মঙ্গলবার, ১৪ মে, ২০২৪

দাকায়েকুল আখবার- (৫) হযরত আদম সফীউল্লাহ (আঃ)-এর সৃষ্টি রহস্য


📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ৫)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

হযরত আদম সফীউল্লাহ (আঃ)-এর সৃষ্টি রহস্য 
হযরত ইবনে আব্বাস (রঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে তিনি বলিয়াছেন আল্লাহ্ তা'আলা হযরত আদম  আলাইহিস্সালাম-কে বিভিন্ন দেশের মাটি হইতে সৃষ্টি করিয়াছেন। পবিত্র কাবা শরীফের মাটি হইতে মস্তক, দোহনার মাটি হইতে বক্ষস্থল, ভারত বর্ষের মাটি হইতে উদর ও পিট, হস্থদ্বয় পূর্ব দেশের মাটি হইতে পয়দা করিয়াছেন।
হযরত ওয়াহ্হাব ইবনে মাম্বা (রঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, "আল্লাহ্ তা'আলা সপ্তস্তরের মৃত্তিকা হইতে হযরত আদম আলাইহিস্সালামের সপ্তঅঙ্গ সৃষ্টি করিয়াছেন। যেমন- প্রথম স্তরের মাটি হইতে তাহার মস্তক, দ্বিতীয় স্তরের মাটি হইতে তাহার ঘাড়, তৃতীয় স্তরের মাটি হইতে তাহার বক্ষস্থল, চতুর্থ স্তরের মাটি হইতে তাহার হস্তদ্বয়, পঞ্চম স্তরের মাটি হইতে তাহার উদর ও পিট, ষষ্ঠ স্তরের মাটি হইতে তাহার উরুদ্বয় ও নিতম্ব এবং সপ্তম স্তরের মাটি হইতে তাহার পদদ্বয় সৃষ্টি করিয়াছেন। 

পরবর্তী পর্ব

দাকায়েকুল আখবার- (৪) নূরে মুহাম্মদীর দর্শনের তারতম্যের ফজিলত


📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ৪)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

নূরে মুহাম্মদীর দর্শনের তারতম্যের ফজিলত-
আল্লাহ তা'আলা পূর্বোল্লিখিত আত্মাসমূহকে নূরে মুহম্মদী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করিতে নির্দেশ করেন। এই আত্মাসমূহের মধ্যে যাহারা নূরে মুহম্মদী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর পবিত্র মস্তক দেখিয়াছেন তাহারা পরিণামে খলিফা ও বাদশা হইয়াছেন যাহারা পবিত্র মুখমন্ডল দেখিতে পাইয়াছেন, তাহারা ন্যায় পরায়ন, আমীর ও সাধক হইয়াছেন। যাহারা কর্ণ দ্বয় দেখিতে পাইয়াছেন তাহারা সত্যের সাধক হইয়াছেন। যাহারা চক্ষুদ্বয় দেখিতে পাইয়াছেন, তাহারা পবিত্র কুরআন শরীফের তত্বাবধায়ক হইবার সৌভাগ্য লাভ করিয়াছেন। ভ্রূদ্বয়ের দর্শকগণ ভাগ্যবান হইয়াছেন। যাহারা গন্ডদ্বয় দেখিয়াছেন, তাহারা বুদ্ধিমান ও চরিত্রবান হইয়াছেন। যাহারা পবিত্র নাসিকা দেখিযাছেন তাহারা হেকিম, ডাক্তার ও সুগন্ধি বিক্রেতা হইয়াছেন। আর যাহারা ওষ্ঠ মুবারক দেখিয়াছেন, তাহারা রূপবান ও উযির হইয়াছেন। যাহারা মুখ গহবর দেখিয়াছেন , তাহারা রোযাদার হইয়াছেন। দন্তরাজির দর্শকগণ সুন্দর সুন্দর নর-নারী হইয়াছে।  রশনা মুবারকের দর্শকগণ রাজদূত হইয়াছে। হল্কুমের দর্শকগণ বক্তা, মুয়াজ্জিন ও উপদেষ্টা হইয়াছে। শ্মশ্রু মুবারকের দর্শকগণ ধর্মযোদ্ধা হইয়াছেন। বাহুদ্বয়ের দর্শকগণ তীরন্দাজ ও তরবারি যোদ্ধা হইয়াছেন।  ডান বাহুর দর্শকগণ নাপিত হইয়াছে। বামবাহুর দর্শকগণ জল্লাদ ও বীর পুরুষ হইয়াছে। ডান হস্তের দর্শকগণ সাব্বাক ও শিল্পী হইয়াছে। বাম হস্তের দর্শকগণ কয়াল হইয়াছে। উভয় হস্তের দর্শকগণ দানবীর ও বিজ্ঞ হইয়াছে। হাতের পিট দর্শকগণ কৃপণ অসৎ হইয়াছে। ডান হস্তের পিট দর্শকগণ রন্জক হইয়াছে। বাম হস্তের পিট দর্শকগণ কাঠুরিয়া হইয়াছে। অঙ্গুলি দর্শকগণ লেখক ও মুন্সি হইয়াছে। ডান হস্তের অঙ্গুলির পিট দর্শকগণ দর্জি হইয়াছে। বাম হস্তের অঙ্গুলির পিট দর্শকগণ কর্মকার হইয়াছে। বক্ষ দর্শকগণ আলেম, মুস্তাহীদ, চিন্তাবিদ ও কৃতজ্ঞ হইয়াছে। পৃষ্ঠ দর্শকগণ ধর্মানুরাগী হইয়াছে। কপাল দর্শকগণ গাজী হইয়াছে। উদর দর্শকগণ স্বল্পেতুষ্ট ও সংসার ত্যাগী হইয়াছে। হাটু দ্বয় দর্শকগণ রুকু সিজদাহ্কারী হইয়াছে। পদদ্বয় দর্শকগণ শিকারী হইয়াছে। পদতম দর্শকগণ পর্যটক হইয়াছে। ছায়া মুবারক দর্শকগণ গায়ক ও রুটি প্রস্তুতকারক হইয়াছে। যাহারা তাহাকে দেখিতে পায় নায় তাহারাই খোদায়ী দাবীদার ফেরাউন, নমরুদ ও অন্যেন্য কাফের রূপে পরিগনিত হইয়াছে। যাহারা তাহার প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করা সত্বেও দেখিতে পায় নাই তাহারা ইহুদী, নাসারা, অগ্নি-উপাসক ইত্যাদিরুপে পরিগনিত হইয়াছে। 
আল্লাহ্ তা'আলা হুজুর করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর আহমদ নামের আকৃতিতে নামাযকে সৃষ্টি করিয়াছেন। যেমন নামাযে দন্ডায়মান হওয়া  'আলিফ' অক্ষর সদৃশ। রুকুর অবস্থা 'হা'-অক্ষর সদৃশ। সিজদাহ্ করা 'মিম' অক্ষর সদৃশ এবং নামাজের বৈঠক ও উপবেশন 'দাল' অক্ষর সদৃশ।আল্লাহ্ তা'আলা মানুষকে হুজুর করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর 'মুহাম্মদ' (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) নামের আকৃতিতে পয়দা করিয়াছেন। যেমন 'মিম' অক্ষরের মত মানুষের মস্তক গোলাকার। হস্তদ্বয় 'হা' অক্ষরের মত বাকা। উদর দ্বিতীয় 'মিম' অক্ষরের মতও মোটা ও গোল এবং পদদ্বয় 'দাল' অক্ষরের ন্যায়। এই কারণে কোন কাফের মানবাকৃতিতে দোযকের অনলকুন্ডে নিক্ষিপ্ত হইবেনা। বরং কাফেরকে শুকরের আকৃতিতে দোযকের মধ্যে নিক্ষিপ্ত করা হইবে।
(ওয়াল্লাহু আ'লামু বিছ্ছাওয়াব)
[আল্লাহ্ তা'আলা-ই ইহার অধিক ভাল জানেন]

পরবর্তী পর্ব

দাকায়েকুল আখবার- (৩) হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সঃ)-এর সৃষ্টি রহস্য



📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ৩)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

হযরত মুহাম্মদ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উনার সৃষ্টি রহস্য-
হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ্ তা'আলা সর্বপ্রথম 'শাজ্বরাতুল্ ইয়াকীন' নামে চারি কান্ড বিশিষ্ট একটি বৃক্ষ সৃষ্টি করেন। তারপর নুরে মুহম্মদীকে ময়ুর আকৃতিতে শুভ্র মুক্তার আবরনের মধ্যে সৃষ্টি করিয়া উক্ত বৃক্ষের উপর রাখিয়া দেন। সত্তর হাজার বৎসর তিনি এরুপ অবস্থায় আল্লাহ্ তা'আলার তাসবীহ পাঠে নিবিষ্ট থাকেন।
অতঃপর আল্লাহ তা'আলা লজ্জার আয়না তৈরী করিয়া তাঁহার সন্মুখে রাখেন। তিনি যখন স্বীয় সুন্দর লাবণ্যময় জাঁকজমকপূর্ণ ছবি আয়নার মধ্যে দেখতে পান, তখন লজ্জিত হইয়া আল্লাহ্ তা'আ'লাকে অবনত মস্তকে পাঁচবার সিজদাহ করেন। এই কারণেই হযরত মুহম্মদ মুস্তফা (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)  উনার উম্মতের উপর দৈনিক নির্দিষ্ট সময়ে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরয হইয়াছে। আল্লাহ তা'আলা পুনরায় যখন উক্ত নুরের প্রতি দৃষ্টিপাত করেন, তখন উহা আল্লাহ'র ভয়ে লজ্জিত ও ঘর্মাক্ত হইয়া যায়। আল্লাহ তা'আলা তাঁহার মাথার ঘর্ম হইতে ফেরেশতাদিগকে এবং মুখমন্ডলের ঘর্ম হইতে আরশ-কুরসি, লৌহ-মাহফুজ, কলম, চন্দ্র, সূর্য, পর্দা সমুহ, তারকারজি এবং আকাশস্থিত যাবতীয় বস্তু পয়দা করেন। আর কর্ণদ্বয়ের ঘর্ম হইতে ঈহুদী, নাসারা, অগ্নি উপাসক এবং অন্যেন্য অনুরূপ জাতীসমূহের আত্মা সৃষ্টি করেন। তাহার পদদ্বয়ের ঘর্ম হইতে ভূমন্ডলস্থিত সমুদয় বস্তু সামগ্রী সৃষ্টি করেন।
তারপর আল্লাহ্ তা'আলা নূরে মুহম্মদী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) -কে সম্মুখের দিকে তাকাইতে আদেশ করেন। তিনি সম্মুখ পানে দৃষ্টি নিক্ষেপ করিলে তাঁহার সম্মুখে, পশ্চাতে, উত্তরে, দক্ষিণে যতাক্রমে হযরত আবুবকর (রঃ) হযরত ওমর (রঃ), হযরত ওসমান (রঃ) এবং হযরত আলী (রঃ) এর নূর দেখিতে পান। অতঃপর নূরে মুহম্মদী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) সত্তর হাজার বৎসর পর্যন্ত আল্লাহ'র তসবীহ পাঠ করেন। লাল লোহিত আকীক পাথরে একটি লন্ঠন বা ফানুস তৈরি করিয়া হযরত মুহাম্মদ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) -কে নামাজের সুরতে উহাতে বসাইয়া রাখেন। অতঃপর উল্লিখিত আত্মাসমূহ নুরে মুহাম্মদী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) -কে এক লক্ষ বৎসর পর্যন্ত তাওয়াফ করেন এবং তাসবীহ তাহলীল পাঠ করিয়া কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। 

পরবর্তী পর্ব

দাকায়েকুল আখবার- (২) সমস্ত নবী-রসূলদের থেকে সফত গ্রহণ


📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ২)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

সমস্ত নবী-রসূলদের থেকে সফত গ্রহণ-
আল্লাহ তা'আলা নূরে মুহাম্মদী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) হইতে সমস্ত রূহ সৃষ্টি করিয়া তাহাদের নিকট হইতে “আমি কি তোমাদের প্রতিপালক নই” বলিয়া স্বীকৃতি তলব করিলেন। তখন সর্বপ্রথম মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) হাঁ বলিয়া স্বীকৃতি প্রদান করিলেন। তারপর আল্লাহ তা'আলা নূরে মুহাম্মদীর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) দ্বারা সমস্ত নবীগণের নূরকে ঢাকিয়া ফেলিলেন। তখন নবীগণের নূর চাহিয়া দেখিল যে, তাহাদের উপর একেকটি নূর চমকাইতেছে। তাহারা এই নূরের পরিচয় জানিতে চাহিলে আল্লাহ তা'আলা বলিলেন , “ইহা নূরে মোহাম্মদী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ! তোমরা যদি তাঁহার উপর ঈমান আনয়ন কর তাহা হইলে আমি তোমাদিগকে নবী পদ দান করিব। "তখন তাহারা প্রত্যেকেই মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উনাকে  সাইয়্যেদুল মুরছালীন বলিয়া ঈমান আনয়ন করিলেন এবং এই উছিলায়ই তাহারা নবী পদপ্রাপ্ত হইলেন।
আল্লাহ তা'আলা হইলেন, 'রাব্বুল আলামীন' এবং রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) হইলেন ‘রহমতুল্লিল আলামীন'। সমস্ত সৃষ্টজগত রসূলুল্লাহর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) রহমতের অণুকণা ধারণ করিয়া টিকিয়া রহিয়াছে এবং থাকিবে। আল্লাহ তা'আলার পূর্ণ পরিচয় একমাত্র রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ছাড়া আর কেহই লাভ করিতে পারে নাই এবং পারিবেও না। এইজন্য রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উনাকে মহব্বত করিলেই আল্লাহ তা'আলার মহব্বত লাভ করা যাইবে। অন্যথায় আল্লাহ তা'আলার মহব্বত ও কুদরত হাসিল করা কোন মতেই সম্ভব হইবে না। এইজন্যই পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করা হইয়াছে, “যদি তোমরা আল্লাহর সহিত বন্ধুত্ব করিতে চাও তাহা হইলে আমার এত্তেবা ও অনুসরণ কর। তবেই আল্লাহ তা'আলা তোমাদিগকে বন্ধুরূপে কবুল করিবেন।”
আল্লাহুম্মা আতিনা হুব্বাকা ওয়া হুব্বা রাসূলিকা মুহাম্মাদিন্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)।

পরবর্তী পর্ব

দাকায়েকুল আখবার- (১) সৃষ্টি রহস্যের গোড়ার কথা



📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ১)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

সৃষ্টি রহস্যের গোড়ার কথা—
মাওয়া হিবুল্লাদুন্নিয়া ও শরহে মাওয়াহিব এবং মুসান্নাফ আবদুর রাজ্জাক কিতাবে হযরত যাবের বিন্ আবদুল্লাহ আনসারী (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, হযরত জাবের (রাঃ) বলেন, একদিন আমি আরজ করিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ! আমার পিতা এবং মাতা আপনার জন্য কোরবান হউক। আপনি আমাকে বলিয়া দিন যে, সকল বস্তু সৃষ্টি করিবার আগে আল্লাহ তা'আলা কোন জিনিস পয়দা করিলেন? 
রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উত্তর করিলেন, হে জাবের ! আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সবকিছু সৃষ্টি করিবার পূর্বে স্বীয় নূর হইতে তোমার নবীর নূরকে পয়দা করিলেন। তারপর সেই নূর আল্লাহ পাকের মর্জি মোতাবেক বিচরণ করিতে লাগিল। সেই সময়ে লাওহে মাহফুজ, কলম, জান্নাত, জাহান্নাম, ফেরেশতা, আসমান, যমিন, সূর্য, চন্দ্র, জ্বিন ও ইনসান্‌ কিছুই ছিল না। কেবল আল্লাহ তা'আলা ছিলেন এবং নূরে মুহাম্মদী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আল্লাহর নির্দেশে ভ্রমণ করিতেছিলেন।

তারপর আল্লাহ তা'আলা যখন সৃষ্টিজগত পয়দা করিতে মনস্থ করিলেন, তখন সেই নূর মোবারককে চারিভাগে বিভক্ত করিলেন। 
(১) প্রথম ভাগ হইতে কলম, দ্বিতীয় ভাগ হইতে লাওহে মাহফুজ, তৃতীয় ভাগ হইতে আরশে মোয়াল্লা পয়দা করিলেন। (২) তারপর চতুর্থ ভাগকে চারিভাগে বিভক্ত করিয়া প্রথম ভাগ হইতে আরশে মোয়াল্লা বহনকারী ফেরেশ্তামণ্ডলী, দ্বিতীয় ভাগ হইতে কুর্শী, তৃতীয় ভাগ হইতে অন্যান্য ফেরেশ্তাদিগকে পয়দা করিলেন ।(৩) তারপর চতুর্থ ভাগকে চারিভাগে বিভক্ত করিলেন । ইহার প্রথম ভাগ হইতে আকাশমণ্ডল, দ্বিতীয় ভাগ হইতে ভূমণ্ডল, তৃতীয় ভাগ হইতে জান্নাত এবং জাহান্নাম পয়দা করিলেন। (৪) তারপর ইহার চতুর্থ ভাগকে চারিভাগে বিভক্ত করিলেন। ইহার প্রথম ভাগ হইতে মুমিন বান্দাহদের চোখের নূর, দ্বিতীয় ভাগ হইতে মুমিন বান্দাহদের কলবের নূর ইহাই আল্লাহর মারেফাত এবং তৃতীয় ভাগ হইতে মুমিন বান্দাহদের ভালবাসার নূর ইহাই তাওহীদের মূল সূত্র ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’ পয়দা করিলেন। (৫) তারপর ইহার চতুর্থ খণ্ডকে পুনরায় চারিভাগ করিয়া পর্যায়ক্রমে সমস্ত মাখলুকাত পয়দা করিলেন।
হাদীসে কুদ্‌সীতে বর্ণিত আছে, আল্লাহ তা'আলা এরশাদ করিয়াছেন, “হে আমার প্রিয় হাবীব ! আপনাকে সৃষ্টি না করিলে আমি এই জগত সংসার সৃষ্টি করিতাম না।”  অন্য এক হাদীসে কুদসীতে আছে, আল্লাহ তা'আলা বলেন,
“হে আমার প্রিয় হাবীব ! আপনাকে সৃষ্টি না করিলে আমি আকাশমণ্ডল, ভূমণ্ডল, সৃষ্টি করিতাম না এবং আকাশমণ্ডলকে সুউচ্চে স্থাপন করিতাম না এবং ভূমণ্ডলকে নিম্নে বিছানাস্বরূপ করিতাম না।”  অন্য এক হাদীসে রাসূলুল্লাহু (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ফরমান, 
“আমি তখনও নবী ছিলাম যখন হযরত আদমের (আঃ) অস্তিত্ব পানি এবং কাদার মধ্যে নিহিত ছিল।
”অপর এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করেন,
“আমি হযরত আদমের (আঃ) চৌদ্দ হাজার বছর পূর্বে আল্লাহ তা'আলার দরবারে একটি নূর ছিলাম !”  হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ তা'আলা এরশাদ করিয়াছেন,
“সমস্ত মাখলুকাত হইতে আমার নিকট যিনি অধিক প্রিয় ও সম্মানিত এবং যাহার পবিত্র নাম আকাশমণ্ডল, ভূমণ্ডল, চন্দ্র, সূর্য সৃষ্টি করার বিশলক্ষ বৎসর পূর্বে আরশে মোয়াল্লাতে আমার নামের পাশে লিখিয়া রাখিয়াছি, তিনিই নবী হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)। তিনি এবং তাহার উম্মতগণ বেহেশতে প্রবেশ না করা পর্যন্ত অন্যান্যদের বেহেশতে প্রবেশ করা হারাম। ”রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিয়াছেন, “হযরত আদমের (আঃ) দেহে রূহ ফুৎকার করার পর যখন তাহার দেহে প্রাণ সঞ্চার হইল, তখন তিনি আরশের দিকে তাকাইয়া দেখিলেন লেখা রহিয়াছে, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ্।”  তখন আদম (আঃ) তাহার পরিচয় জিজ্ঞাসা করিলে আল্লাহ তা'আলা বলিলেন, এই নাম আমার প্রিয় হাবীবের। যিনি শেষ যমানায় নবী হইবেন। তাঁহার সৃষ্টি না হইলে তোমাকেও সৃষ্টি করিতাম না। সমস্ত মাখলুকাতের মধ্যে তিনি আমার নিকট বেশী প্রিয়।” 
কলম পয়দা হইয়া সর্বপ্রথম লাওহে মাহফুজে এই কথা কয়টি লিখিল, “আল্লাহ ছাড়া কোনই উপাস্য নাই, আল্লাহর মনোনীত ধর্ম ইসলাম, হযরত মুহাম্মদ আল্লাহর বান্দাহ্ ও রাসূল।” সুতরাং যে ব্যক্তি তাঁহার প্রতি ঈমান আনিবে তাহাকে আল্লাহ তা'আলা বেহেশতে দাখিল করিবেন।

পরবর্তী পর্ব

রবিবার, ২৮ এপ্রিল, ২০২৪

সিদক (পর্ব- ২) সিদকের স্বরূপ



সিদক (পর্ব- ২)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দীন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
সিদকের স্বরূপ : 
‘সিদ্ধ’ তথা নিষ্ঠা ছয়টি অর্থে ব্যবহৃত হয় : (১) কথায় নিষ্ঠা, (২) নিয়তে নিষ্ঠা (৩) সংকল্পে নিষ্ঠা (8) সংকল্প বাস্তবায়নে নিষ্ঠা (৫) আমলে নিষ্ঠা এবং (৬) ধর্মীয় মকামসমূহে নিষ্ঠা। 
যে ব্যক্তি এই ছয়টি বিষয়েই নিষ্ঠার গুণে গুণান্বিত হয়, তাকে বলা হয় সিদ্দীক। কারণ, সে সিদকের চরম সীমায় পৌঁছে যায়। এখন এই ছয়টি অর্থ বিস্তারিত বর্ণনা করা হচ্ছে।
(১) কথায় নিষ্ঠা- 
কথায় সত্যবাদিতা বা নিষ্ঠা সেই সমস্ত উক্তি ও খবরে হয়ে থাকে, যেগুলো অতীত কিংবা ভবিষ্যতের সাথে সম্পর্কযুক্ত। ওয়াদা পূর্ণ করাও এর অন্তর্ভুক্ত। প্রত্যেক বান্দার কর্তব্য নিজের কথাবার্তার প্রতি লক্ষ্য রাখা এবং সত্য ছাড়া কোনরূপ কথাবার্তা না বলা। সিদকের সকল প্রকারের মধ্যে এ প্রকারটিই সর্বাধিক স্পষ্ট। যে ব্যক্তি নিজের মুখের হেফাযত করে এবং বাস্তব অবস্থার খেলাফ কিছু না বলে, তাকে বলা হয় সাদেক তথা সত্যবাদী। কিন্তু এই সিদকের পূর্ণতার দুটি স্তর রয়েছে। প্রথম, রূপক ভাষা থেকে বেঁচে থাকা৷ কেননা, বলা হয়, মিথ্যা এড়ানোর জন্যে রূপক ভাষার আশ্রয় নেয়া হয়। আসলে এটাও মিথ্যার স্থলবর্তী। মাঝে মাঝে সময়ের উপযোগিতার কারণে এর আশ্রয় নিতে হয়। যেমন, বালক-বালিকা ও নারীদের শাসন করার ক্ষেত্রে, যালেমদের কবল থেকে আত্মরক্ষার বেলায় এবং শত্রুর মোকাবিলা করার সময়। এসব ক্ষেত্রে যথাসম্ভব রূপক ভাষা ব্যবহার করা যায়, যাতে পরিষ্কার মিথ্যা না হয়। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-উনার রীতি ছিল তিঁনি যখন সফরে রওয়ানা হতেন, তখন অন্যদের কাছে তা গোপন রাখতেন, যাতে শত্রুরা খবর না পায়। এটা মিথ্যার অন্তর্ভুক্ত নয়। এক হাদীসে এরশাদ হয়েছে
“সে মিথ্যাবাদী নয়, যে দু'ব্যক্তির মধ্যে শান্তি স্থাপন করতে গিয়ে ভাল কথা বলে অথবা ভাল কথা পৌছায়।”
রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) তিন জায়গায় মিথ্যা ভাষণকে সময়োপযোগী বলেছেন। (এক) যে দু’ব্যক্তির মধ্যে শান্তি স্থাপন করে। (দুই) যার দুই স্ত্রী রয়েছে এবং (তিন) যে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছে। এসব জায়গায় সিদকের অর্থ নিয়তের সত্যবাদিতা । ফলে সৎ নিয়ত ও সদিচ্ছার প্রতি লক্ষ্য রাখা হয়, ভাষার প্রতি নয়। সুতরাং যার ইচ্ছা সৎ হবে এবং শুধু কল্যাণই কাম্য হবে, সে সত্যবাদী ও সিদ্দীক কথিত হবে। এতদসত্ত্বেও এসব জায়গায় ইশারা-ইঙ্গিতে বর্ণনা করা উত্তম। উদাহরণতঃ বর্ণিত আছে, জনৈক বুযুর্গকে যখন কোন যালেম ব্যক্তি তালাশ করত এবং তিনি ঘরেই থাকতেন, তখন নিজের স্ত্রীকে বলতেন— অঙ্গুলি দ্বারা মাটিতে একটি বৃত্ত আঁক এবং তার ভিতরে আঙ্গুল রেখে বলে দাও তিনি এখানে নেই । এ বাহানায় তিনি মিথ্যা বলা থেকে এবং যালেম থেকে আত্মরক্ষা করতেন। পত্নীর কথা সত্য হত; কিন্তু যালেম বুঝত যে, তিনি ঘরে নেই।
পূর্ণতার দ্বিতীয় স্তর হচ্ছে ব্যবহৃত ভাষার অর্থের প্রতিও লক্ষ্য রাখা। নতুবা মুখে সত্য কথা বললে এবং নিজের অবস্থা সে অর্থের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ না হলে মিথ্যা ভাষণ হয়ে যাবে। উদাহরণতঃ কেউ আল্লাহর কাছে মোনাজাত ও দোয়ায় মুখে বলে
‘আমি আমার মুখমণ্ডল সেই সত্তার প্রতি নিবিষ্ট করলাম, যিনি নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডল সৃষ্টি করেছেন।’
কিন্তু তার অন্তর আল্লাহ থেকে বিমুখ এবং দুনিয়ার কামনা-বাসনায় মশগুল। এমতাবস্থায় সে হবে মিথ্যাবাদী। অথবা কেউ মুখে বলে, আমি শুধুমাত্র তোমারই বন্দেগী করি, অথচ তার মধ্যে বন্দেগীর স্বরূপ অনুপস্থিত
(২) নিয়তে নিষ্ঠা -
নিয়তে সত্যবাদিতা হচ্ছে এখলাস। অর্থাৎ, সাধকের যাবতীয় কাজকর্মের প্রেরণাদাতা আল্লাহ তা'আলা ছাড়া অন্য কিছু না হওয়া। অতএব, যদি কোন জৈবিক বাসনা এর সাথে মিলিত হয়ে যায়, তবে নিয়তের সত্যতা বাতিল হয়ে যাবে। এমতাবস্থায় সাধককে মিথ্যাবাদী বলা হবে। এখলাসের ফযীলত সম্পর্কে ইতিপূর্বে এক হাদীসে তিন ব্যক্তির প্রশ্ন ও উত্তর বার্ণিত হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে যে, আলেমকে প্রশ্ন করা হবে তুমি ইলম শিখে কি আমল করেছ? সে উত্তর দেবে, আমি অমুক কাজ করেছি। আল্লাহ তা'আলা বলবেন, তুমি মিথ্যাবাদী; বরং তোমার ইচ্ছা ছিল যে, মানুষ তোমাকে আলেম বলুক। এখানে লক্ষণীয় যে, তাকে একথা বলা হয়নি যে, তুমি আমল করনি; বরং কেবল নিয়তের ব্যাপারে তাকে মিথ্যাবাদী বলা হয়েছে। নিম্নোক্ত আয়াতে এমনিভাবে মুনাফিকদেরকে মিথ্যাবাদী বলা হয়েছে- “আল্লাহ সাক্ষ্য দেন, মুনাফিকরা অবশ্যই মিথ্যাবাদী”। অথচ মুনাফিকরা রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-কে বলেছিল-“নিশ্চয়ই আপনি আল্লাহর রসূল। তাদের এ কথাটি সত্য ছিল। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা তাদের কথাটিকে মিথ্যা বলেননি; বরং একথা বলার পেছনে তাদের অন্তরে যে নিয়ত লুক্কায়িত ছিল, তাকে মিথ্যা বলেছেন৷
(৩) সংকল্পে নিষ্ঠা 
সংকল্পে সত্যবাদিতার অর্থ এই যে, মানুষ কখনও আমল করার পূর্বে মনে মনে সংকল্প করে বলে, যদি আল্লাহ্ তা'আলা আমাকে অর্থ-সম্পদ দান করেন, তবে সমস্তই সদকা করে দেব অথবা অর্ধেক সদকা করব। এই সংকল্প কখনও মানুষের মনে পাকাপোক্ত ও সত্যিকারভাবে হয় এবং কখনও এতে এক প্রকার সংশয় ও দুর্বলতা থাকে। এই সংশয় ও দুর্বলতা সিদকের পরিপন্থী। অতএব, এখানে সিদকের অর্থ যেন শক্তিশালী হওয়া। এই অর্থ অনুযায়ী সাদেক ও সিদ্দীক এমন ব্যক্তিকে বলা হবে, যে তার সদকা করার সংকল্পকে পূর্ণাঙ্গ ও শক্তিশালী পায়।
(8) সংকল্প বাস্তবায়নে নিষ্ঠা 
সংকল্প বাস্তবায়নেও সিদকের প্রয়োজন রয়েছে। কেননা, মানুষ প্রায়ই সংকল্প করে ফেলে। কারণ, এতে কোন কিছু ব্যয় করতে হয় না। কিন্তু যখন বাস্তবায়নের সময় আসে, তখন কামনা-বাসনা জোরদার হবার কারণে সংকল্প শিথিল হয়ে যায়। এটা সংকল্প বাস্তবায়নে সিদকের পরিপন্থী। তাই আল্লাহ তা'আলা এ ধরনের সিদ্ধ সম্পর্কে এরশাদ করেন : “তারা এমন মানুষ, যারা আল্লাহর সাথে কৃত চুক্তি বাস্তবায়ন করেছে”।
এ আয়াতের শানে নুযুল প্রসঙ্গে বর্ণিত আছে যে, আনাস ইবনে নযর (রাঃ) বদর যুদ্ধে ওযরবশত রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর সাথে শরীক ছিলেন না। এটা ছিল তার জন্যে অসহনীয়। তিনি বললেন : এটা ছিল শাহাদত লাভের প্রথম সুযোগ। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) যোগদান করেছেন, আর আমি কি না অনুপস্থিত রইলাম! আল্লাহর কসম, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর সঙ্গে থেকে শাহাদত লাভের এরূপ সুযোগ আবার এলে আল্লাহ তা'আলা দেখবেন আমি কি করি ! 
বর্ণনাকারী বলেন : এই আনাস ইবনে নযর পরবর্তী বছর উহুদ যুদ্ধে উপস্থিত হন। যুদ্ধক্ষেত্রে সা'দ ইবনে মুয়ায তাকে জিজ্ঞেস করলেন : হে আবু আমর, কোথায় যেতে চাও? তিনি বললেন : জান্নাতের চমৎকার হাওয়া আমি উহুদের দিক থেকে অনুভব করছি। এরপর তিনি বীর বিক্রমে লড়তে লড়তে শহীদ হয়ে যান। তাঁর দেহে আশিটির উপরে তীর, তরবারি ও বর্শার আঘাত ছিল। তাঁর ভগ্নী বলেন: যখমের কারণে আমি আমার ভাইকে চিনতে পারিনি। এরপর অঙ্গুলির অগ্রভাগ দেখে চিনতে পেরেছি । তখন উপরোক্ত আয়াতটি অবতীর্ণ হয়।
এক হাদীসে রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : চার ব্যক্তি শহীদ – 
(ক) যে ঈমানদার শত্রুকে দেখে, অতঃপর আল্লাহ তা'আলাকে সত্য বলে বিশ্বাস করে শহীদ হয়ে যায়। কিয়ামতের দিন মানুষ এই ব্যক্তির প্রতি মাথা তুলে তাকাবে। অতঃপর তিনি এমনভাবে মাথা তুললেন যাতে তাঁর মাথার টুপি পড়ে গেল। 
(খ) যে ঈমানদার শত্রুর মুখোমুখি হওয়ার পর নিজের দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয়। অতঃপর একটি ঘাতক তীর এসে তার দেহে বিদ্ধ হয় এবং সে শহীদ হয়ে যায়। 
(গ) যে ঈমানদার কিছু ভাল ও কিছু মন্দ আমল করে। অতঃপর শত্রুর সাথে ভিড়ে আল্লাহকে সত্য বলে বিশ্বাস করে শহীদ হয়ে যায়। 
(ঘ) যে ঈমানদার নিজের উপর যুলুম করে। অতঃপর শত্রুর মুখোমুখি হয়ে আল্লাহকে সত্য বলে বিশ্বাস করে শহীদ হয়ে যায়।
হযরত মুজাহিদ (রহঃ) বর্ণনা করেন, দুটি লোক মানুষের সামনে এসে বলল : আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে ধন-সম্পদ দিলে আমরা সদকা করব। আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে ধন-সম্পদ দিলেন। কিন্তু তারা কৃপণতা অবলম্বন করল। তখন নিম্নোক্ত আয়াত নাযিল হল :
“তাদের কেউ কেউ আল্লাহর সাথে অঙ্গীকার করল, যদি আল্লাহ আমাদেরকে তাঁর অনুগ্রহ (ধন-সম্পদ) দান করেন, তবে আমরা সদকা করব এবং সৎকর্মপরায়ণদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব। অতঃপর আল্লাহ যখন তাদেরকে অনুগ্রহ করে দান করলেন, তখন তারা কৃপণতা অবলম্বন করল এবং পৃষ্ঠ প্রদর্শন করল। অতঃপর আল্লাহ এর চিহ্ন হিসাবে নিফাক স্থাপন করে দিলেন, তাদের অন্তর আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের দিন পর্যন্ত। কারণ, তারা আল্লাহর সাথে কৃত ওয়াদার খেলাফ করেছিল”।
এ আয়াতে সংকল্পকে অঙ্গীকার বলা হয়েছে এবং এর খেলাফ করাকে মিথ্যা আখ্যায়িত করা হয়েছে। এই সিদক তৃতীয় প্রকার সিদকের তুলনায় কঠিনতর। কেননা, মানুষ কখনও সংকল্প করতে প্রস্তুত হয়ে যায়; কিন্তু বাস্তবায়নের সময় এলে নানাবিধ বাসনার মাধ্যমে বাধাগ্রস্ত হয়ে পিছু হটে যায়।
(৫) আমলে নিষ্ঠা -
আমলে সত্যবাদিতা হচ্ছে এমন চেষ্টা করা যাতে বাহ্যিক আমলে কোনরূপ কৃত্রিমতা প্রকাশ না পায়। অর্থাৎ, যে গুণ বাস্তবে তার মধ্যে নেই, বাহ্যিক আমল দ্বারা তা যেন আছে বলে প্রকাশ না পায়। কিন্তু এ কৃত্রিমতা প্রকাশ না পাওয়া যেন আমল বর্জন করার মাধ্যমে না হয়। এই সিদকের উদ্দেশ্য রিয়া বর্জন নয়। কেননা, অধিকাংশ নামাযী নামাযে খুশুখুযুর আকার ধারণ করে থাকে। কিন্তু রিয়া তথা কাউকে দেখানো তাদের উদ্দেশ্য থাকে না; কিন্তু তাদের অন্তর নামায থেকে গাফেল থাকে এবং বাজারে ঘুরাফেরা করে। এরূপ ব্যক্তি আমলে মিথ্যাবাদী এবং সে সিদক সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে- রিয়া সম্পর্কে নয়। মোটকথা, বাহ্যিক অবস্থা অন্তরের অবস্থার পরিপন্থী হওয়া ইচ্ছাকৃত হলে তা রিয়া। এর ফলে এখলাস বিনষ্ট হয়ে যায়। আর যদি অনিচ্ছায় হয়, তবে সেটা মিথ্যা এবং এতে সিদক বিনষ্ট হয়। এ কারণেই রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরূপ দোয়া করতেন - “ইলাহী, আমার অভ্যন্তরীণ অবস্থাকে বাহ্যিক অবস্থা অপেক্ষা উত্তম করে দেন এবং আমার বাহ্যিক অবস্থাকে সৎ করে দেন।”
যায়দ ইবনে হারেছ বলেন : যখন মানুষের বাইরের অবস্থা ও ভেতরের অবস্থা সমান হয়ে যায়, তখন সে পুণ্যবান হয়ে যায়। যদি ভেতরের অবস্থা বাইরের তুলনায ভাল হয়, তবে তাকে বলা হয় ‘ফল’। আর বাইরের অবস্থা ভেতরের তুলনায় উত্তম হলে তার নাম হয় ‘জুর’ তথা অন্যায়।
আতিয়্যা ইবনে আবদুল গাফের বলেন : ঈমানদারের ভেতরের অবস্থা বাইরের অবস্থার চেয়ে ভাল হলে আল্লাহ তা'আলা তাকে নিয়ে ফেরেশতাদের সামনে গর্ব করে বলেন : সে হচ্ছে আমার সত্যিকার বান্দা। অতএব বুঝা গেল, ভেতর ও বাইর সমান হওয়া এক প্রকার সিদক।
(৬) ধর্মীয় মকামসমূহে নিষ্ঠা -
ধর্মীয় মকামসমূহে সত্যবাদিতা হচ্ছে খওফ, রেযা, যুহদ, তাওয়াক্কুল,মহব্বত ইত্যাদি তরীকতের বিষয়সমূহে যথার্থ হওয়া। কেননা, এসব বিষয়ের এক অংশ হচ্ছে সূচনা; এরপর আসে এগুলোর চূড়ান্ত সীমা তথা হাকীকত (স্বরূপ)। যে ব্যক্তি এগুলোর হাকীকত পর্যন্ত পৌঁছে যায়, সে-ই যথার্থ মুহাক্কিক। কোন গুণ কারো মধ্যে পূর্ণাঙ্গ হয়ে গেলে সে ব্যক্তিকে সে গুণে যথার্থ বলা হয়। যেমন, আমরা বলি অমুক ব্যক্তি যথার্থ বীর, অমুক ব্যক্তি যথার্থ খোদাভীরু। 
আল্লাহ তা'আলা এরশাদ করেন, “ঈমানদার তারাই, যারা আল্লাহ ও রসূলে বিশ্বাস স্থাপন করে, অতঃপর সন্দিহান হয় না এবং নিজের ধন ও প্রাণের বিনিময়ে আল্লাহর পথে জেহাদ করে। তারাই যথার্থ নিষ্ঠাবান ও সত্যবাদী।”
 “কিন্তু সৎকর্ম হল আল্লাহর প্রতি, কিয়ামত দিবসের প্রতি, ফেরেশতাদের প্রতি, কিতাব সমূহের প্রতি, নবী-রসূলগণের প্রতি ঈমান আনা, তাঁরই মহব্বতে আত্মীয়-স্বজন, এতীম-মিসকীন, মুসাফির এবং ভিক্ষুকদের এবং ক্রীতদাসের জন্যে সম্পদ ব্যয় করা। বস্তুত যারা নামায প্রতিষ্ঠা করে, যাকাত দান করে, যারা প্রতিজ্ঞা পূর্ণ করে, বিপদাপদ ও যুদ্ধের সময় ধৈর্যধারণ করে, তারাই হল সত্যবাদী”।
এক্ষণে আমরা খওফ তথা ভয়ের ক্ষেত্রে যথার্থতার একটি দৃষ্টান্ত উল্লেখ করছি। যে বান্দা আল্লাহ তা'আলা ও কিয়ামত দিবসে বিশ্বাস রাখে, সে আল্লাহকে অবশ্যই ভয় করে। কিন্তু এ ভয় এমন যে, একে কেবল শাব্দিক দিক দিয়েই ভয় বলা যায়। সত্যিকার ভয়ের যে স্তর তা সেই পর্যন্ত পৌঁছল না। 
দেখ, মানুষ যখন কোন বাদশাহকে ভয় করে অথবা পথিমধ্যে ডাকাতকে ভয় করে, তখন তার শরীরের রঙ ফ্যাকাসে হয়ে যায়, হাত-পা কাঁপতে থাকে, জীবন তিক্ত হয়ে যায় এবং আহার-নিদ্রা কঠিন হয়ে যায়। কিন্তু জাহান্নামের আগুনকে ভয় করার পর মানুষ যখন কোন গোনাহের কাজে লিপ্ত হয়, তখন এসব কিছুই হয় না। তার দেহের রঙ স্বাভাবিকই থাকে এবং হাত-পা কাঁপে না। এর কারণ কি? রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করেন
“দোযখ থেকে পলায়নকারী যেভাবে ঘুমায়, তেমন ঘুমাতে আমি কাউকে দেখি না এবং জান্নাত অন্বেষণকারীর মতও আমি কাউকে ঘুমুতে দেখি না”।
সুতরাং খওফের স্বরূপ পর্যন্ত পৌঁছা খুবই কঠিন। এসব মকামের স্বরূপ ও সিদকের কোন সীমা নেই। প্রত্যেকেই নিজের অবস্থা অনুযায়ী এগুলোর অংশ প্রাপ্ত হয়। যে বেশী অংশ পায়, তাকেই সত্যিকার বান্দা বলা হয়। 
বর্ণিত আছে, রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) হযরত জিবরাঈলকে বললেন আমি আপনাকে আসল আকৃতিতে দেখতে চাই। জিবরাঈল বললেন : আপনি আমাকে আসল আকৃতিতে দেখলে ঠিক থাকতে পারবেন না। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বললেন : না, আমি দেখতেই চাই। জিবরাঈল ওয়াদা করলেন : আচ্ছা, জোছনা রাতে ‘বাকী' নামক স্থানে দেখিয়ে দেব।
রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) চাঁদনী রাতে সেখানে পৌঁছলে জিবরাঈলকে দেখলেন আকাশের সমগ্র দিগন্ত আচ্ছাদিত করে বিরাজমান। দেখার সাথে সাথেই তিনি সংজ্ঞা হারিয়ে ফেললেন। সংজ্ঞা ফিরে আসার পর যখন তিনি চোখ খুললেন, তখন জিবরাঈলকে পূর্বের আকৃতিতে দেখে বললেন : আমার মনে হয় আল্লাহ তা'আলার সৃষ্টির মাঝে এ ধরনের কেউ নেই। জিবরাঈল আরয করলেন : আপনি ইসরাফীলকে দেখলে ভালই হত। আরশে মোয়াল্লা তার কাঁধে এবং পা পৃথিবীর সর্বনিম্নে নামানো। এতদসত্ত্বেও আল্লাহর মাহাত্ম্যের সামনে যখন তিনি সংকুচিত হন, তখন ক্ষুদ্র পাখীর মত হয়ে যান। এখানে দেখা উচিত যে, হযরত ইসরাফীল খণ্ডফের কত বিরাট অংশ প্রাপ্ত হয়েছেন। সকল ফেরেশতা এরূপ নন। কেননা, তারা খণ্ডফের ক্ষেত্রে সমান নন। 
হযরত জাবের (রাঃ)-এর রেওয়ায়েতে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করেন- আমি মে'রাজ রজনীতে ঊর্ধ্বাকাশে হযরত জিবরাঈলকে আল্লাহ তা'আলার ভয়ে উটের পিঠে পুরানো চাদরের মত পড়ে থাকতে দেখেছি। এমনিভাবে সাহাবায়ে কেরামের মধ্যেও খওফ ছিল। কিন্তু তাদের খওফ রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর খওফের সমান ছিল না।
উপরোক্ত বর্ণনা থেকে জানা গেল, খওফ, মহব্বত ইত্যাদি স্তরগুলোতে যারা সাদেক তথা নিষ্ঠাবান, তাদের সংখ্যা খুবই কম। মাঝে মাঝে বান্দা কোন কোন স্তরে সাদেক আর কোন কোন স্তরে সাদেক নয়। যে সব মকামে সাদেক, তাতে যথার্থই সিদ্দীক। আবু বকর ওররাফ বলেন: সিদক তিন প্রকার— তাওহীদে সিদক, এবাদতে সিদক এবং মারেফতে সিদক। তাওহীদে সিদক সাধারণ মুমিনদেরও অর্জিত হয়। যেমন, আল্লাহ বলেন - “যারা আল্লাহ ও রসূলগণের প্রতি ঈমান আনে, তারা সাদেক” 
এবাদতে সিদক আলেম ও পরহেযগারদের অর্জিত হয়। আর মারেফতে সিদক ওলীগণ অর্জন করেন। (সমাপ্ত)

প্রথম পর্ব

সিদক (পর্ব- ১) সিদকের ফযীলত



সিদক (পর্ব- ১)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দীন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

সিদকের ফযীলত: 
আল্লাহ তা'আলা এরশাদ করেন :
>“তারা এমন মানুষ, যারা আল্লাহর সাথে কৃত চুক্তিকে সত্যে পরিণত করেছে”।
সিদকের শ্রেষ্ঠত্বের জন্যে এতটুকুই যথেষ্ট যে, ‘সিদ্দীক’ শব্দটি এ থেকেই উদগত ! আল্লাহ তা'আলা পয়গম্বরগণের প্রশংসায় তাদেরকে সিদ্দীক বলেছেন। বলা হয়েছে-
> “কিতাবে ইবরাহীমের আলোচনা করুন। সে ছিল সিদ্দীক তথা সাচ্চা নবী। 
> “কিতাবে ইদ্রীসের আলোচনা করুন। সে ছিল সিদ্দীক ও নবী”।
রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি  ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেন,- 
>“সত্যবাদিতা পূণ্যের পথ দেখায় আর পুণ্য জান্নাতে নিয়ে যায়। মানুষ সত্য বলতে থাকে। অবশেষে সে আল্লাহর কাছে সিদ্দীক হিসাবে লিখিত হয় মিথ্যা পাপাচারের পথ দেখায়। পাপাচার জাহান্নামে নিয়ে যায়। মানুষ মিথ্যা বলতে থাকে। অবশেষে সে আল্লাহর কাছে মিথ্যাবাদী হিসাবে লিখিত হয়”।

হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন : চারটি বিষয় এমন রয়েছে, যেগুলোর উপকার সে-ই পায়, যার মাঝে এগুলো থাকে- সত্যবাদিতা, লজ্জা, সচ্চরিত্রতা ও শোকর। 
বিশর ইবনে হারেছ (রহঃ) বলেন : “যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে নিষ্ঠা সহকারে আচরণ করে, সে মানুষকে ঘৃণা করে”। 
এক ব্যক্তি জনৈক দার্শনিককে বলল : আমি কোন সাচ্চা মানুষ দেখিনি। দার্শনিক বলল : যদি তুমি সাচ্চা হতে, তবে সাচ্চাদেরকে চিনতে। 
জনৈক ব্যক্তি হযরত শিবলী (রঃ)-এর মজলিসে চিৎকার দিয়ে উঠল। অতঃপর সে দজলা নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ল। হযরত শিবলী (রঃ) বললেন : যদি সে সাচ্চা হয়, তবে আল্লাহ তা'আলা তাকে বাঁচিয়ে দেবেন, যেমন হযরত মূসা (আঃ)-কে বাঁচিয়েছিলেন। আর যদি সে মিথ্যুক হয়, তবে তাকে নিমজ্জিত করে দেবেন, যেমন ফেরাউনকে নিমজ্জিত করেছিলেন।
আলেম ও ফেকাহবিদগণ এ বিষয়ে একমত যে, তিনটি বিষয় সঠিক হয়ে গেলে মানুষ মুক্তি পেয়ে যাবে- 
(১) বেদআত ও খেয়ালখুশীমুক্ত ইসলাম, 
(২) আমলসমূহে আল্লাহ তা'আলার নিষ্ঠা এবং 
(৩) হালাল খাদ্য । 
ওয়াহাব ইবনে মুনাব্বেহ (রহঃ) বলেন : আমি তাওরাতের প্রান্তটীকায় বাইশটি বাক্য দেখেছি যা বনী ইসরাঈলের সাধু বক্তিরা সমবেত হয়ে পাঠ করত। বাক্যগুলো এই : 
(১) কোন ভাণ্ডার জ্ঞানের চেয়ে অধিক উপকারী নয়। 
(২) কোন ধন সহনশীলতা অপেক্ষা অধিক ফলদায়ক নয়। 
(৩) কোন স্বভাব ক্রোধের চেয়ে অধিক নীচ নয়। 
(৪) কোন সঙ্গী আমলের চেয়ে বেশী শোভাদায়ক নয়। 
(৫) কোন সহচর মূর্খতার চেয়ে অধিক দোষী নয়। 
(৬) কোন গৌরব খোদাভীতি অপেক্ষা অধিক প্রিয় নয়। 
(৭) কোন বীরত্ব বাসনা বর্জনের চেয়ে বেশী পূর্ণাঙ্গ নয়। 
(৮) কোন আমল চিন্তা-ভাবনা অপেক্ষা অধিক শ্রেষ্ঠ নয়। 
(৯) কোন পুণ্য কাজ সবর অপেক্ষা উচ্চ নয়। 
(১০) কোন দোষ অহংকার অপেক্ষা অধিক অপমানকর নয়। 
(১১) কোন ঔষধ নম্রতার চেয়ে অধিক নরম নয়। 
(১২) কোন ব্যাধি বোকামি অপেক্ষা অধিক কষ্টদায়ক নয়। 
(১৩) কোন রসূল সত্য বিমুখ নয়। 
(১৪) সত্যবাদিতার চেয়ে অধিক কোন হিতাকাংখী নেই। 
(১৫) কোন ফকীর-লোভের চেয়ে অধিক লাঞ্ছিত নয়। 
(১৬) কোন প্রাচুর্য সম্পদ আগলে রাখার চেয়ে অধিক হতভাগা নয়। 
(১৭) কোন জীবন সুস্থতার চেয়ে উৎকৃষ্টতর নয়। 
(১৮) সাধুতার চেয়ে অধিক সহনীয় কোন পাপ নেই। 
(১৯) খুশুর চেয়ে উত্তম কোন এবাদত নেই। 
(২০) অল্পে তুষ্টির চেয়ে ভাল কোন বৈরাগ্য নেই। 
(২১) চুপ থাকার চেয়ে অধিক কোন হেফাযতকারী নেই। 
(২২) কোন অদৃশ্য বস্তু মৃত্যুর চেয়ে অধিক নিকটবর্তী নয়।
মুহাম্মাদ ইবনে সাঈদ মরুযী (রঃ) বলেন: যখন তুমি আল্লাহ তা'আলাকে নিষ্ঠার সাথে অন্বেষণ করবে, তখন তিনি তোমার হাতে একটি আয়না দিবেন, যার মধ্যে তুমি দুনিয়া ও আখেরাতের অত্যাশ্চর্য বিষয়সমূহ দেখতে পাবে।

পরবর্তী পর্ব-
সিদকের স্বরূপ 

শনিবার, ২৭ এপ্রিল, ২০২৪

বিভ্রান্তি (পর্ব- ১৩) বিভ্রান্তি থেকে আত্মরক্ষার উপায়



বিভ্রান্তি (পর্ব- ১৩)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

বিভ্রান্তি থেকে আত্মরক্ষার উপায়—

বিভ্রান্তি থেকে আত্মরক্ষার জন্যে তিনটি বিষয় মানুষের মধ্যে থাকা বাঞ্ছনীয়– বুদ্ধি, শিক্ষা ও মারেফত। 


বিভ্রান্তি থেকে আত্মরক্ষার প্রথম উপায়– 

বুদ্ধি এমন একটি জন্মগতভাবে প্রাপ্ত মৌলিক নূর বা আলো। যা দ্বারা মানুষ বস্তুনিচয়ের স্বরূপ উদঘাটন করতে সক্ষম। মানুষের মূল সৃষ্টিতে বুদ্ধিমত্তাও থাকে এবং নির্বুদ্ধিতাও থাকে। বুদ্ধিহীন ব্যক্তি বিভ্রান্তির মধ্যে পার্থক্য করতে পারে না। তাই মূল সৃষ্টিতেই তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা থাকা জরুরী। জন্মগতভাবে এরূপ না হলে তা অর্জন করা সম্ভব নয়। তবে মূল বুদ্ধিমত্তা বিদ্যমান থাকলে অভিজ্ঞতা ইত্যাদি দ্বারা তাকে শানিত করা যায়। এ থেকে জানা গেল যে, বুদ্ধিমত্তা হচ্ছে সৌভাগ্যের চাবিকাঠি। তাই হাদীসে বলা হয়েছে,

"মহিমান্বিত সেই আল্লাহ, যিনি তাঁর বান্দাদের মধ্যে ভিন্ন ভিন্নরূপে বুদ্ধিমত্তা বণ্টন করেছেন। নিশ্চয় দু'ব্যক্তির আমল তথা নামায, রোযা ইত্যাদি সমান সমান হয়। কিন্তু তাদের বুদ্ধিমত্তার একটি কণাতেও উহুদ পাহাড়সম ব্যবধান থাকে। আল্লাহ তাআলা তাঁর সৃষ্টিকে বুদ্ধিমত্তার চেয়ে উত্তম বস্তু দান করেননি।

হযরত আবু দারদা (র.) বর্ণনা করেন। এক ব্যক্তি রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-কে জিজ্ঞেস করল- যদি কেউ দিনে রোযা রাখে, রাতে তাহাজ্জুদ পড়ে, হজ্জ ও উমরা পালন করে এবং দান-খয়রাত, জেহাদ ইত্যাদি পুণ্য কাজ যথারীতি সম্পাদন করে, তবে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলার কাছে তার কি মর্তবা হবে? তিনি জওয়াব দিলেন সে বুদ্ধিমত্তার মাপ অনুযায়ী সওয়াব পাবে।

হযরত আনাস (রা.) বলেনঃ রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর সামনে এক ব্যক্তির প্রশংসা করা হলে তিনি শুধালেন? তার বুদ্ধিমত্তা কেমন? লোকেরা বলল : আমরা এবাদত, চরিত্র ও গুণ-গরিমার কথা বলছি। তিনি বললেন : আগে বল তার বুদ্ধিমত্তা কেমন? কেননা, নির্বোধ ব্যক্তি নির্বুদ্ধিতার কারণে ব্যভিচারের চেয়েও জঘন্য ভুল করে বসে। কিয়ামতের দিন মানুষ বুদ্ধি পরিমাণেই আল্লাহর নৈকট্য লাভ করবে।

বিষয় মারেফতের অর্থ হচ্ছে চারটি বিষয়ে জ্ঞান লাভ করা।

প্রথমত, নিজের সম্পর্কে জানতে হবে যে, সে এই পৃথিবীতে একজন অচেনা মুসাফির এবং আল্লাহর মারেফত ও দীদারই তার জন্যে উপযুক্ত।

দ্বিতীয়ত, আল্লাহ সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান অর্জন করতে হবে।

তৃতীয়ত, দুনিয়া সম্পর্কে জানতে হবে।

চতুর্থত, আখেরাত সম্পর্কে পুরোপুরি জ্ঞানলাভ করতে হবে।

আল্লাহ সম্পর্কে জ্ঞানলাভের কারণে বান্দার অন্তরে তাঁর প্রতি মহব্বত সৃষ্টি হবে। আখেরাতের জ্ঞান অর্জিত হলে তৎপ্রতি আগ্রহ ও ঔৎসুক্য বৃদ্ধি পাবে। দুনিয়া সম্পর্কে জ্ঞাত হলে দুনিয়ার প্রতি ঘৃণা ও বিমুখতা হাসিল হবে এবং তার কাছে সর্বাধিক জরুরী কাজ তাই হবে, যা আখেরাতে উপকারী। যখন আখেরাতের কাজ করার ইচ্ছা প্রবল হবে, তখন সকল বিষয়ে তার নিয়ত সঠিক হবে। ফলে, বিভ্রান্তি দূর হয়ে যাবে। আল্লাহর মারেফত ও নিজের সম্পর্কে জ্ঞান লাভের ফলস্বরূপ যখন খোদায়ী মহব্বত প্রবল হবে, তখন তৃতীয় বিষয়ের জ্ঞান লাভ করার প্রয়োজন হবে ; অর্থাৎ আল্লাহর পথ কিভাবে অতিক্রম করা উচিত, কোন্ কোন্ কাজ আল্লাহর নিকটবর্তী করে, কোন্ কোন্ কাজ আল্লাহ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। এছাড়া পথের বিপদাপদ ও বিনাশকারী বাধাসমূহ জানা। আলোচ্য গ্রন্থে আমরা এসব বিষয় নিয়েই বিস্তারিত আলোচনা করছি। যেমন প্রথম খণ্ডে এবাদতের শর্ত ও বাধাবিপত্তি লিপিবদ্ধ করেছি। এসব শর্তের প্রতি লক্ষ্য রাখতে হবে এবং বাধাবিপত্তিগুলো অতিক্রম করতে হবে। দ্বিতীয় খণ্ডে পারস্পরিক আদান-প্রদানের রহস্য এবং যেসব আদান-প্রদান অপরিহার্য, সেগুলো বর্ণিত হয়েছে। এক্ষেত্রে শরীয়তের নিয়ম-কানুন অনুযায়ী আমল করতে হবে। আলোচ্য খণ্ডে আল্লাহর পথের প্রতিবন্ধক বিষয়সমূহ বিধৃত হয়েছে অর্থাৎ, নিন্দনীয় স্বভাব-চরিত্র বর্ণনা করা হয়েছে। সুতরাং নিন্দনীয় স্বভাবগুলো জানতে হবে এবং প্রতিকারের পন্থাও আয়ত্ত করতে হবে। এসব বিষয় জেনে নিলে বর্ণিত সকল প্রকার বিভ্রান্তি থেকে আত্মরক্ষা করা সম্ভবপর হবে।


প্রথম পর্ব

বিভ্রান্তি সকল দুর্ভাগ্যের মূল

বিভ্রান্তি (পর্ব- ১২) বিভ্রান্তি থেকে কেউ মুক্ত নয়



বিভ্রান্তি (পর্ব- ১২)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

বিভ্রান্তি থেকে কেউ মুক্ত নয়

এখন প্রশ্ন হয় যে, উপরে যে সকল বিভ্রান্তি বর্ণিত হয়েছে, সেগুলো থেকে কেউই মুক্ত নয় এবং এ সকল বিভ্রান্তি থেকে আত্মরক্ষা করাও অসম্ভব। সুতরাং বিভ্রান্তির এ বর্ণনা থেকে মানুষের মধ্যে এক প্রকার নৈরাশ্য সৃষ্টি হয়, যার ফলস্বরূপ সে আমল করতে উৎসাহ পায় না এবং হাত গুটিয়ে বসে থাকে। এর জওয়াব এই যে, মানুষ যখন সাহস হারিয়ে ফেলে, তখন সে নিরাশও হয় এবং সম্ভবপর কাজকেও অসম্ভব মনে করতে থাকে। কিন্তু যখন সে সত্যিকার সাহস ও ঐকান্তিক ইচ্ছা নিয়ে কাজে অগ্রসর হয়, তখন অভীষ্ট পর্যন্ত পৌঁছার জন্য স্বীয় সূক্ষ্ম চিন্তার মাধ্যমে গোপন পথ আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়। উদাহরণতঃ উড়ন্ত পাখীকে ইচ্ছা করলে দূরত্ব সত্ত্বেও নিচে নামিয়ে আনা যায় অথবা সমুদ্রের অতল গভীরে অবস্থানকারী মৎস্যকে উপরে তুলে আনতে চাইলে আনা যায় অথবা পাহাড় ও পর্বতের ভিতর থেকে সোনা ও রূপা আহরণ করতে চাইলে খনন করে আহরণ করা যায় অথবা বনের স্বাধীন ও মুক্ত হাতীকে ধরে পোষ মানাতে চাইলে মানানো যায়, বিষধর সাপ ও অজগরকে ধরে খেলা দেখাতে চাইলে দেখানো যায়, যদি কেউ গ্রহ-উপগ্রহের সংখ্যা ও দৈর্ঘ্য-প্রস্থ জানতে চায়, তবে জ্যামিতি শাস্ত্রের মাধ্যমে পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে দাড়িয়ে তা জানতে পারে। মোটকথা, মানুষ দুঃসাধ্য কর্মসমূহের উপায় বের করার ব্যাপারে ওস্তাদ। সে প্রত্যেক কাজের পদ্ধতি ও তার সাজসরঞ্জাম সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করতে পারে। এসব উপায় ও পদ্ধতি মানুষ কেবল পার্থিব জীবনের উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্যে আবিষ্কার করে। সুতরাং সে যদি পারলৌকিক জীবনের উদ্দেশ্য সিদ্ধ করতে চায় এবং তার সামনে একটি মাত্র কাজ থাকে অর্থাৎ অন্তরকে সোজা করা, তবে এ কাজে সে অক্ষম হবে কেন এবং এটা অসম্ভব হবে কেন? না, মানুষের সাহস ও হিম্মতের সামনে কোন কিছুই অসম্ভব নয়। পূর্ববর্তী মনীষীগণ তো এ কাজে অক্ষম হননি। যারা তাদের উত্তমরূপে অনুসরণ করেছে, তারাও এ কাজে হার মানেনি। এখনও যে ব্যক্তি সত্যিকার ইচ্ছা ও অটল সাহসের অধিকারী হবে, সে কখনও অপারগ হবে না; বরং পার্থিব উপায়সমূহ আবিষ্কার করার কাজে যে পরিমাণ অধ্যবসায় ও শ্রম স্বীকার করতে হয়, তার এক-দশমাংশও এতে স্বীকার করার প্রয়োজন হয় না।


পরবর্তী পর্ব

বিভ্রান্তি থেকে আত্মরক্ষার উপায়

বিভ্রান্তি (পর্ব- ১১) বিত্তশালীদের বিভ্রান্তি



বিভ্রান্তি (পর্ব- ১১)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

বিত্তশালীদের বিভ্রান্তি-

একদল বিত্তশালী লোক মসজিদ, মাদ্রাসা, সরাইখানা, পুল ইত্যাদি দর্শনীয় কীর্তি নির্মাণে তৎপর থাকে। তারা এগুলোর মধ্যে নিজেদের নাম খোদাই করে লিখে দেয়, যাতে মৃত্যুর পরও তাদের স্মৃতি অম্লান থাকে। এ কাজ করার পর তারা মনে করে এর মাধ্যমে তারা মাগফেরাতের উপযুক্ত হয়ে গেছে। অথচ দু’কারণে তারা বিভ্রান্ত।

এক, তারা যুলুম, ঘুষ, সূদ ইত্যাদি অবৈধ উপায়ে অর্জিত টাকা-পয়সা দ্বারা এসব তৈরি করে। সুতরাং হারাম ভক্ষণের কারণে তারা শাস্তির যোগ্য।

দুই, তারা রিয়া ও সুখ্যাতির জন্যে অর্থ ব্যয় করে। তাদের উচিত ছিল এই অর্থ উপার্জন না করা। উপার্জন করে যখন তারা গোনাহগার হল, তখন তওবা করে আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়া এবং যে অর্থ প্রকৃত মালিককে ফিরিয়ে দেয়া দরকার ছিল, মালিক পাওয়া না গেলে তার ওয়ারিসকে, ওয়ারিস না থাকলে মুসলমানদের জরুরী প্রয়োজনে ব্যয় করা দরকার ছিল। এ ব্যাপারে মিসকীনদের মধ্যে বন্টন করাই অধিক জরুরী মনে হয়। কিন্তু তারা মিসকীনদের মধ্যে বণ্টন করে না; বরং সুখ্যাতি কুড়ানোর জন্যে দালান-কোঠা নির্মাণে তৎপর হয়ে যায়। সুতরাং জনকল্যাণ তাদের উদ্দেশ্য নয়; বরং রিয়া, সুখ্যাতি এবং প্রশংসা কুড়ানোই তাদের লক্ষ্য হয়ে থাকে। তাদেরকে যদি বলা হয় যে, দালান-কোঠা তৈরি কর, কিন্তু তাতে নিজের নাম খোদাই করো না, তবে কখনও তা মেনে নেবে না এবং দালান-কোঠা নির্মাণে সম্মত হবে না। যদি মানুষকে দেখানো উদ্দেশ্য না হত এবং আল্লাহর ওয়াস্তেই হত, তবে নাম খোদাই করার কি প্রয়োজন ছিল?


আরেক দল ধনী লোক হালাল উপায়ে অর্থ উপার্জন করে মসজিদে ব্যয় করে দেয়। অথচ তার আশেপাশে কিংবা শহরে এমন দরিদ্র ও অভাবগ্রস্ত লোক বাস করে, যাদেরকে দেয়া মসজিদে দেয়ার চেয়ে শরীয়তের দৃষ্টিতে অনেক ভাল। কিন্তু তারা মসজিদেই দেয়। কারণ, এতে মানুষের মধ্যে সুখ্যাতি হয়। এধরনের বিত্তশালী দাতা নিঃসন্দেহে বিভ্রান্ত। এছাড়া মসজিদে চিত্রাংকন ও কারুকার্য করা নিষিদ্ধ। নামাযীদের ধ্যান সেদিকে বিভক্ত হয়। দৃষ্টি সেদিকেই পড়ে। অথচ নামাযের উদ্দেশ্য অনুনয়-বিনয় ও অন্তরের উপস্থিতি। অন্তর কারুকার্যে মশগুল থাকলে সওয়াব বাতিল হয়ে যাবে এবং এর শাস্তি যে কারুকার্য করে, তার উপর বর্তাবে। অথচ সে ধারণা করে থাকে যে, সৎকাজ করেছে, যা ওসীলা হবে আল্লাহর সন্তুষ্টির। কিন্তু বাস্তবে সে আল্লাহর ক্রোধের যোগ্য হবে।

একবার হযরত ঈসা (আঃ)-এর শিষ্যগণ তাঁর খেদমতে আরয করল : দেখুন, এই মসজিদটি কি চমৎকার ! তিনি বললেন : হে আমার উম্মত, আমি সত্য বলছি, আল্লাহ তা'আলা এই মসজিদের ইটের উপর ইট কায়েম রাখবেন না। এই মসজিদ নির্মাণকারীদের গোনাহের কারণে সকলকে বরবাদ করে দেবেন। আল্লাহর কাছে না সোনা-রূপার মূল্য আছে, না এসব ইটের, যেগুলোকে তোমরা চমৎকার বলছ। বরং তার কাছে সর্বাধিক প্রিয় হচ্ছে সৎ অন্তর, যা দিয়ে তিনি পৃথিবীকে আবাদ রাখেন। যখন সৎ অন্তর থাকবে না, তখন পৃথিবীকে শ্মশানে পরিণত করে দেবেন।

হযরত আবু দারদার (রাঃ) রেওয়ায়েতে রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ যখন তোমরা মসজিদকে চাকচিক্যময় করবে এবং কোরআনকে সোনা-রূপা পরিধান করাবে, তখন তোমাদের উপর বিপর্যয় নেমে আসবে। হযরত হাসান (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) যখন মদীনায় মসজিদে নববী নির্মাণ করার ইচ্ছা করেন, তখন হযরত জিবরাঈল (আ্ঃ) এসে বললেন : সাত হাত উঁচু করবেন এবং কারুকার্য ও চিত্রাংকন করবেন না। মোটকথা , এই ধনীরা একটি মন্দ কাজকে ভাল মনে করে এবং তারই উপর ভরসা করে। এটা তাদের বিভ্রান্তি।


আরেক দল ধনী টাকা-পয়সা ব্যয় করে এবং ফকীর-মিসকীনকে দান করে। কিন্তু এই দানের জন্যে এমন জায়গা তালাশ করে, যেখানে অধিক পরিমাণে লোক উপস্থিত থাকে। এছাড়া এমন ফকীর খোজে, যে কৃতজ্ঞ হয় এবং জনসমক্ষে দাতার স্তুতি কীর্তন করে। তারা গোপনে দান করাকে ভাল মনে করে না। কোন ফকীর তাদের কাছ থেকে কিছু নিয়ে গোপন করলে তাকে তারা অপরাধী ও অকৃতজ্ঞ মনে করে। তারা কখনও হজ্জের পর হজ্জ করে; কিন্তু দরিদ্র প্রতিবেশীকে ক্ষুধার্ত রাখে। একারণেই হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন : শেষ যুগে এমন লোক হবে, যারা বিনা কারণেও হজ্জ করবে। ধনী হওয়ার কারণে তারা সফরকে কষ্টকর মনে করবে না। তারা বঞ্চিত অবস্থায় গৃহে ফিরবে। অর্থাৎ, সওয়াব কিছুই পাবে না। নিজেরা তো আরামদায়ক যানবাহনে বসে সফর করবে, প্রতিবেশীর খবরও নেবে না।

আবূ নছর (রহঃ) বলেন : জনৈক ব্যক্তি হযরত বিশর ইবনে হারেছের কাছে বসে বললঃ আমি হজ্জ করার ইচ্ছা করে আপনার কাছ থেকে বিদায় নিতে এসেছি। তিনি জিজ্ঞেস করলেন : হজ্জের জন্যে তোমার কাছে কি পরিমাণ অর্থ আছে? সে জওয়াব দিল : দু'হাজার দেরহাম। বিশর জিজ্ঞেস করলেন। হজ্জের দ্বারা তোমার উদ্দেশ্য কি দেশভ্রমণ, কাবাগৃহের আগ্রহ, না আল্লাহর সন্তুষ্টি? লোকটি আরয করল ; আল্লাহর সন্তুষ্টি। তিনি বললেন : যদি গৃহে বসে এ দু’হাজার দেরহাম ব্যয় করে তুমি আল্লাহর সন্তুষ্টি পেয়ে যাও এবং সন্তুষ্টিপ্রাপ্তির ব্যাপারে তোমার দৃঢ় বিশ্বাসও অর্জিত হয়ে যায়, তবে তুমি কি করবে? লোকটি বলল : তবে এভাবেই সন্তুষ্টি অর্জন করব। তিনি বললেন ; তাহলে যাও, এই দেরহামগুলো দশ প্রকার ব্যক্তিকে দিয়ে দাও- ঋণগ্রস্তকে দাও, যে তার ঋণ পরিশোধ করবে, অভাবগ্রস্তকে দাও, যে তার অভাব মোচন করবে, বাল-বাচ্চাদারকে দাও, তার বাল-বাচ্চাদেরকে পালন করবে, অনাথ শিশুদের দেখাশোনাকারীকে দাও, যে তাদেরকে খুশী করবে। যদি মনে চায়, তবে এসব প্রকারের এক এক ব্যক্তিকে দাও। আমার এরূপ বলার কারণ এই যে, কোন মুসলমানের মন খুশী করা, মযলুমের ডাকে সাড়া দেয়া এবং দুর্বলের সাহায্য করা ফরয হজ্জের পর এক'শ হজ্জের চেয়েও উত্তম। কাজেই এখন যাও এবং আমি যা বললাম- তাই কর। নতুবা মনের কথা বলে দাও। লোকটি বলল : আমার মন তো ভ্রমণ করতেই ইচ্ছুক। অগত্যা হযরত বিশর মুচকি হেসে বললেনঃ যখন টাকা-পয়সা ব্যবসা-বাণিজ্য ও সন্দেহযুক্ত পথে সঞ্চিত হয়ে যায়, তখন মন চায় কোন সৎকর্ম সম্পাদন করতে। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা কসম করেছেন যে, তিনি মুত্তাকীদের আমল ছাড়া কারও আমল কবুল করবেন না।


আরেক দল লোক কৃপণতাবশত অর্থকড়ি সঞ্চয় করে এবং সৎকর্ম ও এবাদত এমন করে, যাতে মোটেই অর্থ ব্যয় করতে হয় না। যেমন দিনের বেলায় রোযা রাখে এবং রাত্রিতে জাগরণ করে কিংবা কোরআন খতম করে, এরাও বিভ্রান্ত। কেননা, মারাত্মক কৃপণতা তাদের অন্তরকে ঘিরে রেখেছে। অর্থ ব্যয় করে প্রথমে এরই মূলোৎপাটন করা উচিত ছিল। এর পরিবর্তে যা তারা করে, তার কোন প্রয়োজন ছিল না। তাদের দৃষ্টান্ত এমন, যেমন কারও পরনের কাপড়ে সাপ ঢুকে গেছে। ফলে, সে মুত্যুর মুখোমুখি হয়ে পড়েছে। কিন্তু এ দিকে ভ্রুক্ষেপ না করে সে সর্দির ঔষধ। প্রস্তুত করার কাজে ব্যস্ত। বল, যাকে সাপে দংশন করবে, সর্দির ঔষধ দ্বারা তার কি উপকার হবে? এ কারণেই হযরত বিশরের কাছে কেউ বলেন : অমুক ধনী ব্যক্তি নামায, রোযা খুব করে। তিনি বললেন : তার অবস্থার সাথে যে কাজের মিল ছিল, তা তো সে ছেড়ে দিয়েছে এবং যে কাজ অন্যের জন্যে উপযুক্ত ছিল, তা অবলম্বন করেছে। তার কর্তব্য ছিল নিরন্নকে অন্ন দেয়া এবং ফকীর-মিসকীনকে খয়রাত দেয়া । নিজে ক্ষুধার্ত থাকার চেয়ে দান-খয়রাত তার জন্যে উত্তম ছিল।


আরেক দল ধনী এত বেশী কৃপণ যে, ধন-সম্পদের মধ্য থেকে যাকাত ছাড়া অন্য কিছু দান করে না। যাকাতেও এমন নিকৃষ্ট মাল দেয়, যা নিজের কাছে রাখতে ঘৃণা করে। তারা যাকাত দিতে গিয়ে এমন ফকীর বেছে নেয়, যে তাদের খেদমত করে অথবা ভবিষ্যতে যার কাছ থেকে খেদমত আশা করে কিংবা যে কোন বড় লোকের সুপারিশ নিয়ে আসে। তাকে দান করার উদ্দেশ্য থাকে সেই বড় লোকের প্রিয়ভাজন হওয়া। এসব বিষয় নিঃসন্দেহে খারাপ নিয়তের পরিচায়ক। যারা এরূপ করে, তারা বিভ্রান্ত। কারণ, এরূপ করেও তারা নিজেদেরকে আল্লাহর ফরমাবরদার বলে ধারণা করে; অথচ তারা বদকার, গোনাহগার। আল্লাহর এবাদত করে অপরের কাছে বিনিময় চায়।

এগুলো ছাড়া বিত্তশালীদের মধ্যে আরও অসংখ্য বিভ্রান্তি দেখা যায়। নমুনা স্বরূপ এখানে মাত্র কয়েকটি উল্লেখ করা হল।

আরও একদল লোক আছে, যারা কেবল বিত্তশালীদের মধ্যেই নয়; বরং জনসাধারণের এমনকি ফকীরদের মধ্যেও বিস্তৃত । তারা ওয়াযের মজলিসে উপস্থিত থাকাকেই মুক্তির জন্যে যথেষ্ট মনে করে। ওয়াযের মজলিসে যাওয়াকে তারা একটি প্রথা ও অভ্যাসে পরিণত করে নিয়েছে। তাদের বিশ্বাস, ওয়ায শুনলেই সওয়াব পাওয়া যাবে এবং তদনুযায়ী আমল করা জরুরী নয়। এটা তাদের খামখেয়ালী। কেননা, ওয়ায মাহফিলের মাহাত্ম এ কারণেই যে, এর মাধ্যমে সৎকর্মের আগ্রহ সৃষ্টি হয়। এই আগ্রহ এ কারণেই ভাল যে, এতে মানুষ আমল করতে উদ্বুদ্ধ হয়। যদি ওয়ায দ্বারা দুর্বল আগ্রহ সৃষ্টি হয়, যা আমলে উদ্বুদ্ধ করে না, তবে এরূপ ওয়াযের কোন উপকারিতা নেই। এ ধরনের শ্রোতা যখন ওয়ায়েযের মুখে ওয়ায মাহফিলের ফযীলত এবং কান্নাকাটি করার সওয়াব শুনে, তখন নারীদের ন্যায় কান্না শুরু করে দেয়। আবার কোন সময় কোন ভয়ংকর কথা শুনে হাতের উপর হাত মেরে হায় আল্লাহ ! মায়াযাল্লাহ ! সোবহানাল্লাহ ! ইত্যাদি বলা ছাড়া আর কিছুই করে না। তাদের ধারণা, তারা যা কিছু করে সবই ভাল। অথচ এটা প্রকাশ্য বিভ্রান্তি। তাদের দৃষ্টান্ত এমন, যেমন কোন রোগী ব্যক্তি ঔষধালয়ে যাতায়াত করে এবং সেখানে ঔষধের গুণাগুণ সম্পর্কে আলোচনা শোনে অথবা কোন ক্ষুধাতুর ব্যক্তি এমন মজলিসে যায় যেখানে সুস্বাদু খাদ্যের আলোচনা হয়। বলা বাহুল্য, এতে না রোগীর রোগ দূর হবে, না ক্ষুধাতুরের ক্ষুধা নিবৃত্ত হবে। এমনিভাবে ওয়ায মাহফিলে এবাদত ও সঙ্কর্মের বর্ণনা শুনলে এবং আমল না করলে আল্লাহর কাছে কোন উপকার পাওয়া যাবে না।


পরবর্তী পর্ব

বিভ্রান্তি থেকে কেউ মুক্ত নয়

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...