বুধবার, ২৯ নভেম্বর, ২০২৩

হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (১০) কর্ম প্রেরণার উৎস



📚 হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (পর্ব- ১০)
✍🏻শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ্ মুহাদ্দেসী দেহলভী (রহঃ)

কর্ম প্রেরণার উৎস -
জানা দরকারমানুষের যে সব মনোগত ও মস্তিষ্ক প্রসূত ভাব তাদের বিভিন্ন কাজে উস্কানী দেয় ও অনুপ্রেরণা জোগায়অবশ্যই সেগুলো উদয়ের পেছনে কোন না কোন কারণ রয়েছে। কারণসব কিছুই সৃষ্টি হওয়ার ব্যাপারে আল্লাহর কার্য কারণ রীতি সক্রিয় রয়েছে। প্রত্যক্ষ উদাহরণঅভিজ্ঞতা ও সঠিক চিন্তা-ভাবনা থেকে এ কথা সুস্পষ্ট হয়ে ধরা দেয় যেসত্যিই সে সব মনোগত ভাবের পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে। 

মোট কথা সে সব কারণের সেরা কারণ হল আল্লাহদত্ত মানব প্রকৃতি। এর আগে এ সম্পর্কিত একটি হাদীস উদ্ধৃত হয়েছে (পাহাড় টললেও স্বভাব টলেনা হাদীস)। তার ভেতরও মানুষের প্রকৃতিগত প্রবণতার কথা রয়েছে। 

খানা-পিনার মত বিভিন্ন অবস্থার প্রভাবে সেগুলোর অবস্থার পরিবর্তন ঘটে থাকে। তাই দেখিক্ষুধার্ত খেতে চায়তৃষ্ণার্ত পানি চায়কামাতুর নারী চায় ইত্যাদি। কখনও মানুষ এমন বস্তু খায় যা তার কাম প্রবণতা বাড়িয়ে দেয়। ফলে সে নারী ঘেঁষা হয়ে যায়। তাই তার গোটা ভাবনা-চিন্তা নারী কেন্দ্রিক হয়ে যায়। এ থেকেই সে অনেক অঘটন ঘটিয়ে থাকে। কখনও এমন রূঢ় বস্তু খায় যা তার অন্তরে রূঢ়তা সৃষ্টি করে। ফলে সে মানুষকে হত্যা করার মত কঠিন কাজ করতেও দ্বিধান্বিত হয় না। এ স্বভাবের কারণে সে এমন সব সাধারণ ব্যাপারেও ক্ষেপে যায় যাতে অন্য সবাই ক্ষিপ্ত হবার চিন্তাও করে না। 

এ দুধরনের লোক যখন নামায-রোযার মাধ্যমে আত্মশুদ্ধির চেষ্টা চালায় কিংবা বেশ বৃদ্ধ হয়ে যায়অথবা কঠিন পীড়াগ্রস্ত হয়তখন তার আগের অবস্থা অনেকটা বদলে যায়। তার অন্তর নম্র এবং প্রকৃতি সরল হয়ে যায়। এ কারণেই যুবক ও বৃদ্ধের অবস্থার তারতম্য সুপ্রকট হয়ে থাকে। এ পার্থক্যের কারণেই মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) রোজা থাকা অবস্থায় বৃদ্ধদের স্ত্রীকে চুমু খাওয়া বৈধ করেছেনঅথচ তরুণদের বেলায় তা নিষিদ্ধ রেখেছেন। 

মোট কথা কারো কোন কিছুর অভ্যেস হওয়ার বা কিছু ভাল লাগার পেছনে কারণ হলসে সেটা বেশী করে করার ফলে মনের পাতায় তা বিচিত্র হয়ে যায়। ফলে অধিকাংশ সময়ই সেটার ভাবনা তাকে পেয়ে বসে। 

কখনও মানবিক প্রবৃত্তি পশু প্রকৃতির খপ্পর থেকে বেরিয়ে গিয়ে উচ্চ পরিষদ থেকৈ সাধ্যানুসারে দ্যুতিময় হয়ে থাকে। তার ফলে ভাল কাজের প্রেরণা ও প্রীতি এবং মানসিক শান্তি ও স্বস্তি দেখা দেয়। এ থেকেও কখনও কোন উন্নত মানের ভাল কাজ করার দৃঢ় সংকল্প দেখা দেয়। 

কখনও জৈবিক প্রবৃত্তি শয়তানের সাহচর্যে পড়ে তারই রঙে রঞ্জিত হয়। তখন মন মগজে যে সব খেয়ালের উদ্ভব হয় তা থেকে মানুষের খারাপ কাজগুলো দেখা দেয়। 

স্মরণ রাখা প্রয়োজনস্বপ্নও অধিকাংশ ক্ষেত্রে মন-মগজের খেয়াল থেকে জন্ম নেয়। পার্থক্য শুধু এইস্বপ্নের জন্য মন পরিস্কার ও নির্ভেজাল থাকা চাই।তা হলেই তা তে স্বপ্নের কথাগুলো বিচিত্র ও রূপায়িত হতে পারে। (জাগরণে খেয়ালগুলো শতধা বিক্ষিপ্ত থাকে ও স্বপ্নে সেগুলো সুবিন্যস্ত হয়।) বিশেষত ইবনে সিরীনবলেনস্বপ্ন তিন ধরনের। একঅন্তরের স্বগতোক্তি। দুইশয়তান ভীতি। তিনআল্লাহর সুসংবাদ।

পরবর্তী পর্ব (একাদশ পরিচ্ছেদ) 

হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (৯) বিভিন্ন স্বভাবের বিচিত্র মানুষ



📚 হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (পর্ব- ৯)
✍🏻শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ্ মুহাদ্দেসী দেহলভী (রহঃ)

বিভিন্ন স্বভাবের বিচিত্র মানুষ-
মানুষের স্বভাবের বিভিন্নতার কারণেতাদের কার্য-কলাপনৈতিকতা ও মর্যাদার পার্থক্য দেখা দেয়। এর সপক্ষে পাই মহানবীর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এ হাদীসটি যদি তুমিশোন কোন পাহাড় এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় চলে গেছেতা হলে তুমি তা বিশ্বাস করলেও করতে পার। কিন্তু যদি শুনতে পাও অমুক ব্যক্তির স্বভাব প্রকৃতি বদলে গেছেতাকে কখনও বিশ্বাস করো না। কারণঅবশেষে সে তার মূল স্বভাবেই ফিরে আসবে। অন্যত্র তিনি বলেন, “দেখআদম সন্তানের বিভিন্ন প্রকৃতি দিয়ে সৃষ্টি করা হয়েছে। তাদের ভেতর কিছু লোক মুমিন হিসেবে জন্ম নিয়েও কাফের হয়ে মারা যায় ইত্যাদি। এ হাদীসটি পুরোপুরি বর্ণনার পর ক্ষোভঅধিকারঋণ প্রকাশ ও আদায়ের ব্যাপারে বিভিন্ন স্বভাবের মানুষের ভিন্ন ভিন্ন অবস্থার উল্লেখ করেন। এক স্থানে তিনি বলেছেনসোনা ও রূপার খনি যেমন পৃথক হয়তেমনি (গোত্র ও ঈমানের বিচারে) মানুষ বিভিন্ন প্রকৃতির হয়ে জন্ম নেয়। 
স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ- 
“(হে নবী) বলুনপ্রত্যেকেই যার যার স্বভাব মতে কাজ করে (সূরা বনী ইস্রাঈলঃ আয়াতঃ ৮৪)
উপরোক্ত হাদীসগুলোর যে অর্থ ও তাৎপর্য আমার কাছে ধরা দিয়েছেযদি আপনিও তা হৃদয়ংগম করতে চানতা হলে শুনে নিনমানুষের ভেতরে দুধরনের ফেরেশতা খাসলাত পয়দা করা হয়েছে। তার ভেতর একটি উচ্চ পরিষদের অনুকূল জ্ঞানে পরিপূষ্ট থাকারহস্যময় স্রষ্টার গভীর ও সূক্ষ্ম রহস্যাবলীর খবর রাখা এবং নিখিল সৃষ্টির উত্তম ব্যবস্থাপনার রীতি-নীতি ভালভাবে আয়ত্ত করা। উদ্দেশ্য হলসে সব জ্ঞান আয়ত্ত করে বাস্তবে রূপায়ণের জন্য সেদিকে সর্ব প্রয়াসে নিয়োজিত থাকা। দ্বিতীয়টি নিম্ন পরিষদের অনুকূল ও উপযোগী হয়। নিম্ন পরিষদের কাজই হল ওপরের হুকুম তামিল করা। তা আয়ত্তের চিন্তা করে না এবং সেদিকে সাহস ও প্রয়াস ব্যয় করে নাকেন্দ্রিভূতও করে না। তাই তারা সেগুলোর ব্যাপারে ওয়াকেফহাল থাকে না এবং আল্লাহর গুণাবলী ও নামাবলীর জ্ঞান থেকেও তারা বঞ্চিত। অবশ্য তাদের ভেতরে নূরের দ্যুতি রয়েছে। ফলে জৈব স্বভাব থেকে তারা পবিত্র ও উন্নত থাকে। 
তেমনি জৈব স্বভাবও দুধরনের। 
একপ্রবল ও শক্ত স্বভাব। যেমনঅতি আদর-যত্নে পালিত ষাঁড়। তার যেমন বপু বিশালআওয়াজ বিকটশক্তি বিপুল ও দেহ মেদুল হয়ে থাকেতেমনি সে তীব্র কামপ্রবণভীষণ হিংসুটেপ্রবল বিজয় বাসনাকঠিন প্রতিশোধ স্পৃহা ও ভয়ানক বেপরোয়া প্রকৃতির হয়। 
দুইঅত্যন্ত দুর্বল স্বভাব। তার উদাহরণ হলজন্মগত ত্রুটিপূর্ণ কিংবা খাসী করা পশু। তা ছাড়া দুর্ভিক্ষ পীড়িতঅনশনক্লিষ্ট ও অযত্নে পালিত জীব। তার বপু কৃশআওয়াজ ক্ষীণপ্রকৃতি দুর্বল ও সে প্রতিশোধ স্পৃহা বা বিজয় কামনাহীন হয়ে থাকে। প্রত্যেক মানুষের ভেতর এর যে কোন একটি জৈব শক্তির অস্তিত্ব রয়েছে। ফলে যার ভেতর যে শক্তি ঠাঁই পায়সে লোকটি সেভাবেই চিহ্নিত পরিচিত হয়। ফেরেশতা কি পশু শক্তি উভয়ের বেলায়ই এ দুটো স্তরের পরিচয় মিলবে 
মানুষ তার কার্যকলাপ দ্বারা এ সব অন্তর্নিহিত প্রাকৃতিক শক্তিকে অধিকতর শক্তিশালী বা দুর্বল হতে সহায়তা করে থাকে। ফেরেশতা ও পশু প্রবৃত্তির একই সংগে মানুষের ভেতরে অবস্থানের ফলে দুটো অবস্থা দেখা দেয়। একউভয় শক্তির ভেতরে টানা-পোড়ন চলতে থাকে। প্রত্যেকটি শক্তিই যখন নিজের দিকে মানুষটিকে টানতে থাকে ও তার দ্বারা নিজের দাবী প্রতিষ্ঠা করতে ও ইচ্ছা প্রতিফলিত করতে চায়তখন এ টাগ-অফ-ওয়ার নিতান্তই স্বাভাবিক। এর যে শক্তিই বিজয়ী হোক অপর শক্তিটির প্রভাব মুছে ফেলবে। দ্বিতীয় অবস্থাটি হলউভয়ের ভেতর সমঝোতা ও একতার। এ অবস্থায় ফেরেশতা প্রকৃতি প্রতিদ্বন্দ্বিতা পরিহার করেতার দাবীর কাছাকাছি কিছু মেনে নিয়ে কোন মতে গা বাঁচিয়ে চলে। যেমন বিবেকমহানুভবতাউদারতানিঃস্বার্থপরতাপবিত্রতা ও ত্যাগ-তিতিক্ষার থেকে কিছুটা শিথিলতা নিয়ে কাজ করা। পক্ষান্তরে পশু শক্তিও তার মূল অবস্থান থেকে কিছুটা উপরে উঠে এসে সাধারণের মতামতের সাথে মোটামুটি তাল মিলিয়ে চলে। এরূপ ক্ষেত্রে পরস্পর বিরোধী মত দুটো দ্বন্দ্বের বদলে সন্ধি করে নেয়। এ সন্ধি অবস্থায় মূলত উভয় প্রকৃতি মিলে গিয়ে এক তৃতীয় প্রকৃতির সৃষ্টি হয়। তারপর পশু শক্তিফেরেশতা শক্তি ও তৃতীয় মিশ্র শক্তির প্রত্যেকেরই দুটো চরম দিক ও একটি মধ্যপন্থা থাকে। তারপর চরমের কাছাকাছিমধ্য পথের কাছাকাছি ইত্যাকার রূপে তিন প্রকৃতি বহু প্রকৃতিতে রূপান্তরিত হয়ে হয়ে চলে। তার ভেতর প্রধান হল আটটি। এ আটটির পরিচয় পেলে তা থেকে অন্যান্যগুলোও জানা যায়। তার ভেতরে চারটি সৃষ্টি হয় মূল শক্তি দুটোর পারস্পরিক আকর্ষণ-বিকর্ষণ থেকে। 
(১) প্রবলতম ফেরেশতা খাসলত ও প্রবলতম পশু স্বভাবের মিলনে এ শক্তির অভ্যুদয় ঘটে।(২) প্রবলতম ফেরেশতা শক্তি ও দুর্বলতম পশু শক্তির মিলনে উৎপত্তি।
(৩) দুর্বলতম ফেরেশতা স্বভাব ও প্রবলতম পশু স্বভাবের মিলনে এর জন্ম।
(৪) দুর্বলতম ফেরেশতা শক্তি ও দুর্বলতম পশু শক্তির মিলনে এর উদ্ভব ঘটে। 
এভাবে এগুলোর পারস্পরিক সন্ধি ও মিলন থেকে অপর চারটি প্রকৃতি জন্ম নেয়। সেগুলোও স্বতন্ত্র রীতি ও বৈশিষ্ট্যের অধিকারী এবং অপরিবর্তনীয়। কেউ যদি এ সব স্বভাবের বৈশিষ্ট্য ও রীতি জানতে পায়সে অনেক হয়রানি থেকে বেঁচে যায়। আমি শুধু এখানে সে সব ব্যাপারই বলব যা এ গ্রন্থে প্রয়োজন হবে। 
স্মরণ রাখা প্রয়োজনযার পশু শক্তি সবলতমতাকে কঠিন আত্মিক সাধনায় লিপ্ত হতে হবে। বিশেষত যার ভেতর তৃতীয় বা মিশ্র শক্তির সমাবেশ রয়েছেতার জন্য এ সাধনা অপরিহার্য। মানবতার পূর্ণত্ব প্রাপ্তি তারই ঘটবে যার ভেতর ফেরেশতা শক্তি বা বিবেক বিজয়ী রয়েছে। মিলিত স্বভাবের লোক আচরণ ও কাজ-কর্মে সব চাইতে ভাল হয়। টানা-পোড়েন ক্লিষ্ট ব্যক্তিত্ব যদি পশু শক্তি থেকে মুক্তি পায়তা হলে ইলম ও মারেফতে উত্তম হয়। কিন্তু আমলের ক্ষেত্রে উদাসীন হয়। যে কোন গুরুত্বপূর্ণ কাজে তারই উৎসাহ থাকেনা যার ভেতর পশু দুর্বল ভাবে সক্রিয়। 
তেমনি প্রবল উন্নত (ফেরেশতা) স্বভাবের লোক সব কিছু ছেড়ে আল্লাহর দিকে মনোনিবেশ করবে। দুর্বল উন্নত স্বভাবওয়ালা যদি সুযোগ মিলে ও পশু স্বভাব থেকে রেহাই পায়আখেরাতের জন্যই পার্থিব কাজ-কর্ম ত্যাগ করবেপার্থিব অলসতা বা আয়েশের জন্য নয়। বড় বড় কাজে সে ব্যক্তি দেহ-মন নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে যার পশু প্রকৃতির প্রাবল্য রয়েছে। পক্ষান্তরে উন্নত প্রকৃতির লোকেরা নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বের কাজে বেশী আত্মনিয়োগ করবে। মিশ্র প্রকৃতির লোক সব ধরনের কাজেই লিপ্ত হয়। দুর্বল বিবেকের মানুষ যুদ্ধ-বিগ্রহ ও দাংগা-হাংগামার কাজে বেশী নিয়োজিত থাকে।

বিবেক ও প্রবৃত্তির টানা-পোড়েনে বিক্ষত ব্যক্তি যদি প্রবৃত্তির অনুসারী হয়শুধুই পার্থিব কাজে লেগে যাবে এবং যদি বিবেকের অনুগত হয়শুধুই অপার্থিব কাজ ও সাধনায় ডুবে থাকবে। আপোষমূলক স্বভাবের লোকেরা পার্থিব ও অপার্থিব উভয় কাজে সমানে অংশ রাখবে। একই সঙ্গে পাপ ও পুণ্য দুটোই চালাবে।
এ সব প্রকৃতির ভেতর বিবেক যাদের খুবই উন্নত হবেসে পার্থিব ও অপার্থিবউভয় নেতৃত্বের উপযোগী হবে। আল্লাহর মর্জীতে তারা সব সময় সে ক্ষেত্রে জেঁকে বসবে। সার্বিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব যথা লেখাফত (রাষ্ট্রপরিচালনা) ও ইমামত (জাতীয় নেতৃত্ব) তাদের হাতেই থাকবে। এ ধরনের লোকরাই নবীনায়েবে নবীধর্মীয় দিকপালযুগনায়ক ও রাষ্ট্রনায়ক হয়ে থাকেন। যাদের জন্য আল্লাহর দ্বীন অনুসরণ অপরিহার্য করা হয়েছেতারা মিশ্র স্বভাবের এবং ফেরেশতা প্রকৃতির জোর তাদের কিছুটা বেশী। পক্ষান্তরে মিশ্র প্রকৃতিতে ফেরেশতা প্রকৃতি যাদের অপেক্ষাকৃত দুর্বলতারা উপরোক্ত দলের অত্যন্ত অনুগত হয়। কারণ এ ধরনের লোক আল্লাহর রহস্য পুরোপুরি লাভ করে। এদের কিছুটা দূরে থাকে টানা-পোড়েন বা দ্বিধা-দ্বন্দ্বের দল। কারণএ দলটি সরাসরি প্রকৃতিগত আঁধারে হাবুডুবু খেয়ে সত্যের ওপর সঠিক ভাবে স্থির থাকতে পারে না। তবে এ দলের লোক যখন দ্বিধা কাটিয়ে ওঠেতখন যদি উন্নত খেয়ালের লোক হয় তা হলে শরীয়তের রহস্য নিয়ে তারা গবেষণায় ডুবে থাকে। শরীয়তের বাহ্যিক রূপ ছেড়ে তারা সম্পূর্ণ শক্তি ও সাধনা ব্যয় করবে মারেফতের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম রহস্য অবহিত হওয়ার ও সেই রঙে নিজকে রঞ্জিত করার জন্য। যদি তত উন্নতমনা না হয় তা হলে শুধু আধ্যাত্মিক সাধনায় কষ্ট-ক্লেশ করে কাশফ-ইশরাফ (অপরের মনের কথা জানা) ও দোয়া কবুলের মত ফেরেশতা স্বভাবের ঔজ্জ্বল্য নিয়েই সন্তুষ্ট থাকবে। কিন্তু আল্লাহর আসল রহস্যাবলী তার অন্তরে ঠাঁই পাবে না। তা জানতে পারে শুধু প্রকৃতির ওপর জোর খাটিয়ে কিংবা প্রকৃতিগত আলোর আশ্রয় নিয়ে।
 
আমার প্রতিপালক আমাকে এ সব রীতি-নীতি জানিয়েছেন। এগুলো যারা গভীরভাবে অনুধাবন করবেআল্লাহ প্রেমিকদের অবস্থাগুলো তাদের কাছে সুস্পষ্ট হয়ে যাবে এবং তাদেরকে কতটুকু কামেল তা জানতে পাবে। তাদের রীতি-নীতির মর্তবাও তারা জানতে পাবে।

এ বিদ্যা আল্লাহ তালা শুধু আমাকেই দেন নিআরও অনেককেই এরূপ অনেক জ্ঞান দান করেছেন। কিন্তু অধিকাংশ লোকই এ দানের কৃতজ্ঞতা আদায় করে না।

দশম পরিচ্ছেদ 
কর্ম প্রেরণার উৎস 

মঙ্গলবার, ২৮ নভেম্বর, ২০২৩

হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (৮) দায়িত্বই প্রতিদান চায়



📚 হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (পর্ব- ৮)
✍🏻শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ্ মুহাদ্দেসী দেহলভী (রহঃ)

দায়িত্বই প্রতিদান চায় -
জেনে রাখুনমানুষের জন্য রয়েছে যেমন কর্ম তেমন ফল। ভাল কর্মে তারা ফল পাবেমন্দ কাজে পাবে মন্দ ফল। এ ক্ষেত্রে চারটি অবস্থা দেখা দেয়। 
(১) জাতিগত স্বভাবের চাহিদা। যেমন গরু-ছাগল ঘাস খাবে ও বাঘ-শিয়াল মাংস খাবে। তা হলেই তাদের স্বভাব ঠিক থাকবে। তা না খেয়ে যদি বাঘ-শিয়াল ঘাস খায় ও গরু-ছাগল মাংস খায়তখন তাদের স্ববাব খারাপ হবেই। মানুষও তেমনি। যদি তারা এমন সব কাজ করে যাতে আল্লাহর কাছে বিনয়দেহের পাক-পবিত্রতামনের সারল্য ও খোদাভীরুতাএবং বিবেকের ইনসাফ ও ন্যায়ানুগতা প্রকাশ পায়তা হলেই তা তার ফেরেশতা স্বভাবের পরিপোষক হবে। পক্ষান্তরে যখন তার পরিপন্থী সব কাজ করবেতখন তার স্বভাব নষ্ট হয়ে যায়। তারপর প্রাণ যখন তার দেহভার মুক্ত হবেতখন ভাল কাজে সুখের প্রলেপ ও মন্দ কাজে দহন জ্বালা লাভ করবে। 

(২) মালা-ই আলার প্রভাবেও মানুষের দুঃখ বা সুখানুভূতি লাভ হয়। কারো পায়ের নীচে আগুন বা বরফ থাকলে তার অনুভূতি শক্তি যেরূপ প্রভাবিত হয়উচ্চতম পরিষদের ফেরেশতাদের খুশী-অখুশী দ্বারাও সে তেমনি প্রভাবিত হয়। এ প্রভাব মূলত দেখা দেয় স্বরূপ জগতের আদি মানুষটিরতথা মানবের জাতিগত আদি সত্তার ভেতর। সেই সত্তার সেবায় নিয়োজিত রয়েছেন ফেরেশতারা। মানব গোত্রের ওপর বিশেষ অনুগ্রহ হিসেবে তাদের সৃষ্টি করা হয়েছে। কায়া মানব যেভাবে অনুভূতি ও উপলব্ধি ছাড়া চলতে পারেনা তেমনি ছায়া মানব সেই ফেরেশতাদের ছাড়া চলতে পারে না। কোন মানুষ যখন একটি ভাল কাজ করেতখন সেবক ফেরেশতারা খুশী হয় এবং তা থেকে আলোকরশ্মি বিচ্ছুরিত হয়। তেমনি যদি কেউ কোন খারাপ কাজ করেসেবক ফেরেশতারা অসন্তুষ্ট ও ক্ষুব্ধ হয় এবং তা থেকে আঁধার ধোয়ার কুণ্ডুলী নির্গত হয়। এ দুটোই সেই মানব সত্তাটিকে প্রভাবিত করে এবং তাকে সুখ কিংবা দুঃখ দান করে কখনও সেই রশ্মি বা ধোঁয়া কিছু ফেরেশতা এবং বিশেষ একদল লোকের স্বভাবে প্রবিষ্ট হয়। ফলে তার স্বাভাবিক ইলহাম হয় ভাল কাজের মানুষটিকে ভালবাসার ও মন্দ কাজের মানুষটিকে ঘৃণা করার জন্য। সেই অনুসারে তারা সদ্ব্যবহার কিংবা দুর্ব্যবহার করে থাকে। এ অন্তর্লীন প্রভাবটির উদাহরণ এইযখন কোন মানুষের পায়ের নীচে আগুন থাকেতার অনুভূতি ঘটে দহন জ্বালায়। এ অনুভূতি তার মগজ থেকে বিষাদময় ধোঁয়া নির্গত করে ও তা তার অন্তরকে আচ্ছাদিত করায় দুঃখানুভূতি দেখা দেয়। ফলে স্বভাবেও বিমর্ষতা ফুটে ওঠে। অনুভূতি ও উপলব্ধি শক্তিগুলো যেভাবে দেহকে প্রভাবিত করেঠিক তেমনি প্রভাবিত করে সেই ফেরেশতারা আমাদের মন-মানসকে। আমাদের কারো যদি দুঃখ বা লাঞ্ছনার আশংকা দেখা দেয়তখন সে ভয়ে কাঁপে এবং তার দেহ বিবর্ণ ও অবসন্ন হয়। কখনও বা কামনা লোপ পেয়ে প্রস্রাব লাল হয়ে যায়। এমনকি পায়খানা-প্রস্রাবও বেরিয়ে আসে। এ সবই ঘটে তার স্বভাবের ওপর অনুভূতি ও উপলব্ধির প্রভাবের কারণে। এ প্রভাব তার মগজের মাধ্যমে মনে রেখাপাত করে। বনী আদমের সাথে নির্দিষ্ট ফেরেশতার ঠিক দেহের সাথে অনুভূতির সম্পর্কের মতই সংযোগ। তাদের তরফ থেকে মানুষের ও নিম্নস্তরের ফেরেশতাদের ওপর স্বভাবজাত প্রভাব ও প্রকৃতিগত বিবর্তন চলতেই থাকে। 
তারপর যেভাবে ভালর আলো ও মন্দের আঁধার ওপর থেকে নীচে নেমে আসেতেমনি নীচ থেকেও তা ওপরে উঠে এমনকি পবিত্র দরবারে পর্যন্ত পৌঁছে যায়। তার ফলে আল্লাহর জ্যোতিতে বিশেষ এক অবস্থার সৃষ্টি হয়যাকে রহমত বা গজব বলা হয়। আগুনের তাপে যেমন পানি উত্তপ্ত হয়যুক্তিজাল বিন্যাসের পর সিদ্ধান্ত বের হয় এবং দোয়া করলে কবুলের কারণ সৃষ্টি হয়এও ঠিক তেমনি ব্যাপার। বস্তুত আল্লাহ জ্যোতিতে উক্ত অবস্থা সৃষ্টির পর আত্মিক জগতে নতুন নতুন অবস্থা ও বিবর্তনের সৃষ্টি হয়। 
কখনও ক্ষোভ ও আক্রোশ সৃষ্টি হয়। তওবা হলে তা আবার লোপ পায়। কখন আবার রহমত দেখা দেয়। রহমত আবার অপরাধ হলে আজাবে রূপান্তরিত হয়। স্বয়ং আল্লাহ পাক বলেনঃ 
নিশ্চয় আল্লাহ কোন জাতির ভাগ্য বদলান নাযতক্ষণ তারা নিজেদের ভাগ্য নিজেরা না বদলায় (সূরা রাদঃ ১১)
মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বিভিন্ন হাদীসে বলেছেনআদম সন্তানের যা কিছু কাজ ফেরেশতারা আল্লাহর সমীপে নিয়ে যান। কিংবা আল্লাহপাক ফেরেশতাদের জিজ্ঞেস করেনআমার বান্দাদের কি অবস্থায় রেখে এসেছঅথবা আল্লাহর কাছে রাতের কার্যাবলীর আগে দিনের কার্যাবলী পৌঁছে থাকে। এ সব বক্তব্য থেকে বুঝা যায়জ্যোতির্ময় আল্লাহ ও তাঁর বান্দাদের ভেতর পবিত্র পরিষদের মাধ্যমে যে সম্পর্ক বিদ্যমানফেরেশতারা সে সম্পর্ক রক্ষার দায়িত্বই পালন করেন। 
(৩) মানুষের ওপর যা কিছু অপরিহার্য করা হল তা শরীয়তেরই দাবী। এক জ্যোতির্বিদ যেমন জানেননক্ষত্রমণ্ডলীর যখন নিজ নিজ গতিপথ ও অবস্থানগুলোর বিশেষ এক স্থান লাভ ঘটেতখন সেই স্থানের বিশেষ শক্তির প্রভাবে এক ধরনের আত্মিক ও আধ্যাত্মিক পরিমণ্ডল সৃষ্টি হয়। সে অবস্থাটি আকাশের কোথাও কেন্দ্রিভূত হয়ে ছায়ারূপ ধারণ করে। তারপর যখন আকাশের রীতিনীতির নিয়ন্তা জগৎ উদ্ভাসিনী পূর্ণ চন্দ্রের সেই আত্মিক কথা গ্রহণের অবস্থাটিকে পৃথিবীতে প্রতিভাত করেনতখন পৃথিবীর মানুষ সেই শীতল চন্দ্রালোক দ্বারা আকৃষ্ট ও অভিভূত হয়। ঠিক এভাবেই এক আল্লাহ প্রাপ্ত ব্যক্তি জানেনবিশেষ এক সময় আসে যেটাকে লায়লাতুল কদর [কিংবা লাইলাতুল বরাত] বা বরকতের রাত বলে আখ্যায়িত করা হয় এবং যে সময়ে সমস্ত হিকমতপূর্ণ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গৃহীত ও সেগুলো বণ্টিত হয়তখনও মানুষের সাথে সম্পৃক্ত আত্মিক জগতে এক বিশেষ অবস্থার সৃষ্টি হয়। তাই প্রয়োজন ও সময়ের চাহিদা মোতাবেক সেই যুগের উত্তম ও শ্রেষ্ঠ মেধাসম্পন্ন ব্যক্তির কাছে ইলহাম বা ওহী অবতীর্ণ হয়। তাঁর মাধ্যমে সে সব ইলহাম পৌঁছানো হয় তাঁদের কাছে যাদের ব্যক্তিত্ব ও মেধা ঠিক তাঁরই কাছাকাছি রয়েছে। তারপর অন্যান্য সাধারণ লোকের অন্তরে এ ইলহাম পৌঁছানো হয় যে অবতীর্ণ ইলহামগুলোকে মেনে চলে এবং ভাল জানে। তারপর সে সব ইলহামের সমর্থক ও সহায়কদের সাহায্য করা হয়। পক্ষান্তরে সেগুলোর বিরোধীদের লাঞ্ছিত ও পরাভূত করা হয়। নিম্ন জগতের ফেরেশতাদের ইলহাম পৌঁছানো হয় অবতীর্ণ বিধানাবলীর অনুসারীদের সাথে সদ্ব্যবহার ও বিরোধীদের সাথে দুর্ব্যবহার চালাতে। তারপর এক ধরনের উজ্জ্বল দ্যুতি ও প্রভাব সাধারণ পরিষদ ও উচ্চতম পরিষদে পৌঁছে যায়। ফলে সেখান থেকে সন্তুষ্টি কিংবা অসন্তুষ্টি প্রকাশ পেয়ে থাকে। 

(৪) নবীর আনুগত্য। আল্লাহ পাক যখন কাউকে মানুষের মাঝে নবী করে পাঠান এবং এ কাজের মাধ্যমে তিনি মানুষের কল্যাণ সাধন ও তাদের ওপর অনুগ্রহ বর্ষন করতে চানতখন মানুষের ওপর তাঁর আনুগত্য অপরিহার্য করেন। তখন নবীর কাছে তাঁর যে সব ওহী আসে সেগুলো নির্দিষ্ট বিদ্যায় রূপ লাভ করে। সে বিদ্যা নবীর হিম্মৎ ও দোয়ার ফলে সুদৃঢ় ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়ে চলে। আল্লাহ তা'আলারও নির্দেশ হয় তা সুপ্রতিষ্ঠিত হবার ব্যাপারে সহায়তার জন্য। 
যেমন কর্ম তেমন ফলের এ চার ধরনের প্রয়োজনের ভেতর প্রথম দুধরনের প্রয়োজন অর্থাৎ জাতিগত স্বাভাবিক চাহিদা ও উচ্চতম পরিষদের প্রভাবগত চাহিদা মানুষের সৃষ্টিগত প্রকৃতিরই চাহিদা মাত্র। যে প্রকৃতি দিয়ে আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন তা চির অপরিবর্তনীয়। 
তবে পাপ ও পুণ্যের বিধান মানব প্রকৃতিতে সামগ্রিকভাবে বিধৃত রয়েছেবিস্তারিত ভাবে নয়। এ প্রকৃতিগত মানবিক ধর্মটি কলোত্তীর্ণ ও সার্বজনীন। সব নবীই এ মৌলিক ধর্মের ক্ষেত্রে এক ও অভিন্ন মতাবলম্বী। যেমন আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ 
এই হল তোমাদের উম্মতের পরিচয়এ উম্মত সবাই এক (সূরা মুমিনুনঃ আয়াতঃ ৫২)

মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, ‘নবীরা সবাই বৈমাত্রেয় ভাই। বাপ তাদের একমা পৃথক। এ প্রকৃতিগত মানব ধর্মটুকুর জন্য প্রতিটি মানুষকে জবাবদিহি করা হবে। নবী তাঁর কাছে আসুক বা না আসুক। 

তৃতীয় ধরনের প্রতিদান দাবী (শরীয়তের চাহিদা) যুগের পরিবর্তনের সাথে পরিবর্তিত হয়ে চলে। এ জন্যেই যুগে যুগে ভিন্ন ভিন্ন নবী ও রাসূল পাঠাতে হয়েছে। মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর হাদীসে এর ইংগিত এ ভাবে রয়েছে, ‘আমার ও আমার ওপর অবতীর্ণ বিধানের অবস্থা হল এই,কোন লোক যেন এক জাতির কাছে এসে বললহে জাতি! আমি নিজ চোখে শত্রু সৈন্য দেখে এলাম। তাই খোলাখুলি তোমাদের সাবধান করছি। তোমরা এক্ষুণি পালিয়ে প্রাণ বাঁচাও। তখন সেই জাতির একটি দল তার খবর শুনে মেনে নিল এবং শত্রু সৈন্য পৌঁছার আগেই ভোর না হতে পালিয়ে বাঁচল। অন্য দল তার খবরকে মিথ্যা বলে উড়িয়ে দিয়ে সকাল পর্যন্ত আরামে নিদ্রা গেল এবং সকালেই শত্রু সেনারা এসে তাদের মেরে ফেলল। ঠিক তেমনি আমাকে যারা মানল ও আমার বিধানকে সত্য জানলতারা বেঁচে গেল এবং যারা আমাকে মিথ্যা জানল ওআমার বিধানকে অমান্য করলতারা মারা পড়ল। 

এখন রইল চতুর্থ ধরনের প্রতিদান প্রকৃতি। সেটা হল নবী প্রেরণের চাহিদা। এ চাহিদা নবী প্রেরিত না হওয়া পর্যন্ত দেখা দেয় না। নবী এসে সবার কাছে সে বিধানগুলো পৌঁছে দেবার ও তাদের সব সংশয় সন্দেহ নিরসনের পর যারা জেনে শুনে বাঁচতে কিংবা ধ্বংস হতেচায়তাদের বেলায় এ প্রয়োজন দেখা দেয়। তখন আর এ প্রয়োজন অস্বীকার করার তাদের কোন অজুহাত অবশিষ্ট থাকেনা।

পরবর্তী পর্ব (নবম পরিচ্ছেদ)


হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (৭) দায়িত্ব মানুষের বিধিলিপি



📚 হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (পর্ব- ৭)
✍🏻শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ্ মুহাদ্দেসী দেহলভী (রহঃ)

দায়িত্ব মানুষের বিধিলিপি 
এ কথা সুস্পষ্ট যেআল্লাহ্ তা'আলার এ সৃষ্টিজগতে এমন অজস্র নিদর্শন রয়েছে যা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করলে বেশ বুঝা যায়আল্লাহ্ তা'আলা যে তাঁর বান্দাদের শরীয়তের বিধি-নিষেধ পালনের দায়িত্ব দিয়েছেন তার ভেতর বহু কল্যাণকর উদ্দেশ্য রয়েছে। তাঁর কাছে এর সমর্থনে সকল যুক্তি-প্রমাণও রয়েছে। 
এখন একবার গাছের পাতাফুল ও ফলের দিকে তাকান। তা দেখে এবং স্বাদ ও গন্ধ নিয়ে যে অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়তার দিকে গভীরভাবে লক্ষ্য করুন। দেখতে পাবেনপ্রত্যেক ধরনের পাতাকে আল্লাহ বিশেষ রূপ দিয়েছেন। প্রত্যেক জাতীয় ফুলকে দিয়েছেন ভিন্ন ভিন্ন রঙ ও ঘ্রাণ। প্রত্যেক প্রকারের ফলকে দিয়েছেন স্বতন্ত্র স্বাদ। এ থেকে কোনটি কোন গাছের পাতাকিসের ফুল ও কোন ফল তা সহজেই বলা যায়। এ সবগুলোই শ্রেণীরূপের অন্তর্গত। যে সূত্র থেকে যেভাবে শ্রেনী বিন্যাস হয়ে থাকেএগুলো সেখান থেকেই একই ভাবে বিন্যস্ত হয়। 

আল্লাহর সিদ্ধান্ত মোতাবেক প্রত্যেক প্রকারের গাছের জন্য বিশেষ উপাদান নির্ধারিত হয়ে আছে। যেমনখেজুর গাছের জন্য বিশেষ ধরনের মাটি তিনি নির্দিষ্ট করে রেখেছেন। তারপর মোটামুটিভাবে বলে দিয়েছেনএ উপাদান খেজুরের রূপ নিয়ে আত্মপ্রকাশ করবে। অবশেষে বিস্তারিত ফরমানে বলা হলখেজুরের পাতা এরূপফল ওরূপ ও বীচি সেরূপ হবে। 

প্রত্যেক শ্রেণীর কিছু বৈশিষ্ট্য তো সামান্য বুদ্ধি যার রয়েছে সে-ই বলতে পারে। কিন্তু কিছু বৈশিষ্ট্য এরূপ সূক্ষ্ম হয় যা বিজ্ঞ ব্যক্তি ছাড়া কেউ জানতে পারে না। উদাহরণ হিসেবে ইয়াকুতের এক বিশেষ প্রভাবের কথা ধরে নিন। যার হাতে ইয়াকুত থাকেঅন্তরে তার আনন্দ ও সাহস বেড়ে যায়। ইয়াকুতের এ বৈশিষ্ট্যটি সাধারণতঃ কেউ দেখে না। 

কোন কোন শ্রেণীর বৈশিষ্ট্যগুলো তার গোটা সত্তার ভেতর পাওয়া যায়। তা ঘটে উপাদানের উপযুক্ততার জন্য (উপাদানের দুর্বলতার কারণে একই শ্রেণীর ফলফুলের ভেতর তারতম্য ঘটে)। তেমনি কোন শ্রেনীর কিছু সত্তায় সব বৈশিষ্ট্য থাকেকিছু অংশে থাকে না। হালীলা ফল মুঠোয় নিলে এ সত্যটি সহজ হয়ে ধরা দেয়। 

খেজুর এরূপ কেন এ কথা বলতে পারেন না। এ প্রশ্ন অবান্তর। কারণসেটা যেরূপ আছে তা-ই থাকবে। এর কারণ জানতে চাওয়ার পালা নেই। 

তারপর আপনি যদি পশুর শ্রেনীগুলোর দিকে দৃষ্টি দেনসেখানেও মাছের মতই প্রতিটি শ্রেণীর পার্থক্য ও স্বাতন্ত্র্য দেখতে পাবেন। সঙ্গে সঙ্গে এও দেখতে পাবেনতাদের ভেতর এমন কতগুলো স্বতঃস্ফুর্ত ও প্রকৃতিগত ব্যাপার দেখা যায় যা থেকে সহজেই এক শ্রেনী হতে অপর শ্রেণীর পার্থক্য সুস্পষ্ট হয়ে ধরা দেয়। যেমন গৃহপালিত গরুছাগল ইত্যাদি ঘাস খায় ও চর্বিত চর্বন করে। অথচ ঘোড়া খচ্চর ইত্যাদি তৃণজীবি হয়েও চর্বিত চর্বন করে না। হিংস্র জন্তুর গোস্ত খেয়েই বাঁচে। পাখীরা উড়ে বেড়ায়। মাছ পানিতে সাঁতরায়। প্রত্যেক শ্রেণীর পশুর কণ্ঠস্বর ভিন্ন। সংগম ও দাম্পত্য পদ্ধতিও ভিন্ন ভিন্ন। বাচ্চা পালন ও ডিম প্রদানের রীতিও স্বতন্ত্র। এ সব সবিস্তারে বলতে গেলে গ্রন্থের কলেবর বেড়ে যাবে। 

এরপর দেখিপ্রত্যেক শ্রেণীর ভেতর যতটুকু স্বাভাবিক ও স্বতঃস্ফুর্ত জ্ঞান রয়েছে যা তার একান্ত প্রয়োজন ও তার জন্য কল্যাণকর। এ সব হচ্ছে আল্লাহ প্রদত্ত জ্ঞান। শ্রেণী বৈশিষ্ট্যের ছিদ্র পথে তার আগমন। ফুলের রঙ ও রূপ এবং ফলের স্বাদ ও ঘ্রাণ যেরূপ শ্রেণী বিশেষের সাথে জড়িয়েই আবির্ভূত হয়এও তেমনি এসে থাকে। 

কোন শ্রেণীতে শ্রেণীগত বৈশিষ্ট্যগুলোর সর্বত্র উপস্থিতি দেখা যায়। অথচ কোন শ্রেণীতে কিছু সংখ্যকের ভেতর পাওয়া যায় ও কিছু সংখ্যকের ভেতর পাওয়া যায় না। তার মূলে রয়েছে উপাদানের উপযোগিতা কিংবা দুর্বলতা। তবে শ্রেণী বিশেষের প্রত্যেকটি সত্তাই বৈশিষ্ট্যগুলো ধারণের যোগ্যতা রাখে। বৈশিষ্ট্যে ব্যতিক্রমের অন্যতম উদাহরণ হল মধু মক্ষিকার রাজা ও গৃহপালিত তোতাপাখী। নিজ নিজ শ্রেণী থেকে তারা স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য পেয়ে থাকে। 

মানুষের দিকে লক্ষ্য করলেও আপনি গাছপালা ও জীবজন্তুর মতই কতগুলো সাধারণ বৈশিষ্ট্য সেখানে দেখতে পাবেন। যেমনজন্ম নেয়াবৃদ্ধি পাওয়াকাশী দেয়াহাই তোলাপায়খানা-প্রস্রাব করাজন্ম নিয়ে মাতৃস্তন্য পান করা ইত্যাদি। সঙ্গে সঙ্গে এমন কতগুলো বৈশিষ্ট্যও পাবেন যেগুলো মানব জাতিকে অন্যান্য জাতীয় সৃষ্টি থেকে স্বতন্ত্র করে রেখেছে। যেমনকথা বলা ও বুঝাভূমিকা বুঝেই বিষয়জ্ঞান অর্জন করাসাধনা ও গবেষণা চালিয়ে বুদ্ধি-বিবেকের সাহায্যে গভীর তত্ত্বজ্ঞান হাসিল করাবস্তুগত ধ্যান-ধারণার বাইরের বস্তুকে উন্নত জ্ঞানের সাহায্যে জেনে নেয়া (সভ্যতা ও দেশজাতি ও ব্যক্তি সংস্কার পদ্ধতি ইত্যাদি)। এ ব্যাপারগুলো যেহেতু মানুষের জাতিগত বৈশিষ্ট্য ও জন্মগত উত্তরাধিকারতাই জংগল বা পাহাড়ের চূড়ায় বসবাসকারী মানুষের কাছেও তার পরিচয় মিলে। এও হচ্ছে আল্লাহর শ্রেণী বিন্যাসের জন্য নির্ধারিত বিশেষ উপাদানের বৈশিষ্ট্য। আসল তত্ত্ব হল এইমানুষের সৃষ্টিগত বৈশিষ্ট্য বা স্বভাবের দাবী হল এইতার রিপুর ওপরে অন্তরের ও অন্তরের ওপরে বুদ্ধির প্রাধান্য থাকা চাই। 

তারপর লক্ষ্য করুনআল্লাহ তা'আলা প্রতিটি শ্রেণী বিন্যাসে কত কলা-কৌশল ও অনুগ্রহ-প্রীতির পরিচয় দিয়েছেন। গাছ-পালায় যেহেতু গতি ও অনুভূতির উপাদান অবর্তমানতাই তার শিকড়কে এত শক্তি দান করেছেন যেহাওয়ামাটিআলো ইত্যাদি সংযোগে সৃষ্ট প্রয়োজনীয় উপাদান সে সংগ্রহ করে তার শাখা-প্রশাখা শ্রেণীগত চাহিদা মোতাবেক বর্দ্ধন করে দেয়। পক্ষান্তরে জীব-জন্তু যেহেতু অনুভূতিশীলমর্জী মাফিক তারা চলতেও পারেতাই তাদের মাটি থেকে প্রয়োজনীয় উপাদান চুষে খাবার শিকড় দেয়া হয় নি। বরং তাদের আল্লাহপ্রদত্ত জ্ঞান হল এইঘাসপাতা ও পানি যেখানে পাবেখুঁজে ফিরে খাবে। এ ভাবে তাদের অন্যান্য প্রয়োজন মিটাবার বুদ্ধিও দেয়া হল। যে সব শ্রেণী মাটি থেকৈ পোকার মত জন্ম নেয় নাতাদের আল্লাহ তা'আলা সন্তান উৎপাদনধারণ প্রসব ও পালনের শক্তি দান করলেন। সন্তানদাত্রীর ভেতর এমন তরল পদার্থ দিলেন যা পেটের সন্তান পালনে ব্যয় হতে পারে। তারপর সেই তরল পদার্থকে দুধে পরিণত করা হল এবং বাচ্চাকে ইলহাম করা হল বুক চুষে তা পান করার জন্য। চোষার ফলে দুধ তার কণ্ঠনালী পেরিয়ে পাকস্থলীতে চলে গেল। 

তেমনি মুরগীর ভেতর এমন তরল পদার্থ দেয়া হয়েছে যা থেকে ডিম তৈরি হতে পারে। ডিম দেয়া শেষ হলে দেহের তরল পদার্থ শুকিয়ে যায় এবং পেট শূণ্য হয়ে যায়। তখন তার ভেতর এমন এক উন্মাদনা দেখা দেয় যেঅন্যান্য মোরগের সাথে মেলামেশা ভুলে সে ডিমে তা দিতে বসে থাকে। এর ফলে তার পেটের শূন্যতার অনুভূতি দূর হয়। 

কবুতর জুটির ভেতর অদ্ভুত ভালবাসা দান করা হয়েছে। কবুতরীর পেটের খোলসটিকে ডিমে তা দেয়ার জন্য উপযোগী করে রাখা হয়েছে। তার ভেতরকার বাড়তি তরল পদার্থকে বমি আকারে বাচ্চার ওপর অনুগ্রহে পরিণত করা হয়েছে। বমির মাধ্যমে সে দানা-পানি বাচ্চার উপযোগী করে খাওয়ার এবং কবুতরকে আকৃষ্ট করে তার পথ অনুসরণ করে বাচ্চাকে খোরাক জোগাবার জন্য। তেমনি বাচ্চার প্রকৃতিতে তরল পদার্থ দিয়ে পালক সৃষ্টির পথ করা হয়েছে। তার সাহায্যে যেন সে উড়তে পারে। 

মানুষের যেহেতু গতিঅনুভূতিজৈব তাড়না ও বুদ্ধি-বিবেকের প্রেরণা রয়েছেএমন কি বাড়তি জ্ঞান অর্জনের ক্ষমতাও তার রয়েছেতাই তাকে চাষাবাদ করাবৃক্ষ রোপনলেন-দেন ও ব্যবসা-বাণিজ্যের সহজাত জ্ঞান দেয়া হল। কিছু লোককে নেতৃত্ব-কর্তৃত্ব সুলভ ও কিছু লোককে দাসত্ব-আনুগত্য সুলভ স্বভাব দান করা হল। এক দলকে রাজকীয় স্বভাবের ও অন্য দলকে প্রজাসুলভ স্বভাবের অধিকারী করা হল। কাউকে আল্লাহতত্ত্বপ্রকৃতিতত্ত্বতর্কশাস্ত্র ও ব্যবহারিক শাস্ত্রের গভীর ও জটিল জ্ঞান দান করা হল। কাউকে আবার এমন নির্বোধ করা হয়েছে যেজ্ঞানী ব্যক্তির অনুসরণ করা ছাড়া তার নিজের কিছু বুঝবারই ক্ষমতা নেই। শহুরে হোক কিংবা গেঁয়োসবার ভেতরেই স্বভাবের ও ক্ষমতার এ বৈচিত্র্য বিদ্যমান। 

যা কিছু আলোচিত হল সবই মানুষের জৈবিক জীবন ও জীবসুলভ শক্তি সম্পর্কিত আলোচনা ও বিশ্লেষণ বৈ নয়। এখণ তার ফেরেশতাসুলভ শক্তির দিকে চলুন। এটাও আপনি জানেনমানুষ অন্যান্য জীবের মত নয়: বরং তাকে সকল জীবের চাইতে উত্তম পর্যায়ের জ্ঞান দান করা হয়েছে। তার সে জ্ঞানের বিভিন্ন শাখার ভেতর যেটাকে সবার অনুসরণ করতে হয়তা হচ্ছে তার জন্ম ও প্রতিপালনের উদ্দেশ্য ও কারণ সম্পর্কিত জ্ঞান। তারা তখন এটাও জেনে ফেলে যেসৃষ্টির এ বিশাল কারখানার একজন মহান পরিচালক রয়েছেন। তিনিই সবাইকে সৃষ্টি করেছেন এবং রুজী সরবরাহ করছেন। তাই তারা সবাই মিলে অন্তত হাবভাবে সেই মহান প্রতিপালক ও বিজ্ঞতম স্রষ্টার কাছে বিনয়াবনত থাকছে। এটাই হচ্ছে আল্লাহ পাকের নিম্ন আয়াতের তাৎপর্যঃ 

"(হে রাসূল) ! আপনি কি দেখেন না নতোমণ্ডলের বাসিন্দারাপৃথিবীর অধিবাসীচন্দ্রসূর্যনক্ষত্রপাহাড়গাছপালাচতুষ্পদ জন্তু এবং বহু সংখ্যক মানুষ আল্লাহর সমীপে বিনয়াবনত রয়েছেতবে বহু লোক এমনও রয়েছে যাদের ভাগ্যে (নাফরমানীর কারণে) রয়েছে নির্ধারিত শাস্তি (সূরা হাজ্জঃ আয়াত ১৮) 

লক্ষ্য করুনগাছের প্রতিটি অংশশাখাপাতাফুল তাদের বিজ্ঞতম স্রষ্টার সমীপে হাত পেতে রয়েছে। যদি সেগুলোর জ্ঞান থাকততা হলে স্রষ্টার প্রশংসায় মুখর থাকত এবং অধিক থেকে অধিকতর কৃতজ্ঞ হয়ে চলত। যদি কিছুটা বুঝ থাকততা হলে হাবভাবে প্রার্থনার বদলে কথা দিয়ে প্রার্থনা করত। 

এ থেকে এটাও জানা গেল যেমানুষ বড়ই বিজ্ঞ ও বুদ্ধিমান। তাই তারা হাবভাবে প্রার্থনার বদলে জ্ঞানপূর্ণ প্রার্থণা জানায়। মানব শ্রেণীর এটাও একটা বৈশিষ্ট্য যেতাদের ভেতরে কেউ না কেউ অবশ্যই সকল তত্ত্বজ্ঞানের উৎসের দিকে কায়মনে নিবিষ্ট থাকেন। সে ব্যক্তি সেই উৎস থেকে ওহীদিব্যজ্ঞান কিংবা স্বপ্নের মাধ্যমে আসল জ্ঞান শিখে নেন। অন্যান্য লোক তাঁর ভেতর পথের আলো ও পুণ্যের প্রভাব দেখে আল্লাহর আদেশ ও নিষেধের প্রতি অনুগত হয়ে থাকে। 

প্রত্যেকটি মানুষকে অদৃশ্য জগতের কথা জানার শক্তি দেয়া হয়েছে। হোক তা সে স্বপ্নের মাধ্যমে কিংবা দিব্যজ্ঞানের সাহায্যে অথবা গায়েবী আওয়াজ শুনে বা দূরদৃষ্টি প্রয়োগ করে জানুক। তবে এতটুকু তারতম্য অবশ্যই রয়েছে যেকিছু লোক এক্ষেত্রে পূর্ণতা লাভ করেন এবং কিছু লোক অপূর্ণ থাকে। অপূর্ণদের তাই পূর্ণতা প্রাপ্তদের (বুজর্গদের) শরণাপন্ন হতে হয়। এ ছাড়াও মানুষের কতগুলো বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা অন্যান্য জীবের ভেতর নেই। যেমনবিনয়পবিত্রতান্যায়পরায়ণতাদানশীলতাউদারতাপ্রার্থনালব্ধ ঐশী প্রভাব ইত্যাদি। এ ভাবের আরও কিছু অবস্থা রয়েছে। যেমন কারামত। 

মোট কথা যে সব বৈশিষ্ট্য মানুষকে জীবজগতে স্বাতন্ত্র্য দান করেছে তার সংখ্যা অনেক। তবে সবগুলোরই মূলে হল দুটি শক্তি। (১) জ্ঞান বা বোধশক্তি। এর দুটো শাখা। একটি শাখার ঝোঁক থাকে মানবিক কল্যাণ ও তার সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম দিকগুলোর দিকে। অন্যটির ঝোঁক রয়েছে আল্লাহর কাছ থেকে সরাসরি সব কিছু জানার দিকে। (২) পূর্ণাঙ্গ কর্মশক্তি। এরও দুটো শাখা রয়েছে। একটির সাহায্যে মানুষ নিজের ইচ্ছানুসারে ভাল বা মন্দ কাজ করে থাকে। পক্ষান্তরে জীব-জন্তুর ইচ্ছা-অনিচ্ছার বালাই নেই। ভাল বা মন্দ কাজের ভাবনাও তাদের স্বভাবে নেই। ভাল বা মন্দ কাজ দ্বারা তারা প্রভাবিতও হয় না। তারা তো জৈবিক প্রাণের তাগাদায় চলে ও তার থেকেই শুধু প্রভাবিত হয়। তাই পশুরা এ ক্ষেত্রে বেপরোয়া। কিন্তু মানুষ যখন কোন কাজ করেকাজ ফুরিয়ে গেলেও তার প্রাণ বা প্রভাব থেকে যায় এবং তা তার প্রবৃত্তির খোরাক হয়। ফলে হয় তা থেকে আত্মা আলোকময় হয় অথবা আঁধারের ম্লানিময় আচ্ছাদিত হয়। 

শরীয়ত মানুষকে স্বাধীন ইচ্ছা প্রয়োগ করে কাজ করার ক্ষেত্রেই শুধু জবাবদিহি করা হবে বলে শর্ত দিয়েছে। তার সাথে ডাক্তারের এ শর্তের মিল রয়েছে যেবিষ পানের ক্ষতি ও আফিমের উপকার পেতে হলে তা গিলে পেটে পৌঁছাতে হবে। আমি বলেছিমানুষের প্রবৃত্তি তার কাজের প্রভাব বা প্রাণশক্তি আহরণ করে এ বক্তব্যটি কোন না কোনরূপে আত্মিক সাধনা ও ইবাদতকে মানবকুলের সর্বসম্মত ভাবে ভাল বলে ঘোষণাই তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। কারণতাদের অনুসন্ধিৎসা এর আলোকময়তা সম্পর্কে জেনে ফেলেছে। 

তেমনি মানুষ সর্বসম্মত ভাবেই পাপাচার ও নাফরমানীকে খারাপ বলে জানে। কারণতাদের অনুসন্ধিৎসা তার তমসা ও ক্ষতি দেখতে পেয়েছে। জীব জগতে মানবের স্বাতন্ত্র্য সৃষ্টির দ্বিতীয় শক্তিটির দ্বিতীয় শাখা হল তার উন্নততর অবস্থা ও শ্রেষ্ঠতর মর্যাদা। এ অবস্থা ও মর্যাদা অন্যান্য জীবের নেই। যেমনআল্লাহপ্রীতি ও আল্লাহর নির্ভরতা। 

প্রকাশ থাকে যেপরিমিত স্বভাব মানুষের জাতিগত বৈশিষ্ট্য। অবশ্য তা নিম্ন জিনিসগুলো ছাড়া পূর্ণতা লাভ করতে পারে না। (১) উন্নততর ও উত্তম ব্যক্তির অর্জিত যে বিদ্যাগুলো অন্যান্য মানুষ অনুসরণ করেছেসে সব বিদ্যা অর্জন। (২) আল্লাহর যে বিধি-বিধানে আল্লাহর পরিচিতি এবং কল্যাণময় ব্যবস্থাদি রয়েছেসেই শরীয়ত। (৩) যে সব নীতিমালা মানুষের ইচ্ছাকৃত কার্য-কলাপ নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনের জন্য কার্যগুলোকে ফরজহারামমুস্তাহাবমুবাহ ও মকরুহ এ পাঁচ ভাগে বিভক্ত করেছেসেই নীতিশাস্ত্র। (৪) মানবতার ও মানবিক সভ্যতার পূর্ণ বিকাশ ঘটানোর উপায় উপকরণাদি। 

আল্লাহ তা'আলার অনুগ্রহ ও কলাকৌশল পবিত্র অদৃশ্য জগতে থেকে ব্যক্তি বিশেষকে সব চাইতে মেধাবী ব্যক্তির উপযোগী জ্ঞান দান করে তাঁর দিকে আকৃষ্ট করে। তখন তাঁর কাছ থেকে সে ব্যক্তি উপরোক্ত জ্ঞান অর্জণ করে নেয়। তারপর অন্যান্য ব্যক্তিরা তাকে অনুসরণ করে। মধুমক্ষিকার ঝাঁক যেভাবে তাদের রাজ মক্ষিকা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়এও তেমনি ব্যাপার। যদি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে রাজ মক্ষিকাকে সেই শক্তি না দেয়া হততা হলে মধুমক্ষিকার ঝাঁকের এ গৌরবজনক কীর্তিকলাপ সম্ভব হত না। 

সে ভাবে কেউ যখন দেখে যেকোন জন্তু ঘাস ছাড়া বাঁচে নাতখন সে অবশ্যই বিশ্বাস করেতার জন্য কোন না কোন চারণ ক্ষেত্র সৃষ্টি করে রাখা হয়েছে। ঠিক সেভাবেই আল্লাহ পাকের কলা-কৌশল নিয়ে যারা চিন্তা-ভাবনা করেতারা অবশ্যই বিশ্বাস রাখে যেআল্লাহ তা'আলা নিশ্চয়ই এমন কতক বিদ্যা কোথাও না কোথাও দান করে রেখেছেন যার সাহায্যে মানুষ তার জ্ঞানগত অভাব অভিযোগ দূর করে পূর্ণত্ব লাভ করতে পারে। 

মোটকথা এ সব বিদ্যার অন্যতম হল স্রষ্টার একত্ব ও গুণাবলী সম্পর্কিত জ্ঞান। এ বিদ্যাটি এরূপ সুস্পষ্টভাবে বিশ্লেষিত হওয়া উচিত যা প্রত্যেকেই উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়। এরূপ জটিল ও অস্পষ্ট করে তা আলোচনা করা ঠিক নয় যা কারো পক্ষেই জানা ও বুঝা সম্ভব হয় না। তাই সে বিদ্যার বিশ্লেষণ আল্লাহ তাআলা তাঁর পরিচিতির মাধ্যমে দিয়েছেন। 

যেমন তিনি বলেনঃ সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি। সুতরাং তিনি এমন গুণ নিয়ে রয়েছেন যা মানুষ জানে। তারা নিজেরা সেগুলো ব্যবহারও করে। যেমনতিনি চিরঞ্জীবতিনি দেখেনশুনেনক্ষমতা রাখেনইচ্ছা রাখেনকথা বলেনরাগ হনঅসন্তুষ্ট হনদয়া দেখানমালিকানা রাখেনমুখাপেক্ষী হন না ইত্যাদি। সঙ্গে সঙ্গে এটাও প্রমাণ করে দিয়েছেন যেতাঁর এ গুণাবলীর সমকক্ষতা করার ক্ষমতা কারো নেই। সুতরাং তাঁর জীবনদেখা-শুনাক্ষমতাইচ্ছাকথা বলা ইত্যাদি আমাদের কারো মত নয়। এ ভাবে তাঁর প্রত্যেকটি গুণই আমাদের থেকে স্বতন্ত্র ধরনের। 
সেই অতুলনীয়তার ব্যাখ্যা হল এইমরুভূমির বালুবৃষ্টির বিন্দু কিংবা সব গাছপালার পাতা অথবা সকল জীবের শ্বাসপ্রশ্বাস গণনার মতই অসম্ভব ব্যাপার হল আল্লাহর গুণ আমাদের কারো ভেতরে পাওয়া। তিনি তো আঁধার রাতের গর্ভের পিপীলিকার চাল-চলন দেখেন এবং বদ্ধকোঠায় লেপের নিচে কে কি ফাস করে তাও শোনেন। সব গুণের ক্ষেত্রেই তাঁর এ শ্রেষ্ঠত্ব ও অতুলনীয়তা। 

এ বিদ্যার বিভিন্ন শাখার ভেতর রয়েছেউপাসনা পদ্ধতিজীবন ধারণ পদ্ধতিআলোচনা ও সমালোচনা পদ্ধতিসত্য ও ন্যায়ের পথে নিম্নস্তরের লোকের সন্দেহ সংশয় নিরসন বিদ্যাইতিহাস ও বর্ণনা শাস্ত্র (যে বিদ্যায় আল্লাহর অনুগ্রহঅভিলাষকবরহাশর ইত্যাদির বর্ণনা এবং একই মানুষকে বংশানুক্রমে যুগে যুগে আল্লাহ যে যোগ্যতা ও বিবেক-বুদ্ধির পূর্ণত্ব দান করেছেন তার বর্ণনা থাকে) এ সব বিদ্যা অদৃশ্য জগতের অদৃশ্যতম রহস্যের জ্ঞান সমৃদ্ধ মহাজ্ঞানীরা ভেতরেই সীমিত ও সমন্বিত হয়েছিল। এ অবস্থাটিকে আশায়েরা সম্প্রদায় কালামে নফসী’ বা আদি বাক্য আখ্যা দান করেছে। এটা হল জ্ঞানইচ্ছা ও শক্তি ভিন্ন অন্য কিছু। তারপর যখন ফেরেশতা সৃষ্টির মুহুর্ত এলআল্লাহ তা'আলা জানতে পেলেনফেরেশতা সৃষ্টি ছাড়া মানুষের কল্যাণের কাজ সুসম্পন্ন হবে না। জ্ঞানের বিভিণ্ন শাখার মতই ফেরেশততারা মানুষের ভেতর জড়িয়ে ও ছড়িয়ে থাকবে। সুতরাং ফেরেশতাদের তিনি মানুষের প্রতি রহমত হিসেবে সৃষ্টির উদ্দেশ্যে কুন’ (হয়ে যাও) বলা মাত্র হয়ে গেল। তখন তাদের ভেতর অদৃশ্য জগতের অদৃশ্যতম তত্ত্বজ্ঞানীর ভেতর সীমিত ও সমন্বিত জ্ঞানের কিছুটা ঝলকানী দেয়া হল। ফলে তারা আত্মিক জীব হয়ে আত্মপ্রকাশ করল। আল্লাহ পাক এদের ব্যাপারেই বললেন, ‘আরশ বাহী ও তাদের পার্শ্বচররা’ ইত্যাদি।

তারপর যখন শাস্ত্রীয়ধর্মীয় ও জাতীয় পরিবর্তনের মুহুর্ত এলতখন আল্লাহর কৌশলগত প্রয়োজন দেখা দিল কিছু আত্মিক জিনিসের অস্তিত্ব দানের। তখন সে সব জ্ঞান যুগের প্রয়োজন অনুসারে বিস্তারিত ও বিশ্লেষিত হয়ে প্রকাশ পেল। সে সম্পর্কেই আল্লাহ বললেনঃ 
আমি এ জ্ঞানভাণ্ডার (কুরআন)-কে এক কল্যাণময় রাতে অবতীর্ণ করেছি। আমি সতর্ককারী (পূর্বাভাস দাতা) ছিলাম।(সূরা দুখানঃ আয়াত ৩-৪)
এ রাতেই সব হিকমতপূর্ণ ব্যাপার আমার দরবার থেকে নির্দেশ (অর্ডিন্যান্স) আকারে মীমাংসিত ও বণ্টিত হয়

***[উক্ত আয়াতে (لَیۡلَۃٍ مُّبٰرَکَۃٍ)  অর্থাত মোবারকময় রাত বলতে আলেমদের মধ্যে মতভেদ আছে। অনেক আলেম এই রাতকে 'কদরের' রাত বলেছেন অনেকে আবার 'বরাতে'-এর রাতের উল্লেখ করেছেন। কুরআন ও ্হাদিসের আলোকে দু'টি রাতই মোবারকময় রাত এতে কোন সন্দেহ নেই]*** অত্র তারকার মধ্যস্ত লাইন কয়টি বইএর অংশ নয়।

তারপর আল্লাহর কৌশলগত প্রয়োজন এক পুণ্য ও পূত চরিত্রের ব্যক্তিকে নবী হিসেবে মনোনীত করলেন। তাঁকে ওহী ধারণের যোগ্যতাও দান করলেন। এ জন্য উচ্চ স্তর ও উন্নত মর্যাদা নির্দিষ্ট করা হল। যখন তা পাওয়া গেলতখনই মনোনয়ন দেয়া হল এবং উদ্দেশ্য সফলের জন্য তাকে আল্লাহ মাধ্যম বানালেন। তার ওপর নিজ গ্রন্থ অবতীর্ণ করলেন। তাঁকে অনুসরণ করা মানুষের জন্য ফরজ করে দিলেন। হযরত মুসাকে (আঃ) লক্ষ্য করে আল্লাহ তাআলা এ তথ্যই ব্যক্ত করেছেনঃ “(হে মুসা!) আমি আপনাকে আমার (কাজের) জন্য মনোনীত করলাম 
সুতরাং অদৃশ্য জগতের অদৃশ্যতম তত্ত্ব জ্ঞানীর মানুষের জন্য এ সব অমূল্য বিদ্যা নির্ধারিত করে রাখা মানুষের প্রতি তাঁর অপর অনুগ্রহের পরিচয় দেয়। তারপর মানুষের সেবার জন্য ফেরেশতা সৃষ্টি করা মানুষেরই যোগ্যতার প্রতি ইংগিত দান করে। মানুষেরই বিভিন্ন যুগের ভিন্ন ভিন্ন অবস্থাই আল্লাহর বিধানকে পরিবর্তিত ও পরিবর্ধিত করে করে পূর্ণতা দান করেছে। ফলে মানুষের ওপর আল্লাহর (তরফের) দলীল-প্রমাণসুদৃঢ় ও বিজয়ী হল। 

এরপর যদি কেউ প্রশ্ন করেনামায কোত্থেকে ফরজ হলরাসূলের আনুগত্য কি করে ওয়াজিব হলচুরি ও ব্যভিচার কোথায় হারাম হলজবাবে বলবযেখান থেকে গরু ছাগরের ঘাস খাওয়া ফরজ ও মাংস খাওয়া হারাম করা হয়েছেমানুষের ফরজ হারামও সেখান থেকে করা হয়েছে। তেমনি যেখান থেকে মক্ষিকার ঝাঁকের জন্য রাজ মক্ষিকাকে অনুসরণ করা ওয়াজিব করা হলসেখান থেকেই মানুষের জন্য নবীকে অনুসরণ করা ওয়াজিব করা হয়েছে। হ্যাঁতফাত এতটুকু যেপশু-পাখীর জন্য ফরজ হারাম হয় প্রকৃতিগত ইলহামের দ্বারা এবং মানুষ সাধনা লব্ধ ওহীর ও দিব্যজ্ঞানের মাধ্যমে ফরজ হারামের সন্ধান পায়। তারপর অন্যান্যরা পায় ওহীপ্রাপ্ত ব্যক্তির অনুসরণের মাধ্যমে।

অষ্টম পরিচ্ছেদ 

হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (৬) দায়িত্ব তত্ত্ব



📚 হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (পর্ব-৬)
✍🏻শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ্ মুহাদ্দেসী দেহলভী (রহঃ)

দায়িত্ব তত্ত্ব-
আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ 
আমি নভঃমণ্ডলীপৃথিবী ও পাহাড়-পর্বতের সামনে আমার আমানত পেশ করলাম। তারা সে দায়িত্ব বহন করতে অস্বীকার করল। তারা ভয় পেয়ে গেল। অথচ মানুষ সে দায়িত্ব নিল। কারণতারা বড়ই জালিম ও জাহিল। এটা এ কারণেই ঘটল যেআল্লাহ মুনাফিক ও মুশরিক নর-নারীকে শাস্তি দেবেন এবং মুমিন নর-নারীকে অনুগ্রহীত করবেন। আল্লাহ বড়ই ক্ষমাশীল ও দয়ালু (সূরা আহযাবঃ আয়াত ৭২-৭৩)

ইমাম গাজ্জালী ও ইমাম বায়জারী (রঃ) প্রমুখ এটা সুস্পষ্ট করে দিয়েছেন যেএ আয়াতের আমানত’ অর্থ হল আল্লাহ দত্ত দায়িত্ব। আকাশ ও পৃথিবীর অন্য সবাই সভয়ে এ দায়িত্ব পারিহার করেছে। মানুষ এ দায়িত্ব বুঝে নেয়ার কারণেই আল্লাহর আনুগত্যের জন্য যেমন পুরস্কার পাবেতেমনি তাঁর নাফরমানীর জন্য শাস্তিও পাবে। অন্যান্যের কাছে এ দায়িত্ব পেশ করার উদ্দেশ্য হল তাদের যোগ্যতা যাচাই করে নেয়া। তাদের অস্বীকার থেকে প্রমাণিত হয়এত বড় গুরুদায়িত্ব বহনের শক্তি ও সাহস তাদের নেই। মানুষ তা গ্রহণ করে নিজেদের যোগ্যতম বলে প্রমাণ দিল। 

এ ক্ষেত্রে আমার বক্তব্য এইএখানে আল্লাহ পাকের মানুষ বড়ই জালিম ও জাহিল’ মন্তব্যটি মানুষের যোগ্যতার কারণ ইংগিত করেছে। জালিম তাকেই বলা হয়ইনসাফ করার যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি জুলুম করে। তেমনি জাহিল তাকেই বলা যায়জ্ঞানার্জনের যোগ্যতা নিয়ে যে ব্যক্তি মূর্খ থাকে। বস্তুত মানুষ ছাড়া সব সৃষ্টিই হয় শুধু আলিম ও আদিল। তাদের ভেতরে অত্যাচার ও মূর্খতার কোন স্থানই নেই। যেমনফেরেশতা। নয় তারা শুধুই জালিম ও জাহিল। ইলম ও আদলের কোন যোগ্যতাই তাদের নেই। যেমন চতুষ্পদ জন্তু। সুতরাং উক্ত আমানত গ্রহণের যোগ্যতা কেবল তাদেরই থাকতে পারে যাদের ক্ষমতা প্রকৃতিজাত নয়উপার্জনক্ষম। তারপর আয়াতে ( لِّیُعَذِّبَ) শব্দের লাম’ পরিণতি অর্থে এসেছে। অর্থাৎ দায়িত্ব গ্রহণের পরিণতি হল সুখ ও দুঃখ। 

এক্ষণে যদি আপনি সঠিক ব্যাপার বুঝতে চানতা হলে প্রথমে ফেরশতার কথাই খেয়াল করুন। ফেরেশতাদের না আছে ক্ষুৎ-পিপাসানা ভয়-ভাবনা। তেমনি জৈবিক লালসারাগঅহংকার ইত্যাকার বলতে কিছুই নেই। তাদের রুজী রোজগার কিংবা স্বাস্থ্য রক্ষার বালাই নেই। এক কথায় জীবজগতের কোন প্রয়োজনেরই তাদের পরোয়া নেই। তারা থাকেন। তাই কোন বাঞ্ছিত বিধান প্রবর্তনের কিংবা বিরূপ বা অনুকূল মনোভাব গ্রহণের ঐশী নির্দেশ পাওয়া মাত্র সংগে তারা মনে-প্রাণে তা বাস্তবায়নের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েন।

এবারের পশুদের কথা খেয়ার করুন। সেগুলোর অবস্থা শোচনীয়। কতশত মন্দ স্বভাবের পশুদের সাথে তারা আষ্টেপিষ্টে জড়িত। তারা জৈবিক আনন্দ ছাড়া কিছুই বুঝেনা। তাই বস্তুগত স্বার্থভোগ-লালসা ও উত্তেজনার উত্তাল তরংগে তারা ডুবে থাকে। 
অবশেষে মানুষের দিকে লক্ষ্য করুন। আল্লাহ তা'আলা তাঁর পরিপূর্ণ কৌশল প্রয়োগ দ্বারা মানুষের ভেতর পরস্পর বিরোধী দুটো শক্তিরই সমাবেশ ঘটিয়েছেন।
(১) ফেরেশতা প্রকৃতি (বিবেক)। এ প্রকৃতি মানুষের মৌলিক প্রাণ থেকৈ প্রেরণা পায় এবং সেই প্রাণ থেকে তার মৌলিক প্রাণকে অহরহ প্রেরণা যোগায় (যৌগিক প্রাণ মানুষের গোটা দেহে ছড়িয়ে থাকে)। মৌলিক প্রাণের প্রেরণা গ্রহণই ফেরেশতা প্রকৃতির বৈশিষ্ট্য এবং তার ওপরেই সে প্রেরণা প্রাধান্য বিস্তার করে। 
(২) পশু প্রকৃতি (প্রবৃত্তি অন্য সব পশুর ভেতর যে জৈব প্রবৃত্তি রয়েছে সেটাই মানুষের পশু প্রকৃতির ভিত্তি ও উৎস। যে চার উপাদানের মানুষের যৌগিক প্রাণের সৃষ্টিএ প্রকৃতিতেও তা বর্তমান। পশু প্রকৃতি সম্পূর্ণ স্বাধীণ হয়। মৌলিক প্রাণও তার নির্দেশ মেনে নেয়। 
এও স্মরণ থাকা চাইএ দুই শক্তির ভেতর পারস্পরিক দ্বন্দ্ব চলে। কখনও বিবেক প্রবৃত্তিকে ওপরে টানতে চায়। কখনও আবার প্রবৃত্তি বিবেককে টেনে নিচে নামাতে চায়। সেক্ষেত্রৈ বিবেক পরাজিত হলে প্রবৃত্তির প্রভাব প্রকাশ পায় এবং প্রবৃত্তি পরাজিত হলে বিবেকের প্রভাব প্রকাশ পায়। আল্লাহ তা'আলা তো দুটোই প্রকাশের সযোগ দেন। উপার্জণকারী যেটাই উপার্জন করতে চায়তিনি সাধারণত সেটা দেন। যদি কেউ পশু স্বভাবের প্রাধান্য দিতে চায়আল্লাহ তার পথ খুলে দেন। পক্ষান্তরে কেউ যদি ফেরেশতা প্রকৃতির প্রাধান্য রাখতে চায়আল্লাহ পাকও তাকে তার ব্যবস্থা করে দেন। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ 
আল্লাহর পথে যে ব্যক্তি দান করে ও আল্লাহকে ভয় করে এবং ন্যায় কাজকে সমর্থন করেআমি তার জন্য পূণ্য কাজ সহজ করে দেই। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি কার্পণ্য করে ও আল্লাহকে ভয় করেনা এবং সত্যপথকে মিথ্যা বলে আখ্যায়িত করেআমি তার জন্য পাপ কাজ সহজ করে দেই (সুরা লাইলঃ ৫-১০)

অন্যত্র আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ 
(হে রসুল) আপনার প্রভুর অবদানে আমি দলমত নির্বিশেষে ধন্য করে থাকি। এদলকেও দেইও দলকেও দেই। কারণআপনার প্রভু ইহলোকে তাঁর দান-দাক্ষিণ্য কারো জন্য বন্ধ রাখেন না (সুরা বনি ইসরাইল : আয়াত- ২০)

প্রত্যেক শক্তি বা প্রকৃতিতেই সুখ ও দুঃখ রয়েছে। নিজ প্রকৃতির অনুকূল ব্যাপারের অনুভূতিকে বলে সুখ এবং প্রতিকূল ব্যাপার সহ্য করার নাম দুঃখ। দেখুনমানুষকে যখন অবশ (ক্লোরোফর্ম) করার মত কিছু প্রয়োগ করা হয়তখন কোন কিছুই তাকে কষ্ট দিতে পারে না। যদি তার কোন অংগ আগুনে জ্বালানো হয় তা সে টের পাবেনা। কিন্তু যখন তার অবশ অবস্থা কেটে যায়এবং পুনরায় অনুভূতি ফিরে আসে তখন কিরূপ কষ্ট দেখা দেয় তাও জানেন। 

মানুষের অবস্থার সাথে গোলাপ ফুলের বেশ সাদৃশ্য রয়েছে চিকিৎসকরা বলেছেনতার ভেতর তিনটি শক্তি বিদ্যমান। একমৃত্তিকা প্রকৃতি। ঘষে দিয়ে গায়ে লাগালে তা প্রকাশ পায়। দুইজলীয় প্রকৃতি। চিপে পান করলে তা জানা যায়। তিনবায়বীয় প্রকৃতি। তার পরিচয় ঘ্রাণেই মিলে। 

এ সব আলোচনা থেকে জানা গেলমানুষের যোগ্যতাই দায়িত্ব দাবী করে। সুতরাং আল্লাহ তাদের যে দায়িত্ব দিয়ে জবাবদিহির ব্যবস্থা করেছেন সেটা তাদের দাবীরই অনুকূল। তেমনি তাদের ভেতরকার ফেরেশতা প্রকৃতি (বিবেক) এ দাবীই জানায়তার অনুকূল ও উপযোগী কাজগুলো তার জন্য ফরজ (অপরিহার্য) করা হোক এবং প্রতিকূল ও অনুপযোগী পশু প্রকৃতির কাজগুলো হারাম (অবৈধ) করা হোক। তা হলেই সে শাস্তি থেকে বেঁচে গিয়ে শান্তি লাভ করতে পারবে। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

 সপ্তম পরিচ্ছেদ--

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...