📚এহইয়া উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)
মিশ্র আমলের সওয়াব —
আমল যখন আল্লাহ তা'আলার জন্যে খালেস হয় না এবং তাতে রিয়া ইত্যাদি আপদের মিশ্রণ থাকে, তখন সে আমল সম্পর্কে মতভেদ রয়েছে। এরূপ মিশ্র আমল দ্বারা সওয়াব পাওয়া যাবে, না শাস্তি, না কোন কিছুই হবে না?— এ সম্পর্কে নানা জন নানা মত প্রকাশ করেছেন।
বলা বাহুল্য, যে আমলের উদ্দেশ্য কেবল রিয়া হবে, তা তো আযাব ও গযবের কারণ হবেই এবং যা বিশেষভাবে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে হবে, তা সওয়াবের কারণ হবে। মতভেদ কেবল মিশ্র আমল সম্পর্কে। বাহ্যিক হাদীস দ্বারা জানা যায় যে, এতে সওয়াব পাওয়া যাবে না। তবে এ সম্পর্কে বিভিন্নরূপ রেওয়ায়েতও রয়েছে। আমাদের মতে উদ্দেশ্যের শক্তি ও প্রাবল্যের নিরিখে বিচার হওয়া উচিত। যদি দ্বীনী উদ্দেশ্য ও জৈবিক উদ্দেশ্য সমান সমান হয়, তবে এরূপ আমল সওয়াব ও আযাব এতদুভয়ের মধ্যে কোনটিরই কারণ হবে না। আর রিয়ার উদ্দেশ্য প্রবল হলে তা আযাবেরই কারণ হবে। তবে এই আযাব শুধু রিয়ার উদ্দেশ্যে করা আমলের আযাব অপেক্ষা হালকা হবে। আর যদি নৈকট্যের নিয়ত প্রবল হয়, তবে যে পরিমাণ প্রবল হবে, সে পরিমাণ সওয়াব হবে। এর কারণ আল্লাহ তা'আলার এই উক্তি– “যে অণু পরিমাণ সৎকর্ম করবে, সে তা দেখতে পাবে এবং যে অণু পরিমাণ অসৎকর্ম করবে, সে তাও দেখতে পাবে।”
আরও এরশাদ হয়েছে,– “নিশ্চয় আল্লাহ অণু পরিমাণও যুলুম করবেন না। পুণ্য কাজ হলে তিনি তা দ্বিগুণ করে দেবেন।”
এসব আয়াত থেকে বুঝা যায়, সৎকর্মের ইচ্ছা পণ্ড হবে না। যদি সৎ কর্মের ইচ্ছা রিয়ার ইচ্ছা অপেক্ষা প্রবল হয়, তবে রিয়ার ইচ্ছার সমান তা পণ্ড হবে এবং বাড়তিটুকু অবশিষ্ট থাকবে। আর যদি সৎ কর্মের ইচ্ছা কম এবং রিয়ার ইচ্ছা বেশী হয়, তবে শুধু রিয়ার ইচ্ছার কারণে যতটুকু আযাব হত, তা থেকে সৎকর্মের ইচ্ছা পরিমাণ আযাব কমে যাবে। সুতরাং যদি কেউ এমন সৎকর্ম করে, যা দ্বারা উদাহরণ স্বরূপ এক ফুট নৈকট্য অর্জিত হয় এবং তাঁর সাথে এমন অসৎকর্ম করে, যা দ্বারা উদাহরণ স্বরূপ এক ফুট দূরত্ব অর্জিত হয়, তবে এই ব্যক্তি পূর্বে যে অবস্থায় ছিল, তাতেই থেকে যাবে। না সওয়াব হবে, না আযাব। হাদীস শরীফে আছে- অসৎ কর্মের পেছনে সৎকর্ম কর। এই সৎকর্ম অসৎ কর্মকে মিটিয়ে দেবে।
সুতরাং নির্ভেজাল রিয়াকে নির্ভেজাল এখলাস মিটিয়ে দেয়। যদি কারও মধ্যে উভয়টি একত্রিত হয়, তবে একটি অপরটির বিপরীত ক্রিয়া করবে। এ বিষয়ে উম্মতের এজমা তথা ঐকমত্য রয়েছে যে, যে ব্যক্তি হজ্জে রওয়ানা হয় এবং তার সাথে পণ্য সামগ্রীও থাকে, তার হজ্জ জায়েয হবে এবং সে হজ্জের সওয়াব পাবে।
অবশ্য আয়াত ও হাদীস থেকে জানা যায় রিয়ার সংমিশ্রণ সওয়াবকে বরবাদ করে দেয়। হজ্জের সফরে ব্যবসায়ের ইচ্ছা করাও অনুরূপ একটি সংমিশ্রণ। তাউস এবং আরও কয়েকজন তাবেঈ রেওয়ায়েত করেন যে, এক ব্যক্তি রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-কে প্রশ্ন করল : এক ব্যক্তি দান-খয়রাত করে এবং তাতে পছন্দ করে যে, মানুষ তার প্রশংসা করুক এবং সওয়াবও হোক। রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এ প্রশ্নের কোন উত্তর দিলেন না। অবশেষে এই আয়াত অবতীর্ণ হল : “যে ব্যক্তি তার পালনকর্তার সাথে সাক্ষাতের আশা করে, সে যেন সৎকর্ম সম্পাদন করে এবং নিজের পালনকর্তার এবাদতে কাউকে অংশীদার না করে।”
হযরত মুয়ায (রা.) বলেন: রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) রিয়াকে নিম্নতম শিরক বলেছেন। হযরত আবু হোরায়রার (রা.) রেওয়ায়েতে রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : “যে ব্যক্তি তার আমলে শিরক করবে, তাকে বলা হবে তুমি তোমার প্রতিদান তার কাছ থেকে গ্রহণ কর, যার জন্যে তুমি আমল করেছিলে।”
হযরত আবু মূসা (রা.) বর্ণনা করেন, জনৈক বেদুঈন রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর খেদমতে আরয করল : ইয়া রসূলাল্লাহ ! এক ব্যক্তি আত্মমর্যাদার জন্যে যুদ্ধ করে, অন্যজন বীরত্বের খাতিরে যুদ্ধে নামে এবং তৃতীয় জন আল্লাহর কাছে নিজের মর্যাদা জানার জন্যে লড়াই করে। তাদের মধ্যে কে আল্লাহর পথে লড়াই করে? তিনি জওয়াবে বললেন : “যে ব্যক্তি আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যুদ্ধ করে, সে-ই আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে।”
আমরা বলি, উপরোক্ত আয়াত ও হাদীসসমূহ আমাদের উল্লিখিত বক্তব্যের পরিপন্থী নয়। কেননা, এগুলোতে সে ব্যক্তিকেই বুঝানো হয়েছে, যে দুনিয়ার জন্যেই আমল করে এবং দুনিয়ার অন্বেষণই তার নিয়তে প্রবল থাকে। দ্বীনী আমলের বিনিময়ে দুনিয়া তলব করা হারাম। কেননা, এতে এবাদত স্বস্থান থেকে পরিবর্তিত হয়ে যায়। মিশ্র আমল বলতে আমাদের উদ্দেশ্য এমন আমল, যাতে উভয় নিয়ত সমান সমান থাকে। এরূপ আমলে সওয়াব ও আযাব কিছুই হয় না। সুতরাং এরূপ আমল দ্বারা সওয়াবের আশা করা উচিত নয়।
মোটকথা, এখলাসে আপদ অনেক। কিন্তু তা সত্ত্বেও আপদের কারণে আমল ত্যাগ করা উচিত নয়। আমাদের উপরোক্ত বর্ণনার উদ্দেশ্য আসলে এখলাসকে ত্যাগ না করা। যদি আমলই না করা হয়, তবে আমল ও এখলাস উভয়টি বর্জিত হয়ে যাবে। বর্ণিত আছে, জনৈক ফকীর হযরত আবু সাঈদ হেরাযের খেদমত করত এবং তাকে কাজকর্মে সাহায্য করত। একদিন তিনি ফকীরকে কাজকর্মে এখলাস অবলম্বন করতে বললেন। ফকীর প্রত্যেক কাজের সময় অন্তরের অবস্থা দেখতে লাগল। এখলাস অর্জনে অক্ষম হয়ে অবশেষে সে কাজকর্মই বন্ধ করে দিল। এতে হযরত আবু সাঈদ কষ্টে পড়ে গেলেন। কারণ, তার কাজকর্মে সাহায্যকারী কেউ ছিল না। তিনি ফকীরকে জিজ্ঞেস করলেন : তুমি এখন কাজ কর না কেন? ফকীর বলল : আপনার এরশাদ অনুযায়ী এখলাস অবলম্বনে ব্যর্থ হয়ে কাজ ছেড়ে দিয়েছি। তিনি বললেন : এরূপ করো না। এখলাস আমলকে ছিন্ন করে ন । আমল করে যাও এবং এখলাস অর্জনের চেষ্টা করতে থাক। আমি তোমাকে আমল ছেড়ে দিতে বলিনি। বরং আমলকে খাঁটি করতে বলেছি।
(সমাপ্ত)
(এহইয়াউ উলুমিদ্দীন পঞ্চম খণ্ড)









