শনিবার, ৭ অক্টোবর, ২০২৩

মহব্বত (পর্ব- ১৫) আশেকগণের কাহিনী

 

মহব্বত (পর্ব- ১৫)
এহইয়াউ উলুমিদ্দীন - ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

আশেকগণের কাহিনী 
জনৈক আরেফ (আল্লাহভক্ত লোক) বলতেন : যখন তুমি আমাকে দেখে ফেলেছ, তখন তা চল্লিগ্ন জনকে দেখার সমান হয়ে গেছে। কেননা, আমি চল্লিশ জন আবদালকে দেখেছি এবং তাদের প্রত্যেকের কাছ থেকে একটা না একটা চরিত্র আহরণ করেছি। এই বুযুর্গকে কেউ প্রশ্ন করল : আমরা শুনেছি, আপনি খিযির (আঃ)-এর সাথে সাক্ষাত করেন। তিনি হেসে বললেন : যে খিযিরকে দেখে, তার কোন কৃতিত্ব নেই ; বরং কৃতিত্ব সেই ব্যক্তির, যাকে খিযির দেখতে চায় কিন্তু সে আত্মগোপন করে। 
হযরত আবু ইয়াযীদ বুস্তামী (রহঃ) -এর খেদমতে একবার আরয করা হল : আপনি আল্লাহ তা'আলাকে যে প্রত্যক্ষ করেন তার কিছু অবস্থা বর্ণনা করুন। তিনি সজোরে চিৎকার দিয়ে বললেন : এটা জানা তোমাদের অবস্থার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। লোকেরা আরয করল : আল্লাহ তা'আলার ব্যাপারে আপনি নিজের নফসের বিরুদ্ধে যে কঠোরতর মোযাজাদা করেছেন, তা আমাদেরকে বলে দিন। তিনি বললেন : তোমাদেরকে এ সম্পর্কে ওয়াকিফ্‌হাল করাও বৈধ নয়। তারা আরয করল : তা হলে সাধনার শুরুতে আপনি যা যা করতেন, তাই বলুন। তিনি বললেন : প্রথমে আমি আমার নফসকে আল্লাহ তা'আলার দিকে আহবান করলাম। সে অবাধ্যতা করল। আমি তাকে কসম দিলাম যে, এক বছর পানি পান করব না এবং নিদ্রার স্বাদ আস্বাদন করব না। অতঃপর নফস তা পূর্ণ করেছে।
ইয়াহইয়া ইবনে মুয়ায বর্ণনা করেন— আমি আবু ইয়াযীদকে এশার নামাযের পর সোবহে সাদেক পর্যন্ত এভাবে বসে থাকতে দেখেছি, হাটু মাটিতে রাখা, আবার উপরে পায়ের পাতা ও গোড়ালি মাটি থেকে উত্তোলিত। চিবুক বুকের সাথে সংযুক্ত এবং উভয় চক্ষু অনিমেষ উন্মীলিত। যখন সকাল নিকটবর্তী হল, তখন তিনি একটি সেজদা করে আবার বসলেন এবং আল্লাহর দরবারে আরয করলেন : ইলাহী ! কিছু লোক তোমার কাছে প্রার্থনা করেছে এবং তুমি তাদেরকে পানিতে ও বায়ুতে চলার ক্ষমতা দান করেছ। তারা এতেই সন্তুষ্ট হয়েছে। আমি তোমার কাছে এসব বিষয় থেকে আশ্রয় চাই। আরও কিছু লোক তোমার কাছে আবেদন করেছে৷ তুমি তাদেরকে ভূ-পৃষ্ঠের দূরত্ব অতিক্রম করার ক্ষমতা দান করেছ। তারা এতেই রাযী হয়েছে। আমি এ থেকেও তোমার কাছে আশ্রয় চাই। এক সম্প্রদায়ের লোকেরা তোমার কাছে সওয়াল করলে তুমি তাদেরকে ভূ-পৃষ্ঠের ধন-ভাণ্ডার দিয়ে দিয়েছ। তারা এ নিয়েই খুশী হয়েছে। কিন্তু আমি তোমার কাছে এ থেকেও আশ্রয় চাই। এভাবে তিনি ওলীগণের বিশটিরও বেশী কারামতের কথা দোয়ার ভেতরে উল্লেখ করলেন। এরপর চোখ ফিরিয়ে আমার দিকে তাকাতেই দেখলেন, ইয়াহইয়া দণ্ডায়মান। আমি আরয করলাম : খাদেম হাযির। তিনি বললেন : তুমি কখন থেকে এখানে দাঁড়িয়ে? আমি আরয করলাম : অনেকক্ষণ ধরে। অতঃপর তিনি চুপ করে রইলেন। আমি আরয করলাম : আমাকে আপনার কিছু হাল বলুন। তিনি বললেন : তোমার জন্যে যা উপযুক্ত তাই বলছি শুন। আল্লাহ তা'আলা আমাকে নিম্নের আকাশে দাখিল করলেন এবং নিম্নজগত ভ্রমণ করালেন। জান্নাত থেকে আরশ পর্যন্ত যা কিছু আকাশসমূহে ছিল, সবই আমাকে দেখিয়েছেন। এরপর আমাকে সামনে দাঁড় করিয়ে বললেন : তুমি যা যা দেখছ, এগুলোর মধ্যে যা চাইবে, আমি তাই তোমাকে দিয়ে দেব। আমি আরয করলাম : হে আল্লাহ, আমি এমন কোন বস্তু দেখিনি, যা ভাল মনে করে তোমার কাছে চাইতে পারি। আল্লাহ বললেন : তুমি আমার সাচ্চা বান্দা। তুমি ঠিক আমারই জন্যে আমার এবাদত কর। এছাড়া আরও অনেক কথা বললেন।
ইয়াহইয়া ইবনে মোয়ায বলেন : একথা শুনে আমি ভীত হয়ে পড়লাম এবং আরয করলাম : হুযুর, আপনি আল্লাহ তা'আলার কাছে তাঁর মারেফত প্রার্থনা করলেন না কেন? আপনাকে তো এই শাহানশাহের পক্ষ থেকে বলাই হয়েছিল, যা চাইবে, তা-ই পাবে। হযরত আবু ইয়াযীদ একটি চিৎকার দিলেন, অতঃপর বললেনঃ চুপ কর। আল্লাহ তা'আলার প্রতি আমার আত্মসম্মানবোধ জাগ্রত হয়ে গেল, আমাকে ছাড়া কেউ যেন তাঁকে না চিনে ! তাঁর মারেফত অন্যরা পাবে, এটা আমার কাছে ভাল মনে হয়নি।
বর্ণিত আছে, আবু তোরাব বখশী (রহঃ) জনৈক মুরীদকে নিয়ে গর্ব করতেন। তাকে কাছে জায়গা দিতেন এবং তার খেদমত করতেন। মুরীদ এবাদতে মশগুল থাকত। একদিন আবু তোরাব তাকে বললেন : আবু ইয়াযীদ বোস্তামীর সংসর্গ অবলম্বন কর। মুরীদ বলল : আমার তার প্রয়োজন নেই। আবু তোরাব অধিক পীড়াপীড়ি করলে মুরীদ জোশের মুখে বলে ফেলল : আমি আবু ইয়াযীদকে দিয়ে কি করব? আমি আল্লাহ তা'আলাকে দেখেছি। তিনি আমাকে আবু ইয়াযীদকে দেখার মুখাপেক্ষী রাখেননি। আবু তোরাব বলেন : এ কথা শুনে আমারও মন বিগড়ে গেল। আমি বেসামাল হয়ে বলে উঠলাম : আল্লাহকে দেখে অহংকারী হয়ে যাও? যদি আবু ইয়াযীদকে একবার দেখ, তবে আল্লাহ তা'আলাকে সত্তর বার দেখার চেয়ে অধিক উপকারী হবে। মুরীদ অত্যন্ত হয়রান হয়ে বলল : তা কেমন করে হতে পারে? আবু তোরাব বললেন— তুমি আল্লাহ তা'আলাকে নিজের কাছে দেখলে তিনি তোমার সহনশক্তির পরিমাণ অনুযায়ী আত্মপ্রকাশ করেন, আর আবু ইয়াযীদকে আল্লাহ তা'আলার কাছে দেখলে আল্লাহ তা'আলা আবু ইয়াযীদের সহনশক্তির পরিমাণ অনুযায়ী আত্মপ্রকাশ করবেন।
মুরীদ একথার তত্ত্ব উপলব্ধি করার পর বলল : আমাকে তার কাছে নিয়ে চলুন। আবু তোরাব বলেন : আমরা গিয়ে একটি টিলার উপর দাঁড়ালাম এই অপেক্ষায় যে, আবু ইয়াযীদ জঙ্গল থেকে বের হবেন। কেননা, তিনি তখন হিংস্র প্রাণীদের জঙ্গলে বসবাস করতেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই আবু ইয়াযীদ একটি পালকযুক্ত পরিধেয় কোমরে বেঁধে বের হলেন। আমি মুরীদকে বললাম : ইনি আবু ইয়াযীদ। তাঁকে দেখা মাত্রই সে চিৎ হয়ে মাটিতে পড়ে গেল। এরপর আমরা তাকে নাড়া দিয়ে মৃত পেলাম। আমরা সকলে মিলে তাকে দাফন করলাম। আমি আবু ইয়াযীদের খেদমতে আরয করলাম : হুযুর, আপনার দিকে দেখার কারণে লোকটি মরে গেল। তিনি বললেন : তা নয় ; বরং তোমার মুরীদ ছিল সাচ্চা। তার অন্তরে একটি রহস্য লুকিয়ে ছিল। আমাকে দেখা মাত্রই তার মনের সব রহস্য খুলে গেল। দুর্বল মুরীদের মকামে ছিল বলে সে তা সহ্য করতে পারল না। মারা গেল।
যখন হাবশী সৈন্যরা বসরায় প্রবেশ করে হত্যাযজ্ঞ চালায় এবং ধন-সম্পত্তি লুটপাট করে, তখন হযরত সহলের মুরীদরা তাঁর কাছে সমবেত হয়ে আরয করে, আপনি এদেরকে হটিয়ে দেয়ার জন্যে আল্লাহ তা'আলার কাছে দোয়া করুন। হযরত সহল কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন : এ শহরে আল্লাহ তা'আলার কিছু বান্দা আছেন, যারা যালেমের বিরুদ্ধে বদদোয়া করলে সকাল পর্যন্ত ভূপৃষ্ঠে কোন যালেমের অস্তিত্ব থাকবে না। একই রাত্রিতে সব খতম হয়ে যাবে। কিন্তু তারা বদদোয়া করেন না। সকলেই সমস্বরে প্রশ্ন করল : কেন ? তিনি বললেন : কারণ, যে বিষয়কে আল্লাহ তা'আলা ভাল মনে করেন না, সেটা তাদের কাছেও ভাল লাগে না।
হযরত বিশর (রহঃ)-কে কেউ জিজ্ঞেস করল : আপনি এই মর্তবায় কেমন করে পৌছলেন? তিনি বললেন : আমি আল্লাহ তা'আলার কাছে দোয়া করতাম যাতে তিনি আমার অবস্থা গোপন রাখেন এবং কারও কাছে প্রকাশ না করেন। বর্ণিত আছে, তিনি হযরত খিযির (আঃ)-কে দেখেছেন এবং তাঁকে বলেছেন— আপনি আমার জন্যে দোয়া করুন। খিযির (আঃ) বললেন : আল্লাহ তা'আলা নিজের আনুগত্য তোমার জন্যে সহজ করুন। তিনি বললেন : আরও কিছু দোয়া করুন। খিযির (আঃ) বললেন : আল্লাহ তা'আলা এই আনুগত্যকে মানুষের কাছ থেকে গোপন রাখুন।
জনৈক বুযুর্গ বলেন : হযরত খিযিরকে দেখার জন্যে আমার মনে প্রবল আগ্রহ মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। এজন্যে আমি একবার আল্লাহ তা'আলার কাছে দোয়া করলাম । আল্লাহ পাক আমার দোয়া কবুল করলেন এবং তাঁর সাক্ষাত আমার নসীব হল। আমি তখন অন্য সব কথা ভুলে গিয়ে কেবল একথাই বললাম : হে আবুল আব্বাস ! আপনি আমাকে এমন দোয়া শিখিয়ে দিন, যা পাঠ করলে আমি মানুষের মন থেকে উধাও হয়ে যাই। তাদের অন্তরে আমার কোন মান না থাকে এবং আমার ধর্মপরায়ণতা কেউ জানতে না পারে। তিনি বললেন : এই দোয়া পাঠ করবে– “হে আল্লাহ, আমার উপর তোমার পুরু পর্দা ফেলে দাও। আমার উপর তোমার যবনিকা নামিয়ে দাও। আমাকে রাখ গোপন দোষের মধ্যে এবং আমাকে মানুষের অন্তর থেকে লুকিয়ে রাখ। এরপর হযরত খিযির (আঃ) অদৃশ্য হয়ে গেলেন। আমি তাঁকে পুনরায় কখনও দেখিনি এবং মনে দেখার আগ্রহও সৃষ্টি হয়নি। কিন্তু তাঁর শিখানো দোয়া সর্বদা পাঠ করতে থাকলাম। তাঁরই বর্ণনা অনুযায়ী এই দোয়ার প্রভাব এমনভাবে প্রতিফলিত হল যে, মানুষের মধ্যে তাঁর অপমান, লাঞ্ছনা ও মূল্যহীনতা সীমা ছাড়িয়ে যায়। যিম্মী তথা অমুসলিম আশ্রিতরাও তাঁকে নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করত এবং ধরে নিয়ে বিনা মজুরীতে নিজেদের বোঝা তার মাথায় চাপিয়ে দিত। তিনি এসব আচরণ নীরবে সহ্য করতেন। মোটকথা, তাঁর অন্তরে সুখ ও সংশোধন লাঞ্ছিত ও অজ্ঞাত থাকার মধ্যে নিহিত ছিল। আল্লাহ তা'আলার ওলীদের এই ছিল অবস্থা। তাদেরকে অজ্ঞাতদের মধ্যেই খোঁজ করা উচিত। কিন্তু বিভ্রান্ত মানুষ তাদেরকে এমন লোকদের মধ্যে তালাশ করে, যারা পরিধান করে নানা রকম কাপড়ে তালি দেওয়া পোশাক, কিন্তু জ্ঞান-গরিমা, পরহেযগারী এবং প্রভাব-প্রতিপত্তির দিক দিয়ে মানুষের মধ্যে সুপ্রসিদ্ধ।
অথচ আল্লাহ তা'আলা তাঁর ওলীগণকে গোপন রাখাই পছন্দ করেন। হাদীসে কুদসীতে এরশাদ হয়েছে-
>“আমার আওলিয়া আমার কা’বার নীচে থাকে। আমাকে ছাড়া কেউ তাদেরকে চিনে না।”
সারকথা, যারা অহংকার ও আত্মম্ভরিতা করে, তাদের অন্তর ওলীত্বের সুগন্ধি থেকে অধিকতর দূরে থাকে। আর অধিকতর নিকটবর্তী তাদের অন্তর, যারা অপমানিত ও লাঞ্ছিত হয়েও বুঝে না যে, অপমান ও লাঞ্ছনা কি? যেমন, গোলাম অপমান বুঝে না যখন তার প্রভু তার উপরের আসনে বসে। সুতরাং আমাদের মধ্যে যদি তাদের অন্তর এমন না থাকে এবং আমরা এমন আত্মা থেকে যদি বঞ্চিত হই, তবে যারা এর যোগ্য, এসব কারামতের সম্ভাব্যতায় বিশ্বাস না রাখা আমাদের উচিত নয়। কেননা, আল্লাহ তা'আলার ওলী হওয়া যদি কারো পক্ষে সম্ভব না হয়, তবে অন্তত ওলীদের প্রতি মহব্বত ও ঈমান রাখা তো তার জন্যে সম্ভব। হয়তো বা এর দৌলতেই কিয়ামতের দিন ওলীদের সাথে তার হাশর হয়ে যাবে।
প্রসিদ্ধ হাদীসে আছে–
>”মানুষ তার সাথেই থাকবে, যাকে সে মহব্বত করে।”
অনুনয় ও বিনয় অধিকতর উপকারী। তার প্রমাণ হযরত ঈসা (আঃ)-এর উক্তি। তিনি বনী ইসরাঈলকে প্রশ্ন করেন :
শস্যকণা কোথায় গজায়?
তারা আরয করল : মাটিতে।
তিনি বললেন : আমি সত্য বলছি, হেকমত ও প্রজ্ঞাও সে অন্তরেই গজিয়ে উঠে, যা মাটির মত হয়।
আল্লাহ তা'আলার ওলীত্ব অন্বেষণকারী বুযুর্গগণ নিজের নফসকে লাঞ্ছনার চরম পর্যায়ে পৌছিয়েই এই মর্তবা লাভ করেছেন।
বর্ণিত আছে, হযরত জুনায়দ বাগদাদী (রহঃ)-এর ওস্তাদ ইবনে করবনীকে এক ব্যক্তি ভোজের দাওয়াত দিল। তিনি তার ঘরের দরজায় পৌঁছলে তাঁকে তাড়িয়ে দিল। কিছুদূর চলে গেলে লোকটি তাঁকে আবার ডাকল। তিনি এলে আবার তাঁকে তাড়িয়ে দেয়া হল। এভাবে তিনবার ডাকল এবং তাড়িয়ে দিল। চতুর্থবার ডাকার পর যখন তিনি এলেন, তখন তাঁকে ঘরে নিয়ে গেল এবং বলল : মাফ করবেন, আমি আপনার বিনয় পরীক্ষা করার উদ্দেশ্যেই আপনাকে বারবার তাড়িয়ে দিয়েছি। তিনি বললেন : আমি আমার নসকে বিশ বছর ধরে লাঞ্ছনায় অভ্যস্ত করেছি। ফলে, সে এখন কুকুরের মত হয়ে গেছে। তাড়িয়ে দিলে চলে যায়। আবার একটি হাড্ডি ফেলে দিলে চলে আসে। যদি তুমি আমাকে পঞ্চাশ বারও তাড়িয়ে দিতে এবং ডাকতে, তবে আমি চলে আসতাম।
এক রেওয়ায়েত অনুযায়ী এই ইবনে করবনীই বলেন : আমি এক মহল্লায় বাস করতাম। কিন্তু কিছু দিনের মধ্যেই সাধুতায় খ্যাত হয়ে গেলাম। এতে আমার মন অশান্ত হয়ে উঠল। এক দিন আমি এক হাম্মামে (গোসলখানায়) গেলে সেখান থেকে ইচ্ছাকৃতভাবে এক ব্যক্তির মূল্যবান কাপড় নিয়ে এলাম। অতঃপর সে দামী কাপড় পরে তার উপর আমার তালিযুক্ত নানা রঙের ছেঁড়া কাপড় পরে নিলাম। রাস্তায় বের হতেই লোকেরা আমাকে পাকড়াও করল এবং আমার ছেঁড়াবস্ত্র খুলে সেই দামী পোশাক নিয়ে নিল। শুধু তাই নয়, তারা আমাকে প্রচুর কিলঘুষিও মারল। এরপর থেকে আমি হাম্মাম চোর বলে খ্যাত হয়ে গেলাম এবং আমার অশান্ত মনে শান্তি ফিরে এল। এখন চিন্তা করা উচিত, বুযুর্গগণ কেমন সাধনার স্তর অতিক্রম করতেন, যাতে আল্লাহ তা'আলা তাদের মনোযোগ মানুষের দিক থেকে এমনকি, নিজের সত্তার দিক থেকেও ফিরিয়ে নেন। কেননা, যে ব্যক্তি নিজের নফসের দিকে লক্ষ্য রাখে, সে আল্লাহ তা'আলা থেকে আড়ালে থাকে এবং নফসের দিকে এই দৃষ্টিই তার জন্যে পর্দা হয়ে যায়।
বলা বাহুল্য, সর্বাধিক পর্দা হচ্ছে নিজের নসকে নিয়ে মশগুল থাকা। সেমতে বর্ণিত আছে, বুস্তামের জনৈক প্রভাবশালী ব্যক্তি হযরত আবু ইয়াযীদ বুস্তামীর মজলিসে সর্বক্ষণ উপস্থিত থাকত। একদিন সে আরয করল : আমি ত্রিশ বছর ধরে অবিরাম রোযা রাখছি এবং রাত জেগে নফল এবাদত করছি। কিন্তু এত সাধনা সত্ত্বেও আপনি যে জ্ঞান বর্ণনা করেন, তা নিজের অন্তরে বিদ্যমান পাই না। অথচ আমি এই জ্ঞানকে সত্য বলে বিশ্বাস করি এবং ভালবাসি। হযরত আবু ইয়াযীদ বললেন : ত্রিশ বছর কেন, যদি তুমি তিনশ' বছরও রোযা রাখ এবং রাত্রি জাগরণ কর, তবু এই জ্ঞানের কণা পরিমাণও পাবে না। লোকটি এর কারণ জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন : কারণ এই যে, তুমি নিজের নফসের কারণে আল্লাহ তা'আলা থেকে আড়ালে আছ। লোকটি আরয করল : তাহলে এর প্রতিকার কি? তিনি বললেন : প্রতিকার আছে; কিন্তু তুমি তা কবুল করবে না। সে বলল : আপনি বলুন, যাতে আমি তা পালন করতে পারি। তিনি বললেন : এখনি নাপিতের কাছে গিয়ে মাথা ও দাড়ি মুণ্ডন কর। এই পোশাক খুলে কম্বলের লুঙ্গি পরিধান কর। ঘাড়ে আখরুটের একটি ঝুলি তুলে নাও। রাস্তায় গিয়ে নিজের চারপাশে লোকজনকে জড়ো কর। এরপর তাদেরকে বল : যে কেউ আমাকে একটি থাপ্পড় মারবে, আমি তাকে একটি আখরুট দেব। এমনিভাবে প্রত্যেক বাজারে যাও এবং যারা তোমার পরিচিত, তাদের কাছেও যাও এবং থাপ্পড় খেয়ে খেয়ে আখরুট বিলি কর। লোকটি বলল : সোবহানাল্লাহ, আপনি আমাকে এমন কথা বললেন ! তিনি বললেন : তোমার ‘সোবহানাল্লাহ’ বলা একটি শিরক। কারণ, তুমি নিজের নফসকে বড় জেনে “সোবহানাল্লাহ” বলেছ। আল্লাহ তা'আলার তাযীমের জন্যে বলনি। লোকটি বলল : আমি এটা করব না। অন্য কিছু বলুন। তিনি বললেন : সর্বাগ্রে এটাই করা দরকার। সে বলল : এটা করার সাধ্য আমার নেই। হযরত আবু ইয়াযীদ বললেন : আমি তো আগেই বলেছিলাম যে, তুমি প্রতিকার কবুল করবে না। হযরত আবু ইয়াযীদ বর্ণিত এই প্রতিকারটি সে ব্যক্তির জন্যে, যে নিজের নফসের দিকে লক্ষ্য রাখে এবং মানুষের দৃষ্টি নিজের দিকে কামনা করে ! এই চিকিৎসা ছাড়া এ রোগ থেকে রক্ষা পাওয়ার অন্য কোন উপায় নেই। অতএব, যে ব্যক্তি এই চিকিৎসার শক্তি রাখে না, তার কমপক্ষে এর কার্যকারিতায় বিশ্বাস রাখা উচিত। যার মধ্যে এই বিশ্বাসটুকুও নেই, তার দুর্ভোগ নিশ্চিত। হাদীস শরীফে আছে -
>”বান্দার ঈমান কামেল হয় না, যে পর্যন্ত তার কাছে কোন বস্তুর স্বল্পতা আধিক্যের তুলনায় অধিক প্রিয় না হয় এবং যে পর্যন্ত খ্যাত না হওয়া তার কাছে খ্যাত হওয়ার তুলনায় অধিক পছন্দনীয় না হয়।”
আরও আছে–
>”তিনটি বিষয় যার মধ্যে পাওয়া যায়, তার ঈমান কামেল হয়ে যায়৷ এক, আল্লাহ তা'আলার কাজে কোন নিন্দুকের নিন্দাকে ভয় না করা। দুই, লোক দেখানোর জন্যে কোন আমল না করা। তিন, সামনে দু'টি বিষয় উপস্থিত হলে— একটি দুনিয়ার ও একটি আখেরাতের- আখেরাতের বিষয়টি বেছে নেয়া।”
অন্য এক হাদীসে বলা হয়েছে

"বান্দার ঈমান কামেল হয় না যে পর্যন্ত তার মধ্যে তিনটি স্বভাব না পাওয়া যায় । এক, যখন সে ক্রুদ্ধ হয়, তখন তার ক্রোধ তাকে হক থেকে সরিয়ে দেয় না। দুই, যখন সে খুশী হয়, তখন খুশী তাকে অসত্যের ভেতরে ঢুকিয়ে দেয় না। তিন, যখন সে শক্তিশালী হয়, তখন যা তার নয়, সে তা গ্রহণ করে না। এগুলো হচ্ছে মুমিন হওয়ার শর্ত, যা রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) বর্ণনা করেছেন । অতএব, সে ব্যক্তির জন্যে আশ্চর্য লাগে, যে ধার্মিকতার দাবী করে অথচ এসব শর্ত থেকে কণা পরিমাণও নিজের মধ্যে পায় না। এছাড়া ঈমানের পর যে সমস্ত স্তর অর্জিত হয়, সেগুলো সে অস্বীকারও করে ।
(সমাপ্ত)

প্রথম পর্বের লিংক


মহব্বত (পর্ব- ১৪) গোনাহের কেন্দ্র থেকে পলায়ন



 মহব্বত (পর্ব- ১৪)
এহইয়াউ উলুমিদ্দীন - ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

গোনাহের কেন্দ্র থেকে পলায়ন
স্বল্পজ্ঞানী ব্যক্তি মনে করে, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়াসাল্লাম) মহামারীগ্রস্ত এলাকা থেকে পালিয়ে যেতে নিষেধ করেছেন। এতে বুঝা যায়, যে এলাকায় গোনাহ প্রকাশ হয়ে পড়ে, সেখান থেকেও পলায়ন না করা উচিত। কেননা, উভয় অবস্থায়ই আল্লাহর ফয়সালা থেকে পলায়ন হবে। এরূপ মনে করা ঠিক নয়। বরং মহামারী প্রকাশ হয়ে পড়লে পলায়ন নিষিদ্ধ করার কারণ এই যে, এর অনুমতি দেয়া হলে সুস্থ লোকজন সকলেই এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যাবে এবং কেবল রোগাক্রান্তরা থেকে যাবে। ফলে, কোন সেবা-শুশ্রূষাকারী না থাকার কারণে তারা ধ্বংসের মুখে পতিত হবে। যদি এই নিষেধাজ্ঞা আল্লাহর ফয়সালা থেকে পলায়নের কারণে হত, তবে যে ব্যক্তি মহীমারীগ্রস্ত এলাকার কাছে পৌঁছে যায়, তাকে সেখান থেকে ফিরে আসার অনুমতি দেয়া হতো না। কেননা, এটাও আল্লাহর ফয়সালা থেকে পলায়নের শামিল। নিষেধাজ্ঞার উপরোক্ত কারণ জানার পর এ বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে গেল যে, যে এলাকায় গোনাহ প্রকাশ হয়ে পড়ে, সেখান থেকে পলায়ন করা আল্লাহর ফয়সালা থেকে পলায়ন করার অন্তর্ভুক্ত নয়। এমনিভাবে গোনাহে উত্তেজিত করে এমন জায়গার নিন্দা বর্ণনা করা মানুষকে দূরে রাখার জন্যে নিন্দনীয় নয়। পূর্ববর্তী বুযুর্গগণ প্রায়ই এরূপ স্থান বিশেষের নিন্দা করেছেন।
এমনী একদল বুযুর্গ বাগদাদ শহরের নিন্দায় মুখর ছিলেন। তারা যথাসম্ভব এই শহর থেকে পলায়নের চেষ্টা করতেন। হযরত ইবনে মোবারক (রঃ) বলতেন : আমি পূর্ব ও পশ্চিমের অনেক দেশ ঘুরেছি ; কিন্তু বাগদাদের মত মন্দ শহর কোথাও দেখিনি। লোকেরা জিজ্ঞেস করল : সে শহরটি কেমন? তিনি বললেন : এই শহরে আল্লাহ তা'আলার নেয়ামতের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করা হয় এবং তাঁর প্রতি নাফরমানীকে তুচ্ছ বিষয় গণ্য করা হয়। তিনি যখন খোরাসানে পৌছেন, তখন লোকেরা তাঁকে বাগদাদের অবস্থা সম্পর্কে প্রশ্ন করলে তিনি বললেন : আমি এতে কেবল তিন প্রকার লোক দেখেছি– ক্রুদ্ধ সিপাহী, বেদনাক্লিষ্ট বণিক ও বিস্ময়াবিষ্ট আলেম। তাঁর এই উক্তি কোন গীবত ছিল না। কেননা, তিনি এতে কোন ব্যক্তি বিশেষের নাম উচ্চারণ করেননি এবং কোন বাগদাদীকে লক্ষ্যে পরিণত করেননি ; বরং এতে তার উদ্দেশ্য ছিল মানুষকে সতর্ক করা। মক্কা যাওয়ার পথে তিনি বাগদাদে ষোল দিনের বেশী অবস্থান করতেন না । এ সময়ের মধ্যে তাঁর কাফেলা এগিয়ে যাওয়ার জন্যে তৈরী হয়ে যেত। তিনি এই ষোল দিনের বিনিময়ে ষোল দীনার সদকা করে দিতেন।
কোন কোন বুযুর্গ ইরাককে মন্দ বলতেন। হযরত ওমর ইবনে আবদুল আযীয ও হযরত কা’বে আহবার (রাঃ) এ দলভুক্ত ছিলেন। হযরত ইবনে ওমর (রাঃ) তাঁর এক গোলামকে জিজ্ঞেস করলেন : তুই কোথায় থাকিস? সে বলল : ইরাকে। তিনি বললেন : সেখানে তোর কাজ কি? আমি শুনেছি, যে ব্যক্তি ইরাকে থাকে, আল্লাহ তা'আলা তার পেছনে কোন বালা লাগিয়ে দেন। হযরত কা’বে আহবার (রাঃ) একদিন ইরাকের আলোচনা প্রসঙ্গে বললেন : এর দশ ভাগের নয় ভাগে পাপাচার রয়েছে, যার কোন প্রতিকার নেই। জনৈক বুযুর্গ আরও বললেন : কল্যাণকে দশ ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এর নয় ভাগ সিরিয়ায় এবং এক ভাগ ইরাকে স্থান পেয়েছে। আর অনিষ্টের দশ ভাগের নয় ভাগ ইরাকে এবং একভাগ সিরিয়ায় স্থান পেয়েছে।
জনৈক মুহাদ্দিস বলেন : আমি একদিন হযরত ফুযায়ল ইবনে আয়াযের খেদমতে ছিলাম। এমন সময় জনৈক সুফী সম্মুখে এল। তিনি তাকে নিজের সাথে বসিয়ে বললেন : তোমার বাড়ি কোথায় ? সুফী বলল : বাগদাদে। তিনি তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন এবং বললেন : আমাদের কাছে মানুষ দরবেশের ন্যায় পোশাক পরিধান করে আসে ; কিন্তু যখন কোথায় থাক জিজ্ঞেস করা হয়, তখন বলে : যালেমদের বাসায় থাকি।
হযরত আহমদ ইবনে হাম্বল বলতেন : যদি এই সন্তান-সন্ততির সম্পর্ক আমার সাথে না থাকত, তবে আমি এ শহরে থাকতাম না। লোকেরা প্রশ্ন করল, তাহলে কোথায় থাকতেন? তিনি বললেন : পাহাড়ের উপত্যকায়।
এক বুযুর্গকে বাগদাদের অবস্থা জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেন : সেখানকার দরবেশ পাক্কা দরবেশ আর সেখানকার দুষ্ট পাক্কা দুষ্ট।
এসব রেওয়ায়েত থেকে জানা যায় যে, যে শহরে গোনাহের আধিক্য ও পুণ্যের স্বল্পতা বিরাজমান, যেখানে কেউ আটকা পড়লে তার উচিত হিজরত করা।
আল্লাহ পাক এরশাদ করেন -
>”হিজরত করার জন্যে আল্লাহর ভূ-পৃষ্ঠ কি সুবিস্তৃত ছিল না”? যদি পরিবার-পরিজনের বাধার কারণে কেউ হিজরত করতে সক্ষম না হয়, তবে বিষণ্ন মনেই থাকা উচিত এবং সর্বদা দোয়া করা উচিত - “ইলাহী ! যালেম অধিবাসীদের এই জনপদ থেকে আমাদেরকে বের করে নাও”। এর কারণ এই যে, যেখানে পাপাচারীদের আধিক্য হয়ে যায়, সেখানে ব্যাপক বিপদ আসে, যা ভাল-মন্দ সকলকেই ধ্বংস করে দেয়। আল্লাহ তা'আলার অনুগত বান্দারাও রেহাই পায় না। আল্লাহ তা'আলা এরশাদ করেন ,-
>”তোমরা এমন ফেতনা থেকে বেঁচে থাক, যা বিশেষভাবে তোমাদের মধ্যে যারা যালেম তাদেরকেই বিপর্যস্ত করবে না।"
মোটকথা, পাপকাজে রিযা সর্বাবস্থায় নয় ; বরং শুধু এ দিক দিয়ে যে ; এটা আল্লাহ তা'আলার সাথে সম্বন্ধযুক্ত। নতুবা স্বয়ং পাপকাজে রাযী থাকার কোন কারণ নেই। তিন ব্যক্তি তিন স্থানে অবস্থান করে। তাদের একজন দীদারের আগ্রহে মৃত্যুকে পছন্দ করে। দ্বিতীয়জন মাওলার খেদমতের জন্যে জীবিত থাকাকে ভাল মনে করে। তৃতীয়জন বলে : আমি কেবল তাই পছন্দ করি, যা আল্লাহ আমার জন্যে পছন্দ করেন- তা মৃত্যু হোক অথবা জীবন। এই তিন ব্যক্তির মধ্যে কে উত্তম, এ বিষয়ে আলেমগণের মতভেদ রয়েছে।
জনৈক ওলী-আল্লাহকে এই প্রশ্ন করা হলে তিনি বললেনঃ রিযা বিশিষ্ট ব্যক্তি উত্তম। কেননা , তাদের মধ্যে তার ঝামেলাই সবচেয়ে কম।
একদিন ওয়াহাব ইবনে ওয়ার্দ, সুফিয়ান ছওরী ও ইউসুফ ইবনে বিসা এক জায়গায় সমবেত হলেন। হযরত সুফিয়ান বললেন : অদ্যকার পূর্বে আকস্মিক মৃত্যু আমার কাছে খুব খারাপ মনে হত ; কিন্তু আজ আমি মরে যেতে চাই। ইউসুফ ইবনে বিসাত কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন : কারণ, আমি ফেতনাকে ভয় করি।
ইউসুফ ইবনে বিসাত বললেন : আমার কাছে দীর্ঘায়ু হওয়া খারাপ মনে হয় না। আমি আশা করি, সম্ভবত এমন কোন দিন পাওয়া যাবে, যাতে তওবা নসীব হয়ে যাবে এবং কোন নেক আমল করতে পারব।
অতঃপর তাঁরা হযরত ওয়াহাবকে প্রশ্ন করলেন : আপনি এ সম্পর্কে কি বলেন? তিনি বললেনঃ আমি কিছুই পছন্দ করি না। যা কিছু আল্লাহ জাল্লা শানুহুর প্রিয়, তাই আমার প্রিয়– তিনি জীবিত রাখুন অথবা ওফাত দান করুন।
হযরত সুফিয়ান ছওরী উঠে তাঁর কপালে চুম্বন করলেন এবং বললেন : আল্লাহর কসম, এই ব্যক্তি আধ্যাত্মিক।

পরবর্তী পর্ব
আশেকগণের কাহিনী

মহব্বত (পর্ব- ১৩) আল্লাহ্ তা'আলার কাছে দোয়া রিযার পরিপন্থী নয়



 মহব্বত (পর্ব- ১৩)
এহইয়াউ উলুমিদ্দীন - ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

আল্লাহ্ তা'আলার কাছে দোয়া রিযার পরিপন্থী নয়-
যে দোয়া করে, দোয়ার কারণে সে রিযার মকাম থেকে খারিজ হয় না। এমনিভাবে গোনাহকে খারাপ মনে করা, অপরাধীদের প্রতি ক্রুদ্ধ হওয়া, গোনাহের কারণসমূহকে ঘৃণা করা এবং সেগুলো দূর করার জন্যে সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করার কর্তব্য পালন করাও রিযার পরিপন্থী নয়। এ ক্ষেত্রে কিছু লোকের বিভ্রান্তি হয়েছে। তারা বলে , গোনাহ, নির্লজ্জ কাজ ও কুফর আল্লাহ তা'আলার ফয়সালা তাকদীর বৈ নয়। অতএব, এগুলোতেও রিযা ও সন্তুষ্টি দরকার। এসব লোক শরীয়তের রহস্য সম্পর্কে অজ্ঞ। দোয়াকে আল্লাহ তা'আলা আমাদের জন্যে এবাদতই সাব্যস্ত করেছেন। সেমতে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) ও অন্যান্য পয়গাম্বরের অধিক পরিমাণে দোয়া করা এ বিষয়ের প্রমাণ। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) রিযার উচ্চতম মকামে ছিলেন। দোয়া রিযার পরিপন্থী হলে তিনি অধিক পরিমাণে দোয়া কেন করতেন? আল্লাহ তা'আলা কোন কোন বান্দার প্রশংসায় বলেন :
>”আগ্রহ ও ভয় সহকারে তারা আমার কাছে দোয়া করে।” গোনাহকে অপছন্দ করা, তাকে খারাপ মনে করা এবং তাতে রাযী না হওয়াকেও আল্লাহ তা'আলা আমাদের জন্যে এবাদত সাব্যস্ত করেছেন। তিনি গোনাহে সন্তুষ্ট থাকার নিন্দা করেছেন। বলা হয়েছে–
>”তারা পার্থিব জীবন নিয়ে সন্তুষ্ট এবং তাতেই প্রশান্ত।″
>”তারা পেছনে অবস্থানকারিণী মহিলাদের সাথে থাকতে রাযী হয়েছে। আল্লাহ তাদের অন্তরে মোহর মেরে দিয়েছেন।”
এক মশহুর হাদীসে আছে–
>”যে কোন অসৎকাজে উপস্থিত থাকে, অতঃপর তাতে রাযী থাকে, সে যেন নিজেই সে অসৎ কাজ করে।”

অন্য এক হাদীসে আছে–
>”যে মন্দ কাজের পথ দেখিয়ে দেয়, সে সে ব্যক্তির মত, যে নিজে সেটা করে।”

হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ মানুষ মন্দ কাজ থেকে অনুপস্থিত ও দূরে থাকে। এরপরও তার ততটুকুই গোনাহ হয়, যতটুকু যে মন্দ কাজ করে, তার হয়। শ্রোতারা আরয করল : এটা কিরূপে? তিনি বললেনঃ এটা এভাবে যে, সে যখন সে মন্দ কাজের সংবাদ পায়, তখন তাতে রাযী থাকে।
এক হাদীসে আছে—
"যদি এক ব্যক্তি প্রাচ্যে নিহত হয় এবং অপর ব্যক্তি পাশ্চাত্যে বসে সেই হত্যাকাণ্ডে রায়ী থাকে, তবে সেও এই হত্যাকাণ্ডে অংশীদার হবে।"
কাফের ও পাপাচারীদের সাথে শত্রুতা রাখা ও তাদের অস্বীকার করার ব্যাপারে কোরআন ও হাদীসে অসংখ্য প্রমাণ পাওয়া যায়। আল্লাহ পাক এরশাদ করেন-
>”মুমিনরা মুমিনদের ছাড়া কাফেরদেরকে অন্তরঙ্গ বন্ধুরূপে গ্রহণ করবে না।”
>”হে মুমিনগণ, তোমরা ইহুদী ও খৃস্টানদেরকে অন্তরঙ্গ বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না।” [অমুসলিমদের বুঝানো হয়েছে]
>”এমনিভাবে আমি কিছু কিছু পাপাচারীকে কিছু কিছু পাপাচারীর সাথে মিলিয়ে দেই।”
হাদীস শরীফে আছে,
>আল্লাহ তা'আলা প্রত্যেক মুমিনের কাছ থেকে প্রত্যেক মুনাফিকের সাথে শত্রুতা পোষণের অঙ্গীকার নিয়েছেন এবং প্রত্যেক মুনাফিকের কাছ থেকে মুমিনের সাথে শত্রুতা পোষণের অঙ্গীকার নিয়েছেন।”
রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) আরও বলেছেন,
>”যে ব্যক্তি কোন সম্প্রদায়কে পছন্দ করে এবং তাদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করে , কিয়ামতের দিন তাকে তাদের সাথেই উত্থিত করা হবে।”
এখানে প্রশ্ন হয়, কোরআন ও হাদীস দ্বারা প্রমাণিত আছে যে, আল্লাহ তা'আলার ফয়সালায় রাযী থাকতে হবে। পাপ ও গোনাহ আল্লাহর ফয়সালা ছাড়া হয় না। অতএব, পাপকে খারাপ মনে করা আল্লাহর ফয়সালাকে খারাপ মনে করা নয় কি? এই পরস্পর বিরোধিতার মধ্যে সমন্বয়ের পন্থা কি? একই বস্তুর মধ্যে রিযা ও ঘৃণা কেমন করে একত্রিত হতে পার?
জওয়াব এই যে, যাদের মনে এ বিষয়ে সন্দেহ দেখা দিয়েছে, তারা অসৎকাজে চুপ থাকাকে রিযা মনে করেছে এবং এর নাম রেখেছে সচ্চরিত্রতা। অথচ এটা নিছক মূর্খতা। আসলে রিযা ও ঘৃণা যখন একই বস্তুতে একই দিক দিয়ে এবং একইভাবে হয়, তখন অবশ্য একটি অপরটির বিপরীত হয়। কিন্তু যদি এক বস্তুতে এক দিক দিয়ে রিযা এবং অন্য দিক দিয়ে ঘৃণা হয়, তবে নিশ্চিতই একটি অপরটির বিপরীত হবে না এবং তা সম্ভব।
উদাহরণতঃ তোমার কোন শত্রু মারা গেল। সে ছিল তোমার অন্য এক শত্রুরও শত্রু এবং সে তোমার সেই শত্রুকে ধ্বংস করতে সচেষ্ট থাকত। বলা বাহুল্য, এমন শত্রুর মৃত্যু তোমার কাছে এ দিক দিয়ে খারাপ লাগবে যে, সে তোমার শত্রু নিধনে সচেষ্ট থাকত। আর এ দিক দিয়ে ভাল মনে হবে যে, তোমার এক শত্রু খতম হয়ে গেছে। এখানে একই শত্রুর মৃত্যু একদিক দিয়ে খারাপ হয় এবং অন্যদিক দিয়ে ভাল হল। এখানে মোটেই পরস্পর বিরোধিতা নেই। এমনিভাবে গোনাহেরও দুটি দিক আছে। একদিক এই যে, গোনাহ আল্লাহ তা'আলার ক্ষমতায় ও ইচ্ছায় হয়। এদিক দিয়ে এতে রিযা থাকা দরকার যে, যার বস্তু, তিনি তাতে যা ইচ্ছা তাই করবেন। অপরদিক এই যে, গোনাহ বান্দার ‘কসব’ তথা উপার্জন দ্বারা অর্জিত হয় এবং তার বিশেষণ হয়। এটা আল্লাহর কাছে ‘মগযুব’ তথা গযবে পতিত হওয়ার কারণ। এই দৃষ্টিকোণে গোনাহ মন্দ ও নিন্দনীয় ; সুতরাং ঘৃণার যোগ্য।
এ থেকে জানা গেল যে, গোনাহ থেকে বাঁচা এবং গোনাহ ক্ষমা করার জন্যে দোয়া করা আল্লাহ তা'আলার ফয়সালায় রাযী থাকার পরিপন্থী নয়। কেননা, আল্লাহ তা'আলা দোয়াকে বান্দার জন্যে এবাদত হিসাবে নির্দিষ্ট করেছেন, যাতে দোয়ার কারণে অন্তরে অসহায়ত্ব, নম্রতা ও বিনয় সৃষ্টি হয়। তবে অভিযোগের ভঙ্গিতে বিপদ প্রকাশ করা এবং অন্তরে তাকে আল্লাহর পক্ষ থেকে মন্দ জানা রিযার পরিপন্থী।

পরবর্তী পর্ব
গোনাহের কেন্দ্র থেকে পলায়ন

মহব্বত (পর্ব- ১২) রিযার স্বরূপ ও ফযীলত



মহব্বত (পর্ব- ১২)
এহইয়াউ উলুমিদ্দীন - ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
রিযার স্বরূপ ও ফযীলত :
পূর্বেই বর্ণিত হয়েছে, রিযা তথা সন্তুষ্টি মহব্বতের অন্যতম ফল এবং নৈকট্যশীলদের একটি উচ্চতম মকাম। এর স্বরূপ অনেকেরই অজানা। আল্লাহ তা'আলা যাদেরকে যথার্থ জ্ঞান ও বোধশক্তি দান করেছেন, তারাই এর সামঞ্জস্য ও অস্পষ্টতার সমাধান ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম। অতএব রিযার স্বরূপ, ফযীলত ও রিযাবিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের বিষয় বর্ণনা করা প্রয়োজন। রিযার ফযীলত সম্পর্কে আয়াতসমূহ নিম্নরূপ :
>”আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট।
>”অনুগ্রহের প্রতিদান অনুগ্রহই হতে পারে”
চূড়ান্ত অনুগ্রহ হচ্ছে বান্দার প্রতি আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি। এটা তখনই হয়, যখন বান্দা আল্লাহ তা'আলার প্রতি সন্তুষ্ট হয়।
"বসবাসের উদ্যানসমূহে পরিচ্ছন্ন ভবন এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে সন্তুষ্টি সর্ববৃহৎ”। এ আয়াতে আল্লাহ পাক নিজের সন্তুষ্টিকে বসবাসের জান্নাত থেকে বৃহৎ বলেছেন। আল্লাহ পাকের সন্তুষ্টিই জান্নাতবাসীদের চূড়ান্ত লক্ষ্য। হাদীস শরীফে এরশাদ হয়েছে,–
>“আল্লাহ তা'আলা জান্নাতে মুমিনদের জন্যে জ্যোতি বিকিরণ করবেন এবং বলবেন : আমার কাছে প্রার্থনা কর। মুমিনরা আরয করবে- আমরা তোমার রিযা চাই। দীদারের পর এই রিযা প্রার্থনা করা থেকে রিযার অসাধারণ ফযীলত জানা যায়। আল্লাহ তা'আলার প্রতি বান্দার সন্তুষ্টির অর্থ পরে উল্লিখিত হবে। এখানে বান্দার প্রতি আল্লাহর সন্তুষ্টি সম্পর্কে আলোচনা করা হচ্ছে। এর অর্থ বান্দার সাথে আল্লাহর মহব্বতের অর্থের কাছাকাছি, যা ইতিপূর্বে বর্ণিত হয়েছে। এর স্বরূপ সম্পূর্ণ উন্মোচিত করা জায়েয নয়। কারণ, এ বিষয়টি উপলব্ধি করতে মানুষের জ্ঞানবুদ্ধি অপারগ। যে ব্যক্তি এটা অর্জন করতে সক্ষম, তাকে অন্যের বলে দেয়ার প্রয়োজন হয় না। সে নিজে নিজেই এর স্বরূপ জেনে নেয়। সারকথা, আল্লাহ তা'আলার দীদারের চেয়ে বড় কোন মর্তবা নেই। দীদার লাভের পর জান্নাতীরা যে রিযা প্রার্থনা করেছে, তার কারণ রিযা হল, স্থায়ী দীদারের উপায়। তাই তারা রিযা প্রার্থনা করে যেন এটাই প্রার্থনা করেছে যে, আমাদের দীদার স্থায়ী হোক।

>“আমার কাছে আরও বেশি আছে”।
আল্লাহ তা'আলার এই উক্তির তাফসীর প্রসঙ্গে জনৈক তাফসীরকার লিখেন– জান্নাতীদের কাছে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে তিনটি উপঢৌকন আসবে। এক, আল্লাহ তা'আলার তরফ থেকে এমন একটি হাদিয়া, যার তুলনা জান্নাতীদের কাছে থাকবে না। এই হাদিয়ার কথা নিম্নোক্ত আয়াতে উল্লিখিত হয়েছে -
>“তাদের জন্যে যে কি চোখের শান্তি নিহিত রাখা হয়েছে, তা কেউ জানে না।”
দ্বিতীয় উপঢৌকন হল আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে তাদেরকে সালাম। এটা হবে প্রথম হাদিয়া থেকে শ্রেষ্ঠ। আল্লাহ পাক এরশাদ করেন :
>”দয়ালু পালন কর্তার পক্ষ থেকে সালাম বলা হবে।”
তৃতীয়, আল্লাহ তা'আলা এরশাদ করেন-
>”আমি তোমাদের প্রতি সন্তুষ্ট।”
এটা হাদিয়া ও সালাম উভয়টি থেকে শ্রেষ্ঠ। তাই আল্লাহ পাক বলেন–
>”আল্লাহর তরফ থেকে সন্তুষ্টি সর্ববৃহৎ”।
এ থেকে খোদায়ী সন্তুষ্টির শ্রেষ্ঠত্ব জানা গেল। রিযার ফযীলত হাদীস দ্বারাও প্রমাণিত।
বর্ণিত আছে, রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) একদল সাহাবীকে জিজ্ঞেস করলেন : তোমরা কি? তারা আরয করলেন : আমরা ঈমানদার। তিনি প্রশ্ন করলেন : তোমাদের ঈমানের লক্ষণ কি? তারা আরয করলেন : আমরা বালা মুসীবতে সবর করি, স্বাচ্ছন্দ্যে শোকর করি এবং আল্লাহ তা'আলার ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকি। রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) বললেন : কা'বার পালনকর্তার কসম, তোমরা ঈমানদার।
অন্য এক হাদীসে আছে,
>”মোবারকবাদ সে ব্যক্তিকে, যাকে ইসলামের পথপ্রদর্শন করা হয়, যার রূযী প্রয়োজন পরিমাণে এবং সে তাতে রাযী।”
আরও এরশাদ হয়েছে -
>”যে অল্প রিযিকে আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট থাকে, আল্লাহ অল্প আমলে তার প্রতি সন্তুষ্ট থাকবেন।
আরও বলা হয়েছে-
>”কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা আমার উম্মতের একদল লোকের প্রতি কৃপা করবেন। তারা তাদের কবর থেকে উড়ে জান্নাতের দিকে যাবে এবং যেভাবে ইচ্ছা সেখানে আনন্দ-উল্লাস করবে।
ফেরেশতারা তাদেরকে জিজ্ঞেস করবে- ‘তোমরা কি পুলসিরাত পার হয়ে এসেছ’? তারা জওয়াব দেবে ‘আমরা তো পুলসিরাত দেখিনি’।
আবার প্রশ্ন করা হবে- ‘তোমরা কি দোযখ দেখেছ’?
তারা বলবে, আমরা তো কিছুই দেখিনি’।
ফেরেশতারা বলবে- ‘তাহলে তোমরা কোন্ পয়গাম্বরের উম্মত? তারা বলবে-
‘আমরা মুহাম্মদ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম)-উনার উম্মত’।
তারা শুধাবে, ‘আমরা কসম দিয়ে জিজ্ঞেস করছি, সত্য বল দুনিয়াতে তোমাদের আমল কি ছিল? তারা জওয়াব দিবে, ‘দুনিয়াতে আমাদের মধ্যে দুটি চরিত্র বিদ্যমান ছিল, যে কারণে আল্লাহ তা'আলার কৃপায় আমরা এ মর্তবায় পৌঁছেছি। প্রথম, আমরা যখন একাকী থাকতাম, তখন আল্লাহ তা'আলার নাফরমানী করতে লজ্জাবোধ করতাম। দ্বিতীয়ত, আল্লাহ তা'আলা আমাদের জন্যে যা নির্দিষ্ট করতেন, তাতেই আমরা রাযী থাকতাম।’
ফেরেশতারা বলবে, ‘তাহলে তো তোমাদের এ অবস্থা হওয়াই উচিত’।”
অন্য এক হাদীসে আছে -
>”হে দরিদ্র শ্রেণী, তোমরা অন্তরের অন্তস্তল থেকে আল্লাহকে সন্তুষ্টি নিবেদন কর। তা হলে দারিদ্যের সওয়াব লাভে সফল হবে। অন্যথায় নয়।”
একবার বনী ইসরাঈল হযরত মূসা (আঃ)-এর খেদমতে আরয করল : আপনি আল্লাহ তা'আলার কাছে আমাদের জন্যে এমন কোন কাজের কথা জিজ্ঞেস করুন, যা করলে তিনি আমাদের প্রতি সন্তুষ্ট হবেন। মূসা (আঃ) আল্লাহর দরবারে আরয করলেন : ইলাহী, তারা যা বলে তা আপনি শুনেছেন। আদেশ হল : হে মূসা, তাদেরকে বলেদিন, তারা যেন আমার প্রতি সন্তুষ্ট থাকে, যাতে আমি তাদের প্রতি সন্তুষ্ট থাকি। এমনিভাবে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) তিনিও এরশাদ করেন,
>”সে পছন্দ করে যে, আল্লাহ তা'আলার কাছে তার যা আছে, তা জেনে নেবে, সে যেন দেখে, তার কাছে আল্লাহ তা'আলার জন্যে কি আছে। কেননা, আল্লাহ তা'আলা বান্দাকে নিজের কাছে সে স্তরে রাখেন, যে স্তরে বান্দা নিজের কাছে আল্লাহ তা'আলাকে রাখে।”
হযরত মূসা (আঃ) তার মোনাজাতে আরয করলেন : ইলাহী ! আপনার সৃষ্টির মধ্যে কে আপনার কাছে সর্বাধিক প্রিয়? এরশাদ হল – “যার কাছ থেকে আমি তার প্রিয়বস্তু নিয়ে নিলে সে আমার সাথে অনরঙ্গ সম্বন্ধ রাখে।
মূসা (আঃ) আরয করলেন : সে ব্যক্তি কে, যার প্রতি আপনি অসন্তুষ্ট হন? এরশাদ হল– যে কোন কাজে আমার কাছে কল্যাণ প্রার্থনা করে, এরপর যখন আমি আদেশ দিয়ে দেই, তখন সে নাখোশ হয়।
অন্য এক রেওয়ায়েত আরও কঠোর। আল্লাহ পাক বলেন :
>”আমি ছাড়া কোন মাবুদ নেই। যে ব্যক্তি আমার দেয়া মুসীবতে সবর করে না, আমার নেয়ামতের শোকর করে না এবং আমার ফয়সালায় রাযী থাকে না, তার উচিত আমাকে ছাড়া অন্য কাউকে মাবুদ বানিয়ে নেয়া।”
এরই অনুরূপ একটি হাদীসে কুদসী রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) থেকেও বর্ণিত আছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন :
>”আমি তাকদীর নির্ধারণ করেছি এবং কাজকর্ম সংহত করেছি। এখন যে রাযী হবে, তার প্রতি আমি রাযী আমার সাথে সাক্ষাত পর্যন্ত, আর যে নাখোশ হবে, তার জন্যে আমার অসন্তুষ্টি আমার কাছে আসা পর্যন্ত।”
অন্য এক হাদীসে কুদসীতে এরশাদ রয়েছে–
>”আমি ভাল-মন্দ উভয়টি সৃষ্টি করেছি। এখন সে ব্যক্তি ভাল, যাকে আমি কল্যাণের জন্যে সৃষ্টি করেছি এবং কল্যাণের পথে পরিচালিত করি। আর সে ব্যক্তি মন্দ, যাকে আমি অমঙ্গলের জন্যে সৃষ্টি করেছি এবং অমঙ্গলের পথে চালনা করি। সে ব্যক্তির জন্যে ধ্বংসই ধ্বংস, যে বিতর্ক ও প্রশ্ন করে।”

বর্ণিত আছে, আল্লাহ তা'আলা হযরত দাউদ (আঃ)-এর কাছে ওহী পাঠালেন-
>”হে দাউদ, আপনি বাসনা করেন, আমিও বাসনা করি ; কিন্তু হবে তাই, যা আমি বাসনা করি। যদি আপনি আমার বাসনায় রাযী থাকেন, তবে আপনার বাসনার জন্যে আমি যথেষ্ট হব। পক্ষান্তরে যদি আপনি আমার বাসনা অমান্য করেন, তবে আপনার বাসনায় আমি আপনাকে পরিশ্রমে ফেলে দেব, এরপর হবে তাই, যা আমি চাইব।
মনীষীদের উক্তিসমূহেও রিযার অনেক ফযীলত পাওয়া যায়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন : সর্বপ্রথম যাদেরকে জান্নাতে ডাকা হবে, তারা হবে এমন লোক, যারা সর্বাবস্থায় আল্লাহ তা'আলার প্রশংসা করে। অর্থাৎ, সর্বাবস্থায় রাযী থাকে। মায়মূন ইবনে মহরান বলেনঃ যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার ফয়সালায় রাযী হয় না, তার নির্বুদ্ধিতার কোন প্রতিকার নেই। আবদুল আযীয ইবনে আবু রোয়াদ (রঃ) বলেন : সিরকা দিয়ে যবের রুটি খাওয়া ও পশমী পোশাক পরার মধ্যে জাঁকজমক নেই ; বরং জাঁকজমক হচ্ছে আল্লাহ তা'আলার ফয়সালায় রাযী থাকার মধ্যে।
এক ব্যক্তি মুহাম্মদ ইবনে ওয়াসের পায়ে যখম দেখে বলল : এই যখমের কারণে আপনার প্রতি আমার করুণা হয়। তিনি বললেন : এই যখম হওয়ার পর থেকে আমি আল্লাহ তা'আলার শোকর করছি যে, এটা আমার চোখে হয়নি।
বনী ইসরাঈলের কাহিনীতে বর্ণিত আছে, জনৈক ব্যক্তি দীর্ঘদিন পর্যন্ত আল্লাহ তা'আলার এবাদত করে। তাঁকে স্বপ্নে দেখানো হয় যে, অমুক মহিলা– যে ছাগল চরায়, সে জান্নাতে তোমার সঙ্গিনী হবে। আবেদ পর দিন সেই মহিলার খোঁজে বের হল এবং লোকের কাছে জিজ্ঞাসাবাদ করে তার সন্ধান পেল। সে মহিলার আমল দেখার উদ্দেশ্যে তিন দিন তার বাড়িতে অবস্থান করল। এ সময় আবেদ নিজে সারারাত দাঁড়িয়ে এবাদত করত ; কিন্তু মহিলা আরামে ঘুমিয়ে থাকত। দিনের বেলায় আবেদ রোযা রাখত, আর মহিলা পানাহার করত। একদিন আবেদ তাকে জিজ্ঞেস করল : তোমার এ ছাড়া আরও কোন আমল আছে কি? মহিলা বলল : আর কিছু নেই। আপনি যা দেখেছেন, তাই। আমি নিজের মধ্যে অন্য কোন আমল জানি না।
আবেদ বলল : ভাল করে স্মরণ করে বল আরও কোন আমল আছে কিনা? হাঁ আমার মধ্যে আর একটি ছোট-খাটো অভ্যাস আছে। তা এই যে, আমি সংকটে পড়ে কোন সময় বাসনা করি না যে, আমার অবস্থা আরও ভাল হোক। রুগ্ন হয়ে আশা করি না যে, সুস্বাস্থ্য ফিরে আসুক। যদি রৌদ্রে থাকি, তবে ছায়ার প্রত্যাশী হই না।
এ কথা শুনে আবেদ নিজের মাথায় হাত রেখে বলল : এটা ছোটখাটো অভ্যাস নয় ; বরং এতই বড়, যা অর্জন করতে আবেদ অক্ষম।
জা'ফর ইবনে সোলায়মান হযরত রাবেয়া বসরীকে প্রশ্ন করলেন : বান্দা আল্লাহর প্রতি রাযী– একথা কখন বলা যায়? তিনি বললেন : যখন বিপদেও ততখানি খুশী হয়, যতখানি নেয়ামত পেয়ে হয়।
হযরত ফুযায়ল বলতেন– আল্লাহ তা'আলার দেয়া না দেয়া উভয়ই যখন বান্দার কাছে সমান হয়ে যায়, তখন সে আল্লাহর প্রতি রাযী হয়ে যায়।

পরবর্তী পর্ব-

মহব্বত (পর্ব- ১১) অনুরাগের প্রাবাল্য



মহব্বত (পর্ব- ১১)
এহইয়াউ উলুমিদ্দীন - ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

অনুরাগের প্রাবাল্য -
অনুরাগ যখন স্থায়ী, প্রবল ও মযবুত হয়ে যায়, তখন তা মোনাজাতে এক প্রকার সন্তুষ্টি ও খোলাখুলি ভাব সৃষ্টি করে, যা মাঝে মাঝে বাহ্যত মন্দ হয়ে থাকে। কারণ, এতে থাকে দুঃসাহস ও নির্ভীকতা। কিন্তু যে ব্যক্তি অনুরাগের স্তরে অবস্থান করে, তার এই খোলাখুলি ভাব সহ্য করে নেওয়া হয়। আর যে ব্যক্তি এই স্তরে অবস্থান না করে কথায় ও কাজে অনুরাগীদের ন্যায় সাহসিকতা দেখায়, সে ধ্বংস হয়ে যায় এবং কুফরের কাছাকাছি চলে যায়। বরখে আসওয়াদের মোনাজাত এর দৃষ্টান্ত। তার সম্পর্কে হযরত মূসা (আঃ)-কে আদেশ করা হয় যে, বনী ইসরাঈলের নিমিত্ত বৃষ্টির দোয়া জন্যে তাকে অনুরোধ কর।
বরখে আসওয়াদের কাহিনী নিম্নরূপ :
বনী ইসরাঈলের দেশে সাত বছর পর্যন্ত অনাবৃষ্টি ও দুর্ভিক্ষ বিরাজ করলে হযরত মূসা (আঃ) সত্তরজন লোককে সঙ্গে নিয়ে বৃষ্টির দোয়া করতে বের হন এবং দোয়া করেন। প্রত্যুত্তরে আল্লাহ তা'আলা এই মর্মে ওহী পাঠালেন–
"যারা গোনাহে আচ্ছন্ন, আন্তরিকভাবে পাপিষ্ঠ, বিশ্বাস ছাড়াই দোয়া করে এবং আমার আযাবকে ভয় করে না, তাদের দোয়া আমি কেমন করে কবুল করব?
আপনি আমার এক বান্দার কাছে যান। যার নাম বরখ। তাকে বলুন বাইরে এসে বৃষ্টির জন্যে দোয়া করতে, যাতে আমি কবুল করি।"
হযরত মূসা (আঃ) বরখের খোঁজ নিলে কেউ তার সন্ধান দিতে পারল না। একদিন তিনি জনৈক হাবশী গোলামকে পথিমধ্যে দেখতে পেলেন। তার চক্ষুদ্বয়ের মাঝখানে সেজদার ধূলি লেগেছিল এবং গলায় একটি চাদর জড়ানো ছিল। তিনি খোদা প্রদত্ত নূরের মাধ্যমে তাকে চিনলেন এবং নাম জিজ্ঞেস করলেন : সে বলল : আমার নাম বরখ। হযরত মূসা (আঃ) বললেন : আমি তো দীর্ঘদিন ধরে তোমাকেই খুঁজছি। আমার সঙ্গে চল এবং বৃষ্টির জন্যে দোয়া কর। বরখ তার সঙ্গে বের হল এবং এভাবে দোয়া করল :
"এলাহী, এটা তোমার কাজও নয়, হুকুমও নয়। তোমার কি হল যে, অনাবৃষ্টি সৃষ্টি করে রেখেছ? তোমার নিকটস্থ নদী-নালা শুকিয়ে গেছে কি? না বায়ু তোমার আনুগত্য স্বীকার করছে না? না গোনাহগারদের প্রতি তোমার ক্রোধ তীব্র আকার ধারণ করেছে? গোনাহগারদের সৃষ্টি করার পূর্বে তুমি ক্ষমাকারী ছিলে না কি? তুমিই তো রহমত সৃষ্টি করেছ এবং অনুগ্রহের আদেশ করছ। এখন কি আমাদেরকে দেখাচ্ছ যে, তোমার কাছ পর্যন্ত কেউ পৌঁছতে পারে না?"
মোটকথা, সে দোয়ার মধ্যে.এমনি ধরনের উচিত-অনুচিত কথাবার্তা বলতে লাগল। অবশেষে বৃষ্টি বর্ষিত হল এবং বনী ইসরাঈল সিক্ত হয়ে গেল। আল্লাহ তা'আলার আদেশে ঘাস গজিয়ে উঠল এবং দ্বিপ্রহর অবধি উরু পর্যন্ত উঁচু হয়ে গেল। এরপর বরখ স্বস্থানে চলে গেল। পরবর্তী সময়ে মূসা (আঃ)-এর সাথে সাক্ষাত হলে সে বলল : আমি আমার রবের সঙ্গে কেমন বিবাদ করেছি ! তিনি আমার সাথে ইনসাফ করেছেন। আল্লাহ তা'আলা মূসা (আঃ)-এর কাছে ওহী পাঠালেন–“বরখ আমাকে দিনে তিনবার হাসায়”।
হযরত হাসান বর্ণনা করেন- একবার বসরায় অগ্নিকাণ্ডে অনেক কুঁড়েঘর ভস্মীভূত হয়ে গেল ; কিন্তু সেগুলোর মাঝে একটি কুঁড়েঘর সম্পূর্ণ অক্ষত রয়ে গেল। তখন বসরার গভর্নর ছিলেন হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ)। তিনি এই অভূতপূর্ব ঘটনার সংবাদ পেয়ে সে কুঁড়েঘরের মালিককে ডেকে পাঠালেন। দেখা গেল সে একজন অশীতিপর বৃদ্ধ। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন : ব্যাপার কি? তোমার কুঁড়েঘর জ্বলেনি কেন? সে বলল : আমি আমার ঘরটি ভস্মীভূত না করার জন্যে আল্লাহ তা'আলাকে কসম দিয়েছিলাম। হযরত আবু মূসা (রাঃ) বললেন : আমি রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম)- উনি বলতে শুনেছি,-
"আমার উম্মতের মধ্যে এমন লোক হবে, যাদের মাথার কেশ থাকবে বিক্ষিপ্ত এবং পোশাক হবে মলিন। কিন্তু তারা আল্লাহ তা'আলাকে কোন বিষয়ে কসম দিলে আল্লাহ তা বাস্তবায়িত করে দেখাবেন।"
হযরত হাসান (রঃ) থেকে আরও বর্ণিত আছে, বসরায় একবার অগ্নিকাণ্ড ঘটলে আবু ওবায়দা খাওয়াস সেখানে আগমন করলেন এবং আগুনের উপর চলতে লাগলেন। বসরার শাসনকর্তা আরয করলেন : দেখুন, আপনি জ্বলে না যান। তিনি বললেন : আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। আগুনে না জ্বালানোর জন্যে আমি আল্লাহ পাককে কসম দিয়ে রেখেছি। শাসনকর্তা বললেন : তাহলে আগুনকেও নিভে যাওয়ার জন্যে কসম দিন। তিনি আগুনকে কসম দিলেন এবং তা নিভে গেল।
একদিন আবু হাফস (রঃ) পথ চলছিলেন, এমন সময় এক ধোপা সামনে এল। সে প্রকৃতিস্থ ছিল না। তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ তোমার উপর কি বিপদ এল? সে বলল : আমার একমাত্র সম্বল গাধাটি হারিয়ে গেছে। এখন আমি কি করি? একথা শুনে আবু হাফস থেমে গেলেন এবং আল্লাহ তা'আলার দরবারে আরয করলেনঃ তোমার ইযযত ও প্রতাপের কসম, আমি এক পা-ও সামনে এগুব না যে পর্যন্ত তুমি এই ব্যক্তির গাধা তার কাছে পৌছিয়ে না দেবে। একথা বলার সাথে সাথে গাধা সেখানে এসে দাঁড়িয়ে গেল। অতঃপর তিনি সামনে এগুলেন। এগুলো হচ্ছে অনুরাগীদের কর্মকাণ্ড। অন্যদের এরূপ করার অধিকার নেই।
হযরত জুনায়দ বাগদাদী (রহঃ) বলেন : অনুরাগীরা তাদের কথাবার্তায় ও নির্জন মোনাজাতে এমন সব কথা বলেন, যা সাধারণ মানুষের কাছে কুফর হয়ে থাকে। তারা এগুলো শুনলে অনুরাগীদেরকে সোজা কাফের বলতে শুরু করবে। অথচ এসব বিষয়ে অনুরাগীরা নিজেদের উন্নতি অনুভব করেন। তাদের জন্যেই এসব কথাবার্তা শোভনীয় – অন্যদের জন্যে নয়।
এমনটাও অসম্ভব নয় যে, একই কথার কারণে আল্লাহ তা'আলা এক বান্দার প্রতি সন্তুষ্ট হবেন এবং অন্য বান্দার প্রতি অসন্তুষ্ট। যদি উভয়ের অবস্থান তথা মকাম ভিন্ন ভিন্ন হয়। অন্তর্দৃষ্টি থাকলে কোরআন পাকে এ বিষয়ে অনেক ইশারা-ইঙ্গিত রয়েছে। বলা বাহুল্য, কোরআন পাকের সমস্ত কিস্সা-কাহিনী অন্তর্দৃষ্টি সম্পন্ন ব্যক্তিদের কাছে শিক্ষা গ্রহণের অমূল্য ইশারা-ইঙ্গিত ছাড়া কিছু নয়। আর যারা স্বল্পবুদ্ধি তাদের কাছে এগুলো নিছক কিসসা-কাহিনী। উদাহরণতঃ প্রথম কিস্সা হচ্ছে হযরত আদম (আঃ) ও অভিশপ্ত ইবলীসের। গোনাহ্ ও বিরুদ্ধাচরণে তারা উভয়েই অংশীদার ছিলেন। কিন্তু যে গোনাহের পর ইবলীস রহমত থেকে বিতাড়িত হল এবং অভিশাপের বেড়ি গলায় পরল, সে গোনাহের পরই হযরত আদম (আঃ) সম্পর্কে এরশাদ হল–“আদম তার পালনকর্তার অবাধ্যতা করল। ফলে, সে পথভ্রষ্ট হল। অতঃপর তার পালনকর্তা তাকে মনোনীত করলেন, তার তওবা কবুল করলেন এবং তাকে পথপ্রদর্শন করলেন।
আল্লাহ তা'আলা রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম)-কে এক বান্দার প্রতি মনোনিবেশ করা ও অন্য বান্দা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়ার কারণে ভর্ৎসনা করেছেন। অথচ তারা উভয়েই ছিল আল্লাহর বান্দা ; কিন্তু তাদের অবস্থান ছিল ভিন্ন ভিন্ন। এরশাদ হয়েছে - “যে আপনার কাছে সোৎসাহে ও ভয়ার্তচিত্তে আসল, আপনি তাকে অবজ্ঞা করলেন। আর অন্য বান্দা সম্পর্কে বলা হয়েছে – “যে বিত্তশালী, আপনি তার প্রতি মনোযোগী।
অনুরূপভাবে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম)-কে এক শ্রেণীর লোকের সাথে বসতে বলা হয়েছে এবং অন্য একশ্রেণীর লোকদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আয়াতে আছে -
>“যারা আমার আয়াতসমূহে বিশ্বাস স্থাপন করে, তারা যখন আপনার কাছে আসে, তখন আপনি বলুন, তোমাদের প্রতি সালাম।”
আরও এরশাদ হয়েছে :
>”আপনি নিজেকে তাদের সাথে আবদ্ধ রাখুন, যারা সকাল-সন্ধ্যায় সন্তুষ্টি কামনা করে তাদের পালনকর্তাকে ডাকে।”
অন্য এক আয়াতে এভাবে বলা হয়েছে :
>”যারা আমার আয়াত সম্পর্কে প্রলাপোক্তি করে, আপনি যখন তাদেরকে দেখেন, তখন তাদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিন, যে পর্যন্ত না তারা অন্য কথায় প্রলাপোক্তি করে। যদি শয়তান আপনাকে ভুলিয়ে দেয়, তবে স্মরণ হওয়ার পর পাপাচারী সম্প্রদায়ের সাথে বসবেন না।”
এমনিভাবে কোন কোন বান্দার পক্ষ থেকে মহব্বতের ছলনা ও গর্ব সহ্য করা হয় এবং কোন কোন বান্দার তরফ থেকে সহ্য করা হয় না। উদাহরণত : হযরত মূসা (আঃ) অনুরাগের আনন্দের ছলে আরয করেছিলেন :
“এগুলো সব তো আপনার পরীক্ষা, যা দ্বারা যাকে ইচ্ছা গোমরাহ করেন এবং যাকে ইচ্ছা পথ দেখান।
যখন হযরত মূসা (আঃ)-কে ফেরাউনের কাছে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়, তখন তিনি জওয়াবে ওযর স্বরূপ বললেন : আমার বিরুদ্ধে তাদের একটি অপরাধের দাবী আছে। তাই আমার আশংকা হয়, তারা আমাকে হত্যা করবে। এ ধরনের জওয়াব মূসা (আঃ) ছাড়া অন্যের মুখ দিয়ে বের হলে তা বে-আদবী বলে গণ্য হবে। তবে অনুরাগের স্তরে অবস্থানকারীর প্রতি নম্রতা করা হয়।
অপরদিকে হযরত ইউনুস (আঃ) অনুরাগের স্তরে ছিলেন না। তাই তাঁর তরফ থেকে এর চেয়ে কম অভিমানকেও বরদাশত করা হয়নি এবং তাঁকে শাস্তিস্বরূপ মাছের পেটে বন্দী করা হয় এবং কিয়ামত পর্যন্ত তাঁর জন্যে এই ঘোষণা হয়ে যায় :
>”যদি তার পালনকর্তার পক্ষ থেকে নেয়ামত তাকে সামাল না দিত, তবে সে নিন্দিত হয়ে জনশূন্য প্রান্তরে নিক্ষিপ্তই হয়েছিল।”
হযরত হাসান বলেন : এখানে ‘জনশূন্য প্রান্তর’ হল কিয়ামত।
আমাদের রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়া সাল্লাম)-কে তার অনুসরণ করতে নিষেধ করা হয়েছে। বলা হয়েছে–
>”অতএব আপনি ধৈর্যধারণ করুন আপনার পালনকর্তার নির্দেশের অপেক্ষায় এবং মৎস্যওয়ালা ইউনুসের মত অধৈর্য হবেন না। সে বিষাদগ্রস্ত অবস্থায় ডাক দিয়েছিল”।

পরবর্তী পর্ব
রিযার স্বরূপ ও ফযীলত

শুক্রবার, ৬ অক্টোবর, ২০২৩

মহব্বত (পর্ব- ১০) আল্লাহর প্রতি অনুরাগের অর্থ



মহব্বত (পর্ব- ১০)
এহইয়াউ উলুমিদ্দীন - ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

আল্লাহর প্রতি অনুরাগের অর্থ -
পূর্বেই লিখিত হয়েছে, অনুরাগ, ভীতি ও আগ্রহ মহব্বতের অন্যতম ফল। কিন্তু এসব ফল অবস্থা ভেদে বিভিন্নরূপ হয়ে থাকে। যখন মহব্বতকারী আল্লাহর প্রতাপ ও সৌন্দর্য হৃদয়ঙ্গম করার ব্যাপারে নিজের অক্ষমতা বুঝে নেয় এবং অবস্থাটি প্রবল হয়ে দেখা দেয়, তখন অন্তর তাঁর অন্বেষণে উত্তেজিত থাকে। অন্তরের এই উত্তেজনাকে ‘শওক’ তথা আগ্রহ বলা হয়। যখন মহব্বতকারীর উপর খোদায়ী সৌন্দর্য ও নৈকট্যের আনন্দ প্রবল হয়, তখন অন্তরের এই আনন্দ ও খুশীর ভাবকে ‘উন্‌স’ তথা অনুরাগ বলা হয়। মহব্বতকারীর দৃষ্টি কখনও মাহবুবের শক্তি, অমুখাপেক্ষিতা, বেপরওয়াভাব ইত্যাদি গুণাবলীর প্রতি নিবদ্ধ থাকে এবং এগুলো জানার কারণে মনে ব্যথা থাকে। অন্তরে এ ধরনের দুঃখের ভাব প্রবল হয়ে গেলে তাকে বলা হয় ‘খওফ’ তথা ভীতি। যার মধ্যে অনুরাগ প্রবল, সে নির্জনতাপ্রিয় হয়ে থাকে। এ কারণেই হযরত ইবরাহীম ইবনে আদহাম পাহাড় থেকে অবতরণ করলে কেউ প্রশ্ন করল : আপনি কোত্থেকে আসছেন? তিনি জবাব দিলেন : আল্লাহর প্রতি অনুরাগ থেকে।
যে আল্লাহর প্রতি অনুরাগী হয়, গায়রুল্লাহর প্রতি বীতশ্রদ্ধ হওয়া তার জন্যে অপরিহার্য। বর্ণিত আছে, হযরত মূসা (আঃ) যখন আল্লাহ তা'আলার সাথে বাক্যালাপ করেন, তখন কিছুদিন পর্যন্ত মানুষের কথাবার্তা শুনে তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়তেন। এর কারণ, মাহবুবের কথা ও তাঁর প্রতি অনুরাগ এত মিষ্ট যে, অন্য বস্তুর মিষ্টতা অন্তর থেকে সম্পূর্ণ বিদূরিত হয়ে যায়। সেমতে আল্লাহ তা'আলা হযরত দাউদ (আঃ)-এর প্রতি ওহী করেন– “হে দাউদ, আমারই আগ্রহী এবং আমারই প্রতি অনুরাগী হোন। অন্যের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হোন।
আবদুল ওয়াহেদ ইবন যায়দ বলেন-
আমি জনৈক দরবেশের কাছে গিয়ে বললাম : তুমি খুব নির্জনতা পছন্দ কর?
সে বলল : মিঞা সাহেব, আপনি যদি নির্জনতার স্বাদ আস্বাদন করেন, তবে নিজেকেও ঘৃণা করতে শুরু করবেন। নির্জনতাই তো এবাদতের মূল শিকড়।
আমি শুধালাম : তুমি নির্জনতার সর্বনিম্ন উপকার কি পেয়েছ?
সে বলল : মানুষের তোষামোদ থেকে মুক্তি এবং তাদের অনিষ্ট থেকে নিরাপত্তা।
আমি বললাম : মানুষ আল্লাহ তা'আলার প্রতি অনুরাগের মিষ্টতা কখন পায়?
সে বলল : যখন মহব্বত পরিষ্কার এবং আদান-প্রদান খাঁটি হয়।
আমি শুধালাম : মহব্বত কখন পরিষ্কার হয়?
সে বলল : যখন এবাদতে কোন চিন্তা অবশিষ্ট না থাকে।
আল্লাহর প্রতি অনুরাগের বিশেষ আলামত হচ্ছে জনকোলাহলে অস্বস্তিবোধ করা এবং খোদায়ী এবাদতের মিষ্টতা আস্বাদনে তীব্র লোভী হওয়া। এমতাবস্থায় অনুরাগী ব্যক্তি মানুষের সাথে মেলামেশা করলেও এমনভাবে করবে যেন সে জনসমাবেশের মধ্যেও একা। হযরত আলী (রাঃ) বলেন : অনুরাগী ব্যক্তিরা কেবল দৈহিকভাবে দুনিয়াকে সঙ্গ দেয়। তাঁদের আত্মা উচ্চতম প্রাসাদে নিবদ্ধ। তারা পৃথিবীতে আল্লাহ তা'আলার নায়েব এবং তাঁর ধর্মের প্রতি আহ্বায়ক।

অনুরাগের প্রাবাল্য

মহব্বত (পর্ব- ৮) আল্লাহ্ তা'আলার প্রতি আগ্রহের প্রমাণ





 মহব্বত (পর্ব- ৮)
এহইয়াউ উলুমিদ্দীন - ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
আল্লাহ্ তা'আলার প্রতি আগ্রহের প্রমাণ -
অসংখ্য হাদীস ও মনীষীগণের উক্তিতেও আল্লাহ তা'আলার প্রতি আগ্রহের প্রমাণ পাওয়া যায়। সেমতে রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়াসাল্লাম) থেকে এ দোয়া বর্ণিত আছে :
>“হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে প্রার্থনা করি আপনার আদেশের পর সম্মতি, মৃত্যুর পর সুখী জীবন, আপনার প্রিয় মুখমন্ডলের প্রতি দৃষ্টিপাত এবং আপনার সাক্ষাতের প্রতি আগ্রহ।”
হযরত আবুদ্দারদা (রঃ) হযরত কা'ব আহবারকে বললেন : আমাকে তাওরাতের কোন একটি আয়াত শুনাও। তিনি বললেন : “আল্লাহ তা'আলা এরশাদ করেন- সজ্জনগণ আমার সাক্ষাতের প্রতি খুব আগ্রহ দেখায়, আর আমি তাদের সাক্ষাতের প্রতি অধিক আগ্রহী।” তিনি আরও বললেন : তাওরাতে এই আয়াতের কাছাকাছি আরও উল্লিখিত আছে,-
>“যে ব্যক্তি আমাকে অন্বেষণ করবে, সে আমাকে পাবে। আর যে আমাকে ছাড়া অন্য কাউকে অন্বেষণ করবে, সে আমাকে পাবে না।”
হযরত আবুদ্দারদা বললেন : “আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আমি রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম)-উনাকেও এরূপ বলতে শুনেছি।”
বর্ণিত আছে, আল্লাহ তা'আলা হযরত দাউদ (আঃ)-কে বললেনঃ “হে দাউদ, পৃথিবীর অধিবাসীদেরকে শুনিয়ে দিন, যে আমাকে মহব্বত করবে, আমি তার হাবীব। যে আমার কাছে বসবে, আমি তার সহচর। যে আমার যিকর দ্বারা প্রীতি অর্জন করবে, আমি তার প্রিয়জন। যে আমার সাথে থাকবে, আমি তার সাথী। যে আমাকে অবলম্বন করবে, আমি তাকে অবলম্বন করব। যে আমার কথা মানবে, আমি তার কথা মানব। যে আমাকে মহব্বত করে, তার মহব্বত আমার খুব জানা হয়ে যায়। ফলে, আমি তাকে নিজের জন্যে কবুল করে নিই। তাকে এমন মহব্বত করি, আমার সৃষ্টির কেউ তার উপর অগ্রণী থাকে না। যে আমাকে সত্যি সত্যি অন্বেষণ করে, সে আমাকে পায়। আর যে অন্যকে অন্বেষণ করে, সে আমাকে পায় না।”
হে পৃথিবীর অধিবাসীরা, তোমরা এখন দুনিয়ার মাধ্যমে প্রতারিত হচ্ছ। একে পরিত্যাগ কর এবং আমার সম্মান, সংসর্গ ও সান্নিধ্যের দিকে অগ্রসর হও আমার সাথে বন্ধুত্ব কর, আমি তোমাদের সাথে বন্ধুত্ব করব। কেননা, আমি আমার বন্ধুদের খমীর ইবরাহীম খলীলুল্লাহ, মূসা কলীমুল্লাহ এবং মুহাম্মদ সফীউল্লাহর খমীর থেকে তৈরী করেছি। আমি আমার প্রতি আগ্রহীদের অন্তর নিজের নূর দ্বারা নির্মাণ করেছি এবং আমার প্রতাপ দ্বারা তাদেরকে লালিত করেছি।”
জনৈক বুযুর্গ বর্ণনা করেন, আল্লাহ তা'আলা জনৈক সিদ্দীককে প্রত্যাদেশ করেন যে, আমার কিছু সংখ্যক বিশিষ্ট বান্দা আমার সাথে মহব্বতের সম্পর্ক রাখে, আমিও তাদের সাথে মহব্বতের সম্পর্ক রাখি। তারা আমার প্রতি আগ্রহী, আমিও তাদের প্রতি আগ্রহী। তারা আমাকে স্মরণ করে, আমিও তাদেরকে স্মরণ করি। তারা আমার দিকে তাকায়, আমিও তাদের দিকে তাকাই। যদি তুমিও তাদের পদাংক অনুসরণ কর, তবে আমি তোমাকে মহব্বত করব। আর যদি তাদের পথ থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও, তবে আমি তোমার প্রতি ক্রুদ্ধ হব!
সিদ্দীক ব্যক্তি আরয করলেন : ইলাহী, আপনার এই সকল বান্দার পরিচয় কি?
এরশাদ হল-
“তারা দিনের বেলায় ছায়ার প্রতি এমন উৎসুক থাকে, যেমন- রাখাল তার ছাগলের প্রতি উৎসুক থাকে। তারা সূর্যাস্তের জন্যে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে থাকে; যেমন পশুপাখি সন্ধ্যায় তাদের বাসায় ফেরার জন্যে আগ্রহী হয়। অতঃপর যখন রাত এসে যায়, অন্ধকার গাঢ় হয়ে যায়, শয্যা বিছানো হয়, রহস্য উন্মোচিত এবং দোস্ত দোস্তের সাথে মিলিত হয়, তখন তারা আমার উদ্দেশে পা বাড়ায়, কপাল বিছায়, আমার কালামের মাধ্যমে আমার কাছে মোনাজাত করে এবং আমার নেয়ামতের উপর আমাকে খোশামোদ করে। তাদের কেউ চিৎকার করে, কেউ কান্নাকাটি করে এবং কেউ দীর্ঘশ্বাস ফেলে। তাদের কেউ আগ্রহী হয়ে দাঁড়ানো, কেউ বসা, কেউ রুকুকারী, কেউ সেজদাকারী। তারা আমার কারণে যা যা সহ্য করে এবং আমার কাছে অভিযোগ করে, তা সমস্তই গ্রহণ করে নিই। সর্বপ্রথম আমি তাদেরকে তিনটি বস্তু দান করব।
(১) আমার নূর তাদের অন্তরে ঢেলে দেব। ফলে তারা আমার অবস্থা বর্ণনা করবে; যেমন আমি তাদের অবস্থা সম্পর্কে খবর দেই।
(২) নভোমণ্ডল, ভূমণ্ডল ও এতদুভয়ের মাঝে যা কিছু আছে, যদি সবই তাদের মোকাবেলা করে, তবে আমি তাদের খাতিরে এগুলোকে কম মনে করব।
(৩) আমি আমার পবিত্র মুখমণ্ডল তাদের দিকে ফিরিয়ে দেব। তুমি তো জান, আমি যার দিকে মুখ করি, তাকে কত কিছু দেই!
হযরত দাউদ (আঃ) -এর ঘটনাবলীতে আরও উল্লিখিত আছে, আল্লাহ তা'আলা ওহীর মাধ্যমে তাঁকে বললেন : হে দাউদ, জান্নাতকে কত স্মরণ করবেন অথচ আমার কাছে আসার প্রতি আগ্রহের আবেদন করবেন না? হযরত দাউদ (আঃ) আরয করলেন : ইলাহী, আপনার প্রতি আগ্রহী কারা? এরশাদ হল, তারা আমার আগ্রহী, যাদেরকে আমি সর্বপ্রকার মলিনতা থেকে পবিত্র করে দিয়েছি এবং ভয় সম্পর্কে অবহিত করেছি। তাদের অন্তরে আমার দিকে ছিদ্র করে দিয়েছি। সেই ছিদ্রপথে তারা আমাকে দেখে। আমি তাদের অন্তরকে হাতে নিয়ে আকাশের উপর রাখি। এরপর শ্রেষ্ঠ ফেরেশতাদেরকে ডাকি। তারা সমবেত হয়ে আমাকে সেজদা করে। তখন আমি তাদেরকে বলি : আমি তোমাদেরকে সেজদার জন্য ডাকিনি; বরং আমি তোমাদেরকে আমার প্রতি আগ্রহীদের নিষ্কলুষ অন্তর দেখাতে চাই এবং তাদের নিয়ে গর্ব করতে চাই। তাদের অন্তর আকাশে ফেরেশতাদেরকে এমন নূর দান করে, যেমন সূর্য পৃথিবীবাসীকে কিরণ দান করে। হে দাউদ, আমি আগ্রহীদের অন্তর আপন “রেযা” দ্বারা তৈরী করেছি। নিজের চেহারার নূর দ্বারা তাদের লালন করেছি। তাদের দেহকে পৃথিবীতে আমার লক্ষ্যস্থল নির্ধারণ করেছি। তারা অন্তরের পথ দিয়ে আমাকে দেখে এবং তাদের আগ্রহ উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পায়।
হযরত দাউদ আরয করলেন : ইলাহী, আপনার আশেকদের সাথে আমার সাক্ষাত ঘটিয়ে দেন। আদেশ হলঃ লেবাননের পাহাড়ে চলে যান। সেখানে চৌদ্দজন লোকের সাক্ষাত পাবেন। তাদের মধ্যে রয়েছে যুবক, বৃদ্ধ ও প্রৌঢ় সকল প্রকার লোক। তাদের কাছে পৌঁছে আমার সালাম বলে বলবেন যে, আল্লাহর কাছে তোমরা নিজেদের প্রয়োজন ব্যক্ত করো না কেন? তোমাদের পালনকর্তা সালাম জানিয়ে তোমাদেরকে জিজ্ঞেস করছেন- তোমরা তো আমার বন্ধু, মনোনীত ও ওলী। আমি তোমাদের আনন্দে আনন্দিত হই এবং তোমাদের মহব্বতের দিকে অগ্রগামী হই।
হযরত দাউদ (আঃ) নির্দেশ অনুযায়ী লেবানন পাহাড়ে গিয়ে তাদেরকে (১৪ ওলি) একটি ঝরণার কাছে আল্লাহ্ তা'আলার মাহাত্ম্য ঘোষণায় রত দেখলেন। তারা হযরত দাউদ (আঃ)-কে দেখেই প্রস্থানোদ্যত হলেন। হযরত দাউদ (আঃ) বললেন : ভাইসব, আমি আল্লাহর রসূল। তাঁর একটি পয়গাম নিয়ে তোমাদের কাছে এসেছি। অতঃপর তারা তাঁর দিকে মুখ করে কান পেতে শুনতে লাগলেন। হযরত দাউদ (আঃ) বলতে লাগলেন : আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে এই পয়গাম দিচ্ছেন, তোমরা তোমাদের নিজ নিজ প্রয়োজন তাঁর কাছে ব্যক্ত করবে, তাঁকে ডাকবে, যাতে তিনি তোমাদের কণ্ঠস্বর শুনেন। তোমরা তাঁর বন্ধু ও ওলী। তোমাদের খুশীতে তিনি খুশী হন। স্নেহময়ী জননী যেমন তার সন্তানদের দেখাশুনা করে, তেমনি তিনি প্রতি মুহূর্তে তোমাদের দেখাশুনা করেন।
একথা শুনে তাদের চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরতে লাগল। তাদের প্রত্যেকেই আলাদা আলাদা দোয়া করল।
(১) বৃদ্ধ দোয়ায় বলল : ইলাহী, আমরা আপনার বান্দা এবং বান্দার সন্তান-সন্ততি। অতীত জীবনে আমরা যে পরিমাণ আপনাকে স্মরণ করিনি, আমাদেরকে সে পরিমাণ ক্ষমা করুন।
(২) দ্বিতীয় জন বলল : ইলাহী, আপনি পবিত্র। আমরা দাসানুদাস। আপনার মধ্যে ও আমাদের মধ্যে যে ব্যাপার রয়েছে তাতে সুদৃষ্টি দান করুন।
(৩) তৃতীয় জন বলল ; আপনি পবিত্র। আমরা কি আপনার কাছে দোয়া করার দুঃসাহস করব? আপনি জানেন, আমাদের নিজের কোন প্রয়োজন নেই। তবে সর্বদা আপনার পথে প্রতিষ্ঠিত থাকার তৌফিক দান করুন। এতটুকু অনুগ্রহ আমাদের প্রতি করুন।
(৪) চতুর্থ ব্যক্তি বলল : ইলাহী, আপনার সন্তুষ্টি অন্বেষণে আমরা ত্রুটি করেছি। আপনি নিজের কৃপায় এ কাজে আমাদের সাহায্য করুন।
(৫) পঞ্চম ব্যক্তি বলল : আল্লাহ, আপনি আমাদেরকে বীর্য থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং আপনার মাহাত্ম্য সম্পর্কে চিন্তা করার গৌরব দান করেছেন। অতএব, যে ব্যক্তি আপনার মাহাত্ম্যে মশগুল, সে কি আপনার সাথে কথা বলার ধৃষ্টতা দেখাতে পারে? আপনি আমাদেরকে আপন নূরের নিকটবর্তী করুন- এটাই ছিল আমাদের মকছদ।
(৬) ষষ্ঠ ব্যক্তি বলল : ইলাহী, আপনি মহান। আপনি আপনার ওলীদের নিকটে থাকেন। তাই আপনার কাছে দোয়া করার সাহস আমরা পাই না।
(৭) সপ্তম ব্যক্তি বলল : আল্লাহ, আপনি আমাদের অন্তরকে যিকিরের পথ প্রদর্শন করেছেন এবং আপনাতে মশগুল হওয়ার ধ্যান দান করেছেন। এই নেয়ামতের শোকরে আমাদের পক্ষ থেকে যে ত্রুটি হয়েছে, তা ক্ষমা করুন।
(৮) অষ্টম ব্যক্তি বলল : আল্লাহ, আমাদের প্রয়োজন তো আপনি জানেনই। সেটা হচ্ছে কেবল আপনার দিকে দেখা।
(৯) নবম ব্যক্তি বলল : ইলাহী, দাস তার প্রভুর সামনে দুঃসাহস দেখাতে পারে না। যেহেতু আপন কৃপায় আমাদেরকে দোয়ার আদেশ করেছেন, তাই আরয করছি আমাদেরকে সেই নূর দান করুন, যা দ্বারা নভোমণ্ডলের অন্ধকার স্তরসমূহে পথ পাওয়া যায।
(১০) দশম ব্যক্তি বলল : হে আল্লাহ, আমরা আপনার কাছে আপনাকেই চাই। আমাদের প্রতি মনোযোগী হোন এবং সর্বদা আমাদের কাছে থাকুন।
(১১) একাদশ ব্যক্তি বলল : ইলাহী, আপনি আমাদেরকে যে নেয়ামত - দান করেছেন, আমরা তা পূর্ণ করার আবেদন করি।
(১২) দ্বাদশ ব্যক্তি বলল : এলাহী, আপনার সৃষ্টির মধ্য থেকে আমাদের কোন বস্তুর প্রয়োজন নেই। কেবল কৃপাদৃষ্টি করে আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করুন।
(১৩) ত্রয়োদশ ব্যক্তি বলল : এলাহী, আমার আবেদন এই যে, দুনিয়াকে দেখার ব্যাপারে আমার চক্ষুকে অন্ধ করুন এবং আখেরাতে মশগুল হওয়ার ব্যাপারে আমার অন্তরকে অন্ধ করুন।
(১৪) চতুর্দশ ব্যক্তি বলল : ইলাহী, আমি জানি আপনি ওলীদেরকে ভালবাসেন। অতএব, আমাদের প্রতি এতটুকু অনুগ্রহ করুন যে, আমাদের অন্তরকে সবকিছু থেকে ফিরিয়ে কেবল আপনাতে মশগুল করে দেন।
আল্লাহ তা'আলা দাউদ (আঃ)-এর কাছে ওহী পাঠালেন : তাদেরকে বলেদিন, আমি তোমাদের সকল কথাবার্তা শুনেছি। তোমরা যা যা কামনা করেছ, আমি সবই কবুল করলাম। তোমরা পরস্পরে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাও এবং ভূগর্ভে কুঠরী তৈরী করে নাও। আমি তোমাদের ও আমার মধ্যবর্তী যবনিকা সরিয়ে দিতে চাই যাতে তোমরা আমার নূর ও প্রতাপ দর্শন কর। হযরত দাউদ (আঃ) আরয করলেনঃ ইলাহী, এরা এই পর্যায়ে কেমন করে উন্নীত হল? এরশাদ হল “তারা আমার প্রতি সুধারণা পোষণ করে এবং দুনিয়া ও দুনিয়াবাসীদেরকে ত্যাগ করে আমার সাথে একাকী থাকে।

পরবর্তী পর্ব

মহব্বত (পর্ব- ৭) শওক তথা আগ্রহের স্বরূপ

 





মহব্বত (পর্ব- ৭)
এহইয়াউ উলুমিদ্দীন  ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

শওক তথা আগ্রহের স্বরূপ -
যারা মহব্বতের বাস্তবতা অস্বীকার করে, তারা আগ্রহের স্বরূপকে অবশ্যই স্বীকার করে না। কেননা, আগ্রহ মাহবুবের প্রতিই হয়ে থাকে। আমরা এখনি প্রমাণ করব, যে আল্লাহ্ তা'আলাকে মহব্বত করে, আল্লাহর প্রতি তার আগ্রহ অবশ্যই থাকে এবং সে আগ্রহে বাধ্য। মহব্বত প্রমাণ করার জন্যে আমরা ইতিপূর্বে যে সব যুক্তির অবতারণা করেছি, বলা বাহুল্য, আগ্রহ প্রমাণ করার জন্যে সেগুলোই যথেষ্ট। অর্থাৎ, মাহবুব যখন দৃষ্টির অন্তরালে থাকে, তখন তার প্রতি আগ্রহ হওয়া অনিবার্য। এর ব্যাখ্যা এই যে, যে বস্তু একদিক দিয়ে উপলব্ধ এবং অন্যদিক দিয়ে উপলব্ধ নয়, তার প্রতিই আগ্রহ হওয়া সম্ভব। যে বস্তু কখনও উপলব্ধিতেই আসেনি, তার প্রতি আগ্রহ হওয়া অসম্ভব। এমনিভাবে যে বস্তু চূড়ান্ত পর্যায়ে উপলব্ধ হয়ে যায়, তার প্রতিও আগ্রহ থাকে না। চূড়ান্ত উপলব্ধি প্রত্যক্ষ করার মাধ্যমেই হয়ে থাকে।

উদাহরণতঃ এক ব্যক্তি অন্য এক ব্যক্তিকে কখনও দেখেনি এবং কখনও তার প্রশংসা শুনেনি। এমতাবস্থায় এই অদেখা ও অজানা ব্যক্তির প্রতি তার আগ্রহান্বিত হওয়ার কথা কল্পনাই করা যায় না। আর যে ব্যক্তি তার মাহবুবকে সর্বক্ষণ প্রত্যক্ষ করে, সে-ও মাহবুবের প্রতি আগ্রহান্বিত হবে না। বরং যে মাহবুব একদিক দিয়ে উপলব্ধ এবং অন্যদিক দিয়ে উপলব্ধ নয়, তার প্রতিই আগ্রহ হয়ে থাকে।
উদাহরণতঃ এক ব্যক্তির মাহবুব তার কাছেই নেই; কিন্তু তার কল্পনা তার অন্তরে বিদ্যমান। এমতাবস্থায় এই কল্পনাকে পূর্ণতা দেওয়ার জন্যে সে মাহবুবকে দেখতে আগ্রহান্বিত হবে। কেননা, আগ্রহের অর্থ হচ্ছে অন্তরস্থিত কল্পনাকে পূর্ণতা দানের প্রয়াস পাওয়া। এমনিভাবে যে ব্যক্তি মাহবুবকে অন্ধকারে দেখে, ফলে তার মুখমণ্ডল উত্তমরূপে দৃষ্টিতে পড়ে না, সে-ও এই অপূর্ণ দীদারকে পূর্ণ করতে আগ্রহী হবে। অনুরূপভাবে যে ব্যক্তি মাহবুবের মুখমণ্ডল দেখে, কিন্তু তার কেশ ও অন্যান্য সৌন্দর্য দেখে না, সে-ও এগুলো দেখার জন্যে আগ্রহী হয়। আগ্রহের উপরোক্ত ধরনগুলো আল্লাহ্ তা'আলার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। বরং প্রত্যেক মহব্বতকারী সাধকের জন্যে এগুলো অপরিহার্য। কারণ, আল্লাহ তা'আলার যে সব বিষয় আল্লাহওয়ালাদের সামনে প্রকটিত হয়েছে, সেগুলো যেন হালকা যবনিকার অন্তরাল থেকে দেখার অনুরূপ এবং তাতে চূড়ান্ত পর্যায়ের স্পষ্টতা নেই৷ পূর্ণ স্পষ্টতা প্রত্যক্ষকরণ ও জ্যোতির দীপ্তিকে বলা হয়, যা দুনিয়াতে অসম্ভব। কিন্তু এটাই আল্লাহওয়ালাদের চূড়ান্ত প্রিয় লক্ষ্য। তাই আগ্রহ সৃষ্টির কারণ অর্থাৎ, মহব্বতকারীর সামনে আল্লাহ তা'আলার সামান্য প্রকাশ হওয়ার পর সে পূর্ণ প্রকাশের জন্যে নিঃসন্দেহে আগ্রহী হবে।

মহব্বত (পর্ব- ৬) আল্লাহর মারেফতে মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধির ত্রুটি





 মহব্বত (পর্ব- ৬)
এহইয়াউ উলুমিদ্দীন  ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

আল্লাহর মারেফতে মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধির ত্রুটি -
পৃথিবীতে যা কিছু বিদ্যমান, সেগুলোর মধ্যে অধিকতর দৃশ্যমান ও প্রকৃষ্টতর হচ্ছেন আল্লাহ তা'আলা। তাই যাবতীয় মারেফতের মধ্যে আল্লাহর মারেফতই সর্বপ্রথম বোধগম্য হওয়া উচিত। কিন্তু ব্যাপার সম্পূর্ণ উল্টো প্রতীয়মান হয়। এর কারণ অবশ্যই জানা দরকার। আমরা আল্লাহ্ তা'আলাকে অস্তিত্ব জগতের সর্বাধিক দৃশ্যমান ও প্রকৃষ্টতর বলেছি। এর কারণ ব্যাখ্যা করার জন্যে আমরা একটি দৃষ্টান্তের অবতারণা করছি। যদি আমরা কোন মানুষকে লিখতে, সেলাই করতে অথবা অন্য কোন কাজ করতে দেখি, তবে তার জীবিত হওয়া আমাদের কাছে সর্বাধিক স্পষ্ট হবে। অর্থাৎ, তার জীবন, জ্ঞান ও ক্ষমতা আমাদের মতে তার অন্যান্য বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ গুণাবলীর তুলনায় অধিক স্পষ্ট হবে। কেননা, তার অভ্যন্তরীণ গুণাবলী যেমন, ক্রোধ, স্বাস্থ্য, রোগ ইত্যাদি তো আমরা জানিই না। আর বাহ্যিক গুণাবলীর মধ্যে কতক আমরা জানি না আর কতক আমাদের জানা হয়ে যায়। যেমন, জীবন, জ্ঞান, কর্মক্ষমতা, ইচ্ছা ইত্যাদি। অতঃপর আমরা যদি বিশ্বের দিকে লক্ষ্য করি, তবে আল্লাহ তা'আলার গুণাবলী আমাদের জানা হয়ে যায়। পাথর, ঢিলা, তরুলতা, বৃক্ষ, জীবজন্তু, ভূমণ্ডল, নভোমণ্ডল, সৌরজগত, জল, স্থল ইত্যাদি সকল বস্তু দ্বারা আল্লাহ তা'আলার অস্তিত্ব, কুদরত, জ্ঞান ইত্যাদি গুণাবলী প্রত্যক্ষ করা যায়। এগুলো সব এ বিষয়ের উজ্জ্বল প্রমাণ যে, একজন স্রষ্টা, পরিচালক ও সবকিছুকে গতিশীলকারী অবশ্যই বিদ্যমান। এ ধরনের সৃষ্টবস্তুর কোন শেষ নেই। তাই আল্লাহর অস্তিত্ব ও গুণাবলীর প্রমাণসমূহের শেষ নেই। যদি লেখকের জীবন, জ্ঞান ও কর্মক্ষমতা কেবল একটি প্রমাণ অর্থাৎ, তার হাতের নড়াচড়া দেখে প্রমাণিত ও স্পষ্ট হয়ে যায়, তবে আল্লাহর অস্তিত্ব ও জীব - কিরূপে স্পষ্ট হবে না। তাঁর অস্তিত্ব বুঝাবে না- এমন কোন বস্তুর থাকা সম্ভব নয়। আমাদের ভেতরেও এমন কোন বস্তু নেই এবং বাইরেও নেই। কেননা, বিশ্বের প্রতিটি কণা তার অবস্থার ভাষায় ডেকে বলছে, আমি আপনা-আপনি বিদ্যমান ও গতিশীল নই। আমার আবিষ্কর্তা ও গতিশীলকারী অন্য কেউ। আমাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের গঠন, অস্থির গ্রন্থি, রক্ত-মাংস ইত্যাদি সবকিছুই একজন স্রষ্টার সাক্ষ্য দেয় বিধায় তিনি এতই স্পষ্ট হয়ে গেছেন যে, তাঁকে উপলব্ধি করতে মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধি হতভম্ব হয়ে যায়। কেননা, দু’কারণে কোন বস্তুকে হৃদয়ঙ্গম করতে মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধি অক্ষম। এক, সেই বস্তুর সত্তাগতভাবে অপ্রকাশ্য ও সূক্ষ্ম হওয়া। দুই, বস্তুর সীমাতিরিক্ত দৃশ্যমান ও প্রকট হওয়া। যেমন, বাদুড় রাতের অন্ধকারে দেখে এবং দিনের আলোতে দেখে না। এর কারণ এটা নয় যে, দিন রাতের তুলনায় অস্পষ্ট; বরং দিন এত বেশী স্পষ্ট যে, বাদুড়ের দুর্বল দৃষ্টি তাতে ধাঁধিয়ে যায়। সূর্যকিরণের তীব্রতা তার দৃষ্টিকে বিক্ষিপ্ত করে দেয়। যখন এর সাথে কিছু অন্ধকার মিশ্রিত হয় এবং প্রকাশ দুর্বল হয়, তখন বাদুড় দেখতে শুরু করে। অনুরূপভাবে আমাদের জ্ঞান-বুদ্ধি দুর্বল, আর আল্লাহ তা'আলার বিকাশে রয়েছে অসাধারণ চমক ও চূড়ান্ত দীপ্তি। এমনকি তাঁর বিকাশ দ্বারা প্রতিটি কণা দেদীপ্যমান। ফলে, এই অসাধারণ বিকাশই তাঁর গোপন ও অস্পষ্ট থাকার কারণ হয়ে গেছে। তীব্র প্রকাশের কারণে গোপন থাকার তত্ত্ব শুনে বিস্মিত হওয়া উচিত নয়। কেননা, বস্তুর বিকাশ ঘটে তার বিপরীত বস্তুর দ্বারা। যেমন, অন্ধকার আছে বলেই আমরা আলো উপলব্ধি করতে পারি। কিন্তু আল্লাহ তা'আলার অস্তিত্ব এত ব্যাপক ও বিস্তৃত যে, তাঁর কোন বিপরীত নেই। এ কারণেই মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধি তাঁকে যথার্থভাবে উপলব্ধি করতে অক্ষম হয়ে পড়ে এবং তিনি চূড়ান্ত প্রকট হওয়া সত্ত্বেও মানুষের দৃষ্টিতে, অস্পষ্ট থেকে যান। কিন্তু যার অন্তর্দৃষ্টি তীক্ষ্ণ এবং শক্তিপ্রবল, সে আল্লাহ তা'আলা ছাড়া অন্য কোন কিছু দেখে না। সে বিশ্বাস করে, আল্লাহ ব্যতীত অন্য কিছুই বিদ্যমান নেই। অন্যের যাবতীয় ক্রিয়াকর্ম তাঁর কুদরতের ফল এবং তাঁরই অনুগামী।

পরবর্তী পর্ব
শওক তথা আগ্রহের স্বরূপ

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...