নির্জনবাস (পর্ব- ৩)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দীন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দীন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
মেলামেশা পছন্দকারীদের প্রমাণ-—
কোরআন পাকে আল্লাহ্ তা'আলা বলেন,-
>"তোমরা তাদের মত হয়ো না যারা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে এবং মতভেদ করেছে।" অন্য আয়াতে বলা হয়েছে -
>"তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ স্মরণ কর, যখন তোমরা পরস্পরে শত্রু ছিলে, অতঃপর আল্লাহ্ তোমাদের অন্তরে সম্প্রীতি সৃষ্টি করেছেন।"
এ আয়াতে আল্লাহ তাআলা মানুষের প্রতি স্বীয় অনুগ্রহ বর্ণনা করেছেন যে, তাদের মধ্যে সম্প্রীতির কারণ সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু এসব প্রমাণ দুর্বল। কেননা, প্রথম আয়াতে বিচ্ছিন্ন হওয়ার অর্থ কোরআন পাক ও শরীয়তের মূলনীতিতে মতের বিভিন্নতা, মাযহাবসমূহের মতবিরোধ। দ্বিতীয় আয়াতে সম্প্রীতি স্থাপনের মানে হচ্ছে, অন্তর থেকে সেসব হিংসা-দ্বেষ বের করে দেয়া, যা গোলযোগ ও কলহ-বিবাদের কারণ হয়ে থাকে। নির্জনবাস এসব বিষয়ের পরিপন্থী নয়। নির্জনবাসের মধ্যে এগুলো হতে পারে।
তাদের দ্বিতীয় দলীল এই হাদীস "ঈমানদার বন্ধুত্ব করে এবং তার সাথে বন্ধুত্ব করা হয়। যে বন্ধুত্ব করে না এবং যার সাথে বন্ধুত্ব করা হয় না, তার মধ্যে কল্যাণ নেই।"
দলীলটিও দুর্বল। এতে অসচ্চরিত্রতার অনিষ্টের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে, যার কারণে বন্ধুত্ব হতে পারে না। যে চরিত্রবান ব্যক্তি মেলামেশা করলে অপরের সাথে বন্ধুত্ব করে এবং অপরও তার সাথে বন্ধুত্ব করে; কিন্তু নিজের নিরাপত্তা ও সংশোধনের নিমিত্ত মেলামেশা বর্জন করে, এ হাদীসে তাকে বোঝানো উদ্দেশ্য নয়।
তৃতীয় দলীল এই- রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন-
>"যে দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মৃত্যু বরণ করে, তার মৃত্যু মূর্খতা যুগের মৃত্যুর মত।"
অন্য এক হাদীসে আছে -
>"মুসলমানদের ইসলামে সুসংহত থাকা অবস্থায় যে মুসলমানদের বিরোধিতা করে, সে তার গর্দান থেকে ইসলামের জাল ছিন্ন করে দেয়।"
এ দলীলটিও অগ্রাহ্য। কেননা, এখানে দলের অর্থ সেই দল, যে একজন ইমামের বয়াতে একমত। অতএব যে এই দলের বিরোধিতা করবে সে বিদ্রোহী বলে গণ্য হবে। কাজেই বিচ্ছিন্ন হওয়ার অর্থ মতবিরোধ করা। এই হাদীসে নির্জনবাসের কোন উল্লেখ নেই।
চতুর্থ দলীল, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) তিন দিনের বেশী সাক্ষাৎ বর্জন করতে নিষেধ করেছেন। সেমতে তিনি বলেন
>"যে তার ভাইকে তিন দিনের বেশী সময় ত্যাগ করে এবং মরে যায়, সে দোযখে যাবে।" তিনি আরও বলেন :
>"কোন মুসলমানের জন্যে হালাল নয় যে, সে তার ভাইকে তিন দিনের বেশী ত্যাগ করবে। তাদের মধ্যে যে আগে সাক্ষাৎ করবে, সে জান্নাতে যাবে।" আরও বলা হয়েছে -
>"যে তার ভাইকে ছয় দিনের বেশী ত্যাগ করে, সে তার ঘাতকের মত।" সুতরাং কেউ নির্জনবাস করলে সে তার বন্ধু ও পরিচিত জনকে ত্যাগ করবে, যা এসব হাদীসদৃষ্টে নিষিদ্ধ। কিন্তু এ দলীলও গ্রহণযোগ্য নয়। কেননা, এই ত্যাগ করার অর্থ অসন্তুষ্ট হয়ে কথা বলা, সালাম করা ও মামুলী মেলামেশা বর্জন করা। অসন্তুষ্টি ছাড়া মেলামেশা বর্জন করা এ হাদীসের অন্তর্ভুক্ত নয়। এছাড়া দুই স্থানে তিন দিনের বেশীও মেলামেশা বর্জন করা জায়েয।
এক, যদি জানা যায়, তিন দিনের বেশী ত্যাগ করলে প্রতিপক্ষ সঠিক পথে এসে যাবে এবং দুই, যদি মেলামেশা বর্জন করার মধ্যেই নিরাপত্তা নিহিত আছে বলে মনে করা হয়। হাদীসের নিষেধাজ্ঞা যদিও ব্যাপক, কিন্তু এ দু'টি স্থান এর ব্যতিক্রম। কেননা, হযরত আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) তাঁকে যিলহজ্জ, মহররম ও সফর মাসের কিছু দিন পর্যন্ত বর্জন করেছিলেন। হযরত ওমর (রাঃ) বর্ণনা করেন- রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আপন পত্নীগণকে এক মাস পর্যন্ত ত্যাগ করেছিলেন। তিনি কসম খেয়ে তাঁদের থেকে পৃথক হয়ে উপরের কক্ষে চলে গিয়েছিলেন, যেখানে তার খাদ্য রাখা হত। সেখানে উনত্রিশ দিন অবস্থান করার পর যখন তিনি নীচের তলায় নেমে আসেন, তখন আরজ করা হল, আপনি তো উনত্রিশ দিন অবস্থান করেছেন। তিনি বললেন : মাস কখনও ঊনত্রিশ দিনেও হয়। হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর রেওয়ায়েতে রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন- কোন মুসলমানের জন্য হালাল নয় যে, সে তার ভাইকে তিন দিনের বেশী ত্যাগ করবে, কিন্তু তখন, যখন তার অনিষ্ট থেকে নিরাপদ না থাকে। এ হাদীসে ব্যতিক্রমের স্পষ্ট উল্লেখ আছে। এর উপর ভিত্তি করেই হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন : নির্বোধ থেকে আলাদা থাকা উচিত। কেননা, নির্বুদ্ধিতার প্রতিকার সম্ভবপর নয়। মুহাম্মদ ইবনে ওমর ওয়াকেদীর সম্মুখে কেউ বলল, এক ব্যক্তি অন্য এক ব্যক্তির সাথে সাক্ষাৎ করেনি। তিনি বললেন : এ কাজটি পূর্ববর্তীদের মধ্যেও কয়েকজন বুযুর্গ করেছেন। সেমতে সা’দ ইবনে ওয়াক্কাস (রাঃ) আম্মার ইবনে ইয়াসির (রাঃ)-এর সাথে সাক্ষাৎ বর্জন করে ওফাত পর্যন্ত তা অব্যাহত রাখেন। হযরত ওসমান গনী (রাঃ), হযরত আবদুর রহমান ইবনে আওফের সাথে সাক্ষাৎ করতেন না এবং হযরত আয়েশা (রাঃ) হযরত হাফসা (রাঃ)-কে বর্জন করে রেখেছিলেন। এসব সাক্ষাৎ বর্জন এই অর্থে ছিল যে, এই বুযুর্গগণ নিজেদের নিরাপত্তা এর মধ্যেই দেখেছিলেন।
পঞ্চম দলীল, এক ব্যক্তি এবাদতের জন্যে পাহাড়ে চলে গেলে লোকেরা তাকে ধরে রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর খেদমতে হাযির করল। তিনি বললেন : এরূপ করো না এবং তোমাদের কেউ যেন এরূপ না করে। সম্ভবতঃ এটা বলার কারণ ছিল, ইসলামের প্রথম যুগে জেহাদ অত্যাবশ্যকীয় ছিল। নির্জনবাসের কারণে জেহাদ বাদ পড়ে যেত। সেমতে হযরত আবু হোরায়রা (রাঃ) বলেন : রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর পবিত্র যুগে আমরা জেহাদের জন্যে বের হলাম। আমরা একটি উপত্যকা দিয়ে যাচ্ছিলাম। সেখানে নির্মল পানির একটি ছোট ঝরনা ছিল। আমাদের মধ্য থেকে এক ব্যক্তি বলল। আমি লোকজন থেকে আলাদা হয়ে এখানে একান্তে বাস করলে চমৎকার হত। কিন্তু রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম)-এর সাথে আলোচনা না করে এরূপ করব না। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) তাকে বললেন? এরূপ করো না। কেননা, আল্লাহর পথে তোমাদের অবস্থান করা আপন গৃহে ষাট বছর এবাদত করার চেয়ে উত্তম। আল্লাহ তোমাদেরকে ক্ষমা করুন এবং তোমরা জান্নাতে দাখিল হও, এটা কি তোমরা চাও না? আল্লাহর পথে জেহাদ কর। দুধের ধারাসমূহ বের করার মাঝখানে যতটুকু সময় থাকে, ততটুকু সময় যে আল্লাহর পথে জেহাদ করবে, আল্লাহ তাকে জান্নাতে দাখিল করবেন।
ষষ্ঠ দলীল, হযরত মুআয ইবনে জাবালের রেওয়ায়েতে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ
>"শয়তান মানুষের বাঘ। সে মানুষকে ছাগলের বাঘের ন্যায় গ্রাস করে। গ্রাস করে তাকে, যে দূরে থাকে, যে কিনারায় থাকে এবং যে একা থাকে। তোমরা ছত্রভঙ্গ হওয়া থেকে বেঁচে থাক। সকলের সাথে থাক এবং জমাত ও মসজিদের সাথে থাক।" এ হাদীসে নির্জনবাস তার জন্যে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যে জ্ঞানার্জনের পূর্বে নির্জনবাস অবলম্বন করে। এর বর্ণনা পরে আসবে।
পরবর্তী পর্ব-









