আল্লাহ-পরিচয় (তত্ত্বদর্শন) পর্ব – ১৮
📚সৌভাগ্যের পরশমণি ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)
📚সৌভাগ্যের পরশমণি ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)
শরীয়ত অমান্যকারীদের ভ্রমের সাতটি কারণ —
যে ব্যক্তি শরীয়তের সীমালঙ্ঘন করে, সে নিজে নিজেই ধ্বংসের মুখে অগ্রসর হয়। এইজন্যই আল্লাহ্ তা'আলা বলেন : “যে ব্যক্তি আল্লাহ্’র নির্ধারিত সীমালঙ্ঘন করে সে নিজের উপরই অত্যাচার করে।” যাহারা হারামকে হালাল জানিয়া আল্লাহর নির্ধারিত সীমালঙ্ঘন করিয়াছে তাহাদের ভ্রম ও অজ্ঞতার সাতটি কারণ আছে।
যে ব্যক্তি শরীয়তের সীমালঙ্ঘন করে, সে নিজে নিজেই ধ্বংসের মুখে অগ্রসর হয়। এইজন্যই আল্লাহ্ তা'আলা বলেন : “যে ব্যক্তি আল্লাহ্’র নির্ধারিত সীমালঙ্ঘন করে সে নিজের উপরই অত্যাচার করে।” যাহারা হারামকে হালাল জানিয়া আল্লাহর নির্ধারিত সীমালঙ্ঘন করিয়াছে তাহাদের ভ্রম ও অজ্ঞতার সাতটি কারণ আছে।
(১) প্রথম কারণ : আল্লাহর উপর তাহাদের ঈমানই নাই। তাহারা নিজেদের খেয়াল ও কল্পনার বলে ‘আল্লাহ্ কিভাবে হইলেন’, ‘তিনি কিরূপ' অনুসন্ধান করিতে যাইয়া যখন কিছুই বুঝিতে পরিল না তখন স্বয়ং আল্লাহ্কেই অস্বীকার করিয়া বসিল এবং প্রকৃতি ও গ্রহ-নক্ষত্রাদিকে জগতের সকল কার্যের মূল কারণ বলিয়া ধরিয়া লইল। তাহারা আরও মনে করিয়া লইল যে, মানব, জীবজন্তু এবং এই বিশ্বজগত আশ্চর্য অনুভূতি, চমৎকার কৌশল ও সুশৃঙ্খলার সহিত আপনা-আপনিই উৎপন্ন হইয়াছে; অথবা অনাদিকাল হইতে আপনা-আপনিই এইরূপ চলিয়া আসিয়াছে বা এই সমস্তই প্রকৃতির কাজ। প্রকৃতিবাদিগণ যখন নিজেদের সম্বন্ধেই একেবারে অজ্ঞ তখন অন্যের সম্বন্ধে তাহারা কি জানিবে? তাহাদের উদাহরণ এইরূপ, যেমন কোন ব্যক্তি সুন্দর লেখা দেখিয়া ভাবিল, ইহা নিজে নিজেই হইয়াছে, লেখকের জ্ঞান ক্ষমতা ও ইচ্ছার সহিত ইহার কোন সম্পর্ক নাই অথবা ইহা এইরূপ লিখিত অবস্থাতেই অনাদিকাল হইতে আছে। যাহারা এতটুকু অন্ধ হইয়া গিয়াছে তাহারা দুর্ভাগ্যের পথ হইতে কখনও ফিরিয়া আসিবে না জ্যোতির্বিদ ও প্রকৃতিবাদীদের ভ্রম পূর্বেই বর্ণিত হইয়াছে।
(২) দ্বিতীয় কারণ : শরীয়ত অমান্যকারিগণ আখিরাতের উপর ঈমান রাখে না। কারণ, তাহারা মনে করে মানুষ ও তৃণলতা, বৃক্ষ এবং অন্য ইতর প্রাণীর ন্যায় মৃত্যুর পর ধ্বংস হইয়া যাইবে। মন্দ কৃতকর্মের জন্য তাহাকে পরকালে তিরস্কার করা হইবে না, কোন প্রকার হিসাব নিকাশ তাহার দিতে হইবে না এবং তথায় কোনরূপ দণ্ড বা পুরস্কার নাই। এইরূপ ব্যক্তিরা নিজদিগকে চিনে নাই। কেননা, তাহারা তাহাদিগকে গরু, গাধা, লতাপাতার ন্যায় মনে করে। মানবাত্মা যে দেহের মূল, অমর ও চিরস্থায়ী ইহা তাহারা জানে না। কেবল দেহরূপ কাঠামো হইতে আত্মাকে বিচ্ছিন্ন করা হইবে। ইহাকেই মৃত্যু বলে। মৃত্যুর হাকীকত চতুর্থ অধ্যায়ে বর্ণিত হইবে।
(৩) তৃতীয় কারণ : আল্লাহ্ ও আখিরাতের উপর তাহাদের ঈমান আছে বটে, কিন্তু তাহাদের ঈমান নিতান্ত দুর্বল। শরীয়তের অর্থ না বুঝিয়া তাহারা বলে - 'আমাদের ইবাদতে আল্লাহ্’র কি প্রয়োজন? আমাদের পাপেই বা তাহার অসন্তুষ্ট হওয়ার কারণ কি? তিনি তো বিশ্বজগতের বাদশাহ এবং তিনি আমাদের ইবাদতের মুখাপেক্ষী নহেন। তাহার নিকট পাপ-পুণ্য সবই সমান।' এই মূর্খেরা কি কুরআন শরীফে আল্লাহর আদেশ শ্রবণ করে নাই? আল্লাহ্ তা'আলা বলেন : “যে ব্যক্তি আত্মশুদ্ধি লাভ করিয়াছে সে একমাত্র নিজের মঙ্গলের জন্যই আত্মশুদ্ধি লাভ করিয়াছে।” তিনি আরও বরেন : “যে ব্যক্তি পুণ্যলাভে কঠোর সাধনা করে সে নিজের জন্যেই তদ্রূপ সাধনা করিয়া থাকে।” তিনি বলেন : - “যে ব্যক্তি নেক কাজ করিয়াছে সে নিজের জন্যই করিয়াছে।”
এই সকল উক্তি হইতে বুঝা যাইতেছে যে, বান্দা যে নেক আমল করে উহার উপকারিতা তাহার নিজেরই, উহাতে আল্লাহর কোন লাভ নাই? এই হতভাগ্য জাহিলগণ শরীয়তের অর্থ বুঝে না এবং মনে করে, শরীয়তের আদেশ নিষেধ মানিয়া চলা কেবল আল্লাহর জন্য, তাহাদের নিজের জন্য নহে।
তাহাদের দৃষ্টান্ত ঠিক এইরূপ যেমন, কোন রোগী নিজকে কুপথ্য হইতে রক্ষা করে না এবং বলে আমি চিকিৎসকের উপদেশ মান্য করি বা না করি ইহাতে তাহার কি? তাহার কথা সত্য বটে; কারণ ইহাতে চিকিৎসকের কোন লাভ-লোকসান নাই। তবু কুপথ্য বর্জন না করিলে রোগী নিজেই বিনষ্ট হইবে। চিকিৎসকের প্রয়োজনের জন্য রোগী বিনষ্ট হইবে না, বরং কুপথ্য বর্জন না করার দরুন বিনষ্ট হইবে। সুস্থ হওয়ার জন্য চিকিৎসক তাহাকে কুপথ্য বর্জনের উপদেশ দিয়াছিলেন। রোগী তাহা মানে নাই; ইহাতে উপদেশদাতার কি ক্ষতি? বরং রোগী নিজেই বিনাশপ্রাপ্ত হইবে। শারীরিক রোগ যেমন এ জগতে ধ্বংসের কারণ আত্মার রোগও তদ্রূপ পরকালে দুর্ভোগের কারণ। ঔষধ সেবন ও কুপথ্য বর্জনে যেমন শারীরিক পীড়া দূর হয়, তদ্রূপ ইবাদত, মারিফাত ও পাপ বর্জনে আত্মার স্বাস্থ্য লাভ হয় । এইজন্যই আল্লাহ্ তা'আলা বলেন : “যাহারা আল্লাহ্’র নিকট নিষ্পাপ ও নিরোগ আত্মা লইয়া যাইতে পারিবে তাহারা ব্যতীত অপর কেহই মুক্তি পাইবে না।
(৪) চতুর্থ কারণ : শরীয়ত বিষয়ে অজ্ঞতার দরুন তাহারা বলে, কুপ্রবৃত্তি, ক্রোধ ও রিয়া হইতে হৃদয়কে পাকপবিত্র করিবার জন্য শরীয়ত আদেশ দিয়াছে, অথচ উহা নিতান্তই অসম্ভব। কারণ, মানুষকে আল্লাহ্ এই সকল প্রবৃত্তি দিয়াই সৃষ্টি করিয়াছেন। তাহারা আরও বলে, কৃষ্ণ বর্ণকে শুভ্র বর্ণে পরিণত করা যেমন অসম্ভব, শরীয়তের এই আদেশ পালন ও তদ্রূপ অসম্ভব। কিন্তু এই নির্বোধগণ জানে না যে, লোভ, ক্রোধ ইত্যাদি রিপুকে সমূলে বিনষ্ট করিবার আদেশ শরীয়তে নাই; বরং এই সকল রিপুকে সায়েস্তা করত শরীয়ত ও বুদ্ধির অধীন করিয়া রাখিবার আদেশ রহিয়াছে যাহাতে ইহারা অবাধ্য হইতে না পারে এবং শরীয়তের সীমালঙ্ঘন না করে। রিপুগুলিকে এইরূপে দমন করিয়া কবিরা গুনাহ্ হইতে বাঁচিয়া থাকিতে পারিলে করুণাময় আল্লাহ্ সগিরা গুনাহ্সমূহ ক্ষমা করিয়া দিবেন। ক্রোধ-লোভাদি রিপুকে বশীভূত করিয়া রাখা মানব-ক্ষমতা বহির্ভূত নহে। বহু লোকে ইহা করিয়া দেখাইয়া গিয়াছেন। রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিয়াছেন যে,- কাম, ক্রোধ, রিপু থাকা উচিত নহে। অথচ তাহার নয়জন স্ত্রী ছিলেন এবং তিনি বলিয়াছেন- “আমি তোমাদের ন্যায় মানুষ; মানুষের ন্যায় আমার হৃদয়েও ক্রোধের উদ্রেক হয়।” যাঁহারা ক্রোধ দমন করিয়াছেন তাহাদের প্রশংসা করিয়া আল্লাহ্ বলেন : “যাহারা ক্রোধ দমনকারী ও লোকের প্রতি ক্ষমাপ্রদর্শনকারী, আল্লাহ্ তাহাদিগকে ভালবাসেন।” কিন্তু যাহাদের হৃদয়ে ক্রোধের উদ্রেকই হয় না, আল্লাহ্ তাহাদের প্রশংসা করেন নাই।
(৫) পঞ্চম কারণ : তাহারা আল্লাহ্’র গুণাবলীর মর্ম উপলব্ধি করিতে না পারিয়া বলে, “আল্লাহ্ দয়াময় ও ক্ষমাশীল আমরা যাহাই করি না কেন সর্বাবস্থায়ই তিনি আমাদের উপর দয়া করিবেন।” তিনি দয়াময় হইলেও যে আবার কঠিন শাস্তিদাতাও এ কথা তাহারা ভাবেন না। তাহারা দেখে না যে আল্লাহ্ দয়াময় ও ক্ষমাশীল হওয়া সত্ত্বেও এ জগতে বহু লোককে বিপদাপদ, রোগ-শোক এবং ক্ষুধা-তৃষ্ণায় নিপতিত রাখিতেছেন। কৃষি ও বাণিজ্য না করিলে ধন পাওয়া যায় না, পরিশ্রম ব্যতীত বিদ্যালাভ হয় না - ইহা বুঝিয়া তাহারা দুনিয়ার কাজে পরিশ্রম করিতে কিছুমাত্র ত্রুটি করে না। আল্লাহ্ তা'আলা পরম করুণাময়; কৃষিকার্য ও বাণিজ্য ব্যতীতই তিনি রিযিক দান করিবেন- এ কথা ভাবিয়া কেহই সাংসারিক কার্য হইতে হস্ত সঙ্কুচিত করিয়া নিষ্কর্মা হইয়া থাকে না; অথচ আল্লাহ্ স্বয়ং সকল প্রাণীর রিযিকের যিম্মাদার, যেমন তিনি বলেন : “পৃথিবীতে এমন কোন প্রাণী নাই যাহার রিযিকের যিম্মাদার আল্লাহ্ নহেন।” এবং পরকালে উন্নতি ও সৌভাগ্য তিনি প্রত্যেকের আমলের উপর ন্যস্ত রাখিয়াছেন। যেমন তিনি বলেন- “মানুষ শুধু তাহার চেষ্টায় সফলতা লাভ করিয়া থাকে।” প্রকৃত প্রস্তাবে এই শ্রেণীর লোকেরা আল্লাহ্কে করুণাময় বলিয়া বিশ্বাস করে না। কারণ, তাহারা আল্লাহর করুণার উপর নির্ভর করিয়া জীবিকা অর্জনে হস্ত সঙ্কুচিত করত নিষ্কর্মা বসিয়া থাকে না, কেবল পরকালের কার্যে শৈথিল্য করিয়া থাকে। সুতরাং পরকালের কার্যের বেলায় তাহারা যাহা কিছু বলে তাহা কেবল মৌখিক উক্তি এবং শয়তানের প্ররোচনা ব্যতীত আর কিছুই নহে। উহা সম্পূর্ণ অমূলক।
(৬) ষষ্ঠ কারণ : এই সকল লোক গর্বিত হইয়া বলে : “আমরা এমন অবস্থায় উপনীত হইয়াছি যে, পাপ আমাদের কোন ক্ষতি করিতে পারে না। আমাদের অবস্থা দুই কুল্লা পানির মত; গুনাহের অপবিত্রতা আমাদিগকে অপবিত্র করিতেই পারে না।” ( যে পাত্রে বিশ মণ পানি ধরে তাহাকে কুল্লা বলে। শাফেয়ী আলিমগণের মতে দুই কুল্লা পরিমাণ পানিতে সামান্য নাপাক মিশ্রিত হইলে পানি নাপাক হয় না ।) এই নির্বোধের অনেকে এত সংকীর্ণ মনা যে, তাহাদের সহিত কেহ কোন বেয়াদবির কথা বলিলে এবং তাহাদের অভিমানে আঘাত হানিলে ও রিয়া প্রকাশ করিয়া দিলে তাঁহারা চিরতরে তাহার শত্রু হইয়া পড়ে; লালসার বস্তুর এক গ্রাস কম হইলে তাহারা দুনিয়া আঁধার দেখে। মানবতাগুণে যাহাদের স্বভাব এত সংকীর্ণ ও অনুদার, দুই কুল্লা পানির ন্যায় কোন পাপই তাহাদের ক্ষতি করিতে পারে না - এরূপ মিথ্যা দাবি করা তাহাদের পক্ষে কি প্রকারে শোভা পায় ? বস্তুত পাপ হইতে নির্ভয় হওয়ার ন্যায় উচ্চ মর্যাদায় এই নির্বোধগণ উপনীত হয় নাই। আর যদি ধরিয়াও লওয়া যায় যে,- শত্রুতা, ক্রোধ, লালসা, রিয়া হইতে ব্যক্তি বিশেষ একেবারে পাকপবিত্র তথাপি তাহার পক্ষেও অদ্রূপ দাবি করা অহংকারমাত্র। কারণ তাহার মরতবা কখনও পয়গম্বরগণের মরতবা হইতে বৃদ্ধি পাইবে না অথচ পয়গম্বরগণ সামান্য অসাবধানতা ও পদস্খলনের জন্য রোদন করিতেন এবং তওবা করিতেন। বড় বড় সাহাবা ছোট ছোট পাপ হইতেও সভয়ে দূরে থাকিতেন। বরং সন্দেহের ভয়ে হালাল বস্তু হইতেও তাঁহারা বহু দূরে সরিয়া পড়িতেন।
পক্ষান্তরে এই নির্বোধগণ কিরূপে জানিল যে, শয়তানের প্রতারণায় তাহারা পড়ে নাই? আর কেমনে বুঝিল যে, পয়গম্বর ও সাহাবাগণ অপেক্ষা তাহাদের মরতবা বৃদ্ধি পাইয়াছে? এই নির্বোধগণ যদি বলে পয়গম্বরগণও এমন ছিলেন যে, পাপ তাহাদের কোন ক্ষতি করিতে পারিত না; কিন্তু মানবের শিক্ষা ও মঙ্গলের জন্য তাহারা সামান্য ত্রুটি-বিচ্যুতিতে রোদন ও তওবা করিতেন তবে তাহারাও মানব জাতির মঙ্গলের জন্য তদ্রূপ করে না কেন? অথচ তাহারা দেখিতেছে যে, যে কেহ তাহাদের কথা ও কর্মের অনুসরণ করিতেছে সে-ই ধ্বংস হইতেছে। তাহারা যদি বলে, মানবজাতি ধ্বংস হইলে ‘আমাদের কি ক্ষতি?' তবে দেখ রসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরই বা কি ক্ষতি ছিল? কোন ক্ষতিই না থাকিলে তিনি তাকওয়া ও পরহেযগারিতে এত কঠোর সাধনায় লিপ্ত ছিলেন কেন?
একদা তিনি অসাবধানতা বশত সাদকার একটি খেজুর মুখে দিলেন। কিন্তু সাদকার বলিয়া বুঝিতে পারিয়া তৎক্ষণাৎ তিনি ইহা মুখ হইতে বাহির করিয়া ফেলিয়া দিলেন। ইহা তিনি খাইয়া ফেলিলে ইহাতে মানবজাতির কি ক্ষতি হইত? বরং তিনি খাইয়া ফেলিলে সাদকার মাল সকলের জন্য হালাল হইয়া যাইত। যদি বল, ঐ খেজুর ভক্ষণে তাঁহার অনিষ্ট ছিল, তবে বল দেখি, গামলা গামলা মদে কি এই নির্বোধদের কোন ক্ষতি নাই? মোট কথা এই নির্বোধদের মরতবা রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)- এর মরতবা অপেক্ষা অধিক নহে এবং একটি সদকার খেজুর অপেক্ষা একশত গামলা মদ নিশ্চয়ই অধিক অপবিত্র এব কি এই হতভাগ্যরা নিজদিগকে মহাসমুদ্রের ন্যায় মনে করিতেছে যে, উহার মধ্যে শত শত গামলা মদ ঢালিয়া দিলেও উহা অপবিত্র হইবে না এবং রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর নিকট একটি ক্ষুদ্র পানি পাত্র বলিয়া মনে করিতেছে যাহাতে একটিমাত্র খেজুর পড়িলেই পানি অপবিত্র হইয়া যাইবে ! (নাউযুবিল্লাহ) বস্তুত শয়তান তাহাদিগকে নাকে দড়ি দিয়া ঘুরাইতেছে। আর দুনিয়ার নির্বোধ লোকেরা তাহাদিগকে লইয়া তামাশা করিতেছে। কেননা জ্ঞানিগণ তাহাদের সহিত বাক্যালাপ করিতে চাহেন না এবং তাহাদিগকে বিদ্রূপ করাও ঘৃণার কাজ বলিয়া মনে করেন। বুযর্গগণ জানেন, যে ব্যক্তি প্রবৃত্তিকে দমন ও বশীভূত করিতে অক্ষম সে মানুষ নামে যোগ্য নহে, বরং নরাকৃতি পশু।
জানিয়া রাখা উচিত যে , মানুষের রিপু নিতান্ত প্রবঞ্চক ও দাগাবাজ। ইহা অন্যায় দাবি করে, অসার বাহাদুরী দেখায় এবং নিজকে জবরদস্ত বলিয়া মনে করে। সুতরাং রিপুর নিকট হইতে সর্বদা ইহার দাবিদার সত্যতার প্রমাণ তলব করা সকলেরই কর্তব্য। রিপুগণ যখন স্বাধীনভাবে না চলিয়া শরীয়তের আজ্ঞাধীন থাকে এবং সর্বদা সন্তুষ্টচিত্তে শরীয়তের আদেশ মানিয়া চলে তখন ইহাদিগকে বিশ্বস্ত বলা যায়। কিন্তু শরীয়তের বিধান মান্য করার বেলায় ছল-চাতুরি ও টালবাহানা তালাশ করিলে সে শয়তানের গোলাম, যদিও সে নিজকে আল্লাহর ওলী বলিয়া দাবি করে। জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত নফসের নিকট সাধুতার দাবির সত্যতার প্রমাণ তলব করা উচিত। অন্যথায় গর্বিত ও দুনিয়ার প্রতি আসক্ত হইয়া মানুষ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। নফসকে সর্বোতভাবে শরীয়তের আজ্ঞাধীন করিয়া রাখা মুসলমানীর প্রথম সোপান; অথচ সকলে একথা জানে না ।
পক্ষান্তরে এই নির্বোধগণ কিরূপে জানিল যে, শয়তানের প্রতারণায় তাহারা পড়ে নাই? আর কেমনে বুঝিল যে, পয়গম্বর ও সাহাবাগণ অপেক্ষা তাহাদের মরতবা বৃদ্ধি পাইয়াছে? এই নির্বোধগণ যদি বলে পয়গম্বরগণও এমন ছিলেন যে, পাপ তাহাদের কোন ক্ষতি করিতে পারিত না; কিন্তু মানবের শিক্ষা ও মঙ্গলের জন্য তাহারা সামান্য ত্রুটি-বিচ্যুতিতে রোদন ও তওবা করিতেন তবে তাহারাও মানব জাতির মঙ্গলের জন্য তদ্রূপ করে না কেন? অথচ তাহারা দেখিতেছে যে, যে কেহ তাহাদের কথা ও কর্মের অনুসরণ করিতেছে সে-ই ধ্বংস হইতেছে। তাহারা যদি বলে, মানবজাতি ধ্বংস হইলে ‘আমাদের কি ক্ষতি?' তবে দেখ রসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরই বা কি ক্ষতি ছিল? কোন ক্ষতিই না থাকিলে তিনি তাকওয়া ও পরহেযগারিতে এত কঠোর সাধনায় লিপ্ত ছিলেন কেন?
একদা তিনি অসাবধানতা বশত সাদকার একটি খেজুর মুখে দিলেন। কিন্তু সাদকার বলিয়া বুঝিতে পারিয়া তৎক্ষণাৎ তিনি ইহা মুখ হইতে বাহির করিয়া ফেলিয়া দিলেন। ইহা তিনি খাইয়া ফেলিলে ইহাতে মানবজাতির কি ক্ষতি হইত? বরং তিনি খাইয়া ফেলিলে সাদকার মাল সকলের জন্য হালাল হইয়া যাইত। যদি বল, ঐ খেজুর ভক্ষণে তাঁহার অনিষ্ট ছিল, তবে বল দেখি, গামলা গামলা মদে কি এই নির্বোধদের কোন ক্ষতি নাই? মোট কথা এই নির্বোধদের মরতবা রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)- এর মরতবা অপেক্ষা অধিক নহে এবং একটি সদকার খেজুর অপেক্ষা একশত গামলা মদ নিশ্চয়ই অধিক অপবিত্র এব কি এই হতভাগ্যরা নিজদিগকে মহাসমুদ্রের ন্যায় মনে করিতেছে যে, উহার মধ্যে শত শত গামলা মদ ঢালিয়া দিলেও উহা অপবিত্র হইবে না এবং রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর নিকট একটি ক্ষুদ্র পানি পাত্র বলিয়া মনে করিতেছে যাহাতে একটিমাত্র খেজুর পড়িলেই পানি অপবিত্র হইয়া যাইবে ! (নাউযুবিল্লাহ) বস্তুত শয়তান তাহাদিগকে নাকে দড়ি দিয়া ঘুরাইতেছে। আর দুনিয়ার নির্বোধ লোকেরা তাহাদিগকে লইয়া তামাশা করিতেছে। কেননা জ্ঞানিগণ তাহাদের সহিত বাক্যালাপ করিতে চাহেন না এবং তাহাদিগকে বিদ্রূপ করাও ঘৃণার কাজ বলিয়া মনে করেন। বুযর্গগণ জানেন, যে ব্যক্তি প্রবৃত্তিকে দমন ও বশীভূত করিতে অক্ষম সে মানুষ নামে যোগ্য নহে, বরং নরাকৃতি পশু।
জানিয়া রাখা উচিত যে , মানুষের রিপু নিতান্ত প্রবঞ্চক ও দাগাবাজ। ইহা অন্যায় দাবি করে, অসার বাহাদুরী দেখায় এবং নিজকে জবরদস্ত বলিয়া মনে করে। সুতরাং রিপুর নিকট হইতে সর্বদা ইহার দাবিদার সত্যতার প্রমাণ তলব করা সকলেরই কর্তব্য। রিপুগণ যখন স্বাধীনভাবে না চলিয়া শরীয়তের আজ্ঞাধীন থাকে এবং সর্বদা সন্তুষ্টচিত্তে শরীয়তের আদেশ মানিয়া চলে তখন ইহাদিগকে বিশ্বস্ত বলা যায়। কিন্তু শরীয়তের বিধান মান্য করার বেলায় ছল-চাতুরি ও টালবাহানা তালাশ করিলে সে শয়তানের গোলাম, যদিও সে নিজকে আল্লাহর ওলী বলিয়া দাবি করে। জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত নফসের নিকট সাধুতার দাবির সত্যতার প্রমাণ তলব করা উচিত। অন্যথায় গর্বিত ও দুনিয়ার প্রতি আসক্ত হইয়া মানুষ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। নফসকে সর্বোতভাবে শরীয়তের আজ্ঞাধীন করিয়া রাখা মুসলমানীর প্রথম সোপান; অথচ সকলে একথা জানে না ।
(৭) সপ্তম কারণ : এ কারণটি লোকের গাফলতি ও খাহেশ হইতে উৎপন্ন হয়; অজ্ঞতা মূর্খতা ইহার কারণ নহে। প্রবৃত্তির দাস এই সকল মোহাবিষ্ট লোক হারামকে হালাল করিয়া লয় এবং উপরে তাহাদের মোহান্ধতার কারণ স্বরূপ যাহা বর্ণিত হইয়াছে তাহা তাহারা বুঝে না। যাহারা হারামকে হালাল করিয়া লয়, সমাজে গণ্ডগোলের সৃষ্টি করে। মিষ্ট ও চাটু কথা বলে এবং সূফীদের পোশাক পরিধানপূর্বক দরবেশীর দাবি করে তাহাদের দেখাদেখি এই শ্রেণীর লোকেরাও ঐরূপ কার্যে আনন্দ পায়। তাহাদের হৃদয়ে বাজে কাজ ও কামনার বস্তুর দিকে টান অধিক বলিয়াই তাহারা এই সকলের প্রতি অনুপ্রাণিত হয়। তাহরা জানে না যে, এই সকল কার্যের জন্য তাহারা পরকালে আযাব ভোগ করিবে। ইহা জানিলেও তাহাদের নিকট এই সকল কাজ তিক্ত ও দুঃসাধ্য হইয়া উঠিত। এই সমস্ত দুষ্কর্মের সমালোচকগণকে তাহারা মিথ্যা অপবাদকারী ও মনগড়া নূতন কথা বলেন বলিয়া দোষারোপ করিয়া থাকে : অথচ মিথ্যা অপবাদ ও মনগড়া নূতন কথা কাহাকে বলে তাহাও তাহারা জানে না। এই ধরনের লোক বাস্তবিক গাফিল ও প্রবৃত্তির গোলাম। তাহারা শয়তানের আজ্ঞাধীন। শত বুঝাইলেও তাহারা ঠিক হয় না। কারণ, তাহাদের অবলম্বিত পথ যে খাঁটি সত্য, ইহাতে তাহাদের বিন্দুমাত্রও সন্দেহ নাই। তাহাদের সম্বন্ধেই আল্লাহ্ তা'আলা বলেন : “তাহাদের হৃদয়সমূহের উপর পর্দা পড়িয়া গিয়াছে এবং তাহাদের কানের উপর বধিরতা চাপিয়া বসিয়াছে। এইজন্য তাহারা বুঝিতে পারিতেছে না। যদি আপনি তাহাদিগকে সত্যের দিকে আহ্বান করেন তথাপি অবশ্যই তাহারা কখনও পথ পাইবে না।”
এই সকল লোকের সহিত যবান দ্বারা যুক্তি প্রদর্শন না করিয়া তলোয়ারের যবান দ্বারা কথা বলা উচিত। শরীয়ত লঙ্ঘনকারী গাফিলদের স্বরূপ ও প্রতিকার যাহারা হারামকে হালাল সাব্যস্ত করিয়া লইয়াছে তাহাদের ভ্রম প্রদর্শন ও উপদেশ দান সম্বন্ধে এই অধ্যায়ে যাহা বর্ণিত হইল তাহাই যথেষ্ট। তাহাদের ভ্রম ও গোমরাহির কারণ এই - হয়ত তাহারা নিজকে চিনে নাই বা আল্লাহ্কে চিনে নাই কিংবা শরীয়তের জ্ঞান লাভ করে নাই। প্রকৃতির অনুকূল ব্যাপারে মানুষের অজ্ঞতা থাকিলে ইহা বিদূরিত করা বড় কঠিন। এইজন্যই লোকেরা নিঃসন্দেহে ও অনায়াসে হারামকে হালাল মানিয়া চলিয়াছে। তাহারা বলে, তাহারা হতভম্ব হইয়া রহিয়াছে। কোন্ বিষয়ে হতভম্ব হইয়া রহিয়াছে জিজ্ঞাসা করিলে তাহারা কোন উত্তর দিতে পারে না। কারণ, তাহাদের সত্যের অনুসন্ধান নাই এবং যে গোমরাহির পথে তাহারা চলিয়াছে তদ্স্প্রতি তাহাদের কোন সন্দেহও নাই। তাহাদের অবস্থা এমন পীড়িত ব্যক্তির ন্যায় যে, চিকিৎসককে বলে, আমি পীড়ায় কষ্ট পাইতেছি ; কিন্তু কি পীড়ায় কষ্ট পাইতেছি তাহা সে বলে না। অতএব রোগ না জানিয়া চিকিৎসক চিকিৎসা করিতে পারে না। তদ্রূপ লোকের অভিযোগের উত্তরে এইমাত্র বলা উচিত- তুমি যাহা চাহ তাহাতেই হতভম্ব থাক। কিন্তু এই বিষয়ে মোটেও সন্দেহ পোষণ করিও না যে, তুমি আল্লাহ্’র একজন গোলাম, তোমার সৃষ্টিকর্তা অসীম ক্ষমতাশালী, অনন্ত জ্ঞানবান; তিনি যাহা ইচ্ছা তাহাই করিতে পারেন।
উল্লিখিত দলিল প্রমাণাদি দ্বারা এই ধরনের লোকদিগকে উপদেশ দেওয়া আবশ্যক । (সমাপ্ত)
প্রথম পর্ব —
আল্লাহর অস্তিত্বের পরিচয়









