প্রত্যেক মুসলমান নর-নারীর উপর তওবা করা ওয়াজিব বা অপরিহার্য কর্তব্য।
এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ তা'আলা ইরশাদ করেছেনঃ "তোমরা আল্লাহর কাছে তওবা কর-আন্তরিকতওবা।' (তাহ্রীম: ৮)
উক্ত আয়াতে আদেশ-বাচক পদ ব্যবহৃত হয়েছে বিধায় এ থেকে তওবার অপরিহার্যতাই প্রমাণিত হয়।
অন্য এক আয়াতে ইরশাদ হয়েছে: "তোমরা তাদের মত হয়ো না, যারা আল্লাহকে ভুলেগেছে।" (হাশর: ১৯)
অর্থাৎ,- যারা আল্লাহর সাথে ওয়াদা-অঙ্গীকার করেও তা' ভঙ্গ করেছে, তোমরা তাদের মত হয়োনা। কেননা ওয়াদা ভঙ্গ করার ফলে তাদের অবস্থা হয়েছেঃ (কুরআনের ভাষায়) "ফলে আল্লাহ্ তাদেরকে আত্মবিস্মৃত করে দিয়েছেন।' (হাশর : ১৯)
অর্থাৎ, -নিজেদের সম্পর্কে তারা সম্পূর্ণ বিস্মৃত ও উদাসীন হয়ে গেছে। ফলে, তারা স্বীয় জীবনের জন্য কল্যাণকর ও অকল্যাণকর বিষয়ের মধ্যে কোনই পার্থক্য করতে পারছে না এবং পারলৌকিক সাফল্যের জন্য কোন নেক আমল বা সৎকর্মে সক্রিয় হচ্ছে না। হুযুর আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেছেন : "যারা আল্লাহর দীদার তথা সাক্ষাতে অনুরাগী, আল্লাহ্ তাদের সাক্ষাতে আগ্রহী।
পক্ষান্তরে, যারা আল্লাহ্ সাক্ষাতে অনাগ্রহী, আল্লাহ্ও তাদের সাক্ষাতে অনাগ্রহী।'
'বস্তুতঃ এরাই হচ্ছে, ফাসেক।' (হাশর : ১৯)
অর্থাৎ,- এরাই আল্লাহর অবাধ্য ও না-ফরমান বান্দা, আল্লাহ্ সাথে ওয়াদা-অঙ্গীকার করেও তারা তা' ভঙ্গ করেছে, আল্লাহর অনুগ্রহ, ক্ষমা ও সঠিক পথ-প্রাপ্তি হতে এরা বঞ্চিত।
বস্তুতঃ ফাসেক লোকদেরকে দুই ভাগে বিভক্ত করা যায়: এক,- 'কাফের ফাসেক'। দুই,-'ফাজের ফাসেক' অর্থাৎ, অবাধ্য মু'মিন।
'কাফের ফাসেক' বলতে ওই ব্যক্তিকে বুঝায়, যে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসুলের প্রতি ঈমান আনয়ন করেনাই; বরং সম্পূর্ণরূপে হেদায়াত থেকে বঞ্চিত এবং গুমরাহী ও পথভ্রষ্টতায় নিমজ্জিত। কুরআনুল করীমে ইরশাদ হয়েছে: "সে (শয়তান) তার সৃষ্টিকর্তার নির্দেশকে অমান্য করেছে।" (কাফ্ফ : ৫০)
অর্থাৎ, -পরওয়ারদিগারের প্রতি ঈমান আনয়ন করার হুকুমকে পরিহার করে কুফর অবলম্বন করেছে।
আর 'ফাজের ফাসেক' বলতে বুঝায়,- যে ব্যক্তি মদ্যপান করে, রিযিকের ব্যাপারে হালাল-হারামের কোন তমিজ করে না, ব্যভিচারে লিপ্ত হয়, আল্লাহ্ না-ফরমানী ও অবাধ্যতায় মত্ত থাকে, আল্লাহ্ ইবাদত-বন্দেগী পরিহার করে পাপাচারে নিমগ্ন থাকে; কিন্তু এসবকিছু করা সত্ত্বেও সে কুফর ও শিরকে লিপ্ত হয় না।
উক্তরূপ দ্বিবিধ ফাসেকের মধ্যে পার্থক্য এই যে, ঈমান আনয়ন করে তওবা না করা পর্যন্ত হাজার অনুতাপ করলেও 'কাফের ফাসেক'-এর ক্ষমা ও মার্জনার আশা করা যায় না। পক্ষান্তরে, দ্বিতীয় প্রকার 'ফাজের ফাসেক' মৃত্যুর পূর্বে স্বীয় কৃতকর্ম হতে তওবা ও অনুশোচনায় ভারাক্রান্ত হলে, ক্ষমার আশা করা যায়। বস্তুতঃ লোভ-লালসা ও কাম-প্রবণতায় আক্রান্ত ব্যক্তির তওবা সহজেই নসীব হতে পারে; কিন্তু অহংকার ও আত্মগৌরবের ব্যাধিতে আক্রান্ত ব্যক্তির তওবা ও হিদায়াত সহজে নসীব হয় না। অতএব, তোমাকে সর্বদা সতর্ক থাকতে হবে, যেন প্রতি মুহূর্তে আল্লাহর দরবারে তওবারত অবস্থায় থাকো, - তওবাহীন অবস্থায় মৃত্যু যেন তোমাকে গ্রাস করে না ফেলে। আল্লাহ্ তা'আলা ইরশাদ করেছেনঃ– "তিনি তাঁর বান্দাদের তওবা কবুল করেন এবং পাপসমূহ মার্জনাকরেন"। (শূরা : ২৫)
অর্থাৎ, -আল্লাহ্ তা'আলা এদের তওবা কবুল করে অতীতের সমস্ত গুনাহ্ ক্ষমা করে দেন।
হুযুর (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেন: "গুনাহ্ থেকে তওবাকারী নিষ্পাপ ব্যক্তির ন্যায় পবিত্র।"
কথিত আছে, এক ব্যক্তি যখনই কোন পাপ করতো, তখন তা' একটি খাতায় লিপিবদ্ধ করে রাখতো (যাতে দ্বিতীয়বার এই পাপে লিপ্ত না হয়)। একদা সে কোন একটি পাপকর্মে লিপ্ত হওয়ার পর তা' লিপিবদ্ধ করার জন্য যখন খাতা খুললো তখন দেখতে পেল, পূর্বের লিপিবদ্ধকরা সবকিছু সম্পূর্ণ মুছে গেছে এবং তদস্থলে নিম্নের এই আয়াতটি লেখা রয়েছে :
"আল্লাহ্ তাদের (তওবাকারীদের) গুনাহকে পুণ্য দ্বারা পরিবর্তিত করে দেন।" (ফুরক্বান: ৭০)
অর্থাৎ, সেই ব্যক্তির আন্তরিক তওবা ও অনুতাপের বরকত ও কল্যাণে শিরকের স্থলে ঈমান, ব্যভিচারের স্থলে ক্ষমা, অবাধ্যতা ও না-ফরমানীর স্থলে আনুগত্য ও গুনাহ্ থেকে হিফাযতের সওগাত এসে গেছে।
একদা আমীরুল-মু'মেনীন হযরত উমর (র.) মদীনার একটি গলিপথ অতিক্রম করছিলেন। এ সময় একজন যুবকের প্রতি তাঁর দৃষ্টি পড়ে। যুবকটি তার পরিহিত কাপড়ের নীচে একটি বোতল লুকিয়ে রেখেছিল। হযরত উমর জিজ্ঞাসা করলেন : 'ওহে যুবক! তুমি কাপড়ের অভ্যন্তরে এটা কি লুকিয়ে রেখেছো?' আসলে সেই বোতলটিতে মদ রক্ষিত ছিল। তাই, সে হযরত উমরের জিজ্ঞাসার জওয়াব দিতে লজ্জা ও অপমান বোধ করছিল। তখন সে অন্তরে-অন্তরে আল্লাহর নিকট অনুশোচনায় ভারাক্রান্ত হয়ে দো'আ করলো- 'আয় আল্লাহ্! আমাকে হয়রত উমরের সম্মুখে লজ্জিত ও অপমানিত করো না, তাঁর কাছে আমার দোষ ও অপরাধকে গোপন করে রাখ, আমি তওবা করছি এবং ওয়াদা করছি যে, জীবনে আর কখনও মদ্য পান করবো না।'
তারপর এই যুবক হযরত উমরের জিজ্ঞাসার জওয়াবে বললো: 'হেআমীরুল-মু'মেনীন! আমি সির্কার বোতল বহন করে নিয়ে যাচ্ছি।'
অতঃপর হযরত উমর (র.) বোতলটি দেখতে চাইলেন। আমীরুল- মু'মেনীনের অভিপ্রায় অনুযায়ী যুবক যখন বোতলটি তাঁর সম্মুখে পেশ করলো, তখন তিনি দেখতে পেলেন যে, বোতলটিতে সত্যসত্যই সির্কা রয়েছে।
প্রিয় সাধক! এখানে লক্ষ্য করার বিষয় হচ্ছে, একজন মাখলুক অপর একজন মাখলুকের সম্মুখে লজ্জা ও অপমানের ভয়ে তওবা করেছে, তথাপি আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর অনুতাপ কবুল করে মদ্যকে সির্কায় পরিণত করে দিয়েছেন। বস্তুতঃ এ ক্ষেত্রে সে আন্তরিক ইখলাস ও ঐকান্তিক নিষ্ঠার সাথে সত্যিকারের তওবা করেছিল, এরই ফলশ্রুতিতে সে কবুলিয়তের নে'আমতে ভূষিত হয়েছে।
ঠিক এভাবেই যদি পাপাচার ও অবাধ্যতার দরুণ বিধ্বস্ত কোন বান্দা নিষ্ঠা ও ইখলাসের সাথে কায়মনোবাক্যে আল্লাহর দরবারে তওবা করে এবং স্বীয় অতীত কৃতকর্মের জন্য অনুতাপ ওঅনুশোচনায় জর্জরিত হয়, তা'হলে অবশ্যই তিনি তা' করুল করে নিবেন এবং পাপাচারের মদ্যকে নেকী ও সৎকর্মের সির্কায় পরিবর্তন করে দিবেন।
হযরত আবু হুরাইরাহ্ (র.) বলেন: 'একদা হুযুর আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর সাথে জামাতে ইশা'র নামায আদায় করার পর আমি বাহিরে বের হলাম; এমন সময় একজন মহিলা পথে দণ্ডায়মান হয়ে আমাকে জিজ্ঞাসা করলো :-'হে আবু হুরাইরাহ্! আমি গুনাহ্ করেছি; পাপে লিপ্ত হয়েছি, আমার জন্য কি তওবা ও পাপ মোচনের কোন উপায় আছে?'
আমি তাকেজিজ্ঞাসা করলাম, তুমি যে পাপটি করেছো তা' কি?
সে বললো, 'আমি ব্যভিচারে লিপ্ত হয়েছিএবং আমার এই দুষ্কর্মের ফলে যে সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়েছে, তাকেও হত্যা করে ফেলেছি।'
অতঃপর আমি তাকে বললাম- 'তুমি নিজেও ধ্বংস হয়েছো এবং অপর একটি নিষ্পাপ সন্তানকেও ধ্বংস করেছো! আল্লাহর কসম, এহেন পাপকার্যের পর তোমার জন্য কোন তওবা নাই।
একথা শুনে মহিলাটি অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে গেল। তাকে এভাবেই রেখে আমি সেখান থেকে চলে গেলাম।
কিন্তু অন্তরে-অন্তরে চিন্তা করতে লাগলাম-মহিলার প্রশ্নের উত্তরতো আমি দিয়ে দিলাম; কিন্তু রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের মাঝে বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও বিষয়টি তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম না।
অতঃপর আমি হুযূর আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর পবিত্র খেদমতে উপস্থিত হয়ে বিষয়টি খুলে বললাম।
আমার বিবরণ শুনে হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ'হে আবু হুরাইরাহ্! তুমি নিজেও ধ্বংস হলে এবং অপরকেও ধ্বংস করলে। তুমি কি কুরআনেরএ আয়াতটি তিলাওয়াত কর নাই? "এবং যারা আল্লাহর সাথে অন্য উপাস্যের ইবাদত করেনা আল্লাহ্ তাদের পাপসমূহকে পুণ্যের দ্বারা পরিবর্তিত করে দেন।"
(ফুরকান: ৬৮,৬৯, ৭০)
অর্থাৎ,-শিরক ও কুফর ত্যাগ করে পাপাচার হতে তওবা ও অনুতাপ করলে আল্লাহ্ তা'আলা বান্দার কৃতগুনাহকে নেকীর দ্বারা পরিবর্তন করে দেন। এটা মহান আল্লাহ্ রাব্বুল-আলামীনের রহমত ও অনুগ্রহ।
হযরত আবু হুরাইরাহ্ বলেন – "অতঃপর আমি চরম হতাশ ও উদ্বিগ্ন হয়ে সেই মহিলাকেএমনভাবে তালাশ করতে লাগলাম যে, লোকেরা আমাকে উন্মাদ বলতে লাগলো। অবশেষে আমি তাকে খুঁজে বের করতে সমর্থ হয়েছি। তারপর হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহিওয়াসাল্লাম) কর্তৃক বিবৃত সঠিক মাসআলা সম্পর্কে আমি তাকে অবহিত করি। তাতে সে আনন্দের আতিশয্যে সজোরে হেসে উঠলো এবং একটি বাগান আল্লাহ্ ও আল্লাহর রাসুলের জন্য ওয়াকফ করে দিল।"
উত্তাহ নামক এক নওজওয়ান অনাচার, ব্যভিচার ও মদ্যপানে অভ্যস্ত ছিল। এহেন পাপকার্যের জন্য সে সমাজে ঘৃণ্য ও কুখ্যাত ছিল। একদা হযরত হাসান বসরী (রহঃ)-এর মজলিসে সে উপস্থিত হয়। তখন তিনি নিম্নের এই আয়াতটির তাফসীর প্রসঙ্গে ওয়াজ করছিলেন:
"যারা মু'মিন, তাদের জন্যে কি আল্লাহর স্মরণে বিগলিত হওয়ার সময় আসে নাই।" (হাদীদ: ১৬)
হযরত হাসানের অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী ও মর্মস্পর্শী ওয়াজে তন্ময় হয়ে শ্রোতামণ্ডলী কান্নায় ভেঙ্গেপড়েছিল। এমন সময় জনৈক যুবক দাঁড়িয়ে হযরত হাসান বসরীকে উদ্দেশ্য করে বললো-'হেআল্লাহ্ প্রিয় বান্দা! আমি একজন জঘন্য পাপী, আমার মত জঘন্য না-ফরমান বান্দার তওবা কি আল্লাহ্ তা'আলা কবুল করবেন?
উত্তরে হযরত হাসান বসরী (রহঃ) বললেন: 'অবশ্যই তোমার অবাধ্যতা ও পাপাচার সত্ত্বেও আল্লাহ্ তা'আলা তোমার তওবা কবুল করবেন।'
হাসান বসরীর এই উত্তর শুনে মজলিসে উপবিষ্ট নওজওয়ান উত্তার মুখমণ্ডল বিবর্ণ হয়ে গেল, সম্পূর্ণ দেহ তার কাঁপতে আরম্ভ করলো, চিৎকার করতে করতে সে মূর্ছিত হয়ে মাটিতে ঢলে পড়লো। জ্ঞান ফিরে আসার পর হযরত হাসান তার নিকটবর্তী হলেন এবংক য়েকটি পংক্তি আবৃত্তি করলেন, যেগুলোর সারমর্ম হচ্ছে: 'ওহে না-ফরমান যুবক! মহা আরশের মালিক আল্লাহ্ তা'আলার অবাধ্যতার শাস্তি কি? সে সম্পর্কে তুমি অবশ্যইঅবগত, - তোমাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে, যেখানে থাকবে ক্রদ্ধ গর্জন, রোষভরে গ্রেফতার করে হেঁচড়িয়ে তোমাকে সেই ভয়াবহ অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করা হবে! তুমি যদি সেই অগ্নিকুণ্ডে প্রজ্জ্বলিত হওয়ার ক্ষমতা রাখো, তা'হলে না-ফরমানী কর। নতুবা এখনই বিরত হয়ে যাও। বস্তুতঃ তুমি পাপাচারে লিপ্ত হয়ে নিজেকে শয়তান ও কু-প্রবৃত্তির বেড়াজালে আবদ্ধকরে ফেলেছো; এখনও সময় আছে, পরিত্রাণের চেষ্টা কর।'
পংক্তিগুলো শ্রবণ করার পর যুবক উত্তাহ পুনরায় চিৎকার দিয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়লো।
এবার জ্ঞান ফিরে আসার পর সে বলতে লাগলো-'হে শায়খ! আমার মত বদনসীব ও গুনাহগার বান্দার তওবাও কি আল্লাহ্ তা'আলা কবুল করবেন?'
হযরত হাসান বসরী (রহঃ) বললেন: 'হাঁ, অবশ্যই কবুল করবেন।' অতঃপর নওজওয়ান উত্তা মাথা উঠিয়ে নিম্নোক্ত তিনটি দো'আ করলো: 'এক,- হে আল্লাহ্! আপনি যদি দয়া করে আমার তওবা কবুল করেন, এবং আমার পাপরাশি ক্ষমা করে দেন, তা'হলে আমাকে তীক্ষ্ণউপলব্ধি, প্রখর ধীশক্তি ও প্রচুর স্মরণশক্তি দান করুন, যাতে উলামায়ে- কেরাম থেকে শ্রুত সর্ব বিধ ইল্ম ও কুরআনী জ্ঞান আমি সংরক্ষণ করতে পারি। দুই,-আয় আল্লাহ্! আমাকে মনমুগ্ধকর কণ্ঠস্বর দান করুন, যাতে যেকোন পাষাণহৃদয় ব্যক্তিও আমার কুরআন তিলাওয়াত শুনে আকৃষ্ট ও বিনয়াবনত হয়। তিন,- আয় আল্লাহ্! আমাকে হালাল রিযিক দান করুন এবং কল্পনাতীতভাবে আমাকে সাহায্য করুন।'
মহান আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন যুবকের তিনটি দো'আই কবুল করে নিলেন। ফলে, তার মেধা অত্যন্ত তীক্ষ্ণ হয়েছিল, তার কুরআন তিলাওয়াত শুনে যে কোন কঠিন হৃদয় মানুষও তওবা করতো। প্রতিদিন তার গৃহে দু'টি রুটি এবং এক পেয়ালা তরকারী পৌছিয়ে দেওয়া হতো; কিন্তু এ খাদ্য কোত্থেকে কিভাবে আসছে, কে-ই বা প্রত্যহ তা' পৌঁছিয়ে দিয়ে যাচ্ছে, সে সম্পর্কে যুবক কিছুই বলতে পারতো না। এ অবস্থা তার মৃত্যু পর্যন্ত অব্যাহত ছিল।
প্রিয় সাধক! উক্ত নওজওয়ানের মত যে কোন ব্যক্তি আল্লাহ্ দিকে প্রত্যাবর্তন করবে, আল্লাহ্তা'আলা তার সাথে সেই ব্যবহারই করবেন, যা এই নওজওয়ানের সাথে করেছেন। কেননা, আল্লাহ্ তা'আলা কারো নেক আমল কখনও ধ্বংস হতে দেন না।
একদা জনৈক তত্ত্বজ্ঞানী আলেমকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল,- 'কোন তওবাকারী ব্যক্তি যদি জানতে চায় যে, তার তওবা আল্লাহর দরবারে কবুল হয়েছে কিনা, তা'হলে এর কোন উপায় আছে কি?' তিনি বলেছিলেনঃ 'এ বিষয়ে পূর্ণ নিশ্চয়তা সহকারে যদিও কিছু বলা যায় না; তবুও তওবা কবুলের কিছু'লক্ষণ আছে। যথা: তওবা ও অনুতাপের পর বান্দা সর্বদা পাপমুক্ত থাকবে, অযথা আনন্দ-উল্লাস থেকে বিরত থাকবে, অন্তকরণকে আধ্যাত্মিক ব্যাধি হতে পবিত্র রাখবে, নিজকে সর্বদা আল্লাহর সামনে উপস্থিত জ্ঞান করবে সৎ ও বুযুর্গ লোকদের সংসর্গ অবলম্বন করবে, অসৎ পরিবেশ থেকে সর্বদা দূরে থাকবে, দুনিয়ার স্বল্প পরিমাণ সম্পদকে সে যথেষ্ট বরং অধিক জ্ঞান করবে; কিন্তু আখেরাতের জন্য কৃত প্রচুর আমল ও ইবাদতকে সামান্য ও অপ্রতুল মনে করবে, অন্তরকে সর্বদা আল্লাহ্ ইবাদত ও আনুগত্যে মগ্নরাখবে, জিহ্বাকে হিফাজত করবে; নিষ্ঠার সাথে সর্বদা চিন্তামগ্ন ও ধ্যানমগ্ন থাকবে, অতীত জীবনের কৃত পাপকর্মের কথা স্মরণ করে অনুশোচনায় জর্জরিত হয়ে আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করবে। তওবা ও অনুতাপের পর যদি কেউ নিজের মধ্যে এসব আলামত ও নিদর্শন লক্ষ্য করে, তা'হলে সে বুঝে নিতে পারে যে, আল্লাহর দরবারে তার তওবা কবুল হয়েছে।'
পরবর্তী পর্ব–
মহব্বত ও অনুরাগ







