শুক্রবার, ১ নভেম্বর, ২০২৪

দাকায়েকুল আখবার- (৪৭) শরাবখোরের আযাবের বিবরণ-



📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ৪৭)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

শরাবখোরের আযাবের বিবরণ-
হযরত উবাই ইবনে কা'ব (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, হুযুর করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিয়াছেন, রোজ কিয়ামতে মদখোর ও শরাবখোরদিগকে হাতে তাম্বুরা ও গলায় পানপাত্র ঝুলান অবস্থায় দোযখের কাষ্ঠের শূলে চড়াইবার জন্য আনা হইবে। এমন সময় জনৈক ঘোষণাকারী ঘোষণা করিবে, “ইহা অমুকের পুত্র অমুক এবং অমুক স্থানের বাসিন্দা।” তখন তাহাদের মুখ হইতে এমন দুর্গন্ধ বাহির হইবে যে, সমস্ত হাশরবাসী উহাতে অস্থির হইয়া আল্লাহর কাছে আরজী করিবে। তখন আল্লাহ পাক তাহাদিগকে দোযখে নিক্ষেপ করিবার জন্য হুকুম করিবেন। দোযখে পড়িয়া তাহারা হায় তৃষ্ণা! হায় তৃষ্ণা!! বলিয়া হাজার বৎসর যাবত চীৎকার করিবে। তারপর আশি বৎসর পর্যন্ত হযরত মালেক (আঃ) এর নিকট আরজ করিবে; কিন্তু তিনি কোন উত্তর দিবেন না। তাহাদের দেহ হইতে এমন দুর্গন্ধযুক্ত ঘাম বাহির হইবে যাহাতে শুধু প্রতিবেশীই নয়, স্বয়ং তাহারাও অতিষ্ঠ হইয়া আল্লাহর নিকট আরজ করিবে; কিন্তু অনুনয়ে কোন উপকার হইবে না। পরিশেষে অকস্মাৎ দোযখের আগুন তাহাদিগকে জ্বালাইয়া ভস্ম করিয়া দিবে। আবার তাহাদিগকে নূতন করিয়া পয়দা করা হইবে এবং আগুন তাহাদিগকে তৌকের আকার চারিদিক হইতে জ্বালাইতে থাকিবে এবং তাহারা বিকট চীৎকার সহকালে আহাজারী করিতে থাকিবে। এমনভাবে পা হাতে মাথা পর্যন্ত জ্বালান হইবে। অবশেষে অধঃমুখে পায়ে জিঞ্জির লাগাইয়া দোযখের মধ্যস্থলে ফেলিয়া দেওয়া হইবে। দোযখে পড়িয়া যখন পানি পানি বলিয়া চীৎকার করিবে, তখন তাহাদিগকে পানি দেওয়া হইবে। উহা এমন বিষাক্ত হইবে যে, উদরস্থ করিবার সঙ্গে সঙ্গে নাড়িভুড়ি ছারখার হইয়া যাইবে। পুনরায় তাহারা খাদ্যের জন্য চীৎকার করিতে থাকিবে। তখন যাক্কুম নামক কাঁটাযুক্ত ফল তাহাদিগকে খাইতে দেওয়া হইবে। উহা উদরস্থ করিবামাত্র আপাদমস্তক টগবগ করিয়া জোশ মারিতে থাকিবে এবং মুখ হইতে আগুনের শিখা বাহির হইতে থাকিবে। অবস্থা এমন চরমে পৌছিবে যে, সমস্ত নাড়িভুড়ি গলিয়া বিন্দুর মত বাহানালী দিয়া গড়াইয়া পড়িবে। আবার কাহাকেও আগুনের সিন্ধুকে ভরিয়া এক হাজার বৎসর পর্যন্ত আযাব করা হইবে। উহাতে তাহার শরীরের রং পরিবর্তিত হইয়া যাইবে। পুনরায় এক হাজার বৎসর পর্যন্ত দোযখের জিন্দানখানায় জ্বালান হইবে। সেখানে হাজার হাজার বৎসর ক্রন্দন করিবে। তবুও তাহাদের প্রতি আল্লাহর দয়া হইবে না। সেই জেলখানায় উটের মত সাপ-বিচ্ছু থাকিবে। উহারা তাহাদের পদতল হইতে কাটিয়া ছিন্নভিন্ন করিয়া দিবে। তারপর তাহাদের মাথায় আগুনের তাজ ও শরীরের জোড়াগুলিতে লোহার পাত মুড়িয়া ও গলায় তৌক ও জিঞ্জির পরান হইবে। হাজার বৎসর যাবত এমনি আযাব ভোগ করিবার পর 'ওয়াইল' নামক দোযখের মাঠে নিক্ষেপ করা যাইবে। তথাকার উষ্ণতা অত্যন্ত ভয়াবহ ও ইহার গভীরতা সীমাহীন হইবে। উহাতে অগণিত সাপ, বিচ্ছু তৌক ও জিঞ্জির থাকিবে। সেখানে হাজার বৎসর আযাব ভোগ করিবার পর সে অকস্মাৎ 'হে মুহাম্মদ' বলিয়া কাঁদিয়া উঠিবে। ইহা শ্রবণান্তে হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিবেন, “হে আল্লাহ! আমি আমার এক উম্মতের করুণ ক্রন্দন যেন শুনিতে পাইতেছি?” আল্লাহ পাক বলিলেন, “হ্যাঁ, ইহা তোমার এক শরাবখোর উম্মতের আওয়াজ। সে শরাব খাইয়া মাতাল অবস্থায় মৃত্যুমুখে পতিত হইয়াছিল।” পরিশেষে হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)এর সুপারিশক্রমে তাহাকে দোযখ হইতে বাহিরে আনা হইবে। তখন আল্লাহ পাক বলিবেন, “হে মুহাম্মদ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)! আপনার উসিলায় আমি আজ তাহাকে নাজাত দান করিলাম।”

পরবর্তী পর্ব-

দাকায়েকুল আখবার- (৪৬) আমল অনুসারে আযাব হইবার বিবরণ


📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ৪৬)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

আমল অনুসারে আযাব হইবার বিবরণ
হুযুর করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিয়াছেন, “আমার গুনাহগার উম্মতেরা ষাট হাজার বৎসর আযাব ভোগ করিবার পর মুক্তিলাভ করিবে (১) যাহারা হারাম খাদ্য দ্বারা দেহ তাজা করিয়াছে এবং এবাদতের বিমুখ রহিয়াছে, (২) যাহারা বাহ্যতঃ কাপড় পরিধান করিয়াছিল কিন্তু এবাদত-বন্দেগীর কাপড় হইতে উলঙ্গ ছিল, (৩) যাহারা এলেম অনুসারে আমল না করিয়া বাজারের নাদানদের মত হালাল-হারাম ভেদাভেদ না করিয়া অর্থ রোজগার করিয়াছিল, (৪) যাহারা দুনিয়ার ব্যাপারে সজাগ ছিল কিন্তু আখেরাতের সম্বন্ধে অজ্ঞতার ভান করিয়াছিল, তাহাদের জন্য দোযখের সাতটি দরজা খোলা থাকিবে।”

একদা হযরত মূসা (আঃ) কে লক্ষ্য করিয়া আল্লাহ পাক এরশাদ করিলেন, “হে মূসা! তুমি যদি ওয়াদা ভঙ্গকারী ও আমানতের খেয়ানতকারীর যাতনা ও অধঃমুখে টানিয়া জাহান্নামে ফেলিবার অবস্থা প্রত্যক্ষ করিতে তবে অনুধাবন করিতে পারিবে উহা কত বড় জঘন্য পাপ। আর দোযখীদের বাহুগুলি একস্থানে শিরাগুলি অন্যস্থানে ও অন্তরগুলি বিভিন্নস্থানে ছিটকাইয়া পড়িবে। আমানত-খেয়ানতকারী ও ওয়াদা ভঙ্গকারীর কষ্ট ও যাতনার সীমা থাকিবে না। যখন যাক্কুম গাছের ডালে তাহাদিগকে শুলি দেওয়া হইবে। তাহাদের বাহ্যরাস্তা দিয়া অগ্নি ঢুকিয়া নাক, মুখ, কান ও চক্ষু দিয়া বাহির হইবে, তাহাদিগকে শয়তানের সহিত একই জিঞ্জিরে ও তৌকে বাঁধিয়া রাখা হইবে। তৌক তাহাদের দন্তরাজিও মুখের উপর পড়িয়া থাকিবে। আযাবের যাতনার ফলে তাহাদের মগজ নাকের ভিতর দিয়া বাহির হইবে। এক দন্ডের জন্যও তাহাদের আযাব কম করা হইবে না। কাফেরগণ ওয়াদা ভঙ্গকারী ও আমানতে খেয়ানতকারীর আযাব হইতে আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করিবে। ওয়াদা ভঙ্গকারী ও আমানত খেয়ানতকারীগণ নামায তরককারী ও জ্বিনাকারীর আযাব হইতে মুক্তি কামনা করিবে। তাহাদিগকে হোকবার পর হোকবা আযাব দেওয়া হইবে। (আশি বৎসরে এক হোকবা হয়।) হুযুর করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আরও বলিয়াছেন, “যদি সমস্ত সাগরের পানি কালি হয়, যাবতীয় গাছ-পালা কলম হয়, মানুষ ও জ্বিন উহাদ্বারা দোযখে বসবাসের সময় নিরূপণ করিতে শুরু করে, তথাপি তাহাদের নির্ণেয় অংক শেষ হইবার অনেক আগেই সবকিছু শেষ হইয়া যাইবে। অনুরূপ সত্তর গুণ কালি কলম হইলেও শেষ করা যাইবে না; কিন্তু উপকরণ শেষ হইবার পূর্বেই মানুষ-জ্বিন সকলেই ধ্বংস হইয়া যাইবে।” 

যেমন, আল্লাহ পাক ঘোষণা করিয়াছেন, “তাহারা দোযখে হোকবার পর হোকবা অবস্থান করিতে থাকিবে।” একদা হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আসহাবদিগকে হোকবা সম্পর্কে প্রশ্ন করিলেন। তাহারা আরজ করিলেন- “হুযুর! হোকবা কি তাহা আমরা জানি না। হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিলেন, “দোযখের এক হোকবা দুনিয়ার চারি হাজার বৎসরের সমান দীর্ঘ হইবে।” সাহাবারা জিজ্ঞাসা করিলেন, “হে আল্লাহর রাসূল! কত মাসে এক বৎসর হইবে?” হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিলেন, “চারি হাজার মাসে এক বৎসর এবং চারি হাজার দিনে একমাস হইবে এবং সত্তর হাজার ঘন্টায় একদিন হইবে আর প্রতিটি ঘন্টা দুনিয়ার এক বৎসরের সমান দীর্ঘ হইবে।”

হযরত আবু হোরায়রা (রাঃ) বর্ণনা করিয়াছেন যে, হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিয়াছেন, “রোজ কিয়ামতে হোরায়েশ নামক একটি সাপ দোযখ হইতে বাহির হইবে, উহা বিচ্ছু প্রসব করিবে। উহার মস্তক সাত আকাশের উপরে এবং লেজ সাত যমিনের নীচে থাকিবে । উহা প্রতি বছর এক হাজারবার উদাত্ত কণ্ঠে সাবধান করিয়া বলে, “হে শরাবখোর ও আত্মীয়তার বিভেদকারী! তোমরা কোথায়?” হযরত জিব্রাইল (আঃ) তাহাকে প্রশ্ন করিবেন, “হে হোরায়েশ তুমি কি চাও?” সে উত্তর করিবে, “আমি পাঁচ প্রকার মানুষকে আযাব করিব- (১) যাহারা নামায পরিত্যাগ করিয়াছে, (২) যাহারা যাকাত প্রদান করে নাই, (৩) যাহারা শরাবখোর, (৪) যাহারা সুদখোর এবং (৫) যাহারা মসজিদে দুনিয়াদারীর কথা বলিয়াছে। আমি অবশ্যই তাহাদিগকে গ্রাস করিব এবং মুখে ভরিয়া দোযখে ফিরিয়া যাইব।” 

আল্লাহ ! আমাদিগকে হোৱায়েশের আযাব হইতে বাঁচাইয়া রাখুন! আমিন।

পরবর্তী পর্ব-

দাকায়েকুল আখবার- (৪৫) দোযখীদের আহার্য ও পানীয়



📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ৪৫)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

দোযখীদের আহার্য ও পানীয়-
হাদীস শরীফে আছে, “দোযখীদের মুখমন্ডল কাল ও চক্ষু অন্ধ হইবে। তাহারা বিবেকহীন ও চক্ষুদ্বয় কুরঞ্জিত হইবে। তাহাদের মস্তক পাহাড়ের মত বিশাল, শরীর কামারের ফ্যখারের মত বিশ্রী, চক্ষুদ্বয় টিলার মত উচ্চ, কেশগুলি বাঁশের ঝাড়ের মত হইবে। তাহারা না জীবিত না মৃতের মত জাহান্নামে অবস্থান করিবে। তাহাদের শরীর সত্তরটি চামড়ায় ঢাকা হইবে। প্রত্যেক দুই চামড়ার মধ্যে সত্তর স্তর আগুন থাকিবে। ভয়ঙ্কর ও বিকট জাহান্নামী সাপ-বিচ্ছুতে তাহাদের পেট ভর্তি থাকিবে এবং হিংস্র জীব-জন্তু ও গাধার আওয়াজের মত বিকট আওয়াজ শোনা যাইবে। তৌক ও জিঞ্জির দ্বারা তাহারা শৃংখলিত থাকিবে। শাড়াসী দিয়া তাহাদিগকে বিচ্ছিন্ন করা হইবে এবং লোহার হাতুরী দ্বারা আঘাত করা হইবে। পরিশেষে তাহাদিগকে দোযখে নিক্ষেপ করা হইবে।” 

নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আরও বলিয়াছেন, “দোযখীগণ ফরিয়াদ করিবে, হে আল্লাহ! দোযখের আগুন আমাদিগকে চতুর্দিক হইতে ঘিরিয়া ফেলিয়াছে। আমরা সংকীর্ণ অবস্থায় আবদ্ধ হইয়া গিয়াছি।” তখন হাজার বিনয়েও তাহাদের আযাব কম করা হইবে না বরং নির্বাক রাখিবার জন্য তাহাদের গলায় তৌক পরাইয়া দেওয়া হইবে। এই কষ্ট ও যাতনা যখন অসহ্য হইবে তখন তাহারা চীৎকার করিতে থাকিবে। পরিশেষে অধৈর্য হইয়া মৃত্যু কামনা করিবে। এইবার কঠিন জিঞ্জির দ্বারা তাহাদিগকে দোযখে বাঁধিয়া রাখা হইবে। সেই কঠিন আযাব ও সংকীর্ণ গন্ডিতে থাকিয়া তাহারা চীৎকার করিবে। তাহাদের শরীর পচিয়া পুঁজের স্রোত বহিতে থাকিবে। তাহাদের শরীর ও মুখমন্ডল কুৎসিত হইয়া যাইবে। দোযখীগণ চীৎকার করিয়া বলিবে, “হে আল্লাহ! কু-অভ্যাস আমাদিগকে পাপ করিতে উদ্বুদ্ধ করিয়াছিল। অতএব আমরা পাপী ছিলাম। হে আল্লাহ! একদিনের জন্য হইলেও আমাদের আযাব কমাইয়া দাও। কেননা আমরা বিশ্বাসী হইয়াছি।”

হাদীস শরীফে আরও আছে যে, আল্লাহ পাক দোযখীদের জন্য একটি পাহাড় তৈরি করিয়া রাখিয়াছেন। তাহারা আল্লাহর নির্দেশক্রমে এক বৎসর একাদিক্রমে অধঃমুখে চলিয়া উহার শীর্ষদেশে উঠিলে উহা কাঁপিতে শুরু করিবে এবং সকল আরোহী ছিটকাইয়া অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ভাঙ্গিয়া অতলতলে পড়িয়া যাইবে।”

 হাদীস শরীফে আরও আছে যে, দোযখীগণ আল্লাহর নিকট বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা করিলে একখন্ড কাল মেঘ তাহাদের উপর দেখিতে পাইবে এবং তাহারা মনে করিবে যে, সত্বরই আল্লাহর রহম বর্ষিত হইবে এবং আযাব কিছুটা কম হইবে ও তাহাদের পিপাসার নিবৃত্তি হইবে; কিন্তু উহা হইতে দোযখের সাপ, বিচ্ছু ও প্রস্তরখণ্ড তাহাদের উপর পতিত হইবে। আবার এক হাজার বৎসর পর্যন্ত তাহারা বৃষ্টির জন্য আবেদন করিলে পূর্বের ন্যায় একখন্ড কাল মেঘ দেখিয়া মনে করিবে বৃষ্টি হইবে; কিন্তু উহা হইতে কাল রংএর প্রকান্ড বিষাক্ত সাপ বর্ষিত হইবে। উহাদের বিষের যাতনা এক হাজার বৎসর পর্যন্ত বিদ্যমান থাকিবে। যেমন, আল্লাহ পাক ঘোষণা করিয়াছেন, “তাহাদের অশান্তি ও ফ্যাসাদের কারণে আমি তাহাদের আযাবকে কঠিন হইতে কঠিনতর করিয়া দিয়াছি।” 

তিনি আরও বলিয়াছেন, “দোযখীগণ বিনয়ের সহিত সত্তর হাজার বৎসর পর্যন্ত হযরত মালেক (আঃ)এর নিকট ফরিয়াদ করিলে তিনি নিশ্চুপ থাকিবেন। তারপর তাহারা আল্লাহর নিকট ফরিয়াদ করিয়া বলিবে, “হে আল্লাহ! হযরত মালেক (আঃ) আমাদের আবেদন মঞ্জুর করিতেছেন না।

তারপর মালেক (আঃ) কে লক্ষ্য করিয়া বলিবেন, “হে মালেক! তাছযিন সরোবর হইতে শুধু এক অঞ্জলি পানি পান করিতে দাও। ” আগুন আমাদের হাড়, মাংস, শরীর ও হৃদয় জ্বালাইয়া দিয়াছে। পরিশেষে হযরত মালেক (আঃ) জাহান্নাম হইতে এক অঞ্জলি পানি তাহাদিগকে দিবেন। ঐ পানি এত বিষাক্ত হইবে যে, হাতে লইলে অঙ্গুলি খসিয়া পড়িবে এবং মুখের নিকট পৌছিবামাত্র মুখমন্ডল, চক্ষু ও চামড়া খসিয়া পড়িবে এবং ঐ পানি উদরে পরিবামাত্র নাড়িভুড়ি ও কলিজা খন্ড-বিখন্ড হইয়া যাইবে।”

হাদীস শরীফে আরও আছে যে, 'দোযখীগণ যখন আহারের জন্য ফরিয়াদ করিবে তখন তাহাদিগকে যাক্কুম নামক কাঁটাযুক্ত গাছ ভক্ষণ করিতে দেওয়া হইবে। উহা ভক্ষণ করিবামাত্র উদরস্থ সমস্ত বস্তু টগবগ করিয়া ফুটিতে থাকিবে এবং দন্তরাজি পড়িয়া . যাইবে ও মাথার মগজ উথলিয়া পড়িবে এবং মুখ হইতে আগুনের শিখা বাহির হইতে থাকিবে। উহার যাতনা এতই পীড়াদায়ক হইবে যে, উদরস্থ নাড়ি-ভুড়ি গলিয়া পড়িবে।” হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আরও বলিয়াছেন যে, দোযখীদিগকে কাতরান রঞ্জিত কাপড় পড়িতে দেওয়া হইবে। উক্ত পোশাক পড়িবামাত্র চামড়া খসিয়া পড়িবে এবং দোযখীগণ অন্ধ হইয়া যাইবে। তাহাদের বাকশক্তি রহিত হইয়া যাইবে এবং তাহারা বধির হইয়া যাইবে। ক্ষুধার্ত ব্যক্তিগণ খাদ্য ভক্ষণ করিতে চায়, কিন্তু দোযখীগণ তাহাও চাহিবে না। মুমূর্ষু ব্যক্তি দীর্ঘায়ু কামনা করে, দোযখীগণ তাহাও করিবে না; কিন্তু তাহারা মৃত্যু কামনা করিবে মৃত্যু হইবে না ।

পরবর্তী পর্ব-

দাকায়েকুল আখবার- (৪৪) আযাবের ফেরেশতাদের বিবরণ



📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ৪৪)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

আযাবের ফেরেশতাদের বিবরণ
হযরত মন্‌ছুর ইবনে আম্মার (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, হুযুর করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিয়াছেন,“দোযখের দারোগা মালেক (আঃ) এর দোযখীদের সংখ্যানুপাতে হাত পা রহিয়াছে। অর্থাৎ প্রত্যেক দোযখীকে আযাব করার ও তৌক-জিঞ্জির পরাইবার জন্য তাঁহার পৃথক পৃথক হস্ত রহিয়াছে। মালেক (আঃ) দোযখের দিকে নজর করিবামাত্র দোযখ, একে অন্যকে গ্রাস করিতে থাকিবে। "বিসমিল্লাহ" শরীফে মোট ঊনিশটি অক্ষর আছে। তদ্রূপ আযাবের ফেরেশতাদের সংখ্যাও ঊনিশ। অতএব যে ব্যক্তি কায়মনে বিসমিল্লাহ্ শরীফ পাঠ করিবে, আল্লাহ পাক তাহাকে আযাবের ফেরেশতাদের নিপীড়ন ও অত্যাচার হইতে মুক্তিদান করিবেন। আযাবের ফেরেশতাগণ পা দ্বারা হাতের কর্ম করিতে সক্ষম হইবে। এইজন্য তাহাদিগকে ‘জবানিয়া' বলা হয়। তাহারা এক-এক হাত-পা দ্বারা দশ সহস্র কাফেরকে আযাব করিবে। তাহাদের অধীনে অগণিত ফেরেশতাও রহিয়াছে। তাহাদের চক্ষুদ্বয় দৃষ্টি হরণকারী বিদ্যুতের মত, দন্তরাজি গাভীর শিং এর মত লম্বা ও তীক্ষ্ণ হইবে! তাহাদের জিহ্বা পা-পর্যন্ত লম্বা ও উহা হইতে আগুনের শিখা-বাহির হইবে! তাঁহাদের কাঁধ এক বৎসরের দূরত্বের সমান হইবে। তাহারা নির্দয় ও পাষাণ হইবে। তাহারা একাদিক্রমে চল্লিশ বৎসরও যদি দোযখ সাগরে বিচরণ করে, তথাপি নরকাগ্নি তাহাদের কোন ক্ষতি করিতে পারিবে না। কেননা আল্লাহ পাক তাহাদিগকে দোযখের আগুন হইতে উত্তম বস্তু নূর দ্বারা পয়দা করিয়াছেন। হে আল্লাহ! তাহাদের আযাব হইতে আমাদিগকে রক্ষা করুন। মালেক (আঃ) পাপীগণকে দোযখে ফেলিতে নির্দেশ করিলে আযাবের ফেরেশতাগণ তাহাদিগকে দোযখে ফেলিবে। তখন তাহারা সমস্বরে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ' বলিয়া ফরিয়াদ করিতে থাকিবে। অমনি দোযখের আগুন তাহাদের নিকট হইতে সরিয়া যাইবে। মালেক (আঃ) বলিবেন, “হে অগ্নি! সত্বর তাহাদিগকে গ্রাস কর।” আগুন বলিবে, “যাহারা কালেমায়ে তাইয়্যেবা পাঠ করিতেছে তাহাদিগকে আমরা কিরূপে গ্রাস করিব?” মালেক (আঃ) বলিবেন, “হে অগ্নি! আল্লাহ পাক এমতাবস্থায়ই গ্রাস করিবার জন্য নির্দেশ দিয়াছেন; সুতরাং অতিসত্ত্বর গ্রাস কর।” তখন তাহারা কালেমা পাঠ হইতে বিরত থাকিবে এবং আগুন তাহাদিগকে গ্রাস করিবে। দোযখের আগুন কাহারও পা, কাহারও হাঁটু, কাহার ও নাভি এবং কাহারও গলা পর্যন্ত জ্বালাইতে থাকিবে। যখন আগুন মুখমন্ডল গ্রাস করিতে চাহিবে তখন মালেক (আঃ) বলিবেন, “হে আগুন! মুখমন্ডল জ্বালাইও না, কেননা উহাদ্বারা সে আল্লাহকে সিজদাহ করিয়াছে। তাহার অন্তরকে জ্বালাইও না, কেননা সে রমজান মাসের রোযায় ক্ষুধা ও পিপাসার মোকাবেলা করিয়া আল্লাহকে রাজী করিয়াছেন। তারপর যতদিন আল্লাহ পাক ইচ্ছা করিবেন, ততদিন তাহারা দোযখের আযাব ভোগ করিবে।”

পরবর্তী পর্ব-

দাকায়েকুল আখবার- (৪৩) গুনাহগারদিগকে দোযখের দিকে তাড়াইয়া নিবার বিবরণ



📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ৪৩)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

গুনাহগারদিগকে দোযখের দিকে তাড়াইয়া নিবার বিবরণ 
হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহর শত্রু কাফেরদিগকে মুখমন্ডল কৃষ্ণবর্ণ ও চক্ষুদ্বয় কুরঞ্জিত রঙ্গে রঞ্জিত ও মুখে মোহর করা অবস্থায় দোযখের দিকে তাড়াইয়া নেওয়া হইবে। ফলে তাহারা বাক্যালাপ করিতে সক্ষম হইবে না। তাহাদিগকে দোযখের সন্নিকটে পৌছান মাত্র আযাবের ফেরেশতাগণ জিঞ্জির ও তৌক লইয়া সামনে হাজির হইবে এবং সেই তৌকগুলি মুখের মধ্যে প্রবেশ করাইয়া গুহ্যদ্বার দিয়া বাহির করিবে। দোযখীদের ডানহাত স্বীয় ঘাড়ের উপর বাঁধিয়া দেওয়া হইবে এবং বামহাত কলবের ভিতর দিয়া ঢুকাইয়া বক্ষের মধ্যস্থল দিয়া বাহির করতঃ শক্তভাবে জিঞ্জির দ্বারা বাঁধিবে । একই জিঞ্জিরে দোযখীর সহিত একটি শয়তান বাঁধা পড়িবে। কেহ তাহাদিগকে নীচমুখী করিয়া টানিবে, কেহ লোহার মুগড় দ্বারা প্রহার করিবে। উহারা যখনই দোযখ হইতে বাহির হইতে চাহিবে, তখন দ্বিগুণ জোরে প্রহার করিয়া বলা হইবে, “আজ দোযখের আযাব ভোগ করিয়া দেখ কেমন লাগে!” যেমন, আল্লাহ পাক ঘোষণা করিয়াছেন, “তাহারা যখনই দোযখ হইতে বাহির হইতে চাহিবে, তখনই তাহাদিগকে ঢুকাইয়া দিয়া বলা হইবে, তোমরা দোযখের আযাবকে মিথ্যা বলিয়া বিদ্রূপ করিতে, কিন্তু এখন উহা ভোগ করিয়া দেখ কেমন মজা লাগে!”হযরত ফাতেমা (রাঃ) একদিন স্বীয় পিতাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “হে আল্লাহর রাসূল! কিরূপে আপনার উম্মতদিগকে দোযখের দিকে তাড়াইয়া নেওয়া হইবে এবং কিরূপে দোযখে ফেলিয়া দেওয়া হইবে?” আঁ হযরত (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উত্তর করিলেন, “হে ফাতেমা! আমার উম্মতদিগকে দোযখের দিকে হাঁকাইয়া নেওয়া হইবে, কিন্তু তাহাদের চেহারা কৃষ্ণবর্ণ ও চক্ষু কুরঞ্জিত হইবে না এবং তাহাদের মুখমন্ডলে মোহর করা হইবে না আর তাহারা তৌক ও জিঞ্জিরাবদ্ধও হইবে না।” বিবি ফাতেমা (রাঃ) আরও জিজ্ঞাসা করিলেন, “তবে তাহাদিগকে কেমনভাবে বাঁধা হইবে এবং তাহারা কোন ব্যক্তি?” 
হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিলেন, “আমার তিন শ্রেণীর উম্মত দোযখে নিক্ষিপ্ত হইবে- (১) বৃদ্ধ ব্যভিচারী, (২) যুবক পাপী, (৩) বদকার রমণী। পুরুষদের শ্মশ্রু ধরিয়া এবং রমণীদের চুলের গুচ্ছ ধরিয়া দোযখে নিক্ষেপ করা হইবে। তখন সে 'হায় দুর্বলতা ও হায় বার্ধক্য' বলিয়া চীৎকার করিবে। অসংখ্য যুবককে কাল শ্মশ্রু ধরিয়া দোযখে ফেলা হইবে। তাহারা 'হায় যৌবনকাল, হায় যৌবন লাবণ্য' বলিয়া চীৎকার করিবে। অসংখ্য রমণীকে কেশগুচ্ছ ধরিয়া দোযখে নিক্ষেপ করা হইবে, তাহারা 'হায় লজ্জা, হায় রূপ' বলিয়া চীৎকার করিবে। 
তাহাদিগকে হযরত মালেক (আঃ)-এর নিকট উপস্থিত করা হইলে তিনি জিজ্ঞাসা করিবেন, “হে ফেরেশ্তাগণ! উহারা কে? এই ধরনের পাপী ত দেখিনাই!” তাহাদের মুখমন্ডল উজ্জ্বল এবং তৌক ও জিঞ্জির পরান হয় নাই!” ফেরেশতাবর্গ বলিবে, “এমনভাবে আনিতেই আমাদের নির্দেশ দেওয়া হইয়াছে।” মালেক (আঃ) তখন স্বয়ং জিজ্ঞাসা করিবেন, “হে পাপীগণ! তোমরা কাহারা?” উত্তর করিবে, “আমরা উম্মতে মুহাম্মদী।”

অপর এক হাদীসে আছে, “ফেরেশতাগণ পাপীদিগকে হাঁকাইয়া নেওয়ার সময় তাহারা, “ইয়া মুহাম্মদ!” বলিয়া চীৎকার করিবে; কিন্তু মালেক (আঃ)-কে দর্শন করিয়া তাহাও ভুলিয়া যাইবে। মালেক (আঃ) জিজ্ঞাসা করিবেন, “তোমরা কে?” উত্তর করিবে, “আমরা সেই নবীর উম্মত যাহার উপর কুরআন নাযিল হইয়াছিল এবং রমজানের রোযা ফরজ করা হইয়াছিল।” তিনি বলিবেন, “তবে কি তোমরা হযরত মুহাম্মদ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর উম্মত? যাহার উপর কুরআন নাযিল হইয়াছিল?” ইহা শ্রবণ করিয়া তাহারা সমস্বরে, হে মুহাম্মদ! বলিয়া চীৎকার করিয়া উঠিবে এবং বলিবে, “হাঁ, আমরা তাঁহারই উম্মত।” মালেক (আঃ) বলিবেন, “পবিত্র কুরআন কি গুনাহর পরিমাণ সম্বন্ধে তোমাদিগকে হেদায়েত করে নাই।" অতঃপর তাহার মূর্তি দেখিয়া বিনয় সহকারে কাতর প্রার্থনা করিবে যেন তাহাদিগকে কায়মনে এক ঘণ্টা ক্রন্দন করিবার অনুমতি দেওয়া হয়। অনুমতি লাভ করিয়া তাহারা এমনভাবে ক্রন্দন করিবে যে চোখের পানি শেষ হইয়া রক্ত গড়াইয়া পড়িতে থাকিবে। তখন মালেক (আঃ) বলিবেন, “হায়! এই ক্রন্দন কতইনা ফলদায়ক হইত যদি পৃথিবীর জীবনে আল্লাহর ভয়ে ক্রন্দন করিত! তবে আজ দোযখের আযাব হইতে রেহাই পাইত।”

পরবর্তী পর্ব-

দাকায়েকুল আখবার- (৪২) জাহান্নামকে হাজির করিবার বিবরণ



📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ৪২)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

জাহান্নামকে হাজির করিবার বিবরণ-
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) হইতে বর্ণিত, আছে যে, হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিয়াছেন, “রোজ কিয়ামতে জাহান্নামকে সপ্ততল মাটিসহ আরশের বামদিকে এমতাবস্থায় উপস্থিত করা হইবে যে, উহার চতুর্দিকে সত্তর হাজার ফেরেশতা সারিবদ্ধ থাকিবে এবং প্রত্যেক সারিতে জ্বিন ও মানুষের সত্তর হাজার গুণ ফেরেশত থাকিবে। তাহারা উহার রশি ধরিয়া টানিবে । তখন জাহান্নাম চারিটি খুঁটির উপর থাকিবে। প্রত্যেক খুঁটি এক হাজার বৎসরের পথ দূরে থাকিবে। জাহান্নামের ত্রিশ হাজার মাথা ও প্রত্যেক মাথায় ত্রিশ হাজার মুখ থাকিবে, প্রত্যেক মুখে ওহুদ পর্বত হইতে হাজার গুণ বড় ত্রিশ হাজার ধাঁরাল দাঁত থাকিবে। প্রত্যেক মুখে দুনিয়ার সমান দুইটি ঠোঁট ও প্রত্যেক ঠোঁটে সত্তর হাজার কড়াযুক্ত লোহার শিকল থাকিবে এবং প্রত্যেক কড়াতে অসংখ্য ফেরেশতা শক্তভাবে ধরিয়া উহাকে আরশের বামপার্শ্বে আনয়ন করিবে। যেমন, আল্লাহ পাক ঘোসণা করিয়াছেন, “জাহান্নাম বিরাট অট্টালিকার মত প্রকান্ড অগ্নিস্ফুলিঙ্গ নিক্ষেপ করিতে থাকিবে।”

পরবর্তী পর্ব-
গুনাহগারদিগকে দোযখের দিকে তাড়াইয়া নিবার বিবরণ

দাকায়েকুল আখবার- (৪১) দোযখের দরওয়াজার বিবরণ



📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ৪১)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

দোযখের দরওয়াজার বিবরণ-
দোযখের সর্বমোট সাতটি দরওয়াজা রহিয়াছে। প্রত্যেক দ্বার নির্দিষ্ট নারী-পুরুষের জন্য সর্বদাই খোলা। প্রত্যেকটি দ্বার ক্রমাগত নিম্নদিকে গিয়াছে এবং একটি হইতে অন্যটির দূরত্ব সত্তর বৎসরের পথ। ভয়ঙ্কর ও প্রচণ্ডতাও সমপরিমাণ হইবে। একদা হুযুর করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) হযরত জিব্রাইল (আঃ)-কে দোযখ ও দোযখবাসীদের সম্বন্ধে প্রশ্ন করিলে তিনি উত্তর করিলেন, “হে বন্ধু! দোযখের প্রথম দ্বারের নাম 'হাবিয়া' এবং উহাতে মুনাফেক, ফেরাউন বংশধর, আসহাবে মায়েদার কাফেরগণ থাকিবে! দ্বিতীয দ্বার 'লাজ্বা'তে ইবলিস শয়তান, তাহার চেলা-সামন্ডা ও আগুন পূজারীগণ থাকিবে। তৃতীয় দ্বার ‘হোতামা'তে ইহুদীগণ থাকিবে। চতুর্থ দ্বার 'ছায়ীরে' নাসারাগণ থাকিবে। পঞ্চম দ্বার ‘সাকারে' তারকা পূজারীগণ থাকিবে। ষষ্ঠ দ্বার ‘জাহিমে' কাফের-মোশরেক থাকিবে। সপ্তম দ্বার ‘জাহান্নাম' বলিয়া জিব্রাইল (আঃ) চুপ করিয়া থাকিলে হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) জিজ্ঞাসা করিলেন, “হে বন্ধু! আপনি চুপ করিলেন কেন? শীঘ্র উহার অধিবাসীর কথা আমাকে বলিয়া দিন।” হযরত জিব্রাইল (আঃ) বলিলেন, “হে বন্ধু! উম্মতে মুহাম্মদীর মধ্যে যাহারা কবীরাহ গুনাহ করিয়া বিনা তাওবায় মৃত্যুবরণ করিয়াছে, তাহারা উহাতে অবস্থান করিবে।” 
ইহা শ্রবণান্তে আঁ হযরত (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বেহুঁশ হইয়া পড়িলে হযরত জিব্রাইল (আঃ) তাঁহার মস্তক কোলে তুলিয়া লইলেন এবং হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) চৈতন্য লাভ করিয়া বলিলেন, “হে জিব্রাইল! আমার উম্মতের দোযখে নিক্ষেপ ও দুরবস্থার কথা আমাকে মর্মাহত, ব্যথিত ও পীড়া দিয়াছে। আমার দুশ্চিন্তা ও ভয় কিছুতেই কমিতেছে না।” জিব্রাইল (আঃ) বলিলেন, “হাঁ গুনাহগার উম্মতদিগকে দোযখে নিক্ষেপ করা হইবে। এতশ্রবণে হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) অঝোর ধারায় কাঁদিতে লাগিলেন'। 'জিব্রাইল (আঃ)-ও নিজেকে সম্বরণ করিতে না পারিয়া কান্না শুরু করিলেন। নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) পুনরায় বলিলেন, “হে বন্ধু! আপনি কাঁদিতেছেন কেন? আপনি ‘রুহুল আমিন, আল্লাহর ফর্মাবর্দার।” তিনি উত্তর করিলেন, “যদি হারুত মারুত ফেরেশতাদ্বয়ের মত আমাকেও পরীক্ষা করা হয়, সেই ভয়ে ক্রন্দন করিতেছি।” তখন আল্লাহ পাক জানাইয়া দিলেন যে, “হে মুহাম্মদ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ও জিব্রাইল (আঃ)! আমি আপনাদেরকে দোযখের আগুন হইতে নাজাত দিয়াছি। অতএব আমার শোকরগুজারীর জন্য কাঁদিতে থাকুন।”

পরবর্তী পর্ব-
জাহান্নামকে হাজির করিবার বিবরণ



দাকায়েকুল আখবার- (৪০) দোযখের বিবরণ



📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ৪০)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

দোযখের বিবরণ-
হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, “একদিন জিব্রাইল (আঃ) হুযুর করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর নিকট গমন করিলে আঁ হযরত তাহাকে দোযখের বিবরণ দিতে বলিলেন। উত্তরে জিব্রাইল (আঃ) বলিলেন, আল্লাহ পাক দোযখকে পয়দা করিয়া এক হাজার বৎসর পর্যন্ত জ্বালাইলে ইহা লালবর্ণ হয়। আরও এক হাজার বৎসর জ্বালাইলে উহা গাঢ় কৃষ্ণবর্ণ হয়। উহার তীব্রতা ও শিখা কখনও নিভিবে না। হযরত মোজাহেদ (রাঃ) বর্ণনা করিয়াছেন যে, 'দোযখে উটের ঘাড়ের ন্যায় এক শ্রেণীর বিষাক্ত সাপ ও বিশ্রী খচ্চরের মত এক শ্রেণীর বিচ্ছু আছে। দোযখীগণ উহার ভয়ে পলায়ন করিতে চাহিলে উহারা তাহাদিগকে তালাস করিয়া ঠোঁট দ্বারা কামড়াইবে এবং মস্তক ও নখ ছাড়া সমস্ত দেহের চামড়া টানিয়া ছিঁড়িবে। শতবার পলাইয়াও তাহারা উহাদের আযাব হইতে রেহাই পাইবে না।” হযরত আবদুল্লাহ ইবনে হারেস (রাঃ) হুযুর করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম হইতে বর্ণনা করিয়াছেন যে, “দোযখে উটের ঘাড়ের মত এক শ্রেণীর সাপ আছে। উহা এত ভয়ঙ্কর যে কাহাকেও একবার দংশন করিলে চল্লিশ বৎসর যাবত উহার বিষক্রিয়া থাকিবে।আবার খচ্চরের মত এক শ্রেণীর বিচ্ছু আছে, উহার দংশনেও বিষক্রিয়া চল্লিশ বৎসর বিদ্যমান থাকিবে।” 
হযরত আমামা (রাঃ) এজিদ ইবনে ওয়াহাব ও হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হইতে বর্ণনা করিয়াছেন যে, হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিয়াছেন, “তোমাদের ব্যবহারের আগুন দোযখের আগুনের তুলনায় সত্তর ভাগের একভাগ তেজসম্পন্ন। দুনিয়ার আগুন পানিতে ধুইলে ব্যবহারের উপযোগী থাকে না আর দুনিয়ার আগুন দোযখের আগুন হইতে আল্লাহর নিকট পানাহ চাহিয়া থাকে।

হাদীস শরীফে আরও আছে যে, একদা জিব্রাইল (আঃ) কে আল্লাহ পাক নির্দেশ করিলেন, “তুমি মালেক (আঃ) এর নিকট হইতে কিঞ্চিৎ‍ আগুন লইয়া হযরত আদম (আঃ)কে ব্যবহারের জন্য দাও।" আগুন চাহিলে জিব্রাইল (আঃ)কে মালেক (আঃ) বলিলেন, “কি পরিমাণ আগুন আপনি নিতে চান?” জিব্রাইল (আঃ) উত্তর করিলেন, “এক আঙ্গুলের মাথার সমান আগুন চাই।” হযরত মালেক (আঃ) বলিলেন, “এই পরিমাণ আগুন সাত আকাশ ও সাত যমিন বিগলিত করিয়া দিবে।” তিনি আরও বলিলেন, “হে বন্ধু! অর্ধ অঙ্গুলি পরিমাণ আগুনের তাপে বৃষ্টিপাত ও গাছপালা উৎপাদন বন্ধ হইয়া যাইবে।” তারপর জিব্রাইল (আঃ) আগুনের পরিমাণ সম্পর্কে আল্লাহর নিকট আরজ করিলে, আল্লাহ পাক বলিলেন, “হে জিব্রাইল! কেবল কণামাত্র আগুনকে সাত সাগরে সত্তরবার ধুইয়া সর্ব্বোচ্চ পর্বতের উপর রাখিয়া দাও।” কিন্তু সেই আগুনও পর্বতকে জ্বালাইয়া দোযখে উহার পূর্বস্থানে চলিয়া গেল। পাথরখন্ড ও লোহার মধ্যে উহার ধূম্ররাশি ছাড়িয়া গেল। উহার পরিত্যক্ত ধূম্ররাশি আজও মানুষের ব্যবহারের উপযোগী আগুন সরবরাহ করিতেছে; সুতরাং হে বিশ্বাসীগণ! উহা হইতে হেদায়েত লাভ করুন।

হাদীস শরীফে আছে, “নিকৃষ্টতম দোযখীকে কেবল এক জোড়া আগুনের জুতা পরিধান করান হইবে। উহার তেজে মগজ টবগ্ করিয়া ফুটিয়া মস্তক বিদীর্ণ করিয়া বাহির হইতে থাকিবে এবং পেটের সমস্ত বস্তু গলিয়া বাহ্যনালী দিয়া গড়াইয়া পড়িবে এবং সে ধারণা করিবে হয়ত তাহাকেই সবচেয়ে কঠিন আযাব করা হইতেছে। মূলতঃ সেই ব্যক্তি নিকৃষ্টতম জ্বাহান্নামী।" দোযখীরা আযাবের যন্ত্রণায় অস্থির হইয়া দীর্ঘ চল্লিশ বৎসর যাবত হযরত মালেক (আঃ) কে ডাকাডাকি করিবে, কিন্তু তিনি নিশ্চুপ থাকিবেন ৷ বহুকাল পর তিনি বলিবেন, “হে দোযখীগণ! চীৎকার ও ডাকাডাকিতে কোন ফল হইবে না। এই আযাব তোমাদিগকে অনন্তকাল ভোগ করিতে হইবে।” আবার তাহারা আল্লাহর নিকট আরজ করিয়া বলিবে, “হে আল্লাহ! আমাদিগকে মাফ করুন এবং আযাব হইতে মুক্তি দিন! পুনরায় এমন গুনাহ আর করিব না।" বহুকাল নীরবতার পর বলা হইবে, “হে দোযখীগণ! কান্না-কাটিতে কোন ফল হইবে না। লাঞ্ছিত ও নির্বাকভাবে আযাব ভোগ কর। তোমাদের প্রতি কোন করুণা বর্ষিত হইবে না। তারপর তাহারা চীৎকার ও বাক্যালাপ করিতে পারিবে না। গাধার প্রথম আওয়াজ ‘জাফির' এবং শেষ আওয়াজ ‘শাহিক' ছাড়া অন্য কোন আওয়াজ তাহারা করিতে পারিবে না।”

হযরত মালেক (আঃ) আল্লাহর শপথ করিয়া বলিয়াছেন, “হে নবী! যিনি আপনাকে সত্য নবীরূপে পাঠাইয়াছেন, তাঁহার শপথ, যদি দোযখের একটি কাপড় আকাশ ও পৃথিবীর মাঝখানে লট্‌কাইয়া দেওয়া হইত, তবে উহার তাপ ও দুর্গন্ধে জগৎবাসী মরিয়া যাইত। ঐ আল্লাহর শপথ, যিনি আপনাকে সত্য নবী করিয়া প্রেরণ করিয়াছেন। যদি সূচাগ্র পরিমাণ দোযখের আগুন দুনিয়াতে রাখা হইত, তবে সমস্ত পৃথিবী ছারখার হইয়া যাইত। ঐ আল্লাহর শপথ, যিনি আপনাকে সত্য নবী করিয়া পাঠাইয়াছেন, পবিত্র কুরআনে বর্ণিত জিঞ্জিরের একছাত পরিমাণও যদি কোন পর্বতে রাখা হইত তবে পর্বত ও পৃথিবী জ্বালাইয়া উহা সপ্ততল ষমিনের নীচে নামিয়া যাইত। আর হে নবী! ঐ আল্লাহর শপথ, যিনি আপনাকে সত্য নবী করিয়া পাঠাইয়াছেন, দোযখীদের আযাবের মত কাহাকেও যদি দুনিয়ার মাগরিব প্রান্তে আযাব করা হইত, তবে মাশরিক প্রান্তবাসীগণ উহার তাপ, প্রচন্ডতা ও ভয়ঙ্করতায় জ্বলিয়া যাইত। দোযখ অতিশয় ভয়ঙ্কর, ভীষণ গভীর অনলকুন্ড বিশিষ্ট। লোহা উহার জ্বালানী হইবে। গরম পানি ও পূঁজ , দোযখীদের পানীয় এবং কাত্রান নির্মিত বস্তু উহাদের পরিধেয় কাপড় হইবে।

পরবর্তী পর্ব-
দোযখের দরওয়াজার বিবরণ

দাকায়েকুল আখবার- (৩৯) পুলছিরাতের বিবরণ



📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ৩৯)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

পুলছিরাতের বিবরণ-
হাদীস শরীফে আছে যে, “রোজ কিয়ামতে আল্লাহ পাক দোযখের একটি পিচ্ছিল পুল তৈয়ারী করিবেন। উহাতে সাতটি পুল থাকিবে। প্রত্যেক পুল ত্রিশ হাজার বৎসরের, নীচের দিকে হাজার বৎসরের এবং মধ্যস্থলে এক হাজার বৎসরের সমতল পথ থাকিবে। পুলগুলি চুলের মত চিকন, তলোয়ারের মত ধারাল এবং রাত্রির অন্ধকার হইতে অধিক অন্ধকারাচ্ছন্ন হইবে। তাহা ছাড়া পুলের উপর ধারাল বর্শার অধিক ফলকের মত কাঁটা থাকিবে। আল্লাহ্ পাকের নির্দেশাবলী পালন সম্পর্কে বান্দাকে উহার বিভিন্ন ঘাঁটিতে প্রশ্ন করিবার জন্য আটক করা হইবে। যদি বান্দা কুফরী ও রিয়াকারী হইতে স্বীয় ঈমানকে পাক রাখিয়া থাকে, তবেই তাহাকে মার্জনা করা হইবে। অন্যথায় দোযখে নিক্ষেপ করা হইবে। দ্বিতীয় ঘাঁটিতে নামায সম্পর্কে, তৃতীয় ঘাঁটিতে যাকাত সম্পর্কে, চতুর্থ ঘাঁটিতে রোযা সম্পর্কে, পঞ্চম ঘাঁটিতে হজ্জ ও ওমরাহ্ সম্পর্কে, ষষ্ঠ ঘাঁটিতে অজু এবং ফরজ গোসল সম্পর্কে এবং সপ্তম ঘাঁটিতে পিতামাতা ও আত্মীয়দের প্রতি সদ্ব্যবহার ও দুর্ব্যবহার সম্পর্কে প্রশ্ন করা হইবে। এই সকল প্রশ্নের উত্তর যথার্থভাবে দিতে পারিলে বান্দা উহা নিরাপদে অতিক্রম করিয়া বেহেশতে দাখিল হইবে। অন্যথায় নীচের জাহান্নামে পড়িয়া কষ্ট ভোগ করিবে।”

হযরত ওহাব ইবনে মাম্বাহ (রাঃ) বলেন, “সেদিন হুযুর করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) প্রত্যেক ঘাঁটিতে মুনাজাত করিবেন, “ইয়া রাব্বি হাবলী উম্মাতি, ইয়া রাব্বি হাব্‌লী উম্মাতি!” তখন , উহাতে মানুষের এত ভীড় হইবে যে, একে অন্যের উপর পতিত হইবে। সেতুটি সমুদ্রের মধ্যে প্রকম্পিত জাহাজের ন্যায় প্রবল বাতাসে আন্দোলিত হইতে থাকিবে। তথাপিও যাহারা রক্ষা পাওয়ার তাহারা আল্লাহর রহমতে পার হইয়া যাইবে। প্রথম দল চক্ষুর দৃষ্টি হরণকারী বিজলীর মত দ্রুতবেগে, দ্বিতীয় দল প্রবল ঝড়ের ন্যায়, তৃতীয় দল দ্রুতগামী পাখীর ন্যায়, চতুর্থ দল দ্রুতগামী অশ্বের ন্যায়, পঞ্চম দল ধাবমান পথিকের ন্যায়, ষষ্ঠ দল দুর্বল পথিকের মত ধীরে ধীরে, সপ্তম দল ধাবমান উটের মত, অষ্টম দল গর্ভবতী মহিলাদের মত, নবম দল বাঘের মত দৌড়াইয়া পুল পার হইবে। একদল পুলের উপর দাঁড়াইয়া থাকিবে ও চলিতে এবং পার হইতে পারিবে না। তন্মধ্যে কেহ একদিনে কেহ একমাসে, কেহ এক বৎসরে, কেহ দুই বৎসরে, কেহ তিন বৎসরে ক্রমানুয়ে দীর্ঘ সময়ে পুলছিরাত পার হইবে। সর্বশেষ ব্যক্তি উহা পঁচিশ হাজার বৎসরে পার হইবে।

হাদীস শরীফে আরও আছে, “মানুষ যখন পুল পার হইতে থাকিবে, তখন তাহাদের সামনে-পেছনে, উর্ধ্বে-নিন্মে ডাহিনে-বামে, চতুর্দিকে কেবল জ্বলন্ত আগুন থাকিবে। যেমন, আল্লাহ পাক ঘোষণা করিয়াছেন, “তোমাদের মধ্যে এমন কেহ নাই যে, তাহাকে পুলছিরাত পার হইতে হইবে না। তোমার প্রতিপালক নিশ্চয়ই ইহা অতিক্রম করাইবেন। তারপর আমি প্রত্যেক ধর্মভীরুদিগকে নিস্তার দিব এবং অত্যাচারীদিগকে অধঃমুখে দোযখে নিক্ষেপ করিব।” নরকাগ্নি তাহাদের হাড়, মাংস, চামড়া, নাড়িভূড়ি জ্বালাইয়া কয়লার মত করিয়া দিবে। 

অপরদিকে কেহ নির্বিঘ্নে তাহা পার হইবে। আগুন তাহাদিগকে স্পর্শও করিবে না। পরন্তু সে পার হইয়া বলিবে, “কই পুলছিরাত কোথায়?” ফেরেশতাগণ উত্তর করিবে, “হে আল্লাহর বান্দা! আল্লাহর রহমতে তুমি উহা অতিক্রম করিয়াছ।" আরও বর্ণিত আছে যে, একদল লোক আগুনের ভয়ে মধ্যখানে দাঁড়াইয়া কাঁদিতে থাকিবে। এমতাবস্থায় হযরত জিব্রাইল (আঃ) তাহাদিগকে প্রশ্ন করিবেন, “তোমরা কেন দাঁড়াইয়া ক্রন্দন করিতেছ?” তাহারা বলিবে, “আগুনের ভয়ে।” পুনরায় জিজ্ঞাসা করিবেন, “পৃথিবীতে কিভাবে তোমরা সমুদ্র অতিক্রম করিতে?” তাহারা উত্তর করিবে, “নৌকা বা জাহাজে চড়িয়া।” তখন ফেরেশ্তাগণ ঐ সকল মসজিদগুলিকে যাহাতে তাহারা জামাতে নামায আদায় করিয়াছিল, নৌকা বা জাহাজের ছুরতে উপস্থিত করিবে এবং তাহারা সেইগুলিতে আরোহণ করিয়া পুলছিরাত পাৱ হইয়া যাইবে। আর তাহাদিগকে স্মরণ করাইয়া ঘোষণা করা হইবে, “এইগুলি সেই মসজিদ, যাহাতে তোমরা জামাতের সহিত নামায সম্পন্ন করিতে।” 

হাদীস শরীফে আরও আছে, “রোজ কিয়ামতে আল্লাহর সম্মুখে এক ব্যক্তিকে উপস্থিত করা হইবে, যাহার গুনাহরাশি নেক হইতে অধিক হইবে। এইজন্য তাহাকে দোযখে নিক্ষেপের নির্দেশ দেওয়া হইবে। তারপর আল্লাহ পাক হযরত জিব্রাইল (আঃ) কে বলিবেন, “হে জিব্রাইল! তাহাকে জিজ্ঞাসা কর, সে কি কোন আলেমের মাহফিলে বসিয়াছিল? তবে তাহাকে আমলের সুপারিশে মাফ করিয়া দিব।” তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলে সে উত্তর করিবে যে সে বসে নাই। হযরত জিব্রাইল (আঃ) আরজ করিবেন, “হে আল্লাহ! তুমিই তোমার বান্দা সম্পর্কে ভাল জান।” আল্লাহ আবার বলিবেন, “তাহাকে জিজ্ঞাসা কর, সে কোন আলেমের সাথে ভালবাসা রাখিয়াছিল কিনা?” বান্দা বলিবে, না রাখে নাই। আবার জিজ্ঞাসা করা হইবে, “সে কি কোন আলেমের দস্তরখানে বসিয়া আহার করিয়াছে?" বান্দা উত্তরে না বলিবে। পুনরায় জিজ্ঞাসা করা হইবে, “সেকি কোন আলেমের গৃহে বসবাস করিয়াছে?" বান্দা উত্তর করিবে, না। আবার জিজ্ঞাসা করা হইবে, “সে কি কোন আলেমের নামে নিজের ছেলের নাম রাখিয়াছে? তাহাতেও তাহাকে মাফ করিয়া দিব।” ইহাও পাওয়া যাইবে না। আবার জিজ্ঞাসা করা হইবে, “সে এমন কোন ব্যক্তিকে ভালবাসিয়াছে কি, যে কোন আলেমকে ভালবাসিত।” এইবার বান্দা উত্তর করিবে 'হ্যাঁ।' তখন আল্লাহ নির্দেশ দিবেন, “তাহাকে বেহেশতে পৌছাইয়া দাও। কারণ সে পৃথিবীতে আলেমের প্রিয়পাত্রকে ভালবাসিয়াছে।" 

হাদীস শরীফে আরও আছে, “রোজ কিয়ামতে মসজিদগুলিকে শুভ্র উটের ন্যায় হাশরের মাঠে হাজির করা হইবে। উহার পাগুলি আম্বর নির্মিত হইবে। গলা জাফরানের, মস্তক মেশকের ও পৃষ্ঠদেশ জবরজদের তৈরী হইবে। উহাদের পিঠে জামাতের নামায আদায়কারীগণ সওয়ার হইবে। মোয়াজ্জিনগণ উহার লাগাম ধরিয়া এবং ঈমামগণ হাঁকাইয়া মাঠে লইয়া যাইবে। তখন জিজ্ঞাসা করা হইবে, “তাহারা কি মর্যাদাশীল · ফেরেশতা না কোন নবী ও রাসূল?” উত্তরে বলা হইবে, “হে হাশরবাসীগণ! তাহারা কোন নবী ও রাসূল বা কোন মর্যাদাশালী ফেরেশতা নহে, বরং তাহারা ঐ সকল উম্মতে মুহাম্মদী যাহারা জামাতে পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়িয়াছিল।” 

আরও বর্ণিত আছে যে, “আল্লাহ পাক দারদাইল নামক একজন ফেরেশতা পয়দা করিয়াছেন। তাহার দুইখানা পাখা মাশরেক-মাগরেব পর্যন্ত বিস্তৃত। মাগরিবের পাখা ইয়াকুত এবং মাশরিকের পাখা সবুজ জবরজদে নির্মিত হইবে। আর মণিমুক্তা, ইয়াকুত ও মারজান খচিত হইবে। ইহার মস্তক আরশের নীচে এবং পদদ্বয় সপ্ততল মাটির নীচে থাকিবে। তিনি প্রত্যেক রমযান মাসের রাত্রে উদাত্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেন, “কোন প্রার্থনাকারী আছে কি, আল্লাহ যাহার প্রার্থনা কবুল করিবেন। কোন আকাঙ্ক্ষাকারী আছে কি? তাহা পূরণ করিয়া দেওয়া হইবে। কোন তাওবাহকারী আছে কি? তাহার তাহওবাহ, কবুল করা হইবে। কোন ক্ষমাকারী আছে কি? আজ ক্ষমা করা হইবে।” উক্ত ফেরেশতা ফজর পর্যন্ত এইরূপ ঘোষণা করেন।

পরবর্তী পর্ব-
দোযখের বিবরণ

দাকায়েকুল আখবার- (৩৮) তুলাদণ্ড বা মিজান খাঁড়া করিবার বিবরণ



📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ৩৮)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

তুলাদণ্ড বা মিজান খাঁড়া করিবার বিবরণ-
হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, “রোজ কিয়ামতে আল্লাহ পাক একটি বৃহৎ খুঁটির উপর মিজানকে খাঁড়া করিবেন। উক্ত খুঁটি মাশরিক ও মাগরিবের সমান লম্বা হইবে। উহার দুইটি পাল্লা পৃথিবীর সমান প্রশস্ত হইবে। নেকের পাল্লাটি আরশের দক্ষিণ দিকে থাকিবে এবং বদের পাল্লাটি আরশের উত্তর দিকে থাকিবে। পঞ্চাশ হাজার বৎসর সমতুল্য দিনে ওজন করিবার জন্য নেক-বদ মিজানের মাঝখানে পাহাড়ের মত স্তূপিকৃত থাকিবে।” হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) আরও বলিয়াছেন যে, “নিরানব্বইটি দপ্তরবিশিষ্ট (হিসাবের খাতার সহিত) এক বান্দাকে মিজানের নিকট উপস্থিত করা হইবে।” তাহার প্রত্যেক পাপপূর্ণ দপ্তর দৃষ্টিশক্তির প্রান্তসীমা পর্যন্ত লম্বা হইবে। এই সমস্ত পাপের পাল্লায় রাখার পর শুধু কালেমা শাহাদাত লিখিত অঙ্গুলির ন্যায় চিকন এক টুকরা কাগজ নেকের পাল্লায় রাখা হইবে। সঙ্গে সঙ্গে বদের' পাল্লাটি হাল্‌কা হইয়া উঠিয়া যাইবে। যেমন, আল্লাহ পাক ঘোষণা করিয়াছেন, : “ফাআম্মা মান ছাকুলাত মাওয়াযিনুহু ফাহুয়া ফি ইশাতির রাদ্বিয়াহ” অর্থাৎ : যাহার নেকের পাল্লা ভারী হইবে, সে চিরসুখে বেহেশতে অবস্থান করিবে। আল্লাহ পাক আরও ঘোষণা করিয়াছেন, “কিন্তু যাহার নেকের পাল্লা হাল্কা হইবে, তাহার বাসস্থান হইবে হাবিয়া দোযখ। তুমি কি পরিজ্ঞাত যে উহা কি? উহা প্রজ্বলিত অনলকুন্ড বিশেষ । ”

পরবর্তী পর্ব-
পুলছিরাতের বিবরণ


বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...