মঙ্গলবার, ১৭ জুন, ২০২৫

বিবাহ (২০) কনের লক্ষ‍্যনীয় ষষ্ঠ গুন কুমারী হওয়া



বিবাহ (পর্ব – ২০) 
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)

কনের লক্ষ‍্যনীয় ষষ্ঠ গুন কুমারী হওয়া  —
ষষ্ঠ গুণ- কুমারী হওয়া। হযরত জাবের (র.) এক পূর্ব বিবাহিতা মহিলাকে বিবাহ করলে রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) তাকে বলেছিলেন: কুমারী মেয়েকে বিবাহ করলে না কেন, এতে তুমি তার প্রতি এবং সে তোমার প্রতি সন্তুষ্ট থাকত। 
স্ত্রী কুমারী হওয়ার উপকারিতা তিনটিঃ 
(১) স্ত্রীর মনে স্বামীর প্রতি ভালবাসা ও মহব্বত জন্মে। এছাড়া প্রথম পরিচিত মজনের সাথে মন লাগে। যে নারী পূর্বে একজন পুরুষের সঙ্গ লাভ করে আসে এবং অবস্থা দেখে-শুনে আসে, পূর্বপরিচিত বিষয়াদির বিপরীতে কোন কিছুতে রাজি না হওয়া তার জন্যে বিচিত্র নয়। এটাই দ্বিতীয় স্বামীকে খারাপ মনে করার কারণ হয়ে যেতে পারে। 
(২) কুমারী স্ত্রীকে স্বামী মহব্বত করে। কেননা, যে নারীকে অন্য কেউ স্পর্শ করে, তার প্রতি স্বামীর মনে স্বভাবগতভাবে ঘৃণা থাকে। মনে এ ধারণা উদয় হতেই স্বামীর মন ভারী হয়ে যায়।এ ব্যাপারে কোন কোন লোক অত্যধিক আবেগপ্রবণ হয়ে থাকে। 
(৩) কুমারী হলে স্ত্রী প্রথম স্বামীকে স্মরণ করে না। এ স্মরণও জীবনে এক প্রকার তিক্ততা সৃষ্টি করে। প্রথম প্রিয়জনের প্রতি যে মহব্বত হয়, প্রায়শঃ সেটাই সর্বাধিক পাকাপোক্ত হয়।
(৭) সপ্তম গুণ- অভিজাত বংশের অর্থাৎ, দ্বীনদার ও সৎ পরিবারের কনে হওয়া। কেননা, এরূপ পরিবারের মেয়েরা আপন সন্তানদের শিক্ষা-দীক্ষায় মনোযোগী হয়। যে নারী স্বয়ং শিষ্টও বিনীত নয়, সন্তানদেরকে সুন্দরভাবে শিষ্ট ও বিনীত করা তার পক্ষে সম্ভব হয় না। এ কারণেই রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : "তোমরা গোবরের স্তূপের শাক-সব্জি থেকে বেঁচে থাক"। 
সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন : গোবরের স্তূপের শাক-সব্জি কি? 
তিনি (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বললেন: সুন্দরী নারী, যে নীচ পরিবারে জন্মগ্রহণ করে। 
তিনি আরও বলেন: নিজের বীর্যের জন্যে ভাল নারী পছন্দ কর। কেননা, আত্মীয়তার শিরা পিতামাতার চরিত্র সন্তানের মধ্যে টেনে আনে।
(৮) অষ্টম গুণ- কনের নিকট সম্পর্কীয়া না হওয়া। এটা কামস্পৃহা হ্রাস করে। রসূলে করীম(সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন: নিকট সম্পর্কীয়া নারীকে বিবাহ করো না, দুর্বল সন্তান জন্মগ্রহণ করবে। কামস্পৃহা দুর্বল হওয়াই সন্তান দুর্বল্ হওয়ার কারণ। কেননা, কামস্পৃহা দৃষ্টি ও স্পর্শ শক্তি থেকে উদ্দীপ্ত হয়। নারী নতুন ও অপরিচিতা হলে এই শক্তি জোরদার হয়। যে নারী সর্বদা এক সময় দৃষ্টির সামনে থাকে, তাকে দেখতে দেখতে মানুষ নিস্পৃহ হয়ে যায় এবং পূর্ণ আকর্ষণ থাকে না। ফলে কামস্পৃহাও উদ্দীপ্ত হয় না।
মোট কথা, কনের উপরোক্ত গুণসমূহের কারণে তাকে বিবাহ করার আগ্রহ জন্মায়। 

পরবর্তী পর্ব —
বরের স্বভাব-চরিত্র যাচাই করা 

বিবাহ (১৯) কনের লক্ষ‍্যনীয় পঞ্চম গুন বন্ধ্যা না হওয়া



বিবাহ (পর্ব – ১৯) 
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)

কনের লক্ষ‍্যনীয় পঞ্চম গুন বন্ধ্যা না হওয়া —
পঞ্চম গুণ- কনের বন্ধ্যা না হওয়া। যদি বন্ধ্যাত্ব জানা যায়, তবে সেই কনেকে বিবাহ করবেনা। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, এমন কনেকে বিবাহ করবে, যে সন্তান দেয় এবং স্বামী আসক্তা হয়। সুতরাং কনের পূর্বে বিবাহ না হওয়ার কারণে যদি সে বন্ধ্যা কি না তা জানা না যায়, তবে স্বাস্থ্যবতী ও যুবতী হওয়ার প্রতি লক্ষ্য করবে।কারণ, এ দু'টি গুণ কনের মধ্যে থাকলে তার সন্তান দেয়ার সম্ভাবনা প্রবল।

পরবর্তী পর্ব —
কনের লক্ষ‍্যনীয় প্রথম গুন কুমারী হওয়া 

বিবাহ (১৮) কনের লক্ষ‍্যনীয় চতুর্থ গুন মোহরানা কম হওয়া



বিবাহ (পর্ব – ১৮) 
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)
কনের লক্ষ‍্যনীয় চতুর্থ গুন মোহরানা কম হওয়া—
চতুর্থ গুণ হচ্ছে, মোহরানা কম হওয়া। রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, তারাই উত্তন স্ত্রী, যাদের চেহারা-নমুনা ভাল এবং মোহরানা কম। তিনি সীমাতিরিক্ত মোহরানা নির্ধারণ করতে নিষেধ করেছেন এবং নিজে কোন কোন বিবাহ দশ দেরহাম ও গৃহের আসবাবপত্রের বিনিময়ে করেছেন। গৃহের আসবাবপত্রের মধ্যে ছিল একটি আটা পেষার যাঁতা, একটি মাটির কলসী ও একটি নরম গদি। তিনি কোন বিবির বিবাহে যবদ্বারা ওলীমা করেছেন, কোন বিবির ওলীমা খোরমা দ্বারা এবং কোন বিবির ওলীমা ছাতু দ্বারা করেছেন। হযরত ওমর (র.) অধিক মোহরানা ধার্য করতে নিষেধ করে বলতেন: রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) নিজেও চারশ' দেরহামের অধিক মোহরানার বিনিময়ে বিবাহ করেননি এবং নিজের কন্যাগণের বিবাহেও এর বেশী মোহরানা ধার্য করেননি। যদি অধিক মোহরানা ধার্য করার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য থাকত তবে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) সবার আগে তা করতেন। কতিপয় সাহাবী বিবাহে এ পরিমাণ স্বর্ণ মোহরানা হিসাবে ধার্য করেন, যার মূল্য পাঁচ দেরহামের বেশী ছিল না।হযরত সায়ীদ ইবনে মুসাইয়্যিব (র.) আপন কন্যার বিবাহ হযরত আবু হোরায়রা (র.)-এরসাথে দু'দেরহামের বিনিময়ে দেন। তিনি রাতের বেলায় আপন কন্যাকে নিয়ে তার গৃহের দ্বারেপৌঁছে দিয়ে আসেন এবং সাত দিন পর কন্যার কাছে গিয়ে তার কুশলাদি জিজ্ঞেস করেন। সকল ইমামের মাযহাব পালন করার নিয়তে মোহরানা দশ দেরহাম ধার্য করলে কোন ক্ষতিনেই। হাদীসে আছে, স্ত্রী তখন মোবারক হয় যখন তাড়াতাড়ি বিবাহ হয়, তাড়াতাড়ি সন্তান হয় এবং মোহরানা কম হয়। 
আরও আছে, সেই স্ত্রীর মধ্যে বরকত বেশী যার মোহরানা সবচেয়ে কম। স্ত্রীর পক্ষ থেকে মোহরানা বেশী হওয়া যেমন মাকরূহ, তেমনি পুরুষের পক্ষ থেকে স্ত্রীর ধন-সম্পদের খবর নেয়াও মাকরূহ। ধনসম্পদের লোভে বিবাহ করা উচিত নয়। 
সুফিয়ান সওরী (রহ.) বলেন: যখন কেউ বিবাহ করে এবং জিজ্ঞেস করে, কনের কি কি ধন-সম্পদ আছে, তখন বুঝে নেবে সে চোর। স্বামী কোন উপহার শ্বশুরালয়ে প্রেরণ করলে এই নিয়ত করবে না যে, এর বদলে সেখান থেকে বেশী পাওয়া যাবে। তদ্রূপ কনের পরিবারের লোকজন কিছু পাঠালেও এরূপ নিয়ত করবে না। বেশী পাওয়ার নিয়ত করা খুবই খারাপ। তবে উপহার পাঠানো মোস্তাহাব ও পারস্পরিক সম্প্রীতির কারণ। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন: "একে অপরকে হাদিয়া পাঠাও এবং পারস্পরিক সম্প্রীতি বৃদ্ধি কর!" এতে বেশী পেতে চাওয়া আল্লাহ তাআলার এই নিষেধাজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত: "অধিক পাওয়ার নিয়তে দিয়ো না"। 
মোট কথা, বিবাহে এ ধরনের কাজ মাকরূহ ও বেদআত। এটা ব্যবসা ও জুয়ার মত এবং এতে বিবাহের উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়।

পরবর্তী পর্ব —
কনের লক্ষ‍্যনীয় পঞ্চম গুন বন্ধ্যা না হওয়া 


বিবাহ (১৭) কনের লক্ষ‍্যনীয় তৃতীয় গুন রূপলাবণ্য



বিবাহ (পর্ব – ১৭) 
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)

কনের লক্ষ‍্যনীয় তৃতীয় গুন রূপলাবণ্য —
তৃতীয় গুণ রূপলাবণ্য। এ গুণটিও এজন্যে কাম্য যে, এর ফলে স্বামী যিনা থেকে মুক্ত থাকে। স্ত্রী কুশ্রী হলে মানুষ স্বভাবতই অতৃপ্ত থাকে। এছাড়া যার মুখমণ্ডল সূশ্রী হবে, তার চরিত্রও ভাল হয়। এটাই সাধারণ নিয়ম। আমরা পূর্বে লেখেছি যে, কনের দ্বীনদারীর প্রতিলক্ষ্য রাখা জরুরী এবং রূপ-লাবণ্যের কারণে তাকে বিবাহ করা উচিত নয়। এর অর্থ এই নয় যে, রূপলাবণ্যের প্রতি লক্ষ্য করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বরং উদ্দেশ্য এই যে, যখন দ্বীনদারীর অভাব হয়, তখন কেবল রূপলাবণ্যে আসক্ত হয়ে বিবাহ করা উচিত নয়। কেননা, শুধু সুন্দরী হওয়া বিবাহে উৎসাহিত করে ঠিক, কিন্তু দ্বীনদারীর ব্যাপারে শিথিল করে দেয়। তবে রূপলাবণ্যের কারণে স্বামী স্ত্রীর মধ্যে প্রায়ই মহব্বত ও সম্প্রীতি থাকে বিধায় এটাও লক্ষ্যণীয় বিষয়। মহব্বতের কারণাদি বিবেচনা করাতে শরীয়তও নির্দেশ দিয়েছে। এ কারণেই বিবাহের পূর্বে কনেকে দেখে নেয়া মোস্তাহাব। রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন: আল্লাহ তাআলা তোমাদের অন্তরে যখন কোন মহিলাকে বিবাহ করার আগ্রহ সৃষ্টি করে দেন, তখন তোমাদের উচিত তাকে দেখে নেয়া। কেননা, এটা পারস্পরিক প্রেম-প্রীতির জন্যে উপযোগী। তিনি আরও বলেন:  আনসারদের চোখে কিছু আছে। যখন তোমাদের কেউ তাদের কাউকে বিবাহ করতে চায়, তখন তাকে দেখে নেয়া উচিত। কথিত আছে, আনসাররা ক্ষীণদৃষ্টি ছিলেন। কেউ বলেন: তাদের চোখ ছোট ছিল। পূর্ববর্তী কোন কোন বুযুর্গ এমন ছিলেন, যাঁরা অভিজাত পরিবারে বিবাহ করলেও পাত্রী দেখে নিতেন। 
আ'মাশ বলেন: পূর্বে না দেখে যে বিবাহ করা হয় তার পরিণতি হয় দুঃখ কষ্ট। বলাবাহুল্য, প্রথম দৃষ্টিতে তো চরিত্র ও দ্বীনদারী জানাই যায় না- কেবল বাহ্যিক সৌন্দর্য জানা যায়। এথেকে বুঝা গেল যে, রূপলাবণ্যের প্রতি খেয়াল রাখাও শরীয়তে কাম্য। 
বর্ণিত আছে, হযরত ওমর (র.)-এর খেলাফতকালে এক ব্যক্তি চুলে খেযাব লাগিয়ে বিবাহ করে নেয়। কয়েক দিন পর তার খেযাব সরে গেলে শ্বশুরালয়ের লোকেরা খলীফার কাছে নালিশ করে বসে যে, তারা যুবক মনে করে তার কাছে বিবাহ দিতে সম্মত হয়েছিল। খলীফা লোকটিকে শাস্তি দিলেন এবং বললেন: তুমি মানুষকে বিভ্রান্ত করেছ। 
বর্ণিত আছে, হযরত বেলাল ও হযরত সোহায়ব রূমী (র.) এক আরব পরিবারে গিয়ে বিবাহের প্রস্তাব দেন। গৃহকর্তা তাদের পরিচয় জিজ্ঞেস করলে হযরত বেলাল বললেন: আমি বেলাল এবং সে আমার ভাই সোহায়ব! আমরা পথভ্রষ্ট ছিলাম, আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে পথ প্রদর্শন করেছেন। আমরা গোলাম ছিলাম, আল্লাহ আমাদেরকে মুক্ত করেছেন। আমরা নিঃস্ব ছিলাম, আল্লাহ আমাদেরকে ধনবান করেছেন আপনারা আমাদের সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করলে আলহামদুলিল্লাহ আর অস্বীকার করলে সোবহানাল্লাহ, অতঃপর তাদেরকে বলাহলঃ আপনাদের বিবাহ হয়ে যাবে। হযরত সোহায়ব হযরত বেলালকে বললেন : হায়, তুমি আমাদের ত্যাগ ও কঠোর পরিশ্রমের কথাও উল্লেখ করতে পারতে, যা আমরা রসূলে করীম(সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর সঙ্গে থেকে আনজাম দিয়েছি! হযরত বেলাল বললেন: চুপ থাক। আমরা সত্য কথা বলে দিয়েছি। এ সততাই বিবাহ সম্পন্ন করেছে। বাহ্যিক রূপলাবণ্য ও আভ্যন্তরীণ চরিত্র উভয়ের মধ্যে ধোঁকা হতে পারে। রূপলাবণ্যের ধোঁকা দেখার মাধ্যমে দূর করা মোস্তাহাব। চারিত্রিক ধোঁকা দোষগুণ শুনার মাধ্যমে দূর হতে পারে। তাই বিবাহের পূর্বে উভয় কাজ সেরে নেয়া উচিত, কিন্তু দোষগুণ ও চরিত্র মাধুর্য কেবল বুদ্ধিমান, সত্যবাদী এবং বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণ অবস্থা সম্পর্কে ওয়াকিফহাল ব্যক্তিকেই জিজ্ঞাসা করা উচিত। সে যেন কনের পক্ষ না হয় এবং শত্রুও না হয়। কেননা, ইদানীং বিবাহ পূর্ব বিষয়াদিতে এবং কনের গুণ বর্ণনার ব্যাপারে মানুষের মন স্বল্পতা ও বাহুল্য প্রবণ হয়ে গেছে। এসব ব্যাপারে সত্য কথা বলে এরূপ লোকের সংখ্যা খুবই কম। বর্তমানে প্রবঞ্চনা ও বিভ্রান্ত করার প্রচলন অত্যন্ত বেড়ে গেছে। মোট কথা, যেব্যক্তি কেবল সুন্নত আদায়, সন্তানলাভ ও ঘরকন্নার জন্যে বিবাহ করতে চায়, সে যদি রূপলাবণ্যের প্রতি উৎসাহী না হয়, তবে এটা সংসারবিমুখতার অধিক নিকটবর্তী। কেননা, রূপলাবণ্যও একটি পার্থিব বিষয়, যদিও মাঝেমাঝে এবং কোন কোন ব্যক্তির পক্ষে এটা দ্বীনদারীতে সহায়ক হয়। 
হযরত আবু সোলায়মান দারানী বলেন: সংসারবিমুখতা সবকিছুতেই হয়, এমনকি স্ত্রীর মধ্যেও হয় সংসারবিমুখতা অবলম্বন করার জন্যে মানুষ কোন বৃদ্ধাকে বিবাহ করতে পারে। 
মালেক ইবনে দীনার বললেন: মানুষ এতীম ও নিঃস্ব মহিলাকে বিবাহ করে না, যাকে খাওয়ালে পরালে সওয়াব পাওয়া যায়, ভরণপোষণ সহজ হয় এবং সামান্যতে সন্তুষ্ট থাকে; বরং তারা দুনিয়াদারদের কন্যাকে বিবাহ করে, যে সর্বদা নতুন নতুন কামনা বাসনা উপস্থিত করে বলে,আমাকে অমুক শাড়ী পরাও, অমুক বস্তু খাওয়াও।

ইমাম আহমদ দু'ভগিনীর ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেন, তাদের মধ্যে বুদ্ধিমতী কোন্টি, তাঁকে উত্তরে বলা হয়: যে বুদ্ধিমতী, তার চোখ নেই। তিনি বললেন: আমি এই অন্ধকেই বিবাহ করব। মোটকথা, যেব্যক্তি আনন্দের জন্যে নয়, বরং প্রয়োজন মেটানোর উদ্দেশে বিবাহ করতে চায়, তার নিয়মনীতি এরূপই হওয়া উচিত, কিন্তু যেব্যক্তি আনন্দ ব্যতীত দ্বীনদারী ঠিক রাখতে পারে না, তার রূপ-লাবণ্য দেখা উচিত। কারণ, বৈধ বিষয় দ্বারা আনন্দ লাভ করা দ্বীনদারীর একটি দুর্গ।
কথিত আছে, সুন্দরী, চরিত্রবতী, কালকেশী আনতনয়না, গৌরবর্ণা ও স্বামী নিবেদিত! স্ত্রী কেউ পেয়ে গেলে সে যেন বেহেশতের হুর পেয়ে যায়। কেননা, আল্লাহ তাআলা জান্নাতীদের পত্নীদেরকে এসব বিশেষণেই বিশেষিত করেছেন। 
বলা হয়েছে: চরিত্রবতী, সুন্দরী, আনতনয়না, সোহাগিনী ও সমবয়স্কা, অপ্সরা আয়তলোচনা।বলাবাহুল্য, এসব বৈশিষ্ট্যের কারণে আনন্দ পূর্ণতা লাভ করে। 
রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, "তোমাদের স্ত্রীদের মধ্যে সেই উত্তম, যাকে দেখে তার স্বামী আনন্দিত হয়, যে স্বামীর আদেশ পালন করে, স্বামীর অনুপস্থিতিতে নিজের হেফাযত করে এবং স্বামীর ধনসম্পদ দেখাশুনা করে।" বলাবাহুল্য, সোহাগিনী স্ত্রীকে দেখেই স্বামী আনন্দিত হয়।

পরবর্তী পর্ব —
কনের লক্ষ‍্যনীয় চতুর্থ গুন মোহরানা কম হওয়া

বিবাহ (১৬) কনের লক্ষ‍্যনীয় দ্বিতীয় গুন সদাচারী হওয়া।



বিবাহ (পর্ব – ১৬) 
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)

কনের লক্ষ‍্যনীয় দ্বিতীয় গুন  সদাচারী হওয়া —
দ্বিতীয় গুণ– সদাচারী হওয়া। যেব্যক্তি স্বাচ্ছন্দ্যে ও দ্বীনদারীতে সাহায্য প্রত্যাশা করে, তার জন্যে সদাচারিণী স্ত্রী একটি বড় আশীর্বাদ। কেননা, স্ত্রী প্রগলভ, কটুভাষিণী ও কঠোরস্বভাব হলে তার দ্বারা উপকারের চেয়ে অপকারই বেশী হবে। স্ত্রীদের কটু কথায় সবর করা এমন একটি বিষয়, যা দ্বারা ওলীগণের পরীক্ষা নেয়া হয়। 

জনৈক আরব বলেন: ছয় প্রকার নারীকে বিবাহ করো না- আন্নানা, মান্নানা, হান্নানা, হাদ্দাকা, বাররাকা ও শাদ্দাকা।
(১) "আন্নানা” সেই নারীকে বলা হয় যে সর্বদা কাতরায় ও হায় আফসোস করতে থাকে এবং রোগিনী হয়ে থাকে। এরূপ নারীর বিবাহে কোন বরকত নেই।
(২) "মান্নানা" সেই নারীকে বলা হয়, যে স্বামীর প্রতি প্রায়ই অনুগ্রহ প্রকাশ করে বলে, আমি তোমার জন্যে এই করেছি সেই করেছি।
(৩) "হান্নানা" সেই নারীকে বলা হয়, যে তার পূর্ব স্বামীর প্রতি অথবা তার সন্তানদের প্রতি আসক্ত থাকে।
(৪) "হাদ্দাকা" সেই নারীকে বলা হয় যে সবকিছুর উপরই লোভ পোষণ করে এবং তা পেতে চায়। এর পর তা ক্রয় করার জন্যে স্বামীকে তাগিদ দেয়।
(৫) "বাররাকা” হেজাযীদের পরিভাষায় সেই নারীকে বলা হয়, যে সারাদিন কেবল সাজসজ্জা ও প্রসাধনে মেতে থাকে। আর ইয়ামানীদের পরিভাষায় সেই নারীকে বলা হয়, যে খেতে বসেরাগ করে এবং একাই খায়। প্রত্যেক বস্তু থেকে নিজের অংশা আলাদা করে রাখে।
(৬) "শাদ্দাকা" সেই নারীকে বলে, যে খুব বকবক করে।

তিনটি বিষয় পুরুষের জন‍্য মন্দ নারীর জন‍্য প্রশংসনীয়—
হযরত আলী (র.) বলেন: যে সকল অভ্যাস পুরুষের জন্য মন্দ সেগুলো নারীর জন্য প্রশংসনীয়। এ জাতীয় অভ্যাস হচ্ছে কৃপণতা, অহংকার ও ভীরুতা। কেননা, নারী কৃপণ হলে নিজের ও স্বামীর অর্থসম্পদ বাঁচিয়ে রাখবে। অহংকারী হলে প্রত্যেকের সাথে নম্র ও মোহনীয় কথাবার্তা বলতে ঘৃণা করবে। আর ভীরু হলে সবকিছুকে ভয় করে চলবে, গৃহের বাইরে যাবেনা এবং স্বামীর ভয়ে অপব্যয়ের স্থান থেকে দূরে থাকবে।

পরবর্তী পর্ব —
কনের লক্ষ‍্যনীয় তৃতীয় গুন রূপলাবণ্য 

বিবাহ (১৫) কনের লক্ষ‍্যনীয় প্রথম গুন সতী ও দ্বীনদার হওয়া



বিবাহ (পর্ব – ১৫) 
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)
কনের লক্ষ‍্যনীয় প্রথম গুন সতী ও দ্বীনদার হওয়া—
কনের সতী ও দ্বীনদার হওয়া উচিত। এটি মূল গুণ। এদিকে খেয়াল রাখা খুবই জরুরী।কেননা, কনে যদি নীচ জাত, অসতী ও কম দ্বীনদার হয়, তবে বরের দূর্ভোগের অন্ত থাকবে না। সমাজে তার মুখ কাল হবে এবং তার জীবন তিক্ত হয়ে যাবে। যদি সে আত্মসম্মানী হয়, তবে আজীবন বিপদ ও দুঃখে পতিত থাকবে। আর যদি মুখ বুজে থাকে, তবে নিজের দ্বীনদারী ও ইযযত কলংকিত হবে। অসতী হওয়ার সাথে যদি কনে সুন্দরীও হয়, তবে তো ঘোর বিপদ।কেননা, বর তাকে বিচ্ছিন্ন করাও পছন্দ করবে না এবং তার অপকর্ম সইতেও পারবে না। তার অবস্থা সেই ব্যক্তির মতই হবে, যে রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর খেদমতে এসে আরজ করেছিল: ইয়া রসূলাল্লাহ! আমার স্ত্রী কোন স্পর্শকারীর হাতকে ফিরিয়ে দেয় না। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বললেন: তুমি তাকে তালাক দিয়ে দাও। সে আরজ করল: আমি তাকে ভালবাসি। তিনি বললেন: তবে তাকে থাকতে দাও। এ হাদীসে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) থাকতে দাও বলেছেন। কেননা, তিনি আশংকা করেছেন, এ ব্যক্তি তালাক দিয়ে দিলে আসক্তির কারণে তার পশ্চাদ্ধাবন করবে এবং নিজেও বরবাদ হয়ে যাবে। আর যদি কনের দ্বীনদারী এমন খারাপ হয় যে, সে স্বামীর অর্থ-সম্পদ বিনষ্ট করে, তাহলেও জীবন দুর্বিষহ হবে। কেননা, স্বামী তার কাণ্ড-কারখানায় চুপ থাকলে এবং নিষেধ না করলে তার গোনাহে শরীক হবে।
অন্য এক হাদীসে আছে, "যেব্যক্তি কোন নারীকে তার অর্থ সম্পদ ও রূপলাবণ্যের কারণে বিবাহ করে, তাকে তার অর্থসম্পদ ও রূপ থেকে বঞ্চিত করা হয়। আর যে তার দ্বীনদারীর কারণে বিবাহ করে, আল্লাহ্ তাআলা তাকে অর্থসম্পদ ও রূপ-লাবন্যে উভয়টি দান করেন"। 
আরও বলা হয়েছে– "রূপ-লাবণ্যের কারণে নারীকে বিবাহ করোনা। হয় তো তার রূপলাবণ্যই তাকে ধ্বংস করে দেবে। 
ধনসম্পদের কারণেও বিবাহ করবে না। হয় তো তার ধন-সম্পদই তাকে অবাধ্য করে দেবে। 
বরং বিবাহ দ্বীনদারীর কারণে করা উচিত।" দ্বীনদারীর উপর বেশী জোর দেয়ার কারণ, দ্বীনদার নারী স্বামীর দ্বীনদারীতে সহায়ক হয়ে থাকে। পক্ষান্তরে দ্বীনদার না হলে স্বামীকেও দ্বীনদারী থেকে ফিরিয়ে নেয়।

পরবর্তী পর্ব —
কনের লক্ষ‍্যনীয় দ্বিতীয় গুন সদাচারী হওয়া। 

বিবাহ (১৪) কনের অবস্থা

 

বিবাহ (পর্ব – ১৪) 
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)

কনের অবস্থা 
কনের অবস্থা সম্পর্কে দু'প্রকার বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য রাখা উচিত। 
প্রথম, বিবাহের পরিপন্থী বিষয়াদি থেকে কনে মুক্ত কিনা তা দেখার দরকার এবং দ্বিতীয়, দেখা উচিত, তাকে বিবাহ করলে জীবন সুন্দরভাবে অতিবাহিত হবে কিনা এবং উদ্দেশ্য হাসিলহবে কিনা।
নিম্নে বিবাহের পরিপন্থী বিষয়াদি বর্ণিত হচ্ছে:
(১) অন্য কোন ব্যক্তির বিবাহিত স্ত্রী হওয়া। 
২) অন্য স্বামীর কাছে থেকে তালাকপ্রাপ্তির পর অথবা স্বামীর মৃত্যুর পর তার ইদ্দতে থাকা। 
(৩) মুখে কোন কুফরী কলেমা উচ্চারণ করার কারণে ধর্মত্যাগী হওয়া। 
(৪) অগ্নিপূজারী হওয়া। 
(৫) মূর্তিপূজারী ও যিনদীক হওয়া অর্থাৎ কোন ঐশী গ্রন্থ ও পয়গম্বরের সাথে সম্পর্কযুক্ত না হওয়া। এমন নারীও এর অন্তর্ভুক্ত, যার মাযহাব হচ্ছে হারাম বস্তুকে হালাল মনে করা অথবা এমন বিষয়ে বিশ্বাস করা, যার বিশ্বাসীকে শরীয়ত কাফের বলে। এ ধরনের কোন নারীকে বিবাহ করা দুরস্ত নয়। 
৬) যে সকল আত্মীয়কে বিবাহ করা হারাম, কনে তাদের অন্তর্ভুক্ত হওয়া অর্থাৎ মা, নানী, দাদী, কন্যা, পৌত্রী, দৌহিত্রী, বোন, ভাতিজী, ভাগ্নেয়ী ও তাদের সকলের সন্তান, ফুফু ও খালা হওয়া। 
(৭) দুধ পান করার কারণে হারাম হওয়া। বলাবাহুল্য, আত্মীয়তার কারণে যাদেরকে বিবাহকরা হারাম, দুধ পান করার কারণেও সেসব আত্মীয় হারাম, কিন্তু পাঁচ বারের কম দুধ পানকরলে ইমাম শাফেয়ীর মতে হারাম হয় না। (ইমাম আবু হানীফার মতে একবারেও হারাম হয়েযায়।) 
(৮) জামাতা হওয়ার করণে হারাম হওয়া। উদাহরণতঃ বর ইতিপূর্বে কনের কন্যা, পৌত্রী অথবা দৌহিত্রীকে বিবাহ করে থাকলে এমতাবস্থায় এই কনেকে বিবাহ করতে পারে না।কেননা, কোন নারীকে কেবল বিবাহ করলেই তার মা, দাদী প্রমুখ হারাম হয়ে যায়। আর যদি সহবাসও করে, তবে তার সন্তানও হারাম হয়ে যায়। অথবা এমন কনে হওয়া, যাকে বরের পিতা অথবা পুত্র ইতিপূর্বে বিবাহ করেছে। এরূপ কনেও বরের জন্যে হারাম।
( ৯) কনের পঞ্চম স্ত্রী হওয়া। অর্থাৎ, বরের বর্তমানে চার স্ত্রী রয়েছে। সুতরাং পঞ্চম মহিলাকে বিবাহ করা জায়েয নয়। 
(১০) বরের বিবাহে পূর্ব থেকে কনের ভগিনী, অথবা ফুফু অথবা খালা থাকা। কেননা, এমন দু'মহিলাকে এক সাথে বিবাহে রাখা হারাম, যাদের মধ্যে এমন আত্মীয়তা বিদ্যমান যে, একজনকে পুরুষ ধরে নিলে অন্যজনের সাথে তার বিবাহ জায়েয হয় না। 
(১১) এই কনেকে পূর্বে এই বরের তিন তালাক দেয়া। এরূপ তালাকপ্রাপ্তা কনে এই বরের জন্যে হালাল নয়, যে পর্যন্ত অন্য কোন পুরুষ তাকে বিবাহ করে তার সাথে সহবাস করার পর তালাক না দেবে। 
(১২) হজ্জ অথবা ওমরার এহরাম বাঁধা। বর ও কনের মধ্য থেকে যেকোন একজন এহরাম বাঁধলে এহরাম শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাদের বিবাহ জায়েয হবে না। 
(১৩) কনের পূর্ব বিবাহিতা অপ্রাপ্ত বয়স্কা হওয়া। এরূপ কনের বিবাহ প্রাপ্তবয়স্কা হওয়ার পরেই জায়েয হবে। (১৪) কনের পূর্ববিবাহিতা এতীম হওয়া। এরূপ কনের বিবাহও প্রাপ্তবয়স্কা হওয়ার পরই, জায়েয হবে।

কনের লক্ষ‍্যনীয় সদগুণাবলী  
এখন সুন্দর জীবন যাপন ও উদ্দেশ্য হাসিল হওয়ার জন্যে কনের যেসমস্ত সদগুণের প্রতি লক্ষ্যকরা উচিত, সেগুলো বর্ণনা করা হচ্ছে:

পরবর্তী পর্ব —
কনের লক্ষ‍্যনীয় প্রথম গুন
 সতী ও দ্বীনদার হওয়া

বিবাহ (১৩) বিবাহ বন্ধনের আদব



বিবাহ (পর্ব – ১৩) 
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)

বিবাহ বন্ধনের আদব 

(১) প্রথমতঃ পাত্রীর অভিভবকের সাথে পূর্বাহ্ণে যোগাযোগ স্থাপন করবে, কিন্তু পাত্রী ইদ্দতে থাকলে পয়গাম দেবে না। ইদ্দত অতিবাহিত হওয়ার পর পয়গাম দেবে। অনুরূপভাবে যদিঅন্য কেউ বিবাহের পয়গাম দিয়ে থাকে, তবে তার মীমাংসা না হওয়া পর্যন্ত পয়গাম দেবে না।হাদীসে এ সম্পর্কে নিষেধাজ্ঞা আছে। 

(২) দ্বিতীয়তঃ পূর্বে খোতবা হবে এবং ইজাব কবুলের সাথে হামদ ও নাত থাকবে!

উদাহরণতঃ ওলী বলবে- আলহামদু লিল্লাহ ওয়াস্সালাতু আলা রসূলিল্লাহ্, আমি নিজের অমুক কন্যাকে তোমার বিবাহে দিলাম। 

বর বলবে- আলহামদু লিল্লাহ ওয়াস সালাতু আলা রসূলিল্লাহ্, আমি এই মোহরানার বিনিময়ে তার বিবাহ কবুল করলাম। মোহরানা নির্দিষ্ট ও কম হওয়া বাঞ্ছনীয়। হামদ ও নাত খোতবার পূর্বেও মোস্তাহাব। 

(৩) তৃতীয়তঃ কনে কুমারী হলে বরের হাল অবস্থা কনের শ্রুতিগোচর করা উচিত। কেননা, এটাপারস্পরিক সম্প্রীতি ও ভালবাসার জন্যে উপযুক্ত। এ কারণেই বিবাহের পূর্বে কনে দেখেনেয়াও মোস্তাহাব। 

(৪) চতুর্থত: দুজন সাক্ষী ছাড়া আরও কিছু সৎলোকের বিবাহ মজলিসে উপস্থিত থাকা উচিত। 

(৫) পঞ্চমতঃ বিবাহে সুন্নত পালন, দৃষ্টি নত রাখা, সন্তান লাভ করা এবং এর বর্ণিত উপকারিতা সমূহের নিয়ত করবে- কেবল মনের কামনা চরিতার্থ করা লক্ষ্য না হওয়া কর্তব্য।অন্যথায় এই বিবাহ দুনিয়ার কাজে গণ্য হবে। মনের কামনা থাকা উপরোক্ত তিনটি নিয়তের পরিপন্থী নয়। অধিকাংশ এবাদতকর্ম মনের খাহেশের অনুকূল হয়ে যায়। 

মোস্তাহাব হল বিবাহ মসজিদে ও শওয়াল মাসে করা। হযরত আয়েশা (রা.) বলেনঃ রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর সাথে আমার বিবাহও শওয়াল মাসে হয় এবং আমরা প্রথম শওয়াল মাসেই মিলিত হই। 


পরবর্তী পর্ব —

কনের অবস্থা 



বিবাহ (১২) বিবাহ বন্ধনের শর্ত



বিবাহ (পর্ব – ১২) 
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)

বিবাহ বন্ধনের শর্ত —

(১) ওলী তথা অভিভাবকের অনুমতি। মহিলার কোন অভিভাবক না থাকলে শাসনকর্তার অনুমতি তার স্থলবর্তী হবে। 

(২) মহিলা প্রাপ্ত বয়স্কা বা পূর্ব বিবাহিতা হলে তার সম্মতি। যদিকুমারী হয় এবং পিতা অথবা দাদা ছাড়া অন্য কেউ অভিভাবক হয়, তাহলেও মহিলার অনুমতি শর্ত। 

(৩) দু'জন সাক্ষীর উপস্থিতি, যারা বাহ্যতঃ বিশ্বাস্ত হবে, অর্থাৎ, অপকর্মের তুলনায় সৎকর্ম বেশী করে এমন। যদি এমন দুজন সাক্ষী উপস্থিত থাকে, যাদের অবস্থা জানা নেই, তবুও বিবাহ হয়ে যাবে। 

(৪) ইজাব ও কবুল হওয়া।


পরবর্তী পর্ব —

বিবাহ বন্ধনের আদব


বিবাহ (১১) বিবাহের কারণে সৃষ্ট বিপদাপদ



বিবাহ (পর্ব – ১১)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)

বিবাহের কারণে সৃষ্ট বিপদাপদ —

প্রথম বিপদ হালাল রুজি-রোজগারে অক্ষম হওয়া। এটা সর্বাধিক মারাত্মক বিপদ। কেননা, প্রত্যেকেই হালাল রুজি-রোজগার করতে পারে না, বিশেষতঃ বর্তমান যুগে যখন জীবন যাপন পদ্ধতি ক্রমশই অধঃপতিত হচ্ছে, তখন মানুষ বিবাহ করলে বিবাহের কারণে অর্থের অন্বেষণও বেশী হবে। সে হারাম দ্বারা পরিবার-পরিজনকে খাওয়াতে বাধ্য হবে। ফলে নিজেও ধ্বংস হবে এবং অন্যকেও ধ্বংস করবে। পক্ষান্তরে যে অবিবাহিত, সে এই বিপদ থেকে মুক্ত। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এরূপ হয় যে, পরিবার-পরিজন বিশিষ্ট ব্যক্তি মন্দ জায়গায় ঢুকে পড়ে এবং স্ত্রীর মনোবাঞ্ছা পূরণের পেছনে পড়ে ইহকালের বিনিময়ে স্বীয় পরকাল বিক্রি করে দেয়। 

এক হাদীসে আছে বান্দাকে দাঁড়িপাল্লার নিকটে দাঁড় করা হবে। তার কাছে পাহাড়সম পুণ্য থাকবে। তখন তাকে পরিবার পরিজনের দেখাশুনা ও খেদমত সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে এবং অর্থ সম্পদের অবস্থা জিজ্ঞেস করা হবে, কি উপায়ে উপার্জন করেছে এবং কিসে ব্যয় করেছে, অবশেষে এসব দাবী পূরণ তার সমস্ত পুণ্য নিঃশেষ হয়ে যাবে। তার কাছে কোন পুণ্যই থাকবে না। তখন ফেরেশতারা সজোরে বলবে- এই ব্যক্তির পরিবার-পরিজন দুনিয়াতে তার সমস্ত নেকী খেয়ে ফেলেছে। আজ সে তার আমলের বিনিময়ে বন্ধক হয়ে গেছে।

কথিত আছে, কেয়ামতে সর্বপ্রথম মানুষকে যারা জড়িয়ে ধরবে. তারা হবে তার পরিবার-পরিজন। তারা তাকে আল্লাহ্ তাআলার সামনে দাঁড় করিয়ে বলবে? ইলাহী, তার কাছ থেকে আপনি আমাদের প্রতিদান নিন। আমরা যা জানতাম না, সে আমাদেরকে তা বলেনি এবং আমাদের অজ্ঞাতে আমাদেরকে হারাম খাইয়েছে। এর পর তার কাছ থেকে প্রতিশোধ নেয়া হবে। 

জনৈক বুযুর্গ বলেন: আল্লাহ তাআলা যখন কোন বান্দা দ্বারা পাপ কাজ করাতে চান, তখন দুনিয়াতে তার উপর দংশনকারী আযাব চাপিয়ে দেন, যে তাকে দংশন করতে থাকে। 

রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন: কোন ব্যক্তি পরিবার পরিজন মূর্খ হওয়ার চেয়ে বড় কোন গোনাহ্ নিয়ে আল্লাহ তাআলার কাছে যাবে না। মোট কথা, এ বিপদটি এমন ছড়িয়ে পড়েছে যে, এ থেকে কম লোকই মুক্ত হবে। হাঁ, যার কাছে উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত অথবা হালাল উপায়ে উপর্জিত যথেষ্ট পরিমাণ ধন-সম্পদ রয়েছে এবং সে অল্পে তুষ্ট ও অধিক ধন-সম্পদ অন্বেষণ থেকে বিরত, সে এই বিপদ থেকে বেঁচে থাকতে পারে। 

ইবনে সালেম (রহ.)-কে কেউ বিবাহ করার ব্যাপারে প্রশ্ন করলে তিনি জওয়াব দিলেন: আমাদের এ যুগে বিবাহ করা তার জন্যেই উত্তম, যার কামস্পৃহা গাধার মত প্রবল। গাধা মাদীকে দেখলে শত পিটুনি খেয়েও তার কাছ থেকে সরে না। পক্ষান্তরে যার নফস তার আয়ত্তে থাকে, তার জন্যে বিবাহ না করা উত্তম।


বিবাহের দ্বিতীয় বিপদ হচ্ছে পরিবার-পরিজনের হক আদায় করতে, তাদের আচার অভ্যাসে সবর করতে এবং তাদের পীড়নে সহনশীল হতে অক্ষমতা। এ বিপদটি প্রথম বিপদের তুলনায় কম। কেননা, এতে সক্ষম হওয়া প্রথমটিতে সক্ষম হওয়ার তুলনায় সহজ। নারীদের সাথে সম্প্রীতি বজায় রাখা, তাদের হক আদায় করা, হালাল রুজি অন্বেষণের মত কঠিন নয়, কিন্তু এতে অবশ্য বিপদাশংকা আছে। কেননা, স্ত্রী, পুত্র-পরিজন প্রজাতুল্য। প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার প্রজাদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।   

রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন - "মানুষ যাদের ভরণ পোষণ করে তাদের হক নষ্ট করা গোনাহগার হওয়ার জন্যে যথেষ্ট"। 

বর্ণিত আছে, যেব্যক্তির পরিবার-পরিজনের কাছ থেকে পলায়ন করে, সে সেই পলাতক গোলামের মত, যে তার প্রভুর কাছ থেকে পলায়ন করে। পরিবার পরিজনের মধ্যে ফিরে না আসা পর্যন্ত তার নামায রোযা কিছুই কবুল হয় না। 

আর যে ব্যক্তি তার পরিবার পরিজনের হক আদায় করতে অক্ষম, সে তাদের মধ্যে বিদ্যমান থাকলেও পলাতক গোলামেরই মত। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন – "তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে জাহান্নাম থেকে বাঁচাও"। এতে নিজেকে এবং পরিবার পরিজনকে জাহান্নাম থেকে বাঁচাতে বলা হয়েছে। মানুষ কখনও নিজের হকও আীদায় করতে পারে না। এমতাবস্থায় বিবাহ করলে তার উপর দ্বিগুণ হক ওয়াজিব হয়ে যাবে। নিজের সাথে অন্যও শামিল হবে। এ কারণেই জনৈক বুযুর্গ বিবাহ করতে আপত্তি করেন এবং বলেন: আমি নিজেকে নিয়েই ব্যতিব্যস্ত। এর উপর অন্যকে কিরূপে সংযুক্ত করি। অনুরূপভাবে হযরত ইব্ররাহীম আদহাম বিবাহ করতে অস্বীকৃত হন এবং বলেন: আমি নিজের কারণে কোন মহিলাকে বিপদে ফেলতে চাই না। অর্থাৎ, তার হক আদায় করতে এবং তার উপকার করতে আমি অক্ষম। বিশরে হাফীও এমনি ওযর পেশ করে বলেছিলেন: আল্লাহ্ তাআলার এই উক্তি আমার বিবাহের পথে বাধা- "নারীদেরও তেমনি হক রয়েছে, যেমন তাদের কাছে অন্যের হক রয়েছে"।

সারকথা, এটাও একটা ব্যাপক বিপদ, যদিও প্রথম বিপদের তুলনায় এর ব্যাপকতা কম। এ বিপদ থেকে এমন ব্যক্তিই নিরাপদ থাকবে যে বিচক্ষণ, বুদ্ধিমান, নারী চরিত্র সম্পর্কে অভিজ্ঞ, তাদের কটু কথায় ধৈর্যশীল এবং তাদের হক আদায় করতে আগ্রহী, কিন্তু এখন তো অধিকাংশ লোক বির্বোধ, কটুভাষী, কঠোর স্বভাব এবং বেইনসাফ, যদিও নিজের জন্যে খুব ইনসাফ প্রত্যাশী। এরূপ লোকদের জন্যে অবিবাহিত থাকাই অধিক নিরাপদ।


বিবাহের তৃতীয় বিপদ, স্ত্রী-পুত্র পরিজন মানুষকে আল্লাহর স্মরণ থেকে বিরত রাখে এবং দুনিয়াদারীর দিকে ঝুঁকিয়ে দেয়। এ বিপদটি প্রথমোক্ত দু'বিপদের তুলনায় কম ব্যাপক। এ বিপদে মানুষের অবস্থা এই দাঁড়ায় যে, সে পরিবার পরিজনের জীবিকা নির্বাহের জন্যে অগাধ সাজ-সরঞ্জাম সঞ্চয় করতে ও তা রেখে যেতে সচেষ্ট হয়। বলাবাহুল্য, যেসব বিষয় আল্লাহর স্মরণে বাধা সৃষ্টি করে তা পরিবার পরিজন হোক। অথবা অর্থ-সম্পদ হোক, সমস্তই অমঙ্গলজনক হয়ে থাকে। 

আমাদের উদ্দেশ্য এই নয় যে, এসব বিষয় তাকে কোন নিষিদ্ধ কাজে লিপ্ত করে দেবে। কেননা, এটা তো প্রথম ও দ্বিতীয় বিপদে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে; বরং উদ্দেশ্য, স্ত্রী পুত্র পরিজনের কারণে মানুষ বৈধ বস্তু দ্বারা বিলাসব্যসন, হাসি-তামাশা ও উপভোগে সম্পূর্ণ নিমজ্জিত হয়ে পড়ে। বিবাহের কারণে এ ধরনের ব্যস্ততা বহুলাংশে বেড়ে যায়। মন এগুলোতে ডুবে যায় সকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা এবং সন্ধ্য গড়িয়ে রাত হয়ে গেলেও মানুষ আখেরাতের চিন্তা ও প্রস্তুতি গ্রহণের ফুরসত পায় না। এরূপ ক্ষেত্রেই হযরত ইব্রাহীম আদহাম বলেন: যে ব্যক্তি নারীর হাঁটুর সাথে হাঁটু মিলিয়ে বসে থাকতে অভ্যস্ত হয়ে যায়, তার দ্বারা কিছুই হতে পারে না। আবু সোলায়মান দারানী বলেন: যে ব্যক্তি বিবাহ করে, সে দুনিয়ার দিকে ঝুঁকে পড়ে। অর্থাৎ, বিবাহ দুনিয়ার দিকে ঝুঁকে পড়ার কারণ হয়।

এ পর্যন্ত বিবাহের উপকারিতা ও অপকারিতা পূর্ণরূপে বর্ণিত হল! এখন কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তির জন্যে বিবাহ করা উত্তম, না অবিবাহিত থাকা উত্তম, তা সর্বাবস্থায় বলা যায় না। কেননা, এসব বিষয় থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয়া যায় না। বরং নির্দিষ্ট ব্যক্তির কর্তব্য হবে এসব উপকারিতা অপকারিতাকে কষ্টিপাথর মনে করে তাতে নিজের অবস্থা পরখ করা। যদি নিজের মধ্যে অপকারিতা না পায় এবং উপকারিতা বিদ্যমান থাকে, তবে জেনে নেবে, বিবাহ করাই তার জন্যে উত্তম। উদাহরণতঃ যদি তার কাছে হালাল অর্থসম্পদ বিদ্যমান থাকে, সে সচ্চরিত্রবান হয়, এমন পাকা দ্বীনদার হয় যে, বিবাহের কারণে আল্লাহর স্মরণে পার্থক্য হবে না এবং সর্বোপরি যৌবনের কারণে কামস্পৃহা দমিত করার প্রয়োজন থাকে, তবে তার জন্যে বিবাহ করা নিশ্চিতরূপেই উত্তম। আর যদি এসব উপকারিতা অনুপস্থিত থাকে এবং অপকারিতা বিদ্যমান থাকে, তবে নিঃসন্দেহে অবিবাহিত থাকা, তার জন্যে শ্রেয়। পক্ষান্তরে যদি উপকারিতা ও অপকারিতা উভয়টি বিদ্যমান থাকে, যেমন- আমাদের যুগে এটাই প্রবল, তবে ন্যায়ের মানদণ্ডে পরিমাপ করতে হবে যে, উপকারিতা দ্বারা তার দ্বীনদারী কি পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে এবং অপকারিতা দ্বারা ক্ষতি কতটুকু হবে, যদি প্রবল ধারণা একদিকে হয়ে যায়, তবে সেই অনুযায়ী মীমাংসায় উপনীত হবে। উদাহরণতঃ দুটি উপকারিতা অধিক প্রকাশমান- সন্তান হওয়া এবং কামস্পৃহা দমিত হওয়া। তদনুরূপ বিপদও দুটি অধিক দেখা যায়, একটি হারাম উপার্জনের প্রয়োজন পড়ে  পড়েগএবং অপরটি আল্লাহর স্মরণ থেকে বিরত হওয়া। এখন আমরা চারটিকেই একটি অপরটির বিপরীতে ধরে নিয়ে বলি, যদি কোন ব্যক্তি কামস্পৃহার কষ্টে না থাকে এবং বিবাহের উপকারিতা কেবল সন্তান হওয়াই হয়, তবে উল্লিখিত দুটি অপকারিতা বিদ্যমান থাকলে তার জন্যে অবিবাহিত থাকাই উত্তম। কেননা, যে বিষয়ে আল্লাহর স্মরণে বাধা হয়, তার মধ্যে কোন কল্যাণ নেই এবং হারাম উপার্জনেও কল্যাণ নেই। এ দুটি অপকারিতার কারণে যে ক্ষতি হবে, তা কেবল সন্তানের জন্যে চেষ্টা করার উপকারিতা দ্বারা পূরণ হবে না কেননা, সন্তানের জন্যে বিবাহ করলে সন্তানের জীবন যাপনের ব্যাপারেও চেষ্টা করা হয়, কিন্তু এই জীবন একটি অনিশ্চিত বিষয়। অথচ দ্বীনদারীতে অপকারিতার ক্ষতি নিশ্চিত। দ্বীনদারীকে নির্বিঘ্ন রাখার মধ্যেই কল্যাণ। কেননা, দ্বীনদারী হচ্ছে পুঁজি। এটা নষ্ট হয়ে গেলে আখেরাতের জীবন বরবাদ হয়ে যায়। 

বলাবাহুল্য সন্তানের কল্যাণ উপরোক্ত দুটি বিপদের একটিরও বিপরীত হতে পারে না। তবে যদি সন্তানের সাথে কামস্পৃহা দমিত করার প্রয়োজনও অধিকতর প্রবল হয় তবে দেখতে হবে, বিবাহ না করলে যদি যিনায় লিপ্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তবে তার জন্যে বিবাহ করা উত্তম। কেননা, যে দুতরফা বিপদে ফেঁসে গেছে- বিবাহ না করলে যিনায় লিপ্ত হবে এবং করলে হারাম উপার্জন করবে। উভয়েরর মধ্যে হারাম উপার্জন যিনার তুলনায় কম মারাত্মক। যদি বিশ্বাস রাখে যে, সে বিবাহ না করলে যিনায় লিপ্ত হবে না, কিন্তু দৃষ্টি নত রাখতে সক্ষম হবে না, তবে বিবাহ না করা ভাল। কেননা পর নারীর প্রতি দৃষ্টিপাত করা এবং হারাম উপার্জন করা উভয়টি হারাম হলেও উভয়ের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। তা এই যে, হারাম উপার্জন সব সময় হয় এবং এর কারণে সে নিজে এবং পরিবারের সকলেই গোনাহগার হয়, কিন্তু কৃদৃষ্টি কদাচিত হয় এবং এ কারণে বিশেষভাবে সে নিজেই গোনাহগার হয়, অন্য কেউ তাতে শরীক হয় না। এছাড়া এটা দ্রুত শেষও হয়ে যায়। কুদৃষ্টি যদিও চোখের যিনা, কিন্তু হারাম খাওয়ার তুলানায় এটা দ্রুত মাফ হতে পারে। তবে যদি কুদৃষ্টির কারণে যিনায় লিপ্ত হবার ভয় থাকে, তবে তার অবস্থাও যিনায় লিপ্ত হবার ভয়ের মতই। মোট কথা, উপরোক্ত বিপদসমূহকে উপকারিতার সাথে তুলনা করে তদনুযায়ী সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া উচিত। যেব্যক্তি এসব রহস্য সম্পর্কে ওয়াকিফহাল হবে, তার জন্যে পূর্ববর্তী বুযুর্গগণের বর্ণিত বিভিন্নমুখী অবস্থা হৃদয়ঙ্গম করা কঠিন হবে না। কেননা, বিবাহের প্রতি উৎসাহ এবং অনীহা অবস্থাভেদে উভয়টিই সঠিক। এখন যদি প্রশ্ন করা হয় যে, বিপদাপদ মুক্ত ব্যক্তির জন্যে এবাদতের উদ্দেশে অবিবাহিত থাকা উত্তম, না বিবাহ করা উত্তম, তবে এর জওয়াবে আমরা বলি, তার জন্যে উভয়টিই উত্তম। কেননা বিবাহ স্বতন্ত্র দৃষ্টিতে এবাদতের পরিপন্থী নয়, বরং এ দৃষ্টিতে পরিপন্থী যে, এতে অর্থ উপার্জনের প্রয়োজন দেখা দেয়। সুতরাং হালাল পথে অর্থ উপার্জনে সক্ষম হলে বিবাহও উত্তম। কারণ, দিবারাত্র চব্বিশ ঘণ্টা এবাদত করা এবং এক মুহূর্তও আরাম না করা সম্ভবপর নয়। যদি ধরে নেয়া যায় যে, এক ব্যক্তি সর্বক্ষণ অর্থোপার্জনে ব্যয়িত হয় এবং পাঞ্জেগানা ফরয নামায, পানাহার ও প্রস্রাব পায়খানার সময় ছাড়া নফল এবাদতের জন্যে কোন সময় থাকে না, তবে তার জন্যেও বিবাহ করা ভাল। কেননা, হালাল অর্থোপার্জন, স্ত্রী পুত্র পরিজনের খেদমত, সন্তান লাভের প্রয়াস এবং নারী স্বভাবে সবর করার মধ্যেও নানা প্রকার এবাদত নিহিত রয়েছে, যার সওয়াব নফল এবাদতের চেয়ে কম নয়। পক্ষান্তরে যদি সে এমন লোকদের অন্তর্ভুক্ত হয়, যারা জ্ঞান, চিন্তাভাবনা ও অন্তরের ভ্রমের মাধ্যমে এবাদত করে এবং বিবাহ করলে এবাদতে বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ার আশংকা থাকে, তাহলে তার জন্যে বিবাহ না করা উত্তম।

যদি কেউ প্রশ্ন করে যে, বিবাহ করা উত্তম হলে হযরত ঈসা (আ.) বিবাহ করলেন না কেন এবং আল্লাহর এবাদত উত্তম হলে হযরত রসূলে মকবুল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এত অধিক বিবাহ করলেন কেন, তবে এর জওয়াব এই যে, যেব্যক্তি সক্ষম, উচ্চ সাহসী এবং অধিক শক্তির অধিকারী, তার জন্যে উভয় বিষয়ই উত্তম। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) চূড়ান্ত পর্যায়ের শক্তি ও সাহসের অধিকারী ছিলেন তাই তিনি উভয় মাহাত্ম অর্জন করেছেন, অর্থাৎ, নয় পত্নীর স্বামী হওয়া সত্ত্বেও তিনি আল্লাহর এবাদতে মশগুল ছিলেন এবং  বিবাহ তাঁর জন্যে এবাদতে প্রতিবন্ধক হয়নি। যেমন জগতের বড় বড় দার্শনিকদের জন্যে প্রস্রাব-পায়খানার কাজ পার্থিব চিন্তাভাবনায় বাধা সৃষ্টি করে না, তারা বাহ্যতঃ প্রস্রাব পায়খানার কাজে মশগুল থাকেন এবং তাঁদের অন্তর আপন অভীষ্ট কর্মে নিমজ্জিত থাকে তেমনি রসূলে পাক (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) তিনিও আপন উচ্চ মর্যাদার কারণে দুনিয়ার কাজকর্ম করার সাথে সাথে আল্লাহর দরবারে উপস্থিত থাকতেন এবং এতে কোন বাধা অনুভব করতেন না। এ কারণেই এমন সময়েও তাঁর প্রতি ওহী নাযিল হত, যখন তিনি নিজের পত্নীর সাথে শয্যায় থাকতেন। অন্য কোন ব্যক্তির জন্যে এই মর্যাদা ধরে নেয়া সম্ভব, কিন্তু সাথে সাথে একথাও বুঝতে হবে যে, নর্দমা সামান্য খড়কুটা দ্বারা বন্ধ হয়ে যেতে পারে, কিন্তু সমুদ্রে এ কারণে কোন পরিবর্তন আসতে পারে না। তাই রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর অনুরূপ অন্যকে মনে করা অনুচিত। হযরত ঈসা (আ.)-এর বিবাহ না করার কারণ, তিনি নিজের ক্ষমতার প্রতি লক্ষ্য করে সাবধানতা অবলম্বন করেছেন। অথবা সম্ভবতঃ তাঁর অবস্থা এমন ছিল যে, তাতে পারিবারিক ব্যস্ততা ক্ষতিকর হত অথবা তাতে বিবাহ ও এবাদত উভয়টি একত্রে সম্পাদন করা সম্ভবপর ছিল না। তাই তিনি এবাদতের পথই বেছে নিয়েছেন।


পরবর্তী পর্ব 

বিবাহ বন্ধনের শর্ত 



বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...