বুধবার, ১৫ মে, ২০২৪

দাকায়েকুল আখবার- (২০) দেহ হইতে রূহ্ কবজের বিবরণ

 

📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ২০)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

দেহ হইতে রূহ্ কবজের বিবরণ-
হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, “বান্দার জান কবজের সময় যখন তাহার বাকশক্তি লোপ পাইয়া যায়, তখন তাহার নিকট একের পর এক পাঁচজন ফেরেশতা আগমন করেন। 
সর্বাগ্রে খাদ্য সরবরাহকারী ফেরেশতা সালাম প্রদান করিয়া বলেন, “ওহে আল্লাহর বান্দা! আমি তোমার খাদ্য সংস্থানের কাজে নিযুক্ত ছিলাম, কিন্তু এখন আমি তোমার জন্য পৃথিবীর সমুদয় প্রান্ত তালাস করিয়াও একমুষ্টি অন্ন সংগ্রহ করিতে পারি নাই। অতএব আমি তোমার নিকট হইতে বিদায় গ্রহণ করিতেছি।” 
তারপর দ্বিতীয় ফেরেশতা সালাম করিয়া বলে, ‘ওহে আল্লাহর বান্দা! আমি ছিলাম তোমার পানীয় সরবরাহের কার্যে নিযুক্ত। কিন্তু আজ আমি সমস্ত পৃথিবী অন্বেষণ করিয়াও এক ফোটা পানীয় জল সংগ্রহ করিতে পারি নাই; সুতরাং আমি তোমার নিকট হইতে বিদায় গ্রহণ করিতেছি।” অতঃপর 
তৃতীয় ফেরেশতা সালাম করিয়া বলে, “ওহে আল্লাহর বান্দা! আমি তোমার উভয় পায়ের তত্ত্বাবধানের কাজে নিযুক্ত ছিলাম, কিন্তু আজ সমস্ত পৃথিবী পরিভ্রমণ করিয়াও তোমার জন্য এক কদম পরিমাণ স্থানও পাইলাম না। অতএব আমি তোমার নিকট হইতে বিদায় গ্রহণ করিতেছি।” অনুরূপভাবে 
চতুর্থ ফেরেশতা সালাম প্রদান করিয়া বলে, “ওহে আল্লাহর বান্দা! আমি তোমার নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের নিয়ন্ত্রণ কাজে নিযুক্ত ছিলাম; কিন্তু আজ পৃথিবীর সমস্ত প্রান্ত খুঁজিয়াও তোমার জন্য সামান্য পরিমাণ নিঃশ্বাসও পাইলাম না। অতএব আমি তোমার নিকট হইতে বিদায় গ্রহণ করিতেছি।” 
পরিশেষে পঞ্চম ফেরেশতা উপস্থিত হইয়া সালাম প্রদান করিয়া বলে, “ওহে আল্লাহর বান্দা! আমি তোমার জীবন মৃত্যুর কাজে নিযুক্ত ছিলাম; কিন্তু আজ তোমার জন্য পৃথিবীর সমুদয় প্রান্ত তালাস করিয়াও সামান্য পরিমাণ সময়ও পাইলাম না; সুতরাং আমি তোমার নিকট হইতে চিরবিদায় গ্রহণ করিতেছি।” 
তারপর কেরামান কাতেবীন ফেরেশতাদ্বয় উপস্থিত হইয়া সালাম প্রদান করিয়া বলে, “ওহে আল্লাহর বান্দা! আমরা তোমার জন্য নেকী ও পাপ লিখিবার কাজে নিযুক্ত ছিলাম! কিন্তু আজ সমস্ত পৃথিবীর সমুদয় প্রান্ত তালাস করিয়াও তোমার কোন পাপপুণ্য পাইলাম না। অতএব আমরা তোমার নিকট হইতে চিরবিদায় গ্রহণ করিতেছি।” এইকথা বলিবার পর তাঁহারা কালো বর্ণের একখানি লিখিত পত্র তাহার সামনে উপস্থিত করিয়া বলিবে, “হে আল্লাহর বান্দা! তুমি ইহার প্রতি লক্ষ্য কর।” উহার প্রতি দৃষ্টিপাত করিবামাত্র তাহার সমস্ত শরীর বাহিয়া ঘর্ম নির্গত হইবে এবং কেহ যেন উক্ত লিখিত পত্র পাঠ না করিতে পারে, তজ্জন্য সে ডাইনে এবং বামে বারবার সতর্ক দৃষ্টিপাত করিতে থাকিবে। তারপর কেরামান কাতেবীন ফেরেশতাদ্বয় প্রস্থান করিবে। 
কেরামান কাতেবীন ফেরেশতাদ্বয় প্রস্থান করার সাথে সাথে আজরাইল ফেরেশতা তাহার ডানদিকে রহমতের ফেরেশতা ও বামদিকে আযাবের ফেরেশতা সহকারে আগমন করিবেন। তাহাদের মধ্যে কেহবা রূহ্‌কে অত্যন্ত জোরে টানিতে থাকিবে আবার কেহবা খুব শান্তির সহিত রূহকে বাহির করিবে। মৃতব্যক্তি যদি পুণ্যবান হয় তবে রহমতের ফেরেশতাদিগকে ডাকা হইবে৷ তখন তাহারা মৃতব্যক্তির রূহসহকারে শূন্যে আরোহণ করিবেন। দয়াময় আল্লাহ তায়ালা তখন বলিবেন, “ওহে ফেরেশতাগণ! উক্ত রূহকে মৃতের শরীরের মধ্যে পুনরায় প্রবেশ করাও, যেন সে শরীরের অবস্থা নিজে প্রত্যক্ষ করিতে সক্ষম হয়।” তারপর ফেরেশতাগণ রূহকে গৃহের মধ্যস্থলে রাখিবে। তখন মৃতের রূহ তাহার জন্য শোকসন্তপ্ত ও বেখেয়াল লোকদিগকে চিনিতে পারিবে, কিন্তু কোন কিছুই বলিতে পারিবে না। তারপর জানাযা সম্পাদনের পর মৃতদেহ গোর দিবামাত্রই আল্লাহ তা'আলার রহমতে মৃতব্যক্তির শরীরে আত্মার বিকাশ ঘটিতে থাকিবে। এ সম্পর্কে আলেমদের মধ্যে মতভেদ পরিলক্ষিত হয়। 
(ক) কেহ বলেন, “শরীরের মধ্যেই রূহ প্রবেশ করে, যেমন পৃথিবীতে ছিল। তখন তাহাকে বসান হয় এবং জিজ্ঞাসা করা হয়।” 
(খ) আবার কেহ বলেন , “রূহ শরীরেই প্রবেশ করে, কিন্তু তারপরে কি হয়, তাহা অজ্ঞাত৷” 
(গ) কেহ বলেন, “রূহকেই প্রশ্ন করা হয়, শরীরকে নহে।” 
(ঘ) কেহ বলেন, “রূহ দেহের মধ্যেই বক্ষ পর্যন্ত বিরাজ করে।” 
(ঙ) আবার কেহ বলেন, “রূহ্ বা আত্মা শরীর অথবা কাফনের মধ্যে বিরাজ করে।” তবে প্রত্যেক মতের সপক্ষে হযরত নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) হইতে হাদীস বর্ণিত রহিয়াছে।" 
আলেমগণের সহীহ্ মত এই যে, কবরের আযাব সত্য। তবে ইহার প্রকার ও প্রকৃতি সম্পূর্ণ অজ্ঞাত। প্রখ্যাত ফকীহ আবু লায়েস (রহঃ) বলিয়াছেন, “যে ব্যক্তি কবরের আযাব হইতে রেহাই পাইতে চায়, সে যেন চারিটি কার্য সম্পাদন করে এবং চারিটি কার্য বর্জন করে। পালনীয় চারিটি কার্য হইল যে, 
(ক) নিয়ম মত নামায আদায় করা, 
(খ) দান-খয়রাত করা, 
(গ) পবিত্র কোরআন শরীফ পাঠ করা এবং 
(ঘ) অধিক পরিমাণে তাসবীহ পাঠ করা। 
তাহা হইলে অবশ্যই এই কাজগুলির বরকতে বিভিন্ন প্রকার গোর আযাব হইতে পরিত্রাণ পাওয়া যাইবে।

আর বর্জনীয় চারিটি কার্য হইল, (ক) মিথ্যা বলা (খ) কাহারও গীবত গাওয়া, (গ) চোগলখুরী করা এবং (ঘ) প্রস্রাব হইতে শরীরকে পাক না রাখা ইত্যাদি ।” 
জনাব হুযুর করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিয়াছেন, “তোমরা প্রস্রাব হইতে পবিত্র থাক, কারণ অধিকাংশ কবর আযাব ইহার জন্যেই হইয়া থাকে”।
কবরে  মনকির ও নকীর নামক অত্যন্ত কৃষ্ণবর্ণ, নির্দয়-নিষ্ঠুর আরক্তিম লোচন, বজ্রের ন্যায় ভীষণ আওয়াজকারী, বিদ্যুতের ন্যায় চোখের জ্যোতি বিনষ্টকারী এবং মাটি ভেদকারী ও দীর্ঘ নখবিশিষ্ট ভয়ংকর আকৃতির দুইজন ফেরেশতা কবরে প্রবেশ করিবে এবং মৃত ব্যক্তিকে নাড়িয়া চাড়িয়া ও বসাইয়া জিজ্ঞাসা করিবে - “মান রাব্বুকা” অর্থাৎ তোমার প্রতিপালক কে? “ওয়ামা দ্বিনুকা” অর্থাৎ তোমার ধর্মের নাম কি? “ওয়ামান নাবিয়্যুকা” অর্থাৎ তোমার নবী কে? প্রত্যুত্তরে নেককার বান্দাগণ বলিবেনI “রাব্বিয়াল্লাহু” অর্থাৎ আল্লাহ। আমার প্রতিপালক আল্লাহ্। “ওয়াদ্বিনি ইসলামু” অর্থাৎ আমার ধর্ম ইসলাম। “ওয়া নাবিয়্যি মুহাম্মাদুন” অর্থাৎ হযরত মুহাম্মদ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আমার নবী। এই উত্তরে ফেরেশতাদ্বয় পরিতুষ্ট হইয়া তাহাকে বলিবে, “হে আল্লাহর প্রিয় বান্দা” ! তুমি সেই নতুন বরের মত আরামে শুইয়া থাক  যাহাকে তাহার অতি প্রিয়জন ছাড়া কেহ জাগরিত করে না।” তারপর তাহার মাথার কিনারা দিয়া বেহেশতের দিকে জানালা খোলা হইবে, যাহা দ্বারা সেই ব্যক্তি বেহেশতের বাগান, আরামের স্থান ইত্যাদি যাহা কিছু তাহাকে বেহেশৃতে প্রদান করা হইবে, সবকিছুই দেখিবে। পরিশেষে উভয় ফেরেশতা তাহার রূহ্ লইয়া কবর হইতে বাহির হইয়া যাইবে এবং আরশে মোয়াল্লার নীচে ঝুলন্ত প্রদীপে উহা রাখিবে। 
হযরত আবু হোরায়রা (রাঃ) হইতে হাদীসে কুদসীতে বর্ণিত আছে যে, জনাব হুযুর করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিয়াছেন, “আল্লাহ্ তায়ালা এরশাদ করেন- ‘আমার বান্দাগণের মধ্য হইতে যাহাদিগকে আমি ক্ষমা করিতে ইচ্ছা করি তাহাদের গুনাহসমূহকে শরীরের রোগ-শোক অথবা দারিদ্র্যতার নিষ্পেষণে, অথবা দুঃখ-কষ্টে নিপতিত করিয়া দেই। এর পরও যদি গুনাহরাশি বাকী থাকে, তবে তাহার মৃত্যুকষ্ট কঠিন করিয়া দেই যাহাতে সে নিষ্পাপ অবস্থায় আমার সহিত সাক্ষাত করিতে সক্ষম হয়। 'আর আল্লাহ তায়ালা স্বীয় মান-সম্মান ও প্রতিপত্তির শপথ করিয়া বলিয়াছেন, 'আমার বান্দাগণের মধ্যে যাহাদের গুনাহরাশি আমি মার্জনা করিতে চাইনা, তাহাদিগকে এই পৃথিবীতেই তাহাদের কৃতকর্মের প্রতিফলস্বরূপ সুস্থ-সবল ও আনন্দমুখর এবং অঢেল পরিমাণে ভোগ্যপণ্য প্রদান করিয়া সুখ-শান্তিতে নিমগ্ন রাখি। তারপরও যদি কিছুটা পুণ্য অবশিষ্ট থাকিয়া যায়, তবে তাহার মৃত্যুকষ্ট লাঘব করিয়া থাকি।”
হযরত আওয়াদ (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, “একদিন আমরা হযরত আয়েশা (রাঃ) এর নিকট বসিয়াছিলাম। এমন সময় অকস্মাৎ একটি তাঁবু ছিড়িয়া একজন লোকের উপর পতিত হইলে আমরা সকলেই হাস্য সংবরণ করিতে পারিলাম না। তখন হযরত আয়েশা (রাঃ) বলিলেন, আমি জনাব হুযুর করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উনাকে বলিতে শুনিয়াছি যে, মুমিন বান্দার শরীরে কাঁটা প্রবেশ করিলেও আল্লাহ তায়ালা তাহার পাপ মার্জনা করিয়া দেন এবং উচ্চ মর্যাদা প্রদান করেন।
জনৈক বুযর্গ বলিয়াছেন, “নিরোগ দেহ উৎকৃষ্ট নহে এবং বিপদশূন্য ধন-সম্পদও উৎকৃষ্ট নহে।” জনাব হুযুর করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিয়াছেন, “যখন কাহারও ‘মরজগৎ’ ত্যাগ করিয়া পরজগতে যাওয়ার সময় নিকটবর্তী হয়, তখন সূর্যের ন্যায় উজ্জ্বল চেহারাসম্পন্ন একদল ফেরেশ্তা বেহেশতী কাফন ও সুগন্ধি লইয়া তাহার দৃষ্টিপথে বসিয়া থাকে। তারপর মৃত্যুদূত তাহার মাথার পার্শ্বে বসিয়া আরজ করে, হে প্রশান্ত আত্মা ! আল্লাহর রহমত ও রেজামন্দির জন্য অতি সত্বর বাহির হইয়া আস।” রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, “তখন রূহ্ বাহির হইয়া আসে এবং তাহার মুখ হইতে পানির ফোটা পড়িতে থাকে, যেমন মশক হইতে পতিত হয়। তারপর ফেরেশতাগণ তাহার রূহ্‌কে সযত্নে ধরিয়া উক্ত কাফনের মধ্যে রাখে এবং উহা হইতে মেশকের সুগন্ধ বাহির হয়। অবশেষে ফেরেশতাগণ যখন তাহার রূহ লইয়া বেহেশত রাজ্যে আরোহণ করিতে থাকে, তখন অন্যান্য ফেরেশতাগণ জিজ্ঞাসা করে, এই উৎকৃষ্ট সুগন্ধি কোথা হইতে আসিতেছে? প্রত্যুত্তরে বলা হয়, অমুকের পুত্র অমুকের রূহ্ হইতে এই সুগন্ধি বাহির হইতেছে। তখন ফেরেশতাগণ তাহাকে উত্তম নামে সম্বোধন করে। আর যখন ফেরেশতাগণ রূহ সহকারে প্রথম আসমানের দ্বারদেশে উপনীত হয়, তখনই সপ্ত আকাশের সাতটি দরওয়াজা খুলিয়া যায় এবং প্রত্যেক আসমান হইতে কিছু সংখ্যক ফেরেশতা তাহার শুভ গমনার্থে অভ্যর্থনার জন্য অগ্রসর হয়। এইভাবে সপ্তাকাশে আরোহণ করিলে আল্লাহ তা'আলার নিকট হইতে " উচ্চৈঃস্বরে ঘোষণা করা হয়, “হে ফেরেশ্তাগণ! তাহার আমলনামা- 'ঈল্লিন’ নামক স্থানে রাখ এবং তাহার শরীরকে মাটিতে মিশাইয়া দাও। কারণ তাহাকে আমি মাটি হইতেই পয়দা করিয়াছি, এ মাটিতেই ফিরাইয়া আনিব এবং সেই মাটি হইতেই পুনরুত্থান করিব।” তখন ফেরেশ্তাগণ রূহকে শরীরের সহিত মিশ্রিত করিয়া দেয়। তারপর মনকীর নকীর নামক দুইজন ফেরেশতা আগমন করেন এবং মৃত ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসা করেন, “হে আল্লাহর বান্দা ! বল, তোমার মাবুদ কে? তোমার নবী কে? এবং তোমার ধর্ম কি?” তারপর হযরত মুহাম্মদ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর প্রতি ইঙ্গিত করিয়া বলেন, হে আল্লাহর বান্দা! এ প্রেরিত পুরুষ সম্বন্ধে তোমার অভিমত কি? মুমিন বান্দাগণ প্রত্যুত্তরে বলেন, “তিনি আল্লাহর প্রেরিত রাসূল। তাঁহার উপরই আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআন শরীফ নাযিল করিয়াছেন। এইজন্য আমি ইহাকে সত্য জানিয়া ঈমান আনয়ন করিয়াছি।” তখন উদাত্ত কণ্ঠে আল্লাহ তা'আলা ঘোষণা করেন , “হে ফেরেশতাগণ! আমার বান্দা সত্য কথাই বলিয়াছে। অতএব তাহাকে বেহেশ্তী লেবাসে সুসজ্জিত করিয়া বেহেশতী বিছানা পাতিয়া দাও। আর তাহার জন্য বেহেশতের দিকে একটি দরওয়াজা খুলিয়া দাও , যাহাতে বেহেশতী সুগন্ধি তাহার কবরে প্রবেশ করিতে পারে। আর দৃষ্টিশক্তির শেষ সীমা পর্যন্ত তাহার কবরকে প্রশস্ত করিয়া দাও।” 

হযরত রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আরও এরশাদ করিয়াছেন যে, “তখন একজন গৌরকান্তি বিশিষ্ট সুন্দর সুপুরুষ আগমন করিবেন এবং তাঁহার শরীর হইতে সুগন্ধ বাহির হইবে। তিনি বলিবেন, ‘হে আল্লাহর বান্দা ! তোমার সৃষ্টিকর্তা তোমাকে যে সকল সুসংবাদ প্রদান করিয়াছেন, আমিও তোমাকে সেইসব সুসংবাদ প্রদান করিতেছি। উক্ত বান্দা তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিবে ‘আপনি কে? আল্লাহ তা'আলা আপনার উপর শান্তি বর্ষিত করুন। আপনার মত সুন্দর সুপুরুষ আর কাহাকেও দেখি নাই।' প্রত্যুত্তরে তিনি বলিবেন, ‘আমি তোমার নেক আমল!’  

আর যখন কাফেরের মৃত্যু নিকটবর্তী হয়, তখনও আকাশ হইতে ফেরেশ্তাগণ দোযখের পোশাক লইয়া তাহার দৃষ্টি সীমার মধ্যে বসিয়া থাকে। তারপর মৃত্যুদূত তাহার পার্শ্বে উপবেশন করে এবং অল্পক্ষণের মধ্যেই তাহার পাপাত্মাকে জোরপূর্বক অত্যন্ত যন্ত্রণাসহকারে ছিনাইয়া আনে। যেমন শিক কাবাব হইতে শিক বাহির করা হয়। তারপর ফেরেশ্তাগণ কাফেরের পাপাত্মাকে খুব প্রহার করিয়া দোযখের পোশাকে আচ্ছাদিত করিয়া দেয়। তখন আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যবর্তী অবস্থিত যাবতীয় প্রাণী ও বস্তু নিয়া তাহাকে অভিসম্পাত করে। তাহাদের লানত বাণী মানব-দানব ছাড়া সকলেই শ্রবণ করে। আর কাফেরের রূহ্ লইয়া ফেরেশ্তাগণ ঊর্ধ্বাকাশে আরোহণ করিবামাত্রই আকাশের সমস্ত দরজাগুলি বন্ধ হইয়া যায় এবং আল্লাহ তা'আলার নিকট হইতে ঘোষণা করা হয়, ‘হে ফেরেশ্তাগণ! এই কাফেরের রূহকে কবরের মধ্যে পুঁতিয়া রাখ।' তখন তাহারা তাহাকে কবরের মধ্যে পুঁতিয়া রাখিয়া বিদায় হইয়া যায়। তারপর মনকির নকীর ফেরেশ্তাদ্বয় ভীষণ আকার ধারণ করতঃ সেখানে আগমন করে। তাহাদের কণ্ঠস্বর মেঘের গর্জনের মত ভয়ঙ্কর ও ভীতিপ্রদ হইবে এবং চক্ষুদ্বয়ের জ্যোতি বিদ্যুতের মত প্রখর ও তীর্যক হইবে। তাহারা দাঁত, নখ দ্বারা মাটিভেদ করিয়া কবরে প্রবেশ করিবে এবং বিধর্মী কাফেরকে উপবেশন করাইয়া জিজ্ঞাসা করিবে; ‘হে আল্লাহর বান্দা ! বল, তোমার রব কে?’ প্রত্যুত্তরে সে বলিবে ‘হায় ! হায় ! আমি সে সম্বন্ধে কিছুই অবগত নই।' তাহারা আবার জিজ্ঞাসা করিবে, 'তুমি নিজের জ্ঞান দ্বারা ও পবিত্র কোরআন শরীফ পাঠ করিয়া তাহা জানিয়া লও নাই কেন?' অতঃপর আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হইতে ঘোষণা করা হইবে, ‘হে ফেরেশ্তাগণ! তাহাকে ভীষণ হাতুরী দ্বারা বেদম পিটাইতে থাক।' হাতুরীটি এমন ভারী হইবে যে, সমস্ত মাখলুকাত মিলিয়াও উহা স্থানান্তরিত করিতে সক্ষম হইবে না। উহাতে তাহার কবর আগুনে লালে লাল হইয়া যাইবে এবং কবরটি এতই সৎকীর্ণ হইয়া যাইবে যে, একবাহু অন্যবাহুতে প্রবেশ করিয়া যাইবে। তারপর অত্যন্ত দুর্গন্ধময় ও কুৎসিত চেহারাবিশিষ্ট একব্যক্তি তাহার সন্নিধানে আসিয়া বলিবে, ‘আল্লাহ তা'আলা আমার দ্বারা তোমার প্রভূত ক্ষতি সাধন করুন। আল্লাহর শপথ, তুমি পৃথিবীতে পাপকাজ ছাড়া ভাল কাজ কর নাই। আল্লাহর এবাদতে তুমি অত্যন্ত অলস ছিলে, কিন্তু পাপ ও মন্দ কাজে তুমি অত্যন্ত কর্মঠ ও চপল ছিলে।’ মৃতব্যক্তি তাহাকে জিজ্ঞাসা করিবে, ‘হে বন্ধু ! তুমি কে? তোমার মত কুৎসিত লোক ইহজগতে আমি কাহাকেও দেখি নাই।' উত্তরে সে বলিবে, 'আমি তোমার পাপকার্যসমূহ। তারপর তাহার কবর হইতে দোযখের দিকে একটি সুরঙ্গ পথ খুলিয়া দেওয়া হইবে। যাহাদ্বারা সে তাহার দোযখের আবাস দেখিতে পাইবে।
হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, মুমিন বান্দাকে কবরে মাত্র সাতদিন পর্যন্ত পরীক্ষা ও আজমায়েশ করা হয় এবং কাফের বান্দাকে কবরে চল্লিশ দিন পর্যন্ত পরীক্ষা করা হয়। 
হযরত নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আরও বলিয়াছেন যে, ‘যাহারা শুক্রবার দিবসে কিংবা রাত্রিতে মৃত্যুমুখে পতিত হয়, আল্লাহ তা'আলা তাহাদিগকে গোর আযাব হইতে অনেকাংশে রক্ষা করিয়া থাকেন।'
হযরত আবু উমামা বাহেলী (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, যখন কোন ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করে এবং তাহাকে কবরে রাখা হয়, তখন একজন ফেরেশ্তা তাহার মস্তকের পার্শ্বে বসিয়া আযাব করিতে শুরু করে। উক্ত ফেরেশতা একবার লৌহদণ্ড দ্বারা প্রহার করিবামাত্র তার সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ চূর্ণ-বিচূর্ণ হইয়া যায় এবং সম্পূর্ণ কবরটি আগুনের লেলিহান শিখায় জ্বলিতে থাকে। পুনরায় সেই ফেরেশতা আল্লাহ তা'লার আদেশে ‘উঠ’ বলিবা-মাত্র সে সুস্থ সবল দেহে উঠিয়া বসে এবং এমন উচ্চৈঃস্বরে চীৎকার আরম্ভ করে যে, আকাশ ও পাতালের মধ্যস্থিত মানব-দানব ছাড়া অন্য সবকিছুই সেই চীৎকার শুনিতে পায়। সে ফেরেশ্তাকে জিজ্ঞাসা করে, হে আল্লাহর ফেরেশতা ! তুমি আমাকে এহেন কঠিন আযাব প্রদান করিতেছ কেন? আমি নামায আদায় করিয়াছি, যাকাত আদায় করিয়াছি, রমজান মাসের রোযা রাখিয়াছি এবং বিভিন্ন পুণ্যকর্ম সম্পাদন করিয়াছি। প্রত্যুত্তরে ফেরেশতা বলিবে, 'হে আল্লাহর বান্দা ! একদিন তুমি কোন এক অত্যাচারিত ব্যক্তির নিকট দিয়া গমন করিতেছিলে এবং সে অত্যাচারিত হইয়া তোমার নিকট সাহায্য ভিক্ষা করিয়াছিল, কিন্তু তখন তুমি উহা উপেক্ষা করিয়াছিলে। আর একদিন তুমি প্রস্রাব হইতে সঠিকভাবে পাক না হইয়াই নামায পড়িয়াছিলে।' 
এই প্রসঙ্গে হযরত রাসূল মাকবুল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করিয়াছেন, “যে ব্যক্তি মজলুম বা অত্যাচারিতের সাহায্যার্থে অগ্রসর হইবে না, তাহাকে কবরের মধ্যে একশত আগুনের দোররা মারা হইবে।” হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, জনাব রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করিয়াছেন যে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা চারিটি সম্প্রদায়কে নূরের মিম্বরের উপর উপবেশন করাইবেন এবং নিজ রহমতের ছায়ার নীচে দাখিল করাইবেন। সাহাবাগণ আরজ করিলেন, 'হে আল্লাহর রাসূল  তাহারা কোন শ্রেণীর লোক?’ মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করিলেন, 'যাহারা ক্ষুধার্তকে অনুদান করিয়াছে এবং ধর্মযোদ্ধাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করিয়াছে, দুর্বলকে সাহায্য করিয়াছে আর মজলুম ও অত্যাচারীতের ডাকে সাড়া দিয়াছে!’  
হযরত আনাস ইবনে মালেক (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, হযরত রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করিয়াছেন, ‘যখন মৃত ব্যক্তিকে কবরে রাখিয়া মাটি চাপা দেওয়া হয় আর তাহার সন্তান- সন্ততি ও আত্মীয়-স্বজন ‘হে কুলশীল সর্দার!' বলিয়া তাহাকে সম্বোধন করিতে থাকে, তখন কবরের জন্য নির্ধারিত ফেরেশতা তাহাকে প্রশ্ন করে, ‘হে আল্লাহর বান্দা ! তুমি উহাদের কথা শুনিতেছ কি?’ প্রত্যুত্তরে সে বলে, 'হাঁ'। পুনরায় জিজ্ঞাসা করে, 'আচ্ছা তুমি কি প্রকৃতই সম্ভ্রান্ত নেতা ছিলে? উত্তরে আল্লাহর বান্দা বলে, “না না, আমি কস্মিন কালেও তদ্রূপ ছিলাম না। বরঞ্চ তাহারা মিথ্যাকথা বলিতেছে। আমি মহাধিরাজ আল্লাহর নিকৃষ্টতম বান্দা ছিলাম মাত্র।' তখন মৃতব্যক্তি নিতান্ত পরিতাপ সহকারে পুনরায় বলে, ‘হায় তাহারা যদি আর কিছুই না বলিত, তাহা হইলে কতই না ভাল হইত্।'  অতঃপর তাহার কবর এতই সংকীর্ণ হইয়া যায় যে, এক দিকের পাঁজর অন্য পাজরে প্রবেশ করে এবং মৃতব্যক্তি চীৎকার করিয়া বলে ‘হায় ! হায় ! ইহা হাড় ভাঙ্গার জায়গা, লজ্জা ও অনুশোচনার জায়গা এবং কঠিন প্রশ্নের জায়গা।' 
অনুরূপভাবে রজব মাসের প্রথম শুক্রবার রাত্রিতে (লাইলাতুল রাগায়েব) আল্লাহ পাক ফেরেশ্তাদিগকে ডাকিয়া বলেন, “হে ফেরেশ্তাগণ ! তোমরা সাক্ষী থাক, আমি তাহার গুনাহসমূহ মার্জনা করিয়া দিলাম। কারণ সে এই রাত্রিতে আমার উপাসনায় অতিবাহিত করিয়াছিল।” 

পরবর্তী পর্ব
মনকির নকীরের পূর্ববর্তী ফেরেশতার বিবরণ

দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ১৯) বিপদে ধৈর্য্য অবলম্বন করা



📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ১৯)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

বিপদে ধৈর্য্য অবলম্বন করা 
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, হযরত রাসুলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করিয়াছেন, কলম সর্বপ্রথম আল্লাহ তা'আলার নির্দেশে লৌহ মাহফুজে এই কথাগুলি লিখিয়াছে, “আমিই উপাস্য, একমাত্র উপাস্য। আমি ছাড়া অন্য কোন উপাস্য নাই। আর হযরত মুহাম্মদ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আমার প্রিয় বান্দা ও রাসূল। আমার সৃষ্টজীবের মধ্যে তিনিই সর্বশ্রেষ্ঠ।” লৌহে মাহফুজে আরও লেখা হইল, যাহারা আমার বিধি-নিষেধ প্রতিপালন করিবে, আমার নেয়ামতের শোকর গুজারী করিবে, আর বিপদে ধৈর্যধারণ করিবে, তাহাদিগকে আমি কিয়ামতের দিন সাহাবিগণের মধ্যে পরিগণিত করিব এবং যাহারা আমার আদেশ নিষেধ অগ্রাহ্য করিবে, বিপদে অধৈর্য হইবে আর আমার প্রদত্ত নেয়ামতের শোকর গুজারী করিবে না, তাহারা যেন আমার আকাশের সীমানা ছাড়িয়া অন্য কোথাও চলিয়া যায় এবং আমাকে ছাড়া অন্যকে উপাস্যরূপে খুঁজিয়া লয়। হযরত ফকিহ আবু লায়েস (রহঃ) বলিয়াছেন, “বিপদে ধৈর্যধারণ করতঃ আল্লাহ তায়ালাকে স্মরণ করা প্রত্যেক মানুষের একান্ত দরকার। কারণ, সেই সময় আল্লাহ তায়ালাকে স্মরণ করিলে তাঁহার হুকুম প্রতিপালিত হয় এবং শয়তানকে তিরস্কার করা হয়। আর ইহাতে আল্লাহ তা'আলা সেই বান্দার প্রতি খুশী হন।” 
হযরত আলী (রাঃ) বলিয়াছেন, “ধৈর্য তিন শ্রেণীতে বিভক্ত। যেমন— এবাদত-বন্দেগীতে ধৈর্যধারণ করা, বিপদে ধৈর্যধারণ করা এবং বালা-মছিবতে ধৈর্যধারণ করা। 
যাহারা এবাদত-বন্দেগীতে ধৈর্য অবলম্বন করিবে, আল্লাহ তায়ালা তাহাদিগকে রোজকিয়ামতে তিনশত উচ্চস্থান বা উচ্চমর্যাদা প্রদান করিবেন এবং প্রত্যেক দুই স্থানের মধ্যবর্তী উচ্চতা আকাশ পাতালের সমতুল্য হইবে। আর যাহারা বিপদে ধৈর্যধারণ করিবে, তাহাদিগকে রোজকিয়ামতে সাতশত মর্তবা প্রদান করা হইবে। প্রত্যেক দুই মর্তবার উচ্চতা আসমান যমিনের সমতুল্য হইবে। আর যাহারা বালা-মছিবতে ধৈর্য অবলম্বন করিবে, আল্লাহ তায়ালা তাহাদিগকে নয়শত মর্তবা প্রদান করিবেন, প্রত্যেক দুই মতবার উচ্চতা আরশ ও ভূ-মণ্ডলের সমতুল্য হইবে।”

পরবর্তী পর্ব
দেহ হইতে রূহ্ কবজের বিবরণ-

দাকায়েকুল আখবার- (১৮) মৃতের জন্য বিলাপ করিবার পরিণাম

 

📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ১৮)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

মৃতের জন্য বিলাপ করিবার পরিণাম -
হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে, “যে ব্যক্তি বিপদে ধৈর্যধারণ করিতে না পারিয়া স্বীয় বস্ত্র ছিঁড়িয়াছে, কিংবা বুকে আঘাত হানিয়াছে সে ব্যক্তি যেন তীর, বর্শা লইয়া আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছার বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করিয়া দিয়াছে। হযরত নবীয়ে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিয়াছেন, “বিপদের সময় যে ব্যক্তি দরওয়াজা বা বস্ত্র কৃষ্ণবর্ণ করিয়াছে, অথবা ছিঁড়িয়াছে অথবা দোকান পাট নষ্ট করিয়াছে, কিংবা গাছ পালা তুলিয়াছে বা স্বীয় অঙ্গের পশম তুলিয়াছে, আল্লাহতায়ালা তাহার প্রতিটি পশম ও উৎপাদিত বৃক্ষের পাতার পরিবর্তে তাহার জন্য দোযখে একটি গৃহ তৈরী করিবেন এবং সে যেন আল্লাহ তায়ালার সহিত শরীক করিল ও সত্তরজন নবীকে হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হইল। যতদিন এই কালো দাগ থাকিবে, ততদিন আল্লাহ তা'আলা তাহার কোন ফরজ-নফল এবাদত, দান-খয়রাত ও দোয়া কবুল করিবেন না। আর আল্লাহ তা'আলা ঐ ধরনের ক্রোধসম্পন্ন ব্যক্তিদিগকে- যাহারা বিপদে ধৈর্য অবলম্বন করে নাই, তাহাদের কবরকে সংকীর্ণ করিয়া দিবেন এবং কঠিনভাবে তাহাদের হিসাব গ্রহণ করিবেন। আকাশমণ্ডল ও ভূূমণ্ডলে যাহা কিছু রহিয়াছে, সমুদয় জীব-জানোয়ার তৃণলতা ও ফেরেশতাগণ তাহার উপর আল্লাহ তায়ালার অভিসম্পাত কামনা করিবে এবং তাহার নামে এক হাজার পাপ লিখিত হইবে আর তাহাদিগকে উলঙ্গ অবস্থায় কবর হইতে বাহির করা হইবে।”
আর বিপদে অধৈর্য হইয়া যে ব্যক্তি জামার পকেট ছিঁড়িয়া ফেলিবে, আল্লাহ পাক তাহার ধর্ম বিনষ্ট করিয়া দিবেন। বিপদে অধৈর্য হইয়া যে ব্যক্তি নিজ গণ্ডদেশে চপেটাঘাত করিবে কিংবা মুখমণ্ডলের কোন অংশ জখম করিয়া ফেলিবে, আল্লাহ তা'আলা তাহার জন্য স্বীয় দর্শন (সাক্ষাত) হারাম করিয়া দিবেন।

হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে, যখন কোন ব্যক্তি মৃত্যুমুখে পতিত হয়, তখন কেহ যদি উচ্চৈঃস্বরে ক্রন্দন করিতে করিতে সেই গৃহে প্রবেশ করে, তাহা হইলে মালাকুল মউত সেই গৃহের দরওয়াজায় দাঁড়াইয়া ঘোষণা করেন, “হে মানবমণ্ডলী! তোমরা এরূপ করিতেছ কেন? আমি তোমাদের কাহারও হায়াত বা ধন-সম্পদ বিনষ্ট করি নাই এবং কাহারও উপর অত্যাচার করি নাই। তোমরা যদি আমার কাজে অসন্তুষ্ট হইয়া ক্রন্দন করিয়া থাক, তবে জানিয়া রাখিও, আমি আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ পালনকারী দাসানুদাস মাত্র। আর যদি মৃত ব্যক্তির জন্য ক্রন্দন করিয়া থাক, তবে জানিয়া রাখিও, সে ছিল নিতান্ত অসহায়। আর যদি আল্লাহ তা'আলার আদেশের কারণে ক্রন্দন করিয়া থাক, তবে তোমরা আল্লাহ তা'আলার শোকর গুজারী হইতে বঞ্চিত হইয়া কুফুরী করিতেছ। আল্লাহর শপথ দিয়া বলিতেছি যে, অবশ্যই তোমাদের নিকটও আমাকে আসিতে হইবে আর তোমরা কেহই আমার হাত হইতে রেহাই পাইবে না।”

ফকীহগণের অভিমত এই যে, মৃত ব্যক্তির জন্য উচ্চৈঃস্বরে চীৎকার করা হারাম; কিন্তু আওয়াজহীন ক্রন্দনে কোন ক্ষতি নাই তবে ধৈর্যধারণ করাই সর্বোত্তম। আল্লাহ তা'আলা এরশাদ করিয়াছেন- “ইন্নামা ইয়াতাওফ্‌ফাছ ছাবিরুনা আজরুহুম বিশ্বাইরি হিছাব”  অর্থাত: - “অবশ্যই ধৈর্যশীলদিগকে অসংখ্য প্রতিদান প্রদান করা হইবে।”  হযরত নবীয়ে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিয়াছেন, “উচ্চৈস্বরে ক্রন্দনকারীগণ ও তাহাদের সাহায্যকারীগণ এবং শ্রবণকারী ও নিকটবর্তী সকলেই আল্লাহ তায়ালা ও ফেরেশতাগণ এবং সমস্ত মানুষ অভিসম্পাত করিয়া থাকে।”

বর্ণিত আছে, হযরত হাসান ইবনে আলী (রাঃ) যখন ইন্তেকাল করেন, তখন তাঁহার স্ত্রী এক বৎসর পর্যন্ত তাঁহার কবরের উপর পড়িয়াছিলেন। এক বৎসর পর তাবু উঠানো হইলে কবরের মধ্যস্থল হইতে এই আওয়াজ তিনি শুনিতে পাইলেন, “ওহে! যাহাকে তুমি হারাইয়াছ, তাহাকে কি তুমি পাইয়াছ?” হুযুর করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর পুত্র হযরত ইব্রাহিম (রাঃ) যখন ইন্তেকাল হন, তখন তাঁহার চক্ষুদ্বয় হইতে অশ্রু ঝড়িতেছিল। ইহা দর্শন করিয়া হযরত আবদুর রহমান আরজ করিলেন, “হুযুর আপনিতো আমাদিগকে এইরূপ করিতে নিষেধ করিয়াছেন?” প্রত্যুত্তরে তিনি বলিলেন, “আমি মাত্র দুইটি পাপ আওয়াজ ও দুইটি আহাম্মকি কাজ হইতে বিরত থাকিতে বলিতেছি। উহা হইল বিলাপের ও গানের সুরে ক্রন্দন করা, পোশাক-পরিচ্ছদ ছিন্ন করা এবং গলদেশে আঘাত হানা কিন্তু অশ্রু বিসর্জনে কোন দোষ নাই। আল্লাহ তা'আলা রহমতস্বরূপ দয়ালুদের হৃদয়ে উহা স্থাপন করিয়াছেন।” তারপর তিনি বলিলেন, “হে ইব্রাহিম! তোমার বিচ্ছেদে আমার হৃদয় ব্যথিত এবং চক্ষুদ্বয় অশ্রুসিক্ত হইয়া পড়িয়াছে।”

হযরত ওহাব ইবনে কায়সান (রাঃ) ও হযরত আবু হোরায়রা (রাঃ) বর্ণনা করিয়াছেন যে, হযরত আবু হাফস ওমর (রাঃ) একজন স্ত্রীলোককে মৃত ব্যক্তির জন্য ক্রন্দন করিতে দেখিয়া তাহাকে নিষেধ করিলেন। অতঃপর হুযুর করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিলেন, “হে ওমর! তাহাকে ক্রন্দন করিতে দাও। কারণ হৃদয়ের দুঃখে চক্ষু হইতে অশ্রু প্রবাহিত হয় এবং উহা বিপদের সময়ের কথা স্মরণ করাইয়া দেয়।”

পরবর্তী পর্ব

মঙ্গলবার, ১৪ মে, ২০২৪

দাকায়েকুল আখবার- (১৭) জান কবজের পর রূহের চীৎকার

 

📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ১৭)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

জান কবজের পর রূহের চীৎকার-
হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, হযরত আয়েশা (রাঃ) বর্ণনা করিয়াছেন, “একদিন আমি স্বীয় শয়ন কক্ষে বসিয়াছিলাম। এমন সময় অপ্রত্যাশিতভাবে আল্লাহ তা'আলার প্রিয় হাবীব (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আমার গৃহে আগমন করিলেন। তখন আমি স্বীয় অভ্যাস অনুযায়ী দণ্ডায়মান হইতে চাহিলে হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিলেন, “হে উম্মুল মুমিনিন! স্বীয় স্থানে বসিয়া থাক।” আমি তাহাই করিলাম। তারপর হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আমার ক্রোড়ে স্বীয় মাথা মোবারক স্থাপন করিয়া চিৎ হইয়া শুইয়া পড়িলেন। অতঃপর আমি তাহার সাদা শ্মশ্রু মোবারক অন্বেষণ করিয়া ঊনবিংশটি সাদা শ্মশ্রুর সন্ধান লাভ করিলাম এবং মনে মনে চিন্তা করিতে লাগিলাম, আহা! আল্লাহ তায়ালার প্রিয় নবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) নিজ উম্মতদিগকে শোকের সাগরে ভাসাইয়া অনন্ত ধামে যাত্রা করিবেন। আর উম্মতগণ নবীবিহীন অবস্থায় থাকিয়া যাইবে। এইকথা চিন্তা করিতে করিতে আমার চক্ষুদ্বয় অশ্রু বন্যায় প্লাবিত হইয়া গেল এবং কয়েক ফোটা অশ্রু আল্লাহ তা'আলার প্রিয় নবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উনার পবিত্র চেহারা মোবারকের উপর টপকাইয়া পড়িল। ফলে হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) জাগ্রত হইয়া আমাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘হে উম্মুল মুমিনীন! তুমি ক্রন্দন করিতেছ কেন?' প্রত্যুত্তরে আমি সবকিছু বর্ণনা করিয়া তাঁহাকে শুনাইলাম।তারপর তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘হে উম্মুল মুমিনীন! বলতো মৃত ব্যক্তির নিকট কোন্ অবস্থা অত্যন্ত ভয়াবহ ও অসহনীয়?” আমি উত্তর করিলাম, সে সম্বন্ধে আল্লাহ তায়ালা ও তাঁহার প্রিয় রসূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-ই ভাল জানেন। তিনি বলিলেন, “তাহা অবশ্যই; কিন্তু তবু তুমি অভিমত প্রকাশ কর।” আমি বলিলাম, “যখন মৃত ব্যক্তিকে ঘর হইতে বাহির করা হয় এবং যখন তাহার সন্তানগণ হে পিতা! হে মাতা! বলিয়া ক্রন্দন করিতে করিতে তাহার পশ্চাতে দৌড়াইতে থাকে, আর সে ব্যক্তি, হে পুত্র! হে কন্যা! বলিতে থাকে, এই সময়টিই অত্যন্ত ভয়াবহ ও অসহনীয়।” হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিলেন, হ্যাঁ, প্রকৃতই সে অবস্থা অত্যন্ত ভয়াবহ।' হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) পুনরায় জিজ্ঞাসা করিলেন, “বলত আর কোন্ অবস্থা ভয়াবহ?” আমি উত্তর করিলাম, “যখন মৃত ব্যক্তিকে কবরে রাখিয়া তাহার বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনগণ তাহাকে আল্লাহ তা'আলার কুদরতের হস্তে সমর্পণ করিয়া প্রত্যাবর্তন করে এবং নিজের কৃতকর্ম ব্যতীত আর কিছুই তাহার থাকে না, এই অবস্থাটিও তাহার জন্য কম ভয়াবহ নহে।” হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আবার জিজ্ঞাসা করিলেন, “বলত আর কোন্ অবস্থা ভয়াবহ।” আমি প্রত্যুত্তরে বলিলাম, “আমার চাইতে আল্লাহ পাক ও তাঁহার রাসূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-ই ভাল জানেন।” তখন হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিলেন, “হে উম্মুল মুমিনীন! জানিয়া রাখ যে, গোসলদানকারী যখন মৃত ব্যক্তিকে গোসল করাইবার নিমিত্ত তাহার পরিধেয় বস্ত্র, যুবকদের অঙ্গুরী ও জামা কাপড়, - আর কাজী, ফকীহ ও বৃদ্ধের পাগড়ী টানিয়া খুলিয়া ফেলে, সেই সময়টা মৃত ব্যক্তির পক্ষে অত্যন্ত ভয়াবহ ও অসহনীয়। রূহ তখন তাহার এই উলঙ্গ শরীর দেখিতে পায়, তখন সে অতি উচ্চৈঃস্বরে চিৎকার করিয়া বলে, 'হে গোসলদানকারী! তোমাকে আল্লাহ তায়ালার শপথ দিয়া বলিতেছি, আমার পরিধেয় বসন একটু আস্তে আস্তে খুলিয়া বাহির কর। কারণ, এইমাত্র আজরাইলের যাতনা হইতে পরিত্রাণ লাভ করিয়াছি।' তাহার এই চিৎকার মানব-দানব ভিন্ন অন্য সকলেই শুনিতে পায়। তারপর মৃত ব্যক্তির শরীরে যখন পানি ঢালা হয়, তখনও পূর্বের মত চিৎকার করিয়া বলে, 'হে গোসলদানকারী! তোমাকে আল্লাহর শপথ দিয়া বলিতেছি, তুমি আমার শরীরে অতি ঠাণ্ডা বা অতি গরম পানি ঢালিও না। কারণ, রূহ বাহির করিবার পর আমার শরীর ক্ষতবিক্ষত হইয়া গিয়াছে।' তারপর গোসলদানকারী মৃত ব্যক্তির শরীর যখন কচলাইয়া দিতে থাকে, তখনও সে বলিয়া উঠে, 'হে গোসলদানকারী, আল্লাহর শপথ ! আমার শরীর অতি জোরে মর্দন করিও না।' 
তারপর শবদেহে যখন কাফন পরান হয়, তখন রূহ উচ্চৈঃস্বরে ডাকিয়া বলে, “হে গোসলদানকারী! আমার স্ত্রী, পুত্র, আত্মীয়-পরিজন আমার মুখমণ্ডল শেষবারের জন্য দেখিয়া লউক; সুতরাং তুমি আমার মাথার দিকের কাপড় শক্ত করিয়া বাঁধিয়া ফেলিও না।' অতঃপর যখন শবদেহ গৃহ হইতে বাহির করা হয়, তখন মৃতের আত্মা বলিয়া উঠে ‘হে লোকগণ! আল্লাহর শপথ, আমাকে গৃহ হইতে এত তাড়াতাড়ি বাহির করিও না। আমাকে শেষবারের মত আমার ঘর-বাড়ী, ধন-সম্পদ ও পরিবার-পরিজনের নিকট হইতে বিদায় লইতে দাও।”
তারপর রূহ উচ্চৈঃস্বরে ঘোষণা করিতে থাকে, 'হে মানবগণ! আজ হইতে আমি আমার স্ত্রীকে বিধবা এবং পুত্র-কন্যাদিগকে এতিম ও অসহায় করিয়া যাইতেছি। আল্লাহর শপথ, তোমরা কখনও তাহাদিগকে কষ্ট দিও না। আমি আমার যথাসর্বস্ব ফেলিয়া যাইতেছি, আর কখনও এইস্থানে প্রত্যাবর্তন করিব না।' 
অতঃপর মৃত ব্যক্তিকে খাটে করিয়া যখন লইয়া যাইতে শুরু করে তখন রূহ বলে, 'হে বন্ধুগণ! আল্লাহ তা'আলার শপথ, যে পর্যন্ত আমি আমার পুত্র-কন্যা, পরিবার ও প্রতিবেশীদের আওয়াজ শুনিতে পাই, ততক্ষণ আমাকে শীঘ্র বাহির করিও না। কেননা আজিকার এই বিচ্ছিন্নতা কিয়ামত পর্যন্ত বজায় থাকিবে।' যখন মৃত ব্যক্তির খাট লইয়া তিন কদম অগ্রসর হয়, তখন আত্মা আবার অতি উচ্চৈঃস্বরে চীৎকার করিয়া বলে, হে বন্ধু ও সন্তানগণ! জানিয়া রাখ; আমি পৃথিবীর মোহে পড়িয়া জীবন শেষ করিয়াছি, সাবধান! তোমরা তাহার মোহে পড়িও না। তোমরা উহা হইতে দূরে থাকিও। পৃথিবী আমাকে লইয়া যেমন ছিনিমিনি খেলিয়াছে তোমাদিগকে লইয়াও যেন সেইরূপ করিতে না পারে।'
রূহ আরও বলে, ‘হে দৃষ্টিশক্তিসম্পন্ন জ্ঞানীবৃন্দ! আমার অবস্থা অবলোকন করিয়া তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর, তবেই তোমরা সফলকাম হইতে পারিবে। যাহা আমি সঞ্চয় করিয়াছিলাম, তাহা উত্তরাধিকারীদের জন্যেই ফেলিয়া আসিয়াছি। তোমরা আমার পরও জীবিত থাকিবে; কিন্তু তোমরা আমার পাপের একাংশও গ্রহণ করিবে না। আর উত্তরাধিকারীগণ তাহাদের প্রাপ্য অংশ পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে হিসাব করিয়া লইবে অথচ আমার কথা কেহই মনেও করিবে না।'
জানাযার নামাযের পর বন্ধু-বান্ধব ও লোকজন যখন চলিয়া যাইতে শুরু করে, তখন রূহ্ আল্লাহ তা'আলার শপথ দিয়া বলে, 'হে বন্ধুগণ! তোমরা আমাকে এত তাড়াতাড়ি ভুলিয়া যাইও না এবং দাফন শেষ হওয়ার পূর্বক্ষণ পর্যন্ত ফিরিয়া যাইও না।' আর যখন মৃত ব্যক্তিকে কবরের মধ্যে রাখা হয়, তখন সে তাহার উত্তরাধিকারীগণকে লক্ষ্য করিয়া বলে,- ‘হে আমার ওয়ারিশগণ! আমি এই পৃথিবীতে বহু ধন-সম্পদ অর্জন করিয়াছি এই সমস্ত তোমাদেরই জন্য রাখিয়া আসিয়াছি। তোমরা এই প্রচুর ধন-সম্পদ লাভ করিয়া আমাকে ভুলিয়া যাইও না । আমি পবিত্র কোরআন শরীফ ও আদব-কায়দা ও শিষ্টাচার শিক্ষা দিয়াছি, কিন্তু তোমরা আমার জন্যে নেকদোয়া করিতে বিস্মৃত হইও না।' 
আর দাফনের পর যখন সকলে প্রত্যাবর্তন করে, তখন মৃতব্যক্তি বলে ‘হে বন্ধুগণ! আমার জানা আছে যে, মৃতব্যক্তি জীবিতদের অন্তরে জামহারির হইতেও অধিক ঠাণ্ডা বলিয়া বিবেচিত হয়; কিন্তু আমার অন্তিম অনুরোধ, তোমরা আমাকে এত শীঘ্র ভুলিয়া যাইও না।”

হযরত আবু কালাবা (রঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, একদা স্বপ্নে তিনি একটি কবরস্থান দেখিতে পাইলেন, যাহার কবরগুলি ফাটিয়া গিয়াছে এবং মৃতব্যক্তিরা বাহির হইয়া কবরের পার্শ্বে বসিয়া রহিয়াছে। তিনি আরও দেখিতে পাইলেন যে, তাহাদের প্রত্যেকের সামনে একটি করিয়া নূরের তবক রহিয়াছে; কিন্তু তাহাদের মধ্যে একজনকে দেখিতে পাইলেন যে, তাহার নূরের তবক নাই এবং সে খুবই চিন্তিত। উহার কারণ জিজ্ঞাসা করিয়া তিনি জানিতে পারিলেন যে, প্রথমোক্ত ব্যক্তিগণের পুত্র-কন্যা ও বন্ধু-বান্ধব তাহাদের জন্য দোয়া ও দান-খয়রাত করিয়া থাকে। উহার ফলস্বরূপ তাহারা নূরের তবক প্রাপ্ত হইয়াছে; কিন্তু শেষোক্ত ব্যক্তির এক অসৎ পুত্র আছে; সে পিতার জন্য দান-খয়রাত বা দোয়া-কালাম কিছুই করে না। সেজন্য তাহার নূরের তবক নাই এবং প্রতিবেশীদের নিকট খুবই লজ্জিত। অতঃপর হযরত আবু কালাবা (রঃ) জাগ্রত হইয়া উক্ত ব্যক্তির পুত্রকে ডাকিয়া আনিয়া স্বপ্নযোগে যাহা কিছু অবগত হইয়াছিলেন আনুপূর্বিক সবকিছুই খুলিয়া বলিলেন। পুত্র বলিল, “হুযুর! আমি আপনার হাতে তাওবাহ করিয়া বলিতেছি, আর আমি কখনও পাপের কাজ করিব না এবং আজীবন পিতার কথা স্মরণ রাখিব এবং আল্লাহ তা'আলার নিকট তাহার জন্য মাগফেরাত কামনা করিব।” তারপর সে মৃত পিতার জন্য দান-খয়রাত ও এবাদত-বন্দেগীতে মশগুল হইল। কিছুদিন পর হযরত আবু কালাবা (রঃ) পূর্ববত সেই কবরগুলি স্বপ্নে দেখিতে পাইলেন, পূর্বের সেই নূরহীন মৃত ব্যক্তির নিকট সূর্যের কিরণ হইতে অতি উজ্জ্বল একটি নূরের তবক বিরাজ করিতেছে। আর সেই ব্যক্তি বলিল, “হে আবু কালাবা ! আল্লাহ তা'আলা আপনাকে আমার অপেক্ষা উৎকৃষ্ট পুরস্কার দান করুন। আমি আপনার সাহায্যের ফলে দোযখের আযাব ও প্রতিবেশীদের তিরস্কার হইতে মুক্তিলাভ করয়াছি।” 

হাদীস শরীফে আছে, একদা আজরাইল ফেরেশতা ইসকান্দর দেশীয় এক ব্যক্তির সহিত সাক্ষাত করিলেন। লোকটি তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “আপনি কে?” মালাকুল মউত বলিলেন, “আমি মৃত্যুদূত!” ইহা শ্রবণ করিয়া উক্ত ব্যক্তির পৃষ্ঠদেশ ও পাঁজরের মধ্যে অনুকম্পন আরম্ভ হইল। মৃত্যুদূত তাহাকে বলিলেন, “তুমি কেন এমন করিতেছ?” প্রত্যুত্তরে সে বলিল, “আমি দোযখের ভয়ে এমন করিতেছি।” অতঃপর মৃত্যুদূত তাহাকে বলিল, আমি কি তোমাকে একখানা চিঠি লিখিয়া দিব না, যাহা দ্বারা তুমি নরক হইতে পরিত্রাণ লাভ করিবে?” মালাকুল মউত একখণ্ড কাগজ লইয়া  “বিছমিল্লাহিররাহমানির রাহীম” অর্থাৎ “পরম করুণাময় ও অনন্ত দয়ালু আল্লাহ পাকের নামে আরম্ভ করিতেছি” লিখিয়া দিয়া বলিলেন- “ইহা দ্বারাই তুমি দোযখ হইতে পরিত্রাণ লাভ করিবে।"

আরও বর্ণিত আছে যে, কোন এক অলী-আল্লাহ্ কাহারও “বিছমিল্লাহির রাহমানির রাহীম” পাঠ শুনিয়া চীৎকার করিয়া বলিয়া উঠেন, “প্রিয়তমের নামই যখন এত মধুর, তখন তাঁহার দর্শন বা দীদার না জানি কতই মধুর?” তিনি আরও বলিলেন, “মানুষ বলিয়া থাকে যে, আজরাইলের কারণে পৃথিবী এক পয়সার তুল্যও মূল্যবান নহে, কিন্তু আমি বলিব, মৃত্যুদূতবিহীন পৃথিবী এক কপর্দকেরও সমান নহে। কেননা মৃত্যুদূতই বন্ধুর মিলন ঘটাইয়া থাকে।"

পরবর্তী পর্ব

দাকায়েকুল আখবার- (১৬) বান্দার প্রতি মাটির ঘোষণা

 

📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ১৬)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

বান্দার প্রতি মাটির ঘোষণা-
হযরত আনাস (রঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, মাটি প্রতিনিয়ত উচ্চৈঃস্বরে দশটি বাক্য ঘোষণা করে : 
(১) হে আদম সন্তান! আজ আমার পৃষ্ঠদেশে লাফালাফি দৌড়াদৌড়ি করিতেছ কিন্তু অতি সত্বরই তোমাকে আমার অভ্যন্তরে প্রবেশ করিতে হইবে। 
(২) আজ আমার পৃষ্ঠে পাপকাজ করিতেছ, কিন্তু আমার অভ্যন্তরে তোমাকে আযাব করা হইবে। 
(৩) আজ আমার পৃষ্ঠে হাস্য-কৌতুক করিতেছ, কিন্তু আমার অভ্যন্তরে তোমাকে কান্নাকাটি করিতে হইবে
(৪) আজ আমার পৃষ্ঠে হারাম মাল আরামে ভক্ষণ করিতেছ, কিন্তু আমার অভ্যন্তরে নিকৃষ্ট পোকা-মাকড় তোমার নধর দেহ পরমানন্দে ভক্ষণ করিবে।
(৫) হে আদম সন্তান! তুমি আমার পৃষ্ঠে আনন্দে ও মহাসুখে কালাতিপাত করিতেছ, কিন্তু আমার অভ্যন্তরে দুঃখিত ও চিন্তিত অবস্থায় থাকিতে হইবে।
(৬) আজ আমার পিঠে হারাম বস্তু আরামে ভক্ষণ করিয়া দেহ কাঠামো হৃষ্ট-পুষ্ট করিতেছ কিন্তু কালই উহা আমার অভ্যন্তরে বিগলিত হইয়া যাইবে। 
(৭) আজ আমার পৃষ্ঠে অহংকার ও গৌরব করিতেছ, কিন্তু কালই তোমাকে আমার অভ্যন্তরে লাঞ্ছিত, পদদলিত ও অপদস্থ হইতে হইবে। 
(৮) আজ আনন্দ ও উৎফুল্লচিত্তে আমার পৃষ্ঠে সানন্দে বিচরণ করিতেছ, কিন্তু কালই তোমাকে আমার অভ্যন্তরে দুশ্চিন্তার মহাসাগরে হাবুডুব খাইতে হইবে। 
(৯) আজ ভূ-পৃষ্ঠে আলোর বন্যায় বিচরণ করিতেছ, কিন্তু অচিরেই আমার অভ্যন্তরে ঘোর অন্ধকারে পড়িয়া থাকিবে। 
(১০) আজ আমার পৃষ্ঠে সদলবলে চলাফিরা করিতেছ, কিন্তু আমার অভ্যন্তরে তোমাকে নিঃসঙ্গ একা পড়িয়া থাকিতে হইবে।”
হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, কবর প্রতিনিয়ত তিন তিনবার উচ্চৈঃস্বরে ডাকিয়া বলে, “হে বান্দা! আমিই নির্জন নিবাস, আমিই অন্ধকারালয় এবং আমিই পোকা মাকড়ের আবাসস্থল; সুতরাং হে আল্লাহ তায়ালার বান্দা ! আমার অভ্যন্তরে সুখে দিন যাপন করিবার জন্যে কিছু পাথেয় সঞ্চয় করিয়াছ কি?” তাহা ছাড়া কবর আরও পাঁচ পাঁচবার ডাকিয়া বলিতে থাকে, 
“হে আল্লাহ্’র বান্দা ! আমার অভ্যন্তরে নির্জনবাসে প্রবেশ করিবার পূর্বে পবিত্র কোরআন পাককে বন্ধু হিসাবে সাথে করিয়া আনিও। আর আমার নীরব, নির্জন অন্ধকার কক্ষে প্রবেশ করিবার আগে গভীর রাত্রির এবাদতের নূর লইয়া আসিও। আর হে আল্লাহ্’র বান্দা! আমি কাঁচা মাটির নিবাসস্থল; সুতরাং আমার গৃহে প্রবেশ করিতে পুণ্যকর্মের বিছানাপত্র সঙ্গে আনিও। আর আমি সাপ-বিচ্ছুর নিবাসস্থল; সুতরাং আমার গৃহে আগমনের পূর্বে খয়রাত ও বিসমিল্লাহ্ পাঠ এবং চক্ষুর অশ্রু বিসর্জনরূপে ঔষধ ও প্রতিষেধক সঙ্গে করিয়া আনিও। আর হে আল্লাহর বান্দা ! আমিই হইলাম মুনকির-নকীরের কঠিন পরীক্ষাগার; সুতরাং পৃথিবীতে অত্যধিক পরিমাণে কালেমা তাইয়্যিবা পাঠ করিয়া আমার ভিতরে আগমন করিও। তাহা হইলেই তুমি নিস্তার লাভ করিবে।”

পরবর্তী পর্ব
জানকবজের পর রূহের চীৎকার

দাকায়েকুল আখবার- (১৫) রূহের বিবরণ

 

📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ১৫)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

রূহের বিবরণ-
হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, মানবাত্মা যখন দেহ পিঞ্জর হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া পড়ে, তখন আকাশমণ্ডল হইতে অতি উচ্চৈঃস্বরে তিনবার ডাকিয়া প্রশ্ন করা হয়, “হে আদম সন্তান! বল, তুমি কি পৃথিবী পরিত্যাগ করিয়া আসিয়াছ, না পৃথিবী তোমাকে পরিত্যাগ করিয়াছে? আর তুমি পৃথিবীকে অর্জন করিয়াছিলে, না পৃথিবী তোমাকে অর্জন করিয়াছিল? আর হে বান্দা! পৃথিবী কি তোমাকে গ্রহণ করিয়াছিল, নাকি তুমিই আল্লাহতায়ালাকে বিস্মিত হইয়া পৃথিবীকে গ্রহণ করিয়াছিলে?”
আবার যখন গোসল দেওয়ার জন্য স্নানের জায়গায় রাখা হয় তখনও গগনমণ্ডল হইতে তিনবার উচ্চৈঃস্বরে আওয়াজ দিয়া বলা হয়, “ওহে আদম সন্তান! তোমার সেই শক্তিমান দেহবল্লরী এখন কোথায়? আর কে-ই বা তোমাকে এত দুর্বল ও অসহায় করিয়াছে? আর তোমার সেই বাকপটু জিহ্বা কোথায়? এখন কেন তুমি নির্বাক হইয়া পড়িয়া রহিয়াছ; আর তোমার সেই তীক্ষ্ণ শ্রবণেন্দ্রীয় কর্ণদ্বয়কে এমন বধির করিয়াছে কে? আর কেইবা নিরেট নিষ্ঠুরের মত তোমাকে স্বীয় বন্ধু-বান্ধব হইতে পৃথক করিয়া দিয়াছে?”
তারপর যখন কাফন পরানো হয়, সেই সময়ও আকাশমণ্ডল হইতে তিনবার অতি উচ্চৈঃস্বরে ডাক দিয়া বলা হয়, “হে আদম সন্তান! তুমি যদি বেহেশতি বান্দা হইয়া থাক, তাহা হইলে ইহা সুসংবাদের কথাই বটে, কিন্তু তুমি যদি দোযখী বান্দা হইয়া থাক, তাহা হইলে তোমার জন্যে শত আক্ষেপ! আর হে আদম সন্তান! তোমার প্রতি যদি আল্লাহ তা'আলা সন্তুষ্ট ও রাজি থাকেন, তবেই অতি উত্তম; কিন্তু আল্লাহ তায়ালা যদি তোমার প্রতি ক্রোধান্বিত হইয়া থাকেন, তবে ইহার পরিণাম অত্যন্ত ভয়াবহ।” আর তৃতীয়বার বলা হয়, “ওহে আদম সন্তান! তুমি এখন এক দুর্গম ও কন্টকাকীর্ণ পথে যাত্রা করিবে । তুমি চিন্তা করিয়াছ কি? আর সেই দুর্গম পথের সম্বল তোমার আছে কি? আজ তুমি নিজে সুখ-শয্যা পরিত্যাগ করিয়া অতি বিপদ-সঙ্কুল ভয়ঙ্কর স্থানে গমন করিবে, কিন্তু কখনও আর ফিরিয়া আসিতে পারিবে না।”
আবার যখন মৃত ব্যক্তিকে খাটের ওপর রাখা হয়, তখন পূর্বের ন্যায় তিনবার ঘোষণা করা হয়, “ওহে আদম সন্তান! যদি তুমি পুণ্যবান হইয়া থাক, তাহা হইলে তোমার জন্যে শুভসংবাদ। আর দুষ্কর্মশীল হইলে তোমার নিমিত্ত রহিয়াছে দুঃসংবাদ; কিন্তু তুমি যদি আল্লাহ তা'আলার রেজামন্দি হাসিল করিয়া থাক এবং তাওবাহ করিয়া থাক, তাহা হইলে খুব উত্তম করিয়াছ। অন্যথায় তোমার পরিণাম অত্যন্ত মন্দ হইবে।
অতঃপর যখন খাটকে জানাযার নামাযের জন্য সারিবদ্ধ কাতারের সম্মুখে রাখা হয়, তখন আবার পূর্বের ন্যায় ঘোষণা করা হয়, “হে আদম সন্তান! তুমি তোমার জীবনে ভাল-মন্দ যাহা কিছু সম্পন্ন করিয়াছ এখন সবকিছুই প্রত্যক্ষ করিবে। যদি সৎভাবে ও পুণ্য সঞ্চয়ের ভিতর দিয়া স্বীয় জীবনকে অতিবাহিত করিয়া থাক, তবে তোমার জন্যে রহিয়াছে সুসংবাদ; কিন্তু যদি মন্দভাবে পাপের স্রোতে গা ভাসাইয়া জীবনকে অতিবাহিত করিয়া থাক, তবে তোমার ধ্বংস অবধারিত।”

অতঃপর মৃত ব্যক্তিকে যখন কবরের পার্শ্বে রাখা হয়, তখন কবর তাহাকে তিনবার ডাকিয়া বলে, “ওহে আদম সন্তান! একদিন আমার পৃষ্ঠপোরি পরমানন্দে হাসিয়া খেলিয়া বেড়াইয়াছ, এখন কাঁদিতে কাঁদিতে আমার অভ্যন্তরে প্রবেশ কর । আর এক কালে আমার পৃষ্ঠদেশে কত আনন্দ ও উৎফুল্ল হৃদয়ে কাল অতিবাহিত করিয়াছিলে, এখন চিন্তিতাবস্থায় আমার মধ্যে প্রবেশ কর, আর এককালে তুমি বেশ বাকপটু ছিলে, কিন্তু এখন নির্বাক ও বিমর্ষ চিত্তে আমার অভ্যন্তরে দাখিল হও।

”তারপর দাফন-কার্য সমাপন করিয়া লোকজন যখন নিজ নিজ গন্তব্যস্থলে চলিয়া যায়, তখন পরম কৌশলী আল্লাহ্ তায়ালা বলেন, “ওহে আমার প্রিয় বান্দা! আজ তুমি নির্জন কবরের মাঝে ঘোর অন্ধকারে বন্ধু-বান্ধব ও দোসরহীন একা একা পড়িয়া রহিয়াছ। আত্মীয়-স্বজন সকলেই তোমাকে ছাড়িয়া চলিয়া গিয়াছে; কিন্তু এক সময় তুমি তাহাদের জন্য আমার বিধি-নিষেধের গণ্ডি অতিক্রম করিয়া পাপকাজে পরিলিপ্ত হইয়াছিলে এবং আমাকে ভুলিয়া গিয়াছিলে। হে বান্দা! আজ এই দুর্দিনে তোমার প্রতি আমি অত্যন্ত দয়ালু ও মেহেরবান হইব। যাহা দর্শন করিয়া আমার সৃষ্ট জীবসকল বড়ই আশ্চর্যান্বিত হইয়া পড়িবে। হে বান্দা! জানিয়া রাখ, মাতা সন্তানের প্রতি যতটুকু স্নেহশীল ও মায়াময়ী হইয়া থাকে, আমি আমার বান্দার জন্যে তদপেক্ষাও অধিক স্নেহশীল ও দয়ালু।”

পরবর্তী পর্ব

দাকায়েকুল আখবার- (১৪) মানুষের ঈমান নষ্ট করিতে শয়তানের চেষ্টা

 

📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ১৪)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

মানুষের ঈমান নষ্ট করিতে শয়তানের চেষ্টা-
হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, জান কবজের সময় শয়তান মৃত্যুর পথযাত্রীকে সম্বোধন করিয়া বলে, “হে বান্দা! তুমি যদি এই অসহ্য যন্ত্রণা হইতে নিস্তার লাভ করিতে ইচ্ছা কর, তবে ইসলাম ধর্ম পরিত্যাগ করিয়া দুইজন খোদার অস্তিত্ব স্বীকার কর।” এই সঙ্কট মুহূর্ত ঈমান রক্ষা করা বড়ই বিপজ্জনক হইয়া পড়ে। এইজন্য বলিতেছি, হে বন্ধুগণ! সেই বিপদ ও সঙ্কট হইতে উদ্ধার পাইতে হইলে অধিক পরিমাণে অশ্রু বর্ষণ সহকারে রাত্রি জাগরণ করিয়া রুকু-সিজদায় মশগুল হউন এবং আল্লাহ পাকের দরবারে কান্নাকাটি করুন। 
হযরত ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) কে জনৈক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করিলেন, “হুযুর! কোন কাজে ঈমান নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা বেশী?” প্রত্যুত্তরে তিনি বলিলেন, “(১) ঈমানের শুকরিয়া আদায় না করিলে, (২) জীবনের শেষ মুহূর্তকে ভয় না করিলে এবং (৩) আল্লাহ তায়ালার বান্দাদের উপর জুলুম ও অত্যাচার করিলে ঈমান নাশের সম্ভাবনা থাকে।”
তিনি আরও বলিয়াছেন, “যাহাদের মধ্যে এই তিনটি দোষ বিদ্যমান, আমার মনে হয় তাহারা সকলেই বেঈমান হইয়া মৃত্যুমুখে পতিত হইবে; কিন্তু আল্লাহ তা'আলা যদি কাহারও ভাগ্যবলে ঈমান বিনষ্ট না করেন, তবে সে ঠিক থাকিবে।” এইজন্য আমরা সর্বান্তঃকরণে আল্লাহ তা'আলার নিকট এই সকল অপকর্ম হইতে ক্ষমা প্রার্থনা করিতেছি।

হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, জান কবজের সময় মুমূর্ষু ব্যক্তি পিপাসায় ও হৃৎপিণ্ডের যন্ত্রণায় অত্যন্ত কাতর ও অস্থির হইয়া যায়। এমন সময় শয়তান বান্দার ঈমান নষ্ট করিবার জন্য সচেষ্ট হয়। সেই সময় বান্দা যখন পিপাসায় কাতর হইয়া যায়, তখন শয়তান এক পেয়ালা ঠান্ডা-পানি লইয়া বান্দার সম্মুখে উপস্থিত হয় এবং পেয়ালাটি আন্দোলিত করিতে থাকে। তখন কাতর বান্দা ভুলবশতঃ শয়তানের নিকট পানি চায়। উত্তরে শয়তান বলে, “হে বান্দা! তুমি যদি এই কথা বল যে, এই বিশ্ব-জগতের কোন প্রতিপালক নাই, তবেই তোমাকে আমি এই পানি পান করাইতে পারি।”  ইহাতে বান্দা যদি কোন উত্তর প্রদান না করে, তবে শয়তান পুনরায় তাহার পদযুগলের সন্নিকটে বসিয়া পানির পেয়ালা নাড়াচাড়া করিতে থাকে। তখন উক্ত বান্দা বলে, “আমাকে কিছু পানি দাও।” উত্তরে শয়তান বলে, “হে বান্দা! তুমি যদি বলিতে পার যে, রাসূলগণ মিথ্যাকথা প্রচার করিয়া গিয়াছে, তবে তোমাকে পানি পান করাইতে পারি।” এমতাবস্থায় যাহার ভাগ্যে বদবখতি লেখা আছে, সে পিপাসার যাতনা সহ্য করিতে না পারিয়া শয়তানের ইচ্ছা অনুসারে কাজ করিয়া বেঈমান অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে এবং ধর্ম-ভীরু ও আল্লাহভক্ত ব্যক্তি ঈমানের শক্তির প্রভাবে শয়তানের প্ররোচনা হইতে নিজেকে মুক্ত রাখিতে সক্ষম হয় ও পবিত্র ঈমানের সহিত তাহার রূহ, অনন্ত রাজ্যে বিলীন হইয়া যায়।

হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, বিখ্যাত সুফী আবু জাকারিয়া (রহঃ) -এর জান কবজের সময় তাহার এক প্রিয়তম বন্ধু তাহাকে কালেমায়ে শাহাদাত তালকীন দিতে (পড়াইতে) শুরু করেন; কিন্তু প্রত্যুত্তরে সুফী আবু জাকারিয়া (রহঃ) কিছুই বলিলেন না এবং মুখমণ্ডল অন্যদিকে ফিরাইয়া লইলেন। দ্বিতীয়বারও তিনি এমনই করিলেন এবং তৃতীয়বার তালকীনের সময় বলিলেন, “আমি ইহা বলিব না ।” ফলে বন্ধুবর অত্যন্ত বিচলিত ও চিন্তিত হইয়া পড়িলেন। এইভাবে কিছুক্ষণ অতিবাহিত হইয়া যাওয়ার পর আবু জাকারিয়া (রহঃ) যাতনার শীতলতা অনুভব করতঃ চক্ষুদ্বয় উন্মিলিত করিয়া বলিলেন, “হে বন্ধু! তুমি কি আমাকে কোন কথা জিজ্ঞাসা করিয়াছিলে?” বন্ধুবর বলিলেন, “হ্যা আমরা আপনাকে তিনবার কালেমায়ে শাহাদাত তালকীন করিয়াছি, কিন্তু দুইবারই আপনি মুখমণ্ডল অন্যদিকে ফিরাইয়া লইয়াছিলেন এবং তৃতীয়বার বলিয়াছিলেন যে, “আমি ইহা বলিব না।” তখন সুফী আবু জাকারিয়া (রহঃ) বলিলেন, “বিতাড়িত ইবলিস শয়তান এক পেয়ালা পানিসহ আমার ডানদিকে দাঁড়াইয়া এবং পানির পাত্রটি নাড়াচাড়া করিয়া আমাকে জিজ্ঞাসা করিল, “হে বান্দা! তুমি কি পানি পান করিবে?” আমি উত্তর করিলাম, “হ্যা পান করিব।” তখন শয়তান বলিল, “যদি তুমি বল যে, হযরত ঈসা (আঃ) আল্লাহ তায়ালার পুত্র ছিলেন, তবে তোমাকে আমি পানি পান করাইব।” এইকথা শ্রবণ করিয়া আমি মুখ ফিরাইয়া লইয়াছি। তারপর শয়তান পায়ের কাছে আসিয়াও সেই কথা বলিল, তখনও আমি মুখ ফিরাইয়া লইয়াছি। তৃতীয়বার শয়তান আমাকে বলিল- “তুমি অন্ততঃ বল, 'লা-ইলাহা অর্থাৎ কোনই উপাস্য নাই।” ইহার প্রত্যুত্তরে আমি বলিলাম, আমি কখনও এই কথা বলিব না। ইহা শ্রবণ করিয়াই শয়তান পানির পাত্রটিকে মাটিতে নিক্ষেপ করিয়া চলিয়া গেল। আমি মরদুদ্ শয়তানের কথার উত্তর দিয়াছি মাত্র। আমি তোমাদের কথার উত্তর দেই নাই। এখন আমি সাক্ষ্য দিতেছি যে, “আল্লাহ তায়ালা ব্যতীত আর কোনও উপাস্য নাই এবং আমি আরও সাক্ষ্য দিতেছি যে, হযরত মুহাম্মদ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আল্লাহ তা'আলার বান্দা এবং রাসূল ছিলেন ।”

হযরত মানসুর ইব্‌নে আম্মার (রাঃ) এই প্রসঙ্গে বর্ণনা করিয়াছেন যে, মুমূর্ষু ব্যক্তির অবস্থাকে মোটামুটি পাঁচভাগে ভাগ করা হইয়া থাকে। যেমন- (১) তাহার ধন-সম্পদ নিজের উত্তরাধিকারদের মধ্যে বন্টন করিয়া দেওয়া হয়, (২) মালাকুল মউত রূহ্ লইয়া অনন্তে বিলীন হইয়া যায়, (৩) দেহের মাংস কীট-পতঙ্গে খাইয়া ফেলে, (৪) হাড় অস্থি মাটির সহিত মিশিয়া যায় এবং (৫) সৎকর্মগুলি ইহার হকদারেরা লইয়া যায়। তবে প্রত্যেকে স্বীয় প্রাপ্যাংশ বন্টন করিয়া লইয়া যাইতে অনুশোচনা করিবার কিছুই নাই; কিন্তু, হায়! বিতাড়িত শয়তান যেন ঈমান হরণ করিতে না পারে। পবিত্র ঈমান হইতে বিচ্ছিন্ন হওয়ার অর্থ আল্লাহ পাক হইতে বিচ্ছিন্ন হওয়া মাত্র। ইহার ক্ষতিপূরণ সম্পূর্ণ অসম্ভব। আল্লাহ তা'আলা আমাদের 'খাতেমা বিখায়ের’ এনায়েত করুন, আমিন।

পরবর্তী পর্ব

দাকায়েকুল আখবার- (১৩) মৃত্যুমুহূর্তে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কাতর ফরিয়াদ

 

📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ১৩)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

মৃত্যুমুহূর্তে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কাতর ফরিয়াদ-
হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, যখন কাহারো মৃত্যুর সময় ঘনাইয়া আসে, তখন মালাকুল মউত তাহার আত্মা কবজ করিবার জন্য বান্দার মুখের নিকট আগমন করেন, তখন তাহার মুখমন্ডল আল্লাহ্ তা'আলার জিকির করিতে করিতে বলে, "মৃত্যুদূত! ক্ষান্ত হও, আর সন্মুখে অগ্রসর হইওনা। এই পথে তোমার মনঃবাসনা পূর্ণ হইবেনা। কারণ এই পথে প্রতিনিয়ত আল্লাহ্ তা'আলার জিকির হইয়াছে'। তখন মৃত্যুদূত আল্লা্হ্ তা'আলার কাছে আরজ করেন,"হে আল্লাহ্ ! আপনার বান্দা এরূপ বলিতেছে। আমি এখন কি করিতে পারি?" তখন আল্লাহ্ তা'আলা তাহাকে অন্যদিক হইতে চেষ্টা করিতে নির্দেশ করিবেন। নির্দেশ মত মালাকুল মউত এইবার তাহার হস্তের দিক হইতে প্রাণ সংহারের মৃত্যুবান নিক্ষেপ করিতে উদ্যত হইবেন। তখন হাত বাধা দিয়া বলিবে "হে মৃত্যুদূত আমি তোমাকে এই পথে আক্রমন করিতে বারণ করিতেছি। কারণ এই হাত দ্বারা আমি অনেক দান খয়রাত করিয়াছি।, সস্নেহে এতিমের মস্তক স্পর্শ করিয়াছি, কত লেখনি চালনা করিয়াছি এবং শাণিত কৃপাণ দৃঢভাবে ধারণ করিয়া কাফের বেদ্বীনের গ্রীবাদেশে চালনা করিয়াছি। অতএব তুমি এই পথে আক্রমন করিওনা।" অতঃপর মালাকুল মউত পদদ্বয়ের দিক হইতে মৃত্যুবাণ নিক্ষেপ করিতে সচেষ্ট হইবেন। তখন পদযুগল দৃঢস্বরে বাধা প্রদান পূর্বক বলিবে, "হে মালাকুল মউত! ক্ষান্ত হও, আর সন্মুখে অগ্রসর হইওনা। এই দিক দিয়া আমাকে আক্রমন করিওনা পদদ্বয়ের সাহায্যে আমি জুমআ আর জামাতের জন্য দৌড়াইয়াছি। রোগীর সেবাযত্নের জন্য গমন করিয়াছি। বিদ্যার্জনের জন্য জ্ঞানীদের মজলিসে যোগদান করিয়াছি।" তার পর মালাকুল মউতের আক্রমন কর্ণদ্বয়ের প্রতি আকৃষ্ট হইতেছে দেখিয়া, তাহারা বলিবে! ক্ষান্ত হও! এদিকে অগ্রসর হইওনা। আমি এই কর্ণদ্বারা আল্লাহ্ তা'আলার পবিত্র কালাম ও যিকির শুনিয়া হৃদয়কে পবিত্র ও আলোকিত করিয়াছি।" অতঃপর নেত্র দ্বয়ের দিকে আক্রমন করিবার উপক্রম করিলে তাহারা বলিবে, "হে মালাকুল মউত! ক্ষান্ত হও, ধৈর্যধারণ কর, আমাদের দ্বারা পবিত্র কুরআনের প্রতি ও আলেমগণের প্রতি দৃষ্টিপাত করা হইয়াছে। এজন্য তুমি নেত্রদ্বয়ের ক্ষেত্রে আক্রমন চালাইওনা।" মালাকুল মউত বান্দার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সহিত তর্কযুদ্বে পরাস্ত হইয়া আল্লাহ্ তাআলার নিকট আরজ করিবেন, হে আল্লাহ্! আপনার বান্দা আমাকে যুক্তি-তর্কে পরাস্ত করিয়াছে ও এইরূপ বলিয়াছে। এখন আমি কিরূপে তাহার রূহ্ কবজ করিব, বলুন।" প্রত্যুত্তরে আল্লাহ্ তা'আলা বলিবেন, "হে মালাকুল মউত! এভাবে তুমি তাহার জান কবজ করিতে সক্ষম হইবেনা, বরং তুমি তোমার হাতের উপর আমার নাম লিখিয়া আমার প্রিয় মুমিন বান্দার সম্মুখে উপস্থাপন কর। তবেই দেখিবে যে, আমার বান্দার রূহ্ আমার নাম দেখিতে দেখিতে কষ্ট-ক্লেশ ব্যাতীত হাসিতে হাসিতে অনন্তে মিলিয়া যাইবে।" অতঃপর মালাকুল মাউত তাহাই করিবেন। ইহাতে বান্দার রূহ্ আল্লাহ্ তা'আলার পবিত্র নামের মায়ায় বিমুগ্ধ হইয়া মৃত্যুকষ্ট বিস্মৃত হইয়া পরমানন্দে অন্তরের পথে বিলিন হইয়া যাইবে।

তাই বন্ধুগণ, মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করুন, যাহারা নিজ অন্তর প্রদেশে আল্লাহর নামের মোহর অংকিত করিতে সক্ষম হইয়াছেন, নিশ্চয় তাহারা আল্লাহ প্রদত্ত সুকঠিন শাস্তি বিচ্ছিন্নতার কষ্ট ও যাতনা এবং অপদস্থতার তীব্র গ্লানি হইতে নিস্তার লাভ করিবেন। যেমন আল্লাহ্ তা'আলা এরশাদ করেন, -("উলাইকা কাতাবা ফি কুলুবিহিমুল ঈমানা") অর্থাত : "উহারাই, যাহাদের হৃদয় কন্দরে আল্লাহ্ তা'আলা ঈমানের মোহর অংকিত করিয়া দিয়াছেন।" আর আল্লাহ্ তা'আলা আরো ইরশাদ করেন, - ("আফামান্ শারাহাল্লাহু ছাদরাহু লিল্ ইসলামি ফাহুয়া আলানুরিম্-মির রাব্বিহ্") অর্থাত : আল্লাহ্ তা'আলা যাদের অন্তকরণকে পবিত্র ইসলামের জন্য সম্প্রসারিত করিয়াছেন, নিশ্চয় তাহারা আল্লাহ্ তা'আলার প্রদত্ত জ্যাতিতে বিরাজ করিতেছে। অতএব সে কিয়ামতের দিন আযাবের ভয় হইতে পরিত্রাণ লাভে সক্ষম হইবে"।

অন্য এক হাদিসে বর্ণিত আছে যে, যখন কোন বান্দার জান কবজ আরম্ভ হয়, তখন আল্লাহ্ তা'আলার তরফ হইতে কেহ উচ্চৈঃস্বরে ডাকিয়া বলে, "হে মালাকুল মউত! ক্ষান্ত হও কিছু সময় তাহাকে আরাম করিতে দাও।" আর রূহ্ যখন বক্ষস্থল পর্যন্ত আসে তখন পূনরায় ডাকিয়া বলা হয় যে, "হে মৃত্যুদূত ক্ষান্ত হও, ক্ষান্ত হও, আরো কিছু সময় তাহাকে আরাম করিতে দাও।" অনুরূপ ভাবে হাটু ও নাভী পর্যন্ত পৌছিলেও তেমনি বলা হইয়া থাকে। পরিশেষে রূহ্ যখন কন্ঠ পর্যন্ত পৌছিয়া যায় তখন অতি উচ্চৈঃস্বরে বলা হয় হে মালাকুল মউত! ক্ষান্ত হও! ক্ষান্ত হও! তা্হাকে নিজের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ হইতে চিরবিদায় গ্রহন করিবার জন্য কিছু সময় প্রদান কর।" তখন চক্ষুদ্বয় রূহ্কে বিদায় দিয়া বলে, হে বন্ধু কিয়ামত পর্যন্ত তোমার উপর শান্তি ও রহমত বর্ষিত হউক।" অনুরুপ ভাবে উভয় হস্ত, উভয় কর্ণ এবং পদদ্বয় রূহ্কে আশীর্বাদ করিয়া চির বিদায় গ্রহন করে।

আমরা আল্লাহ্ তা'আলার দরবারে প্রার্থনা করিতেছি যেন আমাদের রসনা হইতে ঈমানের বাণী এবং অন্তর হইতে মারেফাতের জ্যোতি বিদায় করিতে না হয়। তারপর হস্তদ্বয়, পদদ্বয় নিস্তেজ হইয়া পড়িয়া থাকে এবং চক্ষুদ্বয় জ্যোতিহীন ও কর্ণদ্বয় শ্রবণ শক্তিহীন এবং দেহ কাঠামো আত্মাহীন হইয়া পরিয়া থাকে।

আহা! সে সময় যদি রসনা শাহাদত বিহীন ও আত্মা আল্লাহ্ তা'আলার মারেফত বিহীন পরিয়া থাকে, তবে সেই বান্দাকে কবরের মধ্যে কতইনা দুরবস্থা ও দুঃখ যাতনা ভোগ করিতে হইবে। যেখানে মাতা-পিতা, ভ্রাতা-ভগ্নি, বন্ধু-বান্ধব, পূত্র-কন্যা, পাড়া-প্রতিবেশী, বিছনাপত্র ও আবরণ বলিতে কিছুই থাকিবেনা। আহা! সে সময় যদি আল্লাহ্ অনুগ্রহ না করেন তাহলে তাহাকে প্রচুর পরিমাণে ক্ষতিগ্রস্ত হইতে হইবে।
ইমাম আযম হযরত আবু হানিফা (রহঃ) বলিয়াছেন, "জান কবজের সময় বান্দার ঈমান নষ্ট হইবার অত্যাধিক সম্ভাবনা থাকে।" 
ঈমান নষ্ট না করার জন্য আমরা পরম করুনাময়ের সাহায্য ও অনুকম্পা কামনা করিতেছি। আমিন! আমিন!!

পরবর্তী পর্ব

দাকায়েকুল আখবার- (১২) আত্মার কথোপকথনের বিবরণ

 

📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ১২)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

আত্মার কথোপকথনের বিবরণ-
পবিত্র হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, মালাকুল মউত যখন কাহারও জান কবজ করিতে উপস্থিত হন, তখন নেককারের আত্মা তাহাকে লক্ষ্য করিয়া বলে, "হে মালাকুল মউত!  আল্লাহ তা'লার অনুমতি ও আদেশ ব্যতীত তোমার অনুগত হইতে সম্মত নহি। তোমাকে আমার জান কবজ করিতে দিব না!" তখন মালাকুল মউত বলিবে, "হে আল্লাহর বান্দা! আল্লাহ তা'আলা স্বয়ং আমকে তোমার রূহ কবজ করিতে নির্দেশ দিয়াছেন।" তখন আত্মা বলিবে, "হে মৃত্যুদূত! যদি তুমি সত্য হও, তবে উহার প্রমাণ স্বরূপ নিদর্শন প্রদর্শন কর। কারণ আল্লাহ তায়ালা আমার দেহকে সৃষ্টি করিয়া উহাতে আমাকে বসবাস করিতে অনুমতি প্রদান করিয়াছেন, তখন তুমি উপস্থিত ছিলে না । এখন কোথা হইতে আমায় কবজ করিতে আসিয়াছ?" তারপর মালাকুল মউত আল্লাহ তা'আলার সমীপে আরজ করিবেন, "হে আল্লাহ ! আপনার বান্দা এইরূপ বলিতেছে এবং আপনার নিদর্শন কামনা করিতেছে।" প্রতুত্তরে আল্লাহ এরশাদ করিবেন "হে মালাকুল মউত! আমার বান্দার রূহ্ সত্য কথাই বলিয়াছে; সুতরাং তুমি বেহেশতে চলিয়া যাও এবং উহা হইতে আমার নাম অঙ্কিত একটি সেব-ফল আনিয়া তাহার রূহের সম্মুখে স্থাপন কর।" অতঃপর মালাকুল মউত বেহেশতে চলিয়া যাইবে এবং "বিসমিল্লাহ"  খোদিত একটি সেব-ফল আনিয়া তাহার সম্মুখে রাখিবে। আর তখনই বান্দার রূহ উহা দেখিতে দেখিতে পরম আনন্দে বাহির হইয়া যাইবে।

পরবর্তী পর্ব

দাকায়েকুল আখবার- (১১) মৃত্যুস্থানের বিবরণ

 

📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ১১)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

 মৃত্যুস্থানের বিবরণ-
অনন্ত দয়াময় আল্লাহ তা'আলা 'মালাকুল আরহাম' নামক এক শ্রেণীর ফেরেশতা সৃষ্টি করিয়াছেন। তাহারা শিশু মাতৃগর্ভে থাকা অবস্থায় তাহার মৃত্যুস্থানের মাটি বীর্যের সহিত মিশ্রিত করিয়া দেন। জন্ম-লাভের পর বান্দা পৃথিবীর যেখানে সেখানে পরিভ্রমণ করে; কিন্তু মৃত্যুর পূর্বক্ষণে সে বীর্যের সহিত মিশ্রিত মাটির জায়গায় আসিয়া হাজির হয়। তখন সেখানে তাহার রূহ কবজ করা হয়। আল্লাহ তা'আলার বাণীই ইহার জ্বলন্ত প্রমাণ। আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করিয়াছেন "হে নবী! আপনি বলিয়া দিন, যদি তোমরা তোমাদের গৃহেও অবস্থান করিতে, তথাপি যাহার যেখানে মৃত্যু লেখা আছে, তাহাকে অবশ্যই সেই মৃত্যুস্থানে পৌঁছিতে হইবে।"
হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে, প্রাচীনকালে হযরত মালাকুল মউত পয়গাম্বরদের সহিত সাক্ষাত করিতে আসিতেন। একদিন তিনি হযরত দাউদ (আঃ) এর পুত্র হযরত সুলাইমান (আঃ) এর সহিত সাক্ষাত করিতে আসিলেন। তথায় তিনি একজন সুশ্রী যুবকের প্রতি তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করিলেন। ফলে উক্ত যুবক ভীত ও কম্পিত হইয়া পড়িল। মালাকুল মউতের প্রস্থানের পর যুবকটি হযরত সুলাইমান (আঃ) এর নিকট আরজ করিল, "হে আল্লাহর রাসূল! আশা করি বায়ু আপনার হুকুমে এখনই আমাকে চীনদেশে পৌঁছাইয়া দিবে।"  অতঃপর হযরত সুলাইমান (আঃ) এর নির্দেশে বায়ু সে যুবকটিকে তখনই চীনদেশে পৌঁছাইয়া দিল। পুনরায় মালাকুল মউত সুলাইমান (আঃ) এর দরবারে উপস্থিত হইলে তিনি তাহাকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিপাতের কারণ জিজ্ঞাসা করিলেন। উত্তরে মালাকুল মউত বলিলেন,  "আমি সেইদিনই তাহার রূহ চীনদেশে কবজ করিবার জন্যে আদিষ্ট হই, কিন্তু তাহাকে আপনার নিকট দেখিয়া আশ্চর্যান্বিত হইয়া পড়ি।" তারপর হযরত সুলাইমান (আঃ) সেই যুবকের চীনদেশে গমনের গল্প শুনাইলেন। তখন মালাকুল মউত বলিলেন,  আমি ঐদিনই তাহার রূহ্ চীনদেশে কবজ করিয়াছি"। 
অন্য এক হাদীসে বর্ণিত আছে যে, রূহ কবজ করিবার নিমিত্ত মালাকুল মউতের অসংখ্য সহকর্মী আছে। যেমন কোনও ব্যক্তি সর্বদা প্রার্থনা করিয়া বলিত,  "হে আল্লাহ! আমাকে এবং সূর্যের তত্ত্বাবধায়ক ফেরেশতাকে ক্ষমা করুন।"  সূর্যের তত্ত্বাবধায়ক ফেরেশতা একদা আল্লাহ পাকের অনুমতি লইয়া সেই ব্যক্তির সহিত সাক্ষাত করিতে আসিলেন এবং তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন,  "হে বন্ধু! বলুন ত আপনি কি প্রয়োজনে আমার জন্য এত বেশি দোয়া করিয়া থাকেন।"  সে উত্তর করিল, "আমার আশা আপনি আমাকে আপনার স্থানে লইয়া যান এবং মালাকুল মউতের নিকট হইতে জানিয়া আমাকে আমার মৃত্যুর নৈকট্যতা সম্বন্ধে অবগত করান।"  এই উপলক্ষে তিনি তাহাকে স্বীয় স্থান সূর্যে বসাইয়া রাখিয়া মালাকুল মউতের নিকট গমন করিলেন এবং তাহাকে আদ্যোপান্ত সমস্ত ঘটনা শুনাইয়া উক্ত ব্যক্তির মৃত্যু সময় সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করিলেন। প্রত্যুত্তরে মালাকুল মউত নিজের ডাইরী খুলিয়া বলিলেন, "এই লোকটির ঘটনা অত্যন্ত আশ্চর্যজনক। আমার ডাইরীতে লিপিবদ্ধ আছে যে, এই ব্যক্তি যতক্ষণ পর্যন্ত তোমার স্থান সূর্যে অবস্থান না করিবে ততক্ষণ পর্যন্ত তাহার মৃত্যু হইবে না।"  তখন প্রশ্নকারী বলিলেন, "সে এখন আমার স্থানে বসিয়া রহিয়াছে।"  উত্তরে মালাকুল মউত বলিলেন, "তবে অবশ্যই এতক্ষণে আমার সহকর্মীগণ তাহার রূহ কবজ সম্পন্ন করিয়া ফেলিয়াছেন। কেননা তাহারা কখনও স্বীয় কার্যে গাফলতি বা অবহেলা করেন না।" 
জীব-জন্তু ও পশু-পক্ষীর হায়াত সম্পর্কে জনাব হুযুর করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ ফরমাইয়াছেন যে, আল্লাহ তা'আলার যিকিরই তাহাদের জীবন। যখন তাহারা আল্লাহ তায়ালার যিকির ছাড়িয়া দেয় তখনই আল্লাহ তা'লা তাহাদের আত্মা সংহার করিয়া থাকেন; তাহাদের সহিত মালাকুল মউতের কোন সম্পর্ক নাই। আরও বলা হইয়াছে যে, প্রকৃতপক্ষে যাবতীয় জীবের আত্মা আল্লাহ পাকই সংহার করিয়া থাকেন। কিন্তু হত্যাকার্যকে হন্তার প্রতি এবং মুত্যুকে রোগের প্রতি যেমন নেছবত বা সম্বন্ধযুক্ত করা হয়, তেমনি মৃত্যুর সহিত মালাকুল মউতের নেছবত বা সম্পর্ক বিদ্যমান রহিয়াছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা এরশাদ করিয়াছেন "মৃত্যুর সময় হইলে আল্লাহ তা'আলাই রূহ কবজ করিয়া থাকেন এবং তাহারা নিদ্রার সময় মৃত্যুবরণ করে না, কিন্তু মৃত্যুর সময় হইলে তাহার আত্মা কাড়িয়া লওয়া হয় আর অন্যান্য লোকদিগকে এক নির্দিষ্ট কালের জন্য মুক্তি দেওয়া হয় নিশ্চয়ই উহাতে চিন্তাশীলদের জন্য নিদর্শনাবলী বিদ্যমান রহিয়াছে।"

পরবর্তী পর্ব

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...