মঙ্গলবার, ৮ এপ্রিল, ২০২৫

আত্মদর্শন (২১) স্বপ্ন তত্ত্ব



আত্মদর্শন পর্ব - ২১
📚কিমিয়ায়ে সাদাত ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)

স্বপ্ন তত্ত্ব 
আত্মা দর্পণতুল্য এবং লওহে মাহ্ফূজও একখানা দর্পণস্বরূপ; ইহাতে বিশ্বের যাবতীয় বস্তু ও ঘটনার ছবি অঙ্কিত আছে। একটি স্বচ্ছ আয়নাকে চিত্রিত আয়নার সম্মুখে ধরিলে স্বচ্ছ আয়নাতে যেমন চিত্রিত আয়নার ছবি প্রতিফলিত হয়, তদ্রূপ নির্মল আত্মা লওহে মাহফুজের সম্মুখীন হইলে ইহাকে অঙ্কিত সমস্ত বস্তু ও ঘটনার ছবি নির্মল আত্মার মধ্যে পরিষ্কাররূপে দেখা যায়। তবে লওহে মাহফুজের ছবি আত্মায় প্রতিফলিত হওয়ার উপযোগী করিতে হইলে ইহাকে পাপের মলিনতা হইতে সম্পূর্ণরূপে নির্মল রাখিতে হয় এবং জড়জগতের সহিত ইহার সকল সম্বন্ধ ছিন্ন করত ইহাকে লওহে মাহফুজের সম্মুখীন করিতে হয়। আত্মা যতক্ষণ আত্মা ও লওহে মাহফুজের মধ্যে এক আবরণ বিদ্যামান থাকে। নিদ্রার সময়ে আত্মার সহিত জড়জগতের সম্বন্ধ একেবারে বিচ্ছিন্ন হয় বলিয়া আপনা আপনিই আধ্যাত্মিক জগত নয়নগোচর হয়। কিন্তু নিদ্রিতাবস্থায় ইন্দ্রিয়সমূহের কার্য স্থগিত থাকিলেও খেয়াল বাকি থাকে। এই জন্যই আধ্যাত্মিক জগতের বিষয়সমূহ পরিষ্কাররূপে দেখা না গিয়া সাদৃশ্যে উপমাস্বরূপ দৃষ্টিগোচর হইয়া থাকে। মানুষ মরিয়া গেলে খেয়াল বা ইন্দ্রিয় কোনটাই থাকে না; তখন সকল আবরণ বিদূরিত হয় এবং বিশ্বজগতের সকল বিষয় পরিষ্কাররূপে আত্মার দৃষ্টিগোচর হইতে থাকে ৷ সেই সময় আত্মাকে লক্ষ্য করিয়া বলা হয় : “অনন্তর তোমা হইতে তোমার পর্দা তুলিয়া লইয়াছি, অতঃপর তোমার দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হইল৷” উত্তরে আত্মা বলিবে : “হে আমাদের রব, আমরা দেখিলাম ও শুনিলাম; আমাদিগকে পুনরায় পাঠাও; আমরা সৎকাজ করিব। নিশ্চয়ই আমরা বিশ্বাসী আছি।”

এই দুনিয়াতে এমন কোন লোক নাই যাহার হৃদয়ে ইলহামের মধ্যস্থতায় অন্তর্দৃষ্টি ও শুভ প্রেরণা জাগরিত না হয়। এই সকল ইন্দ্রিয়পথে আসে না, বরং হৃদয়েই উৎপন্ন হয়। উহা কোথা হইতে আসে লোকে জানে না। ইহাতে বুঝা গেল যে, সকল জ্ঞান শুধু বাহ্যজগত হইতে হয় না এবং আত্মা এই জড়জগতের নহে, বরং আধ্যাত্মিক জগত দর্শনে উহারা স্বভাবতই বাধা সৃষ্টি করিয়া থাকে। অতএব, মানুষ যতদিন জড়জগতের সকল সম্বন্ধ ছিন্ন না করিবে ততদিন আধ্যাত্মিক জগতের দিকে পথ পাইবে না ।

জাগ্রতাবস্থায় আধ্যাত্মিক জগতের জ্ঞান লাভের উপায়

আত্মদর্শন (২০) আত্মার শ্রেষ্ঠত্বের কারণ



আত্মদর্শন পর্ব - ২০
📚কিমিয়ায়ে সাদাত ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)

আত্মার শ্রেষ্ঠত্বের কারণ 
আত্মা জগতের আশ্চর্যসমূহের শেষ নাই। সৃষ্টজগতে আত্মা সর্বাপেক্ষা অধিক বৈশিষ্ট্যপূর্ণ, এইজন্যই ইহার শ্রেষ্ঠত্ব। কিন্তু বহু লোকে ইহা জানে না। আত্মার শ্রেষ্ঠত্বের দুইটি কারণ আছে, যথা- (১) জ্ঞান ও (২) শক্তি। আত্মার জ্ঞানজনিত শ্রেষ্ঠত্ব আবার দুই প্রকার। ইহার একটি সকলেই বুঝিতে পারে এবং অপরটি নিতান্ত গুপ্ত এবং অতি উত্তম। শেষোক্তটি অতি দুর্লভ। আত্মার জ্ঞানজনিত প্রকাশ্য শ্রেষ্ঠত্ব হইল সকল বিদ্যা ও যাবতীয় শিল্পকৌশল জানিবার ক্ষমতা। এই ক্ষমতাবলে আত্মা সকল শিল্পকৌশল শিক্ষা করিতে পারে এবং ইহার বলেই মানুষ লিখিত বিষয় পাঠ করিতে পারে ও শিখিতে পারে। অংকশাস্ত্র, চিকিৎসাবিদ্যা, জ্যোতিষ ও ধর্মনীতি এই ক্ষমতাবলেই আয়ত্ত হয়। এই ক্ষমতার প্রভাবেই আত্মা এমন পদার্থ যে, ইহা বিভক্ত হইতে পারে না, অথচ ইহাতে সমস্ত জ্ঞানবিজ্ঞানের সমাবেশ হইতে পারে। এমনকি, মরুভূমির মধ্যে সামান্য বালুকণা যেমন লুকাইয়া যায় তদ্রূপ সমস্ত জগতের জ্ঞান-বিজ্ঞানও আত্মার মধ্যে লুকাইয়া থাকে। চিন্তাবলে আত্মা এক মুহূর্তে পৃথিবী হইতে আকাশে এবং বিশ্বের এক প্রান্ত হইতে অপর প্রান্তে বিচরণ করিতে পার। ভূতলে থাকিলেও ইহা আকাশমণ্ডল জরিপ করিতে পারে, এক গ্রহ হইতে অপর গ্রহের দূরত্ব নির্ণয় করিতে পারে; সাগরতল হইতে মৎস্যকে কৌশলে উত্তোলন করিতে পারে; আকাশ বিহারী পক্ষীকে কৌশলে ভূতলে নামাইতে পারে এবং উট, হাতী, ঘোড়া প্রভৃতি অতি শক্তিশালী প্রাণীকে বশীভূত করিতে পারে। বিশ্বের আশ্চর্য আশ্চর্য জ্ঞান ইহার ব্যবসায় পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে আত্মা এই জ্ঞান আহরণ করে। ইহাতে বুঝা যায় যে, আত্মার দিকে সকল ইন্দ্রিয়ের এক একটি পথ খোলা রহিয়াছে। 
বড়ই বিস্ময়ের ব্যাপার এই যে, জড়-জগতের দিকে পঞ্চ ইন্দ্রিয় যেমন হৃদয়ের পাঁচটি দ্বার, তদ্রূপ আধ্যাত্মিক জগতের দিকেও হৃদয়ের একটি প্রশস্ত দ্বার খোলা আছে। অধিকাংশ লোকেই কেবল জড়জগতকেই অনুভূতির বিষয় এবং বাহ্য ইন্দ্রিয়সমূহকেই জ্ঞানের দ্বার বলিয়া মনে করে। কিন্তু এই ধারণা সঙ্কীর্ণতা প্রসূত ও অমূলক। জ্ঞানের দিকে হৃদয়ের যে বহু দ্বার খোলা রহিয়াছে ইহার দুইটি প্রমাণ আছে। 
প্রথম, স্বপ্ন – নিদ্রিত অবস্থায় প্রকাশ্য ইন্দ্রিয়ের কার্য বন্ধ হইয়া যায়, কিন্তু হৃদয়ের আভ্যন্তরিক জ্ঞানদ্বার খুলিয়া পড়ে। তখন আলমে আরওয়াহ্ ও লওহে মাহফুজের অজ্ঞাত বিষয়সমূহ দৃষ্টিগোচর হইতে থাকে, ভবিষ্যতে যাহা ঘটিবে তাহা কখনও পরিষ্কারভাবে স্পষ্টত দেখা যায়, আবার কখনো সাদৃশ্যে উপমাস্বরূপ দৃষ্টিগোচর হয়। যখন সাদৃশ্যে দেখা যায় তখন স্বপ্নের অর্থ করিয়া বুঝিতে হয়। লোকে মনে করে জাগরিত ব্যক্তি অধিক পরিমাণে জ্ঞান লাভে সমর্থ অথচ জাগ্রত অবস্থায় গায়েবের কোন বিষয়ই নয়নগোচর হয় না। স্বপ্নতত্ত্বের বিস্তারিত বিবরণ এ গ্রন্থে সমাবেশ হইবে না। তথাপি সংক্ষেপে কিছু বলা হইতেছে। 

স্বপ্ন তত্ত্ব 

আত্মদর্শন (১৯) মানুষের নিত্য ও অনিত্য গুণ



আত্মদর্শন পর্ব - ১৯
📚কিমিয়ায়ে সাদাত ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)

মানুষের নিত্য ও অনিত্য গুণ 
যে গুণ মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব ও পূর্ণতার মূল কারণ, উহাই তাহার আসল ও নিত্য গুণ। এতদ্ব্যতীত অপর সমস্ত গুণই নৈমিত্তিক অর্থাৎ অন্য কারণে আগত ও অনিত্য। এই অনিত্য গুণগুলি মানুষকে কেবল পূর্ণতা লাভে সাহায্য করিবার জন্য দেওয়া হইয়াছে। এই জন্যই মানুষ যখন মরে তখন কাম, লোভ, ক্রোধ ইত্যাদি রিপু আর তাহার সহিত থাকে না। কিন্তু তখনও দুইটি বস্তুর কোন একটি অবিচ্ছেদ্যরূপে তাহার সহিত থাকে। 
—তন্মধ্যে ( ১ ) একটি মানুষের আসল মূল বস্তু; ইহা ফেরেশতাদের ন্যায় আল্লাহর মারিফাতে সুশোভিত। ইহা মৃত্যুর পরেও আপনা-আপনিই নেককার লোকের সঙ্গে বন্ধুর ন্যায় থাকিয়া যায়। ইহাই ফেরেশতাগণেরও চিরসাথী এবং তাঁহার এই অবস্থা প্রাপ্ত হইয়া সর্বদা আল্লাহর সন্নিধানে উপস্থিত থাকেন। নেক্কার লোকদের আত্মাও তদ্রূপ সুশোভিত হইয়া আল্লাহর সান্নিধানে বিরাজ করিবে; যেমন আল্লাহ্ তা'আলা বলেন : “সত্য আসনে ক্ষমতাশীল বাদশাহের নিকট (উপবিষ্ট) থাকিবে।” 
—অপর (২) বস্তুটি মৃত্যুর পর বদকার লোকের সঙ্গে থাকে। ইহা কলঙ্ক কালিমাপূর্ণ ও অন্ধকারাচ্ছন্ন। পাপের প্রভাবে মানবাত্মার মরিচা ধরে বলিয়া ইহা কলঙ্কালিমাপূর্ণ এবং জীবিতাবস্থায় সে অন্যের প্রতি ক্রোধ ও অবিচার করিয়া আরাম পাইতে বসিয়া অন্ধকারাচ্ছন্ন মৃত্যুকালে এই সকল কুপ্রবৃত্তি তাহা হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া যায়; কিন্তু তাহার আত্মার মুখ ইহাদের দিকেই থাকে। কারণ, তাহার সকল লোভনীয় দ্রব্য জীবনের লক্ষ্যবস্তু এই জগতেই থাকিয়া যায়। আর এই জগৎ পর জগতের নিম্নে বলিয়া বদকারগণ পরকালে ঊর্ধ্ব পদ অধো মস্তক অবস্থায় থাকে। এই অর্থেই আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ “আক্ষেপ, যদি তুমি দেখ যখন পাপীগণ আপন পালনকারীর নিকট নিজেদের মাথা নীচু করিয়া থাকিবে।” (সূরা সিজদা : রুকূ ২, পারা ২১ ) এই প্রকার বদকার লোক শয়তানের সহিত সিজ্জীনে নিপতিত হইবে । সিজ্জীনের অর্থ সকলে জানে না । এইজন্য আল্লাহ্ বলেন “আর সিজ্জীন কি তোমাকে কিসে জানাইবে ?”


আত্মার শ্রেষ্ঠত্বের কারণ 

আত্মদর্শন (১৮) মানব জীবনের উদ্দেশ্য



আত্মদর্শন পর্ব - ১৮
📚কিমিয়ায়ে সাদাত ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)

মানব জীবনের উদ্দেশ্য 
এখানে প্রশ্ন হইতে পরে মানুষের মধ্যে যখন ইতর প্রাণীর স্বভাব, শয়তানের স্বভাব ও ফেরেশতার স্বভাব বিদ্যমান আছে তখন কিরূপে জানিব যে, ফেরেশতার স্বভাবই মানুষের আসল গুণ উহা ব্যতীত আর সকল গুণ ও স্বভাবই নৈমিত্তিক ? আবার কেমন করিয়াই বা বুঝিব যে, মানুষ কেবল ফেরেশতা স্বভাব অর্জনের জন্যই সৃষ্ট হইয়াছে অন্য গুণের জন্য নহে ? তবে শোন; তাহা হইলেই বুঝিবে, ইতর প্রাণী ও হিংস্র জন্তু অপেক্ষা মানুষ শ্রেষ্ঠ। আল্লাহ্ প্রত্যেক বস্তুর জন্য পূর্ণতার একটি শেষ সীমা নির্দিষ্ট করিয়া দিয়াছেন। এবং কেহই এই সীমা অতিক্রম করিয়া অধিকতর উন্নতি লাভ করিতে পারে না। আর যাহার উন্নতি যে সীমা পর্যন্ত নির্দিষ্ট করিয়া রাখিয়াছেন, সেই সীমা পর্যন্ত উন্নতি করিবার জন্যই তাহাকে সৃষ্টি করা হইয়াছে। একটি উপমা দ্বারা বিষয়টি বুঝাইয়া দেওয়া যাইতেছে। ঘোড়া গাধা অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। কারণ, গাধা শুধু ভারবহনের জন্যেই সৃষ্ট, কিন্তু ঘোড়া গাধার ন্যায় ভারও বহন করিতে পারে, আবার যুদ্ধের সময় যোদ্ধাকে পৃষ্ঠে লইয়া তাহার ইঙ্গিত অনুসারে চলাফেরা করিবার ক্ষমতাও রাখে। এই জন্যই গাধা অপেক্ষা ঘোড়ার শ্রেষ্ঠত্ব অধিক। ঘোড়া যদি এই শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করিতে না পারে তবে গর্দৰ্ভত্ব প্রাপ্ত হয় এবং তখন গর্দভের ন্যায় ভারবহন ছাড়া আর কিছুই করিতে পারে না। ইহা ঘোড়ার পক্ষে নিতান্ত ক্ষতি ও অধোগতি। তদ্রূপ কোন কোন লোক পানাহার, নিদ্রা ও স্ত্রীসম্ভোগের জন্যই মানব সৃষ্টি হইয়াছে মনে করিয়া কেবল এই সকল কার্যেই স্বীয় পরমায়ু ধ্বংস করে। আবার কোন কোন সম্প্রদায় আরবী তুর্কীদের ন্যায় মনে করে যে, অপরকে জয় করিয়া তাহাদের উপর প্রভুত্ব স্থাপন করাই মানব জীবনের উদ্দেশ্য। এই দুইটি মতই ভ্রমাত্মক। কেননা, পানাহার, স্ত্রীসম্ভোগ প্রবৃত্তির উত্তেজনায় সম্পন্ন হয়। এই প্রবৃত্তি ইতর জন্তুরও আছে। বরং উটের পানাহার শক্তি ও বাবুই পক্ষীর কাম-শক্তি মানুষের অপেক্ষা অনেক অধিক। এমতাবস্থায় পানাহার, মৈথুন কার্যে উন্নতি লাভই যদি মানব জীবনের উদ্দেশ্য হয় তবে কিরূপে মানুষকে উট ও বাবুই পক্ষী অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ বলা যাইতে পারে ? অপর পক্ষে অন্যকে পরাজিত করা ক্রোধের কার্য হিংস্র জন্তুরও ক্রোধ আছে। অতএব নিকৃষ্ট প্রাণী ও হিংস্র জন্তুর প্রকৃতিতে যে ভাব আছে তাহা মানুষের মধ্যেও আছে। তবে মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব কিসে? কেবল বুদ্ধির জন্যই মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব। বুদ্ধি আছে বলিয়াই মানুষ আল্লাহকে চিনিতে পারে এবং তাঁহার বিচিত্র শিল্প-নৈপুণ্য ও বিস্ময়কর কারিগরি জানিতে পারে। বুদ্ধিবলেই মানুষ নিজকে কাম, ক্রোধ ও লোভের হাত হইতে রক্ষা করিতে পারে। ইহাই ফেরেশতার স্বভাব। ইহার প্রভাবেই মানুষ পশু-পক্ষী প্রভৃতি সকলের উপর আধিপত্য স্থাপন করিতে পারে। বরং জগতে যাহা কিছু আছে সবই মানুষের জন্য নিয়মাধীন করা হইয়াছে, যেমন আল্লাহ্ বলেন : “আর যাহা কিছু আকাশে আছে এবং যাহা কিছু পৃথিবীতে আছে তৎসমুদয় তিনি তোমাদের জন্য নিয়মাধীন করিয়া দিয়াছেন ।”


মানুষের নিত্য ও অনিত্য গুণ 

আত্মদর্শন (১৭) আত্মা দর্পণ সদৃশ



আত্মদর্শন পর্ব - ১৭
📚কিমিয়ায়ে সাদাত ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)

আত্মা দর্পণ সদৃশ  
মানবাত্মা স্বচ্ছ দর্পণের ন্যায় উজ্জ্বল এবং মন্দ স্বভাবে ধোঁয়া ও অন্ধকারসদৃশ। ইহা হৃদয়ে প্রবেশ করিয়া আত্মাকে কলুষিত করিয়া ফেলে। ইহা কিয়ামত দিবসে মানবকে আল্লাহর দর্শন লাভে বঞ্চিত রাখিবে। প্রভু সস্বভাব উজ্জ্বল আলোকস্বরূপ। ইহা হৃদয়ে প্রবেশ করিয়া আত্মার মলিনতা ও পাপ দূর করিয়া সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে এইজন্যই রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : “প্রত্যেক মন্দ কার্যের পর সৎকার্য কর। কারণ সৎকার্য অসৎ কার্য মিটাইয়া দেয়।” কিয়ামত দিবসে মানবাত্মা উজ্জ্বল সৌন্দর্যবিশিষ্ট বা অন্ধকারাবৃত মলিন হইয়া বিচারক্ষেত্রে উত্থিত হইবে। আল্লাহ্ বলেন : “যে ব্যক্তি আল্লাহর নিকট নিষ্কলঙ্ক আত্মা লইয়া আসিবে সে ব্যতীত অপর কেহই নাজাত পাইবে না।”

সৃষ্টির প্রারম্ভে আত্মা এমন লৌহের ন্যায় থাকে যদ্দ্বারা স্বচ্ছ দর্পণ নির্মিত হয়। লৌহ-দর্পণে যেমন সকল বস্তুর প্রতিবিম্ব পড়িতে পারে, আত্মার মধ্যেও তদ্রূপ বিশ্বের সকল বস্তুর প্রতিবিম্ব পড়িতে পারে। কিন্তু লৌহ-দর্পণকে অতি সাবধানতার সহিত রক্ষা করিতে না পারিলে উহা মরিচার ধরিয়া নষ্ট হইয়া যায় এবং উহা তখন প্রতিবিম্ব ধারণের অযোগ্য হইয়া পড়ে। আত্মার অবস্থাও ঠিক তদ্রূপড। এই সম্পর্কেই আল্লাহ্ বলেনঃ “ তাহা নহে, বরং নিজ কর্মের দোষে তাহাদের আত্মার উপর মরিচা পড়িয়াছে।”


মানব জীবনের উদ্দেশ্য 

আত্মদর্শন (১৬) পাপ-পুণ্য



আত্মদর্শন পর্ব - ১৬
📚কিমিয়ায়ে সাদাত ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)

পাপ-পুণ্য 
যে সকল কর্মে মন্দ গুণ ও মন্দ স্বভাব জন্মে উহাদিগকে পাপকর্ম বলে। অপরপক্ষে যে সকল কার্যে সদ্গুণ ও উত্তম স্বভাবের উৎপন্ন হয় উহাদিগকে পুণ্যকর্ম বলে। মানুষের সকল গতিবিধি ও ক্রিয়াকলাপ পাপ-পুণ্য এই দুই অবস্থা ব্যতীত অন্য অবস্থায় থাকিতে পারে না। 


আত্মা দর্পণ সদৃশ  

আত্মদর্শন (১৫) প্রবৃত্তি বিশেষের অনুসরণে ভাব বিশেষের উৎপত্তি



আত্মদর্শন পর্ব - ১৫
📚কিমিয়ায়ে সাদাত ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)

প্রবৃত্তি বিশেষের অনুসরণে ভাব বিশেষের উৎপত্তি —
উল্লিখিত বর্ণনা হইতে বুঝা গেল যে, মানুষের প্রতি আদেশ জারি করিবার ও তাহাকে চালাইবার জন্য চারি প্রকার প্রবৃত্তি তাহার মধ্যে রহিয়াছে। তন্মধ্যে কোন্‌টির অধীনতায় তোমার গতিবিধি ও কাজকর্ম চলিতেছে তাহা তোমাকে বিশেষভাবে লক্ষ্য করিয়া দেখিতে হইবে। আর ইহাও দৃঢ়রূপে বিশ্বাস করিয়া লও যে, তুমি যে কাৰ্যই কর না কেন, তাহার ফলস্বরূপ তোমার আত্মায় এক প্রকার গুণ বা ভাব উৎপন্ন হইবে এবং এই সকল গুণ বা ভাব পরকালেও তোমার সঙ্গে থাকিব । এই গুণকেই স্বভাব বলে। 
মানব স্বভাব উল্লিখিত চারি প্রকার হুকুমদাতা প্রবৃত্তি হইতে উৎপন্ন হয়। তুমি খাহেশরূপ শূকরের অধীন হইয়া চলিলে তোমার স্বভাবে অপবিত্রতা, নির্লজ্জতা, লোভ-চাটুকারিতা, হিংসা ইত্যাদি কুস্বভাবের উৎপন্ন হইবে। অপরপক্ষে এই শূকরকে দাবাইয়া রাখিলে তোমার মধ্যে অল্পে তুষ্টি, লজ্জাশীলতা, বিচক্ষণতা, পবিত্রতা, নির্লোভতা, বিনয় ইত্যাদি সদগুণ প্রকাশিত হইবে। আবার ক্রোধরূপ কুকুরের বশীভূত হইলে দুঃসাহস, অপবিত্রতা, দাম্ভিকতা, গর্ব, অহংকার, প্রভু-প্রিয়তা, ভর্ৎসনা, অত্যাচার, অপরের প্রতি অবজ্ঞা ও ঘৃণা, কলহপ্রিয়তা প্রভৃতি স্বভাব তোমাতে প্রকাশিত হইবে । পরস্থ সেই কুকুরকে শাসনে রাখিতে তোমার মধ্যে ধৈর্য, গাম্ভীর্য, ক্ষমতা, স্থিরতা, বীরত্ব, নীরবতা, সম্মান শ্রেষ্ঠত্ব ইত্যাদি সদগুণ প্রকাশিত হইবে । যে শয়তানী প্রবৃত্তি পূর্বোক্ত শূকর প্রকৃতিতে প্রলুব্ধ করিয়া দুঃসাহসিক করিয়া তোলে ও প্রতারণা শিক্ষা দেয় তাহার বশবর্তী হইয়া চলিলে তোমাকে প্রবঞ্চনা, বিশ্বাসঘাতকতা, জালিয়াতি, হিংসা-বিদ্বেষ, ছলনা প্রভৃতি কুস্বভাব প্রকাশিত হইবে। পরভু তুমি যদি সেই শয়তানী প্রবৃত্তিকে বশীভূত করিয়া রাখ ও তাহার ধোঁকায় না পড় এবং বুদ্ধির লঙ্করকে বলবান করিয়া তোল তবে তোমাতে বিজ্ঞতা, জ্ঞান, কৌশল, নিপুণতা, সৎস্বভাব, শ্রেষ্ঠত্ব, প্রভুত্ব প্রভৃতি সদগুণ প্রকাশিত হইবে । এই সকল সদগুণ চিরকাল তোমার সঙ্গে থাকিবে এবং তোমার মৃত্যুর পর উহা স্থায়ী সৎকার্যের প্রস্রবণ ও তোমার সৌভাগ্যের বীজ হইবে ।

পরবর্তী পর্ব —
পাপ-পুণ্য 

আত্মদর্শন (১৪) বুদ্ধির আলোকে ফেরেশতাদের জ‍্যোতি



আত্মদর্শন পর্ব - ১৪
📚কিমিয়ায়ে সাদাত ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)

বুদ্ধির আলোকে ফেরেশতাদের জ‍্যোতি 
ইহার সাহায্যে শয়তানের ছল-চাতুরি ধরিয়া ফেলিবার জন্য মানুষকে আদেশ করা হইয়াছে। তাহা করিলেই মানুষ অপদস্থ হইবে না এবং শয়তানও তাহাকে প্রতারিত করিতে পারিবে না এই মর্মেই রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : “প্রত্যেক মানুষের জন্য এক একটি শয়তান আছে। কিন্তু আল্লাহ তাহার উপর আমাকে জয়ী করিয়াছেন এবং সে আমার অধীন হইয়া পড়িয়াছে। আর সে আমাকে মন্দ কার্যের নির্দেশ দিতে পারে না।"

খাহেশরূপ শূকর ও ক্রোধরূপ কুকুরকে দমন করিয়া এইরূপ বুদ্ধির অধীনে স্থাপন করিবার জন্য মানুষ আদিষ্ট হইয়াছে যেন উহারা বুদ্ধির আদেশ ব্যতীত চলিতে ফিরিতে না পারে। যে ব্যক্তি খায়েশ ও ক্রোধকে বুদ্ধির অধীন করিবে সে সৌভাগ্যের বীজস্বরূপ সৎস্বভাব লাভ করিতে পারিবে। কিন্তু ইহার বিপরীত করিয়া নিজেই খাহেশ ও ক্রোধের দাস হইয়া পড়িলে তাহার মধ্যে কতগুলি জঘন্য স্বভাব বিকাশ পাইবে। উহাই তাহার দুর্ভাগ্যের বীজস্বরূপ হইয়া থাকিবে। তাহার প্রকৃত অবস্থা স্বপ্নে বা জাগরণে যদি তাহাকে দৃষ্টান্তস্বরূপ দেখানো হয় তবে সে দেখিতে পাইবে যে, একটি শূকর, কুকুর বা শয়তানের সম্মুখে সে ব্যক্তি করজোড় দণ্ডায়মান রহিয়াছে। কোন মুসলমানকে কাফিরের অত্যাচারে নিঃসহায় পরিত্যাগ করিলে কাফির যেমন মুসলমানের দূর্দশার একশেষ করিয়া থাকে । লোকে যদি বিচার ও চিন্তা করিয়া দেখে তবে বুঝিতে পারিবে যে, তাহারা দিবারাত্র নফসানী খাহেশের অনুসরণ করিয়া চলিতেছে । প্রকাশ্য আকৃতিতে তাহাদের মানুষরূপে দেখা গেলেও কিয়ামতের দিন তাহাদের প্রকৃত অবস্থা বাহির হইয়া পড়িবে এবং তাহাদের আকৃতিও তখন তাহাদের প্রকৃতি অনুযায়ী হইবে। যে ব্যক্তি ক্রোধের বশীভূত সে তখন ব্যাঘ্র বা কুকুরের আকার ধারণ করিবে। এই জন্য কথিত আছে, “যে ব্যক্তি স্বপ্নে ব্যাঘ্র দেখিতে পায়, তাহার অর্থ জালিম লোক; কোন ব্যক্তি স্বপ্নে শূকর দেখিলে ইহার অপবিত্র নোংরা লোক ।” নিদ্রা মৃত্যুর নমুনাস্বরূপ। নিদ্রার প্রভাবে মানুষ এই জগত হইতে যত দূরবর্তী হইতে থাকে ততই তাহার আকৃতি ক্রমান্বয়ে প্রকৃতির অনুরূপ হইয়া পড়ে। এইজন্য প্রত্যেক ব্যক্তি বাহ্য আকৃতি তাহার আভ্যন্তরিক প্রকৃতির অনুরূপ দৃষ্টান্ত হইয়া থাকে। এ সকল গভীর রহস্যের কথা। ইহার বিশদ ব্যাখ্যা এই পুস্তকে সমাবেশ হইবে না।


প্রবৃত্তি বিশেষের অনুসরণে ভাব বিশেষের উৎপত্তি 

আত্মদর্শন (১৩) মানব প্রকৃতিতে চতুর্বিধ স্বভাব



আত্মদর্শন পর্ব - ১৩
📚কিমিয়ায়ে সাদাত ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)

মানব প্রকৃতিতে চতুর্বিধ স্বভাব 
মানবের আভ্যন্তরিক প্রত্যেক লঙ্করের সহিত আত্মার সম্বন্ধ আছে এবং এইজন্যই মানবের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন গুণ ও পৃথক পৃথক স্বভাব উৎপন্ন হয়। তন্মধ্যে কতকগুলি মন্দ - ইহারা মানবকে ধ্বংস করে; আর কতকগুলি ভাল - এইগুলি মানুষকে সৌভাগ্যের উন্নত সোপানে লইয়া গিয়া মহা সম্মান প্রদান করে। এই সমস্ত স্বভাব যদিও বহুবিধ তথাপি উহাদিগকে চারি শ্রেণীতে ভাগ করা যায় । যথা – ( ১ ) চতুষ্পদ জন্তুর স্বভাব, ( ২ ) হিংস্র জন্তুর স্বভাব, ( ৩ ) শয়তানের স্বভাব ও ( ৪ ) ফেরেশতার স্বভাব। মানুষের মধ্যে লোভ ও কামপ্রবৃত্তি আছে বলিয়া তাহার আহার গ্রহণ ও স্ত্রী-সহবাস ইত্যাদি নিকৃষ্ট জন্তুর কাজে প্রবৃও হয়, ক্রোধ আছে বলিয়া তাহার কুকুর, সিংহ ও ব্যাঘ্রের ন্যায় মারামারি, কাটাকাটি, ঝগড়া-বিবাদ, গালিগালাজ করিয়া থাকে। ছলনা-প্রতারণা ও অপরের সঙ্গে বিবাদ-বিসম্বাদের প্রবৃত্তি মানুষের মধ্যে আছে বলিয়াই তাহারা শয়তানের কাজ করে। মানুষের মধ্যে বুদ্ধি আছে বলিয়া তাহারা ফেরেশতার কাজও করিয়া থাকে, যেমন - জ্ঞানের প্রতি অনুরাগ, মন্দ কার্যে বিরাগ, অপরের মঙ্গল কামনা, জঘন্য কার্য হইতে বিরত থাকিয়া নিজ সম্মান রক্ষা করা, আল্লাহর মারিফাত লাভ করত সন্তুষ্ট হওয়া এবং অজ্ঞানতা ও মুর্খতাকে লজ্জাকর বিবেচনা করা।" 
বাস্তব পক্ষে মানুষের প্রকৃতির মধ্যে কুকুর স্বভাব, শূকর স্বভাব, শয়তান-স্বভাব ও ফেরেশতা স্বভাব - এই চারিপ্রকার স্বভাব বিদ্যমান আছে। কুকুর স্বীয় আকৃতি, হস্ত, পদ ও চর্মের জন্য সে মন্দ কুকুর মানুষ দেখিলেই ঘেউ ঘেউ করিয়া আক্রমণ করিতে যায়। শূকরও আপন গঠনের দোষে ঘৃণিত। কুকুর ও শূকরের আত্না যে নীচ ইহাই তাহার মূল কথা। মানুষের মধ্যেও ঐ দুই প্রকার প্রবৃত্তি বর্তমান আছে। এইরূপে মানুষের মধ্যে শয়তান স্বভাব এবং ফেরেশতা স্বভাবের ব্যাখ্যা করা যাইতে পারে। 


বুদ্ধির আলোকে ফেরেশতাদের জ‍্যোতি 

আত্মদর্শন (১২) শরীর, আত্মা ও তাহার সৈন্যদের তুলনামূলক পরিচয়



আত্মদর্শন পর্ব - ১২
📚কিমিয়ায়ে সাদাত ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)

শরীর, আত্মা ও তাহার সৈন্যদের তুলনামূলক পরিচয়
আত্মার সমস্ত সৈন্যের পরিচয় বহু বিস্তৃত। তথাপি মোটামুটি বুঝাইবার জন্য একটি উপমা দেওয়া যাইতেছে। শরীর যেন একটি শহর; হস্ত-পদ ইত্যাদি প্রত্যেকে এক একটি ব্যবসায়ী। লোভ এই শহরের খাজনা আদায়কারী তহশীলদার; ক্রোধ কোতওয়াল; আত্মা বাদশাহ এবং বুদ্ধি উযীর। আপন রাজ্যের সুবন্দোবস্ত করিতে বাদশাহের ঐসকল কর্মচারীর সাহায্যের প্রয়োজন হয়। কিন্তু তহশীলদার লোভ, বড় মিথ্যাবাদী এবং স্বীয় অধিকারের অতিরিক্ত কর্ম করিয়া বসেও বুদ্ধিরূপ উযীরের আদেশ অমান্য করে। সে রাজস্বের বাহানায় রাজ্যের সকল ধন সর্বদা আত্মসাৎ করিয়া লইতে চায়। কোতওয়াল ক্রোধ বড় দুষ্ট, বদমেজাজ ও তেজীয়ান। খুন-জখম করিতে সে বড় ভালবাসে। অপরাপর বাদশাহ যেমন সব কার্যে স্বীয় মন্ত্রীর সহিত পরামর্শ করেন, মিথ্যাবাদী ও লোভী তহশীলদারগণকে কানমলা দিয়া সোজা করিয়া রাখেন, মন্ত্রীর পরামর্শের বিপরীত তাহাদের কোন কথাই শ্রবণ করেন না, দুষ্ট সীমা অতিক্রমকারীদিগকে দমন রাখবার জন্য কোতওয়াল নিযুক্ত করেন, আবার কোতওয়ালকেও দমন রাখেন, আইনের বাহিরে একপদও যাইতে দেন না এবং সর্বপ্রকার রাজ্যে সুশৃঙ্খলা স্থাপন করেন, তদ্রূপ আত্মারূপ বাদশাহর স্বীয় দেহ রাজ্যের শাসনকার্যে বুদ্ধিরূপ মন্ত্রীর পরামর্শ গ্রহণ করিলে এবং লোভ ও ক্রোধকে দমন করত উহাদিগকে বুদ্ধির অধীন করিয়া রাখিলে এইরূপ শৃঙ্খলার সহিত নির্বাহ হইলে আত্মা সৌভাগ্যের পথে চলিয়া নির্বিঘ্নে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করিতে পারে । অপর পক্ষে ক্রোধ ও লোভ যদি বুদ্ধিকে বন্দী করিয়া গোলাম বানাইয়া রাখে তবে দেহ-রাজ্য ও হতভাগ্য বাদশাহ উভয়ই ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। যাহা বলা হইল তাহাতে বুঝা গেল যে, দেহরক্ষার জন্য আল্লাহ্ ক্রোধ ও লোভ সৃষ্টি করিয়াছেন। পানাহার গ্রহণ করিয়া দেহরক্ষার জন্য লোভের সৃষ্টি এবং শত্রু হইতে আত্মরক্ষার জন্য ক্রোধের সৃষ্টি হইয়াছে। ক্রোধ ও লোভ দুইটিই শরীরের খেদমতগার। পানাহার শরীরের খোরাক চক্ষু, কর্ণ ইত্যাদি ইন্দ্রিয়সমূহ বহন করিবার জন্য শরীরের সৃষ্টি হইয়াছ । সুতরাং শরীর এই সকল ইন্দ্রিয়ের খাদেম। আবার আত্মার পক্ষে প্রদীপের কার্য করিবে বলিয়া বুদ্ধির সৃষ্টি হইয়াছে যেন এই প্রদীপের আলোকে আত্মা আল্লাহর মহান দরবার দর্শন করিতে পার । ইহাই আত্মার জন্য বেহেশত। এই হিসাবে বুদ্ধি আবার আত্মার খাদেম । আল্লাহর অনুপম সৌন্দর্য দর্শনের জন্যই আত্মার সৃষ্টি হইয়াছে । আত্মা যখন আল্লাহর সৌন্দর্য দর্শনে একেবারে বিভোর হইয়া পড়ে তখন সে তাঁহার উপযুক্ত বান্দা বলিয়া পরিগণিত হয়। এই মর্মেই আল্লাহ্ বলেন : “আর একমাত্র আমার ইবাদত করিবার জন্যই জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করিয়াছি ।”

আত্মাকে সৃষ্টি করিয়া এই রাজ্য, সৈন্য ও দেহরূপ বাহন এইজন্য প্রদান করা হইয়াছে যে, ইহা জড়জগত হইতে সর্বোচ্চ ইল্লীন পর্যন্ত আরোহণ করিবে। কেহ যদি এই মহাদানের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ বন্দেগীর কর্তব্য পালন করিতে ইচ্ছা করে তবে তাহাকে বাদশাহের ন্যায় স্বীয় সিংহাসনে উপবেশন পূর্বক একমাত্র আল্লাহ্‌কে তাহার লক্ষ্যস্থল ও কিবলা করিয়া লইতে হইবে এবং পরকালকে আপন স্থায়ী বাসস্থান ও দুনিয়াকে পান্থশালা বিবেচনা করিতে হইবে। তৎপর শরীরকে বাহন, হস্ত পদকে খেদমতগার, বুদ্ধিকে উযীর, লোভকে ধন-রক্ষক, ক্রোধকে কোতওয়াল এবং ইন্দ্রিয়গণকে গুপ্তচর বানাইয়া প্রত্যেককে পরজগতের সংবাদ সংগ্রহে নিযুক্ত রাখা কর্তব্য। মস্তিষ্কের সম্মুখ ভাগে যে চিন্তাশক্তি আছে ইহা সংবাদ সংগ্রহকারী চরগণের অধিনায়ক এবং চরগণ প্রত্যেকটি সংবাদ এই অধিনায়কের নিকট উপস্থিত করে তাহার পর মস্তিষ্কের পশ্চাৎভাগে যে স্মরণশক্তি আছে তাহা ঐ সংগৃহীত সংবাদসমূহের রক্ষক এবং সে উহা অধিনায়ক চিন্তাশক্তির নিকট হইতে লইয়া হিফাজতে রাখে ও উপযুক্ত সময়ে বুদ্ধি রূপে উযীরের নিকট পেশ করে। এইরূপ সংগৃহীত সংবাদ অনুসারে উযীর দেহ-রাজ্যের কার্য পরিচালনা করে এবং বাদশাহের পরকাল-সফরের উপায় অবলম্বনে তৎপর থাকে। উযীর যদি দেখিতে পায় যে, ক্রোধ, লোভ ইত্যাদি পরিচালকদের মধ্যে কেহ বাদশাহের বিদ্রোহী হইয়াছে, অধীনতা বর্জন করিয়াছে ও ডাকাতি করিতে ইচ্ছা করিয়াছে, তবে বুদ্ধিরূপ উযীর তাহাদিগকে দমন করিবার চেষ্টা করে এবং তাহাদিগকে অধীন করিয়া লইবার জন্য তাহাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে প্রবৃত্ত হয়, কিন্তু তাহাদিগকে একেবারে মারিয়া ফেলিবার ইচ্ছা করে না । কারণ, উহাদের অভাবে দেহ-রাজ্যের কার্য কখনও সুচারুরূপে চলে না । এইজন্য নানা উপায়ে উহাদিগকে এমনভাবে বশীভূত করে উহারা যেন আত্মার গন্তব্যপথে রন্ধ ও সাহায্যকারী হয়। শত্রু না হয়ে বরং মিত্রের ন্যায় সঙ্গী থাকে, চুরি ডাকাতি না করে এইরূপ বন্দোবস্ত করিতে পারিলে আত্মা সৌভাগ্যবান হয়, আল্লাহ্ প্রদত্ত অসীম অনুগ্রহের হক আদায় করিবার উপযোগী হইয়া উঠে এবং তাহার বন্দেগী করিয়া তৎপরিবর্তে উপযুক্ত সময়ে আল্লাহর নিকট মহা পুরস্কার পাইয়া থাকে। অপরপক্ষে উক্তরূপ বন্দোবস্ত না করিয়া উহার বিপরীত কাজ করিতে আত্মা বিদ্রোহী, ডাকাত ও শত্রুদলের সহিত মিলিত হইয়া নিমকহারাম ও দুর্ভাগ্যগ্রস্ত হইয়া পড়ে এবং অবশেষে তাহাকে এই গর্হিত কার্যের জন্য কঠিন শাস্তি ভোগ করিতে হয় ।


মানব প্রকৃতিতে চতুর্বিধ স্বভাব 

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...