অতঃপর মৃত ব্যক্তিকে যখন কবরের পার্শ্বে রাখা হয়, তখন কবর তাহাকে তিনবার ডাকিয়া বলে, “ওহে আদম সন্তান! একদিন আমার পৃষ্ঠপোরি পরমানন্দে হাসিয়া খেলিয়া বেড়াইয়াছ, এখন কাঁদিতে কাঁদিতে আমার অভ্যন্তরে প্রবেশ কর । আর এক কালে আমার পৃষ্ঠদেশে কত আনন্দ ও উৎফুল্ল হৃদয়ে কাল অতিবাহিত করিয়াছিলে, এখন চিন্তিতাবস্থায় আমার মধ্যে প্রবেশ কর, আর এককালে তুমি বেশ বাকপটু ছিলে, কিন্তু এখন নির্বাক ও বিমর্ষ চিত্তে আমার অভ্যন্তরে দাখিল হও।
মঙ্গলবার, ১৪ মে, ২০২৪
দাকায়েকুল আখবার- (১৫) রূহের বিবরণ
দাকায়েকুল আখবার- (১৪) মানুষের ঈমান নষ্ট করিতে শয়তানের চেষ্টা
হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, জান কবজের সময় মুমূর্ষু ব্যক্তি পিপাসায় ও হৃৎপিণ্ডের যন্ত্রণায় অত্যন্ত কাতর ও অস্থির হইয়া যায়। এমন সময় শয়তান বান্দার ঈমান নষ্ট করিবার জন্য সচেষ্ট হয়। সেই সময় বান্দা যখন পিপাসায় কাতর হইয়া যায়, তখন শয়তান এক পেয়ালা ঠান্ডা-পানি লইয়া বান্দার সম্মুখে উপস্থিত হয় এবং পেয়ালাটি আন্দোলিত করিতে থাকে। তখন কাতর বান্দা ভুলবশতঃ শয়তানের নিকট পানি চায়। উত্তরে শয়তান বলে, “হে বান্দা! তুমি যদি এই কথা বল যে, এই বিশ্ব-জগতের কোন প্রতিপালক নাই, তবেই তোমাকে আমি এই পানি পান করাইতে পারি।” ইহাতে বান্দা যদি কোন উত্তর প্রদান না করে, তবে শয়তান পুনরায় তাহার পদযুগলের সন্নিকটে বসিয়া পানির পেয়ালা নাড়াচাড়া করিতে থাকে। তখন উক্ত বান্দা বলে, “আমাকে কিছু পানি দাও।” উত্তরে শয়তান বলে, “হে বান্দা! তুমি যদি বলিতে পার যে, রাসূলগণ মিথ্যাকথা প্রচার করিয়া গিয়াছে, তবে তোমাকে পানি পান করাইতে পারি।” এমতাবস্থায় যাহার ভাগ্যে বদবখতি লেখা আছে, সে পিপাসার যাতনা সহ্য করিতে না পারিয়া শয়তানের ইচ্ছা অনুসারে কাজ করিয়া বেঈমান অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে এবং ধর্ম-ভীরু ও আল্লাহভক্ত ব্যক্তি ঈমানের শক্তির প্রভাবে শয়তানের প্ররোচনা হইতে নিজেকে মুক্ত রাখিতে সক্ষম হয় ও পবিত্র ঈমানের সহিত তাহার রূহ, অনন্ত রাজ্যে বিলীন হইয়া যায়।
হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, বিখ্যাত সুফী আবু জাকারিয়া (রহঃ) -এর জান কবজের সময় তাহার এক প্রিয়তম বন্ধু তাহাকে কালেমায়ে শাহাদাত তালকীন দিতে (পড়াইতে) শুরু করেন; কিন্তু প্রত্যুত্তরে সুফী আবু জাকারিয়া (রহঃ) কিছুই বলিলেন না এবং মুখমণ্ডল অন্যদিকে ফিরাইয়া লইলেন। দ্বিতীয়বারও তিনি এমনই করিলেন এবং তৃতীয়বার তালকীনের সময় বলিলেন, “আমি ইহা বলিব না ।” ফলে বন্ধুবর অত্যন্ত বিচলিত ও চিন্তিত হইয়া পড়িলেন। এইভাবে কিছুক্ষণ অতিবাহিত হইয়া যাওয়ার পর আবু জাকারিয়া (রহঃ) যাতনার শীতলতা অনুভব করতঃ চক্ষুদ্বয় উন্মিলিত করিয়া বলিলেন, “হে বন্ধু! তুমি কি আমাকে কোন কথা জিজ্ঞাসা করিয়াছিলে?” বন্ধুবর বলিলেন, “হ্যা আমরা আপনাকে তিনবার কালেমায়ে শাহাদাত তালকীন করিয়াছি, কিন্তু দুইবারই আপনি মুখমণ্ডল অন্যদিকে ফিরাইয়া লইয়াছিলেন এবং তৃতীয়বার বলিয়াছিলেন যে, “আমি ইহা বলিব না।” তখন সুফী আবু জাকারিয়া (রহঃ) বলিলেন, “বিতাড়িত ইবলিস শয়তান এক পেয়ালা পানিসহ আমার ডানদিকে দাঁড়াইয়া এবং পানির পাত্রটি নাড়াচাড়া করিয়া আমাকে জিজ্ঞাসা করিল, “হে বান্দা! তুমি কি পানি পান করিবে?” আমি উত্তর করিলাম, “হ্যা পান করিব।” তখন শয়তান বলিল, “যদি তুমি বল যে, হযরত ঈসা (আঃ) আল্লাহ তায়ালার পুত্র ছিলেন, তবে তোমাকে আমি পানি পান করাইব।” এইকথা শ্রবণ করিয়া আমি মুখ ফিরাইয়া লইয়াছি। তারপর শয়তান পায়ের কাছে আসিয়াও সেই কথা বলিল, তখনও আমি মুখ ফিরাইয়া লইয়াছি। তৃতীয়বার শয়তান আমাকে বলিল- “তুমি অন্ততঃ বল, 'লা-ইলাহা অর্থাৎ কোনই উপাস্য নাই।” ইহার প্রত্যুত্তরে আমি বলিলাম, আমি কখনও এই কথা বলিব না। ইহা শ্রবণ করিয়াই শয়তান পানির পাত্রটিকে মাটিতে নিক্ষেপ করিয়া চলিয়া গেল। আমি মরদুদ্ শয়তানের কথার উত্তর দিয়াছি মাত্র। আমি তোমাদের কথার উত্তর দেই নাই। এখন আমি সাক্ষ্য দিতেছি যে, “আল্লাহ তায়ালা ব্যতীত আর কোনও উপাস্য নাই এবং আমি আরও সাক্ষ্য দিতেছি যে, হযরত মুহাম্মদ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আল্লাহ তা'আলার বান্দা এবং রাসূল ছিলেন ।”
দাকায়েকুল আখবার- (১৩) মৃত্যুমুহূর্তে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কাতর ফরিয়াদ
তাই বন্ধুগণ, মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করুন, যাহারা নিজ অন্তর প্রদেশে আল্লাহর নামের মোহর অংকিত করিতে সক্ষম হইয়াছেন, নিশ্চয় তাহারা আল্লাহ প্রদত্ত সুকঠিন শাস্তি বিচ্ছিন্নতার কষ্ট ও যাতনা এবং অপদস্থতার তীব্র গ্লানি হইতে নিস্তার লাভ করিবেন। যেমন আল্লাহ্ তা'আলা এরশাদ করেন, -("উলাইকা কাতাবা ফি কুলুবিহিমুল ঈমানা") অর্থাত : "উহারাই, যাহাদের হৃদয় কন্দরে আল্লাহ্ তা'আলা ঈমানের মোহর অংকিত করিয়া দিয়াছেন।" আর আল্লাহ্ তা'আলা আরো ইরশাদ করেন, - ("আফামান্ শারাহাল্লাহু ছাদরাহু লিল্ ইসলামি ফাহুয়া আলানুরিম্-মির রাব্বিহ্") অর্থাত : আল্লাহ্ তা'আলা যাদের অন্তকরণকে পবিত্র ইসলামের জন্য সম্প্রসারিত করিয়াছেন, নিশ্চয় তাহারা আল্লাহ্ তা'আলার প্রদত্ত জ্যাতিতে বিরাজ করিতেছে। অতএব সে কিয়ামতের দিন আযাবের ভয় হইতে পরিত্রাণ লাভে সক্ষম হইবে"।
অন্য এক হাদিসে বর্ণিত আছে যে, যখন কোন বান্দার জান কবজ আরম্ভ হয়, তখন আল্লাহ্ তা'আলার তরফ হইতে কেহ উচ্চৈঃস্বরে ডাকিয়া বলে, "হে মালাকুল মউত! ক্ষান্ত হও কিছু সময় তাহাকে আরাম করিতে দাও।" আর রূহ্ যখন বক্ষস্থল পর্যন্ত আসে তখন পূনরায় ডাকিয়া বলা হয় যে, "হে মৃত্যুদূত ক্ষান্ত হও, ক্ষান্ত হও, আরো কিছু সময় তাহাকে আরাম করিতে দাও।" অনুরূপ ভাবে হাটু ও নাভী পর্যন্ত পৌছিলেও তেমনি বলা হইয়া থাকে। পরিশেষে রূহ্ যখন কন্ঠ পর্যন্ত পৌছিয়া যায় তখন অতি উচ্চৈঃস্বরে বলা হয় হে মালাকুল মউত! ক্ষান্ত হও! ক্ষান্ত হও! তা্হাকে নিজের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ হইতে চিরবিদায় গ্রহন করিবার জন্য কিছু সময় প্রদান কর।" তখন চক্ষুদ্বয় রূহ্কে বিদায় দিয়া বলে, হে বন্ধু কিয়ামত পর্যন্ত তোমার উপর শান্তি ও রহমত বর্ষিত হউক।" অনুরুপ ভাবে উভয় হস্ত, উভয় কর্ণ এবং পদদ্বয় রূহ্কে আশীর্বাদ করিয়া চির বিদায় গ্রহন করে।
আমরা আল্লাহ্ তা'আলার দরবারে প্রার্থনা করিতেছি যেন আমাদের রসনা হইতে ঈমানের বাণী এবং অন্তর হইতে মারেফাতের জ্যোতি বিদায় করিতে না হয়। তারপর হস্তদ্বয়, পদদ্বয় নিস্তেজ হইয়া পড়িয়া থাকে এবং চক্ষুদ্বয় জ্যোতিহীন ও কর্ণদ্বয় শ্রবণ শক্তিহীন এবং দেহ কাঠামো আত্মাহীন হইয়া পরিয়া থাকে।
দাকায়েকুল আখবার- (১২) আত্মার কথোপকথনের বিবরণ
দাকায়েকুল আখবার- (১১) মৃত্যুস্থানের বিবরণ
দাকায়েকুল আখবার- (১০) মালাকুল মউত যেরূপে রূহ কবজ করে
হযরত কা'ব ইবনে আহ্বার (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ তা'আলা আরশের নিম্নভাগে একটি সুবৃহৎ বৃক্ষ পয়দা করিয়াছেন। উক্ত বৃক্ষে যাবতীয় জীবের সংখ্যানুপাতে পাতা রহিয়াছে। কাহারও মৃত্যুর চল্লিশ দিন পূর্বেই তাহার নামাঙ্কিত পাতাটি হযরত আজরাইল (আঃ) এর বক্ষের উপর ঝরিয়া পড়ে। তখন তিনি তাঁহার সহকর্মীদিগকে উক্ত ব্যক্তির রূহ কবজ করিতে নির্দেশ করেন। এরূপভাবে চল্লিশ দিন পূর্বেই উক্ত ব্যক্তি আকাশমণ্ডলে মৃত বলিয়া ঘোষিত হয়।
দাকায়েকুল আখবার- (৯) মৃত্যুর ইতিহাস
দাকায়েকুল আখবার- (৮) ফেরেশতাগণের সৃষ্টির বিবরণ
দাকায়েকুল আখবার- (৭) মানুষের শরীরের চামড়ার রহস্য
দাকায়েকুল আখবার- (৬) আদম (আঃ) এর দেহের রহস্য
বিবাহ (৩৫) কন্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ
বিবাহ (পর্ব – ৩৫) 📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.) কন্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...
-
অহংকার ও আত্মপ্রীতি (পর্ব- ৮) এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ইমাম গাজ্জালী (রহঃ) অহংকারের প্রতিকার ও বিনয় অর্জনের উপায় উপরোক্ত আলোচনা থেকে জানা গেল যে,...
-
অহংকার ও আত্মপ্রীতি (পর্ব- ৫) এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ইমাম গাজ্জালী (রহঃ) অহংকারের স্বরূপ ও তার লাভ-লোকসান— অহংকার দু'প্রকার। একটি বাহ্যিক, অপ...
-
অহংকার ও আত্মপ্রীতি (পর্ব- ৩) এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ইমাম গাজ্জালী (রহঃ) অহংকারের নিন্দা — পবিত্র কোরআনুল কবিমে বহু স্থানে আল্লাহ তা'আলা ...









