রবিবার, ২৬ নভেম্বর, ২০২৩

নির্জনবাস - (৩) মেলামেশা পছন্দকারীদের প্রমাণ



নির্জনবাস (পর্ব- ৩)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দীন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

মেলামেশা পছন্দকারীদের প্রমাণ-—
কোরআন পাকে আল্লাহ্ তা'আলা বলেন,-
>"তোমরা তাদের মত হয়ো না যারা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে এবং মতভেদ করেছে।" অন্য আয়াতে বলা হয়েছে -
>"তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ স্মরণ কর, যখন তোমরা পরস্পরে শত্রু ছিলে, অতঃপর আল্লাহ্ তোমাদের অন্তরে সম্প্রীতি সৃষ্টি করেছেন।"
এ আয়াতে আল্লাহ তাআলা মানুষের প্রতি স্বীয় অনুগ্রহ বর্ণনা করেছেন যে, তাদের মধ্যে সম্প্রীতির কারণ সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু এসব প্রমাণ দুর্বল। কেননা, প্রথম আয়াতে বিচ্ছিন্ন হওয়ার অর্থ কোরআন পাক ও শরীয়তের মূলনীতিতে মতের বিভিন্নতা, মাযহাবসমূহের মতবিরোধ। দ্বিতীয় আয়াতে সম্প্রীতি স্থাপনের মানে হচ্ছে, অন্তর থেকে সেসব হিংসা-দ্বেষ বের করে দেয়া, যা গোলযোগ ও কলহ-বিবাদের কারণ হয়ে থাকে। নির্জনবাস এসব বিষয়ের পরিপন্থী নয়। নির্জনবাসের মধ্যে এগুলো হতে পারে।
তাদের দ্বিতীয় দলীল এই হাদীস "ঈমানদার বন্ধুত্ব করে এবং তার সাথে বন্ধুত্ব করা হয়। যে বন্ধুত্ব করে না এবং যার সাথে বন্ধুত্ব করা হয় না, তার মধ্যে কল্যাণ নেই।"
দলীলটিও দুর্বল। এতে অসচ্চরিত্রতার অনিষ্টের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে, যার কারণে বন্ধুত্ব হতে পারে না। যে চরিত্রবান ব্যক্তি মেলামেশা করলে অপরের সাথে বন্ধুত্ব করে এবং অপরও তার সাথে বন্ধুত্ব করে; কিন্তু নিজের নিরাপত্তা ও সংশোধনের নিমিত্ত মেলামেশা বর্জন করে, এ হাদীসে তাকে বোঝানো উদ্দেশ্য নয়।
তৃতীয় দলীল এই- রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন-
>"যে দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মৃত্যু বরণ করে, তার মৃত্যু মূর্খতা যুগের মৃত্যুর মত।"
অন্য এক হাদীসে আছে -
>"মুসলমানদের ইসলামে সুসংহত থাকা অবস্থায় যে মুসলমানদের বিরোধিতা করে, সে তার গর্দান থেকে ইসলামের জাল ছিন্ন করে দেয়।"
এ দলীলটিও অগ্রাহ্য। কেননা, এখানে দলের অর্থ সেই দল, যে একজন ইমামের বয়াতে একমত। অতএব যে এই দলের বিরোধিতা করবে সে বিদ্রোহী বলে গণ্য হবে। কাজেই বিচ্ছিন্ন হওয়ার অর্থ মতবিরোধ করা। এই হাদীসে নির্জনবাসের কোন উল্লেখ নেই।
চতুর্থ দলীল, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) তিন দিনের বেশী সাক্ষাৎ বর্জন করতে নিষেধ করেছেন। সেমতে তিনি বলেন
>"যে তার ভাইকে তিন দিনের বেশী সময় ত্যাগ করে এবং মরে যায়, সে দোযখে যাবে।" তিনি আরও বলেন :
>"কোন মুসলমানের জন্যে হালাল নয় যে, সে তার ভাইকে তিন দিনের বেশী ত্যাগ করবে। তাদের মধ্যে যে আগে সাক্ষাৎ করবে, সে জান্নাতে যাবে।" আরও বলা হয়েছে -
>"যে তার ভাইকে ছয় দিনের বেশী ত্যাগ করে, সে তার ঘাতকের মত।" সুতরাং কেউ নির্জনবাস করলে সে তার বন্ধু ও পরিচিত জনকে ত্যাগ করবে, যা এসব হাদীসদৃষ্টে নিষিদ্ধ। কিন্তু এ দলীলও গ্রহণযোগ্য নয়। কেননা, এই ত্যাগ করার অর্থ অসন্তুষ্ট হয়ে কথা বলা, সালাম করা ও মামুলী মেলামেশা বর্জন করা। অসন্তুষ্টি ছাড়া মেলামেশা বর্জন করা এ হাদীসের অন্তর্ভুক্ত নয়। এছাড়া দুই স্থানে তিন দিনের বেশীও মেলামেশা বর্জন করা জায়েয।
এক, যদি জানা যায়, তিন দিনের বেশী ত্যাগ করলে প্রতিপক্ষ সঠিক পথে এসে যাবে এবং দুই, যদি মেলামেশা বর্জন করার মধ্যেই নিরাপত্তা নিহিত আছে বলে মনে করা হয়। হাদীসের নিষেধাজ্ঞা যদিও ব্যাপক, কিন্তু এ দু'টি স্থান এর ব্যতিক্রম। কেননা, হযরত আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) তাঁকে যিলহজ্জ, মহররম ও সফর মাসের কিছু দিন পর্যন্ত বর্জন করেছিলেন। হযরত ওমর (রাঃ) বর্ণনা করেন- রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আপন পত্নীগণকে এক মাস পর্যন্ত ত্যাগ করেছিলেন। তিনি কসম খেয়ে তাঁদের থেকে পৃথক হয়ে উপরের কক্ষে চলে গিয়েছিলেন, যেখানে তার খাদ্য রাখা হত। সেখানে উনত্রিশ দিন অবস্থান করার পর যখন তিনি নীচের তলায় নেমে আসেন, তখন আরজ করা হল, আপনি তো উনত্রিশ দিন অবস্থান করেছেন। তিনি বললেন : মাস কখনও ঊনত্রিশ দিনেও হয়। হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর রেওয়ায়েতে রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন- কোন মুসলমানের জন্য হালাল নয় যে, সে তার ভাইকে তিন দিনের বেশী ত্যাগ করবে, কিন্তু তখন, যখন তার অনিষ্ট থেকে নিরাপদ না থাকে। এ হাদীসে ব্যতিক্রমের স্পষ্ট উল্লেখ আছে। এর উপর ভিত্তি করেই হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন : নির্বোধ থেকে আলাদা থাকা উচিত। কেননা, নির্বুদ্ধিতার প্রতিকার সম্ভবপর নয়। মুহাম্মদ ইবনে ওমর ওয়াকেদীর সম্মুখে কেউ বলল, এক ব্যক্তি অন্য এক ব্যক্তির সাথে সাক্ষাৎ করেনি। তিনি বললেন : এ কাজটি পূর্ববর্তীদের মধ্যেও কয়েকজন বুযুর্গ করেছেন। সেমতে সা’দ ইবনে ওয়াক্কাস (রাঃ) আম্মার ইবনে ইয়াসির (রাঃ)-এর সাথে সাক্ষাৎ বর্জন করে ওফাত পর্যন্ত তা অব্যাহত রাখেন। হযরত ওসমান গনী (রাঃ), হযরত আবদুর রহমান ইবনে আওফের সাথে সাক্ষাৎ করতেন না এবং হযরত আয়েশা (রাঃ) হযরত হাফসা (রাঃ)-কে বর্জন করে রেখেছিলেন। এসব সাক্ষাৎ বর্জন এই অর্থে ছিল যে, এই বুযুর্গগণ নিজেদের নিরাপত্তা এর মধ্যেই দেখেছিলেন।
পঞ্চম দলীল, এক ব্যক্তি এবাদতের জন্যে পাহাড়ে চলে গেলে লোকেরা তাকে ধরে রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর খেদমতে হাযির করল। তিনি বললেন : এরূপ করো না এবং তোমাদের কেউ যেন এরূপ না করে। সম্ভবতঃ এটা বলার কারণ ছিল, ইসলামের প্রথম যুগে জেহাদ অত্যাবশ্যকীয় ছিল। নির্জনবাসের কারণে জেহাদ বাদ পড়ে যেত। সেমতে হযরত আবু হোরায়রা (রাঃ) বলেন : রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর পবিত্র যুগে আমরা জেহাদের জন্যে বের হলাম। আমরা একটি উপত্যকা দিয়ে যাচ্ছিলাম। সেখানে নির্মল পানির একটি ছোট ঝরনা ছিল। আমাদের মধ্য থেকে এক ব্যক্তি বলল। আমি লোকজন থেকে আলাদা হয়ে এখানে একান্তে বাস করলে চমৎকার হত। কিন্তু রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম)-এর সাথে আলোচনা না করে এরূপ করব না। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) তাকে বললেন? এরূপ করো না। কেননা, আল্লাহর পথে তোমাদের অবস্থান করা আপন গৃহে ষাট বছর এবাদত করার চেয়ে উত্তম। আল্লাহ তোমাদেরকে ক্ষমা করুন এবং তোমরা জান্নাতে দাখিল হও, এটা কি তোমরা চাও না? আল্লাহর পথে জেহাদ কর। দুধের ধারাসমূহ বের করার মাঝখানে যতটুকু সময় থাকে, ততটুকু সময় যে আল্লাহর পথে জেহাদ করবে, আল্লাহ তাকে জান্নাতে দাখিল করবেন।
ষষ্ঠ দলীল, হযরত মুআয ইবনে জাবালের রেওয়ায়েতে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ
>"শয়তান মানুষের বাঘ। সে মানুষকে ছাগলের বাঘের ন্যায় গ্রাস করে। গ্রাস করে তাকে, যে দূরে থাকে, যে কিনারায় থাকে এবং যে একা থাকে। তোমরা ছত্রভঙ্গ হওয়া থেকে বেঁচে থাক। সকলের সাথে থাক এবং জমাত ও মসজিদের সাথে থাক।" এ হাদীসে নির্জনবাস তার জন্যে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যে জ্ঞানার্জনের পূর্বে নির্জনবাস অবলম্বন করে। এর বর্ণনা পরে আসবে।

পরবর্তী পর্ব-

নির্জনবাস - (২) নির্জনবাস সম্পর্কে বিভিন্ন মাযহাবের দলীল



নির্জনবাস (পর্ব- ২)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দীন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

নির্জনবাস সম্পর্কে বিভিন্ন মাযহাবের দলীল—
এ সম্পর্কে মতভেদ এত গভীর যে, তাবেয়ীগণের মধ্যেও তা প্রকাশ পেয়েছে। সেমতে সুফিয়ান সওরী, ইবরাহীম ইবনে আদহাম, দাউদ তায়ী, ইবনে আয়ায, সোলায়মান খাওয়াস, ইউসুফ ইবনে আসবাত, হুযায়ফা মারআশী এবং বিশরে হাফীর মাযহাব হল, নির্জনবাস অবলম্বন করা উচিত। এটা মেলামেশার চেয়ে উত্তম।
পক্ষান্তরে সায়ীদ ইবনে মুসাইয়িব, শা'বী, ইবনে আবী লায়লা, হেশাম ইবনে ওরওয়া, ইবনে শাৰরামা, শোরায়হ, শরীফ ইবনে আবদুল্লাহ, ইবনে ওয়ায়না, ইবনে মোবারক, শাফেয়ী, আহমদ ইবনে হাম্বল ও অন্যান্য আলেম অধিকাংশ তাবেয়ীর এই অভিমত পছন্দ করেন যে, মেলামেশা করা, অনেক বন্ধু করা, মুমিনদের মধ্যে সম্প্রীতি হওয়া, ধর্মের কাজে তাদের সাহায্য নেয়া মোস্তাহাব।
আলেমগণ এ সম্পর্কে কতকগুলো মিশ্র বাক্য প্রয়োগ করেছেন। কোন কোন বাক্য দ্বারা উভয় মাযহাবের মধ্য থেকে কোন এক মাযহাবের প্রতি ঝোক এবং কোন কোন উক্তি দ্বারা ঝোকের কারণ বুঝা যায়। এখন প্রথম প্রকার উক্তিসমূহ লিপিবদ্ধ করা হচ্ছে। দ্বিতীয় প্রকার উক্তি অনিষ্ট ও উপকারিতার আলোচনায় লিপিবদ্ধ করা হবে।
হযরত ওমর (রাঃ) বলেনঃ তোমরা সকলেই নির্জনবাস থেকে আপন আপন অংশ গ্রহণ কর।
হযরত ইবনে সীরীন (রঃ) বলেন : নির্জনবাস এবাদত।
হযরত ফোযায়ল (রহঃ) বলেন : আল্লাহ তাআলা বন্ধু হওয়ার জন্যে, কোরআন সঙ্গী হওয়ার জন্যে এবং মৃত্যু উপদেশদাতা হওয়ার জন্যে যথেষ্ট। আল্লাহকে সাথী করে নাও এবং মানুষকে এক তরফে রাখ।
'আবুর রবী’ দরবেশ দাউদ তায়ীকে বলল ও আমাকে উপদেশ দিন। তিনি বললেন : দুনিয়ায় রোযা এবং আখেরাত ইফতারের জন্যে রাখ। মানুষের কাছ থেকে এমনভাবে পলায়ন কর, যেমন মানুষ ব্যাঘ্র থেকে পলায়ন করে।
হযরত হাসান বসরী (রহঃ) বলেন : তওরাতের কিছু বাক্য আমার স্মরণ আছে- তা হল, মানুষ অল্পে তুষ্ট হলে স্বাবলম্বী হয়। মানুষের কাছ থেকে আলাদা হলে আপদমুক্ত থাকে। কামপ্রবৃত্তি বর্জন করলে স্বাধীন হয়। হিংসা বর্জন করলে ভদ্ৰ হয়। অল্পে সবর করে অনেক মুনাফা অর্জন করে।
ওহায়ব ইবনুল ওয়ারদ বলেন : আমি শুনেছি, হেকমতের দশটি অংশ আছে। তন্মধ্যে নয়টি চুপ থাকা এবং একটি নির্জনবাস অবলম্বন করার মধ্যে।
সুফিয়ান সওরী বলেন : এখন আপন গৃহে নিশ্চুপ বসে থাকার দিন এসেছে।
কথিত আছে, হযরত মালেক ইবনে আনাস (রাঃ) জানাযায় আসতেন, রোগীদের হাল জিজ্ঞেস করতেন। এবং বন্ধুবর্গের সাথে সাক্ষাৎ করতেন। কিন্তু আস্তে আস্তে সবগুলো বর্জন করলেন। তিনি বলতেন মানুষ তার সকল ওযরই বর্ণনা করবে- এটা সহজ বিষয় নয়।
হযরত ওমর ইবনে আবদুল আযীয (রহঃ)-কে কেউ বলল : আপনি আমাদের জন্যে কিছু ফুরসত বের করলে ভাল হত। তিনি বললেন : ফুরসত বিদায় হয়ে গেছে। এখন আল্লাহ তাআলার কাছেই ফুরসত পাওয়া যাবে।
ফোযায়ল বলেন : মানুষ যদি পথিমধ্যে দেখা হলে আমাকে সালাম না করে এবং আমি অসুস্থ হলে আমার হাল জিজ্ঞেস না করে, তবে আমি তাদের কাছে ঋণী থাকব।
আবু সোলায়মান দারানী বলেন : রবী ইবনে খায়সাম তার গৃহের দরজায় উপবিষ্ট ছিলেন, এমন সময় একটি পাথর এসে তার বুকে আঘাত করল এবং রক্তাক্ত করে দিল। তিনি বুকের রক্ত মুছতে মুছতে বলেছিলেন- হে রবী, এখন তো তোর উপদেশ হয়ে গেছে। অতঃপর তিনি গৃহের অভ্যন্তরে চলে গেলেন এবং জানাযা বের হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত কখনও দরজায় বসলেন না।
বশীর ইবনে আবদুল্লাহ্ বলেন : মানুষের সাথে পরিচয় কম কর। কেননা তুমি জান না, কেয়ামতে তোমার কি অবস্থা হবে? যদি লাঞ্ছনা হয়, তবে তোমার পরিচিত জন কম হলেই উত্তম।
জনৈক শাসক হাতেম আসাম্মের কাছে গিয়ে বলল : আমার কাছে আপনার কোন কাজ থাকলে বলুন তিনি বললেন : বড় কাজ হচ্ছে, তুমি আমাকে দেখোনা এবং আমি তোমাকে দেখব না।
এক ব্যক্তি সহল তস্তরী (রহঃ)-কে বলল, আমি আপনার কাছে থাকার ইচ্ছা রাখি। তিনি বললেন : যখন আমাদের উভয়ের মধ্যে একজন মারা যাবে, তখন কে সাথে থাকবে? তখন যে সাথে থাকে, তার কাছেই তোমার থাকা উচিত।
ফোষায়লকে কেউ বলল : আপনার পুত্র আলী বলে- হায়, আমি যদি এমন জায়গায় থাকতাম, যেখান থেকে আমি মানুষকে দেখতাম, কিন্তু মানুষ আমাকে দেখত না। একথা শুনে ফোযায় কেঁদে ফেললেন এবং বললেন : আলীর জন্যে আফসোস, সে কথা বলেছে, কিন্তু অসম্পূর্ণ বলেছে। পূর্ণ কথা তখন হত, যখন বলত, না আমি কাউকে দেখতাম, না কেউ আমাকে দেখত। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন : সেই মজলিস সর্বোত্তম, যা তোমার গৃহের অভ্যন্তরে হয়। সেখানে তুমি কাউকে দেখ না এবং কেউ তোমাকে দেখে।
মোট কথা, নির্জনবাসের প্রতি যারা আকৃষ্ট ছিলেন, এগুলো তাদের উক্তি। এখন উভয় পক্ষের প্রমাণাদি উল্লেখ করা সমীচীন মনে হয়।

পরবর্তী পর্ব-

শনিবার, ২৫ নভেম্বর, ২০২৩

নির্জনবাস (১) নির্জনবাসের আদব



নির্জনবাস (পর্ব- ১)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দীন
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

নির্জনবাসের আদব—
প্রকাশ থাকে যে, নির্জনবাস ও মানুষের সাথে মেলামেশা- এ দু'য়ের মধ্যে কোন্‌টি উত্তম, এ সম্পর্কে মতভেদ রয়েছে। এতদুভয়ের প্রত্যেকটির মধ্যে কিছু কিছু অনিষ্ট আছে, যে কারণে মানুষ পছন্দের দৃষ্টিতে দেখে না। আবার অনেক গুণও আছে, যে কারণে মানুষ এগুলোর প্রতি উৎসুক হয়। নির্জনবাস অবলম্বনের প্রতি অনেক আবেদ ও দরবেশের ঝোক দেখা যায়। তারা একে মেলামেশার উপর অগ্রাধিকার দান করেন। আমরা পঞ্চম অধ্যায়ে মেলামেশা, ভ্রাতৃত্ব ও বন্ধুত্বের যে ফযীলত বর্ণনা করেছি, তা বাহ্যতঃ নির্জনবাসের বিপরীত, যার প্রতি অধিকাংশের ঝোঁক রয়েছে। তাই এ সম্পর্কে যা সত্য তা প্রকাশ করা জরুরী। পরবর্তী দু’টি পরিচ্ছেদে এ বিষয়টি বিধৃত হবে।

পরবর্তী পর্ব -

অন্তর বা হৃদয় (২৩) পরিবর্তনের দিক দিয়ে অন্তরের প্রকারভেদ



অন্তর বা হৃদয় (পর্ব- ২৩) 
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

পরিবর্তনের দিক দিয়ে অন্তরের প্রকারভেদ-
পূর্বে বর্ণিত হয়েছে যে, অন্তর বিভিন্ন পথে প্রভাবিত হয়ে থাকে। তন্মধ্যে এক অন্তর এমন, যার উপর চতুর্দিক থেকে তীর বর্ষিত হতে থাকে। একদিক থেকে কোন কিছুর প্রভাব তার উপর পড়লে দ্বিতীয় দিক থেকে তার বিপরীত কোন প্রভাব এসে যায়। ফলে প্রথম প্রভাব পরিবর্তিত হয়ে যায়। উদাহরণতঃ যদি শয়তান অন্তরকে মানসিক খেয়াল-খুশীর দিক থেকে টানে, তবে ফেরেশতা এসে তাকে সেই বিষয় থেকে বিরত রাখে। যদি এক শয়তান একটি মন্দ কাজ করতে বলে, তবে অন্য শয়তান তাকে অন্য দিকে টেনে নেয়। যদি এক ফেরেশতা অন্তরকে এক বস্তুর দিকে আকৃষ্ট করে, তবে অন্য ফেরেশতা অন্য বস্তুর দিকে উৎসাহিত করে। সুতরাং অন্তর কখনও দু'ফেরেশতার টানা হেচঁড়ার মধ্যে থাকে, কখনও দু'শয়তানের এবং কখনও এক ফেরেশতা ও এক শয়তানের পারস্পরিক দ্বন্দ্বের শিকার হয়, কিন্তু কোন সময়েই অবসর পায় না। নিম্নোক্ত আয়াতে এ বিষয়ের প্রতিই ইঙ্গিত করা হয়েছে
>“আমি তাদের হৃদয় ও নয়নযুগল পাল্টে দেই।”
আল্লাহ তাআলা অন্তরকে এক অভিনব বস্তুরূপে সৃষ্টি করেছেন এবং একে অনেক আশ্চর্যজনক বস্তু দ্বারা পূর্ণ করে রেখেছেন। এসব আশ্চর্যজনক বস্তু ও তার পরিবর্তন সম্পর্কে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম)-কে সম্যক অবহিত করা হয়েছিল। তাই তিনি প্রায়ই এভাবে কসম খেতেন : “অন্তর পরিবর্তনকারীর কসম।”
এছাড়া তিনি প্রায়ই এই দোয়া করতেন- “হে অন্তর পরিবর্তনকারী আল্লাহ! আমার অন্তরকে আপনার ধর্মের উপর প্রতিষ্ঠিত রাখুন।” 
সাহাবায়ে কেরাম আরজ করতেন- ইয়া রসূলাল্লাহ! (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) আপনিও অন্তরের ব্যাপারে ভীত? তিনি বলতেন- আল্লাহ ইচ্ছা করলে অন্তরকে সোজা রাখেন এবং বক্র করতে চাইলে বক্র করে দেন। 
এক রেওয়ায়েতে আছে— অন্তর চড়ুই পাখীর মত সর্বক্ষণ নাচানাচি করতে থাকে। হাদীসে অন্তরের আরও দুটি দৃষ্টান্ত বর্ণিত হয়েছে। এক জায়গায় বলা হয়েছে
>“পরিবর্তনের ব্যাপারে অন্তর ডেগের মত, যখন তাতে খুব স্ফুটন আসে।
অন্য এক জায়গায় বলা হয়েছে :
>“অন্তর জঙ্গলের পাখীর মত, যাকে ঝড়ের বায়ু ওলট পালট করতে থাকে”। 
যারা আপন আপন অন্তরের অবস্থা দেখা-শুনা করে এবং মোরাকাবায় মগ্ন থাকে, কেবল তারাই অন্তরের উপরোক্ত পরিবর্তন সম্পর্কে ওয়াকিফহাল হতে পারে।
ভাল অথবা মন্দের উপর অন্তরের প্রতিষ্ঠিত থাকা এবং এতদুভয়ের মধ্যে দোদুল্যমান থাকার ব্যাপারে অন্তর তিন প্রকার। 
প্রথম প্রকার সেই অন্তর, যা তাকওয়া ও খোদাভীতিতে পূর্ণ, সাধনা দ্বারা পরিশোধিত এবং কুঅভ্যাস থেকে পাক পবিত্র। এরূপ অন্তরে অদৃশ্যের ভাণ্ডার ও ঊর্ধ্বজগত থেকে প্রেরণা আসে এবং জ্ঞান-বুদ্ধি সেই প্রেরণা নিয়ে চিন্তা-ভাবনায় ব্যাপৃত হয়, যাতে তার কল্যাণ ও উপকারিতার রহস্য অবগত হওয়া যায়। এরপর অন্তর্দৃষ্টির নূর দ্বারা যখন রহস্য অবগত হয়ে যায়, তখন জ্ঞান-বুদ্ধি বলে দেয় যে, এ কাজটি করা জরুরী। ফেরেশতা এই অন্তরের প্রতি দৃষ্টিপাত করে দেখে, এর মূল উপাদান পরিষ্কার, বুদ্ধিমত্তার নূরে আলোকিত এবং ফেরেশতাদের থাকার যোগ্য। তখন বহু ফেরেশতা তার সাহায্যার্থে এগিয়ে আসে এবং একের পর এক অসংখ্য সৎকাজের প্রতি তাকে উদ্বুদ্ধ করতে থাকে। এসব সৎকাজ তার জন্যে সহজও করে দেয়। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ
“অতঃপর যে দান করে, আল্লাহকে ভয় করে এবং উত্তমকে গ্রহণ করে আমি তার জন্যে সুখকর পরিণামের পথ সহজ করে দেই”।
এই প্রকার অন্তরে মারেফতের সূর্য উদিত হয়, যার কিরণে গোপন শেরকও অদৃশ্য থাকে না। অথচ গোপন শিরক অন্ধকার রাতে কাল পিঁপড়ার গতির চেয়েও অধিক রহস্যাবৃত থাকে। এমনিভাবে অন্যান্য গোপন বিষয়ও এই অন্তরের কাছে গোপন থাকে না। ফলে শয়তানের কোন চক্রান্ত সফল হয় না। শয়তান দাঁড়িয়ে প্রতারণার অনেক মাসআলাযুক্ত কথা বলে; কিন্তু অন্তর সেদিকে ভ্রূক্ষেপও করে না। এই প্রকার অন্তর যখন বিনাশকারী বিষয়াদি থেকে পাক সাফ হয়ে যায়, তখন শোকর, সবর, ভয়, আশা, সংসারের প্রতি অনাসক্তি, মহব্বত, সন্তুষ্টি, আগ্রহ, তাওয়াক্কুল, চিন্তাভাবনা, আত্মজিজ্ঞাসা ইত্যাদি উদ্ধারকারী গুণাবলী দ্বারা বিভূষিত হয়ে যায়। এরূপ অন্তরের প্রতিই আল্লাহ তাআলা অভিনিবেশ করেন এবং এরই নাম 'কলবে মুতমাইন্নাহ' তথা প্রশান্ত অন্তর, যা এই আয়াতে বুঝান হয়েছে- 
>“খবরদার, আল্লাহর যিকির দ্বারা অন্তর প্রশান্তি লাভ করে”।
নিম্নোক্ত আয়াতে এই অন্তরই উদ্দেশ্য : 
>“হে প্রশান্ত মন, তুমি তোমার পরওয়ারদেগারের দিকে প্রত্যাবর্তন কর”।
দ্বিতীয় প্রকার অন্তর প্রথমটির বিপরীত। অর্থাৎ, খেয়াল-খুশীতে পরিপূর্ণ। বদভ্যাস দ্বারা কলুষিত। এই প্রকার অন্তরের সামনে শয়তানের দরজা থাকে উন্মুক্ত এবং ফেরেশতাদের দরজা তালাবদ্ধ। এরূপ অন্তরে অনিষ্টের সূচনা এভাবে হয় যে, প্রথমে তার মধ্যে মানসিক খেয়াল-খুশীর একটি শংকা জাগরিত হয়। সে শাসক জ্ঞান-বুদ্ধির কাছে উপযোগিতা জিজ্ঞেস করে। কিন্তু জ্ঞান-বুদ্ধি পূর্ব থেকেই খেয়াল-খুশীর সেবায় অভ্যস্ত থাকে, সর্বদা তার খাতিরে কৌশল আবিষ্কারে রত থাকে এবং তারই মর্জি অনুযায়ী কাজ করে। তাই এখনও নফসেরই সহযোগিতা করে এবং তদনুযায়ী জওয়াব দেয়।ফলে খেয়াল-খুশীর বক্ষ উন্মোচিত হয়ে যায় এবং তার তমসা বিস্তৃতি লাভ করে। জ্ঞান-বুদ্ধি পরাভূত হয়ে যায়। শয়তান সুযোগ পেয়ে খুব পা ছড়ায় এবং বাহ্যিক সাজসজ্জা, প্রতারণা, দীর্ঘ আশা এবং এমনি ধরনের অসার বিষয়সমূহের প্রতি উৎসাহিত করতে থাকে। অবশেষে ঈমানের শাসন দুর্বল এবং বিশ্বাসের প্রদীপ নির্বাপিত হয়ে যায়। অর্থাৎ, আল্লাহর ওয়াদা, শাস্তি ও পরকাল ভীতির বিশ্বাস অবশিষ্ট থাকে না। কেননা, খেয়াল-খুশীর একটি কাল ধূম্র নির্গত হয়ে অন্তরের চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং অন্তরের নূরকে নিষ্প্রভ করে দেয়। জ্ঞান-বুদ্ধির অবস্থা তখন এমন হয়ে যায়, যেমন কারও চোখ তীব্র ধোঁয়ায় পরিপূর্ণ হয়ে গেলে সে দেখতে পারে না। কামভাবের প্রাবল্যের দরুন অন্তরের অবস্থা এমনি হয়ে যায়। হিতাহিত জ্ঞান ও সুমতি মোটেই থাকে না। সদুপদেশ হৃদয়ঙ্গম করে না এবং তৎপ্রতি কানও লাগায় না । এমতাবস্থায় শয়তান হামলা করে। কামভাবে উত্তেজনা দেখা দেয় এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ খেয়াল-খুশীর ইচ্ছানুযায়ী গতিশীল হয়। এই প্রকার অন্তরের প্রতিই নিম্নোক্ত আয়াতসমূহে ইশারা করা হয়েছে, 
>“আপনি কি সেই ব্যক্তির প্রতি লক্ষ্য করেছেন, যে তার খেয়াল-খুশীকে আপন উপাস্যরূপে গ্রহণ করে? আপনি কি তার দায়িত্ব নেবেন? না, আপনি ধারণা করেন যে, তাদের অধিকাংশ লোক শ্রবণ করে অথবা বুঝে? তারা চতুষ্পদ জন্তু বৈ নয়; বরং তাদের পথ আরও অধিক ভ্ৰষ্ট”।
>“তাদের অধিকাংশের জন্যে আল্লাহর শাস্তিবাণী অবধারিত হয়ে গেছে। অতএব তারা ঈমান আনবে না। তাদেরকে সতর্ক করা এবং না করা তাদের জন্যে সমান। তারা ঈমান আনবে না।”
কতক অন্তরের অবস্থা সকল প্রকার কাম-বাসনার ক্ষেত্রে এরূপই হয়ে থাকে এবং কোন কোন অন্তর কতক কাম-বাসনার বেলায় এরূপ হয়। 
উদাহরণতঃ কতক লোক কতক গোনাহ থেকে বেঁচে থাকে; কিন্তু যখন কোন সুশ্রী চেহারার উপর দৃষ্টি পতিত হয়, তখন সংযম হারিয়ে ফেলে, বুদ্ধি-বিবেচনা বিদায় হয়ে যায় এবং অন্তরের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারে না। কিছু লোক জাঁকজমক, প্রতিপত্তি ও অহংকারের সামগ্রী দেখলে তা অর্জন করার জন্যে পাগলপারা হয়ে যায়। আবার কতক লোক নিজের সম্পর্কে কোন অপমানজনক উক্তি ও সমালোচনা শুনলে রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে যায়। কেউ কেউ টাকা-পয়সা নেয়ার সময় এমন রূঢ় হয়ে যায় যে, ভদ্রতা ও খোদাভীতির রীতিনীতি সম্পূর্ণ ভুলে যায়। এ সবের কারণ, অন্তর খেয়াল-খুশীর কাল ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যায় এবং অন্তর্দৃষ্টির নূর ঘোলাটে হয়ে যায়। ফলে লজ্জা-শরম, ঈমান ও ভদ্রতাকে শিকায় রেখে শয়তানী অভিপ্রায় অর্জনের চেষ্টায় লেগে যায়।
তৃতীয় প্রকার অন্তর এমন, যার মধ্যে খেয়াল-খুশীর প্রবণতা প্রকাশ পায় এবং তাকে অনিষ্টের দিকে আকৃষ্ট করে। তখনই ঈমানের প্রবণতা আসে এবং তাকে কল্যাণের দিকে আহ্বান করে। কামপূজারী নফস তখন অনিষ্টের প্রবণতার পক্ষপাতিত্ব করতে তৎপর হয়ে উঠে। এ সময় কামভাব কিছুটা প্রবল হয় এবং ভোগবিলাস ও আনন্দ ভাল মনে হতে থাকে। অতঃপর জ্ঞান-বুদ্ধি কল্যাণমুখী প্রবণতার প্রশংসা করে এবং কামপ্রবৃত্তির অনিষ্ট বর্ণনা করে বলে : এটা মূর্খতার কাজ এবং চতুষ্পদ ও হিংস্র জন্তুদের আচরণের অনুরূপ, যারা পরিণামের পরওয়া করে না এবং কুকর্মে ঝাঁপিয়ে পড়ে। নফস জ্ঞান বুদ্ধির এই উপদেশের প্রতি আকৃষ্ট হয়। এ সময় শয়তান জ্ঞান-বুদ্ধির উপর হামলা চালায় এবং বলে : শুষ্ক বৈরাগ্য কেমন? তুমি কাম-প্রবৃত্তি চরিতার্থ করতে বিরত হও কেন? দুনিয়ার আরও মানুষ কি ভোগবিলাসে মত্ত নয়? তোমার ভাগ্যে দুঃখ-কষ্ট ও বিপদাপদ ছাড়া কিছু নেই। মানুষ তোমাকে দেখে হাসবে। দেখ, অমুক অমুক ব্যক্তি ভোগ-বিলাসে মত্ত হয়ে কেমন সুখে দিন যাপন করছে। তুমি মর্তবায় তাদেরকে ডিঙ্গিয়ে যাও না কেন? অমুক আলেম ব্যক্তিও তো তাই করে।নিষিদ্ধ হলে সে এরূপ করত না। এ ধরনের কথা শুনে নফস শয়তানের দিকে ঝুঁকে পড়ে।তখন ফেরেশতা শয়তানের উপর চড়াও হয় এবং অন্তরকে এভাবে বুঝায়- যে ব্যক্তি ভোগ-বিলাসের পেছনে পড়ে এবং পরিণামের প্রতি লক্ষ্য করে না, সে ধ্বংস হয়ে যায়। তুমি কি ক্ষণস্থায়ী ভোগ-বিলাসে সন্তুষ্ট হয়ে চিরস্থায়ী বেহেশতী সুখ বর্জন করতে চাও? তুমি কি দোযখের আযাবের ভয়াবহতা কল্পনা করে কামপ্রবৃত্তিতে সবর করার কষ্ট সহ্য করতে পার না? অপরের অনুকরণে তুমি নিজের ব্যাপারে গাফেল হয়ে যাচ্ছ। এটা মস্ত বড় ধোঁকা। অপরের গোনাহ তোমার আযাব হালকা করবে না। অন্য মানুষ যদি জ্যৈষ্ঠ মাসের প্রখর রৌদ্রতাপে চলাচল করে এবং তোমার একটি শীতল গৃহ থাকে, তবে তুমি অন্যদের সাথে রৌদ্র তাপের কষ্ট ভোগ করবে, না আপন গৃহে সুখে থাকবে? যদি অপরের সাথে রৌদ্রতাপে দাঁড়িয়ে থাকতে তোমার ভয় লাগে, তবে অপরের সাথে দোযখের আযাবে প্রবেশ করতে ভয় কর না কেন? এই উপদেশের ফলে নফস ফেরেশতার দিকে ঝুঁকে পড়ে। এভাবে সে শয়তান ও ফেরেশতা উভয়ের দ্বন্দ্বে জড়িত থাকে। এমতাবস্থায় যদি অন্তরে শয়তানী স্বভাব প্রবল থাকে, তবে শয়তানেরই অনুগত হয়ে যায়। পক্ষান্তরে যদি ফেরেশতার স্বভাব প্রবল থাকে, তবে শয়তানী প্ররোচনাকে তুচ্ছ জ্ঞান করে এবং আখেরাতের উপর দুনিয়াকে অগ্রাধিকার দেয়ার প্রতি বিন্দুমাত্রও আকৃষ্ট হয় না; বরং আল্লাহর আনুগত্য স্বীকার করে নেয় এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ থেকে এমন কাজই প্রকাশ পায়, যদ্দ্বারা আল্লাহ সন্তুষ্ট হন। এটি তাকদীরগত ব্যাপার। কেননা, হাদীস অনুযায়ী মুমিনের অন্তর আল্লাহ তা'আলার দু'অঙ্গুলির ফাঁকে অবস্থিত। অর্থাৎ শয়তান ও ফেরেশতা এই উভয় পক্ষের মধ্যে প্রায়ই দ্বন্দ্ব লেগে থাকে এবং অন্তর এদিক-ওদিক পরিবর্তিত হতে থাকে। কিন্তু এক পক্ষের দিকে চিরকাল অটল থাকা খুবই কম। আল্লাহ তা'আলা বলেন : 
>“আল্লাহ যাকে পথ প্রদর্শন করতে চান, তার বক্ষ ইসলামের জন্যে উন্মুক্ত করে দেন। আর যাকে পথভ্রষ্ট করতে চান, তার বক্ষ সংকীর্ণ করে দেন, যেন সে সজোরে আকাশে আরোহণ করে”।
অন্য আয়াতে বলেন ; 
>“যদি আল্লাহ তোমাদের সাহায্য করেন, তবে কেউ তোমাদের উপর প্রবল হবে না। আর যদি তিনি তোমাদেরকে ত্যাগ করেন, তবে তাঁর পরে তোমাদের সাহায্য কে করবে?”
এ থেকে জানা গেল, পথ প্রদর্শন ও পথভ্রষ্টকরণ তাঁরই কাজ। তাঁর আদেশ কেউ এড়িয়ে যেতে পারে না এবং তাঁর ফয়সালা কেউ বিলম্বিত করতে পারে না । তিনিই জান্নাত সৃষ্টি করে তার জন্যে কিছু লোককে সৃষ্টি করেছেন এবং তেমনি কাজে নিয়োজিত করেছেন। দোযখও তাঁরই তৈরী এবং এর জন্যে কিছু লোক সৃজিত হয়েছে। তাদেরকেও তেমনি কাজে লাগানো হয়েছে। মোটকথা, আল্লাহর ব্যাপার অনেক ঊর্ধ্বে- তিনি যা করেন, তজ্জন্যে কারও কাছে জিজ্ঞাসিত হবেন না। কিন্তু মানুষ জিজ্ঞাসিত হবে।
এ পর্যন্ত অন্তরের আশ্চর্যজনক অবস্থাসমূহের সামান্যই বর্ণিত হল। এর পূর্ণ বর্ণনা এলমে মোয়ামালায় সমীচীন নয়; বরং এলমে মোয়ামালার সূক্ষ্ম বিষয়াদি বুঝার জন্যে যতটুকু দরকার ততটুকু বর্ণনা করেই এ আলোচনা সমাপ্ত করা হচ্ছে।

(সমাপ্ত)
প্রথম পর্ব

অন্তর বা হৃদয় ( ২২) শয়তান যেসব বিষয়ে কুমন্ত্রণা দেয়



অন্তর বা হৃদয় (পর্ব- ২২) 
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

শয়তান যেসব বিষয়ে কুমন্ত্রণা দেয়
কুমন্ত্রণা তিন প্রকার। প্রথম, সত্য বিষয়কে সন্দিগ্ধ করে কুমন্ত্রণা দেয়া। 
উদাহরণতঃ শয়তান এভাবে বুঝাবে যে, দুনিয়ার ভোগ-বিলাস ত্যাগ করা উচিত নয়। জীবনের অনেক কামনা-বাসনা এতদিন বিসর্জন দেয়া আযাব বৈ নয়। এসময় যদি বান্দা আল্লাহ তা'আলার হক, তাঁর বিরাট পুরস্কার ও শাস্তিকে স্মরণ করে এবং নিজেকে বুঝায় যে, কামনা-বাসনা থেকে বিরত থাকা অবশ্যই কঠিন; কিন্তু জাহান্নামের অগ্নি সহ্য করা আরও অধিক কঠিন, তবে শয়তান প্রশ্রয় পাবে না, পালিয়ে যাবে। 
কেননা, শয়তান এ কথা বলবে না যে, দোযখের কষ্ট গোনাহ্ থেকে বিরত থাকার কষ্টের তুলনায় হালকা এবং একথাও বলবে না যে, গোনাহের পরিণতি দোযখ ভোগ নয়। যদি বলেও, তবে কোরআনে বিশ্বাসী হওয়ার কারণে বান্দা তার কথা শুনবে না। অনুরূপভাবে যদি আত্মম্ভরিতার জন্যে কুমন্ত্রণা দেয় এবং অন্তরে একথা জাগ্রত করে যে, আজ মারেফত ও এবাদতে তোমার সমতুল্য কেউ নেই, তবে শয়তান হটে যাবে। যদি বান্দা স্মরণ করে যে, তার মারেফত, অন্তর ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সমস্তই আল্লাহ তা'আলা সৃষ্টি করেছেন; সুতরাং আত্মম্ভরিতা কিসের? মোট কথা, এই প্রথম প্রকারের কুমন্ত্রণা সম্পূর্ণ বিদূরিত হয়ে যায়। যারা আরেফ এবং ঈমানের আলোকে আলোকিত, তাদের কাছে এই প্রকার কুমন্ত্রণা থাকতে পারে না।
দ্বিতীয়, কাম-প্রবৃত্তিকে গতিশীল করে কুমন্ত্রণা দেয়া। যদি কাম-প্রবৃত্তিকে এমন বিষয়ের প্রতি গতিশীল করে, যার সম্পর্কে বান্দা নিশ্চিতরূপে বিশ্বাস করে যে, এটা গোনাহ, তবে শয়তান কামভাব উত্তেজিত করা থেকে বিরত হবেনা ঠিক; কিন্তু এমন উত্তেজিত করবে না, যাতে গতিশীলতা থাকে। পক্ষান্তরে যদি এমন বিষয়ের প্রতি গতিশীল করে, যার গোনাহ হওয়ার ব্যাপারে বান্দা নিশ্চিত নয়, তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে কুমন্ত্রণা প্রভাবশালী হবে এবং তা দূর করার জন্যে সাধনার প্রয়োজন হবে। এমতাবস্থায় কুমন্ত্রণা থাকবে; কিন্তু স্তিমিত অবস্থায় থাকবে।
তৃতীয়, অনুপস্থিত বিষয় স্মরণ করিয়ে কুমন্ত্রণা দেয়া। এতে অন্তর যখন যিকিরের প্রতি মনোনিবেশ করে, তখন কুমন্ত্রণা কিছুটা দূর হয়ে যায় এবং পুনরায় এসে পড়ে। আবার দূর হয়ে যায় এবং আবার আসে। এমনিভাবে যিকির ও কুমন্ত্রণা একের পর এক আসতে থাকে। ফলে ধারণা হতে থাকে যে, উভয়েরই একটি অব্যাহত ধারা সৃষ্টি হয়ে গেছে এবং যেন উভয় বিষয়ের ঠিকানা অন্তরে দুটি জায়গা। এ ধরনের কুমন্ত্রণা সম্পূর্ণরূপে ছিন্ন হওয়া সুকঠিন, তবে অসম্ভব নয়। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) এরশাদ করেন : “যে ব্যক্তি দু'রাকআত এমনভাবে নামায পড়ে যে, তাতে তার মন দুনিয়ার কোন কথা না বলে, তার পূর্বেকার সকল গোনাহ মাফ করে দেয়া হয়।”
সুতরাং এটা অসম্ভব হলে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) তার উল্লেখ করতেন না। হাঁ, আল্লাহর মহব্বতে পরিবেষ্টিত অন্তরেই এটা সম্ভব। কেননা, অন্তর যে বিষয়ে পুরোপুরি ব্যস্ত থাকে, সে বিষয় ছাড়া অন্তরে অন্য কোন কিছু আসে না। যেমন আশেক ব্যক্তি এশকের চিন্তায় নিমজ্জিত থাকলে তার অন্তরে মাশুকের কথা ছাড়া অন্য কিছু আসে না। সুতরাং কুমন্ত্রণার উপরোক্ত প্রকারত্রয় থেকে বুঝা যায়, বর্ণিত পাঁচটি মাযহাবই বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে সত্য।
সারকথা, এক মুহূর্ত অথবা কিছু সময়ের জন্যে শয়তান থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া অসম্ভব নয়; কিন্তু সারা জীবনের জন্যে তার কবল থেকে মুক্তি পাওয়া খুবই অবান্তর; বরং অসম্ভব। কেননা, এটা সম্ভবপর হলে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-এর কোন সময় কোন কুমন্ত্রণা হত না। অথচ কুমন্ত্রণা তাঁরও হয়েছে। হাদীসে বর্ণিত আছে- একবার নামাযে তিনি আপন বস্ত্রের কারুকার্যের দিকে দৃষ্টিপাত করেন। নামাযান্তে সেই বস্ত্র খুলে দূরে নিক্ষেপ করলেন এবং বললেন : “এটা আমাকে নামাযে বাধা দিয়েছে।”  পুরুষের জন্যে স্বর্ণ হারাম হওয়ার পূর্বে একবার রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-এর হাতে একটি স্বর্ণের আংটি ছিল। খোতবা পাঠ করার সময় সেটির উপর দৃষ্টিপাত হলে তিনি তা খুলে দূরে নিক্ষেপ করেন এবং বলেন- “আমি একবার এর দিকে এবং একবার তোমাদের দিকে দেখি।”
 বস্ত্রের কারুকার্য ও স্বর্ণের আংটির দিকে দৃষ্টিপাত করার কারণ ছিল কুমন্ত্রণা। তাই তিনি এগুলো দূরে নিক্ষেপ করলেন। এ থেকে বুঝা যায়, সাংসারিক আসবাবপত্র ও টাকা পয়সার কুমন্ত্রণা তখনই ছিন্ন হবে, যখন এগুলো আলাদা করে দেয়া হবে। যে পর্যন্ত মালিকানায় একটি টাকাও থাকবে, শয়তান তারই কুমন্ত্রণা দেবে। একে কিভাবে মানুষের দৃষ্টি থেকে গোপন রাখা যায়, কিভাবে ব্যয় করা যায় এবং কিভাবে প্রকাশ করে বড়লোকী ফুটানো যায় ইত্যাদি বহু প্রকার কুমন্ত্রণা অন্তরে আসতে থাকবে। সুতরাং দুনিয়ার কাজ-কারবারে জড়িত হয়ে যে ব্যক্তি আশা করে যে, সে শয়তান থেকে মুক্তি পাবে, তার অবস্থা সেই ব্যক্তির মত, যে সর্বাঙ্গে মধু মেখে মনে করতে থাকে যে, এর উপর মাছি বসবে না। এটা অসম্ভব।মোট কথা, দুনিয়া কুমন্ত্রণার একটি সুবৃহৎ ফটক। এতে গমন পথ একটি নয়- অসংখ্য। 
জনৈক দার্শনিক বলেন : শয়তান প্রথমে মানুষের কাছে গোনাহের দিক থেকে আসে। এতে মানুষ অবাধ্য হলে উপদেশের ছলে আগমন করে এবং কোন বেদআতের সাথে জড়িত করে দেয়। এতেও মানুষ অবাধ্য হলে তাকে কঠোরতার আদেশ দিয়ে যা হারাম নয়, তাও হারাম করার প্রয়াস পায়। এতেও কাজ না হলে ওযু ও নামাযে সন্দেহ সৃষ্টি করে। যদি এতেও কার্য সিদ্ধি না হয়, তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির জন্যে সৎকর্ম সহজ করে দেয়। অতঃপর সৎকর্মপরায়ণতার সুবাদে মানুষ যখন তার প্রতি আকৃষ্ট হয়, তখন শয়তান তাকে আত্মম্ভরিতার বেড়াজালে ফাঁসিয়ে দিয়ে ধ্বংস করে দেয়। এ কাজে শয়তান তার সর্বশক্তি নিয়োগ করে এবং কোন ত্রুটির অবকাশ রাখে না। কেননা, শয়তান জানে, এ ফাঁদে আটকা না পড়লে সে সোজা জান্নাতে চলে যাবে।

পরবর্তী পর্ব-

পরিবর্তনের দিক দিয়ে অন্তরের প্রকারভেদ-

অন্তর বা হৃদ (২১) যিকিরের সময় কুমন্ত্রণা ছিন্ন হয় কি না



অন্তর বা হৃদয় (পর্ব- ২১) 
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

যিকিরের সময় কুমন্ত্রণা ছিন্ন হয় কি না-
প্রকাশ থাকে যে, অন্তরের অবস্থা প্রত্যক্ষকারী আলেমগণের এ বিষয়ে মতামত পাঁচ প্রকার। একদল আলেমের মত হচ্ছে, যিকির দ্বারা কুমন্ত্রণা ছিন্ন হয়ে যায়। কেননা, রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম)-এরশাদ করেন “বান্দা যখন আল্লাহর যিকির করে, তখন শয়তান চুপ হয়ে যায়। 
দ্বিতীয় দলের উক্তি হচ্ছে, মূল কুমন্ত্রণা দূর হয় না- তার প্রভার বিনষ্ট হয়ে যায়। কারণ, যখন যিকির দ্বারা অন্তর পূর্ণ হয়ে যায়, তখন কুমন্ত্রণা প্রভাব বিস্তার করতে পারে না। যেমন কোন ব্যক্তি চিন্তামগ্ন হয়ে বসে থাকলে কথার আওয়ায শুনেও তার অর্থ হৃদয়ঙ্গম করতে পারে না। 
তৃতীয় দলের অভিমত হচ্ছে, কুমন্ত্রণাও ছিন্ন হয় না এবং প্রভাবও বিনষ্ট হয় না; বরং প্রভাব স্তিমিত হয়ে পড়ে। অর্থাৎ, কুমন্ত্রণা হয়, কিন্তু খুবই দুর্বল! 
চতুর্থ দল বলেন, সামান্য সময়ের যিকির দ্বারা কুমন্ত্রণা খতম হয়ে যায় এবং ততটুকু সময়ের কুমন্ত্রণা দ্বারা যিকির খতম হয়ে যায়। যিকির ও কুমন্ত্রণা একের পর এক দ্রুতগতিতে আসার কারণে একটি অবিচ্ছিন্ন ধারা চালু হয়ে যায়। উদাহরণতঃ একটি গোলকের গায়ে কয়েকটি আলাদা বিন্দু বসিয়ে যদি গোলকটিকে দ্রুতগতিতে ঘুরানো হয়, তবে সেই বিন্দুগুলো একটি গোলাকার চক্র বলে মনে হবে। কেননা, দ্রুতগতির কারণে বিন্দুগুলো মনে হবে যেন একটি অপরটির সাথে মিলিত। এই দল প্রমাণ পেশ করেন যে, উপরোক্ত হাদীসে ‘শয়তান চুপ হয়ে যায়' বলা হয়েছে। কিন্তু আমরা যিকর করার সময় কুমন্ত্রণা অনুভব করি। এমতাবস্থায় উভয়ের মধ্যে সমন্বয় বর্ণিত উক্তি অনুযায়ীই হতে পারে। 
পঞ্চম দলের অভিমত হচ্ছে, কুমন্ত্রণা ও যিকির অন্তরের উপর সর্বদা একে অপরের পেছনে চলে এবং বিচ্ছিন্ন হয় না। কোন ব্যক্তি একই অবস্থায় যেমন আপন চক্ষু দ্বারা দুই বস্তু দেখতে পারে, তেমনি অন্তরও দুই বস্তুর অবস্থানস্থলে হতে পারে। হাদীসে আছে :
“প্রত্যেক বান্দার চারটি করে চক্ষু আছে। দুটি তার মস্তকে, যদ্দারা সে তার দুনিয়ার ব্যাপারাদি দেখে এবং দু'টি অন্তরে, যদ্দ্বারা সে আখেরাতের বিষয়াদি প্রত্যক্ষ করে। এটি হযরত মুহাসেবীর মাযহাব। 
আমাদের মতে সবগুলো উক্তিই সঠিক, কিন্তু সর্বপ্রকার কুমন্ত্রণার কথা কোন এক উক্তিতে বর্ণিত হয়নি। প্রত্যেকেই যেমন কুমন্ত্রণা দেখেছেন, তেমনি বর্ণনা করেছেন। তাই আমরা এক্ষণে কুমন্ত্রণার প্রকারভেদ বর্ণনা করব।

পরবর্তী পর্ব-

শয়তান যেসব বিষয়ে কুমন্ত্রণা দেয়

বুধবার, ২২ নভেম্বর, ২০২৩

যশ ও রিয়া - (১৪) গোপন ও প্রকাশ্য রিয়ার মধ্যে যেগুলি বাতিল

 

যশ ও রিয়া (পর্ব - ১৪)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দীন - ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
গোপন ও প্রকাশ্য রিয়ার মধ্যে যেগুলি বাতিল-


(চলবে)

যশ ও রিয়া - (১৩) পিপিলিকার চলনের ছেয়েও গোপন রিয়া



যশ ও রিয়া (পর্ব - ১৩)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দীন - ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

পিপিলিকার চলনের ছেয়েও গোপন রিয়া-
রিয়া দু'প্রকার- ‘জলী’ (প্রকাশ্য) ও ‘খফী’ (গোপন) যে রিয়া সওয়াবের নিয়ত না থাকা সত্ত্বেও মানুষকে আমল করতে উদ্বোদ্ধ করে, এটাই প্রকাশ্য রিয়া। এ প্রকার রিয়া দ্রুত বুঝা যায় এবং রিয়াকারও জেনে নেয় যে সে রিয়া করেছে। এর ছেয়ে সামান্য গোপন সেই রিয়া, যা আমল করার কারণ তো হয় না, কিন্তু সওয়াবের নিয়তে যে আমলটি করা হয় তা এই রিয়ার কারণে সহজ হয়ে যায়। উদাহরণত : এক ব্যক্তি প্রত্যহ তাহাজ্জুদ পড়ে ;  কিন্তু কিছুটা কষ্ট ও অবহেলার সাথে পড়ে ; কিন্তু বাড়িতে কোন মেহমান আগমন করলে তাহাজ্জুদ পড়া তার জন্য সহজ ও আনন্দের কাজ হয়ে যায়। সে এটাও জানে যে, সওয়াবের আশা না থাকলে কেবল এই মেহমানকে দেখানোর জন্য সে তাহাজ্জুদ পড়তনা।
এর ছেয়ে অধিক গোপন সেই রিয়া, যা আমলের কারণও হয়না এবং এবং আমলকে সহজও করেনা, এতদসত্বেও তা অন্তরে লুক্বায়িত থাকে। আমলের উপর এর কোন প্রভাব নেই বিধায় আলামত ছাড়া একে জানাও সম্ভবপর নয়। এর সুস্পষ্ট আলামত এই যে, এই রিয়াকারের 
আমল সম্পর্কে মানুষ অবগত হলে সে খুশী হয়। যেমন অনেক আবেদ রয়েছে যারা নিষ্টা সহকারে এবং রিয়ায় বিশ্বাস করেনা ; বরং একে খারাপ মনে করে। কিন্তু তাদের এবাদত সম্পর্কে মানুষ অবগত হয, তখন তারা আনন্দ অনুভব করে- যেন এবাদতে পরিশ্রম করা একটি বোঝা অন্তর থেকে নেমে গেল। বলা বাহুল্য, একটি গোপন রিয়া থেকেই এই আনন্দের উৎপত্তি। কারণ অন্তর যদি মানুষের দিকে ভ্রূক্ষেপ না করত, তবে মানুষ অবগত হওয়ার কারণে এই আনন্দ কখনো হতনা। 
অতএব জানা গেল যে, পাথরে যেমন আগুন লুকিয়ে থাকে, তেমনি এই রিয়াও অন্তরে প্রচ্ছন্ন ছিল, যার মধ্যে মানুষের অবগতি চমকি পাথরের কাজ করছে এবং আনন্দের চিহ্ন ফুটিয়ে তুলেছে। এর পর এই অবগতির থেকে উদ্বুত আনন্দের স্বাধ যদি আবেদ গ্রহন করে এবং ঘৃনা দ্বারা ক্ষতিপূরণ না করে, তবে এই আনন্দই গোপন রিয়ার শক্তি ও খাদ্য হয়ে যায়।
এর ছেয়ে অধিক গোপন সেই রিয়া, যাতে মানুষের অবগতির খায়েশও থাকেনা ও এবাদত প্রকাশ পেলে আনন্দও হয় না, কিন্তু এতদসত্বেও এটা ভাল মনে হয় যে, মানুষ তাকে দেখামাত্রই প্রথমে সালাম করুক, সসম্ভ্রম ব্যবহার করুক, তার কাজে সন্তুষ্ট থাকুক এবং কেনা বেচায় তার খ্যাতি করুক। এসব ব্যাপারে কেউ ত্রুটি করলে সেটা তার কাছে দুঃসহ কষ্টের কারণ ও অবাস্তব মনে হয়। এমতাবস্থায় সে যেন এই সম্মান ও সম্ভ্রম সেই এবাদতের কারণে চায়, যা সে গোপনে করে এবং কাউকে জানায় না। পূর্বে এই এবাদত না করলে সম্মান প্রদর্শনে মানুষের ত্রুটি তার কাছে অবাস্তব মনে হত না। সুতরাং এই সকল এবাদতে আবেদ কেবল আল্লাহ্ তা'আলার অবগতিতে সন্তুষ্ট থাকেনা বিধায় তার সাথে গোপন রিয়ার সম্পর্ক স্থাপিত হয়ে যায়, যা পিপীলিকার চলন থেকেও অধিক গোপন। এই রিয়া যদি সওয়াব বরবাদ করে দেয়, তবে এতে আশ্চর্যের কিছু নেই। সিদ্দীকগণ ছাড়া কেউ এই রিয়া থেকে বাঁচতে পারেনা। সওয়াব বরবাদ করার দলীল হযরত আলী (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর এই উক্তি- 
>"কিয়ামতের দিন আল্লাহ্ তা'আলা ক্বারীগণকে বলবেন, - তোমাদের জন্য কি লোকেরা পণ্য-দ্রব্যের দাম সস্তা করত না? তোমাদেরকে কি প্রথমে সালাম করত না?  তোমাদের অভাব অনটন কি দূর করত না?  অতএব আজ তোমাদের জন্য কোন পুরষ্কার নেই। তোমাদের পুরষ্কার তোমরা দুনিয়াতেই আদায় করে নিয়েছ।
এখন প্রশ্ন হয়, এবাদত প্রকাশ হয়ে পড়লে আনন্দিত হয় না- এমন লোক আমরা দেখি না; বরং এ ব্যাপারে প্রত্যেক এবাদতকারী-ই কিছু না কিছু আনন্দ অনুভব করে। অতএব সকল প্রকার আনন্দই কি নিন্দনীয়? না কিছু নিন্দনীয় ও কিছু প্রসংশনীয় আছে?  এ প্রশ্নের জবাব এই যে, সকল প্রকার আনন্দই নিন্দনীয় নয়; বরং এবাদত প্রকাশ হয়ে যাওয়ার আনন্দ পাঁচ প্রকার হতে পারে। তন্মধ্যে চার প্রকার ভাল এবং এক প্রকার মন্দ। 
ভাল চার প্রকারের 
(১) প্রথম প্রকার এই যে, এবাদত গোপন ও একনিষ্ট থাকুক এটাই আবেদের কাম্য। কিন্তু প্রকাশ হয়ে যাওযার পর আবেদ এই ভেবে আনন্দিত হয় যে,  আল্লাহ্ তা'আলা আমার প্রতি কৃপা ও সদয় ব্যবহার করতে চান,  তাই আমার গুনাহসমূহ গোপন করেন এবং অনুগত্য প্রকাশ করে দেন। আমার ইচ্ছা ছিল গুনাহ ও অনুগত্য উভয়টি গোপন থাকুক। অতএব এর ছেয়ে বড় কৃপা আর কি হবে যে, তিনি গুনাহ্ কে ঢেকে রেখেছেন আর এবাদতকে প্রকাশ করে দিয়েছেন। আল্লাহর অনুগ্রহ ও রহমতের কথা ভেবে আবেদের এহেন আনন্দ খারাপ নয়, বর়ং উত্তম।
যেমন আল্লাহ্ তা'আলা বলেছেন, 
>"বলুন, আল্লাহর কৃপা ও রহমতে ! অতএব এতেই আনন্দিত হওয়া উচিত।"
এ আনন্দের কারণ এই হল যে, আবেদ জানতে পারল সে আল্লাহ্ তা'আলার একজন প্রিয় বান্দা।
(২) দ্বিতীয় প্রকার এই ভেবে আনন্দিত হওয়া যে,  আল্লাহ্ তা'আলা দুনিয়াতে যেমন আমার গুনাহ ঢেকে রেখেছেন এবং এবাদত প্রকাশ করে দিয়েছেন, তেমনি আখেরাতেও করবেন। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে - 
>"আল্লাহ্ তা'আলা দুনিয়াতে যে গুনাহ গোপন রাখেন, আখেরাতেও তাই গোপন রাখেন।"
অতএব, এ আনন্দের কারণ হচ্ছে ভবিষ্যত আল্লাহর প্রিয় হওয়ার আশা।
(৩) তৃতিয় প্রকার এই ভেবে আনন্দিত হওয়া যে, এই অনুগত্য প্রকাশ হইয়া পড়লে মানুষ আমার অনুসরণ করবে এবং এমনি ধরণের অনুগত্য করবে। ফলে আমার সওয়াব আরো বেড়ে যাবে। রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ মুবারক করেন- 
>"যে ব্যক্তি কোন সওয়াবের কাজ করে এবং মানুষ তার অনুসরণ করে, সে অনুসারীদের সমান সওয়াব পেতে থাকে এবং তাদের সওয়াব হ্রাস করা হয়না।" 
বলা বাহুল্য, সওয়াব বৃদ্ধির আশা করা আনন্দদায়ক। এ ক্ষেত্রে সংস্লিষ্ট এবাদতকে গোপন করার সওয়াবও পাবে এবং পরে প্রকাশ হয়ে পড়ার কারণেও সওয়াব পাবে।
(৪) চতুর্থ প্রকার এই ভেবে আনন্দিত হওয়া যে, তারা তার এবাদত সম্পর্কে অবগত হয়ে তার প্রশংসা করেছে, তারা আল্লাহ্ তা'আলার মরযী ও পছন্দ অনুযায়ী কাজ করেছে। কারণ তারা অনুগত বান্দাকে প্রিয়পাত্র মনে করেছে। এতে বুঝা যায়, তাদের মন-মেজায অনুগত্যপ্রবণ। নতুবা কতক ঈমানদার এমনও রয়েছে, যারা এবাদতকারীদেরকে দেখলে হিংসা করে, নিন্দা করে এবং রিয়াকারী আখ্যা দিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে। সুতরাং প্রসংশা দ্বারা জানা গেল যে,  প্রসংশাকারীদের ঈমান সঠিক। এ ক্ষেত্রে এবাদতকারীর আন্তরিকতার আলামত এই যে, মানুষ অন্য কোন এবাদতকারীর প্রসংশা করলেও সে ততটুকু আনন্দিত হয়, যতটুকু নিজের প্রসংশার কারণে হয়।
(৫) পঞ্চম প্রকার আনন্দ যা মন্দ, তা হচ্ছে এই ভেবে আনন্দিত হওয়া যে, এবাদতের কারণে মানুষের মনে আমার মর্যাদা প্রতিষ্টিত হয়ে গেছে। ফলে তারা আমার তারিফ ও তাযীম করতে শুরু করেছে, উঠা বসায় আমাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে এবং আমার প্রয়োজনে সহায়তা করছে। এবাদতকারীর এই প্রকার আনন্দ নিঃসন্দেহে গর্হিত।

পরবর্তী পর্ব-
গোপন ও প্রকাশ্য রিয়ার মধ্যে যেগুলি বাতিল

যশ ও রিয়া - (১২) রিয়ার বিভিন্ন স্থর



যশ ও রিয়া (পর্ব - ১২)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দীন - ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

রিয়ার বিভিন্ন স্থর
জানা উচিত যে, রিয়ার চারটি স্তর রয়েছে।
(১) প্রথম স্তর হল,  সওয়াবের ইচ্ছা মোটেই না থাকা। উদাহরণত: এক ব্যক্তি জনসমক্ষে নামাজ পড়ে এবং একাকী হলে পড়েনা; বরং মাঝে মাঝে উযু ছাড়াই মানুষের সাথে দাড়িয়ে যায়। এরুপ ব্যক্তির ইচ্ছা কেবল রিয়া-ই রিয়া। ফলে সে আল্লাহ'র কাছে গযবের যোগ্য। রিয়ার এই স্তরটি কঠোরতর। 
(২) দ্বিতীয় স্তর হল সওয়াবের ইচ্ছা থাকবে, কিন্তু তা খুব দুর্বল। এমনকি একান্তে থাকলে এ ইচ্ছা এতটুকু থাকেনা যে, তার কারণে সেই আমলটি করে। এরুপ ব্যাক্তি প্রথমোক্ত ব্যক্তির কাছাকাছি। কেননা তার এমন ইচ্ছা নেই, যার কারণে আমলটি করতে পারে। এরুপ ইচ্ছা থাকা-না থাকা সমান।
(৩০ তৃতীয় স্তর হল, সওয়াবের ইচ্ছা এবং রিয়ার ইচ্ছা উভয়টি সমান থাকা। ফলে উভয় ইচ্ছা একত্রিত হলে সে আমল করে এবং একটি অনুপস্থিত থাকলে আমল করেনা। এরুপ ব্যক্তির অবস্থা এমন যে, সে যতটুকু নষ্ট করে ততটুকু গড়ে। ফলে আশা করা যায় যে, তার সওয়াব হবেনা অথবা যে পরিমান আযাব হবে,  সেই পরিমাণ সওয়াব হবে। হাদীসসমূহের বাহ্যিক অর্থ থেকে জানা যায় যে, এরূপ ব্যক্তিও আযাব থেকে বাঁচতে পারবেনা।
(৪) চতুর্থ স্থর হল, রিয়ার ইচ্ছা দুর্বল এবং সওয়াবের ইচ্ছা প্রবাল হওয়া। অর্থৎ মানুষ তার আমল জানতে পারলে তার স্ফূর্তি ও আনন্দ বেড়ে যায়। কিন্তু একাকী অবস্থায় এবাদত বর্জন করেনা। আমাদের ধারণায় এরূপ ব্যক্তির মূল সওয়াব বাতিল হবেনা। বরং কিছুটা হ্রাস পাবে অথবা রিয়া পরিমানে আযাব হবে এবং সওয়াবের ইচ্ছা পরিমানে সওয়াব হবে।

আল্লাহ'র এবাদত ও অনুগত্য দ্বারা রিয়া করা হলে সেদিকে লক্ষ্য করে রিয়ার দু'টি স্তর রয়েছে- মূল এবাদত দ্বারা রিয়া করা ও এবাদতের গুণ দ্বারা রিয়া করা। প্রথম স্থরের রিয়া অত্যন্ত মন্দ। এর তিনটি সোপান রয়েছে।
(১) প্রথম সোপান হল : মূল ঈমান দ্বারাই রিয়া করা, এরূপ রিয়াকার অনন্তকাল দোযকে বাস করবে। এ রিয়াকার সেই ব্যক্তি যে মূখে কলেমায়ে শাহাদাত উচ্চারণ করে, কিন্তু অন্তরে তাকে মিথ্যা বলে বিশ্বাস করে। নিছক লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে মুসলমানী প্রকাশ করে। কুরআন পাকের একাধিক জায়গায় আল্লাহ্ তা'আলা এ রিয়াকারদের অবস্থা বর্ণনা করেছেন। এক যায়গায় এরশাদ হয়েছে, 
>“হে রসূল ! যখন মুনাফেকরা আপনার কাছে আসে, তখন বলে : আমরা সাক্ষ্য দেই যে, -  আপনি অবশ্যই আল্লাহ'র রসূল। আল্লাহ্ জানেন যে, আপনি তার রসূল। আল্লাহ্ সাক্ষ্য দেন যে,  মুনাফেকরা অবশ্যই মিথ্যাবাদী”।
অর্থাৎ তাদের উক্তি তাদের আন্তরিক বিশ্বাসের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
অন্য আয়াতে বলা হয়েছে : 
>“কোন কোন লোকের কথা পার্থিব জীবনে আপনাকে অবাক করবে। সে তার মনের কথার উপর আল্লাহ তা'আলাকে সাক্ষী করে;  অথচ সে কঠোর তার্কিক। যখন সে প্রস্থান করে, তখন চেষ্টা করে- পৃথিবীতে গোলযোগ সৃষ্টি করতে, শস্যক্ষেত্র বিনাশ করতে এবং প্রাণহানি ঘঠাতে। আল্লাহ গোলযোগ পছন্ধ করেন না।"
অন্য এক আয়াতে বলা হয়েছে, - 
>“যখন তোমাদের সাথে মিলিত হয,  তখন ওরা বলে : আমরা ঈমান এনেছি। আর যখন একান্তে যায, তখন তোমাদের উপর ক্রোধে অংগুলি চর্বন করে।"
আরো বলা হয়েছে : 
>“তারা লোক-দেখানো আমল করে। আল্লাহ-কে খুব কমই স্মরণ করে। তারা মানুষের মধ্যে দুদুল্যমান- না এই দলে, না ঐ দলে”।
ইসলামের প্রাথমিক যুগে নিফাক অনেক বেশি ছিল। তখন কিছু লোক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য বাহ্যত মুসলমান হয়ে যেত। বর্তমানে কম হলেও এর ধরণ ও নমুনা অনেক রয়েছে। উদাহরণত : কিছু লোক ধর্মদ্রোহীদের উক্তির দিকে ঝুকে পড়ে মনে মনে দোযক, জান্নাত ও কিয়ামত অস্বীকার করে অথবা শরীয়ত ও শরীয়তের বিধানাবলীকে বিধর্মীদের উক্তি অনুযায়ী অবশ্য পালনীয় মনে করে না। অথচ মুখে এর বিপরীত বর্ণনা করে। এ শ্রেনীর লোকও মুনাফেক ও রিয়াকার। এরা অনন্তকাল দোযকে থাকবে। কেননা এর ছেয়ে বড় কোন নিফাক নেই। এরা প্রকাশ্য কাফেরের চেয়েও মন্দ। কারণ কাফের বাইরেও শত্রু এবং ভিতরেও বেঈমান। কিন্তু এদের অবস্থা এইযে,  এরা মুখে আল্লাহ্ আল্লাহ বলে কিন্তু বগলে ছুরি লুকিয়ে রাখে।
(২) দ্বিতীয় সোপান হচ্ছে : মূল ঈমান স্বীকার করে মৌলিক এবাদত দ্বারা রিয়া করা। এ স্থরটিও আল্লাহ্ তা'আলার খুব অপছন্দনীয়। এর দৃষ্টান্ত এই যে, এক ব্যক্তি জন সমাবেশে উপস্থিত রয়েছে, এমন সময় নামাজের ওয়াক্ত হয়ে গেল। সকলেই যখন নামাজ পড়ল, তখন সেও পড়ে নিল। অথচ একাকী নামাজ না পড়াই তার অভ্যাস। অথবা রমজান মাসে রোজা রাখল। কিন্তু যাতে রোজা রাখতে না হয, সেজন্য মানুষের কাছ থেকে দুরে চলে যাওয়ার ইচ্ছা রাখে। অথবা জুমআর নামাজের জন্য মসজিদে যায় ; কিন্তু লোকের নিন্দার আশংকা না থাকলে কখনো যেতনা। অথবা জেহাদ কিংবা হজ্জ কেবল মানুষের ভয়ে করে- মনের আগ্রহে নয়। এ ধরণের রিয়াকারের মধ্যে মূল ঈমান প্রতিষ্টিত থাকে, সে আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কিছুকে উপাস্য মনে করে না। কেউ অন্য কিছুকে সেজদা করতে বললে সে করবে না। কিন্তু অলসতার কারণে আল্লাহর এবাদত করেনা। এবং জন সমাবেশে করলে খুশী হয়। অতএব আল্লাহর কাছে মর্যাদা লাভের ছেয়ে মানুষের কাছে মর্যাদা লাভ তার কাছে ভাল মনে হয়। তার কাছে মানুষের মন্দ বলার ভয় আল্লাহর আযাবের ভয়ের ছেয়েও বেশী। মানুষের প্রশংসার প্রতি তার আগ্রহ আল্লাহর সওয়াবের প্রতি আগ্রহের তুলনায় বেশী। বলা বাহুল্য এই ধরণের বিশ্বাস চরম মূর্খতা ছাড়া কিছুই নয়। এরূপ ব্যক্তি মূল ঈমানে বিশ্বাসী হলেও আল্লাহর গযবে পতিত হওয়ার যোগ্য।
(৩) তৃতীয় সোপান হচ্ছে : নফল ও মুস্তাহাব এবাদত দ্বারা রিয়া করা, যেই গুলি বর্জন করলে কেউ গুনাহ্-গার হয় না। কিন্তু একাকী থাকলে এর সওয়াব লাভ করতে সচেষ্ট হয় না এবং রিয়ার কারণে পালন করে। উদাহরণত নামাজের জামাতে শরীক হওয়া, রোগীর কুশল জিজ্ঞাসা করা, জানাজায় শরীক হওয়া, রাতে তাহায্যুত পড়া, আশুরার রোজা রাখা অথবা সোমবার ও বৃহস্পতিবার রোজা রাখা। রিয়াকার এই সব এবাদত মানুষের নিন্দার ভয়ে অথবা মানুষের প্রশংসা কুড়ানোর উদ্দেশ্যে পালন করে। আল্লাহ্ তা'আলা জানেন যে,  একাকী হলে তারা ফরয সমুহের বেশী কিছু করত না। এ ধরণের রিয়াকার মন্দ হলেও পূর্ববর্তী সোপান সমূহের তুলনায় কম মন্দ।
এবাদতের গুণাবলীতেও রিযা হয়ে থাকে। উদাহরণত এক ব্যক্তি একাকী অবস্থায় নামাজ পড়লে দ্রুত গতিতে এবং কম সময়ে নামাজ সমাপ্ত করে নেয় কিন্তু জনসমক্ষে নামাজ পড়লে রুকু সেজদা উত্তম রূপে করে এবং সর্বাঁঙ্গীন সুন্দর রূপে নামাজ আদায় করে। হযরত ইবনে মাসুদ (রঃ) বলেন : যে ব্যক্তি এরূপ করে, সে তার পরোয়ারদেগারকে হেয় প্রতিপন্ন করে। অর্থাত নির্জন অবস্থায়ও যে আল্লাহ্ তা'আলা তার কর্ম সম্বন্ধে অবহিত আছেন, সে বিষয়ে পরোয় করেনা।

পরবর্তী পর্ব-
পিপিলিকার চলনের ছেয়েও গোপন রিয়া

যশ ও রিয়া - (১১) রিয়ার স্বরূপ



যশ ও রিয়া (পর্ব - ১১)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দীন - ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

রিয়ার স্বরূপ-
প্রকাশ থাকে যে, রিয়া শব্দটি আারবী ‘রুইয়ত’ ধাতু থেকে উদ্ভূত যার অর্থ দেখা। এমনিভাবে খ্যাতির অর্থে ব্যবহৃত "সুমআ' শব্দটি ‘সেমা’ ধাতু থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ শ্রবন করা। রিয়ার আসল অর্থ হচ্ছে মানুষের ভাল স্বভাব চরিত্র দেখিয়ে তাদের কাছে মর্যাদাবান হওয়া। যেহেতু এবাদত দ্বারাও যশ ও মর্যাদা অর্জিত হতে পারে, তাই সাধারণের পরিভাষায় রিয়া বিশেষভাবে সেই অবস্থাকে বলা হয়, যাতে ইবাদতের দিক দিয়ে অন্তরে মর্যাদা প্রতিষ্টা করা উদ্দেশ্য হয়। অর্থাত আল্লাহ্ তা'আলার এবাদত দ্বারা নিজের প্রতি মানুষের মনোযোগ আকৃষ্ট করা। অতএব এখানে চারটি বিষয় একত্রিত রয়েছে। 
 (১) রিয়াকার। সে হচ্ছে এবাদতকারী।
 (২) যার জন্য রিয়া করা হয়। সে হচ্ছে মানুষ। মানুষকে দেখানোই লক্ষ্য থাকে
 (৩) যা দেখানো উদ্দেশ্য; অর্থাত এবাদত ও অভ্যাস, যা রিয়াকার প্রকাশ করতে চায়।
 (৪) সয়ং রিয়া; অর্থাত, এবাদত প্রকাশ করার ইচ্ছা।

মানুষ ৫ প্রকার বস্তুর মধ্যে রিয়া করতে পারে 
শরীর, আকার-আকৃতি, কথা, কর্ম ও সঙ্গী-সাথী। কিন্তু এবাদত নয় এমন বস্তুতে রিয়া করা এবাদতে রিয়া করার তুলনায় হাল্কা।
(১) রিয়ার প্রথম প্রকার হচ্ছে শরীর প্রদর্শন করা। ধর্মীয় ক্ষেত্রে এর পদ্ধতি শরীরে ক্ষীণতা-শীর্ণতা ও ফ্যকাসে ভাব প্রকাশ করা,  যাতে মানুষ মনে করে,  এ ব্যক্তি ধর্ম-কর্মে খুব মেহনত করে এবং তার মধ্যে ধর্মের ভয় প্রবল। অথবা সে খাদ্য কম খায়। কিংবা ফ্যাকাসে ভাব দেখে মানুষ ধারণা করে যে, সে রাত্রি জাগরণ করে এবং এবাদত করে। এর কাছাকাছি ক্ষীনস্বরে কথা বলা, চক্ষু কোটরাগত হওয়া ও ঠোট শুষ্ক থাকা। এগুলো দ্বারা বুঝা যায়, লোকটি চির রোযাদার।
এ কারণে হযরত ঈসা (আঃ) বলেন : যখন তোমাদের কেউ রোযা রাখে, তখন যেন মাথায় তৈল মালিশ করে, চিরুনি করে এবং চোখে সুরমা ব্যবহার করে, যাতে সে রিয়াপ্রবণ না হয়ে যায়। দ্বীনদার ব্যক্তিরা এভাবে শরীর প্রদর্শন করে। কিন্তু দুনিয়াদাররা এর বিপরীতে স্থূলদেহ, স্বচ্ছবর্ণ, সুঠাম দেহ, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা এবং দৈহিক শক্তি প্রদর্শন করে থাকে।
(২) রিয়ার দ্বিতীয প্রকার হচ্ছে আকার-আকৃতি ও পোষাক প্রদর্শন করা। উদাহরণত : মাথায় কেশ এলোমেলো রাখা, গোফ মুন্ডন করা, পথে মাথা নত করে ধীরে ধীরে চলা, কপালে সেজদার চিহ্ন বাকী রাখা এবং অধৌত ও ছিন্নবস্ত্র পরিধান করা। এগুলো এজন্য করা হয়, যাতে বুঝা যায়যে, লোকটি সুন্নতের অনুসারী এবং আল্লাহর নেকবান্দা। এর মধ্যে দাখিল রয়েছে তালিকাযুক্ত বস্ত্র পরিধান করা এবং সুফীগণের ন্যায় নীলরঙের পোষাক পরিধান করা, আলেম না হয়ে আলেমের বিশেষ পোষাক পরিধান করা, যাতে মানুষ তাকে আলেম মনে করে, এটাও রিয়ার মধ্যে শামিল।
(৩) রিয়ার তৃতীয় প্রকার হচ্ছে, কথা। অর্থাত লোক দেখানোর জন্যে ওয়াজ নসীহত করা,  জ্ঞানগর্ব ও বিজ্ঞ কথাবার্তা বলা,  দৈনন্দিন বাচন পদ্ধতিতে হাদিস ও মহাজন-উক্তি মুখস্থ করা,  মানুষের সামনে যিকরের জন্য ঠোট নাড়াচাড়া করা, জনসমক্ষে ভাল কাজের আদেশ করা এবং মন্দকাজ থেকে বিরত রাখা।
(৪) রিয়ার চতুর্থ প্রকার হচ্ছে, আমল। অর্থাত লোক দেখানোর জন্যে নামাজে দীর্ঘ কেয়াম করা, রুকু ও সেজদা লম্বা করা,  স্থিরতা ও গাম্বীর্য প্রকাশ করা। এমনি ভাবে রোযা,  জেহাদ,  হজ্জ,  সদকা ও খাদ্য খাওয়ানোর মধ্যে রিয়া হয়ে থাকে।
(৫) রিয়ার পঞ্চম প্রকার হচ্ছে সঙ্গী-সাথী ও সাক্ষাতকামী ব্যক্তিবর্গ। উদাহরণত : কোন ব্যক্তি কামনা করে যে, অমুক আলেম অথবা আবেদ তার সাথে সাক্ষাত করতে আসুক, যাতে মানুষ জানে যে, সে খুব দ্বীনদার। তাই এমন আলেম ও আবেদ তার কাছে আসা-যাওয়া করে। অথবা কেউ কোন শাসনকর্তার আগমন প্রত্যাশা করে, যাতে মানুষ মনে করে যে,  সে ধর্মে অত্যন্ত  মর্যাদাবান। তাই শাসনকর্তাও বরকতলাভের জন্য তার কাছে আসে।

পরবর্তী পর্ব-

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...