মঙ্গলবার, ২২ এপ্রিল, ২০২৫

তত্ত্বদর্শন (১৮) শরীয়ত অমান্যকারীদের ভ্রমের সাতটি কারণ



আল্লাহ-পরিচয় (তত্ত্বদর্শন) পর্ব – ১৮
📚সৌভাগ্যের পরশমণি ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)

শরীয়ত অমান্যকারীদের ভ্রমের সাতটি কারণ —
যে ব্যক্তি শরীয়তের সীমালঙ্ঘন করে, সে নিজে নিজেই ধ্বংসের মুখে অগ্রসর হয়। এইজন্যই আল্লাহ্ তা'আলা বলেন : “যে ব্যক্তি আল্লাহ্’র নির্ধারিত সীমালঙ্ঘন করে সে নিজের উপরই অত্যাচার করে।” যাহারা হারামকে হালাল জানিয়া আল্লাহর নির্ধারিত সীমালঙ্ঘন করিয়াছে তাহাদের ভ্রম ও অজ্ঞতার সাতটি কারণ আছে। 

(১) প্রথম কারণ : আল্লাহর উপর তাহাদের ঈমানই নাই। তাহারা নিজেদের খেয়াল ও কল্পনার বলে ‘আল্লাহ্ কিভাবে হইলেন’, ‘তিনি কিরূপ' অনুসন্ধান করিতে যাইয়া যখন কিছুই বুঝিতে পরিল না তখন স্বয়ং আল্লাহ্কেই অস্বীকার করিয়া বসিল এবং প্রকৃতি ও গ্রহ-নক্ষত্রাদিকে জগতের সকল কার্যের মূল কারণ বলিয়া ধরিয়া লইল। তাহারা আরও মনে করিয়া লইল যে, মানব, জীবজন্তু এবং এই বিশ্বজগত আশ্চর্য অনুভূতি, চমৎকার কৌশল ও সুশৃঙ্খলার সহিত আপনা-আপনিই উৎপন্ন হইয়াছে; অথবা অনাদিকাল হইতে আপনা-আপনিই এইরূপ চলিয়া আসিয়াছে বা এই সমস্তই প্রকৃতির কাজ। প্রকৃতিবাদিগণ যখন নিজেদের সম্বন্ধেই একেবারে অজ্ঞ তখন অন্যের সম্বন্ধে তাহারা কি জানিবে? তাহাদের উদাহরণ এইরূপ, যেমন কোন ব্যক্তি সুন্দর লেখা দেখিয়া ভাবিল, ইহা নিজে নিজেই হইয়াছে, লেখকের জ্ঞান ক্ষমতা ও ইচ্ছার সহিত ইহার কোন সম্পর্ক নাই অথবা ইহা এইরূপ লিখিত অবস্থাতেই অনাদিকাল হইতে আছে। যাহারা এতটুকু অন্ধ হইয়া গিয়াছে তাহারা দুর্ভাগ্যের পথ হইতে কখনও ফিরিয়া আসিবে না জ্যোতির্বিদ ও প্রকৃতিবাদীদের ভ্রম পূর্বেই বর্ণিত হইয়াছে।

(২) দ্বিতীয় কারণ : শরীয়ত অমান্যকারিগণ আখিরাতের উপর ঈমান রাখে না। কারণ, তাহারা মনে করে মানুষ ও তৃণলতা, বৃক্ষ এবং অন্য ইতর প্রাণীর ন্যায় মৃত্যুর পর ধ্বংস হইয়া যাইবে। মন্দ কৃতকর্মের জন্য তাহাকে পরকালে তিরস্কার করা হইবে না, কোন প্রকার হিসাব নিকাশ তাহার দিতে হইবে না এবং তথায় কোনরূপ দণ্ড বা পুরস্কার নাই। এইরূপ ব্যক্তিরা নিজদিগকে চিনে নাই। কেননা, তাহারা তাহাদিগকে গরু, গাধা, লতাপাতার ন্যায় মনে করে। মানবাত্মা যে দেহের মূল, অমর ও চিরস্থায়ী ইহা তাহারা জানে না। কেবল দেহরূপ কাঠামো হইতে আত্মাকে বিচ্ছিন্ন করা হইবে। ইহাকেই মৃত্যু বলে। মৃত্যুর হাকীকত চতুর্থ অধ্যায়ে বর্ণিত হইবে।

(৩) তৃতীয় কারণ  : আল্লাহ্ ও আখিরাতের উপর তাহাদের ঈমান আছে বটে, কিন্তু তাহাদের ঈমান নিতান্ত দুর্বল। শরীয়তের অর্থ না বুঝিয়া তাহারা বলে - 'আমাদের ইবাদতে আল্লাহ্’র কি প্রয়োজন? আমাদের পাপেই বা তাহার অসন্তুষ্ট হওয়ার কারণ কি? তিনি তো বিশ্বজগতের বাদশাহ এবং তিনি আমাদের ইবাদতের মুখাপেক্ষী নহেন। তাহার নিকট পাপ-পুণ্য সবই সমান।' এই মূর্খেরা কি কুরআন শরীফে আল্লাহর আদেশ শ্রবণ করে নাই? আল্লাহ্ তা'আলা বলেন : “যে ব্যক্তি আত্মশুদ্ধি লাভ করিয়াছে সে একমাত্র নিজের মঙ্গলের জন্যই আত্মশুদ্ধি লাভ করিয়াছে।” তিনি আরও বরেন  :  “যে ব্যক্তি পুণ্যলাভে কঠোর সাধনা করে সে নিজের জন্যেই তদ্রূপ সাধনা করিয়া থাকে।”  তিনি বলেন : - “যে ব্যক্তি নেক কাজ করিয়াছে সে নিজের জন্যই করিয়াছে।” 
এই সকল উক্তি হইতে বুঝা যাইতেছে যে, বান্দা যে নেক আমল করে উহার উপকারিতা তাহার নিজেরই, উহাতে আল্লাহর কোন লাভ নাই? এই হতভাগ্য জাহিলগণ শরীয়তের অর্থ বুঝে না এবং মনে করে, শরীয়তের আদেশ নিষেধ মানিয়া চলা কেবল আল্লাহর জন্য, তাহাদের নিজের জন্য নহে।
তাহাদের দৃষ্টান্ত ঠিক এইরূপ যেমন, কোন রোগী নিজকে কুপথ্য হইতে রক্ষা করে না এবং বলে আমি চিকিৎসকের উপদেশ মান্য করি বা না করি ইহাতে তাহার কি? তাহার কথা সত্য বটে; কারণ ইহাতে চিকিৎসকের কোন লাভ-লোকসান নাই। তবু কুপথ্য বর্জন না করিলে রোগী নিজেই বিনষ্ট হইবে। চিকিৎসকের প্রয়োজনের জন্য রোগী বিনষ্ট হইবে না, বরং কুপথ্য বর্জন না করার দরুন বিনষ্ট হইবে। সুস্থ হওয়ার জন্য চিকিৎসক তাহাকে কুপথ্য বর্জনের উপদেশ দিয়াছিলেন। রোগী তাহা মানে নাই; ইহাতে উপদেশদাতার কি ক্ষতি? বরং রোগী নিজেই বিনাশপ্রাপ্ত হইবে। শারীরিক রোগ যেমন এ জগতে ধ্বংসের কারণ আত্মার রোগও তদ্রূপ পরকালে দুর্ভোগের কারণ। ঔষধ সেবন ও কুপথ্য বর্জনে যেমন শারীরিক পীড়া দূর হয়, তদ্রূপ ইবাদত, মারিফাত ও পাপ বর্জনে আত্মার স্বাস্থ্য লাভ হয় । এইজন্যই আল্লাহ্ তা'আলা বলেন : “যাহারা আল্লাহ্’র নিকট নিষ্পাপ ও নিরোগ আত্মা লইয়া যাইতে পারিবে তাহারা ব্যতীত অপর কেহই মুক্তি পাইবে না। 

(৪) চতুর্থ কারণ : শরীয়ত বিষয়ে অজ্ঞতার দরুন তাহারা বলে, কুপ্রবৃত্তি, ক্রোধ ও রিয়া হইতে হৃদয়কে পাকপবিত্র করিবার জন্য শরীয়ত আদেশ দিয়াছে, অথচ উহা নিতান্তই অসম্ভব। কারণ, মানুষকে আল্লাহ্ এই সকল প্রবৃত্তি দিয়াই সৃষ্টি করিয়াছেন। তাহারা আরও বলে, কৃষ্ণ বর্ণকে শুভ্র বর্ণে পরিণত করা যেমন অসম্ভব, শরীয়তের এই আদেশ পালন ও তদ্রূপ অসম্ভব। কিন্তু এই নির্বোধগণ জানে না যে, লোভ, ক্রোধ ইত্যাদি রিপুকে সমূলে বিনষ্ট করিবার আদেশ শরীয়তে নাই; বরং এই সকল রিপুকে সায়েস্তা করত শরীয়ত ও বুদ্ধির অধীন করিয়া রাখিবার আদেশ রহিয়াছে যাহাতে ইহারা অবাধ্য হইতে না পারে এবং শরীয়তের সীমালঙ্ঘন না করে। রিপুগুলিকে এইরূপে দমন করিয়া কবিরা গুনাহ্ হইতে বাঁচিয়া থাকিতে পারিলে করুণাময় আল্লাহ্ সগিরা গুনাহ্সমূহ ক্ষমা করিয়া দিবেন। ক্রোধ-লোভাদি রিপুকে বশীভূত করিয়া রাখা মানব-ক্ষমতা বহির্ভূত নহে। বহু লোকে ইহা করিয়া দেখাইয়া গিয়াছেন। রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিয়াছেন যে,- কাম, ক্রোধ, রিপু থাকা উচিত নহে। অথচ তাহার নয়জন স্ত্রী ছিলেন এবং তিনি বলিয়াছেন- “আমি তোমাদের ন্যায় মানুষ; মানুষের ন্যায় আমার হৃদয়েও ক্রোধের উদ্রেক হয়।” যাঁহারা ক্রোধ দমন করিয়াছেন তাহাদের প্রশংসা করিয়া আল্লাহ্ বলেন : “যাহারা ক্রোধ দমনকারী ও লোকের প্রতি ক্ষমাপ্রদর্শনকারী, আল্লাহ্ তাহাদিগকে ভালবাসেন।” কিন্তু যাহাদের হৃদয়ে ক্রোধের উদ্রেকই হয় না, আল্লাহ্ তাহাদের প্রশংসা করেন নাই।

(৫) পঞ্চম কারণ : তাহারা আল্লাহ্’র গুণাবলীর মর্ম উপলব্ধি করিতে না পারিয়া বলে, “আল্লাহ্ দয়াময় ও ক্ষমাশীল আমরা যাহাই করি না কেন সর্বাবস্থায়ই তিনি আমাদের উপর দয়া করিবেন।” তিনি দয়াময় হইলেও যে আবার কঠিন শাস্তিদাতাও এ কথা তাহারা ভাবেন না। তাহারা দেখে না যে আল্লাহ্ দয়াময় ও ক্ষমাশীল হওয়া সত্ত্বেও এ জগতে বহু লোককে বিপদাপদ, রোগ-শোক এবং ক্ষুধা-তৃষ্ণায় নিপতিত রাখিতেছেন। কৃষি ও বাণিজ্য না করিলে ধন পাওয়া যায় না, পরিশ্রম ব্যতীত বিদ্যালাভ হয় না - ইহা বুঝিয়া তাহারা দুনিয়ার কাজে পরিশ্রম করিতে কিছুমাত্র ত্রুটি করে না। আল্লাহ্ তা'আলা পরম করুণাময়; কৃষিকার্য ও বাণিজ্য ব্যতীতই তিনি রিযিক দান করিবেন- এ কথা ভাবিয়া কেহই সাংসারিক কার্য হইতে হস্ত সঙ্কুচিত করিয়া নিষ্কর্মা হইয়া থাকে না; অথচ আল্লাহ্ স্বয়ং সকল প্রাণীর রিযিকের যিম্মাদার, যেমন তিনি বলেন : “পৃথিবীতে এমন কোন প্রাণী নাই যাহার রিযিকের যিম্মাদার আল্লাহ্ নহেন।” এবং পরকালে উন্নতি ও সৌভাগ্য তিনি প্রত্যেকের আমলের উপর ন্যস্ত রাখিয়াছেন। যেমন তিনি 
বলেন- “মানুষ শুধু তাহার চেষ্টায় সফলতা লাভ করিয়া থাকে।” প্রকৃত প্রস্তাবে এই শ্রেণীর লোকেরা আল্লাহ্‌কে করুণাময় বলিয়া বিশ্বাস করে না। কারণ, তাহারা আল্লাহর করুণার উপর নির্ভর করিয়া জীবিকা অর্জনে হস্ত সঙ্কুচিত করত নিষ্কর্মা বসিয়া থাকে না, কেবল পরকালের কার্যে শৈথিল্য করিয়া থাকে। সুতরাং পরকালের কার্যের বেলায় তাহারা যাহা কিছু বলে তাহা কেবল মৌখিক উক্তি এবং শয়তানের প্ররোচনা ব্যতীত আর কিছুই নহে। উহা সম্পূর্ণ অমূলক। 

(৬) ষষ্ঠ কারণ : এই সকল লোক গর্বিত হইয়া বলে : “আমরা এমন অবস্থায় উপনীত হইয়াছি যে, পাপ আমাদের কোন ক্ষতি করিতে পারে না। আমাদের অবস্থা দুই কুল্লা পানির মত; গুনাহের অপবিত্রতা আমাদিগকে অপবিত্র করিতেই পারে না।” ( যে পাত্রে বিশ মণ পানি ধরে তাহাকে কুল্লা বলে। শাফেয়ী আলিমগণের মতে দুই কুল্লা পরিমাণ পানিতে সামান্য নাপাক মিশ্রিত হইলে পানি নাপাক হয় না ।) এই নির্বোধের অনেকে এত সংকীর্ণ মনা যে, তাহাদের সহিত কেহ কোন বেয়াদবির কথা বলিলে এবং তাহাদের অভিমানে আঘাত হানিলে ও রিয়া প্রকাশ করিয়া দিলে তাঁহারা চিরতরে তাহার শত্রু হইয়া পড়ে; লালসার বস্তুর এক গ্রাস কম হইলে তাহারা দুনিয়া আঁধার দেখে। মানবতাগুণে যাহাদের স্বভাব এত সংকীর্ণ ও অনুদার, দুই কুল্লা পানির ন্যায় কোন পাপই তাহাদের ক্ষতি করিতে পারে না - এরূপ মিথ্যা দাবি করা তাহাদের পক্ষে কি প্রকারে শোভা পায় ? বস্তুত পাপ হইতে নির্ভয় হওয়ার ন্যায় উচ্চ মর্যাদায় এই নির্বোধগণ উপনীত হয় নাই। আর যদি ধরিয়াও লওয়া যায় যে,- শত্রুতা, ক্রোধ, লালসা, রিয়া হইতে ব্যক্তি বিশেষ একেবারে পাকপবিত্র তথাপি তাহার পক্ষেও অদ্রূপ দাবি করা অহংকারমাত্র। কারণ তাহার মরতবা কখনও পয়গম্বরগণের মরতবা হইতে বৃদ্ধি পাইবে না অথচ পয়গম্বরগণ সামান্য অসাবধানতা ও পদস্খলনের জন্য রোদন করিতেন এবং তওবা করিতেন। বড় বড় সাহাবা ছোট ছোট পাপ হইতেও সভয়ে দূরে থাকিতেন। বরং সন্দেহের ভয়ে হালাল বস্তু হইতেও তাঁহারা বহু দূরে সরিয়া পড়িতেন। 
পক্ষান্তরে এই নির্বোধগণ কিরূপে জানিল যে, শয়তানের প্রতারণায় তাহারা পড়ে নাই? আর কেমনে বুঝিল যে, পয়গম্বর ও সাহাবাগণ অপেক্ষা তাহাদের মরতবা বৃদ্ধি পাইয়াছে? এই নির্বোধগণ যদি বলে পয়গম্বরগণও এমন ছিলেন যে, পাপ তাহাদের কোন ক্ষতি করিতে পারিত না; কিন্তু মানবের শিক্ষা ও মঙ্গলের জন্য তাহারা সামান্য ত্রুটি-বিচ্যুতিতে রোদন ও তওবা করিতেন তবে তাহারাও মানব জাতির মঙ্গলের জন্য তদ্রূপ করে না কেন? অথচ তাহারা দেখিতেছে যে, যে কেহ তাহাদের কথা ও কর্মের অনুসরণ করিতেছে সে-ই ধ্বংস হইতেছে। তাহারা যদি বলে, মানবজাতি ধ্বংস হইলে ‘আমাদের কি ক্ষতি?' তবে দেখ রসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরই বা কি ক্ষতি ছিল? কোন ক্ষতিই না থাকিলে তিনি তাকওয়া ও পরহেযগারিতে এত কঠোর সাধনায় লিপ্ত ছিলেন কেন? 
একদা তিনি অসাবধানতা বশত সাদকার একটি খেজুর মুখে দিলেন। কিন্তু সাদকার বলিয়া বুঝিতে পারিয়া তৎক্ষণাৎ তিনি ইহা মুখ হইতে বাহির করিয়া ফেলিয়া দিলেন। ইহা তিনি খাইয়া ফেলিলে ইহাতে মানবজাতির কি ক্ষতি হইত? বরং তিনি খাইয়া ফেলিলে সাদকার মাল সকলের জন্য হালাল হইয়া যাইত। যদি বল, ঐ খেজুর ভক্ষণে তাঁহার অনিষ্ট ছিল, তবে বল দেখি, গামলা গামলা মদে কি এই নির্বোধদের কোন ক্ষতি নাই? মোট কথা এই নির্বোধদের মরতবা রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)- এর মরতবা অপেক্ষা অধিক নহে এবং একটি সদকার খেজুর অপেক্ষা একশত গামলা মদ নিশ্চয়ই অধিক অপবিত্র এব কি এই হতভাগ্যরা নিজদিগকে মহাসমুদ্রের ন্যায় মনে করিতেছে যে, উহার মধ্যে শত শত গামলা মদ ঢালিয়া দিলেও উহা অপবিত্র হইবে না এবং রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর নিকট একটি ক্ষুদ্র পানি পাত্র বলিয়া মনে করিতেছে যাহাতে একটিমাত্র খেজুর পড়িলেই পানি অপবিত্র হইয়া যাইবে ! (নাউযুবিল্লাহ) বস্তুত শয়তান তাহাদিগকে নাকে দড়ি দিয়া ঘুরাইতেছে। আর দুনিয়ার নির্বোধ লোকেরা তাহাদিগকে লইয়া তামাশা করিতেছে। কেননা জ্ঞানিগণ তাহাদের সহিত বাক্যালাপ করিতে চাহেন না এবং তাহাদিগকে বিদ্রূপ করাও ঘৃণার কাজ বলিয়া মনে করেন। বুযর্গগণ জানেন, যে ব্যক্তি প্রবৃত্তিকে দমন ও বশীভূত করিতে অক্ষম সে মানুষ নামে যোগ্য নহে, বরং নরাকৃতি পশু।
জানিয়া রাখা উচিত যে , মানুষের রিপু নিতান্ত প্রবঞ্চক ও দাগাবাজ। ইহা অন্যায় দাবি করে, অসার বাহাদুরী দেখায় এবং নিজকে জবরদস্ত বলিয়া মনে করে। সুতরাং রিপুর নিকট হইতে সর্বদা ইহার দাবিদার সত্যতার প্রমাণ তলব করা সকলেরই কর্তব্য। রিপুগণ যখন স্বাধীনভাবে না চলিয়া শরীয়তের আজ্ঞাধীন থাকে এবং সর্বদা সন্তুষ্টচিত্তে শরীয়তের আদেশ মানিয়া চলে তখন ইহাদিগকে বিশ্বস্ত বলা যায়। কিন্তু শরীয়তের বিধান মান্য করার বেলায় ছল-চাতুরি ও টালবাহানা তালাশ করিলে সে শয়তানের গোলাম, যদিও সে নিজকে আল্লাহর ওলী বলিয়া দাবি করে। জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত নফসের নিকট সাধুতার দাবির সত্যতার প্রমাণ তলব করা উচিত। অন্যথায় গর্বিত ও দুনিয়ার প্রতি আসক্ত হইয়া মানুষ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। নফসকে সর্বোতভাবে শরীয়তের আজ্ঞাধীন করিয়া রাখা মুসলমানীর প্রথম সোপান; অথচ সকলে একথা জানে না । 

(৭) সপ্তম কারণ :  এ কারণটি লোকের গাফলতি ও খাহেশ হইতে উৎপন্ন হয়; অজ্ঞতা মূর্খতা ইহার কারণ নহে। প্রবৃত্তির দাস এই সকল মোহাবিষ্ট লোক হারামকে হালাল করিয়া লয় এবং উপরে তাহাদের মোহান্ধতার কারণ স্বরূপ যাহা বর্ণিত হইয়াছে তাহা তাহারা বুঝে না। যাহারা হারামকে হালাল করিয়া লয়, সমাজে গণ্ডগোলের সৃষ্টি করে। মিষ্ট ও চাটু কথা বলে এবং সূফীদের পোশাক পরিধানপূর্বক দরবেশীর দাবি করে তাহাদের দেখাদেখি এই শ্রেণীর লোকেরাও ঐরূপ কার্যে আনন্দ পায়। তাহাদের হৃদয়ে বাজে কাজ ও কামনার বস্তুর দিকে টান অধিক বলিয়াই তাহারা এই সকলের প্রতি অনুপ্রাণিত হয়। তাহরা জানে না যে, এই সকল কার্যের জন্য তাহারা পরকালে আযাব ভোগ করিবে। ইহা জানিলেও তাহাদের নিকট এই সকল কাজ তিক্ত ও দুঃসাধ্য হইয়া উঠিত। এই সমস্ত দুষ্কর্মের সমালোচকগণকে তাহারা মিথ্যা অপবাদকারী ও মনগড়া নূতন কথা বলেন বলিয়া দোষারোপ করিয়া থাকে :  অথচ মিথ্যা অপবাদ ও মনগড়া নূতন কথা কাহাকে বলে তাহাও তাহারা জানে না। এই ধরনের লোক বাস্তবিক গাফিল ও প্রবৃত্তির গোলাম। তাহারা শয়তানের আজ্ঞাধীন। শত বুঝাইলেও তাহারা ঠিক হয় না। কারণ, তাহাদের অবলম্বিত পথ যে খাঁটি সত্য, ইহাতে তাহাদের বিন্দুমাত্রও সন্দেহ নাই। তাহাদের সম্বন্ধেই আল্লাহ্ তা'আলা বলেন : “তাহাদের হৃদয়সমূহের উপর পর্দা পড়িয়া গিয়াছে এবং তাহাদের কানের উপর বধিরতা চাপিয়া বসিয়াছে। এইজন্য তাহারা বুঝিতে পারিতেছে না। যদি আপনি তাহাদিগকে সত্যের দিকে আহ্বান করেন তথাপি অবশ্যই তাহারা কখনও পথ পাইবে না।”
এই সকল লোকের সহিত যবান দ্বারা যুক্তি প্রদর্শন না করিয়া তলোয়ারের যবান দ্বারা কথা বলা উচিত। শরীয়ত লঙ্ঘনকারী গাফিলদের স্বরূপ ও প্রতিকার যাহারা হারামকে হালাল সাব্যস্ত করিয়া লইয়াছে তাহাদের ভ্রম প্রদর্শন ও উপদেশ দান সম্বন্ধে এই অধ্যায়ে যাহা বর্ণিত হইল তাহাই যথেষ্ট। তাহাদের ভ্রম ও গোমরাহির কারণ এই - হয়ত তাহারা নিজকে চিনে নাই বা আল্লাহ্‌কে চিনে নাই কিংবা শরীয়তের জ্ঞান লাভ করে নাই। প্রকৃতির অনুকূল ব্যাপারে মানুষের অজ্ঞতা থাকিলে ইহা বিদূরিত করা বড় কঠিন। এইজন্যই লোকেরা নিঃসন্দেহে ও অনায়াসে হারামকে হালাল মানিয়া চলিয়াছে। তাহারা বলে, তাহারা হতভম্ব হইয়া রহিয়াছে। কোন্ বিষয়ে হতভম্ব হইয়া রহিয়াছে জিজ্ঞাসা করিলে তাহারা কোন উত্তর দিতে পারে না। কারণ, তাহাদের সত্যের অনুসন্ধান নাই এবং যে গোমরাহির পথে তাহারা চলিয়াছে তদ্‌স্প্রতি তাহাদের কোন সন্দেহও নাই। তাহাদের অবস্থা এমন পীড়িত ব্যক্তির ন্যায় যে, চিকিৎসককে বলে, আমি পীড়ায় কষ্ট পাইতেছি ; কিন্তু কি পীড়ায় কষ্ট পাইতেছি তাহা সে বলে না। অতএব রোগ না জানিয়া চিকিৎসক চিকিৎসা করিতে পারে না। তদ্রূপ লোকের অভিযোগের উত্তরে এইমাত্র বলা উচিত- তুমি যাহা চাহ তাহাতেই হতভম্ব থাক। কিন্তু এই বিষয়ে মোটেও সন্দেহ পোষণ করিও না যে, তুমি আল্লাহ্’র একজন গোলাম, তোমার সৃষ্টিকর্তা অসীম ক্ষমতাশালী, অনন্ত জ্ঞানবান; তিনি যাহা ইচ্ছা তাহাই করিতে পারেন। 
উল্লিখিত দলিল প্রমাণাদি দ্বারা এই ধরনের লোকদিগকে উপদেশ দেওয়া আবশ্যক । (সমাপ্ত)

প্রথম পর্ব —
আল্লাহর অস্তিত্বের পরিচয় 

তত্ত্বদর্শন (১৭) ইবাদত মানব সৌভাগ্যের অন্যতম উপাদান



আল্লাহ-পরিচয় (তত্ত্বদর্শন) পর্ব – ১৭
📚সৌভাগ্যের পরশমণি ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)

ইবাদত মানব সৌভাগ্যের অন্যতম উপাদান 
আল্লাহ্’র মারিফাতের বিবরণ এত বিস্তৃত যে, এ ক্ষুদ্র গ্রন্থে ইহার সম্যক বর্ণনা সম্ভব নহে। লোকে কিছুটা অবগত হইয়া আল্লাহর যথাসাধ্য পূর্ণ পরিচয় লাভের আগ্রহ-উদ্দীপনা তাহার মনে জন্মাইয়া দেওয়ার জন্য যাহা বলা হইল তাহাই যথেষ্ট। কারণ, আল্লাহর মা'রিফাতই মানব সৌভাগ্যের মূল। বরং সৌভাগ্যের উপায় হইল আল্লাহর মা'রিফাত ও ইবাদত-বন্দেগী। ইবাদত সৌভাগ্যের উপায় হওয়ার কারণ এই যে, মৃত্যুর পর একমাত্র আল্লাহ্’র সহিতই তাহার সম্বন্ধ থাকিবে। অর্থাৎ “সকলেই একমাত্র আল্লাহর দিকেই প্রত্যাগমন ও পুনরাগমন করে।” আর যাঁর সহিত অবস্থান করিতে হইবে তাহার সহিত পূর্ব হইতেই বন্ধুত্ব স্থাপন করিয়া লওয়াতেই সৌভাগ্য নিহিত আছে। বন্ধুত্ব যে পরিমাণে বৃদ্ধি পাইবে সৌভাগ্যও সে পরিমাণে বৃদ্ধি পাইবে। কারণ, প্রিয়জনের দর্শনে আনন্দ ও আরাম মিলে এবং মারিফাতের ও যিকিরের ফলেই মানব হৃদয়ে আল্লাহ্’র মহব্বত বৃদ্ধি পায়। যাহাকে ভালবাসা যায় তাহার কথাই অধিক মনে পড়ে। আবার যাহাকে অধিকাংশ সময় স্মরণ করা হয় সে স্বভাবতই প্রিয় হইয়া উঠে। এইজন্যই আল্লাহ্ হযরত দাউদ আলায়হিস সালামের উপর ওহী নাযিল করিয়াছেন : “একমাত্র আমি তোমার আশ্রয়স্থল এবং কেবল আমার সহিত তোমার সম্বন্ধ, অতএব আমার যিকির হইতে এক মুহূর্তও গাফিল থাকিও না।” মানুষ আল্লাহ্’র ইবাদতে সর্বদা লিপ্ত থাকিলে তাহার মনে আল্লাহর স্মরণ প্রবল হয় এবং প্রবৃত্তির সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়। সুতরাং সকল পাপ হইতে বিরত হওয়াই একাগ্রচিত্তে ইবাদতে রত হওয়ার মূল কারণ। আবার ইবাদত মনে যিকির প্রবল হওয়ার কারণে হইয়া থাকে। যিকির ও ইবাদত আবার মহব্বতের মূল কারণ এবং আল্লাহর মহব্বত সৌভাগ্যের বীজ। আর সৌভাগ্যের অর্থ হইল নাজাত লাভ করা; যেমন আল্লাহ্ বলেন  : “অবশ্যই মু'মিনগণ নাজাত পাইয়াছে।” তিনি আরও বলেন  : - “যে ব্যক্তি আত্ম-শুদ্ধি লাভ করিয়াছে, আপন প্রভুর নাম স্মরণ করিয়াছে এবং নামায কায়েম করিয়াছে সে নিশ্চয়ই নাজাত পাইয়াছে।”
সকল কাজ ইবাদত হইতে পারে না; কোন কোন কাজ ইবাদত, কোন কোন কাজ ইবাদত নহে এবং সর্ববিধ প্রবৃত্তি হইতে বিরত থাকা সম্ভবও নহে, আর সঙ্গতও নহে। কারণ, আহার না করিলে মানুষ মরিয়া যায় এবং স্ত্রী সহবাস না করিলে বংশ রক্ষা পায় না। কতক প্রবৃত্তি একেবারে পরিত্যাজ্য এবং কতকগুলি গ্রহণীয়। সুতরাং গ্রহণীয়গুলি হইতে পরিত্যাজ্যগুলিকে পার্থক্য করিবার জন্য একটি মাপকাঠি ও সীমারেখা থাকা আবশ্যক। এই সীমারেখা নির্ধারণের দ্বিবিধ উপায় আছে। মানুষ হয়ত নিজে বিচার-বুদ্ধি ও ইচ্ছা অনুসারে তাহা নির্ধারণ করিয়া লইবে অথবা অন্যের দ্বারা উহা করাইয়া লইবে। সাধারণত মানুষকে নিজ স্বাধীন ক্ষমতার উপর ছাড়িয়া দেওয়া যায় না। কারণ, যাহার হৃদয়ে প্রবৃত্তি প্রবল হইয়া উঠে সে কখনও সত্যের পথ পায় না এবং যাহা দ্বারা মানুষের অভিলাষ পূর্ণ হয় তাহা তাহার নিকট উত্তম বলিয়া মনে হয়। এইজন্যই কর্তব্যাকর্তব্য নির্ধারণে মানুষকে স্বাধীনতা দেওয়া উচিত নহে। বরং এ বিষয়ে অন্যের অধীনে চলা উচিত। কিন্তু সকলেই পরিচালকের উপযুক্ত হইতে পারে না। কেবল দূরদর্শী ও প্রবল বিচার শক্তিসম্পন্ন ব্যক্তিগণই পরিচালক হওয়ার উপযুক্ত। নবীগণই এই প্রকার দূরদর্শী ও সূক্ষ্ম বিচারক। তাঁহারা কর্তব্যাকর্তব্যের যে সীমা নির্ধারণ করিয়া দিয়াছেন তাহাকেই শরীয়ত বলেন সুতরাং শরীয়তের অনুশাসন মানিয়া চলাই সৌভাগ্য অর্জনের উপায় এবং ইহার নামই ইবাদত।




পরবর্তী পর্ব —
শরীয়ত অমান্যকারীদের ভ্রমের সাতটি কারণ 

তত্ত্বদর্শন (১৬) আল্লাহ্ সম্বন্ধে মানুষের ধারণা অসম্পূর্ণ



আল্লাহ-পরিচয় (তত্ত্বদর্শন) পর্ব – ১৬
📚সৌভাগ্যের পরশমণি ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)

আল্লাহ্ সম্বন্ধে মানুষের ধারণা অসম্পূর্ণ —
আল্লাহর পবিত্রতা কি মানুষের পবিত্রতার অনুরূপ? এরূপ ধারণা হইতে আল্লাহ্ আমাদিগকে বাঁচাইয়া রাখুন। তাঁহার তুলনায় মানুষ তো কিছুই নহে। সমস্ত সৃষ্টির সহিত তুলনা হইতে তিনি পবিত্র। মানুষের যে বাদশাহী তাহার নিজ শরীরের উপর চলে আল্লাহ্’র বাদশাহী কি মানুষের এই বাদশাহীর তুল্য? আল্লাহর জ্ঞান ও শক্তি কি মানুষের জ্ঞান ও শক্তির অনুরূপ? নাউযুবিল্লাহ; কখনও নহে, কখনও এরূপ চিন্তা মনে স্থান দিও না। কিন্তু আল্লাহর ঐ সকল গুণের নামেমাত্র সামঞ্জস্য মানবের মধ্যে এইজন্য রাখিয়াছেন যেন সে নিতান্ত দুর্বল ও অসহায় হওয়া সত্ত্বেও পরম করুণাময় আল্লাহ্’র অনুপম সৌন্দর্য ও গুণাবলী কিঞ্চিৎ উপলব্ধি করিতে পারে। ইহা বুঝাইবার জন্য একটি উপমা দেওয়া হইতেছে। কোন বালক আমাকে জিজ্ঞাসা করিল - প্রভুত্ব ও বাদশাহীতে কিরূপ আনন্দ পাওয়া যায়? আমি উত্তরে বলিব ডাণ্ডাগুলী খেলায় যেমন আনন্দ পাওয়া যায় প্রভুত্ব এবং বাদশাহীতেও তদ্রূপ আনন্দ মিলে। এরূপ উত্তর দেওয়ার কারণ এই যে, ঐ বালক ডান্ডাগুলি 
আনন্দ ব্যতীত কোন আনন্দ জানেই না এবং যে আনন্দ সে লাভ করে নাই তাহা কখনও সে বুঝিতে পারিবে না। তবে বালকের হৃদয়ে কোন প্রকার আনন্দের লেশমাত্রও না থাকিলে তাহাকে উহা বুঝান কঠিন হইত। সকলেই জানে যে, বাদশাহীর আনন্দের সহিত ডাণ্ডাগুলীর আনন্দের তুলনা হইতে পারে না। তথাপি উভয়ের নামই আনন্দ। তাই নামের মিলে উভয়ের মধ্যে কিছুটা সাদৃশ্য দেখা গেল। আল্লাহ্’র মারিফাতের ময়দানে যাহারা নাবালক তাহাদিগকে এইরূপ সাদৃশ্য দ্বারাই মা'রিফাতের আনন্দ বুঝাইতে হয়। আল্লাহ্’র মারিফাত সম্বন্ধে যাহা বলা হইল এবং দৃষ্টান্ত দেওয়া গেল তৎসমুদয়ই ঐ প্রকার বালককে ডাণ্ডাগুলীর আনন্দ দ্বারা বাদশাহীর ঐ আনন্দ বুঝানোর ন্যায়। ফলকথা, আল্লাহ্ ব্যতীত তাহার পূর্ণ হাকীকত কেহই বুঝিতে পারে না । 

পরবর্তী পর্ব —
ইবাদত মানব সৌভাগ্যের অন্যতম উপাদান

তত্ত্বদর্শন (১৫) আল্লাহর মা'রিফাতের সমষ্টিরূপে চারিটি বাক্যের ব্যাখ্যা



আল্লাহ-পরিচয় (তত্ত্বদর্শন) পর্ব – ১৫
📚সৌভাগ্যের পরশমণি ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)

আল্লাহর মা'রিফাতের সমষ্টিরূপে চারিটি বাক্যের ব্যাখ্যা 
(১) ‘আল্লাহ্ পবিত্র’, (ছোবহানাল্লাহ্)
(২) ‘সমস্ত প্রশংসাই আল্লাহ্’র', (আলহামদুলিল্লাহ)
(৩) 'আল্লাহ্ ব্যতীত কেহই উপাস্য নাই' (লা ইলাহ্ ইল্লাল্লাহ্) এবং 
(৪) 'আল্লাহ্ সর্বশ্রেষ্ঠ’ (আল্লাহুআকবার)। 
এই বাক্যগুলির তাৎপর্য এখন তোমার বুঝিয়া লওয়া দরকার। এই চারিটি বাক্য নিতান্ত ক্ষুদ্র হইলেও আল্লাহ্’র মা'রিফাতের সমষ্টি। নিজের পবিত্রতা দৃষ্টে যখন আল্লাহ্’র পবিত্রতা তুমি বুঝিলে তখন ‘আল্লাহ্ পবিত্র' এই কলেমার তাৎপর্য বুঝিতে পারিলে। নিজের বাদশাহী চিনিয়া যখন আল্লাহ্’র বাদশাহী সংক্ষেপে চিনিতে পারিলে- যেমন কলম লেখকের হাতের অধীন তদ্রূপ সমস্ত উপাদান ও মধ্যবর্তী কারণ একই আল্লাহর আজ্ঞাধীন তখন ‘সমস্ত প্রশংসাই আল্লাহর' এই বাক্যের মর্ম উপলব্ধি করিলে। আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য কেহ যখন নিয়ামতদাতা নাই তখন প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা একমাত্র আল্লাহ্’র জন্যই শোভন, তিনি ছাড়া অপর কেহই প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা পাইতে পারে না। যখন বুঝিতে পারিলে যে, তিনি ব্যতীত অপর কাহারও আজ্ঞা করিবার স্বাধীন ক্ষমতা নাই তখন ‘আল্লাহ্ ব্যতীত কেহই উপাস্য না' এই বাক্যের তাৎপর্য বুঝিলে। 
'আল্লাহ্ সর্বশ্রেষ্ট' এই বাক্যের মর্ম এখন বুঝিয়া লও। জানিয়া রাখ, তুমি যত বড় জ্ঞানীই হও না কেন, মহান আল্লাহর হাকীকত তুমি কখনও বুঝিতে পারিবে না। কারণ, তিনি এত মহান ও শ্রেষ্ঠ যে, মানব কল্পনায় ইহা অনুধাবন করিতে পারেন না। সুতরাং তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ। নতুবা তাহার শ্রেষ্ঠত্বের কোন তুলনা নাই যদ্দ্বারা তুমি তাহার শ্রেষ্ঠত্বের পরিমাণ নির্ধারণ করিয়া লইতে পারিবে। বরং আল্লাহ্ ব্যতীত বিশ্বজগতে অপর কোন বস্তুর অস্তিত্বই নাই যাহার তুলনায় তাহাকে সর্বশ্রেষ্ঠ বলা যাইবে। বিশ্ব-সংসারে যাহা কিছু দেখা যায় সমস্তই আল্লাহর অস্তিত্বের নূর। সূর্যের আলো সূর্য হইতে পৃথক কোন বস্তু নহে। অতএব, আলো অপেক্ষা সূর্য শ্রেষ্ঠ, এরূপ বলা চলে না। তদ্রূপ জগতে যাহা কিছু আছে সবই আল্লাহর নূর। সুতরাং তাঁহাকে কোন কিছুর সহিতই তুলনা করা যাইতে পারে না। আল্লাহ্ সর্বশ্রেষ্ঠ হওয়া অর্থ এই যে, বুদ্ধি বা কল্পনা দ্বারা কেহই তাঁহাকে ধারণা করিতে পারে না। তিনি বুদ্ধি ও কল্পনার অতীত। 





পরবর্তী পর্ব —
আল্লাহ্ সম্বন্ধে মানুষের ধারণা অসম্পূর্ণ 

তত্ত্বদর্শন (১৪) রোগ-শোক প্রদানের কারণ ও রোগ নির্ণয়ের বিভিন্ন মত



আল্লাহ-পরিচয় (তত্ত্বদর্শন) পর্ব – ১৪
📚সৌভাগ্যের পরশমণি ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)

রোগ-শোক প্রদানের কারণ ও রোগ নির্ণয়ের বিভিন্ন মত 
যদি কাহারও মানসিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়া দুনিয়া হইতে সে মুখ ফিরাইয়া লয় - দুঃখ ও অনুতাপ তাহাকে আচ্ছন্ন করিয়া ফেলে দুনিয়ার নিয়ামত তাহার নিকট খারাপ বোধ হয় এবং অন্তিমকালের চিন্তা-ভাবনা তাহাকে ঘিরিয়া লয় তখন চিকিৎসকগণ বলিবেন : মস্তিষ্ক বিকৃতিতে এ ব্যক্তি অসুস্থ হইয়া পড়িয়াছে। এক প্রকার ভেষজ পদার্থের পাঁচন ইহার ঔষধ। প্রকৃতিবাদিগণ তাহার সম্বন্ধে বলিবেন : শীতকালের শুষ্ক বায়ুর কারণে মস্তিষ্কে শুষ্কতা বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হইয়া তাহার এ রোগ জন্মিয়াছে। বসন্তের স্নিগ্ধ বায়ু : মস্তিষ্কে প্রবেশ করত ইহাকে আর্দ্র না করিলে এ রোগ সারিবে না। জ্যোতির্বিদগণ বলিবেন  : এই ব্যক্তির উন্মাদনা রোগ হইয়াছে। বুধ গ্রহের সহিত মঙ্গল গ্রহের অশুভ সংক্রমণ হইয়া এই দুই গ্রহের কুদৃষ্টি তাহার উপর পড়িয়াছে বলিয়াই এ রোগের উৎপত্তি হইয়াছে৷ চন্দ্র-সূর্য বা অন্য কোন শুভ গ্রহের সহিত সংক্রমণ হইয়া তাহার উপর ইহার শুভ-দৃষ্টি না পড়িলে এ রোগ দূর হইবে না। চিকিৎসক, প্রকৃতিবাদী ও জ্যোতির্বিদ তাহাদের নিজ নিজ চিন্তাধারা অনুযায়ী এ ব্যক্তি সম্বন্ধে ঠিকই বলিয়াছেন। তাঁহাদের জ্ঞানের দৌড় এ পর্যন্তই সীমাবদ্ধ। কিন্তু প্রকৃত কথা এই যে, সেই রোগাক্রান্ত ব্যক্তির জন্য আল্লাহ্’র দরবার হইতে সৌভাগ্যের আদেশ হইল। তদানুসারে বুধ ও মঙ্গল গ্রহকে তিনি অনুমতি করিলেন যেন ইহারা একত্রে উদিত হইয়া তাঁহার অন্যতম পিয়াদা বায়ুকে শুষ্কতার ফাঁদের সাহায্যে ঐ ব্যক্তির মস্তিষ্ক শুষ্ক করিয়া ফেলিবার ইঙ্গিত করে, দুনিয়ার সুখ-শান্তি হইতে তাহার মুখ ফিরাইয়া লয় এবং অনুতাপ ও ভয়ের চাবুক মারিয়া তাহাকে আল্লাহর দরবারের দিকে লইয়া যায়। চিকিৎসা শাস্ত্র, প্রকৃতিবিদ্যা ও জ্যোতির্বিদ্যা এ সম্বন্ধে কোন খবরই রাখে না। বরং এই খবর একমাত্র পয়গম্বরগণের 
ইলমে নবুয়তরূপ মহারত্নের অসীম সমুদ্র হইতে পাওয়া যায়। পয়গম্বরগণের জ্ঞান-সমুদ্র বিশ্ব-জগতের সমস্ত রাজ্য এবং আল্লাহ্’র কর্মচারী ও ভৃত্যদিগকে ঘিরিয়া রহিয়াছে। আর তাদের কে কোন্ কাজে নিযুক্ত আছে, কাহার আদেশে পরিচালিত হয় এবং সৃষ্টিকে কোন্ দিকে লইয়া যায় ও কোন্ দিকে যাইতে বাধা দেয়- এ সমুদয় কেবল পয়গম্বরগণই জানেন। তথাপি উপরোক্ত তিন শ্রেণীর পণ্ডিতগণ যাহা করেন তাহা এক হিসাবে সত্য বটে। তবে পার্থক্য এই যে, বিশ্বজগতের বাদশাহ্, তাহার বিশাল রাজ্য, প্রধান প্রধান কর্মচারী ও ভৃত্যগণের সংবাদ তাহারা কিছুই রাখেন না। তাহারা এমন মূর্খ পল্লীবাসীর ন্যায় যে বাদশাহের দরবারে উপস্থিত হইয়া তাঁহার সৈন্যসামন্ত, প্রভাব-প্রতিপত্তি এবং তাঁহার কর্মচারীবৃন্দকে দেখিয়া বলে “আমি বাদ্‌শাহকে দেখিয়াছি।” তাহার এরূপ উক্তি এক হিসাবে সত্য। কারণ, সে বাদশাহের দরবারকে বাদশাহের সহিত সংযোগ করিয়া দিয়াছে। কিন্তু প্রকৃত ব্যাপার তাহার উক্তির বিপরীত ছিল। কেননা, সে বাদশাহের দরবারের গোলামকে দেখিয়া তাহাকেই বাদশাহ বলিয়া মনে করিয়াছিল। 
ফলকথা, আল্লাহ্ মানুষকে বিপদাপদ, রোগ, উন্মাদনা ও কষ্ট দ্বারা নিজের দিকে আহবান করিতেছেন এবং বলিতেছেন ইহা রোগ নহে, বরং ইহা আমার দয়ারূপ ফাঁদ। এই ফাঁদ দ্বারা আমি আমার বন্ধুগণকে আমার দিকে আকর্ষণ করিয়া লই। অর্থাৎ “আল্লাহ্ পয়গম্বরগণকে বড় বড় বিপদে নিপতিত করিয়াছেন এবং অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র বিপদ ওলীদের উপর দিয়াছেন। তৎপর তাঁহার বান্দাগণের মর্যাদার তারতম্য অনুসারে লঘু হইতে লঘুতর বিপদে তাহাদিগকে ফেলিয়াছেন।” এই সকল লোকগণের সম্বন্ধেই হাদীসে আল্লাহ্’র উক্তি উদ্ধৃত হইয়াছে : “আমি পীড়িত হইয়াছিলাম; কিন্তু তুমি আমার সেবা-শুশ্রুষা কর নাই।” 
মানব দেহের অভ্যন্তরে যে বাদ্‌শাহী চলিয়াছে তাহা প্রথম উদাহরণে বর্ণিত হইল এবং দেহের বাহিরে যে বাদশাহী চলিয়াছে তৎসম্বন্ধে দ্বিতীয় উদাহরণে প্রকাশ পাইল। 
নিজকে চিনিলেই মানব দেহের বাহিরের বাদশাহী সম্বন্ধে জ্ঞান লাভ করা যায়। এই জন্যই আত্ম-দর্শন প্রথমে বর্ণিত হইয়াছে। 

পরবর্তী পর্ব —
আল্লাহর মা'রিফাতের সমষ্টিরূপে চারিটি বাক্যের ব্যাখ্যা

তত্ত্বদর্শন (১৩) বিশ্বপ্রকৃতির কার্যনির্বাহের ধারা



আল্লাহ-পরিচয় (তত্ত্বদর্শন) পর্ব – ১৩
📚সৌভাগ্যের পরশমণি ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)

বিশ্বপ্রকৃতির কার্যনির্বাহের ধারা —
চার প্রকৃতি, গ্রহ-নক্ষত্ , দ্বাদশ রাশি, কক্ষপথ এবং তদ্ব্যতীত মহান আরশ এই সমস্তকে এক হিসাবে এমন এক রাজার রাজ্য শাসন প্রণালীর সহিত তুলনা করা যাইতে পারে যাঁহার একটি খাস কামরা আছে, এই কামরায় তাঁহার উযির বসিয়া রহিয়াছেন। কামরার চতুর্দিকে একটি বারান্দা আছে ইহার বারটি দরজা। প্রত্যেক দরজায় এক একজন সহকারী উযির উপবিষ্ট আছেন এবং সাতজন অশ্বারোহী উযির হইতে প্রাপ্ত শাহী আদেশ সহকারী উযিরগণের মারফতে পাইবার প্রতীক্ষায় অনবরত বারটি দরজার চতুর্দিকে ঘুরিতেছে। অশ্বারোহিগণ হইতে একটু দূরে চারিজন পেয়াদা ফাঁদ হাতে দাঁড়াইয়া শাহী নির্দেশের প্রতীক্ষায় অশ্বারোহীদের মুখপানে চাহিয়া রহিয়াছে। ইঙ্গিত পাওয়ামাত্র এই ফাঁদের সাহায্যে তাহারা কাহাকেও নির্দেশ অনুযায়ী শাহী দরবারে হাযির করিবে, কাহাকেও বা দূর করিয়া দিবে, কাহাকেও পুরস্কার প্রদান করিব, আবার কাহাকেও শাস্তি দিবে। আরশ উক্ত খাস কামরাতুল্য। এই স্থানে উযির অবস্থান করেন তিনি একজন শ্রেষ্ঠ ফেরেশতা। গ্রহ-নক্ষত্রবিশিষ্ট আসমান বারান্দাস্বরূপ এবং দ্বাদশ রাশি বার দরজা সদৃশ। এই সকল দরজায় অবস্থিত সহকারী উযির-ফেরেশতাগণ উক্ত শ্রেষ্ঠ ফেরেশতা অপেক্ষা মরতবায় একটু নিম্নে। ইহাদের এক একজনের উপর এক এক কাজের ভার আছে। সাতটি গ্রহ সাতজন অশ্বারোহী তুল্য। তাহারা দ্বাদশ রাশিতে অবস্থিত ফেরেশতাগণের নিকট হইতে আল্লাহর নির্দেশের প্রতীক্ষায় আসমানের চারিদিকে ঘুরিতেছে। প্রত্যেক রাশি হইতে ইহাদের নিকট বিভিন্ন আদেশ আসিয়া থাকে। আগুন, পানি মাটি ও বায়ু এই চারি উপাদান সেই চারি পেয়াদাস্বরূপ। ইহারা নিজ নিজ স্থান ছাড়িয়া যায় না। উষ্ণতা, শীতলতা, আর্দ্রতা ও শুষ্কতা এই চতুর্বিধ প্রকৃতি উহাদের হস্তস্থিত চারিটি ফাঁদ। 

পরবর্তী পর্ব —
রোগ-শোক প্রদানের কারণ ও রোগ নির্ণয়ের বিভিন্ন মত 

তত্ত্বদর্শন (১২) মানুষের মধ্যে মতভেদের কারণ



আল্লাহ-পরিচয় (তত্ত্বদর্শন) পর্ব – ১২
📚সৌভাগ্যের পরশমণি ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)

মানুষের মধ্যে মতভেদের কারণ — 
লোকের মধ্যে এমন বহু মতভেদ আছে বিভিন্ন কারণে যাহাদের প্রত্যেকের কথাই সত্য। এরূপ মতভেদের কারণ এই যে, তাহাদের কেহ বা কোন বিষয়ের কিয়দংশ দেখিয়া বুঝিয়াছে, অপর অংশ দেখে নাই; আবার অপর লোক অন্য অংশ দেখিয়াছে, সম্পূর্ণটা দেখে নাই; অথচ তাহারা সকলেই সম্পূর্ণটা দেখিয়াছে বলিয়া মনে করে। এমন লোকের অবস্থাকে ‘অন্ধের হস্তী দর্শনে’র সহিত তুলনা করা যাইতে পারে। অন্ধগণ তাহাদের শহরে হাতী আসিয়াছে শুনিয়া ইহা কেমন জানিবার জন্য রওয়ানা হইল এবং মনে করিল যে , হাতীর শরীরে হাত বুলাইয়া উহার যথার্থ পরিচয় লাভ করা যাইবে। সকলেই হাতীর শরীরে হাতড়াইতে লাগিল। কাহারও হাত হাতীর কানের উপর পড়িল ; কাহারও হাত ইহার পায়ের উপর পড়িল; আবার কেহ ইহার দাঁত স্পর্শ করিল। এই অন্ধগণ অপর অন্ধদের নিকট গেলে তাহারা ইহাদিগকে হাতীর পরিচয় জিজ্ঞাসা করিলে ইহাদের মধ্যে যে ব্যক্তির হাত হাতীর পায়ের উপর পড়িয়াছিল সে বলিল হাতী থামের মত; যে ব্যক্তির হাত হাতীর দাঁত স্পর্শ করিয়াছিল সে বলিল হাতি মূলার মত; যে-ব্যক্তি হাতির কান স্পর্শ করিয়াছিল সে বলিল; হাতী কুলার মত। পৃথক পৃথক কারণে তাহাদের প্রত্যেকের মতই কিছুটা সত্য বটে। কিন্তু তাহারা সকলেই এই কারণে ভ্রমে পতিত হইয়াছিল যে, তাহাদের প্রত্যেকেই হাতীর সমস্ত শরীরের পরিচয় না পাইয়াই বলিয়াছে -“আমি হাতীকে সম্পূর্ণ রূপে চিনিয়াছি”; অথচ গোটা হাতীর পরিচয় তাহাদের কেহই লাভ করে নাই। : এইরূপে জ্যোতির্বিদ ও প্রকৃতিবাদীদের দৃষ্টি আল্লাহর এক এক বান্দার উপর পড়িয়াছে এবং ইহাদের প্রভুত্ব ও ক্ষমতা দর্শনে অবাক হইয়া বলিয়াছে : 
অর্থাৎ “ইহাই আমার প্রভু।” কিন্তু যাহাদিগকে আল্লাহ্ হিদায়েত করিলেন তিনি এ সমস্ত গ্রহ-নক্ষত্র ও প্রাকৃতিক শক্তির অসম্পূর্ণতা ও অক্ষমতা বুঝিতে পারিয়া সিদ্ধান্তে উপনীত হইলেনঃ যাহাকে আমি আল্লাহ্ বলিয়া ধারণা করিয়াছিলাম তাহাতে অন্যের আজ্ঞাধীন এবং যাহা অন্যের আজ্ঞাধীন তাহা কখনই আল্লাহ্ হওয়ার উপযুক্ত নহে; তৎক্ষণাৎ তিনি বলিয়া উঠিলেন- “আমি অস্তগামীদিগকে পছন্দ করি না।” 

পরবর্তী পর্ব —
বিশ্বপ্রকৃতির কার্যনির্বাহের ধারা 

তত্ত্বদর্শন (১১) জড়জগতের মূল নির্ণয়ে প্রকৃতিবাদী ও জ্যোতির্বিদগণের ভুল



আল্লাহ-পরিচয় (তত্ত্বদর্শন) পর্ব – ১১
📚সৌভাগ্যের পরশমণি ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)

জড়জগতের মূল নির্ণয়ে প্রকৃতিবাদী ও জ্যোতির্বিদগণের ভুল —
প্রকৃতিবাদী ও জ্যোতির্বিদগণের দুর্ভাগ্যের কারণ এই যে, তাহারা প্রকৃতি ও গ্রহ-নক্ষত্রদিগকেই যাবতীয় কার্য ও ঘটনার মূল বলিয়া মনে করে। তাহাদের দৃষ্টান্ত এইরূপ যেমন কোন এক পিপীলিকা কাগজের উপর দিয়া চলিবার সময় দেখিতে পাইল, কাগজের উপর কালির দাগ পড়িয়া এক প্রকার চিত্র অঙ্কিত হইতেছে। তত্পর সেই পিপীলিকা কলমের অগ্রভাগের প্রতি মনোযোগের সহিত লক্ষ্য করত প্রফুল্লচিত্তে বলিতে লাগিল : আমি চিত্র অঙ্কনের মূল তত্ত্ব অবগত হইয়াছি। কলমই কাগজের উপর চিত্র অঙ্কন করে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হইয়া পিপীলিকাটি নিশ্চিত হইল প্রকৃতিবাদিগণের অবস্থাও ঠি এইরূপ । সর্বশেষে কাজটি কাহার দ্বারা সম্পন্ন হইল, ইহা ছাড়া তাহারা আর কিছুই দেখে না। অবশেষে ঐ পিপীলিকার পার্শ্বে আর একটি পিপীলিকা আসিল। সে প্রথমে পিপীলিকা হইতে দূরদর্শী এবং ইহার দৃষ্টিশক্তিও তদপেক্ষা তীক্ষ্ণতর। সে প্রথম পিপীলিকাকে বলিল তুমি ভুল করিয়াছ। আমি কলমকে আজ্ঞাধীন দেখিতেছি। আমি দেখিতে পাইতেছি যে  কলম ভিন্ন এক পদার্থ কলমকে চালাইয়া চিত্র অঙ্কন করিতেছে। এই সিদ্ধান্তে উপনীত হইয়া সে আনন্দের সহিত বলিয়া উঠিল, আমি যাহা জানিয়াছি তাহাই ঠিক। অঙ্গুলী চিত্র অঙ্কন করে, কলম করে না। কারণ, কলম অঙ্গুলীর অধীনে চলিতেছে। জ্যোতির্বিদগণ এই পিপীলিকা সদৃশ। তাহাদের দৃষ্টি প্রকৃতিবাদীদের অপেক্ষা অধিক দূরে পৌঁছিয়াছে। তাহারা প্রাকৃতিক উপাদানসমূহকে গ্রহ-নক্ষত্রাদির অধীন দেখিতেছে বটে, কিন্তু গ্রহ-নক্ষত্রাদি যে ফেরেশতাগণের অধীন, তাহা বুঝিতে পারে নাই এবং ফলে তাহারা জ্ঞানের তদপেক্ষা উপরের স্তরসমূহে পৌঁছিতে পারে নাই। জ্ঞানের তারতম্যানুসারে জ্ঞানীগণের মধ্যে প্রভেদ
জড়জগতের কার্যাবলীর মূল কারণ সম্বন্ধে প্রকৃতিবাদী বৈজ্ঞানিক ও জ্যোতির্বিদদের মধ্যে যেমন প্রভেদ ঘটিয়াছে এবং এইজন্যই তাহাদের মধ্যে মতভেদ দেখা দিয়াছে তদ্রূপ আধ্যাত্মিক জগতে যাহারা উন্নতি করেন তাহাদের মধ্যেও মতভেদ দেখা দিয়া থাকে। তাহাদের অধিকাংশ লোকই জড়জগত ছাড়াইয়া আধ্যাত্মিক জগতের দিকে উন্নতি করিতে পারেন নাই। জড়জগতের বাহিরের কোন জিনিসই তাহারা দেখে নাই। তাহারা আধ্যাত্মিকতার প্রথম সোপানেই রহিয়া গিয়াছেন এবং এইদিকে তাহাদের উন্নতির পথ বন্ধ রহিয়াছে। আধ্যাত্মিক জগত অতি দুর্গম ও বহু বাধা-বিপত্তি পরিপূর্ণ। এই জগতে উন্নতির স্তর অনুসারে কাহারও অবস্থা তারকাতুল্য কাহারও অবস্থা চন্দ্রসদৃশ, কাহারও মর্যাদা সূর্যতুল্য। আল্লাহ্ তা'আলা ঊর্ধ্ব জগতের যাঁহাকে যত অধিক দেখাইয়াছেন তদনুসারেই তাঁহাদের গৌরবের শ্রেণীবিভাগ হইয়াছে; যেমন হযরত ইবরাহীম আলায়হিস সালাম সম্বন্ধে আল্লাহ্ তা'আলা বলেন  : “এইরূপে আমি ইবরাহীমকে আকাশ ও পৃথিবীর রাজ্যসমূহ দেখাইয়াছি।” এই সমস্ত দেখিয়াই হযরত ইবরাহীম আলায়হিস্ সালাম বলিয়াছিলেনঃ - “নিশ্চয়ই আমি আমার মুখ তাঁহার দিকে ফিরাইলাম যিনি আকাশসমূহ ও পৃথিবী সৃষ্টি করিয়াছেন।” আর এই কারণেই রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন  : “নিশ্চয়ই সত্তর হাজার নূরের পর্দা আছে। এই সমস্ত দূর করা হইলে তাঁহার মুখমণ্ডলের জ্যোতি দর্শকগণকে দগ্ধ করিয়া ফেলিবে।” ইহার বিশদ ব্যাখ্যা ‘মিশকাতুল আনওয়ার’ ও ‘মিসবাহুল আসরার' কিতাবদ্বয়ে দেওয়া হইয়াছে। তথায় দেখিয়া লওয়া উচিত। 
জড়জগতের মূল নির্ণয়ে মতভেদ সম্বন্ধে সত্যাসত্যের বিচার উপরে যাহা বলা হইয়াছে ইহার উদ্দেশ্য হইল, জড়বাদীগণ কোন বস্তুর সৃষ্টির কারণরূপে যে উষ্ণতা, আর্দ্রতা ইত্যাদি প্রাকৃতিক উপাদানের উল্লেখ করিয়াছেন তাহা এক হিসাবে সত্য, উহা জানাইয়া দেওয়া। কারণ, জড়জগতের ক্রিয়া-কলাপে আল্লাহ্ যে সমস্ত উপকরণ রাখিয়াছেন উহাতে এই সকল না থাকিলে চিকিৎসাশাস্ত্র অকর্মণ্য হইয়া পড়িত। কিন্তু তাঁহারা এইজন্য ভুল করিয়াছেন যে, তাঁহাদের দৃষ্টিশক্তি নিতান্ত কম ও সংকীর্ণ। ফলে ইহা তাঁহাদিগকে অধিক দূরে লইয়া যাইতে পারে নাই এবং তাঁহারা প্রথম সোপানেই রহিয়া গেলেন। তাঁহারা উষ্ণতা, আর্দ্রতা প্রভৃতি উপাদানগুলিকে মূল কারণ বলিয়া নির্ধারণ করিলেন,  এই সমস্তকে অপরের অধীন বলিয়া বুঝিতে পারিলেন না, উহাদিগকে ভৃত্য না বুঝিয়া কৰ্তা বলিয়া বুঝিয়া লইলেন। অথচ উষ্ণতা, আর্দ্রতা, ইত্যাদি উপাদান প্রকৃত কর্তার ভৃত্যগণের মধ্যে সর্বনিম্ন শ্রেণীর ভৃত্যস্বরূপ । 
জ্যোতির্বিদগণ গ্রহ-নক্ষত্রাদিকে আল্লাহর জাগতিক কার্যাবলী ও ঘটনাসমূহের উপকরণ বলিয়া ঠিকই করিয়াছেন। কারণ, উহারা আল্লাহ্ জাগতিক কার্যাবলীর উপকরণ না হইলে দিবা-রাত্রের প্রভেদ থাকিত না - শীত-গ্রীষ্ম সমান হইত। কেননা, সূর্য একটি গ্রহ; ইহা হইতেই পৃথিবীতে আলো ও উত্তাপ আসিয়া থাকে। গ্রীষ্মকালে সূর্য মধ্যগগনের নিকটে থাকে বলিয়া গ্রীষ্ম হয় এবং শীতকালে দূরে থাকে বলিয়া শীত হয়। যে-আল্লাহর এই শক্তি রহিয়াছে যে, তিনি সূর্যকে উষ্ণ ও উজ্জ্বল করিয়া সৃষ্টি করিয়াছেন, তিনি যে শনিগ্রহকে শীতল ও শুষ্ক এবং শুক্রগ্রহকে উষ্ণ ও আর্দ্র করিয়া সৃষ্টি করিয়াছেন ইহাতে বিস্ময়ের কি আছে? এরূপ বিশ্বাসে ঈমানের কোন ক্ষতি হয় না। কিন্তু জ্যোতির্বিদগণ গ্রহ-নক্ষত্রাদিকে জাগতিক ঘটনাবলীর মূল কর্তা সাব্যস্ত করিয়া মহা ভ্রমে পতিত হইয়াছেন। গ্রহ-নক্ষত্রাদিকে অন্য এক শক্তির অধীন বলিয়া তাঁহারা বুঝিতে পারে নাই; অথচ এই সম্বন্ধে আল্লাহ্ তা'আলা বলেন  : “সূর্য ও চন্দ্র আল্লাহর নির্দেশমত নিয়ম কানুনের অধীনে চলিতেছে।” তিনি আরও বলেন : “সূর্য, চন্দ্র ও নক্ষত্ররাজি তাঁহারই অনুগত!” প্রকৃতিবাদী ও জ্যোতির্বিদগণ এই সকল কথা বুঝিতে পারেন নাই। অনুগত তাহাকেই বলে যে অপরের অধীনে কাজ করে। অতএব গ্রহ-নক্ষত্রাদির কোন স্বাধীন ক্ষমতা নাই, বরং ইহারা ফেরেশেতাগণের পরিচালনাধীনে থাকিয়া কাজ করে। স্নায়ুসূত্র দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে আলোড়িত করিলে যেমন মস্তিষ্কের শক্তি কার্যনির্বাহে অগ্রসর হয় তদ্রূপ আল্লাহর নিয়োজিত ফেরেশতাগণ দ্বারা পরিচালিত হইয়া গ্রহ-নক্ষত্রাদি কার্যে ব্যাপৃত থাকে। আল্লাহর ভৃত্যদের মধ্যে গ্রহ-নক্ষত্রাদি নীচ শ্রেণীর ভৃত্য বটে; কিন্তু চারি প্রকৃতি যেমন লেখকের হস্তস্থিত সর্বনিম্ন শ্রেণীর আজ্ঞাবহ কলমের ন্যায় ভৃত্য তদ্রূপ উহারা একেবারে নিম্নতম শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত নহে। 

পরবর্তী পর্ব —
মানুষের মধ্যে মতভেদের কারণ 

তত্ত্বদর্শন (১০) আত্ম-জ্ঞান ও বিশ্ব-জ্ঞান



আল্লাহ-পরিচয় (তত্ত্বদর্শন) পর্ব – ১০
📚সৌভাগ্যের পরশমণি ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)

আত্ম-জ্ঞান ও বিশ্ব-জ্ঞান —
দেহ রাজ্যে মানুষের প্রভুত্বের সহিত বিশ্বপ্রভু আল্লাহর বাদশাহীর তুলনা করিতে গিয়া দুইটি প্রধান জ্ঞানের আভাস দেওয়া হইল। প্রথম, মানুষের আত্মজ্ঞান মানবদেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সহিত উহার বিবিধ শক্তি ও গুণাবলীর সম্বন্ধ এবং এই সকল শক্তি ও গুণাবলীর উপর আত্মার আধিপত্য। এ সকল জ্ঞানের বিস্তৃত বিবরণ এ ক্ষুদ্র গ্রন্থে সম্ভব নহে। দ্বিতীয়, বিশ্বজ্ঞান – বিশ্বপ্রভু আল্লাহ্’র বাদশাহীর সঙ্গে ফেরেশতাগণের সম্পর্ক ও এই সকল ফেরেশতার মধ্যে একের সহিত অপরের সম্বন্ধ এবং আসমান, আরশ ও কুরসীর সহিত ফেরেশতাগণের সম্পর্ক। ইহাও এক বড় জ্ঞান। এ কথার আভাস দিবার উদ্দেশ্য এই যে, বুদ্ধিমান ব্যক্তি এই কথাগুলির প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করিবে এবং উহা হইতে আল্লাহর মহত্ত্ব অনুভব করিবে। পক্ষান্তরে নির্বোধ ব্যক্তিও বুঝিতে পারিবে, কি কারণে সে অজ্ঞ ও ক্ষতিগ্রস্ত রহিল যে, এইরূপ প্রবল প্রতাপশালী বাদশাহ ও পরম সৌন্দর্যের আধার আল্লাহর দীদার লাভ করিতে পারিল না। বিশ্ব প্রভু আল্লাহর জ্ঞান মানুষ কতটুকু লাভ করিতে পারে? তবে এতটুকু বলার উদ্দেশ্য এই যে, মানুষ যেন বুঝিতে পারে যে, সে কত ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ! 

পরবর্তী পর্ব —
জড়জগতের মূল নির্ণয়ে প্রকৃতিবাদী ও জ্যোতির্বিদগণের ভুল 

তত্ত্বদর্শন (৯) পার্থিব প্রকৃতির প্রকারভেধ



আল্লাহ-পরিচয় (তত্ত্বদর্শন) পর্ব – ৯
📚সৌভাগ্যের পরশমণি ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)

পার্থিব প্রকৃতির প্রকারভেধ
পার্থিব প্রকৃতি চারি প্রকার, যথা- উষ্ণতা, শীতলতা, আর্দ্রতা ও শুষ্কতা। কলম যেমন কালিকে আলোড়িত, বিক্ষিপ্ত ও সঙ্কুচিত করিলে 'বিসমিল্লাহ্' শব্দ লিখিত হয়, উষ্ণতা ও শীতলতা তদ্রূপ পানি, মাটি ও অন্যান্য উপাদানকে আলোড়িত বিক্ষিপ্ত ও সঙ্কুচিত করিলে দৃশ্যমান আকৃতি সকল গঠিত হয়। কলমের সাহায্যে কাগজের উপর কালি ছড়াইয়া দিলে কাগজ যেমন সেই কালি চোষণ করে অদ্রূপ আর্দ্রতা জড়পদার্থের মূল উপাদানসমূহকে ভিজাইয়া উহার সাহায্যে আকৃতি গঠন করিলে শুষ্কতা সেই আকৃতি রক্ষা করে। পদার্থসকল যাহাতে নিজ নিজ আকৃতি পরিত্যাগ করিতে না পারে, এইজন্যই শুষ্কতা সর্বদা প্রহরীর ন্যায় কাজ করে। তরলতা না থাকিলে আকৃতি গঠিত হইতে পারিত না; আবার শুষ্কতা না থাকিলে মূর্তি সকলের আকৃতি রক্ষা পাইত না। কলম আপন গতিবিধি ও কার্য শেষ করিলে যেমন দেখা যায় যে পূর্ব হইতে চক্ষুর সাহায্যে মস্তিষ্কে অঙ্কিত চিত্রের ন্যায় ‘বিসমিল্লাহ্' শব্দ লিখিত হইয়াছে তদ্রূপ উষ্ণতা ও আর্দ্রতা কর্তৃক জড়পদার্থের অন্যান্য উপাদানগুলি আলোড়িত হইলে ফেরেশতাগণের সাহায্যে এ জগতে লওহে মাহফুজে অঙ্কিত ছবির ন্যায় প্রাণী ও উদ্ভিদের মূর্তি গঠিত হয়। প্রত্যক্ষ ইচ্ছার প্রভাব যেমন প্রথমে তোমার মনে আরম্ভ হইয়া ক্রমে দেহের অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে বিস্তারিত হয়, সেইরূপ জড়জগতের প্রতিটি কার্য ও ঘটনার মূল আল্লাহর ইচ্ছা আরশে সূত্রপাত হয়। ইচ্ছার প্রভাব প্রথমে মনে গৃহীত হয়। তৎপর অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ উহা গ্রহণ করিয়া থাকে। এইজন্য লোকে মনকে তোমার সহিত সম্বন্ধযুক্ত বলিয়া মনে করে এবং বিশ্বাস করে যে, তুমি মনে বাস করিয়া থাক। তদ্রূপ সকলের উপর আল্লাহর প্রভুত্ব যখন আরশের মাধ্যমে পরিচালিত হয় তখন লোকে মনে করে আল্লাহ্ আরশে অবস্থান করেন। মনের উপর তুমি প্রবল হইয়া বসিলে দেহ- রাজ্যের সমস্ত কার্য যেমন সূচারুরূপে সম্পন্ন হইতে থাকে, তদ্রূপ আল্লাহ্ যখন সৃষ্টি হইতেই আরশের উপর প্রবল প্রভু হইয়া বসিলেন ও আরশ আল্লাহর সমস্ত অভিপ্রায়ের অধীন হইয়া পড়িল তখন বিশ্বজগতের সমস্ত কার্য সুচারুরূপে নির্বাহ হইতে লাগিল । এই মর্মেই আল্লাহ্ বলেন  : “তৎপর আরশকে আল্লাহ্ নিজ আধিপত্যের অধীন করিলে জাগতিক কার্যাবলী সুচারুরূপে চলিতে লাগিল ।” তিনিই সকল কাজের সুব্যবস্থা করিয়া থাকেন ৷ 
মানবদেহে আল্লাহর রাজ্যের নমুনা উপরে যাহা বর্ণিত হইল তদ্‌সমুদয়ই সত‍্য। চক্ষুষ্মান সাধক ওলিগণ কাশফের দ্বারা উহা অবগত হইয়াছেন এবং যথার্থই তাঁহারা জানেন যে, আল্লাহ্ আদমকে নিজের অনুরূপ করিয়া সৃষ্টি করিয়াছেন। কারণ, বাদশাহকে বাদশাহ ব্যতীত অপর কেহই চিনিতে পারে না। আল্লাহ্ তোমাকে তোমার দেহ-রাজ্যের বাদশাহ্ করিয়া না বানাইলে এবং তাঁহার স্বীয় মহাসাম্রাজ্যের এক সংক্ষিপ্ত নমুনা তোমাকে দান না করিলে তুমি বিশ্বজগতের প্রভু আল্লাহ্কে কখনই চিনিতে পারিতে না। অতএব যিনি তোমাকে সৃষ্টি করিয়াছেন, তোমাকে বাদশাহের মর্যাদা দান করিয়াছেন এবং স্বীয় রাজ্যের নমুনাস্বরূপ তোমাকে একটি রাজ্য প্রদান করিয়াছেন, সেই বিশ্বপ্রভু আল্লাহর নিকট তোমার কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। তোমার দিল আরশতুল্য, দিল হইতে নিঃসৃত তোমার জীবনী-শক্তি ইসরাফীলসদৃশ; এইরূপ মস্তিষ্ক - কুর্সী; মস্তিষ্কের খেয়াল-কুঠরি - লওহে মাহফূজ; চক্ষু, কর্ণ ইত্যাদি ইন্দ্রিয়গুলির-শক্তি- ফেরেশতা; মস্তিষ্কের বহির্গত হইয়া সর্বদেহে পরিব্যপ্ত হইয়াছে, সেই বিন্দু সকল গ্রহ-নক্ষত্র; অঙ্গুলী, কলম ও কালি প্রকৃতিস্বরূপ। আল্লাহ্ তোমার আত্মাকে কল্পনাতীত ও নিরাকাররূপে সৃষ্টি করিয়া সমস্ত অঙ্গ-প্রতঙ্গের উপর বাদশাহ্ করিয়া দিয়াছেন এবং তোমাকে সতর্ক করিয়া বলিয়াছেন- “খবরদার, স্বীয় অস্তিত্ব ও বাদশাহী ভুলিও না। ভুলিলে তোমার সৃষ্টিকর্তা আল্লাহকে ভুলিয়া ফেলিবে।” এইজন্যই বলা হইয়াছে- “নিশ্চয়ই আল্লাহ্ আদমকে তাহার আকৃতির অনুরূপ সৃষ্টি করিয়াছেন। অতএব, হে মানব, নিজকে চিন। তাহা হইলেই তোমার প্রভু আল্লাহ্‌কে চিনিবে।” 

পরবর্তী পর্ব —
আত্ম-জ্ঞান ও বিশ্ব-জ্ঞান 

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...