মঙ্গলবার, ১১ জুলাই, ২০২৩

অন্তর বা হৃদয় (১২) সুফী সম্প্রদায়ের শিক্ষা পদ্ধতি সঠিক হওয়ার প্রমাণ



অন্তর বা হৃদয় (পর্ব- ১২) 
এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

সুফী সম্প্রদায়ের শিক্ষা পদ্ধতি সঠিক হওয়ার প্রমাণ
জানা উচিত, যার অন্তরে সামান্য বিষয়ও এলহামের পথে উন্মোচিত হয়, তাকেই ‘আরেফ' (বিভুজ্ঞানী) বলা হবে। আর যার অন্তর কখনও এরূপ অনুভব করে না, তারও এ বিষয়টি বিশ্বাস করা উচিত। কেননা, মারেফত তথা বিভুজ্ঞান মানুষের একটি মজ্জাগত ব্যাপার। এর পক্ষে শরীয়তসম্মত প্রমাণ অভিজ্ঞতা ও কাহিনী বিদ্যমান আছে। প্রমাণ এই আল্লাহ তা'আলা বলেন,- “যারা আমার পথে সাধনা ও অধ্যবসায় করে, আমি অবশ্যই তাদেরকে পথ প্রদর্শন করি ।”


অর্থাৎ কাশফ ও এলহামের পদ্ধতিতে তাদের অন্তর থেকে প্রজ্ঞা প্রকাশ পায়। রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) বলেন, - যে ব্যক্তি তার এলেম অনুযায়ী আমল করে, আল্লাহ তাআলা তাকে সেই বিষয়ের এলেম দান করেন, যা সে জানে না। তাকে আমল করার তওফীক দেন। ফলে সে জান্নাতের হকদার হয়ে যায়। আর যে ব্যক্তি তার এলেম অনুযায়ী আমল করে না, সে জানা বিষয়ে হয়রান হয় এবং আমল করার তওফীক পায় না। ফলে সে জাহান্নামের উপযুক্ত হয়ে যায়।


আল্লাহ তা'আলা বলেন,

“যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্যে নিষ্কৃতির পথ করে দেন এবং তাকে ধারণাতীত স্থান থেকে রিযিক পৌঁছান।”

অর্থাৎ আপত্তি ও সন্দেহ থেকে নিষ্কৃতির পথ করে দেন, জ্ঞান ও মেধা শিক্ষা এবং অভিজ্ঞতা ছাড়াই দান করেন।


আরও বলা হয়েছে:

“মুমিনগণ, তোমরা যদি আল্লাহকে ভয় কর, আল্লাহ তোমাদেরকে সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী বিষয় দান করবেন।”

এখানে ‘ফোরকান' মানে নূর, যদ্দ্বারা সত্য ও মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য করে সন্দেহ থেকে আত্মরক্ষা করা যায়। এ কারণেই রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) দোয়ার মধ্যে প্রায়ই এই নূর প্রার্থনা করতেন এবং বলতেন : “হে আল্লাহ, আমাকে নূর দান করুন, আমার নূর বৃদ্ধি করুন, আমার অন্তরে নূর দিন এবং আমার কলবে ও আমার নয়নে নূর দিন। এমনকি, তিনি আরও বলতেন : আমার কেশ ও রক্ত-মাংসে এবং অস্থির মধ্যে নূর দান করুন। 


আল্লাহ তায়ালা বলেন,

-“আল্লাহ যার বক্ষ ইসলামের জন্যে উন্মুক্ত করে দেন, সে তার রবের পক্ষ থেকে একটি নূরের উপর থাকে।”

এই আয়াতের তফসীর প্রসঙ্গে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-উনাকে প্রশ্ন করা হলে তিনি এরশাদ করেন : এর অর্থ বক্ষের প্রশস্ততা। অর্থাৎ অন্তরে যখন নূর ঢেলে দেয়া হয়, তখন তার জন্যে বক্ষ প্রশস্ত হয়ে যায়। তিনি হযরত ইবনে আব্বাস (রঃ)-এর জন্যে এই দোয়া করেন- “হে আল্লাহ, তাকে ধর্মীয় বোধশক্তি দান করুন এবং ব্যাখ্যা শিক্ষা দিন।”


হযরত আলী (রাঃ) বলেন : রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) কোন কথা গোপনে বলেননি, কিন্তু আল্লাহ তা'আলা তাঁর কোন কোন বান্দাকে কিতাবুল্লাহর জ্ঞান দান করেন। এটা শেখার মাধ্যমে অর্জিত হয় না।-“আল্লাহ যাকে ইচ্ছা 'হেকমত' দান করেন”- এই আয়াতে কেউ কেউ হেকমতের অর্থ করেছেন আল্লাহর কিতাবের জ্ঞান। - আমি সোলায়মানকে তা বুঝিয়ে দিলাম। এখানে কাশফের মাধ্যমে সোলায়মান (আঃ) যা বুঝেছিলেন, তাকেই 'বুঝিয়ে দিলাম' বলে ব্যক্ত করা হয়েছে। হযরত আবু দারদা (রাঃ) বলেন : মুমিন সেই ব্যক্তি, যার দৃষ্টিতে আল্লাহর নূর দ্বারা পর্দার অন্তরালের বস্তু ভেসে উঠে। তিনি কসম খেয়ে বলেন : নির্ঘাত সত্য হচ্ছে, আল্লাহ তা'আলা সত্য বিষয় মুমিনদের অন্তরে ঢেলে দেন এবং মুখে উচ্চারিত করে দেন। হাদীস শরীফে আছে :

“মুমিনের দূরদর্শিতাকে ভয় কর। কেননা, সে আল্লাহ তা'আলার নূর দ্বারা দৃষ্টিপাত করে।”


হযরত ইমাম হাসান (রাঃ)-এর রেওয়ায়েতে রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) এরশাদ করেনঃ

এলেম দু'প্রকার। এক এলেম অন্তরে লুক্কায়িত। এটাই উপকারী এলেম। জনৈক আলেমকে অন্তরে লুক্কায়িত এলেমের অর্থ জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেন : এটা আল্লাহ তা'আলার রহস্যাবলীর অন্যতম, যা তিনি আপন ওলীদের অন্তরে ঢেলে দেন। কোন ফেরেশতা কিংবা মানুষ তা অবগত নয়। কোরআন শরীফে স্পষ্ট উল্লেখ আছে, তাকওয়া হেদায়াত ও কাশফের চাবি। এই হেদায়াত ও কাশফকেই শিক্ষা ব্যতীত জ্ঞান বলা হয়। এরশাদ হয়েছে - “এটা মানুষের জন্যে বর্ণনা এবং তাকওয়া বিশিষ্টদের জন্যে হেদায়াত ও উপদেশ।”


এখানে হেদায়াতের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে তাকওয়া বিশিষ্টদের উল্লেখ করা হয়েছে। আবু ইয়াযীদ বলতেন : আলেম সেই ব্যক্তির নাম নয়, যে কোরআনের কিছু অংশ মুখস্থ করে নেয়, এর পর যখন তা বিস্মৃত হয়, তখন মূর্খ কথিত হয়। বরং আলেম তাকে বলা হয়, যে পরওয়ারদেগারের কাছ থেকে যখন ইচ্ছা পাঠ ও মুখস্থ করা ছাড়া বস্তুনিচয়ের জ্ঞান অর্জন করে নেয়। এরূপ জ্ঞানকেই এলমে রব্বানী বলা হয়।(আমি তাকে আমার পক্ষ থেকে এলম দিয়েছি।) আয়াতে এই এলেমের দিকেই ইঙ্গিত রয়েছে। নতুবা সকল এলেমই তাঁর তরফ থেকে। তফাৎ হচ্ছে, কতক জ্ঞান শিক্ষাদানের মাধ্যমে হয়, তাকে ‘এলেমে লাদুন্নী' বলা হয় না। বরং যে এলেম বাইরের কোন অভ্যস্ত কারণ ছাড়াই অন্তরে উপস্থিত হয়, তাকেই এলমে লাদুন্নী বলা হয়। এ সম্পর্কে অসংখ্য আয়াত ও হাদীসের মধ্য থেকে এখানে কিঞ্চিত উল্লেখ করা হল।


এখন এ সম্পর্কিত অভিজ্ঞতা বর্ণনা করা হচ্ছে, যা অনেক সাহাবী, তাবেঈ ও পরবর্তী বুযুর্গগণের হয়েছে। 


বর্ণিত আছে, হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) ইন্তেকালের পূর্ব মুহূর্তে কন্যা আয়েশাকে বললেন : তোমরা দু'ভাই ও দু'বোন। অথচ তাঁর পত্নী তখন গর্ভবতী ছিলেন এবং পরে কন্যা জন্মগ্রহণ করেছিল। এখানে তিনি জন্মের পূর্বেই জেনে নেন যে, কন্যা জন্মগ্রহণ করবে। 


হযরত ওমর (রাঃ) জুমুআর খোতবার মাঝখানে বলে উঠেন (যার অর্থ তোমরা আত্মরক্ষা কর) তিনি কাশফের মাধ্যমে জানলেন যে, যুদ্ধক্ষেত্রে মুসলিম বাহিনীকে শত্রু সৈন্যরা ধাওয়া করছে। তখনই তিনি মুসলিম বাহিনীকে পাহাড়ের দিকে সরে যেতে আহ্বান করলেন। তাঁর এই কণ্ঠস্বর যুদ্ধক্ষেত্রে সৈন্যদের কানে পৌঁছে যাওয়া একটি বড় কারামাত। 

আনাস ইবনে মালেক বর্ণনা করেন, আমি একদিন হযরত ওসমান (রাঃ)-এর খেদমতে যাওয়ার জন্যে রওয়ানা হলাম। পথিমধ্যে জনৈকা মহিলাকে পেয়ে আমি তার দিকে তাকালাম এবং তার রূপ গভীরভাবে নিরীক্ষণ করলাম। এর পর হযরত ওসমানের খেদমতে উপস্থিত হলে তিনি আমাকে বললেন : তোমাদের কেউ কেউ আমার কাছে আগমন করে এমতাবস্থায় যে, তার চোখে-মুখে যিনার চিহ্ন থাকে। তোমার কি জানা নেই যে, কুদৃষ্টি করা হচ্ছে চোখের যিনা? তুমি তওবা কর। নতুবা তোমাকে সাজা দেব। আমি জিজ্ঞেস করলাম : রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়াসাল্লাম)-এর পরেও ওহী আগমন করে কি? তিনি বললেন : না, কিন্তু অন্তর্দৃষ্টি ও দূরদর্শিতার মাধ্যমে জানা যায়। 


আবু সাঈদ খেরাম বর্ণনা করেন, একবার আমি হেরেম শরীফে গেলাম। সেখানে খেরকা পরিহিত এক ফকীরকে দেখে মনে মনে বললাম : এ ধরনের মানুষই সমাজের উপর বোঝা হয়ে থাকে। ফকীর তৎক্ষণাৎ আমাকে কাছে ডাকল এবং বললঃ আল্লাহ তোমাদের মনের কথা জানেন। অতএব সাবধান হয়ে যাও। এতে আমি মনে মনে এস্তেগফার (ক্ষমা প্রার্থনা) করলাম। এর পর ফকীর সজোরে বলল : 

“তিনি (আল্লাহ) বান্দার তওবা কবুল করেন।” একথা বলে ফকীর আমার দৃষ্টি থেকে উধাও হয়ে গেল। 


যাকারিয়া ইবনে দাঊদ রেওয়ায়েত করেন, একবার আবুল আব্বাস ইবনে মসরূক অসুস্থ আবুল ফযল হাশেমীকে দেখতে যান। আবুল ফযল ছিলেন ছাপোষা নিঃস্ব ব্যক্তি। জীবন যাপনের জন্যে বাহ্যিক কোন উপকরণ তার ছিল না। আবুল আব্বাস যখন প্রস্থানোদ্যত হলেন, তখন মনে মনে চিন্তা করলেন, ইয়া আল্লাহ! এ লোকটি কোত্থেকে খাবার সংগ্রহ করে? তৎক্ষণাৎ আবুল ফযল তাকে ডেকে বললেন : খবরদার! কখনও এরূপ অনর্থক কথা চিন্তা করো না। আল্লাহ্ তাআলার অদৃশ্য কৃপা অনেক।


আহমদ নকীব বর্ণনা করেন, একদিন আমি হযরত শিবলীর খেদমতে গেলাম। তিনি আমাকে লক্ষ্য করে বললেন : আহমদ, আল্লাহ তাআলা সকলকে পরিচয়ের জন্যে মস্তিষ্ক দান করেছেন। আমি বললাম : হযরত, ব্যাপার কি, একথা বলছেন কেন? তিনি বললেন : আমি এই মুহূর্তে যখন বসা ছিলাম, তখন আমার মনে ধারণা সৃষ্টি হল যে, তুমি কৃপণ। আহমদ বললেন : হযরত, আমি তো কৃপণ নই। এর পর তিনি চিন্তা করে বললেন : নিঃসন্দেহে তুমি কৃপণ। অতঃপর আমি মনে মনে সংকল্প করলাম- আজ যা কিছু পাব, তা প্রথমে যে ফকীরের সাথে সাক্ষাৎ হবে, তাকে দান করে দেব। এমনি সময় এক ব্যক্তি আমার কাছে এসে পঞ্চাশটি আশরফী দিয়ে গেল। 'আমি এগুলো নিয়ে সংকল্প অনুযায়ী রাস্তায় বের হলাম। এক জায়গায় দেখলাম, জনৈক অন্ধ ফকীর নাপিতের কাছে মাথা মুণ্ডাচ্ছে। আমি তার কাছে যেয়ে আশরফীগুলো দিতে চাইলে সে বলল : নাপিতকে দিয়ে দাও। আমি নাপিতকে দিতে গেলে বলল : এই ফকীর মাথা মুণ্ডাতে বসেছে অবধি আমি প্রতিজ্ঞা করেছি, কোন মজুরি গ্রহণ করব না। অগত্যা আমি আশরফীগুলো নদীতে নিক্ষেপ করে বললাম : যে কেউ তোদের (অর্থকে) ইযযত করে, আল্লাহ্ তাকেই লাঞ্ছিত করেন।


হামযা ইবনে আবদুল্লাহ বর্ণনা করেন, আমি একবার হযরত আবুল খায়রের গৃহে রওয়ানা হলাম এবং মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলাম, তার গৃহে কিছু খাব না। যখন আমি গৃহ থেকে বের হলাম, তখন দেখলাম, তিনি খাদ্যের একটি খাঞ্চা নিয়ে আমার গৃহে আসছেন। তিনি বললেন : নাও, এখন খাও। এটা তো আমার গৃহ নয়। এই বুযুর্গের অনেক প্রসিদ্ধ কারামত আছে। সেমতে ইবরাহীম রকী রেওয়ায়েত করেন, আমি একবার তার সাথে দেখা করতে গেলাম। তিনি মাগরিবের নামায পড়ালেন, কিন্তু সূরা ফাতেহাও ভালরূপে পড়তে পারলেন না। আমি মনে মনে চিন্তা করলাম, তার কাছে আসা সম্পূর্ণ নিরর্থক হয়েছে। নামাযের পর আমি এস্তেঞ্জার জন্যে বাইরে গেলাম। একটি সিংহ আমার পথ রোধ করে দাঁড়াল । আমি আবুল খায়রের কাছে ফিরে এসে ঘটনা বিবৃত করলে তিনি সেখান থেকেই সিংহকে ভর্ৎসনা করে বললেন : কি হে, আমি কি বলিনি, আমার মেহমানদের কোন অসুবিধা করবে না? একথা শুনেই সিংহ সরে গেল। প্রয়োজন সেরে যখন আমি ফিরে এলাম, তখন তিনি বললেন : তুমি তোমার বাহ্যিক দিকটাকে সোজা করেছ। তাই সিংহকে দেখে ভয় পেয়েছ, কিন্তু আমি আমার বাতেন (অভ্যন্তর) ঠিক করেছি। তাই সিংহ আমাকে ভয় করে। এমনি ধরনের আরও অসংখ্য কাহিনী থেকে মাশায়েখের অন্তর্দৃষ্টি, মানুষের মনের কথা জানা এবং তাদের অন্তরের বিশ্বাস বলে দেয়ার বিষয় অবগত হওয়া যায়। হাঁ, যে অস্বীকার করে, তার জন্যে এসব কাহিনী যথেষ্ট নয়, কিন্তু দু'টি অকাট্য দলীল আছে, যেগুলো কেউ অস্বীকার করতে পারে না। তন্মধ্যে একটি হচ্ছে অভূতপূর্ব সত্য স্বপ্ন, যদ্বারা অবস্থা উন্মোচিত হয়। কেননা, স্বপ্নে এখন অদৃশ্য জগতের অবস্থা ফুটে উঠা সম্ভবপর হয়, তখন জাগ্রত অবস্থায় এরূপ হওয়া অসম্ভব নয়। কেননা, উভয় অবস্থার মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে, স্বপ্নে ইন্দ্রিয় অচল হয়ে থাকে এবং বাহ্যিক অনুভূত বিষয়সমূহের মধ্যে লিপ্ত হয় না । এটা প্রায়ই জাগ্রত অবস্থায়ও সংঘটিত হয়। যেমন কেউ যখন কোন বিষয়ে গভীরভাবে চিন্তামগ্ন থাকে, তখন না শুনে কোন আওয়ায এবং না দেখে কোন বস্তু।


দ্বিতীয় দলীল হচ্ছে অদৃশ্য জগত ও ভবিষ্যত বিষয়াদি সম্পর্কে রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-এর সংবাদ প্রদান করা। কোরআন ও হাদীস দ্বারা এটা প্রমাণিত। এটা যখন নবীর জন্যে প্রমাণিত হল, তখন নবী নয় – এমন ব্যক্তির জন্যেও প্রমাণিত হতে পারে। কেননা, নবী এমন ব্যক্তিকে বলা হয়, যিনি কাশফের মাধ্যমে বিষয়সমূহের স্বরূপ জেনে নেন এবং সংস্কার কাজে মশগুল থাকেন। অতএব এরূপ কোন ব্যক্তি থাকাও সম্ভব, যিনি কাশফের মাধ্যমে বিষয়সমূহের স্বরূপ জানবেন; কিন্তু সংস্কার কাজে মশগুল থাকবেন না। এরূপ ব্যক্তিকে নবী না বলে ওলী বলা হবে। এখন যে ব্যক্তি নবীগণকে মানবে এবং সত্য স্বপ্নের সত্যায়ন করবে, তাকে অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে, অন্তরের দু'টি দরজা রয়েছে- একটি বহির্জগত অর্থাৎ, ইন্দ্রিয়ের দিকে এবং অপরটি ঊর্ধ্বজগতের দিকে, একেই বলা হয় এলহাম ও ওহী। এ দু'টি দরজা স্বীকার করে নিলে কেউ একথা বলতে পারবে না যে, এলেম কেবল শিক্ষা ও অভ্যস্ত কারণসমূহের মধ্যেই সীমিত।



অন্তর বা হৃদয় (পর্ব- ১১) এলহামের ক্ষেত্রে সুফী ও আলেমের পার্থক্য



অন্তর বা হৃদয় (পর্ব- ১১) 
এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

এলহামের ক্ষেত্রে সুফী ও আলেমের পার্থক্য--
জানা উচিত, যে জ্ঞান শিক্ষালব্ধ নয়; বরং কখনও কখনও অন্তরে জাগরিত হয়ে যায়, তাকে এলহাম বলা হয়। এই জ্ঞান কয়েক প্রকারে অন্তরে জাগরিত হয়। কখনও মনে হয়, কেউ অজ্ঞাতে অন্তরে ঢেলে দিয়েছে এবং কখনও শিক্ষার পদ্ধতিতে অর্জিত হয়। প্রথম প্রকারকে ‘নফখ ফিল কলব' এবং দ্বিতীয় প্রকারকে ‘এতেবার' ও ‘এস্তেবসার' আখ্যা দেয়া হয়। এলহাম কখনও এমনভাবে হয় যে, বান্দা বুঝতেও পারে না, এই জ্ঞান কোথা থেকে কিভাবে অর্জিত হল। এটা আলেম ও সুফীগণের জন্যে হয়। আবার কখনও জ্ঞান লাভের পন্থা পদ্ধতি বান্দার জানা হয়ে যায়। অর্থাৎ যে ফেরেশতা অন্তরে জ্ঞান ঢেলে দেয়, সে বান্দার দৃষ্টিতে উদ্ভাসিত হয়ে উঠে। এই প্রকার এলহামকে ওহী বলা হয়। এটা পয়গম্বরগণের বৈশিষ্ট্য। যে জ্ঞান উপার্জন ও প্রমাণের মাধ্যমে হাসিল হয়, তা আলেমগণের জ্ঞান।


সত্য হচ্ছে, সকল বিষয়ের মধ্যে সত্যকে জেনে নেয়ার যোগ্যতা অন্তরের রয়েছে, কিন্তু পূর্বোল্লিখিত পাঁচটি কারণই এতে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এই পাঁচটি কারণ যেন অন্তররূপী আয়না ও লওহে মাহফুযের মধ্যে আড়াল হয়ে যায়। লওহে মাহফুয এমন একটি সংরক্ষিত ফলক, যাতে কেয়ামত পর্যন্ত অনুষ্ঠিতব্য সকল বিষয় চিত্রিত আছে। এই ফলক থেকে অন্তরের উপর জ্ঞান প্রতিফলিত হওয়া এমন, যেমন এক আয়নার প্রতিচ্ছবি অন্য আয়নায় দৃষ্টিগোচর হয়। উভয় আয়নার মধ্যবর্তী আড়াল যেমন কখনও হাতে সরিয়ে দেয়া হয় এবং কখনও আপনা-আপনি বাতাসের চাপে সরে যায়, তেমনি মাঝে মাঝে খোদায়ী কৃপার সমীরণ প্রবাহিত হয় এবং অন্তশ্চক্ষুর সামনে থেকে পর্দা সরে যায়। ফলে লওহে মাহফুযে লিপিবদ্ধ কতক বিষয় দৃষ্টিগোচর হয়। এটা কখনও স্বপ্নে হয়। এতে ভবিষ্যতের অবস্থা জানা হয়ে যায়। সম্পূর্ণ পর্দা সরে যাওয়া মৃত্যুর পরই সম্ভবপর। মাঝে মাঝে জাগ্রত অবস্থায়ও পর্দা সরে যায় এবং সাথে সাথে অদৃশ্য যবনিকার অন্তরাল থেকে বিস্ময়কর জ্ঞানের বিষয়াদি অন্তরে উন্মোচিত হয়ে যায়। এই উন্মোচন ক্ষণস্থায়ী হয়ে থাকে এবং এর স্থায়িত্ব খুবই বিরল। সারকথা, অন্তরে জ্ঞান এলহাম হওয়া ও জ্ঞানার্জন করা এতদুভয়ের মধ্যে কেবল পর্দা সরে যাওয়ার পার্থক্য আছে। এছাড়া পাত্র ও কারণের মধ্যে কোন তফাৎ নেই। পর্দা সরে যাওয়াটা বান্দার এখতিয়ারে নেই। এমনিভাবে ওহী ও এলহামের মধ্যে এছাড়া কোন তফাৎ নেই যে, ওহীর মধ্যে জ্ঞানের মাধ্যম অর্থাৎ, ফেরেশতা দৃষ্টিগোচর হয় এবং এলহামে দৃষ্টিগোচর হয় না, কিন্তু অর্জিত হয় ফেরেশতার মাধ্যমেই আল্লাহ তাআলা বলেন, “কোন মানুষের সাধ্য নেই যে, আল্লাহ তা'লার সাথে কথা বলবেন, কিন্তু ওহীর মাধ্যমে অথবা পর্দার আড়াল থেকে অথবা কোন বার্তাবাহক প্রেরণের মাধ্যমে, যে তাঁর নির্দেশে তিনি যা চান পৌঁছে দেবে। 

এখন জানা উচিত, সুফী সম্প্রদায় এলহামী জ্ঞানের প্রতি উৎসাহী হয়ে থাকেন- শিক্ষালব্ধ জ্ঞানের প্রতি নয়। এ কারণেই তারা গ্রন্থকারদের লেখা গ্রন্থসমূহ পাঠ করেন না এবং উক্তি ও প্রমাণাদি নিয়ে আলোচনা করেন না। তারা বলেন: প্রথমে খুব সাধনা করা উচিত এবং কুস্বভাব ও যাবতীয় সাংসারিক সম্পর্ক ছিন্ন করে কায়মনোবাক্যে সর্বপ্রযত্নে আল্লাহ তাআলার দিকে মনোনিবেশ করা দরকার। এটা অর্জিত হয়ে গেলে আল্লাহ তাআলা স্বয়ং বান্দার অন্তরের কার্যনির্বাহী ও যিম্মাদার হয়ে যাবেন। তিনি যিম্মাদার হয়ে গেলে বান্দার প্রতি রহমত ছায়াপাত করবে এবং অন্তরে নূর চমকাতে থাকবে। ফলে ঊর্ধ্ব জগতের রহস্য তার সামনে উন্মোচিত হয়ে যাবে। অন্তরের সামনে থেকে আড়াল দূর হয়ে যাবে এবং খোদায়ী বিষয়াদির সত্যাসত্য উজ্জ্বল হয়ে দেখা দেবে। এ বক্তব্য অনুযায়ী বান্দার কাজ এতটুকু যে, সে কেবল আত্মশুদ্ধি করবে এবং খাঁটি ইচ্ছা সহকারে খোদায়ী রহমতে জ্ঞানোন্মেষের জন্যে অপেক্ষমাণ ও পিপাসার্ত থাকবে। এভাবে পয়গম্বর ও ওলীগণের সামনে সত্য উদ্ঘাটিত হয়ে অন্তর নূরানী হয়ে যায়। এটা লেখাপড়া ও গ্রন্থ পাঠ দ্বারা হয় না। কারণ, যে আল্লাহর হয়ে যায়, আল্লাহ তার হয়ে যান।


যাহেরী আলেমগণ জ্ঞানলাভের উপরোক্ত পদ্ধতি অস্বীকার করেন না। তারা স্বীকার করেন যে, বিরল হলেও এভাবে মনযিলে মকসুদ পর্যন্ত পৌছা যায় । কেননা, অধিকাংশ নবী ও ওলীর অবস্থা তাই হয়, কিন্তু তাঁরা বলেন, এ পদ্ধতি অত্যন্ত কঠিন এবং এর ফলাফল বিলম্বে পাওয়া যায়। এর জন্যে যে সকল শর্ত রয়েছে, সেগুলো অর্জন করাও খুবই দূরূহ ব্যাপার । কেননা, যারতীয় সম্পর্ক এমনভাবে ছিন্ন করা এক রকম অসম্ভব । যদি ছিন্ন হয়েও যায়, তবে তা অব্যাহত থাকা আরও বেশী কঠিন। কেননা, সামান্য কুমন্ত্রণা ও শংকার কারণে অন্তর দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়ে।


রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়াসাল্লাম) বলেন,-

“মুমিনের অন্তর ফুটন্ত পানির চেয়েও অধিক স্ফুটিত হতে থাকে। এছাড়া এই সাধনায় কখনও মেযাজ বিগড়ে যায়, মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটে এবং স্বাস্থ্য খারাপ হয়ে যায়। পূর্ব থেকে জ্ঞানার্জনের মাধ্যমে মনকে সুসংযত করে না নিলে অন্তরে নানাবিধ ক্ষতিকর চিন্তা এসে ভিড় জমায় । এগুলো দূর না করা পর্যন্ত মন এগুলোতেই লিপ্ত থাকে, অথচ সারা জীবনেও এগুলোর সমাধান হয় না। এ পথে চলেছেন, এমন অনেক সুফী একই চিন্তায় বিশ বছর পর্যন্ত জড়িয়ে রয়েছেন। পূর্ব থেকে জ্ঞানার্জন করে নিলে এ ধরনের চিন্তার সমাধান তাঁরা তৎক্ষণাৎ পেয়ে যেতেন। এ থেকে জানা যায়, জ্ঞানার্জনে ব্রতী হওয়ার পদ্ধতিই নির্ভরযোগ্য এবং উদ্দেশ্যের অধিক অনুকূল। আলেমগণ বলেন, সুফী সম্প্রদায় এমন, যেমন কোন ব্যক্তি ফেকাহ শেখে না এবং বলে যে, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়াসাল্লাম) ফেকাহ শেখেননি। তিনি ওহী ও এলহামের মাধ্যমে ফকীহ হয়েছিলেন। সুতরাং আমিও সদা সর্বদা সাধনা করে করে ফকীহ হয়ে যাব। যে কেউ এরূপ চিন্তা করে, সে নিজের উপর যুলুম করে এবং মূল্যবান জীবন বিনষ্ট করে। অতএব প্রথমে জ্ঞানার্জন ও আলেমগণের বাণীর অর্থ হৃদয়ঙ্গম করা উচিত। এর পর প্রতীক্ষায় থাকবে যে, যা অন্য আলেমগণের জানা নেই, তা যেন সে জেনে নেয়। সম্ভবত সাধনার পরে এটি অর্জিত হয়ে যাবে।



পরবর্তী পর্ব-

সুফী সম্প্রদায়ের শিক্ষা পদ্ধতি সঠিক হওয়ার প্রমাণ

বুধবার, ৫ জুলাই, ২০২৩

অন্তর বা হৃদয় (পর্ব- ১০) বিভিধ জ্ঞানে অন্তরের অবস্থা


অন্তর বা হৃদয় (পর্ব- ১০) 
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

যৌক্তিক, ধর্মিয়, জাগতিক ও পারলৌকিক জ্ঞানে অন্তরের অবস্থা —
পূর্বে বর্ণিত হয়েছে, অন্তর স্বভাবগতভাবে জ্ঞাতব্য বিষয়াদি গ্রহণে তৎপর। এখন বলা হচ্ছে, যেসব জ্ঞান অন্তরে আসে, সেগুলো দু'প্রকার যুক্তিগত ও শরীয়তগত। 

যুক্তিগত জ্ঞানও দু'প্রকার- এক, যা শিক্ষালব্ধ নয় এবং দুই, যা শিক্ষালব্ধ। 

যে জ্ঞান শিক্ষালব্ধ তাও দু'প্রকার- জাগতিক ও পারলৌকিক। যুক্তিগত জ্ঞান বলে আমাদের উদ্দেশ্য এমন জ্ঞান, যার কারণ নিছক যুক্তি- অনুকরণ ও শ্রবণ নয়। এর মধ্যে সেই জ্ঞান শিক্ষালব্ধ নয়, যাতে জানা যায় না যে, এই জ্ঞান কোথা থেকে এবং কিভাবে অর্জিত হয়েছে? উদাহরণতঃ এটা জানা যে, এক ব্যক্তি একই সময় দুটি গৃহে থাকতে পারে না এবং একই বস্তু নশ্বর, অবিনশ্বর কিংবা উপস্থিত ও অনুপস্থিত একই সাথে হতে পারে না। এ জ্ঞান মানুষ শৈশবকাল থেকে অর্জন করে, কিন্তু সে জানে না, দু'গৃহে থাকা এটা কখন এবং কিভাবে অর্জিত হয়েছে? অর্থাৎ, এর কোন বাহ্যিক ও নিকটবর্তী কারণ জানে না। নতুবা আল্লাহর পক্ষ থেকে যে এসেছে, এটা জানে। 

আর শিক্ষালব্ধ জ্ঞান হচ্ছে, যাতে শিক্ষা ও প্রমাণ করার প্রয়োজন আছে। এই উভয় প্রকারকে ‘আকল' বলা হয়। হযরত আলী (রাঃ) বলেন : আকল দু'প্রকার স্বভাবগত ও শ্রবণগত। স্বভাবগত আকল ব্যতীত শ্রবণগত আকলের কোন উপকার নেই; যেমন সূর্যকিরণ দ্বারা অন্ধের কোন উপকার হয় না।


রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) এক হাদীসে বলেন :

“আল্লাহ তাআলা আকল অপেক্ষা অধিক মহৎ কোন কিছু সৃষ্টি করেননি।” এখানে প্রথম প্রকার আকল বুঝানো হয়েছে।

অন্য এক হাদীসে তিনি বলেন :

“যখন মানুষ নানা প্রকার পুণ্য কাজ দ্বারা আল্লাহ তাআলার নৈকট্য লাভ করে, তখন তুমি আপন আকল দ্বারা নৈকট্য লাভ কর।”

এখানে দ্বিতীয় প্রকার আকল বুঝানো হয়েছে। কেননা, আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্যে শিক্ষালব্ধ জ্ঞান দরকার। মোট কথা, অন্তরকে মনে করতে হবে চক্ষু এবং স্বভাবগত আকলকে বুঝতে হবে দৃষ্টিশক্তিরূপে। দৃষ্টিশক্তি অন্ধের মধ্যে থাকে না, চক্ষুষ্মান ব্যক্তির মধ্যে থাকে, যদিও সে তার চক্ষু বন্ধ করে নেয় অথবা অন্ধকার রাত্রে থাকে। যে কলম দ্বারা আল্লাহ তাআলার জানা বিষয় অন্তরে মুদ্রিত করে, তাকে সূর্যের গোল পরিমণ্ডল মনে করা উচিত। শৈশবে জ্ঞান অর্জিত না হওয়ার কারণ এটাই যে, তখন পর্যন্ত মানসপটে জ্ঞান চিত্রিত করার যোগ্যতা থাকে না। “কলম” বলে আমাদের উদ্দেশ্য আল্লাহর সৃজিত এমন একটি বস্তু, যদ্দ্বারা অন্তরে জ্ঞানের চিত্র আকাঁ হয়ে যায়। আল্লাহ বলেন “তিনি কলম দ্বারা শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে এমন বিষয় শিখিয়েছেন, যা সে জানত না।”

আল্লাহ তাআলার কলম আমাদের কলমের মত নয়। যেমন- তাঁর গুণাবলী সৃষ্টির গুণাবলী থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন।

মোট কথা, অন্তশ্চক্ষু ও চর্মচক্ষুর মধ্যে উপরোক্ত বিষয়সমূহে মিল আছে, কিন্তু সম্মান ও মর্যাদায় কোন মিল নেই। এ মিলের কারণেই আল্লাহ তাআলা অন্তরের উপলব্ধিকে দেখা বলে ব্যক্ত করে বলেছেন : “অন্তর যা দেখেছে, তা মিথ্যা দেখেনি।”

আরও বলা হয়েছে : “এমনিভাবে আমি ইবরাহীমকে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর রাজত্ব দেখাতে থাকি।”

এ আয়াতে আত্মোপলব্ধিকে দেখা বলে প্রকাশ করা হয়েছে। এমনিভাবে নিম্নের আয়াতসমূহে উপলদ্ধির বিপরীত বিষয়কে অন্ধত্ব বলা হয়েছেঃ নিশ্চয় চক্ষু অন্ধ হয় না। তবে বক্ষস্থিত অন্তর অন্ধ হয়। যে এ জগতে অন্ধ থাকে, সে পরকালেও অন্ধ থাকবে। এ পর্যন্ত যৌক্তিক জ্ঞানের কথা বর্ণিত হল। 


এক্ষণে ধর্মীয় জ্ঞানের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে। ধর্মীয় জ্ঞান পয়গম্বরগণের অনুসরণ তখা আল্লাহর কিতাব ও রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর হাদীস শিক্ষা করার মাধ্যমে অর্জিত হয়। এর মাধ্যমেই অন্তরগত গুণাবলী পূর্ণরূপে বিকাশ লাভ করে এবং অন্তরগত রোগ-ব্যাধি ও ব্যথার উপশম ঘটে। যৌক্তিক জ্ঞানের প্রয়োজন থাকলেও সেটা অন্তরের নিরাপত্তার জন্যে যথেষ্ট নয়। কেননা, কোরআন ও হাদীসের বিষয়সমূহ আপনা আপনি আকল তথা যুক্তি-প্রমাণ দ্বারা জানা যায় না, কিন্তু শ্রবণের পর যথাযথ বুঝার জন্যে আকলের প্রয়োজন হয়। এ থেকে প্রমাণিত হল, শ্রবণ ছাড়া আকলের উপায় নেই এবং আকল থেকে শ্রবণের পলায়নের পথ নেই। যেব্যক্তি কেবল তাকলীদ তথা অনুসরণই করে যায় এবং আকলকে শিকায় তুলে রাখে, সে মূর্খ। 

অনুরূপভাবে যে কেবল আকলকেই যথেষ্ট মনে করে এবং কোরআন ও হাদীসের প্রতি ভ্রূক্ষেপ করে না, সে উদ্ধৃত। অতএব উভয়বিধ জ্ঞান অর্জন করা উচিত। 

কেননা, যৌক্তিক জ্ঞান খাদ্যের মত এবং শরীয়তের জ্ঞান ওষুধের অনুরূপ। রুগ্ন ব্যক্তি যদি ওষুধ না খায়, তবে কেবল খাদ্য খেয়ে তার রোগ দূর হবে না। এমনিভাবে অন্তরের রোগসমূহের চিকিৎসা সেসব ভেষজ দ্বারা হতে পারে, যা শরীয়তের হাসপাতালে পাওয়া যায় । অর্থাৎ, ওযীফা, এবাদত ও সৎকর্ম। সুতরাং যেব্যক্তি তার রোগাক্রান্ত অন্তরের চিকিৎসা এবাদত দ্বারা করবে না সে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যেমন সেই রুগীর ক্ষতি হয়, যে ওষুধ না খেয়ে কেবল খাদ্য খেতে থাকে।


যারা বলে, যৌক্তিক জ্ঞান শরীয়তের জ্ঞানের বিপরীত, কাজেই উভয়বিধ জ্ঞান অর্জন করা সম্ভবপর নয়, তারা অজ্ঞতার কারণে এ কথা বলে। তারা অন্তশ্চক্ষুর নূর থেকে বঞ্চিত। বরং তাদের দৃষ্টিতে শরীয়তের কতক জ্ঞানও পরস্পর বিরোধী প্রতিভাত হয়ে থাকে। তারা এগুলোর সমন্বয় সাধনে ব্যর্থ হয়ে ধারণা করতে থাকে যে, শরীয়তই ত্রুটিপূর্ণ। অথচ এরূপ মনে হওয়ার কারণ হচ্ছে তাদের নিজেদের অক্ষমতা। উদাহরণতঃ জনৈক অন্ধ ব্যক্তি কারও গৃহে প্রবেশ করার পর ঘটনাক্রমে বাসনকোসনের উপর তার পা পড়ে গেল। এতে সে বলতে লাগলঃ এ গৃহের লোকেরা কেমন যে, পথের মধ্যে বাসনকোসন রেখে দেয়। এগুলো যথাস্থানে রাখল না কেন? জওয়াবে গৃহের লোকেরা বলল : মিয়া সাহেব, বাসনকোসন তো যথাস্থানেই রাখা আছে, কিন্তু অন্ধত্বের কারণে আপনিই পথের দিশা পাননি। আশ্চর্যের বিষয়, আপনি নিজের ত্রুটি দেখলেন না, অপরের দোষ ধরতে শুরু করেছেন!


হাঁ, যৌক্তিক জ্ঞান ও শরীয়তের জ্ঞান এদিক দিয়ে একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী, কেউ এগুলোর কোন একটিতে সর্বপ্রযত্নে মনোনিবেশ করলে অপরটি থেকে সে প্রায়শ গাফেল থেকে যায়। এ কারণেই হযরত আলী (রাঃ) দুনিয়া ও আখেরাতের তিনটি দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেছেন। এক উক্তিতে তিনি বলেন, দুনিয়া ও আখেরাত নিক্তির দু'পাল্লার মত। দ্বিতীয় উক্তি হচ্ছে, উভয়টি পূর্ব ও পশ্চিমের মত। তৃতীয় উক্তিতে বলেছেন- এরা দু'সতীনের মত। একটি রাজি হলে অপরটি নারাজ হয়ে যায়। এ কারণেই দেখা যায়, যারা দুনিয়ার বিষয়াদিতে খুব চালাক-চতুর হয়, তারা আখেরাতের ব্যাপারাদিতে মূর্খ থেকে যায়। পক্ষান্তরে যারা আখেরাতের সূক্ষ্ম বিষয়াদি সম্পর্কে পারদর্শী হয়, তারা প্রায়ই দুনিয়ার জ্ঞান সম্পর্কে অজ্ঞ হয়। কেননা, অধিকাংশ লোকের আকল-শক্তি উভয় বিষয় অর্জনে সক্ষম হয় না। একটি শিখলে অপরটিতে পূর্ণতা অর্জন করতে পারে না। এ কারণেই হাদীসে বলা হয়েছে- “অধিকাংশ জান্নাতী আত্মভোলা। অর্থাৎ দুনিয়ার বিষয় সম্পর্কে অচেতন।” হযরত হাসান বসরী (রহঃ) এক ওয়াযে বলেন : আমি এমন লোকদের সাক্ষাৎ লাভ করেছি, যাদেরকে তোমরা দেখলে পাগল বলতে এবং তারা তোমাদেরকে দেখলে শয়তান বলত। অতএব, কোন অভিনব ধর্মীয় বিষয়কে যদি যাহেরী আলেমগণ অস্বীকার করে, তবে তাদের ব্যাপারে সন্দেহ করা উচিত নয়; বরং বুঝা দরকার যে, কেউ পূর্ব দিকে গমন করে যেমন পশ্চিমের বস্তু পেতে পারে না, তাদের অস্বীকারও তেমনি। দুনিয়া ও আখেরাতের বিষয়ও এই পর্যায়ে পড়ে। আল্লাহ তা'আলা বলেন : 

“নিশ্চয় যারা আমার সাক্ষাৎ আশা করে না, পার্থিব জীবন নিয়ে সন্তুষ্ট থাকে এবং তা দ্বারাই প্রশান্তি লাভ করে এবং যারা আমার নিদর্শনাবলী থেকে গাফেল।”


আরও বলা হয়েছে - “তারা পার্থিব জীবনের বাহ্যিক দিকটা জানে এবং তারা আখেরাতের খবর রাখে না।”

অন্য এক আয়াতে আছে - “অতএব সেই ব্যক্তি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিন, যে আমার যিকিরের প্রতি বিমুখ হয়ে পার্থিব জীবনই কামনা করে। তাদের বিদ্যার দৌড় এ পর্যন্তই”।


মোট কথা, আল্লাহ তাআলা আপন কৃপায় যাদেরকে উভয় জাহানের জ্ঞান দান করেন, তারাই কেবল দুনিয়া ও আখেরাত সম্পর্কে পূর্ণ অন্তর্দৃষ্টি লাভ করতে পারেন এবং তারা হলেন আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম। তাদের অন্তরে সকল বিষয়ের সংকুলান হয়ে থাকে।


পরের পর্ব

এলহামের ক্ষেত্র সুফী ও আলেমের পার্থক্য

অন্তর বা হৃদয় (পর্ব- ৯) ইমানের স্থর সমুহ



অন্তর বা হৃদয় (পর্ব- ৯) 
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

ইমানের স্থর সমুহ —
ঈমানের তিনটি স্তর–  বলাবাহুল্য, এই দ্যুতি ও ঈমানের তিনটি স্তর রয়েছে। প্রথম স্তর সর্বসাধারণের ঈমান। নিছক অনুকরণের উপর এর ভিত্তি। দ্বিতীয় স্তর দার্শনিকদের ঈমান। এতে কিছু যুক্তি প্রমাণও থাকে, কিন্তু এটাও সর্বসাধারণের ঈমানের কাছাকাছি। তৃতীয় স্তর আরেফ তথা বিভুজ্ঞানীদের ঈমান, যা একীনের নূর থেকে অর্জিত হয়।
 
আমরা এ তিনটি স্তরকে একটি উদাহরণ দ্বারা বর্ণনা করছি। উদাহরণতঃ যায়েদ গৃহে আছে- এ কথা তিনভাবে জানা যায়। প্রথমতঃ কোন সত্যবাদী ব্যক্তির বর্ণনা, যার সত্যবাদিতা বার বার পরীক্ষিত হয়েছে এবং যার কথায় মিথ্যার অবকাশ নেই। এরূপ ব্যক্তির কথায় বিশ্বাস করা যাবে যে, যায়েদ নিঃসন্দেহে গৃহে আছে। এটা নিছক অনুকরণমূলক ঈমানের দৃষ্টান্ত। সাধারণ মানুষের অবস্থা তাই। তারা জ্ঞানবুদ্ধি বয়সে পৌঁছে পিতামাতার কাছে আল্লাহ্ তা'আলার অস্তিত্ব, জ্ঞান, কুদরত, ইচ্ছা ইত্যাদি সকল সেফাত, পয়গম্বরগণের আগমন এবং তাঁদের আনীত বিধি-বিধান সত্য হওয়ার কথা শুনে এবং তৎক্ষণাৎ বিশ্বাস স্থাপন করে। অতঃপর আজীবন এর উপরই কায়েম থাকে। এর বিরুদ্ধে অন্তরে কোন কল্পনা আসে না। কেননা, পিতামাতা ও গুরুজনদের প্রতি তারা সুধারণা পোষণ করে। এ ধরনের ঈমান পারলৌকিক মুক্তির কারণ হয়ে থাকে। এরূপ মুমিন ব্যক্তি কোরআনে বর্ণিত “আসহাবে ইয়ামীনের” সর্বনিম্ন স্তর। সে “মোকাররাব” তথা নৈকট্যপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত নয়। কেননা, নৈকট্যশীল হওয়ার জন্যে কাশফ এবং বক্ষ একীনের আলোকে আলোকিত হওয়া জরুরী, যা এ ধরনের ঈমানে অনুপস্থিত। এছাড়া এ'তেকাদ তথা  বিশ্বাসের ক্ষেত্রে কতক লোক কিংবা অনেক লোকের বর্ণিত খবরে ভ্রান্তিরও সম্ভাবনা থাকে। ইহুদী ও খৃস্টান (বা অন্যেন্য ধর্মাবলম্বি) দের অন্তরও তাদের পিতামাতার কথায় প্রশান্ত হয়, কিন্তু তারা যেসব আকীদা পোষণ করে, সেগুলো ভ্রান্ত । কেননা, তাদের অন্তরে ভ্রান্তিই নিক্ষিপ্ত হয়েছে। পক্ষান্তরে মুসলমানদের আকীদা সত্য।


দ্বিতীয়, প্রাচীরের আড়ালে দাঁড়িয়ে গৃহের ভিতর থেকে যায়েদের শব্দ শ্রবণ করা। এর মাধ্যমেও জানা যায় যে, যায়েদ গৃহে আছে। অপরের কাছে শুনে যে পরিমাণ বিশ্বাস হয়, নিজ কানে শব্দ শুনে তার চেয়ে বেশী বিশ্বাস হবে। কেননা, আওয়াজ শুনলে যার আওয়াজ, তার সমস্ত আকার-আকৃতি চিন্তায় উপস্থিত হয়ে যায় এবং অন্তরে বদ্ধমূল হয়, এই আওয়াজ অমুকের। এটা দ্বিতীয় প্রকার ঈমানের দৃষ্টান্ত, যার মধ্যে কিছু প্রমাণেরও মিশ্রণ আছে, কিন্তু ভ্রান্তির সম্ভাবনা এর মধ্যেও রয়েছে। কেননা, একজনের কণ্ঠস্বর অন্যজনের সাথে মিলেও যেতে পারে। কেউ কেউ আবার অন্যের কণ্ঠস্বর হুবহু নকল করতে পারে।


তৃতীয়, তুমি নিজে গৃহের ভিতরে গিয়ে যায়েদকে দেখে নেবে যে, সে গৃহে উপস্থিত আছে। এটা বিভুজ্ঞানী নৈকট্যশীল ও সিদ্দীকগণের ঈমান। একেই মারেফত ও মুশাহাদা বলা হয়। কারণ, তাদের ঈমান মুশাহাদা তথা প্রত্যক্ষকরণের পরে হয়ে থাকে। তবে এর মধ্যে সর্বসাধারণ ও দার্শনিকের ঈমানও শামিল এবং তাতে কেবল প্রত্যক্ষকরণের স্তরটি অতিরিক্ত, সে কারণে ভ্রান্তির সম্ভাবনা থাকে না। হাঁ, এর মধ্যে কাশফ ও জ্ঞানের পরিমাণে তফাৎ হয়। জ্ঞানের পরিমাণে তফাৎ এমন, যেন কোন ব্যক্তি গৃহের আঙ্গিনায় গিয়ে যায়েদকে খুব আলোর মধ্যে দেখে এবং অন্য ব্যক্তি কোন কক্ষে অথবা রাতের বেলায় দেখে। এখানে প্রথম ব্যক্তির দেখা অধিক কামেল হবে। এমনিভাবে প্রত্যক্ষকরণের ক্ষেত্রে কেউ সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম বিষয়গুলোও দেখে জেনে নেয় এবং কেউ এ থেকে বঞ্চিত থাকে। জ্ঞানার্জনের দিক দিয়ে এ হচ্ছে অন্তরের অবস্থা।



পরবর্তী পর্ব 

বিভিধ জ্ঞানে অন্তরের অবস্থা 

অন্তর বা হৃদয় (পর্ব- ৮) অন্তরে কতক জ্ঞান না আসার কারণ


অন্তর বা হৃদয় (পর্ব- ৮) 
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

অন্তরে কতক জ্ঞান না আসার কারণ-
প্রথম কারণ, স্বয়ং অন্তর ত্রুটিপূর্ণ হওয়া; যেমন শিশুদের অন্তর। এতে ত্রুটি ও অসম্পূর্ণতার কারণে জ্ঞাতব্য বিষয়সমূহ উদ্ভাসিত হয় না।

দ্বিতীয় কারণ, গোনাহ ও নাফরমানীর ময়লা, যা অধিক কামলিপ্সার কারণে অন্তরের উপর এসে জমা হয় এবং তার ঔজ্জ্বল্য ও স্বচ্ছতা বিনষ্ট করে দেয়। এই কালিমার কারণে অন্তরে সত্য বিষয়টি ফুটে উঠতে পারে না। এদিকে ইঙ্গিত করেই হাদীসে বলা হয়েছে, যেব্যক্তি কোন গোনাহ্ করে, বিবেক-বুদ্ধি তার কাছ থেকে পৃথক হয়ে যায় এবং কখনও তার কাছে ফিরে আসে না। অর্থাৎ, তার অন্তরে এমন কালিমা পড়ে যায়, যার প্রভাব কখনও দূরীভূত হয় না। কেননা, গোনাহের পরে পুণ্য কাজ করলেও তার কারণে সেই প্রভাব দূর হবে না, কিন্তু সে যদি গোনাহ্ না করত এবং পুণ্য কাজই করত, তবে নিঃসন্দেহে অন্তরে নূর বৃদ্ধি পেত। প্রথমে গোনাহ করার কারণে পুণ্য কাজের তেমন উপকার হয়নি। বরং গোনাহের পূর্বে অন্তর যেমন ছিল, তেমনি রয়ে গেল- নূর বৃদ্ধি পেল না। বাস্তবে এটা এমন ভয়ংকর ক্ষতি, যার কোন প্রতিকার নেই। দেখ, যে আয়নায় একবার মরিচা পড়ে যায়, এর পর তা ঘষে-মেজে পরিষ্কার করা হয়, তা সেই আয়নার সমান হয় না, যা মরিচা ছাড়াই পরিষ্কার রাখা হয়। মোট কথা, আল্লাহ তাআলার আনুগত্যের দিকে ধাবিত হওয়া এবং কামলিপ্সা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়া আন্তরিক স্বচ্ছতার কারণ হয়ে থাকে।

এ জন্যেই আল্লাহ্ তাআলা এরশাদ করেন :

“যারা আমাকে পাওয়ার জন্যে অধ্যবসায় করে, আমি অবশ্যই তাদেরকে আমার পথ প্রদর্শন করব।”

রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) বলেন : “যে ব্যক্তি তার জানা বিষয়ে আমল করে, আল্লাহ তাকে অজানা বিষয়ের এলেম দান করেন।”


তৃতীয় কারণ, প্রার্থিত স্বরূপের প্রতি বিমুখ হওয়া। উদাহরণতঃ এক ব্যক্তি আনুগত্যশীল ও সৎকর্মপরায়ণ, কিন্তু তার অন্তর সত্যান্বেষী নয়। বরং অধিকাংশ শারীরিক এবাদত কিংবা জীবিকা উপার্জনের ক্ষেত্রে আপন প্রচেষ্টা ব্যাপৃত রাখে। এরূপ ব্যক্তির অন্তর যদিও স্বচ্ছ হয়ে থাকে, কিন্তু তাতে সত্যের দ্যুতি বিদ্যমান থাকে না। এতে সেই বিষয়ই উদঘাটিত হয়, যার কল্পনায় সে মগ্ন থাকে। অতএব যেব্যক্তি আপন প্রচেষ্টাকে জাগতিক কামলিপ্সা ও তার আনন্দে ব্যাপৃত রাখে, তার সামনে সত্য বিষয় কিরূপে উদঘাটিত হতে পারে?


চতুর্থ কারণ “হিজাব” তথা আড়াল থাকা। উদাহরণতঃ কোন আনুগত্যশীল ব্যক্তি তার কামলিপ্সা দাবিয়ে রেখেছে। সে কোন সত্য উদ্ঘাটনের জন্য চিন্তা-ভাবনা করলে মাঝে মাঝে তার সামনে সত্য উদ্ঘাটিত হয় না। কেননা, সে পৈতৃক অনুকরণ কিংবা সুধারণার কারণে কোন একটি বিশ্বাস মনে পোষণ করে নেয়। এ বিশ্বাসটিই সত্য বিষয়ের মধ্যে ও তার অন্তরের মধ্যে আড়াল হয়ে যায়। সে শৈশবকাল থেকে যে বিশ্বাস নিয়ে বড় হয়, সেই বিশ্বাস অন্তরে কোন বিপরীত বিশ্বাস উদঘাটিত হওয়ার পথে বিরাট বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এটা নিঃসন্দেহে একটি বড় অন্তরায়, যার কারণে অধিকাংশ মুসলিম দার্শনিক ও বিভিন্ন মতের বিদ্বেষপরায়ণ ব্যক্তিবর্গ সত্যের আড়ালে রয়ে গেছেন। বরং অধিকাংশ সৎকর্মপরায়ণ ব্যক্তি, যাদের চিন্তা-ভাবনা যমীন ও আকাশের রাজ্যে বিচরণ করে, তারাও এই বালায় গ্রেফতার আছেন।


পঞ্চম কারণ, প্রার্থিত সত্যের দিক সম্পর্কে অজ্ঞতা। উদাহরণতঃ কোন বিদ্যার্থী যদি কোন অজানাকে জানতে চায়, তবে যে পর্যন্ত জানা তথ্যসমূহকে জ্ঞানীদের কাছে গ্রহণযোগ্য পদ্ধতিতে বিন্যস্ত না করবে, সেই পর্যন্ত প্রার্থিত ফল অর্জিত হবে না। কেননা, যেসকল জ্ঞান মজ্জাগত নয়, সেগুলো অন্যান্য জানা তথ্যসমূহের সাহায্য ব্যতিরেকে অর্জিত হতে পারে না। যেমন- নর ও মাদী ব্যতীত বাচ্চা আসতে পারে না। কেউ যদি ঘোটক শাবক লাভ করতে চায়, তবে তা উট ও গাধা থেকে অর্জিত হবে না; বরং এর জন্যে ঘোটক-ঘোটকী দরকার। অনুরূপভাবে প্রত্যেক জ্ঞানের জন্যে দু'টি বিশেষ মূল ও একটি বিন্যাস পদ্ধতি প্রয়োজন। এতে প্রার্থিত জ্ঞান অর্জিত হবে। সুতরাং এসব মূল বিষয় ও বিন্যাস পদ্ধতি সম্পর্কে অজ্ঞতা সত্যোপলব্ধির ক্ষেত্রে অন্তরায় হয়ে থাকে; যেমন আয়নায় সঠিক দিক না জানার কারণে চিত্র প্রতিফলিত হয় না। এ বিষয়ের একটি সুস্পষ্ট দৃষ্টান্ত হল, কোন ব্যক্তি যদি আয়নায় তার পৃষ্ঠদেশ দেখতে চায়, তবে আয়না মুখের সামনে রাখলে পৃষ্ঠদেশ দেখা যাবে না। কেননা, আয়না পিঠের বিপরীতে নয়। আয়না পিঠের বিপরীতে রাখলেও পিঠ দৃষ্টিগোচর হবে না; বরং স্বয়ং আয়নাও দেখা যাবে না। কেননা, আয়না তার দৃষ্টি থেকে উধাও হয়ে যাবে। এমতাবস্থায় পিঠ দেখতে হলে আরও একটি আয়নার প্রয়োজন হবে। একটি পিঠের বিপরীতে রাখবে এবং অপরটি চোখের সামনে এমনভাবে রাখবে যে, উভয় আয়না একটি অপরটির বিপরীতে থাকে। এমতাবস্থায় এই ব্যক্তি নিজের পৃষ্ঠদেশ দেখতে পারে। কেননা, তার পিঠের প্রতিচ্ছবি পেছনের আয়নায় পড়বে এবং তার প্রতিচ্ছবি সামনে রক্ষিত অপর আয়নায় পড়বে। এমনিভাবে জ্ঞানার্জনের ক্ষেত্রে এই দৃষ্টান্তের চেয়েও অধিক বিচিত্র ধরনের কর্মকাণ্ডের আশ্রয় নিতে হয়। ভূপৃষ্ঠে এমন কেউ নেই, যার এসব কর্মকাণ্ড আপনা আপনি জানা হয়ে যায়। এটাই অন্তরের জন্যে সত্যোপলব্ধিতে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। প্রত্যেক অন্তরেরই মজ্জাগতভাবে সত্য অনুধাবনের যোগ্যতা নেই। কেননা, এ যোগ্যতা একটি খোদায়ী বৈশিষ্ট্য এবং এই বৈশিষ্ট্যের কারণেই অন্তরাত্মা সকল সৃষ্টি থেকে ভিন্ন ও সেরা। আল্লাহ্ তাআলা কোরআন পাকে এ বিষয়টিই এরশাদ করেছেন

“আমি আমানতটি পেশ করেছি আকাশমণ্ডলীর সামনে, পৃথিবীর সামনে এবং পর্বতমালার সামনে। অতঃপর কেউ তা বহন করতে স্বীকৃত হল না। তারা ভীত হয়ে গেল, কিন্তু মানুষ তা বহন করেছে।”

অর্থাৎ, মানুষ একটি বৈশিষ্ট্যের কারণে আকাশমণ্ডলী, পৃথিবী ও পর্বতমালা থেকে স্বাতন্ত্র্য লাভ করছে এবং খোদায়ী আমানত বহন করার যোগ্য সাব্যস্ত হয়েছে। 

এই আমানত হচ্ছে অধ্যাত্ম জ্ঞান তথা মারেফত ও তাওহীদ। প্রত্যেক মানুষের অন্তর এই আমানত বহন করার যোগ্য, কিন্তু আমরা যেসকল কারণ বর্ণনা করেছি সেগুলোর ফলস্বরূপ অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে পারে না । এ জন্যেই নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করেন

-প্রত্যেক নবজাত শিশু ‘ফিতরত” তথা মূল ইসলামের উপর জন্মগ্রহণ করে। এর পর তার পিতামাতা তাকে ইহুদী এবং খৃস্টান বানিয়ে দেয়।


অন্য এক হাদীসে বলা হয়েছে : -যদি আদম সন্তানের অন্তরের চারপাশে শয়তানরা ঘুরাফেরা না করত, তবে সে আকাশের ফেরেশতা ও রহস্যাবলী অবলোকন করত।' এতে কতক কারণ বর্ণিত হয়েছে, যেগুলো অন্তর ও ঊর্ধ্ব জগতের মধ্যে আড়াল হয়ে থাকে। হযরত ইবনে ওমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-এর এই উক্তির মধ্যেও এদিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে। 

একবার লোকেরা জিজ্ঞেস করল : ইয়া রসূলাল্লাহ্! (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) আল্লাহ্ তা'আলা কোথায় আছেন- পৃথিবীতে, না আকাশে? 

তিনি বললেন : আল্লাহ্ ঈমানদার বান্দাদের অন্তরে আছেন। 

এক হাদীসে কুদসীতে বলা হয়েছে- পৃথিবীতে আমার সংকুলান হয় না আকাশেও না। আমার সংকুলান আমার মুমিন বান্দার অন্তরে হয়, যে অন্তর নরম ও স্থির। এ কারণেই হযরত ওমর (রাঃ) বলেন : আমার অন্তর আল্লাহকে যখন দেখেছে, তখনই তাকওয়ার কারণে নূর আড়াল হয়ে গেছে। যার সামনে থেকে আড়াল দূর হয়ে যায়, তার অন্তরে ঊর্ধ্ব জগতের চিত্র ফুটে উঠে। সকল এবাদত ও দৈহিক ক্রিয়াকর্মের উদ্দেশ্য হচ্ছে অন্তর পরিষ্কার ও স্বচ্ছ হওয়া। আর স্বচ্ছতার লক্ষ্য হচ্ছে অন্তরে খোদায়ী মারেফতের দ্যুতি এসে যাওয়া। মারেফতের এই দ্যুতিই নিম্নোক্ত আয়াতে বুঝানো হয়েছে : “আল্লাহ্ তা'আলা ইসলামের জন্যে যার বক্ষ উন্মুক্ত করে দেন, সে তার পরওয়ারদেগারের পক্ষ হতে একটি নূরের উপর থাকে। 



পরের পর্ব -

ইমানের স্থর সমুহ 


অন্তর বা হৃদয় (পর্ব- ৭) জ্ঞানার্জনের দিক দিয়ে অন্তরের দৃষ্টান্ত - ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)



অন্তর বা হৃদয় (পর্ব- ৭) 
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

জ্ঞানার্জনের দিক দিয়ে অন্তরের দৃষ্টান্ত
প্রকাশ থাকে যে, জ্ঞানের পাত্র হচ্ছে অন্তর। অর্থাৎ, যে সূক্ষ্ম বস্তু সমগ্র দেহের নিয়ন্ত্রণ করে এবং সমগ্র দেহ যার আনুগত্য ও সেবা করে। জ্ঞাতব্য বিষয়সমূহের জন্যে এই অন্তর এমন, যেমন ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তুসমূহের জন্যে আয়না। অর্থাৎ, বস্তুসমূহের চিত্র যেমন আয়নার মধ্যে চিত্রিত হয়ে বিদ্যমান থাকে, তেমনি প্রত্যেক জানা বিষয়ের চিত্র অন্তর আয়নায় প্রতিফলিত হয়ে স্পষ্টরূপ ধারণ করে। এক্ষেত্রে আয়না, বস্তুর চিত্র এবং আয়নায় তা প্রতিফলিত হওয়া যেমন ভিন্ন ভিন্ন বিষয়, তেমনি অন্তরের মধ্যেও তিনটি বস্তু ভিন্ন ভিন্ন। এক, অন্তর; দুই, বস্তুসমূহের স্বরূপ এবং তিন, স্বরূপসমূহের চিত্র জানা, যা অন্তরে উপস্থিত হয়। এর আর একটি দৃষ্টান্ত হচ্ছে, ধরার জন্যে তিনটি বিষয় জরুরী। ধারণকারী, যেমন হাত; যাকে ধারণ করা হয়, যেমন তরবারি এবং হাত ও তরবারির মিলন, যাকে ধরা বলা হয়। এমনিভাবে জানা বিষয়ের চিত্র অন্তরে পৌঁছলে তাকে এলেম তথা জ্ঞান বলা হয়। মাঝে মাঝে বস্তুর স্বরূপ বিদ্যমান থাকে এবং অন্তরও বিদ্যমান থাকে, কিন্তু জ্ঞান হয় না। কেননা, জ্ঞান বলা হয় বস্তুর স্বরূপ অন্তরে পৌঁছে যাওয়াকে। উদাহরণতঃ তরবারিও বিদ্যমান এবং হাতও উপস্থিত, কিন্তু তরবারি হাতে না পৌছা পর্যন্ত ‘ধরা’ বলা হবে না। পার্থক্য হচ্ছে, ধরার মধ্যে হুবহু তরবারি হাতে পৌঁছে যায়, কিন্তু জানা বস্তু হুবহু অন্তরে চলে যায় না; বরং তার স্বরূপ চলে যায়। উদাহরণতঃ কেউ অগ্নিকে জেনে নিলে স্বয়ং অগ্নি তার মধ্যে যাবে না; বরং বাহ্যিক আকৃতির দিক দিয়ে অগ্নির যে স্বরূপ, তা অন্তরে যায়। এদিক দিয়ে অন্তরকে আয়নার সাথে তুলনা করাই উত্তম। কেননা, আয়নার মধ্যেও স্বয়ং বস্তু চলে যায় না; বরং বস্তুর অনুরূপ একটি চিত্র প্রতিফলিত হয়।
অন্তরকে আয়নার সাথে তুলনা করার একটি বড় কারণ হল, আয়নার মধ্যে পাঁচটি কারণে চিত্র জানা যায় না। প্রথম, আয়নাই ভাল না হওয়া এবং তার মধ্যে ত্রুটি থাকা। দ্বিতীয়, আয়নার মধ্যে অন্য কোন কারণে ময়লা জমে থাকা। তৃতীয়, যে বস্তু আয়নার মধ্যে প্রতিফলিত হবে, তা সম্মুখে না থাকা কিংবা উদাহরণতঃ পেছনে থাকা। চতুর্থ, বস্তু ও আয়নার মাঝখানে আড়াল থাকা। পঞ্চম, যে বস্তুর চিত্র আয়নায় দেখতে হবে, তার সঠিক দিক জানা না থাকা। ফলে আয়না ঠিক জায়গায় রাখা যায় না। অনুরূপভাবে অন্তর আয়নার মধ্যেও সকল ক্ষেত্রে সত্য বিষয়টি উদ্ভাসিত হতে পারে, কিন্তু অন্তরে কতক জ্ঞান না আসার কারণ সেই পাঁচটি, যার কিঞ্চিত বিবরণ নিম্নে লিপিবদ্ধ করা হচ্ছে।

রবিবার, ২৫ জুন, ২০২৩

জিহ্বার বিপদাপদ - (পর্ব - ১৫) ইঙ্গিতেও মিথ্যা বলা ঠিক নয়



জিহ্বার বিপদাপদ - পর্ব - ১৫
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

ইঙ্গিতেও মিথ্যা বলা ঠিক নয়
পূর্ববর্তীদের উক্তি হচ্ছে, ইঙ্গিতে মিথ্যা বললে তা মিথ্যা হয় না। হযরত ওমর (রাঃ) বলেন : যদি কেউ ইঙ্গিতে কিছু মিথ্যা বলে তবে সে মিথ্যা থেকে বেঁচে যায়, কিন্তু তাঁদের উদ্দেশ্য, যখন কেউ মিথ্যা কথা বলার জন্যে বাধ্য হয়, তখন যেন ইঙ্গিতে বলে দেয়। নতুবা বিনা বাধ্যবাধকতায় মিথ্যা বলা প্রকাশ্যেও জায়েয নয়- ইঙ্গিতেও নয়। ইঙ্গিতে মিথ্যা বলা হচ্ছে এমন দ্ব্যর্থবোধক শব্দ বলা, যার এক অর্থ বক্তার উদ্দেশ্য হয় এবং অন্য অর্থ শ্রোতা বুঝে। উদাহরণতঃ হযরত মুয়ায ইবনে জাবাল (রাঃ) হযরত ওমর (রাঃ)-এর খেলাফতকালে এক জায়গার গভর্নর ছিলেন। সেখান থেকে ফিরে এলে তাঁর পত্নী তাঁকে বলল : অন্য গভর্নররা যেমন গৃহে এলে কিছু নিয়ে আসে, তুমিও কিছু এনেছ কি না? তিনি জওয়াব দিলেন : না। কারণ আমার সাথে একজন গুপ্তচর নিযুক্ত ছিল। এ কথা দ্বারা তাঁর উদ্দেশ্য ছিল আল্লাহ্ তাআলা, কিন্তু তাঁর পত্নী বুঝলেন, সম্ভবতঃ হযরত ওমর তাঁর পেছনে কোন গুপ্তচর প্রেরণ করেছিলেন। তাই বললেন : সোবহানাল্লাহ্! তুমি রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম)-এর কাছে বিশ্বস্ত ছিলে। হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ)-এর কাছে বিশ্বস্ত ছিলে। আর হযরত ওমর (রাঃ) কি না তোমার পেছনে গুপ্তচর নিযুক্ত করলেন। মহিলাদের মধ্যে এ বিষয়টির খুব চর্চা হল। অবশেষে হযরত ওমরের কাছেও অভিযোগ পৌঁছল। তিনি হযরত মুয়াযকে ডেকে এনে জিজ্ঞেস করলেন : আমি কবে তোমার পেছনে গুপ্তচর প্রেরণ করেছিলাম? তিনি বললেন : আমি একথা তো বলিনি যে, আপনি গুপ্তচর পাঠিয়েছিলেন। আমি কেবল বলেছিলাম, আমার সাথে গুপ্তচর ছিল। পত্নীর আবদারের সামনে এছাড়া আমার কোন ওযর ছিল না। হযরত ওমর (রাঃ) হাসলেন এবং তাকে কিছু অর্থকড়ি দিয়ে বললেন নাও, এ দিয়ে পত্নীকে খুশী কর।
মোটকথা, প্রয়োজনের সময় ইঙ্গিতে মিথ্যা বলা যায়। বিনা প্রয়োজনে এটা করা উচিত নয়। কেননা, এটা একটা কৌশল। এতে প্রতিপক্ষ বাস্তবের বিপরীত বুঝে। সুতরাং মাকরূহ। আবদুল্লাহ্ ইবনে ওতবা বলেন ঃ আমি আমার পিতার সাথে হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজীজের খেদমতে গেলাম। তখন আমার পরনে ছিল উৎকৃষ্ট দামী পোশাক। যখন সেখান থেকে বের হলাম তখন আমার উৎকৃষ্ট পোশাক দেখে লোকেরা বলল : আমীরুল মুমিনীন তোমাকে এই পোশাক দিয়েছেন? আমি বললাম : আল্লাহ্ তাআলা তাঁকে উত্তম প্রতিদান দিন। এতে আমার পিতা আমাকে শাঁসিয়ে বললেন : খবরদার, মিথ্যা কথা বলো না। আবদুল্লাহর এ বাক্যটি মিথ্যা ছিল না, কিন্তু সাধারণত শাসনকর্তার জন্যে ওয়াদা কোন পুরস্কারের বিনিময়ে হয়ে থাকে বিধায় লোকেরা এ থেকে এটাই বুঝে থাকবে যে, খলীফা দান করেছেন। এতে যেন একটি মিথ্যা ভিত্তিহীন কথার উপর তাদেরকে প্রতিষ্ঠিত করা হয়। তাই তিনি এ দোয়া করতে নিষেধ করলেন।
আর একটি মিথ্যা আছে, যদ্দ্বারা কেউ ফাসেক হয় না। তা হচ্ছে, অভ্যাসগতভাবে অতিরঞ্জিত বলা; যেমন কেউ বলে, তোমাকে এটা করতে একশ' বার নিষেধ করেছি। এতে সংখ্যা বুঝানো উদ্দেশ্য হয় না; বরং অতিরঞ্জন সহকারে আধিক্য বুঝানো উদ্দেশ্য, কিন্তু যে জিহ্বা অতিরিক্ত কথা বলতে অভ্যস্ত হয়ে যায়, সে মিথ্যার আশংকা থেকে মুক্ত হয় না।
আর একটি মিথ্যার অভ্যাস মানুষের মধ্যে প্রচলিত আছে। তা হচ্ছে, যখন কাউকে বলা হয়- এস, খানা খাও। তখন সে জওয়াব দেয়, আমার ক্ষুধা নেই। কোন বিশুদ্ধ উদ্দেশ্য এর সাথে জড়িত না থাকলে এটাও মিথ্যা ও হারাম। আসমা বিনতে ওমায়েস বর্ণনা করেন : হযরত আয়েশার (রাঃ) বাসর রাত্রিতে আমি তাঁর কাছে উপস্থিত ছিলাম এবং আমিই তাকে সাজিয়ে ছিলাম। আমার সাথে আরও কয়েকজন মহিলা ছিল। আমরা যখন হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে হুযুরের কাছে নিয়ে গেলাম তখন তার গৃহে এক পেয়ালা দুধ ছাড়া কিছুই ছিল না। তা থেকে কিছু তিনি নিজে পান করলেন এবং বাকীটুকু হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে দিলেন। লজ্জায় তিনি হাত বাড়ালেননা। আমি বললাম : রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম)-এর হাত সরিয়ে দিয়ো না, নিয়ে নাও। তিনি লজ্জাভরেই তা নিলেন এবং পান করলেন। অতঃপর রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম) বললেন : তোমার সঙ্গিনীদেরকে দিয়ে দাও। মহিলারা আরজ করল : আমাদের ক্ষুধা নেই। রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম) বললেন : পেটে ক্ষুধা ও মিথ্যা একত্র করো না। আমি আরজ করলাম : ইয়া রসূলাল্লাহ! যদি কোন বস্তু আমাদের মনে চায় এবং আমরা বলে দেই, ক্ষুধা নেই, তবে এটাও কি মিথ্যার মধ্যে দাখিল? তিনি বললেন : মিথ্যা মিথ্যাই লেখা হয়। অল্প হলে অল্পই লেখা হয়।


চলবে

জিহ্বার বিপদাপদ - (পর্ব - ১৪) যে যে স্থানে মিথ্যা বলা জায়েয



জিহ্বার বিপদাপদ - (পর্ব - ১৪)

📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

যে যে স্থানে মিথ্যা বলা জায়েয
প্রকাশ থাকে যে, মিথ্যা সত্তাগতভাবে হারাম নয়; বরং এদিক দিয়ে হারাম যে, এর দ্বারা অন্যের ক্ষতি সাধিত হয়। এ ক্ষতির সর্বনিম্ন স্তর হচ্ছে আসল সত্য সম্পর্কে মূর্খ থাকা। সুতরাং যদি কোথাও আসল সত্য সম্পর্কে মূর্খ থাকার মধ্যে উপকারিতা থাকে, তবে মিথ্যা বলার অনুমতি হওয়া উচিত; বরং কোন কোন ক্ষেত্রে মিথ্যা বলা ওয়াজিব হওয়া দরকার। মায়মুন ইবনে মেহরান বলেন : মিথ্যা কোন কোন ক্ষেত্রে সত্যের চেয়ে উত্তম হয়ে থাকে। উদাহরণতঃ যদি কোন ব্যক্তি পলায়ন করে তোমার মাধ্যমে এক গৃহে আত্মগোপন করে এবং অন্য এক ব্যক্তি তরবারি নিয়ে তাকে অন্যায়ভাবে হত্যা করার জন্যে খোঁজাখুঁজি করতে থাকে, সে তোমাকে জিজ্ঞেস করে, অমুক ব্যক্তি কোথায়? তবে এ ক্ষেত্রে মিথ্যা বলা ওয়াজিব।

সারকথা, যেখানে একটি উৎকৃষ্ট লক্ষ্য মিথ্যা ও সত্য উভয়টি দ্বারা অর্জিত হতে পারে, সেখানে মিথ্যা বলা হারাম। আর যদি কেবল মিথ্যা দ্বারাই সেই লক্ষ্য অর্জিত হতে পারে, তবে লক্ষ্য বৈধ হলে মিথ্যা বলা ও বৈধ এবং লক্ষ্য ওয়াজিব হলে মিথ্যা বলাও ওয়াজিব; যেমন বর্ণিত উদাহরণ দ্বারা বুঝা যায়। যেখানে পরস্পরের মধ্যে শান্তি স্থাপন মিথ্যা ছাড়া সম্ভবপর হয় না, সেখানে মিথ্যা বলা বৈধ; কিন্তু যথাসম্ভব বৈধ মিথ্যা থেকেও বেঁচে থাকতে হবে। কেননা, মিথ্যার অভ্যাস হয়ে গেলে অনাবশ্যক মিথ্যাও মুখে উচ্চারিত হওয়ার অথবা প্রয়োজনের বেশী মিথ্যা বলে ফেলার আশংকা থাকে। এ থেকে জানা গেল, মিথ্যা আসলে হারাম,
কিন্তু প্রয়োজনে জায়েয হতে পারে। হযরত উম্মে কুলসুম (রাঃ) বর্ণনা করেন, আমি কখনও শুনিনি যে, রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম) তিনটি জায়গা ছাড়া কোথাও মিথ্যার অনুমতি দিয়েছেন। (১) দু'ব্যক্তির মধ্যে সন্ধি স্থাপনে, (২) যুদ্ধক্ষেত্রে এবং (৩) স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মনোমালিন্য দূর করার ক্ষেত্রে। রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম) বলেন- “যে দু'ব্যক্তির মধ্যে সন্ধি স্থাপনে ভাল কথা বলে এবং ভাল বর্ণনা করে, সে মিথ্যাবাদী নয়”।
হযরত আবু কাহেল (রঃ) বর্ণনা করেন : দু'জন সাহাবীর মধ্যে কথা কাটাকাটি হল। অবশেষে তারা খুন খারাবী করতে প্রস্তত হয়ে গেল। আমার সাথে তাদের একজনের দেখা হলে আমি তাকে বললাম : তুমি অমুক ব্যক্তির সাথে লড়তে চাও কেন? সে তো তোমার প্রশংসা করছিল। এরপর অপরজনের সাথেও সাক্ষাৎ করে এ কথাই বললাম। অবশেষে তাদের মধ্যে সন্ধি হয়ে গেল। এরপর আমি ভাবতে লাগলাম, তাদের মধ্যে সন্ধি তো হয়ে গেছে, কিন্তু মিথ্যা বলার কারণে আমার কি দশা হবে? তাই রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম)-এর খেদমতে উপস্থিত হয়ে ঘটনা বর্ণনা করলাম। তিনি বললেন : হে আবু কাহেল! পরস্পরের মধ্যে শান্তি স্থাপন করা দরকার, যদিও মিথ্যা বলেই হয়।
আতা ইবনে ইয়াসার বলেন : এক ব্যক্তি রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম)-এর কাছে জিজ্ঞেস করল : আমার স্ত্রীর সাথে মিথ্যা বলব? তিনি বললেন : মিথ্যার মধ্যে কল্যাণ নেই। সে আরজ করল : আমি তার সাথে ওয়াদা করব? তিনি বললেন : এতে দোষ নেই। মিথ্যা বলার ব্যাপারে উপরোক্ত তিনটি স্থানের ব্যতিক্রম হাদীস দ্বারা জানা গেল। যদি আরও কোন স্থান এমন হয়, যেখানে বিশুদ্ধ লক্ষ্য সামনে রেখে মিথ্যা বলা হয়, তবে সেই স্থানও এতে দাখিল হবে। উদাহরণ : কোন ডাকাত ও জালেম যদি কাউকে পাকড়াও করে জিজ্ঞেস করে : বল, তোর ধনসম্পদ কোথায়? তবে ধন-সম্পদ নেই বলা তার জন্যে জায়েয।

জিহ্বার বিপদাপদ - (পর্ব - ১৩) মিথ্যা বলা এবং মিথ্যা কসম খাওয়া

জিহ্বার বিপদাপদ - (পর্ব - ১৩)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

মিথ্যা বলা এবং মিথ্যা কসম খাওয়া—
এটা জঘন্য অপরাধ ও মহাপাপ। ইসমাঈল ইবনে ওয়াসেতা বলেন : রসূলল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম)-এর ওফাতের পর আমি হযরত আবু বকর (রাঃ)-কে খোতবায় এ কথা বলতে শুনলাম- আমি যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, হিজরতের প্রথম বছরে রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম) এখানে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন - এতটুকু বলেই হযরত আবু বকর (রাঃ) কাঁদতে লাগলেন। এরপর কান্না থামিয়ে এই হাদীস বর্ণনা করলেন–

“তোমরা মিথ্যা থেকে বেঁচে থাক। মিথ্যা পাপাচারের সঙ্গী, তাদের উভয়ের স্থান জাহান্নাম। তোমরা সততা আঁকড়ে থাক। সততা পুণ্য কাজের সঙ্গী। তারা উভয়েই জান্নাতে স্থান পাবে”।
এক হাদীসে রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম) বলেন : ব্যবসায়ীরা পাপাচারী হয়ে থাকে। সাহারায়ে কেরাম আরজ করলেন : হুযুর, আল্লাহ্ তাআলা ক্রয়-বিক্রয় হালাল এবং সুদকে হারাম করেছেন। অতএব ব্যবসায়ীদের পাপাচারী হওয়ার কারণ কি? তিনি বললেন : কারণ, তারা কসম খেয়ে খেয়ে গোহাহগার হয় এবং কিছু বললে মিথ্যা বলে। তিনি আরও বলেন : তিন ব্যক্তির সাথে আল্লাহ তাআলা কেয়ামতের দিন কথা বলবেন না এবং তাদের প্রতি কৃপাদৃষ্টি দেবেন না। প্রথম, যে ব্যক্তি কাউকে কিছু দান করে অনুগ্রহ প্রকাশ করে। দ্বিতীয়, যে মিথ্যা কসম খেয়ে খেয়ে পণ্য বিক্রি করে। তৃতীয়, যে গিঁটের নীচে পর্যন্ত পায়জামা পরিধান করে।
হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন : সাহাবায়ে কেরামের কাছে মিথ্যার চেয়ে অধিক কোন বদভ্যাস অপ্রিয় ছিল না। রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম) যখন কোন সাহাবীর মিথ্যা জেনে নিতেন, তখন সে ব্যক্তির নতুনভাবে আল্লাহর সামনে তওবা না করা পর্যন্ত তিনি তার প্রতি মন থেকে মলিনতা দূর করতে পারতেন না। হযরত মূসা (আঃ) আল্লাহ্ তাআলার দরবারে আরজ করলেন : তোমার বান্দাদের মধ্যে আমলের দিক দিয়ে কে ভাল? এরশাদ হল : যার জিহ্বা মিথ্যা বলে না, অন্তর পাপাচারে লিপ্ত হয় না এবং লজ্জাস্থান যিনা করে না। হযরত লোকমান আপন পুত্রকে বললেন : মিথ্যা বলো না, যদিও তা পাখীর মাংসের মত সুস্বাদু মনে হয়। হযরত ওমর (রাঃ) বলেন : আমার সাথে সাক্ষাৎ না হওয়া পর্যন্ত তোমাদের মধ্যে সে ব্যক্তি উত্তম মনে হয় যার নাম উত্তম। যখন সাক্ষাৎ হয়ে যায়, তখন সে ব্যক্তি ভাল মনে হয়, যার অভ্যাস ভাল। লেনদেন করার পর সে ব্যক্তি ভাল মনে হয়, যে কথায় সাচ্চা এবং ওয়াদায় পাক্কা। খালেদ ইবনে সবীকে কেউ জিজ্ঞেস করল ; একবার মিথ্যা বললেও কি কাউকে মিথ্যাবাদী বলা হবে? তিনি বললেন : অবশ্যই।

পরবর্তী পর্ব
যে যে স্থানে মিথ্যা বলা জায়েয


জিহ্বার বিপদাপদ - (পর্ব - ১২) মিথ্যা ওয়াদা



জিহ্বার বিপদাপদ - পর্ব - ১২
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

মিথ্যা ওয়াদা
ওয়াদা করার ক্ষেত্রে জিহ্বা অগ্রে থাকে, কিন্তু তা পূর্ণ করা মনের জন্যে অপ্রিয় হয়ে থাকে। ফলে ওয়াদা মিথ্যা কথায় পর্যবসিত হয়। এটা মোনাফেকীর আলামত। আল্লাহ্ তাআলা বলেন : “মুমিনগণ! তোমরা অঙ্গীকার পূর্ণ কর”।
রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম) বলেন : ওয়াদা করা দানের মধ্যে গণ্য। তিনি আরও বলেন : ওয়াদাও এক প্রকার কর্জ। আল্লাহ পাক নবী হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর প্রশংসায় বলেন : -সে ছিল ওয়াদায় সাচ্চা। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমরের মৃত্যু আসন্ন হলে তিনি বললেন : জনৈক কোরায়শী ব্যক্তি আমার কাছে আমার কন্যা বিবাহ চেয়েছিল। আমি কিছুটা দোদুল্যমান ওয়াদা করেছিলাম। আল্লাহর কসম, আমি তাঁর কাছে এক তৃতীয়াংশ মোনাফেকী নিয়ে যাব না। তোমরা সাক্ষী থাক, আমি সে ব্যক্তিকেই কন্যা দান করলাম। আবদুল্লাহ ইবনে আবুল হাসান রেওয়ায়াত করেন, আমি নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম)-এর সাথে নবুওয়তের পূর্বে একটি লেনদেন করেছিলাম। তাঁর কিছু প্রাপ্য আমার কাছে বাকী ছিল। আমি আরজ করলাম : এক্ষুণি এনে দিচ্ছি। আপনি এখানে অপেক্ষা করুন, কিন্তু আমি সেদিন এবং পরের দিন সম্পূর্ণ ভুলে রইলাম। তৃতীয় দিন এসে তাঁকে সেই জায়গাতেই পেলাম। তিনি বললেন : মিয়া, তুমি বড় বিপদে ফেলে দিলে। এখানে তিন দিন ধরে তোমার অপেক্ষা করছি।
ইবরাহীম ইবনে আদহামকে কেউ জিজ্ঞেস করল : যদি কেউ আসার ওয়াদা করে যায় এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ফিরে না আসে, তবে তার জন্যে কতক্ষণ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে? তিনি বললেন, পরবর্তী নামাযের সময় আসা পর্যন্ত। হযরত ইবনে মসউদ (রাঃ) প্রত্যেক ওয়াদার সাথে “ইনশাআল্লাহ্” বলতেন। এতে ওয়াদা পূর্ণ করা না হলেও কোন দোষ থাকে না। এর সাথে পাকাপোক্ত ইচ্ছা থাকলে তা পূর্ণ করা উচিত। যদি কেউ ওয়াদা করার সময়ই পাকা ইচ্ছা রাখে যে, পূর্ণ করবে না, তবে এরই নাম ‘নেফাক'।
হযরত আবু হোরায়রা (রাঃ)-এর রেওয়ায়াতে রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম) বলেন : যে ব্যক্তির মধ্যে তিনটি অভ্যাস পাওয়া যাবে, সে পাকা মোনাফেক, যদিও সে নামায রোযা আদায় করে এবং মুসলমান বলে দাবী করতে থাকে। অভ্যাস তিনটি হল (১) কথা বললে মিথ্যা বলা (২) ওয়াদা করলে তা পূর্ণ না করা এবং (৩) আমানত রাখা হলে তাতে খেয়ানত করা। এটা তারই অবস্থা, যে ওয়াদা করার সময় পূর্ণ করার নিয়ত রাখে না, অথবা ওযর ছাড়াই ওয়াদার খেলাফ করে, কিন্তু যে ওয়াদা করার সময় পূর্ণ করার ইচ্ছা রাখে, অতঃপর কোন ওঘরের কারণে পূর্ণ না করে, সে মোনাফেক হবে না। রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম) আবুল হায়সামকে একটি গোলাম দেয়ার ওয়াদা করেছিলেন। এরপর গনীমতের মালে তিনটি গোলাম আসে। দুটি গোলাম বন্টন করে দেয়া হল। একটি রয়ে গেল। আদরের দুহিতা হযরত ফাতেমা (রাঃ) এসে বললেন : দেখুন, যাঁতাকল চালাতে চালাতে আমার হাতে ফোস্কা পড়ে গেছে। এ গোলামটি আমাকে দান করুন, কিন্তু আবুল হায়সামের সাথে কৃত ওয়াদা রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম)-এর মনে পড়ে গেল। তিনি কন্যাকে বললেন : তোমাকে গোলাম দিয়ে দিলে আমার ওয়াদা বিপন্ন হবে। এরপর তিনি গোলামটি আবুল হায়সামকেই দান করেন।

পরবর্তী পর্ব-
মিথ্যা বলা এবং মিথ্যা কসম খাওয়া

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...