রবিবার, ১৯ মে, ২০২৪

দাকায়েকুল আখবার- (২৭) সিঙ্গা ফুৎকারে প্রাণী জগতের অস্থিরতা



📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ২৭)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

সিঙ্গা ফুৎকারে প্রাণী জগতের অস্থিরতা-
হযরত ইস্রাফীল (আঃ)-এর প্রথম ফুৎকারের ভীষণ শব্দে সমস্ত প্রাণী অস্থির, বেকারার হইয়া যাইবে; কিন্তু যাহাদিগকে আল্লাহ পাক রক্ষা করিবেন, তাহারা অস্থির হইবে না। প্রথম ফুৎকারের সাথে সাথে পাহাড়-পর্বত উড়িয়া যাইবে, নভোমণ্ডলও নদীবক্ষে আন্দোলিত নৌকার মত প্রকম্পিত ও দুলিতে থাকিবে। গর্ভবতীদের গর্ভ নষ্ট হইয়া যাইবে। মাতা স্বীয় দুগ্ধপোষ্য শিশুর কথা বিস্মৃত হইবে। আর শয়তানগণ এদিক সেদিক পলায়ন করিতে থাকিবে এবং তারকাপুঞ্জ তাহাদের উপর বর্ষিতে থাকিবে। চন্দ্র-সূর্য গ্রহণ আরম্ভ হইবে ও তাহাদের উপর নভোমণ্ডলকে বিস্তৃত করিয়া দেওয়া হইবে। বালক বৃদ্ধ হইয়া যাইবে। যেমন আল্লাহ পাক ঘোষণা করিয়াছেন- (“ইন্না যাল্যালাতুছ্ ছাআতি শাইউন্‌ আজীম”।) “অবশ্যই প্রলয় কম্পন অত্যন্ত ভয়াবহ জিনিস”। এই অবস্থা চল্লিশ বৎসর পর্যন্ত দীর্ঘ হইবে।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এই আয়াত পাঠ করিলেন যে, “হে মানব সকল! তোমাদের প্রতিপালককে ভয় কর, নিশ্চয়ই কিয়ামতের কম্পন অতি ভীষণ।” তারপর তিনি সাহাবাদিগকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “এই অবস্থা কখন হইবে বলিতে পার?” সাহাবাগণ আরজ করিলেন, “আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূল অধিকতর জ্ঞানী।” তিনি বলিলেন, “এই অবস্থা সেইদিন হইবে, যেদিন আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম (আঃ)-কে ডাকিয়া বলিলেন-'হে আদম উঠ এবং তোমার গোনাহগার সন্তানদিগকে দোযখে প্রেরণ কর। তখন হযরত আদম (আঃ) ফরিয়াদ করিবেন, হে আল্লাহ! প্রতি হাজার হইতে কি পরিমাণ প্রেরণ করিব?' আল্লাহ তা'আলা বলিবেন, 'হে আদম! প্রতি হাজার হইতে একজনকে বেহেশতের জন্য রাখিয়া অবশিষ্ট নয়শত নিরানব্বইজনকে দোযখে পাঠাও।' এইকথা সাহাবাদের নিকট অত্যন্ত ভারী মনে হইল এবং তাঁহারা বিষণ্নচিত্তে কাঁদিতে লাগিলেন। তারপর হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করিয়া সাহাবাদিগকে উদ্দেশ্য করিয়া বলিলেন, “আমার আশা, অবশ্যই তোমরা এক-চতুর্থাংশ বেহেশ্তী হইবে।” আঁ হযরত (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) পুনরায় বলিলেন, “আমি আশা করি নিশ্চয়ই তোমাদের অর্ধাংশ বেহেশ্তী হইবে।” ইহা শ্রবণ করিয়া সাহাবাগণ সন্তুষ্ট হইলেন। হুযুর করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আরও বলিলেন, “তোমরা খোশ খবরী গ্রহণ কর যে, তোমরা অন্যান্য উম্মতের তুলনায় একপাল উটের ভিতর একটি বকরী তুল্য হইবে এবং তোমরাই হাজারের মধ্যে একজন হইবে।”

হযরত আবু হোরাইরা (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করিয়াছেন, “আল্লাহ পাক তাঁহার একশত রহমতের একভাগ মাত্র জগতের কীট-পতঙ্গ, পশু-পক্ষী, মানব-দানব ইত্যাদিকে দান করিয়াছেন।” এই একভাগের ফলেই তাহারা পরস্পরে স্নেহ-মমতা, প্রেম-প্রণয় ও ভালবাসায় মত্ত হয়। আর আল্লাহ তা'আলা স্বীয় অবশিষ্ট নিরানব্বই রহমত দ্বারা রোজ কিয়ামতে বান্দাদের প্রতি রহমত ও দয়া করিবেন। তারপর আল্লাহ পাক হযরত ইস্রাফীল (আঃ)-কে মৃত্যুর জন্য সিঙ্গা ফুঁকিবার নির্দেশ দিবেন। অমনি তিনি, হে উলঙ্গ রূহ সকল! যথাশীঘ্র আল্লাহর হুকুমে বাহির হইয়া যাও, বলিয়া জোরে সিঙ্গার ফুৎকার প্রদান করিবেন। তখনই নভোমন্ডলের ও ভূমণ্ডলের সবকিছু মৃত্যু-মুখে পতিত হইবে; কিন্তু শহীদগণ আল্লাহর অভিপ্রায়ে রক্ষা পাইবে। যেমন এরশাদ হইয়াছে- (“ওয়ালা তাছাবান্নাল্লাজিনা কুতিলু ফী ছাবিলিল্লাহি আওয়াতা, বাল্ আহইয়াউন্ ইন্দা রাব্বিহিম ইউরযাকুন!”) "যাহারা আল্লাহর পথে নিহত হইয়াছে, তাহাদিগকে মৃত মনে করিও না, বরং তাহরা স্বীয় প্রতিপালকের নিকট জীবিত থাকিয়া উপজীবিকা আস্বাদন করিতেছে"। হাদীস শরীফে আছে যে, আল্লাহ তা'আলা শহীদগণকে পাঁচটি শ্রেষ্ঠ মর্যাদা প্রদান করিতেছেন, যাহা নবীগণকেও দান করেন নাই। এই প্রসঙ্গে হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করিয়াছেন – (১) সমস্ত শহীদগণের রূহ আল্লাহ তা'আলা কবজ করেন, কিন্তু আমার ও অন্যান্য নবীগণের রূহ আজরাইল (আঃ) কবজ করিয়া থাকেন। (২) মৃত্যুবরণের পর সমস্ত নবীগণকে গোসল দেওয়া হয়, এমন কি আমাকেও গোসল দেওয়া হইবে, কিন্তু শহীদগণকে গোসল দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। (৩) আমার এবং অন্যান্য নবীগণের জন্য ভিন্ন কাফন দিতে হয়, কিন্তু শহীদগণের ভিন্ন কাফনের দরকার হয় না। (৪) আমাকে এবং অন্যান্য নবীগণকে মৃত বলিয়া অভিহিত করা যায়, কিন্তু শহীদগণকে মৃত বলিয়া আখ্যায়িত করা যায় না। (৫) আমি এবং অন্যান্য নবীগণ আল্লাহ তা'আলার নিকট নিজ নিজ উম্মতের জন্য সুপারিশ করিবেন, কিন্তু শহীদগণ রোজ কিয়ামতে সমস্ত উম্মতের জন্য শাফায়াত করিবেন। 
আরও বর্ণিত আছে যে, রোজ কিয়ামতে আল্লাহ তায়ালা বারজনকে মৃত্যুর হাত হইতে রক্ষা করিবেন। তাহারা হইবেন -(১) হযরত জিব্রাইল (আঃ), (২) হযরত মিকাইল (আঃ), (৩) হযরত ইস্রাফীল, (আঃ) (8) আজরাইল (আঃ) এবং আরশ বহনকারী আটজন (৫-১২) বিশিষ্ট ফেরেশ্তা। তখন সৃষ্টজগতে জ্বিন-ইন্‌সান, পশু-পক্ষী ও মানব, শয়তান বলিতে কিছুই থাকিবে না। তারপর আল্লাহ তায়ালা আজরাইল (আঃ) কে উদ্দেশ্য করিয়া হুকুম করিবেন, “হে আজরাইল (আঃ)! আমি তোমার নিমিত্ত পূর্ববর্তী ও পরবর্তী মানুষের সমতুল্য সাহায্যকারী পয়দা করিয়াছি আর তোমাকে সাত আকাশ ও ভূমণ্ডলের সৃষ্ট পদার্থের সমতুল্য শক্তি প্রদান করিয়াছি। আজ তোমাকে গজব ও ক্রোধের লেবাছে সাজাইতেছি। যাও, এই মুহূর্তে ইবলিস্ শয়তানের উপর ভীমনাদে আক্রমণ কর এবং পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত মানব-জ্বিনের দ্বিগুণ, চতুগুণ কষ্ট সহকারে তাহার রূহ কবজ কর আর তোমার সহকারী সত্তর হাজার দোজখের ফেরেশতাকে 'লজ্জা' নামক দোজখ হইতে সত্তর হাজার জিঞ্জির সঙ্গে লইতে নির্দেশ কর।” তারপর আজরাইলের নির্দেশক্রমে দোযখের দরওয়াজা খুলিয়া যাইবে এবং সত্তর হাজার দোযখের ফেরেশ্তা সমসংখ্যক জিঞ্জির লইয়া তাঁহার সামনে উপস্থিত হইবে। তখন আজরাইল এমন ভয়ঙ্কর মূর্তি ধারণ করিবেন যে, যদি সাত আকাশ ও ভূমণ্ডলের অধিবাসীবৃন্দ তাঁহার সেই মূর্তি অবলোকন করিত, তবে সকলেই মরিয়া যাইত। আজরাইল (আঃ) অভিশপ্ত ইবলিসকে দেখিয়াই এমন জোরে ধমক দিবেন যে ইহাতে সে বেহুঁশ হইয়া যাইবে এবং ভয়ঙ্কর শব্দ করিতে শুরু করিবে। যদি নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের অধিবাসীগণ তাহার সেই বিকট শব্দ শ্রবণ করিত তবে সকলেই বেহুঁশ হইয়া যাইত।
অতঃপর আজরাইল (আঃ) তাহাকে রুদ্ররোষে বলিবেন, 'হে পাপিষ্ট! অপেক্ষা কর! এখনই তোকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করাইতেছি। তুই দীর্ঘদিন জীবমান ছিলি, আর তোর দ্বারা অনেক লোক পথভ্রষ্ট হইয়াছে।” ইহা শ্রবণ করিয়া ইবলিস্ পূর্ব প্রান্তে পলায়ন করিতে ছুটিয়া যাইবে, কিন্তু সেখানেও হযরত আজরাইল (আঃ) কে দেখিতে পাইবে। পুনরায় সে পৃথিবীর পশ্চিম প্রান্তে গিয়া আত্মগোপন করিতে চেষ্টা করিবে কিন্তু সেখানেও আজরাইল (আঃ)-কে দেখিতে পাইবে। পরিশেষে নিরুপায় হইয়া পৃথিবীর মধ্যস্থলে হযরত আদম (আঃ) এর কবরের পার্শ্বে উপস্থিত হইয়া বলিবে- 'হে আদম! তোমারই জন্য আমি লাঞ্ছিত ও অপমানিত হইয়াছি এবং আল্লাহর করুণা হইতে বঞ্চিত হইয়াছি। তারপর আজরাইল (আঃ) কে জিজ্ঞাসা করিবে, “হে আজরাইল! বল কিরূপে তুমি আমার প্রাণ বধ করিবে?" আজরাইল (আঃ) বলিবেন, 'হে দুরাত্মা ইবলিস! সায়ীর নামক জাহান্নামের শাস্তি ও আগুনের পাত্র দ্বারা তোর পাপাত্মাকে সংহার করিব।" তারপর ইবলিস্ ভূমিতে গড়াগড়ি দিতে থাকিবে। তখন দোযখের ফেরেশতাগণ কালালিবের অস্ত্র দ্বারা তাহাকে চতুর্দিক হইতে আঘাত করিতে থাকিবে এবং তীর ও বর্শার দ্বারা তাহাকে ক্ষত-বিক্ষত করিবে। আবশেষে জীবনপাতের কঠিন যন্ত্রণা ভোগ করিয়া ইবলিস্ মৃত্যুমুখে পতিত হইবে।

পরবর্তী পর্ব
মাখলুকাতের লয়প্রাপ্তি

দাকায়েকুল আখবার- (২৬) সিঙ্গায় ফুৎকার, পুনরুত্থান ও হাশরের বিবরণ



📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ২৬)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

সিঙ্গায় ফুৎকার, পুনরুত্থান ও হাশরের বিবরণ-
সিঙ্গার তত্ত্বাবধানকারী হইলেন হযরত ইস্রাফীল (আঃ)। আল্লাহ তা'আলা লৌহে মাহফুজকে আকাশ ও পৃথিবীর মাঝখানের দূরত্বের সাতগুণ বেশী প্রশস্ত সাদা মণিমুক্তা দ্বারা তৈরী করিয়া আরশের সহিত ঝুলন্ত রাখিয়াছেন। রোজ কিয়ামত পর্যন্ত যাহা কিছু সংঘটিত হইবে, সবকিছুই ইহাতে লিখা রহিয়াছে।

হযরত ইস্রাফিল (আঃ)এর চারিটি পাখা রহিয়াছে। প্রথমটি পূর্বদিকে, দ্বিতীয়টি বিস্তৃত রহিয়াছে। আর তৃতীয়টির উপর তিনি নিজে অধিষ্ঠিত আছেন। চতুর্থটি দ্বারা তিনি আল্লাহ তা'আলার ভয়ে নিজ মুখমণ্ডল এবং মাথা আচ্ছাদিত রাখিয়াছেন। আল্লাহ তা'আলার ভয়ে তিনি এতই ভীত ও লজ্জিত যে, নিজ পাখায় মাথা ঢাকিয়া আরশে মোয়াল্লার খাম্বা বুকে রাখিয়া আনত মস্তকে পড়িয়া রহিয়াছেন আর আল্লাহ তা'আলার ভযে ক্ষুদ্র পাখীর মত সংকুচিত থাকেন। আল্লাহ তা'আলা যখন ‘লৌহে মাহফুজে' কোন আদেশ-নিষেধ জারী করেন, তখন তিনি নিজ মুখের পর্দা খুলিয়া উহার দিকে লক্ষ্য করেন। হযরত ইস্রাফিল (আঃ) অন্যান্য ফেরেশ্তাদের তুলনায় আরশের অতি নিকটে রহিয়াছেন। তবুও তাঁহার এবং আরশের মধ্যে সত্তর হাজার পর্দা রহিয়াছে। একটি হইতে অন্যটির দূরত্ব পাঁচশত বৎসরের রাস্তা। অনুরূপ হযরত ইস্রাফিল (আঃ) ও হযরত জিব্রাইল (আঃ) এর মধ্যে সত্তর হাজার পর্দা রহিয়াছে এবং দুই পর্দার দূরত্ব পাঁচশত বৎসরের রাস্তা। তিনি স্বীয় দক্ষিণ রানের উপর সিঙ্গা সংস্থাপন করতঃ উহার অগ্রভাগ মুখে দিয়া আল্লাহ তা'আলার নির্দেশের অপেক্ষায় সতর্ক রহিয়াছেন। আল্লাহর নির্দেশে তিনি উহাকে সজোরে ফুৎকার দিবেন। যখন পৃথিবীর আয়ু শেষ হইয়া আসিবে, তখন উহা তাহার কপালের সন্নিকট হইবে। তারপর তিনি আল্লাহর নির্দেশে নিজ পাখাগুলি দেহের উপর একত্রিত করতঃ খুব জোরে সিঙ্গা বাজাইবেন। এমন সময় হযরত আজরাইল (আঃ) সাত যমিনের নীচে একহাত ও আকাশের উপরে অন্যহাত রাখিয়া ইহাদের বাসিন্দাদের প্রাণ সংহার, করিবেন। পরিশেষে পৃথিবীতে ইবলিস্ মরদুদ ও আকাশে হযরত জিব্রাইল (আঃ), হযরত মিকাইল (আঃ) হযরত ইস্রাফিল (আঃ) ও হযরত আজরাইল (আঃ) এবং আল্লাহ তা'আলা যাহাদিগকে রক্ষা করিবেন, তাহাদের ব্যতীত অন্য সকলেই মৃত্যুবরণ করিবে। যেমন পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করা হইয়াছে,- (“ওয়া নুফিখা ফিছ্ছুরী ফাছাইক্বা মান্ ফিছ ছামাওয়াতি ওয়াল্ আরদ্বি ইল্লা মান্ শাআল্লাহ্”)  "সিঙ্গা ফুৎকারের সাথে সাথে নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের সকলেই বেহুঁশ হইয়া পড়িবে; কিন্তু আল্লাহ তা'আলা যাহাদিগকে মর্জি করিবেন, তাহারা নিরাপদ থাকিবে"।

হযরত আবু হোরায়রা (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, বিশ্বনবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিয়াছেন—“আল্লাহ তা'আলা হযরত ইস্রাফিল (আঃ)-এর সিঙ্গাকে চারি শাখাবিশিষ্ট তৈরী করিয়াছেন। সিঙ্গার দুই শাখা পূর্ব-পশ্চিমে প্রলম্বিত রহিয়াছে। তৃতীয় শাখা সাত যমিনের নীচে ও চতুর্থ শাখা সাত 'আকাশের উপরে স্থাপিত। উহাতে রূহের আকারানুসারে অসংখ্য ছিদ্র রহিয়াছে; যেমন নবীগণের রূহের জন্য একটি, জ্বিনদের রুহের জন্য একটি, মানবাত্মার জন্য একটি, শয়তানের জন্য একটি ইত্যাদি। তাহা ছাড়া জীব-জন্তু, পোকা-মাকড় এমনকি মশা-মাছির জন্যও এক একটি ছিদ্র রহিয়াছে। হযরত ইস্রাফিল (আঃ)-কে আল্লাহ তা'আলা সেই কাজে নিয়োগ করিয়াছেন। অতএব তিনি সর্বদা সিঙ্গা মুখে করিয়া আল্লাহ তা'আলার নির্দেশের অপেক্ষায় আছেন। আল্লাহ তা'আলার হুকুম মাত্র তিনি সজোরে সিঙ্গা ফুৎকার দিবেন। হযরত ইস্রাফিল (আঃ) তিনবার সিঙ্গায় ফুৎকার দিবেন। প্রথমবারে সমুদয় সৃষ্টজীব ভীত ও আতঙ্কগ্রস্ত হইবে। দ্বিতীয় বারে সকলেই মৃত্যুবরণ করিবে। তৃতীয়বারে সবাই পুনরুত্থিত হইবে।”

হযরত হোজায়ফা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-কে জিজ্ঞাসা করিলেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)! সিঙ্গার ফুৎকারে মানুষের অবস্থা কিরূপ হইবে?" প্রত্যুত্তরে হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিলেন, “হে হোজায়ফা! আমার রূহ যাহার হাতে রহিয়াছে তাঁহার শপথ করিয়া বলিতেছি, সিঙ্গা ফুৎকার দেওয়া মাত্রই কিয়ামত সংঘটিত হইবে। এমন অবস্থা হইবে যে, মুখের নিকটে উঠানো লোকমা খাইবার অবসর মিলিবে না-ইহা হস্ত হইতে পড়িয়া যাইবে, পরিধেয় বস্ত্র সামনে থাকিবে সত্য কিন্তু পরিধান করিবার সাহস ও শক্তির অভাব হইবে। পানির পাত্র সামনে থাকিলেও উহা হইতে পানি পান করা অসম্ভব হইবে।

পরবর্তী পর্ব
সিঙ্গা ফুৎকারে প্রাণী জগতের অস্থিরতা-






দাকায়েকুল আখবার- (২৫) জান কবজের পর রূহের কবরে ও গৃহে আগমন



📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ২৫)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

জান কবজের পর রূহের কবরে ও গৃহে আগমন-
হযরত রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করিয়াছেন, “কোন বনী আদম মৃত্যুবরণ করিলে তৃতীয় দিন তাহার রূহ ফরিয়াদ করে, “হে আল্লাহ ! আমাকে নিজের দেহ-খাঁচা ও গৃহ পরিদর্শন করিবার অনুমতি প্রদান করুন।”  তারপর অনুমতি লাভ করিয়া রূহ কবরের দিকে ধাবিত হয় এবং দূর হইতে প্রত্যক্ষ করে যে, তাহার শরীর, মুখ, নাসিকা হইতে পানির স্রোত বহিতেছে। তখন সে অনেকক্ষণ পর্যন্ত ক্রন্দন করতঃ আরজ করে, ‘আমার প্রিয় অসার দেহ! তোমার বিগত জীবনের কথা স্মরণ হইতেছে কি? হায়! এই সমাধিস্থল কত না দুঃখ-বেদনা, আপদ-বিপদ, লজ্জা-অপমান ও চিন্তা-ভাবনার নির্জন নিবাস।' অতঃপর রূহ ফিরিয়া যায়।  পুনরায় রূহ পঞ্চম দিনে ফরিয়াদ করে, হে আল্লাহ! আমাকে নিজের পরিত্যক্ত দেহ-খাঁচা দর্শন করিবার অনুমতি দান করুন। আল্লাহর অনুমতির পর রূহ গোরস্থানে আগমন করতঃ দূর হইতে অবলোকন করে যে, তাহার শরীর, নাক ও মুখ হইতে রক্ত, গলিত পুঁজ ও পচা রক্ত ইত্যাদি বহিয়া পড়িতেছে। তখন রূহ চীৎকার করিয়া বলে, “হে আমার অসহায়, নিঃস্ব দেহ বন্ধু তোমার অতীত জীবনের সুখ ও শান্তির কথা মনে পড়িতেছে কি? হায়! এইস্থান কত না ভীতিপ্রদ! এইস্থান কেবল দুঃখ-কষ্ট, দুশ্চিন্তা, অপমান, কষ্ট-শ্রম, বিভিন্ন প্রকার পোকা-মাকড় ও শ্বাপদ সঙ্কুলের আড্ডা। পোকার দংশনে তোমার দেহ ক্ষত-বিক্ষত ও চামড়া আলগা হইয়া গিয়াছে এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের জোড়া শিথিল হইয়া পড়িয়াছে।' অতঃপর রূহ সেই স্থান হইতে ফিরিয়া যায়। অধিকন্তু সপ্তম দিবসে রূহ পুনরায় আরজ করে, ‘হে আল্লাহ! আমাকে আমার দেহ দর্শন করিবার অনুমতি দান করুন! আল্লাহ তা'আলার অনুমতি লাভ করিয়া রূহ গোরস্থানে গমন করতঃ দূর হইতে আবলোকন করে যে, এইবার সমস্ত শরীরে পোকা পড়িয়া আছে৷ তখন রূহ অত্যন্ত দুঃখ ভারাক্রান্ত হইয়া চীৎকার করিয়া বলে, 'হে আমার নিঃস্ব শরীর! তোমার অতীত জীবনের সুখ-দুঃখের কথা স্মরণে পড়িতেছে কি? আজ তোমার ছেলে-মেয়ে, বাপ-মা, ভাই-বন্ধু, ঘর-দুয়ার, সহায়-সম্পদ ও প্রতিবেশি স্বজনেরা কই? পৃথিবীর জীবনে ইহারা তোমার প্রতি সুপ্রসন্ন ছিল। অদ্য হইতে রোজ কিয়ামত পর্যন্ত উহারা তোমার ও আমার জন্য বিলাপ করতে থাকিবে।
হযরত আবু হোরায়রা (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, হযরত রাসূলে মাকবুল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করয়াছেন- “কোনও বিশ্বাসী বান্দার এন্তেকালের পর তাহার রূহ দীর্ঘ একমাস পর্যন্ত তাহার ঘর-বাড়িতে ঘুরিয়া ফিরিয়া প্রত্যক্ষ করে যে, তাহার পরিবার-পরিজনের সদস্যগণ তাহার পরিত্যক্ত ধন-সম্পদ কেমনভাবে নিজেদের মধ্যে বন্টন করিতেছে এবং কিরূপে তাহার দায়-দেনা আদায় করিতেছে। এইভাবে এক মাসের পর হইতে সুদীর্ঘ এক বৎসর পর্যন্ত রূহ্ শরীর ও গোরের মধ্যে ঘুরিয়া ফিরিয়া অবলোকন করে যে, কোন ব্যক্তি তাহার জন্য প্রার্থনা করিতেছে এবং কে তাহার জন্য চিন্তার ভিতর কাল যাপন করিতেছে।” তারপর ইস্রাফিলের সিঙ্গার ফুৎকার দেওয়া পর্যন্ত মুমিন বান্দার রূহ আত্মার যথার্থ স্থানে তুলিয়া রাখা হয়। এই প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা এরশাদ করিয়াছেন “তানায্যালুল মালাইকাতু ওয়াররূহু ফীহা বিইজনি রাব্বিহিম” অর্থাৎ লাইলাতুল কদরে ফেরেশতাগণ ও রূহ তাহাদের প্রতিপালকের অনুমতিক্রমে অবতীর্ণ হন। এইখানে রূহ শব্দের অর্থ হইল রহমত বা শান্তি, যাহা পৃথিবীর অধিবাসী বান্দাদের উপর নাযিল হয়। অতএব উক্ত শব্দটি রূহ্ কিংবা 'রাউহুন' উভয়ই ধরা যাইতে পারে; তখন ইহার প্রকৃত তাৎপর্য এই দাঁড়ায় যে , ফেরেশ্তাগণের সহিত রূহ অর্থাৎ আল্লাহ পাকের রহমত ও করুণা নাযিল হইয়া থাকে। মতান্তরে বলা যায় যে, রূহ হইল এক মর্যাদাশীল ফেরেশ্তার নাম। যিনি মুমিন বান্দার উপর আল্লাহর রহমত নাযিল করিয়া থাকেন। এই প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা এরশাদ করিতেছেন - “ইয়াউমা ইয়াকুমুর রূহ ওয়াল মালাইকাতু ছাফ্‌ফা” “সেইদিন রূহু এবং ফেরেশ্তামণ্ডলী কাতারবন্দী অবস্থায় দণ্ডায়মান হইবে। কিংবা রূহ্ অর্থ হইল বণি-আদমের রূহ্; অথবা রূহ অর্থ হযরত জিব্রাইল (আঃ)।” আরও বর্ণিত আছে যে , “হযরত মুহাম্মদ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর পবিত্র রূহ আরশের নিম্নদেশ হইতে লাইলাতুল কদরে দুনিয়াতে অবতরণ করিয়া তাঁহার প্রিয় মুমিন উম্মত নারী-পুরুষদিগকে সালাম ও দোয়া করিবার নিমিত্ত আল্লাহ পাকের নিকট অনুমতি প্রার্থনা করিয়া থাকেন। "আরও বর্ণিত আছে যে, রূহ অর্থ হইল মৃত বিশ্বাসী মুসলমানদের আত্মীয়-স্বজনদের রূহ, যাহারা দোয়া করিয়া থাকে, “হে আল্লাহ ! আমাদিগকে নিজেদের নিবাসস্থলে প্রত্যাবর্তন করতঃ নিজ পরিবার-পরিজনদের হালত দর্শন করিবার জন্য অনুমতি প্রদান করুন?”
সুতরাং আল্লাহ তা'আলার অনুমতি লাভ করতঃ তাহারা লাইলাতুল কদরে পূর্ব নিবাসস্থলে উপস্থিত হয়।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, মৃত লোকজন ঈদের দিন অথবা আশুরার দিন অথবা রাত্রিতে অথবা জুমআর দিন অথবা রজব মাসের প্রথম শুক্রবারে অথবা সাবান মাসের পনেরই তারিখের রাত্রে স্বীয় কবর হইতে বহির্গত হইয়া পরিবার-পরিজনদের সন্নিকটে উপস্থিত হইয়া বলে, “হে আমার পরিবার-পরিজনগণ! আজ কিছু টাকা-পয়সা অথবা খাদ্য সামগ্রী দান করিয়া আমার উপকার করিতে সচেষ্ট হও। আজ আমি ভিখারীর মত হইয়াই তোমাদের সমীপে আরজ করিতেছি। যদি তোমরা দান-খয়রাত করিতে সমর্থ না হও, তাহা হইলে এই পবিত্র রাত্রে অন্ততঃ দুই রাকায়াত নামাযে আমার কথা মনে কর!” তারপর রূহ অতিশয় দুঃখ সহকারে বলিয়া থাকে, “হায় ! হায় ! আমাদের জন্য কেহ দোয়া করিবার আছে কি? আমাদের নাম মনে করিবার মত কি কেহই নাই? হে আমাদের গৃহবাসীগণ! হে আমার ভার্যা! হে আমার সুবিশাল দালানের বাসীন্দাগণ! তোমাদের মাঝে আমাদের জন্য কোনও স্মরণকারী ও প্রার্থনাকারী আছে কি? আমরা আজ কবরে পড়িয়া রহিয়াছি। হে আমাদের অর্থ-সম্পদ বন্টনকারী ও সন্তান-সন্ততিদের হেয়কারী! আমাদের এই দুঃখ-বেদনা, অভাব-অভিযোগ ও দৈন্য-দুর্দশা সম্বন্ধে তোমাদের কেহই কি চিন্তা করে না? আমাদের কর্মানুষ্ঠান চিরতরে যদিও বন্ধ হইয়া পড়িয়াছে কিন্তু তোমাদের আমলনামা এখনও বন্ধ হয় নাই। হে প্রিয় বন্ধুগণ! আমাদের জন্য সামান্য রুটি দান বা প্রার্থনা করিতে বিস্তৃত হইও না। কারণ আমরা চির দরিদ্র হইয়া গিয়াছি।” মৃত ব্যক্তি যদি কিঞ্চিত দান, সদ্‌কাহ ও নেক লাভ করিতে পারে তাহা হইলে সে সুখী ও আনন্দিত হইয়া কবরে প্রত্যাবর্তন করে, অন্যথায় চিন্তিত ও বিমর্ষভাবে কবরে প্রবেশ করে।

হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, রূহ হৃদয়ে অথবা দেহস্থ কোন অংশে অবস্থান করে। ইহার প্রমাণস্বরূপ বলা যায় যে, কোন লোক নির্মম প্রহার অথবা কঠিন যন্ত্রণায়ও মৃত্যুমুখে পতিত হয় না আবার অন্য লোক সামান্য আঘাতেই মৃত্যুবরণ করে। ফলে বুঝা যায় যে, সেই আঘাতের স্থানেই রূহ তখন অবস্থান করিয়াছিল। অতএব স্পষ্টতঃই প্রমাণিত হয় যে, রূহ সর্বাবস্থায় শরীরের বিস্তীর্ণ অংশ জুড়িয়া বিরাজ করে না। তবে রূহ যদি কখনও সমস্ত শরীরে অবস্থান করে তাহা হইলে মৃত্যু সমস্ত শরীরে বিকাশ লাভ করিয়া থাকে। আল্লাহ তা'আলার এই নির্দেশই ইহার উজ্জ্বল প্রমাণঃ - “কুল ইউহয়ী হাল্লাজি আন্‌শাআহা আউয়্যালা মাররাহ্” হে নবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)!  আপনি “বলে দিন, যে আল্লাহ প্রথম সৃষ্টি করিয়াছেন, তিনিই পুনর্বার জীবিত করিবেন।” আর যদি ‘রূহ’ ও ‘রূহুয়ান’ এর প্রভেদ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়, তাহা হইলে উত্তরে বলিব যে, এই দুইয়ের মধ্যে কোনই পার্থক্য নাই উভয়ে একই বস্তু। যেমন হাত, পা শরীর হইতে আলাদা বস্তু নহে। উহার শরীরের সাথে যেখানে সেখানে বিচরণ করে, কিন্তু পার্থক্য শুধু এই যে, রূহ নড়াচড়া করে না আর ইহার কোন নির্দিষ্ট জায়গা নাই। আর‘ রূহুয়ান'-এর অবস্থানস্থল হইল ভ্রূযুগলের মধ্যস্থল। রূহ বাহির করিলে মানুষ মারা যায়, আর রূহুয়ান বাহির করিলে মানুষ নিদ্রার কোলে ঢলিয়া পড়ে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে, যদি একটি স্থির পানিপূর্ণ পাত্রে ছিদ্রপথে আলোক রশ্মি পতিত হয়, তবে উহার প্রতিবিম্ব স্পন্দন করিতে থাকে । অনুরূপভাবে রূহ বান্দার শরীরে প্রবেশ করিবার সাথে সাথে ইহার ছায়া আরশে প্রতিফলিত হয় এবং তখন বান্দা খাব দেখে। ইহাকে বলা হয় 'রূহুয়ান।' আর বান্দা যখন নিদ্রাচ্ছন্ন হয়, তখন 'রূহুয়ান' নাসিকার ছিদ্রপথে স্বর্গে আরোহণ করে এ ‘আলমে মালাকুতে' রূহের সান্নিধ্যে হাজির হয়। যদি প্রশ্ন করা হয় যে, ঈমানদার বান্দার রূহ আকাশে উত্থিত হইয়া আত্মার সন্নিধানে উহার খেদমতে ব্যাপৃত হয়, কিন্তু কাফেরের আত্মা তখন কোথায় অবস্থান করে? ইহার উত্তরে বলা হইয়াছে যে, কাফেরের আত্মাও ঊর্ধাকাশে আরোহণে সচেষ্ট হয়, কিন্তু শয়তান কর্তৃক বিকৃত হইয়া ইহারই সহিত ঘুরিতে আরম্ভ করে। যদি জিজ্ঞাসা করা হয় যে আত্মা যখন আকাশে উঠিয়া যায়, তখন শরীরে শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয় না কেন? উত্তর হইবে যে, যদিও রূহ শরীর হইতে পৃথক হইয়া যায় কিন্তু জীবনী শক্তি ও শ্বাস-প্রশ্বাস প্রক্রিয়া বাকী থাকে। কারণ এইগুলি রূহের মধ্যে শামিল নহে। যেমন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, “মানুষ, জিন, ফেরেশতা ও শয়তান এই চারি সম্প্রদায় হইল রূহসম্পন্ন জীব। তাহা ছাড়া অন্যান্য প্রাণী ও জীবের রূহ নাই, কেবল জীবনীশক্তি বা শ্বাস-প্রশ্বাস ক্রিয়া আছে।"

হযরত মুহাম্মদ ইবনে তিরমিজি (রাঃ) বলিয়াছেন যে, রূহ হইল দুই প্রকার। প্রথম প্রকার রূহ শ্বাস-প্রশ্বাস এবং জীবনীশক্তি পরিচালিত করে এবং দ্বিতীয় প্রকার রূহ চলাফেরা ও নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণ করে। এইজন্য নিদ্রিতাবস্থায় চলাফেরার শক্তি লোপ পায় এবং জীবনীশক্তি শ্বাসক্রিয়া সচল থাকে। আর রূহের স্থান সম্বন্ধে বলা হয় যে, রূহ কবজের পর ইহা হযরত ইস্রাফিল (আঃ) শিঙ্গার মধ্যে থাকেন। তাঁহার শিঙ্গায় আদি পিতা হযরত আদম (আঃ) হইতে শুরু করিয়া কিয়ামত পর্যন্ত সৃষ্টজীবের সংখ্যা অনুসারে ছিদ্র রহিয়াছে। সেখানে প্রবেশ করিবার পর পুরস্কারপ্রাপ্তকে পুরস্কার দেওয়া হইবে এবং তিরস্কারপ্রাপ্ত ব্যক্তি তিরস্কৃত হইবে।
হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, মুমিনের রূহ্ বেহেশতের মধ্যে সবুজ পক্ষীর শরীরে পুরিয়া রাখা হয় আর কাফেরের রূহ্ দোযখের সিজ্জিন নামক স্থানে অথবা দোযখের মধ্যস্থিত কালো পাখীর মধ্যে রাখা হয়। আরও বর্ণিত আছে যে, মুমিন বান্দার রূহ কবজ হইবার সাথে সাথে রহমতের ফেরেশতাগণ উহা অত্যন্ত সম্মান ও শ্রদ্ধা সহকারে সপ্তাকাশে উঠাইয়া লইয়া যায়। তখন আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হইতে ঘোষণা করা হয়, “হে ফেরেশতাগণ ! তোমরা তাহার নাম ‘ইল্লিন’ নামক পবিত্র গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করিয়া পুনর্বার শরীরের সঙ্গে সংযুক্ত করিবার জন্য পৃথিবীতে প্রেরণ কর।" নির্দেশানুসারে ফেরেশতাগণ তাহার রূহকে কবরের মধ্যে শরীরের সহিত সংযুক্ত করিয়া বেহেশতের দিকে একটি দরওয়াজা খুলিয়া দেয়। উক্ত দ্বারপথে সে স্বীয় বেহেশত অবলোকন করিতে করিতে রোজকিয়ামত পর্যন্ত সুখে অতিবাহিত করে। 
অপরদিকে কাফেরদের রূহ কবজ করিবার সঙ্গে সঙ্গে আযাবের ফেরেশতা সেই রূহসহ প্রথম আকাশে আরোহণ করিতে সচেষ্ট হইলে, আকাশের দ্বার বন্ধ হইয়া যায় এবং বলা হয় যে, ‘হে ফেরেশতাগণ! তাহার পাপাত্মাকে শরীরের সহিত সংযুক্ত করিয়া দাও।' সুতরাং ফেরেশতাগণ পাপাত্মাকে কবরে দেহের সহিত সংযুক্ত করিয়া দোযখের দিকে একটি দ্বার উন্মুক্ত করিয়া দেয়। ফলে সে দোযখের দুঃখাবাস অবলোকন করিতে করিতে রোজ কিয়ামত পর্যন্ত দুঃখে অতিবাহিত করিবে। এই প্রসঙ্গে মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করিয়াছেন যে, “মৃত ব্যক্তিরা তোমাদের পায়ের আওয়াজ বা জুতার শব্দ শ্রবণ করে কিন্তু তারা কিছুই বলিতে পারে না।”

কোন একজন আলেমকে প্রশ্ন করা হইয়াছিল যে, “হুযুর ! মৃত্যুর পর মানবাত্মার অবস্থান স্থল কোথায়?” উত্তরে তিনি বলিয়াছিলেন যে, নবীদের আত্মা জান্নাতুল আদনে এবং কবরের মধ্যে নিজ শরীরের জন্য শোকাকুল ও আল্লাহ পাকের জন্য সিজদাহ রত থাকে৷ শহীদের আত্মা বেহেশত রাজ্যের মধ্যস্থলে জান্নাতুল ফেরদাউসে সবুজ পাখীর দেহে অবস্থান করে। তাহারা স্বেচ্ছায় বেহেশৃতে বিচরণ করে এবং আরশের নিম্নস্থ ঝুলায়মান ফানুসে বিশ্রাম লাভ করে। আর মুসলমান শিশুদের রূহ বেহেশতি পাখীদের দেহে মেশাক পর্বতের সন্নিকটে কিয়ামত পর্যন্ত অপেক্ষা করে। আর মোশরেক ও মোনাফেকদের শিশুদের রূহ বেহেশতের আনাচে কানাচে পরিভ্রমণ করিতে থাকিবে, কিয়ামত পর্যন্ত তাহাদের নির্দিষ্ট কোন বাসস্থান থাকিবে না। তারপর তাহারা মুমিনদের খাদেম হইবে। ঋণগ্রস্ত ও পরদ্রব্য গ্রাসকারী মুমিনের আত্মা আকাশ ও বাতাসের মাঝে ঝুলন্ত অবস্থায় থাকে৷ ঋণ ও অন্যের হক আদায় না করা পর্যন্ত তাহাদের রূহ আকাশে উঠিতে সক্ষম হয় না অথবা বেহেশতে প্রবেশ করিতে পারে না। পাপে আকৃষ্ট ফাসেক মুসলমানদের আত্মাকে কবরের মধ্যে শরীরের সহিত আযাব করা হয় এবং বিধর্মী, কাফের ও মোনাফেকদের আত্মাকে জাহান্নামে সিজ্জিন নামক স্থানে আজীবন আযাব করা হয়।

আরও বর্ণিত আছে যে, রূহ্ একটি সূক্ষ্মদেহ সৃষ্টজীব। এইজন্য আল্লাহ তায়ালাকে “জিরূহ” বলা যায় না। কারণ সুনির্দিষ্ট গণ্ডিতে আল্লাহ তা'আলার বিরাজ করা কিছুতেই সম্ভব নহে। আরও বলা হইয়াছে যে, রূহ অস্তিত্বহীন; কিন্তু শরীরের অস্তিত্বের সঙ্গে ইহার মিল আছে। হাদীস শরীফে আছে যে, ইহুদীগণ নবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-উনাকে 'রূহ', 'আসহাবে কাহাফ' ও 'জুলকারনাইন' সম্বন্ধে প্রশ্ন করিয়াছিল৷ তাহাদের প্রশ্নের উত্তরে আল্লাহ তা'আলা সূরায়ে কাহাফ নাযিল করেন। উক্ত সূরায় রূহ্ সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা এরশাদ করিয়াছেন, - “হে নবী ! ইহুদীগণ আপনাকে রূহ্ সম্পর্কে প্রশ্ন করিতেছে, উত্তরে আপনি বলিয়া দিন যে, রূহ আমার প্রতিপালকের নির্দেশে নিয়ন্ত্রিত হয়। অর্থাৎ রূহ সম্বন্ধে আমি সম্পূর্ণ অজ্ঞাত৷ সে সম্বন্ধে আল্লাহই সুপরিজ্ঞাত। আর ইহাও বলা হইয়াছে যে, রূহ সৃষ্ট জীব নহে। মূলতঃ ইহা আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ বা বাণী মাত্র আল্লাহ তা'আলার “কুন” শব্দ হইতেই রূহের সৃষ্টি। বস্তুতঃ আল্লাহ তা'আলার আদেশ দুই শ্রেণীতে বিভক্ত। প্রথম শ্রেণীর আদেশকে ‘আমারে এলজমি' বলে। নামায, রোযা ইত্যাদি এবাদতের নির্দেশসমূহ এই শ্রেণীর আদেশের অন্তর্ভুক্ত। দ্বিতীয় শ্রেণীকে ‘আনরে তাকবীন' বলে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলিবেন- “তোমরা প্রস্তর কিংবা লৌহ অথবা অন্য কোনও বস্তুতে পরিণত হইয়া যাও,” আর তখনই তাহা হইয়া যায়। যেমন এরশাদ হইয়াছে “নায্যালা বিহি রূহল্ আমীন” অর্থাৎ পবিত্র কোরআন রুহুল আমিন ফেরেশতার মাধ্যমে নাযিল করিয়াছেন। তিনি আরও এরশাদ করিয়াছেন “ইয়াউমা ইয়াকুমুর রূহু ওয়াল মালাইকাতু ছাফ্‌ফ্ফাল্লা ইয়াতা কাল্লামুন৷ ইল্লা মান আজিনা লাহুর রাহমানু ওয়া কালা ছাওয়াবা ” 
অর্থাৎ : "যেদিন রূহ ও ফেরেশতাগণ নির্বাক অবস্থায় শ্রেণীবদ্ধভাবে দণ্ডায়মান থাকিবেন, কিন্তু যাহারা আল্লাহ কর্তৃক আদিষ্ট হইবেন এবং সত্য বলিবেন, তাহারাই সত্য বলিবেন ও সুপারিশ করিতে সক্ষম হইবেন"। এখানে রূহ অর্থ হযরত জিব্রাইল (আঃ)। যিনি একাই কাতারবন্দি হইয়া দণ্ডায়মান হইবেন। আল্লাহ তা'আলা আরও এরশাদ করিয়াছেন, “যখন আদম (আঃ)-এর সৃষ্টি সমাপ্ত করিলাম এবং আমার রূহ তন্মধ্যে ফুঁকিয়া দিলাম। ”এখানে রূহের অর্থ সৃষ্টির সম্মান প্রদান করিলাম। যেমন বলা হয় যে, “নাকাতুল্লাহ” অর্থাৎ আল্লাহর উষ্ট্রী এবং “বাইতুল্লাহ” অর্থাৎ আল্লাহর ঘর। উল্লিখিত সম্বন্ধও তেমন অর্থেই ব্যবহৃত নয়। আর আল্লাহ তা'আলা আরও এরশাদ করিয়াছেন, “আমি মরিয়মের বক্ষদেশে আমার রূহ ফুঁকিয়া দিলাম৷” এই সম্বন্ধও উপরোক্ত সম্মানাত্মক সম্বন্ধের অন্তর্ভুক্ত। আর ইহাও বলা হইয়াছে যে , “আমি মরিয়মের প্রতি হযরত জিব্রাইলের (আঃ) রূহ ফুঁকিয়া দিয়াছি।” এই কারণেই হযরত ঈসা (আঃ) কে আল্লাহ পাকের রূহ বলা হয়।

পরবর্তী পর্ব
সিঙ্গার ফুৎকার পুনরুত্থান ও হাশরের বিবরণ-

দাকায়েকুল আখবার- (২৪) জামাতে নামায আদায়ের ফজীলত



📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ২৪)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

জামাতে নামায আদায়ের ফজীলত- 
হযরত ছিদ্দিক ইবনে ওনায়েছ (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলিয়াছেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-তিনি এরশাদ করিতে শুনিয়াছি যে, একদিন হযরত জিব্রাইল (আঃ) তাঁহাকে বলিলেন, “হে মুহাম্মদ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)! আল্লাহ তা'আলা আপনাকে সালাম দিয়া আপনার উম্মতদিগকে এই খবর জানাইতে নির্দেশ করিয়াছেন যে, যাহারা জামাত বর্জন করিয়া মৃত্যুমুখে পতিত হইয়াছে তাহারা বেহেশতের সুগন্ধ পাইবে না, যদিও তাহাদের আমল সমস্ত পৃথিবীর মানুষ হইতে অধিক হইয়া থাকে। রোজ কিয়ামতে আল্লাহ তা'আলা তাহাদের কোন ফরজ ও নফল এবাদত কবুল করিবেন না। জামাত বর্জনকারী আপনার নিকট এবং সমস্ত ফেরেশতা ও মানবকুলে অভিশপ্ত। তাহা ছাড়া তৌরাত-জব্বুর ও ইঞ্জিল তাহার প্রতি অভিসম্পাত বর্ষণ করিয়া থাকে। এমনকি জামাত পরিত্যাগকারীর কোন প্রার্থনা কবুল হইবে না এবং সে ইহকালে ও পরকালে আল্লাহ তা'আলার রহমত হইতে বঞ্চিত থাকিবে। এই লোকেরাই আপনার উম্মতের মধ্যে নিকৃষ্ট এবং তাহারা মদ্‌খোর, দস্যু এবং সহস্র জ্ঞানী হত্যাকারী হইতেও অধম!”
হযরত নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করিয়াছেন, “তোমরা নাসারা এবং ইহুদীগণকে সালাম করিও, কিন্তু আমার উম্মতের ইহুদীগণকে সালাম করিও না।” 
হযরত সাদ্দাদ (রাঃ) আরজ করিলেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার উম্মতের ইহুদী কাহারা?” মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উত্তর করিলেন, 'যাহারা আযান শুনিয়াও জামাতে উপস্থিত হইল না, তাহারাই আমার উম্মতের মধ্যে ইহুদী।” তিনি আরও এরশাদ করিয়াছেন, “যে ব্যক্তি জামাত ভঙ্গকারীকে অল্প-বিস্তর খাদ্য বা রুটি দিয়া সাহায্য করিল, সে যেন নবীগণের হত্যায় সহায়তা করিল। সে মৃত্যুবরণ করিলে তাহাকে গোসল, জানাযা ও মুসলমানদের কবরস্থানে সমাহিত করিও না। এমন কি জামাত বর্জনকারী একাই যদি সমস্ত উম্মতের সমতুল্য নামায পড়ে, সকল আসমানী কিতাব পাঠ করে এবং সারা বৎসর রোযা রাখে আর সমস্ত উম্মতের সমতুল্য দান-খয়রাত করে, তবু সে বেহেশতের সুগন্ধ হইতে বঞ্চিত-হইবে। আল্লাহ তা'আলা জীবিত অথবা মৃত কোন অবস্থায়ই তাহার দিকে রহমতের দৃষ্টি নিক্ষেপ করিবেন না!”
জনাব হুযুর করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করিয়াছেন, “যে ব্যক্তি অজু করতঃ নামাযের জন্য মসজিদে প্রবেশ করিবে এবং জামাতের সহিত নামায আদায় করিবে, আল্লাহ তা'আলা তাহার গুনাহসমূহ মাফ করিয়া দিবেন।" অন্য এক বর্ণনায় আছে, 'যে ব্যক্তি নির্দিষ্ট সময়ে যথাযথ সুন্দররূপে রুকু-সিজদাহ করতঃ নামায আদায় করিবে, তাহার সম্মানার্থ আল্লাহ তা'আলা বিভিন্ন সময়ে তাহাকে পনরটি পুরস্কার প্রদান করিবেন। তন্মধ্যে ইহকালে তিনটি, মৃত্যুমুহূর্তে তিনটি এবং আল্লাহ তা'আলার দীদারে তিনটি। 
ইহকালে -
(১) ইহকালে আল্লাহ তা'আলা তাহার বয়স, খাদ্য-দ্রব্য বাড়াইয়া দিবেন এবং তাহার ও তাহার পরিবার পরিজনের রক্ষণাবেক্ষণ করিবেন। 
(২) মৃত্যুকালে তাহাকে ভয়-ভীতি হইতে নিরাপত্তা, শান্তি এবং বেহেশতে প্রবেশের সুসংবাদ প্রদান করিবেন।' যেমন পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তা'আলা ঘোষণা করিয়াছেনঃ - “নিশ্চয়ই যাহারা বলিয়াছে যে, আল্লাহই আমাদের প্রতিপালক তারপর ៖ উহাতে মৃত্যু পর্যন্ত স্থির রহিয়াছে, তবে মৃত্যুলগ্নে বেহেশতের ফেরেশ্তাগণ নাযিল হইয়া তাহাদিগকে ভয়-ভীতি হইতে নিরাপত্তা এবং অঙ্গীকারকৃত বেহেশত রাজ্যে প্রবেশের সুসংবাদ দান করিয়া থাকে।” 
(৩) আর কবরের মধ্যে মনকির নকীরের প্রশ্নোত্তর সহজ করিয়া দিবেন, কবরকে সুপ্রশস্ত করিবেন এবং বেহেশতের দিকে কবরের দরজা খুলিয়া দিবেন।

আর হাশরে -
(১) আল্লাহ তা'আলা তাহার চেহারাকে পূর্ণিমার চন্দ্রের মত সমুজ্জ্বল করিয়া উত্থিত করিবেন । যেমন পবিত্র কোরআনে এরশাদ হইয়াছে— “তাহাদের অগ্রে এবং পশ্চাতে নূর দৌড়াদৌড়ি করিতে থাকিবে। 
(২) আর তাহার আমলনামা ডান হাতে প্রদান করিবেন এবং 
(৩) তাহার হিসাব-নিকাশ অত্যন্ত সহজভাবে গ্রহণ করিবেন।

আর আল্লাহ তা'আলার দীদারে
(১) আল্লাহ তা'আলা তাহার উপর রাজী ও সন্তুষ্ট থাকিবেন, 
(২) আল্লাহ তা'আলা তাহাকে সালাম জানাইবেন এবং 
(৩) তাহার প্রতি রহমতের দৃষ্টি নিক্ষেপ করিবেন। যেমন পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করা হইয়াছে- “ছালামুন কাউলাম মির রাব্বির রাহীম্।” অর্থাৎ : “আল্লাহ তা'আলা তাহাদিগকে ছালাম প্রদান করিবেন।" আর সেইদিন কাহারও মুখমণ্ডল তরুতাজা থাকিবে এবং তাহারা আল্লাহ তা'আলার প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করিয়া থাকিবে। আর পাঞ্জেগানা নামাযে যাহারা অলসতা প্রদর্শন করিবে আল্লাহ তাহাদিগকে পনরটি শাস্তির ভাগী করিবেন। 
ইহলোকে- (১) তাহার হায়াত কমিয়া যাইবে, (২) তাহার আহার্য বস্তু হইতে বরকত উঠিয়া যাইবে এবং (৩) তাহার চেহারা হইতে নেককারের চিহ্ন মুছিয়া যাইবে।

মৃত্যুর সময়- 
(১) ক্ষুধা এবং তৃষ্ণায় সে বড়ই কাতর হইবে, আর নেহায়েত অপমান ও অপদস্থ করিয়া তাহার রূহ কবজ করা হইবে।

কবরের মধ্যে- 
(১) তাহার কবর এতই সংকীর্ণ করা হইবে যে, তাহার এক বাহু অন্য বাহুতে মিশিয়া যাইবে। 
(২) আর জাহান্নামের দিকে তাহার কবরের দ্বার খুলিয়া দেওয়া হইবে এবং 
(৩) বেহেশতে প্রবেশের সুসংবাদ হইতে সে বঞ্চিত হইবে এবং তাহাকে দোযখে প্রবেশের দুঃসংবাদ প্রদান করা হইবে।

আর হাশরের মাঠে –
(১) তাহার মুখমণ্ডল ঘোর কালবর্ণ করিয়া কবর হইতে উঠানো হইবে। 
(২) আল্লাহ তা'আলার রহমত হইতে নিরাশার চিহ্ন তাহার কপালে লিখিয়া দেওয়া হইবে এবং 
(৩) তাহাকে পিছনের দিক হইতে আমলনামা দেওয়া হইবে। আর,

আল্লাহ তা'আলার সাক্ষাতে-
(১) আল্লাহ তা'আলা তাহার সহিত কালাম করিবেন না, 
(২) আল্লাহ তা'আলা তাহার প্রতি নজর করিবেন না, 
(৩) তাহাকে শাস্তি হইতে রেহাই দিবেন না বরং তুলনামূলক কঠোর শাস্তিদান করিবেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা তিনি কোরআন শরীফে ঘোষণা করিয়াছেন- “ফাখালাফা মিম বা'দিহিম খালফুন আদ্বাউছ ছালাতা ওয়াত্তাবাউশ শাহাওয়াতি ফাছাউফা ইয়াল্‌ক্কাউনা পাইয়্যা।”
অর্থাৎ: “তাহাদের পশ্চাতে একদল লোক আসিয়াছিল যাহারা নামায বিনষ্ট করিয়াছিল, অতএব শীঘ্রই তাহারা স্বীয় পথভ্রষ্টতার শাস্তি ভোগ করিবে।”

হযরত আনাস (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, জনাব রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করিয়াছেন, “বান্দা যখন উত্তমরূপে অজু এবং বিশুদ্ধভাবে নিয়ত করতঃ নামায পড়িতে দণ্ডায়মান হয় এবং ‘আল্লাহু আকবার' বলে, তৎক্ষণাত সে সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশুর ন্যায় নিষ্পাপ হইয়া যায়। আর যখন সে 'আউজুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম' বলে তখন তাহার শরীরের অগণিত পশমতুল্য এক বৎসরের এবাদত লেখা হয়। আর সে যখন সূরা ফাতেহা পাঠ করে তখন সে যেন পবিত্র ‘হজ্জ ও ওমরাহ' সমাপ্ত করে। আর সে যখন ‘রুকু' করে তখন যেন সে তাহার ওজনের সমতুল্য স্বর্ণ আল্লাহ তা'আলার রাস্তায় খরচ করে। আর যখন সে 'ছামিআল্লাহু লিমান হামিদাহ্' বলে, তখন আল্লাহ তা'আলা তাহার প্রতি রহমতের নজর নিক্ষেপ করেন। সিজদাহর হালতে সে যখন 'ছোব্‌হানা রাব্বিয়াল আলা' পাঠ করে, তখন যেন সে একটি গোলাম আযাদ করে। আর যখন সে ‘তাশাহ্হুদ’ পাঠ করে তখন আল্লাহ তা'আলা তাহাকে সহস্র আলেম ও শহীদের পুণ্য প্রদান করেন। আর সালামান্তে নামায শেষ করিবার সাথে সাথে তাহার জন্যে বেহেশতের আটটি দরওয়াজা খুলিয়া দেওয়া হয়, সে বিনা হিসাবে নির্ভয়ে খুশীমত যে কোন দরওয়াজা দিয়া উহাতে প্রবেশ করিতে পারে।”

হযরত নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করিয়াছেন, “কুকুরের পাঁচটি স্বভাব প্রত্যেক বান্দার মধ্যে থাকা দরকার। যেমন- (১) কুকুর সদা-সর্বদা ক্ষুধার্ত ও অভুক্ত থাকে, সুতরাং সৎলোকেরও তদ্রূপ থাকা দরকার। (২) কুকুরের কোন নির্দিষ্ট বাসস্থান থাকে না, অতএব সৎলোকদেরও থাকা উচিত নহে। (৩) কুকুর সারারাত্র বিনিদ্রভাবে স্বীয় প্রভুর গৃহ পাহারা দেয়, তদ্রূপ সৎলোকেরও অহোরাত্র জাগ্রত থাকিয়া আল্লাহ পাকের এবাদত করা দরকার। (৪) কুকুর উত্তরাধিকারীদের জন্য কিছুই রাখিয়া যায় না, তেমনি সৎলোকেরও রাখা উচিত নহে। (৫) কুকুর স্বীয় প্রভুর দুয়ার হইতে শত সহস্রবার তাড়া খাইয়াও বিতাড়িত হয় না, অনুরূপভাবে বান্দাদেরও নানারকম দৈব দুর্বিপাকে পড়িয়া আল্লাহ পাকের নাম স্মরণ রাখা দরকার।”

হযরত আলী (রাঃ) বলিয়াছেন, যাহার জীবনযাত্রা কুকুরের ন্যায় তাহার জন্য সু-সংবাদ রহিয়াছে। কুকুরের মধ্যে দশটি অভ্যাস দেখিতে পাওয়া যায়। যেমন – (১) কুকুরের কোন ধন-সম্পদ নাই, (২) বিশ্বের কোথাও তাহার মান-সম্মান নাই, (৩) সমস্ত দুনিয়া জুড়িয়াই তাহার বাসস্থান, (৪) আর ইহা অধিকাংশ সময় চুপচাপ থাকে, (৫) অধিকাংশ সময়ই ইহা ক্ষুধার্ত থাকে, (৬) কুকুর দিবারাত্র ইহার প্রভুকে স্মরণ করিয়া থাকে, (৭) সে যাহা পায় তাহাতেই সন্তুষ্ট থাকে, (৮) শত সহস্র বেত্রাঘাত খাইয়াও সে প্রভুর দুয়ার পরিত্যাগ করে না, (৯) সে প্রভুর শত্রুকে আক্রমণ করে কিন্তু প্রভুর বন্ধুকে আক্রমণ করে না আর (১০) মৃত্যুকালে সে কিছুই পরিত্যাগ করিয়া যায় না। ইহাই হইল কুকুরের জীবনযাত্রার কতিপয় নিয়মাবলী। এই সকল স্বভাব সৎলোকদের মধ্যে থাকা দরকার।

পরবর্তী পর্ব
জান কবযের পর রূহের  কবরে ও গৃহে আগমন-

দাকায়েকুল আখবার- (২৩) কিরামান কাতেবীনের বিবরণ



📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ২৩)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

কিরামান কাতেবীনের বিবরণ-
হাদীস শরীফে বর্ণিত রহিয়াছে যে, প্রত্যেক মানুষের ডাইনে এবং বামে দুইজন ফেরেশতা রহিয়াছেন। তাহাদের মধ্যে দক্ষিণ পার্শ্বের ফেরেশতা তাঁহার সহকর্মীর অনুমতি ছাড়াই বান্দার নেক আমলগুলি লিপিবদ্ধ করেন; কিন্তু বামপার্শ্বের ফেরেশতা তাহার সহকর্মীর অনুমতি ছাড়া বান্দার পাপ কর্মগুলি লিপিবদ্ধ করিতে পারেন না। আল্লাহ তা'আলার বান্দা যখন উপবেশন করে তখন তাঁহারা তাহার ডাইনে এবং বামে উপবেশন করেন। আর মানুষ যখন চলাফেরা করে তখন একজন তাহার সামনে এবং অন্যজন তাহার পিছনে ও নিদ্রিত অবস্থায় মস্তক পার্শ্বে ও পদ-প্রান্তে থাকিয়া বান্দার তত্ত্বাবধান করেন।

অন্য এক হাদীসে আছে যে, বান্দার তত্ত্বাবধান করিবার জন্য পাঁচজন ফেরেশতা রহিয়াছেন। তন্মধ্যে দুইজন রাত্রিতে, দুইজন দিবাভাগে ও একজন সদাসর্বদা তাহার সহিত অবস্থান করেন। দিবাভাগের ফেরেশ্তাদ্বয় বান্দাকে দিবাভাগে মানব-দানব, শত্রু ও শয়তানের অনিষ্টকারিতা হইতে রক্ষা করেন। 
অন্য এক রেওয়ায়েতে আছে যে, বান্দার উভয় কাঁধে দুইজন ফেরেশতা  অবস্থান করেন। তাঁহারা তর্জনী অঙ্গুলিকে কলমরূপে, মুখগহ্বরকে দোয়াতরূপে, মুখের থুথুকে কালিরূপে এবং অন্তরকে কাগজরূপে ব্যবহার করিয়া বান্দার সারা জীবনের কাজকর্ম লিপিবদ্ধ করিয়া থাকেন। 
হযরত নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করিয়াছেন যে, দক্ষিণ পার্শ্বের ফেরেশতা নেতা হিসাবে কাজ করেন। বান্দার পাপকাজ করিবার সাথে সাথে বামপার্শ্বের ফেরেশতা উহা লিখিতে মনস্থ করেন। আর তখনই নেতা ফেরেশতা তাহাকে বলেন, “হে প্রিয় বন্ধু! অন্ততঃ সাত ঘন্টার জন্য তোমার লিখা বন্ধ রাখ।” ইতিমধ্যে বান্দা তাওবাহ করিলে কিংবা মৃত্যুবরণ করিলে উহা আর লিপিবদ্ধ করা হয় না। অন্যথায় কেবলমাত্র একটি পাপ লিপিবদ্ধ করা হয়। আর মৃত্যুর পর বান্দাকে কবরের মধ্যে রাখা হইলে উভয় ফেরেশতা আল্লাহ তা'আলার নিকট ফরিয়াদ করেন, “হে আল্লাহ ! আপনি আমাদিগকে আপনার বান্দার নেক-বদ লিপিবদ্ধ করিবার কাজে নিয়োজিত করিয়াছিলেন, কিন্তু এখন আপনি তাহার রূহ কবজ করিয়া লইয়াছেন। অতএব আমাদিগকে আকাশে আরোহণ করিবার অনুমতি প্রদান করুন।” উত্তরে আল্লাহ তা'আলা বলেন, “হে ফেরেশতাগণ! তোমরা অবগত আছ যে গগনমণ্ডল অজস্র স্বর্গীয় ফেরেশ্তায় ভরপুর। তাহারা সদা-সর্বদা আমার তাসবীহ, তাহলীল পাঠে মশগুল রহিয়াছে। তোমরাই বল, আমি তোমাদের দ্বারা কি করিব?” ফেরেশ্তাগণ পুনরায় আরজ করেন, “হে বারে এলাহী! তবে আমাদিগকে দুনিয়াতেই বাস করিবার অনুমতি প্রদান করুন।' তখন আল্লাহ তা'আলা বলেন, “পৃথিবীও আমার অজস্র সৃষ্ট জীবে ভরপুর। আমি পৃথিবীতে তোমাদের দ্বারা কি করাইব?” পরিশেষে আল্লাহতায়ালা তাহাদিগকে নির্দেশ দেন, “ওহে ফেরেশ্তাগণ! তোমরা ঐ বান্দার কবরে বসিয়া রোজ কিয়ামত পর্যন্ত তাসবীহ তাহলীল পাঠ কর এবং তাহার আমলনামায় ঐগুলি যোগ করিয়া দাও।” যেমন পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তা'আলা এরশাদ করিয়াছেন-
উচ্চারণ : “ওয়া ইন্না আলাইকুম লাহাফিজি-না কিরা-মান্ কাতিবী না ইয়ালামু-না   মা তাফ্ আলুন্।"
অর্থাৎ “নিশ্চয়ই তোমাদের তত্ত্বাবধানের নিমিত্ত কিরামান কাতিবীন নামক দুইজন ফেরেশতা রহিয়াছেন, যাহারা তোমাদের আমলনামা সম্বন্ধে সম্যক পরিজ্ঞাত আছেন।” আর তাহাদিগকে কিরামান কাতেবীন নামে আখ্যায়িত করার কারণ হইল এই যে তাহারা বান্দার কৃত নেককাজে আনন্দে উৎফুল্ল হইয়া আকাশমণ্ডলে আরোহণ করতঃ আল্লাহ তা'আলার দরবারে প্রার্থনা করে, “হে আল্লাহ! আপনার ঐ বান্দা আপনার রেজামন্দির উদ্দেশ্যে এইরূপ নেক আমল করিয়াছে এবং আমরা ইহার সত্যতার সাক্ষ্য দিতেছি।” তবে বান্দা যখন কোন পাপ করে তখন ফেরেশতাদ্বয় বিমর্ষ, চিন্তান্বিত ও সলজ্জ অবস্থায় গগনমণ্ডলে আরোহণ করিয়া থাকে। তারপর আল্লাহ তা'আলা তাহাদিগকে প্রশ্ন করেন,- “হে কিরামান কাতেবীন! আমার বান্দা কিরূপ আমল করিয়াছে?” তখন তাহারা নিরুত্তর থাকে। অনুরূপভাবে তৃতীয়বার তাহাদিগকে জিজ্ঞাসা করা হইলে তাহারা বলে, “হে আল্লাহ! আপনি সর্ব পরিজ্ঞাত, গোপনকারী এবং বান্দাদের দোষ গোপনের নির্দেশদাতা । হে আল্লাহ! আপনার বান্দা প্রতিদিন আপনার পবিত্র কালাম পাঠ করিয়াছে এবং আপনার স্তুতিগান করিয়াছে।” তারপর তাহারা আবার আরজ করে, “হে পরম দয়াময় আল্লাহ! আপনি তাহাদের আয়েব-ত্রুটি গোপন করুন।" এইজন্যই তাহাদিগকে কিরামান কাতেবীন অর্থাৎ 'মর্যাদাশীল লেখক' নামে অভিহিত করা হইয়াছে।

পরবর্তী পর্ব-
জামাতে নামায আদায়ের ফজীলত-

দাকায়েকুল আখবার- (২২) মনকির নকীরের সওয়ালের বিবরণ



📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ২২)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

মনকির নকীরের সওয়ালের বিবরণ-
হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, মৃত ব্যক্তিকে যখন কবরের মধ্যে রাখা হয়, তখন বিভৎস, কুৎসিত ও ঘোর লোহিত বর্ণ নয়নবিশিষ্ট দুইজন ভয়ঙ্কর মূর্তিধারী স্বর্গীয় ফেরেশতা তাহার কবরে আগমন করে। তাহাদের গলার স্বর মেঘের গর্জনের মত এবং দৃষ্টিশক্তি এতই প্রখর যেন চক্ষুর দৃষ্টিশক্তি হরণকারী বিজলী। উক্ত ফেরেশতাদ্বয় নিজ নিজ দাঁতের দ্বারা মাটি ভেদ করিয়া যখন মৃত ব্যক্তির মাথার নিকট আগমন করিবে, তখন মাথা তাহাদিগকে বাধা দিয়া বলিবে, “হে ফেরেশ্তাগণ! এইদিক হইতে আমাকে কোনরূপ আঘাত করিও না। আমি অহর্নিশি এই স্থানের ভয়ে যথেষ্ট পরিমাণে নামায আদায় করিয়াছি।”
তারপর ফেরেশতাদ্বয় তাহার পদদ্বয়ের দিক হইতে আক্রমণ করিতে সচেষ্ট হইলে পদদ্বয় বলিবে, “এই নেক বান্দা আমার সহায়তায় জুমআ নামায আদায় করিয়াছে এবং জামাতে নামায আদায় করিবার জন্য দৌড়াইয়াছে আর আমার সাহায্যেই নামায আদায় করিতে পারিয়াছে।” 
এইবার দক্ষিণ দিক হইতে আক্রমণ করিবার জন্য অগ্রসর হইতে চাহিলে দক্ষিণ হস্ত বাধা দিয়া বলিবে, “হে স্বর্গীয় ফেরেশ্তা! তোমরা এইদিক হইতে আক্রমণ করিও না, কেননা এই নেক বান্দা আমার দ্বারা প্রচুর দান-খয়রাত করিয়াছে।” 
অতঃপর তাহারা উত্তর দিক হইতে আক্রমণ করিতে প্রবৃত্ত হইবে, কিন্তু সেই পথেও বাধাপ্রাপ্ত হইবে। পরিশেষে তাহারা বান্দার মুখের দিকে আক্রমণ করিতে উদ্যত হইবে, তখন মুখ বাধা দিয়া বলিবে, “হে ফেরেশতাগণ! এইদিক হইতে আক্রমণ করিও না । এই নেকবান্দা আমার সাহায্যে ক্ষুধা-তৃষ্ণা নিবারণ করিয়াছে এবং পবিত্র রোযাব্রত পালন করিয়াছে।
পরিশেষে ফেরেশতা নিরুপায় হইয়া ঘুমন্ত ব্যক্তির মত মৃতকে জাগ্রত করিয়া জিজ্ঞাসা করিবে, “হে আল্লাহর বান্দা! হযরত মুহাম্মদ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর সম্বন্ধে তোমার কিরূপ ধারণা রহিয়াছে?” প্রত্যুত্তরে সে বলিবে, “আমি সাক্ষ্য দিতেছি যে, তিনি আল্লাহ তা'আলার রাসূল ও বান্দা ছিলেন।” তখন ফেরেশ্তাগণ বলিবে, “হে বান্দা! তুমি পৃথিবীতে বিশ্বাসী ছিলে এবং সেই অবস্থায়ই মৃত্যুবরণ করিয়াছ।” [এটাই হল ঈমানের মূল তথা রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উনাকে আল্লাহর অনুগত বান্দা ও চুড়ান্তপর্যায়ে আল্লাহ্ তা'আলার রসূল হিসেবে চিনতে ও জানতে হবে।] 
মনকির নকীর ফেরেশ্তাদ্বয়ের সওয়াল করার রহস্য এই যে, আল্লাহ তা'আলা যখন মানবকুল সৃষ্টি করিবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিয়াছিলেন, তখন ফেরেশতাগণ হযরত আদম (আঃ)-কে দর্শন করিয়া বিদ্রূপ করতঃ বলিয়াছিল, “হে আল্লাহ ! আপনি কি এমন মানবকুল সৃষ্টি করিতে চান, যাহারা সেখানে কলহ-বিবাদ ও বিসম্বাদে নিমগ্ন হইবে এবং পরস্পর রক্তারক্তি করিয়া পৃথিবীতে অশান্তির সৃষ্টি করিবে।” 
প্রত্যুত্তরে আল্লাহ তা'আলা বলিয়াছিলেন, “হে ফেরেশতাগণ ! আমি যাহা জানি তোমরা তাহা জান না।” এই জন্য আল্লাহ তায়ালা সর্বপ্রথমে কবরের মধ্যে দুইজন ফেরেশতা প্রেরণ করিয়া মুমিন বান্দার তৌহিদ ও রেসালত সম্বন্ধে সওয়াল করিয়া পরীক্ষা করিবার ব্যবস্থা করিয়াছেন। আর তাহাদিগকে পুনরায় ফেরেশ্তার সম্মুখে মুমিন বান্দার কথিত বিষয় জ্ঞাপন করিতে নির্দেশ দান করিয়াছেন। কেননা সাক্ষ্যের জন্য দ্বি-বচনই যথেষ্ট বলিয়া পরিগণিত। পরিশেষে আল্লাহ তায়ালা ফেরেশতাগণকে উদ্দেশ্য করিয়া বলেন, 'হে ফেরেশতাগণ! আমি কেবলমাত্র তাহার আত্মা কবজ করিয়াছি, অথচ তাহার দাস-দাসী, স্ত্রী-পুত্র ধন-রত্ন সবকিছুই অন্যের জন্য রাখিয়াছি এবং সে বন্ধু-বান্ধবহীন একাকী কবরের মধ্যে পড়িয়া রহিয়াছে। সেখানে আমি ছাড়া তাহার অন্য কোন সহায়-সম্বল নাই; সুতরাং এমতাবস্থায় তোমরা তাহাকে জিজ্ঞাসা করিয়া দেখ, “তোমার প্রতিপালক কে? তোমার নবী কে? আর তুমি কোন ধর্মাবলম্বী?” তখন সে নিঃসঙ্কোচে বলে, 'আমার সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তায়ালা, আমার নবী হযরত মুহাম্মদ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এবং আমার ধর্ম ইসলাম। আর আমার অধিক জ্ঞানের বিষয় হইল ইহাই।

পরবর্তী পর্ব
কিরামান কাতেবীনের বিবরণ-

দাকায়েকুল আখবার- (২১) মনকির নকীরের পূর্ববর্তী ফেরেশতার বিবরণ



📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ২১)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

মনকির নকীরের পূর্ববর্তী ফেরেশতার বিবরণ-
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেন, একদা আমি রাসুলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-উনাকে জিজ্ঞাসা করিলাম, “হে আল্লাহর রসূল ! মনকির নকীরের পূর্বে কোন ফেরেশতা কবরে আগমন করে কি”? 
প্রত্যুত্তরে আল্লাহর রসূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিলেন, “হে ইবনে সালাম ! মনকির নকীরের পূর্বে সূর্যের মত উজ্জ্বল চেহারা বিশিষ্ট রোমান নামক একজন ফেরেশ্তা কবরের মধ্যে আগমন করিয়া মৃত ব্যক্তিকে উঠাইয়া বসান এবং উক্ত বান্দাকে তাহার পাপপূর্ণ লিপিবদ্ধ করিতে নির্দেশ করেন। তখন উক্ত বান্দা আরজ করে, “হে স্বর্গীয় ফেরেশতা ! আমি কি দিয়া লিখিব? কাগজ, কলম, কালি কোন কিছুই ত আমার নিকট নাই।” তখন ফেরেশ্তা বলেন, “স্বীয় অঙ্গুলিকে কলমরূপে, মুখকে দোয়াতরূপে আর থুথুকে কালিরূপে ব্যবহার কর।” তখন বান্দা বলিবে, “কাগজ ছাড়া কিসে লিখিব বলুন?” ফেরেশ্তা তাহার কাপড়ের একখণ্ড ছিঁড়িয়া দিয়া বলিবেন, “এখন তোমার যাবতীয় পাপ ও পুণ্য ইহাতে লিপিবদ্ধ কর।” তখন সে তৎক্ষণাত অকুণ্ঠচিত্তে তাহার কৃত পুণ্য কর্মগুলি লিপিবদ্ধ করিবে, কিন্তু পাপকর্মগুলি লিখিতে লজ্জিত হইয়া বসিয়া পড়িবে। তখন উক্ত ফেরেশতা তাহাকে শাসাইয়া বলিবেন, “হে পাপিষ্ঠ নরাধম! দুনিয়ার জীবনে পাপকাজ ও অসৎকর্ম করিতে কোন রকমের লজ্জাবোধ কর নাই, কিন্তু এখন উহা আমার সম্মুখে লিখিতে লজ্জা করিতেছ কেন?” এই বলিয়া তাহাকে প্রহার করিবার জন্য হাতুড়ী উত্তোলন করিলে সে আরজ করিবে, “হে স্বর্গীয় ফেরেশতা ! আমাকে আঘাত করিবেন না, আমি এখনই আনুপূর্বিক সবকিছুই লিখিয়া দিতেছি।” তারপর সে সবকিছুই লিপিবদ্ধ করিবে। তখন ফেরেশতা তাহাকে সেই লেখাগুলি মোহরাঙ্কিত করিতে নির্দেশ দিবেন ।`সে ব্যক্তি পুনরায় বলিবে, “হে স্বৰ্গীয় ফেরেশতা ! আমার নিকট কোন উপকরণ নাই। আমি সীলমোহর করিব কি দিয়া?” ফেরেশতা উত্তর করিবে, “তুমি তোমার নখের সাহায্যে এই কাজ সমাধা কর ।” অতঃপর সে তদনুরূপ করিবে এবং ফেরেশতা তাহার স্বহস্ত লিখিত আমলনামা তাহার গলায় ঝুলাইয়া দিয়া বিদায় হইয়া যাইবেন আর সেই আমলনামা কেয়ামত পর্যন্ত অক্ষত অবস্থায় তাহার গলদেশে শোভা পাইতে থাকিবে। যেমন আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে ঘোষণা “এবং আমি প্রত্যেক মৃত ব্যক্তির গলদেশে তাহার আমলনামা টাঙ্গানোর ব্যবস্থা রাখিয়াছি।”
উক্ত 'রোমান' ফেরেশতার প্রস্থানের পর 'মনকির' ও 'নকীর' সে কবরে প্রবেশ করিবে। কেয়ামতের দিন যখন সে তাহার নিজের আমলনামা প্রত্যক্ষ করিবে এবং আল্লাহ তা'আলার নির্দেশে উহা পাঠ করিতে বাধ্য হইবে, তখন সে তাহার পুণ্যকাজের বিবরণাদি পাঠ করিয়া যাইবে। আল্লাহ তা'আলা উহার কারণ জিজ্ঞাসা করিলে সে উত্তর করিবে, 'হে আল্লাহ! বাকী অংশ পাঠ করিতে আমি লজ্জাবোধ করিতেছি।” আল্লাহ তা'আলা বলিবেন, “হে বান্দা! দুনিয়াতে এইরূপ কাজ করিতে কেন লজ্জাবোধ কর নাই?” তখন সে লজ্জিত হইবে ও নির্বাক হইয়া যাইবে; কিন্তু তাহাতে কোন উপকার সাধিত হইবে না। তখন আল্লাহ তা'আলা আদেশ করিবেন, “ওহে ফেরেশতাগণ ! তাহাকে ধরিয়া জিঞ্জির (শিকল) পরাইয়া দাও এবং জাহান্নামের অনলকুণ্ডে তাহাকে নিক্ষেপ কর।”

পরবর্তী পর্ব
মনকির নকীরের সওয়ালের বিবরণ-

বুধবার, ১৫ মে, ২০২৪

দাকায়েকুল আখবার- (২০) দেহ হইতে রূহ্ কবজের বিবরণ

 

📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ২০)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

দেহ হইতে রূহ্ কবজের বিবরণ-
হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, “বান্দার জান কবজের সময় যখন তাহার বাকশক্তি লোপ পাইয়া যায়, তখন তাহার নিকট একের পর এক পাঁচজন ফেরেশতা আগমন করেন। 
সর্বাগ্রে খাদ্য সরবরাহকারী ফেরেশতা সালাম প্রদান করিয়া বলেন, “ওহে আল্লাহর বান্দা! আমি তোমার খাদ্য সংস্থানের কাজে নিযুক্ত ছিলাম, কিন্তু এখন আমি তোমার জন্য পৃথিবীর সমুদয় প্রান্ত তালাস করিয়াও একমুষ্টি অন্ন সংগ্রহ করিতে পারি নাই। অতএব আমি তোমার নিকট হইতে বিদায় গ্রহণ করিতেছি।” 
তারপর দ্বিতীয় ফেরেশতা সালাম করিয়া বলে, ‘ওহে আল্লাহর বান্দা! আমি ছিলাম তোমার পানীয় সরবরাহের কার্যে নিযুক্ত। কিন্তু আজ আমি সমস্ত পৃথিবী অন্বেষণ করিয়াও এক ফোটা পানীয় জল সংগ্রহ করিতে পারি নাই; সুতরাং আমি তোমার নিকট হইতে বিদায় গ্রহণ করিতেছি।” অতঃপর 
তৃতীয় ফেরেশতা সালাম করিয়া বলে, “ওহে আল্লাহর বান্দা! আমি তোমার উভয় পায়ের তত্ত্বাবধানের কাজে নিযুক্ত ছিলাম, কিন্তু আজ সমস্ত পৃথিবী পরিভ্রমণ করিয়াও তোমার জন্য এক কদম পরিমাণ স্থানও পাইলাম না। অতএব আমি তোমার নিকট হইতে বিদায় গ্রহণ করিতেছি।” অনুরূপভাবে 
চতুর্থ ফেরেশতা সালাম প্রদান করিয়া বলে, “ওহে আল্লাহর বান্দা! আমি তোমার নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের নিয়ন্ত্রণ কাজে নিযুক্ত ছিলাম; কিন্তু আজ পৃথিবীর সমস্ত প্রান্ত খুঁজিয়াও তোমার জন্য সামান্য পরিমাণ নিঃশ্বাসও পাইলাম না। অতএব আমি তোমার নিকট হইতে বিদায় গ্রহণ করিতেছি।” 
পরিশেষে পঞ্চম ফেরেশতা উপস্থিত হইয়া সালাম প্রদান করিয়া বলে, “ওহে আল্লাহর বান্দা! আমি তোমার জীবন মৃত্যুর কাজে নিযুক্ত ছিলাম; কিন্তু আজ তোমার জন্য পৃথিবীর সমুদয় প্রান্ত তালাস করিয়াও সামান্য পরিমাণ সময়ও পাইলাম না; সুতরাং আমি তোমার নিকট হইতে চিরবিদায় গ্রহণ করিতেছি।” 
তারপর কেরামান কাতেবীন ফেরেশতাদ্বয় উপস্থিত হইয়া সালাম প্রদান করিয়া বলে, “ওহে আল্লাহর বান্দা! আমরা তোমার জন্য নেকী ও পাপ লিখিবার কাজে নিযুক্ত ছিলাম! কিন্তু আজ সমস্ত পৃথিবীর সমুদয় প্রান্ত তালাস করিয়াও তোমার কোন পাপপুণ্য পাইলাম না। অতএব আমরা তোমার নিকট হইতে চিরবিদায় গ্রহণ করিতেছি।” এইকথা বলিবার পর তাঁহারা কালো বর্ণের একখানি লিখিত পত্র তাহার সামনে উপস্থিত করিয়া বলিবে, “হে আল্লাহর বান্দা! তুমি ইহার প্রতি লক্ষ্য কর।” উহার প্রতি দৃষ্টিপাত করিবামাত্র তাহার সমস্ত শরীর বাহিয়া ঘর্ম নির্গত হইবে এবং কেহ যেন উক্ত লিখিত পত্র পাঠ না করিতে পারে, তজ্জন্য সে ডাইনে এবং বামে বারবার সতর্ক দৃষ্টিপাত করিতে থাকিবে। তারপর কেরামান কাতেবীন ফেরেশতাদ্বয় প্রস্থান করিবে। 
কেরামান কাতেবীন ফেরেশতাদ্বয় প্রস্থান করার সাথে সাথে আজরাইল ফেরেশতা তাহার ডানদিকে রহমতের ফেরেশতা ও বামদিকে আযাবের ফেরেশতা সহকারে আগমন করিবেন। তাহাদের মধ্যে কেহবা রূহ্‌কে অত্যন্ত জোরে টানিতে থাকিবে আবার কেহবা খুব শান্তির সহিত রূহকে বাহির করিবে। মৃতব্যক্তি যদি পুণ্যবান হয় তবে রহমতের ফেরেশতাদিগকে ডাকা হইবে৷ তখন তাহারা মৃতব্যক্তির রূহসহকারে শূন্যে আরোহণ করিবেন। দয়াময় আল্লাহ তায়ালা তখন বলিবেন, “ওহে ফেরেশতাগণ! উক্ত রূহকে মৃতের শরীরের মধ্যে পুনরায় প্রবেশ করাও, যেন সে শরীরের অবস্থা নিজে প্রত্যক্ষ করিতে সক্ষম হয়।” তারপর ফেরেশতাগণ রূহকে গৃহের মধ্যস্থলে রাখিবে। তখন মৃতের রূহ তাহার জন্য শোকসন্তপ্ত ও বেখেয়াল লোকদিগকে চিনিতে পারিবে, কিন্তু কোন কিছুই বলিতে পারিবে না। তারপর জানাযা সম্পাদনের পর মৃতদেহ গোর দিবামাত্রই আল্লাহ তা'আলার রহমতে মৃতব্যক্তির শরীরে আত্মার বিকাশ ঘটিতে থাকিবে। এ সম্পর্কে আলেমদের মধ্যে মতভেদ পরিলক্ষিত হয়। 
(ক) কেহ বলেন, “শরীরের মধ্যেই রূহ প্রবেশ করে, যেমন পৃথিবীতে ছিল। তখন তাহাকে বসান হয় এবং জিজ্ঞাসা করা হয়।” 
(খ) আবার কেহ বলেন , “রূহ শরীরেই প্রবেশ করে, কিন্তু তারপরে কি হয়, তাহা অজ্ঞাত৷” 
(গ) কেহ বলেন, “রূহকেই প্রশ্ন করা হয়, শরীরকে নহে।” 
(ঘ) কেহ বলেন, “রূহ দেহের মধ্যেই বক্ষ পর্যন্ত বিরাজ করে।” 
(ঙ) আবার কেহ বলেন, “রূহ্ বা আত্মা শরীর অথবা কাফনের মধ্যে বিরাজ করে।” তবে প্রত্যেক মতের সপক্ষে হযরত নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) হইতে হাদীস বর্ণিত রহিয়াছে।" 
আলেমগণের সহীহ্ মত এই যে, কবরের আযাব সত্য। তবে ইহার প্রকার ও প্রকৃতি সম্পূর্ণ অজ্ঞাত। প্রখ্যাত ফকীহ আবু লায়েস (রহঃ) বলিয়াছেন, “যে ব্যক্তি কবরের আযাব হইতে রেহাই পাইতে চায়, সে যেন চারিটি কার্য সম্পাদন করে এবং চারিটি কার্য বর্জন করে। পালনীয় চারিটি কার্য হইল যে, 
(ক) নিয়ম মত নামায আদায় করা, 
(খ) দান-খয়রাত করা, 
(গ) পবিত্র কোরআন শরীফ পাঠ করা এবং 
(ঘ) অধিক পরিমাণে তাসবীহ পাঠ করা। 
তাহা হইলে অবশ্যই এই কাজগুলির বরকতে বিভিন্ন প্রকার গোর আযাব হইতে পরিত্রাণ পাওয়া যাইবে।

আর বর্জনীয় চারিটি কার্য হইল, (ক) মিথ্যা বলা (খ) কাহারও গীবত গাওয়া, (গ) চোগলখুরী করা এবং (ঘ) প্রস্রাব হইতে শরীরকে পাক না রাখা ইত্যাদি ।” 
জনাব হুযুর করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিয়াছেন, “তোমরা প্রস্রাব হইতে পবিত্র থাক, কারণ অধিকাংশ কবর আযাব ইহার জন্যেই হইয়া থাকে”।
কবরে  মনকির ও নকীর নামক অত্যন্ত কৃষ্ণবর্ণ, নির্দয়-নিষ্ঠুর আরক্তিম লোচন, বজ্রের ন্যায় ভীষণ আওয়াজকারী, বিদ্যুতের ন্যায় চোখের জ্যোতি বিনষ্টকারী এবং মাটি ভেদকারী ও দীর্ঘ নখবিশিষ্ট ভয়ংকর আকৃতির দুইজন ফেরেশতা কবরে প্রবেশ করিবে এবং মৃত ব্যক্তিকে নাড়িয়া চাড়িয়া ও বসাইয়া জিজ্ঞাসা করিবে - “মান রাব্বুকা” অর্থাৎ তোমার প্রতিপালক কে? “ওয়ামা দ্বিনুকা” অর্থাৎ তোমার ধর্মের নাম কি? “ওয়ামান নাবিয়্যুকা” অর্থাৎ তোমার নবী কে? প্রত্যুত্তরে নেককার বান্দাগণ বলিবেনI “রাব্বিয়াল্লাহু” অর্থাৎ আল্লাহ। আমার প্রতিপালক আল্লাহ্। “ওয়াদ্বিনি ইসলামু” অর্থাৎ আমার ধর্ম ইসলাম। “ওয়া নাবিয়্যি মুহাম্মাদুন” অর্থাৎ হযরত মুহাম্মদ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আমার নবী। এই উত্তরে ফেরেশতাদ্বয় পরিতুষ্ট হইয়া তাহাকে বলিবে, “হে আল্লাহর প্রিয় বান্দা” ! তুমি সেই নতুন বরের মত আরামে শুইয়া থাক  যাহাকে তাহার অতি প্রিয়জন ছাড়া কেহ জাগরিত করে না।” তারপর তাহার মাথার কিনারা দিয়া বেহেশতের দিকে জানালা খোলা হইবে, যাহা দ্বারা সেই ব্যক্তি বেহেশতের বাগান, আরামের স্থান ইত্যাদি যাহা কিছু তাহাকে বেহেশৃতে প্রদান করা হইবে, সবকিছুই দেখিবে। পরিশেষে উভয় ফেরেশতা তাহার রূহ্ লইয়া কবর হইতে বাহির হইয়া যাইবে এবং আরশে মোয়াল্লার নীচে ঝুলন্ত প্রদীপে উহা রাখিবে। 
হযরত আবু হোরায়রা (রাঃ) হইতে হাদীসে কুদসীতে বর্ণিত আছে যে, জনাব হুযুর করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিয়াছেন, “আল্লাহ্ তায়ালা এরশাদ করেন- ‘আমার বান্দাগণের মধ্য হইতে যাহাদিগকে আমি ক্ষমা করিতে ইচ্ছা করি তাহাদের গুনাহসমূহকে শরীরের রোগ-শোক অথবা দারিদ্র্যতার নিষ্পেষণে, অথবা দুঃখ-কষ্টে নিপতিত করিয়া দেই। এর পরও যদি গুনাহরাশি বাকী থাকে, তবে তাহার মৃত্যুকষ্ট কঠিন করিয়া দেই যাহাতে সে নিষ্পাপ অবস্থায় আমার সহিত সাক্ষাত করিতে সক্ষম হয়। 'আর আল্লাহ তায়ালা স্বীয় মান-সম্মান ও প্রতিপত্তির শপথ করিয়া বলিয়াছেন, 'আমার বান্দাগণের মধ্যে যাহাদের গুনাহরাশি আমি মার্জনা করিতে চাইনা, তাহাদিগকে এই পৃথিবীতেই তাহাদের কৃতকর্মের প্রতিফলস্বরূপ সুস্থ-সবল ও আনন্দমুখর এবং অঢেল পরিমাণে ভোগ্যপণ্য প্রদান করিয়া সুখ-শান্তিতে নিমগ্ন রাখি। তারপরও যদি কিছুটা পুণ্য অবশিষ্ট থাকিয়া যায়, তবে তাহার মৃত্যুকষ্ট লাঘব করিয়া থাকি।”
হযরত আওয়াদ (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, “একদিন আমরা হযরত আয়েশা (রাঃ) এর নিকট বসিয়াছিলাম। এমন সময় অকস্মাৎ একটি তাঁবু ছিড়িয়া একজন লোকের উপর পতিত হইলে আমরা সকলেই হাস্য সংবরণ করিতে পারিলাম না। তখন হযরত আয়েশা (রাঃ) বলিলেন, আমি জনাব হুযুর করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উনাকে বলিতে শুনিয়াছি যে, মুমিন বান্দার শরীরে কাঁটা প্রবেশ করিলেও আল্লাহ তায়ালা তাহার পাপ মার্জনা করিয়া দেন এবং উচ্চ মর্যাদা প্রদান করেন।
জনৈক বুযর্গ বলিয়াছেন, “নিরোগ দেহ উৎকৃষ্ট নহে এবং বিপদশূন্য ধন-সম্পদও উৎকৃষ্ট নহে।” জনাব হুযুর করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিয়াছেন, “যখন কাহারও ‘মরজগৎ’ ত্যাগ করিয়া পরজগতে যাওয়ার সময় নিকটবর্তী হয়, তখন সূর্যের ন্যায় উজ্জ্বল চেহারাসম্পন্ন একদল ফেরেশ্তা বেহেশতী কাফন ও সুগন্ধি লইয়া তাহার দৃষ্টিপথে বসিয়া থাকে। তারপর মৃত্যুদূত তাহার মাথার পার্শ্বে বসিয়া আরজ করে, হে প্রশান্ত আত্মা ! আল্লাহর রহমত ও রেজামন্দির জন্য অতি সত্বর বাহির হইয়া আস।” রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, “তখন রূহ্ বাহির হইয়া আসে এবং তাহার মুখ হইতে পানির ফোটা পড়িতে থাকে, যেমন মশক হইতে পতিত হয়। তারপর ফেরেশতাগণ তাহার রূহ্‌কে সযত্নে ধরিয়া উক্ত কাফনের মধ্যে রাখে এবং উহা হইতে মেশকের সুগন্ধ বাহির হয়। অবশেষে ফেরেশতাগণ যখন তাহার রূহ লইয়া বেহেশত রাজ্যে আরোহণ করিতে থাকে, তখন অন্যান্য ফেরেশতাগণ জিজ্ঞাসা করে, এই উৎকৃষ্ট সুগন্ধি কোথা হইতে আসিতেছে? প্রত্যুত্তরে বলা হয়, অমুকের পুত্র অমুকের রূহ্ হইতে এই সুগন্ধি বাহির হইতেছে। তখন ফেরেশতাগণ তাহাকে উত্তম নামে সম্বোধন করে। আর যখন ফেরেশতাগণ রূহ সহকারে প্রথম আসমানের দ্বারদেশে উপনীত হয়, তখনই সপ্ত আকাশের সাতটি দরওয়াজা খুলিয়া যায় এবং প্রত্যেক আসমান হইতে কিছু সংখ্যক ফেরেশতা তাহার শুভ গমনার্থে অভ্যর্থনার জন্য অগ্রসর হয়। এইভাবে সপ্তাকাশে আরোহণ করিলে আল্লাহ তা'আলার নিকট হইতে " উচ্চৈঃস্বরে ঘোষণা করা হয়, “হে ফেরেশ্তাগণ! তাহার আমলনামা- 'ঈল্লিন’ নামক স্থানে রাখ এবং তাহার শরীরকে মাটিতে মিশাইয়া দাও। কারণ তাহাকে আমি মাটি হইতেই পয়দা করিয়াছি, এ মাটিতেই ফিরাইয়া আনিব এবং সেই মাটি হইতেই পুনরুত্থান করিব।” তখন ফেরেশ্তাগণ রূহকে শরীরের সহিত মিশ্রিত করিয়া দেয়। তারপর মনকীর নকীর নামক দুইজন ফেরেশতা আগমন করেন এবং মৃত ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসা করেন, “হে আল্লাহর বান্দা ! বল, তোমার মাবুদ কে? তোমার নবী কে? এবং তোমার ধর্ম কি?” তারপর হযরত মুহাম্মদ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর প্রতি ইঙ্গিত করিয়া বলেন, হে আল্লাহর বান্দা! এ প্রেরিত পুরুষ সম্বন্ধে তোমার অভিমত কি? মুমিন বান্দাগণ প্রত্যুত্তরে বলেন, “তিনি আল্লাহর প্রেরিত রাসূল। তাঁহার উপরই আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআন শরীফ নাযিল করিয়াছেন। এইজন্য আমি ইহাকে সত্য জানিয়া ঈমান আনয়ন করিয়াছি।” তখন উদাত্ত কণ্ঠে আল্লাহ তা'আলা ঘোষণা করেন , “হে ফেরেশতাগণ! আমার বান্দা সত্য কথাই বলিয়াছে। অতএব তাহাকে বেহেশ্তী লেবাসে সুসজ্জিত করিয়া বেহেশতী বিছানা পাতিয়া দাও। আর তাহার জন্য বেহেশতের দিকে একটি দরওয়াজা খুলিয়া দাও , যাহাতে বেহেশতী সুগন্ধি তাহার কবরে প্রবেশ করিতে পারে। আর দৃষ্টিশক্তির শেষ সীমা পর্যন্ত তাহার কবরকে প্রশস্ত করিয়া দাও।” 

হযরত রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আরও এরশাদ করিয়াছেন যে, “তখন একজন গৌরকান্তি বিশিষ্ট সুন্দর সুপুরুষ আগমন করিবেন এবং তাঁহার শরীর হইতে সুগন্ধ বাহির হইবে। তিনি বলিবেন, ‘হে আল্লাহর বান্দা ! তোমার সৃষ্টিকর্তা তোমাকে যে সকল সুসংবাদ প্রদান করিয়াছেন, আমিও তোমাকে সেইসব সুসংবাদ প্রদান করিতেছি। উক্ত বান্দা তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিবে ‘আপনি কে? আল্লাহ তা'আলা আপনার উপর শান্তি বর্ষিত করুন। আপনার মত সুন্দর সুপুরুষ আর কাহাকেও দেখি নাই।' প্রত্যুত্তরে তিনি বলিবেন, ‘আমি তোমার নেক আমল!’  

আর যখন কাফেরের মৃত্যু নিকটবর্তী হয়, তখনও আকাশ হইতে ফেরেশ্তাগণ দোযখের পোশাক লইয়া তাহার দৃষ্টি সীমার মধ্যে বসিয়া থাকে। তারপর মৃত্যুদূত তাহার পার্শ্বে উপবেশন করে এবং অল্পক্ষণের মধ্যেই তাহার পাপাত্মাকে জোরপূর্বক অত্যন্ত যন্ত্রণাসহকারে ছিনাইয়া আনে। যেমন শিক কাবাব হইতে শিক বাহির করা হয়। তারপর ফেরেশ্তাগণ কাফেরের পাপাত্মাকে খুব প্রহার করিয়া দোযখের পোশাকে আচ্ছাদিত করিয়া দেয়। তখন আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যবর্তী অবস্থিত যাবতীয় প্রাণী ও বস্তু নিয়া তাহাকে অভিসম্পাত করে। তাহাদের লানত বাণী মানব-দানব ছাড়া সকলেই শ্রবণ করে। আর কাফেরের রূহ্ লইয়া ফেরেশ্তাগণ ঊর্ধ্বাকাশে আরোহণ করিবামাত্রই আকাশের সমস্ত দরজাগুলি বন্ধ হইয়া যায় এবং আল্লাহ তা'আলার নিকট হইতে ঘোষণা করা হয়, ‘হে ফেরেশ্তাগণ! এই কাফেরের রূহকে কবরের মধ্যে পুঁতিয়া রাখ।' তখন তাহারা তাহাকে কবরের মধ্যে পুঁতিয়া রাখিয়া বিদায় হইয়া যায়। তারপর মনকির নকীর ফেরেশ্তাদ্বয় ভীষণ আকার ধারণ করতঃ সেখানে আগমন করে। তাহাদের কণ্ঠস্বর মেঘের গর্জনের মত ভয়ঙ্কর ও ভীতিপ্রদ হইবে এবং চক্ষুদ্বয়ের জ্যোতি বিদ্যুতের মত প্রখর ও তীর্যক হইবে। তাহারা দাঁত, নখ দ্বারা মাটিভেদ করিয়া কবরে প্রবেশ করিবে এবং বিধর্মী কাফেরকে উপবেশন করাইয়া জিজ্ঞাসা করিবে; ‘হে আল্লাহর বান্দা ! বল, তোমার রব কে?’ প্রত্যুত্তরে সে বলিবে ‘হায় ! হায় ! আমি সে সম্বন্ধে কিছুই অবগত নই।' তাহারা আবার জিজ্ঞাসা করিবে, 'তুমি নিজের জ্ঞান দ্বারা ও পবিত্র কোরআন শরীফ পাঠ করিয়া তাহা জানিয়া লও নাই কেন?' অতঃপর আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হইতে ঘোষণা করা হইবে, ‘হে ফেরেশ্তাগণ! তাহাকে ভীষণ হাতুরী দ্বারা বেদম পিটাইতে থাক।' হাতুরীটি এমন ভারী হইবে যে, সমস্ত মাখলুকাত মিলিয়াও উহা স্থানান্তরিত করিতে সক্ষম হইবে না। উহাতে তাহার কবর আগুনে লালে লাল হইয়া যাইবে এবং কবরটি এতই সৎকীর্ণ হইয়া যাইবে যে, একবাহু অন্যবাহুতে প্রবেশ করিয়া যাইবে। তারপর অত্যন্ত দুর্গন্ধময় ও কুৎসিত চেহারাবিশিষ্ট একব্যক্তি তাহার সন্নিধানে আসিয়া বলিবে, ‘আল্লাহ তা'আলা আমার দ্বারা তোমার প্রভূত ক্ষতি সাধন করুন। আল্লাহর শপথ, তুমি পৃথিবীতে পাপকাজ ছাড়া ভাল কাজ কর নাই। আল্লাহর এবাদতে তুমি অত্যন্ত অলস ছিলে, কিন্তু পাপ ও মন্দ কাজে তুমি অত্যন্ত কর্মঠ ও চপল ছিলে।’ মৃতব্যক্তি তাহাকে জিজ্ঞাসা করিবে, ‘হে বন্ধু ! তুমি কে? তোমার মত কুৎসিত লোক ইহজগতে আমি কাহাকেও দেখি নাই।' উত্তরে সে বলিবে, 'আমি তোমার পাপকার্যসমূহ। তারপর তাহার কবর হইতে দোযখের দিকে একটি সুরঙ্গ পথ খুলিয়া দেওয়া হইবে। যাহাদ্বারা সে তাহার দোযখের আবাস দেখিতে পাইবে।
হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, মুমিন বান্দাকে কবরে মাত্র সাতদিন পর্যন্ত পরীক্ষা ও আজমায়েশ করা হয় এবং কাফের বান্দাকে কবরে চল্লিশ দিন পর্যন্ত পরীক্ষা করা হয়। 
হযরত নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আরও বলিয়াছেন যে, ‘যাহারা শুক্রবার দিবসে কিংবা রাত্রিতে মৃত্যুমুখে পতিত হয়, আল্লাহ তা'আলা তাহাদিগকে গোর আযাব হইতে অনেকাংশে রক্ষা করিয়া থাকেন।'
হযরত আবু উমামা বাহেলী (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, যখন কোন ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করে এবং তাহাকে কবরে রাখা হয়, তখন একজন ফেরেশ্তা তাহার মস্তকের পার্শ্বে বসিয়া আযাব করিতে শুরু করে। উক্ত ফেরেশতা একবার লৌহদণ্ড দ্বারা প্রহার করিবামাত্র তার সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ চূর্ণ-বিচূর্ণ হইয়া যায় এবং সম্পূর্ণ কবরটি আগুনের লেলিহান শিখায় জ্বলিতে থাকে। পুনরায় সেই ফেরেশতা আল্লাহ তা'লার আদেশে ‘উঠ’ বলিবা-মাত্র সে সুস্থ সবল দেহে উঠিয়া বসে এবং এমন উচ্চৈঃস্বরে চীৎকার আরম্ভ করে যে, আকাশ ও পাতালের মধ্যস্থিত মানব-দানব ছাড়া অন্য সবকিছুই সেই চীৎকার শুনিতে পায়। সে ফেরেশ্তাকে জিজ্ঞাসা করে, হে আল্লাহর ফেরেশতা ! তুমি আমাকে এহেন কঠিন আযাব প্রদান করিতেছ কেন? আমি নামায আদায় করিয়াছি, যাকাত আদায় করিয়াছি, রমজান মাসের রোযা রাখিয়াছি এবং বিভিন্ন পুণ্যকর্ম সম্পাদন করিয়াছি। প্রত্যুত্তরে ফেরেশতা বলিবে, 'হে আল্লাহর বান্দা ! একদিন তুমি কোন এক অত্যাচারিত ব্যক্তির নিকট দিয়া গমন করিতেছিলে এবং সে অত্যাচারিত হইয়া তোমার নিকট সাহায্য ভিক্ষা করিয়াছিল, কিন্তু তখন তুমি উহা উপেক্ষা করিয়াছিলে। আর একদিন তুমি প্রস্রাব হইতে সঠিকভাবে পাক না হইয়াই নামায পড়িয়াছিলে।' 
এই প্রসঙ্গে হযরত রাসূল মাকবুল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করিয়াছেন, “যে ব্যক্তি মজলুম বা অত্যাচারিতের সাহায্যার্থে অগ্রসর হইবে না, তাহাকে কবরের মধ্যে একশত আগুনের দোররা মারা হইবে।” হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, জনাব রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করিয়াছেন যে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা চারিটি সম্প্রদায়কে নূরের মিম্বরের উপর উপবেশন করাইবেন এবং নিজ রহমতের ছায়ার নীচে দাখিল করাইবেন। সাহাবাগণ আরজ করিলেন, 'হে আল্লাহর রাসূল  তাহারা কোন শ্রেণীর লোক?’ মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করিলেন, 'যাহারা ক্ষুধার্তকে অনুদান করিয়াছে এবং ধর্মযোদ্ধাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করিয়াছে, দুর্বলকে সাহায্য করিয়াছে আর মজলুম ও অত্যাচারীতের ডাকে সাড়া দিয়াছে!’  
হযরত আনাস ইবনে মালেক (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, হযরত রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করিয়াছেন, ‘যখন মৃত ব্যক্তিকে কবরে রাখিয়া মাটি চাপা দেওয়া হয় আর তাহার সন্তান- সন্ততি ও আত্মীয়-স্বজন ‘হে কুলশীল সর্দার!' বলিয়া তাহাকে সম্বোধন করিতে থাকে, তখন কবরের জন্য নির্ধারিত ফেরেশতা তাহাকে প্রশ্ন করে, ‘হে আল্লাহর বান্দা ! তুমি উহাদের কথা শুনিতেছ কি?’ প্রত্যুত্তরে সে বলে, 'হাঁ'। পুনরায় জিজ্ঞাসা করে, 'আচ্ছা তুমি কি প্রকৃতই সম্ভ্রান্ত নেতা ছিলে? উত্তরে আল্লাহর বান্দা বলে, “না না, আমি কস্মিন কালেও তদ্রূপ ছিলাম না। বরঞ্চ তাহারা মিথ্যাকথা বলিতেছে। আমি মহাধিরাজ আল্লাহর নিকৃষ্টতম বান্দা ছিলাম মাত্র।' তখন মৃতব্যক্তি নিতান্ত পরিতাপ সহকারে পুনরায় বলে, ‘হায় তাহারা যদি আর কিছুই না বলিত, তাহা হইলে কতই না ভাল হইত্।'  অতঃপর তাহার কবর এতই সংকীর্ণ হইয়া যায় যে, এক দিকের পাঁজর অন্য পাজরে প্রবেশ করে এবং মৃতব্যক্তি চীৎকার করিয়া বলে ‘হায় ! হায় ! ইহা হাড় ভাঙ্গার জায়গা, লজ্জা ও অনুশোচনার জায়গা এবং কঠিন প্রশ্নের জায়গা।' 
অনুরূপভাবে রজব মাসের প্রথম শুক্রবার রাত্রিতে (লাইলাতুল রাগায়েব) আল্লাহ পাক ফেরেশ্তাদিগকে ডাকিয়া বলেন, “হে ফেরেশ্তাগণ ! তোমরা সাক্ষী থাক, আমি তাহার গুনাহসমূহ মার্জনা করিয়া দিলাম। কারণ সে এই রাত্রিতে আমার উপাসনায় অতিবাহিত করিয়াছিল।” 

পরবর্তী পর্ব
মনকির নকীরের পূর্ববর্তী ফেরেশতার বিবরণ

দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ১৯) বিপদে ধৈর্য্য অবলম্বন করা



📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ১৯)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

বিপদে ধৈর্য্য অবলম্বন করা 
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, হযরত রাসুলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করিয়াছেন, কলম সর্বপ্রথম আল্লাহ তা'আলার নির্দেশে লৌহ মাহফুজে এই কথাগুলি লিখিয়াছে, “আমিই উপাস্য, একমাত্র উপাস্য। আমি ছাড়া অন্য কোন উপাস্য নাই। আর হযরত মুহাম্মদ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আমার প্রিয় বান্দা ও রাসূল। আমার সৃষ্টজীবের মধ্যে তিনিই সর্বশ্রেষ্ঠ।” লৌহে মাহফুজে আরও লেখা হইল, যাহারা আমার বিধি-নিষেধ প্রতিপালন করিবে, আমার নেয়ামতের শোকর গুজারী করিবে, আর বিপদে ধৈর্যধারণ করিবে, তাহাদিগকে আমি কিয়ামতের দিন সাহাবিগণের মধ্যে পরিগণিত করিব এবং যাহারা আমার আদেশ নিষেধ অগ্রাহ্য করিবে, বিপদে অধৈর্য হইবে আর আমার প্রদত্ত নেয়ামতের শোকর গুজারী করিবে না, তাহারা যেন আমার আকাশের সীমানা ছাড়িয়া অন্য কোথাও চলিয়া যায় এবং আমাকে ছাড়া অন্যকে উপাস্যরূপে খুঁজিয়া লয়। হযরত ফকিহ আবু লায়েস (রহঃ) বলিয়াছেন, “বিপদে ধৈর্যধারণ করতঃ আল্লাহ তায়ালাকে স্মরণ করা প্রত্যেক মানুষের একান্ত দরকার। কারণ, সেই সময় আল্লাহ তায়ালাকে স্মরণ করিলে তাঁহার হুকুম প্রতিপালিত হয় এবং শয়তানকে তিরস্কার করা হয়। আর ইহাতে আল্লাহ তা'আলা সেই বান্দার প্রতি খুশী হন।” 
হযরত আলী (রাঃ) বলিয়াছেন, “ধৈর্য তিন শ্রেণীতে বিভক্ত। যেমন— এবাদত-বন্দেগীতে ধৈর্যধারণ করা, বিপদে ধৈর্যধারণ করা এবং বালা-মছিবতে ধৈর্যধারণ করা। 
যাহারা এবাদত-বন্দেগীতে ধৈর্য অবলম্বন করিবে, আল্লাহ তায়ালা তাহাদিগকে রোজকিয়ামতে তিনশত উচ্চস্থান বা উচ্চমর্যাদা প্রদান করিবেন এবং প্রত্যেক দুই স্থানের মধ্যবর্তী উচ্চতা আকাশ পাতালের সমতুল্য হইবে। আর যাহারা বিপদে ধৈর্যধারণ করিবে, তাহাদিগকে রোজকিয়ামতে সাতশত মর্তবা প্রদান করা হইবে। প্রত্যেক দুই মর্তবার উচ্চতা আসমান যমিনের সমতুল্য হইবে। আর যাহারা বালা-মছিবতে ধৈর্য অবলম্বন করিবে, আল্লাহ তায়ালা তাহাদিগকে নয়শত মর্তবা প্রদান করিবেন, প্রত্যেক দুই মতবার উচ্চতা আরশ ও ভূ-মণ্ডলের সমতুল্য হইবে।”

পরবর্তী পর্ব
দেহ হইতে রূহ্ কবজের বিবরণ-

দাকায়েকুল আখবার- (১৮) মৃতের জন্য বিলাপ করিবার পরিণাম

 

📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ১৮)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

মৃতের জন্য বিলাপ করিবার পরিণাম -
হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে, “যে ব্যক্তি বিপদে ধৈর্যধারণ করিতে না পারিয়া স্বীয় বস্ত্র ছিঁড়িয়াছে, কিংবা বুকে আঘাত হানিয়াছে সে ব্যক্তি যেন তীর, বর্শা লইয়া আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছার বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করিয়া দিয়াছে। হযরত নবীয়ে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিয়াছেন, “বিপদের সময় যে ব্যক্তি দরওয়াজা বা বস্ত্র কৃষ্ণবর্ণ করিয়াছে, অথবা ছিঁড়িয়াছে অথবা দোকান পাট নষ্ট করিয়াছে, কিংবা গাছ পালা তুলিয়াছে বা স্বীয় অঙ্গের পশম তুলিয়াছে, আল্লাহতায়ালা তাহার প্রতিটি পশম ও উৎপাদিত বৃক্ষের পাতার পরিবর্তে তাহার জন্য দোযখে একটি গৃহ তৈরী করিবেন এবং সে যেন আল্লাহ তায়ালার সহিত শরীক করিল ও সত্তরজন নবীকে হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হইল। যতদিন এই কালো দাগ থাকিবে, ততদিন আল্লাহ তা'আলা তাহার কোন ফরজ-নফল এবাদত, দান-খয়রাত ও দোয়া কবুল করিবেন না। আর আল্লাহ তা'আলা ঐ ধরনের ক্রোধসম্পন্ন ব্যক্তিদিগকে- যাহারা বিপদে ধৈর্য অবলম্বন করে নাই, তাহাদের কবরকে সংকীর্ণ করিয়া দিবেন এবং কঠিনভাবে তাহাদের হিসাব গ্রহণ করিবেন। আকাশমণ্ডল ও ভূূমণ্ডলে যাহা কিছু রহিয়াছে, সমুদয় জীব-জানোয়ার তৃণলতা ও ফেরেশতাগণ তাহার উপর আল্লাহ তায়ালার অভিসম্পাত কামনা করিবে এবং তাহার নামে এক হাজার পাপ লিখিত হইবে আর তাহাদিগকে উলঙ্গ অবস্থায় কবর হইতে বাহির করা হইবে।”
আর বিপদে অধৈর্য হইয়া যে ব্যক্তি জামার পকেট ছিঁড়িয়া ফেলিবে, আল্লাহ পাক তাহার ধর্ম বিনষ্ট করিয়া দিবেন। বিপদে অধৈর্য হইয়া যে ব্যক্তি নিজ গণ্ডদেশে চপেটাঘাত করিবে কিংবা মুখমণ্ডলের কোন অংশ জখম করিয়া ফেলিবে, আল্লাহ তা'আলা তাহার জন্য স্বীয় দর্শন (সাক্ষাত) হারাম করিয়া দিবেন।

হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে, যখন কোন ব্যক্তি মৃত্যুমুখে পতিত হয়, তখন কেহ যদি উচ্চৈঃস্বরে ক্রন্দন করিতে করিতে সেই গৃহে প্রবেশ করে, তাহা হইলে মালাকুল মউত সেই গৃহের দরওয়াজায় দাঁড়াইয়া ঘোষণা করেন, “হে মানবমণ্ডলী! তোমরা এরূপ করিতেছ কেন? আমি তোমাদের কাহারও হায়াত বা ধন-সম্পদ বিনষ্ট করি নাই এবং কাহারও উপর অত্যাচার করি নাই। তোমরা যদি আমার কাজে অসন্তুষ্ট হইয়া ক্রন্দন করিয়া থাক, তবে জানিয়া রাখিও, আমি আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ পালনকারী দাসানুদাস মাত্র। আর যদি মৃত ব্যক্তির জন্য ক্রন্দন করিয়া থাক, তবে জানিয়া রাখিও, সে ছিল নিতান্ত অসহায়। আর যদি আল্লাহ তা'আলার আদেশের কারণে ক্রন্দন করিয়া থাক, তবে তোমরা আল্লাহ তা'আলার শোকর গুজারী হইতে বঞ্চিত হইয়া কুফুরী করিতেছ। আল্লাহর শপথ দিয়া বলিতেছি যে, অবশ্যই তোমাদের নিকটও আমাকে আসিতে হইবে আর তোমরা কেহই আমার হাত হইতে রেহাই পাইবে না।”

ফকীহগণের অভিমত এই যে, মৃত ব্যক্তির জন্য উচ্চৈঃস্বরে চীৎকার করা হারাম; কিন্তু আওয়াজহীন ক্রন্দনে কোন ক্ষতি নাই তবে ধৈর্যধারণ করাই সর্বোত্তম। আল্লাহ তা'আলা এরশাদ করিয়াছেন- “ইন্নামা ইয়াতাওফ্‌ফাছ ছাবিরুনা আজরুহুম বিশ্বাইরি হিছাব”  অর্থাত: - “অবশ্যই ধৈর্যশীলদিগকে অসংখ্য প্রতিদান প্রদান করা হইবে।”  হযরত নবীয়ে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিয়াছেন, “উচ্চৈস্বরে ক্রন্দনকারীগণ ও তাহাদের সাহায্যকারীগণ এবং শ্রবণকারী ও নিকটবর্তী সকলেই আল্লাহ তায়ালা ও ফেরেশতাগণ এবং সমস্ত মানুষ অভিসম্পাত করিয়া থাকে।”

বর্ণিত আছে, হযরত হাসান ইবনে আলী (রাঃ) যখন ইন্তেকাল করেন, তখন তাঁহার স্ত্রী এক বৎসর পর্যন্ত তাঁহার কবরের উপর পড়িয়াছিলেন। এক বৎসর পর তাবু উঠানো হইলে কবরের মধ্যস্থল হইতে এই আওয়াজ তিনি শুনিতে পাইলেন, “ওহে! যাহাকে তুমি হারাইয়াছ, তাহাকে কি তুমি পাইয়াছ?” হুযুর করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর পুত্র হযরত ইব্রাহিম (রাঃ) যখন ইন্তেকাল হন, তখন তাঁহার চক্ষুদ্বয় হইতে অশ্রু ঝড়িতেছিল। ইহা দর্শন করিয়া হযরত আবদুর রহমান আরজ করিলেন, “হুযুর আপনিতো আমাদিগকে এইরূপ করিতে নিষেধ করিয়াছেন?” প্রত্যুত্তরে তিনি বলিলেন, “আমি মাত্র দুইটি পাপ আওয়াজ ও দুইটি আহাম্মকি কাজ হইতে বিরত থাকিতে বলিতেছি। উহা হইল বিলাপের ও গানের সুরে ক্রন্দন করা, পোশাক-পরিচ্ছদ ছিন্ন করা এবং গলদেশে আঘাত হানা কিন্তু অশ্রু বিসর্জনে কোন দোষ নাই। আল্লাহ তা'আলা রহমতস্বরূপ দয়ালুদের হৃদয়ে উহা স্থাপন করিয়াছেন।” তারপর তিনি বলিলেন, “হে ইব্রাহিম! তোমার বিচ্ছেদে আমার হৃদয় ব্যথিত এবং চক্ষুদ্বয় অশ্রুসিক্ত হইয়া পড়িয়াছে।”

হযরত ওহাব ইবনে কায়সান (রাঃ) ও হযরত আবু হোরায়রা (রাঃ) বর্ণনা করিয়াছেন যে, হযরত আবু হাফস ওমর (রাঃ) একজন স্ত্রীলোককে মৃত ব্যক্তির জন্য ক্রন্দন করিতে দেখিয়া তাহাকে নিষেধ করিলেন। অতঃপর হুযুর করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিলেন, “হে ওমর! তাহাকে ক্রন্দন করিতে দাও। কারণ হৃদয়ের দুঃখে চক্ষু হইতে অশ্রু প্রবাহিত হয় এবং উহা বিপদের সময়ের কথা স্মরণ করাইয়া দেয়।”

পরবর্তী পর্ব

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...