মঙ্গলবার, ১৪ মে, ২০২৪

দাকায়েকুল আখবার- (১১) মৃত্যুস্থানের বিবরণ

 

📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ১১)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

 মৃত্যুস্থানের বিবরণ-
অনন্ত দয়াময় আল্লাহ তা'আলা 'মালাকুল আরহাম' নামক এক শ্রেণীর ফেরেশতা সৃষ্টি করিয়াছেন। তাহারা শিশু মাতৃগর্ভে থাকা অবস্থায় তাহার মৃত্যুস্থানের মাটি বীর্যের সহিত মিশ্রিত করিয়া দেন। জন্ম-লাভের পর বান্দা পৃথিবীর যেখানে সেখানে পরিভ্রমণ করে; কিন্তু মৃত্যুর পূর্বক্ষণে সে বীর্যের সহিত মিশ্রিত মাটির জায়গায় আসিয়া হাজির হয়। তখন সেখানে তাহার রূহ কবজ করা হয়। আল্লাহ তা'আলার বাণীই ইহার জ্বলন্ত প্রমাণ। আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করিয়াছেন "হে নবী! আপনি বলিয়া দিন, যদি তোমরা তোমাদের গৃহেও অবস্থান করিতে, তথাপি যাহার যেখানে মৃত্যু লেখা আছে, তাহাকে অবশ্যই সেই মৃত্যুস্থানে পৌঁছিতে হইবে।"
হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে, প্রাচীনকালে হযরত মালাকুল মউত পয়গাম্বরদের সহিত সাক্ষাত করিতে আসিতেন। একদিন তিনি হযরত দাউদ (আঃ) এর পুত্র হযরত সুলাইমান (আঃ) এর সহিত সাক্ষাত করিতে আসিলেন। তথায় তিনি একজন সুশ্রী যুবকের প্রতি তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করিলেন। ফলে উক্ত যুবক ভীত ও কম্পিত হইয়া পড়িল। মালাকুল মউতের প্রস্থানের পর যুবকটি হযরত সুলাইমান (আঃ) এর নিকট আরজ করিল, "হে আল্লাহর রাসূল! আশা করি বায়ু আপনার হুকুমে এখনই আমাকে চীনদেশে পৌঁছাইয়া দিবে।"  অতঃপর হযরত সুলাইমান (আঃ) এর নির্দেশে বায়ু সে যুবকটিকে তখনই চীনদেশে পৌঁছাইয়া দিল। পুনরায় মালাকুল মউত সুলাইমান (আঃ) এর দরবারে উপস্থিত হইলে তিনি তাহাকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিপাতের কারণ জিজ্ঞাসা করিলেন। উত্তরে মালাকুল মউত বলিলেন,  "আমি সেইদিনই তাহার রূহ চীনদেশে কবজ করিবার জন্যে আদিষ্ট হই, কিন্তু তাহাকে আপনার নিকট দেখিয়া আশ্চর্যান্বিত হইয়া পড়ি।" তারপর হযরত সুলাইমান (আঃ) সেই যুবকের চীনদেশে গমনের গল্প শুনাইলেন। তখন মালাকুল মউত বলিলেন,  আমি ঐদিনই তাহার রূহ্ চীনদেশে কবজ করিয়াছি"। 
অন্য এক হাদীসে বর্ণিত আছে যে, রূহ কবজ করিবার নিমিত্ত মালাকুল মউতের অসংখ্য সহকর্মী আছে। যেমন কোনও ব্যক্তি সর্বদা প্রার্থনা করিয়া বলিত,  "হে আল্লাহ! আমাকে এবং সূর্যের তত্ত্বাবধায়ক ফেরেশতাকে ক্ষমা করুন।"  সূর্যের তত্ত্বাবধায়ক ফেরেশতা একদা আল্লাহ পাকের অনুমতি লইয়া সেই ব্যক্তির সহিত সাক্ষাত করিতে আসিলেন এবং তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন,  "হে বন্ধু! বলুন ত আপনি কি প্রয়োজনে আমার জন্য এত বেশি দোয়া করিয়া থাকেন।"  সে উত্তর করিল, "আমার আশা আপনি আমাকে আপনার স্থানে লইয়া যান এবং মালাকুল মউতের নিকট হইতে জানিয়া আমাকে আমার মৃত্যুর নৈকট্যতা সম্বন্ধে অবগত করান।"  এই উপলক্ষে তিনি তাহাকে স্বীয় স্থান সূর্যে বসাইয়া রাখিয়া মালাকুল মউতের নিকট গমন করিলেন এবং তাহাকে আদ্যোপান্ত সমস্ত ঘটনা শুনাইয়া উক্ত ব্যক্তির মৃত্যু সময় সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করিলেন। প্রত্যুত্তরে মালাকুল মউত নিজের ডাইরী খুলিয়া বলিলেন, "এই লোকটির ঘটনা অত্যন্ত আশ্চর্যজনক। আমার ডাইরীতে লিপিবদ্ধ আছে যে, এই ব্যক্তি যতক্ষণ পর্যন্ত তোমার স্থান সূর্যে অবস্থান না করিবে ততক্ষণ পর্যন্ত তাহার মৃত্যু হইবে না।"  তখন প্রশ্নকারী বলিলেন, "সে এখন আমার স্থানে বসিয়া রহিয়াছে।"  উত্তরে মালাকুল মউত বলিলেন, "তবে অবশ্যই এতক্ষণে আমার সহকর্মীগণ তাহার রূহ কবজ সম্পন্ন করিয়া ফেলিয়াছেন। কেননা তাহারা কখনও স্বীয় কার্যে গাফলতি বা অবহেলা করেন না।" 
জীব-জন্তু ও পশু-পক্ষীর হায়াত সম্পর্কে জনাব হুযুর করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ ফরমাইয়াছেন যে, আল্লাহ তা'আলার যিকিরই তাহাদের জীবন। যখন তাহারা আল্লাহ তায়ালার যিকির ছাড়িয়া দেয় তখনই আল্লাহ তা'লা তাহাদের আত্মা সংহার করিয়া থাকেন; তাহাদের সহিত মালাকুল মউতের কোন সম্পর্ক নাই। আরও বলা হইয়াছে যে, প্রকৃতপক্ষে যাবতীয় জীবের আত্মা আল্লাহ পাকই সংহার করিয়া থাকেন। কিন্তু হত্যাকার্যকে হন্তার প্রতি এবং মুত্যুকে রোগের প্রতি যেমন নেছবত বা সম্বন্ধযুক্ত করা হয়, তেমনি মৃত্যুর সহিত মালাকুল মউতের নেছবত বা সম্পর্ক বিদ্যমান রহিয়াছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা এরশাদ করিয়াছেন "মৃত্যুর সময় হইলে আল্লাহ তা'আলাই রূহ কবজ করিয়া থাকেন এবং তাহারা নিদ্রার সময় মৃত্যুবরণ করে না, কিন্তু মৃত্যুর সময় হইলে তাহার আত্মা কাড়িয়া লওয়া হয় আর অন্যান্য লোকদিগকে এক নির্দিষ্ট কালের জন্য মুক্তি দেওয়া হয় নিশ্চয়ই উহাতে চিন্তাশীলদের জন্য নিদর্শনাবলী বিদ্যমান রহিয়াছে।"

পরবর্তী পর্ব

দাকায়েকুল আখবার- (১০) মালাকুল মউত যেরূপে রূহ কবজ করে

 

📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ১০)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

মালাকুল মউত যেরূপে রূহ কবজ করে-
সলবি নামক গ্রন্থে হযরত মোকাতেল (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, "আল্লাহ তায়ালা মালাকুল মউত ফেরেশতার জন্য সপ্তম বা চতুর্থ আকাশে সত্তর হাজার স্তম্ভের উপর একটি নূরের সিংহাসন সংস্থাপন করিয়াছেন। মালাকুল মউতের চারিখানা পাখা আছে। এবং তাহার সমস্ত দেহে মানব-দানব, পশু-পাখী, কীট-পতঙ্গ ইত্যাদির সংখ্যানুপাতে জিহ্বা ও চক্ষু রহিয়াছে। অর্থাৎ এমন কোন প্রাণী নাই, যাহার নিমিত্ত তাহার শরীরে মুখ, হাত ও চক্ষু নাই। সেখান হইতেই তিনি তাহাদের রূহ কবজ করেন।"
একদিন হযরত নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিলেন যে, মালাকুল মউতের উত্তরে, দক্ষিণে, সম্মুখে, পশ্চাতে, উপরে ও নীচে সর্বমোট ছয়খানা মুখমণ্ডল রহিয়াছে। তখন সাহাবাগণ আরজ করিলেন, "হে আল্লাহর রাসূল! সেই ছয়খানা মুখের তাৎপর্য ও রহস্য কি?" প্রত্যুত্তরে নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিলেন,  "মালাকুল মউত তাহার উত্তর মুখ দিয়া পশ্চিম দেশীয় প্রাণীদের রূহ কবজ করেন; আর দক্ষিণ মুখ দিয়া পূর্ব দেশীয় প্রাণীদের রূহ কবজ করেন। পশ্চাতের মুখ দিয়া পাপী ও দোযখীদের আত্মা কবজ করেন। আর সম্মুখের মুখ দিয়া আমার মুমিন উম্মতদের রূহ কবজ করেন। তিনি মস্তকোপরি মুখ দিয়া আকাশমণ্ডলের অধিবাসীদের রূহ কবজ করেন এবং পদতলের মুখ দিয়া জ্বিন ও দানবদের আত্মা ছিনাইয়া আনেন।"
হযরত রাসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আরও বলিয়াছেন যে, "মালাকুল মউত হাতের দ্বারা প্রাণীর রূহ কবজ করেন এবং চক্ষু দ্বারা তিনি প্রাণীর প্রতি দৃষ্টিপাত করেন।"  এমনিভাবে সর্ব স্থানের সৃষ্টজীবের আত্মা কবজ করা হইয়া থাকে। যখন পৃথিবীর বুকে কেহ মৃত্যুবরণ করে, তখনই মালাকুল মউতের দেহস্থিত একটি চক্ষু বিলীন হইয়া যায়।
অন্য এক হাদীসে বর্ণিত আছে যে, মালাকুল মউত মাত্র চারিটি মুখমণ্ডলের অধিকারী। তিনি মস্তকোপরী মুখমণ্ডলের দ্বারা নবী ও ফেরেশতাদের আত্মা কবজ করেন। আর সম্মুখস্থ মুখমন্ডলের দ্বারা মুমিন বান্দাদের রূহ কবজ করেন। পশ্চাদমুখী মুখমণ্ডলের দ্বারা ধর্মদ্রোহী কাফেরদের আত্মা সংহার করেন। আর পদতলস্থ মুখমণ্ডল দ্বারা মানুষের মহাশত্রু শয়তান ও জিন্নাতদের আত্মা সংহার করেন। তাহার একখানি পা জাহান্নামের উপরিস্থিত পুলসিরাতের উপর এবং অপরখানি বেহেশতের উদ্যানস্থিত সিংহাসনের উপর অবস্থিত। 
হাদীস শরীফে আছে যে, মালাকুল মউতের আকৃতি এতই বিশাল যে, যদি সমুদয় নদ-নদী ও সাগর-মহাসাগরের পানিরাশি তাহার মাথার উপর বর্ষিত হইত, তথাপি একবিন্দু পানিও ভূমিতে পতিত হইত না আরও বলা হইয়াছে যে, মালাকুল মউতের সম্মুখে এই পৃথিবীর জীবসমূহ এতই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র যে, যেন একখানি খাদ্যের বরতন বিভিন্ন উপাদানে সজ্জিত করিয়া তাহার সম্মুখে রাখা হইয়াছে এবং তিনি স্বীয় ইচ্ছা অনুসারে তন্মধ্য হইতে ভক্ষণ করিতে পারেন। পৃথিবীর যাবতীয় সৃষ্টজীব তাহার সম্মুখে ঠিক তেমনই পড়িয়া রহিয়াছে। তিনি পৃথিবীকে এমনভাবে উলট-পালট করিতে পারেন, যেন কেহ হাতের তালুতে রৌপ্যমুদ্রা লইয়া উলট-পালট করিয়া থাকে।
হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, মালাকুল মউত নবী ও রাসূল (আলাইহিস্সালাম)  ব্যতীত অন্য কাহারও রূহ কবজ করিবার জন্য পৃথিবীতে অবতীর্ণ হন না। অন্যান্য জীব জানোয়ারদের প্রাণ সংহারের জন্য তাহার অনেক সহকর্মী রহিয়াছে। হাদীস শরীফে আরও বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ তা'আলা যখন যাবতীয় সৃষ্টজীব ধ্বংস করিয়া ফেলিবেন, তখন হযরত আজরাইল (আঃ) এর দেহে মাত্র আটটি চক্ষু অবশিষ্ট থাকিবে, আর সবই বিলীন হইয়া যাইবে। সেইগুলি থাকিবে হযরত জিব্রাইল (আঃ), হযরত মিকাইল (আঃ), হযরত ইস্রাফিল (আঃ) ও স্বয়ং হযরত আজরাইল (আঃ)-এর জন্য এবং আরশ-বহনকারী ও তত্ত্বাবধায়ক চারিজন বিশিষ্ট ফেরেশতার জন্য।
আর মালাকুল মউত কিরূপে বুঝিতে পারেন যে, কাহার মৃত্যু ঘনাইয়া আসিয়াছে? এই সম্বন্ধে বলা হইয়াছে যে, যখন কাহারও রোগ-শোক ও মৃত্যুর পরোয়ানা মালাকুল মউতের সম্মুখে উপস্থিত করা হয়, তখন তিনি আল্লাহ পাকের দরবারে আরজ করেন, "হে আল্লাহ! আমি কিরূপে, কোথায় এবং কখন এই বান্দার আত্মা কবজ করিব, - তাহা বলিয়া দিন।" তখন আল্লাহ তায়ালা বলেন, "হে মালাকুল মউত! মৃত্যুর গোপনীয় সংবাদ কেবল আমার জন্য সুনির্দিষ্ট রহিয়াছে, আমি ব্যতীত অন্য কেহই সে সম্বন্ধে অবগত নহে। তবে হাঁ, যখন সময় ঘনাইয়া আসিবে, তখন আমিই তোমাকে পরিজ্ঞাত করাইব এবং তুমি উহার স্পষ্ট নিদর্শন প্রত্যক্ষ করিবে। তাহা এই যে, যখন কাহারও মৃত্যুর সময় উপস্থিত হয়, তখন শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণকারী ফেরেস্তা হাজির হইয়া বলিবে, "অমুকের পুত্র অমুকের শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হইয়া গিয়াছে।" অতঃপর কৃতকর্ম ও খাদ্যদ্রব্যের তত্ত্বাবধায়ক ফেরেশতা আসিয়া বলিবে অমুকের পুত্র অমুকের কর্মশক্তি ও খাদ্যদ্রব্য ফুরাইয়া গিয়াছে। তারপর মালাকুল মউতের নিকটস্থ ডাইরিতে পুণ্যবান ব্যক্তির নামের চতুর্দিকে উজ্জ্বল নূরের সুবর্ণ রেখা প্রকাশিত হয় এবং বদকার ব্যক্তির নামের চতুর্দিকে কৃষ্ণবর্ণের রেখা প্রকাশিত হয়। পরিশেষে আরশের নিম্নস্থিত প্রকাণ্ড বৃক্ষ হইতে তাহার নাম অঙ্কিত একটি পাতা মালাকুল মউতের সম্মুখে ঝরিয়া পড়ে এবং তখনই তিনি সেই ব্যক্তির রূহ কবজ করেন।

হযরত কা'ব ইবনে আহ্বার (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ তা'আলা আরশের নিম্নভাগে একটি সুবৃহৎ বৃক্ষ পয়দা করিয়াছেন। উক্ত বৃক্ষে যাবতীয় জীবের সংখ্যানুপাতে পাতা রহিয়াছে। কাহারও মৃত্যুর চল্লিশ দিন পূর্বেই তাহার নামাঙ্কিত পাতাটি হযরত আজরাইল (আঃ) এর বক্ষের উপর ঝরিয়া পড়ে। তখন তিনি তাঁহার সহকর্মীদিগকে উক্ত ব্যক্তির রূহ কবজ করিতে নির্দেশ করেন। এরূপভাবে চল্লিশ দিন পূর্বেই উক্ত ব্যক্তি আকাশমণ্ডলে মৃত বলিয়া ঘোষিত হয়।

হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, হযরত মিকাইল (আঃ) আল্লাহ তায়ালার নিকট হইতে একখানি সহিফা বা লিখিত পত্র লইয়া হযরত আজরাইল (আঃ) এর নিকট উপস্থিত হন। উহাতে মৃত ব্যক্তির নাম-ধাম, তাহার মৃত্যুর স্থান ও মৃত্যুর কারণ ইত্যাদি লিপিবদ্ধ থাকে। আর হযরত আবু লাইস্ সমরকন্দি বর্ণনা করিয়াছেন যে, কাহারও মৃত্যুর সময় ঘনাইয়া আসিলে আরশে মোয়াল্লার নিম্নস্থান হইতে সবুজ বা সাদা রংয়ের একবিন্দু পানি তাহার নামের উপর টপকাইয়া পড়ে। সেই পানিবিন্দু সবুজ হইলে উক্ত ব্যক্তি বদ্-বখত বলিয়া বিবেচিত হয় এবং পানিবিন্দু সাদা হইলে সে নেকবখত হিসাবে বিবেচিত হয়, আর অত্যন্ত আসানীর সহিত তাহার রূহ কবজ করা হয়।

পরবর্তী পর্ব

দাকায়েকুল আখবার- (৯) মৃত্যুর ইতিহাস


📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ৯)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

মৃত্যুর ইতিহাস-
পবিত্র হাদীস শরীফে জনাব হুযুর করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) হইতে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ তায়ালা মৃত্যুকে পয়দা করিয়া শত আবরণের মধ্যে উহা গোপন করিয়া রাখেন। আকাশমণ্ডল ও ভূমণ্ডল অপেক্ষা প্রকাণ্ড করিয়া উহার আকৃতি গঠন করতঃ উহাকে সত্তরটি শৃংখলে আবদ্ধ করিয়া রাখেন। উহার প্রতিটি শৃংখল প্রায় এক হাজার বৎসরের রাস্তার সমপরিমাণ লম্বা ও দীর্ঘ। ফেরেশতাগণ কখনও উহার পার্শ্ব দিয়া গমন করিতেন না। তবে কি উহার অস্তিত্ব ও অবস্থান সম্বন্ধে তাহারা অবগত ছিলেন না; কিন্তু চতুর্দিক হইতে উহার বিকট ও প্রলয়ঙ্করী চীৎকার শুনিতে পাইতেন।
হযরত আদম (আলাইহিস্সালাম) এর সৃষ্টির পূর্বে সকলেই সে সম্পর্কে অনবগত ছিলেন। হযরত আদম (আঃ) এর সৃষ্টিলগ্নে আল্লাহ তায়ালা যখন মালাকুল মউতকে মৃত্যুর কার্যে নিয়োগ করিলেন তখন তিনি প্রার্থনা করিলেন- "হে আল্লাহ! মৃত্যু আবার কি জিনিস?" তখন আল্লাহ তা'য়ালা উক্ত আবরণকে উন্মুক্ত হইতে এবং সমস্ত ফেরেশতাদিগকে উহার প্রতি নজর করিতে নির্দেশ দিলেন। যখন ফেরেশতাগণ উহাকে দেখিবার জন্য দণ্ডায়মান হইল, তখন আল্লাহ তা'আলা মৃত্যুকে বলিলেন- "হে মৃত্যু! তুমি তোমার সমুদয় পাখা বিস্তার করিয়া তাহাদের মস্তকোপরি উড়িয়া বেড়াও এবং তোমার সমস্ত চক্ষু উন্মিলিত করিয়া তাহাদের প্রতি দৃষ্টিপাত কর। আল্লাহ তা'আলার নির্দেশানুযায়ী যখন মৃত্যু উড়িতে আরম্ভ করিল, তাহা দর্শন করিয়া ফেরেশতাগণ মুর্হিত হইয়া দুই হাজার বৎসর পড়িয়া রহিলেন। তারপর তাহারা চৈতন্য লাভ করিয়া আরজ করিলেন, "হে আল্লাহ! ইহা অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ কোন বস্তু আপনি সৃষ্টি করিয়াছেন কি?" প্রত্যুত্তরে আল্লাহ দতা'আলা বলিলেন, "হে ফেরেশতাগণ!  ইহা আমারই সৃষ্ট এবং ইহা অপেক্ষা আমিই মহীয়ান ও গরীয়ান। প্রতিটি সৃষ্টজীবই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করিবে।" আর আল্লাহ তা'য়ালা হযরত আজরাইল (আঃ) কে বলিলেন, "হে আজরাইল!  আমি তোমাকে সৃষ্টজীবের মৃত্যু নিয়ন্ত্রণের জন্য নির্বাচন করিলাম।" হযরত আজরাইল (আঃ) প্রার্থনা করিলেন, "হে আল্লাহ ! মৃত্যুকে নিয়ন্ত্রণের শক্তি আমার নাই। কেননা মৃত্যু আমার অপেক্ষা বহুলাংশে শ্ৰেষ্ঠ ও শক্তিশালী।" তখন হযরত আজরাইল (আঃ) আল্লাহ তা'আলা প্রদত্ত শক্তিতে বলীয়ান হইয়া মৃত্যুকে স্বীয় আয়ত্তে আনয়ন করেন।
অতঃপর মৃত্যু আল্লাহ তায়ালার নিকট আরজ করিল, "হে আল্লাহ! আমাকে একবার নভোমণ্ডলে ও ভূমণ্ডলে উচ্চৈঃস্বরে কিছু বলিবার অনুমতি প্রদান করুন। আল্লাহ্ তা'আলার অনুমতি লইয়া মৃত্যু অতি উচ্চৈঃস্বরে বলিয়া উঠিল, "হে সৃষ্টজীব সকল! স্মরণ রাখিও, আমি সেই মুত্যু- যে বন্ধু-বান্ধবের মধ্যে বিচ্ছেদ সাধন করে, মাতা-কন্যায়, পিতা-পুত্রে, স্বামী-স্ত্রীতে, সবল-দুর্বলে এবং ভ্রাতা-ভগ্নির মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটায়; ঘর-বাড়ী, দালান-কোঠা বিরান ও ধ্বংসস্থূপে পরিণত করে। "আমি অবশ্যই মৃত্যু দান করিব, যদিও তোমরা গগণচুম্বি অট্টালিকায় থাক না কেন। এমন কি কোন জীবই আমার স্বাদ গ্রহণে বঞ্চিত হইবে না।"
যখন কাহারও মৃত্যুর সময় ঘনাইয়া আসে, তখন মৃত্যু স্বীয় বিকট মূর্তিতে মুমূর্ষ ব্যক্তির সম্মুখে আসিয়া উপস্থিত হয়। মুমূর্ষ আত্মা তখন তাহাকে জিজ্ঞাসা করে,  "হে ব্যক্তি! তুমি কে এবং তুমি কি চাও?" প্রত্যুত্তরে সে বলে, "আমি মৃত্যু, আমি তোমাকে পৃথিবী হইতে বাহির করিব, তোমার সন্তানদিগকে অনাথ, এতিম করিব এবং তোমার স্ত্রীকে বিধবা করিব। তোমার ধন-দৌলত, অর্থ-সম্পদ তোমার সেই সকল উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বন্টন করিব, যাহারা তোমাকে পৃথিবীতে পছন্দ করে নাই এবং তুমিও যাহাদের পছন্দ কর নাই। তুমি নিজের জন্য যে সকল সক্কার্য করিয়াছিলে, আজ তাহারাই তোমার উপকারার্থে তোমার দোসর হইবে; আর কিছুই তোমার কোন প্রকার উপকার করিতে সক্ষম হইবে না।" এই সকল কথা শুনিয়া সেই ব্যক্তি তাহার মুখমণ্ডল দেওয়ালের দিকে ফিরায়, কিন্তু মৃত্যুদূতকে সেদিকেও হাজির দেখিতে পায়। পুনরায় সে অন্যদিকে মুখ ফিরায়, কিন্তু সেইদিকেও মৃত্যুকে দেখিতে পায়। পরিশেষে মৃত্যু বলিতে থাকে, "হে আল্লাহর বান্দা! তুমি কি জান না যে, আমিই সেই মৃত্যু যে তোমার চোখের সম্মুখ হইতে তোমার মাতা-পিতার রূহ কবজ করিয়া লইয়াছিলাম। কিন্তু তুমি তখন তাহাদের কোনই উপকার করিতে পার নাই। আজ তদ্রুপ আমি তোমার। সন্তানদের সম্মুখ হইতে তোমার রূহ্ ছিনাইয়া লইয়া অনন্ত জগতে বিলীন হইয়া যাইব; কিন্তু তাহারা তোমার কোনই উপকার করিতে পারিবে না। আমিই সেই মৃত্যু, যে অত্যন্ত শক্তিশালী জাতিসমূহকে ধ্বংস করিয়াছে।"
অতঃপর মৃত্যুদূত তাহাকে জিজ্ঞাসা করে "হে ব্যক্তি! পৃথিবী তোমার সহিত কিরূপ ব্যবহার করিয়াছে?" প্রত্যুত্তরে সে বলে, "আমি পৃথিবীকে ধোকাবাজ, প্রবঞ্চক ও প্রতারক হিসাবেই পাইয়াছি। উহা আমার সহিত সদ্ব্যবহার করে নাই।"  তারপর আল্লাহ তা'আলা মুমূর্ষ ব্যক্তির সম্মুখে পৃথিবীকে কুৎসিত বৃদ্ধা রমণীর আকৃতিতে তুলিয়া ধরিবেন। তখন পৃথিবী মুমূর্ষ ব্যক্তিকে সম্বোধন করিয়া বলিবে, "হে পাপিষ্ঠ নরাধম! তুমি কি আমার বুকে পাপকাজ করিতে কুণ্ঠাবোধ করিয়াছিলে বা লজ্জিত হইয়াছিলে? আর পাপ কর্ম হইতে বাচিয়াছিলে? তুমি আমাকে অন্বেষণ করিয়াছিলে কিন্তু আমি তোমাকে অন্বেষণ করি নাই। তুমি আমার মোহে এতই বিভোর, বিবেকহীন, অন্ধ হইয়া পড়িয়াছিলে যে, হালাল হারামের কখনও পার্থক্য কর নাই। তুমি কি মনে করিয়াছিলে যে, তোমাকে পৃথিবী ছাড়িয়া যাইতে হইবে না? কিন্তু তুমি মনে রাখিও, আমি তোমাকে এবং তোমার কার্যক্রমকে মোটেই পছন্দ করি নাই।"
মুমূর্ষ ব্যক্তি আরও দেখিতে পাইবে যে, তাহার টাকা-পয়সা, ধন-দৌলত অন্যের হাতে চলিয়া যাইতেছে। তখন উক্ত মালামাল তাহাকে লক্ষ্য করিয়া বলিবে,  "হে পাপী নরাধম! তুমি আমাদিগকে অন্যায়ভাবে সঞ্চয় ও সংগ্রহ করিয়াছিলে এবং দরিদ্র-ভিক্ষুককে আমাদের হইতে মোটেই দান-খয়রাত কর নাই। আজ আমরা অন্যের হাতে যাইতেছি। যেমন আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে এরশাদ করিয়াছেন "সেইদিন ধন-সম্পত্তি ও পুত্র-কন্যা কোন উপকার করিতে পারিবে না; কিন্তু যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার সমীপে পবিত্র আত্মা লইয়া হাজির হইবে, সে ব্যতীত।"  তখন বান্দা আরজ করিবে, "হে আল্লাহ! আমাকে পুনরায় পৃথিবীতে পাঠাইয়া দিন। তাহা হইলে আমি যথোপযুক্ত সক্কার্য সম্পাদন করিয়া আসিব।" প্রত্যুত্তরে আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করিবেন "যখন কাহারও মৃত্যু সময় সন্নিকটে আসে (তখনই তাহার রূহ্ কবজ করা হয়) তখন মুহূর্তও আগে পিছে করা হয় না।"
অতঃপর মুমিন লোকের রূহ অত্যন্ত সহজ ও আছানির সহিত কবজ করা হয় আর মুনাফেক ও কাফেরদের রূহ্ খুব যাতনা সহকারে ছিনাইয়া আনা হয়। যেমন আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করিয়াছেন "নিশ্চয়ই সৎলোকের আমলনামা ইল্লিন নামক স্থানে এবং বদ লোকদের আমলনামা সিজ্জিন নামক স্থানে রাখা হয়।"
[বিঃ দ্রঃ সিজ্জিন এবং ইল্লিন হইল দুইটি লিখিত রেজিষ্টার। উহাতে সৎলোকদের আমলনামা ও বদলোকদের আমলনামা সংরক্ষিত করা হয়।]

পরবর্তী পর্ব

দাকায়েকুল আখবার- (৮) ফেরেশতাগণের সৃষ্টির বিবরণ



📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ৮)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

ফেরেশতাগণের সৃষ্টির বিবরণ-
বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ তা'আলা সৃষ্টিকুল নিয়ন্ত্রণ ও সৃষ্টজীবের তত্ত্বাবধানের জন্য শ্রেষ্ঠ ফেরেশতা হযরত জিব্রাইল (আঃ), হযরত মিকাইল (আঃ), হযরত আজরাইল (আঃ) ও হযরত ইস্রাফিল (আঃ) কে সৃষ্টি করিয়াছেন। হযরত জিব্রাইল (আঃ) কে আল্লাহ্ তা'আলার বাণী বাহক ও প্রধান দূতের কার্যে নিয়োজিত করিয়াছেন। আর হযরত মিকাইল (আঃ) কে খাদ্যদ্রব্য বন্টন ও শিলা বৃষ্টির নিয়ন্ত্রণের কার্যে, হযরত আজরাইল (আঃ) কে জীবের রূহ কবজ বা মৃত্যু-দূতের কার্যে এবং ইস্রাফিল (আঃ) কে বিশ্ব প্রলয়ঙ্করী শিঙ্গা ফুকাইবার কার্যে নিযুক্ত করিয়াছেন।
হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, হযরত ইস্রাফিল (আঃ) আল্লাহ তা'আলার সমীপে আবেদন করিয়াছেন, “হে আল্লাহ! আমাকে সাত আকাশ, সাত যমিন, পাহাড়-পর্বত, হিংস্র জীব-জন্তু ও মানব-দানবসমূহের শক্তি প্রদান করুন।” 
দয়াময় আল্লাহ তায়ালা তাঁহার প্রার্থনা মঞ্জুর করতঃ তাঁহাকে উল্লিখিত বস্তুসমূহের শক্তি দান করেন। তাঁহার দেহে অসংখ্য পালক রহিয়াছে এবং তাঁহার মস্তক জাফরানী রং-এর পশম দ্বারা আবৃত। তাঁহার এক এক পশমে হাজার হাজার মুখমণ্ডল আছে। আর প্রত্যেক মুখে অগণিত জিহ্বা রহিয়াছে। তাঁহার মুখমণ্ডল ও জিহ্বাসমূহ সুপ্রশস্ত পাখা দ্বারা পরিবৃত। তিনি প্রত্যেক জিহ্বা দ্বারা অসংখ্য ভাষায় আল্লাহ তা'লার তাসবিহ্ পাঠ করেন। তাঁহার প্রতি শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে আল্লাহ তায়ালা একজন করিয়া ফেরেশতা পয়দা করেন। এই সকল ফেরেশতা কিয়ামত পর্যন্ত আল্লাহ তা'আলার তাবীহ পাঠে নিমগ্ন থাকিবে। তাঁহারাই মর্যাদাশালী আরশ বহনকারী 'কিরামান কাতিবীন' ফেরেশতা। তাঁহারা সকলেই হযরত ইস্রাফিল (আঃ) এর আকৃতিতে গঠিত।
হযরত ইস্রাফিল (আঃ) প্রত্যহ তিনবার করিয়া জাহান্নামের প্রতি নজর করেন। উহাতে তাঁহার দেহ প্রায় বিগলিত হইয়া যায় এবং ধনুকের রশির মত সঙ্কুচিত হইয়া যায়। সদাসর্বদা তিনি কান্নাকাটি ও রোনাজারীতে সময় অতিবাহিত করেন। যদি আল্লাহ তা'আলা তাঁহাকে চোখের পানি ফেলিতে ও ক্রন্দন করিতে নিষেধ না করিতেন, তাহা হইলে সমস্ত পৃথিবী তাঁহার চোখের পানিতে ভাসিয়া যাইত এবং হযরত নূহ (আঃ) এর প্লাবনের আকার ধারণ করিত। যদি তাঁহার চক্ষুর পানি পৃথিবীর উপর নিপতিত হইত, তবে সমস্ত পৃথিবীবাসী হযরত নূহ (আঃ) এর তুফানের মত পানিতে ডুবিয়া মৃত্যবরণ করিত। তাঁহার শরীরের পরিধি এতই বিস্তৃত যে সমস্ত সাগরের পানি যদি তাঁহার মস্তকে বর্ষিত হয় তথাপি একবিন্দু পানিও ভূমিতলে পতিত হইবে না।
হযরত ইস্রাফিল (আঃ) এর সৃষ্টির পাঁচশত বৎসর পর আল্লাহ তা'আলা হযরত মিকাইল (আঃ) কে পয়দা করেন। তাঁহার আপাদমস্তক জাফরানী রংয়ের পশমে এবং পাখায় আবার পরিবৃত । প্রতিটি পশমের গায়ে অসংখ্য মুখ ও চক্ষু রহিয়াছে । প্রত্যেক মুখে অসংখ্য জিহ্বা আছে । প্রত্যেক জিহ্বার সাহায্যে তিনি অসংখ্য ভাষায় আল্লাহ তা'লার তাসবীহ পাঠ করেন। তাঁহার প্রত্যেক চোখ মুমিন মুসলমান ও পাপীদের জন্য ক্রন্দন সহকারে আল্লাহ তায়ালা সমীপে ক্ষমা প্রার্থনা করে ও রহমত কামনা করে। আর প্রত্যেক চক্ষু হাজার হাজার বিন্দু অশ্রু বিসর্জন করে। উহাদ্বারা আল্লাহ তায়ালা তাহার আকৃতির সত্তর হাজার ফেরেশতা পয়দা করেন। যাহারা কিয়ামত পর্যন্ত আল্লাহ তা'আলার তাসবীহ পাঠে আত্মনিয়োগ করিবে। তাহাদিগকে ‘রূহানী ফেরেশতা' বলা হয়।
হযরত আজরাইল (আঃ) কে আল্লাহ্ তা'আলা হযরত ইস্রাফিল (আঃ) এর মতই সৃষ্টি করিয়াছেন। তাঁহারও মুখ, জিহ্বা এবং পাখা রহিয়াছে।

পরবর্তী পর্ব

দাকায়েকুল আখবার- (৭) মানুষের শরীরের চামড়ার রহস্য


📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ৭)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

মানুষের শরীরের চামড়ার রহস্য-
রূহ্ যখন আদম (আঃ)-এর উদরে প্রবেশ করিল, তখন তিনি খাদ্য ভক্ষণের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করিলেন। অতঃপর রূহ দেহে প্রবেশ করিলে দেহ রক্ত, মাংস, শিরা-উপশিরায় পরিণত হইল। আল্লাহ তায়ালা হযরত আদম (আঃ) এর শরীরকে নখের আবরণ দ্বারা ঢাকিয়া দিলেন। তাই তাঁহার দেহের সৌন্দর্য ও লাবণ্য দিন দিন অধিকতর বর্ধিত হইতে থাকে; কিন্তু ভুল পথে পদক্ষেপের ফলে আল্লাহ তা'আলা শাস্তি স্বরূপ তাঁহার সেই নখের আবরণকে চামড়ার আবরণে পরিবর্তিত করিয়া দেন, আর পূর্বাবস্থার চিহ্নস্বরূপ হস্ত-পদের অঙ্গুলির অগ্রভাগে সামান্য একটু নখ রাখিয়া দেন।
দয়াময় আল্লাহ তায়ালা হযরত আদম (আঃ) এর সৃষ্টি সমাপ্ত করিয়া তাঁহাকে রূহদান করিলেন এবং তাঁহাকে বেহেশতের পোশাকে সুসজ্জিত করিলেন। তখন নূরে মোহাম্মদী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) তাঁহার মুখমণ্ডলে ও পেশানিতে পূর্ণিমার উজ্জ্বল চন্দ্রের ন্যায় চমকাইতে থাকে৷ তারপর যখন তিনি আশ্চর্যান্বিত হইয়া মস্তক উত্তোলন করিলেন, তখন ফেরেশতাগণ তাঁহাকে স্কন্ধে উঠাইয়া লইল। আর আল্লাহ তা'আলা ফেরেশতাদিগকে নির্দেশ করিলেন, “হে ফেরেশতাগণ!  তোমরা হযরত আদম (আঃ) কে আকাশের অত্যাশ্চর্য বস্তুসমূহের দর্শক হিসাবে আকাশমণ্ডলে বিচরণ করাও। তাহা হইলে তাঁহার ঈমান আরও সুদৃঢ় হইবে।” 
ফেরেশতাগণ আল্লাহ তায়ালার নির্দেশ অনুযায়ী হযরত আদম (আঃ) কে স্কন্ধে স্থাপন করিয়া প্রায় দুইশত বৎসর পর্যন্ত সমুদয় নভোমণ্ডল পর্যটনে অতিবাহিত করিলেন।
তারপর আল্লাহ তায়ালা হযরত আদম (আঃ) এর সওয়ারী বা বাহনের নিমিত্ত ‘মাইমুনা’ নামক একটি ঘোটকী তীব্র সুগন্ধবিশিষ্ট মেশক দ্বারা সৃষ্টি করেন। উহার দুই পাখা মণিমুক্তা দ্বারা তৈরী করিয়া তিনি তাঁহাকে উহাতে উপবেশন করিতে বলিলেন। হযরত জিব্রাইল (আঃ) উহার লাগাম ধরিয়া আর হযরত মিকাইল (আঃ) উহার ডাহিনে এবং হযরত ইস্রাফিল (আঃ) উহার বামে থাকিয়া হযরত আদম (আঃ)-কে সমস্ত আকাশে ঘুরাইতে লাগিলেন। তাঁহার সহিত ফেরেশতাদের সাক্ষাত হইতেই তিনি তাহাদিগকে (আচ্ছালামু আলাইকুম) অর্থাৎ “তোমাদের উপর শান্তি বর্ষিত হউক” বলিয়া সন্তাষণ করিলেন আর তাঁহারাও প্রত্যুত্তরে -"ওয়া আলাইকুমুচ্ছালামু ওয়া রাহমাতুল্লাহ্" অর্থাৎ তোমাদের উপরও শান্তি এবং আল্লাহর রহমত বর্ষিত হউক বলিয়া তাঁহাকে সম্ভাষণ জানাইলেন। তখন আল্লাহ তা'আলা এরশাদ করিলেন, “ হে আদম! এইরূপ সালামই আমি তোমাকে এবং তোমার বিশ্বাসী বংশধরগণের নিমিত্ত উপঢৌকনস্বরূপ দান করিলাম। তোমরা উহাদ্বারা একে অপরকে কিয়ামত পর্যন্ত সম্ভাষণ করিবে।”

[বিঃ দ্রঃ হাদীস শরীফে আছে মুসলমানের সহিত কথা বলিবার পূর্বে প্রথমে সালাম প্রদান করিবে। অর্থাৎ এক মুসলমান অপর মুসলমানের সহিত কথা বলিবার পূর্বে প্রথমে সালাম প্রদান করিবে]

পরবর্তী পর্ব

দাকায়েকুল আখবার- (৬) আদম (আঃ) এর দেহের রহস্য



📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ৬)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

আদম (আঃ) এর দেহের রহস্য
হযরত ইবনে আব্বাস রদিয়াল্লাহু আরো বর্ণনা করিয়াছেন যে, "আল্লাহ্ তা'আলা হযরত আদম আলাইহিস্সালামের মাথা বাইতুল কোকাদ্দেসের মাটি হইতে, এবং চেহেরা মুবারক বেহেশতের মাটি হইতে সৃষ্টি করিয়াছেন। আর দন্তরাজি হাউজে কাউসারের মাটি হইতে দক্ষিন হস্ত কাবা শরীফের মাটি হইতে, বাম হস্ত পারস্যের মাটি হইতে, হাড়সমূহ পাহাড়ের মাটি হইতে, লজ্জাস্থান বাবেল দেশের মাটি হইতে, পার্শদেশ ইরাকের মাটি হইতে, হৃদয় ফেরদাউসের মাটি হইতে, নয়ন যুগল হাউজে কাউসারের মাটি হইতে জিহ্বা তায়েফেরে মাটি হইতে পয়দা করিয়েছেন।"
তাঁহার মস্তক বাইতুল মোকাদ্দেসের মাটি হইতে সৃষ্টি করা হইয়াছে বলিয়া উহা জ্ঞান-বিজ্ঞান, বিদ্যা-বুদ্ধি ও আলাপ-আলোচনার স্থান হইয়াছে।  বেহেস্তের মাটি হইতে তাহার মুখমন্ডল তৈরী হইয়াছেন বলিয়া উহা সুন্দর, মনোহর ও লাবণ্যময় হইয়াছে। তাঁহার দন্তরাজি কাউসারের মাটি হইতে সৃষ্টি করা হইয়াছে বলিয়া উহারা স্বাধের ও আস্বাধনের স্থান হইয়াছে। তাঁহার দক্ষিন হস্থ কাবা শরীফের মাটি হইতে তৈরি হইয়াছে বলিয়া উহা সাহায্যের স্থান হইয়াছে। তাঁহার পিট মুবারক ইরাকের মাটি হইতে তৈরি হইয়াছে বলিয়া উহা শক্তি ও সামর্থের স্থান হইয়াছে। তাঁহার লজ্জাস্থাম বাবেল দেশের মাটি হইতে তৈরী হইয়াছে বলিয়া উহা কাম-স্থান হইয়াছে। তাহার হাড্ডি পাহাড় হইতে সৃষ্টি করা হইয়াছে বলিয়া উহা শক্ত ও সুদৃঢ় হইয়াছে। তাহার অন্তর ফেরদাউসের মাটি হইতে সৃষ্টি করা হইয়াছে বলিয়া উহা ঈমান ও বিশ্বাসের স্থান হইয়াছে। আর তাঁহার জিহ্বা তায়েফের মাটি হইতে তৈরী হইয়াছে বলিয়া উহা সাক্ষ্য দানের স্থান হইয়াছে।
পরম কৌশলী আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম (আঃ) এর দেহে সর্বমোট নয়টি দরজা রাখিয়াছেন। তন্মধ্যে সাতটি হইল মস্তকে, যেমন- (১) দুই চক্ষু, (২) দুই কর্ণ, (৩) দুই নাসিকার ছিদ্র এবং (৪) মুখগহ্বর। অবশিষ্ট দুইটি কোমরের নীচে- বাহ্যনালী ও প্রস্রাব-নালী শরীরের নির্দিষ্ট স্থানে সন্নিবেশিত হইয়াছে।
আর আল্লাহ তা'আলা চক্ষুদ্বয়ে দর্শন শক্তি, কর্ণদ্বয়ে শ্রবণ শক্তি, নাসিকায় ঘ্রাণশক্তি, জিহ্বায় আস্বাদন শক্তি, হাতদ্বয়ে স্পর্শ শক্তি এবং পদদ্বয়ে চলন শক্তি প্রদান করিয়াছেন। বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ তা'আলা যখন হযরত আদম (আঃ) কে রূহদান করিতে ইচ্ছা করিলেন, তখন রূহ্‌কে আল্লাহ তাঁহার মুখে বা মস্তকে প্রবেশ করিতে নির্দেশ দিলেন। উহা মস্তকে প্রবেশ করতঃ দুইশত বৎসর পর্যন্ত হযরত আদম (আঃ) এর মস্তকে বিচরণ করিয়া চক্ষুদ্বয়ে অবতরণ করে। তখন হযরত আদম (আঃ) স্বীয় দেহ-কাঠামোর প্রতি নজর করিয়া সমস্ত শরীর অবলোকন করিলেন। আর যখন রূহ কর্ণে প্রবেশ করিল তখন তিনি ফেরেশতাগণের তাসবীহ্ পাঠ শ্রবণ করিলেন। অতঃপর রূহ্ নাসিকায় প্রবেশ করিয়া হাঁচি ছাড়িতে না ছাড়িতে পুনরায় মুখ ও কর্ণদ্বয়ে প্রবেশ করিল। তখন আল্লাহ পাক তাঁহাকে 'আলহামদুলিল্লাহ্' অর্থাৎ সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য বলিতে শিখাইলেন৷ আর হযরত আদম (আঃ) এর হামদ শ্রবণ করিয়া আল্লাহ তাআলা তাঁহাকে ‘ইয়ারহামু কাল্লাহ' অর্থাৎ আল্লাহ তোমাকে রহম করিবেন বলিয়া আশীর্বাদ জ্ঞাপন করিলেন। তারঃপর রূহ্ বক্ষস্থলে প্রবেশ করিলে হযরত আদম (আঃ) তাড়াতাড়ি দণ্ডায়মান হইতে সচেষ্ট হইলেন, কিন্তু কিছুতেই দণ্ডায়মান হইতে পারিলেন না। এই জন্যই আল্লাহ তা'আলা বলিয়াছেন "ওয়া কানাল্ ইনছানু আজুলা" অর্থাৎ “মানুষ অত্যন্ত চপলমতি ও জলদিবাজ”। 
[এ পর্বে শিক্ষনীয় যে হাঁচি দেয়ার পর 'আলহামদুলিল্লাহ্' ও শ্রবনকারী 'ইয়ারহামুকাল্লাহ্' বলিবে]

পরবর্তী পর্ব

দাকায়েকুল আখবার- (৫) হযরত আদম সফীউল্লাহ (আঃ)-এর সৃষ্টি রহস্য


📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ৫)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

হযরত আদম সফীউল্লাহ (আঃ)-এর সৃষ্টি রহস্য 
হযরত ইবনে আব্বাস (রঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে তিনি বলিয়াছেন আল্লাহ্ তা'আলা হযরত আদম  আলাইহিস্সালাম-কে বিভিন্ন দেশের মাটি হইতে সৃষ্টি করিয়াছেন। পবিত্র কাবা শরীফের মাটি হইতে মস্তক, দোহনার মাটি হইতে বক্ষস্থল, ভারত বর্ষের মাটি হইতে উদর ও পিট, হস্থদ্বয় পূর্ব দেশের মাটি হইতে পয়দা করিয়াছেন।
হযরত ওয়াহ্হাব ইবনে মাম্বা (রঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, "আল্লাহ্ তা'আলা সপ্তস্তরের মৃত্তিকা হইতে হযরত আদম আলাইহিস্সালামের সপ্তঅঙ্গ সৃষ্টি করিয়াছেন। যেমন- প্রথম স্তরের মাটি হইতে তাহার মস্তক, দ্বিতীয় স্তরের মাটি হইতে তাহার ঘাড়, তৃতীয় স্তরের মাটি হইতে তাহার বক্ষস্থল, চতুর্থ স্তরের মাটি হইতে তাহার হস্তদ্বয়, পঞ্চম স্তরের মাটি হইতে তাহার উদর ও পিট, ষষ্ঠ স্তরের মাটি হইতে তাহার উরুদ্বয় ও নিতম্ব এবং সপ্তম স্তরের মাটি হইতে তাহার পদদ্বয় সৃষ্টি করিয়াছেন। 

পরবর্তী পর্ব

দাকায়েকুল আখবার- (৪) নূরে মুহাম্মদীর দর্শনের তারতম্যের ফজিলত


📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ৪)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

নূরে মুহাম্মদীর দর্শনের তারতম্যের ফজিলত-
আল্লাহ তা'আলা পূর্বোল্লিখিত আত্মাসমূহকে নূরে মুহম্মদী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করিতে নির্দেশ করেন। এই আত্মাসমূহের মধ্যে যাহারা নূরে মুহম্মদী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর পবিত্র মস্তক দেখিয়াছেন তাহারা পরিণামে খলিফা ও বাদশা হইয়াছেন যাহারা পবিত্র মুখমন্ডল দেখিতে পাইয়াছেন, তাহারা ন্যায় পরায়ন, আমীর ও সাধক হইয়াছেন। যাহারা কর্ণ দ্বয় দেখিতে পাইয়াছেন তাহারা সত্যের সাধক হইয়াছেন। যাহারা চক্ষুদ্বয় দেখিতে পাইয়াছেন, তাহারা পবিত্র কুরআন শরীফের তত্বাবধায়ক হইবার সৌভাগ্য লাভ করিয়াছেন। ভ্রূদ্বয়ের দর্শকগণ ভাগ্যবান হইয়াছেন। যাহারা গন্ডদ্বয় দেখিয়াছেন, তাহারা বুদ্ধিমান ও চরিত্রবান হইয়াছেন। যাহারা পবিত্র নাসিকা দেখিযাছেন তাহারা হেকিম, ডাক্তার ও সুগন্ধি বিক্রেতা হইয়াছেন। আর যাহারা ওষ্ঠ মুবারক দেখিয়াছেন, তাহারা রূপবান ও উযির হইয়াছেন। যাহারা মুখ গহবর দেখিয়াছেন , তাহারা রোযাদার হইয়াছেন। দন্তরাজির দর্শকগণ সুন্দর সুন্দর নর-নারী হইয়াছে।  রশনা মুবারকের দর্শকগণ রাজদূত হইয়াছে। হল্কুমের দর্শকগণ বক্তা, মুয়াজ্জিন ও উপদেষ্টা হইয়াছে। শ্মশ্রু মুবারকের দর্শকগণ ধর্মযোদ্ধা হইয়াছেন। বাহুদ্বয়ের দর্শকগণ তীরন্দাজ ও তরবারি যোদ্ধা হইয়াছেন।  ডান বাহুর দর্শকগণ নাপিত হইয়াছে। বামবাহুর দর্শকগণ জল্লাদ ও বীর পুরুষ হইয়াছে। ডান হস্তের দর্শকগণ সাব্বাক ও শিল্পী হইয়াছে। বাম হস্তের দর্শকগণ কয়াল হইয়াছে। উভয় হস্তের দর্শকগণ দানবীর ও বিজ্ঞ হইয়াছে। হাতের পিট দর্শকগণ কৃপণ অসৎ হইয়াছে। ডান হস্তের পিট দর্শকগণ রন্জক হইয়াছে। বাম হস্তের পিট দর্শকগণ কাঠুরিয়া হইয়াছে। অঙ্গুলি দর্শকগণ লেখক ও মুন্সি হইয়াছে। ডান হস্তের অঙ্গুলির পিট দর্শকগণ দর্জি হইয়াছে। বাম হস্তের অঙ্গুলির পিট দর্শকগণ কর্মকার হইয়াছে। বক্ষ দর্শকগণ আলেম, মুস্তাহীদ, চিন্তাবিদ ও কৃতজ্ঞ হইয়াছে। পৃষ্ঠ দর্শকগণ ধর্মানুরাগী হইয়াছে। কপাল দর্শকগণ গাজী হইয়াছে। উদর দর্শকগণ স্বল্পেতুষ্ট ও সংসার ত্যাগী হইয়াছে। হাটু দ্বয় দর্শকগণ রুকু সিজদাহ্কারী হইয়াছে। পদদ্বয় দর্শকগণ শিকারী হইয়াছে। পদতম দর্শকগণ পর্যটক হইয়াছে। ছায়া মুবারক দর্শকগণ গায়ক ও রুটি প্রস্তুতকারক হইয়াছে। যাহারা তাহাকে দেখিতে পায় নায় তাহারাই খোদায়ী দাবীদার ফেরাউন, নমরুদ ও অন্যেন্য কাফের রূপে পরিগনিত হইয়াছে। যাহারা তাহার প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করা সত্বেও দেখিতে পায় নাই তাহারা ইহুদী, নাসারা, অগ্নি-উপাসক ইত্যাদিরুপে পরিগনিত হইয়াছে। 
আল্লাহ্ তা'আলা হুজুর করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর আহমদ নামের আকৃতিতে নামাযকে সৃষ্টি করিয়াছেন। যেমন নামাযে দন্ডায়মান হওয়া  'আলিফ' অক্ষর সদৃশ। রুকুর অবস্থা 'হা'-অক্ষর সদৃশ। সিজদাহ্ করা 'মিম' অক্ষর সদৃশ এবং নামাজের বৈঠক ও উপবেশন 'দাল' অক্ষর সদৃশ।আল্লাহ্ তা'আলা মানুষকে হুজুর করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর 'মুহাম্মদ' (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) নামের আকৃতিতে পয়দা করিয়াছেন। যেমন 'মিম' অক্ষরের মত মানুষের মস্তক গোলাকার। হস্তদ্বয় 'হা' অক্ষরের মত বাকা। উদর দ্বিতীয় 'মিম' অক্ষরের মতও মোটা ও গোল এবং পদদ্বয় 'দাল' অক্ষরের ন্যায়। এই কারণে কোন কাফের মানবাকৃতিতে দোযকের অনলকুন্ডে নিক্ষিপ্ত হইবেনা। বরং কাফেরকে শুকরের আকৃতিতে দোযকের মধ্যে নিক্ষিপ্ত করা হইবে।
(ওয়াল্লাহু আ'লামু বিছ্ছাওয়াব)
[আল্লাহ্ তা'আলা-ই ইহার অধিক ভাল জানেন]

পরবর্তী পর্ব

দাকায়েকুল আখবার- (৩) হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সঃ)-এর সৃষ্টি রহস্য



📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ৩)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

হযরত মুহাম্মদ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উনার সৃষ্টি রহস্য-
হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ্ তা'আলা সর্বপ্রথম 'শাজ্বরাতুল্ ইয়াকীন' নামে চারি কান্ড বিশিষ্ট একটি বৃক্ষ সৃষ্টি করেন। তারপর নুরে মুহম্মদীকে ময়ুর আকৃতিতে শুভ্র মুক্তার আবরনের মধ্যে সৃষ্টি করিয়া উক্ত বৃক্ষের উপর রাখিয়া দেন। সত্তর হাজার বৎসর তিনি এরুপ অবস্থায় আল্লাহ্ তা'আলার তাসবীহ পাঠে নিবিষ্ট থাকেন।
অতঃপর আল্লাহ তা'আলা লজ্জার আয়না তৈরী করিয়া তাঁহার সন্মুখে রাখেন। তিনি যখন স্বীয় সুন্দর লাবণ্যময় জাঁকজমকপূর্ণ ছবি আয়নার মধ্যে দেখতে পান, তখন লজ্জিত হইয়া আল্লাহ্ তা'আ'লাকে অবনত মস্তকে পাঁচবার সিজদাহ করেন। এই কারণেই হযরত মুহম্মদ মুস্তফা (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)  উনার উম্মতের উপর দৈনিক নির্দিষ্ট সময়ে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরয হইয়াছে। আল্লাহ তা'আলা পুনরায় যখন উক্ত নুরের প্রতি দৃষ্টিপাত করেন, তখন উহা আল্লাহ'র ভয়ে লজ্জিত ও ঘর্মাক্ত হইয়া যায়। আল্লাহ তা'আলা তাঁহার মাথার ঘর্ম হইতে ফেরেশতাদিগকে এবং মুখমন্ডলের ঘর্ম হইতে আরশ-কুরসি, লৌহ-মাহফুজ, কলম, চন্দ্র, সূর্য, পর্দা সমুহ, তারকারজি এবং আকাশস্থিত যাবতীয় বস্তু পয়দা করেন। আর কর্ণদ্বয়ের ঘর্ম হইতে ঈহুদী, নাসারা, অগ্নি উপাসক এবং অন্যেন্য অনুরূপ জাতীসমূহের আত্মা সৃষ্টি করেন। তাহার পদদ্বয়ের ঘর্ম হইতে ভূমন্ডলস্থিত সমুদয় বস্তু সামগ্রী সৃষ্টি করেন।
তারপর আল্লাহ্ তা'আলা নূরে মুহম্মদী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) -কে সম্মুখের দিকে তাকাইতে আদেশ করেন। তিনি সম্মুখ পানে দৃষ্টি নিক্ষেপ করিলে তাঁহার সম্মুখে, পশ্চাতে, উত্তরে, দক্ষিণে যতাক্রমে হযরত আবুবকর (রঃ) হযরত ওমর (রঃ), হযরত ওসমান (রঃ) এবং হযরত আলী (রঃ) এর নূর দেখিতে পান। অতঃপর নূরে মুহম্মদী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) সত্তর হাজার বৎসর পর্যন্ত আল্লাহ'র তসবীহ পাঠ করেন। লাল লোহিত আকীক পাথরে একটি লন্ঠন বা ফানুস তৈরি করিয়া হযরত মুহাম্মদ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) -কে নামাজের সুরতে উহাতে বসাইয়া রাখেন। অতঃপর উল্লিখিত আত্মাসমূহ নুরে মুহাম্মদী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) -কে এক লক্ষ বৎসর পর্যন্ত তাওয়াফ করেন এবং তাসবীহ তাহলীল পাঠ করিয়া কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। 

পরবর্তী পর্ব

দাকায়েকুল আখবার- (২) সমস্ত নবী-রসূলদের থেকে সফত গ্রহণ


📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ২)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

সমস্ত নবী-রসূলদের থেকে সফত গ্রহণ-
আল্লাহ তা'আলা নূরে মুহাম্মদী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) হইতে সমস্ত রূহ সৃষ্টি করিয়া তাহাদের নিকট হইতে “আমি কি তোমাদের প্রতিপালক নই” বলিয়া স্বীকৃতি তলব করিলেন। তখন সর্বপ্রথম মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) হাঁ বলিয়া স্বীকৃতি প্রদান করিলেন। তারপর আল্লাহ তা'আলা নূরে মুহাম্মদীর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) দ্বারা সমস্ত নবীগণের নূরকে ঢাকিয়া ফেলিলেন। তখন নবীগণের নূর চাহিয়া দেখিল যে, তাহাদের উপর একেকটি নূর চমকাইতেছে। তাহারা এই নূরের পরিচয় জানিতে চাহিলে আল্লাহ তা'আলা বলিলেন , “ইহা নূরে মোহাম্মদী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ! তোমরা যদি তাঁহার উপর ঈমান আনয়ন কর তাহা হইলে আমি তোমাদিগকে নবী পদ দান করিব। "তখন তাহারা প্রত্যেকেই মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উনাকে  সাইয়্যেদুল মুরছালীন বলিয়া ঈমান আনয়ন করিলেন এবং এই উছিলায়ই তাহারা নবী পদপ্রাপ্ত হইলেন।
আল্লাহ তা'আলা হইলেন, 'রাব্বুল আলামীন' এবং রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) হইলেন ‘রহমতুল্লিল আলামীন'। সমস্ত সৃষ্টজগত রসূলুল্লাহর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) রহমতের অণুকণা ধারণ করিয়া টিকিয়া রহিয়াছে এবং থাকিবে। আল্লাহ তা'আলার পূর্ণ পরিচয় একমাত্র রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ছাড়া আর কেহই লাভ করিতে পারে নাই এবং পারিবেও না। এইজন্য রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উনাকে মহব্বত করিলেই আল্লাহ তা'আলার মহব্বত লাভ করা যাইবে। অন্যথায় আল্লাহ তা'আলার মহব্বত ও কুদরত হাসিল করা কোন মতেই সম্ভব হইবে না। এইজন্যই পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করা হইয়াছে, “যদি তোমরা আল্লাহর সহিত বন্ধুত্ব করিতে চাও তাহা হইলে আমার এত্তেবা ও অনুসরণ কর। তবেই আল্লাহ তা'আলা তোমাদিগকে বন্ধুরূপে কবুল করিবেন।”
আল্লাহুম্মা আতিনা হুব্বাকা ওয়া হুব্বা রাসূলিকা মুহাম্মাদিন্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)।

পরবর্তী পর্ব

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...