বুধবার, ২৬ জুলাই, ২০২৩

তওবা - (পর্ব - ৭) শর্তসহ তওবা কবুল হয়



তওবা - (পর্ব - ৭) 
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

শর্তসহ তওবা কবুল হয়—
নিঃসন্দেহে প্রত্যেক বিশুদ্ধ তওবা কবুল হয়। যারা অন্তশ্চক্ষুর আলোকে দেখে তারা জানে যে, সুস্থ ও নীরোগ অন্তর আল্লাহর কাছে মকবুল হয়ে থাকে এবং প্রকৃতিগতভাবে অন্তর নীরোগ সৃজিত হয়। এর সুস্থতা কেবল গোনাহের অন্ধকার ও মালিন্য আচ্ছন্ন হয়ে যাওয়ার কারণে বিনষ্ট হয়। অনুশোচনার অনল এ মালিন্যকে ভস্মীভূত করে দেয় এবং সৎকর্মের নূর অন্তরের চেহারা থেকে গোনাহের তিমির দূর করে দেয়। গরম পানি ও সাবান ব্যবহার করলে যেমন কাপড়ের ময়লা পরিষ্কার হয়ে যায়, তেমনি তওবা ও অনুতাপের ফলে অন্তরের নাপাকী দূর হয়ে অন্তর পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন হয়ে যায়। 

অতএব মানুষের উচিত, কেবল অন্তরকে পাক ও সাফ রাখা, যাতে আল্লাহর কাছে মকবুল হয়। কোরআনের ভাষায় এই কবুল হওয়ার নাম সাফল্য। 

বলা হয়েছে–

>“যে অন্তরকে পরিশুদ্ধ রেখেছে, সে সফলতা অর্জন করেছে”।

কারও কারও ধারণা, তওবা বিশুদ্ধ হলেও তা কবুল হয় না। তাদের এই ধারণা এরূপ ধারণার অনুরূপ যে, সূর্য উদিত হলেও অন্ধকার দূর হয় না অথবা সাবান দিয়ে ধৌত করলেও কাপড়ের ময়লা পরিষ্কার হয় না। 

হাঁ, যদি ময়লার স্তর কাপড়ের কলিজার মধ্যে প্রবেশ করে যায়, তবে সাবান দিয়ে তা দূর করা যাবে না। এমনিভাবে উপর্যুপরি গোনাহের কারণে যে অন্তরে মরিচা ও মোহর লেগে যায়, তার তওবা নিষ্ফল। কেউ কেউ মাঝে মাঝে কেবল “তওবা তওবা” বলে থাকে। এরূপ তওবার কোন মূল্য নেই। এটা এমন, যেমন ধোপা মুখে বলে, আমি কাপড় ধোলাই করেছি। তাঁর এই মৌখিক কথায়ই কাপড় পরিষ্কার হয়ে যাবে কি, যে পর্যন্ত কাপড়ের ময়লা ছাড়ানোর কৌশল ব্যবহার না করবে। প্রকৃত তওবা থেকে যারা গা বাঁচাতে চায়, এটা তাদেরই অবস্থা। দুনিয়ার প্রতি অতিমাত্রায় আসক্ত ব্যক্তিদের উপর এ অবস্থাই প্রবল। 

এখন তওবা কবুল হওয়ার পক্ষে কোরআন ও হাদীস থেকে প্রমাণ পেশ করা হচ্ছে। 

আল্লাহ্ তা'আলা বলেন-

>“তিনি আল্লাহ, যিনি আপন বান্দাদের তরফ থেকে তওবা কবুল করেন এবং গোনাহসমূহ মার্জনা করেন”।  

>“আল্লাহ গোনাহ মার্জনাকারী এবং তওবা কবুলকারী”।  

তওবা কবুল হওয়ার ব্যাপারে আরও অনেক আয়াত রয়েছে। হাদীস শরীফে আছে, 

>“আল্লাহ তা'আলা বান্দার তওবার কারণে অধিক সন্তুষ্ট হন”। 

বলা বাহুল্য, সন্তুষ্ট হওয়ার মর্তবা কবুল করার ঊর্ধ্বে। 

অন্য এক হাদীসে বলা হয়েছে- 

>“যে ব্যক্তি রাতের বেলায় সকাল পর্যন্ত এবং দিনের বেলায় সন্ধ্যা পর্যন্ত গোনাহ করে, তার তওবা কবুল করার জন্যে আল্লাহ তা'আলা বাহু প্রসারিত করেন। এটা পশ্চিম দিক থেকে সূর্যোদয় পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে”। 

এখানে বাহু প্রসারিত করার অর্থ তওবা তলব বা কামনা করা বুঝা যায়। যে তলব করে, সে কবুলকারীর ঊর্ধ্বে। কেননা, কোন কোন কবুলকারী তলব করে না কিন্তু তলবকারীর জন্য কবুলকারী হওয়া অপরিহার্য। 


অন্য এক হাদীসে আরও বলা হয়েছে : 

>“যদি তোমরা আকাশ পর্যন্ত বিস্তৃত গোনাহ কর, এরপর অনুতপ্ত হও, তবে অবশ্যই আল্লাহ তোমাদের তওবা কবুল করবেন”।  

হাদীসে আরও বলা হয়েছে- 

>“মানুষ কোন গোনাহ করে, এরপর এর কারণে জান্নাতে দাখিল হয়ে যায়”  সাহাবায়ে কেরাম আরয করলেন এটা কিরূপে ? তিনি বললেনঃ গোনাহ থেকে তওবা করে তাকেই দৃষ্টিতে রাখে এবং সেই গোনাহ থেকে বিরত থাকে। অবশেষে এর দৌলতে জান্নাতে দাখিল হয়। 

রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আরও বলেন  :

“যে গোনাহ থেকে তওবা করে, সে সেই ব্যক্তির মত, যার কোন গোনাহ নেই।


বর্ণিত আছে, জনৈক হাবশী রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর খেদমতে আরয করল  ‘আমি গোনাহ করতাম’ –বলুন, আমার তওবা কবুল হবে কি না? 

তিনি (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বললেন  : অবশ্যই তওবা কবুল হবে। 

লোকটি চলে গেল, এরপর আবার ফিরে এসে আরয করল : ইয়া রসূলাল্লাহ ! (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আমি যখন গোনাহ করতাম, তখন আল্লাহ আমাকে দেখতেন কি না?

তিনি (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বললেন : হাঁ, দেখতেন । 

একথা শুনেই হাবশী এমন সজোরে চীৎকার করে উঠল যে, সাথে সাথে তার প্রাণবায়ু বের হয়ে গেল।

বর্ণিত আছে, যখন আল্লাহ তা'আলা শয়তানকে নিজের দরবার থেকে তাড়িয়ে দিলেন, তখন শয়তান অবকাশ প্রার্থনা করল। আল্লাহ তাকে কিয়ামত পর্যন্ত অবকাশ দিলেন। 

শয়তান বলল,

>“আপনার ইযযতের কসম, যে পর্যন্ত মানুষের দেহে প্রাণ থাকবে, আমি তার অন্তর থেকে বের হব না”। 

এরশাদ হল-

>“আমিও আমার ইযযত ও প্রতাপের কসম খেয়ে বলছি- যে পর্যন্ত মানুষের মধ্যে প্রাণ থাকবে, সে পর্যন্ত তাদের তওবা প্রত্যাখ্যান করব না”। 

অন্য এক হাদীসে বলা হয়েছে– 

>“পুণ্যকাজ মন্দকাজকে বিদূরিত করে। যেমন পানি ময়লাকে বিদূরিত করে”। 

তওবা কবুল হওয়ার বিষয়ে এমনি ধরনের আরও অসংখ্য হাদীস বর্ণিত রয়েছে। এ সম্পর্কে মনীষীগণের উক্তিও কম নয়। 


হযরত সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িব (রাঃ) বলেন: 

>“আল্লাহ প্রত্যাবর্তনকারীদেরকে ক্ষমা করেন”। 

আয়াতের মর্ম এই যে, যদি কেউ গোনাহ করার পর তওবা করে এবং এরপরও গোনাহ করে এবং এরপর তওবা করে, তবে আমি তার তওবা কবুল করব। 

তালেক ইবনে হাবীব বলেনঃ আল্লাহ তা'আলার হক আদায় করা বান্দার পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু যেহেতু সে সকালে তওবা করে এবং সন্ধ্যায় তওবা করে, তাই ক্ষমার আশা করা যায়। 

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রাঃ) বলেন–> "যে ব্যক্তি কোন অপরাধ করে, সে যদি সেই অপরাধ স্মরণ করে মনে মনে ভীত হয়, তবে সে অপরাধ তার আমলনামা থেকে মিটে যায়"। 

জনৈক বুযুর্গ বলেন মানুষ মাঝে মাঝে গোনাহ করে এবং দীর্ঘকাল পর্যন্ত অনুতাপ করতে থাকে। অবশেষে সে এর দৌলতে জান্নাতে দাখিল হয়ে যায়। তখন শয়তান বলে, চমৎকার হত যদি আমি তাকে গোনাহে লিপ্ত না করতাম। 

এক ব্যক্তি হযরত ইবনে মসউদ (রাঃ)-কে প্রশ্ন করল : “আমি একটি গোনাহ করেছি, আমার তওবা কবুল হবে কি না”? তিনি প্রথমে তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। এরপর তাকিয়ে লোকটিকে অশ্রুসজল দেখতে পেয়ে বললেন জান্নাতের আটটি দরজা আছে, সবগুলো খুলে এবং বন্ধ হয়; কিন্তু তওবার দরজা কখনও বন্ধ হয় না। সেখানে একজন ফেরেশতা মোতায়েন রয়েছে। তুমি নিরাশ না হয়ে ভাল আমল করে যাও। 

আবদুর রহমান ইবনে আবুল কাসেমের দরবারে একবার কাফেরের তওবা এবং এই আয়াত সম্পর্কে আলোচনা শুরু হল : 

>“যদি তারা বিরত হয়, তবে অতীতে যা হয়েছে, ক্ষমা করা হবে”। 

আবদুর রহমান বললেন : আমি আশা করি আল্লাহর কাছে মুসলমানের অবস্থা কাফেরের তুলনায় ভাল হবে। আমি এই রেওয়ায়েতপ্রাপ্ত হয়েছি যে, মুসলমানের তওবা করা যেন ইসলাম গ্রহণের পর আবার ইসলাম গ্রহণ করা। 

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম বলেন : আমি তোমাদের কাছে যে হাদীস বর্ণনা করি, তা নবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) থেকে শুনে অথবা ঐশীগ্রন্থ থেকে দেখে বর্ণনা করি। 

বান্দা গোনাহ করার পর যদি এক মুহূর্ত অনুতাপ করে, তবে পলক মারারও পূর্বে সেই গোনাহ দূর হয়ে যায়। 

হযরত উমর (রাঃ) বলেনঃ তওবাকারীদের কাছে বস। কারণ, তাদের অন্তর অধিক নম্ৰ থাকে।

জনৈক বুয়ুৰ্গ বলেন যদি আমি তওবা থেকে বঞ্চিত থাকি, তবে এটা আমার জন্যে মাগফেরাত থেকে বঞ্চিত থাকার তুলনায় অধিক ভয়ের কারণ। এরূপ বলার কারণ এই যে, তওবার জন্যে মাগফেরাত অপরিহার্য। তওবা কবুল হলে মাগফেরাত হয়েই যাবে। তওবা কবুল হওয়ার ব্যাপারে এতটুকু বর্ণনাই যথেষ্ট । 

এখন কেউ প্রশ্ন তুলতে পারে যে, এটা তো মুতাযেলা সম্প্রদায়ের কথা যারা বলে যে, তওবা কবুল করা আল্লাহর উপর ওয়াজিব। এর জওয়াব এই যে, আমৱা যে “ওয়াজিব” বলি, তার অর্থ “জরুরী”। যেমন কেউ বলে - সাবান দিয়ে কাপড় ধৌত করলে ময়লা দূর হওয়া ওয়াজিব অথবা পিপাসার্ত ব্যক্তি পানি পান করলে পিপাসা দূর হওয়া ওয়াজিব, অথবা কাউকে দীর্ঘ সময় পানি পান করতে না দিলে পিপাসা লাগা ওয়াজিব, অথবা কেউ সদাসর্বদা পিপাসার্ত থাকলে তার মরে যাওয়া ওয়াজিব। মুতাযেলা সম্প্রদায় যে অর্থে ওয়াজিব বলে, সে অর্থে এসব বিষয়ের মধ্যে কোনটিই ওয়াজিব নয়। আমাদের উদ্দেশ্য এতটুকু যে, আল্লাহ তা'আলা এবাদতকে গোনাহের কাফফারা করেছেন এবং পাপকে মিটানোর জন্যে পুণ্য সৃষ্টি করেছেন, যেমন পানিকে পিপাসা নিবৃত্ত করার জন্যে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহর কুদরতে এর বিপরীত হওয়ারও অবকাশ রয়েছে। 

   সারকথা, আল্লাহর উপর কোনকিছুই ওয়াজিব নয়। কিন্তু তিনি যে বিষয়ের ইচ্ছা করেছেন, তা হওয়া অবশ্যই ওয়াজিব। এখানে আরও একটি প্রশ্ন হতে পারে যে, তওবাকারীদের প্রত্যেকেই তওবা কবুল হওয়ার ব্যাপারে সন্দেহ করতে থাকে; অথচ যে পানি পান করে, সে পিপাসা নিবৃত্তির ব্যাপারে সন্দেহ করে না। অতএব, তওবাকারী সন্দেহ করবে কেন? জওয়াব এই যে, তওবা বিশুদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে যে সকল জরুরী শর্ত রয়েছে, সেগুলো পাওয়া গেল কি না, সন্দেহ সে বিষয়েই হয়ে থাকে । পানি পান করার ক্ষেত্রে এরূপ কোন শর্ত নেই।তওবা বিশুদ্ধ হওয়ার শর্তাবলী ইনশাআল্লাহ  পরে বর্ণনা করা হবে।

পরবর্তী পর্ব

যে সকল গোনাহ থেকে তওবা করা হয়

তওবা - (পর্ব - ৬) তওবা সর্বদা ও সর্বাবস্থায় ওয়াজিব



তওবা - (পর্ব - ৬) 
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

তওবা সর্বদা ও সর্বাবস্থায় ওয়াজিব—
তওবা সর্বদা ও সর্বাবস্থায় ওয়াজিব। কেননা, কোন ব্যক্তির অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ গোনাহ থেকে মুক্ত নয়। পয়গম্বরগণও এ থেকে বাঁচতে পারেননি। কোৱআন ও হাদীসে পয়গম্বরগণের ত্রুটি, তাঁদের তওবা ও কান্নাকাটি উল্লেখ রয়েছে। কদাচিৎ মানুষ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের গোনাহ থেকে বেঁচে থাকলেও মনে মনে গোনাহের কল্পনা থেকে বাঁচতে পারে না। যদি অন্তরেও গোনাহের কল্পনা না থাকে, তবে শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে মুক্ত হয় না। সে অন্তরে বিক্ষিপ্ত কল্পনা নিক্ষেপ করতে থাকে। ফলে আল্লাহর এবাদতে গাফলতি দেখা দেয়। যদি কেউ কুমন্ত্রণা থেকেও মুক্ত থাকে, তবে আল্লাহ তা'আলা তাঁর গুণাবলী ও ক্রিয়াকর্ম সম্পর্কে যথার্থ ওয়াকিফহাল হওয়ার ব্যাপারে ত্রুটি থেকেই যায়। মোটকথা, ত্রুটিমুক্ততা মানুষের জন্যে কল্পনা করা যায় না। তবে ত্রুটির পরিমাণে মানুষের অবস্থা বিভিন্নরূপ হতে পারে। মূল ত্রুটি প্রত্যেকের মধ্যেই বিদ্যমান রয়েছে। 

রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়া সাল্লাম) এরশাদ করেন : “আমার অন্তরে মরিচা ধরে যায়। এমনকি, আমি দিবা-রাত্রিতে সত্তর বার আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করি”। বলা বাহুল্য, এই ক্ষমা প্রার্থনার কারণেই আল্লাহ তাঁকে মাহাত্ম্য দান করেছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন : “যাতে আল্লাহ আপনার আগের ও পেছনের সমস্ত ত্রুটি মিটিয়ে দেন”। [এখানে উল্লেখযোগ্য যে ত্রুটি থাক বা না থাক সেটা কোন ধারনার বিষয় নয়]

রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহি ওয়া সাল্লাম)- উনার যখন এই অবস্থা, তখন অন্যদের কি দশা হবে। এই ত্রুটির কারণ পরিত্যাগ করা এবং তার বিপরীত কারণ অবলম্বন করাই তওবার সারকথা। 

এখানে প্রশ্ন হয় যে, অন্তরে নানাবিধ জল্পনা-কল্পনা আসা নিঃসন্দেহে ত্রুটি এবং অন্তর এগুলো থেকে মুক্ত হওয়া পূর্ণতা। বলা বাহুল্, প্রত্যেক ত্রুটির কারণ থেকে পূর্ণতার দিকে উন্নতি করাকে তওবা বলা হবে। 


পূর্বের বর্ণনা অনুযায়ী তওবা ওয়াজিব। অথচ ত্রুটি থেকে পূর্ণতার উন্নতি করা ফযীলত তথা বাড়তি গুণের কাজ, ওয়াজিব নয়। কারণ, পূর্ণতা অর্জন করা ওয়াজিব নয়। এমতাবস্থায় সর্বাবস্থায় তওবা ওয়াজিব হওয়ার মানে কি? 

এর জওয়াব এই যে, পূর্বেই বর্ণিত হয়েছে, মানুষ জন্মলগ্ন থেকে কখনও কামনার অনুসরণ থেকে আত্মরক্ষা করতে পারে না এবং কামনা থেকে তওবা করার উদ্দেশ্য এটা নয় যে, কামনার অনুসরণ কেবল ভবিষ্যতে পরিত্যাগ করবে; বরং পূর্ণ তওবা হচ্ছে অতীতকালের ক্ষতিও পূরণ করা। মানুষ যখনই কামনার অনুসরণ করে, তখনই তার অন্তরে এক প্রকার অন্ধকার ছায়াপাত করে; যেমন আয়নায় মুখের বাষ্প লাগলে আয়না মলিন হয়ে যায়। যদি এই কামনার অনুসরণ একের পর এক অব্যাহত থাকে, তবে অন্তরের অন্ধকার মরিচায় রূপান্তরিত হয়ে যায়। যেমন, মুখের বাষ্প অব্যাহতভাবে আয়নায় পড়তে থাকলে কালক্রমে আয়নায় মরিচা ধরে যায়। কামনার কারণে অন্তরে মরিচা ধরার কথা কোরআনে উল্লিখিত হয়েছে। বলা হয়েছে- 

>“বরং তাদের কৃতকর্ম তাদের অন্তরে মরিচা ধরিয়ে দিয়েছে”।

মরিচা যদি অনেক বেশী হয়, তবে অন্তরে মোহর লেগে যায়। যেমন আয়নার মরিচা অনেকদিন পরিষ্কার না করলে তা আর পরিষ্কার করার যোগ্য থাকে না। তখন মনে হয় যেন আয়নাটি মরিচা দ্বারাই নির্মিত হয়েছে। সুতরাং আয়না পরিষ্কার করার জন্যে যেমন ভবিষ্যতে বাষ্প ও ময়লা পড়তে না দেয়াই যথেষ্ট নয়; বরং চেহারা দেখার জন্যে পূর্বের বাষ্প ও ময়লা দূর করা জরুরী তেমনিভাবে অন্তর পরিষ্কার করার জন্যেও ভবিষ্যতে কামনার অনুসরণ ত্যাগ করা যথেষ্ট নয়; বরং অতীত গোনাহের কারণে অন্তরে যে অন্ধকার ছেয়ে গেছে, তাও দূর করা জরুরি। গোনাহের কারণে যেমন অন্তরে অন্ধকার নেমে আসে, তেমনি এরাদত করা ও কামনা বর্জনের কারণে নূর সৃষ্টি হয়, যার ফলস্বরূপ সেই অন্ধকার দূর হয়ে যায়। এক হাদীসে এ বিষয়ের প্রতিই ইঙ্গিত করে বলা হয়েছে। 

>”অসৎ কর্মের পেছনে সৎকর্ম কর। সৎকর্ম অসৎ কর্মকে মিটিয়ে দেয়”। 

এ থেকে জানা গেল যে, সর্বাবস্থায় অন্তর থেকে গোনাহের চিহ্ন মিটিয়ে ফেলার প্রয়োজন রয়েছে।


এখন সর্বাবস্থায় তওবা ওয়াজিব হওয়ার অর্থ কি, তা জানা দরকার।

প্রকাশ থাকে যে, ওয়াজিবের অর্থ দ্বিবিধ। 

এক ওয়াজিব শরীয়তের বিধিবিধানে সুবিদিত। এতে সকলেই শরীক। যেমন নামায, রোযা ইত্যাদি। পূর্ণতায় স্তর এই ওয়াজিবের অন্তর্ভুক্ত নয়।

দ্বিতীয় ওয়াজিব আল্লাহ তা'আলার নৈকট্য লাভ করার জন্যে জরুরী। 

আমরা এতক্ষণ যে সব বিষয় থেকে তওবা করার কথা লিখেছি, সেগুলো সমস্তই এই নৈকট্যের স্তরে পৌঁছার জন্যে জরুরী। বিষয়টি একটি দৃষ্টান্ত দ্বারা বুঝা দরকার। 

আমরা বলি, নফল নামাযের জন্যে উযু ওয়াজিব। এর অর্থ এই যে, যে ব্যক্তি নফল নামায পড়তে চায়, তার জন্যে উযু জরুরী। কিন্তু যে ব্যক্তি নফলই পড়তে চায় না, তার জন্যে নফলের কারণে উযু ওয়াজিব নয়। অথবা আমৱা বলি, চক্ষু, কর্ণ, হাত, পা মানুষের অস্তিত্বের জন্যে শর্ত ও জরুরী। অর্থাৎ, যদি কেউ পূর্ণাঙ্গ মানুষ হতে চায়, তবে তার জন্যে এসব অঙ্গ থাকা অত্যাবশ্যক। কিন্তু যদি কোন ব্যক্তি কেবল মাংসপিণ্ডের জীবন নিয়েই সন্তুষ্ট থাকে, তবে এরূপ জীবনের এসব অঙ্গ থাকা জরুরী নয়।

সুতরাং শরীয়তের যেসব মূল ওয়াজিব সকলের উপর ওয়াজিব, তা দ্বারা কেবল নাজাত তথা মুক্তি পাওয়া যায়। নিরেট মুক্তিকে কেবল মাংসপিন্ডের জীবন মনে করা উচিত। এটি ছাড়া অন্য আরও যেসকল সৌভাগ্য রয়েছে, সেগুলোকে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের অনুরূপ জ্ঞান করা দরকার। মুক্তির অলংকার ও সাজসজ্জা সেগুলোই। এগুলোর জন্যেই পয়গম্বর, ওলী ও আলেমগণ আজীবন সাধনা করেছেন এবং পার্থিব সুখ-শান্তি ও আনন্দ পুরোপুরি বিসর্জন দিয়েছেন। 


সেমতে হযরত ঈসা (আঃ) একবার মাথার নিচে পাথর রেখে শয়ন করেছিলেন। শয়তান হাযির হয়ে আরয করল, আপনি তো দুনিয়া বর্জন করেছিলেন। এখন এ কি করলেন? 

তিনি বললেনঃ “তুই দুনিয়া বর্জনের খেলাফ কি দেখলি”? শয়তান বলল  : পাথরকে বালিশ করা দুনিয়ার সুখ। মাটিতে মাথা রাখেন না কেন? তিনি তৎক্ষণাৎ মাথার নিচ থেকে পাথরটি বের করে ফেলে দিলেন এবং মাটিতে মাথা রেখে শয়ন করলেন। 

হযরত ঈসা (আঃ)-এর এ কাজটি ছিল দুনিয়ার এ সুখ থেকে তওবা। এখন জিজ্ঞাসা এই যে, তিনি কি জানতেন না যে, মাটিতে মাথা রাখা শরীয়তের সাধারণ বিধানে ওয়াজিব নয়? 

এমনিভাবে রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) নকশাযুক্ত চাদৱকে নামাযে বিঘ্ন সৃষ্টিকরী পেয়ে খুলে ফেলেছিলেন এবং জুতার নতুন ফিতাকে মনোযোগ আকৃষ্ট করতে দেখে তার স্থলে পুরাডন ফিতা লাগিয়ে নিয়েছিলেন। তার কি জানা ছিল না যে, এসব বিষয় শরীয়তে ওয়াজিব নয়? জানা থাকলে এগুলো বর্জন করলেন কেন?

এ থেকে বুঝা গেল যে, তিনি এসব বিষয়কে অন্তরে প্রতিশ্রুত  “মকামে মাহমুদ” (প্রশংসিত মর্তবা) পর্যন্ত পৌঁছার পথে কার্যকর অন্তরায় অনুভব করার কারণে বর্জন করেছিলেন। 


হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রাঃ) দুধ পান করার পর যখন জানতে পারলেন, তা অবৈধ উপায়ে অর্জিত ছিল, তখন কণ্ঠনালীতে অঙ্গুলি ঢুকিয়ে খুব বমি করলেন। ফলে তাঁর প্রাণবায়ু নির্গত হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। তিনি কি ফেকাহ শাস্ত্রের এই বিধান জানতেন না যে, ভুলক্রমে পান করার মধ্যে গোনাহ নেই এবং পান করা বস্তু পেট থেকে বের করা ওয়াজিব নয়? 

তা হলে তিনি এই পান করা থেকে রুজু করলেন কেন এবং পেটকে যথাসম্ভব খালি করতে চাইলেন কেন? 

এর কারণ এটাই ছিল যে, তিনি জানতেন জনসাধারণের বিধান এবং আখেরাত পথের বিপদ ভিন্ন ভিন্ন। অতএব, এ সকল মহাপুরুষের অবস্থা চিন্তা করা দরকার। তাঁরা আল্লাহ, তাঁর পথ, তার শাস্তি এবং গোপন বিভ্রান্তি সম্পর্কে সর্বাধিক অবগত ছিলেন। 

মোটকথা, এসব রহস্য সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিরা জানে, আধ্যাত্ম পথে চলার জন্যে প্রত্যেক ব্যক্তির উপর প্রতি মুহূর্তে নির্ভেজাল তওবা করা ওয়াজিব। 

নূহ (আঃ)-এর মত দীর্ঘজীবী হলেও তৎক্ষণাৎ ও অবিলম্বে তওবা করবে। 

আবূ সোলায়মান দারানী বলেন : যদি বুদ্ধিমান ব্যক্তি অবশিষ্ট জীবন কেবল এজন্যে দুঃখ করে যে, তার অতীত জীবন এবাদত ছাড়াই বিনষ্ট হয়ে গেছে, তবে আমৃত্যু এ দুঃখ তার জন্যে সমীচীন হবে। সুতরাং কোন ব্যক্তি যদি অবশিষ্ট জীবনও অতীত জীবনের ন্যায় কুকর্মে অতিবাহিত করে, তবে তার কি অবস্থা হবে ? 

বুদ্ধিমান ব্যক্তি যদি কোন সুবর্ণ সুযোগ পায়, এরপর তা অহেতুক বিনষ্ট হয়ে যায়, তবে এজন্যে সে অবশ্যই দুঃখ করে। আর যদি সেই সুযোগ বিনষ্ট হওয়ার সাথে সাথে স্বয়ং ব্যক্তিরও ধ্বংস অনিবার্য হয়, তবে দুঃখ আরও বেশী হবে। 

মানুষের জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত একটি উৎকৃষ্ট সুযোগ, যার কোন বিকল্প নেই। কারণ, এতে মানুষ নিজের চিরন্তন সৌভাগ্য গড়ে নিতে পারে এবং সার্বক্ষণিক দুর্ভাগ্য থেকে আত্মরক্ষা করতে পারে। এরপর মানুষ যদি এই সুযোগ হেলায় নষ্ট করে দেয়, তবে সেটা খুবই ক্ষতির বিষয় হবে।

আর যদি এই সুযোগকে আল্লাহর নাফরমানীতে বিনষ্ট করে, তবে সরাসরি নিজের ধ্বংসই ডেকে আনে। 

এরপরও যদি মানুষ এই বিপদের জন্যে দুঃখ না করে, তবে এটা হবে মূর্খতা, যা সকল বিপদের মধ্যে বৃহত্তম বিপদ। কিছু মূর্খতার বিপদ বিপদগ্রস্ত ব্যক্তি জানতে পারে না। কেননা, গাফলতির স্বপ্ন তার মধ্যে ও তার জ্ঞানের মধ্যে অন্তরায় হয়ে যায়। 

পরিতাপের বিষয়, সকল মানুষই এই গাফলতির স্বপ্নে বিভোর যখন মৃত্যু আসবে, তখন স্বপ্নভঙ্গ হবে। তখন বিপদগ্রস্ত ব্যক্তি তার বিপদ টের পাবে। কিন্তু তখন ক্ষতিপূরণ সম্ভব নয়। বেদনা ও নৈরাশ্য ছাড়া কিছুই পাওয়া যাবে না ।

জনৈক সাধক বলেন : মালাকুল মওত যখন কোন মানুষের সামনে আবির্ভূত হয়ে বলে দেয়, তোমার জীবন আর মাত্র এক মুহূর্ত বাকী, এতে এক নিমেষেরও বিলম্ব হবে না, তখন সে এত দুঃখিত ও অনুতপ্ত হয় যে, এক মুহূর্ত সময় পাওয়ার জন্যে যদি সে সমগ্র পৃথিবীর মালিক হত, তবে তাও অকাতরে দিয়ে দিত, যাতে সে সেই বাড়তি মুহূর্তের মধ্যে নিজের দোষত্রুটির ক্ষতিপূরণ করে নেয়। কিন্তু তখন অবকাশ কোথায় আর ? কোরআন পাকের নিম্নোক্ত আয়াতে এ বিষয়বস্তুর প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে–

>"তোমাদের কারও কাছে মৃত্যু আসার পূর্বে সে বলে, পরওয়ারদেগার ! আমাকে সামান্য সময় অবকাশ দিলে না কেন, যাতে আমি দান-খয়রাত করতাম এবং সৎকর্মীদের একজন হতাম”। 

আল্লাহ কখনও অবকাশ দিবেন না কাউকে যখন তার মৃত্যু এসে পড়বে। সামান্য সময়ের অর্থ হল মানুষের সামনে মালাকুল মওতের আবির্ভাব। তখন মানুষ বলে : হে মালাকুল মওত, আমাকে একদিনের সময় দাও, যাতে আমি পরওয়ারদেগারের কাছে ক্ষমা চাই এবং তওবা করি। মালাকুল মওত জওয়াব দেয়, তুই এতগুলো দিন অকারণে বরবাদ করেছিস, এখন একদিন কোথায় পাবে ? এরপর মানুষ বলে, এক মুহূর্তেরই অবকাশ দাও । মালাকুল মওত বলে তুই অনেক মুহূর্ত বিনষ্ট করেছিস। এখন এক মুহূর্তও দেয়া হবে না। 

এরপর মানুষের সামনে তওবার দরজা বন্ধ করে দেয়া হয় এবং প্রাণবায়ু কণ্ঠনালীতে এসে পড়ে। বুকে গড়গড় শব্দ হয়। এসব আতঙ্কের কারণে আসল ঈমান টলমল করতে থাকে। এরপর তাকদীর ভাল হলে আত্মা তাওহীদের উপর নির্গত হয়। একেই বলে “শুভ খাতেমা"। 

পক্ষান্তরে তাকদীর মন্দ হলে সন্দেহ ও অস্থিরতার উপর আত্মা নির্গত হয়। এটা হচ্ছে “অশুভ খাতেমা”। এই অশুভ খাতেমা সম্পর্কেই আল্লাহ পাক এরশাদ করেন - 

>“তাদের জন্যে তওবা নেই, যারা আমৃত্যু মন্দ কাজ করে যায়। এমনকি, যখন তাদের কারও কাছে মৃত্যু এসে উপস্থিত হয়, তখন বলে, আমি এখন তওবা করছি”।  

অন্য এক আয়াতে বলা হয়েছে, – 

>“আল্লাহর কাছে তাদের তওবা কবুল হবে, যারা অজ্ঞতাবশত মন্দ কাজ করে, এরপর অনতিবিলম্বে তওবা করে।" 

এর অর্থ এই যে, তওবার সময় ও গোনাহের সময় লাগালাগি হতে হবে। অর্থাৎ, গোনাহ হয়ে গেলে তৎক্ষণাৎ তজ্জন্যে অনুতাপ করবে এবং সাথে সাথে সৎকর্ম করবে। বেশী দিন অতিবাহিত হয়ে গেলে গোনাহের কারণে অন্তরে মরিচা ধরে যেতে পারে, যা মিটানো সম্ভব না-ও হতে পারে। 

এ কারণেই রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেন– “মন্দকাজের পশ্চাতেই সৎকাজ কর। সৎকাজ মন্দ কাজকে মিটিয়ে দেবে”।

হযরত লোকমান (আঃ) তাঁর পুত্রকে বলেন প্রিয় বৎস, তওবায় বিলম্ব করো না। কেননা, মৃত্যু হঠাৎ এসে যায়। যে ব্যক্তি অনতিবিলম্বে তওবা করে না, সে দুটি বিপদে জড়িত থাকে। 

এক, গোনাহের কাল দাগ যদি একের পর এক অন্তরে পড়তে থাকে, তবে মরিচা ও মোহর লেগে যাবে এবং তা মিটানোর যোগ্য থাকবে না। 

দুই, যদি এ সময়ের মধ্যে রোগ অথবা মৃত্যুর কবলে পড়ে যায়, তবে ক্ষতিপূরণের অবকাশ থাকবে না। এছাড়া অন্তর মানুষের কাছে আল্লাহ তা'আলার আমানত। এমনিভাবে জীবনও তাঁরই আমানত। অতএব, যে ব্যক্তি আমানতে খেয়ানত করবে, তার পরিণাম ভয়াবহ।


জনৈক দরবেশ বলেনঃ আল্লাহ তা'আলা মানুষকে দুটি রহস্যের কথা এলহামের মাধ্যমে শুনিয়ে দেন। 

এক, যখন মানুষ জননীর গর্ভ থেকে নির্গত হয়, তখন তাকে বলা হয়  “হে বান্দা ! আমি তোমাকে পাকসাফ অবস্থায় দুনিয়াতে পাঠিয়েছি”। তোমার আয়ুষ্কাল তোমার কাছে আমানত। এখন আমি দেখব তুমি কিভাবে এই আমানতের হেফাযত কর এবং আমার সাথে কি অবস্থায় সাক্ষাৎ কর”।

দুই, যখন মানুষের আত্মা নির্গত হয়, তখন বলা হয়, “হে বান্দা ! আমি যে আমানত তোমার কাছে রেখেছিলাম, তুমি এ সময় পর্যন্ত তার হেফাযত করেছ কি ? তুমি তোমার অঙ্গীকার পূর্ণ করে থাকলে আমিও আমার অঙ্গীকার পূর্ণ করব। আর তুমি অঙ্গীকার ভঙ্গ করে থাকলে আমি শাস্তি দেব। 

নিম্নোক্ত আয়াতে এদিকেই ইশারা করা হয়েছে- 

>“তোমরা আমার অঙ্গীকার পূর্ণ কর, আমি তোমাদের অঙ্গীকার পূর্ণ করব ।



পরবর্তী পর্ব

শর্তসহ তওবা কবুল হয়

তওবা - (পর্ব - ৫) প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যে তওবা অপরিহার্য



তওবা - (পর্ব - ৫) 
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
 
প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যে তওবা অপরিহার্য—
সকলের জন্যে তওবার অপরিহার্যতা নিম্নোক্ত আয়াত দ্বারা প্রমাণিত : 

>“হে মুমিনগণ, তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে তওবা কর, যাতে সফলকাম হও”। 

এ আয়াতে ব্যাপকভাবে সম্বোধন করা হয়েছে। বুদ্ধি-বিবেকের আলোকেও এই অপরিহার্যতা হৃদয়ঙ্গম করা যায়। কেননা, তওবার অর্থ হচ্ছে, যে পথ আল্লাহ থেকে দূরে এবং শয়তানের কাছে। সে পথ থেকে ফিরে আসা উচিত। এই ফিরে আসার কাজটি বুদ্ধিমান ব্যক্তি দ্বারাই সম্ভবপর। কাম, ক্রোধ ও অন্যান্য নিন্দনীয় স্বভাব হচ্ছে মানুষকে বিপথগামী করার জন্যে শয়তানের হাতিয়ার। এগুলো যখন পূর্ণতা লাভ করে, তখন মানুষের বুদ্ধি পূর্ণতা লাভ করে। সাধারণত চল্লিশ বছর বয়সে বুদ্ধি পূর্ণাঙ্গ হয়ে থাকে এবং তার ভিত্তি যৌবনে পা রাখার সাথে সাথে পূর্ণ হয়ে যায়। এ ভিত্তির সূচনা হয় সাত বছর বয়স থেকে। কিন্তু কাম ও ক্রোধ পূর্ব থেকেই বিদ্যমান থাকে। এগুলো হচ্ছে শয়তানের বাহিনী এবং বুদ্ধি ফেরেশতাদের বাহিনী। যখন উভয় বাহিনী মুখোমুখি হয়, তখন তাদের মধ্যে যুদ্ধ অবশ্যই সংঘটিত হয়। কেননা – এরা পরস্পর বিরোধী শক্তি। একের উপস্থিতিতে অন্যের কায়েম থাকা সম্ভব নয়। যেমন রাত ও দিন এবং অন্ধকার ও আলো একত্রে অবস্থান করতে পারে না। এ যুদ্ধে যে পক্ষ বিজয়ী হয়, সে অপর পক্ষের মূলোচ্ছেদ করে। কাম ও ক্রোধ শৈশবেই পূর্ণাঙ্গ হয়ে যায় বিধায় শয়তানের ব্যূহ বুদ্ধির পূর্বেই প্রতিষ্ঠিত  হয়ে যায়।

তাই স্বভাবতই কামনার দাবীর প্রতি মানুষের টান ও মোহ প্রবল হয়ে উঠে এবং এ থেকে উদ্ধার পাওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এরপর যখন বুদ্ধি প্রকাশ পায়, তখন যদি তা শক্তিশালী ও পূর্ণাঙ্গ না হয়, তবে যুদ্ধের ময়দান শয়তানের হাতেই থাকে এবং সে কোরআনে উল্লিখিত এই প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করে নেয় অর্থাৎ, 

>“আমি আদম সন্তানদেরকে অল্পসংখ্যক বাদে অবশ্যই বিপথগামী করব”।

পক্ষান্তরে যদি বুদ্ধি পূর্ণাঙ্গ ও শক্তিশালী হয়, তবে প্রথমে সে শয়তান বাহিনীর মূলোচ্ছেদ করতে শুরু করে। এ জন্যে কামনাকে চূর্ণ করে, অভ্যাস ত্যাগ করে এবং মনকে বলপূর্বক এবাদতে ফিরিয়ে আনে। 

বলা বাহুল্য, তওবার উদ্দেশ্য তাই। অর্থাৎ, ফিরে আসার কাজটি এখানেও পাওয়া যায়। যেহেতু কাম বুদ্ধির পূর্বে অস্তিত্ব লাভ করে, তাই যে কাজ বুদ্ধির পূর্বে করা হয়, তা থেকে ফিরে আসা অর্থাৎ তওবা করা প্রত্যেক মানুষের জন্যে অত্যাবশ্যক। সে নবী-রসূল কিংবা সাধারণ মানুষ যেই হোক। কাজেই এরূপ মনে করা উচিত নয় যে, তওবার প্রয়োজন বিশেষভাবে হযরত আদম (আঃ) এর জন্যেই ছিল; বরং এটা একটা আদি বিধান; যা মানুষ মাত্রের জন্যেই জরুরী। এর অন্যথা হওয়া সম্ভব নয়। অতএব, যে ব্যক্তি বালেগ হয়, সে যদি কুফর ও মূর্খতার উপর থাকে, তবে এসব বিষয় থেকে তওবা করা তার উপর ওয়াজিব। যদি সে পিতামাতার অনুগামী হয়ে মুসলমান হয়, তবে ইসলামের স্বরূপ সম্পর্কে অবশ্যই গাফেল ও অজ্ঞ। এ ক্ষেত্রে এই গাফলতি ও অজ্ঞতা থেকে তওবা করা ওয়াজিব। তাকে ইসলামের সঠিক অর্থ বুঝতে হবে। কেননা, তার পিতামাতার ইসলাম তার জন্যে উপকারী হবে না যে পর্যন্ত নিজে মুসলমান না হবে। ইসলামকে বুঝার পর নিজের অভ্যাস ও কামনা চরিতার্থ করার জন্যে অহেতুক স্বেচ্ছাচারপ্রীতি থেকে ফিরে আসা অপরিহার্য।অর্থাৎ, প্রত্যেক করণীয় ও বর্জনীয় কাজে আল্লাহ তা'আলার নির্ধারিত সীমা মেনে চলতে হবে। সীমার বাইরে এক পাও রাখা যাবে না। এ প্রকার তওবা সর্বাধিক কঠিন। অধিকাংশ লোক এতে অক্ষম হয়ে বরবাদ হয়ে যায়। 


উপরোক্ত আলোচনা থেকে জানা গেল যে, তওবা প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যে ফরযে আইন৷ এরূপ কোন ব্যক্তির কল্পনা করা যায় না, যার তওবার প্রয়োজন নেই। হযরত আদম (আঃ) তওবা থেকে বেপরওয়া হননি। তেমনি তাঁর সন্তানরাও এ থেকে বেপরওয়া হতে পারেননা। এখন জানা দরকার যে, তওবা সর্বদা ও সর্বাবস্থায় ওয়াজিব। 


পরবর্তী পর্ব

তওবা সর্বদা ও সর্বাবস্থায় ওয়াজিব  

তওবা - (পর্ব - ৪) তওবা সম্পর্কে উক্তি সমূহ



তওবা - (পর্ব - ৪) 

📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

তওবা সম্পর্কে উক্তি সমূহ—
তওবা সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা, রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ও পূর্ববর্তী মনীষীগণের উক্তি—

আল্লাহ তা'আলা এরশাদ করেন  : 

> “হে মুমিনগণ, তোমরা সম্মিলিতভাবে আল্লাহর সামনে তওবা কর — যাতে সফলকাম হও“। 

এখানে সকল ঈমানদারকে তওবা করার ব্যাপক আদেশ করা হয়েছে।

> “তোমরা যারা ঈমান এনেছো শুন, তোমরা আল্লাহর সামনে পরিষ্কার মনে তওবা কর।” 

এ আয়াতে “নাসূহ” শব্দ ব্যবহার করে বুঝানো হয়েছে যে, আল্লাহর জন্যে খাঁটি ও অবিমিশ্র তওবা কর। 

> “আল্লাহ ভালবাসেন তওবাকারীকে এবং ভালবাসেন পবিত্রতা অবলম্বনকারীকে ।” এ আয়াতটি তওবার ফযীলত জ্ঞাপন করে। 

রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি  ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেন  : 

> “যে গোনাহ থেকে তওবা করে, সে সেই ব্যক্তির মত, যার কোন গোনাহ নেই।” 

এক হাদীসে দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা হয়েছে- এক ব্যক্তি সফর করতে করতে এক প্রতিকূল জায়গায় বিশ্রামের জন্যে যাত্রা বিরতি করল। সঙ্গে তার পাথেয় বহনকারী উট। লোকটি মাটিতে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ল। কিছুক্ষণ পর জাগ্রত হয়ে দেখল তার উটটি নেই। সে ক্ষোভে ও দুঃখে ম্রিয়মাণ হয়ে উটটিকে খুঁজতে লাগল। অবশেষে যখন রৌদ্রতাপ, পিপাসা ও ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়ল, তখন মনে মনে বললঃ আমি যেখানে ছিলাম, সেখানেই চলে যাব এবং মৃত্যুর অপেক্ষায় শুয়ে থাকব। সেমতে সেখানে পৌঁছে মাথার উপর হাত রেখে শুয়ে পড়ল এবং তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ল। কিছুক্ষণ পর চোখ খুলতেই দেখল পাথেয় বহনকারী উটটি শিয়রের কাছেই দাঁড়িয়ে আছে। উটটি ফিরে পাওয়ার কারণে এই ব্যক্তির যে আনন্দ হতে পারে, তার চেয়ে অনেক বেশী আল্লাহ তা'আলা মুমিন বান্দার তওবার কারণে আনন্দিত হন। 


> হযরত হাসান (রঃ) বর্ণনা করেন, আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম (আঃ)-এর তওবা কবুল করলে পর ফেরেশতারা তাঁকে মোবারকবাদ দিল। হযরত জিবরাঈল (আঃ) তাঁর কাছে এসে বললেনঃ হে আদম, আল্লাহ তা'আলা আপনার তওবা কবুল করায় আপনার কলিজা ঠাণ্ডা হয়েছে নিশ্চয়? হযরত আদম (আঃ) জওয়াব দিলেন জিবরাঈল, যদি তওবা কবুল করার পরও আমাকে সওয়াল করা হয়, তবে আমার ঠিকানা কোথায় হবে?

তখনই তাঁর প্রতি ওহী আগমন করল- হে আদম, তুমি তোমার সন্তানদের জন্যে দুঃখকষ্টও রেখে গেলে এবং তওবাও। অতএব, তাদের মধ্যে যে আমাকে ডাকবে, আমি তার ডাকে সাড়া দেব, যেমন তোমার ডাকে সাড়া দিয়েছি। আর যে আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবে, আমি কৃপণতা করব না। কেননা, আমার নাম “করীব” (নিকটবর্তী) এবং “মুজীব” (সাড়া দানকারী)। হে আদম, আমি তওবাকারীদেরকে কবর থেকে যখন উত্থিত করব, তখন তারা আসতে থাকবে এবং সুসংবাদ শুনতে থাকবে। তারা যে দোয়া করবে, তা কবুল হবে। 

মোটকথা, তওবার সংজ্ঞা হচ্ছে বর্তমানে গোনাহ পরিত্যাগ করা এবং ভবিষ্যতে তা না করার জন্যে সংকল্পবদ্ধ হওয়া, সাথে সাথে অতীতের ত্রুটি-বিচ্যুতি পূরণ করে নেয়া। 

এই তওবা তাৎক্ষণিকভাবে ওয়াজিব। কেননা, গোনাহকে ক্ষতিকর মনে করা ঈমানের অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং যে ব্যক্তি গোনাহ পরিত্যাগ করে না, তার মধ্যে ঈমানের এই অংশটি অনুপস্থিত। 

নিম্নোক্ত হাদীসে এ কথাই বুঝানো হয়েছে— 

> “যিনাকার ব্যক্তি যখন যিনা করতে থাকে, তখন সে ঈমানদার থাকে না। অর্থাৎ যিনা যে আল্লাহর অসন্তোষ সৃষ্টিকারী একটি গোনাহ, এ বিষয়ের ঈমান যিনাকারের মধ্যে থাকে না। এর অর্থ এই নয় যে, তার মধ্যে মূল ঈমানই থাকে না; অর্থাৎ আল্লাহর অস্তিত্ব স্বীকার করা। অতএব বুঝা গেল, আল্লাহকে জানা, তাঁর একত্ব স্বীকার করা, তাঁর গুণাবলী, ঐশী গ্রন্থসমূহ এবং রসূলগণের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা যিনার পরিপন্থী নয়। তাই যিনার কারণে এই ঈমান বিনষ্ট হবে না। 

উদাহরণতঃ কোন চিকিৎসক রোগীকে বলল  : এটা বিষ। এটা খেয়ো না। যদি রোগী সেই বস্তু খেয়ে ফেলে, তবে বলা হবে যে, সে চিকিৎসকের এ কথাটির সত্যতা স্বীকার করে না এবং এর অর্থ এই হবে না যে  সে চিকিৎসকের অস্তিত্ব এবং তার চিকিৎসক হওয়া বিশ্বাস করে না। এ থেকে জানা গেল যে, গোনাহগার ব্যক্তি পূর্ণ ঈমানদার হয় না এবং ঈমান একই বস্তু বিশ্বাস করার নাম হয় না; বরং এর সত্তরের উপর শাখা রয়েছে। তন্মধ্যে সর্বোচ্চ শাখা হচ্ছে কালেমা তাইয়েবার সাক্ষ্য দেয়া এবং নিম্নতম শাখা হচ্ছে রাস্তা থেকে ক্ষতিকর বস্তু সরিয়ে দেয়া৷ 


ঈমানের সঠিক দৃষ্টান্ত হচ্ছে মানুষ। আত্মার অনুপস্থিতিতে যেমন মানুষ মানুষ হয় না, তেমনি একত্ববাদ স্বীকার না করলে ঈমান ঈমান হয় না। যে ব্যক্তি কেবল তাওহীদ ও রেসালতের সাক্ষ্য দেয় এবং আমলে ত্রুটি করে, সে এমন মানুষের মত, যার হাত, পা, চক্ষু, কর্ণ ইত্যাদি বাহ্যিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নেই। এরূপ মানুষের মৃত্যু যেমন অতি নিকটে, তেমনি যে ব্যক্তি কেবল কালেমা তাইয়েবা ও রেসালতের সাক্ষ্য দেয়, সেও এই অবস্থার কাছাকাছি। সামান্য ঝড়ো হাওয়ায় তার ঈমানের বৃক্ষ সমূলে উৎপাটিত হয়ে যায়। অর্থাৎ মৃত্যুদূতের আগমনের সময় যে ভীতিপ্রদ পরিস্থিতির উদ্ভব হয়, তার কারণে ঈমান উধাও হয়ে যায়। দুর্বল ঈমান এই পরিস্থিতি বরদাশত করতে পারে না । এরূপ মুমিনের “খাতেমা” তথা জীবনাবসান শুভ না হওয়ার আশংকা থাকে। খাতেমার সময় সেই ঈমানই বাকী থাকে, যার ভিত্তি সার্বক্ষণিক আনুগত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে। 

কোন কোন গোনাহগার ব্যক্তি আনুগত্যশীল ব্যক্তিকে বলে, আমার মধ্যে ও তোমার মধ্যে পার্থক্য কি? তুমিও ঈমানদার, আমিও ঈমানদার। যেমন লাউগাছ দেবদারু গাছকে বলেছিল, আমিও বৃক্ষ, তুমিও বৃক্ষ। কাজেই আমাদের মধ্যে কোন তফাৎ নেই। কিন্তু জওয়াবে দেবদারু গাছ বলেছিল, নামের অভিন্নতার এই বিভ্রান্তি তোমার তখন দূর হবে, যখন কালবৈশাখীর ঝড় আসবে। তখন তোমার শিকড় উপড়ে যাবে এবং পাতা ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। আর আমি পূর্ববৎ সগর্বে দাঁড়িয়ে থাকব। সুতরাং গোনাহগার ব্যক্তি যদি দোযখ বাসকে ভয় না করে এবং মৃত্যুর পরওয়া না করে, তবে তাকে বলা হবে দেখ, সুস্থ-সবল ব্যক্তি অসুখ-বিসুখের আশংকা করে এবং যখন অসুস্থ হয়ে যায়, তখন মৃত্যুকে  ভয় করে। এমনিভাবে গোনাহগারেরও উচিত অশুভ খাতেমাকে ভয় করা। যদি খোদা না করুন, খাতেমা খারাপ হয়, তবে দোযখের অগ্নিতে থাকা জরুরী। কেননা, ঈমানের জন্যে গোনাহ তেমনি, যেমন দেহের জন্যে ক্ষতিকর খাদ্য। ক্ষতিকর খাদ্য পাকস্থলীতে একত্রিত হয়ে আস্তে আস্তে পিত্তাদির মেযাজ বিগড়াতে থাকে, যা মানুষ টের পায় না। এরপর হঠাৎ সে রুগ্ন হয়ে পড়ে এবং মৃত্যুবরণ করে। গোনাহ ঈমানের মধ্যে এমনিভাবে প্রভাব বিস্তার করে এবং একদিন ঈমানকেই ডুবিয়ে দেয়। সুতরাং ধ্বংসশীল দুনিয়াতে মৃত্যুর ভয়ে যখন বিষাক্ত ও ক্ষতিকর খাদ্য না খাওয়া তাৎক্ষণিক ওয়াজিব, তখন চিরন্তন ধ্বংসের ভয়ে ধ্বংসাত্মক কাজকর্ম না করা আরও উত্তমরূপে তাৎক্ষণিক ওয়াজিব হবে।


বিষপানকারী স্বীয় ভুলের জন্যে অনুতপ্ত হয়ে যেমন তৎক্ষণাৎ উদরকে বিষমুক্ত করার জন্যে বমি করতে অথবা অন্য কোন উপায় অবলম্বন করতে সচেষ্ট হয়, তেমনিভাবে যে গোনাহ করে, তার জন্যে গোনাহ থেকে তৎক্ষণাৎ ফিরে আসা ওয়াজিব। 

এরপর যতদিন সে জীবিত থাকে, ততদিন এই ক্ষতিপূরণ করতে সচেষ্ট হবে। সুতরাং গোনাহগারের উচিত দ্রুত তওবার প্রতি মনোনিবেশ করা। নতুবা গোনাহের বিষক্রিয়ার ফলে ঈমানের আত্মা প্রভাবিত হয়ে যাবে। এরপর ওয়ায-নসীহত কোন উপকারে আসবে না এবং গোনাহগার ব্যক্তি ধ্বংসপ্রাপ্তদের তালিকাভুক্ত হয়ে নিম্নোক্ত আয়াতের প্রতীক হয়ে যাবে-  

> “আমি তাদের গলদেশে চিবুক পর্যন্ত বেড়ি পরিয়েছি, ফলে তারা ঊর্ধ্বমুখী হয়ে গেছে। আমি তাদের সামনে ও পেছনে প্রাচীর স্থাপন করেছি' এবং তাদের দৃষ্টি আচ্ছন্ন করে দিয়েছি। ফলে, তারা দেখতে পায় না। আপনি তাদেরকে সতর্ক করুন বা না করুন, তারা ঈমান আনবে না।” 

এ আয়াতগুলো কাফেরদের সম্পর্কে বলা হয়েছে- এরূপ মনে করে বিভ্রান্ত হওয়া ঠিক নয়। কেননা, পূর্বেই বর্ণিত হয়েছে যে, ঈমানের শাখা সত্তরেরও বেশী এবং যিনাকার মুমিন অবস্থায় যিনা করে না। এ থেকে জানা যায়, যে ব্যক্তি শাখার অনুরূপ ঈমান থেকে বঞ্চিত হবে, সে খাতেমার সময় মূল ঈমান থেকেও বঞ্চিত হবে, যেমন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ যা আত্মার শাখা, তা না থাকলে মানুষের মূল আত্মাও বিলুপ্ত হয়ে যায়। কেননা, শাখা ব্যতীত মূল কায়েম থাকতে পারে না।



পরবর্তী পর্ব

প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যে তওবা অপরিহার্য

তওবা - (পর্ব - ৩) তওবার ফযীলত ও আবশ্যকতা



তওবা - (পর্ব - ৩) 
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

তওবার ফযীলত ও আবশ্যকতা—
কোরআনের আয়াত ও হাদীস শরীফ দ্বারা তওবার আবশ্যকতা প্রমাণিত। যার অন্তশ্চক্ষু উন্মুক্ত এবং যার বক্ষ ঈমানের আলোকে আলোকিত, তার কাছেও এর প্রয়োজনীয়তা সুস্পষ্ট। এরূপ ব্যক্তি অজ্ঞতার অন্ধকারের মধ্যেও এই আলোকের সাহায্যে সম্মুখে অগ্রসর হতে পারে। প্রতি পদক্ষেপে একজন পথপ্রদর্শক সঙ্গে থাকা তার জন্য জরুরী নয়। যারা আল্লাহর পথে চলে, তাদের কেউ কেউ অন্ধ হয়ে থাকে। কারও সাহায্য ব্যতিরেকে সম্মুখে পা বাড়াতে পারে না। আবার কেউ কেউ চক্ষুষ্মান হয়ে থাকে। একবার পথে পা রাখলে আপনা-আপনিই অগ্রসর হতে থাকে। 

প্রথম প্রকার লোক ধর্মের পথে প্রতি পদক্ষেপে কোরআনের আয়াত অথবা হাদীস শুনার মুখাপেক্ষী হয়। পরিষ্কার আয়াত অথবা হাদীস পাওয়া কঠিন হলে মাঝে মাঝে তারা হতভম্ব হয়ে পড়ে। কঠোর পরিশ্রম করা এবং দীর্ঘায়ু লাভ করা সত্ত্বেও তাদের ভ্রমণ সংক্ষিপ্ত হয়ে থাকে এবং পদক্ষেপও ছোট হয়। 

পক্ষান্তরে দ্বিতীয় প্রকার লোকের বক্ষ আল্লাহ তা'আলা দ্বীনের জন্য উন্মুক্ত করে দেন বিধায় তারা সামান্য ইঙ্গিত পেয়েই কঠিন কঠিন পথ অতিক্রম করতে সক্ষম হয়। তারা কোরআন পাকের এই আয়াতের অনুরূপ-

>“আগুনের ছোঁয়া না পেয়েও তার তৈল যেন জ্বলতে থাকে।”

  অর্থাৎ, সামান্য ইঙ্গিতই তাদের জন্যে যথেষ্ট হয়। আর পূর্ণরূপে বলে দেয়ার পর তাদের অবস্থা এই দাঁড়ায়--

>“আলোর উপর আলো।”  

আল্লাহ যাকে ইচ্ছা, তাঁর আলোর পথ দেখান। এরূপ লোকদের জন্যে প্রতিক্ষেত্রে কোরআন ও হাদীসের প্রয়োজন নেই। তারা তওবার আবশ্যকতা জানতে চাইলে প্রথমে অন্তশ্চক্ষুর আলোকে তওবা কি তা দেখে, অতঃপর আবশ্যকতার অর্থ বুঝে, এরপর উভয়টিকে মিলিয়ে জেনে নেয় যে, তওবার প্রয়োজনীয়তা প্রমাণিত। 


উদাহরণতঃ তারা প্রথমে জানে যে, ওয়াজিব ও জরুরী তাই, যা চিরন্তন সৌভাগ্য পর্যন্ত পৌঁছা এবং চিরন্তন ধ্বংস থেকে আত্মরক্ষার জন্যে জরুরী। 

এরপর তারা বুঝে যে, কিয়ামতে আল্লাহর দীদার ব্যতীত কোন সৌভাগ্য নেই। যে এ থেকে বঞ্চিত হয়, সে হতভাগ্য। এতটুকু জানার পর তাদের কোন সন্দেহ থাকে না যে, আল্লাহর নৈকট্য লাভ করার জন্যে সেই পথ থেকে ফিরে আসতে হবে, যে পথ আল্লাহ থেকে দূরে নিয়ে যায়। 

বলা বাহুল্য, এই পথ থেকে ফিরে আসা তিনটি বিষয় দ্বারা অর্জিত হবে— জ্ঞান, অনুশোচনা ও সংকল্প। 

কেননা, যে পর্যন্ত এ বিষয়ের জ্ঞান না হবে যে, গোনাহ আল্লাহ থেকে দূরে সরে পড়ার কারণ, সে পর্যন্ত অনুশোচনা হবে না। আর অনুশোচনা না হওয়া পর্যন্ত ফিরে আসার প্রশ্নই উঠে না। 

যে ব্যক্তি ঈমানের আলোকে আলোকিত, তার তওবা এভাবেই হয়। কিন্তু যে ব্যক্তি এই স্তরে উন্নীত নয়, তার জন্য তাকলীদ ও অনুসরণের যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। সে অনুসরণের মাধ্যমে ধ্বংসের কবল থেকে আত্মরক্ষা - করতে পারে। এখন এই তওবা সম্পর্কে আল্লাহ পাক, রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী  ওয়া সাল্লাম) ও পূর্ববর্তী মনীষীগণের উক্তি প্রণিধানযোগ্য। 



পরবর্তী পর্ব

তওবা সম্পর্কে উক্তি সমূহ

তওবা - (পর্ব - ২) তওবার স্বরূপ




তওবা - (পর্ব - ২) 
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

তওবার স্বরূপ—
জানা উচিত যে, তিনটি ধারাবাহিক বিষয়ের সমন্বয়ে তওবা অস্তিত্ব লাভ করে। এক- জ্ঞান, দুই- অনুশোচনা এবং তিন- বর্তমানে ও ভবিষ্যতে গোনাহ বর্জন করা এবং অতীত দিনসমূহের ক্ষতিপূরণ করে নেয়া। এই তিন বিষয়ের সমষ্টিকে পরিভাষায় তওবা বলা হয়। 

প্রায়শ কেবল অনুশোচনাকেই তওবা বলা হয়। আর জ্ঞানকে তার ভূমিকা এবং গোনাহ বর্জনকে ফলাফল আখ্যা দেয়া হয়। এদিক দিয়েই রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি  ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করেন - 

“অনুশোচনা হচ্ছে তওবা”। কেননা, অনুশোচনার অবশ্যই কোন কারণ থাকবে এবং পরবর্তীতে এর কিছু ফলাফলও প্রকাশ পাবে। সুতরাং অনুশোচনা যা মধ্যবর্তী বিষয় ছিল, তাই আপন কারণ ও ঘটনার স্থলাভিষিক্ত হয়ে গেল। 

এদিক দিয়েই জনৈক বুযুর্গ তওবার সংজ্ঞায় বলেন : তওবা হচ্ছে সাবেক গোনাহের জন্যে অনুশোচনার অনলে অন্তরের বিগলিত হওয়া এ সংজ্ঞায় কেবল মর্মবেদনার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। 

কেউ কেউ এই মর্মবেদনার পরিষ্কার উল্লেখ করে বলেছেন যে, তওবা একটি অগ্নি, যা অন্তরে প্রজ্বলিত হয় এবং একটি বেদনা, যা অন্তর থেকে বিচ্ছিন্ন হয় না। 

কেউ কেউ গোনাহ বর্জনের দিকে লক্ষ্য করে বলেছেন, তওবা হচ্ছে অনাচারের পোশাক খুলে ফেলে সরলতা ও হৃদ্যতার শয্যা পাতা। 

সহল ইবনে আবদুল্লাহ তস্তরী (রঃ) বলেন নিন্দনীয় কর্মকাণ্ডকে প্রশংসনীয় কর্মকাণ্ডে বদলে দেয়ার নাম তওবা। এটা নির্জনবাস, মৌনতা ও হালাল ভক্ষণ ছাড়া সহজলভ্য নয়। সম্ভবত এ সংজ্ঞায় তৃতীয় বিষয়ের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। তওবার প্রথম বিষয় জ্ঞানের উদ্দেশ্য হচ্ছে একথা জানা যে, গোনাহের ক্ষতি অসামান্য এবং অনেক গোনাহ মানুষ ও তার প্রেমাস্পদ আল্লাহর মধ্যে আড়াল হয়ে যায়। বলা বাহুল্য, এই জ্ঞানের ফল স্বরূপ অন্তরে অনুশোচনার উৎপত্তি হয়। 

তওবার সংজ্ঞা প্রসঙ্গে আরও অনেক উক্তি বর্ণিত আছে। আমাদের বর্ণিত উপরোক্ত তিনটি বিষয় সম্যক জেনে নেয়ার পর এটা কঠিন হবে না যে, অন্যরা তওবার সংজ্ঞা প্রসঙ্গে যা কিছু বলেছে, তার কোনটিতেই উপরোক্ত তিনটি বিষয় এক সাথে পাওয়া যায় না। অথচ তওবার বাস্তব স্বরূপ জানাই উদ্দেশ্য- শব্দ নয়।


পরবর্তী পর্ব

তওবার ফযীলত ও আবশ্যকতা


তওবা (পর্ব- ১) আধ্যাত্ম পথের সূচনা



তওবা (পর্ব- ১)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

আধ্যাত্ম পথের সূচনা
প্রকাশ থাকে যে, গোনাহ থেকে তওবা করে আল্লাহ তা'আলার দিকে প্রত্যাবর্তন হচ্ছে আধ্যাত্ম পথের সূচনা এবং ওলীগণের অমূল্য সম্পদ। সাধকগণ প্রথমে এ পথেই পা বাড়ান। যারা সত্য পথ থেকে বিচ্যুত, তাদের জন্যে এ প্রত্যাবর্তনই হচ্ছে সৎপথে অটল থাকার চাবিকাঠি। নৈকট্যশীলদের জন্যে এটাই আল্লাহর মনোনয়ন লাভের দিকচক্রবাল। পরগম্বরগণের জন্যে বিশেষত আমাদের আদি পিতা আদম (আঃ)-এর জন্যে এটাই সৌভাগ্য লাভের উৎস। মানুষ আদম সন্তান বিধায় তার তরফ থেকে গোনাহ হয়ে যাওয়া অসম্ভব নয়। কিন্তু যদি পিতা ক্ষতিপূরণ করে থাকে এবং দোষ সংশোধনে আত্মনিয়োগ করে থাকে, তবে পুত্রেরও উচিত উভয় বিষয়ে পিতার অনুরূপ হওয়া। এখন হযরত আদম (আঃ) এর অবস্থার প্রতি লক্ষ্য করলে জানা যায়, তিনি (ভুল বসত) আল্লাহ তা'আলার নাফরমানীর পর অনুশোচনার দাবানলে দগ্ধীভূত হয়েছেন এবং সুদীর্ঘকাল পর্যন্ত লজ্জাশ্রু প্রবাহিত করেছেন। এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, যদি কোন ব্যক্তি কেবল নাফরমানী করার ব্যাপারে তাঁকে আপন পথপ্রদর্শক ও অনুসৃত মনে করে এবং তওবার ধারে কাছেও না যায়, তবে সে নিতান্তই ভ্রান্ত ও পথভ্রষ্ট। বরং মূল কথা হচ্ছে কেবল কল্যাণকর্মে আত্মনিবেদিত হওয়া নৈকট্যশীল ফেরেশতাগণের বৈশিষ্ট্য আর শুধু অকল্যাণের দাস হয়ে থাকা শয়তানের স্বভাব। বস্তুত অকল্যাণে জড়িয়ে পড়ার পর কল্যাণের দিকে ফিরে আসা মানুষের ধর্ম। কারণ, মানুষের মজ্জায় কল্যাণ ও অকল্যাণ উভয় বিষয়ের সংমিশ্রণ রয়েছে। যে ব্যক্তি কল্যাণের দিকে ফিরে এসে অকল্যাণের ক্ষতিপূরণ করে নেয়, বাস্তবে সে-ই মানুষ। যদি সে গোনাহ করার পর তওবা করে, তবে তার আদম সন্তান হওয়ার প্রমাণ শক্তিশালী হয়। পক্ষান্তরে যদি সে গোনাহ ও নাফরমানীর উপর অটল থাকে, তবে সে শয়তানের সাথে আপন বংশগত সম্পর্ক স্থাপনে সচেষ্ট হয়। 

আর শুধু সৎকর্ম সম্পাদনের মাধ্যমে ফেরেশতার সাথে সম্পর্কযুক্ত হওয়া মানুষের জন্যে সম্ভবপর নয়। কেননা, তার খমীর তথা মৌলিক উপাদানের মধ্যে পাপ-পুণ্য এমন শক্তভাবে মিশ্রিত রয়েছে যে, তার আলাদা হওয়া দু'উপায়েই সম্ভবপর। অনুতাপের উত্তাপ দ্বারা অথবা দোযখের আগুন দ্বারা। 

বলা বাহুল্য, দোযখের আগুন সহ্য করার তুলনায় দুনিয়াতে অনুতাপের অনলে দগ্ধ হওয়া মানুষের জন্যে সহজতর। সুতরাং গোনাহ করার পর মানুষের উচিত দ্রুত তওবার দ্বারস্থ হওয়া। নতুবা মৃত্যুর পর এ সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যাবে। শরীয়তে তওবার এই গুরুত্বের পরিপ্রেক্ষিতে এর স্বরূপ, সময়কাল, শর্ত, কারণ, লক্ষণ, ফলাফল, বাধাবিপত্তি ইত্যাদি বিষয়ে সবিস্তারে আলোচনা করা জরুরী। নিম্নে চারটি পরিচ্ছেদে এ বিষয়গুলো বর্ণনা করা হবে ।




পরবর্তী পর্ব

তওবার স্বরূপ 

মঙ্গলবার, ২৫ জুলাই, ২০২৩

(অহংকার ও আত্মপ্রীতি পর্ব- ১২) আত্মপ্রসাদের প্রতিকার



অহংকার ও আত্মপ্রীতি (পর্ব- ১২)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏼ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

আত্মপ্রসাদের প্রতিকার 
জানা উচিত যে, প্রত্যেক রোগের প্রতিকার হবে তার কারণের বিপরীত কারণকে সম্মুখে আনা। আত্মপ্রসাদের কারণ যেহেতু অজ্ঞতা, তাই তার প্রতিকার হবে সেই জ্ঞান, যা অজ্ঞতার বিপরীত। অজ্ঞতাবশত যে সকল বিষয় নিয়ে মানুষ আত্মপ্রসাদে লিপ্ত হয়, সেগুলো মোটামুটি আট প্রকার।


(১) রূপ, সৌন্দর্য, স্বাস্থ্য, অঙ্গসৌষ্ঠব ইত্যাদি নিয়ে আত্মপ্রসাদ অনুভব করা। এর চিকিৎসা তাই, যা আমরা রূপলাবণ্য নিয়ে অহংকার করার বেলায় উল্লেখ করেছি। অর্থাৎ, নিজের আদি-অন্ত অপবিত্রতার কথা চিন্তা করবে এবং অনুধাবন করবে যে, এর আগে কত অপরূপ সৌন্দর্যশালীরা মাটিতে মিশে গেছে এবং কবরে তাদের দেহ কেমন দুর্গন্ধযুক্ত হয়ে গেছে।


(২) শক্তিসামর্থ্য নিয়ে আত্মপ্রসাদ অনুভব করা; যেমন কোরআনে উল্লিখিত আদ সম্প্রদায়ের লোকেরা বলেছিল,

>আমাদের চেয়ে অধিক শক্তিধর আর কে?’ এর চিকিৎসা এ কথা হৃদয়ঙ্গম করা যে, একদিনের জ্বরে শক্তিশালী মানুষ নিঃশক্তি হয়ে যায়।


(৩) আপন বুদ্ধিমত্তা ও দূরদর্শিতা নিয়ে আত্মপ্রসাদ অনুভব করা। এর ফলে মানুষ নিজের মতামতকে বহাল রাখতে আপ্রাণ চেষ্টা করে এবং যে তার বিরুদ্ধে বলে, তাকে মূর্খ জ্ঞান করে। এর চিকিৎসা হল, স্রষ্টার পক্ষ থেকে যে বুদ্ধিমত্তা দান করা হয়েছে, তজ্জন্যে তাঁর শোকর করবে এবং চিন্তা করবে যে, তার মস্তিষ্কে সামান্য রোগ দেখা দিলে এমন পাগল হয়ে যেতে পারে, যার পেছনে বালকেরা হাসি-তামাশা করবে। এছাড়া নিজের বুদ্ধিমত্তা ও জ্ঞান-গরিমাকে কম মনে করবে। মনে রাখবে, যার বুদ্ধিমত্তায় ত্রুটি থাকে, সে নিজে কখনও সেই ত্রুটি জানতে পারে না।


(৪) বংশমর্যাদা নিয়ে আত্মপ্রসাদ অনুভব করা। যেমন কতক সৈয়দ বংশীয় ব্যক্তি আত্মপ্রসাদবশত মনে করে, বংশ-গরিমা এবং পূর্বপুরুষদের দৌলতে তাদের মাগফেরাত হয়ে যাবে। আবার কেউ কেউ মনে করে, সকল মানুষ তাদের বাঁদী-গোলাম। এর চিকিৎসা একথা চিন্তা করা যে, আমি কর্ম ও চরিত্রে বংশের কৃতী পুরুষদের বিরুদ্ধাচরণ করেছি। এ সত্ত্বেও ধারণা করি যে, তাদের স্তরে পৌঁছে গেছি। এটা নিছক মূৰ্খতা। আমার গুরুজনদের মধ্যে তো আত্মপ্রসাদ ছিল না; বরং তারা নিজেদেরকে তুচ্ছ এবং সকল মানুষকে বড় মনে করতেন।

আল্লাহর আনুগত্য ও উত্তম অভ্যাস দ্বারাই তো তারা গৌরব অর্জন করেছিলেন- বংশমর্যাদা দ্বারা নয়। অতএব, আমাকেও সেই গৌরব অর্জন করতে হবে। গৌরব খোদাভীতি দ্বারা অর্জিত হয়। বংশমর্যাদা দ্বারা নয়। যেমন আল্লাহ্ তা'আলা বলেন :

>”তোমাদের মধ্যে সেই আল্লাহর কাছে অধিক সম্মানী, যে অধিক খোদাভীরু।”

এ আয়াতের শানে নুযূল এই যে, মক্কা বিজয়ের দিন হযরত বেলাল (রাঃ) আযান দিলে হারেছ ইবনে হেশাম, সোহায়ল ইবনে উমর ও খালেদ ইবনে উসায়দ সবিস্ময়ে বলল : এই কাফ্রী ক্রীতদাস আযান দেয় ! কোরআন পাকে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি নিকট-আত্মীয়দেরকে সতর্ক করার আদেশ অবতীর্ণ হলে তিনি একজন একজন করে সকলকে নাম ধরে ডাকলেন। এমনকি বললেন : হে মোহাম্মদ তনয়া ফাতেমা এবং সফিয়্যা বিনতে আবদুল মুত্তালিব, তোমরা নিজের জন্যে নিজেই আমল কর। এটা মনে করো না যে, আমি তোমাদেরকে রক্ষা করতে পারব। যে ব্যক্তি এসব বিষয় অনুধাবন করবে, সে কখনও বংশমর্যাদার অহমিকায় লিপ্ত হবে না।


(৫) যালেম রাজা-বাদশাহের বংশধর প্রকাশ করে আত্মপ্রসাদ অনুভব করা। এটাও চরম মূর্খতা এবং এর চিকিৎসা এই যে, সেই রাজা-বাদশাহদের যুলুম ও অত্যাচারের কথা চিন্তা করবে এবং এর কারণে তারা যে আল্লাহর গযবে পতিত হয়ে দোযখের ইন্ধন হয়ে গেছে একথাও চিন্তা করবে। কিয়ামতে তাদের দুরবস্থার একটি চিত্রও কল্পনা করবে যে, তারা যে সব লোকের উপর যুলুম করেছিল, তারা তাদেরকে জড়িয়ে ধরবে এবং মাথার চুল ধরে উপুড় করে টেনে জাহান্নামে নিয়ে যাবে। এটা কল্পনা করলে নিজেই আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইবে এবং বলবে- শূকর ও কুকুরের সাথে আত্মীয়তা ভাল- এদের সাথে নয়।

মোটকথা, যালেম রাজা-বাদশাহদের বংশধরকে যদি আল্লাহ যুলুম থেকে বাঁচিয়ে রাখেন, তবে তারা তজ্জন্যে শোকর করবে। তাদের পিতৃপুরুষ মুসলমান হলে তাদের জন্যে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবে।


(৬) অধিক সন্তান-সন্ততি, চাকর-নওকর ও বন্ধু-বান্ধব নিয়ে আত্মপ্রসাদ অনুভব করা; যেমন হুনায়ন যুদ্ধে মুসলমানরা নিজেদের সংখ্যাধিক্যের কারণে বলেছিল, আজ আমরা পরাজিত হব না। এর প্রতিকার এটা ধ্যান করা যে, সকলেই আল্লাহর অক্ষম বান্দা। কেউ নিজের লাভ-লোকসানের মালিক নয়। আল্লাহ বলেন : “অনেক ক্ষুদ্র দল আল্লাহর আদেশে বৃহৎ দলের উপর বিজয়ী হয়েছে।”


(৭) ধন-সম্পদ নিয়ে আত্মপ্রসাদ অনুভব করা। যেমন, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) একবার দেখলেন, জনৈক ধনী ব্যক্তির কাছে এক ফকীর এসে বসতেই সে তার কাপড় টেনে সংকুচিত হয়ে বসল। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) ধনী ব্যক্তিকে বললেন : তুমি কি আশংকা কর যে, তার দরিদ্রতা তোমার মধ্যে সংক্রমিত হয়ে যাবে? বলা বাহুল্য, এটা ছিল ধনের আত্মপ্রসাদ। এর চিকিৎসা এই যে, ধন-সম্পদের বিপদাপদ, এতে অপরের হকের আধিক্য, ফকীরদের ফযীলত এবং জান্নাতে তাদের অগ্রগামিতার কথা চিন্তা করবে। আরও চিন্তা করবে যে, ধন-দৌলত সকালে আসে, বিকালে চলে যায়। এর কোন মৌলিকতা নেই। অনেক কাফেরও অগাধ ধন-সম্পদের মালিক।


(৮) আপন ভ্রান্ত মত নিয়ে আত্মপ্রসাদ অনুভব করা। এরূপ ব্যক্তি সম্পর্কেই আল্লাহ তা'আলা বলেন :

>”যার জন্যে তার কুকর্মকে সুসজ্জিত করা হয়। অতঃপর সে তাকে সৎকর্ম দেখে।”

অন্য আয়াতে বলা হয়েছে :

>”তারা ধারণা করে যে, তারা খুব সৎকর্ম করছে।” 


রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) এরশাদ করেন- 

>”ভ্রান্ত মত নিয়ে আত্মপ্রসাদ এ উম্মতের শেষ যুগে হবে।” 

এ সর্বনাশা বদ অভ্যাসের কারণে পূর্ববর্তী উম্মতরা ধ্বংস হয়ে গেছে। কারণ, এর কারণেই ভিন্ন ভিন্ন মত ও পথের সৃষ্টি হয়েছে। প্রত্যেকেরই বিশ্বাস যে, সেই খুব জ্ঞানী। অতঃপর সে তার মত ও পথ নিয়েই খুশী থাকে। দুনিয়াতে অনেক বেদআতী ও পথভ্রষ্ট ব্যক্তি আপন আপন বেদআত ও পথভ্রষ্টতাকে শক্তভাবে আঁকড়ে থাকে। এর কারণ এটাই যে, তারা আপন ভ্রান্ত মত নিয়ে আত্মপ্রসাদে লিপ্ত।


বেদআত নিয়ে আত্মপ্রসাদ অর্থ এই, যে বিষয়ের প্রতি খাহেশ ও মন ধাবিত হয়, তাকে ভাল ও সত্য বলে ধারণা করা। এ প্রকার আত্মপ্রসাদের চিকিৎসা তুলনামূলকভাবে কঠিন। কেননা, যার মতামত ভ্রান্ত, সে তার ভ্রান্তি সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ থাকে। সুতরাং যাকে রোগই মনে করে না, তার চিকিৎসা কিরূপে করবে? কিন্তু যারা সাধক ও বিভুজ্ঞানী তারা মূর্খতা সম্পর্কে অবগত করতে পারে এবং তা দূর করতে পারে। যদি সে মূর্খতা নিয়েও আত্মপ্রসাদে মগ্ন থাকে, তবে সাধকের কথায়ও কর্ণপাত করবে না; বরং সাধককেও দোষী মনে করবে। এমতাবস্থায় তার চিকিৎসা কিরূপে হবে? তবে একটি মোটামুটি চিকিৎসা আছে। তা এই যে, প্রত্যেকেই আপন মতকে অভ্রান্ত মনে করবে না; বরং বিশ্বাস করবে যে, তার মতও ভ্রান্ত হতে পারে। এ ছাড়া বিরোধপূর্ণ মাযহাবসমূহ নিয়ে মাথা ঘামাবে না; বরং বিশ্বাস করবে যে, আল্লাহ এক। তাঁর কোন শরীক নেই। তিনি দেখেন ও শুনেন। তাঁর রসূল সত্য। যা কিছু তিনি নিয়ে এসেছেন, তা সত্য ৷ আল্লাহ আমাদের সকলকে যাবতীয় পথভ্রষ্টতা থেকে রক্ষা করুন।

(সমাপ্ত)

[আমিন ! ইয়া রব্বে মোস্তফা সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম]


প্রথম পর্ব

অহংকার ও আত্মপ্রীতি মারাত্মক ব্যাধি


অহংকার ও আত্মপ্রীতি (পর্ব- ১১) আত্মপ্রসাদের সংজ্ঞা ও স্বরূপ



অহংকার ও আত্মপ্রীতি (পর্ব- ১১)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏼ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

আত্মপ্রসাদের সংজ্ঞা ও স্বরূপ--

প্রকাশ থাকে যে, কোন না কোন পূর্ণতার গুণের মধ্যেই আত্মপ্রসাদ হয়ে থাকে। যে ব্যক্তি নিজের মধ্যে কোন পূর্ণতার গুণ আছে বলে বিশ্বাস করে, তার অবস্থা ত্রিবিধ হতে পারে। এক, সেই পূর্ণতার গুণটি বিলুপ্ত হওয়ার অথবা বিকৃত হওয়ার ভয় লেগে থাকবে। এরূপ হলে তা আত্মপ্রসাদ হবে না। দুই, বিলুপ্ত হওয়ার ভয়ে ভীত থাকবে না; কিন্তু সেটিকে আল্লাহর পক্ষ থেকে নেয়ামত বলে বিশ্বাস করবে। এরূপ হলেও তাকে আত্মপ্রসাদ বলা হবে না। তিন, বিলুপ্ত হওয়ারও ভয় থাকবে না এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে নেয়ামত বলেও বিশ্বাস করবে না; বরং সেটিকে নিজস্ব কৃতিত্ব ও গুণ মনে করেই আনন্দিত হবে । একেই বলা হবে আত্মপ্রসাদ। 

অতএব, আত্মপ্রসাদের সংজ্ঞা এই দাঁড়াল যে, কোন পূর্ণতার গুণকে বড় মনে করে প্রসন্ন হওয়া এবং সেটি যে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে একটি দান, একথা বেমালুম ভুলে যাওয়া। এর সাথে যদি আল্লাহর উপর প্রতিদান দেয়া হক হয়ে গেছে বলে মনে দৃঢ় বিশ্বাস পোষণ করে, তবে তাকে বলা হবে গর্ব, যা আত্মপ্রসাদের উপরের স্তর। দুনিয়াতেও এমনটি হয় যে, এক ব্যক্তি কাউকে কোন কিছু দিয়ে সেটাকে বড় কাজ মনে করে। এতটুকুতে কেবল আত্মপ্রসাদ হয়। কিন্তু যদি সে এই দেয়ার বদলে তার কাছে কোন খেদমত আশা করে, তবে একে বলা হয় গর্ব। আল্লাহ বলেন : >“কারও প্রতি বেশী পাওয়ার আশায় অনুগ্রহ করো না”।


এই আয়াতের তাফসীরে হযরত কাতাদাহ (রাঃ) বলেন : আপন কর্ম দ্বারা গর্ব করো না। হাদীসে আছে–

>”গর্বকারীর নামায তার মাথা অতিক্রম করে না; অর্থাৎ আল্লাহর কাছে পৌঁছে না।”


মোটকথা, যে গর্ব করে, সে আত্মপ্রদাসও অনুভব করে। কিন্তু যে আত্মপ্রসাদ অনুভব করে, তার জন্যে গর্ব করা জরুরী নয়। কেননা, আত্মপ্রসাদ হয় কেবল নেয়ামতকে বড় জানা এবং নেয়ামতদাতাকে ভুলে যাওয়া দ্বারা। এতে প্রতিদান আশা করার শর্ত নেই। অপরপক্ষে প্রতিদান আশা করা ছাড়া গর্ব হয় না। সুতরাং কেউ যদি কবুল হওয়ার আশায় দোয়া করে, অতঃপর কবুল না হওয়াকে মনে মনে খারাপ বিশ্বাস করে, তবে সে গর্বকারীদের অন্তর্ভুক্ত হবে।



আত্মপ্রসাদের প্রতিকার

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...