শুক্রবার, ৮ নভেম্বর, ২০২৪

মারেফতের মর্মকথা (৫) মানুষের আচরণ-ধর্ম



📚কাশফুল মাহজুব (পর্ব- ৫)  ✍🏻দাতা গঞ্জেবকশ হাজবেরী (রহ.)

মানুষের আচরণ-ধর্ম—
এই পথের প্রথম পদক্ষেপ হলো সঠিক এবং নির্ভরযোগ্য এলম তথা জ্ঞানার্জন করা। কারণ, সঠিক জ্ঞান না থাকলে কেউ সঠিক পথের সন্ধান পায় না। কিন্তু বিপদ হলো আমাদের যুগে বিশেষিত আমাদের দেশে এলমের প্রতি লোক উদাসীন, সবাই কুপ্রবৃত্তির ভক্ত এবং আল্লাহর প্রতি অনাসক্ত। এই যুগের আলেমরা পর্যন্ত সত্যের বিরোধী। এই যুগের লোক প্রবৃত্তির তাড়নাকেই শরীয়ত হিসেবে আখ্যায়িত করে। প্রভাব প্রতিপত্তির প্রতি লালায়িত ও লালসার নাম সম্মান, অহংকার করার নাম এলম, লোক দেখানো ইবাদতের নাম তাকওয়া, হিংসা দূর করার পরিবর্তে অন্তরে পোষণ করে রাখার নাম সহনশীলতা, তর্ক-বিতর্ক এবং অতিশয় হীনতার সাথে সংগ্রাম করার নাম মহানতা,  মুনাফেকীর নাম বৈরাগ্য,  মুখে যা আসে তা বলাকে মারেফাত,  বিলাসিতার নাম আল্লাহ প্রেম,  নাস্তিকতার নাম দরবেশী,  আল্লাহকে অস্বীকার করার নাম ফানা আর হুজুর- (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর শরীয়তকে পরিত্যাগ করার নাম তরিকত রেখেছে। এমনকি সৎপথের পথিকগণ অজ্ঞদের দাপটে এমনভাবে সনাক্ত হয়ে রয়েছেন যেরূপ খোলাফায়ে রাশেদার পর নবি পরিবার উমাইয়া বংশধরদের চাপে নিশ্চুপ হয়ে গিয়েছিলেন। 
এই ব্যাপারে হজরত আবু বকর ওয়াস্তি কী সুন্দর বলেছেন- আমাদের এমন যুগের সাথে পরীক্ষা করা হচ্ছে যে যুগের মানুষের মাঝে না ইসলামী আদব আছে, না জাহেলিয়াতের স্বভাব আছে। আর না আছে মানবসুলভ চরিত্র। ফলে আল্লাহ ব্যতীত এমন কে আছে যে বিগত যুগকে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম? এজন্য প্রথম পদক্ষেপ সঠিক জ্ঞানার্জনের দ্বারাই আরম্ভ হয়। অতএব আমরা এলম ও এলম অর্জনের অধ্যায় দ্বারাই আরম্ভ করব। আল্লাহ সাহায্যকারী। আল্লাহ ছাড়া আর কারও কোন প্রকার সামর্থ্য নেই।

পরবর্তী পর্ব-
জ্ঞানার্জন করা ফরজ


মারেফতের মর্মকথা (৪) সহজ পথ



📚কাশফুল মাহজুব (পর্ব- ৪)  ✍🏻দাতা গঞ্জেবকশ হাজবেরী (রহ.)

সহজ পথ—
অতঃপর এটাও স্মরণ রাখতে হবে যে, আল্লাহ তায়ালা অনুগ্রহ করে এই পৃথিবীতে যেই কাজের জন্য যাকে সৃষ্টি করেছেন এবং যেই কাজের দায়িত্ব যাকে অর্পণ করেছেন তা তার জন্য সহজ করে দিয়েছেন। যদি মানুষ স্বীয় ভ্রান্তি দ্বারা নিজের স্বভাব ও প্রকৃতিকে বক্র না করে তাহলে তার স্বভাবের জন্য ঐসব পথ অবলম্বন করাই সহজসাধ্য হয় যা আল্লাহ তায়ালা তার রাসূলদের মাধ্যমে মানবজাতির কাছে উপস্থাপন করেছেন। কেননা, এসব পথ তাঁরই প্রস্তাবিত যিনি মানবজাতির স্রষ্টা এবং আকৃতি দাতা। 

কুরআন মজীদে এই পথকে "সহজ পথ” বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এসব পথ মানুষের স্বভাবগত পথ।
আল্লাহ তায়ালা তাঁর প্রিয় নবি (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) কে সম্বোধন করে বলেছেন: وَنُيَسرُكَ لِليسرى আমি اليسرى কে আপনার জন্য সহজ করে দিয়েছি। যে ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় চলে এবং আল্লাহভীতির পথকে অনুসরণ করে এবং মঙ্গলের সত্যতা স্বীকার করে তার জন্য আমি البشرى কে সহজ করে দেব।"
এরই ব্যাখ্যাস্বরূপ মহানবি (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করেছেন-
"সকলের জন্য ঐ পথকে সহজ করে দেয়া হয়েছে যার জন্য তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে।”
তাই এই পথের অনুসারী হতে মানুষের কু-প্রবৃত্তি, বিগড়ানো স্বভাব এবং নিয়তের ব্যতিক্রম ব্যতীত অন্য কিছু যেন অন্তরায় হয়ে না দাঁড়ায়। অন্যথায় আল্লাহর বন্দেগির পথ তো মূলে নিজের আমলের উপর প্রতিষ্ঠিত মানুষের একান্ত কাম্য বিষয় ও তার প্রকৃতি; স্বভাব ও প্রয়োজনের অনুকূলে। সত্যানুসন্ধানীর জন্য পথ প্রদর্শক
অতপর মহানবি (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) -এর তিরোধানের পর মানবজাতিকে সত্যের পথ-প্রদর্শন করার উদ্দেশ্যে আল্লাহ তায়ালা সত্যের সন্ধানীদের সরল পথে পরিচালনা করার জন্য এই মানবজাতির মধ্যেই একটি দলকে নিয়োগ করে রেখেছেন যারা তাদের সর্বক্ষণ সঠিক পথে পরিচালনা করতে পারেন। এই ব্যাপারে হুজুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)  সুসংবাদ জ্ঞাপন করেছেন-
"আমার উম্মতের মধ্যে একটি সম্প্রদায় কেয়ামত পর্যন্ত সত্য ও ন্যায়ের পথে বহাল থাকবে।” আরও বলেন: "সকল যুগে আমার উম্মতের মধ্যে কমপক্ষে চল্লিশ জন ব্যক্তি হজরত ইবরাহীম (আ)-এর চরিত্রে চরিত্রবান থাকবে"।
কাজেই যে কোন ব্যক্তিই সঠিক পথের সন্ধানী হবে এবং সৎ নিয়তে সেই পথে চলতে ইচ্ছুক হবে তার জন্য এই সুসংবাদ যে সে কখনও সৎ পথের সন্ধান পেতে কোন ধরনের অসুবিধার সম্মুখীন হবে না এবং সেই পথে থাকার সাথি পাওয়া হতেও বঞ্চিত হবে না। অবশ্য শর্ত হলো তার নিয়ত সৎ ও সরল হতে হবে। যেমন কোন ব্যক্তি তার বিষয় সম্পত্তির ব্যাপারে ভালো উকিল এবং রোগের চিকিৎসার লক্ষ্যে ভালো ডাক্তারের পরামর্শ গ্রহণ করে থাকে।

পরবর্তী পর্ব

মারেফতের মর্মকথা (৩) এই দুনিয়া পরীক্ষাগার



📚কাশফুল মাহজুব (পর্ব- ৩)  ✍🏻দাতা গঞ্জেবকশ হাজবেরী (রহ.)

এই দুনিয়া পরীক্ষাগার 
এই সম্পর্কে দ্বিতীয় স্মরণযোগ্য বিষয় হলো- আল্লাহ তায়ালা এই দুনিয়াকে মানুষের জন্য পরীক্ষাগার হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। এটা পরীক্ষা গৃহ এবং আমানতের ক্ষেত্র। এখানে পুরস্কৃত বা তিরস্কার করা হবে না। তাই আল্লাহ তায়ালা এই দুনিয়াকে পর্দার গৃহে রেখেছেন এবং এর সম্পূর্ণ যথার্থতাকে লোকচক্ষুর অন্তরালে গোপন করে রেখেছেন। মানবজাতিকে পথ প্রদর্শনের জন্য যতটি পর্দা অপসারণের দরকার ছিল আল্লাহ স্বয়ং তাঁর রাসূলদের মাধ্যমে তা সরিয়ে দিয়েছেন। অতপর আল্লাহ তা'আলা এরশাদ করেছেন:– "আমি মানবসম্প্রদায়কে পথ প্রদর্শন করেছি এখন তাদের ইচ্ছা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করুক কিংবা অকৃতজ্ঞ হোক।” (সূরা দাহর : ৩) 

তিনি অন্যত্র বলেন, - "আর যারা আমার হেদায়াতের অনুসারী হবে তাদের জন্য কোন ধরনের ভয়ভীতি নেই। কিন্তু যারা অকৃতজ্ঞ এবং আমার আয়াতে অবিশ্বাসী তারা চিরকাল দোযখের আজাব ভোগ করবে।” (সূরা আল-বাকারা- ৩৮-৩৯)

পরবর্তী পর্ব —

মারেফতের মর্মকথা (২) আল্লাহর পথের অন্তরায়



আল্লাহর পথের অন্তরায় 

📚কাশফুল মাহজুব (পর্ব- ২)  ✍🏻দাতা গঞ্জেবকশ হাজবেরী (রহ.)

আল্লাহর পথের অন্তরায়—
আল্লাহর আজ্ঞানুবর্তী হয়ে চলার পথে মানুষের নিকট যেসব অন্তরায় বা বাধা বিপত্তি এসে দাঁড়ায় তাসাউফের ভাষায় তাকে হিজাব বলা হয়। তা দু'প্রকার। যথা:
(১) রাইনী হিজাব; (২) গাইনী হিজাব।

(১) রাইনী হিজাব—
রাইনী হিজাব এক ধরনের সুদৃঢ় অন্তরায়– যা কখনও অপসারণ হয় না। কারণ তা সম্পৃক্ত হয়ে যাওয়ার পর ব্যক্তির অন্তরে সিল পড়ে যায় এবং দাগ লেগে যায়। রাইন (রং লাগা) খাতাম (সিল পড়া) তাবায়া (দাগ লাগা) এই তিনটি শব্দকে একই অর্থে কুরআন মজীদে আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেছেন। যেমন আল্লাহ্ তা'আলা বলেন- "যখন তাদের নিকট আমার আয়াত পাঠ করা হয় তখন তারা বলে থাকে- রাখ এটাতো পৌরাণিক কেচ্ছা কাহিনি। কখনও নয় বরং তাদের অপকর্মসমূহ রঞ্জিত হয়ে তাদের অন্তরে বদ্ধমূল হয়ে গেছে।” (সুরা আন আলফাল : ৩১)

অপর আয়াতে এরশাদ করেন: “যারা (যথার্থতাকে) মান্য করতে অস্বীকার করে তাদের ভয় প্রদর্শন করা হোক কিংবা না হোক তা তাদের জন্য একই সমতুল্য, তারা তাকে বিশ্বাস করবে না। আল্লাহ তাদের অন্তরে সীলমোহর অঙ্কিত করে দিয়েছেন এবং তাদের চোখে পর্দা পড়ে গেছে। তাদের জন্য মর্মান্তিক আজাব রয়েছে।”
(সূরা আল-বাকারা- ৬-৭)

এই সম্পর্কেই অন্য আয়াতে বলেন: "তাদের ওয়াদা ভঙ্গের দরুন এবং এই জন্য যে তারা আল্লাহর আয়াতকে মিথ্যা বলেছে এবং বহু নবিকে অযথা হত্যা করেছে। আরও বলে আমাদের অন্তর গেলাফে সংরক্ষিত (অন্তঃকরণকে সংরক্ষিত বলো না) বরং তাদের অর্থহীন বস্তুকে উপাসনা করার কারণে আল্লাহ তাদের অন্তঃকরণে ছাপ মেরে দিয়েছেন। তাদের মধ্যে খুব কম সংখ্যক লোকই ঈমান গ্রহণ করে।" (সূরা: আন্-নিসা : ১৫৫)

উক্ত আয়াতসমূহে আল্লাহ যাদের কথা উল্লেখ করেছেন তাদের অন্তরেই আল্লাহ তায়ালা রাইনী পর্দা টেনে দিয়েছেন। কিন্তু লোকের কৃতকার্যের কারণেই ঐ জাতীয় পর্দার সৃষ্টি হয়ে থাকে। এমন নয় যে তারা সঠিক পথের অনুসন্ধানী ছিল। অথচ আল্লাহ তাদের উক্ত পথ পাওয়া হতে বঞ্চিত করেছেন। তাই আল্লাহ তায়ালা এই প্রসঙ্গে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন- "যখন তারা নিজেরাই হীনতা অবলম্বন করেছে তখন আল্লাহও তাদের অন্তরকে বক্র করে দিয়েছেন।" (সূরা বনী ইসরাইল)

আল্লাহর নিয়ম নয় যে, অসৎ পথের পথিককে জোর জবরদস্তি করে হেদায়াত করেন। অথচ যারা স্বেচ্ছায় ও সরলান্তঃকরণে হেদায়াতপ্রাপ্ত হতে চায় আল্লাহ অবশ্য তাদের সঠিক পথপ্রাপ্ত করেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন- "সত্যের সন্ধানীকে আল্লাহ সঠিক পথ প্রদর্শন করেন।"
আরও বলেন:– "যারা ফাসেক, যারা আল্লাহর ওয়াদাকে মজবুতভাবে আঁকড়িয়ে ধরার পর বিচ্ছিন্ন করে দেয় আল্লাহ তাদেরই গোমরাহীতে নিমজ্জিত করেন। আল্লাহ যেই সম্পর্ককে সুদৃঢ় করার আদেশ দিয়েছেন তারা তাকে বিচ্ছিন্ন করে এবং পৃথিবীতে বিবাদ বিসম্বাদের সৃষ্টি করে।” (সূরা আল-বাকারা- ২৬-২৭)

এই সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলার নীতি হলো, - "যারা আমার পথে সাধনা করে নিশ্চয় তাদের আমি আমার পথ প্রদর্শন করি।” (সূরা আল-আম্বিয়া- ৩)

বরং এই সম্বন্ধে আল্লাহর মেহেরবানি এবং অনুকম্পা এতই যে যেই ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস রাখে তিনি তাদের অন্তঃকরণকে সঠিক পথ দেখান। এর চেয়ে আর কী অনুগ্রহ হতে পারে যে আল্লাহ তার কিতাবকে সর্বদিক হতে সংরক্ষণ করে মানবজাতির হাতে সমর্পণ করে বলেছেন,- "এটি (কোরআন) আল্লাহর গ্রন্থ তাতে কোন ধরনের সন্দেহ নেই। এটি পরহেযগারদের পথ প্রদর্শন করে।” (সূরা: আল-বাকারা : ২)

নবি করিম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করেছেন: মানুষ যখন কোন অন্যায় করে তখন সেই কৃত কাজের ফলে তার অন্তরে একটি কাল দাগ পড়ে যায়। অতপর সে যদি উক্ত পাপ থেকে তওবাহ করে এবং ভবিষ্যতে কোন পাপ কাজ করা হতে বিরত থাকে তখন অন্তঃকরণ পরিষ্কার হয়ে যায়। নতুবা সেই দাগ বাড়তে বাড়তে সমস্ত অন্তঃকরণকে ঘিরে ধরে এবং কালো করে ফেলে।
সুতরাং এর প্রতিষেধক সত্যিকারের তওবাহ। এই ব্যাপারে পরে বর্ণিত হবে।

(২) গাইনী হিজাব—
অপরদিকে গাইনী হিজাব রাইনী হিজাবের বিপরীত। এটা এক প্রকার সাময়িক হিজাব। মানুষ কিছুটা পরিশ্রম করলে এবং আল্লাহর দিকে ধাবিত হলেই এই বাধা দূর হয়ে যায়। যেমন উপরে বর্ণিত আয়াতে প্রকাশিত হয়েছে। এই জাতীয় অন্তরায় কমবেশি সবার মধ্যেই হয়ে থাকে। তা অপসারণ করার নিয়ম হলো মানুষের সত্যিকারের আল্লাহর প্রতি মনোনিবেশ করা। তার জানামতে যেসব কাজ দ্বারা আল্লাহর নাফরমানী করা হয় তা বর্জন করা। আল্লাহ যা কিছু ফরজ করেছেন এবং যা তার পছন্দনীয় তা দায়িত্বসহকারে পালন করা। নতুবা এটাতো সকলেরই জানা যে যেই ব্যক্তি সত্যের সন্ধানী না হয়, তাকে সন্ধান করার দরকার মনে না করে এবং তা পাওয়ার জন্য শ্রমবিমুখ হয়; সে কীভাবে হেদায়াত প্রাপ্ত হতে পারে? যে ব্যক্তি স্বীয় অসুস্থতা সম্বন্ধে উদাসীন তার পরিণতি সম্বন্ধে অজ্ঞ এবং বাড়ির সম্মুখে হাসপাতাল থাকা সত্ত্বেও চিকিৎসা না করায় তবে তার পরিণতি কী হতে পারে।

তাই আল্লাহ তায়ালা বলেন- "ঐ সকল লোকদের আল্লাহ তায়ালা কীভাবে হেদায়াত দান করবেন যারা ঈমান গ্রহণ করার পর কুফরীতে লিপ্ত হয়। অথচ সে সাক্ষ্য প্রদান করেছে যে রাসূল সত্য। সব কিছুই তার কাছে প্রকাশ লাভ করেছে। এমন অত্যাচারী লোকদের আল্লাহ সঠিক পথ দেখান না।” (সূরা: আলে-ইমরান- ৮৬)

তাই ঈমানের নেয়ামত ও ধর্মের পথপ্রাপ্ত হওয়ার পর উদাসীন থাকা এবং আল্লাহর আজ্ঞানুবর্তীকে গ্রহণ না করা মানুষের পক্ষে খুবই মর্মান্তিক কাজ। মানুষ যদি তার এই অবস্থার পরিবর্তন সাধনে যত্নবান না হয় তাহলে তার জন্য সন্দেহজনক যে তার এই গাইনী হিজাব রাইনী হিজাবে পরিবর্তন হয়ে যেতে পারে।

এই দ্বিবিধ হিজাবের পার্থক্য এরূপ ভাবুন যে একটি প্রকৃতপক্ষেই পাথর যা কখনও আয়না হতে পারে না। দ্বিতীয়টি মূলত আয়না। মরিচা ধরেছে। একটু ঘষা মাজা করলেই ঠিক হয়ে যেতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে যে যেই হৃদয় পাথরের আকৃতি ধারণ করে আল্লাহ তাকে জোরপূর্বক পাথরে পরিণতি করেন না। বরং মানুষ নিজে এমন পথের অনুসারী হয় যেই পথ উক্ত অবস্থায় পরিণত করে। নতুবা যথার্থতা তো এই যে- "সকল শিশুই ইসলামের প্রকৃতির উপর জন্মগ্রহণ করে।” (মুয়াত্তা ইমাম মালেক)

পরবর্তী পর্ব-
এই দুনিয়া পরীক্ষাগার 

মারেফতের মর্মকথা (১) বিসমিল্লাহ এবং নিয়তের পরিশুদ্ধতা



বিসমিল্লাহ এবং নিয়তের পরিশুদ্ধতা 
📚কাশফুল মাহজুব (পর্ব- ১) 
✍🏻দাতা গঞ্জেবকশ হাজবেরী (রহ.)

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
আমাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে আমরা যেন বিসমিল্লাহ বলে আল্লাহর সাহায্য ও সহানুভূতি কামনা করে প্রতিটি কাজ শুরু করি। কেননা কাজের পরিণতি স্বীয় ইচ্ছা এবং চেষ্টার উপর নয় বরং আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছা এবং আল্লাহ প্রদত্ত সামর্থ্য দ্বারা হয়ে থাকে। ফলে আল্লাহ তায়ালা তাঁর প্রিয় রাসূল ও তাঁর অনুসারীদের উদ্দেশ্যে বলেছেন-
“যখন তোমরা কুরআন তেলাওয়াত কর তখন বিতাড়িত শয়তান হতে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা কর”। (সূরা: আন্-নাহল : ৯৮)

আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআন এবং সূরা সমূহ বিসমিল্লাহ দ্বারা শুরু করা শিক্ষা দিয়েছেন। হুজুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) তিনিও তাঁর অনুসারীদের ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ বলে কাজ শুরু করা শিক্ষা দিয়েছেন। বান্দা যখন আল্লাহর নাম, তাঁর সাহায্য এবং নির্দেশ কামনা করে কাজ শুরু করে তখনই সে আল্লাহর সাহায্য, সহানুভূতি এবং সন্তুষ্টি অর্জন করে থাকে।

তাছাড়া নিয়মের বিশুদ্ধতাও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। হুজুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করেছেন- “কাজের পরিণতি নিয়তের উপর নির্ভরশীল”। কাজের মধ্যে নিয়ত এতটা কার্যকরী যে নিয়তের বিভিন্নতার কারণে একই কাজের পরিণতি বিভিন্ন রকম হয়ে দাঁড়ায়। অথচ কাজের আকৃতি একই ধরনের হয়ে থাকে। যেমন কোন মুসাফির মুকীম হওয়ার নিয়ত করা ব্যতীত বহু দিন ধরে একই শহরে অবস্থান করলে সে মুসাফিরই থাকবে। কিন্তু সে যদি থাকার নিয়ত করে কোন শহরে উপস্থিত হয় তবে তার বাহ্য কাজকর্ম একই ধরনের হওয়া সত্ত্বেও সে মুকিম হিসেবে পরিগণিত হবে। তেমনি নিয়ত ছাড়া কোন ব্যক্তি রোযা থেকে সারাদিন পানাহার করা হতে বিরত থাকলেও সে রোযাদারের মধ্যে পরিগণিত হবে না, কোন প্রকার পুণ্যের অংশীদারী হবে না। আর যদি রোযার নিয়তে পানাহার করা হতে বিরত থাকে তবে সে আল্লাহর সান্নিধ্য অর্জন করবে।
কোন ব্যক্তি যদি বিশুদ্ধ নিয়তে কোন কাজ শুরু করে কিন্তু কোন প্রকার ভুল-ভ্রান্তি বা ত্রুটি-বিচ্যুতির জন্য কাজ সম্পাদন করতে না পারে তবে তাকে অপারগ মনে করা হবে এবং সে তার কাজের প্রতিদান পাবে। 
হুজুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করেছেন- জানা মোমেনের নিয়ত তার কাজ সম্পাদন করা অপেক্ষা উত্তম। কাজ সম্পাদন করা ছাড়াও নিয়ত করায় উপকার হতে পারে। কিন্তু নিয়ত ব্যতীত কোন কাজ কোন উপকারেই আসে না। তদুপরি নিয়তের জন্য যতটা বিশুদ্ধতা এবং সরলতা থাকবে উক্ত কাজের প্রতিদানও ততটা বৃদ্ধি পেতে থাকবে।
নিয়ত বিশুদ্ধ হওয়ার অর্থ হচ্ছে আল্লাহর সন্তুষ্টি-বিধান সম্মুখে রেখে কাজ করে যাওয়া। কু-প্রবৃত্তির তাড়না না থাকা। মনে রেখো যে কাজে আল্লাহর সন্তুষ্টি বিধানের উদ্দেশ্য না থাকে এবং কু-প্রবৃত্তির তাড়না থাকে উক্ত কাজে কোন প্রকার বরকত থাকে না এবং মানুষের মন সরল পথ থেকে দূরে সরে যায়। কু-প্রবৃত্তি দোযখের চাবি। কারণ, কু-প্রবৃত্তির অনুসরণ করেই মানুষ দোযখের দিক এগিয়ে যায়। অপরদিকে স্বীয় নফসকে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করার পথে পরিচালনা করা এবং নিজের খেয়াল খুশিমতো না চলা। বেহেশতের চাবি এ কারণে আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেছেন-
“যে ব্যক্তি আল্লাহর নাফরমান, পরকালের চেয়ে পার্থিব জীবনকে অগ্রাধিকার দিবে তার ঠিকানা দোযখ। আর যে স্বীয় প্রভুর কাছে উপস্থিত হতে ভয় পায় এবং (এই ভয়ে) নফসকে তার ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষা হতে বিরত রাখে তার স্থান বেহেশত।” (সূরা: আন্-নাযিয়াত- ৩৭-৪১)
তাই লোকের দেখা কর্তব্য- সে যে কাজ করতে যাচ্ছে তাতে কী সে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের সন্ধান করে. না তাতে কোন প্রকার কু-প্রবৃত্তির তাড়না আছে। যদি দ্বিতীয় প্রকার উদ্দেশ্য থাকে তাহলে সে কাজ করা হতে বিরত থাকবে। অথবা তাতে যতটা কু-প্রবৃত্তির তাড়না থাকে তা হতে স্বীয় ইচ্ছা এবং নিয়তকে পরিশুদ্ধ করে নিবে।

পরবর্তী পর্ব

শনিবার, ২ নভেম্বর, ২০২৪

দাকায়েকুল আখবার- ( ৫২) বৃহৎ নয়না ব্রীড়াময়ী হুরদের বিবরণ



📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ৫২)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

বৃহৎ নয়না ব্রীড়াময়ী হুরদের বিবরণ-
হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে, হযরত নবী করিম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিয়াছেন যে, “আল্লাহ তায়ালা হুরদের মুখমণ্ডল লোহিত বর্ণ, সাদা, সবুজ ও হলুদ রংয়ের সংমিশ্রণে পয়দা করিয়াছেন ৷ আর তাহাদের শরীর মেশক, আম্বর, কাফুর ও জাফরান দ্বারা পয়দা করিয়াছেন। তাহাদের কেশগুচ্ছ লবঙ্গ দ্বারা সৃষ্টি করিয়াছেন। আর আল্লাহ তায়ালা হুরদের পদযুগল হইতে হাঁটু পর্যন্ত অত্যন্ত সুগন্ধযুক্ত জাফরান দ্বারা তৈরী করিয়াছেন। হাঁটু হইতে বক্ষস্থল পর্যন্ত মেশ্ক দ্বারা এবং বক্ষস্থল হইতে ঘাড় পর্যন্ত সুগন্ধি আম্বর দ্বারা আর ঘাড় হইতে উপরের অংশটুকু খালেছ কাফুর দ্বারা সৃষ্টি করিয়াছেন। যদি তাহাদের কেহ শুধুমাত্র একবার পৃথিবীর বুকে থুথু নিক্ষেপ করিত, তাহা হইলে সমস্ত জগৎ মেশকের সুগন্ধে বিমোহিত হইয়া পড়িত। ব্রীড়াময়ী হুরদের বক্ষস্থলে তাহাদের স্বামীর নাম ও আল্লাহ তায়ালার একটি সিফতি নাম লিখিত থাকিবে। তাহাদের সুবিন্যস্ত বক্ষস্থল দৈর্ঘ ও প্রস্থে এক ক্রোশ পর্যন্ত হইবে। তাহাদের উভয় হস্তে দশটি করিয়া চুড়ি বা কঙ্কন থাকিবে এবং অঙ্গুলিগুলিতে এক একটি অঙ্গুরি থাকিবে । আর তাহাদের পদযুগলে থাকিবে দশটি করিয়া ‘খালখাল' বা খাড়ু ।'

হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, হযরত নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করিয়াছেন, “বেহেশতের মধ্যে 'লোবা' নামক একজন হুর রহিয়াছে। দয়াময় আল্লহ্ তায়ালা তাহাকে মেশক, আম্বর, জাফরান ও কাফুর এই চারি প্রকার সুগন্ধি বস্তু দ্বারা পয়দা করিয়াছেন। তিনি এই সকল বস্তুকে আবেহায়াতের পানি দ্বারা গুলিয়াছেন। বেহেশতের সমস্ত হুরগণ তাহার প্রেমে মাতোয়ারা। সে যদি একবারও মহাসাগরে স্বীয় থুথু নিক্ষেপ করিত, তাহা হইলে সেই সাগরের লবণাক্ত পানি সুমিষ্ট হইয়া যাইত। আর তাহার বক্ষস্থলে এই কথাগুলি লিখিত থাকিবে, “কেহ যদি আমার মত পরমাসুন্দরী হুর লাভ করিতে আশা পোষণ করে তবে সে যেন আমার সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ পাকের এবাদত-বন্দেগীতে আত্মনিয়োগ করে।”

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, হযরত রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিয়াছেন যে, ‘আল্লাহ তায়ালা ‘জান্নাতুল আদন' পয়দা করিবার পর, হযরত জিব্রাইল (আঃ)কে ডাকিয়া নির্দেশ প্রদান করিলেন যে, তিনি যেন সেই সকল বস্তু পর্যবেক্ষণ করিয়া আসেন, যাহা তিনি উহাতে তাঁহার প্রিয় বান্দা ও আউলিয়ায় কেরামদের জন্য পয়দা করিয়াছেন। নির্দেশ মোতাবেক হযরত জিব্রাইল (আঃ) যখন 'জান্নাতুল আদনে' ঘুরিয়া ফিরিয়া দেখিতেছিলেন, তখন একজন হুর একটি সুন্দর মহল হইতে তাহাকে দেখিয়া হাসিয়া ফেলিলেন। তাহার সুবর্ণ দন্তরাজির উজ্জ্বল আলোকে “জান্নাতুল আদন' ঝলমল করিয়া ফুটিয়া উঠিল। এই উজ্জ্বল আলোক দর্শন করিয়া হযরত জিব্রাইল (আঃ) কে মাথা উত্তোলন করিতে অনুরোধ করিলেন। হযরত জিব্রাইল (আঃ) মস্তক উত্তোলন করিয়া হুরকে দেখিয়া বলিলেন, 'আপনার সৃষ্টিকর্তা প্রশংসনীয়।' হুর আরজ করিলেন, “হে আমিনুল্লাহ! আমিনুল্লাহ !! আমি কাহার জন্য সৃষ্টি হইয়াছি, তাহা আপনি অবগত আছেন?” হযরত জিব্রাইল (আঃ) উত্তর করিলেন, “না আমি তাহা অবগত নহি।” উক্ত হুর বলিলেন, “আল্লাহ পাক আমাকে ঐ পুণ্যবান বান্দার ভোগের জন্য পয়দা করিয়াছেন, যিনি নিজের কামনা-বাসনাকে আল্লাহ পাকের রেজামন্দির জন্য বিসর্জন দিয়া থাকেন।” অপর এক হাদীসে হযরত নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ ফরমাইয়াছেন, “পবিত্র মেরাজের রাত্রিতে আমি বেহেশতে একদল ফেরেশতাকে দেখিতে পাইলাম যে, তাহারা স্বর্ণ, রৌপ্য দ্বারা সুন্দর 'বালাখানা' তৈরী করিতেছে। অকস্মাৎ তাহারা নির্মাণ কার্য বন্ধ করিয়া দিলে আমি তাহাদিগকে জিজ্ঞাসা করিলাম, হে ফেরেশেতাগণ! সহসা নির্মাণ কার্য হইতে বিরত হইলে কেন? প্রত্যুত্তরে তাহারা বলিল, “আমাদের পুঁজি শেষ হইয়া গিয়াছে”, আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, 'কি তোমাদের পুঁজি?' তাহারা উত্তরে বলিল, “এই সুন্দর বালাখানার মালিক যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ পাকের এবাদতে মগ্ন থাকেন, ততক্ষণ আমরাও নির্মাণ কাজ চালাইয়া যাই। আর তিনি আল্লাহ তায়ালার এবাদত জিকির হইতে বিরত হইলে আমরাও নির্মাণ কাজ বন্ধ করিয়া দেই।” হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে “আল্লাহ পাকের অলী বান্দাগণ বেহেশতে ইচ্ছানুরূপ ফল ভক্ষণ করিবার পর আরও খাদ্য গ্রহণের আশা পোষণ করিবেন। তখন আল্লাহ তায়ালা আরও অধিক খাদ্য আনয়ন করিতে নির্দেশ দিবেন। আর তৎক্ষণাত সত্তর হাজার খেদমতগার তাহাদের সম্মুখে আসিয়া উপস্থিত হইবে। তাহাদের প্রত্যেকের হাতে মোতি ও ইয়াকুতের সত্তর হাজার সুবর্ণ খাদ্যভান্ডার থাকিবে এবং প্রত্যেক খাদ্যভান্ডারে এক হাজার স্বর্ণের পেয়ালা থাকিবে। যেমন আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করিয়াছেন “আর তাহাদের আশে-পাশে স্বর্ণের খাদ্যভান্ডার ও পানপাত্র লইয়া খাদেমগণ বিচরণ করিবে। সেইগুলি প্রাণের কাম্য দ্রব্যসামগ্রীতে ভরপুর থাকিবে এবং চক্ষু জুড়াইয়া যাইবে এবং তোমরা উহাতে চিরকাল অবস্থান করিবে।” আর প্রত্যেক খাদ্যভান্ডারে সত্তর হাজার প্রকারের খাদ্যদ্রব্য থাকিবে। সেই সকল খাদ্যবস্তু আগুন দ্বারা পাক করা হইবে না, কিংবা কেহ পাক করে নাই বা কোন পাত্রে করাও হয় নাই বরং আল্লাহ পাকের নির্দেশেই সেইগুলি সৃষ্টি হইয়াছে। আল্লাহ পাকের অলী বান্দাগণও তাহাদের সহধর্মিনীগণ একত্রে পরমানন্দে পরিতৃপ্তির সহিত সেই সকল খাদ্যভান্ডার হইতে আহার গ্রহণ করিবেন। ভক্ষণ করিতে করিতে যখন তাহারা পরিতৃপ্তি লাভ করিবে, তখন একটি বেহেশতী পাখী উড়িয়া আসিবে। উহার হাড়গুলি উটের হাড়ের মত হইবে। ইহা স্বীয় পাখার উপর ভর করিয়া আল্লাহ তায়ালার অলী বান্দাগণের মাথার উপর বসিয়া বলিবে, “হে আল্লাহ পাকের অলী বান্দা! আপনি কি আমার টাটকা মাংস ভক্ষণ করিতে আগ্রহী? আমি নহরে ছাল্‌ছাবিল ও নহরে কাফুরের পানি পান করিয়াছি এবং বেবেতের বাগানে পরিভ্রমণ করিয়াছি। আর উহার অমৃত সুধা পান করিয়াছি।” আল্লাহ তায়ালার অলী বান্দাগণ উহা ভক্ষণ করিতে ইচ্ছা প্রকাশ করিবামাত্র আল্লাহ পাকের নির্দেশে উহা অলী বান্দার কামনা অনুসারে ভুনা হইয়া খাদ্যের বর্তনে আসিয়া পড়িবে। অলী আল্লাহগণ স্বীয় ইচ্ছানুরূপ ইহার সুস্বাদু মাংস ভক্ষণ করিবেন। কিছুক্ষণ পর সেই পাখী আল্লাহ পাকের অনুগ্রহে উড়িয়া চলিয়া যাইবে। শত খাইলেও বেহেশতের খাদ্যদ্রব্য শেষ হইবে না এবং এমন কি কমিবেও না। যেমন পবিত্র কুরআন শরীফ লোকে পাঠ করে, অন্যকে শিক্ষা দেয়, কিন্তু কোন অবস্থাতেই উহার পরিবর্তন কিংবা হ্রাস হয় না, তেমনি বেহেশতের খাদ্যদ্রব্য যত ভক্ষণই করা হউক না কেন, তাহা হ্রাস পাইবে না বা কমিবেও না।”

হাদীস শরীফে আছে, জনাব নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করিয়াছেন, “বেহেশতী বান্দাগণ পরমানন্দে পানাহার করিবে এবং বিবিধ প্রকারে উহার ফল ভক্ষণ ও আস্বাদন করিবে; কিন্তু সেই সকল খাদ্য উদরে পৌঁছিয়া হাওয়া হইয়া বাহির হইয়া যাইবে। সেই বাতাসে থাকিবে মেক ও কাফুরের সুগন্ধ। যেমন মাতৃগর্ভে শিশু প্রস্রাব পায়খানা করে না, এমনিই বাঁচিয়া থাকে।”

হে পরম করুণাময় ও অনন্ত ও দয়াময় আল্লাহ! আপনি আমাদিগকে জনাব হুযুর করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর এবং তাঁহার পরিবার-পরিজনদের উছিলায় মাফ করুন। হে সর্বশক্তিমান আল্লাহ! একমাত্র আপনি সমস্ত প্রশংসার উপযুক্ত । আমীন! আমীন!! আমীন!!!

প্রথম পর্ব

দাকায়েকুল (৫১) বেহেশতবাসীগণের সুখের বিবরণ



📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ৫১)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

বেহেশতবাসীগণের সুখের বিবরণ-
হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, জনাব নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করিয়াছেন, পুলছিরাতের পিছনে একটি বিস্তীর্ণ মাঠ রহিয়াছে। উহাতে অনেক সুন্দর ও মনোরম গাছ আছে এবং প্রত্যেক গাছের নীচে উত্তরে দক্ষিণে প্রলম্বিত দুইটি নহর রহিয়াছে। আর সেই নহরগুলি বেহেশত হইতে উৎপন্ন হইতেছে। নেককার বান্দ| কবর হইতে উঠিয়া হিসাব-নিকাশের জন্য দীর্ঘকাল দণ্ডায়মান থাকিয়া এবং প্রখর সূর্যের উত্তাপে দগ্ধীভূত হইয়া অতিশয় ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত ও পিপাসার্ত অবস্থায় পুলছিরাত অতিক্রম করিয়া যখন একটি নহর হইতে পানি পান করিবে, তখনই তাহাদের যাবতীয় দুঃখ-কষ্ট, ক্লান্তি ও অবসাদ বিদূরিত হইয়া যাইবে। এমন কি সেই পানি বক্ষস্থলে পৌঁছিবামাত্র সমস্ত হিংসা, বিদ্বেষ, কিনা ও খেয়ানতের আপবিত্রতা দূরীভূত হইয়া যাইবে। আর সেই পানি উদরে প্রবেশ করিবার সঙ্গে সঙ্গে উদরস্থ সমুদয় প্রস্রাব পায়খানা এবং রক্ত জাতীয় নাপাকী হইতে দেহ পবিত্র হইয়া যাইবে। তারপর অন্য নহরের পানি দ্বারা তাহার। নিজেদের মস্তক ও শরীর ধৌত করিবে। আর সঙ্গে সঙ্গে তাহাদের মুখমণ্ডল পূর্ণ চন্দ্রের ন্যায় উজ্জ্বল ও রেশমী বস্ত্রের ন্যায় কোমল ও নরম হইয়া যাইবে। আর সেই দেহ হইতে সুগন্ধি নির্গত হইতে থাকিবে। তারপর তাহারা নিজ নিজ বেহেশতের দ্বারদেশে গিয়া উপনীত হইবে। সেইখানে পৌছিয়া তাহারা দরজার লাল বর্ণের ইয়াকুত-মুক্তার শিকলে করাঘাত করিবার সঙ্গে সঙ্গে উহা উন্মুক্ত হইয়া যাইবে। তাহাদের করাঘাতের মৃদু শব্দ শ্রবণ করিয়া হুরগণ অনুভব করিতে পারিবে যে, তাহাদের প্রতিক্ষিত স্বামীগণের আগমন ঘটিয়াছে। অতএব তখনই তাহারা স্বীয় স্বামীর শুভাগমনে আনন্দিত হইয়া বিদ্যুৎবেগে ছুটিয়া গিয়া নিজ নিজ স্বামীকে আলিঙ্গন করিবে এবং তাহাকে ভিতরে লইয়া আসিবে। আর বলিতে থাকিবে, “ওগো প্রিয়তম! তুমিই আমার পরম সুহৃদ বন্ধু, আমি তোমাতেই সন্তুষ্ট ও পরিতুষ্ট থাকিব। আর আমি কখনও তোমার প্রতি বিরাগ ও অসন্তুষ্ট হইব না।” তাহারা এইরূপভাবে তাঁহাকে সাদর সম্ভাষণ জ্ঞাপন করিবে। তাহাদের জন্য বেহেশতের মধ্যে সত্তরটি পালঙ্ক থাকিবে এবং প্রত্যেক পালঙ্কে সত্তরটি বিছানা ও প্রত্যেক বিছানায় সত্তরজন করিয়া বিবি থাকিবে এবং তাহাদের প্রত্যেকের শরীরে সত্তরটি অলঙ্কার থাকিবে আর সেইগুলির ভিতর দিয়া তাহাদের নলার হাড়ের ভিতরের মগজ পর্যন্ত পরিদৃষ্ট হইবে।

হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, “যদি বেহেশতি হুরগণের একটি কেশও পৃথিবীতে পতিত হইত, তাহা হইলে উহার আলোকে সমুদয় পৃথিবীবাসী আলোকিত হইয়া যাইত।”

হযরত নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আরও ফরমাইয়াছেন যে, “বেহেশত রাজ্য অত্যন্ত চমকদার শুভ্র আলোতে ঝলমল করিবে। সেখানে বেহেশতীগণ কখনও নিদ্রাচ্ছন্ন হইবে না, কারণ নিদ্রা মৃত্যুর ভাই। স্মরণ রাখা দরকার যে, বেহেশত রাজ্যে দিবা-রাত, চন্দ্র-সূর্য কিংবা নিদ্ৰা-তন্দ্ৰা কিছুই থাকিবে না, তবে সর্বদাই উহা স্বর্গীয় আভায় ঝলমল করিতে থাকিবে। বেহেশত রাজ্য মোট সাতটি প্রাচীর দ্বারা পরিবেষ্টিত হইবে । তন্মধ্যে প্রথম প্রাচীরটি রৌপ্য নির্মিত, দ্বিতীয়টি স্বর্ণ নির্মিত, তৃতীয়টি ইয়াকুত নির্মিত, চতুর্থ ও পঞ্চমটি মাওয়ারিদ পাথর নির্মিত, ষষ্ঠটি জবরজদ নির্মিত আর সপ্তমটি চমকদার নূরের দ্বারা তৈরী। প্রতি দুইটি প্রাচীরের মধ্যবর্তী দূরত্ব হইবে পাঁচশত বৎসরের রাস্তা। বেহেশতী বান্দাদের মুখে দাড়ী ও শরীরে পশম গজাইবে না, কিন্তু পুরুষদের মুখে সবুজ রংয়ের গোঁফ থাকিবে। ফলে তাহাদের সৌন্দর্য অধিক পরিমাণে বৃদ্ধি পাইবে। তাহাদের নয়নে সুরমা লাগানো থাকিবে। বেহেশতবাসীগণ সকলে তেত্রিশ বৎসরের হৃষ্টপুষ্ট যুবক হইবে। নর এবং নারীর মধ্যে পার্থক্যের নিমিত্ত পুরুষদের মুখে সবুজ গোঁফ থাকিবে।

হযরত নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আরও ফরমাইয়াছেন যে, বেহেশতবাসী প্রত্যেকের শরীর সত্তরটি অলঙ্কারে পরিশোভিত হইবে। প্রত্যেকে প্রতি ঘন্টায় সত্তর প্রকার রং ধারণ করিবে। বেহেশতবাসী পুরুষ তাহার মুখচ্ছবি হুরদের মুখমণ্ডলে, বক্ষে ও উরুদ্বয়ে (আয়নার মত) দেখিতে পাইবে। পক্ষান্তরে হুরগণও তাহাদের মুখমন্ডল তাহাদের স্বামীর মুখমণ্ডলে, বক্ষদেশে ও উরুদ্বয়ে অবলোকন করিবে। তাহারা কফ, থুথু নিক্ষেপ করিবে না বা নাক ঝাড়িবে না। তাহাদের বগলের নীচে ও নাভীর নীচে অবৈধ লোম গজাইবে না; কিন্তু তাহাদের চক্ষুতে ঘন ভ্রূ ও মাথায় সুদীর্ঘ কেশগুচ্ছ শোভা পাইবে। তাহাদের সৌন্দর্য ও লাবণ্য দিন দিনই পরিবর্ধিত হইবে । যেমন পৃথিবীতে ক্রমাগত বার্ধক্য বৃদ্ধি পাইতে থাকে। প্রত্যেক পুরুষ পানাহার ও সঙ্গম ক্রিয়ায় একশত পুরুষের সমতুল্য সামর্থবান হইবে। পৃথিবীতে স্বামী-স্ত্রী যেমন সঙ্গম করিয়া থাকে, তেমনি বেহেশতবাসীরাও হোকবার পর হোবা (আশি বৎসরে এক হোবা) সঙ্গম উপভোগ করিবে। বেহেশতের বিছানাপত্রে কোন পিপীলিকা বা কোন ছারপোকার উপদ্রব ঘটিবে না। বেহেশতী হুরদের সহিত যতই সঙ্গম করা হইবে তাহাদিগকে ততই নবতর কুমারী বলিয়া অনুমিত হইবে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলিয়াছেন, “হুরদের সমতুল্য সুন্দরী লাবণ্যময়ীর সংবাদ কখনও কেহ শ্রবণ করে নাই । এইজন্য উহাদের পূর্ণ বিবরণ প্রদান করা সম্ভব নহে।”

হযরত আলী (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, হযরত নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করিয়াছেন, “বেহেশতের মধ্যে এমন একটি বিশিষ্ট বৃক্ষ রহিয়াছে, যাহার উপর হইতে হোল্লা নামক স্বর্গীয় পোশাক নির্গত হইবে এবং নীচের দিক হইতে পঙ্খীরাজ ঘোটকীর আবির্ভাব ঘটিবে। উহার জিনপোশে মণিমুক্তা ও ইয়াকুত খচিত থাকিবে; কিন্তু উহারা কোন প্রকার পায়খানা-প্রস্রাব করিবে না। আল্লাহ পাকের অলী বান্দাগণ উহাদের উপর সওয়ার হইয়া বেহেশত রাজ্যে বিচরণ করিবেন। তাহাদের এই মর্তবা দর্শন করিয়া নিম্নবর্তী বান্দাগণ আল্লাহ পাকের নিকট ফরিয়াদ করিয়া বলিবেন, “হে আল্লাহ! তাহারা কি কার্যের বিনিময়ে এইরূপ মর্যাদা ও সম্মানের অধিকারী হইয়াছে?” প্রত্যুত্তরে আল্লাহ তায়ালা বলিবেন, “যখন তোমরা সুখ নিদ্রার কোলে বিভোর ছিলে, তখন তাহারা নামাযে আত্মনিয়োগ করিয়াছিল। তোমরা যখন মনের আনন্দে খানাপিনা করিতে, তখন তাহারা পবিত্র রোযা পালনে নিরত ছিল। আর যখন তোমরা ধনরত্ন সঞ্চয় করিতে এবং উহা ব্যয় করিতে কৃপণতা প্রকাশ করিতে, তাহারা তখন মুক্ত হস্তে দান করিত। আর তোমরা যখন ভীরু ও কাপুরুষের মত কালযাপন করিতে তাহারা তখন ধর্মযুদ্ধে ঝাপাইয়া পড়িত।”

হযরত আবু হোরায়রা (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, বেহেশতের মধ্যে এমন একটি প্রকাণ্ড বৃক্ষ রহিয়াছে যাহার সুশীতল ছায়া একশত ঘোড়া দৌড়াইয়াও শেষ করা যাইবে না। এই প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়াল৷ এরশাদ করিয়াছেন, “এবং বেহেশতে সুবিস্তৃত ছায়াবান বৃক্ষ রহিয়াছে।” পৃথিবীর বুকে সূর্যোদয়ের পূর্বে ও সূর্যাস্তের পরক্ষণে সেইরূপ ছায়া পরিদৃষ্ট হইয়া থাকে। যেমন আল্লাহ পাক ঘোষণা করিয়াছেন, “হে হাবীব (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ! আপনি কি ভাবিয়া দেখেন নাই যে, আপনার প্রতিপালক (সূর্যোদয়ের পূর্বে ও সূর্যাস্তের পর) কিরূপ ছায়া বিস্তার করিয়াছেন?” হযরত নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করিয়াছেন, “আমি কি তোমাদিগকে এমন একটি সময়ের কথা বলিব না, যাহা সুখময় বেহেশতের অনুরূপ হইবে? সূর্যোদয়ের পূর্বক্ষণ ও সূর্যাস্তের পরক্ষণই বেহেশতী সময়ের সদৃশ; কিন্তু এই ছায়ার মত বেহেশতী ছায়া ক্ষণস্থায়ী ও ভঙ্গুর নহে। উহা যেমনই চিরস্থায়ী তেমনই আরামদায়ক।”

হাদীস শরীফে আরও বর্ণিত আছে যে, বেহেশতের মধ্যে এমন একটি বৃক্ষ আছে। যাহার ফলগুলি মাখন হইতে কোমল, মধু হইতে সুমিষ্ট এবং মেশ্ক হইতে সুগন্ধযুক্ত হইবে; কিন্তু নামাযী ব্যক্তি ভিন্ন অন্য কাহারও ভাগ্যে উহা আস্বাদন সম্ভব হইবে না।

পরবর্তী পর্ব-

দাকায়েকুল আখবার- (৫০) বেহেশতের দরওয়াজার বিবরণ



📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ৫০)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

বেহেশতের দরওয়াজার বিবরণ
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, বেহেশতে সর্বমোট আটটি দরওয়াজা রহিয়াছে। সেইগুলি মূল্যবান জাওহার খচিত স্বর্ণ দ্বারা নির্মিত। প্রথম দরওয়াজার উপর লিখিত থাকিবে, “আল্লাহ ছাড়া আর কোন মাবুদ নাই: হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল।” সেই দরওয়াজার মধ্য দিয়া নবী, রাসূল, আলেম, শহীদ ও দানশীল ব্যক্তিগণ প্রবেশ করিবেন। 
দ্বিতীয় দরওয়াজা দিয়া উত্তমরূপে নামায আদায়কারী, অজু সম্পাদনকারী ও উহাদের তরতীর রক্ষাকারীগণ প্রবেশ করিবেন। 
তৃতীয় দরওয়াজা পথে খালেস অন্তকরণে ও সন্তুষ্ট হৃদয়ে যাকাত আদায়কারীগণ প্রবেশ করিবেন। 
চতুর্থ দরওয়াজা পথে পুণ্যকর্মের আদেশকারী ও মন্দকার্যে নিষেদ্ধকারীগণ প্রবেশ করিবেন। 
পঞ্চম দরওয়াজা পথে কুপ্রবৃত্তি ও কামনার বস্তু হইতে নিজ প্রবৃত্তিকে সংযত রক্ষাকারীগণ দাখেল হইবেন। 
ষষ্ঠ দরওয়াজা পথে পবিত্র হজ্জ ও ওমরাহ আদায়কারীগণ দাখেল হইবেন। 
সপ্তম দরওয়াজা পথে ধর্মযোদ্ধা বীর পুরুষগণ দাখেল হইবেন। আর 
অষ্টম দরওয়াজা পথে একত্ববাদিগণ এবং যাহারা স্বীয় দৃষ্টিশক্তিকে হারাম দৃষ্টি হইতে বিরত রাখিয়াছেন আর মাতা-পিতা ও আত্মীয়-স্বজনদের সহিত সদ্ব্যবহার ও অন্যান্য সৎকার্য সম্পাদনকারীগণ প্রবেশ করিবেন। 

পত্যেক দরওয়াজা বা বেহেশতের পৃথক নাম রহিয়াছে। 
প্রথম দরওয়াজা শুভ্র-মুক্তা দ্বারা নির্মিত এবং উহার নাম 'দারুল জেনান।' 
দ্বিতীয় বেহেশত লোহিত ইয়াকুত দ্বারা নির্মিত এবং উহার নাম 'দারুছ ছালাম।' 
তৃতীয় বেহেশত সবুজ জবরজদ দ্বারা নির্মিত এবং উহার নাম 'জান্নাতুল মাওয়া।' 
চতুর্থ বেহেশত হলুদ মারজান দ্বারা নির্মিত উহার নাম 'জান্নাতুল খোল্‌দ। 
পঞ্চম বেহেশত অত্যন্ত শুভ্র রৌপ্য দ্বারা নির্মিত এবং উহার নাম 'জান্নাতুল ফেরদাউস।' 
সপ্তম বেহেশত শুভ্র মোতির দ্বারা নির্মিত এবং উহার নাম 'জান্নাতুল আদন।' আর 
অষ্টম বেহেশতের নাম, 'জান্নতুল ফেদ্দা' এবং উহাই সর্বোৎকৃষ্ট বেহেশত। উহার দরওয়াজাদ্বয় স্বর্ণ দ্বারা নির্মিত এবং উহাদের পরস্পরের দূরত্ব আকাশ পাতাল সমতুল্য হইবে। উহার একটি ইট স্বর্ণের, একটি রৌপের আর উহার গাঁথুনী মেশকের হইবে। আর উহার মাটি মেশক জাফরানে মিশ্রিত হইবে এবং বালাখানাগুলি লুলু নামক মুক্তার দ্বারা নির্মিত হইবে। বালাখানার জানালা দরওয়াজাগুলি জওহার দ্বারা নির্মিত হইবে। আর উহাতে আবে রহমতের একটি ঝর্ণা থাকিবে এবং প্রত্যেক বেহেশতে উহার শাখা-প্রশাখা বিস্তৃত থাকিবে। উহার পাথর ও কঙ্করগুলি হইবে মোতির। 
আবে রহমতের পানি বরফ হইতে শীতল, মধু হইতে সুমিষ্ট ও দুধের চেয়ে অধিক সাদা হইবে। আর উহাতেই থাকিবে হযরত মুহাম্মদ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর ‘হাউজে কাউসার।'

সেই বেহেশতের বৃক্ষরাজি মুক্তা ও ইয়াকুত দ্বারা নির্মিত হইবে। এই বেহেশতে আরও চারিটি নহর থাকিবে, যথা-নহরে কাকুর, নহরে তাছলিম, নহরে ছালছাবিল ও নহরে মাখতুম অর্থাৎ মহরকৃত নহর। তাহাছাড়া এই বেহেশতে আরও নহর থাকিবে। হাদীস শরীফে আছে, হযরত নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করিয়াছেন, “আমাকে মেরাজের রাত্রে যখন আকাশমণ্ডল ও ভূ-মণ্ডল পরিভ্রমণ করান হইল, তখন আমি বেহেশতের মধ্যে পানি, মধু, শরাব ও দুগ্ধের চারিটি নহর অবলোকন করিলাম। যেমন আল্লাহ পাক পবিত্র কুরআনে এরশাদ করিয়াছেন, “বেহেশতে গন্ধবিহীন একটি পানির নহর, অপরিবর্তীত স্বাদবিশিষ্ট একটি দুধের নহর, পানকারীদের জন্য সুস্বাদু একটি শরাবের নহর ও একটি বিশুদ্ধ মধুর নহর রহিয়াছে।”

হুযুর করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিয়াছেন, “আমি উহাদের উৎপত্তি স্থান ও পতিত স্থান সম্বন্ধে হযরত জিব্রাইল (আঃ)-কে জিজ্ঞাসা করিলাম। প্রত্যুত্তরে তিনি বলিলেন, “এই নহরগুলি হাউজে কাউসারে পতিত হইয়াছে, কিন্তু উহাদের উৎপত্তি স্থান সম্বন্ধে আমি অবগত নহি; বরং আপনি আল্লাহ তায়ালার নিকট উহা সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করুন। তবেই আল্লাহ পাক আপনাকে উহা বলিয়া দিবেন বা দেখাইয়া দিবেন।" সুতরাং আমি আল্লাহ তায়ালার নিকট প্রার্থনা করিলাম। তখনই আল্লাহ তায়ালা আমার নিকট একজন ফেরেশতা প্রেরণ করিলেন। উক্ত ফেরেশতা আমাকে চক্ষু বন্ধ করিতে বলিলেন, আমি তাহাই করিলাম। আর কিছুক্ষণ পর চক্ষু খুলিয়া দেখিলাম আমি একটা প্রকাণ্ড বৃক্ষের নীচে একটি সুবৃহৎ শুভ্র মোতির গম্বুজের পার্শ্বে দাঁড়াইয়া রহিয়াছি। সেই গম্বুজের সবুজ ইয়াকুত নির্মিত দরওয়াজাগুলির মধ্যে লোহিত বর্ণের স্বর্ণের তালা ঝুলিতেছে। সেই গম্বুজটি আমার এত প্রকাণ্ড মনে হইল যে, যদি পৃথিবীর সমস্ত মানব-দানব উহাতে রাখা হইত, তবে মনে হইত যেন একটি ক্ষুদ্র পাখী পাহাড়ের শীর্ষদেশে বসিয়া রহিয়াছে। আর গম্বুজের উপর একটি বৃহৎ পেয়ালা দেখিতে পাইলাম। আর দেখিলাম যে, সেই চারিটি নহর উক্ত পেয়ালার নিম্নদেশ হইতে প্রবাহিত হইতেছে। অতঃপর আমি ফিরিয়া যাইতে ইচ্ছা প্রকাশ করিলাম। তখন সেই ফেরেশতা আমাকে গম্বুজের ভিতর প্রবেশ করিতে বলিলেন। আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, “আমি উহাতে কিরূপে প্রবেশ করিব? উহা যে বন্ধ দেখা যাইতেছে? তিনি বলিলেন, “তালাটি খুলিয়া ফেলুন?” আমি বলিলাম, “কিরূপে উহা খুলিব? আমার কাছে ত উহার চাবি নাই?” ফেরেশতা বলিলেন, “কেন উহার চাবি ত আপনার হাতেই রহিয়াছে। আমি বলিলাম, “কই উহার চাবি?” তিনি উত্তর করিলেন, উহার চাবি

“বিছমিল্লাহির রাহমানির রাহীম”, অর্থাৎ অনন্ত দয়াময় ও পরম করুণাময় আল্লাহ তায়ালার নামে আরম্ভ করিতেছি, সুতরাং আমি ঐ তালার নিকট গিয়া “বিসমিল্লাহ" শরীফ পাঠ করিতেই উহা খুলিয়া গেল। আর আমি উহাতে প্রবেশ করিয়া প্রত্যক্ষ করিলাম যে উহার চারিটি কোণ হইতে চারিটি নহর প্রবাহিত হইতেছে। তারপর আমি উহা হইতে বাহির হইতে চাহিলাম, তখন উক্ত ফেরেশতা বলিলেন, “আপনি উহার উৎপত্তিস্থল কি দেখিয়াছেন?” আমি উত্তর করিলাম, হ্যাঁ, দেখিয়াছি।” তিনি পুনরায় আমাকে লক্ষ্য করিতে বলিলেন। এইবার আমি লক্ষ্য করিয়া দেখিলাম গম্বুজের চারি কোণেই “বিসমিল্লাহ শরীফ” লেখা রহিয়াছে। আমি আরও লক্ষ্য করিয়া দেখিলাম যে বিস্মির মিম অক্ষর হইতে পানির নহর প্রবাহিত হইতেছে। আর আল্লাহ শব্দের 'হা' অক্ষর হইতে দুধের নহর প্রবাহিত হইতেছে। ‘রাহমানির' শব্দের মিম অক্ষর হইতে শরাবের নহর প্রবাহিত হইতেছে। 'রাহীম' শব্দের মিম অক্ষর হইতে মধুর নহর প্রবাহিত হইতেছে। তখন আমি উপলব্ধি করিলাম যে, ‘বিসমিল্লাহ্ শরীফ' হইতেই চারিটি নহর প্রবাহিত হইতেছে। এমন সময় অলক্ষ্যে থাকিয়া যেন আল্লাহ পাকের এই ঘোষণা দান করিল, “হে হাবীব ! আপনার যে সকল উম্মত সর্বান্তকরণে এই নামে আমাকে ডাকিবে, তবে আমি নিশ্চয়ই তাহাদিগকে এই সকল নহর হইতে পান করাইব।” 

তাহাদিগকে সোমবারে দুধ ও মঙ্গলবারে শরাব পান করাইব। শরাব পান করিয়া তাহারা বেহুঁশ হইয়া উড়িতে থাকিবে। পরিশেষে এক হাজার বৎসর পর্যন্ত উড়িয়া তীব্র গন্ধবিশিষ্ট একটি প্রকাণ্ড পাহাড়ের চূড়ায় গিয়া উপবেশন করিবে। আর সেই পাহাড়ের নিম্নদেশ হইতে নহরে ছাল্‌ছাবিল প্রবাহিত হইতে থাকিবে, সেই নহর হইতে বুধবার দিন পানি পান করিয়া পুনরায় তাহারা উড়িতে আরম্ভ করিবে এবং এক হাজার বৎসর পর্যন্ত উড়িয়া অবশেষে এক বালাখানায় গিয়া উপস্থিত হইবে। সেই বালাখানা অগণিত সুউচ্চ খাট, পালঙ্ক, পানপাত্র, সারিবদ্ধ তাকিয়া, বিছানা, গালিচা ইত্যাদিতে পরিপূর্ণ থাকিবে। আর তাহারা প্রত্যেকে এক একটি খাটের উপর বসিয়া পড়িবে। তখন উপর হইতে তাহাদের উপর জান-জাবিল পানীয় বর্ষিত হইবে। সেই পানি তাহারা বৃহস্পতিবার পান করিবে। তারপর আল্লাহ্তায়ালা আম্বরের শুভ্র মেঘ হইতে এক হাজার বৎসর পর্যন্ত হোল্লা এবং এক হাজার বৎসর পর্যন্ত জাওহার বর্ষিত করিবেন! এক একজন হুর এক একটি জাওহার ধারণ করিয়া পরমানন্দে হাজার বৎসর পর্যন্ত উড়িতে থাকিবে। তারপর তাহারা শুক্রবার দিন মহা প্রতিপান্বিত আল্লাহ পাকের সন্নিকটে ‘মাকয়াদে সিদ্ধ’ বা সত্য মজলিসে আসন গ্রহণ করিবে। সেখানে তাহারা 'খোলদ' নামক দস্তর খানে আহারে বসিবে। তথায় তাহাদিগকে এমন মধু খাইতে দেওয়া হইবে, যাহার পাত্রের মুখ মেশক দ্বারা মোহর করা থাকিবে। আর বলা হইবে, “ইহারাই পুণ্যকার্য সম্পাদন করিয়াছিল এবং পাপকার্য হইতে রিবত থাকিয়াছিল।”

হযরত কা'ব (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, তিনি একদা হুযুর করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-কে বেহেশতের বৃক্ষ সম্বন্ধে প্রশ্ন করিয়াছিলেন। প্রত্যুত্তরে হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিলেন, “বেহেশ্ত্রী বৃক্ষের শাখা-প্রশাখা কখনও পরিশুদ্ধ হইবে না। এমন কি পত্র-পল্লবও ঝরিয়া পড়িবে না এবং ফল কখনও নিঃশেষ হইবে না। আর বেহেশতের মধ্যে তুবা নামক এক বৃহৎ বৃক্ষ রহিয়াছে। উহার মূল শুভ্র মণির তৈরি, উপরাংশ স্বর্ণের তৈরী এবং মধ্যমাংস রূপার তৈরী। সেই বৃক্ষের শাখাগুলি জবরজদ ও পত্রগুলি 'সুনদূস্' পদার্থ দ্বারা নির্মিত। তুবা বৃক্ষের সত্তর হাজার শাখা আছে। সেইগুলি এতই বিস্তৃত যে উহার বৃহৎ শাখাগুলি আরশের পায়ার সহিত এবং ক্ষুদ্র ডালাগুলি আকাশের সহিত মিশিয়া রহিয়াছে। বেহেশতের প্রত্যেক কামরায় উহার এক একটি শাখা আছে ৷ সেই বৃক্ষ প্রত্যেক বেহেশতবাসীকে ছায়াদান করিবে এবং তাহাদের আকাঙ্ক্ষা অনুসারে ফল প্রদান করিবে। সেই বৃক্ষটি আকাশে অবস্থিত সূর্যের তুল্য হইবে –যেমন সূর্য আকাশে থাকিয়াও পৃথিবীর সকল প্রান্তকে আলোকোজ্জ্বল করিয়া থাকে।”

হযরত আলী (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, বেহেশতের বৃক্ষগুলি রৌপ্য নির্মিত হইবে, তবে কিছু শাখা স্বর্ণের ও কিছু শাখা রৌপ্যের হইবে। মোটকথা বৃক্ষটি স্বর্ণের হইলে শাখাগুলি হইবে রৌপ্যের। পক্ষান্তরে মূল বৃক্ষটি রৌপ্যের হইলে শাখাগুলি হইবে স্বর্ণের। দারুত্ তাক্লীফ অর্থাৎ পৃথিবীর গাছগুলির মূল যেমন যমিনে এবং শাখাগুলি উপরে, কিন্তু বেহেশতী বৃক্ষগুলির মূল উপরে এবং শাখাগুলি নীচে হইবে। আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করিয়াছেন, “উহার ফলগুলি নিকটবর্তী হইবে।” বেহেশতের মাটি মেশ্ক, আম্বর ও কাফুরের হইবে এবং উহার নহরগুলি দুধ, মধু, পানি ও শরাবে পরিপূর্ণ হইবে। বাতাসের আলোড়নের সহিত পাতাগুলি হইতে খুব সুন্দর আওয়াজ বাহির হইবে।

মানুষ যতক্ষণ আল্লাহ পাকের জিকিরে, তাস্বীহ পাঠে ও এস্তেগফার ও কুরআন তেলাওয়াতে নিমগ্ন থাকে, ততক্ষণ ফেরেশতারা তাহাদের জন্য বালাখানা ও বৃক্ষ রোপণে নিমগ্ন থাকেন। আর যখনই মানুষ পুণ্যকর্ম হইতে বিরত হয়, তখন ফেরেশতাগণ বালাখানা তৈরী ও বৃক্ষ রোপণ হইতে বিরত থাকেন।

হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, যে ব্যক্তি পবিত্র রমজান মাসে রোযা রাখিবে, আল্লাহ তায়ালা তাহার সহিত শুভ্র মোতি নির্মিত তাঁবুতে আবদ্ধ 'হুর' এর বিবাহ দিবেন। যেমন আল্লাহপাক এরশাদ করিয়াছেন, “এমন হুরদের সহিত বিবাহ দিবেন । যাহাদিগকে তাঁবুতে আবদ্ধ রাখা হইয়াছে।” সেই সকল রমণীদের জন্য সত্তরটি লাল ইয়াকুত নির্মিত পালঙ্ক থাকিবে। প্রত্যেক পালঙ্কের উপর সত্তরটি মায়েদা বা খাদ্যের থালা থাকিবে এবং প্রত্যেক থালায় হাজার স্বর্ণের পেয়ালা থাকিবে। সমপরিমাণে তাহাদের স্বামীও প্রদান করা হইবে। এই সকল নেয়ামত উহাদিগকে দান করা হইবে, যাহারা রমজান মাসে রোযা ছাড়াও অন্যান্য সৎকর্মও সম্পাদন করিয়াছেন।

পরবর্তী পর্ব-

দাকায়েকুল আখবার- (৪৯) বেহেশতের বিবরণ



📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ৪৯)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

বেহেশতের বিবরণ
হযরত ওয়াহাব (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ তা'য়ালা স্বীয় কামনা অনুসারে যথা বেহেশত নির্মাণ করিয়াছেন। আর আকাশমন্ডল ও ভূ-মণ্ডলের বিস্তৃতি অনুযায়ী উহার প্রস্থ নির্ধারণ করিয়াছেন। উহার দৈর্ঘ্য সম্পর্কে কাহাকেও পরিজ্ঞাত করেন নাই। কিয়ামতের দিন যখন যাবতীয় আকাশ ও ভু-মণ্ডল বিলয় হইয়া যাইবে, তখন আল্লাহ তা'য়ালা উহার বিস্তৃতি আরও পরিবর্ধিত করিবেন, যাহাতে সমস্ত বেহেশতবাসী পরম আনন্দে উহাতে বসবাস করিতে সক্ষম হয়।
বেহেশত রাজ্যে মোট একশত দরওয়াজা থাকিবে। এক দরওয়াজা হইতে অন্য দরওয়াজার দূরত্ব হইবে পাঁচশত বৎসরের রাস্তা। উহাতে পবিত্র প্রস্রবণ কুলকুল রবে প্রবাহিত হইতে থাকিবে। বেহেশতী ফলগুলি স্বীয় বৃক্ষের অগ্র-পশ্চাতে অধঃমুখী ঝুলিয়া থাকিবে যেন বেহেশতীগণ স্বীয় ইচ্ছা ও কামনা অনুযায়ী ভক্ষণ করিতে সক্ষম হয়।

বেহেশতে ‘হুরেঈন' নামক বড় চক্ষু বিশিষ্টা পবিত্রা রমণী থাকিবে। আল্লাহ পাক তাহাদিগকে স্বীয় নূর দ্বারা পয়দা করিয়াছেন। তাহারা ইয়াকুত ও মারজানতুল্য লাবণ্যময়ী ও সুন্দরী হইবে। তাহারা সর্বদা আনত নয়না হইয়া থাকিবে। তাহারা সর্বদা নিজ নিজ স্বামী ব্যতীত অন্য কাহারও প্রতি দৃষ্টিপাত করিবে না। তাহারা স্বীয় স্বামী লাভ করিবার পূর্বে কোন মানব-দানব কর্তৃক স্পর্শিতা হইবে না। আর তাহাদের সহিত যতই সঙ্গম করা হইবে, তাহাদিগকে ততই নবতর কুমারীর মত অনুভব হইবে। তাহাদের শরীরে বিভিন্ন রংয়ের মোট সত্তরটি অলংকার পরিশোভিত হইবে। কিন্তু সেগুলি একটি পশমের সমতুল্যও ভারী বোধ হইবে না। তাহাদের হাড়ের মগজ, হাড়, মাংস ও অলঙ্কারের ভিতর দিয়া পরিদৃষ্ট হইবে। যেমন শুভ্র কাচ পাত্রের ভিতর দিয়া লোহিত পানীয় পরিদৃষ্ট হয়। তাহাদের কেশগুচ্ছ ইয়াকুত, মুক্তা খচিত হইবে। 

দোয়া - হে আল্লাহ! আমাদিগকেও এমন উত্তম রিযিক প্রদান করুন। আমিন।

পরবর্তী পর্ব-

দাকায়েকুল আখবার- (৪৮) দোযখ হইতে বাহির হওয়ার বিবরণ



📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ৪৮)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

দোযখ হইতে বাহির হওয়ার বিবরণ-
হাদীস শরীফে আছে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করিয়াছেন যে, আখেরী নবী হযরত মুহাম্মদ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর উম্মতের মধ্য হইতে যাহারা সবশেষে দোযখ হইতে পরিত্রাণ লাভ করিবে, তাহারা অন্ততঃ নয় হাজার বৎসর পর্যন্ত আযাব ভোগ করিবে। দীর্ঘ চারি হাজার বৎসর পর্যন্ত আযাব ভোগ করিয়া তাহারা অকস্মাৎ 'ইয়া আল্লাহ' বলিয়া চীৎকার করিয়া উঠিবে। অতঃপর একহাজার বৎসর পর্যন্ত ‘ইয়া হান্নানু' বলিয়া আল্লাহ তায়ালাকে ডাকিবে। তারপর এক হাজার বৎসর পর্যন্ত ‘ইয়া মান্নানু' এবং এক হাজার বৎসর 'ইয়া কাইয়্যুমু' বলিয়া আল্লাহর যিকির করিবে। পরিশেষে আরও এক হাজার বৎসর 'ইয়া রাহমানু ইয়া রাহিমু' বলিয়া প্রার্থনা করিবে। তারপর আল্লাহ তায়ালা হযরত জিব্রাইল (আঃ) কে ডাকিয়া বলিবেন, “হে জিব্রাইল! দোযখের আগুন পাপী উম্মতে মুহাম্মদীদের সহিত কিরূপ ব্যবহার করিয়াছে, তাহা একবার দেখিয়া আস।” তখন জিব্রাইল (আঃ) আরজ করিবেন, “হে আল্লাহ! তাহাদের সম্বন্ধে আপনিই অধিক ভাল জানেন।" তারপর আল্লাহ পাক তাঁহাকে তাহাদিগকে দেখিয়া আসিতে নির্দেশ দিবেন। তখন হযরত জিব্রাইল (আঃ) দোযখের দারোগা হযরত মালেক (আঃ)-কে দেখিতে পাইবেন যে, তিনি দোযখের মধ্যস্থলে আগুনের মিম্বরের উপর বসিয়া রহিয়াছেন। তিনি হযরত জিব্রাইল (আঃ)কে দর্শন করিয়াই সম্মানার্থে দণ্ডায়মান হইয়া প্রশ্ন করিবেন, “হে দোস্ত! আপনি কিজন্য এইখানে পদার্পণ করিয়াছেন?” উত্তরে তিনি বলিবেন, “হে মালেক! আমি পাপী উম্মতে মুহাম্মদীদের অবস্থা দর্শন করিবার জন্য আসিয়াছি।” প্রত্যুত্তরে মালেক (আঃ) বলিবেন, “হে জিব্রাইল! তাহাদের অবস্থা অত্যন্ত বেদনাদায়ক এবং তাহাদের নিবাসস্থল অতিশয় ভীতিপ্রদ। তাহাদের অস্থিমজ্জা আগুনে জ্বলিয়া বিনষ্ট হইয়৷ গিয়াছে। কেবলমাত্র তাহাদের চেহারা ও কপাল ঈমানের নূরের দ্বারা চমকাইতেছে।” জিব্রাইল (আঃ) বলিবেন, “হে প্রিয় বন্ধু! তাহাদের বর্তমান পর্দা অপসারিত করিয়া আমাকে দর্শন করিবার সুযোগ দিন।” তখন মালেক (আঃ) দোযখরক্ষীদিগকে দোযখের দ্বার খুলিয়া দিতে নির্দেশ দিবেন। দোযখের দ্বার খুলিবার পর দোযখীগণ হযরত জিব্রাইল (আঃ) কে দেখিয়া অনুমান করিবে যে, তিনি আযাবের ফেরেশতা নহেন। তাহারা মালেক (আঃ) কে প্রশ্ন করিবে, “হে দোযখের দারোগা! এই অনিন্দ্য সুন্দর জ্যোতির্ময় ব্যক্তি কে? তাঁহার সমতুল্য অভূতপূর্ব লাবণ্যময় সুন্দর পুরুষ পূর্বে কখনও আমরা অবলোকন করি নাই?” মালেক (আঃ) উত্তরে বলিবেন, “তিনিই হযরত জিব্রাইল আমীন। ইনিই হযরত মুহাম্মদ (সঃ)এর নিকট অহী লইয়া যাইতেন।”

হযরত রাসূলে পাক (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর নাম শ্রবণ করিবামাত্র তাহারা জোর গলায় চীৎকার করিয়া অঝোর ধারায় ক্রন্দন করিয়া বলিবে, “হে জিব্রাইল (আঃ)! আমাদের সালাম ও দুরবস্থার কথা অতি সত্ত্বর হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-কে খুলিয়া বলুন। আর তিনি যেন আমাদের মুক্তিলাভের ব্যবস্থা করেন, এই কথাও বলুন।”

তারপর হযরত জিব্রাইল (আঃ) আল্লাহ পাকের সমীপে উপস্থিত হইলে আল্লাহ তাহাকে জিজ্ঞাসা করিবেন, “হে জিব্রাইল! উম্মতে মুহাম্মদীর অবস্থা কিরূপ প্রত্যক্ষ করিলে?” জিব্রাইল (আঃ) ফরিয়াদ করিবেন, “হে আল্লাহ! তাহাদের সঙ্কটাবস্থা ও সংকীর্ণতা সম্বন্ধে আপনিই ভাল জানেন।” 

পুনরায় আল্লাহ পাক তাহাকে জিজ্ঞাসা করিবেন, “তাহারা কিছু আরজ করিয়াছে কি?" তিনি বলিবেন, “হে আল্লাহ! তাহারা তাহাদের নবী (সঃ) এর নিকট সালাম জানাইয়া তাহাদের দুরবস্থার খবর জানাইতে অনুরোধ করিয়াছে।” 

আল্লাহ পাক তখন জিব্রাইল (আঃ) -কে নির্দেশ দিবেন, “যাও অতি সত্বর তাহাদের নবীর নিকট তাহাদের দুঃসংবাদ জানাও।” তখন জিব্রাইল (আঃ) ক্রন্দনরত অবস্থায় হুযুর করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর সমীপে হাজির হইবেন। তখন হুযুর করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) তুবা বৃক্ষের নীচে সাদা মুক্তার নির্মিত তাঁবুতে অবস্থান করিবেন। উক্ত তাঁবুতে লোহিত সোনার কপাটযুক্ত চারি সহস্র দরওয়াজা থাকিবে। হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) তাঁহাকে ক্রন্দনের কারণ জিজ্ঞাসা করিলে প্রত্যুত্তরে তিনি বলিবেন, “হে প্রিয় বন্ধু মুহাম্মদ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)! যাহা আমি অবলোকন করিয়াছি যদি তাহা আপনি দর্শন করিতেন তাহা হইলে আপনি আমা হইতে অধিক ক্রন্দন করিতেন। আমি আপনার পাপী উম্মতদের নিকট হইতে আগমন করিয়াছি। তাহারা কঠিন আযাবে নিপতিত রহিয়াছে। তাহারা আপনাকে সালাম জানাইয়াছে এবং তাহাদের দুরবস্থার খবর বলিতে অনুরোধ করিয়াছে এবং তাহারা আপনার পবিত্র নাম স্মরণ করিয়া ডাকিতেছে।” 

আল্লাহ পাকের নির্দেশে হুযুর করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) তাহাদের ডাক শ্রবণ করিয়া বলিবেন, “হে আমার অনুসারীগণ! আমি এখনই তোমাদের সাহায্যের জন্য আগমন করিতেছি।" তারপর নবী পাক (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আরশে মোয়াল্লার নীচে সিজদায় পড়িয়া ক্রন্দন শুরু করিবেন। অপরাপর নবীগণও সেখানে হাজির হইয়া আল্লাহ পাকের তাসবীহ্ পাঠে নিমগ্ন হইবেন, তবে তাহাদের কেহই মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম )এর সমতুল্য তাসবীহ পাঠ করিতে পারিবেন না। আল্লাহ পাক তখন এরশাদ করিবেন, “হে প্রিয় হাবীব! আপনি মস্তক উত্তোলনপূর্বক মুনাজাত ও সুপারিশ করুন; আপনার সুপারিশ কবুল করা হইবে।” 

তখন নবী পাক (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ফরিয়াদ করিবেন, “হে আল্লাহ! আপনি আমার গুনাহগার উম্মতের উপর আযাবের নির্দেশ প্রদান করিয়াছেন; কিন্তু আমি তাহাদের মাগফেরাত কামনা করিতেছি। আপনি আমার সুপারিশ কবুল করুন।” 

আল্লাহ পাক তাঁহার প্রার্থনা কবুল করিয়া নির্দেশ দিবেন যে, “তাহাদের নিকট আমার সালাম পৌছাইয়া দিন এবং কালেমা পাঠকারীদিগকে দোযখের বাহিরে লইয়া আসুন।” তখনই নবী পাক (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) অন্যান্য নবীগণের সমভিব্যহারে দোযখের দিকে যাত্রা করিবেন এবং দোযখের দারোগা হযরত মালেক (আঃ) তাহাদিগকে দর্শন করিয়া খোশ আমদেদ জ্ঞাপন করিবেন।

 হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) হযরত মালেক (আঃ)-এর নিকট স্বীয় অপরাধী উম্মতগণের খবর জিজ্ঞাসা করিলে প্রত্যুত্তরে হযরত মালেক (আঃ) বলিবেন, “তাহাদের অবস্থা অত্যন্ত সঙ্কটাপন্ন এবং তাহারা. অতিশয় সংকীর্ণতার মধ্যে নিপতিত রহিয়াছে।” হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) তাহাকে দোযখের দ্বার খুলিবার জন্য বলিবেন। 

দোযখের দ্বার খুলিবার সঙ্গে সঙ্গে পাপীগণ হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-কে দেখিয়া ডাকিতে শুরু করিবে এবং বলিবে, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! দোযখের আগুন আমাদের গোশ্ত পোশত হাড় জ্বালাইয়া দিয়াছে। আপনি এতদিনই আমাদের কথা বিস্মরণ ছিলেন?” 

হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিবেন-“আমি প্রকৃতই তোমাদের খবর জানিতাম না।” তারপর নবী পাক (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) তাহাদিগকে আগুনে পোড়া কয়লার মত দোযখ হইতে বাহিরে আনিয়া বেহেশতের নহরে হায়াতে গোসল করাইবেন। ফলে তাহারা নধর কান্তি যুবকের রূপ পরিগ্রহ করিবে। তাহাদের শরীর পশম ও গণ্ডদেশে দাড়ি থাকিবে না। তবে আঁখিদ্বয় সুরমামণ্ডিত ভ্রূদ্বারা সুসজ্জিত থাকিবে। তাহাদের মুখমণ্ডল হইবে পূর্ণ শশী কলার মত সমুজ্জ্বল ।

কিন্তু তাহাদের কপালে এই লেখা থাকিবে যে, “তাহারা দোযখবাসী ছিল, দয়াময় আল্লাহ পাক তাহাদিগকে মুক্তিদান করিয়াছেন।”তারপর তাহারা সুখময় বেহেশতে দাখিল হইবে, তবে কপালের চিহ্নের দরুন সর্বদা ম্রিয়মান থাকিবে। তাহারা আল্লাহ পাকের সমীপে উক্ত চিহ্ন মুছিয়া দেওয়ার জন্য প্রার্থনা করিবে। পরিশেষে আল্লাহ পাক ইহা বিলীন করিয়া দিবেন আর তাহারা পরমানন্দে বেহেশতে বাস করিবে। আর কাফেরগণ ঈমানদারগণের মুক্তিলাভ প্রত্যক্ষ করিয়া অনুশোচনা সহকারে বলিবে, "হায়! আমরাও যদি মুসলমান হইতাম!” এই প্রসঙ্গে আল্লাহ পাক এরশাদ করিয়াছেন, “কাফেরগণ আকাঙ্ক্ষা করিবে যদি তাহারাও মুসলমান হইত।"

হুযুরে পাক (সঃ) এরশাদ করিয়াছেন যে, অবশেষে আল্লাহ পাক মোটাতাজা দুম্বার আকারে মৃত্যুকে বেহেশত ও দোযখের মধ্যখানে উপস্থিত করিয়৷ বেহেশতীদিগকে লক্ষ্য করিয়া বলিবেন, “তোমরা মউতকে চিনিয়াছ কি?" তাহারা তখন মউতকে চিনিতে সক্ষম হইবে। পুনরায় আল্লাহ পাক দোযখীদিগকে লক্ষ্য করিয়া বলিবেন, “তোমরাও মৃত্যুকে চিনিতে পারিয়াছ কি?"

তাহারাও মউতকে চিনিতে সক্ষম হইবে। তারপর বেহেশত ও দোযখের মধ্যস্থলে মৃত্যুকে যবেহ করা হইবে। আর বেহেশতীদিগকে বলা হইবে, “হে বেহেশ্তীগণ! অদ্য হইতে সুখ উপভোগ কর। তোমাদের আর মৃত্যু হইবে না। আর হে দোযখীগণ! তোমরা আজ হইতে চিরকাল দোযখের আযাব ভোগ করিবে। তোমাদের আর মৃত্যু হইবে না।” যেমন, আল্লাহ পাক ঘোষণা করিয়াছেন, “হে মুহাম্মদ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)! কাফেরদিগকে সেই অনুতাপের দিনের ভয় প্রদর্শন করুন, যেদিন আল্লাহ পাক আযাবের নির্দেশ ঘোষণা করিবেন।”

হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আরও এরশাদ করিয়াছেন যে, কিয়ামতের দিন দোযখকে টানিয়া আনয়ন করা হইবে। তখন ইহার ভীতিপ্রদ বিকট চীৎকার ও আওয়াজ শ্রবণ করিয়া প্রত্যেক সম্প্রদায়ের মানুষ ভীত কলেবরে নিজ হাঁটুর উপর বসিযা থাকিবে। এই প্রসঙ্গে আল্লাহ পাক এরশাদ করিয়াছেন, “হে হাবীব (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)! আপনি প্রত্যেক সম্প্রদায়কে হাঁটুর উপর বসিয়া থাকিতে প্রত্যক্ষ করিবেন।” আল্লাহ পাক আরও ঘোষণা করিয়াছেন, “প্রত্যেক সম্প্রদায়কে সেদিন তাহার কৃতকর্মের প্রতি ডাকা হইবে এবং আমল অনুযায়ী প্রতিফল দেওয়া হইবে।” আর তাহারা দোযখের প্রতি লক্ষ্য করিবে এবং পাঁচশত বৎসরের দূরত্ব হইতে ইহার গুরু গম্ভীর আওয়াজ শ্রবণ করিবে। 

এই প্রসঙ্গে আল্লাহ পাক ঘোষণা করিয়াছেন, “উহার ভয়ঙ্কর ও বিকট আওয়াজ তাহারা পাঁচশত বৎসরের দূরত্ব হইতে শুনিতে পাইবে।” এই সঙ্কট মুহূর্তে নবী রাসূলগণ 'ইয়া নাফসি' 'ইয়া নাফ্‌সি বলিয়া ডাকিতে থাকিবেন। হযরত ইব্রাহীম খলিলুল্লাহ, হযরত মূসা কলিমুল্লাহও 'ইয়া নাফ্‌সি, ‘ইয়া নাফ্‌সি' বলিতে থাকিবেন; কিন্তু আমাদের প্রিয়নবী সাইয়্যেদুল মুরসালীন আল্লাহর হাবীব এই কঠিন মুহূর্তেও আমাদের কথা বিস্সৃত হইবেন না, তিনি সেই সময় আল্লাহ পাকের নিকট ‘ইয়া উম্মতি' ‘ইয়া উম্মতি' বলিয়া মুনাজাত করিবেন।

আর যখন দোযখকে সমীপবর্তী করা হইবে, তখন আঁ হযরত (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিলেন, “হে আগুন! নামাযী বান্দাদের উছিলায় অথবা দাতাদের উছিলায়, অথবা ধার্মিকদের উছিলায় অথবা রোযাদারদের উছিলায় নির্দিষ্টস্থানে ফিরিয়া যাও।” ইহাতেও যখন আগুন প্রত্যাবর্তন করিবে না, তখন হযরত জিব্রাইল (আঃ) বলিলেন, “হে হযরত মুহাম্মদ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আপনি এইকথা বলুন, “হে আগুন! তাওবাহকারীদের উছিলায় অথবা তাহাদের চোখের পানির উছিলায় অথবা গুনাহগারদের অনুতাপ ও ক্রন্দনের উছিলায় নিজস্থানে ফিরিয়া যাও।” এইকথা বলিবার সঙ্গে সঙ্গে অগ্নি নিজের স্থানে প্রত্যাবর্তন করিবে। তারপর হযরত জিব্রাইল (আঃ) গুনাহগারদের চোখের পানি আনয়ন করতঃ দোযখে ছিটাইয়া দিলে উহা নিভিয়া যাইবে, যেমন পানি সিঞ্চনে আগুন নির্বাপিত হইয়া যায়।

নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করিয়াছেন যে, রোজ কিয়ামতে যখন সমস্ত সৃষ্টজীব হাশর মাঠে জড়ো হইবে তখন দোযখ ইহার সমস্ত দ্বার খুলিয়া তথায় উপস্থিত হইবে এবং হাশরবাসীদের পূর্বে, পশ্চিমে, উত্তরে, দক্ষিণে ও নীচের দিক হইতে পরিবেষ্টন করিয়া ফেলিবে। তখন হাশরবাসীগণ আঁ হযরত (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর নিকট ফরিয়াদ জানাইতে থাকিবে। সেই সময় হযরত জিব্রাইল (আঃ) হুযুর পাক (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-কে বলিবেন, যেন তিনি স্বীয় পবিত্র মস্তকের ধূলাবালি নির্বিঘ্নে উহাতে ঝাড়িয়া ফেলেন। তারপর আল্লাহ পাক হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর মাথার ধূলাবালি দ্বারা একখণ্ড বৃষ্টি বহনকারী মেঘমালা সৃষ্টি করতঃ ঈমানদারদিগকে ছায়া প্রদান করিবেন। 

হযরত জিব্রাইল (আঃ)-এর পরামর্শ অনুযায়ী নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) দাড়ি মোবারক ঝাড়িয়া দিলে আল্লাহ পাক ঐগুলি দ্বারা দোযখ এবং তাহাদের মধ্যবর্তী স্থানে একটি দেয়াল তৈরী করিয়া দিবেন। আবার হযরত জিব্রাইল (আঃ) -এর পরামর্শ অনুসারে হযরত নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) স্বীয় দেহ মোবারকের ধূলি-বালি ঝাড়িয়া দিবেন। ফলে ঐগুলি দ্বারা আল্লাহ পাক তাহাদের পায়ের নীচে এমন ফরাশ বিছাইয়া দিবেন যাহাতে দোযখ তাহাদিগকে স্পর্শও করিতে সক্ষম হইবে না।

আঁ হযরত (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আরও এরশাদ করিয়াছেন, রোজ কিয়ামতে একজন লোককে আল্লাহ পাকের সমীপে উপস্থিত করা হইবে। তাহার পাপরাজি নেক হইতে অনেক বেশী হইবে। এইজন্য আল্লাহ পাক তাহাকে দোযখে নিক্ষেপের নির্দেশ দিবেন। তখন তাহার চক্ষুর একটি ভ্রূ আল্লাহ পাকের নিকট আরজ করিয়া বলিবে, “ইয়া আল্লাহ! আপনার হাবীব হযরত মুহাম্মদ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করিয়াছিলেন, যাহার চক্ষু আল্লাহর ভয়ে অশ্রুপাত করিয়াছে, আল্লাহ পাক সেই চক্ষুকে দোযখের আগুনের জন্য হারাম করিয়া দিয়াছেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ পাকের ভয়ে অশ্রুপাত করিয়া একটি পশমও সিক্ত করিয়াছে, আল্লাহ পাক তাহাকে উহার বদলায় মাফ করিবেন।” হে আল্লাহ! আমি আপনার ভয়ে অশ্রুপাত করিয়াছি। অতএব আমাকে দোযখের লেলিহান শিখা হইতে বাহির করিয়া দিন।”

অন্য এক বর্ণনায় আছে, সে বলিবে, “আমাকে মাফ করুন।” অতএব আল্লাহ পাক তাহাকে সেই ভ্রূর উছিলায় ক্ষমা করিয়া দিবেন। তখন আল্লাহ পাকের পক্ষ হইতে কেহ ঘোষণা করিবে, “অমুকের ছেলে অমুককে শুধু কেবল ভ্রূর উছিলায় ক্ষমা করা হইয়াছে।”

পরবর্তী পর্ব-

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...