শনিবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৪

তওবা ও অনুতাপ



তওবা  অনুতাপ
📚মুকাশাফাতুল-কুলুব ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)

প্রত্যেক মুসলমান নর-নারীর উপর তওবা করা ওয়াজিব বা অপরিহার্য কর্তব্য। 
 প্রসঙ্গে আল্লাহ্ তা'আলা ইরশাদ করেছেনঃ "তোমরা আল্লাহর কাছে তওবা কর-আন্তরিকতওবা।' (তাহ্রীম)
উক্ত আয়াতে আদেশ-বাচক পদ ব্যবহৃত হয়েছে বিধায়  থেকে তওবার অপরিহার্যতাই প্রমাণিত হয়।
অন্য এক আয়াতে ইরশাদ হয়েছে: "তোমরা তাদের মত হয়ো নাযারা আল্লাহকে ভুলেগেছে।" (হাশর১৯)
অর্থাৎ,- যারা আল্লাহর সাথে ওয়াদা-অঙ্গীকার করেও তাভঙ্গ করেছেতোমরা তাদের মত হয়োনা। কেননা ওয়াদা ভঙ্গ করার ফলে তাদের অবস্থা হয়েছেঃ (কুরআনের ভাষায়) "ফলে আল্লাহ্ তাদেরকে আত্মবিস্মৃত করে দিয়েছেন।' (হাশর : ১৯)
অর্থাৎ, -নিজেদের সম্পর্কে তারা সম্পূর্ণ বিস্মৃত  উদাসীন হয়ে গেছে। ফলেতারা স্বীয় জীবনের জন্য কল্যাণকর  অকল্যাণকর বিষয়ের মধ্যে কোনই পার্থক্য করতে পারছে না এবং পারলৌকিক সাফল্যের জন্য কোন নেক আমল বা সৎকর্মে সক্রিয় হচ্ছে না। হুযুর আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেছেন : "যারা আল্লাহর দীদার তথা সাক্ষাতে অনুরাগীআল্লাহ্ তাদের সাক্ষাতে আগ্রহী। 
পক্ষান্তরেযারা আল্লাহ্ সাক্ষাতে অনাগ্রহীআল্লাহ্ও তাদের সাক্ষাতে অনাগ্রহী।'
'বস্তুতঃ এরাই হচ্ছেফাসেক।' (হাশর : ১৯)
অর্থাৎ,- এরাই আল্লাহর অবাধ্য  না-ফরমান বান্দাআল্লাহ্ সাথে ওয়াদা-অঙ্গীকার করেও তারা তাভঙ্গ করেছেআল্লাহর অনুগ্রহক্ষমা  সঠিক পথ-প্রাপ্তি হতে এরা বঞ্চিত।
বস্তুতঃ ফাসেক লোকদেরকে দুই ভাগে বিভক্ত করা যায়এক,- 'কাফের ফাসেক' দুই,-'ফাজের ফাসেকঅর্থাৎঅবাধ্য মু'মিন।
'কাফের ফাসেকবলতে ওই ব্যক্তিকে বুঝায়যে আল্লাহ্  তাঁর রাসুলের প্রতি ঈমান আনয়ন করেনাইবরং সম্পূর্ণরূপে হেদায়াত থেকে বঞ্চিত এবং গুমরাহী  পথভ্রষ্টতায় নিমজ্জিত। কুরআনুল করীমে ইরশাদ হয়েছে: "সে (শয়তানতার সৃষ্টিকর্তার নির্দেশকে অমান্য করেছে।" (কাফ্ফ : ৫০
অর্থাৎ, -পরওয়ারদিগারের প্রতি ঈমান আনয়ন করার হুকুমকে পরিহার করে কুফর অবলম্বন করেছে। 
আর 'ফাজের ফাসেকবলতে বুঝায়,- যে ব্যক্তি মদ্যপান করেরিযিকের ব্যাপারে হালাল-হারামের কোন তমিজ করে নাব্যভিচারে লিপ্ত হয়আল্লাহ্ না-ফরমানী ও অবাধ্যতায় মত্ত থাকেআল্লাহ্ ইবাদত-বন্দেগী পরিহার করে পাপাচারে নিমগ্ন থাকেকিন্তু সবকিছু করা সত্ত্বেও সে কুফর  শিরকে লিপ্ত হয় না।
উক্তরূপ দ্বিবিধ ফাসেকের মধ্যে পার্থক্য এই যেঈমান আনয়ন করে তওবা না করা পর্যন্ত হাজার অনুতাপ করলেও 'কাফের ফাসেক'-এর ক্ষমা  মার্জনার আশা করা যায় না। পক্ষান্তরেদ্বিতীয় প্রকার 'ফাজের ফাসেকমৃত্যুর পূর্বে স্বীয় কৃতকর্ম হতে তওবা ও অনুশোচনায় ভারাক্রান্ত হলেক্ষমার আশা করা যায়। বস্তুতঃ লোভ-লালসা ও কাম-প্রবণতায় আক্রান্ত ব্যক্তির তওবা সহজেই নসীব হতে পারেকিন্তু অহংকার ও আত্মগৌরবের ব্যাধিতে আক্রান্ত ব্যক্তির তওবা  হিদায়াত সহজে নসীব হয় না। অতএবতোমাকে সর্বদা সতর্ক থাকতে হবেযেন প্রতি মুহূর্তে আল্লাহর দরবারে তওবারত অবস্থায় থাকো, - তওবাহীন অবস্থায় মৃত্যু যেন তোমাকে গ্রাস করে না ফেলে। আল্লাহ্ তা'আলা ইরশাদ করেছেনঃ– "তিনি তাঁর বান্দাদের তওবা কবুল করেন এবং পাপসমূহ মার্জনাকরেন"। (শূরা : ২৫)
অর্থাৎ, -আল্লাহ্ তা'আলা এদের তওবা কবুল করে অতীতের সমস্ত গুনাহ্ ক্ষমা করে দেন।
হুযুর (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেন: "গুনাহ্ থেকে তওবাকারী নিষ্পাপ ব্যক্তির ন্যায় পবিত্র।"
কথিত আছেএক ব্যক্তি যখনই কোন পাপ করতোতখন তাএকটি খাতায় লিপিবদ্ধ করে রাখতো (যাতে দ্বিতীয়বার এই পাপে লিপ্ত না হয়) একদা সে কোন একটি পাপকর্মে লিপ্ত হওয়ার পর তালিপিবদ্ধ করার জন্য যখন খাতা খুললো তখন দেখতে পেলপূর্বের লিপিবদ্ধকরা সবকিছু সম্পূর্ণ মুছে গেছে এবং তদস্থলে নিম্নের এই আয়াতটি লেখা রয়েছে :
"আল্লাহ্ তাদের (তওবাকারীদেরগুনাহকে পুণ্য দ্বারা পরিবর্তিত করে দেন।" (ফুরক্বান৭০)
অর্থাৎসেই ব্যক্তির আন্তরিক তওবা  অনুতাপের বরকত  কল্যাণে শিরকের স্থলে ঈমানব্যভিচারের স্থলে ক্ষমাঅবাধ্যতা  না-ফরমানীর স্থলে আনুগত্য  গুনাহ্ থেকে হিফাযতের সওগাত এসে গেছে।
একদা আমীরুল-মু'মেনীন হযরত উমর (র.মদীনার একটি গলিপথ অতিক্রম করছিলেন।  সময় একজন যুবকের প্রতি তাঁর দৃষ্টি পড়ে। যুবকটি তার পরিহিত কাপড়ের নীচে একটি বোতল লুকিয়ে রেখেছিল। হযরত উমর জিজ্ঞাসা করলেন : 'ওহে যুবকতুমি কাপড়ের অভ্যন্তরে এটা কি লুকিয়ে রেখেছো?' আসলে সেই বোতলটিতে মদ রক্ষিত ছিল। তাইসে হযরত উমরের জিজ্ঞাসার জওয়াব দিতে লজ্জা  অপমান বোধ করছিল। তখন সে অন্তরে-অন্তরে আল্লাহর নিকট অনুশোচনায় ভারাক্রান্ত হয়ে দো' করলো- 'আয় আল্লাহ্আমাকে হয়রত উমরের সম্মুখে লজ্জিত  অপমানিত করো নাতাঁর কাছে আমার দোষ ও অপরাধকে গোপন করে রাখআমি তওবা করছি এবং ওয়াদা করছি যেজীবনে আর কখনও মদ্য পান করবো না।
তারপর এই যুবক হযরত উমরের জিজ্ঞাসার জওয়াবে বললো: 'হেআমীরুল-মু'মেনীনআমি সির্কার বোতল বহন করে নিয়ে যাচ্ছি।
অতঃপর হযরত উমর (র.বোতলটি দেখতে চাইলেন। আমীরুলমু'মেনীনের অভিপ্রায় অনুযায়ী যুবক যখন বোতলটি তাঁর সম্মুখে পেশ করলোতখন তিনি দেখতে পেলেন যেবোতলটিতে সত্যসত্যই সির্কা রয়েছে।
প্রিয় সাধকএখানে লক্ষ্য করার বিষয় হচ্ছেএকজন মাখলুক অপর একজন মাখলুকের সম্মুখে লজ্জা  অপমানের ভয়ে তওবা করেছেতথাপি আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর অনুতাপ কবুল করে মদ্যকে সির্কায় পরিণত করে দিয়েছেন। বস্তুতঃ  ক্ষেত্রে সে আন্তরিক ইখলাস ও ঐকান্তিক নিষ্ঠার সাথে সত্যিকারের তওবা করেছিলএরই ফলশ্রুতিতে সে কবুলিয়তের নে'আমতে ভূষিত হয়েছে। 
ঠিক এভাবেই যদি পাপাচার  অবাধ্যতার দরুণ বিধ্বস্ত কোন বান্দা নিষ্ঠা  ইখলাসের সাথে কায়মনোবাক্যে আল্লাহর দরবারে তওবা করে এবং স্বীয় অতীত কৃতকর্মের জন্য অনুতাপ অনুশোচনায় জর্জরিত হয়তা'হলে অবশ্যই তিনি তাকরুল করে নিবেন এবং পাপাচারের মদ্যকে নেকী  সৎকর্মের সির্কায় পরিবর্তন করে দিবেন। 
হযরত আবু হুরাইরাহ্ (র.বলেন: 'একদা হুযুর আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর সাথে জামাতে ইশা' নামায আদায় করার পর আমি বাহিরে বের হলামএমন সময় একজন মহিলা পথে দণ্ডায়মান হয়ে আমাকে জিজ্ঞাসা করলো :-'হে আবু হুরাইরাহ্আমি গুনাহ্ করেছিপাপে লিপ্ত হয়েছিআমার জন্য কি তওবা  পাপ মোচনের কোন উপায় আছে?' 
আমি তাকেজিজ্ঞাসা করলামতুমি যে পাপটি করেছো তাকি
সে বললো, 'আমি ব্যভিচারে লিপ্ত হয়েছিএবং আমার এই দুষ্কর্মের ফলে যে সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়েছেতাকেও হত্যা করে ফেলেছি।
অতঃপর আমি তাকে বললাম- 'তুমি নিজেও ধ্বংস হয়েছো এবং অপর একটি নিষ্পাপ সন্তানকেও ধ্বংস করেছোআল্লাহর কসমএহেন পাপকার্যের পর তোমার জন্য কোন তওবা নাই। 
একথা শুনে মহিলাটি অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে গেল। তাকে এভাবেই রেখে আমি সেখান থেকে চলে গেলাম। 
কিন্তু অন্তরে-অন্তরে চিন্তা করতে লাগলাম-মহিলার প্রশ্নের উত্তরতো আমি দিয়ে দিলামকিন্তু রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের মাঝে বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও বিষয়টি তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম না। 
অতঃপর আমি হুযূর আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর পবিত্র খেদমতে উপস্থিত হয়ে বিষয়টি খুলে বললাম। 
আমার বিবরণ শুনে হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ'হে আবু হুরাইরাহ্তুমি নিজেও ধ্বংস হলে এবং অপরকেও ধ্বংস করলে। তুমি কি কুরআনের আয়াতটি তিলাওয়াত কর নাই? "এবং যারা আল্লাহর সাথে অন্য উপাস্যের ইবাদত করেনা আল্লাহ্ তাদের পাপসমূহকে পুণ্যের দ্বারা পরিবর্তিত করে দেন।"
(ফুরকান৬৮,৬৯৭০)
অর্থাৎ,-শিরক  কুফর ত্যাগ করে পাপাচার হতে তওবা  অনুতাপ করলে আল্লাহ্ তা'আলা বান্দার কৃতগুনাহকে নেকীর দ্বারা পরিবর্তন করে দেন। এটা মহান আল্লাহ্ রাব্বুল-আলামীনের রহমত  অনুগ্রহ। 
হযরত আবু হুরাইরাহ্ বলেন – "অতঃপর আমি চরম হতাশ  উদ্বিগ্ন হয়ে সেই মহিলাকেএমনভাবে তালাশ করতে লাগলাম যেলোকেরা আমাকে উন্মাদ বলতে লাগলো। অবশেষে আমি তাকে খুঁজে বের করতে সমর্থ হয়েছি। তারপর হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহিওয়াসাল্লাম) কর্তৃক বিবৃত সঠিক মাসআলা সম্পর্কে আমি তাকে অবহিত করি। তাতে সে আনন্দের আতিশয্যে সজোরে হেসে উঠলো এবং একটি বাগান আল্লাহ্  আল্লাহর রাসুলের জন্য ওয়াকফ করে দিল।"
উত্তাহ নামক এক নওজওয়ান অনাচারব্যভিচার  মদ্যপানে অভ্যস্ত ছিল। এহেন পাপকার্যের জন্য সে সমাজে ঘৃণ্য  কুখ্যাত ছিল। একদা হযরত হাসান বসরী (রহঃ)-এর মজলিসে সে উপস্থিত হয়। তখন তিনি নিম্নের এই আয়াতটির তাফসীর প্রসঙ্গে ওয়াজ করছিলেন:
"যারা মু'মিনতাদের জন্যে কি আল্লাহর স্মরণে বিগলিত হওয়ার সময় আসে নাই।" (হাদীদ১৬)
হযরত হাসানের অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী  মর্মস্পর্শী ওয়াজে তন্ময় হয়ে শ্রোতামণ্ডলী কান্নায় ভেঙ্গেপড়েছিল। এমন সময় জনৈক যুবক দাঁড়িয়ে হযরত হাসান বসরীকে উদ্দেশ্য করে বললো-'হেআল্লাহ্ প্রিয় বান্দাআমি একজন জঘন্য পাপীআমার মত জঘন্য না-ফরমান বান্দার তওবা কি আল্লাহ্ তা'আলা কবুল করবেন
উত্তরে হযরত হাসান বসরী (রহঃবললেন: 'অবশ্যই তোমার অবাধ্যতা  পাপাচার সত্ত্বেও আল্লাহ্ তা'আলা তোমার তওবা কবুল করবেন।
হাসান বসরীর এই উত্তর শুনে মজলিসে উপবিষ্ট নওজওয়ান উত্তার মুখমণ্ডল বিবর্ণ হয়ে গেলসম্পূর্ণ দেহ তার কাঁপতে আরম্ভ করলোচিৎকার করতে করতে সে মূর্ছিত হয়ে মাটিতে ঢলে পড়লো। জ্ঞান ফিরে আসার পর হযরত হাসান তার নিকটবর্তী হলেন এবংক য়েকটি পংক্তি আবৃত্তি করলেনযেগুলোর সারমর্ম হচ্ছে: 'ওহে না-ফরমান যুবকমহা আরশের মালিক আল্লাহ্ তা'আলার অবাধ্যতার শাস্তি কিসে সম্পর্কে তুমি অবশ্যইঅবগত, - তোমাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবেযেখানে থাকবে ক্রদ্ধ গর্জনরোষভরে গ্রেফতার করে হেঁচড়িয়ে তোমাকে সেই ভয়াবহ অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করা হবেতুমি যদি সেই অগ্নিকুণ্ডে প্রজ্জ্বলিত হওয়ার ক্ষমতা রাখোতা'হলে না-ফরমানী কর। নতুবা এখনই বিরত হয়ে যাও। বস্তুতঃ তুমি পাপাচারে লিপ্ত হয়ে নিজেকে শয়তান  কু-প্রবৃত্তির বেড়াজালে আবদ্ধকরে ফেলেছোএখনও সময় আছেপরিত্রাণের চেষ্টা কর।
পংক্তিগুলো শ্রবণ করার পর যুবক উত্তাহ পুনরায় চিৎকার দিয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়লো। 
এবার জ্ঞান ফিরে আসার পর সে বলতে লাগলো-'হে শায়খআমার মত বদনসীব  গুনাহগার বান্দার তওবাও কি আল্লাহ্ তা'আলা কবুল করবেন?' 
হযরত হাসান বসরী (রহঃবললেন: 'হাঁঅবশ্যই কবুল করবেন।অতঃপর নওজওয়ান উত্তা মাথা উঠিয়ে নিম্নোক্ত তিনটি দো' করলো: 'এক,- হে আল্লাহ্আপনি যদি দয়া করে আমার তওবা কবুল করেনএবং আমার পাপরাশি ক্ষমা করে দেনতা'হলে আমাকে তীক্ষ্ণউপলব্ধিপ্রখর ধীশক্তি  প্রচুর স্মরণশক্তি দান করুনযাতে উলামায়েকেরাম থেকে শ্রুত সর্ব বিধ ইল্ম  কুরআনী জ্ঞান আমি সংরক্ষণ করতে পারি। দুই,-আয় আল্লাহ্আমাকে মনমুগ্ধকর কণ্ঠস্বর দান করুনযাতে যেকোন পাষাণহৃদয় ব্যক্তিও আমার কুরআন তিলাওয়াত শুনে আকৃষ্ট  বিনয়াবনত হয়। তিন,- আয় আল্লাহ্আমাকে হালাল রিযিক দান করুন এবং কল্পনাতীতভাবে আমাকে সাহায্য করুন।'
মহান আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন যুবকের তিনটি দো'আই কবুল করে নিলেন। ফলেতার মেধা অত্যন্ত তীক্ষ্ণ হয়েছিলতার কুরআন তিলাওয়াত শুনে যে কোন কঠিন হৃদয় মানুষও তওবা করতো। প্রতিদিন তার গৃহে দু'টি রুটি এবং এক পেয়ালা তরকারী পৌছিয়ে দেওয়া হতোকিন্তু  খাদ্য কোত্থেকে কিভাবে আসছেকে- বা প্রত্যহ তাপৌঁছিয়ে দিয়ে যাচ্ছেসে সম্পর্কে যুবক কিছুই বলতে পারতো না।  অবস্থা তার মৃত্যু পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। 
প্রিয় সাধকউক্ত নওজওয়ানের মত যে কোন ব্যক্তি আল্লাহ্ দিকে প্রত্যাবর্তন করবেআল্লাহ্তা'আলা তার সাথে সেই ব্যবহারই করবেনযা এই নওজওয়ানের সাথে করেছেন। কেননাআল্লাহ্ তা'আলা কারো নেক আমল কখনও ধ্বংস হতে দেন না।
একদা জনৈক তত্ত্বজ্ঞানী আলেমকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল,- 'কোন তওবাকারী ব্যক্তি যদি জানতে চায় যেতার তওবা আল্লাহর দরবারে কবুল হয়েছে কিনাতা'হলে এর কোন উপায় আছে কি?' তিনি বলেছিলেনঃ ' বিষয়ে পূর্ণ নিশ্চয়তা সহকারে যদিও কিছু বলা যায় নাতবুও তওবা কবুলের কিছু'লক্ষণ আছে। যথাতওবা  অনুতাপের পর বান্দা সর্বদা পাপমুক্ত থাকবেঅযথা আনন্দ-উল্লাস থেকে বিরত থাকবেঅন্তকরণকে আধ্যাত্মিক ব্যাধি হতে পবিত্র রাখবেনিজকে সর্বদা আল্লাহর সামনে উপস্থিত জ্ঞান করবে সৎ  বুযুর্গ লোকদের সংসর্গ অবলম্বন করবেঅসৎ পরিবেশ থেকে সর্বদা দূরে থাকবেদুনিয়ার স্বল্প পরিমাণ সম্পদকে সে যথেষ্ট বরং অধিক জ্ঞান করবেকিন্তু আখেরাতের জন্য কৃত প্রচুর আমল ও ইবাদতকে সামান্য  অপ্রতুল মনে করবেঅন্তরকে সর্বদা আল্লাহ্ ইবাদত  আনুগত্যে মগ্নরাখবেজিহ্বাকে হিফাজত করবেনিষ্ঠার সাথে সর্বদা চিন্তামগ্ন  ধ্যানমগ্ন থাকবেঅতীত জীবনের কৃত পাপকর্মের কথা স্মরণ করে অনুশোচনায় জর্জরিত হয়ে আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করবে। তওবা  অনুতাপের পর যদি কেউ নিজের মধ্যে এসব আলামত  নিদর্শন লক্ষ্য করেতা'হলে সে বুঝে নিতে পারে যেআল্লাহর দরবারে তার তওবা কবুল হয়েছে।'


পরবর্তী পর্ব–
মহব্বত  অনুরাগ

মু'মিন ও মুনাফিকদের লক্ষণ



খোদাবিমুখতা ও মুনাফেকী (পর্ব- ২)
📚মুকাশাফাতুল-কুলুব ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)

মু'মিন ও মুনাফিকদের লক্ষণ—
হুযুর আকরাম (সল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-উনাকে খাটি মু'মিন ও মুনাফিকদের লক্ষণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেছেনঃ 
“প্রকৃত মু'মিন সর্বদা আমল-ইবাদত ও নামায-রোযা প্রভৃতি পুণ্যকার্যে নিমগ্ন থাকে আর মুনাফিক সর্বদা চতুষ্পদ জন্তুর ন্যায় পানাহার ও উদরপূর্তির চিন্তা-ধান্দায় মত্ত থাকে। 

মুনাফিক ব্যক্তি নামায ও ইবাদত পরিত্যাগকারী হয়, আর মু'মিন ব্যক্তি আল্লাহ্’র রাস্তায় দান-খয়রাত করে এবং সর্বদা আল্লাহ্’র কাছে স্বীয় কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। 

মুনাফিক ব্যক্তি পার্থিব ধন-সম্পদের প্রতি লোভী ও উচ্চাভিলাষী হয়, আর মু'মিন ব্যক্তি একমাত্র আল্লাহ্ ছাড়া আর কারো কাছে কিছু আশা করে না; বরং সমস্ত মখ্লুক থেকে মু'মিন ব্যক্তি অনপেক্ষ থাকে। 

মুনাফিক ব্যক্তি আল্লাহ’কে ছাড়া আর সকলের কাছেই আশা পোষণ করে থাকে। মু'মিন ব্যক্তি স্বীয় দ্বীন ও ঈমানকে ধন-সম্পদের উপর প্রাধান্য দেয়। আর মুনাফিক ব্যক্তি ধন-সম্পদকে দ্বীন ও ঈমানের উপর প্রাধান্য দেয়। 

মু'মিন ব্যক্তি একমাত্র আল্লাহ্‌কে ভয় করে এবং সমস্ত গায়রুল্লাহ্ থেকে নির্ভীক থাকে, আর মুনাফিক ব্যক্তি সকল গায়রুল্লাহকে ভয় করে এবং একমাত্র আল্লাহ্ থেকে নির্ভীক থাকে। 

মু'মিন ব্যক্তি নেক আমল করা সত্ত্বেও আল্লাহর ভয়ে রোদন করে, আর মুনাফিক পাপকার্যে লিপ্ত হওয়া সত্ত্বেও আনন্দ-উল্লাসে মত্ত থাকে। 

মু'মিন ব্যক্তি নির্জনতা ও একাকীত্ব পছন্দ করে আর মুনাফিক জনকোলাহল ও অবাধে মিলামিশা পছন্দ করে। 

মু'মিন ব্যক্তি আমল ও ইবাদতরূপ শস্যক্ষেত্রকে আবাদ করা সত্ত্বেও যেকোন মুহূর্তে তা’ ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আশংকা পোষণ করে। পক্ষান্তরে মুনাফিক আমলের শস্যক্ষেত্রকে সর্বদা উজাড় করা সত্ত্বেও তা’ থেকে ফসলপ্রাপ্তির আশা করতে থাকে। 

মু'মিন ব্যক্তি দ্বীন ও ঈমানের হিফাযত ও আমলের ইলাহের উদ্দেশ্যে সৎ কাজে আদেশ এবং অসৎ কাজে নিষেধ করে থাকে, আর মুনাফিক ব্যক্তি প্রভাব বিস্তার ও ফেতনা সৃষ্টির উদ্দেশে আদেশ-নিষেধ করে থাকে; বরং সে অসৎ ও অন্যায় কাজে আদেশ ও সহযোগিতা করে এবং সৎ ও ন্যায় কাজ থেকে মানুষকে বিরত রাখে ।” যেমন আল্লাহ্ তা'আলা ইরশাদ করেছেন
“মুনাফিক নর-নারী সবারই গতিবিধি এক রকম; শিক্ষা দেয় মন্দ কথা, ভাল কথা থেকে বারণ করে এবং নিজ মুঠো বন্ধ রাখে আল্লাহ্‌কে ভুলে গেছে তারা, কাজেই তিনিও তাদের ভুলে গেছেন। নিঃসন্দেহে মুনাফিকরাই না-ফরমান। ওয়াদা করেছেন আল্লাহ্ তা'আলা মুনাফিক পুরুষ, মুনাফিক নারী এবং কাফেরদের জন্যে দোযখের আগুনের তাতে পড়ে থাকবে সর্বদা। সেটাই তাদের জন্যে যথেষ্ট। আর আল্লাহ্ তাদের প্রতি অভিসম্পাত করেছেন এবং তাদের জন্য রয়েছে স্থায়ী আযাব।' ( তওবা : ৬৭,৬৮ ) 
অন্য এক আয়াতে ইরশাদ হয়েছে  : “আল্লাহ্ দোযখের মাঝে মুনাফিক ও কাফেরদেরকে একই জায়গায় সমবেত করবেন।' (নিসা : ১৪০)

এসব লোক কুফর ও মুনাফেকীর কারণে মৃত্যুর পর জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে। উক্ত আয়াতে আল্লাহ্ তা'আলা মুনাফিকদের কথা পূর্বে উল্লেখ করেছেন, –এর কারণ হচ্ছে যে, এরা কাফেরদের চাইতেও জঘন্য ও নিকৃষ্ট এবং এদের উভয়ের পরিণতিই হবে জাহান্নাম। 
যেমন ইরশাদ হয়েছে  : “নিঃসন্দেহে মুনাফিকদের স্থান হচ্ছে, দোযখের সর্বনিম্ন স্তরে। আর তুমি, তাদের জন্য কোন সাহায্যকারী পাবে না।”  ( নিসা : ১৪৫ )

 অভিধানে ‘মুনাফিক’ শব্দটি ‘নাফেক্বাউল – ইয়ারবু’ অর্থাৎ ‘বন্য ইঁদুরের গর্ত থেকে নির্গত। কথিত আছে, বন্য ইঁদুরের গর্তে দু'টি ছিদ্রপথ থাকে, আরবী ভাষায় একটিকে ‘নাফেকা’ এবং অপরটিকে 'কাছে'আ' বলা হয়। এসব বন্য ইঁদুরের অভ্যাস হলো, এক ছিদ্রপথে নিজেকে প্রকাশ করে এবং অন্য গোপন ছিদ্রপথ দিয়ে বের হয়ে যায়। 
অনুরূপ, মুনাফিক ব্যক্তিও বাহ্যতঃ নিজকে মুসলমান হিসাবে প্রকাশ করে থাকে; কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ইসলাম থেকে বের হয়ে কুফরের দিকে চলে যায়। এজন্যেই তাকে ‘মুনাফিক' নামে অভিহিত করা হয়েছে। হাদীস শরীফে আছে  : “মুনাফিক ব্যক্তির উদাহরণ হচ্ছে, দু'টি পালের মধ্যবর্তী অপরিচিত ছাগল বা মেষের মত। সে একবার এক পালে প্রবেশ করে আবার কিছুক্ষণ পর অপর পালে প্রবেশ করে; কিন্তু উভয় পালের কাছেই সে অপরিচিত হওয়ার কারণে কেউ তাকে গ্রহণ করে না। অনুরূপ, মুনাফিক ব্যক্তিও না মুসলমানদের কাছে অবস্থান করতে পারে না কাফেরদের কাছে স্থান পায়। 
আল্লাহ্ তা'আলা জাহান্নামকে এমনভাবে সৃষ্টি করেছেন যে, তার সাতটি দরজা রয়েছে। কুরআনের ভাষায়  : “দোযখের সাতটি দরজা রয়েছে।”  (হিজর : ৪৪) 
কাফেরদেরকে আল্লাহ্ তাআলার লা'নত ও অভিশাপ দিয়ে দোযখে নিক্ষেপ করে লোহার দরজা বন্ধ করে দেওয়া হবে। এর উপরের অংশে তামা এবং ভিতরে গলিত সীসা হবে। দোযখের অভ্যস্তরে ভয়াবহ শাস্তি ও আল্লাহ্’র রোষ ও পরাক্রম বিরাজ করবে। দোযখের মাটি হবে উত্তপ্ত তামা, কাঁচ, লোহা ও সীসা দ্বারা গঠিত। দোযখে নিক্ষিপ্ত লোকদের উপরে, নীচে, ডানে, বামে, এক কথায় চতুর্দিক থেকে উপর্যুপরি অগ্নি বর্ষিত হবে। এর মধ্যে সর্বনিম্ন ও সর্বনিকৃষ্ট স্থানে অবস্থান হবে মুনাফিকদের। 

বর্ণিত আছে, একদা হযরত জিব্রাঈল (আঃ) হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর খেদমতে উপস্থিত হলেন, আল্লাহর রসূল তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন  : ‘হে জিব্রাঈল ! দোযখের অগ্নি এবং তার উত্তাপ সম্পর্কে আপনি কিছু বলুন। 
'হযরত জিব্রাঈল (আ.) বললেন আল্লাহ্ তা'আলা দোযখের অগ্নি সৃষ্টি করে প্রথমে এক হাজার বৎসর পর্যন্ত দগ্ধ করেছেন; ফলে তা’ লালবর্ণ ধারণ করে। অতঃপর আরো এক হাজার বৎসর পর্যন্ত দগ্ধ করেছেন; ফলে তা’ শ্বেতবর্ণে রূপান্তরিত হয়। অতঃপর আরো এক হাজার বৎসর কাল জ্বালিয়েছেন; ফলতঃ সেটা কৃষ্ণবর্ণ ধারণ করে এবং ঘন অন্ধকারে পরিণত হয়। 
অতঃপর হযরত জিব্রাঈল (আ.) বললেন : 'আল্লাহ্ তা'আলার মহান সত্তার কসম, যিনি আপনাকে সত্য নবী হিসাবে প্রেরণ করেছেন, যদি দোযখবাসীদের পরিধেয় একটি বস্ত্রখণ্ডও পৃথিবীতে নিক্ষেপ করা হয়, তবে জগতের সমস্ত মখলূক ধ্বংস হয়ে যাবে। 
অনুরূপ, যদি দোযখবাসীদের ছোট এক বালতি পরিমাণ পানীয় বস্তু দুনিয়ার সমগ্র পানিতে মিশ্রিত করা হয়; তা'হলে যে ব্যক্তি এর সামান্য পরিমাণও পান করবে, সে তৎক্ষণাৎ মারা যাবে। 
এমনিভাবে, জাহান্নামে একটি শিকল রয়েছে, কুরআনের ভাষায়  :  “তাকে শৃঙ্খলিত করা হবে সত্তর গজ দীর্ঘ এক শিকলে।' (আল-হাক্কাহ্ ৩২)– এর অর্ধ গজের পরিমাণ দুনিয়ার পূর্ব প্রান্ত হতে পশ্চিম প্রান্ত পর্যন্ত দুরত্বের সমান। যদি এই শিকলকে পৃথিবীর পর্বতসমূহের উপর রাখা হয়, তা'হলে এই অগণিত পর্বত দ্রব-গলিতে পরিণত হবে। অনুরূপ, যদি কোন ব্যক্তি দোযখে প্রবেশের পর কোনক্রমে বের হয়ে পুণরায় দুনিয়াতে আগমন করে, তাহলে সমগ্র জগতবাসী সেই ব্যক্তির দুর্গন্ধে অসহ্য হয়ে মারা যাবে।” 
অতঃপর হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)  হযরত জিব্রাঈল (আঃ)- কে দোযখের দরজাসমূহের অবস্থা বর্ণনা করতে বললেন ; অর্থাৎ সেটা কি আমাদের ঘর-বাড়ীর দরজার মত, না অন্য কোনরূপ? হযরত জিব্রাঈল (আঃ) বললেন  : “হে আল্লাহর রাসূল ! 
দোযখের দরজা এই পৃথিবীর ঘর বাড়ীর দরজার মত নয়; বরং তা উপরে-নীচে স্তরে স্তরে বিন্যস্ত এবং নিম্নদিক থেকে এক দরজা হতে অপর দরজা পর্যন্ত সত্তর বছরের পথ পরিমাণ দূরত্ব। উপরের দিক থেকে প্রথম দরজার তুলনায় দ্বিতীয়টির এবং এভাবে পরবর্তী দরজাগুলোর একটির তুলনায় অপরটির উত্তাপ ও দাহন ক্ষমতা সত্তর গুণ অধিক হবে।'  

অতঃপর হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এসব স্তরে অবস্থানকারীদের সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করলে হযরত জিব্রাঈল (আ.) বললেন যে, 

দোযখের সর্বনিম্ন তলায় নিক্ষেপ করা হবে মুনাফিকদেরকে। এই স্তরের নাম হা’বিয়াহ্। এ স্তরে মুনাফিকদের অবস্থান প্রসঙ্গে আল্লাহ্ পাক পবিত্র কুরআনে বলেছেন  : “নিঃসন্দেহে মুনাফিকদের স্থান হচ্ছে, দোযখের সর্বনিম্ন স্তরে।” (নিসা : ১৪৫) 

নিম্নদিক হতে দ্বিতীয় স্তরে হবে মুশরিকরা। এ স্তরের নাম ‘জাহীম'। 
তৃতীয় পর্যায়ে মূর্তি-পূজকদের স্তর। এর নাম ‘সাক্বার’। 
চতুর্থ পর্যায়ে অভিশপ্ত ইবলীস ও তার অগ্নিপূজক অনুচরদের স্তর। এর নাম ‘লাজা’। 
পঞ্চম স্তরে হবে ইহুদীরা; এর নাম ‘হুতামাহ্’। 
ষষ্ঠ স্তরে হবে খৃষ্টানরা; এর নাম ‘সাঈর’। 
এ পর্যন্ত বর্ণনা করে হযরত জিব্রাঈল (আ.) থেমে গেলেন। হুযূর (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বললেন  : 'হে জিব্রাঈল ! আপনি সপ্তম স্তর সম্পর্কে কিছু বলছেন না কেন?” 
হযরত জিব্রাঈল বললেন  : “হে আল্লাহর রাসূল ! এই স্তর সম্পর্কে আপনি জানতে চাইবেন না। 
'হুযুর (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বললেন  : ‘না এ সম্পর্কেও আপনি বলে দিন।' 
অতঃপর হযরত জিব্রাঈল (আঃ) আরজ করলেনঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) জাহান্নামের এই সপ্তম স্তরে আপনার উম্মতের ওই সব লোক নিক্ষিপ্ত হবে, যারা দুনিয়াতে কবীরা গুনাহে লিপ্ত হয়েছে এবং তওবা না করে মারা গেছে।' 
হাদীসে বর্ণিত আছে যে, হুযুর (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর প্রতি যখন নিম্নের এ আয়াতটি নাযিল হয়েছে—  "তোমাদের মধ্যে এমন কেউ নাই, যে তথায় পৌছবে না।" (মারিয়াম : ৭১) তখন তাঁর পবিত্র অস্তর উম্মতের এই অসহায় অবস্থার কথা চিন্তা করে দুঃখ-বেদনায় ভারাক্রান্ত হয়ে উঠেছিল এবং অনেকক্ষণ পর্যন্ত তিনি কান্নাকাটি করেছিলেন। সুতরাং যারা আল্লাহর পরিচয়প্রাপ্ত এবং তার অসীম ক্ষমতা ও পরাক্রমশীলতা সম্পর্কে পরিজ্ঞাত, তাদের উচিত, সর্বদা আল্লাহ্ তা'আলার ভয়-ভীতি ও ভক্তি শ্রদ্ধা হৃদয়-মনে জাগরুক করে রাখা এবং প্রবৃত্তির তাড়না ও পাপাচারের জন্য তওবা ও অনুশোচনার অশ্রু বর্ষণ করা, যাতে শেষ পরিণামে এহেন ভয়াবহ আযাব-গজব ও মর্মস্তদ পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে না হয়, যার অনিবার্য ফলশ্রুতিতে হাশরের ময়দানে সকলের সম্মুখে অপমানিত হয়ে মহাপরাক্রমশালী আল্লাহর হুকুমে দোযখে নিক্ষিপ্ত হতে হবে। 
অগণিত এমন বহু বৃদ্ধ ধরাপৃষ্ঠে দিব্যি নিশ্চিন্তে পদচারণা করছে; যাদের প্রতি দোযখ তার ভয়াবহ মূর্তি ধারণ করে প্রতিনিয়ত অভিশাপ ক্ষেপণ করছে। কত যুবক রয়েছে, দোযখ ডেকে ডেকে যাদের যৌবন ও তারুণ্যের প্রতি ধিক্কার দিচ্ছে। কত অগণিত নারী রয়েছে, দোযখ চিৎকার করে যাদের উপর লা'নত ও লাঞ্ছনার গ্লানি বর্ষণ করছে এবং ক্ষণকাল পরে যাদের মুখমণ্ডল ঘৃণ্য সিয়াহ্ রূপ ধারণ করবে, পৃষ্ঠদেশ তাদের ভেঙ্গে পড়বে। সেই ভয়াবহ দিনে কোন মহামান্য সম্ভ্রান্তের প্রতিও সম্মান প্রদর্শন করা হবে না, কারও পাপ ও অন্যায়-অপরাধ গোপন থাকবে না । 

হে আল্লাহ্ ! আমাদেরকে দোযখ থেকে, দোযখের শাস্তি থেকে এবং ওইসব আচরণ ও কার্যকলাপ থেকে রক্ষা করুন, যেগুলো আমাদেরকে দোযখের দিকে ঠেলে দিবে। আয় আল্লাহ্ ! আপনি অনুগ্রহ করে আমাদিগকে আপনার নেক (পূন্যবান) বান্দাদের সাথে জান্নাতে দাখেল করে নিন আপনি মহা পরাক্রমশালী, অনস্ত মার্জনাকারী। ইয়া আল্লাহ্ ! আমাদের দোষ-ত্রুটি গোপন করে রাখুন, আচ্ছাদিত করে রাখুন, আমাদেরকে ভয়, সন্ত্রাস ও দুশ্চিন্তা হতে মুক্ত রাখুন, আমাদের ভ্রম ও পদস্খলন মার্জনা করে দিন, ক্বিয়ামতের ময়দানে আপনার সম্মুখে লাঞ্ছনা ও অপমান থেকে রক্ষা করুন; আপনি সর্বমহান, অনস্ত অনুগ্রহের মালিক । আমিন॥

পরবর্তী পর্ব–

দরূদ পাঠের ফজিলত



খোদাবিমুখতা ও মুনাফেকী– (পর্ব – ১)
📚মুকাশাফাতুল-কুলুব ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)

দরূদ পাঠের ফজিলত—
একদা জনৈকা মহিলা হযরত হাসান বসরী (রহঃ)-এর খেদমতে উপস্থিত হয়ে বললো  :  কিছুদিন হয় আমার একটি যুবতী কন্যা মারা গেছে, সেজন্যে আমার হৃদয় ভারাক্রান্ত; আপনি আমাকে এমন কোন তদ্‌বীর বলে দিন, যদ্দ্বারা আমি তাকে স্বপ্নে দেখতে পারি। 
অতঃপর হযরত হাসান বসরী (রহঃ) তাকে তদ্বীর বালিয়ে দিলেন। মহিলাটি সে অনুযায়ী আমল করার পর একদিন স্বপ্নে দেখে যে, তার কন্যা আলকাতরার পোষাক পরিহিতা, গলায় লোহার জিঞ্জীর এবং পায়ে বেড়ী লাগানো অবস্থায় রয়েছে। 

মহিলা একথা হযরত হাসান বসরীকে জানালে তিনি অত্যন্ত দুঃখিত ও চিন্তান্বিত হলেন। 

এভাবে কিছুদিন অতিবাহিত হওয়ার পর হযরত হাসান বসরী নিজে সেই কন্যাকে স্বপ্নে দেখেন যে, সে বেহেশতে পদচারণ করছে এবং তার মাথায় বেহেশতী তাজ। 

তখন সে হযরত হাসান বসরীকে বললো   'হে হাসান। আপনি আমাকে চিনতে পারেন নাই? আমি সেই মহিলার কন্যা, যে আমাকে স্বপ্নে দেখার জন্য আপনার নিকট হতে তদ্বীর নিয়েছিল।' 

তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমার অবস্থা তো পূর্বে এরূপ ছিল না; কিভাবে তোমার পূর্বাবস্থা পরিবর্তন হয়ে গেল এবং তুমি এ পর্যায়ে উন্নীত হলে - এর কারণ কি?” 

সে বললো এর কারণ হচ্ছে এই যে, একদা এক (বযুর্গ) ব্যক্তি আমার কবরের পার্শ্ব দিয়ে পথ অতিক্রম করার সময় হুযূর আকরাম (সল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-উনার উপর দরূদ পাঠ করেছে। তখন কবরস্থানে পাঁচ ব্যক্তির উপর গোর আযাব হচ্ছিল। সেই পথিক লোকটির দরূদ পড়ার পর আমরা একটি আওয়ায শুনতে পেলাম, তাতে বলা হচ্ছে, - ‘এই ব্যক্তির বরকতে এদের উপর থেকে কবরের আযাব উঠিয়ে নাও।' অতঃপর তৎক্ষণাৎ আমাদের আযাব বন্ধ হয়ে গেল। 

এখানে প্রণিধানযোগ্য যে, একজন পথিকের একবার দরূদ শরীফ পাঠ করার ওসীলায় অপর লোকজন চিরকালের জন্য যদি ক্ষমা পেতে পারে, তাহলে যে ব্যক্তি স্বয়ং পঞ্চাশ বছর পর্যন্ত দরূদ শরীফ পাঠ করবে সে কি আল্লাহর রাসূলের শাফা'আত লাভে ধন্য হবে না ? 

আল্লাহ্ তা'আলা ইরশাদ করেছেন “তোমরা তাদের মত হয়ো না, যারা আল্লাহ্‌কে ভুলে গেছে ।” ( হাশর : ১৯ ) 
অর্থাত, ওইসব কপট ও মুনাফেকদের মত হয়ো না, যারা আল্লাহ্ তা'আলার হুকুম-আহ্কামকে পরিত্যাগ করেছে এবং তার দেওয়া বিধানাবলীর বিপরীত পন্থা অবলম্বন করে পার্থিব লোভ-লালসা ও মায়া-মোহে নিমজ্জিত হয়ে গেছে ।

পরবর্তী পর্ব

গাফলতি ও উদাসীনতা



গাফলতি ও উদাসীনতা
📚মুকাশাফাতুল-কুলুব ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)

গাফলতি ও উদাসনীতা মানুষের আসুস ও হা-হুতাশ বৃদ্ধি করে, শুভ পরিণতির কল্যাণ থেকে বঞ্চিত করে, আখেরাতের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ও আরাম-আয়েশ থেকে মাহরুম করে, ইবাদতের বিঘ্নতা ঘটায়, হিংসা-দ্বেষ বাড়িয়ে তোলে, পরিণামে লজ্জা, ভর্ৎসনা, তিরষ্কার ও অপমানের কারণ হয়।

জনৈক পুণ্যবান ব্যক্তি তার উস্তাদকে মৃত্যর পর স্বপ্নযোগে জিজ্ঞাসা করেছিল,-'মৃত্যুর পর আপনি দুনিয়ার কোন্ বিষয়টির উপর আক্ষেপ করাকে সবচেয়ে মারাত্মক পেয়েছেন?' উত্তরে তিনি বলেছেন, 'গাফলতি ও অসাবধানতার আক্ষেপকে।'

বর্ণিত আছে, এক ব্যক্তি হযরত যুন্নুন মিসরী (রহঃ)-কে স্বপ্নযোগে জিজ্ঞাসা করেছিল,-'মৃত্যুর পর আল্লাহ্ তা'আলা আপনার সাথে কিরূপ ব্যবহার করেছেন?' তিনি বলেছেন: 'আল্লাহ্ তা'আলা আমাকে তাঁর মহান দরবারে দণ্ডায়মান করে বলেছেন: হে মিথ্যুক! হে অসত্যের দাবীদার! তুমি আমার প্রতি কৃত্রিম ভালবাসার দাবী করেছো, অতঃপর আমা হতে উদাসীন ও অন্যমনস্ক হয়ে রয়েছো।' 
জনৈক বুযুর্গ স্বীয় পিতাকে মৃত্যুর পর স্বপ্নে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, -আব্বাজান! পরকালের এই জগতে আপনি কেমন আছেন? 
তিনি বললেন, 'ওহে বৎস! দুনিয়াতে আমি গাফেল ও উদাসীন ছিলাম এবং সে অবস্থায়ই আমার মৃত্যু হয়েছে, ফলে এখন আমার নানাবিধ কষ্ট ও শাস্তি ভোগ করতে হচ্ছে।'

'যাহরুর-রিয়াদ' কিতাবে আছে, হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালামের সাথে মালাকুল-মওতের সখ্যতার সম্পর্ক ছিল; তাই মালাকুল-মওত প্রায়ই হযরত ইয়াকুবের নিকট আসা-যাওয়া করতেন। একদিন হযরত ইয়াকুব তাঁকে বললেন : 'আপনি কি আমার সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে এসেছেন, না জান কবজ করতে? তিনি বললেন,-সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে। অতঃপর হযরত ইয়াকুব (আঃ) বললেন, 'আপনার নিকট আমার একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ আবেদন যে, আমার মৃত্যুর সময় যখন উপস্থিত হবে এবং আপনি আমার জান কবজ করার উদ্দেশে আগমন করবেন, তখন পূর্বাহ্নেই আমাকে অবগত করে দিবেন।' হযরত মালাকুল-মওত সম্মতি ব্যক্ত করে বললেন, 'মৃত্যুর পূর্বে অবশ্যই আমি আপনার নিকট তিনটি বার্তা পাঠাবো, তখন বুঝে নিবেন যে, আপনার মৃত্যু সন্নিকটবর্তী।' 
কিছুদিন পর হযরত ইয়াকুবের অন্তিম সময়ে মালাকুল-মওত উপস্থিত হলে তিনি আগমনের কারণ জিজ্ঞাসা করলেন। উত্তরে মালাকুল-মওত রূহ কবজের উদ্দেশ্য ব্যক্ত করলেন। জওয়াব শুনে হযরত ইয়াকুব (আঃ) বিস্ময়বিমূঢ় হয়ে বললেন, -আপনি কি আমার সঙ্গে মৃত্যুর পূর্বে দূত পাঠানোর ওয়াদা করেছিলেন না? কিন্তু কই, কোন দূত বা বার্তাবাহক তো আসে নাই! 

মৃত্যুর ফেরেস্তা বললেন,-'হে আল্লাহর নবী! আমি ঠিকই আপনার কাছে দূত পাঠিয়েছি; কিন্তু আপনি তা' লক্ষ্য করেন নাই; আপনার কেশরাশির কৃষ্ণতার পর শুভ্রতা, আপনার দৈহিক শক্তির প্রাবল্যের পর দুর্বলতা এবং আপনার দেহ সোজা ও সটান থাকবে পর বক্রতাই মৃত্যুর পূর্বে আপনার কাছে প্রেরিত আমার দূত বা বার্তাবাহক।'

হযরত আবু আলী দাক্কাক (রহঃ) বলেন: 'প্রখ্যাত এক বুযুর্গের অসুস্থতার সংবাদ পেয়ে তাঁকে দেখার জন্য আমি খেদমতে হাজির হলাম। তখন তাঁর শিষ্যগণ শিয়রের পার্শ্বে উপবিষ্ট ছিল এবং তিনি ক্রন্দন করছিলেন। আমি তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম,- 'হে শায়খ! আপনি কি এই অন্তিম সময়ে দুনিয়ার মায়া-মহব্বত ও বিচ্ছেদের কারণে কান্নাকাটি করছেন?' তদুত্তরে তিনি বললেন, 'না, বরং আমি আমার নামাযের অসারত্বের কথা স্মরণ করে কাঁদছি; জীবনের সমস্ত নামায আমি বিনষ্ট করে ফেলেছি।' আমি বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, -'এটা কিভাবে? আপনি তো সারা জীবন নামায আদায় করেছেন।' তিনি বললেন, 'আমি জীবনে যত নামাযই পড়েছি; সিজদা করেছি, সিজদা হতে মাথা উঠিয়েছি, সবসময়ই আমার অন্তরে গাফলতি ও অবহেলা বিরাজ করতো, মনোযোগ সহকারে আমি রুকু-সিজদা করতে পারি নাই, আর আজকে আমার সেই অবস্থাতেই মৃত্যু হচ্ছে।' এতটুকু বলে তিনি একটি দীর্ঘ নিশ্বাস ফেললেন এবং কয়েকটি পংক্তি আবৃত্তি করলেন।

সেগুলোর সারমর্ম হচ্ছে: 'হাশরের দিন কিয়ামতের ময়দানে আমার কি অবস্থা হবে, সে বিষয়ে চিন্তা করে আমি উদ্বিগ্ন ও হতাশাগ্রস্ত। দুনিয়ার আরাম-আয়েশ ও ইয্যত-সম্মানের পর জানিনা কবরের ঘোর অন্ধকারে একাকী কি অবস্থায় আমাকে কাটাতে হবে। আমি অতি উত্তমরূপে ধ্যান করেছি,-যখন আমলনামা হস্তান্তর করা হবে, তখন না-জানি আমার কি দুর্দশা হয়। 
আয় আল্লাহ্। আয় পরওয়ারদিগার!! একমাত্র আপনার উপরই আমার ভরসা আমার আশা; আপনার দয়া ও রহমত ছাড়া আমার কোন গত্যন্তর নাই; মেহেরবানী করে আপনি আমাকে সেদিন মা'ফ করে দিন।'

'উয়ুনুল-আখবার' গ্রন্থে হযরত শাক্বীক বলখী (রহঃ) থেকে উদ্ধৃত হয়েছে, তিনি বলেছেন : 
"তিনটি বিষয় এমন রয়েছে, মানুষ মুখে মুখে যেগুলোর খুব বুলি আওড়িয়ে থাকে; কিন্তু কার্যক্ষেত্রে সম্পূর্ণ বিপরীত লক্ষ্য করা যায়।
এক, - মানুষ মুখে স্বীকারোক্তি করে যে, আমরা আল্লাহর বান্দা, একমাত্র তাঁরই দাস; কিন্তু কার্যতঃ দেখা যায় যে, প্রতিটি কাজে আল্লাহ্ অবাধ্যতা ও স্বেচ্ছাচারিতা অবলম্বন করে থাকে। 

দুই,- মানুষ বলে থাকে, আল্লাহ আমাদের জীবিকা ও রোযী-রোযগারের জিম্মাদার, সুতরাং তিনিই এ ব্যাপারে ফিকির করবেন। কিন্তু একথা বলা সত্ত্বেও বাস্তব ক্ষেত্রে মানুষের অন্তর কখনও দুনিয়ার ধন-সম্পদ ব্যতিরেকে পরিতৃপ্ত হয় না, সর্বদা দুনিয়ার মোহে আচ্ছন্ন থাকে এবং ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার মাল-সামান একত্রিকরণে উন্মত্ত থাকে। 

তিন, মানুষ বলে থাকে, মৃত্যু আসবেই এবং এটা সকলের জন্য অবধারিত; কিন্তু তাদের ব্যস্ততা এবং দুনিয়ার প্রতি আকর্ষণ দেখে মনে হয় যে, তারা কোনদিন মরবে না।"
প্রিয় সাধক! একটু চিন্তা করে দেখ, মহান আল্লাহর দরবারে তুমি কোন্ দেহটি নিয়ে হাজির হবে, কোন্ মুখে তুমি কথা বলবে? মহান সেই দরবারের প্রতিটি জিজ্ঞাসার সঠিক জওয়াব তোমাকে দিতে হবে, যা পূর্বাহ্নেই প্রস্তুত করে রাখা চাই। মহা পরাক্রমশালী আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীনের ভয় থেকে এক মুহূর্তের জন্যেও শঙ্কামুক্ত হয়ো না; কারণ তিনি তোমার ভাল-মন্দ সবকিছু সম্পর্কে সম্যক পরিজ্ঞাত। আল্লাহ্ তা'আলার প্রতিটি নির্দেশকে আন্তরিক আনুগত্য সহকারে পালন কর এবং নিজের জাহের-বাতেন, চিন্তা-ভাবনা, ধ্যান-ধারণা ও কাজ-কর্মে সর্বতোভাবে এক আল্লাহর জন্যে নিবেদিতপ্রাণ হয়ে যাও।

হুযুর আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেছেন যে, আরশের নীচে লেখা রয়েছে: "আমার অনুগত বান্দার প্রতি আমি অনুগ্রহ করে থাকি, যে আমাকে ভালবাসে আমি তাকে ভালবাসি, যে আমার কাছে প্রার্থনা করে আমি তাকে দান করি এবং যে আমার কাছে ক্ষমা চায় আমি তাকে ক্ষমা করি।"

অতএব মানবের কর্তব্য হচ্ছে, ইখলাস ও পূর্ণ আনুগত্যের সাথে কায়মনোবাক্যে আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগীতে নিমগ্ন হওয়া, দুনিয়ার বালা- মুসীবত ও দুঃখ-দৈন্যে ছবর করা, আল্লাহর দেওয়া নে'আমতসমূহের শোকর আদায় করা এবং সর্বাবস্থায় মাওলার প্রতি সন্তুষ্ট ও উদগ্রীব থাকা। আল্লাহ্ তা'আলা বলেন: 'যে ব্যক্তি আমার অভিপ্রায়ে সন্তুষ্ট থাকে না, আমার যাচাই ও পরীক্ষায় ছবর করে না, আমার নে'আমতের শোকর আদায় করে না এবং আমার পরিমিত দানে তুষ্ট থাকে না, সে যেন আমাকে ছাড়া অন্য কোন প্রভু তালাশ করে।':

এক ব্যক্তি হযরত হাসান বসরী (রহ.)-এর নিকট আরজ করলো, 'হুযূর! আমি ইবাদতে স্বাদ পাই না; এর কারণ কি?' 
তিনি বললেন: 'হয়তঃ তুমি এমন কোন লোকের প্রতি দৃষ্টিপাত করেছো, যার অন্তরে আল্লাহ্ ভয় নাই।' জেনে রাখ, - 'ইবাদত হচ্ছে, আল্লাহ্ ছাড়া অন্য সবকিছুকে পরিপূর্ণরূপে ত্যাগ করার নাম; এমনকি ইবাদতে স্বাদ অন্বেষণ করাও ইবাদতের পরিপন্থী কাজ।' জনৈক ব্যক্তি হযরত আবু ইয়াযীদ (রহঃ)-এর নিকট ইবাদতে স্বাদ না-পাওয়ার কথা উল্লেখ করলে তিনি বলেছিলেন : 'তুমি তো আল্লাহ্ ইবাদত না-করে 'ইতা'আত ও আনুগত্য' নামের বস্তুটির পূজা করছো, নতুবা তুমি ইবাদতে স্বাদ অন্বেষণ করছো কেন? বস্তুতঃ আল্লাহর আনুগত্যের উদ্দেশে ইবাদত করাটাও এক প্রকার গায়রুল্লাহর ইবাদত। 
সুতরাং তুমি সকল গায়রুল্লাহ্ থেকে মুক্ত-পবিত্র হয়ে এক আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন হও। তা'হলে অবশ্যই তুমি স্বীয় আরাধনায় স্বাদ ও লজ্জত অনুভব করতে পারবে।

একদা এক ব্যক্তি নামায আরম্ভ করে যখন - "হে আল্লাহ্! আমি একমাত্র আপনারই ইবাদত করছি"।পর্যন্ত পৌঁছলো, তখন তার মনে ধারণার উদ্রেক হলো যে, 'সে প্রকৃতই আল্লাহ্ তা'আলার যথার্থ ইবাদত করছে।' তৎক্ষণাৎ গায়েব থেকে আওয়ায আসলো,-'তুমি মিথ্যুক; তুমি আল্লাহর ইবাদত করছো না; বরং রিয়া বা লোকদেখানোর উদ্দেশে এরূপ আরম্ভ করছো।"
একথা শুনে সে তৎক্ষণাৎ তওবা করে নির্জন স্থানে গিয়ে নামায আরম্ভ করলো। এবারও যখন (إِيَّاكَ نَعْبُدُ) পাঠ করলো, তখন আওয়ায আসলো, -'তুমি মিথ্যুক, তুমি তোমার ধন-সম্পদের ইবাদত করছো।' অতঃপর সে নিজের সমস্ত ধন-দৌলত আল্লাহর রাস্তায় দান করে দিল এবং পুনরায় নামায আরম্ভ করলো। পূর্বের মত এবারও আওয়ায আসলো,-'তুমি তোমার পোষাক-পরিচ্ছদের ইবাদত করছো।' অতঃপর সে নিতান্ত প্রয়োজনীয় পোষাকাদি ছাড়া অবশিষ্ট সমস্ত কাপড়- চোপড় দান করে দিল। এরপর পুনরায় নামায আরম্ভ করে (إِيَّاكَ نَعْبُدُ) পর্যন্ত পৌঁছলে গায়েবী আওয়ায আসলো,-'হে আমার বান্দা! এবার তুমি সত্য বলছো; প্রকৃতই তুমি একমাত্র আমারই ইবাদত করছো।'

'রাওনাকুল-মাজালিস' কিতাবে আছে,-'একদা এক ব্যক্তির মূল্যবান একটি বস্তু হারিয়ে যায়; কে নিয়েছে বা কোথায় আছে, তার স্মরণ ছিল না। অতঃপর একবার নামাযে দণ্ডায়মান অবস্থায় বিষয়টি তার স্মরণ হয়। নামায সমাপ্ত করে গোলামকে সে বললো,-'অমুক ব্যক্তির নিকট হতে আমার সেই বস্তুটি নিয়ে আস।' একথা শুনে গোলাম জিজ্ঞাসা করলো, বিষয়টি আপনার কখন স্মরণ হয়েছে? সে বললো, -'নামাযে।' গোলাম বললো, 'হে মনিব! সত্য বলতে কি, নামাযরত অবস্থায় আপনি খোদার উপাসক ছিলেন না; বরং সে বস্তুটির অন্বেষী ছিলেন। মনিব গোলামের মুখে এহেন বিজ্ঞজনোচিত উক্তি শুনে আনন্দিত হয়ে তাকে আযাদ করে দিল।'

হে সাধক! দুনিয়ার সর্ববিধ মায়া-মোহ পরিত্যাগ করে একমাত্র ইবাদত ও আনুগত্যে নিমগ্ন হয়ে যাও, সর্বদা অন্তকরণকে সুস্থ, সবল ও সুন্দর করার চেষ্টায় নিরত থাক, কঠোর পরিশ্রম ও সাধনা করে সম্মুখে অগ্রসর হও এবং পারলৌকিক জীবনের সাফল্যকেই একমাত্র লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হিসাবে গ্রহণ করে নাও। প্রকৃত চিন্তাশীল ও বুদ্ধিমান লোক এ বিষয়ে কোনরূপ অবহেলা প্রদর্শন করতে পারে না। আল্লাহ্ পাক ইরশাদ করেছেন – "যে ব্যক্তি পরকালের ফসল কামনা করে, আমি তার জন্য সেই ফসল বাড়িয়ে দেই। আর যে ইহকালের ফসল কামনা করে, আমি তাকে দুনিয়ার কিছু দিয়ে দেই; কিন্তু পরকালে তার কোন অংশ থাকবে না।" (শূরা : ২০)

আয়াতে উল্লেখিত 'হারসুদ্দুনয়া'-এর অর্থ হচ্ছে,-দুনিয়ার যাবতীয় ভোগ্য উপকরণ, যথা: লেবাস-পোষাক, খাদ্য-পানীয় প্রভৃতি। 'এ ব্যক্তি আখেরাতের কোন অংশ পাবে না'-এর অর্থ হচ্ছে,-দুনিয়াতেই তার অন্তর থেকে আখেরাতের মহব্বত দূর হয়ে যায়। 
হযরত আবু বকর (র.)-এর জীবনালেখ্যে লক্ষ্য করা যায় যে, আখেরাতের প্রতি সনিষ্ঠ আকর্ষণের ফলশ্রুতিতেই তিনি দ্বীনের খেদমতের জন্য চল্লিশ হাজার স্বর্ণমুদ্রা গোপনে আর চল্লিশ হাজার প্রকাশ্যে সর্বমোট আশি হাজার স্বর্ণমুদ্রা আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করেছেন। অতঃপর নিজের জন্য তাঁর কাছে আর কিছুই অবশিষ্ট ছিল না। 
দু'জাহানের সরদার হযরত নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ও তাঁর পরিবারবর্গ সর্বদা দুনিয়ার সর্বপ্রকার আরাম-আয়েশ ও ভোগ-বিলাস পরিহার করে চলতেন। 

আদরের দুলালী মা ফাতেমা যাহরা (র.)-কে তিনি বিবাহের সময় যে উপহার দিয়েছিলেন, তা ছিল নিতান্ত নগণ্য-চামড়ার একটি ছোট মোশক এবং খেজুরবৃক্ষের আঁশ দিয়ে প্রস্তুত করা একটি বালিশ মাত্র।

পরবর্তী পর্ব

রিপুর প্রভাব ও শয়তানের শত্রুতা



রিপুর প্রভাব ও শয়তানের শত্রুতা

📚মুকাশাফাতুল-কুলুব ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)

বুদ্ধিমান ও বিচক্ষণ লোকের কাজ হচ্ছে,-ক্ষুধা ও ক্ষুৎসাধনার মাধ্যমে রিপুর তাড়না ও কাম উত্তেজনাকে সমূলে বিনাশ করে দেওয়া। কেননা খোদার দুশমন শয়তানকে ধ্বংস করার জন্য ক্ষুৎসাধনাই হচ্ছে প্রধান হাতিয়ার। পাপিষ্ঠ শয়তান প্রবৃত্তির সাধ-অভিলাষ ও অধিক পানাহারকেই কেন্দ্র করে মানুষকে বিভ্রান্ত করে থাকে। হুযুর আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেছেনঃ "শয়তান মানুষের রন্ধ্রে রন্ধ্রে রক্তের ন্যায় প্রবহমান হয়, সুতরাং তোমরা শয়তানের এ প্রবাহপথকে ক্ষুৎসাধনার দ্বারা বন্ধ করে দাও"।

কিয়ামতের দিন আল্লাহ্ তা'আলার অধিক নিকটবর্তী হবে সেই ব্যক্তিই, – যে দুনিয়াতে ক্ষুধা ও তৃষ্ণার যন্ত্রণা সহ্য করেছে। বস্তুতঃ অধিক ভোজনস্পৃহা আদম সন্তানকে মারাত্মক ধ্বংসের দিকে ঠেলে নেয়। 

হযরত আদম ও হাওয়া আলাইহিমাস সালাম চিরশান্তির আবাস জান্নাত থেকে বরখাস্ত হয়ে এই অশান্তির জগতে পতিত হয়েছেন, -এর পিছনেও কারণ ছিল ভোজনস্পৃহা। আল্লাহ্ তা'আলা তাঁদেরকে বেহেস্তের একটি নির্দিষ্ট ফল খেতে নিষেধ করেছিলেন, তখন একমাত্র অধিক ভোজনস্পৃহার কারণেই তাঁরা উক্ত নির্দেশ পালন করতে পারেন নাই। ফলে, তাঁদের লজ্জাবরণ সংরক্ষিত থাকে নাই। মোটকথা, উদরই হচ্ছে মানুষের সর্ববিধ পাপাচারের উৎস ও ধ্বংসের মূল কারণ। 
জনৈক বুযুর্গ বলেছেন : 'যে ব্যক্তি স্বীয় রিপুর কাছে পরাজিত হলো, সে প্রবৃত্তির হাতে বন্দী হয়ে গেল। তার অন্তর হিত-কল্যাণ থেকে বঞ্চিত থাকবে। যে ব্যক্তি স্বীয় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের যমীনে স্বেচ্ছাচারিতার পানি সিঞ্চন করলো, সে মূলতঃ আপন অন্তঃকরণে লাঞ্ছনা ও আক্ষেপের বৃক্ষ রোপণ করল।'

আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর কুদরতে তিন প্রকার মাখলুক সৃষ্টি করেছেন: এক,-ফেরেশতা। এঁদেরকে তিনি বিবেক-বুদ্ধি দিয়েছেন; কিন্তু কামভাব দেন নাই। দ্বিতীয়, জীব-জন্তু। এদেরকে কামভাব দিয়েছেন; কিন্তু বিবেক- বুদ্ধি দেন নাই। তৃতীয় প্রকার হচ্ছে মানব। এদেরকে আল্লাহ্ তা'আলা বিবেক- বুদ্ধি এবং কামভাব উভয়টাই দান করেছেন। এদের মধ্যে যারা নিজেদের বিবেক-বুদ্ধিকে বলবান করে কামরিপু ও যথেচ্ছাচারিতাকে দুর্বল ও পরাজিত করতে পেরেছে, তারা ফেরেশতা অপেক্ষাও শ্রেষ্ঠ। আর যাদের বিবেক- বুদ্ধি রিপুর কাছে পরাজয় বরণ করেছে, তারা হিংস্র জীব-জানোয়ারের চাইতেও নিকৃষ্ট।

হযরত ইব্রাহীম খাওয়াস (রহঃ) বলেন, -'একদা আমি 'লাকাম' পর্বতে অবস্থান করছিলাম। তখন একটি আনারের প্রতি আমার দৃষ্টি পড়ায় অন্তরে সেটি খাওয়ার আকাংখা সৃষ্টি হলো। আনারটি হাতে নিয়ে বিদীর্ণ করে সামান্য স্বাদ গ্রহণ করার পর টক হওয়ার কারণে সেটি ফেলে দিলাম। অতঃপর পথ চলাকালে একজন লোকের প্রতি আমার দৃষ্টি পড়লো; লোকটি রাস্তায় নেহায়েত অসহায় অবস্থায় পড়ে আছে আর অজস্র ভীমরুল তাকে আচ্ছন্ন করে রয়েছে। আমি তাকে সালাম প্রদান করলে সে উত্তরে বললো : 'ওয়াআলাইকুমুস সালাম হে ইব্রাহীম! আমি চমকিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি আমাকে কিভাবে চিনতে পারলেন? লোকটি বললো, যে আল্লাহকে চিনতে পেরেছে তার কাছে গোপন ও অপরিচিত বলতে কিছু নাই। আমি বললাম, আল্লাহর সাথে আপনার অতি রহস্যপূর্ণ অবস্থা আমি লক্ষ্য করেছি; আপনি কি ভীমরুলের আক্রমণ থেকে নিরাপত্তার জন্য দো'আ করেন নাই? অতঃপর লোকটি বললো, -আমিও আপনার বিশেষ রহস্যময় অবস্থা প্রত্যক্ষ করেছি; আপনি কি আনার ফলের লোভ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য মোনাজাত করেন নাই? শুনুন, ভীমরুলের উৎপীড়ন-যন্ত্রণা শুধু ইহকাল পর্যন্তই সীমাবদ্ধ, আর আনারের প্রতি লোলুপ দৃষ্টির প্রায়শ্চিত্ত আখেরাতেও ভোগ করতে হবে। ভীমরুল কেবল দৈহিক যন্ত্রণা দিতে পারে; কিন্তু লোভ- লালসা অন্তরাত্মাকে ক্ষত-বিক্ষত করে ফেলে। একথা শুনার পর আমি সেখান থেকে প্রস্থান করলাম।'

বস্তুতঃ রিপুর তাড়না ও যথেচ্ছাচারিতা বাদশাহকে গোলামে পরিণত করে এবং ধৈর্য ও সংযম গোলামকে বাদশাহর মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করে। এ প্রসঙ্গে হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম ও যুলায়খার জীবনালেখ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, হযরত ইউসুফ (আঃ) ধৈর্য ও সংযমশীলতার ফলশ্রুতিতে মহান সম্রাট ও শাসনকর্তার মর্যাদা লাভ করেছিলেন। আর যুলায়খা শুধুমাত্র কাম-প্রবৃত্তির অনুসরণের পরিণতিতে জঘন্যভাবে হেয় প্রতিপন্ন হয়েছেন। কারণ যুলায়খা হযরত ইউসুফকে ভালবাসতে গিয়ে ধৈর্য-সহিষ্ণুতা ও সংযমের পরিচয় দিতে পারেন নাই।

আবুল হাসান রাযী (রহঃ) স্বীয় পিতাকে মৃত্যুর দুই বৎসর পর স্বপ্নে দেখলেন যে, তিনি আলকাতরার পোষাক পরিহিত অবস্থায় আছেন। জিজ্ঞাসা করলেন: 'আব্বাজান! আপনার অবস্থা দোযখবাসীদের ন্যায় দেখা যাচ্ছে, এর কারণ কি?' পিতা বললেন,- 'হে পুত্র! আমার রিপু ও কুপ্রবৃত্তি আমাকে দোযখে ঠেলে দিয়েছে। প্রিয় পুত্র। নফস ও প্রবৃত্তির ব্যাপারে তুমি কখনো গাফেল হয়ো না; সদা সতর্ক ও সচেতন থেকে এহেন শত্রু হতে আত্মরক্ষা করার চেষ্টা কর। কেননা আজকে আমার এ দুর্দশার কারণই হচ্ছে ইবলীস, দুনিয়ার মোহ, প্রবৃত্তির অনুসরণ এবং কাম-বাসনা চরিতার্থকরণ। এরই ফলশ্রুতিতে আমি ধ্বংস ও বিনাশের এই অতল গহ্বরে নিক্ষিপ্ত হয়েছি। নিজের দুর্ভাগ্য আমি নিজেই টেনে এনেছি, জেনেশুনে শত্রুকে প্রশ্রয় দিয়েছি। ফলে, আমি নাজাতের কোনই আশা করতে পারছি না।'

হযরত হাতেম আছাম্ম (রহঃ) বলেন, 'প্রবৃত্তি আমার সীমান্ত রেখা, জ্ঞান-বিদ্যা আমার অস্ত্র, পাপ আমার লাঞ্ছনা ও অপমান, শয়তান আমার শত্রু এবং রিপু আমার প্রতারক ও প্রবঞ্চনাকারী।'

জনৈক বুযুর্গ বলেছেন: 'জিহাদ তিন প্রকারে বিভক্ত : এক,- পথভ্রষ্ট ও বাতিলপন্থীদের বিরুদ্ধে যুক্তি-প্রমাণের মাধ্যমে জিহাদ করা। যেমন আল্লাহ্ তা'আলা ইরশাদ করেছেনঃ "তাদের সাথে বিতর্ক করুন সম্ভাবে"।(নাহল : ১২৫)
দ্বিতীয় প্রকার হচ্ছে,-কাফের ও মুশরিকদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা; এটা স্পষ্ট যুদ্ধ। যেমন কুরআন পাকে ইরশাদ হয়েছে : "তারা আল্লাহর পথে জিহাদ করে।" (মায়িদাহঃ ৫৪)
তৃতীয়,-রিপু ও কুপ্রবৃত্তির বিরুদ্ধে জিহাদ করা। যেমন আল্লাহ্ পাক ইরশাদ করেছেনঃ "যারা আমার উদ্দেশ্যে জিহাদ (সাধনা) করে, তাদেরকে অবশ্যই আমার পথে পরিচালিত করবো"।(রুম: ৬৯)

এই মর্মে হুযুর আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন : "রিপুর বিরুদ্ধে জিহাদ করাই হচ্ছে উত্তম জিহাদ।"
সাহাবায়ে কেরাম কাফেরদের বিরুদ্ধে জিহাদ সম্পন্ন করে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে প্রত্যাবর্তন করার পর বলতেনঃ "আমরা ক্ষুদ্রতম জিহাদ সমাপন করে বৃহত্তম জিহাদে (প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে) প্রত্যাবর্তন করেছি"। প্রবৃত্তি ও শয়তানের বিরুদ্ধাচরণকে 'বৃহত্তম জিহাদ' নামে অভিহিত করার তাৎপর্য হচ্ছে,-কাফেরের বিরুদ্ধে জিহাদ করার ব্যাপারটা একান্ত সাময়িক; কিন্তু শয়তান, কাম-প্রবৃত্তি ইত্যাদি মানুষের সার্বক্ষণিক শত্রু, হর-হামেশা মানুষের সাথে এদের বিসম্বাদ লেগেই থাকে। এছাড়া কাফেরের বিরুদ্ধে জিহাদকারী ব্যক্তি শত্রুকে স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করতে পারে; কিন্তু নফস ও শয়তান মানুষের চোখে ধরা পড়ে না। আর একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, দৃশ্যমান শত্রুর চাইতে অদৃশ্য শত্রু মারাত্মক ও ধ্বংসাত্মক হয় বেশী। এছাড়া আরও একটি কারণ হচ্ছে, -শয়তান সরাসরি রিপু ও কুপ্রবৃত্তিকে তোমার বিরুদ্ধে সাহায্য করে; আর এক্ষেত্রে রিপুই হচ্ছে সকল অনিষ্ট ও স্বেচ্ছাচারিতার মূল। পক্ষান্তরে কাফের তোমার রিপু বা নফসের পক্ষে সাহায্যকারী নয়। এতদ্ব্যতীত আরও কারণ হচ্ছে যে, কোন কাফেরকে তুমি হত্যা করতে সক্ষম হলে গণীমতের মাল ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা লাভ করবে; আর যদি কোন কাফেরের হাতে তুমি নিহত হও, তা'হলে শাহাদতের মর্যাদা ও জান্নাত লাভ করবে। সুতরাং এখানে উভয় দিকেই তোমার স্বার্থ ও কল্যাণ রয়েছে। পক্ষান্তরে শয়তানকে হত্যা করার ক্ষমতা তোমার নাই; অথচ তোমাকে ধ্বংস করার ক্ষমতা শয়তানের আছে। খোদা না করুন যদি শয়তান তোমাকে ধ্বংস করে ফেলে, তা'হলে তুমি চিরশাস্তির ফাঁদে পড়ে গেলে। সুতরাং এখানে উভয় দিকেই তোমার ক্ষতি ও ধ্বংস অনিবার্য। এজন্যেই বুযুর্গানে দ্বীন বলেছেন : 'যুদ্ধক্ষেত্রে যার ঘোড়া পলায়ন করে, সে শত্রুর হাতে বন্দী হয়, আর শয়তানের ফাঁদে পড়ে যার ঈমান বিলুপ্ত হয়, সে আল্লাহর আযাব ও গজবে গ্রেফতার হয়। অনুরূপ যে ব্যক্তি কাফেরের হাতে বন্দী হয়, তার হস্তদ্বয় জিঞ্জীর দিয়ে গলার সাথে বেধে দেওয়া হয় না, তার পদদ্বয় বাঁধা হয় না, তার উদর অভুক্ত থাকে না। কিন্তু আল্লাহর আযাব ও গজবে গ্রেফতার ব্যক্তির অবস্থা খুবই করুণ, খুবই মারাত্মক, তার মুখমণ্ডল কালো অন্ধকার করে দেওয়া হয়, হস্তদ্বয় লোহার শিকল দিয়ে গলার সাথে বেঁধে দেওয়া হয়, পায়ে আগুনের বেড়ী পরিয়ে দেওয়া হয়, অগ্নি পান করানো হয়, অগ্নি খাওয়ানো হয়, অগ্নির পোষাক পরানো হয়।'

পরবর্তী পর্ব

আধ্যাত্মিক সাধনা ও রিপুর তাড়না



আধ্যাত্মিক সাধনা ও রিপুর তাড়না

📚মুকাশাফাতুল-কুলুব ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)

আল্লাহ্ তা'আলা হযরত মূসা আলাইহিস সালামের নিকট ওহী পাঠিয়ে ছিলেন "হে মুসা ! তোমার কথা তোমার জিহ্বার যতটুকু নিকটবর্তী, অনুরূপ তোমার হৃদস্পন্দন তোমার হৃদয়ের, তোমার রূহ তোমার দেহের, তোমার দৃষ্টিশক্তি তোমার চোখের, তোমার শ্রবণশক্তি তোমার কানের যতটুকু নিকটবর্তী, সেই তুলনায় তুমি যদি চাও - আমি (আল্লাহ) তোমার আরও অধিকতর নিকটবর্তী হই, তা'হলে তুমি আমার হাবীব হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর উপর অধিক পরিমাণে দরূদ পাঠ কর"। 
আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেছেন – "প্রত্যেক ব্যক্তির উচিত, আগামী কালের জন্য সে কি প্রেরণ করে, তা চিন্তা করা।" (হাশর : ১৮) 
"হে মানব ! ক্বিয়ামতের দিন জবাবদেহী করার জন্য তুমি কি আমল করেছো? এ কথা সর্বদা স্মরণ রেখো যে, তোমার নফস বা রিপুই হচ্ছে তোমার সবচেয়ে বড় দুশমন। এমনকি শয়তানের চেয়েও সে তোমার জন্য অধিকতর জঘন্য ও মারাত্মক। কারণ, খোদ শয়তানও প্রকৃতপক্ষে তোমার রিপুর তাড়না ও কামনা-বাসনা থেকেই শক্তি যুগিয়ে থাকে। তারপর সে তোমাকে ধোকা–প্রতারণার জালে আবদ্ধ করে তোমার ক্ষতি সাধনে সমর্থ হয়। 
অতএব এ ব্যাপারে কঠোর সতর্কতা অবলম্বন কর। প্রবৃত্তির তাড়নায় অহেতুক কামনা-বাসনা ও আকাংখা-অভিলাষের মাধ্যমে নিজকে শয়তানের প্রবঞ্চনার শিকারে পরিণত করো না। নফস বা কুপ্রবৃত্তি সবসময়ই উদাসীন ও অচেতন থাকতে চায়। বস্তুতঃ এটা তার মজ্জাগত স্বভাব, এজন্যে তার সকল দাবীই মিথ্যা। সুতরাং তাকে কোন ব্যাপারেই বিশ্বাস করো না, তার সাথে আপোষ করো না। নফসের ধোকায় প্রতারিত হয়ে যদি কোন বিষয়ের প্রতি তুমি আকৃষ্ট হয়ে পড়, তা'হলে এ কথা সত্য জেনে রাখ যে, এই নফস তোমাকে পরিণামে জাহান্নামে পৌঁছিয়ে ছাড়বে। বস্তুতঃ নফস থেকে কোনই কল্যাণের আশা করা যায় না; এই নফসই হচ্ছে সকল অনিষ্টের মূল, সকল আপদ ও লাঞ্ছনার হেতু, অভিশপ্ত ইবলীসের আসল সম্পদ ও হাতিয়ার, সকল অহিতকর কর্মকাণ্ডের শিকড়। আল্লাহ্ ছাড়া এর প্রকৃত রহস্য ও হাকীকত অনুধাবন করা অন্য কারও পক্ষে সম্ভব নয়। অতএব, সদাসর্বদা এক আল্লাহ্'র ভয় অন্তরে জাগরুক করে রাখ। তিনি সর্বজ্ঞ; আমলের ভালমন্দ সবকিছু সম্পর্কে তিনি সম্যক পরিজ্ঞাত। আখেরাতের জীবনকে সুন্দর সফল ও উন্নততর করার জন্য বান্দা যখন স্বীয় অতীত জীবনের কৃতকর্মের প্রতি চিন্তানিবেশ করে, তখন আল্লাহ্ তা'আলা তার অস্তকরণকে স্বচ্ছ–পরিচ্ছন্ন করে দেন। 
হুযুর আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেছেন "এক মুহূর্তকালের ধ্যানমগ্নতা বছরকালের ইবাদত অপেক্ষা উত্তম।" 
হযরত আবুল-লাইস (রহঃ) কর্তৃক বিশ্লেষিত তফসীর থেকে উক্তরূপ ব্যাখ্যা বোধগম্য হয়। সুতরাং প্রকৃত বুদ্ধিমান ও বিচক্ষণ লোকের কর্তব্য হচ্ছে, অতীতের সমুদয় পাপকার্য হতে সঠিক তওবা ও অনুতাপ করা। আখেরাতের জীবনে মুক্তি ও সাফল্যের বিষয়ে অগ্রগামী হওয়া, আল্লাহ্ তা'আলার সান্নিধ্যে অধিকতর নৈকট্যলাভের চিন্তা-সাধনায় মনোনিবেশ করা, অনতিবিলম্বে আল্লাহর যিক্‌রে নিমগ্ন হওয়া, সকল হারাম ও নিষিদ্ধ কার্য পরিত্যাগ করা,  প্রবৃত্তির তাড়নায় ব্যতিব্যস্ত না হয়ে ধৈর্য-সহিষ্ণুতা অবলম্বন করা, নফসানী খাহেশের অনুসরণ চিরতরে পরিহার করা। কেননা, নফস হচ্ছে মূর্তি সদৃশ; সুতরাং যে ব্যক্তি নফসের তাবেদারী করলো, প্রকারান্তরে সে মুর্তি পুঁজায় লিপ্ত হলো। আর যে ব্যক্তি নিষ্ঠা ও ইখলাসের সাথে আল্লাহ্'র ইবাদত-বন্দেগীতে মগ্ন হলো, সত্যিকার অর্থে সে-ই হলো নফসের সাথে কঠোর বিরুদ্ধাচরণকারী ও প্রকৃত সংযমী।
কথিত আছে, বিখ্যাত বুযুর্গ হযরত মালেক ইবনে দীনার (রহঃ) একদা বসরা শহরের একটি বাজার অতিক্রম করে যাচ্ছিলেন, এমন সময় একটি ডুমুর ফলের প্রতি তার দৃষ্টি পতিত হয়। ফলটি দেখে তাঁর অন্তরে তা ভক্ষণ করার স্পৃহা জন্মায়। তখন তিনি স্বীয় পাদুকা খুলে বিক্রেতাকে এর বিনিময়ে ফলটি দিতে অনুরোধ করলেন। কিন্তু ফল বিক্রেতা জুতার মূল্যহীনতার কথা ব্যক্ত করে ফল বিক্রয় করতে অসম্মতি জ্ঞাপন করলো। অতঃপর মালেক ইব্‌নে দীনার আপন পথে রওয়ানা হয়ে গেলেন। এদিকে অপর একজন লোক এসে বিক্রেতাকে বললো আপনি কি জানেন, তিনি কে ? তিনিই মালেক ইবনে দীনার। দেশের সুবিখ্যাত বুযুর্গের নাম শুনে লোকটি অত্যন্ত আক্ষেপ করতে লাগলো এবং কৃতদাসের মাথায় ডুমুর বোঝাই একটি টুকরী দিয়ে বললো, - "যাও, যদি ইবনে দীনার এ সবগুলো ফল গ্রহণ করে নেন, তাহলে তুমি আযাদ গোলামীর শৃংখল থেকে তুমি আজ হতে মুক্ত।" গোলাম ছুটে গেল এবং ইব্‌নে দীনারকে অনুরোধ করতে লাগলো। কিন্তু ইব্‌নে দীনার ফল গ্রহণ করতে অস্বীকার করলেন। গোলাম পুনরায় অনুরোধ করে বললো, - "আপনি যদি এগুলো কবুল করে নেন, তাহলে আমি গোলামীর শৃংখল থেকে মুক্তিলাভ করতে পারি।" ইবনে দীনার (রহঃ) এতদসত্ত্বেও অসম্মতি জানিয়ে বললেন আমার গ্রহণ করাটা যদিও তোমার জন্য মুক্তির কারণ; কিন্তু আমার জন্য তা 'শাস্তির কারণ'। গোলাম অতঃপর বারবার অনুরোধ করলে তিনি বললেন, "আমি কসম খেয়ে নিয়েছি যে, ডুমুরের বিনিময়ে আমি আমার ঈমানকে বিক্রি করবো না এবং ক্বিয়ামত পর্যন্ত কোনদিন ডুমুর খাবো না।" - হযরত মালেক ইব্‌নে দীনার (রহঃ) অস্তিমকালীন অসুস্থতার সময় একবার দুধ ও মধু মিশ্রিত গরম রুটির সরীদ (সুস্বাদু খাদ্য) খাওয়ার আকাংখা প্রকাশ করেছিলেন। খাদেম যথাসময়ে সরীদ এনে হাজির করার পর কিছুক্ষণ তিনি সরীদের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করে তাকিয়ে রইলেন, অতঃপর বললেন, -“হে নফস ! তুমি দীর্ঘ ত্রিশ বৎসর ধরে কৃচ্ছ-সাধনায় ধৈর্যধারণ করে আসছো, এখন এই অস্তিম অবস্থায় যখন তোমার মৃত্যুর মাত্র মুহূর্তকাল বাকী আছে" এতটুকু বলে তিনি সরীদের পাত্র হাত থেকে রেখে দিলেন এবং তৎক্ষণাৎ মৃত্যুবরণ করলেন। বস্তুতঃ আম্বিয়ায়ে কেরাম আলাইহিমুস সালাম, আওলিয়া, সাধক, আল্লাহর প্রেমিক ও দুনিয়াত্যাগী বুযুর্গগণের হৃদয়ের অবস্থাই ছিল এরূপ; তারা পারলৌকিক সুখ-শাস্তির তুলনায় নশ্বর পৃথিবীর সবকিছুকে তুচ্ছাতিতুচ্ছ জ্ঞান করতেন।
হযরত সুলাইমান আলাইহিস সালাম বলেছেন, - “যে ব্যক্তি স্বীয় প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছে, সে দিগ্বিজয়ী সেনাপতির চাইতেও বড় বাহাদুর।"হযরত আলী (র.) বলেন, - "আমার এবং আমার নফসের উপমা হচ্ছে রাখাল ও ছাগলের পালের ন্যায়; একদিক থেকে একত্রিত সুশৃংখল করে আনে, অপরদিকে সব ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত হয়ে যায়।" বস্তুতঃ 'যে নিজের নফসকে হত্যা করতে পেরেছে, আল্লাহ্ তা'আলা তাকে রহমতের কাফন পরিয়ে ইয্যতের মাটিতে দাফন করবেন। আর যে ব্যক্তি নিজের আত্মাকে অকেজো করে রেখেছে, তাকে অভিশাপের কাফন পরানো হবে এবং আযাবের মাটিতে দাফন করা হবে।'
ইয়াহয়া ইব্‌নে মু'আয (রহঃ) বলেন : "ইবাদত ও আধ্যাত্ম্য সাধনার মাধ্যমে স্বীয় প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে জিহাদ কর।" আধ্যাত্ম্য সাধনা হচ্ছে, নিদ্রা ও খাদ্যের পরিমাণ হ্রাস করা, অধিক কষ্ট সহ্য করা, মুসীবতে ধৈর্যধারণ করা, উৎপীড়নে অধৈর্য হয়ে প্রতিশোধ গ্রহণে উদ্যত না হওয়া। 
জেনে রাখ– নিদ্রার স্বল্পতা তোমার অন্তরে নূর সৃষ্টি করবে, তোমার চিন্তাশক্তিতে স্বচ্ছতা আনয়ন করবে। আহারের স্বল্পতা তোমাকে নানাবিধ আপদ থেকে রক্ষা করবে। দুঃখ-কষ্ট ও উৎপীড়নে ধৈর্যধারণ তোমাকে ইন্সীত লক্ষ্যে পৌছাবে। 
পক্ষান্তরে অধিক ভোজন হৃদয়কে কঠিন করে তোলে, অস্তকরণকে অন্ধকারাচ্ছন্ন করে দেয়। বস্তুতঃ ক্ষুধা ও ক্ষুৎপিপাসা মানবহৃদয়ে হিকমত ও তত্ত্বজ্ঞানের তীক্ষ্ণতা আনয়ন করে। আর পরিতৃপ্ত ভোজন মানুষকে আল্লাহ্ থেকে দূরে সরিয়ে নেয়। 
হযরত রাসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেছেনঃ "জঠরজ্বালার মাধ্যমে তুমি তোমার অস্তকরণকে জ্যোতির্ময় করে তোল, ক্ষুধা ও তৃষ্ণার অস্ত্রের দ্বারা তুমি তোমার রিপুর বিরুদ্ধে জিহাদে প্রবৃত্ত হও। ক্ষুধার সাহায্যে তুমি সদা বেহেশতের দরজায় কষাঘাত করতে থাক। কেননা এতে তোমার আমলনামায় জিহাদের সওয়াব লিপিবদ্ধ হবে।" 
বস্তুতঃ ক্ষুধা ও তৃষ্ণার চাইতে অধিক প্রিয় আল্লাহ্'র কাছে আর কিছু নাই। যে ব্যক্তি অধিক ভোজন করেছে, সে আসমানের মালাকুতী জগতে প্রবেশ করতে পারবে না; ইবাদতে আস্বাদ গ্রহণ থেকেও সে বঞ্চিত হবে। 

হযরত আবু বকর (র) বলেছেনঃ "আমি ইসলামে দীক্ষিত হওয়ার পর উদরপূর্তি করে কোনদিন আহার করি নাই। কারণ এতে ইবাদতের স্বাদ থেকে বঞ্চিত হতে হয়। অনুরূপ আমি কোনদিন তৃষ্ণা মিটিয়ে পানিও পান করি নাই। কেননা আমার অন্তরে খোদার দীদারের তীব্র আকাংখা রয়েছে"। এতদ্ব্যতীত অধিক ভোজন ইবাদতকার্যে শৈথিল্য ও স্বল্পতা আনয়ন করে। অতিরিক্ত আহারের কারণে শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ভারী হয়ে যায়, নিদ্রার প্রাদুর্ভাব দেখা দেয় এবং গোটা দেহ অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে। ফলে, মানুষ নিতান্ত নিষ্কর্মা হয়ে যায়।

বস্তুতঃ মানুষ যদি অতিরিক্ত ঘুমে অভিভুত হয়ে জীবন কাটিয়ে দেয়, তাহলে এটা নিজকে মৃতদেহে পরিণত করার নামান্তর।

হযরত লুকমান হাকীম (আ.) স্বীয় পুত্রকে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেছিলেন, - "অধিক মাত্রায় নিদ্রা ও ভোজন থেকে নিজকে বিরত রাখ। কেননা অধিক নিদ্রাযাপনকারী ও অধিক ভোজনকারী ক্বিয়ামতের দিন আমল ও ইবাদতশূন্য হবে।
”হুযূর আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেছেন "অধিক পানাহার করে আত্মাকে নিধন করো না। কেননা অধিক বৃষ্টির কারণে যমীনের ফসল যেমন বিনষ্ট হয়ে যায়,  তেমনি অধিক পানাহারে তোমার আত্মাও মরে যাবে।"
জনৈক বুযুর্গ বিষয়টি একটি উদাহরণ দ্বারা আরও স্পষ্ট করে বুঝিয়েছেন, – ‘মানুষের পাকস্থলী হচ্ছে ডেগচি বা রন্ধনপাত্র সদৃশ, এর উপরে রয়েছে আত্মা। পাকস্থলীরূপ ডেগচি হতে বাষ্প নির্গত হয়ে আত্মা পর্যন্ত পৌঁছে। অধিক ভোজনের ফলে যদি এই বাষ্প অধিক মাত্রায় নির্গত হয়, তা'হলে অবশ্যই তা আত্মাকে কলুষিত করে। বস্তুতঃ অধিক ভোজনে জ্ঞান-বুদ্ধি লোপ পেয়ে যায়, মেধার প্রখরতা বিনষ্ট হয়, স্মরণশক্তি বিলুপ্ত হয়।
একদা হযরত ইয়াহইয়া আলাইহিস সালামের সাথে অভিশপ্ত ইবলীসের দেখা হয়। ইবলীসের হস্তস্থিত একটি বস্তুর প্রতি ইঙ্গিত করে আল্লাহ্'র নবী জিজ্ঞাসা করলেন'এটা কি তোমার হাতে ? ইবলীস বললো,- এটা শাওয়াত বা প্রবৃত্তির তাড়না; এটা দিয়ে আমি বনী আদমকে শিকার করে থাকি। 
হযরত ইয়াহইয়া আলাইহিস সালাম জিজ্ঞাসা করলেন, আমাকে শিকার করার জন্যেও কি তোমার কাছে কিছু আছে? ইবলীস বললো, – 'না; তবে এক রাত্রিতে আপনি পরিতৃপ্ত হয়ে ভোজন করেছিলেন, সেই সুযোগে আমি আপনাকে অবসাদগ্রস্ত করে নামায হতে উদাসীন করে দিয়েছিলাম।' হযরত ইয়াহিয়া আলাইহিস সালাম বললেন : "আজ থেকে আমি আর কোনদিন তৃপ্ত হয়ে আহার করবো না ।" ইবলীস বললো, - তাহলে আমিও আজ থেকে আর কোনদিন বনী আদমকে নসীহত করবো না।

প্রিয় সাধক চিন্তা কর, শুধুমাত্র এক রাত্রির তৃপ্ত আহারের এই পরিণাম ! আর যারা জীবনের একটি রাত্রিও ক্ষুধার্ত অবস্থায় কাটায় নাই, তাদের দ্বারা আল্লাহ্'র কি ইবাদত- হতে পারে ? 
এক রাত্রিতে হযরত ইয়াহিয়া আলাইহিস সালাম তৃপ্ত হয়ে যবের রুটি আহার করেছিলেন। ফলে, সেই রাত্রিতে তিনি আল্লাহর যিকর করতে পারেন নাই। অতঃপর তার নিকট আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহী এসেছে'হে ইয়াহিয়া ! আমার বেহেশতের চাইতেও কি উত্তম কোন আবাসস্থল তুমি পেয়ে গেছ ? আমার সান্নিধ্যের চাইতেও কি উত্তম কোন সাহচর্য তুমি লাভ করেছো? তবে কেন তোমার এই অবসাদ?  আমার ইয্যত ও প্রতাপের কসম, যদি তুমি আমার তৈরী বেহেশতের প্রতি একবার দৃষ্টি কর, আর পরক্ষণে জাহান্নামের প্রতিও এক পলক তাকাও, তাহলে অবশ্যই তুমি রক্তের অশ্রুধারা প্রবাহিত করবে এবং বস্ত্রের পোষাক পরিহার করে লোহার পোষাক পরিধান করবে।" 

পরবর্তী পর্ব

রোগ-শোক ও ধৈর্য-সহ্য


রোগ-শোক ও ধৈর্য-সহ্য
📚মুকাশাফাতুল-কুলুব ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)


আখেরাতের জীবনে আল্লাহ্ তা'আলার আযাব ও গজব হতে যে ব্যক্তি বাঁচতে চায়, আল্লাহ্ তা'আলার রহমত ও অনুগ্রহপ্রাপ্তির যে ব্যক্তি অস্তরে আশা পোষণ করে এবং যে ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করতে আগ্রহী-অনুরাগী, তার কর্তব্য হলো— দুনিয়ার লোভ-লালসা ও প্রবৃত্তির কামনা-বাসনা হতে নিজেকে সংযত করতে হবে, দুঃখ-কষ্ট, রোগ-শোক ও আপদ-বিপদে ধৈর্যধারণ করতে হবে। 
আল্লাহ্ তা'আলা বলেন "আল্লাহ্ তা'আলা ছবরকারীদের ভালবাসেন।"


ছবর বা ধৈর্য চার প্রকারে বিভক্ত।
(১) আল্লাহ কর্তৃক ফরযকৃত ইবাদতসমূহ সমাধা করার ব্যাপারে ছবর করা ।
(২) আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক নিষিদ্ধ কাজ হতে বিরত থাকার ব্যাপারে ছবর করা।
(৩) দুঃখ–দৈন্য ও বিপদ-আপদে ছবর করা।
(৪) কোন মুসীবতে পতিত হওয়ার অব্যবহিত পর প্রথম অন্তর্জালার মুহূর্তেই ছবর করা।


যে ব্যক্তি আল্লাহ্'র ইবাদত ও ফরয কার্য সমাধা করার ব্যাপারে ছবর করবে, ক্বিয়ামাতের দিন আল্লাহ্ তা'আলা তাকে তিনশত গুণ মর্যাদা দান করবেন। প্রত্যেক মর্যাদার মধ্যবর্তী ব্যবধান হবে আসমান ও যমীনের মধ্যবর্তী দূরত্বের সমান। অনুরূপ, যে ব্যক্তি নিষিদ্ধ কাজ হতে বিরত থাকার ব্যাপারে ধৈর্যধারণ করবে, তাকে আল্লাহ্ তা'আলা ক্বিয়ামতের দিন ছয়শত গুণ মর্যাদা দান করবেন। প্রত্যেক মর্যাদার মধ্যবর্তী ব্যবধান হবে সপ্তম আসমান ও যমীনের মধ্যবর্তী দূরত্বের সমান। এমনিভাবে যে ব্যক্তি মুসীবতে ধৈর্যধারণ করবে, ক্বিয়ামতের দিন আল্লাহ্ তা'আলা তাকে সাতশত গুণ মর্যাদা দান করবেন। প্রত্যেক মর্যাদার মধ্যবর্তী দূরত্ব হবে আরশ থেকে ভূগর্ভের (যমীনের সর্বনিম্ন সপ্তম তবকের) নীচ পর্যন্ত দূরত্বের সমান।


হুযুর আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেছেন "আল্লাহ্ পাক বলেন,- কোন বান্দা মুসীবতে পতিত হওয়ার পর যদি একমাত্র আমারই উপর ভরসা করে এবং আমার প্রতি আনুগত্য সহকারে দৃঢ় পদ থাকে, তাহলে আমার কাছে প্রার্থনা করার পূর্বেই আমি তার মনোবাঞ্ছা পুরণ করি। পক্ষান্তরে যদি সে আমাকে উপেক্ষা করে কোন মাখলুকের নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করে, তাহলে আমি তার জন্য আসমানের দরজা (সাহায্য) বন্ধ করে দিই।"


অতএব, সত্যিকার জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তার পরিচয় হলো— আপদ-বিপদে, দুঃখ-দৈন্যে ধৈর্যধারণ করা; এ ব্যাপারে কোনরূপ অভিযোগ উত্থাপন না করা। তাহলেই দুনিয়া ও আখেরাতের কঠিন শাস্তি থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া সম্ভব হবে। প্রণিধানযোগ্য যে, আম্বিয়া কেরাম ও আউলিয়া-বুযুর্গানকে সর্বাধিক দুঃখ-কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে।


হযরত জুনাইদ বাগদাদী (রহঃ) বলেন : 'দুঃখ-দৈন্য ও আপদ-বিপদ হচ্ছে খোদা প্রেমিকের জন্য মশালস্বরূপ, ধর্মপথে বিচরণকারীর জন্য চেতনাবর্দ্ধক, মুমিনের জন্য সংশোধনকারী এবং উদাসীন ও গাফেলের জন্য ধ্বংসের উপকরণ।" 


বস্তুতঃ ঈমানের প্রকৃত স্বাদ উপলব্ধি করতে হলে আপদে-বিপদে ধৈর্যধারণ করতে হবে; আল্লাহ্ তা'আলার প্রতি সর্বান্তকরণে সন্তুষ্টির পরিচয় দিতে হবে। হুযুর আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেন- "যে ব্যক্তি অসুস্থ অবস্থায় ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার সাথে একটি রাত্র অতিবাহিত করবে, আল্লাহ্ তা'আলা তাকে সদ্যপ্রসুত শিশুর ন্যায় নিষ্পাপ করে দিবেন। সুতরাং রোগাক্রান্ত হলেই রোগমুক্তির জন্য ব্যতিব্যস্ত হয়ে যেয়ো না।


"হযরত যাহ্হাক (র.) বলেন : "অন্ততঃ চল্লিশ দিনে একবার আপদ বিপদ বা দুঃখ-কষ্টে পতিত না হলে কি করে তুমি আল্লাহ্'র কাছে দয়া ও রহমতের আশা করতে পার ?”
হযরত মু'আয ইবনে জাবাল (র.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন : ‘আল্লাহ্ তা'আলা যখন কোন বান্দাকে রোগাক্রান্ত করেন, তখন বাম কাঁধের ফেরেশতাদেরকে তার পাপরাশি লিপিবদ্ধ করতে নিষেধ করে দেন এবং ডান কাধের ফেরেশতাদেরকে এই মর্মে নির্দেশ প্রদান করেন যে, এই অসুস্থ ব্যক্তি সুস্থ অবস্থায় যেসব ইবাদত ও নেক আমল করতে সক্ষম ছিল, তার আমলনামায় সেগুলোর সওয়াব লিপিবদ্ধ করতে থাক।


”হযরত নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেছেন : "যখন কোন বান্দা অসুস্থ হয়, তখন আল্লাহ্ তা'আলা তার নিকট দুইজন ফেরেশতা প্রেরণ করেন এবং তাদেরকে এই মর্মে নির্দেশ প্রদান করেন যে, আমার এই বান্দা কি আমল করে, তা তোমরা লক্ষ্য কর। অসুস্থ বান্দা যদি আল্লাহ্ তা'আলার প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তাহলে ফেরেশ্তাগণ বান্দার এই গুণকীর্তন আল্লাহ্'র দরবারে পেশ করে। অতঃপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেন- উক্ত বান্দার আমার উপর হক ও প্রাপ্য সাব্যস্ত হয়ে গেছে; সুতরাং আমি যদি এই পীড়িতাবস্থায় তাকে মৃত্যু দান করি, তা'হলে অবশ্যই তাকে জান্নাত দিবো। আর যদি রোগ হতে মুক্তি দান করি, তাহলে তার স্বাস্থ্য, শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, মাংসপেশী ও রক্ত প্রবাহ পুর্বের চাইতে আরও উন্নততর করে দিবো এবং সেইসঙ্গে তার সমুদয় গুণাহ্ মাফ করে দিবো।"
বনী ইসরাঈল গোত্রে জনৈক ভবঘুরে ও লম্পট লোক ছিল। বিভিন্ন ধরনের গর্হিত কাজে সে লিপ্ত থাকতো। নগরবাসীর বহু চেষ্টাও তার কোন প্রকার সংশোধন করতে পারে নাই। অবশেষে অতিষ্ঠ হয়ে সকলেই আল্লাহ্'র দরবারে তার কদর্যতা হতে মুক্তি পাওয়ার জন্য কায়মনোবাক্যে মুনাজাত করলো। অতঃপর আল্লাহ্ তা'আলা তাদের দো'আ কবুল করে হযরত মূসা আলাইহিস সালামের নিকট ওহী পাঠালেন' "হে মুসা ! বনী ইসরাঈল গোত্রে একজন ভণ্ড যুবক আছে, তাকে শহর হতে বহিষ্কার করে দাও, যাতে শুধুমাত্র এক ব্যক্তির পাপের কারণে সমগ্র নগরবাসীর উপর আমার গযব নাযিল না হয়।" 
হযরত মুসা আলাইহিস সালাম আল্লাহ্'র নির্দেশ অনুযায়ী তাকে বহিষ্কার করে দিলেন। কিন্তু সেই যুবক শহর হতে বহিষ্কৃত হয়ে পার্শ্ববর্তী অপর এক বস্তিতে আশ্রয় গ্রহণ করে। আল্লাহ্ তা'আলা হযরত মূসা আলাইহিস সালামের নিকট পুনরায় ওহী পাঠিয়ে তাকে সেখান থেকেও বহিষ্কার করার নির্দেশ দিলেন। হযরত মুসা (আ.) তাই করলেন। অবশেষে লোকটি এক নির্জন প্রান্তরে গিয়ে আশ্রয় নিলো। যেখানে মানুষ বা পশুপক্ষী এমনকি তরুলতা বলতে কিছুই ছিল না।  


পরবর্তী এক পর্যায়ে লোকটি সেখানে মারাত্মকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে। এহেন অসহায় অবস্থায় তার পার্শ্বে সাহায্যকারী বলতে কেউ ছিল না। এই করুণ অবস্থায় সে ভুলুণ্ঠিত হয়ে মাটির উপর মাথা রেখে বারবার বলছিল 'হায় ! আজকে যদি আমার মা আমার কাছে থাকতেন, তাহলে তিনি আমার দুঃখে দুঃখিতা হতেন, আমার সেবা-শুশ্রুষা করতেন, মায়া-মহব্বত করতেন, আমার জন্য নয়ন সিক্ত করে রোদন করতেন। হায় ! আজকে যদি আমার পিতা কাছে থাকতেন, তাহলে তিনি আমার সাহায্য-সহযোগিতা করতেন। হায় ! যদি আমার স্ত্রী পার্শ্বে থাকতো, তাহলে সে আমার দুঃখে ক্রন্দন করতো। হায় ! যদি আমার সন্তান-সন্ততি এখানে থাকতো, তাহলে তারা আমার মৃতদেহের পার্শ্বে বসে কান্নাকাটি করতো আর বলতো,


– হে আল্লাহ্ ! আমাদের প্রবাসী পিতাকে তুমি ক্ষমা করে দাও, তিনি অসহায় দুর্বল, তোমার না-ফরমান, অবাধ্য ও স্বেচ্ছাচারী; লোকেরা তাকে শহর থেকে বস্তিতে বের করে দিয়েছে, পুনরায় তাকে বস্তি থেকে বিজন প্রান্তরে বহিষ্কার করেছে; আর আজকে তিনি ইহকালের এই বিজন ভূমি থেকে পরকালের পথে চিরবিদায় গ্রহণ করছেন, সবকিছু থেকে তিনি নিরাশ ও বঞ্চিত হয়ে একমাত্র আপনার পানে রওয়ানা হচ্ছেন। আয় আল্লাহ ! আপনি আমাকে আমার পিতা-মাতা, সপ্তান-সন্ততি ও স্ত্রী থেকে সুদূর প্রান্তরে নিক্ষেপ করেছেন, জীবনের এই করুণ মুহূর্তে দয়া করে আমাকে আপনার রহমত ও করুণা থেকে চিরবঞ্চিত করবেন না। তাদের বিচ্ছেদে আপনি আমার অন্তর দগ্ধীভূত করেছেন, মেহেরবানী করে আমার পাপরাশির কারণে আমাকে দোযখের অগ্নিতে দগ্ধীভূত করবেন না।'
লোকটির এই করুণ আর্তনাদ আল্লাহ্'র দরবারে কবুল হলো। তার স্ত্রী ও মা'র আকৃতি দিয়ে দু'জন হুর, সন্তান-সন্ততির আকৃতি দিয়ে জান্নাতের কয়েকজন শিশু-কিশোর এবং পিতার আকৃতি দিয়ে একজন ফেরেশতা পাঠিয়ে দিলেন। তারা সকলেই লোকটির পার্শ্বে বসে ক্রন্দন করতে লাগলো। এভাবে সকলের উপস্থিতিতে সে আনন্দচিত্তে আল্লাহর সাথে মিলিত হয় এবং আল্লাহ্ পাক তার সমস্ত গুনাহ্ মাফ করে দেন। এভাবে সম্পূর্ণ পবিত্র হয়ে সে দুনিয়া থেকে বিদায় নেয়।


অতঃপর আল্লাহ্ তা'আলা হযরত মুসা (আ.) -এর নিকট ওহী পাঠালেন'হে মূসা ! তুমি অমুক বিজন প্রান্তরে গিয়ে দেখ, আমার এক প্রিয় বান্দার ইনতিকাল হয়েছে, তুমি তার কাফন-দাফনের ব্যবস্থা কর। আল্লাহ্'র হুকুম অনুসারে হযরত মূসা আলাইহিস সালাম তথায় গিয়ে সে যুবকটিকেই দেখলেন, যাকে তিনি ইতিপূর্বে আল্লাহ্'র হুকুমে শহর থেকে বস্তিতে আবার বস্তি থেকে বিজন ভূমিতে বিতাড়িত করেছিলেন। তিনি আরও দেখলেন যে, লোকটির আশেপাশে বেহেশতের হুর-পরীগণ তাকে বেষ্টন করে বসে আছে। এতদ্দর্শনে হযরত মূসা (আ.) আল্লাহ্'র নিকট আরয করলেন "হে মহান প্রভু ! এই লোকটি তো সে-ই যাকে আমি আপনার হুকুমে শহর ও বস্তি থেকে বহিষ্কার করেছি।" 


আল্লাহ্ তা'আলা বললেন, "হে মুসা ! আমি তার প্রতি দয়া ও রহমত নাযিল করেছি এবং তার যাবতীয় পাপকার্য ক্ষমা করে দিয়েছি। কারণ, সে এই বিজন প্রান্তরে স্বীয় জন্মভূমি, পিতা-মাতা, সন্তান-সন্ততি ও পরিবার-পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অসহায় অবস্থায় কান্নাকাটি করেছে। আমি তার মা'র দেহাবয়বে বেহেশতের হুর, তার পিতার সাদৃশ্যে বেহেশতের ফেরেশতা এবং তার স্ত্রীর আকৃতিতে অপর একজন হুর পাঠিয়ে দিয়েছি। এরা সকলেই আমার কাছে তার এই দুঃখ-যাতনায় ভরপুর মুসাফেরী অবস্থার প্রতি রহম ও করুণার জন্য প্রার্থনা করেছে। একজন আশ্রয়হীন মুসাফির যখন মারা যায়, তখন আসমান ও যমীনের সমগ্র মখলুক তার প্রতি দয়া ও রহমত বর্ষণের জন্য আল্লাহ্'র কাছে প্রার্থনা করতে থাকে; সুতরাং এ অবস্থায় আমি কি তার প্রতি দয়া ও করুণা প্রদর্শন করবো না ? অথচ আমিই একমাত্র অনস্ত মেহেরবান ও অসীম দয়ালু।"


কোন মুসাফির যখন অস্তিম সময়ে উপনীত হয়, তখন আল্লাহ্ তা'আলা বলেন : "ওহে আমার ফেরেশতাগণ। লোকটি স্বদেশত্যাগী মুসাফির, স্বীয় পরিবার-পরিজন, সন্তান-সন্ততি, পিতা-মাতা ও আত্মীয়-স্বজন থেকে বহুদুরে অবস্থানরত ৷ মৃত্যুর পর তার জন্য ক্রন্দনকারী অথবা শোক বা দুঃখ প্রকাশকারী কেউ নাই।" একথা বলে আল্লাহ্ তা'আলা তার পিতা-মাতা, সন্তান-সন্ততি ও আত্মীয়-স্বজনের আকৃতি ও দেহাবয়বে কয়েকজন ফেরেশতা পাঠিয়ে দেন। তারা সেই মুসাফির ব্যক্তির শিয়রপার্শ্বে উপবেশন করলে, সে চক্ষু উম্মিলন করে তাদেরকে প্রত্যক্ষ করে এবং অপার্থিব আনন্দ উপভোগ করে। অতঃপর এই উৎফুল্ল অবস্থাতেই সে ইহজগত ত্যাগ করে। তারপর যখন এ ব্যক্তির জানাযা উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন ফেরেশতাগণও তার সঙ্গে থাকেন এবং ক্বিয়ামত পর্যন্ত সেই ব্যক্তির কবরের পার্শ্ব বসে তার মাগফেরাত ও উচ্চ মর্যাদার জন্য আল্লাহর দরবারে মুনাজাত করতে থাকেন। আল্লাহ্ পাক ইরশাদ করেন : "আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর বান্দাদের প্রতি দয়ালু।” ( শূরা : ১৯ ) 


হযরত ইব্‌নে আত্তার (রহঃ) বলেন : 'তুমি যদি কোন বান্দার অস্তকরণের সত্যাসত্য ও প্রকৃত অবস্থা যাচাই করতে চাও, তাহলে তার সুখ-স্বাচ্ছন্দ ও দুঃখ-কষ্ট উভয় অবস্থার কার্যকলাপের প্রতি লক্ষ্য কর। যদি সে কেবল সুখ-স্বাচ্ছন্দের সময়েই আল্লাহর শোকর আদায় করে, অথচ দুঃখ-কষ্টের সময় হা-হুতাশ করে, তাহলে বুঝতে হবে সে মিথ্যুক ও প্রতারক। 


বস্তুতঃ কোন ব্যক্তি যদি সমগ্র জ্বিন ও মানবের সাকুল্য জ্ঞানের অধিকারী হয়, অতঃপর কোন দুর্ভোগে পতিত হওয়ার পর কোনরূপ শেকায়াত বা অভিযোগ উত্থাপন করে, তাহলে এ কথা নিশ্চিত যে, তার সমস্ত ইলম ও জ্ঞানচর্চা সম্পূর্ণ বৃথা এবং সমগ্র আমল ও ইবাদত একেবারে নিষ্ফল।
হাদীসে কুদসীতে আছে, আল্লাহ্ পাক বলেন "যে ব্যক্তি আমার (নির্ধারিত) তাকদীরের প্রতি অসন্তুষ্ট এবং আমার দান ও নে‘আমতে অকৃতজ্ঞ, সে যেন আমাকে ছাড়া অন্য কোন রব তালাশ করে নেয়।”
হযরত ওয়াহ্ব ইব্‌নে মুনাব্বিহ (রহঃ) বলেন : "একজন নবী দীর্ঘ পঞ্চাশ বৎসরকাল আল্লাহ্ তা'আলার ইবাদতে মগ্ন ছিলেন। 


আল্লাহ্ আলা ওহীর মাধ্যমে জানালেন যে, "আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিয়েছি।" 
নবী বললেন : "ইয়া আল্লাহ্ ! আপনি আমার কোন্ বিষয় ক্ষমা করলেন; আমি তো জীবনে কোন গুনাহ্-ই করি নাই"। 


অতঃপর আল্লাহ্ তা'আলা নবীর একটি শিরাকে আদেশ করলেন। ফলে, সেই শিরাতে অসহনীয় বিষ-বেদনা আরস্ত হয়ে গেল এবং বিষম যন্ত্রণায় নবী সারারাত্রি ঘুমাতে পারলেন না। সকাল বেলা আল্লাহ্ তা'আলা ফেরেশতা পাঠালেন। 
ফেরেশতা বললেন : "আপনার মহান প্রভু আল্লাহ্ তা'আলা বলেছেন, — "তোমার দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের ইবাদত আমার দেওয়া একটা সামান্য সুস্থ শিরা'র নে‘আমতের সমান নয়।"


পরবর্তী পর্ব
আধ্যাত্মিক সাধনা ও রিপুর তাড়না
x

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...