মঙ্গলবার, ১৪ মে, ২০২৪

দাকায়েকুল আখবার- (১৭) জান কবজের পর রূহের চীৎকার

 

📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ১৭)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

জান কবজের পর রূহের চীৎকার-
হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, হযরত আয়েশা (রাঃ) বর্ণনা করিয়াছেন, “একদিন আমি স্বীয় শয়ন কক্ষে বসিয়াছিলাম। এমন সময় অপ্রত্যাশিতভাবে আল্লাহ তা'আলার প্রিয় হাবীব (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আমার গৃহে আগমন করিলেন। তখন আমি স্বীয় অভ্যাস অনুযায়ী দণ্ডায়মান হইতে চাহিলে হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিলেন, “হে উম্মুল মুমিনিন! স্বীয় স্থানে বসিয়া থাক।” আমি তাহাই করিলাম। তারপর হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আমার ক্রোড়ে স্বীয় মাথা মোবারক স্থাপন করিয়া চিৎ হইয়া শুইয়া পড়িলেন। অতঃপর আমি তাহার সাদা শ্মশ্রু মোবারক অন্বেষণ করিয়া ঊনবিংশটি সাদা শ্মশ্রুর সন্ধান লাভ করিলাম এবং মনে মনে চিন্তা করিতে লাগিলাম, আহা! আল্লাহ তায়ালার প্রিয় নবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) নিজ উম্মতদিগকে শোকের সাগরে ভাসাইয়া অনন্ত ধামে যাত্রা করিবেন। আর উম্মতগণ নবীবিহীন অবস্থায় থাকিয়া যাইবে। এইকথা চিন্তা করিতে করিতে আমার চক্ষুদ্বয় অশ্রু বন্যায় প্লাবিত হইয়া গেল এবং কয়েক ফোটা অশ্রু আল্লাহ তা'আলার প্রিয় নবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উনার পবিত্র চেহারা মোবারকের উপর টপকাইয়া পড়িল। ফলে হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) জাগ্রত হইয়া আমাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘হে উম্মুল মুমিনীন! তুমি ক্রন্দন করিতেছ কেন?' প্রত্যুত্তরে আমি সবকিছু বর্ণনা করিয়া তাঁহাকে শুনাইলাম।তারপর তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘হে উম্মুল মুমিনীন! বলতো মৃত ব্যক্তির নিকট কোন্ অবস্থা অত্যন্ত ভয়াবহ ও অসহনীয়?” আমি উত্তর করিলাম, সে সম্বন্ধে আল্লাহ তায়ালা ও তাঁহার প্রিয় রসূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-ই ভাল জানেন। তিনি বলিলেন, “তাহা অবশ্যই; কিন্তু তবু তুমি অভিমত প্রকাশ কর।” আমি বলিলাম, “যখন মৃত ব্যক্তিকে ঘর হইতে বাহির করা হয় এবং যখন তাহার সন্তানগণ হে পিতা! হে মাতা! বলিয়া ক্রন্দন করিতে করিতে তাহার পশ্চাতে দৌড়াইতে থাকে, আর সে ব্যক্তি, হে পুত্র! হে কন্যা! বলিতে থাকে, এই সময়টিই অত্যন্ত ভয়াবহ ও অসহনীয়।” হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিলেন, হ্যাঁ, প্রকৃতই সে অবস্থা অত্যন্ত ভয়াবহ।' হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) পুনরায় জিজ্ঞাসা করিলেন, “বলত আর কোন্ অবস্থা ভয়াবহ?” আমি উত্তর করিলাম, “যখন মৃত ব্যক্তিকে কবরে রাখিয়া তাহার বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনগণ তাহাকে আল্লাহ তা'আলার কুদরতের হস্তে সমর্পণ করিয়া প্রত্যাবর্তন করে এবং নিজের কৃতকর্ম ব্যতীত আর কিছুই তাহার থাকে না, এই অবস্থাটিও তাহার জন্য কম ভয়াবহ নহে।” হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আবার জিজ্ঞাসা করিলেন, “বলত আর কোন্ অবস্থা ভয়াবহ।” আমি প্রত্যুত্তরে বলিলাম, “আমার চাইতে আল্লাহ পাক ও তাঁহার রাসূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-ই ভাল জানেন।” তখন হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিলেন, “হে উম্মুল মুমিনীন! জানিয়া রাখ যে, গোসলদানকারী যখন মৃত ব্যক্তিকে গোসল করাইবার নিমিত্ত তাহার পরিধেয় বস্ত্র, যুবকদের অঙ্গুরী ও জামা কাপড়, - আর কাজী, ফকীহ ও বৃদ্ধের পাগড়ী টানিয়া খুলিয়া ফেলে, সেই সময়টা মৃত ব্যক্তির পক্ষে অত্যন্ত ভয়াবহ ও অসহনীয়। রূহ তখন তাহার এই উলঙ্গ শরীর দেখিতে পায়, তখন সে অতি উচ্চৈঃস্বরে চিৎকার করিয়া বলে, 'হে গোসলদানকারী! তোমাকে আল্লাহ তায়ালার শপথ দিয়া বলিতেছি, আমার পরিধেয় বসন একটু আস্তে আস্তে খুলিয়া বাহির কর। কারণ, এইমাত্র আজরাইলের যাতনা হইতে পরিত্রাণ লাভ করিয়াছি।' তাহার এই চিৎকার মানব-দানব ভিন্ন অন্য সকলেই শুনিতে পায়। তারপর মৃত ব্যক্তির শরীরে যখন পানি ঢালা হয়, তখনও পূর্বের মত চিৎকার করিয়া বলে, 'হে গোসলদানকারী! তোমাকে আল্লাহর শপথ দিয়া বলিতেছি, তুমি আমার শরীরে অতি ঠাণ্ডা বা অতি গরম পানি ঢালিও না। কারণ, রূহ বাহির করিবার পর আমার শরীর ক্ষতবিক্ষত হইয়া গিয়াছে।' তারপর গোসলদানকারী মৃত ব্যক্তির শরীর যখন কচলাইয়া দিতে থাকে, তখনও সে বলিয়া উঠে, 'হে গোসলদানকারী, আল্লাহর শপথ ! আমার শরীর অতি জোরে মর্দন করিও না।' 
তারপর শবদেহে যখন কাফন পরান হয়, তখন রূহ উচ্চৈঃস্বরে ডাকিয়া বলে, “হে গোসলদানকারী! আমার স্ত্রী, পুত্র, আত্মীয়-পরিজন আমার মুখমণ্ডল শেষবারের জন্য দেখিয়া লউক; সুতরাং তুমি আমার মাথার দিকের কাপড় শক্ত করিয়া বাঁধিয়া ফেলিও না।' অতঃপর যখন শবদেহ গৃহ হইতে বাহির করা হয়, তখন মৃতের আত্মা বলিয়া উঠে ‘হে লোকগণ! আল্লাহর শপথ, আমাকে গৃহ হইতে এত তাড়াতাড়ি বাহির করিও না। আমাকে শেষবারের মত আমার ঘর-বাড়ী, ধন-সম্পদ ও পরিবার-পরিজনের নিকট হইতে বিদায় লইতে দাও।”
তারপর রূহ উচ্চৈঃস্বরে ঘোষণা করিতে থাকে, 'হে মানবগণ! আজ হইতে আমি আমার স্ত্রীকে বিধবা এবং পুত্র-কন্যাদিগকে এতিম ও অসহায় করিয়া যাইতেছি। আল্লাহর শপথ, তোমরা কখনও তাহাদিগকে কষ্ট দিও না। আমি আমার যথাসর্বস্ব ফেলিয়া যাইতেছি, আর কখনও এইস্থানে প্রত্যাবর্তন করিব না।' 
অতঃপর মৃত ব্যক্তিকে খাটে করিয়া যখন লইয়া যাইতে শুরু করে তখন রূহ বলে, 'হে বন্ধুগণ! আল্লাহ তা'আলার শপথ, যে পর্যন্ত আমি আমার পুত্র-কন্যা, পরিবার ও প্রতিবেশীদের আওয়াজ শুনিতে পাই, ততক্ষণ আমাকে শীঘ্র বাহির করিও না। কেননা আজিকার এই বিচ্ছিন্নতা কিয়ামত পর্যন্ত বজায় থাকিবে।' যখন মৃত ব্যক্তির খাট লইয়া তিন কদম অগ্রসর হয়, তখন আত্মা আবার অতি উচ্চৈঃস্বরে চীৎকার করিয়া বলে, হে বন্ধু ও সন্তানগণ! জানিয়া রাখ; আমি পৃথিবীর মোহে পড়িয়া জীবন শেষ করিয়াছি, সাবধান! তোমরা তাহার মোহে পড়িও না। তোমরা উহা হইতে দূরে থাকিও। পৃথিবী আমাকে লইয়া যেমন ছিনিমিনি খেলিয়াছে তোমাদিগকে লইয়াও যেন সেইরূপ করিতে না পারে।'
রূহ আরও বলে, ‘হে দৃষ্টিশক্তিসম্পন্ন জ্ঞানীবৃন্দ! আমার অবস্থা অবলোকন করিয়া তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর, তবেই তোমরা সফলকাম হইতে পারিবে। যাহা আমি সঞ্চয় করিয়াছিলাম, তাহা উত্তরাধিকারীদের জন্যেই ফেলিয়া আসিয়াছি। তোমরা আমার পরও জীবিত থাকিবে; কিন্তু তোমরা আমার পাপের একাংশও গ্রহণ করিবে না। আর উত্তরাধিকারীগণ তাহাদের প্রাপ্য অংশ পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে হিসাব করিয়া লইবে অথচ আমার কথা কেহই মনেও করিবে না।'
জানাযার নামাযের পর বন্ধু-বান্ধব ও লোকজন যখন চলিয়া যাইতে শুরু করে, তখন রূহ্ আল্লাহ তা'আলার শপথ দিয়া বলে, 'হে বন্ধুগণ! তোমরা আমাকে এত তাড়াতাড়ি ভুলিয়া যাইও না এবং দাফন শেষ হওয়ার পূর্বক্ষণ পর্যন্ত ফিরিয়া যাইও না।' আর যখন মৃত ব্যক্তিকে কবরের মধ্যে রাখা হয়, তখন সে তাহার উত্তরাধিকারীগণকে লক্ষ্য করিয়া বলে,- ‘হে আমার ওয়ারিশগণ! আমি এই পৃথিবীতে বহু ধন-সম্পদ অর্জন করিয়াছি এই সমস্ত তোমাদেরই জন্য রাখিয়া আসিয়াছি। তোমরা এই প্রচুর ধন-সম্পদ লাভ করিয়া আমাকে ভুলিয়া যাইও না । আমি পবিত্র কোরআন শরীফ ও আদব-কায়দা ও শিষ্টাচার শিক্ষা দিয়াছি, কিন্তু তোমরা আমার জন্যে নেকদোয়া করিতে বিস্মৃত হইও না।' 
আর দাফনের পর যখন সকলে প্রত্যাবর্তন করে, তখন মৃতব্যক্তি বলে ‘হে বন্ধুগণ! আমার জানা আছে যে, মৃতব্যক্তি জীবিতদের অন্তরে জামহারির হইতেও অধিক ঠাণ্ডা বলিয়া বিবেচিত হয়; কিন্তু আমার অন্তিম অনুরোধ, তোমরা আমাকে এত শীঘ্র ভুলিয়া যাইও না।”

হযরত আবু কালাবা (রঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, একদা স্বপ্নে তিনি একটি কবরস্থান দেখিতে পাইলেন, যাহার কবরগুলি ফাটিয়া গিয়াছে এবং মৃতব্যক্তিরা বাহির হইয়া কবরের পার্শ্বে বসিয়া রহিয়াছে। তিনি আরও দেখিতে পাইলেন যে, তাহাদের প্রত্যেকের সামনে একটি করিয়া নূরের তবক রহিয়াছে; কিন্তু তাহাদের মধ্যে একজনকে দেখিতে পাইলেন যে, তাহার নূরের তবক নাই এবং সে খুবই চিন্তিত। উহার কারণ জিজ্ঞাসা করিয়া তিনি জানিতে পারিলেন যে, প্রথমোক্ত ব্যক্তিগণের পুত্র-কন্যা ও বন্ধু-বান্ধব তাহাদের জন্য দোয়া ও দান-খয়রাত করিয়া থাকে। উহার ফলস্বরূপ তাহারা নূরের তবক প্রাপ্ত হইয়াছে; কিন্তু শেষোক্ত ব্যক্তির এক অসৎ পুত্র আছে; সে পিতার জন্য দান-খয়রাত বা দোয়া-কালাম কিছুই করে না। সেজন্য তাহার নূরের তবক নাই এবং প্রতিবেশীদের নিকট খুবই লজ্জিত। অতঃপর হযরত আবু কালাবা (রঃ) জাগ্রত হইয়া উক্ত ব্যক্তির পুত্রকে ডাকিয়া আনিয়া স্বপ্নযোগে যাহা কিছু অবগত হইয়াছিলেন আনুপূর্বিক সবকিছুই খুলিয়া বলিলেন। পুত্র বলিল, “হুযুর! আমি আপনার হাতে তাওবাহ করিয়া বলিতেছি, আর আমি কখনও পাপের কাজ করিব না এবং আজীবন পিতার কথা স্মরণ রাখিব এবং আল্লাহ তা'আলার নিকট তাহার জন্য মাগফেরাত কামনা করিব।” তারপর সে মৃত পিতার জন্য দান-খয়রাত ও এবাদত-বন্দেগীতে মশগুল হইল। কিছুদিন পর হযরত আবু কালাবা (রঃ) পূর্ববত সেই কবরগুলি স্বপ্নে দেখিতে পাইলেন, পূর্বের সেই নূরহীন মৃত ব্যক্তির নিকট সূর্যের কিরণ হইতে অতি উজ্জ্বল একটি নূরের তবক বিরাজ করিতেছে। আর সেই ব্যক্তি বলিল, “হে আবু কালাবা ! আল্লাহ তা'আলা আপনাকে আমার অপেক্ষা উৎকৃষ্ট পুরস্কার দান করুন। আমি আপনার সাহায্যের ফলে দোযখের আযাব ও প্রতিবেশীদের তিরস্কার হইতে মুক্তিলাভ করয়াছি।” 

হাদীস শরীফে আছে, একদা আজরাইল ফেরেশতা ইসকান্দর দেশীয় এক ব্যক্তির সহিত সাক্ষাত করিলেন। লোকটি তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “আপনি কে?” মালাকুল মউত বলিলেন, “আমি মৃত্যুদূত!” ইহা শ্রবণ করিয়া উক্ত ব্যক্তির পৃষ্ঠদেশ ও পাঁজরের মধ্যে অনুকম্পন আরম্ভ হইল। মৃত্যুদূত তাহাকে বলিলেন, “তুমি কেন এমন করিতেছ?” প্রত্যুত্তরে সে বলিল, “আমি দোযখের ভয়ে এমন করিতেছি।” অতঃপর মৃত্যুদূত তাহাকে বলিল, আমি কি তোমাকে একখানা চিঠি লিখিয়া দিব না, যাহা দ্বারা তুমি নরক হইতে পরিত্রাণ লাভ করিবে?” মালাকুল মউত একখণ্ড কাগজ লইয়া  “বিছমিল্লাহিররাহমানির রাহীম” অর্থাৎ “পরম করুণাময় ও অনন্ত দয়ালু আল্লাহ পাকের নামে আরম্ভ করিতেছি” লিখিয়া দিয়া বলিলেন- “ইহা দ্বারাই তুমি দোযখ হইতে পরিত্রাণ লাভ করিবে।"

আরও বর্ণিত আছে যে, কোন এক অলী-আল্লাহ্ কাহারও “বিছমিল্লাহির রাহমানির রাহীম” পাঠ শুনিয়া চীৎকার করিয়া বলিয়া উঠেন, “প্রিয়তমের নামই যখন এত মধুর, তখন তাঁহার দর্শন বা দীদার না জানি কতই মধুর?” তিনি আরও বলিলেন, “মানুষ বলিয়া থাকে যে, আজরাইলের কারণে পৃথিবী এক পয়সার তুল্যও মূল্যবান নহে, কিন্তু আমি বলিব, মৃত্যুদূতবিহীন পৃথিবী এক কপর্দকেরও সমান নহে। কেননা মৃত্যুদূতই বন্ধুর মিলন ঘটাইয়া থাকে।"

পরবর্তী পর্ব

দাকায়েকুল আখবার- (১৬) বান্দার প্রতি মাটির ঘোষণা

 

📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ১৬)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

বান্দার প্রতি মাটির ঘোষণা-
হযরত আনাস (রঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, মাটি প্রতিনিয়ত উচ্চৈঃস্বরে দশটি বাক্য ঘোষণা করে : 
(১) হে আদম সন্তান! আজ আমার পৃষ্ঠদেশে লাফালাফি দৌড়াদৌড়ি করিতেছ কিন্তু অতি সত্বরই তোমাকে আমার অভ্যন্তরে প্রবেশ করিতে হইবে। 
(২) আজ আমার পৃষ্ঠে পাপকাজ করিতেছ, কিন্তু আমার অভ্যন্তরে তোমাকে আযাব করা হইবে। 
(৩) আজ আমার পৃষ্ঠে হাস্য-কৌতুক করিতেছ, কিন্তু আমার অভ্যন্তরে তোমাকে কান্নাকাটি করিতে হইবে
(৪) আজ আমার পৃষ্ঠে হারাম মাল আরামে ভক্ষণ করিতেছ, কিন্তু আমার অভ্যন্তরে নিকৃষ্ট পোকা-মাকড় তোমার নধর দেহ পরমানন্দে ভক্ষণ করিবে।
(৫) হে আদম সন্তান! তুমি আমার পৃষ্ঠে আনন্দে ও মহাসুখে কালাতিপাত করিতেছ, কিন্তু আমার অভ্যন্তরে দুঃখিত ও চিন্তিত অবস্থায় থাকিতে হইবে।
(৬) আজ আমার পিঠে হারাম বস্তু আরামে ভক্ষণ করিয়া দেহ কাঠামো হৃষ্ট-পুষ্ট করিতেছ কিন্তু কালই উহা আমার অভ্যন্তরে বিগলিত হইয়া যাইবে। 
(৭) আজ আমার পৃষ্ঠে অহংকার ও গৌরব করিতেছ, কিন্তু কালই তোমাকে আমার অভ্যন্তরে লাঞ্ছিত, পদদলিত ও অপদস্থ হইতে হইবে। 
(৮) আজ আনন্দ ও উৎফুল্লচিত্তে আমার পৃষ্ঠে সানন্দে বিচরণ করিতেছ, কিন্তু কালই তোমাকে আমার অভ্যন্তরে দুশ্চিন্তার মহাসাগরে হাবুডুব খাইতে হইবে। 
(৯) আজ ভূ-পৃষ্ঠে আলোর বন্যায় বিচরণ করিতেছ, কিন্তু অচিরেই আমার অভ্যন্তরে ঘোর অন্ধকারে পড়িয়া থাকিবে। 
(১০) আজ আমার পৃষ্ঠে সদলবলে চলাফিরা করিতেছ, কিন্তু আমার অভ্যন্তরে তোমাকে নিঃসঙ্গ একা পড়িয়া থাকিতে হইবে।”
হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, কবর প্রতিনিয়ত তিন তিনবার উচ্চৈঃস্বরে ডাকিয়া বলে, “হে বান্দা! আমিই নির্জন নিবাস, আমিই অন্ধকারালয় এবং আমিই পোকা মাকড়ের আবাসস্থল; সুতরাং হে আল্লাহ তায়ালার বান্দা ! আমার অভ্যন্তরে সুখে দিন যাপন করিবার জন্যে কিছু পাথেয় সঞ্চয় করিয়াছ কি?” তাহা ছাড়া কবর আরও পাঁচ পাঁচবার ডাকিয়া বলিতে থাকে, 
“হে আল্লাহ্’র বান্দা ! আমার অভ্যন্তরে নির্জনবাসে প্রবেশ করিবার পূর্বে পবিত্র কোরআন পাককে বন্ধু হিসাবে সাথে করিয়া আনিও। আর আমার নীরব, নির্জন অন্ধকার কক্ষে প্রবেশ করিবার আগে গভীর রাত্রির এবাদতের নূর লইয়া আসিও। আর হে আল্লাহ্’র বান্দা! আমি কাঁচা মাটির নিবাসস্থল; সুতরাং আমার গৃহে প্রবেশ করিতে পুণ্যকর্মের বিছানাপত্র সঙ্গে আনিও। আর আমি সাপ-বিচ্ছুর নিবাসস্থল; সুতরাং আমার গৃহে আগমনের পূর্বে খয়রাত ও বিসমিল্লাহ্ পাঠ এবং চক্ষুর অশ্রু বিসর্জনরূপে ঔষধ ও প্রতিষেধক সঙ্গে করিয়া আনিও। আর হে আল্লাহর বান্দা ! আমিই হইলাম মুনকির-নকীরের কঠিন পরীক্ষাগার; সুতরাং পৃথিবীতে অত্যধিক পরিমাণে কালেমা তাইয়্যিবা পাঠ করিয়া আমার ভিতরে আগমন করিও। তাহা হইলেই তুমি নিস্তার লাভ করিবে।”

পরবর্তী পর্ব
জানকবজের পর রূহের চীৎকার

দাকায়েকুল আখবার- (১৫) রূহের বিবরণ

 

📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ১৫)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

রূহের বিবরণ-
হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, মানবাত্মা যখন দেহ পিঞ্জর হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া পড়ে, তখন আকাশমণ্ডল হইতে অতি উচ্চৈঃস্বরে তিনবার ডাকিয়া প্রশ্ন করা হয়, “হে আদম সন্তান! বল, তুমি কি পৃথিবী পরিত্যাগ করিয়া আসিয়াছ, না পৃথিবী তোমাকে পরিত্যাগ করিয়াছে? আর তুমি পৃথিবীকে অর্জন করিয়াছিলে, না পৃথিবী তোমাকে অর্জন করিয়াছিল? আর হে বান্দা! পৃথিবী কি তোমাকে গ্রহণ করিয়াছিল, নাকি তুমিই আল্লাহতায়ালাকে বিস্মিত হইয়া পৃথিবীকে গ্রহণ করিয়াছিলে?”
আবার যখন গোসল দেওয়ার জন্য স্নানের জায়গায় রাখা হয় তখনও গগনমণ্ডল হইতে তিনবার উচ্চৈঃস্বরে আওয়াজ দিয়া বলা হয়, “ওহে আদম সন্তান! তোমার সেই শক্তিমান দেহবল্লরী এখন কোথায়? আর কে-ই বা তোমাকে এত দুর্বল ও অসহায় করিয়াছে? আর তোমার সেই বাকপটু জিহ্বা কোথায়? এখন কেন তুমি নির্বাক হইয়া পড়িয়া রহিয়াছ; আর তোমার সেই তীক্ষ্ণ শ্রবণেন্দ্রীয় কর্ণদ্বয়কে এমন বধির করিয়াছে কে? আর কেইবা নিরেট নিষ্ঠুরের মত তোমাকে স্বীয় বন্ধু-বান্ধব হইতে পৃথক করিয়া দিয়াছে?”
তারপর যখন কাফন পরানো হয়, সেই সময়ও আকাশমণ্ডল হইতে তিনবার অতি উচ্চৈঃস্বরে ডাক দিয়া বলা হয়, “হে আদম সন্তান! তুমি যদি বেহেশতি বান্দা হইয়া থাক, তাহা হইলে ইহা সুসংবাদের কথাই বটে, কিন্তু তুমি যদি দোযখী বান্দা হইয়া থাক, তাহা হইলে তোমার জন্যে শত আক্ষেপ! আর হে আদম সন্তান! তোমার প্রতি যদি আল্লাহ তা'আলা সন্তুষ্ট ও রাজি থাকেন, তবেই অতি উত্তম; কিন্তু আল্লাহ তায়ালা যদি তোমার প্রতি ক্রোধান্বিত হইয়া থাকেন, তবে ইহার পরিণাম অত্যন্ত ভয়াবহ।” আর তৃতীয়বার বলা হয়, “ওহে আদম সন্তান! তুমি এখন এক দুর্গম ও কন্টকাকীর্ণ পথে যাত্রা করিবে । তুমি চিন্তা করিয়াছ কি? আর সেই দুর্গম পথের সম্বল তোমার আছে কি? আজ তুমি নিজে সুখ-শয্যা পরিত্যাগ করিয়া অতি বিপদ-সঙ্কুল ভয়ঙ্কর স্থানে গমন করিবে, কিন্তু কখনও আর ফিরিয়া আসিতে পারিবে না।”
আবার যখন মৃত ব্যক্তিকে খাটের ওপর রাখা হয়, তখন পূর্বের ন্যায় তিনবার ঘোষণা করা হয়, “ওহে আদম সন্তান! যদি তুমি পুণ্যবান হইয়া থাক, তাহা হইলে তোমার জন্যে শুভসংবাদ। আর দুষ্কর্মশীল হইলে তোমার নিমিত্ত রহিয়াছে দুঃসংবাদ; কিন্তু তুমি যদি আল্লাহ তা'আলার রেজামন্দি হাসিল করিয়া থাক এবং তাওবাহ করিয়া থাক, তাহা হইলে খুব উত্তম করিয়াছ। অন্যথায় তোমার পরিণাম অত্যন্ত মন্দ হইবে।
অতঃপর যখন খাটকে জানাযার নামাযের জন্য সারিবদ্ধ কাতারের সম্মুখে রাখা হয়, তখন আবার পূর্বের ন্যায় ঘোষণা করা হয়, “হে আদম সন্তান! তুমি তোমার জীবনে ভাল-মন্দ যাহা কিছু সম্পন্ন করিয়াছ এখন সবকিছুই প্রত্যক্ষ করিবে। যদি সৎভাবে ও পুণ্য সঞ্চয়ের ভিতর দিয়া স্বীয় জীবনকে অতিবাহিত করিয়া থাক, তবে তোমার জন্যে রহিয়াছে সুসংবাদ; কিন্তু যদি মন্দভাবে পাপের স্রোতে গা ভাসাইয়া জীবনকে অতিবাহিত করিয়া থাক, তবে তোমার ধ্বংস অবধারিত।”

অতঃপর মৃত ব্যক্তিকে যখন কবরের পার্শ্বে রাখা হয়, তখন কবর তাহাকে তিনবার ডাকিয়া বলে, “ওহে আদম সন্তান! একদিন আমার পৃষ্ঠপোরি পরমানন্দে হাসিয়া খেলিয়া বেড়াইয়াছ, এখন কাঁদিতে কাঁদিতে আমার অভ্যন্তরে প্রবেশ কর । আর এক কালে আমার পৃষ্ঠদেশে কত আনন্দ ও উৎফুল্ল হৃদয়ে কাল অতিবাহিত করিয়াছিলে, এখন চিন্তিতাবস্থায় আমার মধ্যে প্রবেশ কর, আর এককালে তুমি বেশ বাকপটু ছিলে, কিন্তু এখন নির্বাক ও বিমর্ষ চিত্তে আমার অভ্যন্তরে দাখিল হও।

”তারপর দাফন-কার্য সমাপন করিয়া লোকজন যখন নিজ নিজ গন্তব্যস্থলে চলিয়া যায়, তখন পরম কৌশলী আল্লাহ্ তায়ালা বলেন, “ওহে আমার প্রিয় বান্দা! আজ তুমি নির্জন কবরের মাঝে ঘোর অন্ধকারে বন্ধু-বান্ধব ও দোসরহীন একা একা পড়িয়া রহিয়াছ। আত্মীয়-স্বজন সকলেই তোমাকে ছাড়িয়া চলিয়া গিয়াছে; কিন্তু এক সময় তুমি তাহাদের জন্য আমার বিধি-নিষেধের গণ্ডি অতিক্রম করিয়া পাপকাজে পরিলিপ্ত হইয়াছিলে এবং আমাকে ভুলিয়া গিয়াছিলে। হে বান্দা! আজ এই দুর্দিনে তোমার প্রতি আমি অত্যন্ত দয়ালু ও মেহেরবান হইব। যাহা দর্শন করিয়া আমার সৃষ্ট জীবসকল বড়ই আশ্চর্যান্বিত হইয়া পড়িবে। হে বান্দা! জানিয়া রাখ, মাতা সন্তানের প্রতি যতটুকু স্নেহশীল ও মায়াময়ী হইয়া থাকে, আমি আমার বান্দার জন্যে তদপেক্ষাও অধিক স্নেহশীল ও দয়ালু।”

পরবর্তী পর্ব

দাকায়েকুল আখবার- (১৪) মানুষের ঈমান নষ্ট করিতে শয়তানের চেষ্টা

 

📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ১৪)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

মানুষের ঈমান নষ্ট করিতে শয়তানের চেষ্টা-
হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, জান কবজের সময় শয়তান মৃত্যুর পথযাত্রীকে সম্বোধন করিয়া বলে, “হে বান্দা! তুমি যদি এই অসহ্য যন্ত্রণা হইতে নিস্তার লাভ করিতে ইচ্ছা কর, তবে ইসলাম ধর্ম পরিত্যাগ করিয়া দুইজন খোদার অস্তিত্ব স্বীকার কর।” এই সঙ্কট মুহূর্ত ঈমান রক্ষা করা বড়ই বিপজ্জনক হইয়া পড়ে। এইজন্য বলিতেছি, হে বন্ধুগণ! সেই বিপদ ও সঙ্কট হইতে উদ্ধার পাইতে হইলে অধিক পরিমাণে অশ্রু বর্ষণ সহকারে রাত্রি জাগরণ করিয়া রুকু-সিজদায় মশগুল হউন এবং আল্লাহ পাকের দরবারে কান্নাকাটি করুন। 
হযরত ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) কে জনৈক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করিলেন, “হুযুর! কোন কাজে ঈমান নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা বেশী?” প্রত্যুত্তরে তিনি বলিলেন, “(১) ঈমানের শুকরিয়া আদায় না করিলে, (২) জীবনের শেষ মুহূর্তকে ভয় না করিলে এবং (৩) আল্লাহ তায়ালার বান্দাদের উপর জুলুম ও অত্যাচার করিলে ঈমান নাশের সম্ভাবনা থাকে।”
তিনি আরও বলিয়াছেন, “যাহাদের মধ্যে এই তিনটি দোষ বিদ্যমান, আমার মনে হয় তাহারা সকলেই বেঈমান হইয়া মৃত্যুমুখে পতিত হইবে; কিন্তু আল্লাহ তা'আলা যদি কাহারও ভাগ্যবলে ঈমান বিনষ্ট না করেন, তবে সে ঠিক থাকিবে।” এইজন্য আমরা সর্বান্তঃকরণে আল্লাহ তা'আলার নিকট এই সকল অপকর্ম হইতে ক্ষমা প্রার্থনা করিতেছি।

হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, জান কবজের সময় মুমূর্ষু ব্যক্তি পিপাসায় ও হৃৎপিণ্ডের যন্ত্রণায় অত্যন্ত কাতর ও অস্থির হইয়া যায়। এমন সময় শয়তান বান্দার ঈমান নষ্ট করিবার জন্য সচেষ্ট হয়। সেই সময় বান্দা যখন পিপাসায় কাতর হইয়া যায়, তখন শয়তান এক পেয়ালা ঠান্ডা-পানি লইয়া বান্দার সম্মুখে উপস্থিত হয় এবং পেয়ালাটি আন্দোলিত করিতে থাকে। তখন কাতর বান্দা ভুলবশতঃ শয়তানের নিকট পানি চায়। উত্তরে শয়তান বলে, “হে বান্দা! তুমি যদি এই কথা বল যে, এই বিশ্ব-জগতের কোন প্রতিপালক নাই, তবেই তোমাকে আমি এই পানি পান করাইতে পারি।”  ইহাতে বান্দা যদি কোন উত্তর প্রদান না করে, তবে শয়তান পুনরায় তাহার পদযুগলের সন্নিকটে বসিয়া পানির পেয়ালা নাড়াচাড়া করিতে থাকে। তখন উক্ত বান্দা বলে, “আমাকে কিছু পানি দাও।” উত্তরে শয়তান বলে, “হে বান্দা! তুমি যদি বলিতে পার যে, রাসূলগণ মিথ্যাকথা প্রচার করিয়া গিয়াছে, তবে তোমাকে পানি পান করাইতে পারি।” এমতাবস্থায় যাহার ভাগ্যে বদবখতি লেখা আছে, সে পিপাসার যাতনা সহ্য করিতে না পারিয়া শয়তানের ইচ্ছা অনুসারে কাজ করিয়া বেঈমান অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে এবং ধর্ম-ভীরু ও আল্লাহভক্ত ব্যক্তি ঈমানের শক্তির প্রভাবে শয়তানের প্ররোচনা হইতে নিজেকে মুক্ত রাখিতে সক্ষম হয় ও পবিত্র ঈমানের সহিত তাহার রূহ, অনন্ত রাজ্যে বিলীন হইয়া যায়।

হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, বিখ্যাত সুফী আবু জাকারিয়া (রহঃ) -এর জান কবজের সময় তাহার এক প্রিয়তম বন্ধু তাহাকে কালেমায়ে শাহাদাত তালকীন দিতে (পড়াইতে) শুরু করেন; কিন্তু প্রত্যুত্তরে সুফী আবু জাকারিয়া (রহঃ) কিছুই বলিলেন না এবং মুখমণ্ডল অন্যদিকে ফিরাইয়া লইলেন। দ্বিতীয়বারও তিনি এমনই করিলেন এবং তৃতীয়বার তালকীনের সময় বলিলেন, “আমি ইহা বলিব না ।” ফলে বন্ধুবর অত্যন্ত বিচলিত ও চিন্তিত হইয়া পড়িলেন। এইভাবে কিছুক্ষণ অতিবাহিত হইয়া যাওয়ার পর আবু জাকারিয়া (রহঃ) যাতনার শীতলতা অনুভব করতঃ চক্ষুদ্বয় উন্মিলিত করিয়া বলিলেন, “হে বন্ধু! তুমি কি আমাকে কোন কথা জিজ্ঞাসা করিয়াছিলে?” বন্ধুবর বলিলেন, “হ্যা আমরা আপনাকে তিনবার কালেমায়ে শাহাদাত তালকীন করিয়াছি, কিন্তু দুইবারই আপনি মুখমণ্ডল অন্যদিকে ফিরাইয়া লইয়াছিলেন এবং তৃতীয়বার বলিয়াছিলেন যে, “আমি ইহা বলিব না।” তখন সুফী আবু জাকারিয়া (রহঃ) বলিলেন, “বিতাড়িত ইবলিস শয়তান এক পেয়ালা পানিসহ আমার ডানদিকে দাঁড়াইয়া এবং পানির পাত্রটি নাড়াচাড়া করিয়া আমাকে জিজ্ঞাসা করিল, “হে বান্দা! তুমি কি পানি পান করিবে?” আমি উত্তর করিলাম, “হ্যা পান করিব।” তখন শয়তান বলিল, “যদি তুমি বল যে, হযরত ঈসা (আঃ) আল্লাহ তায়ালার পুত্র ছিলেন, তবে তোমাকে আমি পানি পান করাইব।” এইকথা শ্রবণ করিয়া আমি মুখ ফিরাইয়া লইয়াছি। তারপর শয়তান পায়ের কাছে আসিয়াও সেই কথা বলিল, তখনও আমি মুখ ফিরাইয়া লইয়াছি। তৃতীয়বার শয়তান আমাকে বলিল- “তুমি অন্ততঃ বল, 'লা-ইলাহা অর্থাৎ কোনই উপাস্য নাই।” ইহার প্রত্যুত্তরে আমি বলিলাম, আমি কখনও এই কথা বলিব না। ইহা শ্রবণ করিয়াই শয়তান পানির পাত্রটিকে মাটিতে নিক্ষেপ করিয়া চলিয়া গেল। আমি মরদুদ্ শয়তানের কথার উত্তর দিয়াছি মাত্র। আমি তোমাদের কথার উত্তর দেই নাই। এখন আমি সাক্ষ্য দিতেছি যে, “আল্লাহ তায়ালা ব্যতীত আর কোনও উপাস্য নাই এবং আমি আরও সাক্ষ্য দিতেছি যে, হযরত মুহাম্মদ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আল্লাহ তা'আলার বান্দা এবং রাসূল ছিলেন ।”

হযরত মানসুর ইব্‌নে আম্মার (রাঃ) এই প্রসঙ্গে বর্ণনা করিয়াছেন যে, মুমূর্ষু ব্যক্তির অবস্থাকে মোটামুটি পাঁচভাগে ভাগ করা হইয়া থাকে। যেমন- (১) তাহার ধন-সম্পদ নিজের উত্তরাধিকারদের মধ্যে বন্টন করিয়া দেওয়া হয়, (২) মালাকুল মউত রূহ্ লইয়া অনন্তে বিলীন হইয়া যায়, (৩) দেহের মাংস কীট-পতঙ্গে খাইয়া ফেলে, (৪) হাড় অস্থি মাটির সহিত মিশিয়া যায় এবং (৫) সৎকর্মগুলি ইহার হকদারেরা লইয়া যায়। তবে প্রত্যেকে স্বীয় প্রাপ্যাংশ বন্টন করিয়া লইয়া যাইতে অনুশোচনা করিবার কিছুই নাই; কিন্তু, হায়! বিতাড়িত শয়তান যেন ঈমান হরণ করিতে না পারে। পবিত্র ঈমান হইতে বিচ্ছিন্ন হওয়ার অর্থ আল্লাহ পাক হইতে বিচ্ছিন্ন হওয়া মাত্র। ইহার ক্ষতিপূরণ সম্পূর্ণ অসম্ভব। আল্লাহ তা'আলা আমাদের 'খাতেমা বিখায়ের’ এনায়েত করুন, আমিন।

পরবর্তী পর্ব

দাকায়েকুল আখবার- (১৩) মৃত্যুমুহূর্তে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কাতর ফরিয়াদ

 

📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ১৩)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

মৃত্যুমুহূর্তে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কাতর ফরিয়াদ-
হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, যখন কাহারো মৃত্যুর সময় ঘনাইয়া আসে, তখন মালাকুল মউত তাহার আত্মা কবজ করিবার জন্য বান্দার মুখের নিকট আগমন করেন, তখন তাহার মুখমন্ডল আল্লাহ্ তা'আলার জিকির করিতে করিতে বলে, "মৃত্যুদূত! ক্ষান্ত হও, আর সন্মুখে অগ্রসর হইওনা। এই পথে তোমার মনঃবাসনা পূর্ণ হইবেনা। কারণ এই পথে প্রতিনিয়ত আল্লাহ্ তা'আলার জিকির হইয়াছে'। তখন মৃত্যুদূত আল্লা্হ্ তা'আলার কাছে আরজ করেন,"হে আল্লাহ্ ! আপনার বান্দা এরূপ বলিতেছে। আমি এখন কি করিতে পারি?" তখন আল্লাহ্ তা'আলা তাহাকে অন্যদিক হইতে চেষ্টা করিতে নির্দেশ করিবেন। নির্দেশ মত মালাকুল মউত এইবার তাহার হস্তের দিক হইতে প্রাণ সংহারের মৃত্যুবান নিক্ষেপ করিতে উদ্যত হইবেন। তখন হাত বাধা দিয়া বলিবে "হে মৃত্যুদূত আমি তোমাকে এই পথে আক্রমন করিতে বারণ করিতেছি। কারণ এই হাত দ্বারা আমি অনেক দান খয়রাত করিয়াছি।, সস্নেহে এতিমের মস্তক স্পর্শ করিয়াছি, কত লেখনি চালনা করিয়াছি এবং শাণিত কৃপাণ দৃঢভাবে ধারণ করিয়া কাফের বেদ্বীনের গ্রীবাদেশে চালনা করিয়াছি। অতএব তুমি এই পথে আক্রমন করিওনা।" অতঃপর মালাকুল মউত পদদ্বয়ের দিক হইতে মৃত্যুবাণ নিক্ষেপ করিতে সচেষ্ট হইবেন। তখন পদযুগল দৃঢস্বরে বাধা প্রদান পূর্বক বলিবে, "হে মালাকুল মউত! ক্ষান্ত হও, আর সন্মুখে অগ্রসর হইওনা। এই দিক দিয়া আমাকে আক্রমন করিওনা পদদ্বয়ের সাহায্যে আমি জুমআ আর জামাতের জন্য দৌড়াইয়াছি। রোগীর সেবাযত্নের জন্য গমন করিয়াছি। বিদ্যার্জনের জন্য জ্ঞানীদের মজলিসে যোগদান করিয়াছি।" তার পর মালাকুল মউতের আক্রমন কর্ণদ্বয়ের প্রতি আকৃষ্ট হইতেছে দেখিয়া, তাহারা বলিবে! ক্ষান্ত হও! এদিকে অগ্রসর হইওনা। আমি এই কর্ণদ্বারা আল্লাহ্ তা'আলার পবিত্র কালাম ও যিকির শুনিয়া হৃদয়কে পবিত্র ও আলোকিত করিয়াছি।" অতঃপর নেত্র দ্বয়ের দিকে আক্রমন করিবার উপক্রম করিলে তাহারা বলিবে, "হে মালাকুল মউত! ক্ষান্ত হও, ধৈর্যধারণ কর, আমাদের দ্বারা পবিত্র কুরআনের প্রতি ও আলেমগণের প্রতি দৃষ্টিপাত করা হইয়াছে। এজন্য তুমি নেত্রদ্বয়ের ক্ষেত্রে আক্রমন চালাইওনা।" মালাকুল মউত বান্দার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সহিত তর্কযুদ্বে পরাস্ত হইয়া আল্লাহ্ তাআলার নিকট আরজ করিবেন, হে আল্লাহ্! আপনার বান্দা আমাকে যুক্তি-তর্কে পরাস্ত করিয়াছে ও এইরূপ বলিয়াছে। এখন আমি কিরূপে তাহার রূহ্ কবজ করিব, বলুন।" প্রত্যুত্তরে আল্লাহ্ তা'আলা বলিবেন, "হে মালাকুল মউত! এভাবে তুমি তাহার জান কবজ করিতে সক্ষম হইবেনা, বরং তুমি তোমার হাতের উপর আমার নাম লিখিয়া আমার প্রিয় মুমিন বান্দার সম্মুখে উপস্থাপন কর। তবেই দেখিবে যে, আমার বান্দার রূহ্ আমার নাম দেখিতে দেখিতে কষ্ট-ক্লেশ ব্যাতীত হাসিতে হাসিতে অনন্তে মিলিয়া যাইবে।" অতঃপর মালাকুল মাউত তাহাই করিবেন। ইহাতে বান্দার রূহ্ আল্লাহ্ তা'আলার পবিত্র নামের মায়ায় বিমুগ্ধ হইয়া মৃত্যুকষ্ট বিস্মৃত হইয়া পরমানন্দে অন্তরের পথে বিলিন হইয়া যাইবে।

তাই বন্ধুগণ, মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করুন, যাহারা নিজ অন্তর প্রদেশে আল্লাহর নামের মোহর অংকিত করিতে সক্ষম হইয়াছেন, নিশ্চয় তাহারা আল্লাহ প্রদত্ত সুকঠিন শাস্তি বিচ্ছিন্নতার কষ্ট ও যাতনা এবং অপদস্থতার তীব্র গ্লানি হইতে নিস্তার লাভ করিবেন। যেমন আল্লাহ্ তা'আলা এরশাদ করেন, -("উলাইকা কাতাবা ফি কুলুবিহিমুল ঈমানা") অর্থাত : "উহারাই, যাহাদের হৃদয় কন্দরে আল্লাহ্ তা'আলা ঈমানের মোহর অংকিত করিয়া দিয়াছেন।" আর আল্লাহ্ তা'আলা আরো ইরশাদ করেন, - ("আফামান্ শারাহাল্লাহু ছাদরাহু লিল্ ইসলামি ফাহুয়া আলানুরিম্-মির রাব্বিহ্") অর্থাত : আল্লাহ্ তা'আলা যাদের অন্তকরণকে পবিত্র ইসলামের জন্য সম্প্রসারিত করিয়াছেন, নিশ্চয় তাহারা আল্লাহ্ তা'আলার প্রদত্ত জ্যাতিতে বিরাজ করিতেছে। অতএব সে কিয়ামতের দিন আযাবের ভয় হইতে পরিত্রাণ লাভে সক্ষম হইবে"।

অন্য এক হাদিসে বর্ণিত আছে যে, যখন কোন বান্দার জান কবজ আরম্ভ হয়, তখন আল্লাহ্ তা'আলার তরফ হইতে কেহ উচ্চৈঃস্বরে ডাকিয়া বলে, "হে মালাকুল মউত! ক্ষান্ত হও কিছু সময় তাহাকে আরাম করিতে দাও।" আর রূহ্ যখন বক্ষস্থল পর্যন্ত আসে তখন পূনরায় ডাকিয়া বলা হয় যে, "হে মৃত্যুদূত ক্ষান্ত হও, ক্ষান্ত হও, আরো কিছু সময় তাহাকে আরাম করিতে দাও।" অনুরূপ ভাবে হাটু ও নাভী পর্যন্ত পৌছিলেও তেমনি বলা হইয়া থাকে। পরিশেষে রূহ্ যখন কন্ঠ পর্যন্ত পৌছিয়া যায় তখন অতি উচ্চৈঃস্বরে বলা হয় হে মালাকুল মউত! ক্ষান্ত হও! ক্ষান্ত হও! তা্হাকে নিজের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ হইতে চিরবিদায় গ্রহন করিবার জন্য কিছু সময় প্রদান কর।" তখন চক্ষুদ্বয় রূহ্কে বিদায় দিয়া বলে, হে বন্ধু কিয়ামত পর্যন্ত তোমার উপর শান্তি ও রহমত বর্ষিত হউক।" অনুরুপ ভাবে উভয় হস্ত, উভয় কর্ণ এবং পদদ্বয় রূহ্কে আশীর্বাদ করিয়া চির বিদায় গ্রহন করে।

আমরা আল্লাহ্ তা'আলার দরবারে প্রার্থনা করিতেছি যেন আমাদের রসনা হইতে ঈমানের বাণী এবং অন্তর হইতে মারেফাতের জ্যোতি বিদায় করিতে না হয়। তারপর হস্তদ্বয়, পদদ্বয় নিস্তেজ হইয়া পড়িয়া থাকে এবং চক্ষুদ্বয় জ্যোতিহীন ও কর্ণদ্বয় শ্রবণ শক্তিহীন এবং দেহ কাঠামো আত্মাহীন হইয়া পরিয়া থাকে।

আহা! সে সময় যদি রসনা শাহাদত বিহীন ও আত্মা আল্লাহ্ তা'আলার মারেফত বিহীন পরিয়া থাকে, তবে সেই বান্দাকে কবরের মধ্যে কতইনা দুরবস্থা ও দুঃখ যাতনা ভোগ করিতে হইবে। যেখানে মাতা-পিতা, ভ্রাতা-ভগ্নি, বন্ধু-বান্ধব, পূত্র-কন্যা, পাড়া-প্রতিবেশী, বিছনাপত্র ও আবরণ বলিতে কিছুই থাকিবেনা। আহা! সে সময় যদি আল্লাহ্ অনুগ্রহ না করেন তাহলে তাহাকে প্রচুর পরিমাণে ক্ষতিগ্রস্ত হইতে হইবে।
ইমাম আযম হযরত আবু হানিফা (রহঃ) বলিয়াছেন, "জান কবজের সময় বান্দার ঈমান নষ্ট হইবার অত্যাধিক সম্ভাবনা থাকে।" 
ঈমান নষ্ট না করার জন্য আমরা পরম করুনাময়ের সাহায্য ও অনুকম্পা কামনা করিতেছি। আমিন! আমিন!!

পরবর্তী পর্ব

দাকায়েকুল আখবার- (১২) আত্মার কথোপকথনের বিবরণ

 

📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ১২)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

আত্মার কথোপকথনের বিবরণ-
পবিত্র হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, মালাকুল মউত যখন কাহারও জান কবজ করিতে উপস্থিত হন, তখন নেককারের আত্মা তাহাকে লক্ষ্য করিয়া বলে, "হে মালাকুল মউত!  আল্লাহ তা'লার অনুমতি ও আদেশ ব্যতীত তোমার অনুগত হইতে সম্মত নহি। তোমাকে আমার জান কবজ করিতে দিব না!" তখন মালাকুল মউত বলিবে, "হে আল্লাহর বান্দা! আল্লাহ তা'আলা স্বয়ং আমকে তোমার রূহ কবজ করিতে নির্দেশ দিয়াছেন।" তখন আত্মা বলিবে, "হে মৃত্যুদূত! যদি তুমি সত্য হও, তবে উহার প্রমাণ স্বরূপ নিদর্শন প্রদর্শন কর। কারণ আল্লাহ তায়ালা আমার দেহকে সৃষ্টি করিয়া উহাতে আমাকে বসবাস করিতে অনুমতি প্রদান করিয়াছেন, তখন তুমি উপস্থিত ছিলে না । এখন কোথা হইতে আমায় কবজ করিতে আসিয়াছ?" তারপর মালাকুল মউত আল্লাহ তা'আলার সমীপে আরজ করিবেন, "হে আল্লাহ ! আপনার বান্দা এইরূপ বলিতেছে এবং আপনার নিদর্শন কামনা করিতেছে।" প্রতুত্তরে আল্লাহ এরশাদ করিবেন "হে মালাকুল মউত! আমার বান্দার রূহ্ সত্য কথাই বলিয়াছে; সুতরাং তুমি বেহেশতে চলিয়া যাও এবং উহা হইতে আমার নাম অঙ্কিত একটি সেব-ফল আনিয়া তাহার রূহের সম্মুখে স্থাপন কর।" অতঃপর মালাকুল মউত বেহেশতে চলিয়া যাইবে এবং "বিসমিল্লাহ"  খোদিত একটি সেব-ফল আনিয়া তাহার সম্মুখে রাখিবে। আর তখনই বান্দার রূহ উহা দেখিতে দেখিতে পরম আনন্দে বাহির হইয়া যাইবে।

পরবর্তী পর্ব

দাকায়েকুল আখবার- (১১) মৃত্যুস্থানের বিবরণ

 

📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ১১)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

 মৃত্যুস্থানের বিবরণ-
অনন্ত দয়াময় আল্লাহ তা'আলা 'মালাকুল আরহাম' নামক এক শ্রেণীর ফেরেশতা সৃষ্টি করিয়াছেন। তাহারা শিশু মাতৃগর্ভে থাকা অবস্থায় তাহার মৃত্যুস্থানের মাটি বীর্যের সহিত মিশ্রিত করিয়া দেন। জন্ম-লাভের পর বান্দা পৃথিবীর যেখানে সেখানে পরিভ্রমণ করে; কিন্তু মৃত্যুর পূর্বক্ষণে সে বীর্যের সহিত মিশ্রিত মাটির জায়গায় আসিয়া হাজির হয়। তখন সেখানে তাহার রূহ কবজ করা হয়। আল্লাহ তা'আলার বাণীই ইহার জ্বলন্ত প্রমাণ। আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করিয়াছেন "হে নবী! আপনি বলিয়া দিন, যদি তোমরা তোমাদের গৃহেও অবস্থান করিতে, তথাপি যাহার যেখানে মৃত্যু লেখা আছে, তাহাকে অবশ্যই সেই মৃত্যুস্থানে পৌঁছিতে হইবে।"
হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে, প্রাচীনকালে হযরত মালাকুল মউত পয়গাম্বরদের সহিত সাক্ষাত করিতে আসিতেন। একদিন তিনি হযরত দাউদ (আঃ) এর পুত্র হযরত সুলাইমান (আঃ) এর সহিত সাক্ষাত করিতে আসিলেন। তথায় তিনি একজন সুশ্রী যুবকের প্রতি তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করিলেন। ফলে উক্ত যুবক ভীত ও কম্পিত হইয়া পড়িল। মালাকুল মউতের প্রস্থানের পর যুবকটি হযরত সুলাইমান (আঃ) এর নিকট আরজ করিল, "হে আল্লাহর রাসূল! আশা করি বায়ু আপনার হুকুমে এখনই আমাকে চীনদেশে পৌঁছাইয়া দিবে।"  অতঃপর হযরত সুলাইমান (আঃ) এর নির্দেশে বায়ু সে যুবকটিকে তখনই চীনদেশে পৌঁছাইয়া দিল। পুনরায় মালাকুল মউত সুলাইমান (আঃ) এর দরবারে উপস্থিত হইলে তিনি তাহাকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিপাতের কারণ জিজ্ঞাসা করিলেন। উত্তরে মালাকুল মউত বলিলেন,  "আমি সেইদিনই তাহার রূহ চীনদেশে কবজ করিবার জন্যে আদিষ্ট হই, কিন্তু তাহাকে আপনার নিকট দেখিয়া আশ্চর্যান্বিত হইয়া পড়ি।" তারপর হযরত সুলাইমান (আঃ) সেই যুবকের চীনদেশে গমনের গল্প শুনাইলেন। তখন মালাকুল মউত বলিলেন,  আমি ঐদিনই তাহার রূহ্ চীনদেশে কবজ করিয়াছি"। 
অন্য এক হাদীসে বর্ণিত আছে যে, রূহ কবজ করিবার নিমিত্ত মালাকুল মউতের অসংখ্য সহকর্মী আছে। যেমন কোনও ব্যক্তি সর্বদা প্রার্থনা করিয়া বলিত,  "হে আল্লাহ! আমাকে এবং সূর্যের তত্ত্বাবধায়ক ফেরেশতাকে ক্ষমা করুন।"  সূর্যের তত্ত্বাবধায়ক ফেরেশতা একদা আল্লাহ পাকের অনুমতি লইয়া সেই ব্যক্তির সহিত সাক্ষাত করিতে আসিলেন এবং তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন,  "হে বন্ধু! বলুন ত আপনি কি প্রয়োজনে আমার জন্য এত বেশি দোয়া করিয়া থাকেন।"  সে উত্তর করিল, "আমার আশা আপনি আমাকে আপনার স্থানে লইয়া যান এবং মালাকুল মউতের নিকট হইতে জানিয়া আমাকে আমার মৃত্যুর নৈকট্যতা সম্বন্ধে অবগত করান।"  এই উপলক্ষে তিনি তাহাকে স্বীয় স্থান সূর্যে বসাইয়া রাখিয়া মালাকুল মউতের নিকট গমন করিলেন এবং তাহাকে আদ্যোপান্ত সমস্ত ঘটনা শুনাইয়া উক্ত ব্যক্তির মৃত্যু সময় সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করিলেন। প্রত্যুত্তরে মালাকুল মউত নিজের ডাইরী খুলিয়া বলিলেন, "এই লোকটির ঘটনা অত্যন্ত আশ্চর্যজনক। আমার ডাইরীতে লিপিবদ্ধ আছে যে, এই ব্যক্তি যতক্ষণ পর্যন্ত তোমার স্থান সূর্যে অবস্থান না করিবে ততক্ষণ পর্যন্ত তাহার মৃত্যু হইবে না।"  তখন প্রশ্নকারী বলিলেন, "সে এখন আমার স্থানে বসিয়া রহিয়াছে।"  উত্তরে মালাকুল মউত বলিলেন, "তবে অবশ্যই এতক্ষণে আমার সহকর্মীগণ তাহার রূহ কবজ সম্পন্ন করিয়া ফেলিয়াছেন। কেননা তাহারা কখনও স্বীয় কার্যে গাফলতি বা অবহেলা করেন না।" 
জীব-জন্তু ও পশু-পক্ষীর হায়াত সম্পর্কে জনাব হুযুর করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ ফরমাইয়াছেন যে, আল্লাহ তা'আলার যিকিরই তাহাদের জীবন। যখন তাহারা আল্লাহ তায়ালার যিকির ছাড়িয়া দেয় তখনই আল্লাহ তা'লা তাহাদের আত্মা সংহার করিয়া থাকেন; তাহাদের সহিত মালাকুল মউতের কোন সম্পর্ক নাই। আরও বলা হইয়াছে যে, প্রকৃতপক্ষে যাবতীয় জীবের আত্মা আল্লাহ পাকই সংহার করিয়া থাকেন। কিন্তু হত্যাকার্যকে হন্তার প্রতি এবং মুত্যুকে রোগের প্রতি যেমন নেছবত বা সম্বন্ধযুক্ত করা হয়, তেমনি মৃত্যুর সহিত মালাকুল মউতের নেছবত বা সম্পর্ক বিদ্যমান রহিয়াছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা এরশাদ করিয়াছেন "মৃত্যুর সময় হইলে আল্লাহ তা'আলাই রূহ কবজ করিয়া থাকেন এবং তাহারা নিদ্রার সময় মৃত্যুবরণ করে না, কিন্তু মৃত্যুর সময় হইলে তাহার আত্মা কাড়িয়া লওয়া হয় আর অন্যান্য লোকদিগকে এক নির্দিষ্ট কালের জন্য মুক্তি দেওয়া হয় নিশ্চয়ই উহাতে চিন্তাশীলদের জন্য নিদর্শনাবলী বিদ্যমান রহিয়াছে।"

পরবর্তী পর্ব

দাকায়েকুল আখবার- (১০) মালাকুল মউত যেরূপে রূহ কবজ করে

 

📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ১০)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

মালাকুল মউত যেরূপে রূহ কবজ করে-
সলবি নামক গ্রন্থে হযরত মোকাতেল (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, "আল্লাহ তায়ালা মালাকুল মউত ফেরেশতার জন্য সপ্তম বা চতুর্থ আকাশে সত্তর হাজার স্তম্ভের উপর একটি নূরের সিংহাসন সংস্থাপন করিয়াছেন। মালাকুল মউতের চারিখানা পাখা আছে। এবং তাহার সমস্ত দেহে মানব-দানব, পশু-পাখী, কীট-পতঙ্গ ইত্যাদির সংখ্যানুপাতে জিহ্বা ও চক্ষু রহিয়াছে। অর্থাৎ এমন কোন প্রাণী নাই, যাহার নিমিত্ত তাহার শরীরে মুখ, হাত ও চক্ষু নাই। সেখান হইতেই তিনি তাহাদের রূহ কবজ করেন।"
একদিন হযরত নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিলেন যে, মালাকুল মউতের উত্তরে, দক্ষিণে, সম্মুখে, পশ্চাতে, উপরে ও নীচে সর্বমোট ছয়খানা মুখমণ্ডল রহিয়াছে। তখন সাহাবাগণ আরজ করিলেন, "হে আল্লাহর রাসূল! সেই ছয়খানা মুখের তাৎপর্য ও রহস্য কি?" প্রত্যুত্তরে নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিলেন,  "মালাকুল মউত তাহার উত্তর মুখ দিয়া পশ্চিম দেশীয় প্রাণীদের রূহ কবজ করেন; আর দক্ষিণ মুখ দিয়া পূর্ব দেশীয় প্রাণীদের রূহ কবজ করেন। পশ্চাতের মুখ দিয়া পাপী ও দোযখীদের আত্মা কবজ করেন। আর সম্মুখের মুখ দিয়া আমার মুমিন উম্মতদের রূহ কবজ করেন। তিনি মস্তকোপরি মুখ দিয়া আকাশমণ্ডলের অধিবাসীদের রূহ কবজ করেন এবং পদতলের মুখ দিয়া জ্বিন ও দানবদের আত্মা ছিনাইয়া আনেন।"
হযরত রাসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আরও বলিয়াছেন যে, "মালাকুল মউত হাতের দ্বারা প্রাণীর রূহ কবজ করেন এবং চক্ষু দ্বারা তিনি প্রাণীর প্রতি দৃষ্টিপাত করেন।"  এমনিভাবে সর্ব স্থানের সৃষ্টজীবের আত্মা কবজ করা হইয়া থাকে। যখন পৃথিবীর বুকে কেহ মৃত্যুবরণ করে, তখনই মালাকুল মউতের দেহস্থিত একটি চক্ষু বিলীন হইয়া যায়।
অন্য এক হাদীসে বর্ণিত আছে যে, মালাকুল মউত মাত্র চারিটি মুখমণ্ডলের অধিকারী। তিনি মস্তকোপরী মুখমণ্ডলের দ্বারা নবী ও ফেরেশতাদের আত্মা কবজ করেন। আর সম্মুখস্থ মুখমন্ডলের দ্বারা মুমিন বান্দাদের রূহ কবজ করেন। পশ্চাদমুখী মুখমণ্ডলের দ্বারা ধর্মদ্রোহী কাফেরদের আত্মা সংহার করেন। আর পদতলস্থ মুখমণ্ডল দ্বারা মানুষের মহাশত্রু শয়তান ও জিন্নাতদের আত্মা সংহার করেন। তাহার একখানি পা জাহান্নামের উপরিস্থিত পুলসিরাতের উপর এবং অপরখানি বেহেশতের উদ্যানস্থিত সিংহাসনের উপর অবস্থিত। 
হাদীস শরীফে আছে যে, মালাকুল মউতের আকৃতি এতই বিশাল যে, যদি সমুদয় নদ-নদী ও সাগর-মহাসাগরের পানিরাশি তাহার মাথার উপর বর্ষিত হইত, তথাপি একবিন্দু পানিও ভূমিতে পতিত হইত না আরও বলা হইয়াছে যে, মালাকুল মউতের সম্মুখে এই পৃথিবীর জীবসমূহ এতই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র যে, যেন একখানি খাদ্যের বরতন বিভিন্ন উপাদানে সজ্জিত করিয়া তাহার সম্মুখে রাখা হইয়াছে এবং তিনি স্বীয় ইচ্ছা অনুসারে তন্মধ্য হইতে ভক্ষণ করিতে পারেন। পৃথিবীর যাবতীয় সৃষ্টজীব তাহার সম্মুখে ঠিক তেমনই পড়িয়া রহিয়াছে। তিনি পৃথিবীকে এমনভাবে উলট-পালট করিতে পারেন, যেন কেহ হাতের তালুতে রৌপ্যমুদ্রা লইয়া উলট-পালট করিয়া থাকে।
হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, মালাকুল মউত নবী ও রাসূল (আলাইহিস্সালাম)  ব্যতীত অন্য কাহারও রূহ কবজ করিবার জন্য পৃথিবীতে অবতীর্ণ হন না। অন্যান্য জীব জানোয়ারদের প্রাণ সংহারের জন্য তাহার অনেক সহকর্মী রহিয়াছে। হাদীস শরীফে আরও বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ তা'আলা যখন যাবতীয় সৃষ্টজীব ধ্বংস করিয়া ফেলিবেন, তখন হযরত আজরাইল (আঃ) এর দেহে মাত্র আটটি চক্ষু অবশিষ্ট থাকিবে, আর সবই বিলীন হইয়া যাইবে। সেইগুলি থাকিবে হযরত জিব্রাইল (আঃ), হযরত মিকাইল (আঃ), হযরত ইস্রাফিল (আঃ) ও স্বয়ং হযরত আজরাইল (আঃ)-এর জন্য এবং আরশ-বহনকারী ও তত্ত্বাবধায়ক চারিজন বিশিষ্ট ফেরেশতার জন্য।
আর মালাকুল মউত কিরূপে বুঝিতে পারেন যে, কাহার মৃত্যু ঘনাইয়া আসিয়াছে? এই সম্বন্ধে বলা হইয়াছে যে, যখন কাহারও রোগ-শোক ও মৃত্যুর পরোয়ানা মালাকুল মউতের সম্মুখে উপস্থিত করা হয়, তখন তিনি আল্লাহ পাকের দরবারে আরজ করেন, "হে আল্লাহ! আমি কিরূপে, কোথায় এবং কখন এই বান্দার আত্মা কবজ করিব, - তাহা বলিয়া দিন।" তখন আল্লাহ তায়ালা বলেন, "হে মালাকুল মউত! মৃত্যুর গোপনীয় সংবাদ কেবল আমার জন্য সুনির্দিষ্ট রহিয়াছে, আমি ব্যতীত অন্য কেহই সে সম্বন্ধে অবগত নহে। তবে হাঁ, যখন সময় ঘনাইয়া আসিবে, তখন আমিই তোমাকে পরিজ্ঞাত করাইব এবং তুমি উহার স্পষ্ট নিদর্শন প্রত্যক্ষ করিবে। তাহা এই যে, যখন কাহারও মৃত্যুর সময় উপস্থিত হয়, তখন শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণকারী ফেরেস্তা হাজির হইয়া বলিবে, "অমুকের পুত্র অমুকের শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হইয়া গিয়াছে।" অতঃপর কৃতকর্ম ও খাদ্যদ্রব্যের তত্ত্বাবধায়ক ফেরেশতা আসিয়া বলিবে অমুকের পুত্র অমুকের কর্মশক্তি ও খাদ্যদ্রব্য ফুরাইয়া গিয়াছে। তারপর মালাকুল মউতের নিকটস্থ ডাইরিতে পুণ্যবান ব্যক্তির নামের চতুর্দিকে উজ্জ্বল নূরের সুবর্ণ রেখা প্রকাশিত হয় এবং বদকার ব্যক্তির নামের চতুর্দিকে কৃষ্ণবর্ণের রেখা প্রকাশিত হয়। পরিশেষে আরশের নিম্নস্থিত প্রকাণ্ড বৃক্ষ হইতে তাহার নাম অঙ্কিত একটি পাতা মালাকুল মউতের সম্মুখে ঝরিয়া পড়ে এবং তখনই তিনি সেই ব্যক্তির রূহ কবজ করেন।

হযরত কা'ব ইবনে আহ্বার (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ তা'আলা আরশের নিম্নভাগে একটি সুবৃহৎ বৃক্ষ পয়দা করিয়াছেন। উক্ত বৃক্ষে যাবতীয় জীবের সংখ্যানুপাতে পাতা রহিয়াছে। কাহারও মৃত্যুর চল্লিশ দিন পূর্বেই তাহার নামাঙ্কিত পাতাটি হযরত আজরাইল (আঃ) এর বক্ষের উপর ঝরিয়া পড়ে। তখন তিনি তাঁহার সহকর্মীদিগকে উক্ত ব্যক্তির রূহ কবজ করিতে নির্দেশ করেন। এরূপভাবে চল্লিশ দিন পূর্বেই উক্ত ব্যক্তি আকাশমণ্ডলে মৃত বলিয়া ঘোষিত হয়।

হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, হযরত মিকাইল (আঃ) আল্লাহ তায়ালার নিকট হইতে একখানি সহিফা বা লিখিত পত্র লইয়া হযরত আজরাইল (আঃ) এর নিকট উপস্থিত হন। উহাতে মৃত ব্যক্তির নাম-ধাম, তাহার মৃত্যুর স্থান ও মৃত্যুর কারণ ইত্যাদি লিপিবদ্ধ থাকে। আর হযরত আবু লাইস্ সমরকন্দি বর্ণনা করিয়াছেন যে, কাহারও মৃত্যুর সময় ঘনাইয়া আসিলে আরশে মোয়াল্লার নিম্নস্থান হইতে সবুজ বা সাদা রংয়ের একবিন্দু পানি তাহার নামের উপর টপকাইয়া পড়ে। সেই পানিবিন্দু সবুজ হইলে উক্ত ব্যক্তি বদ্-বখত বলিয়া বিবেচিত হয় এবং পানিবিন্দু সাদা হইলে সে নেকবখত হিসাবে বিবেচিত হয়, আর অত্যন্ত আসানীর সহিত তাহার রূহ কবজ করা হয়।

পরবর্তী পর্ব

দাকায়েকুল আখবার- (৯) মৃত্যুর ইতিহাস


📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ৯)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

মৃত্যুর ইতিহাস-
পবিত্র হাদীস শরীফে জনাব হুযুর করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) হইতে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ তায়ালা মৃত্যুকে পয়দা করিয়া শত আবরণের মধ্যে উহা গোপন করিয়া রাখেন। আকাশমণ্ডল ও ভূমণ্ডল অপেক্ষা প্রকাণ্ড করিয়া উহার আকৃতি গঠন করতঃ উহাকে সত্তরটি শৃংখলে আবদ্ধ করিয়া রাখেন। উহার প্রতিটি শৃংখল প্রায় এক হাজার বৎসরের রাস্তার সমপরিমাণ লম্বা ও দীর্ঘ। ফেরেশতাগণ কখনও উহার পার্শ্ব দিয়া গমন করিতেন না। তবে কি উহার অস্তিত্ব ও অবস্থান সম্বন্ধে তাহারা অবগত ছিলেন না; কিন্তু চতুর্দিক হইতে উহার বিকট ও প্রলয়ঙ্করী চীৎকার শুনিতে পাইতেন।
হযরত আদম (আলাইহিস্সালাম) এর সৃষ্টির পূর্বে সকলেই সে সম্পর্কে অনবগত ছিলেন। হযরত আদম (আঃ) এর সৃষ্টিলগ্নে আল্লাহ তায়ালা যখন মালাকুল মউতকে মৃত্যুর কার্যে নিয়োগ করিলেন তখন তিনি প্রার্থনা করিলেন- "হে আল্লাহ! মৃত্যু আবার কি জিনিস?" তখন আল্লাহ তা'য়ালা উক্ত আবরণকে উন্মুক্ত হইতে এবং সমস্ত ফেরেশতাদিগকে উহার প্রতি নজর করিতে নির্দেশ দিলেন। যখন ফেরেশতাগণ উহাকে দেখিবার জন্য দণ্ডায়মান হইল, তখন আল্লাহ তা'আলা মৃত্যুকে বলিলেন- "হে মৃত্যু! তুমি তোমার সমুদয় পাখা বিস্তার করিয়া তাহাদের মস্তকোপরি উড়িয়া বেড়াও এবং তোমার সমস্ত চক্ষু উন্মিলিত করিয়া তাহাদের প্রতি দৃষ্টিপাত কর। আল্লাহ তা'আলার নির্দেশানুযায়ী যখন মৃত্যু উড়িতে আরম্ভ করিল, তাহা দর্শন করিয়া ফেরেশতাগণ মুর্হিত হইয়া দুই হাজার বৎসর পড়িয়া রহিলেন। তারপর তাহারা চৈতন্য লাভ করিয়া আরজ করিলেন, "হে আল্লাহ! ইহা অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ কোন বস্তু আপনি সৃষ্টি করিয়াছেন কি?" প্রত্যুত্তরে আল্লাহ দতা'আলা বলিলেন, "হে ফেরেশতাগণ!  ইহা আমারই সৃষ্ট এবং ইহা অপেক্ষা আমিই মহীয়ান ও গরীয়ান। প্রতিটি সৃষ্টজীবই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করিবে।" আর আল্লাহ তা'য়ালা হযরত আজরাইল (আঃ) কে বলিলেন, "হে আজরাইল!  আমি তোমাকে সৃষ্টজীবের মৃত্যু নিয়ন্ত্রণের জন্য নির্বাচন করিলাম।" হযরত আজরাইল (আঃ) প্রার্থনা করিলেন, "হে আল্লাহ ! মৃত্যুকে নিয়ন্ত্রণের শক্তি আমার নাই। কেননা মৃত্যু আমার অপেক্ষা বহুলাংশে শ্ৰেষ্ঠ ও শক্তিশালী।" তখন হযরত আজরাইল (আঃ) আল্লাহ তা'আলা প্রদত্ত শক্তিতে বলীয়ান হইয়া মৃত্যুকে স্বীয় আয়ত্তে আনয়ন করেন।
অতঃপর মৃত্যু আল্লাহ তায়ালার নিকট আরজ করিল, "হে আল্লাহ! আমাকে একবার নভোমণ্ডলে ও ভূমণ্ডলে উচ্চৈঃস্বরে কিছু বলিবার অনুমতি প্রদান করুন। আল্লাহ্ তা'আলার অনুমতি লইয়া মৃত্যু অতি উচ্চৈঃস্বরে বলিয়া উঠিল, "হে সৃষ্টজীব সকল! স্মরণ রাখিও, আমি সেই মুত্যু- যে বন্ধু-বান্ধবের মধ্যে বিচ্ছেদ সাধন করে, মাতা-কন্যায়, পিতা-পুত্রে, স্বামী-স্ত্রীতে, সবল-দুর্বলে এবং ভ্রাতা-ভগ্নির মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটায়; ঘর-বাড়ী, দালান-কোঠা বিরান ও ধ্বংসস্থূপে পরিণত করে। "আমি অবশ্যই মৃত্যু দান করিব, যদিও তোমরা গগণচুম্বি অট্টালিকায় থাক না কেন। এমন কি কোন জীবই আমার স্বাদ গ্রহণে বঞ্চিত হইবে না।"
যখন কাহারও মৃত্যুর সময় ঘনাইয়া আসে, তখন মৃত্যু স্বীয় বিকট মূর্তিতে মুমূর্ষ ব্যক্তির সম্মুখে আসিয়া উপস্থিত হয়। মুমূর্ষ আত্মা তখন তাহাকে জিজ্ঞাসা করে,  "হে ব্যক্তি! তুমি কে এবং তুমি কি চাও?" প্রত্যুত্তরে সে বলে, "আমি মৃত্যু, আমি তোমাকে পৃথিবী হইতে বাহির করিব, তোমার সন্তানদিগকে অনাথ, এতিম করিব এবং তোমার স্ত্রীকে বিধবা করিব। তোমার ধন-দৌলত, অর্থ-সম্পদ তোমার সেই সকল উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বন্টন করিব, যাহারা তোমাকে পৃথিবীতে পছন্দ করে নাই এবং তুমিও যাহাদের পছন্দ কর নাই। তুমি নিজের জন্য যে সকল সক্কার্য করিয়াছিলে, আজ তাহারাই তোমার উপকারার্থে তোমার দোসর হইবে; আর কিছুই তোমার কোন প্রকার উপকার করিতে সক্ষম হইবে না।" এই সকল কথা শুনিয়া সেই ব্যক্তি তাহার মুখমণ্ডল দেওয়ালের দিকে ফিরায়, কিন্তু মৃত্যুদূতকে সেদিকেও হাজির দেখিতে পায়। পুনরায় সে অন্যদিকে মুখ ফিরায়, কিন্তু সেইদিকেও মৃত্যুকে দেখিতে পায়। পরিশেষে মৃত্যু বলিতে থাকে, "হে আল্লাহর বান্দা! তুমি কি জান না যে, আমিই সেই মৃত্যু যে তোমার চোখের সম্মুখ হইতে তোমার মাতা-পিতার রূহ কবজ করিয়া লইয়াছিলাম। কিন্তু তুমি তখন তাহাদের কোনই উপকার করিতে পার নাই। আজ তদ্রুপ আমি তোমার। সন্তানদের সম্মুখ হইতে তোমার রূহ্ ছিনাইয়া লইয়া অনন্ত জগতে বিলীন হইয়া যাইব; কিন্তু তাহারা তোমার কোনই উপকার করিতে পারিবে না। আমিই সেই মৃত্যু, যে অত্যন্ত শক্তিশালী জাতিসমূহকে ধ্বংস করিয়াছে।"
অতঃপর মৃত্যুদূত তাহাকে জিজ্ঞাসা করে "হে ব্যক্তি! পৃথিবী তোমার সহিত কিরূপ ব্যবহার করিয়াছে?" প্রত্যুত্তরে সে বলে, "আমি পৃথিবীকে ধোকাবাজ, প্রবঞ্চক ও প্রতারক হিসাবেই পাইয়াছি। উহা আমার সহিত সদ্ব্যবহার করে নাই।"  তারপর আল্লাহ তা'আলা মুমূর্ষ ব্যক্তির সম্মুখে পৃথিবীকে কুৎসিত বৃদ্ধা রমণীর আকৃতিতে তুলিয়া ধরিবেন। তখন পৃথিবী মুমূর্ষ ব্যক্তিকে সম্বোধন করিয়া বলিবে, "হে পাপিষ্ঠ নরাধম! তুমি কি আমার বুকে পাপকাজ করিতে কুণ্ঠাবোধ করিয়াছিলে বা লজ্জিত হইয়াছিলে? আর পাপ কর্ম হইতে বাচিয়াছিলে? তুমি আমাকে অন্বেষণ করিয়াছিলে কিন্তু আমি তোমাকে অন্বেষণ করি নাই। তুমি আমার মোহে এতই বিভোর, বিবেকহীন, অন্ধ হইয়া পড়িয়াছিলে যে, হালাল হারামের কখনও পার্থক্য কর নাই। তুমি কি মনে করিয়াছিলে যে, তোমাকে পৃথিবী ছাড়িয়া যাইতে হইবে না? কিন্তু তুমি মনে রাখিও, আমি তোমাকে এবং তোমার কার্যক্রমকে মোটেই পছন্দ করি নাই।"
মুমূর্ষ ব্যক্তি আরও দেখিতে পাইবে যে, তাহার টাকা-পয়সা, ধন-দৌলত অন্যের হাতে চলিয়া যাইতেছে। তখন উক্ত মালামাল তাহাকে লক্ষ্য করিয়া বলিবে,  "হে পাপী নরাধম! তুমি আমাদিগকে অন্যায়ভাবে সঞ্চয় ও সংগ্রহ করিয়াছিলে এবং দরিদ্র-ভিক্ষুককে আমাদের হইতে মোটেই দান-খয়রাত কর নাই। আজ আমরা অন্যের হাতে যাইতেছি। যেমন আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে এরশাদ করিয়াছেন "সেইদিন ধন-সম্পত্তি ও পুত্র-কন্যা কোন উপকার করিতে পারিবে না; কিন্তু যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার সমীপে পবিত্র আত্মা লইয়া হাজির হইবে, সে ব্যতীত।"  তখন বান্দা আরজ করিবে, "হে আল্লাহ! আমাকে পুনরায় পৃথিবীতে পাঠাইয়া দিন। তাহা হইলে আমি যথোপযুক্ত সক্কার্য সম্পাদন করিয়া আসিব।" প্রত্যুত্তরে আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করিবেন "যখন কাহারও মৃত্যু সময় সন্নিকটে আসে (তখনই তাহার রূহ্ কবজ করা হয়) তখন মুহূর্তও আগে পিছে করা হয় না।"
অতঃপর মুমিন লোকের রূহ অত্যন্ত সহজ ও আছানির সহিত কবজ করা হয় আর মুনাফেক ও কাফেরদের রূহ্ খুব যাতনা সহকারে ছিনাইয়া আনা হয়। যেমন আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করিয়াছেন "নিশ্চয়ই সৎলোকের আমলনামা ইল্লিন নামক স্থানে এবং বদ লোকদের আমলনামা সিজ্জিন নামক স্থানে রাখা হয়।"
[বিঃ দ্রঃ সিজ্জিন এবং ইল্লিন হইল দুইটি লিখিত রেজিষ্টার। উহাতে সৎলোকদের আমলনামা ও বদলোকদের আমলনামা সংরক্ষিত করা হয়।]

পরবর্তী পর্ব

দাকায়েকুল আখবার- (৮) ফেরেশতাগণের সৃষ্টির বিবরণ



📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ৮)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

ফেরেশতাগণের সৃষ্টির বিবরণ-
বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ তা'আলা সৃষ্টিকুল নিয়ন্ত্রণ ও সৃষ্টজীবের তত্ত্বাবধানের জন্য শ্রেষ্ঠ ফেরেশতা হযরত জিব্রাইল (আঃ), হযরত মিকাইল (আঃ), হযরত আজরাইল (আঃ) ও হযরত ইস্রাফিল (আঃ) কে সৃষ্টি করিয়াছেন। হযরত জিব্রাইল (আঃ) কে আল্লাহ্ তা'আলার বাণী বাহক ও প্রধান দূতের কার্যে নিয়োজিত করিয়াছেন। আর হযরত মিকাইল (আঃ) কে খাদ্যদ্রব্য বন্টন ও শিলা বৃষ্টির নিয়ন্ত্রণের কার্যে, হযরত আজরাইল (আঃ) কে জীবের রূহ কবজ বা মৃত্যু-দূতের কার্যে এবং ইস্রাফিল (আঃ) কে বিশ্ব প্রলয়ঙ্করী শিঙ্গা ফুকাইবার কার্যে নিযুক্ত করিয়াছেন।
হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, হযরত ইস্রাফিল (আঃ) আল্লাহ তা'আলার সমীপে আবেদন করিয়াছেন, “হে আল্লাহ! আমাকে সাত আকাশ, সাত যমিন, পাহাড়-পর্বত, হিংস্র জীব-জন্তু ও মানব-দানবসমূহের শক্তি প্রদান করুন।” 
দয়াময় আল্লাহ তায়ালা তাঁহার প্রার্থনা মঞ্জুর করতঃ তাঁহাকে উল্লিখিত বস্তুসমূহের শক্তি দান করেন। তাঁহার দেহে অসংখ্য পালক রহিয়াছে এবং তাঁহার মস্তক জাফরানী রং-এর পশম দ্বারা আবৃত। তাঁহার এক এক পশমে হাজার হাজার মুখমণ্ডল আছে। আর প্রত্যেক মুখে অগণিত জিহ্বা রহিয়াছে। তাঁহার মুখমণ্ডল ও জিহ্বাসমূহ সুপ্রশস্ত পাখা দ্বারা পরিবৃত। তিনি প্রত্যেক জিহ্বা দ্বারা অসংখ্য ভাষায় আল্লাহ তা'লার তাসবিহ্ পাঠ করেন। তাঁহার প্রতি শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে আল্লাহ তায়ালা একজন করিয়া ফেরেশতা পয়দা করেন। এই সকল ফেরেশতা কিয়ামত পর্যন্ত আল্লাহ তা'আলার তাবীহ পাঠে নিমগ্ন থাকিবে। তাঁহারাই মর্যাদাশালী আরশ বহনকারী 'কিরামান কাতিবীন' ফেরেশতা। তাঁহারা সকলেই হযরত ইস্রাফিল (আঃ) এর আকৃতিতে গঠিত।
হযরত ইস্রাফিল (আঃ) প্রত্যহ তিনবার করিয়া জাহান্নামের প্রতি নজর করেন। উহাতে তাঁহার দেহ প্রায় বিগলিত হইয়া যায় এবং ধনুকের রশির মত সঙ্কুচিত হইয়া যায়। সদাসর্বদা তিনি কান্নাকাটি ও রোনাজারীতে সময় অতিবাহিত করেন। যদি আল্লাহ তা'আলা তাঁহাকে চোখের পানি ফেলিতে ও ক্রন্দন করিতে নিষেধ না করিতেন, তাহা হইলে সমস্ত পৃথিবী তাঁহার চোখের পানিতে ভাসিয়া যাইত এবং হযরত নূহ (আঃ) এর প্লাবনের আকার ধারণ করিত। যদি তাঁহার চক্ষুর পানি পৃথিবীর উপর নিপতিত হইত, তবে সমস্ত পৃথিবীবাসী হযরত নূহ (আঃ) এর তুফানের মত পানিতে ডুবিয়া মৃত্যবরণ করিত। তাঁহার শরীরের পরিধি এতই বিস্তৃত যে সমস্ত সাগরের পানি যদি তাঁহার মস্তকে বর্ষিত হয় তথাপি একবিন্দু পানিও ভূমিতলে পতিত হইবে না।
হযরত ইস্রাফিল (আঃ) এর সৃষ্টির পাঁচশত বৎসর পর আল্লাহ তা'আলা হযরত মিকাইল (আঃ) কে পয়দা করেন। তাঁহার আপাদমস্তক জাফরানী রংয়ের পশমে এবং পাখায় আবার পরিবৃত । প্রতিটি পশমের গায়ে অসংখ্য মুখ ও চক্ষু রহিয়াছে । প্রত্যেক মুখে অসংখ্য জিহ্বা আছে । প্রত্যেক জিহ্বার সাহায্যে তিনি অসংখ্য ভাষায় আল্লাহ তা'লার তাসবীহ পাঠ করেন। তাঁহার প্রত্যেক চোখ মুমিন মুসলমান ও পাপীদের জন্য ক্রন্দন সহকারে আল্লাহ তায়ালা সমীপে ক্ষমা প্রার্থনা করে ও রহমত কামনা করে। আর প্রত্যেক চক্ষু হাজার হাজার বিন্দু অশ্রু বিসর্জন করে। উহাদ্বারা আল্লাহ তায়ালা তাহার আকৃতির সত্তর হাজার ফেরেশতা পয়দা করেন। যাহারা কিয়ামত পর্যন্ত আল্লাহ তা'আলার তাসবীহ পাঠে আত্মনিয়োগ করিবে। তাহাদিগকে ‘রূহানী ফেরেশতা' বলা হয়।
হযরত আজরাইল (আঃ) কে আল্লাহ্ তা'আলা হযরত ইস্রাফিল (আঃ) এর মতই সৃষ্টি করিয়াছেন। তাঁহারও মুখ, জিহ্বা এবং পাখা রহিয়াছে।

পরবর্তী পর্ব

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...