📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ১১)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
মৃত্যুস্থানের বিবরণ-
অনন্ত দয়াময় আল্লাহ তা'আলা 'মালাকুল আরহাম' নামক এক শ্রেণীর ফেরেশতা সৃষ্টি করিয়াছেন। তাহারা শিশু মাতৃগর্ভে থাকা অবস্থায় তাহার মৃত্যুস্থানের মাটি বীর্যের সহিত মিশ্রিত করিয়া দেন। জন্ম-লাভের পর বান্দা পৃথিবীর যেখানে সেখানে পরিভ্রমণ করে; কিন্তু মৃত্যুর পূর্বক্ষণে সে বীর্যের সহিত মিশ্রিত মাটির জায়গায় আসিয়া হাজির হয়। তখন সেখানে তাহার রূহ কবজ করা হয়। আল্লাহ তা'আলার বাণীই ইহার জ্বলন্ত প্রমাণ। আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করিয়াছেন "হে নবী! আপনি বলিয়া দিন, যদি তোমরা তোমাদের গৃহেও অবস্থান করিতে, তথাপি যাহার যেখানে মৃত্যু লেখা আছে, তাহাকে অবশ্যই সেই মৃত্যুস্থানে পৌঁছিতে হইবে।"
হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে, প্রাচীনকালে হযরত মালাকুল মউত পয়গাম্বরদের সহিত সাক্ষাত করিতে আসিতেন। একদিন তিনি হযরত দাউদ (আঃ) এর পুত্র হযরত সুলাইমান (আঃ) এর সহিত সাক্ষাত করিতে আসিলেন। তথায় তিনি একজন সুশ্রী যুবকের প্রতি তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করিলেন। ফলে উক্ত যুবক ভীত ও কম্পিত হইয়া পড়িল। মালাকুল মউতের প্রস্থানের পর যুবকটি হযরত সুলাইমান (আঃ) এর নিকট আরজ করিল, "হে আল্লাহর রাসূল! আশা করি বায়ু আপনার হুকুমে এখনই আমাকে চীনদেশে পৌঁছাইয়া দিবে।" অতঃপর হযরত সুলাইমান (আঃ) এর নির্দেশে বায়ু সে যুবকটিকে তখনই চীনদেশে পৌঁছাইয়া দিল। পুনরায় মালাকুল মউত সুলাইমান (আঃ) এর দরবারে উপস্থিত হইলে তিনি তাহাকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিপাতের কারণ জিজ্ঞাসা করিলেন। উত্তরে মালাকুল মউত বলিলেন, "আমি সেইদিনই তাহার রূহ চীনদেশে কবজ করিবার জন্যে আদিষ্ট হই, কিন্তু তাহাকে আপনার নিকট দেখিয়া আশ্চর্যান্বিত হইয়া পড়ি।" তারপর হযরত সুলাইমান (আঃ) সেই যুবকের চীনদেশে গমনের গল্প শুনাইলেন। তখন মালাকুল মউত বলিলেন, আমি ঐদিনই তাহার রূহ্ চীনদেশে কবজ করিয়াছি"।
অন্য এক হাদীসে বর্ণিত আছে যে, রূহ কবজ করিবার নিমিত্ত মালাকুল মউতের অসংখ্য সহকর্মী আছে। যেমন কোনও ব্যক্তি সর্বদা প্রার্থনা করিয়া বলিত, "হে আল্লাহ! আমাকে এবং সূর্যের তত্ত্বাবধায়ক ফেরেশতাকে ক্ষমা করুন।" সূর্যের তত্ত্বাবধায়ক ফেরেশতা একদা আল্লাহ পাকের অনুমতি লইয়া সেই ব্যক্তির সহিত সাক্ষাত করিতে আসিলেন এবং তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, "হে বন্ধু! বলুন ত আপনি কি প্রয়োজনে আমার জন্য এত বেশি দোয়া করিয়া থাকেন।" সে উত্তর করিল, "আমার আশা আপনি আমাকে আপনার স্থানে লইয়া যান এবং মালাকুল মউতের নিকট হইতে জানিয়া আমাকে আমার মৃত্যুর নৈকট্যতা সম্বন্ধে অবগত করান।" এই উপলক্ষে তিনি তাহাকে স্বীয় স্থান সূর্যে বসাইয়া রাখিয়া মালাকুল মউতের নিকট গমন করিলেন এবং তাহাকে আদ্যোপান্ত সমস্ত ঘটনা শুনাইয়া উক্ত ব্যক্তির মৃত্যু সময় সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করিলেন। প্রত্যুত্তরে মালাকুল মউত নিজের ডাইরী খুলিয়া বলিলেন, "এই লোকটির ঘটনা অত্যন্ত আশ্চর্যজনক। আমার ডাইরীতে লিপিবদ্ধ আছে যে, এই ব্যক্তি যতক্ষণ পর্যন্ত তোমার স্থান সূর্যে অবস্থান না করিবে ততক্ষণ পর্যন্ত তাহার মৃত্যু হইবে না।" তখন প্রশ্নকারী বলিলেন, "সে এখন আমার স্থানে বসিয়া রহিয়াছে।" উত্তরে মালাকুল মউত বলিলেন, "তবে অবশ্যই এতক্ষণে আমার সহকর্মীগণ তাহার রূহ কবজ সম্পন্ন করিয়া ফেলিয়াছেন। কেননা তাহারা কখনও স্বীয় কার্যে গাফলতি বা অবহেলা করেন না।"
জীব-জন্তু ও পশু-পক্ষীর হায়াত সম্পর্কে জনাব হুযুর করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ ফরমাইয়াছেন যে, আল্লাহ তা'আলার যিকিরই তাহাদের জীবন। যখন তাহারা আল্লাহ তায়ালার যিকির ছাড়িয়া দেয় তখনই আল্লাহ তা'লা তাহাদের আত্মা সংহার করিয়া থাকেন; তাহাদের সহিত মালাকুল মউতের কোন সম্পর্ক নাই। আরও বলা হইয়াছে যে, প্রকৃতপক্ষে যাবতীয় জীবের আত্মা আল্লাহ পাকই সংহার করিয়া থাকেন। কিন্তু হত্যাকার্যকে হন্তার প্রতি এবং মুত্যুকে রোগের প্রতি যেমন নেছবত বা সম্বন্ধযুক্ত করা হয়, তেমনি মৃত্যুর সহিত মালাকুল মউতের নেছবত বা সম্পর্ক বিদ্যমান রহিয়াছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা এরশাদ করিয়াছেন "মৃত্যুর সময় হইলে আল্লাহ তা'আলাই রূহ কবজ করিয়া থাকেন এবং তাহারা নিদ্রার সময় মৃত্যুবরণ করে না, কিন্তু মৃত্যুর সময় হইলে তাহার আত্মা কাড়িয়া লওয়া হয় আর অন্যান্য লোকদিগকে এক নির্দিষ্ট কালের জন্য মুক্তি দেওয়া হয় নিশ্চয়ই উহাতে চিন্তাশীলদের জন্য নিদর্শনাবলী বিদ্যমান রহিয়াছে।"
পরবর্তী পর্ব









