রবিবার, ১৭ ডিসেম্বর, ২০২৩

হকদারের হক (৭) সংসর্গ ও বন্ধুত্বের কর্তব্য


হকদারের হক পর্ব- ৭
📚সৌভাগ্যের পরশমণি   ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

সংসর্গ ও বন্ধুত্বের কর্তব্য
বিবাহ বন্ধনে যেমন স্ত্রী ও পুরুষের উপর পরস্পর কতকগুলি কর্তব্য আরোপিত হয়, তদ্রূপ ভ্রাতৃত্ব এবং সংসর্গের বন্ধন প্রতিষ্ঠিত হইলেও ভ্রাতৃত্বের উপর কতগুলি কর্তব্য আরোপিত হইয়া থাকে। রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : দুই ভাইয়ের উদাহরণ এইরূপ দুই হাতের ন্যায় যাহার একটি অপরটিকে ধৌত করিয়া দেয়।
সংসর্গ ও বন্ধুত্বের কর্তব্য দশ শ্রেণীতে বিভক্ত
(১) সংসর্গ ও বন্ধুত্বের প্রথম কর্তব্য হল- ধন-সম্পদের মধ্যে। যাঁহারা ভাই-বন্ধুর হককে অগ্রগণ্য বলিয়া মনে করেন, এমনকি নিজের অংশও তাহাদিগকে প্রদান করেন তাঁহারা বন্ধুত্বের কর্তব্য আদায়ে সর্বোচ্চ শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। যেমন মদীনার আনসারগণ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ্ তা’আলা বলেন “এবং তাহারা নিজেদের অপেক্ষা (মুহাজিরগণকে) অগ্রবর্তী রাখে যদিও নিজেরা ক্ষুধার্তই থাকুক না কেন”।
যাহারা ভাই-বন্ধুকে নিজতুল্য মনে করে এবং স্বীয় ধনকে নিজের ও তাহাদের সকলের ধন বলিয়া মনে করে তাহারা বন্ধুত্বের কর্তব্য সম্পাদনে দ্বিতীয় শ্রেণীর অন্তর্গত। যাহারা ভাই-বন্ধুকে গোলাম ও খাদিমের ন্যায় মনে করে এবং নিজের প্রয়োজনের অতিরিক্ত বস্তু তাহাদিগকে অযাচিতভাবে দান করে, তাহারা সর্বনিম্ন শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। ভাই-বন্ধুগণকে যদি এইরূপ বস্তুই তোমার নিকট হইতে চাহিয়া লইতে হয় তবে তুমি তাহাদের বন্ধু শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত রহিলে না। কারণ এমতাবস্থায় তোমার অন্তরে বন্ধুর দুঃখ-কষ্টের প্রতি সমবেদনা মোটেই নাই; এই বন্ধুত্ব আন্তরিক নহে, ইহা অভ্যাসজনিত সংসর্গ এবং ইহার কোনই মূল্য নাই।
হযরত উতবাতুল গোলাম (রাঃ)-এর এক বন্ধু ছিলেন। বন্ধু তাঁহাকে একদিন বলিলেন : আমার চারি হাজার দিরহামের প্রয়োজন। তিনি বলিলেন : আইস, দুই ៖ হাজার দিরহার গ্রহণ কর। বন্ধু অন্যদিকে মুখ ফিরাইয়া বলিলেনঃ তোমার লজ্জা হয় না? আল্লাহর ওয়াস্তে বন্ধুত্বের দাবী করিতেছ, অথচ পার্থিব ধন-সম্পদকে উহার উপর প্রাধান্য দিতেছ।
এক বাদশাহের নিকট লোকে কতিপয় সূফী ব্যক্তির পরোক্ষ নিন্দা করিল। ফলে এই সমস্ত সূফী ব্যক্তিকে হত্যা করার নির্দেশ হইল। হযরত আবুল হাসান নূরী (রহঃ)-ও তাঁহাদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তিনি অগ্রসর হইয়া বলিলেন : সর্বাগ্রে আমাকে হত্যা করুন। বাদশাহ জিজ্ঞাসা করিলেন : আপনি সর্বাগ্রে অগ্রসর হইলেন কেন? তিনি বলিলেন : এ সমস্ত সূফী আমার ভাই-বন্ধু। আমার ইচ্ছা, অন্ততঃ এক মুহূর্তকাল পূর্বে নিজের জীবনের বিনিময়ে মুহূর্তের জন্য তাঁহাদের জীবন রক্ষা করি। বাদশাহ বলিলেন : সুবহানাল্লাহ্! যাঁহারা এরূপ মনুষ্যত্বের অধিকারী তাঁহাদিগকে হত্যা করা দুরস্ত নহে। ইহা বলিয়া তিনি সকলকে মুক্তি দিলেন।
হযরত ফতেহ মুসেলী (রহঃ) একদা এক বন্ধুর গৃহে গিয়া দেখিলেন বন্ধু ঘরে নাই। তাঁহার পরিচারিকাকে বলিলেন : তোমার প্রভুর ক্যাশ বাক্সটি আন। পরিচারিকা ইহা উপস্থিত করিলে তিনি আবশ্যক পরিমাণে টাকা-পয়সা উহা হইতে চাহিয়া লইয়া গেলেন । গৃহে ফিরিয়া এই সংবাদ শ্রবণে প্রভু এত আনন্দিত হইলেন যে, তৎক্ষণাৎ সে দাসীকে আযাদ করিয়া দিলেন।
এক ব্যক্তি হযরত আবূ হুরাইয়া (রাঃ)-এর নিকট গিয়া বলিতে লাগিল : আমি আপনার সহিত বন্ধুত্ব ও ভ্রাতৃত্ব স্থাপন করিতে ইচ্ছা করি। তিনি বলিলেন : ভ্রাতৃত্বের কর্তব্য আপনার জানা আছে কি? আগন্তুক বলিলঃ না। তিনি বলিলেন : ভ্রাতৃত্বের হকসমূহের মধ্যে একটি হক এই যে, তোমার স্বর্ণ-রৌপ্যের উপর তুমি আমা অপেক্ষা বেশী হকদার হইবে না। আগন্তুক বলিলঃ আমি এখনও এই স্তরে উপনীত হই নাই। তিনি বলিলেন : ব্যাস্ তবে সরিয়া পড়। এ কার্য তোমার দ্বারা হইতে পারে না।
হযরত ইব্ন উমর (রাঃ) বলেন : এক সাহাবীর নিকট এক ব্যক্তি ভাজা করা গোশ্ত প্রেরণ করিল। তিনি বলিলেনঃ আমার অমুক বন্ধু খুব অভাবগ্রস্ত। তাহাকে দেওয়া উত্তম এবং (এই বলিয়া) গোশ্তগুলি তাঁহার নিকট পাঠাইয়া দিলেন। তথায় পৌছিলে তিনি তদ্রূপ উহা তাঁহার অপর এক বন্ধুর নিকট পাঠাইয়া দিলেন। তিনি আবার তাঁহার অন্য বন্ধুর নিকট পাঠাইয়া দিলেন। মোটকথা, এইরূপে ঘুরিতে ঘুরিতে গোশ্ত আবার প্রথম বন্ধুর নিকট আসিয়া উপস্থিত হইল।
হযরত মাসরূক (রঃ) ও হযরত খুসাইমা (রঃ)-এর মধ্যে বন্ধুত্ব ছিল। তাঁহারা উভয়েই ঋণগ্রস্থ ছিলেন। তাঁহারা একে অন্যের ঋণ গোপনভাবে পরিশোধ করিলেন যে, কোন বন্ধুই তাহা জানিতে পারেন নাই।
হযরত আলী (রাঃ) বলেন : কোন গরীবকে একশত দিরহাম দান করা অপেক্ষা কোন বন্ধুর জন্য বিশ দিরহাম ব্যয় করাকে আমি উৎকৃষ্টতর মনে করি। রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) অরণ্য হইতে দুইটি মিসত্তয়াক কাটিয়া লইলেন। তন্মধ্যে একটি ছিল বাঁকা ও অপরটি সোজা। তাঁহার সঙ্গে এক সাহাবীকে সোজা মিসওয়াকটি দিয়া দিলেন এবং নিজে বাঁকাটি রাখিলেন। সাহাবী নিবেদন করিলেন : ইয়া রাসূলুল্লাহ্ ! এই মিসওয়াকটি ভাল। ইহা আপনার নিজের জন্য রাখুন। তিনি বলিলেন : কেহ কাহারও সহিত ক্ষণকাল সঙ্গদান করিলেও কিয়ামত দিবসে জিজ্ঞাসা করা হইবে, সাহচর্যের হক আদায় করা হইয়াছে, না নষ্ট করা হইয়াছে। রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর এই উক্তিতে এইদিকে ইঙ্গিত রহিয়াছে যে, নিজের ক্ষতি স্বীকার করিয়াও অপরের উপকার করা বন্ধুত্বের কর্তব্য। রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ পরস্পর দুই বন্ধুর মধ্যে যে ব্যক্তি অপরকে অধিক দয়া ও সাহায্য করে আল্লাহ্ তাহাকে অধিক ভালবাসেন।

(২) সংসর্গ ও বন্ধুত্বের দ্বিতীয় কর্তব্য হল- সর্বাবস্থায় অভিলাষ ও প্রার্থনা করিবার পূর্বেই সন্তুষ্ট চিত্তে বন্ধুর সাহায্য করা। প্রাচীন কালের বুযর্গগণের এইরূপ অভ্যাস ছিল যে, তাঁহারা প্রত্যহ বন্ধুগণের দ্বারে গমনপূর্বক গৃহবাসিগণকে জিজ্ঞাসা করিতেন : আপনারা কি করিতেছেন? লাকড়ী, আটা, তৈল, লবণ ইত্যাদি প্রয়োজনীয় জিনিস গৃহে মওজুদ আছে কিনা? তাঁহারা ভ্রাতৃ-বন্ধুগণের কার্যকে নিজেদের কার্যের ন্যায় গুরুত্বপূর্ণ ও আবশ্যক বলিয়া মনে করিতেন এবং তাহাদের কোন কার্য করিতে পারিলে অত্যন্ত আনন্দিত হইতেন।
হযরত হাসান বসরী (রহঃ) বলেনঃ ধর্ম-ভ্রাতা আমার নিকট স্ত্রী ও সন্তান-সন্তুতি অপেক্ষা অধিক প্রিয় কারণ, তাহারা ধর্ম স্মরণ করাইয়া দেয় এবং স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি দুনিয়া স্মরণ করাইয়া দেয়।
হযরত আতা (রহঃ) বলেনঃ তিন দিন পর পর স্বীয় বন্ধুগণের খোঁজ-খবর লও। বন্ধু পীড়িত থাকিলে সেবা কর। কোন কার্যে লিপ্ত থাকিলে সাহায্য কর এবং আল্লাহর যিকির হইতে অসতর্ক থাকিলে স্মরণ করাইয়া দাও।
হযরত জাফর ইবন মুহাম্মদ (রঃ) বলেন : শত্রু আমা হইতে নির্লিপ্ত না হওয়া পর্যন্ত আমি তাহার অভাব মোচনে অতি তাড়াতাড়ি করিয়া থাকি। এমতাবস্থায় বন্ধুদের জন্য আমার কি করা উচিত!
প্রাচীনকালের জনৈক বুযর্গ স্বীয় বন্ধুর মৃত্যুর পর চল্লিশ বৎসর পর্যন্ত তাঁহার পরিবারবর্গের সেবা করিয়া বন্ধুত্বের কর্তব্য পালন করিয়াছিলেন।
(৩) সংসর্গ ও বন্ধুত্বের তৃতীয় কর্তব্য হল ভাই-বন্ধুগণের সহিত প্রিয়বাক্য বলা এবং তাহাদের দোষ-ত্রুটি গোপন করা: - বন্ধুর পশ্চাতে কেহ তাহাকে অন্যায় বলিলে ইহার যথাযথ উত্তর দিবে এবং মনে করিবে, বন্ধু অন্তরালে থাকিয়া সব শুনিতেছে। বন্ধু সর্বদা তোমার পশ্চাতে থাকুক, ইহা তুমি যেমন কামনা কর, তুমিও তদ্রূপ তাহার পশ্চাতে থাকিবে। চালাকি করিবে না। বন্ধু কিছু বলিলে তাহা মানিয়া লইবে, কোনরূপ প্রতিবাদ করিবে না। তাহার গোপন কথা কাহারও নিকট প্রকাশ করিবে না। এমনকি বন্ধুত্ব ভঙ্গ হইয়া গেলেও প্রকাশ করিবে না। বন্ধুর গোপন কথা প্রকাশ করিয়া দেওয়া মন্দ স্বভাবের পরিচায়ক। তাহার স্ত্রী, সন্তানাদি ও বন্ধু-বান্ধবের নিন্দা করিবে না। কেহ তাহার দোষ-ত্রুটি উল্লেখ করিলে উহা তাহার নিকট বলিবে না। কারণ, বলিলে তুমি তাহাকে কষ্ট দিলে। কিন্তু লোক বন্ধুর প্রশংসা করিলে ইহা তাহার নিকট গোপন করিবে না। কেননা বন্ধুর প্রশংসা গোপন করা তাহার প্রতি হিংসার প্রমাণ। বন্ধু তোমার নিকট কোন অপরাধ করিয়া থাকিলে তজ্জন্য কোনরূপ অভিযোগ না করিয়া তাহাকে ক্ষমা করিয়া দিবে এবং আল্লাহর ইবাদতে স্বীয় দোষ-ত্রুটি স্মরণ করিবে। তাহা হইলে তামার নিকট কেহ অপরাধ করিলে ইহাকে বিস্ময়কর বলিয়া মনে করিবে না এবং ইহাও বুঝিবে যে, সংসারে নির্দোষ ও ত্রুটিহীন মানুষ কখনই খুঁজিয়া পাওয়া যাইবে না। একেবারে নির্দোষ ব্যক্তির সঙ্গলাভ করিতে চাহিলে মানব সমাজ ছাড়িয়া দিতে হইবে। হাদীস শরীফে আছে যে, মু'মিন ব্যক্তি সর্বদা অপরের ত্রুটির পশ্চাতে কোন উপযুক্ত ওযর (কারণ) আছে বলিয়া মনে করে। আর মুনাফিক সর্বদা অপরের দোষ-ত্রুটি অন্বেষণ করিতে থাকে।

বন্ধুর একটি উপকারের বিনিময়ে তাহার দশটি ত্রুটি গোপন করিয়া রাখা উচিত। রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : অসৎ বন্ধু হইতে (আল্লাহর সমীপে) আশ্রয় প্রার্থনা করা উচিত। কারণ, দোষ-ত্রুটি দেখিলে সে প্রকাশ করিয়া দেয় এবং কোন ভাল আচরণ দেখিলে উহা গোপন করিয়া রাখে।
(১) বন্ধুর কোন অপরাধ ক্ষমার যোগ্য হইলে তাহা ক্ষমা করিয়া দিবে এবং তাহার প্রতি ভাল ধারণা পোষণ করিবে। কারণ কাহারও প্রতি মন্দ ধারণা পোষণ করা হারাম। রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : আল্লাহ্ মু'মিনগণের চারি বস্তু অপরের উপর হারাম করিয়াছেন--ধন, প্রাণ মান-মর্যাদা ও কুধারণা পোষণ।
হযরত ঈসা (আঃ) বলেন : তোমরা সেই ব্যক্তির সম্বন্ধে কি মনে কর যে, তাহার নিদ্রিত ভ্রাতার গুপ্ত অঙ্গ হইতে কাপড় সরাইয়া তাহাকে উলঙ্গ করিতে থাকে? লোকে বলিল : ইয়া রাসূলুল্লাহ! ইহাকে কে সঙ্গত মনে করিবে? তিনি বলিলেনঃ তোমরাই বরং মনে করিয়া থাক। কারণ, তোমরা তোমাদের ভাই-বন্ধুদের ত্রুটি প্রকাশ করিয়া থাক যেন অপর লোকে উহা জানিতে পারে।
বুযর্গগণ বলেন : কাহারও সহিত তুমি বন্ধুত্ব স্থাপনের ইচ্ছা করিলে প্রথমে তাহাকে ক্রোধান্বিত করিয়া গোপনে তাহার নিকট লোক পাঠাও, যে তথায় তোমার আলোচনা করিবে। ইহাতে ঐ ব্যক্তি যদি তোমাদের কোন গোপন কথা প্রকাশ করে তবে বুঝিবে সে বন্ধুত্ব স্থাপনের উপযোগী নহে। বুযর্গগণ আরও বলেন : যে ব্যক্তি আল্লাহর ন্যায় তোমার গোপন কথা জানিয়াও অপরের নিকট প্রকাশ করে না, তাহার সহিত বন্ধুত্ব স্থাপন কর। এক ব্যক্তি তাহার এক বন্ধুর নিকট নিজের কোন গুপ্ত বিষয় ব্যক্ত করতঃ তাহাকে জিজ্ঞাসা করিল : আমি যাহা বলিলাম তাহা তোমার স্মরণ আছে কি? সে ব্যক্তি বলিলঃ না, ভুলিয়া গিয়াছি।
বুযুর্গগণ বলেন : যে ব্যক্তি চারি অবস্থায় তোমার বন্ধুত্ব ভুলিয়া যায় সে বন্ধুত্বের উপযোগী নহে (১) আনন্দের সময়, (২) ক্রোধের সময়, (৩) লোভের সময় এবং (৪) প্রবৃত্তির তাড়নার সময়, এই চারি সময়ে বন্ধুত্বের কর্তব্য ভুলিয়া যাওয়া উচিত নহে।
হযরত আব্বাস (রাঃ) স্বীয় পুত্র হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ)-কে বলেন : আমীরুল মুমিনীন হযরত উমর (রাঃ) তোমাকে স্বীয় বন্ধুরূপে গ্রহণ করিয়াছেন এবং প্রবীণগণের উপর তোমাকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করিয়াছেন, সাধারণ পাঁচটি উপদেশ স্মরণ রাখিও (১) তাঁহার গোপন তথ্য কাহারও নিকট প্রকাশ করিও না, (২) তাঁহার সম্মুখে কাহারও গীবত করিও না, (৩) তাঁহার নিকট কোন মিথ্যা কথা বলিও না, (৪) তাঁহার আদেশের বিরুদ্ধাচরণ করিও না, (৫) তোমা কর্তৃক কোন বিশ্বাষঘাতকতার কার্য যেন তিনি কখনও দেখিতে না পান।
বন্ধুর সহিত তর্ক-বিতর্ক ও মতভেদ করা অপেক্ষা অপর কিছুই বন্ধুত্বের পক্ষে এত অধিক ক্ষতিজনক নহে। বন্ধুর কোন কথায় প্রতিবাদ করিলে ইহার অর্থ এই দাঁড়ায় যে, তুমি যেন তাহাকে নির্বোধ ও মুর্খ এবং নিজেকে বুদ্ধিমান ও মহাজ্ঞানী মনে করিয়া তাহার প্রতি অহংকার ও অবজ্ঞা প্রদর্শন করিতেছ। এইগুলি শত্রুতার নিদর্শন, বন্ধুত্বের পরিচায়ক নহে। রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, :
"তোমরা আপন ভ্রাতার কোন কথায় প্রতিবাদ করিও না। তাহাকে বিদ্রূপ করিও না, তাহার সহিত কোন প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করিও না।"
বুযর্গগণ বলেন : তুমি তোমার বন্ধুকে ‘চল' বলিলে সে যদি জিজ্ঞাসা করে, কত দূর এবং কোথায় যাইতে হইবে; তবে সে বন্ধুত্বের উপযোগী নহে। তাহার উচিত অন্য কিছুই না বলিয়া তোমার সঙ্গে তৎক্ষণাৎ যাত্রা করা।
হযরত আবূ সুলাইমান দারানী (রঃ) বলেনঃ আমার এক বন্ধু ছিলেন। যাহাকিছু তাঁহার নিকট চাহিতাম তাহাই তিনি দিয়া দিতেন। একবার তাঁহার নিকট বলিলাম, অমুক বস্তু আমার প্রয়োজন আছে। তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন : ‘কতটুকু প্রয়োজন?' ইহার পর আমার অন্তর হইতে তাঁহার বন্ধুত্বের আস্বাদ হ্রাস পাইতে লাগিল।
মোটকথা, বন্ধুর কথা ও কার্যের সহিত যথাসম্ভব ঐক্য ও আনুকুল্য রক্ষা করিয়া চলিতে পারিলেই বন্ধুত্ব স্থায়ী থাকে।

(৪) সংসর্গ ও বন্ধুত্বের চতুর্থ কর্তব্য হল- কথায় বন্ধুর প্রতি প্রীতি ও ভালবাসা প্রকাশ করিবে। রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন- “তোমাদের মধ্যে কেহ কাহাকে ভালবাসিলে তাহাকে উহা জানাইয়া দাও”।
তিনি এই উদ্দেশ্যে ইহা বলিয়াছেন যে, বন্ধু উহা জানিতে পারিলে তাহার হৃদয়েও ভালবাসা জন্মিবে। এমতবস্থায় বন্ধুর প্রতি ঐ ব্যক্তির ভালবাসা দ্বিগুণ বৃদ্ধি পাইবে। সকল অবস্থাতেই বন্ধুর খোঁজ-খবর লইবে, সুখ-দুঃখে তাহার অংশীদার হইবে। বন্ধুকে সম্বোধন করিতে হইলে উত্তম নামে সম্বোধন করিবে। তাহার কোন উপাধি বা পদবী থাকিলে ইহা ধরিয়া ডাকিবে। সম্ভবত : এই উপাধি তাহার খুব প্রিয় হইয়া থাকিবে।
হযরত উমর (রাঃ) বলেন : বন্ধুর বন্ধুত্ব ত্রিবিধ কারণে দৃঢ় হইয়া থাকে। (১) প্রিয় নামে সম্বোধন করিলে, (২) দর্শনমাত্র নিজে তাহাকে প্রথমে সালাম করিলে, (৩) আগে বন্ধুকে বসাইয়া পরে নিজে বসিবে। এতদ্ব্যতীত বন্ধুর অগোচরে তাহার পছন্দনীয় প্রশংসাবাদ করিবে। এইরূপে তাহার স্ত্রী, সন্তানাদি এবং তাহার আত্মীয়-স্বজনেরও প্রশংসা করিবে। এইরূপ ব্যবহার বন্ধুত্ব সুদৃঢ় হইয়া থাকে। আর বন্ধুকৃত উপকারের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করিবে।
হযরত আলী (রাঃ) বলেনঃ – যে ব্যক্তি স্বীয় বন্ধুর সদিচ্ছার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না সে সৎকার্যের কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করিবে না।
বন্ধুর অনুপস্থিতিতে তাহাকে সাহায্য করা আবশ্যক। কেহ তাহার দোষারোপ করিলে উহা খণ্ডন করা উচিত। বন্ধুকে নিজের ন্যায় মনে করিবে। তোমার সম্মুখে তোমার বন্ধুকে অপর লোকে মন্দ বলিলে যদি তুমি কিছুই না বল তবে যেন লোকে তাঁহাকে প্রহার করিতে দেখিয়া তুমি তাহাকে সাহায্য না করিয়া নীরব হইয়া রহিলে। বরং প্রহার যন্ত্রণা অপেক্ষা বাক্যাঘাত অধিক যন্ত্রণাদায়ক।
কোন জ্ঞানী ব্যক্তি বলেনঃ বন্ধুর অগোচরে আমার সম্মুখে কেহ তাহার সন্বন্ধে আলোচনা করিলে আমি মনে করি, তিনি যেন উপস্থিত থাকিয়া সমস্তই শুনিতেছেন এবং তিনি উপস্থিত থাকিলে যেরূপ উত্তর দিতাম আমি তদ্রুপ উত্তরই দিয়া থাকি।
হযরত আবু দারদা (রাঃ) একস্থানে দুইটি আবদ্ধ বলদকে শায়িত দেখিলেন। কিন্তু ইহাদের একটি যখন উঠিয়া দাঁড়াইল তখন অপরটিও উঠিয়া দাঁড়াইল। ইহাতে তিনি অভিভূত হইয়া রোদন করিতে লাগিলেন এবং বলিলেনঃ ধর্ম-ভাই-বন্ধুগণও এইরূপ হইয়া থাকে (একজন দাঁড়াইলে অপরজনও দাঁড়ায় এবং একজন চলিতে আরম্ভ করিলে অপরজনও চলে)। দাঁড়ানো ও গমনে একে অন্যের অনুবর্তী হয়।

(৫) সংসর্গ ও বন্ধুত্বের পশ্চম কর্তব্য হল- বন্ধুর প্রয়োজনীয় দীনী ইল্‌ম (ধর্ম বিদ্যা) তাহাকে শিক্ষা দেওয়া। কারণ, দুনিয়ার দুঃখ-কষ্ট হইতে রক্ষা করা অপেক্ষা তাহাকে দোযখের অগ্নি হইতে রক্ষা করা বহুগুণে শ্রেয়। ইল্‌ম শিক্ষা করিয়া তদনুযায়ী আমল না করিলে তাহাকে উপদেশ দিবে এবং আল্লাহর ভয় প্রদর্শন করিবে। কিন্তু নির্জনে উপদেশ দিবে। ইহাতে বন্ধুর প্রতি তোমার অনুগ্রহ প্রমাণিত হইবে। কারণ, লোক-সম্মুখে উপদেশ দিলে বন্ধু লজ্জা পাইবে। মিষ্ট ভাষায় উপদেশ দিবে, শক্ত কথায় নহে। রাসুলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : এক মু'মিন অপর মু'মিনের দর্পণস্বরূপ। এই হাদীসের মর্ম এই যে, স্বীয় দোষ-ত্রুটি একে অপরের নিকট হইতে জানিয়া লইবে। বন্ধু যদি অনুগ্রহপূর্বক তোমার দোষ-ত্রুটি নির্জনে তোমাকে জানাইয়া দেয় তবে এই অনুগ্রহের জন্য তাহার প্রতি তোমার কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত, অসন্তুষ্ট হওয়া কখনই সঙ্গত নহে। ইহার উদাহরণ এইরূপ-যেমন কোন ব্যক্তি তোমাকে জানাইয়া দিল যে, তোমার কাপড়ে সাপ অথবা বিচ্ছু রহিয়াছে। এমতাবস্থায় তাহার প্রতি তুমি অসন্তুষ্ট হইবে না, বরং যে উপকার সে করিয়াছে তজ্জন্য তাহার প্রতি তুমি কৃতজ্ঞ থাকিবে।
সমুদয় মন্দ স্বভাব মানুষের মধ্যে সাপ-বিচ্ছু সদৃশ। এই সমস্তের দংশন যন্ত্রণা কবরে আত্মার উপরে প্রকাশ পাইবে। উহাদের দংশন দুনিয়ার সাপ-বিচ্ছুর দংশন হইতে বহুগুণে অধিক যন্ত্রণাদায়ক হইবে। কারণ, দুনিয়ার সাপ-বিচ্ছুর দংশন দেহের উপর হইয়া থাকে । হযরত উমর (রা) বলেনঃ আল্লাহর রহমত তাহার উপর বর্ষিত হউক যিনি আমার দোষ-ত্রুটি আমার সম্মুখে উপহারস্বরূপ তুলিয়া ধরেন।
হযরত উমর (রাঃ), হযরত সালমান (রাঃ)-এর নিকট আগমন করিলেন। তিনি বলিলেন : ভাই-সালমান! সত্য সত্য বলুন, অপছন্দনীয় কোন্ কোন্ বিষয় আমার মধ্যে দেখিয়াছেন বা শুনিয়াছেন। হযরত সালমান (রাঃ) বলিলেনঃ এ বিষয়ে আমাকে ক্ষমা করুন। হযরত উমর (রাঃ) বলিলেন : আপনাকে অবশ্যই বলিতে হইবে। তিনি অত্যাধিক পীড়াপীড়ি করার পর হযরত সালমান (রাঃ) বলিলেনঃ আমি শুনিয়াছি, এক ওয়াক্তে আপনার দস্তরখানে দুই প্রকার খাদ্য আনীত হয় এবং আপনার দুইটি পিরহান আছে, একটি দিবাভাগে ও অপরটি রাত্রিকালে ব্যবহারের জন্য। হযরত উমর (রাঃ) বলিলেন : এই দুইয়ের কোনটিই সত্য নহে। আর কিছু শুনিয়াছেন কি? তিনি উত্তরে বলিলেনঃ না।
হযরত হুযাইফা মারআশী (রঃ) হযরত আসবাত (রাঃ)-কে পত্রযোগে জানাইলেন : আমি শুনিলাম, তুমি নিজের ধর্মকে দুই হাব্বার বিনিময়ে বিক্রয় করিয়া ফেলিয়াছ। অর্থাৎ তুমি বাজারে কোন বস্তু ক্রয় করিতে চাহিলে বিক্রেতা উহার মূল্য এক দাঙ্গা দাবি করিয়াছিল। কিন্তু তুমি উহা দুই হাব্বার বিনিময়ে চাহিয়াছিলে। বিক্রেতা তোমাকে চিনিত বলিয়া দুই হাব্বাতেই তোমাকে দিয়া দিল। তোমার ধার্মিকতা ও পরহিযগারীর কারণে অনুগ্রহ করতঃ অল্প মূল্যে সে জিনিসটি তোমাকে দিল। মোহের আবরণ মস্তক হইতে খুলিয়া ফেল এবং মোহ-নিদ্রা হইতে জাগ্রত হও।
যে ব্যক্তি কুরআর শরীফ পাঠ ও ধর্ম-বিদ্যা অর্জন করতঃ দুনিয়ার দিকে আকৃষ্ট হইয়া পড়ে, আমার আশংকা হয় সে আল্লাহর কালাম লইয়া উপহাস করিতেছে। উপদেশদাতার প্রতি যে ব্যক্তি কৃতজ্ঞ হয়, বুঝা যায় যে, তাহার হৃদয়ে ধর্মের প্রতি অনুরাগ আছে। আল্লাহ্ তা’আলা মিথ্যাবাদীদের সম্পর্কে বলেন :
“আর কিন্তু তোমার উপদেষ্টাগণকে ভালবাস না।”
যে ব্যক্তি উপদেষ্টাগণকে ভালবাসে না, এইজন্য অহংকার, আত্মাভিমান তাহার ধর্ম ও বুদ্ধির উপর প্রবল হইয়া উঠে। মানুষ যখন নিজের দোষ-ত্রুটি মোটেই বুঝে না তখনই এইরূপ হইয়া থাকে। কিন্তু নিজের দোষ-ত্রুটি বুঝিলে তাহাকে আকারে-ইঙ্গিতে উপদেশ দেওয়া উচিত, স্পষ্ট ভাষায় লোক সম্মুখে উপদেশ দেওয়া উচিত নহে। আর বন্ধু যে অপরাধ কেবল তোমার নিকট করিয়াছে তাহা গোপন রাখা ও তৎসম্বন্ধে অজ্ঞ সাজিয়া থাকাই উত্তম। কিন্তু এইরূপ অপরাধ গোপন রাখার শর্ত এই যে, বন্ধু হইতে তোমার মন যেন ফিরিয়া না যায়। আর যদি একান্ত ফিরিয়া যায় তথাপি বন্ধুর প্রতি তাহার অগোচরে অসন্তুষ্ট হওয়া বন্ধু-বিচ্ছেদ অপেক্ষা শ্রেয়। কিন্তু ঝগড়া-বিবাদ এবং বাক-বিতণ্ডার আশংকা থাকিলে বিচ্ছেদই শ্রেয়। উক্ত অবস্থায় বিচ্ছেদ না ঘটাইয়া সম্পর্ক অক্ষুণ্ন রাখার উদ্দেশ্য এই হওয়া উচিত যে, ভাই-বন্ধুদের দুর্ব্যবহারের কষ্ট সহ্য করিলে নিজের স্বভাব সংশোধিত হইবে, সম্পর্ক অক্ষুণ্ণ রাখিলে পার্থিব উপকার হইবে, এইরূপ উদ্দেশ্য থাকা উচিত নহে।
হযরত আবূ বকর কাত্তানী (রঃ) বলেন : আমার এক বন্ধু ছিলেন : তাঁহার ব্যবহারে আমার মনে কষ্ট ছিল। মনের এই কষ্ট যেন দূরীভূত হয় এই জন্য তাহাকে কিছু দান করিলাম, কিন্তু কোন ফল হইল না। অবশেষে তাহার হস্ত ধারণপূর্বক একদিন তাঁহাকে আমার গৃহে লইয়া আসিলাম এবং বলিলাম : আপনার পায়ের তালু আমার মুখমণ্ডলের উপর স্থাপন করুন। তিনি বলিলেন : ইহা কখনই হইতে পারে না। আমি বলিলাম : আপনাকে অবশ্যই ইহা করিতে হইবে; বিনা কারণেই করিতে হইবে। অগত্যা অনিচ্ছা সত্ত্বেও তিনি বাধ্য হইয়া স্বীয় পায়ের তালু আমার মুখের উপর স্থাপন করিলেন। ইহাতে আমার মনের সেই কষ্ট দূরীভূত হইল।
হযরত আবূ আলী রিবাতী (রঃ) বলেন : একবার আমি হযরত আবদুল্লাহ্ রাযীর সঙ্গীরূপে সফরে বাহির হইলাম। তিনি বলিলেনঃ সফরে সরদার কে হইবে? আমি-না তুমি? আমি বলিলাম আপনি হইবেন। তিনি বলিলেনঃ তাহা হইলে আমি যাহা বলিব তাহাই তোমাকে মানিতে হইবে। আমি বলিলাম : আপনার নির্দেশ শিরোধার্য করিয়া লইব। তৎপর তিনি একটি পেটরা চাহিলেন এবং তাহা আনিয়া উপস্থিত করিলাম। তিনি আমাদের পাথেয় দ্রব্য, কাপড়-চোপড় সমস্ত উহাতে পুরিয়া স্বীয় স্কন্ধে তুলিয়া লইলেন এবং যাত্রাপথে বাহির হইয়া পড়িলেন। আমি তাঁহাকে বার বার অনুরোধ করিয়া বলিলাম, গাঠুরিঠা আমার নিকট দিন, আপনি ক্লান্ত হইয়া পড়িলেন। কিন্তু তিনি কিছুতেই শুনিলেন না এবং বলিলেন : তুমি তাবেদার (আজ্ঞাবহ), সরদারের উপর তাবেদারের হুকুম চালাইবার অধিকার নাই।সফরে একবার সারারাত্রি বৃষ্টি হইতেছিল। তিনি আমার মাথার উপরে একখানি কম্বল ধরিয়া সারারাত্রি দণ্ডায়মান রহিলেন। যেন আমার শরীরে বৃষ্টির পানি পড়িতে না পারে। আমি কোন কথা বলিতে গেলেই তিনি বলিতেন : মনে রাখিও আমি সরদার তুমি তাবেদার। আমি মনে মনে বলিতে লাগিলামঃ হায়! তাঁহাকে যদি আমি সরদার না বানাইতাম ।
(৬) সংসর্গ ও বন্ধুত্বের ষষ্ট কর্তব্য হল,- বন্ধুর ত্রুটি ক্ষমা করা। বুযর্গগণ বলেন : তোমার কোন বন্ধু তোমার নিকট কোন অপরাধ করিলে উহা হইতে তাহাকে অব্যাহতি প্রদানের জন্য তাহার পক্ষের সত্তর প্রকার ওযর তুমি নিজের মন হইতে উপস্থিত করিবে। ইহাতেও যদি তোমার মন তাহাকে ক্ষমা করিতে প্রস্তুত না হয় তবে স্বীয় মনকে বলিবে, তোর স্বভাব অত্যন্ত মন্দ এবং তুই নিতান্ত নীচ বংশজাত। তোর বন্ধু সত্তর ওযর পেশ করিল, তবুও তুই তাহাকে ক্ষমা করিতে পারিস না। সেই অপরাধ পাপজনক হইয়া থাকিলে উহা বর্জনের জন্য তাহাকে নম্রভাবে উপদেশ দিবে। এইরূপ অপরাধ সে পুনরায় না করিলে তুমি তাহার প্রতি এমন ভাব দেখাইবে যে, তুমি যেন সেই সম্বন্ধে বিন্দু-বিসর্গও অবগত নও। কিন্তু বারবার সেই অপরাধ করিতে থাকিলে তুমিও তাহাকে উপদেশ দিতে থাকিবে। বারবার উপদেশ দেওয়া সত্ত্বেও কোন ফল না হইলে এমতাবস্থায় কর্তব্য সম্বন্ধে সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ)-এর মধ্যে মতভেদ আছে। হযরত আবু যর (রা) বলেন যে, এমতাবস্থায় বন্ধুত্ব ছিন্ন করা উচিত। কারণ, প্রথমে আল্লাহর উদ্দেশ্যেই বন্ধুত্ব স্থাপিত হইয়াছিল। সুতরাং এখন আল্লাহর উদ্দেশ্যেই বন্ধুত্ব ছিন্ন করা আবশ্যক। হযরত আবু দারদা (রাঃ) প্রমুখ কতিপয় সাহাবী বলেন যে, তেমন অবস্থায়ও বন্ধুত্ব ছিন্ন করা সমীচীন নহে। কারণ, আশা করা যায় যে, সে ঐ গুনাহ্ পরিত্যাগ করিতে পারে। কিন্তু এমন ব্যক্তির সহিত প্রারম্ভেই বন্ধুত্ব স্থাপন না করা উচিত ছিল।
একবার বন্ধুত্ব স্থাপন করতঃ উহা ছিন্ন করা সমীচিন নহে। হযরত নখঈ (রঃ) বলেন, পাপের কারণে বন্ধুকে পরিত্যাগ করিও না। কারণ, হয়ত আজ সে পাপ করিতেছে, কাল করিবে না। হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, আলিমের দোষকে উপেক্ষা কর। তাহার প্রতি আস্থা হারাইও না এবং তাহার সহিত বন্ধুত্ব ছিন্ন করিও না। আশা করা যায় যে, তদ্রুপ পাপ হইতে তিনি শীঘ্রই ফিরিয়া আসিবেন।
কথিত আছে, প্রাচীনকালের দুই বুযর্গের মধ্যে পরস্পর বন্ধুত্ব ছিল। তাহাদের একজন কামপ্রবৃত্তির তাড়নায় কাহারও প্রতি প্রেমাসক্ত হইয়া পড়েন এবং স্বীয় বন্ধুকে বলিলেন : আমার হৃদয় প্রণয় রোগে আক্রান্ত হইয়া পড়িয়াছে। তুমি ইচ্ছা করিলে ভ্রাতৃত্ব বর্জন এবং বন্ধুত্ব ছিন্ন করিতে পার। বন্ধু বলিলেন আল্লাহ্ করুন, একটি মাত্র পাপের কারণে আমি তোমার সহিত বন্ধুত্ব ছিন্ন করিব ! লা হাউলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ্, এক প্রণয় রোগের দরুন ভালবাসার সম্পর্ক কর্তন করিব। বরং তিনি দৃঢ়তার সহিত শপথ করিলেন যে, যতদিন পর্যন্ত সর্ব রোগের নিরাময় কর্তা আল্লাহ্ তাহার বন্ধুর প্রণয় রোগ আরোগ্য না করেন ততদিন তিনি পানাহার করিবেন না; সম্পূর্ণ উপবাস থাকিবেন। চল্লিশ দিন তিনি কোন প্রকার খাদ্য বা পানীয় গ্রহণ করিলেন না। তৎপর বন্ধুকে জিজ্ঞাসা করিলেন: এখন আপনার অবস্থা কেমন ? বন্ধু উত্তর করিলেন : সেই একই অবস্থা, একই রকম বেদনা হা- হুতাশ। তিনি তৎপর পানাহার না করিয়া দিন দিন কৃশ হইতে কৃশতর হইতে লাগিলেন : অনন্তর বন্ধু যখন তাহাকে জানাইলেন যে, আল্লাহর অনুগ্রহে তাহার প্রণয় রোগ দূরীভূত হইয়াছে তখন তিনি আল্লাহ্‌কে ধন্যবাদ দিলেন এবং পানাহার করিলেন।
এক ব্যক্তিকে লোকে জিজ্ঞাসা করিল : আপনার বন্ধু ধর্ম পথ ত্যাগ করতঃ পাপে লিপ্ত হইয়া রহিয়াছে। আপনি তাহার সহিত বন্ধুত্ব ছিন্ন করেন না কেন? তিনি উত্তর দিলেন : আজ তাহার বন্ধুর নিতান্ত প্রয়োজন। কারণ, তিনি ধ্বংসের পথে চলিয়াছেন। এমতাবস্থায় আমি তাহাকে বর্জন করিব কিরূপে? বরং ইহাই তাহাকে সাহায্য কবিবার প্রকৃষ্ট সময়। সদয় উপদেশ প্রদানে তাহাকে দোষখ হইতে রক্ষা করা কর্তব্য।
কথিত আছে, বনী ইসরাঈল বংশের দুই ব্যক্তি পরস্পর বন্ধুত্ব সূত্রে আবদ্ধ ছিলেন। তাঁহারা উভয়েই এক পাহাড়ে ইবাদত করিতেন। একদা কোন প্রয়োজনীয় দ্রব্য ক্রয়ের জন্য তাঁহাদের একজন বাজারে গমন করেন। তথায় তাঁহার দৃষ্টি অকস্মাৎ এক কূলটা রমণীর প্রতি পতিত হওয়ায় তাহার প্রেমে আকৃষ্ট হইয়া তিনি তথায়ই রহিয়া গেলেন। এইরূপে কয়েক দিন অতিবাহিত হইয়া গেল। তখন অপর বন্ধু তাহার খোঁজে বাহির হইয়া পড়িলেন। ঘটনা শ্রবণ করতঃ তিনি তাঁহার নিকট যাইয়া উপস্থিত হইলেন। কূলটা রমণীর প্রেমাসক্ত ব্যক্তি লজ্জিত হইয়া বলিলেন : তুমি কে? আমি তোমাকে চিনি না। তিনি বলিলেন : প্রিয় ভ্রাতাঃ উদ্বিগ্ন হইও না। অদ্যকার ন্যায় এত ভালবাসা তোমার প্রতি ইতিপূর্বে কখনই ছিল না। এই কথা বলিয়া তিনি তাঁহাকে আলিঙ্গন করতঃ চুম্বন করিলেন। ইহাতে তিনি বুঝিতে পারিলেন যে, বন্ধুর অনুগ্রহ দৃষ্টি হইতে তিনি তখনও বঞ্চিত হন নাই। তৎক্ষণাৎ তিনি তওবা করিলেন। এবং বন্ধুর সহিত চলিয়া গেলেন।
উপরিউক্ত বর্ণনা হইতে বুঝা যায় যে, হযরত আবু যর (রাঃ) মত অর্থাৎ পাপাসক্ত বন্ধুর সহিত বন্ধুত্ব ছিন্ন করা নিরাপত্তার নিকটবর্তী হইতে হযরত আবু দরদা (রাঃ) মত অর্থাৎ তওবা করতঃ সৎপথে প্রত্যাবর্তনের আশায় পাপাসক্ত বন্ধুর বন্ধুত্ব ছিন্ন না করা অধিকতর ফিকাহ শাস্ত্রসম্মত ও অধিকতর সূক্ষ্ম দৃষ্টি প্রসূত। কারণ, বন্ধুর সহানুভূতি অবশেষে পাপাসক্ত ব্যক্তির তওবার কারণ হইয়া দাঁড়ায়। অপর পক্ষে পাপ-পংকিলে লিপ্ত হইয়া মানব যখন আত্ম সংশোধনে অক্ষম ও অপারগ হইয়া পড়ে তখনই তাহার ধর্মবন্ধুর সাহায্য ও সহানুভূতির সর্বাধিক প্রয়োজন। সুতরাং তাহাকে ত্যাগ করা যায় কিরূপে?
বন্ধুত্ব স্থাপনের পর পাপাসক্ত হইয়া পড়িলে বন্ধুত্ব বর্জন না করা ফিকাহ শাস্ত্রসম্মত বলার কারণ এই যে, উভয়ের স্থাপিত বন্ধুত্ব আত্মীয়তার বিধানের অন্তর্ভুক্ত। পাপের কারণে আত্মীয়তা ছিন্ন করা দুরস্ত নহে। এই জন্য আল্লাহ্ বলেন :
“যদি আত্মীয়-স্বজন তোমার প্রতি নাফরমানী করে তবে বলিয়া দাও, আমি তোমার কার্যের প্রতি অসন্তুষ্ট।”
এ স্থলে নাফরমানের প্রতি অসন্তুষ্ট হওয়ার জন্য আল্লাহ্ বলেন নাই।
হযরত আবু দারদা (রা)-কে লোকে জিজ্ঞাসা করিল : আপনার ভ্রাতা পাপ করে। আপনি তাহাকে দুশমন বলিয়া গণ্য করেন না কেন? তিনি বলিলেনঃ আমি তাহার পাপের প্রতি তো অসন্তুষ্ট। কিন্তু সে আমার ভাই (তাহার প্রতি অসন্তুষ্ট হইতে পারি কিরূপে?)
পাপাচারী ব্যক্তির সহিত বন্ধুত্ব স্থাপন না করাই উচিত। কারণ, বন্ধুত্ব স্থাপন করতঃ ইহা ছিন্ন করা প্রতারণা (খেয়ানত) কিন্তু বন্ধুত্ব স্থাপন না করা প্রতারণা নহে। আর বন্ধুত্ব ছিন্ন করিলে বন্ধুত্ব স্থাপনের পর যে অধিকার প্রাপ্য হইয়াছিল তাহা লংঘন করা হয়। সমস্ত আলিমই এ বিষয়ে একমত পোষণ করেন।
তোমার বন্ধু তোমার নিকট কোন অপরাধ করিয়া থাকিলে তাহাকে ক্ষমা করিয়া দেওয়াই উত্তম। অপরাধ করিয়া সে যদি দোষ-স্খলণের জন্য কারণ দর্শায় এবং তুমি ইহাকে মিথ্যা বলিয়া বুঝিতে পার তথাপি উহা মানিয়া লইবে।
রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন:
“যে ব্যক্তি স্বীয় ভ্রাতার ওযর গ্রহণ করে না সে ব্যক্তি রাস্তায় মুসলমানগণের নিকট হইতে খিরাজ আদায়কারীর ন্যায় পাপী (সাধারণত অমুসলমানগণের নিকট হইতে নির্ধারিত হারে যে ভূমিকর আদায় করা হয় তাহাকে খিরাজ বলে)। তিনি আরও বলেন : মুসলমান শীঘ্র অসন্তুষ্ট হয় এবং শীঘ্র সন্তুষ্ট হইয়া থাকে।
হযরত আবু সুলাইমান দারানী (রঃ) স্বীয় মুরীদকে বলেন : তোমার কোন বন্ধু হইতে কোন অন্যায় আচরণ লক্ষ্য করিলে তাহাকে তিরস্কার করিবে না। তিরস্কার করিলে তুমি হয়ত এমন কথা শুনিবে যাহা সে অন্যায় আচরণ হইতে অধিক পীড়াদায়ক। সেই মুরীদ বলেন : আমি যাচাই করিয়া হযরত পীর সাহেবের উক্ত উপদেশ অনুযায়ী ব্যবহার পাইয়াছি।
(৭) সংসর্গ ও বন্ধুত্বের সপ্তম কর্তব্য হল,- বন্ধুর জীবদ্দশায় ও তাহার মৃত্যুর পরও তাহার জন্য দু'আ করা। নিজের স্ত্রী-পুত্র-পরিবারের জন্য যেমন দু'আ করিয়া থাক তদ্রুপ তাহার স্ত্রী-পুত্র-পরিবারের জন্যও দু'আ করিবে। বস্তুত বন্ধুর জন্য দু'আ প্রকারান্তরে নিজের জন্যই হইয়া থাকে।
রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : যে ব্যক্তি স্বীয় ভ্রাতার অগোচরে তাহার মঙ্গলের জন্য দু’আ করিয়া থাকে, ফেরেশতাগণ তাহার মঙ্গলের জন্য ঠিক তদ্রুপ দু'আ করিয়া থাকেন। অপর এক রেওয়ায়েতে বর্ণিত আছে যে, তখন স্বয়ং আল্লাহ্ দু’আকারী বন্ধুকে উদ্দেশ্য করিয়া বলেন : আমি প্রথমে তোমার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করিব। রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : অগোচরে বন্ধুগণের জন্য দু'আ আল্লাহ্ প্রত্যাখ্যান করেন না।
হযরত আবু দারদা (রাঃ) বলেনঃ আমি সিজদায় সত্তরজন বন্ধুর নাম করিয়া তাঁহাদের জন্য দু'আ করিয়া থাকি। বুযর্গগণ বলেনঃ তোমার মৃত্যুর পর ওয়ারিশগণ যখন তোমার পরিত্যক্ত ধন-সম্পত্তি বন্টনে ব্যস্ত থাকে তখন যে তোমার জন্য দু'আ করে এবং পরকালে আল্লাহ্ তোমার সহিত কিরূপ ব্যবহার করেন, এই আশংকায় যে বিহ্ববল থাকে সে ব্যক্তিই তোমার বন্ধু।
রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন :
"মৃত ব্যক্তির দৃষ্টান্ত পানিতে নিমজ্জমান ব্যক্তির ন্যায়। নিমজ্জমান ব্যক্তি যেমন অবলম্বন পাওয়ার আশায় হাতড়াইয়া থাকে, মৃত ব্যক্তিও তদ্রুপ স্ত্রী-সন্তান-সন্ততি এবং বন্ধুদের প্রতীক্ষায় থাকে।"
আর জীবিতদের দু'আ নূরের পাহাড় হইয়া মৃতের কবরসমূহে পৌছিয়া থাকে। হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, নূরের ভাণ্ডে করিয়া দু'আ মৃতদের সম্মুখে উপস্থিত করা হয় এবং বলা হয়, ইহা অমুকের পক্ষ হইতে তোমার নিকট উপহার। জীবিত লোকে উপহার পাইয়া যেরূপ সন্তুষ্ট হইয়া থাকে, মৃত ব্যক্তিও তদ্রুপ সন্তুষ্ট হইয়া থাকে।

(৮) সংসর্গ ও বন্ধুত্বের অষ্টম কর্তব্য হল বন্ধুত্বের প্রতিদান হক কখনও না ভোলা। বন্ধুত্বের হক না ভোলার অর্থ ইহাও যে, বন্ধুর মৃত্যুর পর তাহার স্ত্রী-পুত্র, পরিবার-পরিজন ও তাহার বন্ধুবর্গের খোঁজ-খবর লইতে হইবে।
এক বৃদ্ধা রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর দরবারে উপস্থিত হইলে তিনি তাঁহার অতিশয় সম্মান প্রদর্শন করিলেন। সমবেত সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ) ইহাতে বিস্মিত হইলে হুজুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিলেন : এই মহিলা বিবি খাদীজা (রাঃ)-এর জীবদ্দশায় আমাদের এখানে আসিত।
বন্ধুত্বের কর্তব্য সম্পাদন করা ঈমানের অন্তর্ভুক্ত। বন্ধুর মৃত্যুর পর তাহার পরিবারবর্গ, দাস-দাসী, শিষ্য প্রভৃতি যে সমস্ত লোকের তাহার সহিত সম্পর্ক ছিল, তাহাদের সকলের প্রতি অনুগ্রহ দৃষ্টি রাখাও বন্ধুর প্রতি বিশ্বস্ততার মধ্যে গণ্য। বন্ধুর প্রতি যেরূপ ভালবাসা ও অনুগ্রহ ছিল তাহাদের প্রতি তদপেক্ষা অধিক অনুগ্রহ করা কর্তব্য। উচ্চ পদ, ধন-দৌলত এমনকি রাজ্যলাভের পরও বন্ধুর প্রতি পূর্ব নম্রতা সৌজন্য প্রদর্শন করা, তাহার সহিত অহংকার না করা এবং সর্বদা বন্ধুত্ব দৃঢ় রাখা ও কোন কারণেই বন্ধুত্ব ছিন্ন না করাকে বন্ধুত্বের হক আদায় করা বলে। কারণ, ভাই- ই-বন্ধুদের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটান শয়তানের বড় কাজ যেমন আল্লাহ্ বলেন-
"অবশ্যই শয়তান তাহাদের মধ্যে বিবাদ বাধাইয়া দেয়।" অন্যত্র হযরত ইউসুফ (আ) এর উক্তি উদ্ধৃত করিয়া পবিত্র কুরআনে আল্লাহ্ বলেন
"শয়তান আমার ও আমার ভাইগণের মধ্যে বিবাদ বাধাইবার পর....”
বন্ধুর বিরুদ্ধে কেহ কিছু বলিলে ইহাতে কর্ণপাত না করা এবং যাহারা ঐরূপ বলে তাহাদিগকে মিথ্যাবাদী মনে করাও বন্ধুর প্রতি বিশ্বস্ততার নিদর্শন। বন্ধুর শত্রুকে ভাল না বাসা; বরং তাহাকেও নিজের শত্রু মনে করা বন্ধুত্বের পরিচয়। কারণ, যে ব্যক্তি বন্ধুর শত্রুকে ভালবাসে তাহার বন্ধুত্ব দুর্বল।

(৯) সংসর্গ ও বন্ধুত্বের নৰম কর্তব্য হল,- বন্ধুত্বের মধ্য হইতে লৌকিকতা উঠাইয়া দেওয়া এবং একাকী যেরূপভাবে থাকিতে অভ্যস্ত, বন্ধুর সহিতও তদ্রুপই থাকা। এক বন্ধু অপর বন্ধুর সহিত আচার-ব্যবহারে সামাজিক শিষ্টাচারের প্রতি লক্ষ্য রাখিলে বুঝা যাইবে যে, তাহাদের মধ্যে পূর্ণ বন্ধুত্ব স্থাপিত হয় নাই।
হযরত আলী (রাঃ) বলেন : যে বন্ধুর নিকট তোমার ওযর পেশ করিবার ও লৌকিকতা প্রদর্শনের প্রয়োজন হয়, সেই বন্ধুদের মধ্যে নিকৃষ্টতম। হযরত জুনাইদ (রহঃ) বলেন : আমি অনেক বন্ধু দেখিয়াছি। কিন্তু এমন বন্ধুযুগল দেখি নাই যাহাদের একের পদমর্যাদা অপরের বিষণ্নতার কারণ হইয়াছে। তবে তাহাদের কাহারও মধ্যে কোন দোষ-ত্রুটি থাকিলে স্বতন্ত্র কথা।
বুযর্গগণ বলেন : দুনিয়াদার লোকের সহিত শিষ্টাচার রক্ষা করিয়া চলিবে। আর পরলোক প্রিয় ধর্মপরায়ণ লোকের সহিত ওজনসুলভ এবং আরিফগণের (অন্তদৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তি) সহিত তোমার ইচ্ছানুরূপ আচার-ব্যবহার করিবে। কতিপয় সুফী এই শর্তে একত্রে বাস করিতেন যে, তাহাদের মধ্যে কেহ সর্বদা রোযা রাখিলে বা রোযা না রাখিলে অথবা সারারাত্রি নিদ্রা গেলে বা সারারাত্রি নামায পড়িলে তাহাদের কেহই অপরের নিকট উহার কারণ জিজ্ঞাসা করিবেন না।
ফলকথা, আল্লাহর উদ্দেশ্যে বন্ধুত্বের অর্থ অন্তরঙ্গতা এবং যেখানে অন্তরঙ্গতা রহিয়াছৈ সেখানে লৌকিকতার স্থান নাই ।
(১০) সংসর্গ ও বন্ধুত্বের দশম কর্তব্য হল,- সমস্ত বন্ধুর সম্মুখে নিজকে সর্বাপেক্ষা অধম বলিয়া মনে করা; তাহাদের নিকট হইতে কোন স্বার্থলাভের আশা না করা। তাহাদের নিকট কোন বিষয় গোপন না করা এবং তাহাদের প্রতি সর্ববিধ কর্তব্য সম্পাদন করিতে থাকা।
হযরত জুনাইদ (রহঃ)-এর সম্মুখে এক ব্যক্তি বারবার বলিতেছিল : আজকাল বন্ধু দুর্ভল। তিনি উত্তর দিলেন : তুমি যদি এমন বন্ধুর অনুসন্ধান কর, যে কেবল তোমার খেদমত করিবে তোমার শোক-দুঃখে সহানুভূতি প্রকাশ করিবে, তবে এমন বন্ধু দুর্লভ বটে। কিন্তু যদি এমন বন্ধু অন্বেষণ কর যাহার খেদমত তুমি করিবে এবং যাহার দুঃখে তুমি সহানুভূতি প্রকাশ করিবে তবে এমন বন্ধু অনেক আছে।
বুযর্গগণ বলেন : যে ব্যক্তি নিজকে বন্ধুগণের মধ্যে উত্তম মনে করে সে নিজে পাপী হইবে এবং তৎসঙ্গে অপর বন্ধুকেও পাপী করিবে। আর যে ব্যক্তি নিজকে অপর বন্ধুর সমকক্ষ মনে করিবে সে নিজেও মনঃকষ্ট ভোগ করিবে এবং তাহার বন্ধুও মনঃকষ্ট পাইবে। কিন্তু সে নিজকে সর্বাপেক্ষা নিকৃষ্ট মনে করিলে সকল বন্ধুই শান্তি ও আরামে থাকিবে। হযরত আবু মুআবিয়াতুল আসওয়াদ (রঃ) বলেন : আমার সকল বন্ধুই আমা অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। তাঁহারা আমাকে প্রাধান্য দিয়া থাকেন এবং আমার শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করিয়া থাকেন।
ঘনিষ্ঠতার বিভিন্ন শ্রেণী অনুযায়ী তাহাদের প্রতি কর্তব্যও বিভিন্ন প্রকার হইয়া থাকে। আল্লাহর সহিত বন্ধুত্বের ঘনিষ্ঠতা সর্বাপেক্ষা দৃঢ়তম। এই ঘনিষ্ঠতার কর্তব্যসমূহ ইতিপূর্বে বর্ণিত হইয়াছে। যাহার সহিত বন্ধুত্ব নাই, কেবল ধর্ম সম্পর্ক বিদ্যমান, তাহার প্রতিও কতিপয় কর্তব্য রহিয়াছে।

পরবর্তী পর্ব

হকদারের হক (৬) বন্ধুত্বের যোগ্যতা


হকদারের হক পর্ব- ৬
📚সৌভাগ্যের পরশমণি   ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

বন্ধুত্বের যোগ্যতা
যোগ্যতা : সকল মানুষই সংসর্গ ও বন্ধুত্বের যোগ্য নহে; বরং সংসর্গ এমন লোকের সহিত রাখা উচিত যাহার মধ্যে তিনটি গুণ আছে।
(১) বুদ্ধিমত্তা। কারণ, নির্বোধের সংসর্গে কোন কল্যাণের আশা নাই। নির্বোধের সহিত বন্ধুত্ব স্থায়ী হয় না এবং পরিণামে তিক্ততা বৃদ্ধি পায়। কেননা নির্বোধ বন্ধুর উপকার করিতে গিয়া অজ্ঞানতাবশতঃ এমন কাজ করিয়া বসিতে পারে যাহা তাহার অকল্যাণের কারণ হইয়া পড়ে। বুযর্গগণ বলেনঃ নির্বোধ হইতে দূরে থাকা সওয়াব এবং তাহার চেহারা দর্শন করা গুনাহ্। যাহাদের কার্যের হিতাহিত জ্ঞান নাই এবং বলিয়া দিলেও বুঝে না, তাহারাই নির্বোধ।
দ্বিতীয় গুণ :
সৎস্বভাব ও সচ্চরিত্রতা। কারণ, অসৎস্বভাবের লোকের সংসর্গে শান্তি লাভের আশা করা যায় না। যখন তাহার অসৎস্বভাব প্রবল হইয়া উঠিবে তখন সে তোমার প্রতি তাহার বন্ধুত্বের সকল কর্তব্য বিনাদ্বিধায় পদদলিত করিয়া ফেলিবে।
তৃতীয় গুণ :
সততা ও ধর্মপরায়ণতা। কারণ, যে ব্যক্তি পাপে অদম্য হইয়া পড়িয়াছে, এবং যে ব্যক্তি আল্লাহ্‌কে ভয় করে না তাহাকে বিশ্বাস করা উচিত নহে। আল্লাহ্ কুরআন শরীফে বলেন :
“এইরূপ ব্যক্তির অনুসরণ করিবে না যাহার অন্তরকে আমার যিকির হইতে গাফিল করিয়া দিয়াছে এবং যে স্বীয় প্রবৃত্তির অনুগমন করিয়া থাকে। বিদআতী লোক হইতে দূরে থাকা উচিত। কারণ, তাহার বিদআতের আপদ অপরের উপর প্রভাব বিস্তার করে। অধুনা এক শ্রেণীর বিদআতী গজাইয়া উঠিয়াছে। তাহাদের অপেক্ষা জঘন্য বিদআতী আর নাই। তাহারা বলে : আল্লাহর বান্দাগণকে বাধা প্রদান করা এবং তাহাদিগকে পাপ ও দুষ্কর্ম হইতে বিরত রাখার কোন প্রয়োজন নাই। কারণ, কোন লোকের সঙ্গেই আমাদের শত্রুতা নাই এবং তাহাদের উপর আমরা শাসকও নহি। এই উক্তিতে নিজের জন্য সর্ববিধ কার্য জায়েয করিয়া লওয়ার বীজ নিহিত রহিয়াছে এবং ইহা খোদাদ্রোহিতার মূল। আর ইহা জঘন্যতম বিদআত। এইরূপ বিদআতী লোকদের সহিত মেলামেশা করা কখনই সঙ্গত নহে। কারণ, এই শ্রেণীর বিদআত কুপ্রবৃত্তির পরিপোষক। শয়তান ইহার সাহায্য করিয়া ঐ প্রকার মনোভাবকে বেশ ভালভাবে সাজাইয়া তাহাদের সহিত মেলামেশাকারীর অন্তরে বসাইয়া দিবে এবং অল্পদিনের মধ্যেই তাহাকে স্পষ্ট ইবাহতী (অবৈধ কাজকে বৈধকারী) বানাইয়া দিবে।
হযরত ইমাম জাফর সাদিক (রহঃ) বলেন : পাঁচ প্রকার লোকের সংসর্গ পরিত্যাগ কর। (১) মিথ্যাবাদী। কারণ, তাহার দ্বারা তুমি সর্বদা প্রতারিত হইবে। (২) নির্বোধ। কেননা, নির্বোধ ব্যক্তি তোমার উপকার করিতে গিয়া অজ্ঞানতাবশতঃ তোমার অপকার করিয়া ফেলিবে। (৩) কৃপণ কেননা, কৃপণ নিতান্ত প্রয়োজনকালে তোমার সহিত বন্ধুত্ব বর্জন করিবে। (৪) ভীরু। কারণ এইরূপ ব্যক্তি প্রয়োজনের সময় তোমাকে পরিত্যাগ করিবে। (৫) ফাসিক, কারণ, ফাসিক এক লোকমার বিনিময়ে কিংবা তদপেক্ষা অল্পমূল্যে তোমাকে বিক্রয় করিয়া ফেলিবে।
লোকে জিজ্ঞাসা করিল : এক লোকমা অপেক্ষা অল্প কি? তিনি বলিলেনঃ এক লোকমা-লাভের আশা। হযরত জুনাইদ (রহঃ) বলেন : কুস্বভাবী আলিমের বন্ধুত্ব অপেক্ষা সৎস্বভাবী ফাসিকের বন্ধুত্ব আমার নিকট অধিক পছন্দনীয়।
উপরিউক্ত গুণসমূহ সমষ্টিগতভাবে একই ব্যক্তির মধ্যে খুব কমই পাওয়া যায়। অতএব বন্ধুত্বের উদ্দেশ্য কি, বুঝিতে হইবে। কেবল ভালবাসা ও সখ্যতা তোমার উদ্দেশ্য হইলে সচ্চরিত্রবান লোক অন্বেষণ কর। ধর্মীয় কল্যাণ উদ্দেশ্য হইলে পরহিযগার আলিমের অনুসন্ধান কর এবং পার্থিব মঙ্গল উদ্দেশ্য হইলে দানশীল ও দয়ালু ব্যক্তির তালাশ কর। তাহাদের প্রত্যেকের জন্য ভিন্ন ভিন্ন শর্ত আছে।
সমাজে তিন শ্রেণীর লোক আছে। এক প্রকার লোক খাদ্যবস্তুর ন্যায় নিত্য প্রয়োজনীয়। তাহাদের ছাড়া লোকের চলে না। অপর এক শ্রেণীর লোক ঔষধসদৃশ। কোন সময় তাহাদের প্রয়োজন হয় না। কিন্তু মানুষ তাহাদের ফাঁদে পড়িয়া যায়। অতএব তাহাদিগ হইতে বাঁচিয়া থাকার জন্য চেষ্টা করা আবশ্যক। মোটকথা এমন লোকের সহিত সংসর্গ রাখা উচিত যাহার দ্বারা তোমার অথবা তোমার দ্বারা তাহার ধর্মীয় কল্যাণ সাধিত হয়।

পরবর্তী পর্ব

হকদারের হক (৫) আল্লাহর শত্রুর শ্রেণী বিভাগ

 

হকদারের হক পর্ব- ৫
📚সৌভাগ্যের পরশমণি   ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
আল্লাহর শত্রুর শ্রেণী বিভাগ
আল্লাহর শত্রুগণ বহু শ্রেণীতে বিভক্ত। সুতরাং তাহাদের প্রতি ক্রোধ পোষণ ও কঠোরতা অবলম্বনেও তারতম্য ঘটিয়া থাকে।
প্রথম শ্রেণী : কাফিরগণ এ শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। মুসলমানগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ-বিগ্রহে রত কাফিরদের প্রতি শত্রুতা স্বতঃই ফরয। তাহাদিগকে (যারা যুদ্ধে লিপ্ত) হত্যা করিতে হইবে।
দ্বিতীয় শ্রেণী : যিম্মী অর্থাৎ জান-মালের নিরাপত্তার প্রতিদানে জিযিয়া কর দান করতঃ ইসলামী রাষ্ট্রের আশ্রয়ে বসবাসকারী অমুসলমানগণ এই শ্রেণীর অন্তর্গত। তাহাদের সহিতও শত্রুতা ফরয। তাহাদের সহিত এরূপ ব্যবহার করিতে হইবে যেন তাহারা গুনাহর পাত্র হইয়া থাকে এবং সম্মান না পায় ও তাহাদের জীবনযাত্রা সংকীর্ণ করিয়া রাখিবে। তাহাদের সহিত বন্ধুত্ব স্থাপন করা মাকরূহ তাহরীমা। এমনকি হারাম হওয়ার সম্ভাবনাও রহিয়াছে। এই সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ্ তা'আলা বলেন :
“যাহারা আল্লাহ্ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস রাখে, আপনি তাহাদিগকে সে সমস্ত লোকের সহিত বন্ধুত্ব স্থাপন করিতে দেখিবেন না যাহারা আল্লাহ্ ও তদীয় রসূলের বিরোধী।”
যিম্মীদের উপর নির্ভর করা তাহাদিগকে মুসলমানের উপর শাসক ও বিচারকরূপে নিযুক্ত করা কবীরা গুনাহ্ এবং এইরূপ করিলে ইসলামের অবমাননা করা হয়।
তৃতীয় শ্রেণী : বিদআতীলোক যাহারা মানুষকে শরীয়ত বহির্ভুত নূতন নূতন অপকার্যের প্রতি আহ্বান করে তাহারা এই শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। তাহাদের সহিতও শত্রুতা প্রকাশ করা আবশ্যক যেন লোকের মনে তাহাদের প্রতি ঘৃণার উদ্রেক হয়। তাহাদিগকে সালাম না দেওয়া, তাহাদের সঙ্গে কথাবার্তা না বলা এবং তাহাদের সালামের জওয়াব না দেওয়াই উত্তম। কারণ, তাহারা বিদআতের প্রতি আহ্বান করিলে লোকে যদি ঐদিকে ঝুঁকিয়া পড়ে তবে বিদআতের পাপ সমাজে বিস্তার লাভ করিবে এবং ঝগড়া-ফাসাদ সৃষ্টি হইবে। কিন্তু বিদআতী ব্যক্তি সাধারণ লোক হইলে এবং সে অপরকে বিদআতের দিকে আহ্বান না করিলে তাহার প্রতি তদ্রূপ কার্য করা অতি সহজ।
চতুর্থ শ্রেণী : এমন পাপী যাহাদের পাপের দরূন মানবের দুঃখ-কষ্ট হইয়া থাকে তাহারা এই শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। যেমন— অত্যচার, মিথ্যা সাক্ষ্য গ্রহণ ও পক্ষপাতিত্ব করিয়া বিচার করা; কাহারো কুৎসা রটনা করা, পরনিন্দা করা। মানুষের মধ্যে পরস্পর ঝগড়া-বিবাদ বাধাইয়া দেওয়া। এই শ্রেণীর পাপীদিগ হইতে বিমুখ থাকা এবং তাহাদের প্রতি কঠোর ব্যবস্থা করা অতি উত্তম কার্য। তাহাদের সহিত বন্ধুত্ব স্থাপন করা ঘৃণ্য কার্য এবং একেবারে হারাম করা হয় নাই। কারণ তাহা হইলে সমাজে বাস করা কষ্টকর হইত।
পঞ্চম শ্রেণী : মদ্যপায়ী ও পাপে লিপ্ত এমন লোকগণ এই শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত যাহাদের পাপের দরুন অপর লোকের কোন প্রকার দুঃখ-কষ্ট হয় না। এমন লোকের সহিত আচরণ অধিকতর সহজ। সংশোধনের আশা থাকিলে এমন লোকের সহিত নম্র ব্যবহার করা এবং তাহাদিগকে সদুপদেশ প্রদান করা উত্তম। অন্যথায় তাহাদিগ হইতে বিমুখ থাকাই উত্তম। কিন্তু তাহাদের সালামের জওয়াব দেওয়া উচিত এবং তাহাদিগকে অভিশাপ দেওয়া সঙ্গত নহে। রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর যমানায় এক ব্যক্তি কয়েকবার মদ্য পান করে। এই জন্য তাহাকে যথাবিহিত শাস্তি প্রদান করা হয়। এক সাহাবী (রঃ) তাহাকে অভিশাপ করিয়া বলিলেন : তাহার ফাসাদ আর কতদিন চলিবে? রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) তাঁহাকে অভিশাপ করিতে নিষেধ করিয়া বলিলেন : শয়তান তাহার শত্রুতার জন্য যথেষ্ট; তুমিও শয়তানের সাহায্যকারী হইও না।

হকদারের হক (৪) আল্লাহর উদ্দেশ্যে শত্রুতার পরিচয়


হকদারের হক পর্ব- ৪
📚সৌভাগ্যের পরশমণি   ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

আল্লাহর উদ্দেশ্যে শত্রুতার পরিচয়
যে ব্যক্তি আল্লাহর উদ্দেশ্যে তাঁহার আজ্ঞানুবর্তী বান্দাগণকে ভালবাসিবে সে স্বতঃ কাফির, জালিম, গুনাহ্গার ও ফাসিকদিগকে শত্রু বলিয়া গণ্য করিবে। কারণ কেহ, কাহাকেও ভালবাসিলে সে বন্ধুর-বন্ধুকেও বন্ধু ও শত্রুকে শত্রুরূপে গ্রহণ করিয়া থাকে। এবং কাফির, জালিম, গুনাহ্গার ও ফাসিকগণ আল্লাহর শত্রু। কোন মুসলমান ফাসিক (পাপী) হইলে মুসলমান হওয়ার কারণে তাহাকে ভালবাসিতে হইবে এবং পাপের কারণে তৎপ্রতি অসন্তুষ্ট থাকিতে হইবে। এইরূপ স্থলে ভালবাসা ও অসন্তুষ্টি একত্রে মিলিত হইবে। যেমন, এক ব্যক্তি এক পুত্রকে পুরস্কার প্রদান করিল কিন্তু অপর পুত্রকে কিছুই দিল না। এইরূপ ক্ষেত্রে বুঝিতে হইবে, এক কারণে সে এক পুত্রকে ভালবাসে এবং অন্য এক কারণে সে অপর পুত্রের প্রতি অসন্তুষ্ট; ইহা অসম্ভব নহে। কারণ, যেমন এক ব্যক্তির তিন পুত্র আছে। তন্মধ্যে একজন বুদ্ধিমান পিতৃভক্ত; দ্বিতীয়জন বোকা ও পিতার অবাধ্য এবং তৃতীয় জন নির্বোধ কিন্তু পিতৃভক্ত। এমতাবস্থায় সে ব্যক্তি প্রথম পুত্রকে ভালবাসিবে, দ্বিতীয় পুত্রের প্রতি অসন্তুষ্ট থাকিবে এবং তৃতীয় পুত্রকে পিতৃ ভক্ত হওয়ার জন্য ভালবাসিবে ও নির্বুদ্ধিতার দরুন তৎপ্রতি অসন্তুষ্ট থাকিবে। আচার-ব্যবহারে ইহার প্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত হইয়া থাকে। কেননা সে প্রথম পুত্রকে স্নেহের দৃষ্টিতে দেখিবে। দ্বিতীয় পুত্রকে অবজ্ঞার দৃষ্টিতে দেখিবে এবং তৃতীয় পুত্রের কিছুটা স্নেহ ও কিছুটা অবজ্ঞার চোখে দেখিবে।
ফলকথা, যে ব্যক্তি আল্লাহর নাফরমানী করে, তৎপ্রতি তোমার এইরূপভাব পোষণ করা কর্তব্য যে, যেন সে তোমার বিরুদ্ধাচরণ করিয়া থাকে এবং বিরুদ্ধাচরণের পরিমাণ অনুযায়ী তুমিও তাহার প্রতি শত্রুতা পোষণ করিয়া থাক। আবার আল্লাহর প্রতি তাহার বাধ্যতা ও আনুগত্যের পরিমাণ অনুযায়ী তাহাকে ভালবাসিতে হইবে যেন উহার প্রতিক্রিয়া পরস্পর আচার-ব্যবহার, কাজ-কারবার, সঙ্গ-সাহচর্য এবং কথাবার্তায় প্রকাশ পায়। এমনকি পাপীর সংসর্গে তুমি যাইবে না এবং তাহার সঙ্গে কর্কশ ভাষা ব্যবহার করিবে। আর তাহার পাপ অত্যাধিক বৃদ্ধি পাইয়া থাকিলে তাহা হইতে বহুদূরে থাকিবে এবং তাহার পাপ সীমা অতিক্রম করিয়া গেলে তাহার সহিত কথাবার্তা বন্ধ করিয়া তাহা হইতে অন্যদিকে মুখ ফিরাইবে। অত্যাচারীর সাহিত পাপী অপেক্ষা অধিক রূঢ় ও কঠোর ব্যবহার করিতে হইবে।
কিন্তু যে ব্যক্তি কেবল তোমার উপর অত্যাচার করিয়াছে তাহাকে ক্ষমা করা ও অত্যাচার সহ্য করিয়া যাওয়া উত্তম। এ সম্বন্ধে প্রাচীন বুযর্গগণের বিভিন্নরূপ অভ্যাস ছিল। কেহ কেহ ধর্মীয় বন্ধনও শরীয়তের শাসন দৃঢ় রাখার উদ্দেশ্যে পাপী ও অত্যাচারীর প্রতি খুব কড়া ব্যবহার করিতেন এবং হযরত ইমাম আহমদ ইবন হাম্বল (রহঃ) তাহাদের অন্যতম।
হারিস মজামী দর্শন শাস্ত্রে একখানা গ্রন্থ রচনা করেন। ইহাতে মুতাযিলা সম্প্রদায়ের ভ্রান্ত মতবাদের খণ্ডন করা হইয়াছে। কিন্তু এই সম্প্রদায়ের ভ্রান্ত মতবাদসমূহ প্রথমে বর্ণিত হইয়াছে। ইহাতে হযরত ইমাম আহমদ ইবন হাম্বল (রহঃ) উক্ত গ্রন্থকারের প্রতি অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হইয়া তৎপর যুক্তি-প্রমাণ দ্বারা উহা খণ্ডন করিয়াছেন। হয়ত কেহ এই ভ্রান্ত মতবাদগুলি পাঠ করিবে এবং উহা তাহার অন্তরে বদ্ধমূল হইয়া পড়িবে। হযরত ইয়াহইয়া ইব্‌ন মুঈন বলিলেন : কাহারও নিকট আমি কিছু প্রত্যাশা করি না। কিন্তু বাদশাহ আমাকে কিছু দান করিলে আমি তাহা গ্রহণ করিব। ইহাতে হযরত ইমাম সাহেব (রহঃ) তাঁহার প্রতি অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হইলেন; এমনকি তাঁহার সহিত কথাবার্তা বন্ধ করিয়া দিলেন। তিনি তখন হযরত ইমাম সাহেব (রহঃ)-র নিকট ক্ষমা চাহিয়া বলিলেন : আমি ঠাট্টা করিতেছিলাম। হযরত ইমাম সাহেব (রহঃ) বলিলেন : হালাল জীবিকা ভোগ করা ধর্মের বিধান। কিন্তু ধর্ম-বিষয়ে ঠাট্টা করা সঙ্গত নহে।
কেহ কেহ আবার সর্বপ্রকার পাপীকেই দয়ার চোখে দেখিতেন। কিন্তু এইরূপ দয়ার নিয়্যত সর্বদা পরিবর্তনশীল। কারণ, তাওহীদের প্রতি যাঁহার লক্ষ্য, তিনি আল্লাহর প্রবল প্রতাপান্বিত কবলে সকলকেই অস্থির অবস্থায় দেখিতে পান এবং সকলকেই দয়ার চোখে দেখিয়া থাকেন। এইরূপ মনোভাব খুব বড় কথা। কিন্তু নির্বোধ লোকদের ইহাতে ধোকায় পতিত হওয়ার সম্ভাবনা রহিয়াছে। কারণ, এমন লোকও আছে, যে অপরের পাপ ও উৎপীড়নের প্রতি গুরুত্ব প্রদান না করিয়া অম্লান বদনে সহ্য করিয়া যায়। কিন্তু নির্বোধ ব্যক্তি ইহাকে তাওহীদের প্রভাব বলিয়া মনে করিয়া থাকে। অথচ তাওহীদের লক্ষণ এই যে, কেহ প্রহার করিলে, ধন-সম্পদ কাড়িয়া লইলে, অপমান করিলে অথবা গালি দিলে ক্রোধের সঞ্চার হয় না; বরং তিনি মনে করেন যে, সমস্তই আল্লাহর তরফ হইতে ঘটিতেছে এবং উহাতে মানুষের কোন হাত নাই। অতএব কাহারও প্রতি ক্রুদ্ধ না হইয়া তিনি তাহাদিগকে দয়ার চোখে দেখিয়া থাকেন। যেমন কাফিরগণ উহুদের যুদ্ধে যখন রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর দান্দান (দাঁত) মুবারক প্রস্তরাঘাতে ভাঙ্গিয়া ফেলে এবং ফলে তাঁহার নূরাণী চেহারা মুবারক রক্তাপ্লুত হইয়া যায়। তখন তিনি তাহাদের প্রতি ক্রুদ্ধ না হইয়া এই দু'আ করিতে লাগিলেন :
>“ইয়া আল্লাহ্! আমার কওমকে হিদায়ত করুন। কারণ, নিশ্চয়ই তাহারা অজ্ঞান।”
কিন্তু এমন যদি হয় যে, নিজের প্রতি অত্যাচার হইলে ক্রুদ্ধ হইয়া থাকে এবং আল্লাহর নাফরমানী করিলে নীরব থাকে, তবে ইহা ধর্ম-বিষয়ে গুরুত্ব প্রদানের অভাব, কপটতা ও বোকামি বলিয়া গণ্য হইবে। ইহা তাওহীদের লক্ষণ নহে। সুতরাং যাহার উপর তাওহীদ তত প্রবল হইয়া উঠে নাই এবং সে পাপীকে পাপের দরূন অন্তরে শত্রু জ্ঞান করে না, ইহা তাহার ঈমানের দুর্বলতা ও পাপীর সহিত তাহার বন্ধুত্বের প্রমাণ। যেমন, কেহ তোমার বন্ধুকে মন্দ বলিলে তুমি যদি ইহাতে ক্রুদ্ধ না হও তবে বুঝা যাইবে যে, তোমার বন্ধুত্ব খাঁটি নহে।

হকদারের হক (৩) আল্লাহর প্রতি মহব্বতের দ্বিবিধ কারণ


হকদারের হক পর্ব- ৩
📚সৌভাগ্যের পরশমণি   ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
আল্লাহর প্রতি মহব্বতের দ্বিবিধ কারণ
প্রথম, মানবের প্রতি পরম করুণাময় আল্লাহর ইহলৌকিক ও পারলৌকিক দানের কারণে মহব্বত; দ্বিতীয়, কেবল আল্লাহর জন্যই আল্লাহ্‌কে ভালবাসা। কোন বস্তু বা উদ্দেশ্যের সহিত উহার আদৌ কোন সংশ্রব নাই। ইহা অতি উচ্চ স্তরের মহব্বত। এই গ্রন্থের পরিত্রাণ খণ্ডে ‘মহব্বত' অধ্যায়ে ইহার বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হইবে। মোট কথা, ঈমানের বল অনুপাতে আল্লাহর মহব্বত প্রবল হইয়া থাকে। ঈমান যত বলবান হইবে মহব্বতও ততই প্রবল ও প্রগাঢ় হইয়া উঠিবে। তৎপর ইহা আল্লাহর প্রিয়জনের মধ্যে সঞ্চারিত হইবে। স্বার্থ ও উপকারের কারণে ভালবাসার উদ্রেক হইলে পূর্বকালীন নবী ও ওলীগণের প্রতি কাহারও ভালবাসা জন্মিত না। অথচ তাঁহাদের প্রতি ভালবাসা সকল মুসলমানের অন্তরেই রহিয়াছে। সুতরাং ধর্মপথের দিশারী আলিম, সূফী, সংসারবিরাগী এবং তাঁহাদের খাদিম ও বন্ধুগণের প্রতি যে ভালবাসা জন্মে, তাহা আল্লাহর উদ্দেশ্যেই হইয়া থাকে বলিতে হইবে। কিন্তু আল্লাহর রাস্তায় মান-সম্ভ্রম ও ধন-দৌলত উৎসর্গ করার পরিমাণ দ্বারাই তাঁহার প্রতি মহব্বতের পরিমাণ নির্ণয় করা চলে। কাহারও ঈমান ও মহব্বত এত প্রবল যে, তিনি নিজের যথাসর্বস্ব একবারেই আল্লাহর রাস্তায় উৎসর্গ করিয়া দিয়া থাকেন। যেমন হযরত আবূবকর সিদ্দীক (রাঃ) তাঁহার যথাসর্বস্ব একবারেই আল্লাহর রাস্তায় দান করিয়াছিলেন। আবার কেহ এইরূপও হইয়া থাকেন যে, তাঁহার অর্ধেক ধন-সম্পদ আল্লাহর রাস্তায় উৎসর্গ করেন। যেমন, হযরত উমর (রাঃ) এইরূপ করিয়াছিলেন। আবার কেহ কেহ অল্প ধন-সম্পদই আল্লাহর রাস্তায় দান করিয়া থাকে। অল্পই হউক আর অধিকই হউক, কোন মুসলমানের হৃদয়ই এরূপ নিঃস্বার্থ ভালবাসা হইতে একবারে মুক্ত থাকিবে না।

হকদারের হক (২) আল্লাহর উদ্দেশ্যে ভালবাসার নিদর্শন


হকদারের হক পর্ব- ২
📚সৌভাগ্যের পরশমণি   ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
আল্লাহর উদ্দেশ্যে ভালবাসার নিদর্শন
একই মক্তব, মাদ্রাসা বা গ্রামে অবস্থান অথবা ভ্রমণে একত্রে থাকার কারণে যে ভালবাসার উৎপত্তি হয় তাহা আল্লাহর উদ্দেশ্যে ভালবাসার অন্তর্ভুক্ত নহে। আবার দেখিতে মনোহর, বচনে মিষ্টভাষী এবং অন্তরে সরল ও অকপট হওয়ার দরুন অপরের প্রতি যে ভালবাসার উদ্রেক হয়, তাহাও আল্লাহর উদ্দেশ্যে ভালবাসার অন্তর্ভুক্ত নহে। কাহারও সাহায্যে পদমর্যাদা কিংবা ধন-সম্পদ লাভ হইলে অথবা কাহারও সহিত সাংসারিক কোন কার্যে নিবদ্ধ থাকিলে যে ভালবাসা জন্মে তাহাও আল্লাহ্ উদ্দেশ্যে ভালবাসার অন্তর্গত নহে।
আল্লাহ্ ও আখিরাতের উপর যাহার ঈমান নাই তাহার সহিতও এইরূপ ভালবাসা জন্মিতে পারে। ঈমান ব্যতীত আল্লাহর উদ্দেশ্যে ভালবাসা হইতে পারে না।
আল্লাহ্ উদ্দেশ্যে ভালবাসার দুইটি সোপান আছে।
প্রথম সোপান : আল্লাহর উদ্দেশ্যে স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ভালবাসা। কিন্তু এই স্বার্থ ধর্ম আল্লাহর জন্য হইতে হইবে। যেমন ধর্মবিদ্যা শিক্ষা দেন বলিয়া উস্তাদকে ভালবাসা। এই বিদ্যার উদ্দেশ্য পরকাল হইলে এবং সাংসারিক পদমর্যাদা ও ধনলাভের জন্য না হইলেও উস্তাদের প্রতি ভালবাসাকে আল্লাহর ওয়াস্তে ভালবাসা বলা যাইবে। কিন্তু পর্থিব মান-মর্যাদা ও ধন-দৌলত লাভ করা, বিদ্যা অর্জনের উদ্দেশ্যে হইলে উহাকে আল্লাহর ওয়াস্তে বলা যাইবে না। সদকা প্রদানকারী যদি এমন লোককে ভালবাসে যে তাহার নিকট হইতে সদকা গ্রহণপূর্বক শর্তানুসারে গরীব-দুঃখীদিগকে উহা পৌছাইয়া দেয় কিংবা তাহাদের আতিথ্য করিয়া থাকে অথবা এমন লোককে যদি ভালবাসে যে গরীব-দুঃখীদের জন্য উত্তমরূপে খাদ্য পাকাইয়া থাকে তবে এই ভালবাসা আল্লাহর ওয়াস্তে বলিয়া গণ্য হইবে। যে ব্যক্তি খাদ্য-বস্ত্র প্রদান করতঃ নিরুদ্বেগে ও একাগ্রচিত্তে ইবাদত করিবার সুযোগ দান করে তাহার প্রতি ভালবাসাও আল্লাহর ওয়াস্তে ভালবাসার মধ্যে গণ্য হইবে। কিন্তু শর্ত এই যে, খাদ্য-বস্ত্ৰ পাইয়া নিশ্চিত মনে ইবাদত করিবার উদ্দেশ্য থাকিতে হইবে। বহু আলিম ও আবিদ এই উদ্দেশ্যে ধনীদের সহিত বন্ধুত্ব স্থাপন করিয়া থাকেন এবং ফলে উভয় দলই আল্লাহর ভালবাসা লাভ করিয়া থাকেন।
মন্দ কার্য হইতে স্বামীকে বাঁচাইবে এবং এমন সন্তান জন্মিবার উপলক্ষ হইবে যে পিতার মঙ্গলের জন্য যুদ্ধ করিবে, এই কারণে স্বীয় স্ত্রীকে ভালবাসিলে এই ভালবাসাও আল্লাহর উদ্দেশ্যে ভালবাসা বলিয়া গণ্য হইবে এবং এইরূপ স্ত্রীকে ভরণ-পোষণের ব্যয়ও সদকার মধ্যে গণ্য। ভৃত্য প্রভুর খেদমত করে এবং সে তাহার কার্যভার গ্রহণপূর্বক প্রভূকে নিশ্চিন্ত মনে ইবাদতের অবসর প্রদান করে বলিয়া ভৃত্যকে ভালবাসিলে ইবাদতে অবসর করার দরুন ভৃত্যের প্রতি যে ভালবাসাটুকু হয়, তাহা আল্লাহর উদ্দেশ্যে ভালবাসা বলিয়া গণ্য হইবে এবং উহার সওয়াবও পাওয়া যাইবে।
দ্বিতীয় সোপান : যে ভালবাসা নিঃস্বার্থভাবে একমাত্র আল্লাহর ওয়াস্তেই হইয়া থাকে এবং যাহাতে উভয় পক্ষের অন্য কোন প্রকার স্বার্থের লেশমাত্রও থাকে না, উহাই এই উচ্চ সোপানের ভালবাসা। ইহা পূর্বোক্ত স্বার্থসংশ্লিষ্ট ভালবাসা অপেক্ষা উৎকৃষ্টতর। শিক্ষা প্রদান, শিক্ষা গ্রহণ, ইবাদতে অবসরলাভ এবং বিধ কোন প্রকার স্বার্থই ইহাতে থাকে না। আল্লাহর আজ্ঞানুবর্তী ও তাঁহার প্রিয়পাত্র বলিয়া কাহাকেও ভালবাসিলে ইহাকে এই শ্রেণীর ভালবাসা বলে। কিংবা অন্ততঃপক্ষে ইহা মনে করিয়াও যদি কেহ কাহাকেও ভালবাসে যে, এই ব্যক্তি আল্লাহর বান্দা, তাঁহারই সৃষ্টি, তবে ইহাও আল্লাহর ওয়াস্তে বন্ধুত্বের অন্তর্ভুক্ত এবং ইহার বড় সওয়াব পাওয়া যাইবে। কারণ, এইরূপ ভালবাসা আল্লাহর প্রতি এমন মহব্বত হইতে জন্মিয়া থাকে যাহা ইশকের পর্যায়ে উন্নীত হইয়াছে। যেমন, কেহ কাহারও প্রতি আশিক হইলে সে মাশুকের অলি-গলি এবং তাহার মহল্লাকেও ভালবাসে। আর প্রিয়জনের গৃহ প্রাচীরও তাহার নিকট প্রিয় হইয়া পড়ে। এমন কি যে কুকুর প্রিয়জনের গলিতে যাতায়াত করে, ইহাও অন্যান্য কুকুর অপেক্ষা উক্ত আশিকের নিকট অধিক প্রিয় হইয়া উঠে। অতএব যাহারা তাহার প্রেমাষ্পদকে ভালবাসে অথবা যাহাদিগকে তাহার প্রেমাষ্পদ ভালবাসে তাহাদিগকে, এমন কি যাহারা প্রেমাষ্পদের আজ্ঞানুবর্তী চাকর-বাকর, দাস-দাসী তাহাদিগকে এবং তাহার আত্মীয়-স্বজনকেও প্রেমিক স্বতঃই ভালবাসিয়া থাকে। কারণ, প্রেমাম্পদের সহিত সংশ্লিষ্ট সম্বন্ধযুক্ত বস্তু ও ব্যক্তির প্রতি ভালবাসা স্বতঃই প্রেমিকের অন্তরে অনুপ্রবেশ করে। প্রিয়জনের প্রতি প্রেম যত অধিক, তাহার সহিত সংশ্লিষ্ট ও তাহার অনুগত ব্যক্তিগণের প্রতিও সেই প্রেমের প্রতিক্রিয়ারূপ ভালবাসা তত অধিক হইয়া থাকে ।
সুতরাং যাহার অন্তরে আল্লাহর মহব্বত বৃদ্ধি পাইয়া ইশকের পর্যায়ে উন্নীত হইয়াছে তিনি সাধারণভাবে তাঁহার সমস্ত বান্দাকে এবং বিশেষভাবে তাঁহার প্রিয়পাত্রগণকে ভালবাসিয়া থাকেন। সমস্ত মাখলুকাত স্বীয় প্রেমাস্পদের অপরিসীম শক্তির পরিচায়ক ও তাঁহার শিল্পনৈপুণ্যের জ্বলন্ত নিদর্শন, এইজন্য তিনি এই সমস্তকেই ভালবাসিয়া থাকেন। অপর কারণ এই যে, আশিক মাশুকের হস্তলিপি ও শিল্পকলাকেও ভালবাসিয়া থাকে।
রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর সমীপে কেহ নূতন ফল আনয়ণ করিলে তিনি উহার সম্মান করিতেন এবং স্বীয় চক্ষু মুবারকে লাগাইয়া বলিতেন যে, উহার সৃষ্টিকাল আল্লাহর নিকটবর্তী অর্থাৎ উহা প্রকৃত শিল্পী আল্লাহর নূতন শিল্প নৈপূণ্য।

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...