মঙ্গলবার, ২৮ নভেম্বর, ২০২৩

হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (৮) দায়িত্বই প্রতিদান চায়



📚 হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (পর্ব- ৮)
✍🏻শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ্ মুহাদ্দেসী দেহলভী (রহঃ)

দায়িত্বই প্রতিদান চায় -
জেনে রাখুনমানুষের জন্য রয়েছে যেমন কর্ম তেমন ফল। ভাল কর্মে তারা ফল পাবেমন্দ কাজে পাবে মন্দ ফল। এ ক্ষেত্রে চারটি অবস্থা দেখা দেয়। 
(১) জাতিগত স্বভাবের চাহিদা। যেমন গরু-ছাগল ঘাস খাবে ও বাঘ-শিয়াল মাংস খাবে। তা হলেই তাদের স্বভাব ঠিক থাকবে। তা না খেয়ে যদি বাঘ-শিয়াল ঘাস খায় ও গরু-ছাগল মাংস খায়তখন তাদের স্ববাব খারাপ হবেই। মানুষও তেমনি। যদি তারা এমন সব কাজ করে যাতে আল্লাহর কাছে বিনয়দেহের পাক-পবিত্রতামনের সারল্য ও খোদাভীরুতাএবং বিবেকের ইনসাফ ও ন্যায়ানুগতা প্রকাশ পায়তা হলেই তা তার ফেরেশতা স্বভাবের পরিপোষক হবে। পক্ষান্তরে যখন তার পরিপন্থী সব কাজ করবেতখন তার স্বভাব নষ্ট হয়ে যায়। তারপর প্রাণ যখন তার দেহভার মুক্ত হবেতখন ভাল কাজে সুখের প্রলেপ ও মন্দ কাজে দহন জ্বালা লাভ করবে। 

(২) মালা-ই আলার প্রভাবেও মানুষের দুঃখ বা সুখানুভূতি লাভ হয়। কারো পায়ের নীচে আগুন বা বরফ থাকলে তার অনুভূতি শক্তি যেরূপ প্রভাবিত হয়উচ্চতম পরিষদের ফেরেশতাদের খুশী-অখুশী দ্বারাও সে তেমনি প্রভাবিত হয়। এ প্রভাব মূলত দেখা দেয় স্বরূপ জগতের আদি মানুষটিরতথা মানবের জাতিগত আদি সত্তার ভেতর। সেই সত্তার সেবায় নিয়োজিত রয়েছেন ফেরেশতারা। মানব গোত্রের ওপর বিশেষ অনুগ্রহ হিসেবে তাদের সৃষ্টি করা হয়েছে। কায়া মানব যেভাবে অনুভূতি ও উপলব্ধি ছাড়া চলতে পারেনা তেমনি ছায়া মানব সেই ফেরেশতাদের ছাড়া চলতে পারে না। কোন মানুষ যখন একটি ভাল কাজ করেতখন সেবক ফেরেশতারা খুশী হয় এবং তা থেকে আলোকরশ্মি বিচ্ছুরিত হয়। তেমনি যদি কেউ কোন খারাপ কাজ করেসেবক ফেরেশতারা অসন্তুষ্ট ও ক্ষুব্ধ হয় এবং তা থেকে আঁধার ধোয়ার কুণ্ডুলী নির্গত হয়। এ দুটোই সেই মানব সত্তাটিকে প্রভাবিত করে এবং তাকে সুখ কিংবা দুঃখ দান করে কখনও সেই রশ্মি বা ধোঁয়া কিছু ফেরেশতা এবং বিশেষ একদল লোকের স্বভাবে প্রবিষ্ট হয়। ফলে তার স্বাভাবিক ইলহাম হয় ভাল কাজের মানুষটিকে ভালবাসার ও মন্দ কাজের মানুষটিকে ঘৃণা করার জন্য। সেই অনুসারে তারা সদ্ব্যবহার কিংবা দুর্ব্যবহার করে থাকে। এ অন্তর্লীন প্রভাবটির উদাহরণ এইযখন কোন মানুষের পায়ের নীচে আগুন থাকেতার অনুভূতি ঘটে দহন জ্বালায়। এ অনুভূতি তার মগজ থেকে বিষাদময় ধোঁয়া নির্গত করে ও তা তার অন্তরকে আচ্ছাদিত করায় দুঃখানুভূতি দেখা দেয়। ফলে স্বভাবেও বিমর্ষতা ফুটে ওঠে। অনুভূতি ও উপলব্ধি শক্তিগুলো যেভাবে দেহকে প্রভাবিত করেঠিক তেমনি প্রভাবিত করে সেই ফেরেশতারা আমাদের মন-মানসকে। আমাদের কারো যদি দুঃখ বা লাঞ্ছনার আশংকা দেখা দেয়তখন সে ভয়ে কাঁপে এবং তার দেহ বিবর্ণ ও অবসন্ন হয়। কখনও বা কামনা লোপ পেয়ে প্রস্রাব লাল হয়ে যায়। এমনকি পায়খানা-প্রস্রাবও বেরিয়ে আসে। এ সবই ঘটে তার স্বভাবের ওপর অনুভূতি ও উপলব্ধির প্রভাবের কারণে। এ প্রভাব তার মগজের মাধ্যমে মনে রেখাপাত করে। বনী আদমের সাথে নির্দিষ্ট ফেরেশতার ঠিক দেহের সাথে অনুভূতির সম্পর্কের মতই সংযোগ। তাদের তরফ থেকে মানুষের ও নিম্নস্তরের ফেরেশতাদের ওপর স্বভাবজাত প্রভাব ও প্রকৃতিগত বিবর্তন চলতেই থাকে। 
তারপর যেভাবে ভালর আলো ও মন্দের আঁধার ওপর থেকে নীচে নেমে আসেতেমনি নীচ থেকেও তা ওপরে উঠে এমনকি পবিত্র দরবারে পর্যন্ত পৌঁছে যায়। তার ফলে আল্লাহর জ্যোতিতে বিশেষ এক অবস্থার সৃষ্টি হয়যাকে রহমত বা গজব বলা হয়। আগুনের তাপে যেমন পানি উত্তপ্ত হয়যুক্তিজাল বিন্যাসের পর সিদ্ধান্ত বের হয় এবং দোয়া করলে কবুলের কারণ সৃষ্টি হয়এও ঠিক তেমনি ব্যাপার। বস্তুত আল্লাহ জ্যোতিতে উক্ত অবস্থা সৃষ্টির পর আত্মিক জগতে নতুন নতুন অবস্থা ও বিবর্তনের সৃষ্টি হয়। 
কখনও ক্ষোভ ও আক্রোশ সৃষ্টি হয়। তওবা হলে তা আবার লোপ পায়। কখন আবার রহমত দেখা দেয়। রহমত আবার অপরাধ হলে আজাবে রূপান্তরিত হয়। স্বয়ং আল্লাহ পাক বলেনঃ 
নিশ্চয় আল্লাহ কোন জাতির ভাগ্য বদলান নাযতক্ষণ তারা নিজেদের ভাগ্য নিজেরা না বদলায় (সূরা রাদঃ ১১)
মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বিভিন্ন হাদীসে বলেছেনআদম সন্তানের যা কিছু কাজ ফেরেশতারা আল্লাহর সমীপে নিয়ে যান। কিংবা আল্লাহপাক ফেরেশতাদের জিজ্ঞেস করেনআমার বান্দাদের কি অবস্থায় রেখে এসেছঅথবা আল্লাহর কাছে রাতের কার্যাবলীর আগে দিনের কার্যাবলী পৌঁছে থাকে। এ সব বক্তব্য থেকে বুঝা যায়জ্যোতির্ময় আল্লাহ ও তাঁর বান্দাদের ভেতর পবিত্র পরিষদের মাধ্যমে যে সম্পর্ক বিদ্যমানফেরেশতারা সে সম্পর্ক রক্ষার দায়িত্বই পালন করেন। 
(৩) মানুষের ওপর যা কিছু অপরিহার্য করা হল তা শরীয়তেরই দাবী। এক জ্যোতির্বিদ যেমন জানেননক্ষত্রমণ্ডলীর যখন নিজ নিজ গতিপথ ও অবস্থানগুলোর বিশেষ এক স্থান লাভ ঘটেতখন সেই স্থানের বিশেষ শক্তির প্রভাবে এক ধরনের আত্মিক ও আধ্যাত্মিক পরিমণ্ডল সৃষ্টি হয়। সে অবস্থাটি আকাশের কোথাও কেন্দ্রিভূত হয়ে ছায়ারূপ ধারণ করে। তারপর যখন আকাশের রীতিনীতির নিয়ন্তা জগৎ উদ্ভাসিনী পূর্ণ চন্দ্রের সেই আত্মিক কথা গ্রহণের অবস্থাটিকে পৃথিবীতে প্রতিভাত করেনতখন পৃথিবীর মানুষ সেই শীতল চন্দ্রালোক দ্বারা আকৃষ্ট ও অভিভূত হয়। ঠিক এভাবেই এক আল্লাহ প্রাপ্ত ব্যক্তি জানেনবিশেষ এক সময় আসে যেটাকে লায়লাতুল কদর [কিংবা লাইলাতুল বরাত] বা বরকতের রাত বলে আখ্যায়িত করা হয় এবং যে সময়ে সমস্ত হিকমতপূর্ণ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গৃহীত ও সেগুলো বণ্টিত হয়তখনও মানুষের সাথে সম্পৃক্ত আত্মিক জগতে এক বিশেষ অবস্থার সৃষ্টি হয়। তাই প্রয়োজন ও সময়ের চাহিদা মোতাবেক সেই যুগের উত্তম ও শ্রেষ্ঠ মেধাসম্পন্ন ব্যক্তির কাছে ইলহাম বা ওহী অবতীর্ণ হয়। তাঁর মাধ্যমে সে সব ইলহাম পৌঁছানো হয় তাঁদের কাছে যাদের ব্যক্তিত্ব ও মেধা ঠিক তাঁরই কাছাকাছি রয়েছে। তারপর অন্যান্য সাধারণ লোকের অন্তরে এ ইলহাম পৌঁছানো হয় যে অবতীর্ণ ইলহামগুলোকে মেনে চলে এবং ভাল জানে। তারপর সে সব ইলহামের সমর্থক ও সহায়কদের সাহায্য করা হয়। পক্ষান্তরে সেগুলোর বিরোধীদের লাঞ্ছিত ও পরাভূত করা হয়। নিম্ন জগতের ফেরেশতাদের ইলহাম পৌঁছানো হয় অবতীর্ণ বিধানাবলীর অনুসারীদের সাথে সদ্ব্যবহার ও বিরোধীদের সাথে দুর্ব্যবহার চালাতে। তারপর এক ধরনের উজ্জ্বল দ্যুতি ও প্রভাব সাধারণ পরিষদ ও উচ্চতম পরিষদে পৌঁছে যায়। ফলে সেখান থেকে সন্তুষ্টি কিংবা অসন্তুষ্টি প্রকাশ পেয়ে থাকে। 

(৪) নবীর আনুগত্য। আল্লাহ পাক যখন কাউকে মানুষের মাঝে নবী করে পাঠান এবং এ কাজের মাধ্যমে তিনি মানুষের কল্যাণ সাধন ও তাদের ওপর অনুগ্রহ বর্ষন করতে চানতখন মানুষের ওপর তাঁর আনুগত্য অপরিহার্য করেন। তখন নবীর কাছে তাঁর যে সব ওহী আসে সেগুলো নির্দিষ্ট বিদ্যায় রূপ লাভ করে। সে বিদ্যা নবীর হিম্মৎ ও দোয়ার ফলে সুদৃঢ় ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়ে চলে। আল্লাহ তা'আলারও নির্দেশ হয় তা সুপ্রতিষ্ঠিত হবার ব্যাপারে সহায়তার জন্য। 
যেমন কর্ম তেমন ফলের এ চার ধরনের প্রয়োজনের ভেতর প্রথম দুধরনের প্রয়োজন অর্থাৎ জাতিগত স্বাভাবিক চাহিদা ও উচ্চতম পরিষদের প্রভাবগত চাহিদা মানুষের সৃষ্টিগত প্রকৃতিরই চাহিদা মাত্র। যে প্রকৃতি দিয়ে আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন তা চির অপরিবর্তনীয়। 
তবে পাপ ও পুণ্যের বিধান মানব প্রকৃতিতে সামগ্রিকভাবে বিধৃত রয়েছেবিস্তারিত ভাবে নয়। এ প্রকৃতিগত মানবিক ধর্মটি কলোত্তীর্ণ ও সার্বজনীন। সব নবীই এ মৌলিক ধর্মের ক্ষেত্রে এক ও অভিন্ন মতাবলম্বী। যেমন আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ 
এই হল তোমাদের উম্মতের পরিচয়এ উম্মত সবাই এক (সূরা মুমিনুনঃ আয়াতঃ ৫২)

মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, ‘নবীরা সবাই বৈমাত্রেয় ভাই। বাপ তাদের একমা পৃথক। এ প্রকৃতিগত মানব ধর্মটুকুর জন্য প্রতিটি মানুষকে জবাবদিহি করা হবে। নবী তাঁর কাছে আসুক বা না আসুক। 

তৃতীয় ধরনের প্রতিদান দাবী (শরীয়তের চাহিদা) যুগের পরিবর্তনের সাথে পরিবর্তিত হয়ে চলে। এ জন্যেই যুগে যুগে ভিন্ন ভিন্ন নবী ও রাসূল পাঠাতে হয়েছে। মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর হাদীসে এর ইংগিত এ ভাবে রয়েছে, ‘আমার ও আমার ওপর অবতীর্ণ বিধানের অবস্থা হল এই,কোন লোক যেন এক জাতির কাছে এসে বললহে জাতি! আমি নিজ চোখে শত্রু সৈন্য দেখে এলাম। তাই খোলাখুলি তোমাদের সাবধান করছি। তোমরা এক্ষুণি পালিয়ে প্রাণ বাঁচাও। তখন সেই জাতির একটি দল তার খবর শুনে মেনে নিল এবং শত্রু সৈন্য পৌঁছার আগেই ভোর না হতে পালিয়ে বাঁচল। অন্য দল তার খবরকে মিথ্যা বলে উড়িয়ে দিয়ে সকাল পর্যন্ত আরামে নিদ্রা গেল এবং সকালেই শত্রু সেনারা এসে তাদের মেরে ফেলল। ঠিক তেমনি আমাকে যারা মানল ও আমার বিধানকে সত্য জানলতারা বেঁচে গেল এবং যারা আমাকে মিথ্যা জানল ওআমার বিধানকে অমান্য করলতারা মারা পড়ল। 

এখন রইল চতুর্থ ধরনের প্রতিদান প্রকৃতি। সেটা হল নবী প্রেরণের চাহিদা। এ চাহিদা নবী প্রেরিত না হওয়া পর্যন্ত দেখা দেয় না। নবী এসে সবার কাছে সে বিধানগুলো পৌঁছে দেবার ও তাদের সব সংশয় সন্দেহ নিরসনের পর যারা জেনে শুনে বাঁচতে কিংবা ধ্বংস হতেচায়তাদের বেলায় এ প্রয়োজন দেখা দেয়। তখন আর এ প্রয়োজন অস্বীকার করার তাদের কোন অজুহাত অবশিষ্ট থাকেনা।

পরবর্তী পর্ব (নবম পরিচ্ছেদ)


হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (৭) দায়িত্ব মানুষের বিধিলিপি



📚 হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (পর্ব- ৭)
✍🏻শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ্ মুহাদ্দেসী দেহলভী (রহঃ)

দায়িত্ব মানুষের বিধিলিপি 
এ কথা সুস্পষ্ট যেআল্লাহ্ তা'আলার এ সৃষ্টিজগতে এমন অজস্র নিদর্শন রয়েছে যা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করলে বেশ বুঝা যায়আল্লাহ্ তা'আলা যে তাঁর বান্দাদের শরীয়তের বিধি-নিষেধ পালনের দায়িত্ব দিয়েছেন তার ভেতর বহু কল্যাণকর উদ্দেশ্য রয়েছে। তাঁর কাছে এর সমর্থনে সকল যুক্তি-প্রমাণও রয়েছে। 
এখন একবার গাছের পাতাফুল ও ফলের দিকে তাকান। তা দেখে এবং স্বাদ ও গন্ধ নিয়ে যে অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়তার দিকে গভীরভাবে লক্ষ্য করুন। দেখতে পাবেনপ্রত্যেক ধরনের পাতাকে আল্লাহ বিশেষ রূপ দিয়েছেন। প্রত্যেক জাতীয় ফুলকে দিয়েছেন ভিন্ন ভিন্ন রঙ ও ঘ্রাণ। প্রত্যেক প্রকারের ফলকে দিয়েছেন স্বতন্ত্র স্বাদ। এ থেকে কোনটি কোন গাছের পাতাকিসের ফুল ও কোন ফল তা সহজেই বলা যায়। এ সবগুলোই শ্রেণীরূপের অন্তর্গত। যে সূত্র থেকে যেভাবে শ্রেনী বিন্যাস হয়ে থাকেএগুলো সেখান থেকেই একই ভাবে বিন্যস্ত হয়। 

আল্লাহর সিদ্ধান্ত মোতাবেক প্রত্যেক প্রকারের গাছের জন্য বিশেষ উপাদান নির্ধারিত হয়ে আছে। যেমনখেজুর গাছের জন্য বিশেষ ধরনের মাটি তিনি নির্দিষ্ট করে রেখেছেন। তারপর মোটামুটিভাবে বলে দিয়েছেনএ উপাদান খেজুরের রূপ নিয়ে আত্মপ্রকাশ করবে। অবশেষে বিস্তারিত ফরমানে বলা হলখেজুরের পাতা এরূপফল ওরূপ ও বীচি সেরূপ হবে। 

প্রত্যেক শ্রেণীর কিছু বৈশিষ্ট্য তো সামান্য বুদ্ধি যার রয়েছে সে-ই বলতে পারে। কিন্তু কিছু বৈশিষ্ট্য এরূপ সূক্ষ্ম হয় যা বিজ্ঞ ব্যক্তি ছাড়া কেউ জানতে পারে না। উদাহরণ হিসেবে ইয়াকুতের এক বিশেষ প্রভাবের কথা ধরে নিন। যার হাতে ইয়াকুত থাকেঅন্তরে তার আনন্দ ও সাহস বেড়ে যায়। ইয়াকুতের এ বৈশিষ্ট্যটি সাধারণতঃ কেউ দেখে না। 

কোন কোন শ্রেণীর বৈশিষ্ট্যগুলো তার গোটা সত্তার ভেতর পাওয়া যায়। তা ঘটে উপাদানের উপযুক্ততার জন্য (উপাদানের দুর্বলতার কারণে একই শ্রেণীর ফলফুলের ভেতর তারতম্য ঘটে)। তেমনি কোন শ্রেনীর কিছু সত্তায় সব বৈশিষ্ট্য থাকেকিছু অংশে থাকে না। হালীলা ফল মুঠোয় নিলে এ সত্যটি সহজ হয়ে ধরা দেয়। 

খেজুর এরূপ কেন এ কথা বলতে পারেন না। এ প্রশ্ন অবান্তর। কারণসেটা যেরূপ আছে তা-ই থাকবে। এর কারণ জানতে চাওয়ার পালা নেই। 

তারপর আপনি যদি পশুর শ্রেনীগুলোর দিকে দৃষ্টি দেনসেখানেও মাছের মতই প্রতিটি শ্রেণীর পার্থক্য ও স্বাতন্ত্র্য দেখতে পাবেন। সঙ্গে সঙ্গে এও দেখতে পাবেনতাদের ভেতর এমন কতগুলো স্বতঃস্ফুর্ত ও প্রকৃতিগত ব্যাপার দেখা যায় যা থেকে সহজেই এক শ্রেনী হতে অপর শ্রেণীর পার্থক্য সুস্পষ্ট হয়ে ধরা দেয়। যেমন গৃহপালিত গরুছাগল ইত্যাদি ঘাস খায় ও চর্বিত চর্বন করে। অথচ ঘোড়া খচ্চর ইত্যাদি তৃণজীবি হয়েও চর্বিত চর্বন করে না। হিংস্র জন্তুর গোস্ত খেয়েই বাঁচে। পাখীরা উড়ে বেড়ায়। মাছ পানিতে সাঁতরায়। প্রত্যেক শ্রেণীর পশুর কণ্ঠস্বর ভিন্ন। সংগম ও দাম্পত্য পদ্ধতিও ভিন্ন ভিন্ন। বাচ্চা পালন ও ডিম প্রদানের রীতিও স্বতন্ত্র। এ সব সবিস্তারে বলতে গেলে গ্রন্থের কলেবর বেড়ে যাবে। 

এরপর দেখিপ্রত্যেক শ্রেণীর ভেতর যতটুকু স্বাভাবিক ও স্বতঃস্ফুর্ত জ্ঞান রয়েছে যা তার একান্ত প্রয়োজন ও তার জন্য কল্যাণকর। এ সব হচ্ছে আল্লাহ প্রদত্ত জ্ঞান। শ্রেণী বৈশিষ্ট্যের ছিদ্র পথে তার আগমন। ফুলের রঙ ও রূপ এবং ফলের স্বাদ ও ঘ্রাণ যেরূপ শ্রেণী বিশেষের সাথে জড়িয়েই আবির্ভূত হয়এও তেমনি এসে থাকে। 

কোন শ্রেণীতে শ্রেণীগত বৈশিষ্ট্যগুলোর সর্বত্র উপস্থিতি দেখা যায়। অথচ কোন শ্রেণীতে কিছু সংখ্যকের ভেতর পাওয়া যায় ও কিছু সংখ্যকের ভেতর পাওয়া যায় না। তার মূলে রয়েছে উপাদানের উপযোগিতা কিংবা দুর্বলতা। তবে শ্রেণী বিশেষের প্রত্যেকটি সত্তাই বৈশিষ্ট্যগুলো ধারণের যোগ্যতা রাখে। বৈশিষ্ট্যে ব্যতিক্রমের অন্যতম উদাহরণ হল মধু মক্ষিকার রাজা ও গৃহপালিত তোতাপাখী। নিজ নিজ শ্রেণী থেকে তারা স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য পেয়ে থাকে। 

মানুষের দিকে লক্ষ্য করলেও আপনি গাছপালা ও জীবজন্তুর মতই কতগুলো সাধারণ বৈশিষ্ট্য সেখানে দেখতে পাবেন। যেমনজন্ম নেয়াবৃদ্ধি পাওয়াকাশী দেয়াহাই তোলাপায়খানা-প্রস্রাব করাজন্ম নিয়ে মাতৃস্তন্য পান করা ইত্যাদি। সঙ্গে সঙ্গে এমন কতগুলো বৈশিষ্ট্যও পাবেন যেগুলো মানব জাতিকে অন্যান্য জাতীয় সৃষ্টি থেকে স্বতন্ত্র করে রেখেছে। যেমনকথা বলা ও বুঝাভূমিকা বুঝেই বিষয়জ্ঞান অর্জন করাসাধনা ও গবেষণা চালিয়ে বুদ্ধি-বিবেকের সাহায্যে গভীর তত্ত্বজ্ঞান হাসিল করাবস্তুগত ধ্যান-ধারণার বাইরের বস্তুকে উন্নত জ্ঞানের সাহায্যে জেনে নেয়া (সভ্যতা ও দেশজাতি ও ব্যক্তি সংস্কার পদ্ধতি ইত্যাদি)। এ ব্যাপারগুলো যেহেতু মানুষের জাতিগত বৈশিষ্ট্য ও জন্মগত উত্তরাধিকারতাই জংগল বা পাহাড়ের চূড়ায় বসবাসকারী মানুষের কাছেও তার পরিচয় মিলে। এও হচ্ছে আল্লাহর শ্রেণী বিন্যাসের জন্য নির্ধারিত বিশেষ উপাদানের বৈশিষ্ট্য। আসল তত্ত্ব হল এইমানুষের সৃষ্টিগত বৈশিষ্ট্য বা স্বভাবের দাবী হল এইতার রিপুর ওপরে অন্তরের ও অন্তরের ওপরে বুদ্ধির প্রাধান্য থাকা চাই। 

তারপর লক্ষ্য করুনআল্লাহ তা'আলা প্রতিটি শ্রেণী বিন্যাসে কত কলা-কৌশল ও অনুগ্রহ-প্রীতির পরিচয় দিয়েছেন। গাছ-পালায় যেহেতু গতি ও অনুভূতির উপাদান অবর্তমানতাই তার শিকড়কে এত শক্তি দান করেছেন যেহাওয়ামাটিআলো ইত্যাদি সংযোগে সৃষ্ট প্রয়োজনীয় উপাদান সে সংগ্রহ করে তার শাখা-প্রশাখা শ্রেণীগত চাহিদা মোতাবেক বর্দ্ধন করে দেয়। পক্ষান্তরে জীব-জন্তু যেহেতু অনুভূতিশীলমর্জী মাফিক তারা চলতেও পারেতাই তাদের মাটি থেকে প্রয়োজনীয় উপাদান চুষে খাবার শিকড় দেয়া হয় নি। বরং তাদের আল্লাহপ্রদত্ত জ্ঞান হল এইঘাসপাতা ও পানি যেখানে পাবেখুঁজে ফিরে খাবে। এ ভাবে তাদের অন্যান্য প্রয়োজন মিটাবার বুদ্ধিও দেয়া হল। যে সব শ্রেণী মাটি থেকৈ পোকার মত জন্ম নেয় নাতাদের আল্লাহ তা'আলা সন্তান উৎপাদনধারণ প্রসব ও পালনের শক্তি দান করলেন। সন্তানদাত্রীর ভেতর এমন তরল পদার্থ দিলেন যা পেটের সন্তান পালনে ব্যয় হতে পারে। তারপর সেই তরল পদার্থকে দুধে পরিণত করা হল এবং বাচ্চাকে ইলহাম করা হল বুক চুষে তা পান করার জন্য। চোষার ফলে দুধ তার কণ্ঠনালী পেরিয়ে পাকস্থলীতে চলে গেল। 

তেমনি মুরগীর ভেতর এমন তরল পদার্থ দেয়া হয়েছে যা থেকে ডিম তৈরি হতে পারে। ডিম দেয়া শেষ হলে দেহের তরল পদার্থ শুকিয়ে যায় এবং পেট শূণ্য হয়ে যায়। তখন তার ভেতর এমন এক উন্মাদনা দেখা দেয় যেঅন্যান্য মোরগের সাথে মেলামেশা ভুলে সে ডিমে তা দিতে বসে থাকে। এর ফলে তার পেটের শূন্যতার অনুভূতি দূর হয়। 

কবুতর জুটির ভেতর অদ্ভুত ভালবাসা দান করা হয়েছে। কবুতরীর পেটের খোলসটিকে ডিমে তা দেয়ার জন্য উপযোগী করে রাখা হয়েছে। তার ভেতরকার বাড়তি তরল পদার্থকে বমি আকারে বাচ্চার ওপর অনুগ্রহে পরিণত করা হয়েছে। বমির মাধ্যমে সে দানা-পানি বাচ্চার উপযোগী করে খাওয়ার এবং কবুতরকে আকৃষ্ট করে তার পথ অনুসরণ করে বাচ্চাকে খোরাক জোগাবার জন্য। তেমনি বাচ্চার প্রকৃতিতে তরল পদার্থ দিয়ে পালক সৃষ্টির পথ করা হয়েছে। তার সাহায্যে যেন সে উড়তে পারে। 

মানুষের যেহেতু গতিঅনুভূতিজৈব তাড়না ও বুদ্ধি-বিবেকের প্রেরণা রয়েছেএমন কি বাড়তি জ্ঞান অর্জনের ক্ষমতাও তার রয়েছেতাই তাকে চাষাবাদ করাবৃক্ষ রোপনলেন-দেন ও ব্যবসা-বাণিজ্যের সহজাত জ্ঞান দেয়া হল। কিছু লোককে নেতৃত্ব-কর্তৃত্ব সুলভ ও কিছু লোককে দাসত্ব-আনুগত্য সুলভ স্বভাব দান করা হল। এক দলকে রাজকীয় স্বভাবের ও অন্য দলকে প্রজাসুলভ স্বভাবের অধিকারী করা হল। কাউকে আল্লাহতত্ত্বপ্রকৃতিতত্ত্বতর্কশাস্ত্র ও ব্যবহারিক শাস্ত্রের গভীর ও জটিল জ্ঞান দান করা হল। কাউকে আবার এমন নির্বোধ করা হয়েছে যেজ্ঞানী ব্যক্তির অনুসরণ করা ছাড়া তার নিজের কিছু বুঝবারই ক্ষমতা নেই। শহুরে হোক কিংবা গেঁয়োসবার ভেতরেই স্বভাবের ও ক্ষমতার এ বৈচিত্র্য বিদ্যমান। 

যা কিছু আলোচিত হল সবই মানুষের জৈবিক জীবন ও জীবসুলভ শক্তি সম্পর্কিত আলোচনা ও বিশ্লেষণ বৈ নয়। এখণ তার ফেরেশতাসুলভ শক্তির দিকে চলুন। এটাও আপনি জানেনমানুষ অন্যান্য জীবের মত নয়: বরং তাকে সকল জীবের চাইতে উত্তম পর্যায়ের জ্ঞান দান করা হয়েছে। তার সে জ্ঞানের বিভিন্ন শাখার ভেতর যেটাকে সবার অনুসরণ করতে হয়তা হচ্ছে তার জন্ম ও প্রতিপালনের উদ্দেশ্য ও কারণ সম্পর্কিত জ্ঞান। তারা তখন এটাও জেনে ফেলে যেসৃষ্টির এ বিশাল কারখানার একজন মহান পরিচালক রয়েছেন। তিনিই সবাইকে সৃষ্টি করেছেন এবং রুজী সরবরাহ করছেন। তাই তারা সবাই মিলে অন্তত হাবভাবে সেই মহান প্রতিপালক ও বিজ্ঞতম স্রষ্টার কাছে বিনয়াবনত থাকছে। এটাই হচ্ছে আল্লাহ পাকের নিম্ন আয়াতের তাৎপর্যঃ 

"(হে রাসূল) ! আপনি কি দেখেন না নতোমণ্ডলের বাসিন্দারাপৃথিবীর অধিবাসীচন্দ্রসূর্যনক্ষত্রপাহাড়গাছপালাচতুষ্পদ জন্তু এবং বহু সংখ্যক মানুষ আল্লাহর সমীপে বিনয়াবনত রয়েছেতবে বহু লোক এমনও রয়েছে যাদের ভাগ্যে (নাফরমানীর কারণে) রয়েছে নির্ধারিত শাস্তি (সূরা হাজ্জঃ আয়াত ১৮) 

লক্ষ্য করুনগাছের প্রতিটি অংশশাখাপাতাফুল তাদের বিজ্ঞতম স্রষ্টার সমীপে হাত পেতে রয়েছে। যদি সেগুলোর জ্ঞান থাকততা হলে স্রষ্টার প্রশংসায় মুখর থাকত এবং অধিক থেকে অধিকতর কৃতজ্ঞ হয়ে চলত। যদি কিছুটা বুঝ থাকততা হলে হাবভাবে প্রার্থনার বদলে কথা দিয়ে প্রার্থনা করত। 

এ থেকে এটাও জানা গেল যেমানুষ বড়ই বিজ্ঞ ও বুদ্ধিমান। তাই তারা হাবভাবে প্রার্থনার বদলে জ্ঞানপূর্ণ প্রার্থণা জানায়। মানব শ্রেণীর এটাও একটা বৈশিষ্ট্য যেতাদের ভেতরে কেউ না কেউ অবশ্যই সকল তত্ত্বজ্ঞানের উৎসের দিকে কায়মনে নিবিষ্ট থাকেন। সে ব্যক্তি সেই উৎস থেকে ওহীদিব্যজ্ঞান কিংবা স্বপ্নের মাধ্যমে আসল জ্ঞান শিখে নেন। অন্যান্য লোক তাঁর ভেতর পথের আলো ও পুণ্যের প্রভাব দেখে আল্লাহর আদেশ ও নিষেধের প্রতি অনুগত হয়ে থাকে। 

প্রত্যেকটি মানুষকে অদৃশ্য জগতের কথা জানার শক্তি দেয়া হয়েছে। হোক তা সে স্বপ্নের মাধ্যমে কিংবা দিব্যজ্ঞানের সাহায্যে অথবা গায়েবী আওয়াজ শুনে বা দূরদৃষ্টি প্রয়োগ করে জানুক। তবে এতটুকু তারতম্য অবশ্যই রয়েছে যেকিছু লোক এক্ষেত্রে পূর্ণতা লাভ করেন এবং কিছু লোক অপূর্ণ থাকে। অপূর্ণদের তাই পূর্ণতা প্রাপ্তদের (বুজর্গদের) শরণাপন্ন হতে হয়। এ ছাড়াও মানুষের কতগুলো বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা অন্যান্য জীবের ভেতর নেই। যেমনবিনয়পবিত্রতান্যায়পরায়ণতাদানশীলতাউদারতাপ্রার্থনালব্ধ ঐশী প্রভাব ইত্যাদি। এ ভাবের আরও কিছু অবস্থা রয়েছে। যেমন কারামত। 

মোট কথা যে সব বৈশিষ্ট্য মানুষকে জীবজগতে স্বাতন্ত্র্য দান করেছে তার সংখ্যা অনেক। তবে সবগুলোরই মূলে হল দুটি শক্তি। (১) জ্ঞান বা বোধশক্তি। এর দুটো শাখা। একটি শাখার ঝোঁক থাকে মানবিক কল্যাণ ও তার সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম দিকগুলোর দিকে। অন্যটির ঝোঁক রয়েছে আল্লাহর কাছ থেকে সরাসরি সব কিছু জানার দিকে। (২) পূর্ণাঙ্গ কর্মশক্তি। এরও দুটো শাখা রয়েছে। একটির সাহায্যে মানুষ নিজের ইচ্ছানুসারে ভাল বা মন্দ কাজ করে থাকে। পক্ষান্তরে জীব-জন্তুর ইচ্ছা-অনিচ্ছার বালাই নেই। ভাল বা মন্দ কাজের ভাবনাও তাদের স্বভাবে নেই। ভাল বা মন্দ কাজ দ্বারা তারা প্রভাবিতও হয় না। তারা তো জৈবিক প্রাণের তাগাদায় চলে ও তার থেকেই শুধু প্রভাবিত হয়। তাই পশুরা এ ক্ষেত্রে বেপরোয়া। কিন্তু মানুষ যখন কোন কাজ করেকাজ ফুরিয়ে গেলেও তার প্রাণ বা প্রভাব থেকে যায় এবং তা তার প্রবৃত্তির খোরাক হয়। ফলে হয় তা থেকে আত্মা আলোকময় হয় অথবা আঁধারের ম্লানিময় আচ্ছাদিত হয়। 

শরীয়ত মানুষকে স্বাধীন ইচ্ছা প্রয়োগ করে কাজ করার ক্ষেত্রেই শুধু জবাবদিহি করা হবে বলে শর্ত দিয়েছে। তার সাথে ডাক্তারের এ শর্তের মিল রয়েছে যেবিষ পানের ক্ষতি ও আফিমের উপকার পেতে হলে তা গিলে পেটে পৌঁছাতে হবে। আমি বলেছিমানুষের প্রবৃত্তি তার কাজের প্রভাব বা প্রাণশক্তি আহরণ করে এ বক্তব্যটি কোন না কোনরূপে আত্মিক সাধনা ও ইবাদতকে মানবকুলের সর্বসম্মত ভাবে ভাল বলে ঘোষণাই তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। কারণতাদের অনুসন্ধিৎসা এর আলোকময়তা সম্পর্কে জেনে ফেলেছে। 

তেমনি মানুষ সর্বসম্মত ভাবেই পাপাচার ও নাফরমানীকে খারাপ বলে জানে। কারণতাদের অনুসন্ধিৎসা তার তমসা ও ক্ষতি দেখতে পেয়েছে। জীব জগতে মানবের স্বাতন্ত্র্য সৃষ্টির দ্বিতীয় শক্তিটির দ্বিতীয় শাখা হল তার উন্নততর অবস্থা ও শ্রেষ্ঠতর মর্যাদা। এ অবস্থা ও মর্যাদা অন্যান্য জীবের নেই। যেমনআল্লাহপ্রীতি ও আল্লাহর নির্ভরতা। 

প্রকাশ থাকে যেপরিমিত স্বভাব মানুষের জাতিগত বৈশিষ্ট্য। অবশ্য তা নিম্ন জিনিসগুলো ছাড়া পূর্ণতা লাভ করতে পারে না। (১) উন্নততর ও উত্তম ব্যক্তির অর্জিত যে বিদ্যাগুলো অন্যান্য মানুষ অনুসরণ করেছেসে সব বিদ্যা অর্জন। (২) আল্লাহর যে বিধি-বিধানে আল্লাহর পরিচিতি এবং কল্যাণময় ব্যবস্থাদি রয়েছেসেই শরীয়ত। (৩) যে সব নীতিমালা মানুষের ইচ্ছাকৃত কার্য-কলাপ নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনের জন্য কার্যগুলোকে ফরজহারামমুস্তাহাবমুবাহ ও মকরুহ এ পাঁচ ভাগে বিভক্ত করেছেসেই নীতিশাস্ত্র। (৪) মানবতার ও মানবিক সভ্যতার পূর্ণ বিকাশ ঘটানোর উপায় উপকরণাদি। 

আল্লাহ তা'আলার অনুগ্রহ ও কলাকৌশল পবিত্র অদৃশ্য জগতে থেকে ব্যক্তি বিশেষকে সব চাইতে মেধাবী ব্যক্তির উপযোগী জ্ঞান দান করে তাঁর দিকে আকৃষ্ট করে। তখন তাঁর কাছ থেকে সে ব্যক্তি উপরোক্ত জ্ঞান অর্জণ করে নেয়। তারপর অন্যান্য ব্যক্তিরা তাকে অনুসরণ করে। মধুমক্ষিকার ঝাঁক যেভাবে তাদের রাজ মক্ষিকা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়এও তেমনি ব্যাপার। যদি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে রাজ মক্ষিকাকে সেই শক্তি না দেয়া হততা হলে মধুমক্ষিকার ঝাঁকের এ গৌরবজনক কীর্তিকলাপ সম্ভব হত না। 

সে ভাবে কেউ যখন দেখে যেকোন জন্তু ঘাস ছাড়া বাঁচে নাতখন সে অবশ্যই বিশ্বাস করেতার জন্য কোন না কোন চারণ ক্ষেত্র সৃষ্টি করে রাখা হয়েছে। ঠিক সেভাবেই আল্লাহ পাকের কলা-কৌশল নিয়ে যারা চিন্তা-ভাবনা করেতারা অবশ্যই বিশ্বাস রাখে যেআল্লাহ তা'আলা নিশ্চয়ই এমন কতক বিদ্যা কোথাও না কোথাও দান করে রেখেছেন যার সাহায্যে মানুষ তার জ্ঞানগত অভাব অভিযোগ দূর করে পূর্ণত্ব লাভ করতে পারে। 

মোটকথা এ সব বিদ্যার অন্যতম হল স্রষ্টার একত্ব ও গুণাবলী সম্পর্কিত জ্ঞান। এ বিদ্যাটি এরূপ সুস্পষ্টভাবে বিশ্লেষিত হওয়া উচিত যা প্রত্যেকেই উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়। এরূপ জটিল ও অস্পষ্ট করে তা আলোচনা করা ঠিক নয় যা কারো পক্ষেই জানা ও বুঝা সম্ভব হয় না। তাই সে বিদ্যার বিশ্লেষণ আল্লাহ তাআলা তাঁর পরিচিতির মাধ্যমে দিয়েছেন। 

যেমন তিনি বলেনঃ সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি। সুতরাং তিনি এমন গুণ নিয়ে রয়েছেন যা মানুষ জানে। তারা নিজেরা সেগুলো ব্যবহারও করে। যেমনতিনি চিরঞ্জীবতিনি দেখেনশুনেনক্ষমতা রাখেনইচ্ছা রাখেনকথা বলেনরাগ হনঅসন্তুষ্ট হনদয়া দেখানমালিকানা রাখেনমুখাপেক্ষী হন না ইত্যাদি। সঙ্গে সঙ্গে এটাও প্রমাণ করে দিয়েছেন যেতাঁর এ গুণাবলীর সমকক্ষতা করার ক্ষমতা কারো নেই। সুতরাং তাঁর জীবনদেখা-শুনাক্ষমতাইচ্ছাকথা বলা ইত্যাদি আমাদের কারো মত নয়। এ ভাবে তাঁর প্রত্যেকটি গুণই আমাদের থেকে স্বতন্ত্র ধরনের। 
সেই অতুলনীয়তার ব্যাখ্যা হল এইমরুভূমির বালুবৃষ্টির বিন্দু কিংবা সব গাছপালার পাতা অথবা সকল জীবের শ্বাসপ্রশ্বাস গণনার মতই অসম্ভব ব্যাপার হল আল্লাহর গুণ আমাদের কারো ভেতরে পাওয়া। তিনি তো আঁধার রাতের গর্ভের পিপীলিকার চাল-চলন দেখেন এবং বদ্ধকোঠায় লেপের নিচে কে কি ফাস করে তাও শোনেন। সব গুণের ক্ষেত্রেই তাঁর এ শ্রেষ্ঠত্ব ও অতুলনীয়তা। 

এ বিদ্যার বিভিন্ন শাখার ভেতর রয়েছেউপাসনা পদ্ধতিজীবন ধারণ পদ্ধতিআলোচনা ও সমালোচনা পদ্ধতিসত্য ও ন্যায়ের পথে নিম্নস্তরের লোকের সন্দেহ সংশয় নিরসন বিদ্যাইতিহাস ও বর্ণনা শাস্ত্র (যে বিদ্যায় আল্লাহর অনুগ্রহঅভিলাষকবরহাশর ইত্যাদির বর্ণনা এবং একই মানুষকে বংশানুক্রমে যুগে যুগে আল্লাহ যে যোগ্যতা ও বিবেক-বুদ্ধির পূর্ণত্ব দান করেছেন তার বর্ণনা থাকে) এ সব বিদ্যা অদৃশ্য জগতের অদৃশ্যতম রহস্যের জ্ঞান সমৃদ্ধ মহাজ্ঞানীরা ভেতরেই সীমিত ও সমন্বিত হয়েছিল। এ অবস্থাটিকে আশায়েরা সম্প্রদায় কালামে নফসী’ বা আদি বাক্য আখ্যা দান করেছে। এটা হল জ্ঞানইচ্ছা ও শক্তি ভিন্ন অন্য কিছু। তারপর যখন ফেরেশতা সৃষ্টির মুহুর্ত এলআল্লাহ তা'আলা জানতে পেলেনফেরেশতা সৃষ্টি ছাড়া মানুষের কল্যাণের কাজ সুসম্পন্ন হবে না। জ্ঞানের বিভিণ্ন শাখার মতই ফেরেশততারা মানুষের ভেতর জড়িয়ে ও ছড়িয়ে থাকবে। সুতরাং ফেরেশতাদের তিনি মানুষের প্রতি রহমত হিসেবে সৃষ্টির উদ্দেশ্যে কুন’ (হয়ে যাও) বলা মাত্র হয়ে গেল। তখন তাদের ভেতর অদৃশ্য জগতের অদৃশ্যতম তত্ত্বজ্ঞানীর ভেতর সীমিত ও সমন্বিত জ্ঞানের কিছুটা ঝলকানী দেয়া হল। ফলে তারা আত্মিক জীব হয়ে আত্মপ্রকাশ করল। আল্লাহ পাক এদের ব্যাপারেই বললেন, ‘আরশ বাহী ও তাদের পার্শ্বচররা’ ইত্যাদি।

তারপর যখন শাস্ত্রীয়ধর্মীয় ও জাতীয় পরিবর্তনের মুহুর্ত এলতখন আল্লাহর কৌশলগত প্রয়োজন দেখা দিল কিছু আত্মিক জিনিসের অস্তিত্ব দানের। তখন সে সব জ্ঞান যুগের প্রয়োজন অনুসারে বিস্তারিত ও বিশ্লেষিত হয়ে প্রকাশ পেল। সে সম্পর্কেই আল্লাহ বললেনঃ 
আমি এ জ্ঞানভাণ্ডার (কুরআন)-কে এক কল্যাণময় রাতে অবতীর্ণ করেছি। আমি সতর্ককারী (পূর্বাভাস দাতা) ছিলাম।(সূরা দুখানঃ আয়াত ৩-৪)
এ রাতেই সব হিকমতপূর্ণ ব্যাপার আমার দরবার থেকে নির্দেশ (অর্ডিন্যান্স) আকারে মীমাংসিত ও বণ্টিত হয়

***[উক্ত আয়াতে (لَیۡلَۃٍ مُّبٰرَکَۃٍ)  অর্থাত মোবারকময় রাত বলতে আলেমদের মধ্যে মতভেদ আছে। অনেক আলেম এই রাতকে 'কদরের' রাত বলেছেন অনেকে আবার 'বরাতে'-এর রাতের উল্লেখ করেছেন। কুরআন ও ্হাদিসের আলোকে দু'টি রাতই মোবারকময় রাত এতে কোন সন্দেহ নেই]*** অত্র তারকার মধ্যস্ত লাইন কয়টি বইএর অংশ নয়।

তারপর আল্লাহর কৌশলগত প্রয়োজন এক পুণ্য ও পূত চরিত্রের ব্যক্তিকে নবী হিসেবে মনোনীত করলেন। তাঁকে ওহী ধারণের যোগ্যতাও দান করলেন। এ জন্য উচ্চ স্তর ও উন্নত মর্যাদা নির্দিষ্ট করা হল। যখন তা পাওয়া গেলতখনই মনোনয়ন দেয়া হল এবং উদ্দেশ্য সফলের জন্য তাকে আল্লাহ মাধ্যম বানালেন। তার ওপর নিজ গ্রন্থ অবতীর্ণ করলেন। তাঁকে অনুসরণ করা মানুষের জন্য ফরজ করে দিলেন। হযরত মুসাকে (আঃ) লক্ষ্য করে আল্লাহ তাআলা এ তথ্যই ব্যক্ত করেছেনঃ “(হে মুসা!) আমি আপনাকে আমার (কাজের) জন্য মনোনীত করলাম 
সুতরাং অদৃশ্য জগতের অদৃশ্যতম তত্ত্ব জ্ঞানীর মানুষের জন্য এ সব অমূল্য বিদ্যা নির্ধারিত করে রাখা মানুষের প্রতি তাঁর অপর অনুগ্রহের পরিচয় দেয়। তারপর মানুষের সেবার জন্য ফেরেশতা সৃষ্টি করা মানুষেরই যোগ্যতার প্রতি ইংগিত দান করে। মানুষেরই বিভিন্ন যুগের ভিন্ন ভিন্ন অবস্থাই আল্লাহর বিধানকে পরিবর্তিত ও পরিবর্ধিত করে করে পূর্ণতা দান করেছে। ফলে মানুষের ওপর আল্লাহর (তরফের) দলীল-প্রমাণসুদৃঢ় ও বিজয়ী হল। 

এরপর যদি কেউ প্রশ্ন করেনামায কোত্থেকে ফরজ হলরাসূলের আনুগত্য কি করে ওয়াজিব হলচুরি ও ব্যভিচার কোথায় হারাম হলজবাবে বলবযেখান থেকে গরু ছাগরের ঘাস খাওয়া ফরজ ও মাংস খাওয়া হারাম করা হয়েছেমানুষের ফরজ হারামও সেখান থেকে করা হয়েছে। তেমনি যেখান থেকে মক্ষিকার ঝাঁকের জন্য রাজ মক্ষিকাকে অনুসরণ করা ওয়াজিব করা হলসেখান থেকেই মানুষের জন্য নবীকে অনুসরণ করা ওয়াজিব করা হয়েছে। হ্যাঁতফাত এতটুকু যেপশু-পাখীর জন্য ফরজ হারাম হয় প্রকৃতিগত ইলহামের দ্বারা এবং মানুষ সাধনা লব্ধ ওহীর ও দিব্যজ্ঞানের মাধ্যমে ফরজ হারামের সন্ধান পায়। তারপর অন্যান্যরা পায় ওহীপ্রাপ্ত ব্যক্তির অনুসরণের মাধ্যমে।

অষ্টম পরিচ্ছেদ 

হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (৬) দায়িত্ব তত্ত্ব



📚 হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (পর্ব-৬)
✍🏻শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ্ মুহাদ্দেসী দেহলভী (রহঃ)

দায়িত্ব তত্ত্ব-
আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ 
আমি নভঃমণ্ডলীপৃথিবী ও পাহাড়-পর্বতের সামনে আমার আমানত পেশ করলাম। তারা সে দায়িত্ব বহন করতে অস্বীকার করল। তারা ভয় পেয়ে গেল। অথচ মানুষ সে দায়িত্ব নিল। কারণতারা বড়ই জালিম ও জাহিল। এটা এ কারণেই ঘটল যেআল্লাহ মুনাফিক ও মুশরিক নর-নারীকে শাস্তি দেবেন এবং মুমিন নর-নারীকে অনুগ্রহীত করবেন। আল্লাহ বড়ই ক্ষমাশীল ও দয়ালু (সূরা আহযাবঃ আয়াত ৭২-৭৩)

ইমাম গাজ্জালী ও ইমাম বায়জারী (রঃ) প্রমুখ এটা সুস্পষ্ট করে দিয়েছেন যেএ আয়াতের আমানত’ অর্থ হল আল্লাহ দত্ত দায়িত্ব। আকাশ ও পৃথিবীর অন্য সবাই সভয়ে এ দায়িত্ব পারিহার করেছে। মানুষ এ দায়িত্ব বুঝে নেয়ার কারণেই আল্লাহর আনুগত্যের জন্য যেমন পুরস্কার পাবেতেমনি তাঁর নাফরমানীর জন্য শাস্তিও পাবে। অন্যান্যের কাছে এ দায়িত্ব পেশ করার উদ্দেশ্য হল তাদের যোগ্যতা যাচাই করে নেয়া। তাদের অস্বীকার থেকে প্রমাণিত হয়এত বড় গুরুদায়িত্ব বহনের শক্তি ও সাহস তাদের নেই। মানুষ তা গ্রহণ করে নিজেদের যোগ্যতম বলে প্রমাণ দিল। 

এ ক্ষেত্রে আমার বক্তব্য এইএখানে আল্লাহ পাকের মানুষ বড়ই জালিম ও জাহিল’ মন্তব্যটি মানুষের যোগ্যতার কারণ ইংগিত করেছে। জালিম তাকেই বলা হয়ইনসাফ করার যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি জুলুম করে। তেমনি জাহিল তাকেই বলা যায়জ্ঞানার্জনের যোগ্যতা নিয়ে যে ব্যক্তি মূর্খ থাকে। বস্তুত মানুষ ছাড়া সব সৃষ্টিই হয় শুধু আলিম ও আদিল। তাদের ভেতরে অত্যাচার ও মূর্খতার কোন স্থানই নেই। যেমনফেরেশতা। নয় তারা শুধুই জালিম ও জাহিল। ইলম ও আদলের কোন যোগ্যতাই তাদের নেই। যেমন চতুষ্পদ জন্তু। সুতরাং উক্ত আমানত গ্রহণের যোগ্যতা কেবল তাদেরই থাকতে পারে যাদের ক্ষমতা প্রকৃতিজাত নয়উপার্জনক্ষম। তারপর আয়াতে ( لِّیُعَذِّبَ) শব্দের লাম’ পরিণতি অর্থে এসেছে। অর্থাৎ দায়িত্ব গ্রহণের পরিণতি হল সুখ ও দুঃখ। 

এক্ষণে যদি আপনি সঠিক ব্যাপার বুঝতে চানতা হলে প্রথমে ফেরশতার কথাই খেয়াল করুন। ফেরেশতাদের না আছে ক্ষুৎ-পিপাসানা ভয়-ভাবনা। তেমনি জৈবিক লালসারাগঅহংকার ইত্যাকার বলতে কিছুই নেই। তাদের রুজী রোজগার কিংবা স্বাস্থ্য রক্ষার বালাই নেই। এক কথায় জীবজগতের কোন প্রয়োজনেরই তাদের পরোয়া নেই। তারা থাকেন। তাই কোন বাঞ্ছিত বিধান প্রবর্তনের কিংবা বিরূপ বা অনুকূল মনোভাব গ্রহণের ঐশী নির্দেশ পাওয়া মাত্র সংগে তারা মনে-প্রাণে তা বাস্তবায়নের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েন।

এবারের পশুদের কথা খেয়ার করুন। সেগুলোর অবস্থা শোচনীয়। কতশত মন্দ স্বভাবের পশুদের সাথে তারা আষ্টেপিষ্টে জড়িত। তারা জৈবিক আনন্দ ছাড়া কিছুই বুঝেনা। তাই বস্তুগত স্বার্থভোগ-লালসা ও উত্তেজনার উত্তাল তরংগে তারা ডুবে থাকে। 
অবশেষে মানুষের দিকে লক্ষ্য করুন। আল্লাহ তা'আলা তাঁর পরিপূর্ণ কৌশল প্রয়োগ দ্বারা মানুষের ভেতর পরস্পর বিরোধী দুটো শক্তিরই সমাবেশ ঘটিয়েছেন।
(১) ফেরেশতা প্রকৃতি (বিবেক)। এ প্রকৃতি মানুষের মৌলিক প্রাণ থেকৈ প্রেরণা পায় এবং সেই প্রাণ থেকে তার মৌলিক প্রাণকে অহরহ প্রেরণা যোগায় (যৌগিক প্রাণ মানুষের গোটা দেহে ছড়িয়ে থাকে)। মৌলিক প্রাণের প্রেরণা গ্রহণই ফেরেশতা প্রকৃতির বৈশিষ্ট্য এবং তার ওপরেই সে প্রেরণা প্রাধান্য বিস্তার করে। 
(২) পশু প্রকৃতি (প্রবৃত্তি অন্য সব পশুর ভেতর যে জৈব প্রবৃত্তি রয়েছে সেটাই মানুষের পশু প্রকৃতির ভিত্তি ও উৎস। যে চার উপাদানের মানুষের যৌগিক প্রাণের সৃষ্টিএ প্রকৃতিতেও তা বর্তমান। পশু প্রকৃতি সম্পূর্ণ স্বাধীণ হয়। মৌলিক প্রাণও তার নির্দেশ মেনে নেয়। 
এও স্মরণ থাকা চাইএ দুই শক্তির ভেতর পারস্পরিক দ্বন্দ্ব চলে। কখনও বিবেক প্রবৃত্তিকে ওপরে টানতে চায়। কখনও আবার প্রবৃত্তি বিবেককে টেনে নিচে নামাতে চায়। সেক্ষেত্রৈ বিবেক পরাজিত হলে প্রবৃত্তির প্রভাব প্রকাশ পায় এবং প্রবৃত্তি পরাজিত হলে বিবেকের প্রভাব প্রকাশ পায়। আল্লাহ তা'আলা তো দুটোই প্রকাশের সযোগ দেন। উপার্জণকারী যেটাই উপার্জন করতে চায়তিনি সাধারণত সেটা দেন। যদি কেউ পশু স্বভাবের প্রাধান্য দিতে চায়আল্লাহ তার পথ খুলে দেন। পক্ষান্তরে কেউ যদি ফেরেশতা প্রকৃতির প্রাধান্য রাখতে চায়আল্লাহ পাকও তাকে তার ব্যবস্থা করে দেন। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ 
আল্লাহর পথে যে ব্যক্তি দান করে ও আল্লাহকে ভয় করে এবং ন্যায় কাজকে সমর্থন করেআমি তার জন্য পূণ্য কাজ সহজ করে দেই। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি কার্পণ্য করে ও আল্লাহকে ভয় করেনা এবং সত্যপথকে মিথ্যা বলে আখ্যায়িত করেআমি তার জন্য পাপ কাজ সহজ করে দেই (সুরা লাইলঃ ৫-১০)

অন্যত্র আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ 
(হে রসুল) আপনার প্রভুর অবদানে আমি দলমত নির্বিশেষে ধন্য করে থাকি। এদলকেও দেইও দলকেও দেই। কারণআপনার প্রভু ইহলোকে তাঁর দান-দাক্ষিণ্য কারো জন্য বন্ধ রাখেন না (সুরা বনি ইসরাইল : আয়াত- ২০)

প্রত্যেক শক্তি বা প্রকৃতিতেই সুখ ও দুঃখ রয়েছে। নিজ প্রকৃতির অনুকূল ব্যাপারের অনুভূতিকে বলে সুখ এবং প্রতিকূল ব্যাপার সহ্য করার নাম দুঃখ। দেখুনমানুষকে যখন অবশ (ক্লোরোফর্ম) করার মত কিছু প্রয়োগ করা হয়তখন কোন কিছুই তাকে কষ্ট দিতে পারে না। যদি তার কোন অংগ আগুনে জ্বালানো হয় তা সে টের পাবেনা। কিন্তু যখন তার অবশ অবস্থা কেটে যায়এবং পুনরায় অনুভূতি ফিরে আসে তখন কিরূপ কষ্ট দেখা দেয় তাও জানেন। 

মানুষের অবস্থার সাথে গোলাপ ফুলের বেশ সাদৃশ্য রয়েছে চিকিৎসকরা বলেছেনতার ভেতর তিনটি শক্তি বিদ্যমান। একমৃত্তিকা প্রকৃতি। ঘষে দিয়ে গায়ে লাগালে তা প্রকাশ পায়। দুইজলীয় প্রকৃতি। চিপে পান করলে তা জানা যায়। তিনবায়বীয় প্রকৃতি। তার পরিচয় ঘ্রাণেই মিলে। 

এ সব আলোচনা থেকে জানা গেলমানুষের যোগ্যতাই দায়িত্ব দাবী করে। সুতরাং আল্লাহ তাদের যে দায়িত্ব দিয়ে জবাবদিহির ব্যবস্থা করেছেন সেটা তাদের দাবীরই অনুকূল। তেমনি তাদের ভেতরকার ফেরেশতা প্রকৃতি (বিবেক) এ দাবীই জানায়তার অনুকূল ও উপযোগী কাজগুলো তার জন্য ফরজ (অপরিহার্য) করা হোক এবং প্রতিকূল ও অনুপযোগী পশু প্রকৃতির কাজগুলো হারাম (অবৈধ) করা হোক। তা হলেই সে শাস্তি থেকে বেঁচে গিয়ে শান্তি লাভ করতে পারবে। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

 সপ্তম পরিচ্ছেদ--

হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (৫) প্রাণের রহস্য



📚 হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (পর্ব-৫)
✍🏻শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ্ মুহাদ্দেসী দেহলভী (রহঃ)

প্রাণের রহস্য 
আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ 
“(হে রসূল) তারা (ইয়াহুদীরা) আপনার কাছে প্রাণের রহস্য জানতে চাইছেআপনি বলে দিনপ্রাণ আল্লাহর নির্দেশ বৈ কিছুই নয় বরং তোমাদের খুব নগণ্য জ্ঞানই দান করা হয়েছে। (সূরা বনী ইস্রাঈলঃ আয়াত ৮৫) 
ইবনে মাসউদের বর্ণনায় তিনি (আউতিতুম) স্থলে (ওআ'তু) পাঠ করেছেন। তার অর্থ দাঁড়ায় তাদের নগণ্য জ্ঞান দেয়া হয়েছে। এই তাদের’ থেকে বুঝা যায়প্রশ্নকারীরা ইহুদী ছিল। তা ছাড়া এ আয়াত থেকে সুস্পষ্ট প্রমাণ মিলেনা যেমুসলমানদের কেউ প্রাণের রহস্য জানতেন না। কিছু লোকের অবশ্য সেরূপ ধারণা রয়েছে। শরীয়ত প্রবর্তক যে ব্যাপারে চুপ ছিলেনসে ব্যাপারে কারো কিছু জানা সম্ভবই নয়এটা ভুল কথা। বরং কোন কোন ক্ষেত্রে শরীয়ত দাতা এ জন্য নীরব ভূমিকা নিয়েছেন যেসেরূপ সূক্ষ্ম ও জটিল বিষয় দুচারজনে বুঝলেও সর্ব সাধারণের বোধগম্য হবেনা।
আপনার জানা প্রয়োজনপ্রাণের রহস্য আপনি সর্বপ্রথম যতটুকু বুঝতে পারেন তা হল এইপ্রাণী জগতের আয়ুস্কালের ভিত্তি ও উৎসই হল প্রাণ। যতক্ষণ তা যে প্রাণীর দেহে অবস্থা করেসেটা জীবিত থাকে এবং যখনই প্রাণ দেহ ছেড়ে চলে যায়প্রাণীটি মারা যায়। 
আরও একটু গভীরে তলিয়ে দেখতে পাবেনদেহের ভিতর সূক্ষ্ম ও হালস্কা উষ্ণতার অস্তিত্ব মিলে। রক্তপিত্তকফ ইত্যাকার দেহের চার চীজের নিখুঁত ও নির্ভুল সংমিশ্রণে তা কলবের ভিতর জন্ম নেয়। তারপর তা অনুভূতিগতি ও বোধ শক্তির ধারককে (দেহকে) রুজীর আহরণে বয়ে চলে এবং তাতে চিকিৎসাদিরও দখল থাকে। 
অভিজ্ঞতা থেকে আরও জানা যায়সেই উষ্ণ পিণ্ড হাল্কা ও ভারী এবং পরিচ্ছন্ন ও অপরিচ্ছন্ন হওয়া নির্ভর করছে উপরি বর্ণিত শক্তিগুলোর ওপর। উক্ত শক্তিগুলো থেকে যে প্রক্রিয়া সৃষ্টি হয়তার প্রতিক্রিয়া সেটার ওপর প্রভাব বিস্তার করে। 
এ জানা যায়যখন সেই উষ্ণপিণ্ডের জন্ম ও রূপ লাভের সাথে সংশ্লিষ্ট কোন অংগে কোন বিপত্তি দেখা দেয়তখন উষ্ণপিণ্ডেও গোলযোগ দেখা দেয়। এও জানা যায় উষ্ণ পিণ্ডের জন্ম লাভ জীবনের ও মিটে যাওয়া মৃত্যুর কারণ হয়। ভাসা ভাসা দৃষ্টিতে তো মনে হয় এ উষ্ণ পিণ্ডই প্রাণ। কিন্তু যদি গভীর দৃষ্টিতে লক্ষ্য করা যায়তাহলে বুঝা যায়সেটা প্রাণের নিম্নতম স্তর মাত্র। ফুলের সাথে ঘ্রাণের যে সম্পর্ক কিংবা আগুনের সাথে কয়লারশরীরের সাথে তার ততটুকু সম্পর্ক। 

আরও গভীরে তলিয়ে দেখলে বুঝা যায়এ উষ্ণপিণ্ড প্রাণ নয়বরং মূল প্রাণের ধারক বা খোলস এবং শরীরের সাথে তার সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে বস্তু। তার প্রমাণ হল এইআমরা বারংবার দেখছি শিশু যুবক এবং যুবক বৃদ্ধ হয়। তেমনি তার শরীরের মৌল উপাদান রক্তকফপিত্ত ইত্যাদি পরিবর্তন হয়ে চলে। তাই তার সংমিশ্রণে যে প্রাণের অস্তিত্ব দেখতে পাই তা আগের চাইতে বহুগুণ বেড়ে যায়। আবার দেখিশিশু ছোট থেকে বড় হয়কালো কিংবা সাদা হয়আলেম কিংবা জাহেল হয়। এভাবে তার অবস্থার বহুবিধ বিবর্তন ঘটেঅথচ ব্যক্তিত্বটি একই থেকে যায়। 

এখানে যদি কেউ (তার অবস্থা পরিবর্তন হওয়া বা না হওয়া নিয়ে) তর্ক-বিতর্ক চালায় তো আমি জবাবে বলবএ পরিবর্তনটি আমি ধরে নিয়েছি মাত্র। নইলে এতে তো সন্দেহ নেই যেতার অবস্থার প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হতেই থাকে। অথচ ব্যক্তিটি একই থেকে যায়। কিংবা এ ভাবে জবাব দেব যেশিশুটির নিজ অবস্থানে বহাল থাকা তো মেনে নেবকিন্তু তার অবস্থা নিজ অবস্থানে বহাল থাকতে পারেনা। এ থেকেই প্রমাণিত হলশিশুটি আসল বস্তু ও তার অবস্থা নকল বস্তু। 

সুতরাং এটাই সুপ্রমাণিত হলযে বস্তুর অস্তিত্ব মানুষকে জীবিত রাখে তা উক্ত প্রাণ বা উষ্ণপিণ্ড নয়। তেমনি দেহ তো নয়ই। ব্যক্তিত্বটিও নয়যা বাহ্যত মনে হয়। বরং প্রাণ হল সংমিশ্রণ মুক্ত একক ও স্বতন্ত্র এক জিনিস। তা হল এমন এক নূর বিন্দু বা আলোকপিণ্ড যা পরিবর্তনশীল অবস্থা কিংবা বিভিন্ন পদার্থের সংমিশ্রণ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ও স্বতন্ত্র। এ আসল প্রাণ সত্তাটি ছোট ও বড়রকালো ও সাদার ও অন্যান্য বিপরীত ধর্মী বিভিন্ন অবস্থার ভেতর একই রকম থাকে। কোনরূপ বিবর্তন বা বিভক্তি স্বীকার করেনা। 

অবশ্য সেই আসল প্রাণ সত্তার সম্পর্ক (বাহ্য দৃষ্টির প্রাণ সত্তা) তাপপিণ্ডের সাথেই রয়েছে। সেটার কারণেই দেহের অস্তিত্ব বিরাজমান থাকে। কারণদেহ তো উষ্ণপিণ্ড সৃষ্টির চার উপাদা থেকেই অস্তিত্ববান। পক্ষান্তরে মূল প্রাণ জগতের এমন একটি খিড়কী যে পথে সে যে যে উপাদানে জড় প্রাণের সৃষ্টি তা সবই সেখান থেকে পেয়ে যায়। এখন থেকে গেল বিবর্তনের বিবরণী। পার্থিব উপাদানের সেটাই স্বভাব। দেখুনরোদ ও রোদের তাপ ধোপার ধোয়া কাপড় শুকিয়ে সাদা করেঅথচ ধোপাকে পুড়ে কালো করে। এও তেমনি ব্যাপার। 

আমরা বিশুদ্ধ মন ও মননের এটাই সিদ্ধান্ত যেদেহে যদি জড় প্রাণের উৎপাদন শক্তি না থাকেতাহলে জড় প্রাণ সেখান থেকে বিদায় নেয়। এরই নাম মৃত্যু! জড় প্রাণ থেকে মূল প্রাণের নাম মৃত্যু নয়। তাই যখন ধ্বংসকারী ব্যাধিতে জড় প্রাণ তথা তাপপিণ্ড হাওয়া হয়ে যায়তখনও আল্লাহর কৌশলগত কারণে মূল প্রাণ দেহের সাথে সম্পর্ক রেখে চলে। আপনি যদি কোন শিশির বায়ু ষোল আনা বের করে ফেলার জন্য আপ্রাণ প্রয়াস চালানএমনকি বায়ু আকর্ষণ করতে গিয়ে শিশি ভেংগে ফেলারও উপক্রম করেনতথাপি তাতে কিছু না কিছু বায়ু থেকেই যাবে। তা আবার শিশিতে ছড়িয়ে জড়িয়ে যাবে। এটুকুই তো বায়ু প্রকৃতির গূঢ়তম রহস্য বা অপরিবর্তনীয় ও অখণ্ড সত্তা। তেমনি যৌগিক প্রাণের মূলেও এক রহস্যময় অপরিবর্তনীয় ও অবিভাজ্য সত্তা রয়েছে এবং সেটাই মৌলিক প্রাণ। 
মৌলিখ প্রাণের নির্ধারিত এক সীমা ও পরিমাপ রয়েছে। তার ব্যতিক্রম হতে পারে না। মানুষ যখন মারা যায়তখন তার যৌগিক প্রাণ অন্যরূপ ধারণ করে। তখন মৌলিক প্রাণের কারণে তার যৌথ অনুভূতির যতটুকু অবশিষ্ট থাকেছাড়া জগতের সাহায্যে তা এরূপ শক্তি অর্জন কর যেদেখাশোনা ও কথা বলার সব কাজই তাতে সম্ভব হয়। অর্থাৎ দেহ তখন এক অবচেতন মনের অধিকারী হয়। 
নভোমণ্ডলীতে একই ধরনের শক্তি কাজ করছে। তাই যৌগিক প্রাণ ছায়াজগতের প্রভাবে আলো কিংবা আঁধারের পরিচ্ছদে ভূষিত হওয়ার ক্ষমতা লাভ করে। এ থেকে অন্তর্বর্তী জগতের (আলমে বরযখ) অদ্ভুত ঘটনাবলী সম্ভব হয়। তারপর যখন ইস্রাফীলের শিংগায় ফুঁক দেয়া হবে (যেভাবে শিংগায় সুর ধ্বনি দিয়ে দেহজগতে প্রাণের সঞ্চার ঘটিয়ে সৃষ্টির ধারা অব্যাহত রাখার স্থায়ী ব্যবস্থা করা হয়েছিল) তখন মৌলিক প্রাণের (আমরুল্লাহ) প্রভাবে সেটাকে দেহরূপ ভূষণ কিংবা ছাড়া ও কায়াজগতের মাঝামাঝি ধরনের এক দেহে দান করা হবে। 
তারপর থেকে শুরু হবে সত্য সংবাদ দাতার সংবাদগুলোর এককের পর এক বাস্তবায়ন। যেহেতু যৌগিক প্রাণের সংযোগ রয়েছে মৌলিক প্রাণের সাথেতাই এ প্রাণ ইহ ও পরকাল দুটোর প্রভাব লাভ করবে। আত্মিক জগতের সাথে সংযোগ তার ভেতর ফেরেশতাসুলভ স্বভাব জন্মাবে এবং জড় জগতের প্রভাব তার ভেতর পশুসুলভ স্বভাবের উদ্ভব ঘটাবে। 

প্রাণ (রূহ) তত্ত্ব সম্পর্কে ভূমিকা আলোচনা করেই আমার ক্ষান্ত হওয়া উচিত। এ বিষয়ের এ মূল তত্ত্বটুকু মেনে নেয়ার পর এর শাখা-প্রশাখা বিন্যাস ও বিভিন্ন প্রশ্নের সমাধান প্রয়োজন। আর তা এর চাইতে কোন উন্নততর বিষয়ের আলোচনায় প্রসংগত এর সব রহস্যজাল ছিন্ন হবার আগেই হওয়া চাই।

হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (৪) আল্লাহর অনড় বিধান



📚 হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (পর্ব-৪)
✍🏻শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ্ মুহাদ্দেসী দেহলভী (রহঃ)

আল্লাহর অনড় বিধান -
আল্লাহর প্রকৃতিতে তুমি কোন পরিবর্তন দেখতে পাবেনা(সূরা আহযাবঃ ৬২)
কুরআনের উক্ত আয়াতের ওপর এ অধ্যায়ে আলোচা করা হবে।

এ কথা সুস্পষ্ট যেসৃষ্টি জগতে আল্লাহর কিছু কাজ তাঁর প্রবর্তিত কোন না কোন প্রাকৃতিক শক্তির ভিত্তিতে বিন্যস্ত হয়ে থাকেন। উদ্ধৃতি ও যুক্তিবুদ্ধি উভয় থেকেই এর সমর্থন মিলে। মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেনআল্লাহ তা'আলা গোটা দুনিয়ার এক মুষ্টি মাটি দিয়ে আদমকে তৈরী করেছেন। এ কারণে আদম সন্তান লালকালো কিংবা দুয়ের মাঝামাঝি বর্ণের এবং নম্র বা রুক্ষ ও ভাল বা মন্দ প্রকৃতির হয়ে থাকে। 
একবার আবদুল্লাহ ইবনে সালাম রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-কে প্রশ্ন করলেনহে আল্লাহর রাসূল ! বাচ্চা কি ভাবে মা কিংবা বাপের অনুরূপ হয়তিনি (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) জবাব দিলেনযদি বাপের বীর্য অগ্রগামী হয়তা হলে বাপের অনুরূপ হয় এবং মায়ের বীর্য অগ্রগামী হলে মায়ের অনুরূপ হয়। তেমনি সবাই জানেবিষ পানে কিংবা তরবারীর ঘায়ে মানুষকে মৃত্যু ঘটে। মায়ের জরায়ুতে বীর্য প্রবিষ্ট হলে সন্তান জন্ম নেয়। তরকারী ও গাছ পালা কর্ষণ ও পানি সিঞ্চনে উৎপন্ন হয়। ঠিক এ শক্তির উপস্থিতির কারণেই মানুষকে (শরীয়তের) দায়িত্ব চাপানো হয়েছে। আদেশ ও নিষেধের মাধ্যমে তাদের পুরস্কার ও তিরস্কারের যোগ্য বিবেচনা করা হয়েছে। আল্লাহর সৃষ্ট ও প্রাকৃতিক শক্তি কয়েক শ্রেণীতে বিভক্ত। (১) যে শক্তি জড় উপাদানের গুণাগুণ (তাপশুষ্কতাআর্দ্রতা ইত্যাদি) সৃষ্টি করে। (২) রূপান্তর ও শ্রেণীভেদের ক্ষেত্রে আল্লাহ পাক যে শক্তিকে সক্রিয় রেখেছেন। (৩) যে শক্তি জগজগতে আত্মপ্রকাশের পূর্বে ছায়া জগতে সব কিছুর বিকাশ ঘটায়। (৪) পরিমার্জিত ও পুণ্য চরিত্রের মানুষের জন্য উচ্চতম পরিষদের মনে-প্রাণে দোয়া ও তাদের পরিপন্থীদের জন্য মনে-প্রানে বদ দোয়া থেকে যে শক্তির উদ্ভব হয়। (৫) শরীয়ত তথা আল্লাহর বিধি-নিষেধের শক্তি। যে শক্তির প্রভাবে তার অনুসারীরা সাফল্য অর্জন করে ও উপেক্ষাকারীরা ব্যর্থথার মুখ দেখে (৬) যে শক্তি সৃষ্টির কারণ হয়ে আসে। আল্লাহ পাক কোন কিছু সৃষ্টি হওয়ার নির্দেশ জারী করলে তার কারণটি আগে সৃষ্টি হয়। এ কারণটি শক্তিরূপে সৃষ্টির কাজ দেয়। আল্লাহ চান সৃষ্টিজগতটি কার্যকারণ শৃঙ্খলে আবদ্ধ থাক। অন্যথায় বিশৃঙ্খল অবস্থা সৃষ্টিজগত ধ্বংস করে দেবে। এ ষষ্ঠ শক্তির উদাহরণ প্রসংগে নবী করিম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উনার এ বক্তব্য নেয়া যায়, "আল্লাহ যদি চান অমুক ব্যক্তির অমুক স্থানে মৃত্যু হোকতখন তার সেখানে পৌছার একটি কারণ সৃষ্টি হয়ে যায়"। 

এ সব কথা হাদীস ও যুক্তি দ্বারা সুপ্রমাণিত হয়ে আছে।

*** টিকা- [সব কথার সারকথা হল এইআল্লাহ এ সব স্বনির্ধারিত প্রাকৃতিক রীতি বা শক্তির মাধ্যমে কাজ করে থাকেন। কেউ কাউকে তরবারীর আঘাত করলে তিনি মৃত্যু দান করেন। বীর্য ছাড়া সন্তান উৎপাদনের শক্তি আল্লাহর থাকা সত্ত্বেও সেটাকেই তিনি এ জগতে মানব জন্মের মাধ্যম করেছেন।]***

জানা প্রয়োজনযে সব মাধ্যম শক্তির ভিত্তিতে তিনি নিজ মর্জী ও নির্দেশ কার্যকরী করেনকখনও সেগুলো পরস্পর বিরোধী সংঘাতে লিপ্ত হয়। তখন তিনি যে শক্তির প্রাধান্য লাভ অধিকতর মংগলদায়ক মনে করেনসেটাকে জয়ী করেন। হাদীসে যে রয়েছেদাঁড়ি পাল্লা আল্লাহর হাতে রয়েছে এবং যে পাল্লা ভারী করতে চান সেটাই ভারী হয় এবং আল্লাহ যে বলেছেনস্রষ্টা সতত সৃজনশীল কাজে নিরত বা ব্যস্তএ দুটো বক্তব্যের তাৎপর্য এটাই।কখনও শক্তির প্রাধান্য হয় উপকরণের শ্রেষ্ঠত্বের কারণে। কখনও তা হয় কল্যাণ-শক্তির শ্রেষ্ঠত্বের কারণে। কখনও সৃষ্টিকে ব্যবস্থাপনার ওপর প্রাধান্য দেয়া হয়। এ ছাড়াও বিভিন্ন কারনে শক্তির পারস্পরিক দ্বন্দ্বে একটির ওপর অপরটি প্রাধান্য পেয়ে থাকে। 

আমরা শক্তির দ্বন্দ্বের সময়ে ভালোভাবে জানতে পাইনাকোনটি এ ক্ষেত্রে সঠিক। তবে যেটা জয়ী হয়ে রূপলাভ করেসেটাকে নিঃসন্দেহে সঠিক ভাবতে পারি। এর ভেতরেই কল্যাণ নিহিত। আমার এ বক্তব্যটি ভেবে-চিন্তে দেখলে এর থেকে অনেক সমস্যা ও জটিলতারই সমাধান পাওয়া যাবে। 

***[সকল কর্মই আল্লাহ্ তা'আলার ইচ্ছায় সম্পাদন হয়ে থাকে। সুতরাং সর্বাবস্থায় আল্লাহ্ তা'আলার ইচ্ছার উপর সন্তুষ্ট থাকাই ইমানদারের উচিত। যেমন ইব্রাহিম খলিলুল্লাহ্ (আঃ) উনি আগুন থেকে রক্ষা করার জন্য আল্লাহর কাছে মিনতি করেননি। বরং সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। সুতরাং সকল পরিনতিতে শোকর গুজার করাই উচিত। তবেই আল্লাহ্ তা'আলার সন্তুষ্টি অর্জন সম্ভব।*** তারকার ভিতরের লাইন কয়টি বইয়ের অংশ নয় ]

গ্রহ-নক্ষত্রের শক্তি সম্পর্কে বলা চলেএর গতিবিধি দ্বারা গরম-ঠাণ্ডা বা দিন-রাতের হ্রাস-বৃদ্ধি হওয়ার মত সাধারণ কাজ অবশ্যই ঘটে থাকে। তেমনি জোয়ার ভাটাও দেখা যায়। হাদীসে আছে, “যখন ভোরে তারা দেখা দেয়সূর্য বিদায় নেয়। অর্থাৎ এটাই রীতি। কিন্তু এ সবের প্রভাবে ধনী-গরীব হওয়াদুঃখ-সুখ পাওয়া কিংবা দুর্ভিক্ষ-মহামারী দেখা দেয়ার কোন শরীয়ত সম্মত প্রমাণ নেই। মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বরং এ সব নিয়ে মাথা ঘামাতেও নিষেধ করেছেন। তিনি বলেন, ‘জ্যোতিষী হওয়া ও যাদুকর হওয়া একই কথা’ (হারাম পেশা)। আরবের জাহেলরা যে বলতঅমুক গ্রহ বা নক্ষত্রের উদয় বা অস্তের কারণে বৃষ্টি হয়েছেতিনি তার বিরুদ্ধে কঠোর সতর্ক বাণী উচ্চারণ করেছেন। 

এ ক্ষেত্রে আমার বক্তব্য এইমহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উনার শরীয়ত এ কথা কোথাও বলেনি যেগ্রহ-নক্ষত্রের গতিবিধির ভেতর আল্লাহ এমন কোন শক্তি রাখেননি যা প্রকৃতির বিবর্তনের লীলায় কোনই অংশ রাখে না। তবে এটাও ঠিক যেমহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) জ্যোতিষী হতে নিষেধ করেছেন। জ্যোতিষী বা গণকদার জীনদের কাছে জিজ্ঞেস করে করে অজানা খবর জানত। তাই তিনি জ্যোতিষীর কাছে যাওয়া ও তাদের কথার ওপর বিশ্বাস করাকে অত্যন্ত খারাপ জানতেন। জ্যোতিষীর কার্যকলাপ সম্পর্কে তার কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলতেনফেরেশতারা যখন আকাশে আল্লাহর কোন সিদ্ধান্ত আলোচনা করেনশয়তান তখন সে খবর আড়ি পেতে শুনে নিয়ে পালায় এবং (ভক্ত) জ্যোতিষীদের তা শুনায়। জ্যোতিষী সেই একটি সত্যের সাথে একশ মিথ্যা মিলিয়ে লোকদের শুনায়। 

আল্লাহ তাআলা বলেনহে ঈমানাদর সমাজ ! যারা কুপরী কাজ করল তাদের মত হয়োনা। আর তোমাদের সেই ভাইদের মত হয়োনা যারা তোমাদের ব্যাপারে বললযদি তারা অভিযানে গিয়ে যুদ্ধে অংশ না নিয়ে আমাদের কাছে থাকততাহলে মারা যেতনানিহত হতনা। 

মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেনতোমাদের ভাল কাজই শুধু তোমাদের জান্নাত দেবেনা (আল্লাহ ছাড়া)। তিনি আরও বলেনতুমিই তো একমাত্র দয়ালু বন্ধু। তুমি তো দয়ার হাত বাড়িয়েই রয়েছ। মোটকথা জ্যোতিষ শাস্ত্র নিষিদ্ধ করার ভেতর অজস্র কল্যাণকর উদ্দেশ্য রয়েছে।

পরবর্তী পর্ব

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...