নির্জনবাস (পর্ব- ২)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দীন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দীন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
নির্জনবাস সম্পর্কে বিভিন্ন মাযহাবের দলীল—
এ সম্পর্কে মতভেদ এত গভীর যে, তাবেয়ীগণের মধ্যেও তা প্রকাশ পেয়েছে। সেমতে সুফিয়ান সওরী, ইবরাহীম ইবনে আদহাম, দাউদ তায়ী, ইবনে আয়ায, সোলায়মান খাওয়াস, ইউসুফ ইবনে আসবাত, হুযায়ফা মারআশী এবং বিশরে হাফীর মাযহাব হল, নির্জনবাস অবলম্বন করা উচিত। এটা মেলামেশার চেয়ে উত্তম।
পক্ষান্তরে সায়ীদ ইবনে মুসাইয়িব, শা'বী, ইবনে আবী লায়লা, হেশাম ইবনে ওরওয়া, ইবনে শাৰরামা, শোরায়হ, শরীফ ইবনে আবদুল্লাহ, ইবনে ওয়ায়না, ইবনে মোবারক, শাফেয়ী, আহমদ ইবনে হাম্বল ও অন্যান্য আলেম অধিকাংশ তাবেয়ীর এই অভিমত পছন্দ করেন যে, মেলামেশা করা, অনেক বন্ধু করা, মুমিনদের মধ্যে সম্প্রীতি হওয়া, ধর্মের কাজে তাদের সাহায্য নেয়া মোস্তাহাব।
আলেমগণ এ সম্পর্কে কতকগুলো মিশ্র বাক্য প্রয়োগ করেছেন। কোন কোন বাক্য দ্বারা উভয় মাযহাবের মধ্য থেকে কোন এক মাযহাবের প্রতি ঝোক এবং কোন কোন উক্তি দ্বারা ঝোকের কারণ বুঝা যায়। এখন প্রথম প্রকার উক্তিসমূহ লিপিবদ্ধ করা হচ্ছে। দ্বিতীয় প্রকার উক্তি অনিষ্ট ও উপকারিতার আলোচনায় লিপিবদ্ধ করা হবে।
হযরত ওমর (রাঃ) বলেনঃ তোমরা সকলেই নির্জনবাস থেকে আপন আপন অংশ গ্রহণ কর।
হযরত ইবনে সীরীন (রঃ) বলেন : নির্জনবাস এবাদত।
হযরত ফোযায়ল (রহঃ) বলেন : আল্লাহ তাআলা বন্ধু হওয়ার জন্যে, কোরআন সঙ্গী হওয়ার জন্যে এবং মৃত্যু উপদেশদাতা হওয়ার জন্যে যথেষ্ট। আল্লাহকে সাথী করে নাও এবং মানুষকে এক তরফে রাখ।
'আবুর রবী’ দরবেশ দাউদ তায়ীকে বলল ও আমাকে উপদেশ দিন। তিনি বললেন : দুনিয়ায় রোযা এবং আখেরাত ইফতারের জন্যে রাখ। মানুষের কাছ থেকে এমনভাবে পলায়ন কর, যেমন মানুষ ব্যাঘ্র থেকে পলায়ন করে।
হযরত হাসান বসরী (রহঃ) বলেন : তওরাতের কিছু বাক্য আমার স্মরণ আছে- তা হল, মানুষ অল্পে তুষ্ট হলে স্বাবলম্বী হয়। মানুষের কাছ থেকে আলাদা হলে আপদমুক্ত থাকে। কামপ্রবৃত্তি বর্জন করলে স্বাধীন হয়। হিংসা বর্জন করলে ভদ্ৰ হয়। অল্পে সবর করে অনেক মুনাফা অর্জন করে।
ওহায়ব ইবনুল ওয়ারদ বলেন : আমি শুনেছি, হেকমতের দশটি অংশ আছে। তন্মধ্যে নয়টি চুপ থাকা এবং একটি নির্জনবাস অবলম্বন করার মধ্যে।
সুফিয়ান সওরী বলেন : এখন আপন গৃহে নিশ্চুপ বসে থাকার দিন এসেছে।
কথিত আছে, হযরত মালেক ইবনে আনাস (রাঃ) জানাযায় আসতেন, রোগীদের হাল জিজ্ঞেস করতেন। এবং বন্ধুবর্গের সাথে সাক্ষাৎ করতেন। কিন্তু আস্তে আস্তে সবগুলো বর্জন করলেন। তিনি বলতেন মানুষ তার সকল ওযরই বর্ণনা করবে- এটা সহজ বিষয় নয়।
হযরত ওমর ইবনে আবদুল আযীয (রহঃ)-কে কেউ বলল : আপনি আমাদের জন্যে কিছু ফুরসত বের করলে ভাল হত। তিনি বললেন : ফুরসত বিদায় হয়ে গেছে। এখন আল্লাহ তাআলার কাছেই ফুরসত পাওয়া যাবে।
ফোযায়ল বলেন : মানুষ যদি পথিমধ্যে দেখা হলে আমাকে সালাম না করে এবং আমি অসুস্থ হলে আমার হাল জিজ্ঞেস না করে, তবে আমি তাদের কাছে ঋণী থাকব।
আবু সোলায়মান দারানী বলেন : রবী ইবনে খায়সাম তার গৃহের দরজায় উপবিষ্ট ছিলেন, এমন সময় একটি পাথর এসে তার বুকে আঘাত করল এবং রক্তাক্ত করে দিল। তিনি বুকের রক্ত মুছতে মুছতে বলেছিলেন- হে রবী, এখন তো তোর উপদেশ হয়ে গেছে। অতঃপর তিনি গৃহের অভ্যন্তরে চলে গেলেন এবং জানাযা বের হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত কখনও দরজায় বসলেন না।
বশীর ইবনে আবদুল্লাহ্ বলেন : মানুষের সাথে পরিচয় কম কর। কেননা তুমি জান না, কেয়ামতে তোমার কি অবস্থা হবে? যদি লাঞ্ছনা হয়, তবে তোমার পরিচিত জন কম হলেই উত্তম।
জনৈক শাসক হাতেম আসাম্মের কাছে গিয়ে বলল : আমার কাছে আপনার কোন কাজ থাকলে বলুন তিনি বললেন : বড় কাজ হচ্ছে, তুমি আমাকে দেখোনা এবং আমি তোমাকে দেখব না।
এক ব্যক্তি সহল তস্তরী (রহঃ)-কে বলল, আমি আপনার কাছে থাকার ইচ্ছা রাখি। তিনি বললেন : যখন আমাদের উভয়ের মধ্যে একজন মারা যাবে, তখন কে সাথে থাকবে? তখন যে সাথে থাকে, তার কাছেই তোমার থাকা উচিত।
ফোষায়লকে কেউ বলল : আপনার পুত্র আলী বলে- হায়, আমি যদি এমন জায়গায় থাকতাম, যেখান থেকে আমি মানুষকে দেখতাম, কিন্তু মানুষ আমাকে দেখত না। একথা শুনে ফোযায় কেঁদে ফেললেন এবং বললেন : আলীর জন্যে আফসোস, সে কথা বলেছে, কিন্তু অসম্পূর্ণ বলেছে। পূর্ণ কথা তখন হত, যখন বলত, না আমি কাউকে দেখতাম, না কেউ আমাকে দেখত। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন : সেই মজলিস সর্বোত্তম, যা তোমার গৃহের অভ্যন্তরে হয়। সেখানে তুমি কাউকে দেখ না এবং কেউ তোমাকে দেখে।
মোট কথা, নির্জনবাসের প্রতি যারা আকৃষ্ট ছিলেন, এগুলো তাদের উক্তি। এখন উভয় পক্ষের প্রমাণাদি উল্লেখ করা সমীচীন মনে হয়।
পরবর্তী পর্ব-









