্থির করবে, পরকালকে আবাসস্থল মনে করবে, দুনিয়াকে মনযিল, দেহকে যানবাহন, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে খাদেম জ্ঞান করবে এবং বোধশক্তিকে বাদশাহ সাব্যস্ত করবে, যার রাজধানী হচ্ছে অন্তর মস্তিষ্কের অগ্রভাগে অবস্থিত কল্পনাশক্তি হচ্ছে সেই বাদশাহের দূত। কেননা, ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিষয়সমূহের সংবাদ তার কাছে একত্রিত হয়। মস্তিষ্কের পশ্চাদভাগে অবস্থিত স্মরণশক্তি হচ্ছে তার কোষাধ্যক্য, জিহ্বা ভাষ্যকার, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ লেখক এবং পঞ্চইন্দ্রিয় তার গুপ্তচর। পঞ্চইন্দ্রিয় নিজ নিজ এলাকার সংবাদ একত্রিত করে কল্পনাশক্তির কাছে পৌঁছে দেয়। সে এগুলো কোষাধ্যক্ষ অর্থাৎ, স্মরণশক্তির কাছে সোপর্দ করে। এর পর কোষাধ্যক্ষ বাদশাহ্ অর্থাৎ, বোধশক্তির দরবারে পেশ করে। বাদশাহ রাজত্ব পরিচালনার জন্যে যে সকল সংবাদ জরুরী, সেগুলো গ্রহণ করে নেয়। যে মানুষ নিজেকে এভাবে সক্রিয় রাখে, সে ভাগ্যবান, সফলকাম এবং খোদায়ী নেয়ামতের শোকরকারী হয়। পক্ষান্তরে যে এগুলোকে নিষ্ক্রিয় করে রাখে, সে হতভাগা, লাঞ্ছিত ও অকৃতজ্ঞ সাব্যস্ত হয়ে পরিণামে আযাব, শাস্তি ও পরকালীন দুর্ভোগের পাত্র হয়ে যায় (নাউযু বিল্লাহ)। আমাদের বর্ণিত এ দৃষ্টান্তের প্রতি হযরত কাব ইবনে আহবার ইঙ্গিত করেছেন। তিনি বলেন : আমি হযরত আয়েশা (রাঃ) -এর খেদমতে হাযির হয়ে আরজ করলাম, মানুষের মধ্যে চক্ষু পথপ্রদর্শক, কান রক্ষক, জিহ্বা ভাষ্যকার, হাত লশকরের দু’বাহু, পা দূত এবং অন্তর বাদশাহ। সুতরাং বাদশাহ ভাল হলে তার অনুচরবর্গ ভাল হবে। হযরত আয়েশা (রঃ) বললেন : আমি রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-উনাকেও এরূপ বলতে শুনেছি। হযরত আলী (রঃ) অন্তরের দৃষ্টান্ত দিতে গিয়ে বলেন  : পৃথিবীতে আল্লাহর পাত্র হচ্ছে অন্তর। সেই অন্তর আল্লাহর অধিক প্রিয়, যে নরম, স্বচ্ছ ও শক্ত। অতএব তোমরা মুসলমান ভাইদের সাথে নরম, বিশ্বাসে স্বচ্ছ এবং ধর্মের ব্যাপারে কঠোর হবে। এতে এই আয়াতের প্রতি ইঙ্গিত রয়েছে : “তারা কাফেরদের প্রতি কঠোর এবং পরস্পরে সংবেদনশীল”।  হযরত উবাই ইবনে কা'ব  (মাসালা নূরিহী কামিশকাতুন ফিহা মিসবাহ)

আয়াতের তফসীরে বলেন, এটা মুমিনের নূর ও তার অন্তরের দৃষ্টান্ত। তিনি— (আও কাজুলুমা-তিন ফী বাহরিল লুজ্জিইয়িইঁ) এই আয়াতের তফসীরে বলেন, এটা মোনাফেকের অন্তরের দৃষ্টান্ত। যায়েদ ইবনে আসলাম কোরআনে উল্লিখিত “লওহে মাহফুয” ( সংরক্ষিত ফলক ) সম্পর্কে বলেন, এটা মুমিনের অন্তর। হযরত সহল তস্তরী (রহঃ) বলেন  : অন্তর ও বক্ষের উপমা হচ্ছে আরশ ও কুরসী। 



পরবর্তী পর্ব– অন্তরের গুণাবলী ও উদাহরণ 

অন্তর বা হৃদয়- (৪) কামনার অনুগত থাকা সমীচীন – ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)



অন্তর বা হৃদয় (পর্ব- ৪) 
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

কামনার অনুগত থাকা সমীচীন : 
(১) প্রথম দৃষ্টান্ত—
মনে করুন মানুষের নফস অর্থাৎ, পূর্ববর্ণিত লতীফা বাদশাহ্, দেহ তার রাজধানী, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তার কর্মী ও আমলা, বিবেকশক্তি তার হিতাকাক্ষী উযীর, ক্রোধ তার রাজধানীর প্রধান পুলিশ কর্মচারী এবং কামনা বাসনা তার দুশ্চরিত্র গোলাম, যে এই রাজধানী শহরে খাদ্যশস্য ইত্যাদি আনয়ন করে। সে এত ধূর্ত, মিথুক ও নোংরা যে, শুভাকাঙ্ক্ষারূপে আগমন করে, কিন্তু তার শুভাকাঙ্ক্ষার মধ্যে আদি-অন্ত ষড়যন্ত্র ও মারাত্মক বিষ নিহিত থাকে। বিচক্ষণ উযীরের সাথে কথায় কথায় বিবাদ করা তার অভ্যাস। এমনকি, কোন মুহূর্ত তার কথা কাটাকাটি থেকে খালি থাকে না। সুতরাং এমতাবস্থায় যদি বাদশাহ্ তার রাজত্ব পরিচালনায় উযীরের পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করে এবং এই দুশ্চরিত্র গোলামের কথাবার্তা প্রত্যাখ্যান করে, তবে নিঃসন্দেহে রাজকার্য সঠিকভাবে ও ইনসাফ সহকারে পরিচালিত হবে। এক্ষেত্রে বাদশাহকে বুঝে নিতে হবে, গোলামের বিরুদ্ধাচণের মধ্যেই কল্যাণ নিহিত। উযীরের মন রক্ষার্থে প্রধান পুলিশ কর্মকর্তাকেও উপদেশ দিতে হবে এবং উযীরের পক্ষে থেকে তাকে এই দুশ্চরিত্র গোলাম ও তার সাঙ্গপাঙ্গদের উপর মোতায়েন করতে হবে, যাতে গোলাম সীমালঙ্ঘন করতে না পারে এবং পরাভূত ও শাসিত থেকে যায়। অনুরূপভাবে যদি নফস বুদ্ধির সাহায্য নেয়, ক্রোধকে কামনার উপর চাপিয়ে রাখে এবং কখনও ক্রোধকে দমন করার জন্যে কামনার সাহায্য নেয়, তবে নফসের সকল শক্তি সমতার উপর কায়েম থাকবে এবং চরিত্র উন্নত হবে। যে ব্যক্তি এ পন্থা বর্জন করবে, সে সেই লোকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে, যাদের সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন : “আপনি কি দেখেছেন তাকে যে নিজের প্রবৃত্তিকে উপাস্য বানিয়ে নিয়েছে? আর আল্লাহ্ তাকে জেনেশুনেই বিভ্রান্ত করেছেন এবং তার কর্ণ ও হৃদয় মোহরাঙ্কিত করে দিয়েছেন। আর তার চোখের উপর রেখেছেন আবরণ”।  

অথবা এরশাদ হয়েছে : "এবং সে তার খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করেছে । অতএব তার দৃষ্টান্ত কুকুরের মত । তার উপর বোঝা চাপালে সে হাঁপায় এবং বোঝ না চাপিয়ে ছেড়ে দিলেও হাঁপায়"।

পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি তার নফসকে কামনা থেকে ফিরিয়ে রাখে, তার সম্পর্কে এরশাদ হয়েছে- "আর যে তার পালনকর্তার সামনে দণ্ডায়মান হওয়াকে ভয় করে এবং আপন নফসকে খেয়াল-খুশী থেকে বিরত রাখে, জান্নাতই তার ঠিকানা


(২) দ্বিতীয় দৃষ্টান্ত—

মনে করুন, দেহ একটি শহর এবং এর বিচক্ষণ প্রশাসক হচ্ছে বুদ্ধি। বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ ইন্দ্রিয়সমূহ এই শহরের লশকর। অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ এর প্রজা এবং কামনা ও ক্রোধ এই শহরের দুশমন। তারা এই শহরে তাদের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করতে এবং প্রজাদেরকে ধ্বংস করতে ইচ্ছুক। এখন দেহকে একটি পরিখা মনে করা উচিত , যার মধ্যে বাদশাহ স্বয়ং রক্ষণাবেক্ষণের জন্যে বিদ্যমান রয়েছে। সে যদি যুদ্ধ করে দুশমনকে বিতাড়িত অথবা পরাভূত করে দেয়, তবে তার এ কাজ আল্লাহর দরবারে পছন্দনীয় হবে। যেমন আল্লাহ বলেন,-"যারা ধন ও প্রাণের বিনিময়ে জেহাদ করে, আল্লাহ তাদেরকে গৃহে উপবিষ্টদের উপর অধিক মর্যাদা দান করেন"।

পক্ষান্তরে বাদশাহ যদি পরিখা বিনষ্ট ও প্রজাদেরকে বিপন্ন করে দেয়, তবে সে সর্বোচ্চ দরবারে নিন্দার পাত্র হবে এবং তাকে এর শাস্তি দেয়া হবে। এক হাদীসে কুদসীতে বলা হয়েছে –এরূপ ব্যক্তিকে কেয়ামতের দিন বলা হবে, হে দুষ্টমতি রক্ষক, তুমি গোশত খেয়েছ এবং দুধ পান করেছ, কিন্তু হারানো উদ্ধার করনি এবং ভগ্নাবস্থাকে ঠিক করনি । আজ আমি তোমার কাছ থেকে বিনিময় গ্রহণ করব। এই জেহাদের প্রতিই ইঙ্গিত রয়েছে নিম্নোক্ত হাদীসে "আমরা ছোট জেহাদ থেকে বড় জেহাদের দিকে ফিরে এসেছি"।


(৩) তৃতীয় দৃষ্টান্ত:-

বুদ্ধিকে একজন আরোহী মনে করা উচিত, যার ইচ্ছা শিকার করার। কামনাকে তার ঘোড়া এবং ক্রোধকে তার কুকুর খেয়াল করা দরকার। এখন যদি আরোহী পারদর্শী হয় এবং ঘোড়া ও কুকুর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হয়, তবে অবশ্যই অভীষ্ট অর্জিত হবে। পক্ষান্তরে যদি আরোহী স্বয়ং আরোহণ বিদ্যায় মূখ হয় এবং ঘোড়া অবাধ্য ও কুকুর উন্মাদ হয়, তবে না ঘোড়া তার কথামত কাজ করবে এবং না কুকুর তার ইশারায় শিকারের দিকে ধাবিত হবে। এরূপ ব্যক্তির জন্যে শিকার করা দূরের কথা, প্রাণ রক্ষা করাই কঠিন হয়ে যাবে। এই দৃষ্টান্তে আরোহীর অনভিজ্ঞতা মানে মানুষের মূর্খতা ও জ্ঞানশক্তির অভাব, ঘোড়ার অবাধ্যতা মানে কামনার প্রাবল্য, বিশেষত উদরের কামনা ও যৌন কামনার প্রাবল্য এবং কুকুরের উন্মত্ততার মানে ক্রোধের প্রাবল্য। আল্লাহ তাআলা আপন কৃপায় মানুষকে এগুলো থেকে রক্ষা করুন।



পরবর্তী পর্ব– মানব অন্তরের বৈশিষ্ট

অন্তর বা হৃদয়- ৩ অন্তরের লশকর ও খাদেম – ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)



অন্তর বা হৃদয় (পর্ব- ৩) 

📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

কলৰ তথা অন্তরের লশকর 

প্রকাশ থাকে যে, অন্তর, রূহ ও অন্যান্য জগতে আল্লাহ্ তাআলার লশকর এত বেশী যে, এগুলোর স্বরূপ ও গণনা তিনি ব্যতীত কেউ জানে । আল্লাহ তাআলা বলেন  "আপনার পালনকর্তার লশকর তিনি ব্যতীত কেউ জানে না ।" এখন আমরা অন্তরস্ত আল্লাহ্ তাআলার কয়েকটি লশকর সম্পর্কে বর্ণনা করছি । কেননা, আমাদের আলোচনা অন্তর সম্পর্কেই । অন্তরের দুটি লশকর। এক, যা চর্মচক্ষে দেখা যায় এবং দুই, যা অন্তশ্চক্ষে অনুধাবন করা যায়। এই উভয় প্রকার লশকর অন্তরের জন্যে খাদেম ও সাহায্যকারী। যে লশকর চোখে দেখা যায়, সেগুলো হচ্ছে হাত, পা, জিহ্বা, চক্ষু কর্ণ, নাসিকা এবং অন্যান্য সকল বাহ্যিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। অন্তর এগুলোকে যেভাবে চায় কাজে লাগায় । অন্তরের আনুগত্য করার জন্যেই এগুলো সৃজিত হয়েছে। অন্তরের বিরুদ্ধাচরণ করার ক্ষমতা এদের নেই এবং এরা অন্তরের বৈরীও হতে পারে না। উদাহরণত, অন্তর যখন চক্ষুকে খোলার আদেশ দেয়, তখন সে খুলে যায়। পা’কে চলার আদেশ করলে সে চলতে থাকে। জিহ্বাকে বলার আদেশ করলে সে বলতে থাকে। অন্য সকল অঙ্গের অবস্থাও তথৈবচ। অন্তরের জন্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও ইন্দ্রিয়ের আনুগত্য এমন, যেমন আল্লাহ তাআলার জন্যে ফেরেশতাদের আনুগত্য। কারণ, ফেরেশতাগণও আনুগত্যের জন্যেই সৃজিত। তারা আনুগত্যের খেলাফ করার ক্ষমতা রাখে না। কোরআনের ভাষায় তাদের অবস্থা এই- "তারা আল্লাহর আদেশের নাফরমানী করে না এবং তাই করে, যা করার আদেশ হয়।" তবে পার্থক্য হচ্ছে, ফেরেশতারা আপন আনুগত্য ও খোদায়ী আদেশ পালনের বিষয় অবগত থাকে, কিন্তু অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ আনুগত্য দূরের কথা, আপন অস্তিত্ব সম্পর্কেও অবগত নয়। বলাবাহুল্য, অন্তরকে সৃষ্টি করা হয়েছে একটি সফরের জন্যে। সেই সফর হচ্ছে খোদায়ী মারেফত এবং খোদায়ী দীদারের মনযিল অতিক্রম করার সফর। আল্লাহ্ তাআলা বলেনঃ -"আমি জ্বিন ও মানবকে কেবল আমার এবাদতের জন্যে সৃষ্টি করেছি"।

অন্তরের এই সফরের জন্যে সাহায্যকারীর প্রয়োজন ছিল তাই অন্তরকে সওয়ারী, পাথেয় ইত্যাদি দান করা হয়েছে । দেহ হচ্ছে অন্তরের সওয়ারী এবং পাথেয় জ্ঞান ও শিক্ষা। দুনিয়াতে বসবাস করা ছাড়া আল্লাহর পথে চলা বান্দার জন্যে সম্ভবপর নয়। কেননা, বড় মনযিলে পৌছার জন্যে ছোট মনযিল অতিক্রম করা জরুরী। তাই দুনিয়াকে পরকালের শস্যক্ষেত্র বলা হয়েছে। অন্তরকে ইহজগতে অবশ্যই পাথেয় সংগ্রহ করতে হবে। দেহরূপী সওয়ারীর সাহায্যে সে ইহজগতে পৌছে যায়। সুতরাং দেহের হেফাযত ও রক্ষণাবেক্ষণ অত্যাবশ্যক। 

হেফাযত হচ্ছে দেহকে অনুকূল খাদ্য সরবরাহ করা এবং ধ্বংসের কারণাদি দূর করা। এদিক দিয়ে খাদ্য হাসিল করার জন্যে দুটি খাদেমের প্রয়োজন দেখা দিল। একটি বাতেনী, যার নাম ক্ষুধা ও মনের স্পৃহা এবং অপরটি যাহেরী অর্থাৎ, হাত ইত্যাদি, যদ্দরা খাদ্য অর্জিত হয়। এছাড়া ধ্বংসের কারণ থেকে বাঁচার জন্যে দুটি লশকরের প্রয়োজন দেখা দিল। একটি বাতেনী, যাকে ক্রোধ বলা হয়। যার কারণে শত্রুর কাছ থেকে প্রতিশোধ নেয়া হয় এবং অপরটি যাহেরী অর্থাৎ ,হাত, পা ইত্যাদি। দেহে এসব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ যেন হাতিয়ারের মত কাজ করে। এখন যে ব্যক্তি খাদ্যের মুখাপেক্ষী, সে যদি খাদ্যের অবস্থা না জানে, তবে কেবল খাদ্যে স্পৃহা ও ক্ষুধায় কাজ হবে না। তাই খাদ্যের অবস্থা জানার জন্যে অন্তরকে দু'টি খেদমতগার দেয়া হয়েছে। একটি বাতেনী অর্থাৎ, পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের উপলব্ধি এবং অপরটি যাহেরী অর্থাৎ, পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের বাহ্যিক স্থান তথা কর্ণ, চক্ষু, নাসিকা ইত্যাদি ।


অন্তরের খাদেম তিন প্রকার—

সারকথা, অন্তরের খাদেম তিন প্রকার । 

(১) প্রথম প্রকার হচ্ছে অন্তরকে কোন বস্তুর প্রতি উৎসাহিত করে- উপকার লাভের প্রতি, যেমন ক্ষুধা অথবা ক্ষতি দূর করার প্রতি, যেমন ক্রোধ। এই প্রকার খাদেমকে এরাদা তথা ইচ্ছাও বলা হয়। 

(২) দ্বিতীয় প্রকার হচ্ছে যা উদ্দেশ্য হাসিলের জন্যে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে গতিশীল করে। একে বলা হয় ক্ষমতা ও শক্তি। এটা সমস্ত অঙ্গে বিশেষত শিরা-উপশিরার মধ্যে ছড়িয়ে আছে।

(৩) তৃতীয় প্রকার হচ্ছে দেখা, ঘ্রাণ লওয়া, শ্রবণ করা, আস্বাদন করা ও স্পর্শ করার শক্তি, যা নির্দিষ্ট অঙ্গসমূহের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে। এই প্রকারের নাম উপলব্ধি জ্ঞান। 


এসব বাতেনী লশকরের মধ্য থেকে প্রত্যেকটির জন্যে যাহেরী লশকরও রয়েছে। অর্থাৎ,রক্ত,মাংস, চর্বি, অস্থি ইত্যাদি দ্বারা গঠিত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। উদাহরণতঃ স্পর্শ শক্তির সম্পর্ক অঙ্গুলির সাথে এবং দর্শন শক্তির সম্পর্ক চোখের সাথে । আমরা বাহ্যিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সম্পর্কে আলোচনা করব না । কেননা, এগুলো বাহ্যজগত । আমরা বরং অন্তরের সেসব লশকর সম্পর্কে আলোচনা করব, যেগুলো চোখে দেখা যায় না। অর্থাৎ, তৃতীয় প্রকার উপলব্ধি শক্তি সম্পর্কে। 

এই শক্তি দু'প্রকার। 

প্রথম প্রকার সেসব শক্তি, যাদের ঠিকানা বাহ্যিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ; অর্থাৎ, চক্ষু, কর্ণ ইত্যাদি বাহ্যিক পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের মধ্যে নিহিত। 

দ্বিতীয় প্রকার সেসব শক্তি, যাদের বাসস্থান বাতেনী মনযিলসমূহের মধ্যে নিহিত; অর্থাৎ, মস্তিষ্কের কোটরসমূহের মধ্যে। 

এই দ্বিতীয় প্রকারও পাঁচ ভাগে বিভক্ত। কেননা, মানুষ কোন বস্তুকে দেখে যখন চক্ষু বন্ধ করে নেয় তখন সে সেই বস্তুর চিত্র মনের মধ্যে পায়। একে বলা হয় “খেয়াল” তথা কল্পনা। এর পর এই চিত্র কতক বিষয় মনে রাখার মাধ্যমে মানুষের সাথে থাকে। একে বলা হয় স্মরণশক্তি। এর পর সে এই স্মরণ করা বিষয় সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করে এবং কতককে কতকের সাথে মিলায়। ফলে যা ভুলে গিয়ে থাকে তা স্মরণ হয়ে যায়। কতক চিত্র হুবহু মনের মধ্যে থেকে যায়। এর পর সে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য সকল বিষয় অভিন্ন চেতনার মাধ্যমে আপন কল্পনায় একত্রিত করে নেয়। এ থেকে জানা গেল, মস্তিষ্কের অভ্যন্তরে যে সকল শক্তি রয়েছে, সেগুলো হচ্ছে অভিন্ন চেতনা, কল্পনা, চিন্তা, জল্পনা ও স্মরণ রাখা। আল্লাহ তাআলা এসব শক্তি সৃষ্টি না করলে মস্তিষ্ক এগুলো থেকে খালি থাকত। যেমন- হাত, পা এগুলো থেকে খালি রয়েছে।

অন্তরের আভ্যন্তরীণ খাদেম জানা উচিত, ক্রোধ ও কামনা অন্তরের এ দুটি খাদেম কখনও পুরা মাত্রায় অন্তরের আনুগত্য করে। তখন অন্তর অধ্যাত্ম পথে চলার ব্যাপারে এগুলো থেকে সাহায্য পায়। বরং আল্লাহর দিকে সফরে এ দুটিকে উত্তম সঙ্গী মনে করে, কিন্তু মাঝে মাঝে এ দুটি খাদেম অন্তরের অবাধ্য 


অন্তরের আভ্যন্তরীণ খাদেম —

জানা উচিত, ক্রোধ ও কামনা –অন্তরের এ দুটি খাদেম কখনও পুরা মাত্রায় অন্তরের আনুগত্য করে। তখন অন্তর অধ্যাত্ম পথে চলার ব্যাপারে এগুলো থেকে সাহায্য পায়। বরং আল্লাহর দিকে সফরে এ দুটিকে উত্তম সঙ্গী মনে করে, কিন্তু মাঝে মাঝে এ দুটি খাদেম অন্তরের অবাধ্য ও বিদ্রোহী হয়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত অন্তরকে নিজেদের গোলাম বানিয়ে নেয়। তখন তারা অন্তরের বরবাদ হওয়ার কারণ হয়ে যায়। ফলে অন্তর চিরন্তন সৌভাগ্য লাভের সফর থেকে বিরত থাকে, কিন্তু অন্তরের আরও সাহায্যকারী রয়েছে; যেগুলোকে শিক্ষা, প্রজ্ঞা ও চিন্তা-ভাবনা বলা হয়। এহেন সংকট মুহূর্তে ক্রোধ ও বাসনার মোকাবিলা করার জন্যে এগুলোর সাহায্য নেয়া উচিত। কেননা, ক্রোধ ও কামনা কখনও শয়তানের দলে ভিড়ে অন্তরের উপর অনন্তর চাপ সৃষ্টি করতে থাকে। যদি অন্তর উপরোক্ত খাদেমদের সাহায্য না নেয় এবং ক্রোধ ও কামনার অনুগত হয়ে যায়, তাহলেও ধ্বংস ও প্রকাশ্য ক্ষতির আশংকা থেকে যায়। অধিকাংশ লোককে দেখা যায়, তাদের বিবেক-বুদ্ধি কামনা-বাসনা চরিতার্থ করার জন্যে অনেক কৌশল খুঁজে ফিরে। অথচ বুদ্ধির প্রয়োজন মিটানোর ব্যাপারে কামনার অনুগত থাকা সমীচীন। এখন আমরা তিনটি দৃষ্টান্তের মাধ্যমে এ বিষয়টির ব্যাখ্যা পাঠকবর্গের সামনে তুলে ধরছি ।



পরবর্তী পর্ব– কামনার অনুগত থাকা সমীচীন

অন্তর বা হৃদয়- ২ অন্তরের রহস্যাবলী - ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)


অন্তর বা হৃদয় (পর্ব- ২) 
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

অন্তরের রহস্যাবলী
প্রকাশ থাকে যে, নফস, রুহ্, কলব ও আকল- (এই চারটি শব্দ) ধ্বংসকারী ও উদ্ধারকারী বিষয়সমূহের আলোচনায় ব্যবহৃত এই শব্দ চতুষ্টয়ের অর্থের বিভিন্নতা ও এদের প্রতীক সম্পর্কে কম সংখ্যক আলেমই অবগত আছেন। এদের অর্থ না জানা এবং বিভিন্ন ও অভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হওয়ার অবস্থা না জানার কারণেই অধিকাংশ ভ্রান্তি সৃষ্টি হয়ে থাকে। তাই আমরা এসব শব্দের সেই অর্থ বর্ণনা করব, যার সাথে আমাদের উদ্দেশ্য সম্পৃক্ত।


(১) কলব—

প্রথম শব্দ ‘কলব', এর অর্থ দু’টি। এক, বক্ষস্থলের বাম দিকে অবস্থিত লম্বা ত্রিকোণ মাংসপিন্ড। এর মাঝখানে শূন্যগর্ভ আছে, যাতে কাল রক্ত থাকে। এটাই রূহের উৎস ও আকর, কিন্তু এর আকার-আকৃতি বর্ণনা করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। এটা ডাক্তারদের কাজ। এ ধরনের কলব তথা হৃদয় চতুষ্পদ জন্তু এমনকি মৃতদের মধ্যেও থাকে।


কলবের দ্বিতীয় অর্থ, এটি একটি আধ্যাত্মিক লতীফা (সূক্ষ্ম বিষয়), উপরোক্ত শারীরিক কলবের সাথে এই লতীফার সম্পর্ক আছে। এ লতীফাটিই মানুষের স্বরূপ, বোধশক্তির আওতাভুক্ত, আলেম, সম্বোধিত ও তিরস্কৃত। হিসাব-নিকাশের সম্পর্কও এর সাথেই। শারীরিক কলবের সাথে এই লতীফার যে সম্পর্ক, তা অনুধাবন করতে অধিকাংশ মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধি ঘুরপাক খেয়ে যায়। কেননা, শারীরিক কলবের সাথে এর সম্পর্ক গুণীর সাথে গুণাবলীর সম্পর্কের মত, অথবা যন্ত্রপাতির সাথে কারিগরের সম্পর্কের মত, অথবা গৃহের সাথে গৃহবাসীর সম্পর্কের মত। আমরা দু’কারণে এই লতীফার স্বরূপ বর্ণনা করছি না। প্রথম, এ বিষয়টি “উলুমে মুকাশাফা” তথা অদৃশ্য রহস্যাবলীর সাথে সম্পর্কযুক্ত, যা আমাদের এ গ্রন্থের আলোচ্য বিষয় নয়। দ্বিতীয়, এ সম্পর্কিত তথ্যানুসন্ধান রূহের ভেদ ফাঁস হয়ে যাওয়ার উপর নির্ভরশীল। অথচ এ ভেদ সম্পর্কে রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়া-সাল্লাম) কিছুই বলেননি। সুতরাং অন্যদেরও এসম্পর্কে মুখ খোলা অনুচিত। এ গ্রন্থে আমরা কেবল এ লতীফার গুণাবলী ও অবস্থা বর্ণনা করব। কেননা, এলমে মোয়ামালা এর উপরই ভিত্তিশীল। এতে স্বরূপ বর্ণনা করার কোন প্রয়োজন নেই।


(২) রূহ

রূহ এর পরিচয়—

দ্বিতীয় শব্দ রূহেরও দু' অর্থ। প্রথম, রূহ একটি সূক্ষ্ম দেহ, যার উৎস শারীরিক কলবের শূন্যগর্ভ। এই শূন্যগর্ভ থেকে এটা রক্তবাহী ধমনীর মাধ্যমে দেহের সমগ্র অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে। দেহে এই রূহের ছড়িয়ে পড়া এবং অঙ্গ প্রত্যঙ্গকে জীবন ও পঞ্চইন্দ্রিয় দান করা এমন, যেমন কোন গ্রহে একটি প্রদীপ রেখে দেয়া হলে তার আলো চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং যেখানেই এই আলো পৌছে, সে স্থানই উজালা হয়ে যায় । সুতরাং রূহ প্রদীপসদৃশ এবং জীবন আলোসদৃশ । রূহের এই অর্থ হচ্ছে চিকিৎসাবিদগণের পরিভাষা। এ অর্থ বর্ণনা করা আমাদের লক্ষ্য নয়। রূহের দ্বিতীয় অর্থ, রূহ মানুষের মধ্যে, একটি বোধশক্তিসম্পন্ন লতীফা কলবের দ্বিতীয় অর্থে আমরা যে ব্যাখ্যা পেশ করেছি, এখানেও সেই ব্যাখ্যাই উদ্দেশ্য । নিম্নোক্ত আয়াতে রূহের এই অর্থই বুঝানো হয়েছে "বলে দিন, রূহ্ আমার পালনকর্তার আদেশের অন্তর্ভুক্ত"। রূহের এই দ্বিতীয়, অর্থই অত্র গ্রন্থে আমাদের আলোচ্য বিষয়। 


(৩) নফস 

নফস এর পরিচয় :

তৃতীয় শব্দ হচ্ছে নফস। এটি একাধিক অর্থে অভিন্নরূপে ব্যবহৃত হয়। তন্মধ্যে দুটি অর্থ আমাদের উদ্দেশ্যের অনুকুলে। প্রথম, মানুষের নফস এমন একটি বস্তু, যা ক্রোধশক্তি ও কামশক্তিকে অন্তর্ভুক্ত করে। সুফীগণের মধ্যে এই অর্থ অধিক প্রচলিত। তাদের মতে নফসের মধ্যেই মানুষের নিন্দনীয় গুণাবলী একত্রিত আছে। এ কারণেই তারা বলেন, নফসের বিরুদ্ধে সাধনা করা এবং নফসকে ভেঙ্গে চুরমার করে দেয়া উচিত। হাদীসে এই নফস সম্পর্কেই বলা হয়েছে- "সর্বাপেক্ষা বড় শত্রু হচ্ছে তোমার নফস, যা তোমার পার্শ্বে রয়েছে।"  নফসের দ্বিতীয় অর্থ, নফস একটি খোদায়ী লতীফা, যা অবস্থাভেদে বিভিন্ন গুণে গুণান্বিত হয়। বাস্তবে এটাই মানুষ। মানুষ যখন কামনাকে প্রতিরোধ করে, তখন এই নফসের চাঞ্চল্য দূর হয়ে যায় এবং আনুগত্যে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। তখন একে “নফসে মুতমায়িন্নাহ” (প্রশান্ত চিত্ত) বলা হয়। যার সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন - "হে প্রশান্ত চিত্ত, তুমি তোমার পালনকর্তার কাছে ফিরে এসো সন্তুষ্ট ও সন্তোষভাজন হয়ে।"

কেননা, নফসের প্রথম অর্থের দিক দিয়ে তার আল্লাহ তা'আলার কাছে ফিরে আসা কল্পনা করা যায় না। বরং সে আল্লাহ তাআলার কাছ থেকে দূরে চলে যায় এবং শয়তানের দলভুক্ত হয়ে যায়। আর যদি আনুগত্যের উপর নফসের প্রতিষ্ঠা পূর্ণ না হয়, কিন্তু কামনা-বাসনা প্রতিরোধ করতে থাকে, তবে তাকে বলা হয় “নফসে গলাওয়ামা” (তিরস্কারকারী নফস) । কেননা, সে তার মালিককে আল্লাহর এবাদতে ক্রটি করতে দেখে তিরস্কার করে। কোরআন পাকে এ নফসেরও উল্লেখ আছে। বলা হয়েছে "কসম তিরস্কারকারী নফসের" 

আর যদি নফস কামনা-বাসনার প্রতিরোধ না করে; বরং কামপ্রবৃত্তি ও শয়তানের দাস হয়ে যায়, তবে তাকে বলা হয়, “নফসে আম্মারা বিস্-সূ” অর্থাৎ, জোরেজবরে কুকর্মের আদেশকারী নফস। আল্লাহ তাআলা হযরত ইউসুফ (আঃ) অথবা আযীযে মিসরের পত্নীর ঘটনা প্রসঙ্গে বলেন- “আমি আমার নফসকে নির্দোষ বলি না। কেননা, নফস জোরেশোরে কুকর্মের আদেশ করে।"


আকল

আকল এর পরিচয়—

চতুর্থ শব্দ “আকল”। এটাও বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়। তন্মধ্যে দুটি অর্থের সাথে আমাদের উদ্দেশ্য জড়িত। প্রথম, কখনও এর অর্থ নেয়া হবে একটি শিক্ষামূলক গুণ, যার স্থান কলব। দ্বিতীয় অর্থ, কখনও আকলের অর্থ নেয়া হয় শিক্ষার বোধশক্তি। এমতাবস্থায় আকলও উল্লিখিত লতীফা হবে।

সুতরাং আকল বলে কখনও শিক্ষাগুণ এবং কখনও শিক্ষাগুণের পাত্র বুঝানো হয়। নিম্নোক্ত হাদীসে দ্বিতীয় অর্থই বুঝানো হয়েছে - "আল্লাহ তাআলা সর্বপ্রথম আকল সৃষ্টি করেছেন"।  কেননা, শিক্ষাগুণ তো আপনা-আপনি বিদ্যমান হতে পারে না। তার বিদ্যমান হওয়ার জন্যে পাত্র দরকার। সুতরাং এই পাত্র তার পূর্বে অথবা তার সাথে সাথে সৃষ্ট হওয়া জরুরী। নতুবা তাকে সম্বোধন করা হবে না। এক হাদীসেই আছে, আল্লাহ তাআলা আকলকে বললেন সামনে এসো। সে সামনে এলো। আবার বললেন পিঠ ফিরিয়ে নাও। সে পিঠ ফিরিয়ে নিল।

এখন জানা উচিত, ১। কলব, ২। নফস, ৩। রূহ ও ৪। আকল -এই চারটি শব্দের ভিন্ন ভিন্ন অর্থ বিদ্যমান আছে। অর্থাৎ, শারীরিক কলব, শারীরিক রূহ, কাম-নফস ও জ্ঞান । একটি পঞ্চম অর্থ আছে, যা এই চারটি শব্দেরই অভিন্ন অর্থ; অর্থাৎ মানবীয় বোধশক্তির লতীফা। সুতরাং শব্দ হল চারটি এবং অর্থ পাচটি । পঞ্চম অর্থটি প্রত্যেক শব্দের অভিন্ন অর্থ বিধায় প্রত্যেক শব্দের অর্থ দু'টি । কোরআন মজীদ ও হাদীস শরীফে ব্যবহৃত কলবের অর্থ সেই লতীফা, যারা মানুষ বস্তুনিচয়ের স্বরূপ অবগত হয়। রূপকভাবে এর দ্বারা মানুষের বক্ষস্থিত কলবও বুঝানো হয়। কেননা, এই লতীফা ও শারীরিক কলবের মধ্যে একটি বিশেষ সম্পর্ক আছে। শারীরিক কলবের মধ্যস্থস্ততায়ই এই কলব মানুষের সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে কাজে নিয়োজিত করে। শারীরিক কলব যেন এই লতীফার পাত্র ও বাহন। এ কারণেই সহল তস্তরী (রহঃ) বলেন : কলব হচ্ছে আরশ এবং বক্ষ কুরসী। অর্থাৎ শারীরিক কলব ও বক্ষ হচ্ছে লতীফার রাজধানী, যেখান থেকে লতীফার কার্যক্রম শুরু হয়।



পরবর্তী পর্ব– অন্তরের লশকর ও খাদেম


বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...