মঙ্গলবার, ২ জুলাই, ২০২৪

মখলূক – ৭


মখলূক— (পর্ব – ৭)

📚মিনহাজুল আবেদীন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)


ফিতনার যুগে আলিমদের কর্তব্য—

ফিতনা যখন ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করবে, প্রতিটি কাজই বিপরীত হওয়া শুরু করবে, মানুষ ধর্মীয় বিষয় থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, মুমিনকে কোন কাজের যোগ্য মনে করা হবে না, কেউই আলিমের সন্ধান করবে না, উপদেশপূর্ণ বাক্যের কোন মূল্য থাকবে না এবং নিজের ধর্মের ব্যাপারেও যখন কেউ সাহায্য করবে না,

মানুষের সর্বস্তরে, জীবনের সকল ক্ষেত্রে ফিতনা যখন পরিব্যাপ্ত হয়ে পড়বে,

বিশেষ শ্রেণীর মানুষ ধর্মীয় নির্দেশ পালনে শৈথিল্য প্রদর্শন করবে,

এমতাবস্থায় আলিমের জন্যও নির্জনতা ও নিঃসঙ্গ জীবন অবলম্বন এবং জনসাহচর্য পরিত্যাগ করে গোপনে জীবন যাপনের একটা ওজর পাওয়া যেতে পারে। আমার আশঙ্কা হয় যে, আমি যেসব বিষয় বর্ণনা করলাম সে সঙ্কটপূর্ণ ও কঠিন যুগেই কেবল তা বিদ্যমান থাকবে, তারই বা কি নিশ্চয়তা আছে? সুতরাং বাহ্য দৃষ্টিতে ধরা না পড়লেও আদতে এর মধ্যেই মানুষের সাহচর্য ত্যাগ ও নির্জনতা এবং নিঃসঙ্গ জীবন অবলম্বনের নির্দেশ বিদ্যমান রয়েছে। বিষয়টিকে খুব গভীরভাবে অনুধাবন করা প্রয়োজন। কেননা এ ক্ষেত্রে ভ্রান্তির খুবই আশঙ্কা এবং তাতেই ক্ষতির আশঙ্কাও বেশী

এখন হয়তো কেউ প্রশ্ন করতে পারেন যে, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহি ওয়াসাল্লাম) কি বলেননি যে : 

“জামা'আত ও সংঘবদ্ধতাকে আঁকড়ে থাক; কেননা জামা'আতের উপরই আল্লাহর রহমত বিদ্যমান। (আর মনে রাখবে) শয়তান হলো মানুষের জন্য ব্যাঘ্রস্বরূপ। জামা'আত থেকে বিচ্ছিন্ন, দূরে ও প্রান্তে অবস্থানকারী এবং যে ব্যক্তি জামা'আত থেকে পৃথক হইয়া একা থাকে, শয়তান তাকে ধরে নিয়ে যায়”।

এবং তিনি কি আরও বলেননি ? “শয়তান নিঃসঙ্গ ও একা ব্যক্তির সাথে সাথে থাকে। কিন্তু দু'জন হলেই দূরে অবস্থান করে”।


হ্যাঁ, সত্যই উপরিউক্ত কথাগুলো রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) স্বয়ং বলেছেন। কিন্তু তিনি তো একথা বলেছেন যে, নিজের গৃহকে আঁকড়ে থাক, বিশেষ বিশেষ লোকের সাহচর্য অবলম্বন করো এবং সাধারণের সংশ্রব একেবারে বর্জন করো। সুতরাং দেখা যাচ্ছে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) যেমন জামা'আতে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন, তেমনি গোলযোগপূর্ণ সময়ে মানুষের সংশ্রব বর্জন ও নির্জন জীবন যাপনেরও নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু তাই বলে তাঁর এতদুভয় নির্দেশের মধ্যে কোন বৈপরীত্য নেই। বরং দু'টি নির্দেশের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করে নেয়া দরকার। প্রথমত, রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) যেখানে জামা'আতকে আঁকড়ে থাকার কথা বলেছেন, সেখানে তিনি জামা'আত অর্থে ধর্মীয় বিষয় ও ধর্মীয় আহকাম সম্পর্কে বলেছেন। কেননা, উম্মতে মুহাম্মদীয়া কখনও অধর্মের ব্যাপারে একমত হতে পারে না এবং এ ক্ষেত্রে কেউ যদি ইজমায়ে উম্মতের বিরুদ্ধে চলে যায়, তবে তার ক্ষেত্রে উক্ত হাদীস প্রযোজ্য হতে পারে অথবা জমহুর উলামাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যাপারে রায় প্রকাশ করলে, তার জন্যও এ হাদীস সাবধান বাণী হিসেবে প্রযোজ্য হয়। তেমনি জমহুর উলামাদের থেকে পৃথক হয়ে যাওয়ার ব্যাপারেও হতে পারে। এসবই পরিত্যাজ্য কাজ এবং এগুলোর পরিণাম স্বভাবতই বিপদগামী হওয়া। তবে হ্যাঁ, ধর্মের ঘনিষ্ঠতা রক্ষার জন্যই যদি পৃথক হওয়ার প্রয়োজন দেখা দেয়, তবে সেটা আলাদা কথা। তা অবশ্যই করা যেতে পারে।


‘জামা'আত আঁকড়ে থাক' – এর দ্বিতীয় অর্থ এ হতে পারে যে, জুম'আ - জামা'আত পরিত্যাগ করো না। কেননা এগুলোর মধ্যে ধর্মীয় শক্তি প্রকাশ পায় এবং এগুলোর মধ্যেই ইসলামের পরিপূর্ণতা লাভ হয়। তাছাড়া, এ ধরনের অনুষ্ঠানের দ্বারা কাফির ও বিধর্মীদেরও তুষানলে নিপতিত করা সম্ভব হয় । সুতরাং এ ধরনের অনুষ্ঠান আল্লাহ্র রহমত থেকে নিশ্চয়ই শূন্য থাকবে না। এজন্য আমরা একা জীবন অবলম্বনকারীকে বলে থাকি, উত্তম ও ভাল সকল সমাবেশেই তার অংশগ্রহণ করা উচিত— অপরপক্ষে গোলযোগপূর্ণ ও ক্ষতিকারক সমাবেশ থেকে দূরে অবস্থান সে করতে পারে। কেননা এসব স্থানে প্রতি পদেই অসুবিধা বিদ্যমান।


‘জামা'আত আঁকড়ে থাক'-এর তৃতীয় অর্থ এ হতে পারে যে, ধর্মীয় ব্যাপারে যারা দুর্বল, শান্তি ও নিরাপদকালে তাদের আলাদা না হওয়ার জন্য তাকীদ করা হয়েছে।


তবে যারা ধর্মীয় ব্যাপারে শক্তিশালী এবং আল্লাহর সকল বিষয়েও যথেষ্ট ওয়াকিফহাল, তারা যদি দেখতে পায় যে, ফিতনার সে সময় এসে গেছে,

রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) যে যুগের ব্যাপারে উম্মতকে সাবধান করে গেছেন এবং সে সময় নির্জনতা ও একাকী জীবন যাপনের নির্দেশ দিয়েছেন, তাহলে তখন তাদের জন্য নির্জনতা ও একাকী জীবন যাপনই উত্তম ও ভাল। কেননা, এমন যুগে মানুষের সাথে মেলামেশার মধ্যে ফাসাদ ও বিপদের ঝুঁকি বিদ্যমান থাকে। তবে ইসলামী বিষয় সংক্রান্ত সমাবেশ এবং সাধারণ কল্যাণকার্য থেকে পৃথক হয়ে যাওয়া উচিত নয়। যদি মানুষের সংস্রব বর্জন, নির্জনতা ও একাকী জীবন যাপনই একান্ত উদ্দেশ্য হয়, তাহলে কোন পর্বত শীর্ষে অথবা কোন জনমানবহীন স্থানে চলে যাওয়াই উত্তম। কারণ তথায় গেলে নিজের ধর্মকে অন্তত সংরক্ষণ করতে সক্ষম হবে।


মোদ্দাকথা আল্লাহ্ যাকে জুম'আ, জামা'আত ও অন্যান্য সকল ইসলাম বিষয়ক সমাবেশে অংশ গ্রহণের সামর্থ্য দান করেছেন সে যেখানেই আর যে পরিস্থিতিতেই অবস্থান করুক না কেন, তাতে তার অংশগ্রহণ করা উচিত – যাতে করে এর মহান সওয়াব থেকে বঞ্চিত না হতে হয়। কেননা ধর্মীয় সমাবেশ--তা সে যেখানেই হোক না কেন, আল্লাহর তরফ থেকেই হয়ে থাকে। অবশ্য অনেক সময় মানুষের দোষ-ত্রুটির জন্য তাতেও ফাসাদ ও ফাটল সৃষ্টি হয়ে যায়। আবদাল ও কুতুবদের সম্পর্কে এ ধরনের কথাই শুনতে পাওয়া যায় । ইসলামী বিষয়ে যেখানেই কোন সমাবেশ হোক না কেন, তাঁরা সেখানেই উপস্থিত হন। তাঁরা যেখানেই যেতে চান, সেখানেই পৌঁছে যেতে পারেন। তাঁদের জন্য ধরাটি একটি পদক্ষেপের স্থান মাত্র।


বর্ণিত আছে, এ সকল বুযুর্গের জন্য যমীনকে শুইয়ে দেয়া হয় এবং শান্তির সাথে তাদের আহবান করা হয়। আর তাদের উপর বিস্তার করে থাকে কেরামত ও কল্যাণের ছায়া।


যাঁরা এ ব্যাপারে সাফল্য অর্জন করেছেন, আমি তাঁদের মোবারকবাদ জানাই। আল্লাহ্ তাদের নিজ সংকল্পে দৃঢ় থাকার তৌফিক দান করুন, যারা নিজের নফসকে রেহাই দেয়ার ব্যাপারে ঔদাসীন্য অবলম্বন করেছে আর লক্ষ্যস্থলে পৌঁছতে অপারগ, আমাদের ন্যায় অন্বেষীদের তিনি সাহায্য করুন।


আমি নিজের অবস্থাকে নিম্নোক্ত কবিতার মাধ্যমে প্রকাশ করার প্রয়াস পাব : 

অন্বেষী দল সাফল্য অর্জন করেছে এবং তারা তাদের উদ্দেশ্যে উপনীত হয়ে গেছে। আর বন্ধুগণ বন্ধুদের দ্বারাই সাফল্য অর্জন করেছে। অথচ, আমরা উদ্দেশ্যে উপনীত হওয়া ও সে পথ থেকে বিরত থাকা- এ দুইয়ের মাঝখানে কম্পমান ও অস্থিরতায় ডুবে আছি। নিকটকে দূর আর দূরের মধ্যে নৈকট্য তালাশ করছি। তাছাড়া এ নফসটিও এমন যে, সে অসম্ভব জিনিসকেই জ্ঞানের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

সুতরাং আমাদের এমন জিনিস পান করাও যাতে সকল বেদনা দূর হয়ে যায় এবং সিরাতুল মুস্তাকীমের সোজা পথ হাসিল হয়।


ওহে রোগ-জীর্ণদের চিকিৎসক। এ রোগীদের আহত অন্তঃকরণের বর্তমানে এ একটিই কামনা। ওহে বিপদ ত্রাতা, আমি জানি না, কি দিয়ে আমার এ রোগের চিকিৎসা করবো। আমি এ-ও জানি না যে, কি দিয়ে কিয়ামতের দিন সাফল্য লাভ করবো?

--

মখলূক – ৬



মখলূক— (পর্ব – ৬)

📚মিনহাজুল আবেদীন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)


ধর্মের নেতাদের দুটি জিনিষ আবশ্যক—

এখানে আরও একটি বিষয় অবশ্যই স্মরণীয় যে, যে ব্যক্তির নিকট ধর্মীয় ব্যাপারে সমাজ নির্ভরশীল, মানুষের মধ্যে অবস্থানের জন্য তাঁর দু'টি জিনিসের অত্যন্ত প্রয়োজন। প্রথমত, অসীম ধৈর্য, বিপুল সহিষ্ণুতা, উদার দৃষ্টি ও সকল ব্যাপারে আল্লাহর সাহায্য ও সহযোগিতা লাভের যোগ্যতা। দ্বিতীয়ত, সমাজের অন্যান্য সকল ব্যাপারে যদিও তিনি সশরীরে স্বয়ং অবস্থান করবেন তথাপি তাঁকে সকল বিষয় থেকে আলাদা থাকতে হবে। সুতরাং যখন তিনি কথাবার্তা বলবেন, তিনি ধর্মীয় বিষয়টিকেই প্রাধান্য দেবেন। যদি কেউ সাক্ষাৎ করতে আসে, তবে তার মর্যাদা ও সম্মান অনুযায়ী তাকে মর্যাদা দান ও সম্মান প্রদর্শন করবেন। যদি মানুষ তাঁকে উপেক্ষা করে বা তাঁর সম্পর্কে উদাসীন হয়ে যায়, তবে এ অবস্থাকে সৌভাগ্য মনে করবে। সমাজ যদি নেক ও সত্য কাজে ব্যাপৃত হয়, তবে তার বিরোধিতা করবে অথবা তা থেকে দূরে অবস্থান করবে। অবশ্য যদি দেখা যায় যে, উপদেশ কাজে আসবে, তবে উক্ত কার্যে বাধা দান করবে বা নিজের গোস্বা প্রকাশ করবে। এমনিভাবে, সমস্ত শক্তি ও ক্ষমতা দিয়ে তাঁকে তাঁর হক আদায় করতে হবে। মানুষের সাক্ষাৎ বা ইবাদতে অংশ গ্রহণ করে হোক অথবা সমাজে যে বিষয়ের অভাব আছে, তা পূরণ করেই হোক -- ধর্মীয় ব্যাপারে সমাজের প্রতি যে দায়িত্ব তাঁর আছে, তা পালন করবে। মনে রাখবে, এর কোন বদলার প্রত্যাশী হতে পারবে না। এ ধরনের কোন ধারণা রাখা এবং ধর্মীয় ব্যাপারে মানুষের মনে অসঙ্গত ধারণা সৃষ্টি করাও চলবে না। যদি সামর্থ্য থাকে, তবে ধর্মীয় ব্যাপারে হক আদায়ের জন্য অকুণ্ঠচিত্ত থাকবে।

সমাজের মন্দ দিকগুলো দূর করার চেষ্টা করবে। তাদের খোশখবর দান করবে। নিজেকে সব সময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে এবং নিজের অভাবের বিষয় সর্বদা গোপন রাখবে। তাহলে মানুষ বাহ্যত তাঁকেই তাদের অনুসরণীয় মনে করবে এবং অন্তরেও তাঁর ন্যায় হওয়ার জন্য চিন্তা-ভাবনা করবে।

এ সব বিষয় ছাড়া তাঁর জন্য আরও কতিপয় কর্তব্য রয়েছে। যথা নিজের ব্যাপারেও সর্বদা সতর্ক ও সচেতন এবং বিশেষ ইবাদতে লিপ্ত থাকতে হবে। 

যেমন হযরত উমর 'আল-ফারূক (রা) বলেছেনঃ যদি রাতে বিশ্রাম লাভ করি, তাহলে আমার নফসকে লোকসানের দিকে ঠেলে দিতে হয, আর যদি দিনে বিশ্রাম গ্রহণ করি, তবে মানুষের হক নষ্ট করতে হয়। সুতরাং এই দুই সময়ের মধ্যে বিশ্রাম নেয়ার অবকাশ কোথায়?

উপরিউক্ত বিষয়টিকেই কতিপয় কবিতার মধ্যেও ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

যেমন-

যদি তুমি ইমামদের জীবনাদর্শের প্রতি আকর্ষণ অনুভব কর তবে নিজের নফসকে এমন দৃঢ় কর যেন বিপদাপদ তোমাকে টলাতে না পারে। নফসকে আত্মমর্যাদায় বলীয়ান করে প্রতিটি খারাপ জিনিস উদ্ভবের মুকাবিলা করতে হবে এবং এমনিভাবে ধৈর্য শিক্ষা দেবে যে, তা যেমন বক্ষে প্রতিরোধ ক্ষমতা সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়।


তোমার জিহ্বা থাকবে নীরব, তোমার চতুর্দিক থাকবে বন্ধ। তেমনি তোমার গোপনীয়তা থাকবে সত্যিই লুক্কায়িত – বুদ্ধিমানের নিকট এটাই - সবচাইতে প্রসিদ্ধ লাভ করেছে।

তোমার মন্দ সমালোচনা হবে, দরজা থাকবে বন্ধ। মুখে থাকবে মুচকি হাসি – কিন্তু পেট থাকবে খালি। তোমার অন্তর আহত, তোমার ব্যবসা অচল, - তোমার মর্যাদা বিলুপ্ত – সর্বত্র কেবল তোমার দোষ-ত্রুটির আলোচনা। তবুও দিনরাত তুমি কাল ও মানুষের অভিশাপ হজম করে চলেছ। অন্তরে যদি তাঁদের (মহৎ ব্যক্তির) আদর্শ অনুসরণের আকঙ্খা পোষণ কর, তবে দিনে মানুষের কাজে পুরস্কার বা কৃতজ্ঞতা ব্যতীতই লিপ্ত হয়ে যাও এবং রাতে সেই মিলনানন্দে ডুবে যাও, একই কাফেলার অন্য লোক যে আনন্দের খবরও জানে না।


সুতরাং জীবনের রাত্রিসমূহকে সে মহাসঙ্কটপূর্ণ ও কঠিন দিনের উপায় লাভে নিয়োজিত কর, যে দিন অন্য কোন কিছুই কাজে আসবে না ।


মোটকথা, মানুষের মধ্যে অবস্থানকালে স্বয়ং মানুষের সাহচর্যে থাকবে ঠিক; কিন্তু অন্তর থাকবে বহু দূরে – অতি দূরে। আল্লাহর কসম, এ অবস্থায় উপনীত হওয়া খুবই কঠিন। সংসারটাও বড়ই সংকুল। এ বিষয়টি সম্পর্কে আমাদের ওস্তাদ সাহেব ওসীয়ত করতে গিয়ে বলেছেনঃ “আয় বৎস, যুগের মানুষের সাথে অবস্থান করলেও তাদের সৃষ্ট স্রোতের টানে ভেসে যেও না। তিনি আরও বলেছেনঃ ব্যাপারটা খুবই কঠিন। কেননা, জীবনটা জীবিতদের সাথে আর অনুসরণ করতে হয় মৃত ব্যক্তিদের।


হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে মসউদ (রা) বলেছেনঃ মানুষের সাথে মেলামেশা কর, কিন্তু তোমার অন্তর যেন তাদের সাথে কথা না বলে। তাঁর এ কথাটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও মহান, সন্দেহ নেই।


মখলূক – ৫



মখলূক— (পর্ব – ৫)

📚মিনহাজুল আবেদীন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)


নির্জনতা ও নিঃসংগতা জীবন অবলম্বন নির্দেশ—২

দ্বিতীয় শ্রেণীর লোক—

যে ব্যক্তি জ্ঞানের ব্যাপারে মানুষের নিকট প্রত্যাশী অথবা তার নিকটই মানুষ জ্ঞান লাভেচ্ছ কিংবা ধর্মীয় ব্যাপারে তাঁর নিকট মানুষের প্রয়োজন রয়েছে— যেমন, কোন ব্যক্তি জনসমাজে থাকলে তিনি হয়তো কোন একটি সত্যকে প্রতিষ্ঠা করতে পারেন বা কোন বিদ'আত দূর করতে সক্ষম কিংবা কথায় বা কাজে মানুষকে নেক কাজের দিকে আহবান করতে পারেন এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখার ক্ষমতাও রাখেন — এমতাবস্থায় এ শ্রেণীর লোকের পক্ষে মানুষের সঙ্গ ত্যাগ ও নির্জনতা অবলম্বন কোনক্রমেই সঙ্গত নয়। বরং মানুষের মধ্যেই তার অবস্থান করা উচিত। কারণ তাতে আল্লাহ্ তা'আলার মকলুকের নসীহতের কার্য হবে, আল্লাহর দীনের হেফাজত হবে এবং সঙ্গে সঙ্গে তাঁর দ্বারা আহকাম-আরকানও বর্ণিত হবে। কেননা, রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেন : 

“যখন বিদ'আত আত্মপ্রকাশ করে এবং আলিম নীরবতা অবলম্বন করে তেমন আলিমের উপর আল্লাহ্ তা'আলার অভিশাপ নাযিল হোক”।


যখন কোন আলিম বিদ'আতপূর্ণ সমাজে অবস্থান করে নীরবতা অবলম্বন করবেন, তখন তাঁর বেলায়ই উপরিউক্ত হাদীস প্রযোজ্য হবে। এমতাবস্থায় তিনি সেখান থেকে দূরে চলে গিয়ে নির্জনতা ও নীরবতা অবলম্বন করতে চাইলেও তা জায়েয হবে না।

ওস্তাদ আবি বকর বিন ফুরক সম্পর্কে বর্ণিত আছে, তিনি স্থির করলেন যে, আল্লাহর ইবাদতের জন্য মখলুক থেকে আলাদা অবস্থান করবেন। এ উদ্দেশ্যে তিনি একটি পাহাড়ে উঠছিলেন। এমন সময় তাঁকে সম্বোধন করে আওয়াজ এলোঃ 'আয় আবূ বকর' যখন তুমি আল্লাহ্ তা'আলার মখলুকের মধ্যে তাঁর নিদর্শনসমূহের অন্যতম নিদর্শনের পর্যায়ে উপনীত হয়েছ, তখনই তুমি আল্লাহর বান্দাদের পরিত্যাগ করে চলেছ। এ আহবান শুনে তিনি প্রত্যাবর্তন করলেন এবং এ কারণেই ওস্তাদ আবি বকর বিন ফুরক তাঁর অবশিষ্ট জীবন মানুষের সাহচর্যেই কাটিয়েছেন।


মামুন বিন আহমদ আমার নিকট বর্ণনা করেছেন, ওস্তাদ আবি-ইসহাক কোন এক ইবাদত গোযার ব্যক্তিকে বলেছিলেন : 

তুমি তো মুহাম্মদ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর উম্মতদের বিদ'আতের হাতেই সমর্পণ করেছ, আর নিজে এখানে এসে বনের ঘাস চিবিয়ে দিন গোযরান করছ।


ইবাদত-গোযার ব্যক্তি এ কথার জবাবে বললেনঃ মানুষের সাথে অবস্থানের শক্তি ও ক্ষমতা আমার নেই। আল্লাহ্ তা'আলা আপনাকে বরং সেই ক্ষমতা ও শক্তি দান করেছেন।


অতঃপর আবি ইসহাক মানুষের মধ্যে অবস্থানকেই স্বীকার করে নেন এবং শরীয়তের একটি মূল্যবান গ্রন্থ প্রণয়ন করেন।


এ বুযুর্গদের মধ্যে ইলমের যেমন পরিপূর্ণতা ঘটেছিল তেমনি আমলের ব্যাপারেও তাঁরা নজীর স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাছাড়া, আখিরাতের খাটি পথ অবলম্বনের ব্যাপারে তাঁদের সূক্ষ্ম দৃষ্টিক্ষমতা ছিল। আল্লাহ্ এ সকল বুযুর্গ ব্যক্তির প্রতি সন্তুষ্ট থাকুন। 

মখলূক – ৪



মখলূক— (পর্ব – ৪)

📚মিনহাজুল আবেদীন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)


নির্জনতা ও নিঃসংগতা জীবন অবলম্বন নির্দেশ—১

এখন প্রশ্ন হলো আমাদের সামনে মখলুক অর্থাৎ সৃষ্ট-জগতের বিভিন্ন পর্যায় রয়েছে। কোন্ পর্যায়ে কিভাবে আমাদের নির্জনতা ও নিঃসঙ্গ জীবন অবলম্বন করা উচিত, সে সম্পর্কে আলোচনা করা দরকার।

এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট মানুষকে দু'ভাগে ভাগ করা যায়। 

প্রথম, এমন অনেকেই আছেন, যাদের মখলুক থেকে জ্ঞান অথবা অন্য কোন কিছু গ্রহণের প্রয়োজনই নেই এবং তাদের কাছেও মানুষের কোন প্রয়োজন নেই। এই শ্রেণীর মানুষের পক্ষে মানুষ থেকে নিঃসঙ্গতা অর্জনই উত্তম। জুম'আ, জামা'আত, ঈদ, হজ্জ ও ইলমের মজলিস-এ সব ব্যতীত আর কখনো মানুষের সাহচর্যে তার না যাওয়াই উত্তম। তবে সাংসারিক বিষয়ের মধ্যে যদি এমন কোন জরুরী ব্যাপার দেখা দেয়, যা না হলেই চলে না – তাহলে সে ব্যাপার-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সাথে দেখা করতে পারেন। সব সময় নিজেকে আত্মগোপন রাখার এবং যে বিষয়ে জ্ঞান নেই অথবা যে সম্পর্কে জ্ঞানার্জন সম্ভব নয়, তার প্রকৃত রূপটিকেই দৃঢ়বদ্ধভাবে আঁকড়িয়ে থাকাই তার কর্তব্য।

এ শ্রেণীর ব্যক্তি যদি সম্পূর্ণ নির্জনতা ও নিঃসঙ্গ জীবন অবলম্বন করতে চান এবং মখলুক থেকে সম্পূর্ণ আলাদা হওয়ার আকাঙ্ক্ষা করেন, তবে কোন অবস্থাতেই কোনক্রমেই কারো সাথে যেন সাক্ষাৎ না করেন-- এমনকি, জুম'আ জামা'আতেও নয় । অবশ্য যদি মানুষ সাক্ষাৎ পরিত্যাগ ও সম্পূর্ণ নির্জনতা অবলম্বন লাভজনক বিবেচিত হয়।


এ ব্যবস্থাটি (অর্থাৎ সম্পূর্ণ নির্জনতা ও নিঃসঙ্গ জীবন যাপনের জন্য জামা'আত, জুমা পরিত্যাগ করা) দুইভাবে কার্যকরী করা যেতে পারে। প্রথমত, এমন কোন জায়গায় চলে যেতে হবে, যেখানে উক্ত আহকামগুলো আদৌ ফরয হবে না। যেমন, কোন নির্জন পাহাড়ের চূড়া-- যেখানে কোন জনবসতি নেই। ইবাদত গোয়ার ব্যক্তিগণ মানুষ ও অন্যান্য মলূক থেকে দূরে থাকার জন্য এ উপায়টিই বেশি অবলম্বন করে থাকেন-- এটা অধিক কার্যকরী ও হয়।


দ্বিতীয়ত, যদি সত্যিকারভাবে জানতে পারা যায় যে, উক্ত আহকামগুলো আদায় করতে গিয়ে মানুষের সাথে মেলামেশার ফলে যে ক্ষতি সাধিত হবে, তা আহকামগুলো পরিত্যাগ করার চাইতে মারাত্মক– তাহলে তাঁর পক্ষে আহকামগুলো পরিত্যাগ করার একটি কৈফিয়ত পাওয়া যেতে পারে।


আমি স্বয়ং মক্কায় কতিপয় এমন ব্যক্তিকে দেখেছি যারা বায়তুল্লাহর নিকট অবস্থান করা সত্ত্বেও এবং সুস্থ শরীরে থাকা অবস্থায়ও জামা'আতে হাযির হতেন না। এ অবস্থা প্রত্যক্ষ করে আমার মনে সন্দেহের উদয় হলে আমি একদিন তাদের একজনের নিকট বিষয়টি প্রকাশ করলাম। তখন তিনি সে ওজরই জানালেন, যা আমি এই মাত্র বলে এসেছি (অর্থাৎ যদি সত্যিকারভাবে কেউ উপলব্ধি করতে পারেন যে, জামা'আত পরিত্যাগ করার চাইতে তাতে যোগদানের ফলে মানুষের সাথে মেলামেশায় অধিক ক্ষতি হবে।)


একথার পরিষ্কার অর্থ এই যে, যদি সত্যিকারভাবে বুঝতে পারা যায় যে, মসজিদে জামা'আতে হাযির হওয়ার অর্জিত সওয়াবের দ্বারা মসজিদে যেতে ও মানুষের সাথে মেলামেশার ফলে যে গুনাহ্ হবে তার ক্ষতিপূরণ হবে না।


আমি বলছি, এসব ব্যাপারে অপারগের জন্য কোন বাধ্যবাধকতা নেই। কেননা আল্লাহ্ তা'আলা মানুষের অপারগতা সম্পর্কে খুবই ওয়াকিফহাল। তিনি মানুষের অন্তঃকরণের খবর সবচাইতে বেশী জানেন। মোটকথা, জুম'আ ও জামা'আতে মানুষের সাথে মেলামেশা করবে। তবে নির্জনতা অবলম্বনের সুষ্ঠু উপায় হল মানুষ ও মকলুকাত থেকে দূরে কোথাও গিয়ে অবস্থান করা- যাতে - কোন প্রকারেই এ সবের ঝঞ্ঝাটে পড়তে না হয়। যেখানে গেলে জুম'আ· জামা'আত - এ সব দায়িত্ব পালনের প্রয়োজনই না হয়, তেমন জায়গায়ই চলে যাওয়া উচিত।

কেননা কোন শহরে বা জনসমাজে অবস্থান এবং সকলের মধ্য থেকে কোন ওজরের ভিত্তিতে জুম'আ ও জামা'আতে হাযির না হওয়ার যে (অধিকতর ক্ষতির আশঙ্কায়) অবস্থাটি বর্ণিত হলো, তা উপলব্ধি করা কঠিন কাজ। কারণ এ বিষয়টি উপলব্ধি করার জন্য সুতীক্ষ্ণ দৃষ্টিক্ষমতা ও অন্য ধরনের উপলব্ধি শক্তির প্রয়োজন। তা না হলে তার উপর থেকে উক্ত আহকামের বাধ্যবাধকতা দূর হলো কিনা, তা সঠিকভাবে বুঝতেই পারবে না। তাছাড়া, এ ক্ষেত্রে ভ্রান্তি ও কু-ধারণা সৃষ্টির আশঙ্কাও বিদ্যমান। প্রথম দু'টি পন্থাই বরং নিরাপদ ও সহজ।



মখলূক – ৩




মখলূক— (পর্ব – ৩)

📚মিনহাজুল আবেদীন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)


দ্বিতীয় কারণ--মখলূক থেকে স্বাতন্ত্র্য ও নিঃসঙ্গ জীবন অবলম্বনের দ্বিতীয় কারণ এই যে, মখলুকের সাথে যদি আল্লাহর পবিত্রতা শামিল না হয়, তবে এমতাবস্থায় রিয়া, আত্মপ্রদর্শনী প্রভৃতি কারণ উদ্ভূত বিষয় এসে আল্লাহর ইবাদতের পথে অন্তরায় সৃষ্টি করে— এ সবই বান্দার মধ্য থেকে সামনে এসে হাযির হয়। ইয়াহ্ইয়া ইবনে মায আরাযী সত্যই বলেছেনঃ মানুষের সাথে মেলামেশাই রিয়ার একটি প্রধান উপজীব্য। যারা সত্যিকারের যাহেদ (দুনিয়া ত্যাগী), তারা এসব বিষয় সম্পর্কে সাবধান থাকতেন – এমনকি এজন্য তারা মানুষের সাথে মেলামেশাই পরিত্যাগ করেছেন। হরমে হায়ান হযরত উয়ায়েস করনী (রঃ)-র নিকট আরয করেছিলেন, 'আপনি সাক্ষাৎ দান করে আমাকে গৌরবান্বিত করুন। জবাবে তিনি বলেছিলেনঃ আমি তোমার সাথে এমন একটি সম্পর্ক স্থাপন করেছি যা সাক্ষাতকারের চাইতে অনেক বেশী উপকারী। এ সম্পর্কটি হল, তোমার অসাক্ষাতেই তোমার জন্য দোয়া করা। কেননা সাক্ষাৎ ও প্রদর্শনের মধ্যে রিয়া ও প্রদর্শনী প্রকাশের আশংকা বিদ্যমান থাকে।

ইব্রাহীম আদহাম (রঃ) যখন একবার আগমন করেছিলেন তখন সুলায়মান খাওয়াসকে প্রশ্ন করা হলো, আপনি তাঁর সাথে দেখা করতে এলেন না কেন? তিনি জবাব দিলেনঃ আমি একটি বিদ্রোহী শয়তানের সাথে সাক্ষাৎ করাকে তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করার চাইতে বেশী পছন্দ করি। সুতরাং আমি কি করে তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতে আসবো? সুলায়মান খাওয়াসের এ মন্তব্য উপস্থিত সকলের নিকটই অসহ্য বোধ হতে লাগল। তখন তিনি ব্যাখ্যা করে বললেনঃ আমার আশংকা এই যে, আমি তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করার ফলে আমি তার জন্য একটি গৌরব ও প্রদর্শনীমূলক বস্তু হয়ে না পড়ি। অপরপক্ষে যদি শয়তানের সাথে সাক্ষাৎ হয়, তবে তাকে তাঁর নিকট আগমন করার পথে আমি বাধা দিব। আমার ওস্তাদ এক মারেফাত পন্থীর সাথে একদা সাক্ষাৎ করেছিলেন। প্রথমে কিছুক্ষণ তাঁরা উভয়ে কথাবার্তা বলে কাটিয়ে দিলেন। অতঃপর উভয়েই দোয়া শুরু করলেন। দোয়ার মধ্যে আমার ওস্তাদ সাহেব বলতে লাগলেনঃ আমরা যে মজলিসে এখন বসে আছি, এর চাইতে ফযীলতপূর্ণ মজলিসের কথা আমার স্মরণেই আসে না। তখন সেই মারেফত পন্থী বলতে লাগলেনঃ আমি এমন কোন বৈঠকেই থাকি নাই, যে বৈঠকে মানুষের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ভয় জন্মেছে – কেবল এ বৈঠকে ব্যতীত। কেননা আপনি কি উত্তম শিক্ষাপ্রদ এবং মূল্যবান কথা আমার সামনে বর্ণনা করেন নাই? আমিও তো তাই করেছি। তাহলে নিশ্চয়ই এতে করে রিয়া হয়ে গেছে। এ কথা শুনে আমার ওস্তাদ সাহেব অনেকক্ষণ পর্যন্ত কাঁদতে থাকলেন এবং কাঁদতে কাঁদতে তাঁর হিচকি দেখা দিল। অতঃপর তিনি নিম্নোক্ত কবিতা আবৃত্তি করতে লাগলেন 

“আহা, যদি এমন তৌফিক হাসিল হতো যার দ্বারা অত্যন্ত ভীত অবস্থায় সর্বনিয়স্তার দরবারে ইনসাফের দরখাস্ত পেশ করতে পারা যায়। আল্লাহ তা'আলার সামনে নিজের গুনাহ্ খাতা নিয়ে অনুতপ্ত হয়ে হাযির হয়েছি। তিনি ছাড়া তো আমার উপর দয়া প্রদর্শনের আর কেউ নেই। আয় বিশ্ব-প্রতিপালক! আমি তোমার নিকট সে সব গুনাহগারের প্রত্যেকের জন্যই মাগফিরাত কামনা করছি, যারা গুনাহর বাড়াবাড়ি করেছে সত্য, কিন্তু অনুতপ্ত ও লজ্জিত হয়ে রাতের আঁধারে এই বলে দোয়া করছেঃ কি অনুতাপ এমন গুনাহ্ যে সমগ্র বিশ্বকেই ঘিরে ফেলেছে। যাহেদ ও আবেদ ব্যক্তিদের সাক্ষাতকারেরই এ অবস্থা। তাহলে বুঝতেই পারা যায় নাফরমান ও দুনিয়া লোভী ব্যক্তিদের সাক্ষাতকার কোন পর্যায়ে পড়ে? তাছাড়া মূর্খ ও বদকারদের তো কথাই নেই।

অত্যন্ত গোলযোগ ও জটিলতা নিয়েই আত্মপ্রকাশ করেছে এ কালটি? বর্তমানে মানুষ কেবল লোকসান আর লোকসানেই লিপ্ত রয়েছে। এ সব গোলযোগ ও জটিলতা তোমাকেও ইবাদতে ইলাহী সম্পর্কে উদাসীন করে ফেলবে, অথচ মানুষের সাহচর্যে লাভজনক কিছুই হবে না। অধিকন্তু আল্লাহর ইবাদতের জন্য যতটুকু অগ্রসর হয়েছিলে, তাও ধ্বংস করে দেবে। কেননা আল্লাহর ইবাদতের জন্য যে সব গুণ অর্জন করেছ, যুগের হাওয়ায় নিপতিত হলে তাও সংরক্ষণ করতে তোমার মুশকিল হবে, এমনকি অসম্ভব হয়ে পড়বে।

সুতরাং মানুষ থেকে নিঃসঙ্গ ও একা জীবন যাপন এবং এ গোলযোগপূর্ণ যুগের আবহাওয়া থেকে দূরে অবস্থান অবশ্য কর্তব্য। এমতাবস্থায় পরম করুণাময় আল্লাহ্ তা'আলাই তাঁর করুণাধারায় তোমার হেফাজতের ব্যবস্থা করবেন।

মখলুখ পর্ব – ২




মখলূক— (পর্ব – ২)

📚মিনহাজুল আবেদীন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)


যে যুগে সংসার ত্যাগ করা উচিত—

ভাইসব, মনে রাখবেন, হযরত রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) কোন্ যুগে সংসার ত্যাগ করতে হবে, তা বাতলিয়ে দিয়েছেন। তিনি সে যুগের ও সে যুগের মানুষেরও বিস্তারিত বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করে গেছেন। সে সঙ্গে তিনি সে যুগে সংসার ত্যাগ করে একা জীবন যাপনের নির্দেশও দিয়ে গেছেন। 

হযরত রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) নিশ্চিতভাবেই পুণ্যের বিষয় সম্পর্কে সর্বাপেক্ষা বেশী ওয়াকিফহাল ছিলেন এবং আমাদের জন্য আমাদের চাইতে অধিক উপদেশ ও উত্তম পন্থা বাতলিয়ে দেয়ার যোগ্য ছিলেন। সুতরাং তিনি যেভাবে বর্ণনা করেছেন, তার সাথে যদি তোমার যুগ মিলে যায়, তবে তাঁর নির্দেশ পালনের জন্য অগ্রসর হও এবং তাঁর এ মহান উপদেশ শিরোধার্য করে লও। 

সাবধান, এ ব্যাপারে তোমার মনে যেন সামান্যতমও সন্দেহের অবকাশ না থাকে। কেননা, তোমার যুগে তোমার পক্ষে কি কর্তব্য সঠিক, সে সম্পর্কে রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) পূর্ণ ওয়াকিফহাল ছিলেন। বরং তাঁর নির্দেশের কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে ধোঁকায় নিপতিত হয়ে শেষ পর্যন্ত নিজের জন্য ধ্বংস ডেকে এনো না।


যে যুগে সংসার ত্যাগ ও একা জীবন যাপন করতে হবে, তার পরিচয় নিম্নোক্ত প্রসিদ্ধ হাদীসসমূহে পাওয়া যায়। 

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন :

“আমরা রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম)-এর নিকট বসেছিলাম। তিনি ফিতনার সময়ের কথা উল্লেখ করে বললেনঃ যখন দেখবে যে, মানুষের মধ্যে প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ শুরু হয়ে গেছে, আমানত বিনষ্ট করছে (এ সময়) রসূলূল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) তাঁর এক হাতের অংগুলিসমূহ অপর হাতের অংগুলির মধ্যে প্রবেশ করিয়ে দেখিয়ে বললেন যে, এ রকম হয়ে যাবে। হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে আমর ইবনুল আস (রাঃ) এ সময় আরয করলেনঃ আমার প্রাণ আপনার জন্য কুরবান হোক। হুযূর, সে সময় আমাদের কি করতে হবে? জবাবে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ “(সে সময়) গৃহেই সব সময় অবস্থান করবে এবং যে জিনিস মন্দ বিবেচিত হবে, তা পরিত্যাগ করবে। এ সময় কেবলমাত্র নিজেকেই সামলাতে থাক, সাধারণের সকল ব্যাপার থেকে দূরে অবস্থান করো”।


অন্যত্র রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ

“এরূপ হবে ফিতনার যুগে”--তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলোঃ ফিতনার যুগের পরিচয় কি? 

জবাবে তিনি বললেনঃ “যখন কোন ব্যক্তি তার সাথী সম্পর্কে নিরাপত্তা বোধ করতে পারবে না”।

আবদুল্লাহ্ বিন মসউদ (রাঃ) হারিস বিন উমায়রা (রাঃ) থেকে রেওয়ায়েত করেছেন। তিনি বর্ণনা করেনঃ রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন- “তুমি যদি জীবিত থাক, তাহলে তোমার সামনেই এমন যুগ আগমন করবে, যখন খোতবাদাতা ও বক্তা বেশী হবে, কিন্তু আলিমের সংখ্যা হবে নগণ্য; সওয়ালকারী হবে বেশী, দাতার সংখ্যা হবে অল্প”। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-উনাকে জিজ্ঞেস করা হলো : সে যুগটা কখন আগমন করবে? তিনি জবাব দিলেনঃ “যখন নামাযের কোন গুরুত্ব উপলব্ধি করা হবে না, সূদের কারবার সরগরম হয়ে ওঠবে এবং ধর্মকে দুনিয়ার সামান্য মালমাত্তার বদলে বিকিয়ে দেয়া হবে। এ অবস্থা থেকে নাজাত কামনা করা উচিত।


উপরিউক্ত হাদীসসমূহ থেকে যে দৃশ্য ফুটে উঠে, তার চাক্ষুষ প্রমাণ এ যুগ ও এ-যুগের মানুষের মধ্যে সঠিকভাবেই পরিলক্ষিত হয়। সুতরাং নিজেকে রক্ষার ব্যবস্থা সম্পর্কে অবশ্যই ভাবনা-চিন্তা করা উচিত নয় কি? সলফে সালেহীনগণ ও তাঁদের নিজ নিজ যুগে এসব বিষয়কে ভয় করার জন্য এক বাক্যে তাকীদ করে গেছেন এবং এমন অবস্থা দেখা দিলে নিঃসঙ্গ জীবন যাপনকেই সেক্ষেত্রে উত্তম বলে বিবেচনা করেছেন এবং তা পালনের নির্দেশও দিয়েছেন।

এ ব্যাপারেও কোন সন্দেহ নেই, সলফে সালেহীনগণই ছিলেন উত্তম উপদেশদাতা ও সবচাইতে অধিক দূরদর্শী। তাছাড়া, তাঁদের যুগের পরের যুগগুলো তাঁদের চাইতে উত্তম তো নয়ই, বরং অপেক্ষাকৃত মন্দ।


ইউসুফ বিন আসবাতের একটি বর্ণনা থেকে উক্ত বিষয়টির সঠিক প্ৰমাণ পাওয়া যায়। তিনি বলেন, “আমি সুফিয়ান সওরী (রহঃ)-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলতেনঃ আমি সে পাক যাতের কসম করে বলছি, যিনি ব্যতীত কোন মা'বুদ নেই, এ যুগে সংসার বর্জন ও নিঃসঙ্গ জীবন অবলম্বন সম্পূর্ণ হালাল”।


আমি বলছি, যদি হযরত সুফিয়ান সওরী (রঃ)-এর যুগে সংসার বর্জন ও নিঃসঙ্গ জীবন যাপন হালাল হয়, তবে আমাদের যুগে তা ওয়াজিব এবং ফরয।


সুফিয়ান সওরী (রঃ) থেকে আরও বর্ণিত আছে যে, তিনি তাঁর বিশেষ খাদিমের নিকট এক পত্রে বলেছেনঃ

“তুমি এমন একটি যুগে অবস্থান করছ, রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম)-এর সাহাবীগণ যে যুগ থেকে সর্বদা নাজাত কামনা করতেন – যাতে তাঁরা জীবিত থাকতেই সে - যুগের আগমন না হয় অথচ তাঁদের যে জ্ঞান ছিল, তা নিশ্চয়ই আমাদের নেই। সুতরাং আমরা যখন ইলমের স্বল্পতা, সবরের দৈন্য, নেককারের নগণ্য সংখ্যা এবং আনুগত্যহীনতায় মানুষের মধ্যে গোলযোগের বিভীষিকাময় একটি যুগে উপনীত, তখন আমাদের কি করা উচিত?


হযরত উমর ফারূক (রঃ) এজন্যই বলেনঃ মন্দ লোকের সাহচর্য গ্রহণের চাইতে সংসার-বর্জন ও নিঃসঙ্গ জীবন যাপনে অনেক বেশী আনন্দ ও আরাম। তিনি আরও বলেছেনঃ 'হযরত কা'ব ও হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে মসউদের ভাষায় আমরা যে যুগে বাস করছি, তাতে সত্য সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত আর সর্বত্র বিস্তৃত কেবল জুলুম ও আনুগত্যহীনতা।

যুগের অবস্থা সম্পর্কে বধির ও অন্ধরা আজ পেরেশান। তবে হ্যাঁ, ইবলিসের উন্নতি ও প্রভাব সর্বত্রই দেদীপ্যমান। যদি এ অবস্থাই চলতে থাকে এবং এর কোন পরিবর্তন না হয়, তাহলে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়াবে যে, কোন মৃত ব্যক্তির জন্যই আর শোক প্রকাশ করা হবে না এবং কোন নবজাতকের জন্যও আর আনন্দ করা হবে না।সুফিয়ান ইবনে উয়াইনীয়া সুফিয়ান সওরী (রাঃ)-কে বলেছিলেনঃ আমাকে কিছু ওসীয়ত করে যান। তখন তিনি বললেনঃ মানুষের সাথে সম্পর্ক কম রাখুন। তখন সুফিয়ান ইবনে উয়াইনীয়া আরয করলেনঃ আল্লাহ্ আপনার উপর রহম করুন। হাদীসে কি একথা নেই যে, মানুষের সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধি করো? কেননা প্রত্যেক মুমিনই শাফা'আত করার অধিকার লাভ করবেন। সুফিয়ান সওরী (রাঃ) বললেনঃ তোমার সম্পর্কে আমার ধারণা অনুরূপই। আমি মনে করি, তুমি যে সব বিষয় সহ্য করতে পারো না, মানুষের সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধি করলে তোমার বন্ধু-বান্ধবের তরফ থেকেই তা উদ্ভূত হবে এবং তোমাকে সে অসহনীয় বিষয়েরই মুকাবিলা করতে হবে।

সুফিয়ান ইবনে উয়াইনীয়া বলেনঃ আমি তখন বললাম, ঠিকই বলেছেন। অতঃপর হযরত সুফিয়ান সওরী (রাঃ) ইন্তেকাল করার পর আমি তাঁকে স্বপ্নে দেখলাম। তিনি যেন কিছু আহকাম-আরকান বর্ণনা করছিলেন। আমি আরয করলাম, আয় আবূ আবদুল্লাহ্! আমাকে কিছু ওসীয়ত করুন। তিনি সেই পূর্ব ওসীয়তেরই পুনরাবৃত্তি করলেন। তিনি আরো বললেনঃ যতদূর সম্ভব মানুষের সাথে কম সম্পর্ক রক্ষা করে চলো। কেননা মানুষের সাথে সম্পর্ক জড়িয়ে গেলে, তা থেকে মুক্তিলাভ করা বড় কঠিন ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। এ প্রসঙ্গে তিনি নিম্নোক্ত কতিপয় কবিতা উল্লেখ করলেন :

'আমি বরাবর মখলুকের প্রতীক্ষায় ব্যস্ত ছিলাম এবং মানুষের সাথে আমার সম্পর্ককে ঘনিষ্ঠ করার চেষ্টা করলাম, কিন্তু যখনই আমার মধ্যে বৃদ্ধ হওয়ার লক্ষণ দেখা দিল, তখন পরিচিত সকলকেই আমি মন্দ মনে করতে লাগলাম।

আমি যাদের জানি না, আল্লাহ তাদের উত্তমভাবে পুরস্কৃত করুন। আমার এমন কোন গুনাহ্ নেই, যার জন্য আমার ক্লেশ বা দুর্ভোগের সম্মুখীন হতে হবে। কারণ যাদের সাথে কোন পরিচয় নেই, নিশ্চয়ই তাদের কোন হক নষ্ট করা প্রায়ই সম্ভব হয় না। সুতরাং তাদের সাথে পরিচয় না হয়েই পাপ থেকে বেঁচে গেছেন বলে কবি মনে করেছেন ।


অপরপক্ষে আমি (সুফিয়ান ইবনে উয়াইনীয়া) এমন সব ব্যক্তিকে ভালবাসতে শুরু করেছি, যাদের মধ্যে ইনসাফের উৎসই বিলুপ্ত। কথিত আছে, অতঃপর তিনি তাঁর গৃহের দরজায় লিখে দিলেনঃ আমাকে যারা চিনে না, আল্লাহ্ তা'আলা তাদের কল্যাণ করুন। আর আমার আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবের জন্য কল্যাণের কোন কিছুই দান করো না। কেননা আমার যত ক্লেশ, দুর্ভোগ ও কষ্ট তার মূল কারণ এরাই।


অন্যত্র একটি কবিতায় বলা হয়েছেঃ

“আল্লাহ্ তা'আলা সে সব ব্যক্তির কল্যাণ ও মঙ্গল করুন, যাদের সাথে আমার কোন বন্ধুত্ব বা পরিচয় হয়নি। কেননা মানুষের সাথে সম্পর্ক রক্ষা ও বন্ধুত্বের দরুনই আমাকে কষ্ট, বিপদাপদ ও ক্লেশের সম্মুখীন হতে হয়।

হযরত ফুযায়েল (রাঃ) বলেছেনঃ এটা এমন একটি সময় যে, এখন নিজের জিহবাকে সংযত রাখো, নিজেকে বড় মনে করো না, নিজের অন্তঃকরণের চিকিৎসা করো এবং সেই সঙ্গে হুকুম-আহকাম দৃঢ়ভাবে পালন করতে থাক ও নিষিদ্ধ বিষয়কে পরিত্যাগ করে চলো।


সুফিয়ান সওরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেনঃ দুনিয়ার প্রতি উদাসীন হও, আখিরাতের প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখ এবং মানুষ থেকে এমনভাবে পলায়ন কর, যেরূপ ব্যাঘ্র দেখে পলায়ন করা হয়।

হযরত আবূ উবায়দা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেনঃ এমন কোন বিজ্ঞ ব্যক্তিই দেখলাম না, যিনি আলোচনার শেষে এ কথাটি বলেন না যে, তুমি যদি প্রসিদ্ধ ও খ্যাতিমান হওয়াটাকে পছন্দ না কর, তবে বুঝবে, এটা আল্লাহর তরফ থেকে একটি আনন্দের সওগাত।

যা হোক, এ ব্যাপারে যথেষ্ট তথ্য পরিলক্ষিত হয়। তার সব কিছু এ গ্রন্থে উল্লেখ করা সম্ভব নয়। কেবলমাত্র এ বিষয় সম্পর্কেই আমি একটি স্বতন্ত্র গ্রন্থ রচনা করছি। গ্রন্থটির নাম হলো – কিতাব আখলাকুল আবরার ওয়ান্নাজাতু মিনাল আশরায়ে। যদি এ সম্পর্কে আরো অধিক বিষয় জানতে চান, তবে উক্ত গ্রন্থটি পাঠ করুন। তাতে অনেক আশ্চর্যজনক ও অমূল্য বিষয় জানতে পারবেন। এখানে কেবল আভাস দিলাম – কারণ জ্ঞানী ব্যক্তির জন্য ইঙ্গিতই যথেষ্ট। -


মখলূখ (১)



মখলূক— (পর্ব – ১)

📚মিনহাজুল আবেদীন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)


যে কারণে সৃষ্টি পরিত্যাগ করা উচিত— 

এরপর সৃষ্টিজগৎ থেকেও স্বাতন্ত্র্য ও সংশ্রবহীনতা অবলম্বন করা উচিত। সৃষ্টিজগৎ থেকে স্বাতন্ত্র্য ও সংশ্রবহীনতা লাভেরও দু'টি কারণ আছে। 

প্রথম কারণ—- সৃষ্টিজগৎ আল্লাহ্ তা'আলার ইবাদতের পথে অন্তরায় সৃষ্টি ও তৎপ্রতি ঔদাসীন্য আনয়ন করে।

কোন এক বুযর্গ ব্যক্তি বর্ণনা করেছেন যে, আমি একদা এক দল মানুষকে তীর নিক্ষেপ শিক্ষা করতে দেখলাম। দেখি, বহু লোক উক্ত কার্যে ব্যাপৃত রয়েছে। কিন্তু তার কিছু দূরে আবার এক ব্যক্তি চুপচাপ বসে আছে। আমি তার কাছে গেলাম। মনে মনে ভাবলাম, তার সাথে কিছু আলাপ করব। কিন্তু তিনি বললেনঃ আল্লাহ্ তা'আলার যিকিরে লিপ্ত থাকা তোমার সাথে কথাবার্তা বলার চাইতে আমার কাছে অধিক প্রিয় ও উত্তম। আমি বললাম, তবে কি আপনি একাই আল্লাহ্ তা'আলার যিকির করতে চান? তিনি জবাব দিলেনঃ আমার সাথে আমার পরওয়ারদেগার ও দু'জন ফেরেশতা আছেন। আমি বললাম, এ ধরনের মানুষের মধ্যে আল্লাহর যিকিরের প্রতি কে আগে অগ্রসর হতে পারে? তিনি বললেনঃ আল্লাহ্ তা'আলা যার গুনাহ্ মাফ করে দেন।

অতঃপর আমি জিজ্ঞাসা করলামঃ মাগফিরাতের দরজায় পৌঁছার পন্থা কি? তিনি আকাশের দিকে হাত তুলে ইশারা করে আমাকে বলে দিলেন এবং আমাকে পরিত্যাগ করে উঠে দাঁড়ালেন।

এ কথাবার্তার ফল এই দাঁড়ায় যে, মখলুক মানুষকে আল্লাহর ইবাদত থেকে উদাসীন করে দেয়— এমনকি, তাতে বাধার সৃষ্টি করে এবং মানুষকে বিপর্যয় ও ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়। 


হাতেম আসেম বলেছেন: আমি মখলুকের নিকট পাঁচটি জিনিস দাবি করেছিলাম। কিন্তু তার একটিও এখনও পরিপূর্ণভাবে লাভ করা সম্ভব হয়নি। 

আমি মখলুকের নিকট আল্লাহর পথে আনুগত্য প্রদর্শন ও যুহদ দাবি করলাম। কিন্তু সে তা দিতে অসম্মতি জ্ঞাপন করল। 

অতঃপর আমি আমাকে সাহায্য ও সহযোগিতা করতে বললাম, কিন্তু তাতেও সে রাযী হলো না। 

তখন আমি বললাম, আচ্ছা, তাহলে আমি আল্লাহর রাস্তায় আনুগত্য প্রদর্শন ও যুহদ অবলম্বন করি, তাতে তুমি সম্মতি দাও। কিন্তু সে তাও স্বীকার করল না। 

অতঃপর আমি বললাম--আচ্ছা, অন্তত আমি উপরিউক্ত কার্যে লিপ্ত হই, তুমি তাতে বাধা দিও না, কিন্তু সে বাধা দেয়া হতেও বিরত হলো না। 

শেষে আমি বললাম--আচ্ছা, তাহলে অন্তত আল্লাহ্ তা'আলা যেসব বিষয়ে নিষেধ করেছেন, তার প্রতি আমাকে আহবান জানিও না এবং তোমার অনুসরণ না করায় তুমি আমার পশ্চাদ্ধাবন করো না। কিন্তু 'মখলূক' এ প্রস্তাবেও রাযী হলো না। 

ফলে, নিরুপায় হয়ে আমি সব কিছুকে পরিত্যাগ করে আল্লাহর ইবাদতে লিপ্ত হয়ে গেলাম।


বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...