শুক্রবার, ১ নভেম্বর, ২০২৪
দাকায়েকুল আখবার- (৪৭) শরাবখোরের আযাবের বিবরণ-
দাকায়েকুল আখবার- (৪৬) আমল অনুসারে আযাব হইবার বিবরণ
একদা হযরত মূসা (আঃ) কে লক্ষ্য করিয়া আল্লাহ পাক এরশাদ করিলেন, “হে মূসা! তুমি যদি ওয়াদা ভঙ্গকারী ও আমানতের খেয়ানতকারীর যাতনা ও অধঃমুখে টানিয়া জাহান্নামে ফেলিবার অবস্থা প্রত্যক্ষ করিতে তবে অনুধাবন করিতে পারিবে উহা কত বড় জঘন্য পাপ। আর দোযখীদের বাহুগুলি একস্থানে শিরাগুলি অন্যস্থানে ও অন্তরগুলি বিভিন্নস্থানে ছিটকাইয়া পড়িবে। আমানত-খেয়ানতকারী ও ওয়াদা ভঙ্গকারীর কষ্ট ও যাতনার সীমা থাকিবে না। যখন যাক্কুম গাছের ডালে তাহাদিগকে শুলি দেওয়া হইবে। তাহাদের বাহ্যরাস্তা দিয়া অগ্নি ঢুকিয়া নাক, মুখ, কান ও চক্ষু দিয়া বাহির হইবে, তাহাদিগকে শয়তানের সহিত একই জিঞ্জিরে ও তৌকে বাঁধিয়া রাখা হইবে। তৌক তাহাদের দন্তরাজিও মুখের উপর পড়িয়া থাকিবে। আযাবের যাতনার ফলে তাহাদের মগজ নাকের ভিতর দিয়া বাহির হইবে। এক দন্ডের জন্যও তাহাদের আযাব কম করা হইবে না। কাফেরগণ ওয়াদা ভঙ্গকারী ও আমানতে খেয়ানতকারীর আযাব হইতে আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করিবে। ওয়াদা ভঙ্গকারী ও আমানত খেয়ানতকারীগণ নামায তরককারী ও জ্বিনাকারীর আযাব হইতে মুক্তি কামনা করিবে। তাহাদিগকে হোকবার পর হোকবা আযাব দেওয়া হইবে। (আশি বৎসরে এক হোকবা হয়।) হুযুর করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আরও বলিয়াছেন, “যদি সমস্ত সাগরের পানি কালি হয়, যাবতীয় গাছ-পালা কলম হয়, মানুষ ও জ্বিন উহাদ্বারা দোযখে বসবাসের সময় নিরূপণ করিতে শুরু করে, তথাপি তাহাদের নির্ণেয় অংক শেষ হইবার অনেক আগেই সবকিছু শেষ হইয়া যাইবে। অনুরূপ সত্তর গুণ কালি কলম হইলেও শেষ করা যাইবে না; কিন্তু উপকরণ শেষ হইবার পূর্বেই মানুষ-জ্বিন সকলেই ধ্বংস হইয়া যাইবে।”
যেমন, আল্লাহ পাক ঘোষণা করিয়াছেন, “তাহারা দোযখে হোকবার পর হোকবা অবস্থান করিতে থাকিবে।” একদা হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আসহাবদিগকে হোকবা সম্পর্কে প্রশ্ন করিলেন। তাহারা আরজ করিলেন- “হুযুর! হোকবা কি তাহা আমরা জানি না। হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিলেন, “দোযখের এক হোকবা দুনিয়ার চারি হাজার বৎসরের সমান দীর্ঘ হইবে।” সাহাবারা জিজ্ঞাসা করিলেন, “হে আল্লাহর রাসূল! কত মাসে এক বৎসর হইবে?” হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিলেন, “চারি হাজার মাসে এক বৎসর এবং চারি হাজার দিনে একমাস হইবে এবং সত্তর হাজার ঘন্টায় একদিন হইবে আর প্রতিটি ঘন্টা দুনিয়ার এক বৎসরের সমান দীর্ঘ হইবে।”
হযরত আবু হোরায়রা (রাঃ) বর্ণনা করিয়াছেন যে, হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিয়াছেন, “রোজ কিয়ামতে হোরায়েশ নামক একটি সাপ দোযখ হইতে বাহির হইবে, উহা বিচ্ছু প্রসব করিবে। উহার মস্তক সাত আকাশের উপরে এবং লেজ সাত যমিনের নীচে থাকিবে । উহা প্রতি বছর এক হাজারবার উদাত্ত কণ্ঠে সাবধান করিয়া বলে, “হে শরাবখোর ও আত্মীয়তার বিভেদকারী! তোমরা কোথায়?” হযরত জিব্রাইল (আঃ) তাহাকে প্রশ্ন করিবেন, “হে হোরায়েশ তুমি কি চাও?” সে উত্তর করিবে, “আমি পাঁচ প্রকার মানুষকে আযাব করিব- (১) যাহারা নামায পরিত্যাগ করিয়াছে, (২) যাহারা যাকাত প্রদান করে নাই, (৩) যাহারা শরাবখোর, (৪) যাহারা সুদখোর এবং (৫) যাহারা মসজিদে দুনিয়াদারীর কথা বলিয়াছে। আমি অবশ্যই তাহাদিগকে গ্রাস করিব এবং মুখে ভরিয়া দোযখে ফিরিয়া যাইব।”
আল্লাহ ! আমাদিগকে হোৱায়েশের আযাব হইতে বাঁচাইয়া রাখুন! আমিন।
দাকায়েকুল আখবার- (৪৫) দোযখীদের আহার্য ও পানীয়
নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আরও বলিয়াছেন, “দোযখীগণ ফরিয়াদ করিবে, হে আল্লাহ! দোযখের আগুন আমাদিগকে চতুর্দিক হইতে ঘিরিয়া ফেলিয়াছে। আমরা সংকীর্ণ অবস্থায় আবদ্ধ হইয়া গিয়াছি।” তখন হাজার বিনয়েও তাহাদের আযাব কম করা হইবে না বরং নির্বাক রাখিবার জন্য তাহাদের গলায় তৌক পরাইয়া দেওয়া হইবে। এই কষ্ট ও যাতনা যখন অসহ্য হইবে তখন তাহারা চীৎকার করিতে থাকিবে। পরিশেষে অধৈর্য হইয়া মৃত্যু কামনা করিবে। এইবার কঠিন জিঞ্জির দ্বারা তাহাদিগকে দোযখে বাঁধিয়া রাখা হইবে। সেই কঠিন আযাব ও সংকীর্ণ গন্ডিতে থাকিয়া তাহারা চীৎকার করিবে। তাহাদের শরীর পচিয়া পুঁজের স্রোত বহিতে থাকিবে। তাহাদের শরীর ও মুখমন্ডল কুৎসিত হইয়া যাইবে। দোযখীগণ চীৎকার করিয়া বলিবে, “হে আল্লাহ! কু-অভ্যাস আমাদিগকে পাপ করিতে উদ্বুদ্ধ করিয়াছিল। অতএব আমরা পাপী ছিলাম। হে আল্লাহ! একদিনের জন্য হইলেও আমাদের আযাব কমাইয়া দাও। কেননা আমরা বিশ্বাসী হইয়াছি।”
হাদীস শরীফে আরও আছে যে, আল্লাহ পাক দোযখীদের জন্য একটি পাহাড় তৈরি করিয়া রাখিয়াছেন। তাহারা আল্লাহর নির্দেশক্রমে এক বৎসর একাদিক্রমে অধঃমুখে চলিয়া উহার শীর্ষদেশে উঠিলে উহা কাঁপিতে শুরু করিবে এবং সকল আরোহী ছিটকাইয়া অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ভাঙ্গিয়া অতলতলে পড়িয়া যাইবে।”
হাদীস শরীফে আরও আছে যে, দোযখীগণ আল্লাহর নিকট বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা করিলে একখন্ড কাল মেঘ তাহাদের উপর দেখিতে পাইবে এবং তাহারা মনে করিবে যে, সত্বরই আল্লাহর রহম বর্ষিত হইবে এবং আযাব কিছুটা কম হইবে ও তাহাদের পিপাসার নিবৃত্তি হইবে; কিন্তু উহা হইতে দোযখের সাপ, বিচ্ছু ও প্রস্তরখণ্ড তাহাদের উপর পতিত হইবে। আবার এক হাজার বৎসর পর্যন্ত তাহারা বৃষ্টির জন্য আবেদন করিলে পূর্বের ন্যায় একখন্ড কাল মেঘ দেখিয়া মনে করিবে বৃষ্টি হইবে; কিন্তু উহা হইতে কাল রংএর প্রকান্ড বিষাক্ত সাপ বর্ষিত হইবে। উহাদের বিষের যাতনা এক হাজার বৎসর পর্যন্ত বিদ্যমান থাকিবে। যেমন, আল্লাহ পাক ঘোষণা করিয়াছেন, “তাহাদের অশান্তি ও ফ্যাসাদের কারণে আমি তাহাদের আযাবকে কঠিন হইতে কঠিনতর করিয়া দিয়াছি।”
তিনি আরও বলিয়াছেন, “দোযখীগণ বিনয়ের সহিত সত্তর হাজার বৎসর পর্যন্ত হযরত মালেক (আঃ)এর নিকট ফরিয়াদ করিলে তিনি নিশ্চুপ থাকিবেন। তারপর তাহারা আল্লাহর নিকট ফরিয়াদ করিয়া বলিবে, “হে আল্লাহ! হযরত মালেক (আঃ) আমাদের আবেদন মঞ্জুর করিতেছেন না।
তারপর মালেক (আঃ) কে লক্ষ্য করিয়া বলিবেন, “হে মালেক! তাছযিন সরোবর হইতে শুধু এক অঞ্জলি পানি পান করিতে দাও। ” আগুন আমাদের হাড়, মাংস, শরীর ও হৃদয় জ্বালাইয়া দিয়াছে। পরিশেষে হযরত মালেক (আঃ) জাহান্নাম হইতে এক অঞ্জলি পানি তাহাদিগকে দিবেন। ঐ পানি এত বিষাক্ত হইবে যে, হাতে লইলে অঙ্গুলি খসিয়া পড়িবে এবং মুখের নিকট পৌছিবামাত্র মুখমন্ডল, চক্ষু ও চামড়া খসিয়া পড়িবে এবং ঐ পানি উদরে পরিবামাত্র নাড়িভুড়ি ও কলিজা খন্ড-বিখন্ড হইয়া যাইবে।”
হাদীস শরীফে আরও আছে যে, 'দোযখীগণ যখন আহারের জন্য ফরিয়াদ করিবে তখন তাহাদিগকে যাক্কুম নামক কাঁটাযুক্ত গাছ ভক্ষণ করিতে দেওয়া হইবে। উহা ভক্ষণ করিবামাত্র উদরস্থ সমস্ত বস্তু টগবগ করিয়া ফুটিতে থাকিবে এবং দন্তরাজি পড়িয়া . যাইবে ও মাথার মগজ উথলিয়া পড়িবে এবং মুখ হইতে আগুনের শিখা বাহির হইতে থাকিবে। উহার যাতনা এতই পীড়াদায়ক হইবে যে, উদরস্থ নাড়ি-ভুড়ি গলিয়া পড়িবে।” হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আরও বলিয়াছেন যে, দোযখীদিগকে কাতরান রঞ্জিত কাপড় পড়িতে দেওয়া হইবে। উক্ত পোশাক পড়িবামাত্র চামড়া খসিয়া পড়িবে এবং দোযখীগণ অন্ধ হইয়া যাইবে। তাহাদের বাকশক্তি রহিত হইয়া যাইবে এবং তাহারা বধির হইয়া যাইবে। ক্ষুধার্ত ব্যক্তিগণ খাদ্য ভক্ষণ করিতে চায়, কিন্তু দোযখীগণ তাহাও চাহিবে না। মুমূর্ষু ব্যক্তি দীর্ঘায়ু কামনা করে, দোযখীগণ তাহাও করিবে না; কিন্তু তাহারা মৃত্যু কামনা করিবে মৃত্যু হইবে না ।
দাকায়েকুল আখবার- (৪৪) আযাবের ফেরেশতাদের বিবরণ
দাকায়েকুল আখবার- (৪৩) গুনাহগারদিগকে দোযখের দিকে তাড়াইয়া নিবার বিবরণ
অপর এক হাদীসে আছে, “ফেরেশতাগণ পাপীদিগকে হাঁকাইয়া নেওয়ার সময় তাহারা, “ইয়া মুহাম্মদ!” বলিয়া চীৎকার করিবে; কিন্তু মালেক (আঃ)-কে দর্শন করিয়া তাহাও ভুলিয়া যাইবে। মালেক (আঃ) জিজ্ঞাসা করিবেন, “তোমরা কে?” উত্তর করিবে, “আমরা সেই নবীর উম্মত যাহার উপর কুরআন নাযিল হইয়াছিল এবং রমজানের রোযা ফরজ করা হইয়াছিল।” তিনি বলিবেন, “তবে কি তোমরা হযরত মুহাম্মদ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর উম্মত? যাহার উপর কুরআন নাযিল হইয়াছিল?” ইহা শ্রবণ করিয়া তাহারা সমস্বরে, হে মুহাম্মদ! বলিয়া চীৎকার করিয়া উঠিবে এবং বলিবে, “হাঁ, আমরা তাঁহারই উম্মত।” মালেক (আঃ) বলিবেন, “পবিত্র কুরআন কি গুনাহর পরিমাণ সম্বন্ধে তোমাদিগকে হেদায়েত করে নাই।" অতঃপর তাহার মূর্তি দেখিয়া বিনয় সহকারে কাতর প্রার্থনা করিবে যেন তাহাদিগকে কায়মনে এক ঘণ্টা ক্রন্দন করিবার অনুমতি দেওয়া হয়। অনুমতি লাভ করিয়া তাহারা এমনভাবে ক্রন্দন করিবে যে চোখের পানি শেষ হইয়া রক্ত গড়াইয়া পড়িতে থাকিবে। তখন মালেক (আঃ) বলিবেন, “হায়! এই ক্রন্দন কতইনা ফলদায়ক হইত যদি পৃথিবীর জীবনে আল্লাহর ভয়ে ক্রন্দন করিত! তবে আজ দোযখের আযাব হইতে রেহাই পাইত।”
দাকায়েকুল আখবার- (৪২) জাহান্নামকে হাজির করিবার বিবরণ
দাকায়েকুল আখবার- (৪১) দোযখের দরওয়াজার বিবরণ
দাকায়েকুল আখবার- (৪০) দোযখের বিবরণ
হাদীস শরীফে আরও আছে যে, একদা জিব্রাইল (আঃ) কে আল্লাহ পাক নির্দেশ করিলেন, “তুমি মালেক (আঃ) এর নিকট হইতে কিঞ্চিৎ আগুন লইয়া হযরত আদম (আঃ)কে ব্যবহারের জন্য দাও।" আগুন চাহিলে জিব্রাইল (আঃ)কে মালেক (আঃ) বলিলেন, “কি পরিমাণ আগুন আপনি নিতে চান?” জিব্রাইল (আঃ) উত্তর করিলেন, “এক আঙ্গুলের মাথার সমান আগুন চাই।” হযরত মালেক (আঃ) বলিলেন, “এই পরিমাণ আগুন সাত আকাশ ও সাত যমিন বিগলিত করিয়া দিবে।” তিনি আরও বলিলেন, “হে বন্ধু! অর্ধ অঙ্গুলি পরিমাণ আগুনের তাপে বৃষ্টিপাত ও গাছপালা উৎপাদন বন্ধ হইয়া যাইবে।” তারপর জিব্রাইল (আঃ) আগুনের পরিমাণ সম্পর্কে আল্লাহর নিকট আরজ করিলে, আল্লাহ পাক বলিলেন, “হে জিব্রাইল! কেবল কণামাত্র আগুনকে সাত সাগরে সত্তরবার ধুইয়া সর্ব্বোচ্চ পর্বতের উপর রাখিয়া দাও।” কিন্তু সেই আগুনও পর্বতকে জ্বালাইয়া দোযখে উহার পূর্বস্থানে চলিয়া গেল। পাথরখন্ড ও লোহার মধ্যে উহার ধূম্ররাশি ছাড়িয়া গেল। উহার পরিত্যক্ত ধূম্ররাশি আজও মানুষের ব্যবহারের উপযোগী আগুন সরবরাহ করিতেছে; সুতরাং হে বিশ্বাসীগণ! উহা হইতে হেদায়েত লাভ করুন।
হাদীস শরীফে আছে, “নিকৃষ্টতম দোযখীকে কেবল এক জোড়া আগুনের জুতা পরিধান করান হইবে। উহার তেজে মগজ টবগ্ করিয়া ফুটিয়া মস্তক বিদীর্ণ করিয়া বাহির হইতে থাকিবে এবং পেটের সমস্ত বস্তু গলিয়া বাহ্যনালী দিয়া গড়াইয়া পড়িবে এবং সে ধারণা করিবে হয়ত তাহাকেই সবচেয়ে কঠিন আযাব করা হইতেছে। মূলতঃ সেই ব্যক্তি নিকৃষ্টতম জ্বাহান্নামী।" দোযখীরা আযাবের যন্ত্রণায় অস্থির হইয়া দীর্ঘ চল্লিশ বৎসর যাবত হযরত মালেক (আঃ) কে ডাকাডাকি করিবে, কিন্তু তিনি নিশ্চুপ থাকিবেন ৷ বহুকাল পর তিনি বলিবেন, “হে দোযখীগণ! চীৎকার ও ডাকাডাকিতে কোন ফল হইবে না। এই আযাব তোমাদিগকে অনন্তকাল ভোগ করিতে হইবে।” আবার তাহারা আল্লাহর নিকট আরজ করিয়া বলিবে, “হে আল্লাহ! আমাদিগকে মাফ করুন এবং আযাব হইতে মুক্তি দিন! পুনরায় এমন গুনাহ আর করিব না।" বহুকাল নীরবতার পর বলা হইবে, “হে দোযখীগণ! কান্না-কাটিতে কোন ফল হইবে না। লাঞ্ছিত ও নির্বাকভাবে আযাব ভোগ কর। তোমাদের প্রতি কোন করুণা বর্ষিত হইবে না। তারপর তাহারা চীৎকার ও বাক্যালাপ করিতে পারিবে না। গাধার প্রথম আওয়াজ ‘জাফির' এবং শেষ আওয়াজ ‘শাহিক' ছাড়া অন্য কোন আওয়াজ তাহারা করিতে পারিবে না।”
হযরত মালেক (আঃ) আল্লাহর শপথ করিয়া বলিয়াছেন, “হে নবী! যিনি আপনাকে সত্য নবীরূপে পাঠাইয়াছেন, তাঁহার শপথ, যদি দোযখের একটি কাপড় আকাশ ও পৃথিবীর মাঝখানে লট্কাইয়া দেওয়া হইত, তবে উহার তাপ ও দুর্গন্ধে জগৎবাসী মরিয়া যাইত। ঐ আল্লাহর শপথ, যিনি আপনাকে সত্য নবী করিয়া প্রেরণ করিয়াছেন। যদি সূচাগ্র পরিমাণ দোযখের আগুন দুনিয়াতে রাখা হইত, তবে সমস্ত পৃথিবী ছারখার হইয়া যাইত। ঐ আল্লাহর শপথ, যিনি আপনাকে সত্য নবী করিয়া পাঠাইয়াছেন, পবিত্র কুরআনে বর্ণিত জিঞ্জিরের একছাত পরিমাণও যদি কোন পর্বতে রাখা হইত তবে পর্বত ও পৃথিবী জ্বালাইয়া উহা সপ্ততল ষমিনের নীচে নামিয়া যাইত। আর হে নবী! ঐ আল্লাহর শপথ, যিনি আপনাকে সত্য নবী করিয়া পাঠাইয়াছেন, দোযখীদের আযাবের মত কাহাকেও যদি দুনিয়ার মাগরিব প্রান্তে আযাব করা হইত, তবে মাশরিক প্রান্তবাসীগণ উহার তাপ, প্রচন্ডতা ও ভয়ঙ্করতায় জ্বলিয়া যাইত। দোযখ অতিশয় ভয়ঙ্কর, ভীষণ গভীর অনলকুন্ড বিশিষ্ট। লোহা উহার জ্বালানী হইবে। গরম পানি ও পূঁজ , দোযখীদের পানীয় এবং কাত্রান নির্মিত বস্তু উহাদের পরিধেয় কাপড় হইবে।
দাকায়েকুল আখবার- (৩৯) পুলছিরাতের বিবরণ
হযরত ওহাব ইবনে মাম্বাহ (রাঃ) বলেন, “সেদিন হুযুর করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) প্রত্যেক ঘাঁটিতে মুনাজাত করিবেন, “ইয়া রাব্বি হাবলী উম্মাতি, ইয়া রাব্বি হাব্লী উম্মাতি!” তখন , উহাতে মানুষের এত ভীড় হইবে যে, একে অন্যের উপর পতিত হইবে। সেতুটি সমুদ্রের মধ্যে প্রকম্পিত জাহাজের ন্যায় প্রবল বাতাসে আন্দোলিত হইতে থাকিবে। তথাপিও যাহারা রক্ষা পাওয়ার তাহারা আল্লাহর রহমতে পার হইয়া যাইবে। প্রথম দল চক্ষুর দৃষ্টি হরণকারী বিজলীর মত দ্রুতবেগে, দ্বিতীয় দল প্রবল ঝড়ের ন্যায়, তৃতীয় দল দ্রুতগামী পাখীর ন্যায়, চতুর্থ দল দ্রুতগামী অশ্বের ন্যায়, পঞ্চম দল ধাবমান পথিকের ন্যায়, ষষ্ঠ দল দুর্বল পথিকের মত ধীরে ধীরে, সপ্তম দল ধাবমান উটের মত, অষ্টম দল গর্ভবতী মহিলাদের মত, নবম দল বাঘের মত দৌড়াইয়া পুল পার হইবে। একদল পুলের উপর দাঁড়াইয়া থাকিবে ও চলিতে এবং পার হইতে পারিবে না। তন্মধ্যে কেহ একদিনে কেহ একমাসে, কেহ এক বৎসরে, কেহ দুই বৎসরে, কেহ তিন বৎসরে ক্রমানুয়ে দীর্ঘ সময়ে পুলছিরাত পার হইবে। সর্বশেষ ব্যক্তি উহা পঁচিশ হাজার বৎসরে পার হইবে।
হাদীস শরীফে আরও আছে, “মানুষ যখন পুল পার হইতে থাকিবে, তখন তাহাদের সামনে-পেছনে, উর্ধ্বে-নিন্মে ডাহিনে-বামে, চতুর্দিকে কেবল জ্বলন্ত আগুন থাকিবে। যেমন, আল্লাহ পাক ঘোষণা করিয়াছেন, “তোমাদের মধ্যে এমন কেহ নাই যে, তাহাকে পুলছিরাত পার হইতে হইবে না। তোমার প্রতিপালক নিশ্চয়ই ইহা অতিক্রম করাইবেন। তারপর আমি প্রত্যেক ধর্মভীরুদিগকে নিস্তার দিব এবং অত্যাচারীদিগকে অধঃমুখে দোযখে নিক্ষেপ করিব।” নরকাগ্নি তাহাদের হাড়, মাংস, চামড়া, নাড়িভূড়ি জ্বালাইয়া কয়লার মত করিয়া দিবে।
অপরদিকে কেহ নির্বিঘ্নে তাহা পার হইবে। আগুন তাহাদিগকে স্পর্শও করিবে না। পরন্তু সে পার হইয়া বলিবে, “কই পুলছিরাত কোথায়?” ফেরেশতাগণ উত্তর করিবে, “হে আল্লাহর বান্দা! আল্লাহর রহমতে তুমি উহা অতিক্রম করিয়াছ।" আরও বর্ণিত আছে যে, একদল লোক আগুনের ভয়ে মধ্যখানে দাঁড়াইয়া কাঁদিতে থাকিবে। এমতাবস্থায় হযরত জিব্রাইল (আঃ) তাহাদিগকে প্রশ্ন করিবেন, “তোমরা কেন দাঁড়াইয়া ক্রন্দন করিতেছ?” তাহারা বলিবে, “আগুনের ভয়ে।” পুনরায় জিজ্ঞাসা করিবেন, “পৃথিবীতে কিভাবে তোমরা সমুদ্র অতিক্রম করিতে?” তাহারা উত্তর করিবে, “নৌকা বা জাহাজে চড়িয়া।” তখন ফেরেশ্তাগণ ঐ সকল মসজিদগুলিকে যাহাতে তাহারা জামাতে নামায আদায় করিয়াছিল, নৌকা বা জাহাজের ছুরতে উপস্থিত করিবে এবং তাহারা সেইগুলিতে আরোহণ করিয়া পুলছিরাত পাৱ হইয়া যাইবে। আর তাহাদিগকে স্মরণ করাইয়া ঘোষণা করা হইবে, “এইগুলি সেই মসজিদ, যাহাতে তোমরা জামাতের সহিত নামায সম্পন্ন করিতে।”
হাদীস শরীফে আরও আছে, “রোজ কিয়ামতে আল্লাহর সম্মুখে এক ব্যক্তিকে উপস্থিত করা হইবে, যাহার গুনাহরাশি নেক হইতে অধিক হইবে। এইজন্য তাহাকে দোযখে নিক্ষেপের নির্দেশ দেওয়া হইবে। তারপর আল্লাহ পাক হযরত জিব্রাইল (আঃ) কে বলিবেন, “হে জিব্রাইল! তাহাকে জিজ্ঞাসা কর, সে কি কোন আলেমের মাহফিলে বসিয়াছিল? তবে তাহাকে আমলের সুপারিশে মাফ করিয়া দিব।” তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলে সে উত্তর করিবে যে সে বসে নাই। হযরত জিব্রাইল (আঃ) আরজ করিবেন, “হে আল্লাহ! তুমিই তোমার বান্দা সম্পর্কে ভাল জান।” আল্লাহ আবার বলিবেন, “তাহাকে জিজ্ঞাসা কর, সে কোন আলেমের সাথে ভালবাসা রাখিয়াছিল কিনা?” বান্দা বলিবে, না রাখে নাই। আবার জিজ্ঞাসা করা হইবে, “সে কি কোন আলেমের দস্তরখানে বসিয়া আহার করিয়াছে?" বান্দা উত্তরে না বলিবে। পুনরায় জিজ্ঞাসা করা হইবে, “সেকি কোন আলেমের গৃহে বসবাস করিয়াছে?" বান্দা উত্তর করিবে, না। আবার জিজ্ঞাসা করা হইবে, “সে কি কোন আলেমের নামে নিজের ছেলের নাম রাখিয়াছে? তাহাতেও তাহাকে মাফ করিয়া দিব।” ইহাও পাওয়া যাইবে না। আবার জিজ্ঞাসা করা হইবে, “সে এমন কোন ব্যক্তিকে ভালবাসিয়াছে কি, যে কোন আলেমকে ভালবাসিত।” এইবার বান্দা উত্তর করিবে 'হ্যাঁ।' তখন আল্লাহ নির্দেশ দিবেন, “তাহাকে বেহেশতে পৌছাইয়া দাও। কারণ সে পৃথিবীতে আলেমের প্রিয়পাত্রকে ভালবাসিয়াছে।"
হাদীস শরীফে আরও আছে, “রোজ কিয়ামতে মসজিদগুলিকে শুভ্র উটের ন্যায় হাশরের মাঠে হাজির করা হইবে। উহার পাগুলি আম্বর নির্মিত হইবে। গলা জাফরানের, মস্তক মেশকের ও পৃষ্ঠদেশ জবরজদের তৈরী হইবে। উহাদের পিঠে জামাতের নামায আদায়কারীগণ সওয়ার হইবে। মোয়াজ্জিনগণ উহার লাগাম ধরিয়া এবং ঈমামগণ হাঁকাইয়া মাঠে লইয়া যাইবে। তখন জিজ্ঞাসা করা হইবে, “তাহারা কি মর্যাদাশীল · ফেরেশতা না কোন নবী ও রাসূল?” উত্তরে বলা হইবে, “হে হাশরবাসীগণ! তাহারা কোন নবী ও রাসূল বা কোন মর্যাদাশালী ফেরেশতা নহে, বরং তাহারা ঐ সকল উম্মতে মুহাম্মদী যাহারা জামাতে পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়িয়াছিল।”
আরও বর্ণিত আছে যে, “আল্লাহ পাক দারদাইল নামক একজন ফেরেশতা পয়দা করিয়াছেন। তাহার দুইখানা পাখা মাশরেক-মাগরেব পর্যন্ত বিস্তৃত। মাগরিবের পাখা ইয়াকুত এবং মাশরিকের পাখা সবুজ জবরজদে নির্মিত হইবে। আর মণিমুক্তা, ইয়াকুত ও মারজান খচিত হইবে। ইহার মস্তক আরশের নীচে এবং পদদ্বয় সপ্ততল মাটির নীচে থাকিবে। তিনি প্রত্যেক রমযান মাসের রাত্রে উদাত্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেন, “কোন প্রার্থনাকারী আছে কি, আল্লাহ যাহার প্রার্থনা কবুল করিবেন। কোন আকাঙ্ক্ষাকারী আছে কি? তাহা পূরণ করিয়া দেওয়া হইবে। কোন তাওবাহকারী আছে কি? তাহার তাহওবাহ, কবুল করা হইবে। কোন ক্ষমাকারী আছে কি? আজ ক্ষমা করা হইবে।” উক্ত ফেরেশতা ফজর পর্যন্ত এইরূপ ঘোষণা করেন।
দাকায়েকুল আখবার- (৩৮) তুলাদণ্ড বা মিজান খাঁড়া করিবার বিবরণ
বিবাহ (৩৫) কন্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ
বিবাহ (পর্ব – ৩৫) 📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.) কন্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...
-
অহংকার ও আত্মপ্রীতি (পর্ব- ৮) এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ইমাম গাজ্জালী (রহঃ) অহংকারের প্রতিকার ও বিনয় অর্জনের উপায় উপরোক্ত আলোচনা থেকে জানা গেল যে,...
-
অহংকার ও আত্মপ্রীতি (পর্ব- ৫) এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ইমাম গাজ্জালী (রহঃ) অহংকারের স্বরূপ ও তার লাভ-লোকসান— অহংকার দু'প্রকার। একটি বাহ্যিক, অপ...
-
অহংকার ও আত্মপ্রীতি (পর্ব- ৩) এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ইমাম গাজ্জালী (রহঃ) অহংকারের নিন্দা — পবিত্র কোরআনুল কবিমে বহু স্থানে আল্লাহ তা'আলা ...









