বুধবার, ২২ নভেম্বর, ২০২৩

যশ ও রিয়া - (৯) নিন্দাকে ঘৃনা করার চিকিৎসা



যশ ও রিয়া (পর্ব - ৯)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দীন - ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

নিন্দাকে ঘৃনা করার চিকিৎসা 
পূর্বে বর্ণিত য়য়েছে, নিন্দাকে ঘৃণা করার কারণ প্রশংসা প্রীতির কারণের বিপরীত। সুতরাং চিকিৎসাও প্রশংসাপ্রীতির চিকিৎসা দ্বারা হৃদঙ্গম করা যায়। সংক্ষেপে এর বর্ণনা এইযে, যে ব্যক্তি তোমার নিন্দা করে, সে যদি তার কথায় সত্যবাদি হয় এবং হিতাকাঙ্ক্ষার বশবর্তী হয়ে নিন্দা করে, তবে তার উপর রাঘ করা, বিদ্বেষ পোষন করা এবং মন্দ কথা বলা উচিত নয়। কেননা, এরূপ ব্যক্তি তোমার দোষ বর্ণনা করে তোমাকে ধ্বংসের পথ থেকে বাচাতে চায়। আর যদি সে তোমাকে কষ্ট দেয়ার নিয়তে নিন্দা করে, তবুও তার কথায় তোমার উপকারই হবে। কেননা, সে তোমার দোষ বলে দিয়েছে, যা তুমি জানতেনা। বলাবাহুল্য এটা সৌভাগ্যের কারণ। অবশ্য কষ্ট দেয়ার নিয়ত করে নিন্দাকারী নিজেরই অনিষ্ট করে। কিন্তু তোমার জন্য তার উক্তি নিয়ামত-স্বরূপ আর যদি নিন্দাকারী তার কথায় মিথ্যাবাদী হয়, তবে এমতাবস্থায়ও খারাপ লাগা উচিত নয়। বরং এক্ষেত্রে দেখা দরকার যদিও সেই বিশেষ দোষটি তোমার মধ্যে নেই ;  কিন্তু এরমত দোষ আরও থাকতে পারে। অতএব শোকর করা উচিত যে, নিন্দাকারী সেসব দোষ সম্বন্ধে অবগত হয়নি এবং এমন দোষ বলেই ক্লান্ত হয়ে গেছে, যা তোমার মধ্যে নেই। এ ছারা যে ব্যক্তি তোমার দোষ বলে, সে তার পুণ্যসমুহ তোমাকে উপহার দেয়, আর যে তোমার প্রশংসা করে সে হাদিস অনুযায়ী তোমার কোমর ভেঙ্গে দেয়। অতএব কোমড় ভাঙ্গার কারণে তুমি আনন্দিত হবে, আর পুন্য আসার কারণে দুঃখিত হবে, এটা কেমন কথা ! পুন্য এলেতো আল্লাহর নৈকট্য লাভ হয়, যার জন্য তুমি আগ্রহী থাক। আরো একটি বিষয় চিন্তা করা উচিত যে, নিন্দাকারী ব্যক্তি তোমার নিন্দা করে নিজের ধর্ম বরবাদ করেছে এবং আল্লাহর রহমত থেকে দুরে সরে পরেছে। অতএব তোমার রাঘ করা ও তাকে বদদোয়া দেয়া উচিত নয়। এবং এরূপ দোয়া করা দরকার- ইলাহী ! তাকে যোগ্যতা দাও, তার প্রতি রহম কর এবং তার তওবা কবুল কর। দেখ, উহুদ যুদ্ধে যখন কাফেররা রসুলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর দন্ত মোবারক শহীদ করেছিল, মস্তক ক্ষত বিক্ষত করেছিল এবং তার পিতৃব্য আমীর হামযা (রঃ)-কে শহীদ করেছিল, তখন তিনি এই দোয়া করেন : 
>“ইলাহী আমার কওম-কে সৎপথ প্রদর্শন করুন। কারণ তারা অজ্ঞ”।
হযরত ইবরাহীম ইবনে আদহাম (রহঃ) এমন এক ব্যক্তির জন্য নেক দোয়া করেছিলেন, যে তার মাথায় আঘাত করেছিল। লোকেরা বলল এক্ষেত্রে নেক দোয়া করার কারণ কি?  তিনি বললেন : আমি নিশ্চিতরূপে জানি, তার এই আচরনের কারণে আমি সওয়াব পাব, সে আমার দিক থেকে আযাব ভোগ করুক।

পরবর্তী পর্ব

যশ ও রিয়া - (৮) যশখ্যাতি নির্মুল করার উত্তম পদ্ধতি



যশ ও রিয়া (পর্ব - ৮)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দীন - ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

যশখ্যাতি নির্মুল করার উত্তম পদ্ধতি-
যশখ্যাতি নির্মুল করার উত্তম পদ্ধতি হচ্ছে নির্জনবাস এবং এমন যায়গায় চলে যাওযা,  যেখানে কেউ না চিনে, যদি গৃহে বসেথাকে এবং যে শহরে খ্যাত হয়েছে, সেখানেই থাকে, তবে এ নির্জনবাস দ্বারা মানুষের মনে আরো বেশী বিশ্বাস ও মর্যাদা বেড়েযাবে।
প্রশংসার চিকিৎসা -
মানুষের মন্দ বলার ভয় এবং তাদের প্রশংসা পাওয়ার মোহ অধিকাংশ লোকের ধ্বংশের কারণ হয়েছে। এরুপ লোকেরা মানুষের মর্জি অনুযায়ী সকল কাজকর্ম করার চেষ্টা অবশ্যই করে, যাতে সকলেই প্রশংসা করে এর নিন্দার ভয় না থাকে। এটা বিনাশকারী বিষয় সমুহের অন্যতম। তাই এর চিকিৎসা অত্যাবশ্যক। এর চিকিৎসা পদ্ধতি হল, প্রশংসার মোহ এবং নিন্দার ঘৃনার যে সকল কারণ রয়েছে, সেগুলো দেখতে হবে। 
উদাহরণত: 
(১) প্রথম কারণ হচ্ছে প্রশংসাকারীর কথায় নিজের পূর্ণতা সম্পর্কে অবগত হওয়া। এতে প্রশংসিত ব্যক্তির উচিৎ আপন বিবেক-বুদ্ধির শরণাপন্ন হওয়া এবং মনে মনে চিন্তা করা যে,  যে গুণের দ্বারা আমার প্রশংসা করা হয়েছে,  সেটা আমার মধ্যে আছে কিন? যদি থাকে সেটা আনন্দিত হওয়ার যোগ্য কিনা? 
বলাবাহুল্য জ্ঞান-গরিমা সংসার নির্লিপ্ততা ইত্যদি গুণ হলে তা অবশ্যই আনন্দিত হওয়ার যোগ্য। আর ধন-দৌলত, যশখ্যাতি ইত্যাদি পার্থিব বিষয় হলে তা আনন্দিত হওয়ার যোগ্য নয়। যদি আলোচ্য গুনটি পার্থিব বিষয় হয় তবে তার জন্য উল্লসিত হওয়া খড়কুটার জন্য উল্লসিত হওয়ার মতই, যা দু'দিন পরেই বাতাসের সঙ্গে উড়ে যাবে। জ্ঞানের সল্পতার কারণেই এই ধরনের আনন্দ হয়ে থাকে। অতএব পার্থিব আসবাবপত্রের জন্য আনন্দ করা অনুচিত। আর যদি আলোচ্য গুনটি জ্ঞান-গরিমা ও সংসার নির্লিপ্ততা হয় তবু উল্লসিত হওয়া উচিত নয়। কেননা অন্তিম অবস্থা কি হবে, তা কারো জানা নেই। জ্ঞান ও সংসার নির্লিপ্ততা অবশ্য আল্লাহর নৈকট্য লাভের কারণ হয়ে থাকে। কিন্তু পরিনাম অশুভ হওয়ার আশংকা লেগেই থাকে। যদি শুভ পরিনামের আশা সঞ্চারিত হয়, তবে জ্ঞান ও সংসার নির্লিপ্ততাকে আল্লাহর কৃপা ও অনুগ্রহ মনে করে আনন্দিত হওয়া উচিত- প্রশংসাকারীর প্রশংসার জন্য নয়। জানা দরকার যে প্রশংসার দরুন ফজিলত বৃদ্ধি পায় না।
পক্ষান্তরে যদি গুনটি এমন হয়, যা প্রশংসিত ব্যক্তির মধ্যে নেই, তবে এরুপ গুনের জন্য আনন্দিত হওয়া পাগলামি বৈ কিছু নয়। এর উদাহরণ এমন, যেমন কোন ব্যক্তি অপরকে হাসির ছলে বলে: আপনার পেটের বিষ্ঠা কত সুভাসিত। যখন আপনি মল ত্যাগ করেন, তখন সুভাসে চতুর্দিক আমোদিত হয়ে যায়। অথচ সংশ্লিষ্ট জানে, তার পেটে নেহায়েত দুর্গন্ধযুক্ত নাপাকী রয়েছে। এর পরও যদি সে প্রশংসার কারণে উল্লশিত হয়, তবে সেটা পাগলামী নয় কি?  
সারকথা, প্রশংসাকারী যদি সত্য প্রশংসা করে, তবে প্রশংসিত ব্যক্তি আল্লাহর অনুগ্রহের কথা ভেবে আনন্দ প্রকাশ করবে, আর মিছামিছি প্রশংসা করলে দুঃখ প্রকাশ করবে। প্রশংসার জন্য কোন অবস্থাতেই উল্লাস করা উচিত নয়।
(২) প্রশংসায় আনন্দিত হওয়ার দ্বিতীয় কারণ হলো, এতে বুঝা যায়, প্রশংসাকারীর অন্তর প্রশংসিত ব্যক্তির বশীভুত হয়ে গেছে এবং আরো হবে। এর পরিনতি এবং যশপ্রীতির পরিণতি একই, যার চিকিৎসা পূর্বে বর্ণিত হয়েছে।
(৩) আনন্দের তৃতীয় কারণ: প্রশসিত ব্যক্তির ভয়ভীতি। যার কারণে প্রশংসাকারী প্রশংসা করতে বাধ্য হয়। এটা একটা সাময়িক ও অস্থায়ী ক্ষমতা। ফলে আনন্দ করার যোগ্য নয়। বরং এ কারণে প্রশংসা করা হলে সেজন্য দুখ করা, খারাপ মনে করা, রাগ করা উচিত। জনৈক বুযুর্গ বলেন: যে ব্যক্তি প্রশংসায় আনন্দিত হয়, সে নিজের মধ্যে শয়তানকে প্রবেশ করার পথ করে দেয়। এ কারণে সাহাবায়ে কেরাম প্রশংসাকে খুব ভয় করতেন। খুলাফায়ে রাশেদিনের একজন এক ব্যক্তিকে কিছু জিজ্ঞেস করলে সে আরয করল: আমীরুল মুমিনীন, আপনি আমার ছেয়ে অধিক জ্ঞাত। তিনি রাগ করে বললেন: আমাকে পাকসাফ বলার আদেশ আমি তোমাকে করিনি।

পরবর্তী পর্ব

বৃহস্পতিবার, ১৬ নভেম্বর, ২০২৩

যশ ও রিয়া - (৭) যশখ্যাতির চিকিৎসা



যশ ও রিয়া (পর্ব - ৭)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দীন - ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

যশখ্যাতির চিকিৎসা 
প্রকাশ তাকে যে, যে ব্যক্তির অন্তরকে যশ-প্রীতি আচ্ছন্ন করে নেয়, সে সর্ব প্রযত্নে এ বিষয়েই ব্যাপৃত থাকে যে, মানুষের সহৃদয়তা যেন হাতছারা না হয় এবং তাদের সাথে বন্ধুত্ব উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পায়। সে কথায় ও কাজে কর্মে সর্বদা খেয়াল রাখে, যাতে মানুষের মধ্যে তার মর্যাদা বেড়ে যায়। বাস্তবে এ বিষয়টি নিফাকের বীজ এবং অনর্থের মূল। এর ফলে ক্রমে ক্রমে এবাদতের প্রতি অবহেলা প্রদর্শিত হতে থাকে, রিয়ার প্রভাব বেড়ে যায় এবং মানুষের মন আকৃষ্ট করার জন্য নিষিদ্ধ বিষয়াদিতে লিপ্ত হয়ে পড়ে। এ কারণে রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করেন, -  
>"গৌরব ও ধন-সম্পদের মোহ নিফাক উতপন্ন করে"। 
কেননা নিফাক বলা হয় মানুষের বাহ্যিক অবস্থা তথা ;  কথা ও কাজ তার অন্তরে বিপরীত হওয়াকে। সুতরাং যে ব্যক্তি অন্তরে মর্যাদার আসন প্রতিষ্টিত করতে ইচ্ছুক, সে নিফাক সহকারে তাদের সন্মুখীত হবে। এবং মনের উপর জোর দিয়ে উত্তম স্বভাব তাদের সামনে পেশ করবে। অথচ সে এসব স্বভাব থেকে মুক্ত। এ থেকে যানা গেল যে, যশপ্রীতি বিনাশকারী বিষয় সমুহের অন্যতম। তাই এর চিকিৎসা জরুরী। কেননা এই রোগটি ধন-সম্পদের মহব্বতের ন্যায় একটি মজ্জাগত রোগ।
যশপ্রীতির চিকিৎসা দু'টি- একটি জ্ঞানগত ও অপরটি কর্মগত।
জ্ঞানগত চিকিৎসা এই যে, যে কারণে যশলাভের মোহ সৃষ্টি হয়েছে, তা জানতে হবে। বলা বাহুল্য, এর কারণ হচ্ছে মানুষের দেহ ও মনের উপর ক্ষমতা অর্জন করে। মানুষ যদি এ বিষয়টি অর্জন করতে সক্ষমও হয়ে যায়,  তবে চিন্তা করা দরকার মৃত্যুই এর শেষ সীমা। মৃত্যুর পর এটা কোন উপকারে আসেনা। এটি "বাকিয়াতে সালেহাত" তথা অক্ষয় সৎকর্ম সমুহের অন্তর্ভুক্ত নয় যে,  মৃত্যর পরও এর কার্যকারিতা অবশিষ্ট থাকবে। ধরে নেয়া যাক, যদি পূর্ব-পশ্চিমের সকল মানুষ এক ব্যক্তিকে সেজদা করতে থাকে এবং পঞ্চাশ বছর পর্যন্ত সকলেই সেজদারত থাকে তবু না সেজদাকারীরা থাকবে,  না সয়ং সেই ব্যক্তি থাকবে ;  বরং তারা সকলেই একদিন অন্যেন্য মহাপুরুষের ন্যায় মাটির সাথে মিশে যাবে। সুতরাং এমন ক্ষয়িষ্ণু বিষয়ের জন্য অনন্ত ও অক্ষয় জীবন লাভের মাধ্যমে ধর্মকে বিসর্জন দেয়া মোটেই উচিৎ নয়। সত্যিকার পূর্নতা কি- এ বিষয়টি যে বুঝে নিয়েছে, তার দৃ্ষ্টিতে যশখ্যাতি নিতান্ত তুচ্ছ বিষয়। কিন্তু এটা বুজতে সেই সক্ষম, যে আখেরাতে উপস্থিতিকে চোখে সন্মুখে দেখে,  দুনিয়াকে হেয় মনে করে এবং মৃত্যুকে মনে করে যে এসে গেছে। হযরত হাসান বসরীর অবস্থা তেমনি ছিল। তিনি হজরত ওমর ইবনে আব্দুল আজীজ (রহঃ)-কে এক পত্রে লিখেছেন : আপনার বিশ্বাস করা উচিৎ যে, আপনি মরে গেচেন। হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজীজও এ ব্যাপারে পেছনে ছিলেন না। তিনি জওয়াবে লিখলেন ধারণা করা উচিৎ যে, আপনি দুনিয়াতে কখনো আসেননি- চিরকাল আখেরাতেই রয়েছেন। বলাবাহুল্য, এই বুযুর্গ গণের দৃষ্টি আখেরাতেই নিবন্ধ ছিল। ফলে তারা দুনিয়াতে যশখ্যাতি ও ধনসম্পদকে হেয় মনে করেছেন। কিন্তু অধিকাংশ লোকের দৃষ্টি শক্তি দুর্বল। তারা কেবল দুনিয়াকেই দেখে। এবং পরিনতির খেয়াল করেনা। তাই আল্লাহ্ তা'আলা তাদের সম্পর্কে ইরশাদ করেন, -
>"কিন্তু তোমরা পার্থিব জীবণকে প্রধান্য দাও ;  অথচ আখেরাত হল উৎকৃ্ষ্টতর স্থায়ী"।
আরো বলা হয়েছে, - 
>"কখনো নয় ;  বরং তোমরা দুনিয়াকে ভালবাস এবং আখেরাতকে পরিত্যগ কর"।
সুতরাং যার অবস্তা এরুপ তার উচিৎ যশপ্রীতির বিপদাপদকে জানা। এবং দুনিয়াতে যশশালী ব্যক্তিরা যে সকল বিপদের সন্মুখীন হয়, সেগুলো চিন্তা করা।
দুনিয়াতে যশশালী ব্যক্তিমাত্রই হিংসার পাত্র হয়ে থাকে। মানুষ তার ক্ষতিসাধনের সর্বদা সচেষ্ট থাকে। সে-ও সর্বক্ষন আশংকা করতে থাকে যে, কোথাও মানুষের অন্তর থেকে তার মর্যাদা বিলিন হয়ে যায়। কেননা মানুষের অন্তর সর্বদা পরিবর্তনঅীল। কখনো একদিকে ও কখনো অন্যদিকে থাকে। এক সময় যাকে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করা হয়, অন্য সময় তাকেই জুতার মালা দিতে কসুর করা হয়না। সুতরাং যে ব্যক্তি মানুষের মনের উপর ভরষা করে, সে যেন সমুদ্রের তরঙ্গমালার উপর গৃহ নির্মান করে। অতএব আপন যশখ্যাতি সংরক্ষনের চিন্তা, হিংসাকারীদের চক্রান্ত প্রতিহত করা এবং শত্রুদের শত্রুতা নিবারণ করা- জাগতিক এসব আপদ বিপদের কারণে যশখ্যাতির আনন্দ সর্বদাই মলিন থাকে। দুনিয়াতে মানুষ এ থেকে যতটুকু সুখ আশা করে, তার ছেয়ে অনেক বেশী বিপদাশংকায় জড়িত থাকে। আসল উদ্দেশ্য যে আখেরাতের উপকার তারতো কোন প্রশ্নই উঠেনা।
যশখ্যাতির কর্মগত চিকিৎসা হল, এমন কাজ করা যাতে মানুষ তিরস্কারের যোগ্য হয়ে পড়ে এবং অপরের দৃ্ষ্টিতে ঘৃণাহ্য হয়ে যায়। এতে করে জনপ্রিয় হওয়ার নেশা কেটে যাবে।এছারা মানুষের কাছে অখ্যাত মন্দ সাব্যস্ত হওয়ার দিনটিকে পছন্দ করে নিতে এবং কেবল আল্লাহর প্রিয় হওয়াতেই সন্তুষ্ট থাকবে। এটা 'মালামতী' সম্প্রদায়ের অনুসৃত পদ্ধতি। তারা যশখ্যাতির বিপদ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য এমন গুনাহ ও কুকর্ম করে থাকে,  মানুষের দৃষ্টিতে পুরাপুরি অসন্মানের পাত্র হয়ে যায়। কিন্তু এ উপায় পথপ্রদর্শক ও ধর্মীয় নেতাদের জন্য জায়েয নয়। কেননা তাদের 
কীর্তিকলাপ দেখে মুসলমানদের মনে শৈথিল্য আসবে। এছাড়া যে ব্যক্তি অনুসৃত নেতা নয়, তার জন্যও বিশেষ এই চিকিৎসার খাতিরে হারাম কাজ করা জায়েয নয় ; বরং তার জন্য বৈধ কাজ সমুহের মধ্যে এমন কাজ করে জায়েয যা দ্বারা মানুষের মধ্যে তার মূল্য হ্রাস পায়।
উদাহরণতঃ বর্ণিত আছে যে জনৈক বাদশাহ এক দরবেশের কাছে যাওয়ার ইচ্ছা করলেন। যখন দরবেশ শুনল বাদশা তার আস্তানার কাছাকাছি এসে গেছেন, তখন সে খাদ্য ও শাক আনিয়ে গোগ্রাসে খেতে শুরু করল। বাদশা তাকে এভাবে খেতে দেখে তার প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়লেন এবং সেখান থেকে প্রস্থান করলেন। দরবেশ বলল আল্লাহ পাকের হাজার শোকর, তিনি বাদশাকে আমার কাছথেকে সরিয়ে দিয়েছেন। কোন কোন বুযুর্গ এমন রঙ্গিন পিয়ালার শরবত পান করেছেন, যা দেখে লোকেরা তাকে শরাবখোর মনেকরে চলে যেত যদিও এরকম করা ফেকা শাস্ত্রের দৃষ্টিতে জায়েয নয় ;  কিন্তু বুজুর্গগন অন্তরের সংশোধন অন্য কোন কাজের মধ্যে পাননি বলে বাধ্য হয়ে এরুপ করেন। পরে  অবশ্য তারা এই বাড়াবাড়ির ক্ষতিপুরণ করে নেন। 

বর্ণিত আছে জনৈক বুযুর্গ ব্যক্তি সংসার নির্লিপ্ততায় মশগুল হলে লোকজন তার কাছে ভিড় করতে শুরো করে। তিনি এ থেকে আত্মরক্ষার জন্য একদিন হাম্মামে গেলেন এবং অন্য এক ব্যক্তির বস্ত্র পরিধান করে বাইরে এলেন এবং প্রকাশ্য রাস্থায় দাড়িয়ে গেলেন। লোকেরা চুরি যাওয়া বস্ত্র চিনতে পেরে তাকে ধরল এবং চোর চোর বলে খুব মারপিট করল। এরপর থেকে কোন লোক সেই বুযর্গের আস্থানায় গেলনা। 

পরবর্তী পর্ব

যশ ও রিয়া - (৬) মন আপন প্রশংসায় আনন্দিত ও নিন্দায় নিস্পৃহ হয় কেন



যশ ও রিয়া (পর্ব - ৬)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দীন - ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

মন আপন প্রশংসায় আনন্দিত ও নিন্দায় নিস্পৃহ হয় কেন -
জানা উচিত যে চার কারণে অন্তর প্রফুল্ল ও আনন্দিত হয়। 
(১) প্রথম কারণটি সর্বাধিক শক্তিশালী। তা এই যে প্রশংসার কারণে মন জানতে পারে যে,  সে পূর্ণতা গুন সম্পন্ন। কেননা যে বিষয় দ্বারা প্রশংসা করা হয়,  তা প্রকাশ্য অথবা সন্দিগ্ন গুণ হতে পারে। যদি গুণটি প্রকাশ্য ও ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য হয়,  তবে আন্ন্দ কম হয় ;  যেমন কারো প্রশংসায় বলা হয়,  সে দীর্ঘাকৃতি ও শ্বেতকায়। এটা যদিও একটা পূর্ণতা-গুন কিন্তু মন এ থেকে গাফেল থাকে। ফলে সে মোটেই আনন্দ পায়না। তবে অপর ব্যক্তি বলার কারণে তার চৈতন্যোদয় হয,  তখন কিছু না কিছু আনন্দ পায়। আর যদি প্রশংসার বিষয়টি সন্দিগ্ধ হয়, তবে আনন্দ অনেক বেশী হয়। যেমন কারো শিক্ষাদীক্ষা পরহেজগারী অথবা রূপ-লাবণ্যের প্রশংসা করা হয়।মানুষ প্রায় এইসব গুণের ব্যপারে সন্দিহান থাকে এবং কোন না কোনরূপে এই সন্দেহ দূর হয়ে যাওয়ার বাসনা করতে থাকে। এর পর যখন অপরের মুখ থেকে এই ঈপ্সিত বক্তব্য শ্রবণ করে,  তখন অসাধারণ আনন্দ অর্জিত হয়। এ কারণে অধিকতর আনন্দ তখন অর্জিত হয়, যখন সব গুণ সম্পর্কে ওয়াকিফহাল ব্যক্তির মুখ থেকে এই প্রশংসা উচ্চারিত হয়। 
উদাহরণতঃ কোন ওস্তাদ তার শাগরিদ সম্পর্কে বলে- তুমি বড় মেধাবী, বুদ্ধিমান ও পন্ডিত। এতে শাগরিদের মনে আনন্দ  আর ধরেনা। কিংবা খারাপ লাগারও কারণ এটাই। এতে মন তার ত্রুটি সম্পর্কে সচেতনতা লাভ করে পূর্ণতার বিপরীত। সুতরাং পূর্ণতা যেমন প্রিয় ত্রুটি তেমনি অপ্রিয় হয়ে থাকে। অপরের মুখ থেকে যখন ত্রুটি সম্পর্কে অবগত হবে,  তখন অবশ্যই তা খারাপ লাগার বিষয়,  বিশেষত যখন বিজ্ঞ ও নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি নিন্দা করবে। 
(২) দ্বিতীয় কারণ এই যে, প্রশংসা দ্বারা জানা যায় প্রশংসা কারীর অন্তর প্রশংসিত ব্যক্তির মালিকানাধীন, বশীভূত ও ভক্ত। অন্তরের মালিকানা লাভ করা সকলেরই প্রিয় ও পছন্দনীয়। যখন জানবে প্রশংসাকারী ব্যক্তি তার ভক্ত এবং তার অন্তর তার ইচ্ছার অনুগামী, তখন নিশ্চিতরূপেই সে আনন্দিত হবে। বিশেষত যদি প্রশংসাকারী ব্যক্তি অধিক ক্ষমতাবান হয় এবং তাকে দিয়ে অধিক কার্যোদ্ধারের সম্ভাবনা থাকে, তবে আনন্দ আরো বেশী হবে।
(৩) আনন্দের তৃতীয় কারণ এরুপ ব্যক্তির প্রশংসা করা, যার কথা সকলেই শুনে এব মুল্য দেয়। কিন্তু এর জন্য সর্ত হল যে,  প্রশংসা অথবা নিন্দা জনসমক্ষে হওয়া। সুতরাং সমাবেশ যত বেশী হবে এবং প্রশংসাকারী যত বেশী মান্যবর হবে, আনন্দ তত বেশী হবে। এর বিপরীতে নিন্দা অধিক খারাপ লাগবে।
(৪) চতুর্থ কারণ, প্রশংসা দ্বারা প্রশংসিত ব্যক্তির প্রভাব প্রতিপত্তিশালী হওয়া বুঝা যায়। ফলে প্রশংসাকারী তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে যায়- মনের আগ্রহে হোক কিংবা চাপের কারণে হোক। চাপো মানুসের কাছে প্রিয় হয়ে থাকে, কারণ এতে একপ্রকার প্রাবল্য পাওয়া যায়। এ কারণে প্রশংসাকারীর অন্তর প্রশংসার বিষয়বস্তুতে বিশ্বাসী না হলেও প্রশংসিত ব্যক্তি আনন্দিত হয়। 
যদি উপরোক্ত চারটি কারণই এক প্রশংসাকারীর মধ্যে একত্রিত হয়ে যায় তবে চরম পর্যায়ের আনন্দ ও স্বাদ অর্জিত হয় ।
প্রশংসা দ্বারা অন্তরের আনন্দ লাভ করার কারণ এবং নিন্দা দনবারা দুঃখিত হওয়ার কারণ সম্পর্কিত এ আলোচনাটির অবতারণা এ জন্য করা হল, যাতে প্রশংসার মহব্বত ও নিন্দার কারণে দুঃখ পাওয়ার চিকিৎসা জানা যায় । কেননা যে রোগের কারণ জানা থাকেনা,  তার চিকিৎসাও সম্ভব হয়না। রোগের কারণ দুর করাই চিকিৎসা। 

পরবর্তী পর্ব

যশ ও রিয়া - (৫) যশের মহব্বতে ভাল ও মন্দ বিষয়াদি



যশ ও রিয়া (পর্ব - ৫)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দীন - ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

যশের মহব্বতে ভাল ও মন্দ বিষয়াদি-
উপরোক্ত বর্ণনা থেকে জানা গেল,  যশের অর্থ হচ্ছে অন্তরসমুহের মালিক হওয়া ও তাদের উপর ক্ষমতা বিস্তার করা। সুতরাং এর বিধানও ধন-সম্পদের মালিকের বিধানের অনুরূপ। কেননা যশ ও পার্থিব উদ্দেশ্য সমুহের মধ্যে একটি উদ্দেশ্য,  যা মৃত্যুর কারণে নিঃশেষ হয়ে যায়। যেহেতু দুনিয়া আখেরাতের শস্যক্ষেত্র,  তাই দুনিয়াতে উৎপন্ন বস্তুর থেকেই আখেরাতের পাথেয় অর্জন করা সম্ভব। সুতরাং পানাহার ও পোশাকের জন্যে যেমন সামান্য অর্থসম্পদ জরুরী, তেমনি মানুষের সাথে জীবন যাপনের জন্যেও অল্পবিস্থর যশ-খ্যাতির প্রয়োজন। খোরাক একটি অপরিহার্য বস্তু। প্রয়োজন পরিমানে খোরাক সংগ্রহ করা অথবা খোরাক ক্রয় করা অর্থ সংগ্রহ করা এবং এইগুলোকে প্রিয় মনে করা যেমন জায়েয,  তেমনি খেদমতের জন্যে একজন খাদেম,  সাহায্য-সহায়তার জন্যে একজন সফরসঙ্গী,  পথ প্রদর্শনের জন্য একজন ওস্তাদ এবং দুষ্ট লোকের অনিষ্ট ও যুলুম থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য একজন শাসক থাকাও যায়েজ। 
সুতরাং মালিকের এ বিষয়ে প্রিয় মনে করা যে, খাদেমের মনে তার এমন মহাত্ম্য ও সন্মান থাকুক, যার কারণে সে খেদমত করতে উদ্বুদ্ধ হয় অথবা সফর সঙ্গীর অন্তরে এমন মর্যাদা থাকুক, যারকারণে সে সাহায্য থেকে বিরত না থাকে অথবা ওস্তাদের মনে এমন আসন থাকুক,  যার কারণে সে উত্তমরূপে পদপ্রদর্শন করে অথবা শাসকের মনে এমন সন্মান থাকুক, যার কারণে সে অনিষ্ট দুরিকরণে সম্মত হয়- এসব বিষয়কে প্রিয় মনে করা নাযায়েজ ও নিন্দনীয় নয়। কেননা, 'যশ'  ধনসম্পদের ন্যায় উদ্দেশ্য সাধনের একটি উপায়। উভয়ের মধ্যে তফাৎ নেই। তবে এ সম্পর্কে সুচিন্তিত মতামত এই যে, সয়ং সম্পদ ও যশ-খ্যাতিকে প্রিয় মনে করবেনা ; বরং এ সবের মহব্বতকে এরূপ মনে করবে, যেমন কারো ঘরে শৌচাগার রযেছে এবং সে মল ত্যাগের জন্য এই শৌচাগার থাকাকে প্রিয় মনে করে। সে মনে করে যদি তা মলত্যাগের প্রয়োজন না থাকে, তবে শৌচাগারের সাথেও তার সম্পর্ক থাকবেনা। এই ব্যক্তিকে বাস্তবে পায়খানাকে মহব্বতকারী মনে করা হবেনা। বরং এটা আসল লক্ষ্য অর্জনের উপায়কে মহব্বত করার নামান্তর।

এখন বিষয়টি একটি দৃষ্টান্ত দ্বারা বুঝা দরকার। জনৈক ব্যক্তি তার বিবাহিত স্ত্রীকে একারণে মহব্বত করে যে, প্রয়োজনের সময় সে তার সাথে সহবাস করে। যেমন মলত্যাগের জন্য পায়খানাকে ভাল মনে করা হয়। যদি এইব্যক্তির মধ্যে কামপ্রবৃত্তির তাড়না না থাকে, তবে সে তার স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দিবে ;  যেমন মল ত্যাগের প্রয়োজন না থাকলে কেউ পায়খানায় যায় না। মাঝে মাঝে কেউ কেউ সয়ং স্ত্রীকেই ভালবাসে এবং তার রুপ-লাভণ্যের জন্যে পাগলপারা থাকে। এমনকি যদি কখনো সহবাস নাও হয়, তবুও তাকে তালাক দিতে চায়না। এটা হচ্চে দ্বিতীয় প্রকার মহব্বত। প্রথম প্রকার মহব্বত মহব্বতের অন্তর্ভূক্ত নয়।যশখ্যাতি ও অর্থসম্পদের অবস্থাও তেমনি। এইগুলো দ্বারা দৈহিক উদ্দেশ্য অর্জিত হয় বলে এই গুলোকে মহব্বত করলে কোন অনিষ্ট নেই।  আর যদি সয়ং এগুলোকেই মহব্বত করা হয়- উদ্দেশ্য লাভের উপায় হোক বা না হোক, অথবা প্রয়োজনাতিরিক্ত পরিমাণকে মহব্বত করা হয়, তবে তা নিন্দনীয়। তবে এরুপ মহব্বতকারী ব্যক্তি ফাসেক ও গুনাহগার হবেনা, - যে পর্যন্ত এই মহব্বতের কারণে কোন গুনাহ না করে বসে অথবা ধনসম্পদ ও জাকজমক অর্জন করার জন্যে প্রতারণা, চক্রান্ত, মিথ্যা ইত্যাদি উপায় অবলম্বন না করে। এগুলো অর্জন করার জন্য কোন এবাদতকেও ওসীলা করা যাবেনা। কেননা এবাদতের মাধ্যমে ধন-সম্পদ ও প্রভাব-প্রতিপত্তি সৃষ্টি করা ধর্মমতে হারাম।
এখন বুঝা দরকার, খাদেম, সফরসঙ্গী, ওস্তাদ ও শাসকের মনে আসন প্রতিষ্ঠিত করার কোন নির্দিষ্ট সীমা আছে কি না কিংবা যতদূর ইচ্ছা তাদেরকে ভক্তি করতে পারবে কিনা ? এর ব্যাখ্যা এই যে, তিন উপায়ে অপরকে ভক্তি করা যায়। তন্মধ্যে দু'টি উপায় বৈধ ও একটি অবৈধ। অবৈধ উপায় এই যে,  অপরকে এমন গুণের ভক্ত করা,  যা নিজের মধ্যে নেই। যেমন তাকে বলা- আমি সাধক,  পরহেজগার, বা সৈয়দ বংশীয় ; অথচ সে কিছুই না। এটা মিথ্যা ও প্রতারণা হওয়ার কারণে হারাম। 
বৈদ উপায় দু'টির মধ্যে একটি হল নিজে যে গুণে গুণাম্বিত,  সে গুণের উপযোগী মর্যাদা চাওয়া। যেমন হজরত ইউসুফ (আঃ) মিসরের শাসনকর্তাকে বলেছিলেন : 'আমাকে দেশের ধন-ভান্ডারে নিযুক্ত করুন। আমি বিশ্বস্ত রক্ষক ও অধিক জ্ঞানবান'। এতে তিনি শাসনকর্তার অন্তরে নিজের হেফাযতকারী ও বিজ্ঞ হওয়ার গুন কামনা করেছিলেন।শাসনকর্তার এরুপ ব্যক্তির প্রয়োযনও ছিল।
দ্বিতীয় উপায় হল, অপরের দৃষ্টিতে হেয় প্রতিপন্ন হওয়ার উদ্দেশ্যে নিজের কোন দোষ অথবা গুনাহ গোপন রাখা‌ ! এটাও বৈধ ! কেননা পাপ কর্ম গোপন রাখা জায়েয এবং প্রকাশ্যে বলা নাজায়েয। এছারা এতে কোন ধোকা নেই‌ ;  বরং যে বিষয় জানার মধ্যে কোন ফায়দা নেই,  তা না জানানো মাত্র।
অপরের সামনে উত্তমরূপে নামাজ আদায় করা, যাতে সেভক্ত হয়ে যায়- এটাও নিষিদ্ধ। কেননা এটা সরাসরি 'রিয়া'ও 'প্রতারণা'  অতএব এভাবে জাকজমক জাহির করা হারাম।

পরবর্তী পর্ব

যশ ও রিয়া - (৪) যশপ্রীতির নিন্দা



যশ ও রিয়া (পর্ব - ৪)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দীন - ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

যশপ্রীতির নিন্দা
আল্লাহ্ তাআলা ইরশাদ করেন, -  
>"আখেরাতের সেই গৃহ আমি তাদেরকে দান করব- যারা পৃথিবীতে উচ্চ হওয়ার এবং গোলযোগ সৃষ্টি করার ইচ্ছা করেনা।" 
আখেরাত তার জন্যেই যে উভয় প্রকার ইচ্ছা থেকে মুক্ত। অন্য আয়াতে আছে, 
>"যে ব্যক্তি পার্থিব জীবন ও তার সাজসজ্জা কামনা করে আমি তার আমল দুনিয়াতে পুরাপুরি দিয়া দেই। এবং তাতে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। তাদের জন্য আখেরাতে আগুন ছারা কিছুই নেই।" (সূরা হুদ : ১৫-১৬)
এই আয়াতও তার ব্যাপকতার মধ্যে জাকজমকপ্রীতিকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। কেননা এটা পার্থিব জীবনের সকল আনন্দের ছেয়ে বড় এবং সকল সাজসজ্জার ছেয়ে অধিক। হাদিসে বলা হয়েছে, -
> "ধনসম্পদ ও জাকজমকের মোহ অন্তরে এমনভাবে মুনাফেকী উৎপন্ন করে,  যেমন বৃষ্টিরপানি শাক-সব্জিকে উৎপন্ন করে।"
আরো বলা হয়েছে, 
>"দু'টি বাঘ ছাগলের পালে ছেরে দিলে এতটুকু ক্ষতি করেনা, যতটুকু ক্ষতি করে ধন-সম্পদের মোহ মুসলমান ব্যাক্তির ধর্মপরায়ণতার।"
হজরত আলী (রঃ)-কে বলা হয়েছে,  খেয়ালখুশী ও প্রশংসাপ্রীতির কারণেই মানুষ ধ্বংস হয়েছে। আল্লাহ পাকের কাছে দোয়া এই,  তিনি আপন কৃপা ও অনুগ্রহে আমাদেরকে এই বিপদ থেকে মুক্ত রাখুন।
জানা উচিত যে,  'মাল'  ও 'জাহ্'  হচ্ছে দুনিয়ার দু'টি স্তম্ভ। 'মাল' মানে উপকারী বস্তু সমুহের মালিক হওয়া, 'জাহ্'  বলা হয় সেইসব অন্তরের মালিক হওয়াকে,  যাদের কাছ থেকে সন্মান ও অনুগত্য কামনা করা হয়। মালদার ও ধনী সেই ব্যাক্তিকে বলা হয়, যে টাকা পয়সার ক্ষমতা রাখে এবং এর মাধ্যমে নিজের সমস্ত উদ্দেশ্য, খায়েশ ও মানসিক কামনা-বাসনা পূর্ন করতে পারে। এমনিভাবে 'যশশীল'  তথা প্রভাবশালী সেই ব্যাক্তিকে বলা হয়, যে মানুষের অন্তরকে এমনভাবে বশীভুত করে নেয় যে তাদের দ্বারা যে কোন মতলব যতেচ্ছ সিদ্ধ করতে পারে। অর্থসম্পদ যেমন বিভিন্ন পেশা ও কারিগরি দ্বারা অর্জন করা হয, তেমনি মানুষের অন্তরও বিভিন্ন প্রকার  কাজ কারবারের মাধ্যমে আকৃষ্ট হয়। অন্তর যখন বিশ্বাস করে যে, অমুক ব্যক্তির মধ্যে অমুক বিষয়ে পূর্ণতাগুণ রয়েছে, তখন অন্তর তার বশীভূত হয়েযায়। এখানে সেই গুনটি বাস্তবেও পূর্ণতা গুন হওয়া শর্ত নয়।  বরং ব্যক্তির মতে ও তার বিশ্বাসে পূর্ণতাগুণ হওয়াই যতেষ্ট। মাঝে মাঝে অন্তর এমন বিষয়কেও পূর্ণতাগুণ বলে বিশ্বাস করে, যা বাস্তবে পূর্ণতাগুণ নয় ; কিন্তু অন্তরসংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মধ্যে সেটাকে পূর্ণতাগুণ বলে নিশ্চিত রূপে বিশ্বাস করে নেয়। এ কারনে অন্তর তার অনুগত হয়ে যায়। কেননা  অনুগত্য হচ্ছে অন্তরের একটি অবস্থা- যা বিশ্বাসের অনুগামী হয়ে থাকে। সুতরাং যেমন বিশ্বাস হবে, তেমনি অবস্থা দেখা দেবে।
যে ব্যক্তি ধন-সম্পদের মহব্বত পোষন করে, সে যেমন চায়যে তার কাছে বাদী-গোলাম থাকুক, তেমনি যশপ্রিয় ব্যক্তিও চায়, সকল মানুষ তার গোলামী করুক এবং তাদের অন্তরের উপর তার সর্বময় ক্ষমতা প্রতিষ্টিত হোক;  বরং যশপ্রিয় ব্যক্তি যা চায়, তা আরো বেশী। কেননা সম্পদশালী ব্যক্তি বলপূর্বক বাদী-গোলামের মালিক হয়। বাদী-গোলামরা মন থেকে কোন সময় কারো ক্রীতদাস হতে চায়না। কিন্তু যশপ্রিয় ব্যক্তির অনুগত্য মানুষ সানন্দে গ্রহন করে। স্বাধীন ব্যক্তি নিজের মনের আগ্রহে তার গোলাম হয়, এবং তার গোলামী ও অনুগত্যকে গর্বের বিষয় মনে করে। এ থেকে জানা গেল যে, 'জাহ'  শব্দের অর্থ মানুষের অন্তরে আসন প্রতিষ্ঠিত হওয়া;  অর্থাত অন্তরেকোন ব্যক্তির কোন পূর্ণতা গুনের বিশ্বাস সৃষ্টি হয়ে যাওয়া। সুতরাং পূর্ণতার বিশ্বাস যে পরিমানে হবে, সেই পরিমানেই অনুগত্য হবে এবং যে পরিমানে অনুগত্য হবে, সেই পরিমানে মানুষের অন্তরের উপর আদিপত্য বিস্তৃত হবে। ক্ষমতা যত বেশী হবে, আনন্দ ও জশপ্রীতি তত অধিক হবে। এ পর্যন্ত 'জাহ'  শব্দের অর্থ বর্ণিত হল। এখন এর ফলাফল দেখা উচিত।
'যশ'  তথা প্রভাব-প্রতিপত্তির এক ফল হচ্ছে প্রশংসা কীর্তন করা, যা ব্যক্তি কারো পূর্ণতাগুণে, সে তার প্রশংসা করার ব্যাপারে চুপ থাকেনা।
প্রতিপত্তির আরেকটি ফল হচ্ছে, খেদমত করা ও সাহায্য-সহায়তা করা। বিশ্বাসী ব্যক্তি আপন বিশ্বাস অনুযায়ী নিজেকে বিস্বস্ত ব্যক্তির খেদমত ও সাহায্যে নিয়োজিত রাখে এবং গোলামের ন্যায় তার অনুগত হয়ে থাকে। এ ছারা 'যশ' ও প্রভাব-প্রতিপত্তির অন্যতম ফলাফল হচ্ছে বিশ্বস্ত ব্যক্তিকে অগ্রণী মনে করা। তার সাথে ঝগড়া-বিবাদ না করা,  তাকে সন্মান প্রদর্শন করা এবং মজলিসে উত্তম যায়গায় বসানো।

পরবর্তী পর্ব

যশ ও রিয়া - (৩) খ্যাতিহীনতার ফযীলত



যশ ও রিয়া (পর্ব - ৩)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দীন - ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

খ্যাতিহীনতার ফযীলত
রসূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেন, - 
>"অনেক বিক্ষিপ্তকেশী ধূলি-ধূসরিত চাদরওয়ালা লোক রয়েছে, যাদের দিকে কেউ ভ্রূক্ষেপ করেনা, অথচ যদি তারা আল্লাহর নামে কসম খেয়ে কোন কথা বলে ফেলে,  আল্লাহ্ তা বাস্তবায়িত করে দেন। যদি বলে ইলাহী আমি তোমার কাছে জান্নাতপ্রার্থনা করি,  তবে আল্লাহ্ তাদেরকে জান্নাতই দিবেন এবং দুনিয়াতে কিছুই দেবেননা।" 
হজরত আবুহুরায়রা (রদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু) থেকে বর্ণিত আছে জান্নাতি তাঁরাই,  যাদের কেশ এলোমেলো এবং পোশাক দু'টি মাত্র চাদর। যদি তারা শাসকদের কাছে যেতে চায় কেউ যেতে দেয়না। বিবাহ করার প্রস্তাব দিলে কেউ তাদের প্রস্তাবের প্রতি ভ্রূক্ষেপ করেনা। তাদের অভাব অনটন তাদের বুকের মধ্যেই ঘুরাফের করে। কিয়ামতে তাদের নুর বন্টন করা হলে সমস্ত মানুষের জন্য যতেষ্ট হয়ে যাবে।
বর্ণিত আছে,  একবার হজরত ওমর (রদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু) মসজিদে নববীতে প্রবেশ করে দেখলেন,  মুয়াজ ইবনে জাবল রদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু রসূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর রওজা মুবারকে বসে কাঁদছেন। তিনি কাঁদার কারন জিজ্ঞাসা করলে মুয়াজ (রদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু) বললেন,  আমি রসূল-আল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-উনাকে বলতে শুনেছি, 
>"সামান্য রিয়াও শির্ক। আল্লাহ্ তা'আলা এমন আত্মগোপনকারীদের পছন্দ করেন,  যারা উধাও হয়ে গেলে কেউ তাদের খোঁজ করেনা। আর সন্মুখে এলে কেউ তাদেরকে চিনেনা। তারা হেদায়েতের প্রদীপ।"
মুহম্মদ ইবনে সুয়ায়দ (রহঃ) বর্ণনা করেন, একবার মদিনা মনোয়ারায় খরা ও দুর্ভিক্ষ দেখা দিল। জনৈক সাধু ব্যাক্তি মসজিদে নববীতে থাকত এবং দোয়া করত। একদিন সকলেই দোয়ায় রত ছিল,  এমন সময় জনৈক পুরাতন ও ছিন্ন বস্ত্র পরিহিত ব্যাক্তি আগমন করল। সে এসে সংক্ষেপে দু'রাকআত নামাজ পড়ল এবং হাত তুলে দোয়া করল : ইলাহী আমি তোমাকে কসম দিয়ে বলছি এ মুহূর্তেই বৃষ্টি বর্ষন কর। লোকটি দোয়া শেষ করার আগেই আকাশ মেঘাচছন্ন হয়ে গেল। এবং দেখতে দেখতে এমন বৃষ্টি বর্ষিত হল যে,  মদিনার লোকজন ডুবে যাওয়ার আশংকায় ফরিয়াদ করতে লাগল। এর পর লোকটি আরজ করল :ইলাহী ! যদি তুমি মনে করযে এই পরিমান পানি তাদের জন্য যতেষ্ট,  তবে বৃষ্টি থামিয়ে দাও। তখনি বৃষ্টি থেমে গেল। এর পর লোকটি সেই সাধু ব্যাক্তির পেছনে পেছনে চলল এবং তার গৃহের সন্ধান করে ভোরেই তার খেদমতে গিয়ে বলল : আমি একটি উদ্দেশ্য নিয়ে আপনার কাছে এসেছি। তা এই যে,  আপনি আমার জন্য বিশেষভাবে দোয়া করুন। সাধু ব্যক্তি বলল : সুবহানাল্লাহ্ ! তুমি আমাকে দোয়া করতে বলছ ! তোমার অবস্থাতো কালই জানতে পেরেছি। এখন বল এ মর্তবা তুমি কিরূপে লাভ করলে ?  সে বলল : আমি আল্লাহ্ তা'আলার আদেশ ও নিষেধ মেনে চলেছি। তাই আমি তাঁর কাছে যেই প্রার্থনা করেছি তিনি তা কবুল করেছেন। 
হযরত ইবনে মাসুদ (রঃ) বলেন : হে লোক সকল জ্ঞানের ও হেদায়েতের প্রদীপ হও। নিজ নিজ ঘরে বসে থাক। পুরাতন কাপড় পরিধান কর যাতে আকাশের বাসিন্দারা তোমাদের চিনে এবং পৃথিবীর লোক তোমাদেরকে না চিনে। 
এক হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ্ তা'আলা বলেন : 
>"আমার ওলিদের মধ্যে সেই মুমিন ব্যক্তি অধিকতর ঈর্শার যোগ্য, যে নিজের উপর পরিবার পরিজনের বোঝা কম রাখে, নামাজে অংশগ্রহন করে,  পরোয়ারদেগারের এবাদত করে এবং গোপনে অনুগত্য কর। সে মানুষের মধ্যে এত সুখ্যাত নয় যে,  মানুষ তার প্রতি আংগুলি নির্দেশ করবে। এরপর সে এ অবস্থায় সবর করে।"

হযরত ফুযায়ল (রহঃ) বলেন,  যদি এমনভাবে থাকতে পারযে,  তোমাকে কেউ না চিনে, তবে তাই কর। তোমাকে কেউ না চিনলে তাতে কোন ক্ষতি নেই। কেউ তোমার প্রশংসা না করলেও কোন দোষ নেই। যদি তুমি মানুষের কাছে মন্দ হও এবং আল্লাহ্ তা'আলার কাছে ভাল হও। তবে এতেও কোন অনিষ্ট নেই।
উপরোক্ত হাদিস ও মনীষীর উক্তি থেকে খ্যাতির নিন্দা এবং খ্যাতিহীনতার ফজীলত পরিষ্কার রূপে বুঝা যায়। খ্যাতির আসল লক্ষ্য হচ্ছে জাঁকজমক তথা মানুষের অন্তরে আসন প্রতিষ্ঠা করা। এটা অনর্থের মূল। এখানে প্রশ্ন হয় যে, পয়গম্বর গণ, খোলাফায়ে রাশেদীন ও ইমামগণ সর্বাধিক খ্যাতনামা ব্যক্তিত্ব। তাঁদের খ্যাতির ছেয়ে অধিক খ্যাতি আর কি হবে ?  অতএব তাঁরা খ্যাতিহীনতার ফজীলত থেকে বঞ্চিত রয়ে গেলেন। এর জওয়াব এই যে,  যে খ্যাতি অর্জন করে নেয়া হয়, তাই মন্দ। কিন্তু কোনরূপ চেষ্টা-তদবীর ছারা যে খ্যাতি আল্লাহ্ তা'আলার পক্ষ থেকে পাওয়া যায়, তা নিন্দনীয় নয়।
 
পরবর্তী পর্ব

যশ ও রিয়া - (২) রিয়ার উৎপত্তিস্থল ও তৎসংশ্লিষ্ট বিষয়াদি



যশ ও রিয়া (পর্ব - ২)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দীন - ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

রিয়ার উৎপত্তিস্থল ও তৎসংশ্লিষ্ট বিষয়াদি -
জানা উচিত যে, প্রকৃত পক্ষে খ্যাতি চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়াকে বলা হয় 'জাহ' তথা ঝাঁকজমক। এরূপ খ্যাতি শুভ নয়। বরং অখ্যাত এবং নামনিশান শুন্য থাকা ভাল। তবে আল্লাহ্ তা'য়ালা যদি তাঁর দ্বীনেকে প্রচার করার সুখ্যাতি দান করেন এবং এতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির চেষ্টা-চরিত্রের কোন দখল না থাকে তবে এরূপ স্বতঃস্ফুর্ত খ্যাতিতে কোন দোষ নেই। হজরত আনাস (রঃ)-এর রেওয়ায়েতে রসুলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি  ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেন : 
>"অনিষ্টের জন্য এটাই যতেষ্ট যে, মানুষ কারো দ্বীন ও দুনিয়ার ব্যাপারে তার দিকে আংগুলি দ্বারা ইশারা করবে। কিন্তু আল্লাহ্ তা'আলা যাকে রক্ষা করেন তার কথা স্বতন্ত্র।"
হজরত হাসান (রঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করলে লোকেরা তাঁকে বলল : হে আবু সায়ীদ! আপনাকে দেখে মানুষ আপনার প্রতিও ইশারা করে। তিনি বললেন- এ হাদীসে এইশারা বুঝানো হয়নি;  বরং উদ্দেশ্য হল ধর্মে কোন কোন নতুনত্ব সৃষ্টি করার কারণে যদি কারোদিকে ইশারা করা হয় অথবা নতুন পাপাচার আবিষ্কার করার কারণে ইশারার পাত্র হয়ে গেলে তা অনিষ্টকর। মোট কথা হাদীসটির এমন ব্যাখ্যা দিলেন, যাতে কোন দোষ নেই।
হযরত আলী (রঃ) বলেন "ব্যয় কর খ্যাত করোনা এবং নিজের অস্তিত্বকে বাড়িয়ে উপস্থিত করোনা- যাতে মানুষ তোমাকে চিনে ফেলে এবং স্মরণ করে;  এবং নিজেকে গোপন কর এবং চুপ থাক। এতে মুক্তি নিহিত রয়েছে। ধার্মিক লোকেরা তোমার প্রতি সন্তুষ্ট থাকবে এবং পাপাচারীরা জ্বলে-পুড়ে মরবে।"

হযরত ইব্রাহীম ইবনে আদহাম বলেন : যে খ্যাতিকে ভাল মনে করে,  সে আল্লাহ্'কে চিনে না
হযরত আইয়ুব সখতিয়ানী (রহঃ) বলেন : যে পর্যন্ত কেউ তার বাসগৃহ মানুষের কাছে অজ্ঞাত থাকাকে পছন্দ না করবে,  সেপর্যন্ত আল্লাহ্ তায়ালার সত্যায়ন হয়না । খালেদ ইবনে মে'দানের ওয়াজের মজলিসে যখন অনেক লোক হয়ে যেত, তখন তিনি খ্যাতির ভয়ে মজলিশ থেকে উঠে চলে যেতেন ।
আবুল আলিয়ার কাছে তিন জনের বেশী হলে তিনি প্রস্থান করতেন ।
হযরত তালহা (রঃ) একবার দেখলেন,  তারসাথে দশজন লোক হেঁটে চলেছে । তিনি বললেন : এরা লালসার মাছি এবং দোযখের ফড়িং ।
হযরত সোলাইমান ইবনে হানযালা (রঃ) বর্ণনা করেন,  আমরা হযরত উবাই ইবনে কা'বের পেছনে পেছনে যাচ্ছিলাম । হঠাৎ হযরত ওমর (রঃ)-এর দৃষ্টি তাঁর উপর পতিত হল । তিনি দোররা নিয়ে তেড়ে আসলেন । হযরত কা'ব আরয করলেন : আমীরুল মুমিনীন ! আপনি কি করছেন, একটু ভেবে দেখুন ! যেরূপ সাড়ম্বরে তুমি গমন করছ,  সেটা তাবেয়ীদের জন্য ভ্রষ্টতার পথ এবং তোমার জন্য পরীক্ষা ।
হযরত হাসান (রঃ) বর্ণনা করেন,  হযরত ইবনে মসউদ একদিন গৃহ থেকে বের হলে অনেক লোক তাঁর পেছনে চলতে লাগল । তিনি তাদের দিকে মুখ করে বললেন :তোমরা আমার পেছনে আসছ কেন ?  আল্লাহ্'র কসম,  যে কারণে আমি আমার গৃহের দরজা বন্ধ রাখি,  তা যদি তোমাদের জানা হয়ে যায়,  তবে দু'টি লোকও আমার সাথে চলবেনা । 
হযরত হাসান (রঃ) একদিন বাড়ী থেকে বের হলে লোকজন তাঁর পিছনে চলতে লাগল । তিনি বললেন :আমার কাছে কোন প্রয়োজন থাকলে ভাল,  নতুবা আশ্চর্যনয় যে,  এ পিছনে চলা ইমানদারের অন্তরে কিছু অবশিষ্ট রাখবেনা । অর্থাৎ এতে আল্লাহ্'র মারেফত বিলুপ্ত হওয়ার আশংকা রয়েছে । বর্ণিত আছে,  এক ব্যক্তি ইবনে মাজরিযের সাথে সফরে গেল । অতঃপর তার কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার সময় আরয করল : আমাকে কিছু উপদেশ দিন । তিনি বললেন, সম্ভবপর হলে এটা কর : তুমি অপরকে চিনবে কেউ যেন তোমাকে না চিনে । পথ চলার সময় কেউ যেন তোমার সাথে না থাকে । তুমি অপরকে জিজ্ঞেস করবে,  কেউ যেন তোমাকে জিজ্ঞেস না করে ।
জনৈক বুজুর্গ বলেন,  আমি আবু কেলাবের সঙ্গে ছিলাম,  এমন সময় এক ব্যক্তি অনেক পোষাক পরিহিত হয়ে সেখানে এল । তিনি বললেন এই বাকশক্তিশীল গাধা থেকে বেঁচে থাক । অর্থাৎ খ্যাতি অন্বেষন করোনা । 
হযরত ছওরি (রহঃ) বলেন, পূর্ববর্তী বুযুর্গগণ দুটি খ্যাতি থেকে বেঁচে থাকতেন- একটি উৎকৃষ্ট পোশাক পরিচ্ছদের খ্যাতি এবং অপরটি ছিন্ন ও পুরাতন পোশাকের খ্যাতি । কেননা উভয় পোশাকের প্রতি মানুষের দৃষ্টি সমভাবে নিবদ্ধ হয় । বিশর (রহঃ) বলেন,  খ্যাতি পছন্দ করেছে এবং ধর্ম বরবাদ হয়নি এরূপ ব্যক্তি আমার জানা নেই । তিনি আরো বলেন,  যে খ্যাতি কামনা করে,  সে আখেরাতের স্বাধ পায়না ।
 
পরবর্তী পর্ব

বুধবার, ১৫ নভেম্বর, ২০২৩

যশ ও রিয়া - (১) সর্বাধিক ভয়াবহ বিষয় হল রিয়া ও গোপন খাহেশ



যশ ও রিয়া (পর্ব - ১)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দীন - ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

সর্বাধিক ভয়াবহ বিষয় হল রিয়া ও গোপন খাহেশ-
রসূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ মুবারক করেন-
>"আমার উম্মতের জন্য আমি যেসব বিষয়ের আশংকা করি তন্মধ্যে সর্বাধিক ভয়াবহ বিষয় হল রিয়া ও গোপন খাহেশ। অন্ধকার রাত্রিতে শক্ত পাথরের উপরে কাল পিপীলিকা চলাচল করলে যেমন তা কিছুতেই টের পাওয়া যায় না,  তেমনি এই গোপন খায়েশও অনুভুত হয়না। এ কারণে এর বিপদ সম্পর্কে বড় বড় আলেমগণও জানতে পারেন না। সাধারণ আবেদ মুত্তাকীদের তো কথাই নেই। এটা নফসের বিনাশকারী শক্তি ও গোপন প্রতারণা। যে সকল আলেম ও আবেদ আখেরাতের পথ অতিক্রম করতে চায় এবং তজ্জন্য খুব তৎপর হয়, তাদেরকে রিয়ায় লিপ্ত করা হয়। অর্থাৎ তারা নিজের নফসকে মুজাহাদা ও সাধনার মাধ্যমে পরাভুত করে কামনা বাসনা থেকে আলাদা করে নেয় এবং সন্দেহযুক্ত বিষয়াদি থেকে বাঁচিয়ে নেয়। এর পর নফসকে বলপুর্বক বিভিন্ন প্রকার এবাদতে মশগুল করে। ফলে তাদের নফস বাহ্যিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দ্বারা কোন বাহ্যিক গুনাহ করতে অক্ষম হয়ে পড়ে। নফস যখন মুজাহাদার পরিশ্রম থেকেমুক্তি পাওয়ার কোন উপায় দেখেনা, তখন এই পরিশ্রমের বিনিময়ে শান্তি, সস্তি ও আরামের অভিলাষী হয়।দুনিয়ার মানুষ যখন তাদেরকে মানতে এবং তাদের প্রতি সন্মান প্রদর্শন করতে শুরু করে, তখন নফস এক প্রকার আনন্দ অনুভব করে। এর পর তারা এলম, আমল ও এবাদত প্রকাশ করতে উৎসাহিত হয়ে যায়। আল্লাহ্ তা'আলা ভাল বলবেন কেবল এতেই তারা সবর করতে পারেনা। তারা দেখে মানুষের মধ্যে খ্যাত হয়ে গেছে- অমুক ব্যাক্তি কামনা বাসনা বর্জনকারী, সন্দেহযুক্ত বিষয়াদি থেকে আত্মরক্ষাকারী এবং কঠোর এবাদতে শ্রম স্বীকারকারী।
তারা আরো দেখে, অনেক মানুষ তাদের তারিফ ও প্রশংসা করে,  তাদেরকে শ্রদ্ধার চোখে দেখে,  তাদের সাক্ষাতকে বরকত মনে করে,  তাদের থেকে দোয়া নিতে আগ্রহী হয়,  দেখামাত্রই প্রথমে সালাম করে,  মজলিসের কেন্দ্রস্থলে আসন দেয়,  সন্মুখে বিনীত ও নম্র হয়ে থাকে এবং খেদমত ও অন্যকোন মতলবের কথা বললে তা করতে তৎপর হয়ে যায়। এই সব দেখে-শুনে তাদের নফস এমন আনন্দ পায়, যার উপরে কোন আনন্দ নেই। এ আনন্দের অতিশয্যে গুনাহ বর্জন করা তেমন কঠিন হয় না এবং অব্যাহতভাবে এবাদত করা খুব সহজ হয়ে যায়। তারাতো মনে করে,  তাদের জীবন আল্লাহর জন্য এবং তার ইচ্ছানুযায়ী এবাদতের জন্য। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তাদের জীবন সে সব কামনা বাসনা ও আনন্দের প্রত্যাশী হয়ে থাকে,  যা সুস্থ বিবেক ছারা কেউ জানে না। মানুষের সন্মান প্রদর্শনের কারণে যে আনন্দ তাদের অর্জিত হয়, তার দরুন আমলও এবাদতের সওয়াব সব বরবাদ হয়ে যায়। তারাতো নিজেদেরকে আল্লাহর নৈকট্যশীল মনে করে;  কিন্তু বাস্তবে তাদের নাম মুনাফিকদের তালিকায় লিপিবদ্ধ করা হয়। সুতরাং এটা নফসের এমন এক প্রতারনা,  যা থেকে সিদ্দিক ও নৈকট্যশীলগণ ছারা কেউ বাঁচতে পারেনা । রিয়া যখন এমন একটি অভ্যন্তরীন ব্যাধি এবং শয়তানের বড়ফাঁদ, তখন এর স্বরুপ স্থর,  প্রকার ভেদ এবং চিকিৎসা পদ্ধতি অবগত হওয়া একান্ত জরুরী।

পরবর্তী পর্ব

সোমবার, ১৩ নভেম্বর, ২০২৩

জ্ঞান ও জ্ঞানার্জন (২৪) শিক্ষকের আদব

 

জ্ঞান জ্ঞানার্জন ও জ্ঞানদানের মাহাত্ম্য (পর্ব- ২৪)
এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

শিক্ষকের আদব
জানা উচিত, জ্ঞানের ব্যাপারে মানুষের অবস্থা চার প্রকার, যেমন অর্থোপার্জনের ক্ষেত্রে মানুষের চার অবস্থা হয়ে থাকে। প্রথম, মানুষ অর্থ সৃষ্টি করে। তখন তাকে উপার্জনকারী বলা হয়। দ্বিতীয়, আপন উপার্জিত অর্থ সঞ্চয় করে, তখন সে ধনী হয়ে যায় এবং অন্যের মুখাপেক্ষী থাকে না। তৃতীয়, উপার্জিত অর্থ নিজের জন্যে ব্যয় করে, ফলে সে উপকৃত হয়। চতুর্থ, উপার্জিত অর্থ অন্যকে দেয়, তখন তাকে দাতা ও গুণী বলে গণ্য করা হয়। এই শেষ অবস্থা সকল অবস্থা থেকে শ্রেষ্ঠ।
জ্ঞানেরও তদ্রূপ চারটি অবস্থা রয়েছে-
এক, অর্জনের অবস্থা, দুই, অর্জিত জ্ঞানে এমন ব্যুৎপত্তি অর্জন করা যে, অন্যের কাছে জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন না থাকে, তিন, অর্জিত জ্ঞান সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করে তদ্বারা নিজে উপকৃত হওয়া এবং চার, সে জ্ঞান দ্বারা অন্যের উপকার করা।
শেষোক্ত অবস্থা সকল অবস্থা থেকে শ্রেষ্ঠ। কারণ, যেব্যক্তি জ্ঞান অর্জন করে, আমল করে এবং মানুষকে জ্ঞানদান করে— আকাশ ও পৃথিবীর রাজত্বে তাকেই মহান বলা হয়। সে সূর্যের মত, অপরকে আলো দান করে এবং নিজেও আলোকময়। সে মেশকের মত, অপরকে সুগন্ধিতে আমোদিত করে এবং নিজেও সুগন্ধিযুক্ত। আর যেব্যক্তি অপরকে শিক্ষা দান করে, কিন্তু নিজে আমল করে না, সে শাণের মত, লোহাকে ধারালো করে কিন্তু নিজে কাটে না, অথবা সূচের মত, যে অন্যের জন্যে পোশাক তৈরী করে, কিন্তু নিজে উলঙ্গ থাকে। মানুষ যখন শিক্ষাদানে মশগুল হয়, তখন সে একটি বিরাট কাজের দায়িত্ব গ্রহণ করে। তাই এর আদব ও নিয়মাবলী স্মরণ রাখা উচিত।
প্রথম শিষ্টাচার, ওস্তাদ শাগরেদদেরকে সন্তানের মত স্নেহ করবে। যেমন রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন :
>"সন্তানের জন্যে যেমন পিতা, আমিও তোমাদের জন্যে তেমনি।"
অর্থাৎ, শিক্ষক শাগরেদদেরকে আখেরাতের আগুন থেকে বাঁচানোর নিয়ত করবেন। এটা পিতামাতার তাদের সন্তানদেরকে দুনিয়ার আগুন থেকে বাঁচানোর তুলনায় অধিক গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্যেই শিক্ষকের হক পিতামাতার চেয়ে বেশী। কেননা, পিতামাতা সন্তানের ধ্বংসশীল জীবনের কারণ, আর শিক্ষক অক্ষয় জীবনের কারণ। শিক্ষক না থাকলে পিতামাতার কাছ থেকে অর্জিত বিষয় সন্তানকে স্থায়ী ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিত, কিন্তু শিক্ষক বলতে আমরা এমন ব্যক্তিকে বুঝব, যে আখেরাত শাস্ত্র শিক্ষা দেয়। অথবা দুনিয়ার শাস্ত্র আখেরাতের নিয়তে শিক্ষা দেয়- দুনিয়ার নিয়তে নয়। কেননা, দুনিয়ার নিয়তে শিক্ষা দান করা মানে নিজে ধ্বংস হওয়া এবং অপরকে ধ্বংস করা। এমন শিক্ষকতা থেকে আল্লাহ হেফাযত করুন। এক পিতার পুত্ররা যেমন পারস্পরিক মহব্বত ও সম্প্রীতির সাথে থাকে এবং লক্ষ্য অর্জনে একে অপরকে সাহায্য করে, তেমনি এক ওস্তাদের শাগরেদদের মধ্যে বন্ধুত্ব ও ভালবাসা থাকা উচিত। আখেরাত উদ্দেশ্য হলে শাগরেদরা এমনি হয়। কিন্তু দুনিয়া লক্ষ্য হলে তাদের পরস্পরের মধ্যে হিংসা ও শত্রুতা হয়ে থাকে। যারা দুনিয়ার নেতৃত্ব লাভের শিক্ষা গ্রহণ করে, তারা আল্লাহ তা'আলার এ উক্তির বাইরে-
>"এ মুমিনগণ পরস্পরে ভাই ভাই" এবং তারা এ উক্তির বিষয়বস্তুর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত :
>"যারা বন্ধু, তারা সেদিন পরস্পরের শত্রু হবে; কিন্তু খোদাভীরুরা শত্রু হবে না।"
দ্বিতীয় শিষ্টাচার হচ্ছে, শিক্ষাদানের ব্যাপারে শরীয়তের কর্ণধার রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর অনুসরণ করবে। অর্থাৎ শিক্ষার জন্যে কোন পারিশ্রমিক চাইবে না, কোন বিনিময়ের নিয়ত করবে না এবং কৃতজ্ঞতাও প্রত্যাশা করবে না । বরং কেবল আল্লাহর ওয়াস্তে এবং তাঁর নৈকট্য লাভের জন্যে শিক্ষা দেবে। শাগরেদের প্রতি অনুগ্রহ হচ্ছে— এরূপ মনে করবে না; বরং শাগরেদদের অনুগ্রহভাজন হওয়া এবং এরূপ মনে করা জরুরী যে, তুমি তাদেরই কারণে গৌরবের অধিকারী হয়েছ। তারা তাদের আত্মশুদ্ধির কাজ তোমাকে সমর্পণ করেছে এবং তোমাকে আল্লাহর নৈকট্য লাভের সুযোগ দিয়েছে; যেমন কোন ব্যক্তি তার ক্ষেত তোমাকে ধার দেয়, যাতে তুমি নিজের জন্যে তাতে ফসল উৎপন্ন কর।
বলাবাহুল্য, এখানে ক্ষেতওয়ালার উপকারের তুলনায় তোমার উপকার বেশী হবে । সুতরাং শিক্ষাদানে শাগরেদের তুলনায় ওস্তাদের সওয়াব যখন বেশী হয়, তখন শাগরেদের উপর অনুগ্রহ করার কোন মানে নেই। শাগরেদ না হলে ওস্তাদ এ সওয়াব কোথায় পেত? তাই সওয়াব ও প্রতিদান আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারও কাছে চাওয়া উচিত নয় । আল্লাহ তা'আলা বলেন :
>“বলে দিন, আমি তোমাদের কাছে কোন পারিশ্রমিক চাই না।”
কেননা, ধনদৌলত ও দুনিয়ার সামগ্রী দেহের খাদেম এবং মনের সওয়ারী। তারা সকলেই এলেমের খেদমত করে। অতএব যেব্যক্তি এলেমের বিনিময়ে ধন-দৌলত চাইবে, তার দৃষ্টান্ত এমন, যেমন কারও জুতায় নাপাকী লেগে গেছে, সে তা পরিষ্কার করার জন্যে মুখে ঘষা দিয়ে নেয়। বলাবাহুল্য, এতে যে খেদমতের যোগ্য, তাকে খাদেম করা হয় এবং যে খাদেম তাকে খেদমত পাওয়ার যোগ্য করা হয়। এটা চরম বিপ্লব। এ ধরনের লোক কেয়ামতে অপরাধীদের সাথে মাথা নীচু করে আল্লাহ তা'আলার সামনে দন্ডায়মান হবে।
মোট কথা, গৌরব ও সম্মান ওস্তাদের প্রাপ্য। এখন দেখ, যারা বলে, আল্লাহ তা'আলার নৈকট্য তাদের লক্ষ্য, ফেকাহ ও কালামশাস্ত্র শিক্ষাদানে তাদের দশা কি হবে? তারা ধন-সম্পদ ও প্রতিপত্তি ব্যয় করে এবং জায়গীর লাভের জন্যে রাজা-বাদশাহদের নানা রকম লাঞ্ছনা ভোগ করে। তারা এটা বৰ্জন করলে কেউ তাদেরকে জিজ্ঞেস করবে না এবং কেউ তাদের কাছে আসবে না। তদুপরি ওস্তাদ শাগরেদের কাছে আশা করে, সে তার প্রত্যেক বিপদে কাজে লাগবে, শুভাকাঙ্ক্ষীদেরকে সাহায্য করবে, অমঙ্গলকামীদের সাথে শত্রুতা রাখবে এবং তার জাগতিক প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রাদি গাধার ন্যায় বহন করবে। যদি শাগরেদ এসব বিষয়ে সামান্যও ত্রুটি করে, তবে ওস্তাদজী তার আন্তরিক দুশমন হয়ে যায়। এ ধরনের আলেম নেহায়েত নীচ ও হীন।
তৃতীয় শিষ্টাচার, ওস্তাদ শাগরেদকে উপদেশ দেয়ার ব্যাপারে কোন ত্রুটি করবে না। উদাহরণতঃ শাগরেদ যদি যোগ্যতা অর্জনের পূর্বে কোন মর্তবা লাভের পেছনে পড়ে অথবা জাহেরী এলেম অর্জন করার পূর্বে বাতেনী এলেমে ব্যাপৃত হতে চায়, তবে তাকে নিষেধ করবে। এরপর তাকে বলবে, জ্ঞান অন্বেষণ আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্যে করবে- প্রভাব প্রতিপত্তি অন্বেষণ ও গর্ব করার জন্যে নয়। এটা যে মন্দ, একথা যথাসম্ভব প্রথমেই তার মনে প্রতিষ্ঠিত করে দেবে। কেননা, পাপাচারী আলেমের মঙ্গল কম এবং অনিষ্ট বেশী হয়ে থাকে। সুতরাং যদি ওস্তাদ শাগরেদের অন্তর থেকে জেনে নেয়, সে দুনিয়া লাভের জন্যেই এলেম অর্জন করছে এবং ফেকাহশাস্ত্রে বিতর্ক করার এবং আহকামে মুনাযারার শিক্ষা লাভ করছে, তবে তাকে বিরত রাখবে এবং বলে দেবে, এগুলো আখেরাতের শিক্ষা নয় এবং এমন শিক্ষাও নয়, যার সম্পর্কে জনৈক বুযুর্গ বলেন : আমরা আল্লাহ ছাড়া অন্যের জন্যে এলেম শিখছি, কিন্তু এলেম আল্লাহ ছাড়া অন্যের জন্যে হতে অস্বীকার করেছে। এ ধরনের এলেম হচ্ছে এলমে তফসীর, এলমে হাদীস ও এলমে আখেরাত, যার মধ্যে পূর্ববর্তী মনীষীগণ মশগুল থাকতেন। যদি শাগরেদ দুনিয়ার উদ্দেশে এসব এলেম শেখে, তবে তাকে নিষেধ করবে না। কেননা, শাগরেদ ওয়ায়েয হওয়ার লোভে এবং মানুষকে তার দলভুক্ত করার আশায় এসব এলেম শিখতে তৎপর হয় এবং প্রায়ই শিক্ষাজীবনে এর পরিণতি সম্পর্কে অবগত হয়ে যায়। ফলে সে তার নিয়ত ঠিক করে নেয়। কারণ এর মধ্যে আল্লাহর ভয় সৃষ্টি এবং দুনিয়াকে তুচ্ছ ও আখেরাতকে বড় করে দেখার শিক্ষাও রয়েছে। এতে আশা করা যায়, পরিণামে শাগরেদ সঠিক পথে এসে যাবে।
ওস্তাদ যেসব বিষয়ের উপদেশ অন্যকে দেবে, সেগুলো নিজেও মেনে চলবে। শিক্ষা অর্জনের ক্ষেত্রে জনপ্রিয় হওয়া এবং জাঁকজমক সৃষ্টির বাসনা এমন, যেমন পাখী শিকারের জালের চারপাশে দানা ফেলে দেয়া হয়। আল্লাহ তা'আলা বান্দাদের এসব বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য রেখেছেন। তিনি কামভাব সৃষ্টি করেছেন, যাতে এর মাধ্যমে মানুষের বংশ বিস্তার অব্যাহত থাকে। জাঁকজমকপ্রীতি সৃষ্টি করার কারণও তাই যে, এর মাধ্যমে শিক্ষাদীক্ষা কায়েম থাকবে। এটা উল্লিখিত শিক্ষাসমূহের মধ্যে হতে পারে। কিন্তু নিছক বিরোধপূর্ণ বিষয়াদি শিক্ষা করা এবং কালাম শাস্ত্রের কলহ বিবাদ আয়ত্ত করা এমন যে, মানুষ এগুলোতেই মশগুল থাকলে এবং অন্য শিক্ষা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলে অন্তরের কঠোরতা, আল্লাহ থেকে গাফেল হয়ে গোমরাহীতে পড়ে থাকা ও জাঁকজমক প্রীতিই বৃদ্ধি পাবে। এছাড়া কোন উপকার হবে না। তবে আল্লাহ তা'আলা আপন রহমতে যাকে বাঁচিয়ে নেন অথবা যে এগুলোর সাথে অন্য ধৰ্মীয় শিক্ষা ও মিলিয়ে নেয়, তার অবশ্য উপকার হতে পারে।
একবার সুফিয়ান সওরীকে কেউ দুঃখিত দেখে কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন : আমরা দুনিয়াদারদের জন্যে বাণিজ্য কেন্দ্র হয়ে গেছি। তারা এলেম শিক্ষা করার জন্যে আমাদের পেছনে পড়ে। এরপর যখন শিখে ফেলে, তখন বিচারক, গভর্নর অথবা দারোগা নিযুক্ত হয়ে যায়।
চতুর্থ শিষ্টাচার, শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে উত্তম ও সঠিক পন্থা হল, শাগরেদকে কুচরিত্র থেকে যতদূর সম্ভব ইঙ্গিতে ও সস্নেহে নিষেধ করবে। কঠোর ভাষায় এবং ধমকের সুরে শাসাবে না। কেননা, স্পষ্ট ভাষা ভয়ভীতির পর্দা সরিয়ে দেয় এবং বিরুদ্ধাচরণে সাহস যোগায়। সেমতে ওস্তাদকুল শিরোমণি রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করেন :
>“মানুষকে ছাগলের লেজ চূর্ণ করতে নিষেধ করা হলে তারা তা অবশ্যই চূর্ণ করবে আর বলবে, আমাদেরকে এ কাজ থেকে নিষেধ করার মধ্যে নিশ্চয়ই কোন রহস্য আছে।”
হযরত আদম ও হাওয়ার কাহিনী এ বিষয়ের চমৎকার সাক্ষী। কাহিনী জেনে নেয়ার জন্যে আমরা তোমাকে এটা স্মরণ করিয়ে দেইনি, বরং তুমি এ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে সতর্ক হয়ে যাও। স্পষ্ট ভাষায় না বলার আরেক কারণ, যারা প্রখর বুদ্ধিসম্পন্ন ও মেধাবী, তারা ইঙ্গিতে বললেও অর্থ বুঝে নেয় এবং বুঝে নেয়ার খুশী তাদেরকে আমল করতে উৎসাহিত করে- যাতে অন্যেরা জানে, বিষয়টি তার বুদ্ধিমত্তায় ধরা পড়েছে।
পঞ্চম শিষ্টাচার, ওস্তাদ যে শাস্ত্র শিক্ষা দেয় তার উপরের শাস্ত্রসমূহের প্রতি শাগরেদের মন বীতশ্রদ্ধ করে না তোলা। উদাহরণতঃ যারা অভিধান শিক্ষা দেয়, তাদের অভ্যাস শাগরেদের সামনে ফেকাহকে মন্দ বলা এবং যারা ফেকাহ শিক্ষা দেয়, তাদের অভ্যাস হাদীস ও তফসীর শাস্ত্রের নিন্দা করা। তারা বলে হাদীস ও তফসীর নিছক ইতিহাসগত এবং শ্রবণের সাথে সম্পর্কযুক্ত। এতে বিবেকের কোন দখল নেই। কালামশাস্ত্রীরা ফেকাহকে ঘৃণা করে এবং বলে : ফেকাহশাস্ত্র একটি শাখাগত ব্যাপার। এতে মহিলাদের মাসিকের কথা বর্ণিত হয়। এটা কালাম শাস্ত্রের মর্যাদা কিরূপে পেতে পারে, যাতে আল্লাহর সেফাত সম্পর্কে আলোচনা করা হয়? ওস্তাদদের এ অভ্যাস খুবই মন্দ, যা থেকে বেঁচে থাকা উচিত। যে ওস্তাদ এক শাস্ত্র শিক্ষাদানের দায়িত্ব নেয়, তার উচিত শাগরেদের মনে তার উপরের শাস্ত্র শিক্ষা করার পথও খুলে দেয়া।
ষষ্ঠ শিষ্টাচার, ওস্তাদ যেন এমন কোন কঠিন বিষয় বর্ণনা না করেন, যা হৃদয়ঙ্গম করতে শাগরেদের জ্ঞানবুদ্ধি অক্ষম হয়ে পড়ে, যাতে শাগরেদ ওস্তাদের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে না পড়ে অথবা তার বুদ্ধিবিভ্রাট না ঘটে। এ ব্যাপারে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর অনুসরণ করা উচিত। তিনি বলেন : আমরা পয়গম্বরগণ যেন মানুষকে তাদের স্তরে রেখে তাদের বুদ্ধি জ্ঞান অনুযায়ী তাদের সাথে কথা বলি- সেরূপ আদেশ আমাদেরকে দেয়া হয়েছে। সুতরাং শাগরেদ ভালরূপে বুঝবে- নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত ওস্তাদ শাগরেদের সামনে কোন বিষয়ের স্বরূপ প্রকাশ করবে না। রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : যখন কেউ কোন সম্প্রদায়ের কাছে এমন কথা বলে, যা তাদের বোধগম্য নয়, তখন তাদের কিছু লোকের জন্য এটা ফেতনা হয়ে যায়। একবার হযরত আলী (রাঃ) তাঁর বুকের দিকে ইশারা করে বললেন : এর মধ্যে অনেক জ্ঞান-বিজ্ঞান রয়েছে, যদি এগুলোর সমঝদার থাকে। অর্থাৎ, আমি এসব জ্ঞান বিজ্ঞান প্রকাশ করি না। কারণ, সমঝদার নেই। তিনি সত্যই বলেছেন : নেক বান্দাদের অন্তর রহস্যের আধার। এ থেকে জানা গেল, আলেম যা জানে, তা যে কোন ব্যক্তির কাছে প্রকাশ করা উচিত নয়। এটা তখন, যখন শিক্ষার্থী বুঝে, কিন্তু উপকৃত হওয়ার যোগ্যতা রাখে না। আর যখন বুঝেই না, তখন তার কাছে না বলা অধিক সঙ্গত। ঈসা (আঃ) বলেন : শূকরের গলায় মণি-মাণিক্য পরায়ো না। জ্ঞান-বিজ্ঞান মণি-মাণিক্যের চেয়ে উত্তম এবং যেব্যক্তি জ্ঞানকে খারাপ মনে করে, সে শূকরের চেয়ে অধম, এজন্যেই জনৈক বুযুর্গ বলেছেন : প্রত্যেককে তার বুদ্ধির মাপকাঠি অনুযয়ী মাপ এবং তদনুযায়ী তার সাথে কথা বল, যাতে তুমি তার কাছ থেকে বেঁচে থাক এবং এবং সে তোমার দ্বারা উপকৃত হয়। নতুবা সে মনোবলের সংকীর্ণতার কারণে মানবে না। জনৈক ব্যক্তি এক আলেমকে কোন কথা জিজ্ঞেস করলে তিনি জওয়াব দিলেন না। প্রশ্নকারী বলল : আপনি কি রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর এ হাদীস শুনেননি, "যেব্যক্তি উপকারী এলেম গোপন করে, কেয়ামতে তার মুখে আগুনের লাগাম পরানো হবে"। আলেম বললেন : লাগামের কথা রাখ এবং চলে যাও। যদি কোন সমঝদার আসে এবং এলেম গোপন করি, তখন সে আমাকে লাগাম পরিয়ে দেবে। আল্লাহ তাআলা বলেন :
>"তোমরা তোমাদের ধন-সম্পদ নির্বোধদের হাতে সমর্পণ করো না। এতে হুশিয়ার করা হয়েছে, এলেম যেব্যক্তিকে খারাপ করে দেয় এবং বিভ্রান্তিতে ফেলে, তাকে এলেম থেকে বিরত রাখা উত্তম।" অযোগ্য ব্যক্তিকে কোন বস্তু দেয়া যোগ্যকে না দেয়ার তুলনায় কম জুলুম নয়; বরং উভয় কাজ সমান জুলুম।
সপ্তম শিষ্টাচার, যখন শাগরেদের অবস্থা জানা যায় যে, তার বুদ্ধি-শুদ্ধি কম, তখন ওস্তাদ তাকে তার উপযুক্ত স্কুল বিষয় বলে দেবেন এবং এতে সূক্ষ্ম কথাও আছে, একথাও তাকে বলবেন না। কেননা, এরূপ বললে সেই স্থূল বিষয়ে শাগরেদের আগ্রহ স্তিমিত হয়ে যাবে। তার মন বিক্ষিপ্ত হবে এবং বলবে, তাকে শিক্ষাদানে কুণ্ঠাবোধ করা হচ্ছে। নিজের ধারণায় প্রত্যেক ব্যক্তি মনে করে, সে প্রতিটি সূক্ষ্ম জ্ঞানের উপযুক্ত । প্রত্যেকেই আল্লাহ তাআলার প্রতি এজন্যে সন্তুষ্ট যে, আল্লাহ তাকে পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান বুদ্ধি দান করেছেন। অথচ বাস্তবে সেই বেশী নির্বোধ, যে তার বুদ্ধি পূর্ণ হওয়ার ধারণায় বেশী আনন্দিত হয়। এ থেকে জানা যায়, সাধারণ লোকদের মধ্যে যদি কেউ শরীয়ত অনুসারী হয় এবং পূর্ববর্তী মনীষীদের কাছ থেকে বর্ণিত বিশ্বাসসমূহ নতুন ব্যাখ্যা ছাড়াই তার অন্তরে প্রতিষ্ঠিত থাকে, তবে তার বিশ্বাসকে বিক্ষিপ্ত করা উচিত নয়; বরং তাকে তার কাজে মশগুল থাকতে দেয়া উচিত। কেননা, তার সামনে বাহ্যিক ব্যাখ্যা উল্লেখ করা হলে সে সাধারণের গণ্ডি থেকে বের হয়ে যাবে এবং বিশিষ্ট লোকদের মধ্যে দাখিল হওয়া তার জন্যে সহজ হবে না। ফলে তার মধ্যে ও গোনাহের মধ্যে যে আড়াল ছিল, তা দূর হয়ে যাবে। এর পর সে পুরোপুরি অবাধ্য শয়তান হয়ে নিজে ধ্বংস হবে এবং অন্যকেও ধ্বংস করবে। সুতরাং সাধারণের সামনে সূক্ষ্ম জ্ঞানের স্বরূপ বর্ণনা করা উচিত নয়; বরং তাদেরকে কেবল এবাদত এবং যেসব কাজ তারা করে, তাতে ঈমানদারী শিক্ষা দেয়া সমীচীন। কোরআনের বিষয়বস্তু অনুযায়ী জান্নাতের আগ্রহ এবং দোযখের ভয় দ্বারা তাদের অন্তর পূর্ণ করে দেয়া উচিত। তাদের সামনে কোন সন্দেহের অবতারণা করা যাবে না। কেননা, অধিকাংশ সন্দেহ তাদের মনে আটকে থাকে এবং তা বের হওয়া কঠিন হয়। ফলে তারা বরবাদ হয়ে যায়। সারকথা, সাধারণ লোকদের জন্যে বিতর্কের দ্বার উন্মোচিত করা উচিত নয়।
অষ্টম শিষ্টাচার, ওস্তাদ স্বীয় এলেম অনুযায়ী আমল করবেন। তার কথা ও কাজের মধ্যে গরমিল থাকতে পারবে না। কারণ, এলেম অন্তরের চক্ষু দ্বারা জানা যায়, আর আমল বাহ্যিক চক্ষু দ্বারা। বাহ্যিক চক্ষু দ্বারা দেখে এমন লোক অনেক। এমতাবস্থায় আমল এলেমের বিপরীত হলে হেদায়েত হবে না। যেব্যক্তি নিজে এক কাজ করে এবং অপরকে তা ক্ষতিকারক বলে করতে নিষেধ করে, মানুষ তার সাথে উপহাস করে এবং সেই কাজ করতে অধিক আগ্রহী হয়। তারা বলে, এ কাজটি ভাল ও আনন্দদায়ক না হলে ওস্তাদজী করেন কেন? ওস্তাদ ও শাগরেদ বাঁশ ও তার ছায়ার মত। যদি বাঁশ নিজে সোজা না হয়, তবে ছায়া সোজা হবে কিরূপে? আল্লাহ তাআলা বলেন :
>তোমরা কি লোকদেরকে সৎকাজের আদেশ কর এবং নিজেদেরকে ভুলে যাও?"
এতদসত্ত্বেও আলেমের উপর গোনাহের শাস্তি জালেমের তুলনায় বেশী হয়। কেননা, আলেম গোনাহে লিপ্ত হলে এক বিশ্ব গোনাহে লিপ্ত হয়ে যায়। মানুষ তার অনুসরণ করে। যেব্যক্তি কোন কুরীতি আবিষ্কার করে, তার উপর নিজের এবং যারা এ কুরীতির অনুসরণ করে তাদের গোনাহ্ বর্তে থাকে। এ জন্যেই হযরত আলী (রাঃ) বলেন : দু'ব্যক্তি আমার কোমর ভেঙ্গে দিয়েছে— এক, সেই আলেম, যে তার ইজ্জত হারিয়ে ফেলেছে এবং প্রকাশ্যে গোনাহে লিপ্ত হয়েছে। দুই, সেই মূর্খ, যে দরবেশ হওয়ার ভান করছে। কেননা, মূর্খ দরবেশ হয়ে মানুষকে ধোঁকা দেয় এবং আলেম গোনাহ্ করে বিভ্রান্তি ছাড়ায়।

পরবর্তী পর্ব-
ভাল ও মন্দ আলেমের পরিচয়

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...