মঙ্গলবার, ৮ এপ্রিল, ২০২৫

আত্মদর্শন (১) আত্মদর্শনের উদ্দেশ্য ও স্বরূপ




আত্মদর্শন পর্ব - ১
📚কিমিয়ায়ে সাদাত ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)

আত্মদর্শনের উদ্দেশ্য  ও স্বরূপ —
আত্মজ্ঞানই আল্লাহ্-জ্ঞানের কুঞ্জী এই জন্যই বুযুর্ঘগণ বলেন : "যিনি নিজেকে চিনিয়াছেন তিনি আল্লাহ্-কে চিনিয়াছেন।

আল্লাহ্ তা'আলা-ও এই কারণেই বলেন : "শীঘ্রই আমি তাহাদিগকে স্বীয় নিদর্শনসমুহ পৃথিবীতে ও তাহাদের নিজের মধ্যে দেখাইয়া দিব। যতক্ষন না তাহাদের জন্য প্রকাশিত হইবে যে, নিশ্চয় ইহা সত্য।"-(সুরা হামীম আস্-সাজদা, রুকু ৬, পাড়া ২৪)

আত্মদর্শনের স্বরূপ—
জগতে তোমার নিজ দেহ যেমন তোমার নিকটবর্তী অন্য কোন বস্তু তোমার তত নিকটবর্তী নহে। ইহাতেও যদি তুমি নিজেকে চিনিতে না পার তবে অন্য বস্তু কিরূপে চিনিতে পারিবে ? তুমি যদি বল, "আমি আমাকে বেশ চিনি", তবে ইহা ভুল। কারণ এরূপ আত্মজ্ঞান আল্লাহর কুঞ্জি হইতে পারেনা। এরূপ জ্ঞান পশুদেরও আছে। তুমি যেমন তোমার বাহ্য হস্ত, পদ, মুখ, মস্তক ও মাংসপেশীর অধিক আর কিছুই চিন না এবং তোমার অভ্যন্তরীণ বিষয়ের মধ্যে শুধু এতটুকু বুঝিতে পার যে, ক্ষুধা পাইলে আহার কর, কামভাব প্রবল হইলে স্ত্রী সহবাস কর, পশুগণও ঠিক তদ্রূপই করিয়া থাকে। তোমার হাকীকত জানা তোমার উচিৎ। তুমি কি ? কোথায় যাইবে দুনিয়াতে কেন আসিলে ? তোমাকে কি জন্য সৃষ্টি করা হইয়াছে ? তোমার সৌভাগ্য কি এবং কিসে ইহা নিহিত রহিয়াছে ? তোমার দুর্ভাগ্য কি এবং কিসে ইহা লুক্কায়িত আছে ? তোমার মধ্যে যে সমস্ত গুণ আছে তন্মধ্যে কতগুলি গুন চতুষ্পদ জন্তুর, কতগুলি হিংস্র প্রাণীর, কতগুলি শয়তানের, আর কতগুলি ফেরেশতার । এই সকল গুণের মধ্যে কোনগুলি এবং কি কি তোমার আসল ও স্বাভাবিক অবস্থায় অনুরূপ ? আর কোনগুলি অন্য কারণে উৎপন্ন এবং এইগুলি কোন ধরণের ? যতদিন তুমি এই সকল বিষয় না জানিবে ততদিন তুমি স্বীয় সৌভাগ্য লাভ করিতে পারিবে না । ঐ সকলের প্রত্যেকেরই জীবিকা ও উন্নতি পৃথক পৃথক । 


পাশব ও ফেরেশতা প্রকৃতি 

শনিবার, ১৫ মার্চ, ২০২৫

এখলাস (৭) মিশ্র আমলের সওয়াব



এখলাস (পর্ব – ৭)

📚এহইয়া উলুমিদ্দিন  ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)


মিশ্র আমলের সওয়াব —

আমল যখন আল্লাহ তা'আলার জন্যে খালেস হয় না এবং তাতে রিয়া ইত্যাদি আপদের মিশ্রণ থাকে, তখন সে আমল সম্পর্কে মতভেদ রয়েছে। এরূপ মিশ্র আমল দ্বারা সওয়াব পাওয়া যাবে, না শাস্তি, না কোন কিছুই হবে না?— এ সম্পর্কে নানা জন নানা মত প্রকাশ করেছেন। 

বলা বাহুল্য, যে আমলের উদ্দেশ্য কেবল রিয়া হবে, তা তো আযাব ও গযবের কারণ হবেই এবং যা বিশেষভাবে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে হবে, তা সওয়াবের কারণ হবে। মতভেদ কেবল মিশ্র আমল সম্পর্কে। বাহ্যিক হাদীস দ্বারা জানা যায় যে, এতে সওয়াব পাওয়া যাবে না। তবে এ সম্পর্কে বিভিন্নরূপ রেওয়ায়েতও রয়েছে। আমাদের মতে উদ্দেশ্যের শক্তি ও প্রাবল্যের নিরিখে বিচার হওয়া উচিত। যদি দ্বীনী উদ্দেশ্য ও জৈবিক উদ্দেশ্য সমান সমান হয়, তবে এরূপ আমল সওয়াব ও আযাব এতদুভয়ের মধ্যে কোনটিরই কারণ হবে না। আর রিয়ার উদ্দেশ্য প্রবল হলে তা আযাবেরই কারণ হবে। তবে এই আযাব শুধু রিয়ার উদ্দেশ্যে করা আমলের আযাব অপেক্ষা হালকা হবে। আর যদি নৈকট্যের নিয়ত প্রবল হয়, তবে যে পরিমাণ প্রবল হবে, সে পরিমাণ সওয়াব হবে। এর কারণ আল্লাহ তা'আলার এই উক্তি– “যে অণু পরিমাণ সৎকর্ম করবে, সে তা দেখতে পাবে এবং যে অণু পরিমাণ অসৎকর্ম করবে, সে তাও দেখতে পাবে।” 

আরও এরশাদ হয়েছে,– “নিশ্চয় আল্লাহ অণু পরিমাণও যুলুম করবেন না। পুণ্য কাজ হলে তিনি তা দ্বিগুণ করে দেবেন।”


এসব আয়াত থেকে বুঝা যায়, সৎকর্মের ইচ্ছা পণ্ড হবে না। যদি সৎ কর্মের ইচ্ছা রিয়ার ইচ্ছা অপেক্ষা প্রবল হয়, তবে রিয়ার ইচ্ছার সমান তা পণ্ড হবে এবং বাড়তিটুকু অবশিষ্ট থাকবে। আর যদি সৎ কর্মের ইচ্ছা কম এবং রিয়ার ইচ্ছা বেশী হয়, তবে শুধু রিয়ার ইচ্ছার কারণে যতটুকু আযাব হত, তা থেকে সৎকর্মের ইচ্ছা পরিমাণ আযাব কমে যাবে। সুতরাং যদি কেউ এমন সৎকর্ম করে, যা দ্বারা উদাহরণ স্বরূপ এক ফুট নৈকট্য অর্জিত হয় এবং তাঁর সাথে এমন অসৎকর্ম করে, যা দ্বারা উদাহরণ স্বরূপ এক ফুট দূরত্ব অর্জিত হয়, তবে এই ব্যক্তি পূর্বে যে অবস্থায় ছিল, তাতেই থেকে যাবে। না সওয়াব হবে, না আযাব। হাদীস শরীফে আছে- অসৎ কর্মের পেছনে সৎকর্ম কর। এই সৎকর্ম অসৎ কর্মকে মিটিয়ে দেবে।

সুতরাং নির্ভেজাল রিয়াকে নির্ভেজাল এখলাস মিটিয়ে দেয়। যদি কারও মধ্যে উভয়টি একত্রিত হয়, তবে একটি অপরটির বিপরীত ক্রিয়া করবে। এ বিষয়ে উম্মতের এজমা তথা ঐকমত্য রয়েছে যে, যে ব্যক্তি হজ্জে রওয়ানা হয় এবং তার সাথে পণ্য সামগ্রীও থাকে, তার হজ্জ জায়েয হবে এবং সে হজ্জের সওয়াব পাবে।

অবশ্য আয়াত ও হাদীস থেকে জানা যায় রিয়ার সংমিশ্রণ সওয়াবকে বরবাদ করে দেয়। হজ্জের সফরে ব্যবসায়ের ইচ্ছা করাও অনুরূপ একটি সংমিশ্রণ। তাউস এবং আরও কয়েকজন তাবেঈ রেওয়ায়েত করেন যে, এক ব্যক্তি রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-কে প্রশ্ন করল : এক ব্যক্তি দান-খয়রাত করে এবং তাতে পছন্দ করে যে, মানুষ তার প্রশংসা করুক এবং সওয়াবও হোক। রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এ প্রশ্নের কোন উত্তর দিলেন না। অবশেষে এই আয়াত অবতীর্ণ হল : “যে ব্যক্তি তার পালনকর্তার সাথে সাক্ষাতের আশা করে, সে যেন সৎকর্ম সম্পাদন করে এবং নিজের পালনকর্তার এবাদতে কাউকে অংশীদার না করে।”


হযরত মুয়ায (রা.) বলেন: রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) রিয়াকে নিম্নতম শিরক বলেছেন। হযরত আবু হোরায়রার (রা.) রেওয়ায়েতে রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : “যে ব্যক্তি তার আমলে শিরক করবে, তাকে বলা হবে তুমি তোমার প্রতিদান তার কাছ থেকে গ্রহণ কর, যার জন্যে তুমি আমল করেছিলে।” 

হযরত আবু মূসা (রা.) বর্ণনা করেন, জনৈক বেদুঈন রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর খেদমতে আরয করল : ইয়া রসূলাল্লাহ ! এক ব্যক্তি আত্মমর্যাদার জন্যে যুদ্ধ করে, অন্যজন বীরত্বের খাতিরে যুদ্ধে নামে এবং তৃতীয় জন আল্লাহর কাছে নিজের মর্যাদা জানার জন্যে লড়াই করে। তাদের মধ্যে কে আল্লাহর পথে লড়াই করে? তিনি জওয়াবে বললেন : “যে ব্যক্তি আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যুদ্ধ করে, সে-ই আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে।”


আমরা বলি, উপরোক্ত আয়াত ও হাদীসসমূহ আমাদের উল্লিখিত বক্তব্যের পরিপন্থী নয়। কেননা, এগুলোতে সে ব্যক্তিকেই বুঝানো হয়েছে, যে দুনিয়ার জন্যেই আমল করে এবং দুনিয়ার অন্বেষণই তার নিয়তে প্রবল থাকে। দ্বীনী আমলের বিনিময়ে দুনিয়া তলব করা হারাম। কেননা, এতে এবাদত স্বস্থান থেকে পরিবর্তিত হয়ে যায়। মিশ্র আমল বলতে আমাদের উদ্দেশ্য এমন আমল, যাতে উভয় নিয়ত সমান সমান থাকে। এরূপ আমলে সওয়াব ও আযাব কিছুই হয় না। সুতরাং এরূপ আমল দ্বারা সওয়াবের আশা করা উচিত নয়।


মোটকথা, এখলাসে আপদ অনেক। কিন্তু তা সত্ত্বেও আপদের কারণে আমল ত্যাগ করা উচিত নয়। আমাদের উপরোক্ত বর্ণনার উদ্দেশ্য আসলে এখলাসকে ত্যাগ না করা। যদি আমলই না করা হয়, তবে আমল ও এখলাস উভয়টি বর্জিত হয়ে যাবে। বর্ণিত আছে, জনৈক ফকীর হযরত আবু সাঈদ হেরাযের খেদমত করত এবং তাকে কাজকর্মে সাহায্য করত। একদিন তিনি ফকীরকে কাজকর্মে এখলাস অবলম্বন করতে বললেন। ফকীর প্রত্যেক কাজের সময় অন্তরের অবস্থা দেখতে লাগল। এখলাস অর্জনে অক্ষম হয়ে অবশেষে সে কাজকর্মই বন্ধ করে দিল। এতে হযরত আবু সাঈদ কষ্টে পড়ে গেলেন। কারণ, তার কাজকর্মে সাহায্যকারী কেউ ছিল না। তিনি ফকীরকে জিজ্ঞেস করলেন : তুমি এখন কাজ কর না কেন? ফকীর বলল : আপনার এরশাদ অনুযায়ী এখলাস অবলম্বনে ব্যর্থ হয়ে কাজ ছেড়ে দিয়েছি। তিনি বললেন : এরূপ করো না। এখলাস আমলকে ছিন্ন করে ন । আমল করে যাও এবং এখলাস অর্জনের চেষ্টা করতে থাক। আমি তোমাকে আমল ছেড়ে দিতে বলিনি। বরং আমলকে খাঁটি করতে বলেছি।


(সমাপ্ত)

(এহইয়াউ উলুমিদ্দীন পঞ্চম খণ্ড)

এখলাস (৬) এখলাসের স্থর সমূহ



এখলাস (পর্ব – ৬)

📚এহইয়া উলুমিদ্দিন  ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)

এখলাসের স্থর সমূহ —

যে সব বিষয় এখলাসকে কলুষিত ও দূষিত করে, সেগুলোর মধ্যে কতক সুস্পষ্ট ও কতক অস্পষ্ট। সুস্পষ্ট বিষয়সমূহের মধ্যে প্রধান হচ্ছে ‘রিয়া’। 

—উদাহরণতঃ যখন কেউ নামাযে এখলাস করে, তখন যদি কিছু লোক তাকে দেখে অথবা কাছে আসে, তখন শয়তান তাকে বলে নামায উত্তমরূপে পড় যাতে দর্শকরা তোমাকে সম্মানের দৃষ্টিতে দেখে এবং সাধু মনে করে। নামাযী একথা মেনে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে বিনয় প্রকাশ করে এবং রুকু-সেজদা উত্তমরূপে আদায় করে। প্রথম স্তরের এই রিয়া প্রাথমিক পর্যায়ের নামাযীদের কাছেও গোপন থাকে না। 


—রিয়ার দ্বিতীয় স্তর এই যে, নামাযী এই আপদটি আঁচ করে নেয় এবং এ থেকে আত্মরক্ষা করে। অর্থাৎ, শয়তানের আনুগত্য করে না এবং সেদিকে ভূক্ষেপও করে না; বরং পূর্বে যেভাবে পড়ত, সেভাবেই পড়তে থাকে। তখন শয়তান তার কাছে কল্যাণের বাহানায় আসে এবং বলে : তুমি তো অনুসৃত, পুরোহিত ও নামযাদা ব্যক্তি। তুমি যা করবে, তাতে অন্যরা তোমার অনুসরণ করবে। ফলে, তাদের আমলের সওয়াব তুমিও পাবে যদি তুমি ভালরূপে আমল কর। পক্ষান্তরে তুমি খারাপ আমল করলে অন্যদের খারাপ আমলের কুফল তোমার উপরও বর্তাবে। যারা প্রথম স্তরের ধোকার জালে আবদ্ধ হয় না, তারা কখনও এই দ্বিতীয় স্তরের অপেক্ষাকৃত সূক্ষ্ম জালে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। কিন্তু এটাও রিয়া এবং এর কারণেও এখলাস বরবাদ হয়ে যায়। কেননা, যদি বাস্তবিকই নামাযে খুশু তার কাছে উত্তম হয় যে, অন্যের কারণে তা ত্যাগ করে না, তবে একাকী নামায পড়ার সময় নিজেকে খুশুতে অভ্যস্ত করে না কেন? সত্যিকার সাধু সে ব্যক্তি, যার অন্তর উজ্জ্বল এবং তার ঔজ্জ্বল্য অন্যের উপর প্রতিফলিত হয়। একথা ঠিক যে, কেউ তার অনুসরণ করলে অনুসরণকারী সওয়াবের অধিকারী হবে। কিন্তু এই অনুসৃত ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসা করা হবে, যে বিষয় তোমার মধ্যে ছিল না, তা প্রকাশ করলে কেন?


—তৃতীয় স্তর দ্বিতীয় স্তরের চেয়েও অধিক সূক্ষ্ম। তা এই যে, বান্দা নিজের নফসের পরীক্ষা নেবে এবং শয়তানের চক্রান্ত সম্পর্কে অবগত হয়ে জেনে নেবে যে, নির্জনে এক অবস্থ হওয়া এবং জনসমক্ষে অন্য অবস্থা হওয়া নিছক রিয়া। এখানে এখলাস হল, নামায একাকীত্বেও তেমনি হওয়া, যেমন জনসমাবেশে হয়। কেউ যদি মানুষের দেখা অবস্থায় অভ্যাস অনুযায়ী নামাযে অধিক খুশু করে এবং একদিকে দৃষ্টি রেখে একাকীত্বেও নিজ নফসের প্রতি মনোনিবেশ করে অধিক খুশু করে, তবে তাও সূক্ষ্ম ও গোপন রিয়া। কেননা, সে নির্জনে এই নিয়তে উত্তমরূপে নামায পড়ে যে, জনসমাবেশেও যেন উত্তমরূপে নামায আদায় হয়। অতএব, নির্জনে ও জনসমাবেশে উভয় জায়গায় তার লক্ষ্য রইল মানুষের প্রতি। এখানে এখলাস এভাবে হত যে, চতুষ্পদ জন্তুর দেখা ও মানুষের দেখা উভয়টি নামাযীর দৃষ্টিতে সমান হওয়া উচিত। এক্ষেত্রে নামাযী ধারণা করে নির্জনে ও জনসমাবেশে একই রূপে নামায পড়লে সে রিয়া থেকে মুক্ত হয়ে যাবে তা ঠিক নয়। রিয়া থেকে মুক্ত হওয়ার উপায় হল মানুষের প্রতি দৃষ্টি তেমনি থাকা, যেমন জড় পদার্থের প্রতি দৃষ্টি হয় - নির্জনে হোক অথবা জনসমাবেশ।


—চতুর্থ স্তর যা চূড়ান্ত পর্যায়ের গোপন তা হল এই যে, এক ব্যক্তি শয়তানের ধোকা জেনে ফেলেছে। ফলে, তার নামায পড়া মানুষে দেখলেও শয়তান একথা বলতে পারে না যে, তুমি দর্শকদের খাতিরে খুশু কর। ফলে, শয়তান তার কাছে এসে বলে : আল্লাহ তা'আলার মাহাত্ম্য ও প্রতাপ সম্পর্কে চিন্তাভাবনা কর, যার সামনে তুমি দাঁড়িয়ে আছ। আল্লাহ তোমার অন্তরকে তাঁর দিক থেকে গাফেল দেখুক— এ বিষয়ে লজ্জাবোধ কর। নামাযীর মনে এ ধারণা আসার সাথে সাথে তার অন্তর হাযির হয় এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ খুশু করতে শুরু করে। নামাযী মনে করে, এটাই এখলাস। অথচ এটা হুবহু ধোকা ও প্রতারণা। কেননা, যদি আল্লাহর প্রতাপের প্রতি লক্ষ্য করার কারণে এই খুশু হত, তবে একাকীত্বেও তাই হত। কেবল অন্য কারও আগমনের কারণেই এই অবস্থা সৃষ্টি হত না। এই আপদ থেকে বাঁচার আলামত এই যে, উপরোক্ত চিন্তা-ভাবনা একাকীত্বেও অন্তরে প্রতিষ্ঠিত থাকে, যেমন জনসমাবেশে থাকে। মোটকথা, যে পর্যন্ত মানুষের দেখা ও গবাদি পশুর দেখার মধ্যে নিজের আমলে পার্থক্য হতে থাকবে, সে পর্যন্ত নামাযী এখলাস বহির্ভূত এবং গোপন শিরকে লিপ্ত বলে গণ্য হবে। এটাই সেই শিরক, যা মানুষের অন্তরে কালো পিঁপড়ার গতির চেয়েও অধিক গোপন, যে পিঁপড়া অন্ধকার রাত্রে কঠিন পাথরের উপর দিয়ে চলে। হাদীসে তাই বর্ণিত হয়েছে।


পরবর্তী পর্ব—

মিশ্র আমলের সওয়াব 

বৃহস্পতিবার, ১৩ মার্চ, ২০২৫

এখলাস (৫) এখলাস সম্পর্কে মনীষীগণের উক্তি



এখলাস (পর্ব – ৫)
📚এহইয়া উলুমিদ্দিন  ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.) 

এখলাস সম্পর্কে মনীষীগণের উক্তি —

— হযরত সূমী (রহ.) বলেন : এখলাস হল এখলাসের প্রতি লক্ষ্য না থাকা। কেননা, যে এখলাসের প্রতি লক্ষ্য রাখবে, তার এখলাসের জন্যে এখলাসের প্রয়োজন থাকবে। এতে ইঙ্গিত রয়েছে যে, আমলকে আত্মম্ভরিতা থেকে পরিষ্কার রাখা উচিত। এখলাসের প্রতি দৃষ্টি রাখা আত্মম্ভরিতার নামান্তর, যা আমলের অন্যতম আপদ। খুলুস বা নিষ্ঠা তাকেই বলা হয়, যা যাবতীয় আপদ থেকে মুক্ত হবে। যে এখলাসে আত্মম্ভরিতা থাকে, তাতে একটি আপদ থেকে যায়। 

— হযরত সহল (রহ.) বলেন : এখলাস হচ্ছে বান্দার গতিবিধি ও স্থিরতা বিশেষভাবে আল্লাহ তা'আলার জন্যে নিবদ্ধ হওয়া। এ সংজ্ঞাটি পূর্ণাঙ্গ ও উদ্দেশ্য পরিব্যাপ্ত। 

— হযরত ইবরাহীম ইবনে আদহামের উক্তিও এ অর্থই জ্ঞাপন করে। তিনি বলেন : এখলাস হচ্ছে আল্লাহ তা'আলার সাথে নিয়ত সাচ্চা করা। 

হযরত সহলকে প্রশ্ন করা হল : নফসের জন্যে সর্বাধিক কঠিন কাজ কি? তিনি বললেন : এখলাস। কেননা, এতে নফসের কোন অংশ থাকে না।

ব্রুয়ায়ম (রহ.) বলেন : আমলের এখলাস হচ্ছে উভয় জাহানে এখলাসের জন্য কোন বিনিময় কামনা না করা। এতে ইঙ্গিত রয়েছে, জৈবিক বাসনা পার্থিব হোক অথবা পারলৌকিক সবই আপদ। আসলে আমল দ্বারা আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি ছাড়া অন্য কিছু চাওয়া উচিত নয়। এতে সিদ্দীকগণের এখলাসের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। যে ব্যক্তি জান্নাতের আশায় অথবা দোযখের ভয়ে আমল করে, সে পার্থিব ভোগ-বিলাসের দিক দিয়ে মুখলেস বটে; কিন্তু প্রকৃতপক্ষে জৈবিক বাসনার অন্বেষণকারী। সত্যপন্থীদের কাছে সত্যিকার চাওয়ার বিষয় হচ্ছে কেবল আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি।

আবু ওছমান বলেন : এখলাস হচ্ছে সৃষ্টিকর্তার দিকে সার্বক্ষণিক লক্ষ্য রেখে সৃষ্টির প্রতি তাকানো বিস্তৃত হওয়া। এতে কেবল রিয়ার আপদ থেকে মুক্ত থাকার প্রতি ইঙ্গিত রয়েছে। 

হযরত জুনায়দ বলেন : মলিনতা থেকে আমলকে পরিচ্ছন্ন করার নাম এখলাস। 

এখলাস সম্পর্কে আরও অনেক উক্তি বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু সন্তোষজনক উক্তি তাই, যা রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) করেছেন। উনাকে এখলাস সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বললেন : ”একথা বলা যে, আমার পরওয়ারদেগার আল্লাহ। এরপর নির্দেশ অনুযায়ী সরল পথে অবস্থান করা।“ এ উক্তির উদ্দেশ্য হচ্ছে নিজের নফস ও খেয়ালখুশীর কিংবা পরওয়ারদেগার ব্যতীত অন্য কারও এবাদত না করা। এরপর নির্দেশ অনুযায়ী সোজা ও সরল থাকা। অর্থাৎ, আল্লাহ ব্যতীত সব কিছু থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয়া। বাস্তব এখলাস তাই।







এখলাসের স্থর সমূহ —

বুধবার, ১২ মার্চ, ২০২৫

এখলাস (২) হাসরের মাঠে যে তিনজনের প্রথম বিচার হবে



এখলাস (পর্ব – ২)
📚এহইয়া উলুমিদ্দিন  ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.) 
হাসরের মাঠে যে তিনজনের প্রথম বিচার হবে—
রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করেন- “কিয়ামতের দিন তিন ব্যক্তিকে প্রথমে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। তারা হলেন যথাক্রমে (আলেম, দানবীর ও শহীদ)
(১) যাকে ইলম দান করা হয়েছে তাকে জিজ্ঞাসা করা হবে, তুমি তোমার ইলম দিয়ে কি করেছ? সে বলবে : ইলাহী, দিবারাত্রি আমি এরই খেদমত করেছি। আল্লাহ বলবেন— তুমি মিথ্যা বলছ। তোমার বাসনা ছিল যেন মানুষ তোমাকে আলেম বলে। অতঃপর ফেরেশতারাও তাকে মিথ্যাবাদী বলবে। আল্লাহ বলবেন : মনে রেখ, তোমাকে দুনিয়াতে আলেম বলা হয়ে গেছে। 
(২) যাকে আল্লাহ তা'আলা ধন-সম্পদ দান করেছেন, তাকে প্রশ্ন করবেন- তুমি তোমার ধন-সম্পদ কোথায় ব্যয় করেছ? সে বলবে- পরওয়ারদেগার, আমি দুনিয়াতে দিবারাত্রি সদকা-খয়রাত করেছি। আল্লাহ তা'আলা বলবেন তুমি মিথ্যা বলছ। তৎসঙ্গে ফেরেশতারাও তাকে মিথ্যাবাদী বলবে। আল্লাহ আরও বলবেন, বরং তোমার ইচ্ছা ছিল যাতে মানুষ তোমাকে দানবীর বলে। বস্তুত তা বলা হয়ে গেছে। 
(৩) যে আল্লাহর পথে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছে, আল্লাহ তা'আলা তাকে বলবেন- তুমি কি করেছ? সে বলবে, ইলাহী, তুমি জেহাদের নির্দেশ দিয়েছিলে। তাই আমি যুদ্ধ করেছি এবং তোমার পথে শহীদ হয়েছি। আল্লাহ বলবেন- তুমি মিথ্যাবাদী। ফেরেশতারাও তাকে মিথ্যাবাদী বলবে এবং আরও বলবে- বরং তোমার উদ্দেশ্য ছিল যাতে মানুষ তোমাকে একজন মহাবীর বলে। তা বলা হয়েছে। এ হাদীসের বর্ণনাকারী হযরত আবু হোরায়রা (রা.) বলেনঃ এরপর রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আমার উরুতে একটি রেখা টেনে বললেনঃ হে আবু হোরায়রা, সর্বপ্রথম এই তিন ব্যক্তিকে দিয়েই জাহান্নামের আগুন জ্বালানো হবে”। হযরত আবু হোরায়রা হযরত মোয়াবিয়া-এর কাছে গিয়ে এ হাদীস বর্ণনা করলে তিনি কাঁদতে কাঁদতে মৃতপ্রায় হয়ে গেলেন, অতঃপর বললেন : আল্লাহ পাক ঠিকই বলেছেন, – “যারা পার্থিব জীবন ও তার সাজসজ্জা কামনা করে, আমি দুনিয়াতেই তাদের আমলের প্রতিদান পুরোপুরি দিয়ে দেই। তারা এতে ঠকে না”।
পরবর্তী পর্ব —
এক আবেদ ও শয়তানের লড়াই 

এখলাস (৪) এখলাসের স্বরূপ



এখলাস (পর্ব – ৪)

📚এহইয়া উলুমিদ্দিন  ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.) 


এখলাসের স্বরূপ —

প্রত্যেক বস্তুর মধ্যে অন্য বস্তুর সংমিশ্রণ থাকা সম্ভব। কোন বস্তু অন্য বস্তুর সংমিশ্রণ থেকে মুক্ত ও পবিত্র হলে,তাকে বলা হয় ‘খালেস’ বা খাঁটি। 

আল্লাহ তা'আলা বলেন : “গোবর ও রক্তের মাঝখান থেকে নির্গত খাঁটি দুধ, যা পানকারীদের জন্যে সুপেয়।”

অতএব দুধের মধ্যে গোবর ও রক্তের সংমিশ্রণ না থাকাই হচ্ছে দুধের খাঁটিত্ব। এখলাস অর্থ খাঁটি করা এবং এর বিপরীত হচ্ছে এশরাক অর্থাৎ শরীক করা। এ থেকে বুঝা যায়, যে মুখলেস নয়, সে মুশরেক। তবে শিরকের অনেক স্তর রয়েছে। তাওহীদের ক্ষেত্রে এখলাসের বিপরীত হচ্ছে উপাস্যতায় এশরাক। শিরকের মত এখলাসও কিছু গোপন এবং কিছু প্রকাশ্য। শিরক ও এখলাসের স্থান হচ্ছে অন্তর। নিয়তের মাধ্যমে উভয়টি অন্তরে উপস্থিত হয়। একটি মাত্র উদ্দেশ্য নিয়ে যে কাজ সম্পাদিত হয় এবং তাতে অন্য কোন উদ্দেশ্যের মিশ্রণ না থাকে, তাই এখলাস হওয়া উচিত। উদাহরণতঃ কেউ শুধু ‘রিয়া’ তথা লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে দান-খয়রাত করল অথবা শুধু আল্লাহর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে দান। আভিধানিক দিক দিয়ে উভয়টিকেই এখলাস বলা হবে। কেননা এতে এক উদ্দেশ্যের সাথে অন্য কোন উদ্দেশ্যের সংমিশ্রণ নেই। কিন্তু পরিভাষায় কেবল আল্লাহর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে দান করাকেই এখলাস বলা হয। রিয়ার উদ্দেশ্যে কোন সৎকাজ করা ধ্বংসের কারণ হয়ে থাকে। এখানে তা আমাদের আলোচ্য বিষয় নয়। এখানে আমরা বর্ণনা করতে চাই যে, নৈকট্য লাভের নিয়তের সাথে ‘রিয়া’ অথবা অন্য কোন মানসিক আনন্দ লাভের উদ্দেশ্য সংমিশ্রিত থাকলে তার বিধান কি হবে? 


উদাহরণতঃ কেউ নৈকট্য লাভের নিয়তে রোযা রাখে কিন্তু সাথে সাথে চিকিৎসার খাতিরে পরহেযের উপকারও হয়ে যায়। অথবা কেউ হজ্জ করে যাতে দেশ ভ্রমণের আনন্দও অর্জিত হয়ে যায়। কিংবা শত্রুর অনিষ্ট থেকে নিরাপত্তা হাসিল হয়ে যায়। অথবা কেউ তাহাজ্জুদ পড়ে যাতে রাত্রি জাগরণের মাধ্যমে চোর-ডাকাতের উপদ্রব থেকে হেফাযতও হয়ে যায়। অথবা কেউ উযু করে যাতে হাত পায়ের ময়লা দূর হয়ে যায় এবং দেহ ঠাণ্ডা থাকে। এসব ক্ষেত্রে নৈকট্য লাভের সাথে অন্যান্য উদ্দেশ্য সংমিশ্রিত থাকার কারণে আমলসমূহ এখলাস বহির্ভূত হয়ে যাবে এবং এসব আমলকে আল্লাহর জন্যে খাঁটি বলা যাবে না। 

কিন্তু মানুষের কোন কাজ ও এবাদত এ জাতীয় মানসিক আনন্দমুক্ত থাকে না। তাই বলা হযেছে, যে ব্যক্তি সারা জীবনে খাঁটি ভাবে আল্লাহর জন্যে একটি মুহূর্তও পাবে, সে মুক্তি পেয়ে যাবে। কেননা, এখলাস অত্যন্ত দুর্লভ বস্তু। মনকে উপরোক্ত রূপ মিশ্রণ থেকে মুক্ত রাখা প্রায় অসম্ভব। নিরেট নৈকট্য লাভের নিয়ত সেই ব্যক্তির জন্যে কল্পনা করা যায়, যে আল্লাহর পাগলপারা আশেক, আখেরাতের চিন্তায় আকণ্ঠ নিমজ্জিত এবং এ ধরনের পার্থিব মহব্বতের জন্যে যার অন্তরে বিন্দু পরিমাণও অবকাশ নেই। এমনকি, খানাপিনার প্রতিও কোন আকর্ষণ নেই। এগুলোর প্রয়োজন প্রস্রাব-পায়খানার প্রয়োজনের বেশী নয়। এরূপ ব্যক্তি আহার, পান, প্রস্রাব-পায়খানা ইত্যাদি সকল কাজের ক্ষেত্রে খাঁটি আমলকারী ও সঠিক নিয়ত বিশিষ্ট হবে। এমনকি, সে এই নিয়তে ঘুমাবে যাতে পরবর্তী এবাদতের জন্যে শক্তি ও স্বাচ্ছন্দ্য অর্জিত হয়। এমতাবস্থায় তার নিদ্রাও এবাদতে পরিণত হয়ে যাবে। 

যে ব্যক্তি এরূপ নয়, তার আমলে এখলাসের উপস্থিতি খুবই বিরল হবে। এ থেকে এখলাস অর্জনের এই উপায় জানা যায় যে, জৈবিক বাসনা ভেঙ্গে চুরমার করতে হবে, দুনিয়ার লোভ-লালসা ছিন্ন করতে হবে এবং অন্তরে আখেরাতের চিন্তাই প্রবল রাখতে হবে।

এমন অনেক আমল রয়েছে, যেগুলোতে মানুষ শ্রম স্বীকার করে এবং একান্ত ভাবে আল্লাহর নৈকট্য লাভের ধারণা পোষণ করে অথচ এটা মানুষের একটা বিভ্রান্তি। কেননা, এতে বিপদের কারণ তাদের জানা থাকে না। 

উদাহরণতঃ জনৈক বুযুর্গ বলেন : আমি ত্রিশ বছরের নামায কাযা পড়েছি। এগুলো আমি মসজিদের প্রথম সারিতে পড়েছিলাম, কাযার কারণ, একদিন ওযরবশত আমার মসজিদে যেতে বিলম্ব হয়ে যায়। ফলে, আমি দ্বিতীয় সারিতে নামায পড়লাম এবং মনে মনে খুব লজ্জিত হলাম যে, মুসল্লীরা আমাকে দ্বিতীয় সারিতে দেখেছে। এই লজ্জা থেকে জানতে পারলাম, লোকেরা আমাকে যে প্রথম সারিতে দেখত, তাতে আমি আন্তরিকভাবে খুশী ও আনন্দিত হতাম। অথচ পূর্বে বিষয়টি টের পাইনি।

বলা বাহুল্য, এটা এমন একটি সূক্ষ্ম ও গোপন বিষয়, যা থেকে আমল কমই মুক্ত থাকে এবং প্রত্যেকেই এটা টেরও পায় না। আল্লাহ যাদেরকে তাওফীক দেন, তাদের কথা ভিন্ন। যারা এ থেকে গাফেল, তারা আখেরাতে নিজের সৎ আমলসমূহকে গোনাহ আকারে দেখতে পাবে। নিম্নোক্ত দু'টি আয়াতে এরূপ লোকদের কথাই বুঝানো হয়েছে- 

—“আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের জন্যে এমন বিষয় প্রকাশ পাবে, যার ধারণা তারা করত না এবং নিজের উপার্জিত কর্মের গোনাহ তাদের দৃষ্টিগোচর হবে।”

—“আমি তোমাদেরকে তাদের কথা কি বলব, যারা আমলের দিক দিয়ে খুবই ক্ষতিগ্রস্ত! তারা এমন লোক, যাদের সকল প্রচেষ্টা পার্থিব জীবনেই সীমিত; অথচ তারা মনে করে তারা চমৎকার কাজ করছে।”


আলেম সমাজই এই ফেতনায় সর্বাধিক পতিত। তাদের অধিকাংশের ইলম চর্চায় যে প্রেরণাটি কাজ করে, তা হচ্ছে শ্রেষ্ঠত্বের আনন্দ এবং তারীফ ও প্রশংসা-প্রীতি। শয়তান তাদের সামনে সত্যকে গোপন করে দেয় এবং বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে যে, তোমার উদ্দেশ্য তো খোদায়ী ধর্মের প্রচার ও প্রসার এবং শরীয়তে মুহাম্মদীর পক্ষ থেকে বিরোধীদেরকে প্রতিহত করা। ওয়ায়েযরা জনসাধারণকে এবং শাসকবর্গকে উপদেশ দিয়ে আল্লাহ তা'আলার প্রতি অনুগ্রহ প্রকাশ করে। 


সাধারণ মানুষ তাদের উপদেশ মেনে নিলে এবং তাদের প্রতি মনোযোগী হলে তারা আহলাদে আটখানা হয়ে যায়। তারা বলে আমরা এজন্য আনন্দিত যে, আল্লাহ তা'আলা ধর্মের সাহায্যের কাজে আমাদেরকে নিয়োজিত করেছেন। অথচ তাদের মত অন্য কোন কর্মী সৃষ্টি হয়ে গেলে, সে তাদের চেয়ে ভাল ওয়ায করলে এবং মানুষ তার প্রতি মনোযোগী হলে তারা তাকে সহ্য করতে পারে না এবং মনে মনে দুঃখিত হয়। 


এখন প্রশ্ন, যদি দ্বীনের খাতিরেই তারা ওয়ায করত, তবে তাদের অবস্থা এমন হয় কেন? এক্ষেত্রে তো তাদের আরও খুশী হওয়া উচিত ছিল এবং আল্লাহ তা'আলার শোকর করা দরকার ছিল যে, তিনি দ্বীনের একাজে অন্যকে নিযুক্ত করেছেন। ফলে, তাদের একাজে পরিশ্রম করতে হচ্ছে না। কিন্তু শয়তান এরপরও তাদেরকে ছাড়ে না এবং বলে তোমাদের দুঃখ এজন্য নয় যে, মানুষ তোমাদেরকে ছেড়ে অন্যের ওয়ায শুনছে; বরং দুঃখ এজন্যে যে, তোমরা সওয়াব লাভে বঞ্চিত হয়েছ। অর্থাৎ, মানুষ তোমাদের ওয়ায দ্বারা সৎপথে আসলে তোমাদের সওয়াব হত। এই সওয়াব না পাওয়ার জন্যে দুঃখ করা খারাপ নয়,ভাল। কিন্তু তারা জানে না যে, সত্যের আনুগত্য এবং উত্তম ব্যক্তিকে কাজের দায়িত্ব দিলে আখেরাতে সওয়াব বেশী হয় একা নিজে করার তুলনায়। যদি এরূপ দুঃখ করা প্রশংসনীয় হত, তবে হযরত আবু বকর (রা.) যখন খলীফা নিযুক্ত হয়েছিলেন, তখন হযরত ওমর (রাঃ)-ও দুঃখ করতেন। কেননা, জনগণের কল্যাণ সাধনের দায়িত্ব পালন করা অপরিসীম সওয়াবের কাজ। কিন্তু হযরত ওমর (রা.) হযরত আবু বকর (রা.)-এর খেলাফতপ্রাপ্তিতে আনন্দিতই হয়েছিলেন। কারণ, তিনি জানতেন, হযরত আবু বকর (রা.) তাঁর চেয়ে শ্রেষ্ট। 


জানি না, আজকাল আলেমগণ এ জাতীয় বিষয়সমূহে আনন্দিত হয় না কেন?  যারা নফসের চক্রান্ত সম্পর্কে বিশেষ ওয়াকিফহাল, তারাই শয়তানের ধোকা সম্পর্কে জানে ও বুঝে।


সারকথা, এখলাসের স্বরূপ জানা ও তদনুযায়ী আমল করা একটি অথৈ সমুদ্র। এতে উত্তীর্ণ হওয়ার মত লোক খুবই বিরল। কোরআনে আছে, “(শয়তান বলেছিল,) তোমার এখলাস বিশিষ্ট বান্দগণ ছাড়া আমি সবাইকে বিভ্রান্ত করে ছাড়ব।”


বলা বাহুল্য, এখানে উপরোক্ত বিরল লোকদের ব্যতিক্রম প্রকাশ করা হয়েছে। অতএব বান্দার উচিত এসব সূক্ষ্ম বিষয়াদি হৃদয়ঙ্গম করার কাজে সদা তৎপর থাকা। অন্যথায় সে অজান্তেই শয়তানের দলে ভিড়ে যাবে।


পরবর্তী পর্ব—

এখলাস সম্পর্কে মনীষীগণের উক্তি 

এখলাস (৩) এক আবেদ ও শয়তানের লড়াই



এখলাস (পর্ব – ৩)

📚এহইয়া উলুমিদ্দিন  ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.) 

এক আবেদ ও শয়তানের লড়াই — 

বনী ইসরাঈলের ঘটনাবলীতে বর্ণিত আছে, জনৈক আবেদ দীর্ঘদিন ধরে আল্লাহ তা'আলার এবাদতে নিয়োজিত ছিল। একদিন কিছু লোক তার কাছে এসে বলল : এখানে একটি সম্প্রদায় বৃক্ষের পূজা করে। 

আবেদ রাগান্বিত হয়ে তৎক্ষণাৎ কুড়াল কাঁধে নিয়ে বৃক্ষটি কেটে ফেলার জন্যে রওয়ানা হল। পথে শয়তান এক বুড়োর বেশে তার সামনে এসে জিজ্ঞেস করল : কোথায় যাওয়া হচ্ছে? আবেদ বলল : আমি অমুক বৃক্ষটি কেটে ফেলতে চাই। বুড়ো বলল : তুমি নিজের এবাদত ও কাজকর্ম ছেড়ে এ বৃক্ষের পেছনে পড়লে কেন? এতে তোমার কি লাভ? আবেদ বলল : এটাও এবাদতের অন্তর্ভুক্ত। বুড়ো শয়তান বলল : আমি তোমাকে এটা কাটতে দেব না। 

কথা কাটাকাটি চরমে পৌঁছলে আবেদ বুড়োকে মাটিতে ফেলে দিয়ে তার বুকের উপর চেপে বসল। বুড়ো বলল : আমাকে ছেড়ে দাও। আমি তোমাকে কিছু উপকারী কথা বলতে চাই। আবেদ দাঁড়িয়ে গেল। বুড়ো বলল : আশ্চর্যের বিষয়, আল্লাহ তা'আলা তোমার উপর এ বৃক্ষ কাটা ফরয করেননি। তুমিও এর এবাদত কর না। যদি অন্য কেউ এবাদত করে, তবে তার গোনাহ তোমার উপর বর্তাবে না। ভূ-পৃষ্ঠে আল্লাহর অনেক পয়গম্বর রয়েছেন। আল্লাহর ইচ্ছা হলে বৃক্ষ এলাকায় কোন পয়গম্বর পাঠিয়ে তাকে বৃক্ষ কর্তনের নির্দেশ দেবেন। যে কাজের দায়িত্ব তোমার নেই, তার পেছনে পড়ার প্রয়োজন তোমার আছে কি? 

আবেদ বলল : আমি অবশ্যই বৃক্ষটি কর্তন করব। বুড়ো পুনরায় কুস্তি লড়ার ভাব প্রকাশ করলে আবেদ তাকে পুনরায় ভূতলশায়ী করে দিল এবং বুকের উপর চেপে বসল। 

বুড়োবেশী শয়তান অপারগ হয়ে বলতে লাগল : এস, আমি তোমাকে আরও একটি কথা বলব, যা তোমার জন্যে নিশ্চিতই উত্তম ও কল্যাণকর হবে। আবেদ বলল : আচ্ছা বল কি বলতে চাও। বুড়োবেশী শয়তান বলল : আগে আমাকে ছেড়ে দাও । এরপর বলব। 

আবেদ তাকে ছেড়ে দিল। বুড়ো বলল : তুমি একজন অভাবী মানুষ। পরের দেয়া অন্ন ভক্ষণ কর। আমার মনে হয় অপরকে খাওয়াবার, প্রতিবেশীদের খাতির-আপ্যায়ন করার এবং অমুখাপেক্ষী হয়ে বেঁচে থাকার সাধ তোমার মনেও আছে। 

আবেদ বলল : এ সাধ কার না আছে? বুড়ো বলল : তা হলে এখন তুমি ফিরে যাও। আমি এখন থেকে প্রতিরাত্রে তোমার শিয়রে দু'টি দীনার রেখে দেব। ভোরে এগুলো তুলে নিও এবং নিজের ও পরিবার-পরিজনের ভরণ-পোষণে সেগুলো ব্যয় করো। এটা তোমার জন্যে এবং অন্য মুসলমানদের জন্যে বৃক্ষ কর্তনের তুলনায় অধিক উপকারী হবে। এ বৃক্ষটি কেটে কোন লাভ নেই। কারণ, এর জায়গায় অন্য বৃক্ষ রোপণ করা হবে এবং পূজা করা হবে। 

আবেদ কিছুক্ষণ চিন্তা করে মনে মনে বললঃ বুড়ো ঠিকই বলেছে। আমি তো পয়গম্বর নই যে, বৃক্ষটি কাটা আমার জন্যে অপরিহার্য হবে। আল্লাহ তা'আলা আমাকে এটা কাটার হুকুমও করেননি, যা না কাটলে আমি নাফরমান সাব্যস্ত হব। সে যে প্রস্তাব দিয়েছে, তাতে উপকারও রয়েছে। অতঃপর উভয়ের মধ্যে দীনারের ব্যাপারে পাকাপোক্ত চুক্তি হয়ে গেল।

আবেদ তার এবাদতখানায় ফিরে এল এবং রাতে ঘুমিয়ে পড়ল। ভোরে সে শিয়রের কাছে দু'টি দীনার পেয়ে তুলে নিল। দ্বিতীয় এবং তৃতীয় দিনও তাই হল। এরপর কোনদিন সে দীনারের দেখা পেল না। সে রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে একদিন কাঁধে কুড়াল নিয়ে সে বৃক্ষের উদ্দেশে রওয়ানা হল। পথিমধ্যে বুড়োবেশী ইবলীস ও তার সামনে এসে বলল : কোথায় যাওয়ার ইচ্ছা? আবেদ বলল, সে বৃক্ষ কর্তন করতে যাচ্ছে। ইবলীস বলল : এখন তুমি সে বৃক্ষ কর্তন করতে পারবে না এবং সে পর্যন্ত পৌছুতে সক্ষম হবে না। 

একথা শুনে আবেদ প্রথমবারের মত বুড়োকে মাটিতে ফেলে দিতে চাইল। বুড়োবেশী ইবলীস বলল : এখন সে দিন বাসি হয়ে গেছে। অতঃপর সে আবেদকে উপরে তুলে মাটিতে আছাড় মারল এবং লাথির উপর লাথি মারতে লাগল। আবেদকে তার পায়ে বলের মত মনে হচ্ছিল। এরপর ইবলীস তার ছাতির উপর বসে বলল : হয় তুমি এ কার্জ থেকে বিরত হবে, না হয় আমি তোমাকে যবেহ করে ফেলব। 

আবেদ নিজের ভেতরে মোকাবিলার শক্তি না পেয়ে হার মেনে নিল এবং বলল : এখন আমাকে ছেড়ে দিয়ে বল পূর্বে আমি কিরূপে জয়ী হয়েছিলাম এবং এখন তুমি কিভাবে জয়ী হলে? ইবলীস বললঃ এর কারণ, পূর্বে তুমি যা করেছিলে, তা আল্লাহর জন্যে করেছিলে এবং এখলাসের বলে বলীয়ান ছিলে। কিন্তু এখন তুমি ক্রোধ ও দুনিয়ার হীন স্বার্থের বশবর্তী হয়ে মাঠে নেমেছ। তাই আমি অনায়াসেই তোমাকে পরাভূত করে দিয়েছি।


সত্যি বলতে কি, উপরোক্ত কাহিনীতে নিম্নোক্ত আয়াতের সত্যায়ন ও সমর্থন পাওয়া যায় - “(শয়তান বলল) আমি অবশ্যই মানুষকে পথভ্রষ্ট করে ছাড়ব। কিন্তু যারা তোমার এখলাস বিশিষ্ট বান্দা, তাদের কথা আলাদা।”


কেননা, এখলাস ছাড়া বান্দা শয়তানের হাত থেকে ছাড়া পায় না। তাই হযরত মারূফ কারখী নিজেকে প্রহার করতেন এবং বলতেন- হে নফস, এখলাস অবলম্বন কর যাতে মুক্তি পাও। ইয়াকুব মককুফ বলেন : এখলাস হচ্ছে নেক কর্মসমূহকে গোপন করা, যেমন কুকর্মসমূহকে গোপন করা হয়। 

আবু সোলায়মান বলেন, যার একটি পদক্ষেপও সঠিক হয় এবং তাতে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও নিয়ত না থাকে, সেই সুখী।

পরবর্তী পর্ব —

একলাসের স্বরূপ 

মঙ্গলবার, ১১ মার্চ, ২০২৫

এখলাস (১) এখলাসের ফযীলত



এখলাস পর্ব – ১

📚এহইয়া উলুমিদ্দিন  ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.) 

এখলাসের ফযীলত — 

এখলাস সম্পর্কে কোরআন মজীদের আয়াতসমূহ নিম্নরূপ : 

— “তারা তো কেবল আদিষ্ট হয়েছিল খাঁটিভাবে আল্লাহর এবাদত করতে”।

— “সাবধান! খাঁটি এবাদত আল্লাহরই হয়ে থাকে”।

— “কিন্তু যারা তওবা করে, সংশোধিত হয়, আল্লাহকে শক্তভাবে ধারণ করে এবং আপন এবাদতকে আল্লাহর জন্যে খাঁটি করে”।

— “অতএব যে তার পালনকর্তার সাক্ষাৎ আশা করে, সে যেন সৎকর্ম সম্পাদন করে এবং নিজের পালনকর্তার এবাদতে কাউকে অংশীদার না করে”।

এ আয়াতটি এমন ব্যক্তি সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়, যে আল্লাহ তা'আলার জন্যে আমল করে এবং তজ্জন্যে মানুষের প্রশংসা কামনা করে না। 

রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করেন,- “তিনটি বিষয়ে মর্দে মুমিনের অন্তর খিয়ানত করে না— আল্লাহর জন্যে আমলকে খাঁটি করা, শাসক শ্রেণীকে উপদেশ দেয়া এবং মুসলিম দলের সাথে থাকা”।

হযরত হাসান (র.) থেকে বর্ণিত এক হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “এখলাস আমার রহস্য। আমি যাকে ইচ্ছা এই রহস্য অবগত করি”। 

হযরত আলী (রা.) বলেন : আমলের স্বল্পতার জন্যে চিন্তিত হয়ো না ; বরং কবুল হওয়ার ব্যাপারে চিন্তিত হও। কেননা, রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) একবার মুয়ায ইবনে জাবাল (র.)-কে বলেন- “এখলাস সহকারে আমল কর। এরূপ আমল অল্পই তোমার জন্যে যথেষ্ট হবে”।  

অন্য এক হাদীসে আছে “যে ব্যক্তি চল্লিশ দিন এখলাস সহকারে আমল করে, তার অন্তর ও জিহ্বা থেকে প্রজ্ঞার ঝরনা প্রবাহিত হতে থাকে”।

পরবর্তী পর্ব–

হাসরের মাঠে যে তিনজনের প্রথম বিচার হবে 


বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...