বিবাহের পঞ্চম উপকারিতা–
এতে নফসের বিরুদ্ধে সাধনা করা হয়।
কেননা, পরিবার-পরিজনের হক আদায় করা, তাদের আচার-আচরণ মনের বিরোধী হলেও সবর করা, তাদের জন্যে কষ্ট করা, তাদের সংশোধনের চেষ্টা করা, তাদেরকে ধর্মের পথ বলেদেয়া, তাদের খাতিরে হালাল উপার্জনে অক্লান্ত শ্রম স্বীকার করা এবং তাদের লালনপালন করা- এসবই অত্যন্ত মহত্বপূর্ণ কাজ। কেননা, এগুলো প্রজাপালন ও রাজ্যশাসন তুল্য। স্ত্রী ও পুত্র-পরিজন হচ্ছে প্রজা। প্রজার হেফাযত উচ্চস্তরের কাজ। রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন– “ন্যায়পরায়ণ শাসকের একদিন সত্তর বছর এবাদত অপেক্ষাউত্তম”।
বলাবাহুল্য, যে ব্যক্তি নিজের ও অপরের সংশোধনে আত্মনিয়োজিত, সে সেই ব্যক্তির চেয়েউত্তম, যে কেবল নিজের সংশোধনে মশগুল। অনুরূপভাবে যে ব্যক্তি উৎপীড়ন সহ্য করে, সেতার মত নয়, যে নিজেকে স্বাচ্ছন্দ্য ও আরামে মত্ত রাখে। মোট কথা, স্ত্রী-পুত্র পরিজনের চিন্তাভাবনা কর! আল্লাহর পথে জেহাদ করার মতই। তাই বিশরে হাফী (রহ.) বলেছিলেন: ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল আমার উপর তিন বিষয়ে শ্রেষ্ঠত্ব রাখেন। তন্মধ্যে একটি, তিনি নিজের জন্যে ও অপরের জন্যে হালাল রুজি অন্বেষণ করেন। এক হাদীসে এরশাদ হয়েছে: মানুষ পরিবার-পরিজনের জন্যে যা ব্যয় করে তা খয়রাত তুল্য। মানুষ সেই লোকমারও সওয়াব পায় যা সে তার স্ত্রীর মুখে তুলে দেয়। এক বুযুর্গ জনৈক আলেমের কাছে বললেন: আল্লাহতাআলা আমাকে প্রত্যেক আমল থেকে কিছু অংশ দিয়েছেন, এমন কি, হজ্জ জেহাদ ইত্যাদি থেকেও। আলেম বললেন: তোমাকে আবদালের আমল তো দেয়াই হয়নি। বুযুর্গ জিজ্ঞেস করলেন: আবদালের আমল কি? উত্তর হল- হালাল উপার্জন করা এবং পরিবার-পরিজনের জন্যে ব্যয় করা।
ইবনে মোবারক যখন তাঁর ভাইদের সাথে জেহাদে ছিলেন, তখন একদিন বললেন: তোমরা সেইআমল জান কি, যা আমাদের এই জেহাদ অপেক্ষা উত্তম, তারা বললেন: না, আমরা জানি না।তিনি বললেন: আমি জানি। প্রশ্ন হল: সেটা কি? তিনি বললেন: যে ব্যক্তি সন্তানওয়ালা হওয়া সত্ত্বেও কারও কাছে কিছু চায় না, রাতে জেগে ছা-বাচ্চাদেরকে তৃপ্ত দেখে এবং তাদেরকে আপন কাপড় দ্বারা ঢেকে দেয়, তার আমল আমাদের এই জেহাদের চেয়ে উত্তম।
রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন:
"যার নামায় ভাল হয়, পরিবার-পরিজন বেশী হয়, অর্থসম্পদ কম হয় এবং যে মুসলমানদের পশ্চাৎ নিন্দা করে না, সে জান্নাতে আমার সাথে থাকবে।"
অন্য এক হাদীসে আছে- "নিশ্চয় আল্লাহ্ তা'আলা তিনি- নিঃস্ব, সংযমী, পরিজনশীলকে ভালবাসেন।
হাদীসে আরও আছে- "বান্দার গোনাহ অনেক হয়ে গেলে আল্লাহ তা'আলা তাকে পরিবার-পরিজনের চিন্তায় লিপ্ত করে দেন, যাতে তার গোনাহ দূর হয়ে যায়।"
জনৈক পূর্ববর্তী বুযুর্গ বলেন: কিছু গোনাহ এমন আছে, তাঁর কাফফারা পরিবার-পরিজন ছাড়া অন্য কিছু নয়। এ সম্পর্কে এক হাদীসে আছে, কিছু গোনাহ এমন আছে, যা জীবিকা উপার্জনের চিন্তা ছাড়া অন্য কোন কিছু দূর করতে পারে না।
রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন:
"যে ব্যক্তির তিনটি কন্যা সন্তান থাকে এবং সে তাদের ভরণপোষণ করে ও ততদিন তাদের দেখাশোনা করে, যতদিন আল্লাহ্ তাদেরকে স্বনির্ভর করে না দেন, আল্লাহ তাআলা তার জন্যে নিশ্চিতরূপে জান্নাত ওয়াজিব করে দেন, কিন্তু সে ক্ষমার অযোগ্য কোন গোনাহ করলে ভিন্নকথা।"
কথিত আছে, জনৈক বুযুর্গ তার স্ত্রীর সাথে খুব সম্প্রীতি সহকারে বসবাস করতেন। অবশেষে একদিন স্ত্রী মারা গেল। লোকেরা তাঁকে দ্বিতীয় বিবাহ করতে বললে তিনি বললেন: না, আমার মানসিক শান্তির জন্যে একজনই যথেষ্ট ছিল। এর কিছুদিন পর বুযুর্গ বললেন: স্ত্রীর মৃত্যুর এক সপ্তাহ পরে আমি স্বপ্নে দেখলাম, যেন আকাশের দরজা উন্মুক্ত করে কিছু লোক অবতরণ করছে এবং একে অপরের পেছনে শূন্যে চলে আসছে। যখন একজন আমার নিকটে নামে, তখন আমাকে দেখে তার পেছনের জনকে বলে: অলক্ষুণে এ ব্যক্তিই। পেছনের জন বলে, হাঁ।এমনিভাবে তৃতীয় জন চতুর্থ জনকে বলে এবং সে হাঁ বলে। আমি ভয়ে তাদেরকে ব্যাপার কি জিজ্ঞেস করতে পারি না। অবশেষে সকলের পরে এক বালক আমার কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় আমি বললামঃ মিয়া, সে হতভাগা কে, যার দিকে তোমরা ইশারা করছ? বালকটি বলল: সে তুমি। আমি বললাম, এর কারণ কি? সে বলল: যারা আল্লাহর পথে জেহাদ করে, আমরা তাদের আমলের সাথে তোমার আমল উপরে নিয়ে যেতাম, কিন্তু এক সপ্তাহ ধরে আমাদের প্রতি আদেশ হয়েছে যাতে আমরা তোমার আমল জেহাদে পশ্চাৎপদ ব্যক্তিদের আমলের সাথে লিপিবদ্ধ করি। আমরা জানি না তুমি নতুন কি কান্ড করেছ, যার কারণে এই আদেশ হয়েছে। এর পর সেই বুযুর্গ তার সঙ্গীদেরকে বিবাহ করিয়ে দিতে বললেন এবং অবশিষ্ট জীবন স্ত্রী-পরিজনের সাথে অতিবাহিত করলেন।
বর্ণিত আছে, কিছু লোক পয়গম্বর হযরত ইউনুস (আ.)-এর গৃহে মেহমান হল। তিনি মেহমানদের আদর আপ্যায়নের জন্যে যখন অন্দরে আসা-যাওয়া করতেন, তখনই স্ত্রী তাঁর সাথে দুর্ব্যবহার করত এবং কটু কথা বলত, কিন্তু তিনি চুপ থাকতেন।
মেহমানরা তাঁর এই সহনশীলতা দেখে অবাক হল। তিনি বললেন: অবাক হবেন না। কেননা, আমি আল্লাহ তাআলার কাছে প্রার্থনা করেছিলাম, পরকালে আমাকে যে শাস্তি দেয়ার আছে তা দুনিয়াতেই দিয়ে দিন। এতে এরশাদ হল, তোমার শান্তি অমুক ব্যক্তির কন্যা। তাকে বিবাহ করে নাও। সেমতে আমি তাকে বিবাহ করেছি। আপনারা যে দুর্ব্যবহার দেখলেন, তাতে আমি সবর করি। এসব বিষয়ে সবর করলে ক্রোধ দমিত এবং অভ্যাস সংশোধিত হয়। কেননা, যে ব্যক্তি একা অথবা কোন সদাচারীর সঙ্গী হয়ে থাকে, তার নফসের মালিন্য ফুটে উঠে না এবং অভ্যন্তরীণ নষ্টামি প্রকাশ পায় না। তাই এ ধরনের ঝামেলায় ফেলে নিজেকে পরীক্ষা করা এবং সবরের অভ্যাস গড়ে তোলা আধ্যাত্ম পথের পথিকের জন্যে অপরিহার্য। এতে তার অভ্যাস সুষম এবং অন্তর নিন্দনীয় বিষয়াদি থেকে পাক-সাফ হয়ে যাবে।
পরিবার পরিজনের জন্যে সবর করাও একটি এবাদত। মোট কথা, এটাও বিবাহের একটি উপকারিতা, কিন্তু এ থেকে কেবল দু'প্রকার ব্যক্তিই উপকৃত হতে পারে- (১) যেসাধনা, কঠোর পরিশ্রম ও চরিত্র সংশোধনের ইচ্ছা করে, তার জন্যে এর মাধ্যমে সাধনার পথ জানা হয়ে যাওয়া বিচিত্র নয়। অথবা,
(২) যে ব্যক্তি চিন্তাভাবনা ও অন্তরের গতিবিধি থেকে মুক্ত এবং কেবল বাহ্যিক অঙ্গ প্রত্যঙ্গেরদ্বারা নামায, রোযা, হজ্জ ইত্যাদি করে নেয়, এরূপ ব্যক্তির জন্যে স্ত্রী, পরিবার পরিজনের জন্যেহালাল উপার্জন এবং তাদের লালন পালন দৈহিক এবাদতের চেয়ে উত্তম।
কেননা, দৈহিক এবাদতের ফায়দা অপরে পায় না। আর যে ব্যক্তি মূল মজ্জার কি দিয়ে সংশোধিত মচরিত্রের অধিকারী
মঙ্গলবার, ১৭ জুন, ২০২৫
বিবাহ (১০) বিবাহের পঞ্চম উপকারিতা
বিবাহ (৯) বিবাহের চতুর্থ উপকারিতা :
বিবাহের চতুর্থ উপকারিতা —
বিবাহের চতুর্থ উপকারিতা হচ্ছে, ঘরকন্নার ব্যবস্থাপনা তথা রান্নাবান্না করা, ঝাড় দেয়া, বিছানা করা ও থালাবাসন মাজা। কেননা, গৃহে পুরুষ একা থাকলে এসব কাজ করা তার জন্যে কঠিন হবে। এতে তার অনেক সময় নষ্ট হবে। ফলে এলেম ও আমলের জন্যে অবসর পাবে না। এদিক দিয়ে সাধ্বী নারী ঘরকন্নার ব্যবস্থাপনা করে তার স্বামীর ধর্মকর্মে সহায়তা করে। এ কারণেই আবু সোলায়মান দারানী বলেন : সাধ্বী সুনিপুণা স্ত্রী নিয়ে সংসার করা দুনিয়াদারীর মধ্যে গণ্য হয় না। কেননা, তার মাধ্যমে পুরুষ আখেরাতের কাজ করার সময় পায়। অর্থাৎ, “পরওয়ারদেগার, আমাদেরকে দুনিয়াতে পুণ্য দান কর”। - এ আয়াতের তফসীরে মুহাম্মদ ইবনে কা'ব বলেন : এখানে দুনিয়ার পুণ্য বলে সুশীলা সুনিপুণা স্ত্রী বুঝানো হয়েছে। হযরত ওমর (র.) বলতেন : বান্দাকে ঈমানের পর ভাগ্যবর্তী স্ত্রীর চেয়ে উত্তম কোন কিছু দেয়া হয়নি। স্ত্রীদের মধ্যে কেউ কেউ এমন আশীর্বাদ হয়ে থাকে যে, কোন দান তাদের বিনিময় হতে পারে না। আবার কতক এমন গলার বেড়ী হয় যে, তাদের কাছ থেকে কোন মুক্তিপণের বিনিময়েও রেহাই পাওয়া যায় না। রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করেন : হযরত আদম (আ.)-এর উপর আমার শ্রেষ্ঠত্ব দু'টি বিষয়ে এক, তাঁর স্ত্রী অবাধ্যতার কাজে তাঁর মদদগার ছিল। আর আমার পত্নী আল্লাহ তাআলার আনুগত্যমূলক কাজে আমার সাহায্য করে। দ্বিতীয়, তাঁর শয়তান কাফের ছিল আর আমার শয়তান মুসলমান হয়ে গেছে। সে ভাল কাজ ছাড়া কিছু আদেশ করে না। মোট কথা, এটাও এমন এক উপকারিতা, যা সৎলোকেরা কামনা করে, কিন্তু এ উপকারিতার পূর্বশর্ত হচ্ছে, দুপত্নী থাকা চলবে না। কেননা, দু'পত্নী থাকলে প্রায়ই পারিবারিক বিশৃঙ্খলা দেখা দেয় এবং জীবন নিরানন্দ হয়ে যায়।
পরবর্তী পর্ব —
বিবাহের পঞ্চম উপকারিতা
বিবাহ (৮) বিবাহের তৃতীয় উপকারিতা
বিবাহের তৃতীয় উপকারিতা —
বিবাহের তৃতীয় উপকারিতা হচ্ছে চিত্তবিনোদন এবং এর দ্বারা এবাদতে শক্তি সঞ্চয়। কেননা, মন এবাদত থেকে সব সময় পলায়নপর থাকে। এটা তার মজ্জাবিরোধী। সুতরাং মনকে সদাসর্বদা তার খেলাফ কাজে লাগিয়ে রাখলে সে অবাধ্য হয়ে যাবে। পক্ষান্তরে মাঝে মাঝে বিনোদনের মাধ্যমে তাকে সুখ দিলে সে খুশী থাকবে। নারীর সাথে চিত্তবিনোদনে এমন সুখ পাওয়া যায়, যা সকল ক্লেশ দূর করে দেয়। সুতরাং বৈধ বিষয় দ্বারা মনকে সুখ দেয়া জরুরী। কেননা, আল্লাহ তা'আলা বলেন : “আল্লাহ তোমাদেরকে এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তা থেকে সৃষ্টি করেছেন তার স্ত্রীকে, যাতে সে তার কাছে অবস্থান করে”।
হযরত আলী মুর্তাজা (রা.) বলেন : এক মূহূর্ত হলেও মনকে সুখ দাও। কেননা, যখন মনকে দিয়ে বলপূর্বক কাজ নেয়া হয়, তখন মন অন্ধ হয়ে যায়।
বিবাহ (৭) বিবাহের দ্বিতীয় উপকারিতা
বিবাহের দ্বিতীয় উপকারিতা —
বিবাহের দ্বিতীয় উপকারিতা হচ্ছে, শয়তানের চক্রান্ত থেকে হেফাযতে থাকা, কামস্পৃহা দমিত রাখা এবং দৃষ্টি নত রাখা। এতে করে লজ্জাস্থান সংরক্ষিত হয়ে যায়। হাদীসে এদিকেই ইঙ্গিত রয়েছে। বলা হয়েছে যে বিবাহ করে সে তার অর্ধেক ধর্ম বাঁচিয়ে নেয়। অতঃপর বাকী অর্ধেকের জন্যে আল্লাহকে ভয় করা উচিত। এ উপকারিতা প্রথম উপকারিতার তুলনায় কম। কেননা, কামস্পৃহার বিপদাপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যে বিবাহ যথেষ্ট; কিন্তু যে ব্যক্তি সন্তান লাভ তথা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্যে বিবাহ করে, সে মর্তবায় সেই ব্যক্তির উপরে, যে কেবল কামস্পৃহার বিপদাপদ থেকে আত্মরক্ষার জন্যে বিবাহ করে। তবে কামস্পৃহা সন্তান লাভে সহায়ক হয়ে থাকে। এতে আর একটি রহস্য বিদ্যমান যে, কামস্পৃহা চরিতার্থ করার মধ্যে এমন আনন্দ রয়েছে, যা চিরস্থায়ী হলে তার সমতূলা কোন আনন্দ নেই। এ আনন্দ জান্নাতে প্রতিশ্রুত আনন্দের সন্ধান দেয়। এটা উদ্রেক করার কারণ, যে আনন্দের স্বাদ জানা থাকে না, তার প্রতি উৎসাহিত করা অনর্থক হয়ে থাকে। উদাহরণতঃ পুরুষত্বহীন ব্যক্তিকে নারী সম্ভোগের উৎসাহ দেয়া মোটেই উপকারী নয়। সুতরাং স্বাদ জানার জন্যেই মানুষের মধ্যে কামস্পৃহা সৃষ্টি করা হয়েছে, যাতে সে জান্নাতে একে চিরস্থায়ী করতে আগ্রহী হয়, যা আল্লাহ্ তা'আলার এবাদতের উপর নির্ভরশীল। এখন আল্লাহ্ তাআলার প্রজ্ঞা ও রহমত চিন্তা করা দরকার যে, এক কামস্পৃহার মধ্যে তিনি বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণ দু'প্রকার জীবন নিহিত রেখেছেন। বাহ্যিক জীবন এভাবে যে, কামস্পৃহার মাধ্যমে মানুষের বংশ বিস্তার অব্যাহত থাকে। এটাও মানব জাতির জন্যে এক প্রকার স্থায়িত্ব। আর আভ্যন্তরীণ জীবন হচ্ছে পারলৌকিক জীবন, যার কারণ কামস্পৃহাই হয়ে থাকে। অর্থাৎ, কামস্পৃহার দ্রুত অবসান দেখে মানুষ চিরস্থায়ী ও পূর্ণাঙ্গ আনন্দ লাভের ফিকির করে এবং সেটা অর্জন করার জন্যে এবাদতে উদ্বুদ্ধ হয়। অতএব কামস্পৃহার কারণেই যেন জান্নাতের নেয়ামত হাসিলের সাধনা করা সহজ হয়ে যায়। সারকথা, কামোদ্দীপনা দমন হেতু বিবাহ করা শরীয়তে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সেই ব্যক্তির জন্যে, যে অক্ষম ও পুরুষত্বহীন নয়। অধিকাংশ মানুষই এরূপ। এটা গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার কারণ, কামস্পৃহা প্রবল হলে এবং তা দমন করার মত তাকওয়ার শক্তি না থাকলে মানুষ কুকর্মে লিপ্ত হয়ে পড়ে। এ আয়াতে এদিকেই ইঙ্গিত রয়েছে
“এমনটি না করলে পৃথিবীতে অনর্থ ও মহাগোলযোগ হবে”।
কামস্পৃহা প্রবল হওয়ার সময় তাকওয়ার বাধা থাকলেও এর পরিণতি হবে, মানুষ কেবল বাহ্যিক অঙ্গকে বিরত রাখবে অর্থাৎ, দৃষ্টি নত ও লজ্জাস্থান সংরক্ষিত রাখবে; কিন্তু অন্তরকে কুমন্ত্রণা ও কুচিন্তা থেকে বাঁচানো তার ক্ষমতার বাইরে থাকবে। তার মনে এ ব্যাপারে দ্বন্দ্ব থাকবে এবং সহবাসের চিন্তাভাবনা হবে। মাঝে মাঝে এটা নামাযের ভেতরে উপস্থিত হতে পারে এবং নামাযের মধ্যে এমন কল্পনা আসতে পারে যা মানুষের কাছে বলা লজ্জার কারণে সম্ভবপর নয়। আল্লাহ তাআলা মনের অবস্থা জানেন। মনই মুরীদের জন্যে আখেরাতের পথে চলার একমাত্র পুঁজি। কাজেই মনে কুচিন্তা থাকা খুবই খারাপ। সদা-সর্বদা রোযা রাখলেও কুমন্ত্রণার মূল উৎপাটিত হয় না। হাঁ, রোযা রাখতে রাখতে দেহ দুর্বল এবং মেজাজ খিটখিটে হয়ে গেলে কুমন্ত্রণা দূর হওয়া সম্ভবপর। এসব কারণেই হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন : আবেদের এবাদত বিবাহ দ্বারাই পূর্ণতা লাভ করে। কামস্পৃহার প্রাধান্য একটি ব্যাপক মসিৰত। কম মানুষই এ থেকে মুক্ত থাকে। “আমাদেরকে এমন বোঝা বহন করতে দিয়ো না, যার শক্তি আমাদের নেই”। -এ আয়াতের তফসীরে হযরত কাতাদা (র.) বলেন : এখানে কামোদ্দীপনা বুঝানো হয়েছে : “মানুষ দুর্বল সৃঞ্জিত হয়েছে” –এ আয়াতের তফসীরে হযরত মুজাহিদ বলেন : এখানে দুর্বল অর্থ যে নারী সম্ভোগের ব্যাপারে সবর করে না। হযরত কাইয়াস বলেন: যখন মানুষের পুরুষাঙ্গ উত্তেজিত হয়, তখন তার দুই তৃতীয়াংশ বুদ্ধি লোপ পায়। কেউ বলেন : তার তৃতীয়াংশ দ্বীনদারী বরবাদ হয়ে যায়। নাওয়াদেরুত্তাফসীরে বর্ণিত আছে, “অন্ধকারের অনিষ্ট থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করি যখন তা ঘনীভূত হয়” –এ আয়াতের তফসীরে হযরত ইবনে আব্বাস (র.) বলেন, এখানে উদ্দেশ্য পুরুষাঙ্গ উত্তেজিত হওয়া। মোট কথা, এটা এমন এক বিপদ, যা উত্তেজিত হলে তার মোকাবিলা জ্ঞানবুদ্ধি এবং দ্বীনদারীও করতে পারে না। এদিকেই ইশারা করা হয়েছে এই হাদীসে নারীদেরকে সম্বোধন করে বলা হয়েছে- “আমি এমন কোন স্বল্প বুদ্ধি ও স্বল্প দ্বীনওয়ালা দেখিনি, যে বুদ্ধিমানদের উপর তোমাদের চেয়ে অধিক প্রবল হয়ে যায়।
রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) দোয়ায় বলতেন : “হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই আমার কানের, আমার চোখের, আমার অন্তরের এবং আমার বীর্যের অনিষ্ট থেকে”। এখন বুঝা উচিত, যে বিষয় থেকে রসূলে পাক (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আশ্রয় প্রার্থনা করেছেন, অন্য ব্যক্তি সে বিষয়ে অবহেলা কিরূপে করতে পারে?
পরবর্তী পর্ব —
বিবাহের তৃতীয় উপকারিতা
বিবাহ (৬) বিবাহের প্রথম উপকারিতা সন্তান হওয়া
বিবাহের উপকারিতা —
বিবাহের উপকারিতা হলো - সন্তান হওয়া, কামপ্রবৃত্তি নিবারণ করা, ঘরকন্নার ব্যবস্থা করা, দল বৃদ্ধি করা, মহিলাদের সাথে থাকার ব্যাপারে আত্মিক সাধনা করা- সংক্ষেপে এই পাঁচটি বিষয় হচ্ছে বিবাহের উপকারিতা। এখন প্রত্যেকটির বিস্তারিত ব্যাখ্যা জানা দরকার।
বিবাহের প্রথম উপকারিতা সন্তান হওয়া
সবগুলোর মধ্যে এটাই মূল। মানব বংশ অব্যাহত রাখার উদ্দেশ্যেই বিবাহ প্রবর্তিত হয়েছে, যাতে জগৎ মানবশূন্য হয়ে না যায়। নর ও নারীর মধ্যে নিহিত কাম-বাসনা সন্তান হওয়ার একটি সূক্ষ্ম ব্যবস্থা। যেমন জন্তুকে জালে আবদ্ধ করার জন্যে দানা ছড়িয়ে দেয়া হয়, তেমনি নর নারীর সহবাসস্পৃহা সন্তান লাভের একটি উপায়। খোদায়ী শক্তি এসব ঝামেলা ছাড়াই মানব সৃষ্টি করতে সক্ষম ছিল; কিন্তু খোদায়ী প্রজ্ঞা এটাই চেয়েছে যে, ঘটনাবলী কারণাদির মধ্যেই সীমিত থাকুক। যদিও এর প্রয়োজন ছিল না; কিন্তু আপন কুদরত জাহির করা, বিস্ময়কর কারিগরি সম্পন্ন করা এবং স্বীয় পূর্ব ইচ্ছা, নির্দেশ ও কলমের লিখন অনুযায়ী অস্তিত্ব দান করার জন্যে এ ব্যবস্থাই গ্রহণ করা হয়েছে। কামপ্রবৃত্তি থেকে মুক্ত অবস্থায় সন্তান লাভের উপায় হিসেবে বিবাহ করলে তা চারি প্রকারে সওয়াবের কারণ হয়, যা বিবাহের ফযীলতের মূল কথা। এমনকি এগুলোর কারণেই বুযুর্গগণ অবিবাহিত অবস্থায় আল্লাহ তাআলার সামনে যাওয়া পছন্দ করেননি।
— প্রথম সন্তান লাভের চেষ্টা করা আল্লাহ তাআলার মর্জির অনুকূল। কেননা, এতে মানব জাতির অস্তিত্ব অবশিষ্ট থাকে।
— দ্বিতীয় : এতে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-ঊনার প্রতি মহব্বত পাওয়া যায়। কেননা, যে সংখ্যাধিক্য নিয়ে তিনি গর্ব করতেন, এ চেষ্টা তারই অন্তর্ভুক্ত।
— তৃতীয়, মৃত্যুর পর সৎকর্মপরায়ণ সন্তানের দোয়া আশা করা যায়।
— চতুর্থ, কচি বয়সে সন্তান মারা গেলে সে সুপারিশকারী হবে বলে আশা করা যায়।
এই প্রকার চতুষ্টয়ের মধ্যে প্রথম প্রকারটি সর্বাধিক সূক্ষ্ম এবং জনাসাধারণের বোধগম্যতার ঊর্ধ্বে। অথচ আল্লাহ তাআলার অভূতপূর্ব কারিগরি ও বিধানাবলী সম্পর্কে যারা সম্যক জ্ঞাত, তাদের মতে এটাই সর্বাধিক শক্তিশালী ও সঠিক প্রকার। এর প্রমাণ, যদি কোন মনিব তার গোলামকে বীজ, কৃষিক্ষেত্র সরবরাহ করে এবং গোলামও সে কাজ করতে সক্ষম হয়, তবে গোলাম অলস্যতা করে কৃষিকাজের সাজসরঞ্জাম বেকার ফেলে রাখলে এবং বীজ নষ্ট করে দিলে অবশ্যই মনিবের ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির পাত্র হবে। এখন দেখা দরকার, আল্লাহ তাআলা মানুষকে কি সরবরাহ করেছেন। তিনি মানুষকে যুগল সৃষ্টি করেছেন, নরকে প্রজননযন্ত্র ও অণ্ডকোষ দিয়েছেন এবং কটিদেশে বীর্য সৃষ্টি করে তা শিরা উপশিরায় প্রবাহিত হওয়ার ব্যবস্থা করেছেন। অপর দিকে নারীর গর্ভাশয়কে বীর্য ধারণের পাত্র করেছেন। এর পর নর নারী উভয়ের উপর কামপ্রবৃত্তি ও যৌনবাসনা চাপিয়ে দিয়েছেন। এসব আয়োজন স্পষ্ট ভাষায় স্রষ্টার উদ্দেশ্য ব্যক্ত করে। যদি আল্লাহ তাআলা রসূলের (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) মুখে আপন উদ্দেশ্য বর্ণনা নাও করতেন, তবুও বুদ্ধিমানদের জন্যে এসব আয়োজন ও সাজসরঞ্জামের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য বুঝে নেয়া কঠিন ছিল না, কিন্তু আল্লাহ তাআলা স্বীয় রসূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর মুখে এ উদ্দেশ্য প্রকাশ করেছেন। তিনি এরশাদ করেনঃ
“তোমরা পরস্পরে বিবাহ কর এবং বংশ বিস্তার কর”। এমতাবস্থায় যে ব্যক্তি বিবাহ থেকে বিরত থাকবে সে কৃষিকাজে বিমুখ, বীজ ধ্বংসকারী এবং আল্লাহ তাআলার আয়োজন ব্যর্থকারী হিসেবে গণ্য হবে। সে প্রকৃতির সেই উদ্দেশ্য ও রহস্যের খেলাফ করবে, যা সৃষ্টি অবলোকন করে হৃদয়ঙ্গম করা যায় !
এ কারণেই শরীয়ত সন্তান হত্যা করতে এবং জীবিত কবরস্থ করতে কঠোর ভাষায় নিষেধ করেছে। কেননা, এটাও অস্তিত্ব পূর্ণ হওয়ার পরিপন্থী। সার কথা, যে বিবাহ করে, সে এমন একটি বিষয় পূর্ণ করতে সচেষ্ট হয়, যা পূর্ণ করা আল্লাহ তাআলার পছন্দনীয়। পক্ষান্তরে যে বিবাহ থেকে বিরত থাকে, সে এমন বস্তুকে বিনষ্ট ও বেকার করে দেয়, যা বিনষ্ট করা আল্লাহ তাআলার কাছে অপছন্দনীয়। এছাড়া সে সেই বংশের গতি স্তব্ধ করে দেয়, যা আল্লাহ তাআলা হযরত আদম (আ.) থেকে শুরু করে তার অস্তিত্ব পর্যন্ত অব্যাহত রেখেছিলেন এবং সে নিজেই কৌশল করে, যাতে তার মৃত্যুর পর সন্তান-সন্ততি তার স্থলাভিষিক্ত না হয়। যদি বিবাহের কারণ যৌন প্রবৃত্তি চরিতার্থ করাই হত, তবে হযরত মুয়ায মহামারীতে আক্রান্ত হয়ে বলতেন না যে, আমাকে বিবাহ করাও, যাতে আল্লাহ তাআলার কাছে অবিবাহিত অবস্থায় না যাই। এখানে প্রশ্ন হয়, তখন তাঁর সন্তানের আশা ছিল না, তবুও বিবাহের বাসনা করার কারণ কি ছিল? এর জওয়াব, সন্তান সহবাসের ফলে হয়। সহবাসের কারণ যৌনস্পৃহা। এটা বান্দার ইচ্ছাধীন নয়। যৌনস্পৃহায় গতিবেগ সঞ্চার করে, কেবল এমন বিষয় মওজুদ করাই বান্দার ইচ্ছাধীন। এটা সর্বাবস্থায় হতে পারে! সুতরাং যে বিবাহ করে সে তার দায়িত্ব পূর্ণ করে। অবশিষ্ট বিষয়গুলো তার আয়ত্তের বাইরে। এ কারণেই পুরুষত্বহীন ব্যক্তির জন্যেও বিবাহ করা মোস্তাহাব।
বিবাহ সন্তান লাভের উপায়, এর দ্বিতীয় কারণ —রসূলল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর মহব্বত ও সন্তুষ্টি অর্জনে সচেষ্ট হওয়া। যে বস্তু দ্বারা তিনি গর্ব করবেন, তার প্রাচুর্য বিবাহ দ্বারাই হয়। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) একথা স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন এবং হযরত ওমর (র.)-এর কার্য থেকেও তা বুঝা যায়। বর্ণিত আছে, তিনি একাধিক বিবাহ করেছেন। তিনি বলতেন : আমি সন্তানের জন্যে বিবাহ করি। হাদীসে বর্ণিত বন্ধ্যা নারীর নিন্দা থেকেও একথা বুঝা যায়।
রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ
“গৃহের কোণের মাদুর বন্ধ্যা নারীর তুলনায় উত্তম"। তিনি আরও বলেন–
“যে নারী সন্তান প্রসব করে এবং ভালবাসে, সে তোমাদের উত্তম স্ত্রী”
আরও বলা হয়েছে- “কৃষ্ণাঙ্গ সন্তান প্রসবকারিণী নারী সুন্দরী বন্ধ্যা নারী অপেক্ষা উত্তম”।
এসব রেওয়ায়েত থেকে পরিষ্কার বুঝা যায়, বিবাহের ফযীলতে সন্তান চাওয়ারও দখল আছে। কেননা, সুন্দরী স্ত্রী পুরুষের পবিত্রতা কায়েম রাখা, দৃষ্টি নত রাখা এবং কাম-বাসনা চরিতার্থ করার জন্যে অধিক শোভনীয়। এতদসত্ত্বেও সন্তানের দিকে লক্ষ্য করে কৃষ্ণাঙ্গী মহিলাকে তার উপর অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে।
— তৃতীয় কারণ- মৃত্যুর পর সৎ সন্তান থাকা, যে পিতার জন্যে দোয়া করবে। হাদীসে আছে,
“সস্তানের দোয়া পিতার সামনে নূরের খাজ্ঞায় রেখে পেশ করা হয়।”
কোন কোন লোক বলে, মাঝে মাঝে সন্তান সৎ হয় না। এটা বাজে কথা। কেননা, ধর্মপরায়ণ মুসলমানের সন্তান প্রায়শঃ সৎ-ই হবে; বিশেষতঃ যখন তাকে উত্তমরূপে লালন-পালন করা হয় এবং ভাল কাজে নিয়োজিত রাখা হয়। সারকথা, সৎ হোক কিংবা অসৎ, সর্বাবস্থায় ঈমানদারের দোয়া পিতা-মাতার জন্যে উপকারী হয়ে থাকে। সন্তান সংকাজ করে দোয়া করলে পিতা তার সওয়াব পাৰে। কেননা, সন্তান তার উপার্জন, কিন্তু অসৎ কাজ করলে পিতাকে তজ্জন্যে জওয়াবদিহি করতে হবে না। কেননা, কোরআনে বলা হয়েছে।
“একজনের পাপের বোঝা অন্য জনে বহন করবে না”।
উপরোক্ত বিষয়টিই আল্লাহ তা'আলা এভাবে বর্ণনা করেছেন : “আমি মিলিয়ে দেব তাদের সাথে তাদের সন্তানদেরকে এবং তাদের কোন আমল হ্রাস করব না”।
অর্থাৎ, তাদের আমল হ্রাস না করে অতিরিক্ত অনুগ্রহস্বরূপ তাদের সন্তানকে তাদের সাথে সংযুক্ত করে দেব।
—চতুর্থ কারণ- অপ্রাপ্ত বয়স্ক সন্তান পূর্বে মারা গেলে পিতামাতার জন্যে সুপারিশকারী হবে। রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : সন্তান তার পিতামাতাকে জান্নাতের দিকে টেনে নেবে। কোন কোন হাদীসে বলা হয়েছে- সস্তান পিতামাতার কাপড় ধরবে, যেমন আমি তোমার কাপড় ধরছি। আরও বলা হয়েছে- সন্তানকে জান্নাতে প্রবেশ করতে বলা হবে। সে জান্নাতের দরজায় পৌঁছে থেমে যাবে এবং রাগ করে বলবে : আমার পিতামাতা সঙ্গে থাকলে আমি জান্নাতে যাব। তখন আদেশ হবে তার পিতামাতাকে তার সাথে জান্নাতে দাখিল কর। অন্য হাদীসে আছে,
“কেয়ামতের ময়দানে হিসাব-নিকাশের জন্যে সন্তানরা সমবেত হলে ফেরেশতাদেরকে আদেশ করা হবে : তাদেরকে জান্নাতে নিয়ে যাও। সন্তানরা জান্নাতের দরজায় আসবে। তাদেরকে বলা হবে মুসলমানের সন্তানরা, তোমরা ভিতরে এস। তোমাদের কোন হিসাব-কিতাব নেই। সন্তানরা বলবে : আমাদের পিতামাতা কোথায়? ফেরেশতারা বলবে : তারা তোমাদের মত নয়। তাদের পাপকর্ম আছে। তাদের হিসাব-নিকাশ আছে। একথা শুনে সন্তানরা হঠাৎ গোঁ ধরবে এবং জান্নাতের দরজায় ফরিয়াদ করতে থাকবে। আল্লাহ তা'আলা তাদের অবস্থা সম্পর্কে অবগত হওয়া সত্ত্বেও জিজ্ঞেস করবেন : এই ফরিয়াদ কিসের? ফেরেশতারা বলবে : ইলাহী ! এরা মুসলমানদের সন্তান। এরা বলেঃ আমরা পিতামাতাকে সঙ্গে না নিয়ে জান্নাতে যাব না। আল্লাহ তা'আলা আদেশ করবেন- এই দলের মধ্যে যাও এবং তাদের পিতামাতার হাত ধরে জান্নাতে দাখিল কর।”
এক হাদীসে বলা হয়েছে : “যার দু'সন্তান মারা যায়, তার মধ্যে ও জাহান্নামের অগ্নির মধ্যে একটি প্রাচীর অন্তরায় হয়ে যাবে”।
আরও আছে, “যার তিনটি সন্তান বালেগ হওয়ার পূর্বে মারা যায়, আল্লাহ তা'আলা তাকে জান্নাতে দাখিল করবেন সপ্তানদের প্রতি অতিরিক্ত রহমতস্বরূপ। কেউ প্রশ্ন করল : ইয়া রসূলাল্লাহ! দু'জন মারা গেলে? তিনি বললেনঃ দু'জন মারা গেলেও তাই হবে।
জনৈক বুযুর্গকে লোকেরা বিবাহ করতে বলত, কিন্তু তিনি কিছুদিন পর্যস্ত অস্বীকার করতে থাকেন। একদিন ঘুম থেকে উঠে বলতে লাগলেনঃ আমাকে বিবাহ করিয়ে দাও। লোকেরা তাঁকে বিয়ে করিয়ে দিল এবং বিয়ে করার খাহেশ হওয়ার কারণ জিজ্ঞেস করল। বুযুর্গ বললেন : আল্লাহ তা'আলা হয়তো আমাকে ছেলে দেবেন এবং শৈশবে তার মৃত্যু হবে। ফলে পরকালে সে আমার উপকারে আসবে। এর পর বললেনঃ আমি স্বপ্নে দেখেছি যেন কেয়ামত কারেম হয়েছে। সকলের সাথে আমিও কেয়ামতের ময়দানে দণ্ডায়মান। পিপাসায় আমার প্রাণ ওষ্ঠাগত। অন্য সবই পিপাসায় তেমনি কাভর। এর পর দেখি, কিছু সংখ্যক শিশু কাতার ডিঙ্গিয়ে চলে আসছে। তাদের মাথায় নূরের রুমাল এবং হাতে রূপার পাত্র ও স্বর্ণের গ্লাস। তারা এক একজনকে পানি পান করিয়ে ভিতরে ঢুকে পড়ছে এবং অনেককে ছেড়েও চলেছে। আমি এক শিশুর দিকে হাত বাড়িয়ে বললাম : পিপাসায় আমার শোচনীয় অবস্থা। আমাকে পানি পান করাও। সে বলল : আমরা মুসলমানদের সন্তান- শৈশবে মৃত্যুমুখে পতিত হয়েছিলাম।
কোরআনে বলা হয়েছে অগ্রে প্রেরণ কর। তোমরা নিজেদের জন্যে এর এক অর্থ এরূপও করা হয়েছে, এখানে উদ্দেশ্য শিশুদেরকে অগ্রে প্রেরণ করা। মোট কথা, উপরোক্ত চারটি কারণ থেকেই জানা গেল, বিবাহের ফযীলত বেশীর ভাগ এ কারণেই যে, এটা সন্তান লাভ করার উপায় !
বিবাহের দ্বিতীয় উপকারিতা
বিবাহ (৫) বিবাহের প্রতি বিমুখ হওয়ার কারণ
এক হাদীসে আছে- সন্তান-সন্ততি কম হওয়াও দুই ধনাঢ্যতার একটি। পক্ষান্তরে পরিবার-পরিজন বেশী হওয়াও দুই দারিদ্র্যের একটি।
আবু সোলায়মান দারানী বলেন : একা ব্যক্তি আমলের স্বাদ ও অন্তরের প্রশস্ততা যতটুকু পায়, সপত্নীক ব্যক্তি ততটুকু পায় না। একথাও তিনিই বলেন- আমি, আমার সঙ্গীদের মধ্যে কাউকে পাইনি, যে বিবাহ করার পর তার প্রথম মর্তবায় কায়েম রয়েছে। তিনি আরও বলেন : তিনটি বিষয় যে অন্বেষণ করে সে দুনিয়ার দিকে ঝুঁকে পড়ে।
(১) যে জীবিকা অন্বেষণ করে,
(২) যে কোন মহিলাকে বিয়ে করে এবং
(৩) যে হাদীস লেখে।
হযরত হাসান বসরী (রহ.) বলেন : আল্লাহ তাআলা যে বান্দার কল্যাণ করতে চান, তাকে অর্থকড়ি, স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততির মধ্যে মশগুল করেন না।
একদল লোক এ উক্তি নিয়ে বিতর্ক করার পর সাব্যস্ত করে যে, এ অর্থকড়ি, স্ত্রী ও সম্পদ মোটেই থাকবে না; বরং উদ্দেশ্য এগুলো থাকবে ঠিকই; কিন্তু আল্লাহর পথে বাধা হবে না। এ বিষয়টিই আবু সোলায়মান দারানী (রহ.)-এর এই উক্তির মধ্যে পাওয়া যায়, অর্থকড়ি, স্ত্রী, সন্তান-সন্ততি ইত্যাদি যে বস্তুই তোমাকে আল্লাহর পথে বাধা দেয়, তাই তোমার জন্যে অলক্ষুণে।
মোট কথা, যারা বিবাহ থেকে বিরত হওয়ার কথা বলেছেন, তারা সর্বাবস্থায় বলেননি; বরং একটি শর্তাধীনে বলেছেন। বিবাহের ফযীলতও সর্বাবস্থায় এবং শর্তাধীনে বর্ণিত আছে। তাই বিবাহের উপকারিতা ব্যাখ্যা করা আমাদের জন্যে জরুরী হয়ে পড়েছে।
পরবর্তী পর্ব —
বিবাহের উপকারিতা
বিবাহ (৪) বিবাহের ফযীলত সম্পর্কিত সাহাবায়ে কেরামের উক্তিসমূহ
বিবাহের ফযীলত সম্পর্কিত সাহাবায়ে কেরামের উক্তিসমূহ —
*হযরত ওমর ফারুক (র.) বলেন : ধর্মপরায়ণতা বিবাহে বাধা সৃষ্টি করে না। কেবল দুটি বিষয়ই বিবাহে বাধা দান করে- অক্ষমতা ও দুশ্চরিত্রতা। এতে তিনি বিবাহের বাধা দুটি বিষয়ে সীমিত করে দিয়েছেন।
*হযরত আব্বাস (র.) বলেনঃ বিবাহ না করা পর্যন্ত আবেদের এবাদত পূর্ণ হয় না। এর উদ্দেশ্য বিবাহ এবাদতের পরিশিষ্ট, কিন্তু বাহ্যতঃ তার উদ্দেশ্য এই মনে হয় যে, কামভাব প্রবল হওয়ার কারণে অন্তরের নিরাপত্তা বিবাহ ব্যতীত কল্পনীয় নয়। অন্তরের নিরাপত্তা ছাড়া এবাদত হতে পারে না। এ কারণেই তাঁর কয়েকজন গোলাম যখন বালেগ হয়ে যায়, তখন তাদেরকে একত্রিত করে তিনি বললেন : তোমরা বিবাহ করতে চাইলে আমি বিবাহ করিয়ে দেব। কারণ, মানুষ যখন যিনা করে, তখন তার অন্তর থেকে ঈমান বের করে নেয়া হয়।
*হযরত ইবনে মসউদ (রা.) বলতেনঃ ধরে নেয়া যাক, আমার বয়সের মাত্র দশ দিন বাকী আছে, তবু বিবাহ করে নেয়াই আমার কাছে ভাল মনে হয়, যাতে আল্লাহ্ তাআলার সামনে অবিবাহিত গণ্য হয়ে না যাই।
*হযরত মুয়ায ইবনে জাবালের দুই স্ত্রী মহামারীতে মৃত্যুমুখে পতিত হন এবং নিজেও মহামারীতে আক্রান্ত ছিলেন, কিন্তু এই অবস্থায়ও বিবাহের ইচ্ছা প্রকাশ করে বলেছিলেন : আল্লাহর সাথে অবিবাহিত হয়ে সাক্ষাৎ করতে আমার লজ্জা বোধ হয়। এ দুটি উক্তি থেকে বুঝা যায়, এ দুজন সাহাবীর মতে কামভাবের প্রাবল্য থেকে আত্মরক্ষা ছাড়া বিবাহের অন্যান্য ফযীলতও ছিল।
* হযরত ওমর ফারুক (র.) একাধিক বিবাহ করেছেন এবং বলতেন : আমি কেবল সন্তানের জন্যে বিবাহ করি।
*জনৈক সাহাবী কেবল রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর খেদমতই করতেন এবং রাতে তাঁর কাছেই থাকতেন। তিনি একদিন উক্ত সাহাবীকে বললেন : তুমি বিয়ে কর না কেন? সাহাবী আরজ করলেন : ইয়া রসূলাল্লাহ, একে তো আমি নিঃস্ব, কোন বিষয় আশয় নেই, দ্বিতীয়ত - আপনার খেদমত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাব। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) চুপ হয়ে গেলেন। কিছুদিন পর আবার একথা বললে সাহাবী একই জওয়াৰ দিলেন, কিন্তু এবার সাহাবী মনে মনে চিন্তা করলেন, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আমার মঙ্গল আমার চেয়ে বেশী বুঝেন। আমার জন্যে যা অধিক সমীচীন এবং আল্লাহর নৈকট্যের কারণ, তা তিনি জানেন। যদি তৃতীয় বার বলেন, তবে বিয়ে করে নেব। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) তৃতীয় বার বললে সাহাবী আরজ করলেন : আপনি আমার বিয়ে করিয়ে দেন। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বললেন : অমুক গোত্রে গিয়ে বল, রসূলূল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) তোমাদেরকে আদেশ করেছেন তোমাদের মেয়ে আমার সাথে বিয়ে দিতে। সাহাবী আরজ করলেন : হুযুর, আমার কাছে কিছু নেই। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) সাহাবায়ে কেরামকে ডেকে বললেন : তোমরা খেজুরের বীচি পরিমাণ স্বর্ণ সংগ্রহ করে তোমাদের এ ভাইকে দাও। সাহাবায়ে কেরাম তাই করলেন এবং এই সাহাবীকে সেই গোত্রে নিয়ে বিবাহ করিয়ে দিলেন। এর পর লোকেরা ওলীমা খাওয়ার বাসনা প্রকাশ করলে সাহাবীদের সকলে মিলে একটি ছাগলের ব্যবস্থা করে দেন। এ হাদীসে রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর বার বার বিয়ে করতে বলা এ কথাই জ্ঞাপন করে যে, খোদ বিবাহের মধ্যে ফযীলত রয়েছে। এটাও সম্ভব যে, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) তাঁর বিবাহের প্রয়োজন জানতে পেরেছিলেন।
*কথিত আছে, পূর্ববর্তী উম্মতের মধ্যে জনৈক আবেদ এবাদতে সমসাময়িক সকলকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল। সে সময়ের পয়গম্বরের সামনে তার আলোচনা হলে পয়গম্বর বললেন : যদি একটি সুন্নত বর্জন না করত, তবে সে চমৎকার ছিল বটে। আবেদ পয়গম্বরের কথা শুনে দুঃখিত হয়ে তাঁর খেদমতে হাযির হয়ে বলল : আমি কোন্ সুন্নতটি বর্জন করেছি? পয়গম্বর বললেন :– তুমি বিবাহ বর্জন করেছ। আবেদ আরজ করল : আমি বিবাহ নিজের উপর হারাম করিনি, কিন্তু আমি নিঃস্ব, আমার ব্যয়ভার অন্য বহন করে। এ কারণে কেউ আমাকে কন্যা দান করে না। পয়গম্বর বললেন : আমি তোমাকে আমার কন্যা দিচ্ছি। সেমতে আবেদের সাথে পয়গম্বর কন্যার বিয়ে হয়ে গেল।
*বিশর ইবনে হারেস (রহ.) বলেনঃ ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল তিনটি বিষয়ে আমার উপর ফযীলত রাখেন। প্রথম, তিনি নিজের জন্যে ও অন্যের জন্যে হালাল রুজি অন্বেষণ করেন, আর আমি কেবল নিজের জন্যেই অন্বেষণ করি। দ্বিতীয়, তিনি বিবাহ করার অবকাশ রাখেন; কিন্তু আমি এ ব্যাপারে সংকীর্ণ। তৃতীয়, তিনি জনগণের ইমাম।
*কথিত আছে, ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বলের পত্নী অর্থাৎ, আবদুল্লাহ জননী যেদিন ইন্তেকাল করেন, তার পরের দিন তিনি দ্বিতীয় বিবাহ করে নেন এবং বলেন : আমার মনে হয় যেন রাতে আমি অবিবাহিত।
*বিশরকে লোকে বলল, মানুষ আপনাকে বিবাহের সুন্নত বর্জনকারী বলে থাকে। বিশর বললেন : আপত্তিকারীদেরকে বলে দাও, আমি ফরযের কারণে সূন্নত থেকে বিরত রয়েছি। পুনরায় কেউ তাঁর বিবাহের ব্যাপারে আপত্তি উত্থাপন করলে তিনি বললেনঃ এ আয়াত আমাকে বিবাহ থেকে বিরত রেখেছে-
“মহিলাদেরও নিয়মানুযায়ী হক আছে, যেমন তাদের উপর স্বামীদের হক আছে"।
বর্ণিত আছে, বিশরকে মৃত্যুর পর স্বপ্নে দেখে কেউ জিজ্ঞেস করল : আল্লাহ তাআলা আপনার সাথে কিরূপ ব্যবহার করেছেন? তিনি বললেন : জান্নাতে আমার মর্যাদা উঁচু হয়েছে এবং পয়গম্বরগণের মর্তবার কাছে পৌঁছেছে; কিন্তু বিবাহিতদের মর্তবা পর্যন্ত পৌঁছেনি।
*সুফিয়ান ইবনে ওয়ায়ন! বলেন : অধিক পত্নী দুনিয়াদারী নয়। কেননা, হযরত আলী (র.) অন্য সাহাবীগণের তুলনায় অধিক সংসারত্যাগী ছিলেন। অথচ তাঁর চার জন পত্নী ছিলেন।
পরবর্তী পর্ব —
বিবাহের প্রতি বিমুখ হওয়ার কারণ
বিবাহ (৩) বিবাহের ফযীলত সম্পর্কিত হাদীস
বিবাহের ফযীলত সম্পর্কিত হাদীস—
* "বিবাহ আমার সুন্নত। যে আমার সুন্নতের প্রতি বিমুখ হয়, সে আমার প্রতি বিমুখ হয়।"০০
* “বিবাহ আমার সুন্নত। যে আমার ধর্মকে মহব্বত করে, সে যেন আমার সুন্নত পালন করে ।"
* “বিবাহ কর এবং অনেক সংখ্যক হয়ে যাও। আমি তোমাদেরকে নিয়ে কেয়ামতের দিন অন্য সকল উম্মতের উপর গর্ব করব। এমনকি গর্ভপাতজনিত শিশুদের নিয়েও ।"
* “যে আমার সুন্নতের প্রতি বিমুখ হয়, সে আমার দলভুক্ত নয় ।"
* “বিবাহ আমার অন্যতম সুন্নত। অতএব, যে আমাকে মহব্বত করে, সে যেন আমার সুন্নত পালন করে "।০
রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আরও বলেন
* “যে দারিদ্র্যের ভয়ে বিবাহ বর্জন করে, সে আমার দলভুক্ত নয়।” এ হাদীসে যে কারণে বিবাহ থেকে বিরত থাকা হয়, সেই কারণের নিন্দা করা হয়েছে- বিবাহ বর্জনের নিন্দা করা হয়নি। আরও বলা হয়েছে,
* “যে সামর্থ্য রাখে সে যেন বিবাহ করে”। এক হাদীসে আছে
* “যার যৌন সামর্থ্য আছে সে যেন বিবাহ করে। কারণ, এতে দৃষ্টি বেশী নত থাকে এবং লজ্জাস্থানের অধিক হেফাযত হয়। আর যে বিবাহ করতে না পারে সে যেন রোযা রাখে। কারণ, রোযা তার জন্যে খাসী হওয়ার শামিল ।"
এ থেকে জানা গেল, বিবাহের ফযীলতের কারণ হচ্ছে চক্ষু ও লজ্জাস্থান দূষিত হওয়ার আশংকা। খাসী হওয়ার উদ্দেশ্য হচ্ছে রোযার কারণে কামভাব হ্রাস পাওয়া।
এক হাদীসে আছে – এই এই
* “যখন তোমার কাছে এমন কেউ আসে যার ধর্মপরায়ণতা ও বিশ্বস্ততায় তুমি সন্তুষ্ট, তখন তার বিবাহ করে দাও। এরূপ না করলে পৃথিবীতে গোলযোগ ও অনর্থ সৃষ্টি হবে ।" এখানে ফযীলতের কারণ গোলযোগের আশংকা বর্ণিত হয়েছে। আরও বলা হয়েছে,
* “যে ব্যক্তি আল্লাহর ওয়াস্তে নিজে বিবাহ করবে অথবা অন্যের বিবাহ করে দেবে, সে আল্লাহ তাআলার ওলী হওয়ার হকদার হয়ে যাবে”। অন্য এক হাদীসে বলা হয়েছে-
* “যে ব্যক্তি বিবাহ করে, সে তার অর্ধেক ধর্ম সংরক্ষিত করে নেয়। এখন বাকী অর্ধেকের জন্যে তার উচিত আল্লাহকে ভয় করা ।" এতেও ইঙ্গিত রয়েছে যে, বিবাহের ফযীলতের কারণ হচ্ছে বিরোধ থেকে বাঁচা এবং অনর্থ থেকে দূরে থাকা। কেননা, দুটি বস্তুই মানুষের ধর্ম বিনষ্ট করে- লজ্জাস্থান ও পেট। বিবাহ করলে লজ্জাস্থানের বিপদ থেকে বাঁচা যায়।
আরও বলা হয়েছে-
* “মৃত্যুর সাথে সাথে মানুষের সব আমল বন্ধ হয়ে যায়, কিন্তু তিনটি বিষয় বাকী থাকে। একটি হচ্ছে সৎ সন্তান। যে মৃত পিতার জন্যে দোয়া করে ।"
বলাবাহুল্য, সন্তান হওয়ার উপায় বিবাহ ছাড়া কিছুই নয়।
পরবর্তী পর্ব —
বিবাহের ফযীলত সম্পর্কিত সাহাবায়ে কেরামের উক্তিসমূহ
বিবাহ (২) বিবাহের ফষীলত সম্পর্কিত আয়াত
বিবাহের ফষীলত সম্পর্কিত আয়াত—
* “তোমাদের বিধবাদেরকে বিবাহ দাও।” এখানে (বিবাহ দাও) ব্যবহৃত হয়েছে, যাতে বিবাহ ওয়াজিব বুঝা যায়।
* “স্বামীদেরকে বিয়ে করে নিতে তাদেরকে বাধা দিয়ো না”। এখানে বিয়েতে বাধাদান নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
পয়গম্বরগণের প্রশংসা ও গুণকীর্তনে এরশাদ হয়েছে :
* “আমি আপনার পূর্বে অনেক রসূল প্রেরণ করেছি এবং তাদেরকে স্ত্রী ও সন্তান সন্ততি দিয়েছি”। একথা অনুগ্রহ ও কৃপা প্রকাশের স্থলে বলা হয়েছে।
আল্লাহ তা’আলা তাঁর ওলীগণের প্রশংসাও করছেন,
* “তারা তাঁর কাছে সন্তান সন্ততির জন্যে আবেদন করেন”। সেমতে বলা হয়েছে–“যারা বলে, পরওয়ারদেগার, আমাদেরকে আমাদের স্ত্রী ও সস্তান-সন্ততির তরফ থেকে চক্ষুর শীতলতা দান করুন এবং আমাদেরকে পরহেযগারদের অগ্রদূত করুন”।
বলা হয়, আল্লাহ তাআলা তাঁর পবিত্র কিতাবে সেই পয়গম্বরগণেরই উল্লেখ করেছেন, যারা সপত্নীক ছিলেন। হাঁ, দুজন পয়গম্বর হযরত ইয়াহইয়া ও হযরত ঈসা (আ.) এর ব্যতিক্রম। তাঁদের মধ্যে ইয়াহইয়া (আ.) সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, তিনি বিবাহ করেছিলেন; কিন্তু সহবাস করেননি। কেবল বিবাহের ফযীলত অর্জন ও বিবাহের পদ্ধতি প্রতিষ্ঠিত করার জন্যে বিবাহ করেছিলেন। হযরত ঈসা (আ.) যখন পুনরায় পৃথিবীতে আগমন করবেন, তখন বিবাহ করবেন এবং সন্তানাদিও হবে।
পরবর্তী পর্ব —
বিবাহের ফযীলত সম্পর্কিত হাদীস
বিবাহ (১) বিবাহের ফযীলত:
বিবাহের ফযীলত:—
প্রকাশ থাকে যে, বিবাহ ধর্ম কাজে সহায়ক, শয়তানের চক্রান্ত থেকে আত্মরক্ষার সুদৃঢ় প্রাচীর এবং উম্মতের সংখ্যা বৃদ্ধির প্রধান উপায়। এই সংখ্যাবৃদ্ধির মাধ্যমে নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) অন্যান্য পয়গম্বরের মোকাবিলায় গর্ব করবেন। এ দিক দিয়ে বিবাহের কারণাদি অনুসন্ধান, সুন্নতসমূহের রক্ষণাবেক্ষণ এবং আদব সম্পর্কে আলোচনা খুবই সমীচীন। আমরা এর উদ্দেশ্য, প্রকার ও প্রয়োজনীয় বিধানাবলী তিনটি পরিচ্ছেদে বর্ণনা করছি। তার ধারাবাহিকতায় এই (প্রথম) পরিচ্ছেদে বিবাহের ফযীলত ও বিবাহের প্রতি বিমুখতা আলোচনা করছি।
বিবাহের ফযীলত ও শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে আলেমগণ মতভেদ করেছেন। কেউ কেউ এর ফযীলত এমনি বর্ণনা করেন যে, বিবাহ করা আল্লাহর এবাদতের জন্যে নির্জনবাস অপেক্ষা উত্তম। কেউ ফযীলত স্বীকার করেন, কিন্তু নারী সহবাসের উদ্দীপনা না থাকলে এবাদতের জন্যে নির্জনবাসকে উত্তম বলেন। কেউ কেউ বলেন : আমাদের এ যুগে বিবাহ না করাই শ্রেয়ঃ। আগেকার যুগে এর ফযীলত ছিল। তখন মহিলাদের বদভ্যাস ছিল না। এখন বাস্তব সত্য কি, তা পক্ষ ও বিপক্ষের হাদীস বর্ণনা এবং বিবাহের উপকারিতা ও অপকারিতা ব্যাখ্যা করার পরই জানা যাবে। তাই আমরা এ পরিচ্ছেদটি চার ভাগে বিভক্ত করছি।
পরবর্তী পর্ব —
বিবাহের ফষীলত সম্পর্কিত আয়াত
বিবাহ (৩৫) কন্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ
বিবাহ (পর্ব – ৩৫) 📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.) কন্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...
-
অহংকার ও আত্মপ্রীতি (পর্ব- ৮) এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ইমাম গাজ্জালী (রহঃ) অহংকারের প্রতিকার ও বিনয় অর্জনের উপায় উপরোক্ত আলোচনা থেকে জানা গেল যে,...
-
অহংকার ও আত্মপ্রীতি (পর্ব- ৫) এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ইমাম গাজ্জালী (রহঃ) অহংকারের স্বরূপ ও তার লাভ-লোকসান— অহংকার দু'প্রকার। একটি বাহ্যিক, অপ...
-
অহংকার ও আত্মপ্রীতি (পর্ব- ৩) এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ইমাম গাজ্জালী (রহঃ) অহংকারের নিন্দা — পবিত্র কোরআনুল কবিমে বহু স্থানে আল্লাহ তা'আলা ...









