অহংকারের নিন্দা —
পবিত্র কোরআনুল কবিমে বহু স্থানে আল্লাহ তা'আলা অহংকার ও অহংকারীদের নিন্দা বর্ণনা করেছেন। যেমন এরশাদ হয়েছে :
“যারা পৃথিবীতে অন্যায়ভাবে দাম্ভিকতা করে, আমি তাদেরকে আমার নিদর্শনাবলী থেকে হটিয়ে দিব”।
“এমনিভাবে আল্লাহ অন্তরে মোহর এঁটে দেন প্রত্যেক দাম্ভিক অবাধ্যের”।
“তারা ফয়সালা চাইতে লাগল এবং ব্যর্থ হল প্রত্যেক অবাধ্য হটকারী”।
“আল্লাহ অহংকারীদেরকে ভালবাসেন না”।
“তারা মনে মনে খুব অহংকার করে এবং মারাত্মক সীমালঙ্ঘন করে”।
“নিশ্চয় যারা আমার এবাদতে অহংকার করে, তারা লাঞ্ছিত হয়ে জাহান্নামে প্রবেশ করবে”।
মোটকথা, অহংকারের নিন্দা কোরআন মজীদে বহু জায়গায় বর্ণিত হয়েছে ।
রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেন– “যার অন্তরে সরিষাদানা পরিমাণ অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে দাখিল হবে না এবং যার অন্তরে সরিষাদানা পরিমাণ ঈমান থাকবে, সে দোযখে প্রবেশ করবে না”।
আবূ সালমা ইবনে আবদুর রহমান বর্ণনা করেন– একবার হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ও আবদুল্লাহ ইবনে উমর মারওয়ায় একত্রিত হলেন। সেখানে কিছুক্ষণ অবস্থানের পর প্রথমোক্ত জন চলে গেলেন এবং শেষোক্ত জন দাঁড়িয়ে কাঁদতে লাগলেন। লোকেরা কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন : আবদুল্লাহ ইবনে আমর আমাকে একটি হাদীস শুনিয়ে গেলেন যে, রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-কে তিনি বলতে শুনেছেন,
“যে ব্যক্তির অন্তরে একটি সরিষাদানা পরিমাণ অহংকার থাকবে, আল্লাহ তা'আলা তাকে অধোমুখী করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন”।
অন্য এক হাদীসে এরশাদ হয়েছে, – "মানুষ নিজেকে এত উঁচুতে নিয়ে যায় যে, পরিণামে সে অহংকারীদের তালিকাভুক্ত হয়ে যায়। ফলে যে শাস্তি অহংকারীরা পায়, তা সে-ও পায়।"
হযরত সোলায়মান (আ.) একদিন মানুষ, জিন ও পশুপক্ষীদেরকে ময়দানে সমবেত হতে আদেশ করলেন। সেমতে দু'লাখ মানুষ, জিন ইত্যাদি সমবেত হল। অতঃপর হযরত সোলায়মান (আ.) এত উঁচুতে উঠলেন যে, ফেরেশতাদের তাসবীহ তাঁর শ্রুতিগোচর হল। এরপর তাঁকে নিম্নে নামানো হল, এমনকি তাঁর পদযুগল সমুদ্র স্পর্শ করল। সেখানে তিনি এই আওয়াজ শুনতে পেলেন— "যদি তোমাদের প্রভু অর্থাৎ সোলায়মানের অন্তরে কণা পরিমাণও অহংকার থাকে, তবে তাকে যতটুকু উপরে উঠানো হয়েছে, তার চেয়েও বেশী পাতালে নামিয়ে দেব।"
বর্ণিত আছে, জান্নাত ও দোযখের মধ্যে কথোপকথন হল। দোযখ বলল : আমি অহংকারী ও শক্তিধরদেরকে পাব। জান্নাত বললঃ তা হলে আমি কি অপরাধ করলাম যে, দুর্বল ও অক্ষমরাই আমার মধ্যে স্থান পাবে?
আল্লাহ তা'আলা জান্নাতকে বললেন : "তুমি আমার রহমত। আমি যাকে ইচ্ছা তোমার মাধ্যমে রহমত দেব।" অতঃপর দোযখকে বললেন : "তুই আমার আযাব। আমি যাকে ইচ্ছা, তোর মাধ্যমে আযাব দেব এবং জান্নাত ও দোযখ উভয়কে পরিপূর্ণ করে দেব।"
এক হাদীসে এরশাদ হয়েছে— “দুষ্ট বান্দা সে-ই, যে জবরদস্তি ও সীমালঙ্ঘন করে এবং সর্বশক্তিমানকে ভুলে যায়। দুষ্ট বান্দা সেই, যে যুলুম করে ও অহংকার করে এবং মহান আল্লাহর প্রতি মনোযোগ দেয় না। মন্দ বান্দা সেই, যে ভ্রান্তি ও ক্রীড়াকৌতুকে মত্ত থাকে এবং কবরে মাটি হয়ে যাওয়ার কথা স্মরণ করে না। অধম বান্দা সেই, যে অবাধ্যতায় সীমা ছাড়িয়ে যায় এবং সূচনা ও পরিণতির কথা একবারও ভেবে দেখে না।”
হযরত ছাবেত (র.) বলেন : জনৈক ব্যক্তি রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম)-এর খেদমতে আরয করল – অমুক ব্যক্তি সাংঘাতিক অহংকারী। তিনি বললেন : তার কি মৃত্যু নেই?
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (র.)-এর বাচনিক রেওয়ায়েতে রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) বলেন, হযরত নূহ (আ.)-এর ওফাত নিকটবর্তী হলে তিনি আপন পুত্রদ্বয়কে ডেকে বললেন : আমি তোমাদেরকে দুটি বিষয় থেকে নিষেধ করছি এবং দুটি বিষয়ের আদেশ করছি। শিরক ও অহংকার থেকে নিষেধ করছি এবং কালেমায়ে তাইয়েবার আদেশ করছি। কেননা, আকাশ ও পৃথিবী এবং এতদুভয়ের মধ্যবর্তী সবকিছু যদি এক পাল্লায় রাখা হয় এবং কালেমায়ে তাইয়েবা অন্য পাল্লায় রাখা হয়, তবে কালেমায়ে তাইয়েবার পাল্লাই ভারী হবে। দ্বিতীয় যে বিষয়ের আদেশ করছি, তা হচ্ছে “সোবহানাল্লাহি ওয়া বেহামদিহী”। কেননা, এরই মাধ্যমে প্রত্যেক বস্তুকে রিযিক দেয়া হয়।
হযরত ঈসা (আ.) এরশাদ করেন, "মোবারক সেই বান্দা, যাকে আল্লাহ তা'আলা তাঁর কিতাব শিক্ষা দেন এবং সে নিরহংকার হয়ে দুনিয়া ত্যাগ করে।"
অন্য এক হাদীসে আছে- “কিয়ামতের দিন অহংকারীরা পিপীলিকার আকৃতিতে পুনরুত্থিত হবে। মানুষ তাদেরকে, পদতলে পিষ্ট করে চলবে। সর্বপ্রকার লাঞ্ছনা তাদেরকে ঘিরে রাখবে। দোযখীদের পুঁজ ও কাদা তাদেরকে পান করতে দেয়া হবে”।
হযরত আবূ হুরায়রা (র.)-এর রেওয়ায়েতে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেন: – “প্রতাপশালী ও অহংকারী লোক কিয়ামতে পিঁপড়ার আকারে উত্থিত হবে। মানুষ তাদেরকে পায়ের নিচে পিষ্ট করবে। কেননা, তারা দুনিয়াতে আল্লাহকে হেয় মনে করেছিল”।
মোহাম্মদ ইবনে ওয়াসে বলেন : আমি বেলাল ইবনে আবী বুরদার কাছে গিয়ে বললাম, তোমার পিতা আমার কাছে তার পিতার বাচনিক রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম)-এর এই হাদীসটি বর্ণনা করেছিলেন– "দোযখে ‘মুহিব’ নামক একটি জঙ্গল আছে। আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছা অহংকারীরা তাতে বাস করুক। সুতরাং হে বেলাল, তুমি নিজেকে অহংকারমুক্ত রাখ।"
অন্য এক হাদীসে বলা হয়েছে – "যে ব্যক্তি তিনটি বিষয় থেকে মুক্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করবে, সে জান্নাতে দাখিল হবে- (১) অহংকার, (২) ফরয এবং (৩) খিয়ানত তথা বিশ্বাস ভঙ্গকরণ।
অহংকারের নিন্দায় মনীষীদের উক্তি —
অহংকারের নিন্দায় অনেক মনীষীর উক্তিও বর্ণিত আছে।
হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (র.) বলেন : "এক মুসলমান যেন অন্য মুসলমানকে হেয় জ্ঞান না করে। কেননা, মুসলমানদের মধ্যে যে ক্ষুদ্র, সে আল্লাহর কাছে বড়।"
ওয়াহাব (রহঃ) বলেনঃ আল্লাহ তা'আলা জান্নাতে আদম (আলাইহিস্সালাম)-কে সৃষ্টি করার পর তার দিকে তাকিয়ে বললেন : "অহংকারী ব্যক্তির জন্যে তুমি (জান্নাত) হারাম।"
হযরত হাসান (রহঃ) বলেন : আশ্চর্যের বিষয়, মানুষ প্রত্যহ একবার অথবা দু'বার আপন হাতে পায়খানা ধৌত করে, এরপরও অহংকার করে এবং আকাশ ও পৃথিবীতে যিনি প্রতাপশালী তাঁর মোকাবিলা করে।
হযরত মোহাম্মদ ইবনে হুসায়ন ইবনে আলী (র.) বলেনঃ "মানুষের অন্তরে যে পরিমাণে অহংকার আসে, সেই পরিমাণের জ্ঞানবুদ্ধি হ্রাস পায়। অহংকার কম হলে বুদ্ধির ক্ষতিও কম হবে এবং বেশী হলে বেশী।"
হযরত সালমান (র.)-কে কেউ জিজ্ঞেস করল : সেই কুকর্ম কোন্টি যার উপস্থিতিতে সৎকর্ম উপকারী হয় না? তিনি বললেন : অহংকার ।
হযরত নোমান ইবনে বশীর (রহ.) বলেন : "শয়তানের অনেক ফাঁদ রয়েছে। তন্মধ্যে একটি হচ্ছে আল্লাহর নেয়ামত পেয়ে অহংকার করা এবং খেয়ালখুশির অনুসরণ করা।"
একবার জনৈক উৎকৃষ্ট পোশাক পরিহিত যুবক হযরত হাসান (র.) এর সম্মুখ দিয়ে গমন করলে তিনি তাকে ডেকে বললেন : মানুষ তার যৌবন ও সৌন্দর্য নিয়ে গর্ব করে। মনে করা উচিত যে, কবর দেহকে আবৃত করেছে এবং কৃতকর্ম সামনে এসেছে। যাও, অন্তরের চিকিৎসা কর। বান্দার অন্তর সংশোধিত হোক– এটাই আল্লাহ তা'আলার কাম্য।
বর্ণিত আছে, একবার খলীফা মনোনীত হওয়ার পূর্বে হযরত উমর ইবনে আবদুল আযীয (রহ.) হজ্জ করেন। হযরত লাউস (রহ.) তাঁর চালচলনে কিছুটা অহংকার লক্ষ্য করলেন। তিনি তার পেটের এক পার্শ্বে অঙ্গুলি দিয়ে খোঁচা মেরে বললেন : যার পেট বিষ্ঠায় পরিপূর্ণ, তার চালচলন এমন হয় না । হযরত উমর ক্ষমাপ্রার্থী হয়ে বললেন : চাচা, এ চালচলন শিক্ষা দেয়ার জন্যে আমার বড়রা আমার প্রতিটি অঙ্গে প্রহার করেছে ।
মোহাম্মদ ইবনে ওয়াসে আপন পুত্রকে অহংকার করতে দেখে কাছে ডেকে বললেন : তুমি কে জান? তোমার মাকে আমি দু'শ' দেরহাম দিয়ে ক্রয় করেছিলাম । আর তোমার পিতা এমন যে, আল্লাহ তা'আলা মুসলমানদের মধ্যে এরূপ লোক বেশী সৃষ্টি না করলেই ভাল হয় ।
বর্ণিত আছে, মুতারিক ইবনে আবদুল্লাহ (রহ.) মুহাল্লাবকে রেশমী জুব্বা পরিধান করে গর্ব করতে দেখে বললেন : হে আল্লাহর বান্দা, তোমার এই চলনকে আল্লাহ ও তাঁর রসূল পছন্দ করেন না।
মুহাল্লাব বলল : আপনি জানেন, আমি কে? মুতারিক বললেন : হাঁ, জানি। প্রথমে তুমি নাপাক বীর্য ছিলে এবং পরিণামে নাপাক মাটি হয়ে যাবে। বর্তমানে ময়লা বহন করে ফিরছ। মুহাল্লাব একথা শুনে চলে গেল এবং গর্ব পরিত্যাগ করল।
আল্লাহ আমাদেরকে এই মারাত্মক ব্যাধি থেকে রক্ষা করুন। আমিন ॥
পরবর্তী পর্ব







