শয়তানের সত্তাকে চেনার উপায়
(১) যে খেয়াল নিশ্চিতরূপেই কল্যাণের দিকে আহ্বান করে। এগুলো যে এলহাম, তাতে কোন সন্দেহ নেই।
(২) যে খেয়াল নিশ্চিতরূপেই অনিষ্টের দিকে আহ্বান করে। এগুলো যে কুমন্ত্রণা, তাতে কারও দ্বিমত নেই।
(৩) যে খেয়াল মাঝামাঝি। এগুলো ফেরেশতার পক্ষ থেকে, না শয়তানের পক্ষ থেকে, তা জানা যায় না। এতে খুব ধোকা হয় এবং পার্থক্য করা খুব কঠিন। কেননা, কিছু সৎকর্মপরায়ণ লোককে শয়তান প্রকাশ্যভাবে অনিষ্টের দিকে আহ্বান করতে পারে না; বরং অনিষ্টকে কল্যাণের আকৃতি দিয়ে তাদের সামনে পেশ করে। এতে অধিকাংশ লোকের সর্বনাশ হয়ে যায়।
উদাহরণতঃ শয়তান আলেমকে উপদেশের ভঙ্গিতে বলে :
সাধারণ মানুষের অবস্থা দেখ। সকলেই মূর্খতায় গ্রেফতার, গাফলতিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত এবং দোযখের কিনারায় দণ্ডায়মান। তাদের প্রতি রহম করে তাদেরকে সর্বনাশ থেকে বাঁচানো উচিত এবং ওয়ায নসীহত করা দরকার। আল্লাহ তাআলা তোমাকে এলেমের নেয়ামত, উজ্জ্বল মন-মস্তিষ্ক, চিত্তাকর্ষক বাগ্মিতা এবং সুললিত কণ্ঠস্বর দ্বারা মণ্ডিত করেছেন। এমতাবস্থায় তুমি আল্লাহর নাশোকরী কিরূপে করতে পার এবং জ্ঞান প্রচারে বিরত হয়ে আল্লাহর অসন্তুষ্টির পাত্র হবে কিরূপে? ওয়ায নসীহত করে মানুষকে সৎপথে আনা দরকার। শয়তান এমনিভাবে বুঝিয়ে শুনিয়ে কৌশলে আলেম ব্যক্তিকে ওয়ায করতে সম্মত করে।
এর পর তার মনে এই ধারণ সৃষ্টি করে দেয় যে, উৎকৃষ্ট পোশাক পরিধান করে মিষ্ট ভাষায় ওয়ায না করলে তোমার কথাবার্তা মনে প্রভাব বিস্তার করবে না এবং কেউ সৎপথ পাবে না। সে আলেম ব্যক্তির সামনে হরহামেশা এমনি ধরনের বক্তব্য পেশ করতে থাকে। অথচ এতে তার মূল উদ্দেশ্য থাকে এই আলেমকে রিয়াতে লিপ্ত করে দেয়া, যাতে তার মধ্যে সম্মানপ্রাপ্তি, খাদেমের আধিক্য, জ্ঞান ও যশের অহংকার এবং অপরকে হেয় দৃষ্টিতে দেখার অভ্যাস গড়ে উঠে। সে প্রকাশ্যে শুভেচ্ছার কথা বলে; কিন্তু বাস্তবে আলেম বেচারার সর্বনাশের ফিকির করে। এরূপ আলেমের প্রতি ইশারা করে হাদীসে বলা হয়েছে :
“নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা এই ধর্মকে এমন লোকদের দ্বারা শক্তিশালী করবেন, যারা বেশী দ্বীনদার হবে না।”
আল্লাহ পাপাচারী ব্যক্তি দ্বারা এই ধর্মকে জোরদার করবেন।
একবার বিতাড়িত শয়তান হযরত ঈসা (আঃ)-এর সামনে এসে আরজ করল : বল, 'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ্। তিনি বললেন : এই কালেমা সঠিক, কিন্তু তোর কথায় আমি এটা উচ্চারণ করব না। এতে তাঁর উদ্দেশ্য ছিল, শয়তান শুভেচ্ছার ভিতর দিয়েও প্রতারণা করে। শয়তানের এ ধরনের শঠতা গণনাতীত। এসব প্রতারণার কারণে তাদের সর্বনাশ হয়ে যায়, যারা কেবল বাহ্যিক অনিষ্টকেই অনিষ্ট মনে করে এবং শুধু প্রকাশ্য গোনাহ থেকে বেঁচে থাকে। এ খণ্ডের শেষভাগে আমরা শয়তানের কিছু প্রতারণা লিপিবদ্ধ করব। সময় পেলে সম্ভবত এই বিশেষ অধ্যায় সম্পর্কে একটি কিতাবই লেখে তার নাম রাখব 'তালবীসে ইবলীস' (ইবলীসের বিভ্রান্তি)। কেননা, আজকাল শয়তানের প্রতারণা মানুষের মধ্যে বিশেষত মাযহাব ও আকীদাসমূহের মধ্যে ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। এর কারণ, মানুষ শয়তানের ধোকাকে সত্য বলে বিশ্বাস করে নেয়।
অতএব মানুষের কর্তব্য হচ্ছে, অন্তরে যে ইচ্ছা আসে তাতে বিরতি ও চিন্তাভাবনার মাধ্যমে জেনে নেবে যে, এটা ফেরেশতার পক্ষ থেকে, না শয়তানের পক্ষ থেকে? এটা তাকওয়ার নূর, পর্যাপ্ত এলেম ও অন্তর্দৃষ্টি ছাড়া জানা যায় না। যেমন আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেনঃ “উদ্দেশ্য হচ্ছে, তাকওয়ার অধিকারীরা শয়তানের স্পর্শ পাওয়ার সময় এলেমের নূর কাজে লাগায়। ফলে তাদের খটকা দূর হয়ে যায়। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি তাকওয়ার অধিকারী নয়, কামপ্রবৃত্তির অনুসরণের কারণে সে শয়তানের ধোকায় বিশ্বাস করে নেয় এবং ধ্বংস হয়ে যায়।”
এ ধরনের লোক সম্পর্কেই আল্লাহ তাআলা বলেন :
“আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের জন্যে এমন বিষয় প্রকাশ পেল, যা তারা ধারণাও করত না”। অর্থাৎ, তারা তাদের যে সকল আমলকে পুণ্য কাজ মনে করত, সবগুলো পাপকর্মের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল।
এলমে মুয়ামালায় সর্বাধিক সূক্ষ্ম বিষয় হচ্ছে নফ্স ও শয়তানের প্রতারণাকে জানা। এটা প্রত্যেক বান্দার উপর ফরযে আইন, কিন্তু মানুষ এ থেকে গাফেল হয়ে এমন এলেমের মধ্যে মশগুল হয়েছে, যদ্দ্বারা কুমন্ত্রণা বৃদ্ধি পায় এবং শয়তান প্রবল হয়।
অধিক কুমন্ত্রণা থেকে আত্মরক্ষার উপায় হচ্ছে অন্তরে প্রবণতা আসার দরজা বন্ধ করে দেয়া। এই দরজা হচ্ছে বাহ্যিক পঞ্চ ইন্দ্রিয় এবং অভ্যন্তরীণ কামপ্রবৃত্তি ও সাংসারিক সম্পর্ক। অন্ধকার গৃহে বসে থাকলে পঞ্চ ইন্দ্রিয় বন্ধ হয়ে যায়। আর পরিবার-পরিজন ও ধনসম্পদ থেকে আলাদা হয়ে অভ্যন্তরীণ কুমন্ত্রণা বন্ধ হয় গেলে। এ পর্যায়ে কেবল তখল্লী তথা নির্জনতার পথ খোলা থাকবে, যা সর্বদা অন্তরে অব্যাহত থাকে। এ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য আল্লাহর যিকির ছাড়া উপায় নেই, কিন্তু শয়তান অন্তরকে সেখানেও ছাড়ে না এবং আল্লাহর যিকির বিস্মৃত করতে থাকে। এমতাবস্থায় মোজাহাদা তথা সাধনা করা উচিত। মৃত্যু দ্বারা এই সাধনা চূড়ান্ত হয়। কেননা, মানুষ যে পর্যন্ত জীবন্ত থাকে, শয়তান থেকে নিষ্কৃতি পায় না। তবে সাধনার বলে শয়তানের আনুগত্য থেকে মুক্ত এবং তার অনিষ্ট থেকে বেঁচে থাকতে পারে, কিন্তু দেহে রক্ত থাকা পর্যন্ত এই সাধনা জরুরী। কেননা, শয়তানের দ্বার সারা জীবন মানুষের সামনে খোলা থাকে, কখনও বন্ধ হয় না। এই দ্বার হচ্ছে কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ ইত্যাদি। দ্বার যখন উন্মুক্ত এবং শত্রুও সজাগ, তখন সাধনা ছাড়া কাজ হবে না।
হযরত হাসান বসরীকে কেউ প্রশ্ন করল : হে আবু সাঈদ! শয়তান নিদ্রামগ্ন হয় কি? তিনি বললেন : যদি সে নিদ্রামগ্ন হত, তবে আমরা শান্তি পেতাম। সারকথা, মুমিন বান্দা শয়তান থেকে মুক্তি পায় না।
তবে তার জোর হ্রাস করতে পারে। হাদীসে আছে :
“তোমরা যেমন উটকে সফরে শীর্ণ করে দাও, তেমনি ঈমানদার ব্যক্তি শয়তানকে শীর্ণ করতে পারে।”
হযরত ইবনে মসঊদ (রাঃ) বলেন : মুমিনের শয়তান ক্ষীণ হয়ে থাকে।
কায়েস ইবনে হাজ্জাজ বলেন, আমার শয়তান একদিন আমাকে বলতে লাগল : আমি তোমার কাছে উটের মত সবল ও শক্তিশালী এসেছিলাম। এখন তালপাতার সেপাই হয়ে গেছি। আমি জিজ্ঞেস করলাম : এটা কিরূপে? সে বলল : তুমি আল্লাহর যিকির দ্বারা আমাকে শীর্ণ করে দিচ্ছ।
এসব রেওয়ায়েত থেকে জানা যায় যে, যারা তাকওয়ার অধিকারী, তাদের সামনে বাহ্যিক শয়তানী দরজা বন্ধ হওয়া কঠিন নয়, কিন্তু শয়তানী চক্রান্ত থেকে বেঁচে থাকার ব্যাপারে তাদেরও পদস্খলন ঘটে যায়। কেননা, এসব, চক্রান্ত দ্রুত জানা যায় না। যেমন আমরা আলেমদের সাথে চক্রান্তের একটি দৃষ্টান্ত পূর্বে উল্লেখ করেছি। ব্যাপারটি আরও কঠিন এজন্যে যে, অন্তরের সামনে শয়তানের যেসব দরজা খোলা রয়েছে, সেগুলো অনেক। আর ফেরেশতাদের দরজা মাত্র একটি। এই একটি মাত্র দরজা সবগুলো দরজার মধ্যে সন্দিগ্ধ হয়ে গেছে। এসব দরজার মধ্যে বান্দার অবস্থা এমন, যেমন কোন মুসাফির অন্ধকার রাতে কোন জঙ্গলে দণ্ডায়মান। সেই জঙ্গলে অনেকগুলো দুর্গম পথ রয়েছে। এমতাবস্থায় মুসাফির ব্যক্তি দুই উপায়ে সঠিক পথ জানতে পারে অন্তর্দৃষ্টি ও জ্ঞান দ্বারা অথবা সূর্যের আলো দ্বারা। অতএব এসব দরজা জানার ব্যাপারে মুত্তাকীর অন্তর দিব্যদৃষ্টি ও জ্ঞানের স্থলে রয়েছে এবং কোরআন ও সুন্নাহর পর্যাপ্ত জ্ঞান হচ্ছে সূর্যালোকের মত। এ দু'উপায়ে অবশ্যই সঠিক পথ জানা যাবে।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে- একদিন রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) আমাদের সামনে মাটির একটি রেখা টানলেন, এর পর বললেন : এটা আল্লাহর পথ। অতঃপর এই রেখার ডানে ও বামে অনেকগুলো রেখা টেনে বললেন : এগুলো শয়তানের পথ। প্রত্যেক পথে একটি শয়তান দাঁড়িয়ে মানুষকে তার দিকে ডাকছে। এর পর তিনি এই আয়াত পাঠ করলেন :
“এটা হচ্ছে আমার সরল পথ। অতএব তোমরা এ পথে চল এবং অনেক পথে চলো না।”
তিনি ডান ও বাম দিকের রেখাগুলোকেই 'অনেক পথ' বললেন। এই হাদীসে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) শয়তানের পথ যে অনেক একথাই ফুটিয়ে তুলেছেন। আমরা তার একটি সূক্ষ্ম পথের দৃষ্টান্তও লিপিবদ্ধ করেছি, যে পথে সে আলেম ও আবেদদেরকে পরিচালনা করে। অথচ এরা তাদের কামপ্রবৃত্তিকে বশে রাখতে সক্ষম এবং প্রকাশ্য গোনাহেও লিপ্ত হয় না। এখন আমরা একটি সুস্পষ্ট পথের উল্লেখ করতে চাই। মানুষ কারণে অকারণে এ পথে চলতে শুরু করে।ঘটনাটি হাদীস শরীফেও বর্ণিত হয়েছে।
বনী ইসরাঈলের মধ্যে জনৈক সংসারত্যাগী দরবেশ ছিল। তাকে বিভ্রান্ত করার জন্যে শয়তান এক কৌশল অবলম্বন করে। সে এক বালিকার গলা টিপে দেয় এবং তার পরিবারের লোকজনের মনে একথা জাগ্রত করে দেয় যে, এর চিকিৎসা অমুক দরবেশের কাছে আছে। সেমতে তারা বালিকাকে দরবেশের কাছে নিয় গেল। দরবেশ প্রথমে চিকিৎসা করতে অস্বীকার করল, কিন্তু তাদের পীড়াপীড়িতে অবশেষে সম্মত হল। তারা বালিকাকে দরবেশের কাছে রেখে গেল। এর পর শয়তান এসে দরবেশকে বালিকার সাথে অপকর্ম করতে প্রলুব্ধ করল। দরবেশ আত্মরক্ষার অনেক চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত শয়তানের প্রতারণার সামনে টিকে থাকতে পারল না। সে অপকর্ম করে বসল। ফলে বালিকাটি অন্তঃসত্ত্বা হয়ে গেল। তখন শয়তান এসে তার মনে একথা সৃষ্টি করল যে, এখন তো তোর লাঞ্ছনার শেষ থাকবে না। পরিবারের লোকজন আসবে। সে তাদেরকে মুখ দেখাবে কি করে? সুতরাং তাকে হত্যা করে দাফন করে দেয়াই উত্তম। কেউ জিজ্ঞেস করতে এলে বলে দেবে, অসুখে মারা গেছে। দরবেশ তাই করল। এর পর শয়তান বালিকার আত্মীয়দের কাছে যেয়ে তাদের মনে কুমন্ত্রণা দিল যে, দরবেশ বালিকার সাথে এমন এমন করেছে এবং হত্যা করে দাফন করে। দিয়েছে। আত্মীয়রা দরবেশের কাছে এসে জিজ্ঞেস করল। দরবেশ সন্তোষজনক জওয়াব দিতে না পারায় তারা তাকে হত্যার বিনিময়ে হত্যা করার জন্যে গ্রেফতার করে নিয়ে গেল। তখন শয়তান দরবেশের সামনে আত্মপ্রকাশ করে বলল : এগুলো সব আমার কাজ। এখন যদি আমার কথা মেনে নাও, তবে খুন থেকে রক্ষা পেতে পার। দরবেশ শুধাল : কি করব, বল। প্রাণ তো বাঁচাতে হবে।
শয়তান বলল : আমাকে দুটি সেজদা করলেই তুমি বেঁচে যাবে। দরবেশ অগত্যা দু'টি সেজদা করে নিল। সেজদা করার পর শয়তান বলল : আমি কিছুই করতে পারব না। তুমি কে, তাও আমি জানি না। এ ব্যক্তির অবস্থাই আল্লাহ তাআলা কোরআনের নিম্নোদ্ধৃত আয়াতে উল্লেখ করেছেন :
“শয়তানের উক্তির মত, যখন সে মানুষকে বলল : কুফর কর। যখন মানুষ কুফর করল, তখন শয়তান বলল : আমি তোমা থেকে মুক্ত।”
চিন্তা করা উচিত, শয়তান কত বড় প্রতারক! সে দরবেশকে কিভাবে কবীরা গোনাহে লিপ্ত করে দিল! দরবেশ তো শুধু চিকিৎসার ব্যাপারে তার কুমন্ত্রণা মেনে নিয়েছিল। এটা খুব সহজ ব্যাপার ছিল। শুরুতে দরবেশ এটাই ভেবেছিল যে, চিকিৎসা করা খুবই ভাল কাজ। এ থেকে জানা গেল, শয়তান প্রথমে মনে এমন বিষয় জাগ্রত করে দেয় যে, মানুষ ভাল কাজে উৎসাহী হওয়ার কারণে তাকে ভাল মনে করে, কিন্তু শেষ পরিণতি তার করায়ত্ত থাকে না। এক বিষয় থেকে আরেক বিষয় এমন সৃষ্টি হয়ে যায়, যা থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া সম্ভবপর হয় না। হাদীসে আছে :
“যে ব্যক্তি নিষিদ্ধ স্থানের আশেপাশে ঘুরাফেরা করে, সে যে কোন সময় নিষিদ্ধ স্থানের অভ্যন্তরে চলে যেতে পারে।
পরবর্তী পর্ব








