সোমবার, ২০ মে, ২০২৪

দাকায়েকুল আখবার- (৩০) বেহেশ্তী বাহন বোরাকের বিবরণ



📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ৩০)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

বেহেশ্তী বাহন বোরাকের বিবরণ-
হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, বোরাক এক প্রকার বেহেশতী জানোয়ার । ইহার দুইটি পাখা আছে। ইহা আকাশে ও পৃথিবীতে উড়িতে সক্ষম। ইহার মুখ মানুষের মত ও আরবী ভাষায় কথাবার্তা বলিবে। মুখমণ্ডল সুপ্রশস্ত ও সিং অত্যন্ত মোটা হইবে, কিন্তু উভয় কর্ণদ্বয় সবুজ জবরজদ নির্মিত অত্যন্ত চিকন হইবে। উহার লেজ গাভীর লেজের মত লোহিত স্বর্ণাভ ও শরীর গরু কিংবা ময়ূরের মত এবং ইহার আকৃতি গর্দভ হইতে বড় ও খচ্ছর হইতে ছোট হইবে। বিদ্যুৎসম দ্রুতগামী হইবে! এইজন্য ইহাকে বলা হইবে বোরাক বা বিদ্যুৎ।
হুযুর করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উহাতে চড়িবার ইচ্ছা করিলে ইহা নড়াচড়া করিয়া বলিবে, “আমার আল্লাহর মান-সম্মানের শপথ, হাসেমী, কোরায়েশী, আবতায়ী বংশের নবী-আবদুল্লাহর পুত্র হযরত মুহাম্মদ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-কে ভিন্ন অন্য কাহাকেও আমার পিঠে সওয়ার লইতে আমি দিব না।” তখন মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিবেন, “ওহে বোরাক! সেই হাসেমী, আবতায়ী ও কোরায়েশী হযরত মুহাম্মদ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) হইলাম আমিই।”
তারপর মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বোরাকে সওয়ার হইয়া আরশের নীচে পৌছিয়া সিজদায় পড়িয়া যাইবেন! আল্লাহ তা'আলা তাঁহাকে সম্বোধন করিয়া বলিবেন, “হে মুহাম্মদ! মস্তক উত্তোলন করুন! কেননা আজ এবাদতের দিন নহে। আজ পাপ-পুণ্যের বিনিময়ে বেহেশত-দোযখ লাভ ও হিসাব নিকাশের দিন। মাথা উঠাইয়া নিজ উম্মতের জন্য শাফায়াত করুন। আপনার শাফায়াত কবুল করা হইবে। তারপর হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ফরিয়াদ করিবেন, “হে আল্লাহ! আপনার মর্যাদার শপথ, আমি কি শুধুমাত্র স্বীয় উম্মতের জন্যই শাফায়াত করিব?" আল্লাহ তা'আলা তাঁহাকে প্রবোধ দিয়া বলবেন, “হে মুহাম্মদ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)! আপনি যাহাতে সন্তুষ্ট থাকেন তাহাই হইবে। যেমন আল্লাহ পাক এরশাদ করিয়াছেন- (“ওয়ালা ছাউফা ইউত্বিকা রাব্বুকা ফাতারদ্বা”।) "আপনার পালনকর্তা আপনাকে এত প্রাচুর্য দেবেন যে, আপনি সন্তুষ্ট হয়ে যাবেন।"।(সুরা আদ-দোহা : ৫)
তারপর আল্লাহ তা'আলা আকাশকে প্রবল বারি বর্ষণের নির্দেশ দিবেন। সঙ্গে সঙ্গে চল্লিশ দিন পর্যন্ত অনর্গল বৃষ্টিপাত হইবে। ফলে প্রত্যেক জিনিসের উপর বারহাত পুরু পানি জমিবে। সেই পানির দ্বারা আল্লাহ তা'আলা সমস্ত জীবকে শস্য-দানার মত তড়িৎ পুনরাকৃতি দান করিবেন এবং আকাশ ও যমিনকে একত্রে জড়াইয়া হাতের মুঠিতে তুলিয়া বলিবেন, “বল, অদ্যকার বাদশাহী কাহার? সবাই নিরুত্তর থাকিবে। পুনঃপুনঃ তিনবার জিজ্ঞাসা করিয়াও যখন উত্তর মিলিবে না, তখন স্বয়ং তিনি ঘোষণা করিবেন, “কেবল মাত্র অনন্ত শক্তিশালী আল্লাহর জন্যই।” পুনরায় বলিবেন, “সেই গর্বোন্নত রাজা-মহারাজাগণ আজ কই? আর যাহারা আমার প্রদত্ত পদ ও ভোগ্যবস্তু ভোগ করিবার পরও আমি ব্যতীত অন্যের এবাদত করিয়াছে, তাহারাই বা আজ কোথায়?” তারপর পর্বতশৃঙ্গ তুলার মত উড়িয়া যাইবে এবং আল্লাহ তা'আলা পৃথিবীকে পরিবর্তন করতঃ উহাতে বেহেশতের বাগান ও সাদা রূপার মত বেহেশতে পরিবর্তন করিবেন হযরত আয়েশা (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, একদিন আমি রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-কে প্রশ্ন করিলাম, “যেদিন পৃথিবী পৃষ্ঠ পরিবর্তিত হইয়া যাইবে, সেদিন মানুষ কোথায় দাঁড়াইবে?” উত্তরে আঁ হযরত (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম), বলিলেন, “হে আয়েশা! তুমি একটি জটিল প্রশ্নের অবতারণা করিয়াছ। জানিয়া রাখ, সেদিন মানুষ পুলছিরাতের উপর অবস্থান করিতে থাকিবে।”

পরবর্তী পর্ব 

রবিবার, ১৯ মে, ২০২৪

দাকায়েকুল আখবার- (২৯) সৃষ্ট জগতের পুনরুত্থান



📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ২৯)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

সৃষ্টি জগতের পুনরুত্থান -
হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ যখন জীব জগতের পুনরুত্থানের আশা করিবেন, তখন জিব্রাইল (আঃ), হযরত মিকাইল (আঃ) হযরত ইস্রাফীল (আঃ) ও হযরত আজরাইল (আঃ)-কে পুনর্জীবিত করিলে হযরত ইস্রাফীল (আঃ) আরশের উপর হইতে সিঙ্গা হাতে তুলিয়া স্বীয় হস্তে ধারণ করিবেন। তারপর আল্লাহ তায়ালা বেহেশতের তত্ত্বাবধানকারী রেদওয়ান ফেরেশতার নিকট গমন করিতে নির্দেশ দিবেন। তাহারা উপস্থিত হইয়া বলিবেন, “হে রেদওয়ান! আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ অনুসারে হযরত মুহাম্মদ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ও তাঁহার ঈমানদার উম্মতের জন্য বেহেশতকে সাজাও।” অতঃপর তাহারা বেহেশত হইতে দুইটি বেহেশতী লেবাছ, লেওয়ায়ে হাম্দ ও একটি বোরাক আনয়ন করিবেন। চতুষ্পদ জন্তুর মধ্যে সর্বপ্রথম বোরাকই জীবিত হইবে। বোরাককে সজ্জিত করিবার জন্য আল্লাহ তা'আলা তাহাদিগকে নির্দেশ দান করিবেন; সুতরাং তাহার লাল ইয়াকুতে আচ্ছাদিত জিনপোষ, সবুজ জিনপোষ, জবরজদ তৈরী লাগাম এবং হলুদ ও সবুজ রংয়ের দুইটি পরিচ্ছদে ইহাকে সাজাইয়া হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর পবিত্র রওজার নিকট উপস্থিত করিতে বলিবেন; কিন্তু সুসমতল পৃথিবী পৃষ্ঠে পবিত্র রওজা শরীফকে চিহ্নিত করিতে না পারিলে অকস্মাৎ নূরে মুহাম্মদি রওজা শরীফ হইতে সুদূর আকাশের প্রান্ত পর্যন্ত খাম্বার মত জাহির হইবে। ইহা দেখিয়া হযরত জিব্রাইল (আঃ) হযরত ইস্রাফীল (আঃ)-কে বলিবেন, “হে ইস্রাফীল! আপনি মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-কে আহ্বান করুন। কারণ আপনার দ্বারাই সমস্ত জীবজগৎ পুনর্জীবন লাভ করিবে।” উত্তরে তিনি বলিবেন, “হে জিব্রাইল! আপনিই সম্বোধন করুন! কেননা পৃথিবীতে আপনি তাঁহার দোস্ত ছিলেন। তিনি সলজ্জভাবে তাহা প্রত্যাখ্যান করিলে হযরত ইস্রাফীল (আঃ) হযরত মিকাইল (আঃ)-কে বলিবেন, “আপনি আঁ হযরত (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-কে পুনরুত্থানের নিমিত্ত আহ্বান করুন।” কিন্তু কোন সাড়া পাওয়া যাইবে না। তারপর সকলে হযরত আজরাইল (আঃ)-কে আহ্বান করিতে বলিবেন, “হে পবিত্র রূহ! পবিত্র শরীরে ফিরিয়া আসুন।” এইবারও উত্তর পাওয়া যাইবে না। পরিশেষে হযরত ইস্রাফীল (আঃ) জোর গলায় বলিবেন, “হে পবিত্র রূহ! আল্লাহ পাকের দীদার ও হিসাব নিকাশের জন্য উত্থিত হউন।” এমন সময় রওজা শরীফ চৌচির হইয়া যাইবে। ইহাতে বসিয়াই নবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) পবিত্র মাথা ও দাড়ি মোবারকের ধূলাবালি মুছিয়া থাকিবেন। হযরত জিব্রাইল (আঃ) তাঁহাকে হোল্লা পরিধান করিয়া বোরাকে আরোহণের জন্য আবেদন করিলে হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিবেন, “বল বন্ধু! আজ কোন দিন?" প্রত্যুত্তরে তিনি বলিবেন—“আজ বিরহ-বিচ্ছেদ ও মিলনের দিন! আজ তিরস্কার, অনুতাপ, লজ্জা ও অপমানের দিন!” 
হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিবেন, “হে দোস্ত! আমাকে সুসংবাদ প্রদান করুন। অন্যথায় আমি উঠিব না।” জিব্রাইল (আঃ) মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-উনাকে বোরাক, লওয়ায়ে হাম্দ, বেহেশতী হোল্লার কথা বিবৃত করিবেন, হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিবেন, “হে দোস্ত! আমি এই খবর জিজ্ঞাসা করি নাই। মূলতঃ আমার পাপী উম্মতদের কথা জিজ্ঞাসা করিতেছি? তাহাদিগকে কি আপনি পুলছিরাতের উপর ছাড়িয়া দিয়া আসিয়াছেন?” জিব্রাইল (আঃ) উত্তর করিবেন, “হে মুহাম্মদ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)। আল্লাহর শপথ, এই পর্যন্ত পুনরুত্থানের সিঙ্গা বাজানো হয় নাই।” ইহা শ্রবণান্তে আঁ হযরত (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিবেন, “এখন আমার প্রাণে শান্তি আসিয়াছে এবং আঁখিদ্বয় সুস্থির হইয়াছে।" অতঃপর তিনি হোল্লা ও তাজ পরিধান করতঃ বোরাখে আরোহণপূর্বক যাত্রা করিবেন।

পরবর্তী পর্ব-
বেহেশ্তী বাহন বোরাকের বিবরণ

দাকায়েকুল আখবার- (২৮) মাখলুকাতের লয়প্রাপ্তি



📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ২৮)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

মাখলুকাতের লয়প্রাপ্তি-
জীবকুলের নিধন কার্য শেষ হইলে আল্লাহ তায়ালা সর্বপ্রথম বিশাল পানিরাশি ধ্বংস করিবার জন্য আজরাইল (আঃ)-কে নির্দেশ দিবেন। যেমন ঘোষণা করিয়াছেন-“তাঁহার পবিত্র সত্তা ব্যতীত সমস্ত কিছুই বিলয় হইবে।” আজরাইল (আঃ) পানিকে বলিবেন, "হে পানিরাশি! তোমাদের মেয়াদ শেষ হইয়া গিয়াছে। অতএব তোমরা ধ্বংস হইয়া যাও!” পানি আর্তনাদ করিবার জন্য অনুমতি প্রার্থনা করিবে। অনুমতি লাভ করিয়া পরস্পর চীৎকার করিয়া বলিবে, “হে তরঙ্গরাজি ও আশ্চর্য বস্তুসমূহ! তোমরা কই! আল্লাহ তা'আলা তোমাদের ধ্বংসের নির্দেশ জারী করিয়াছেন। তোমরা লয়প্রাপ্ত হও।” তারপর আজরাইল (আঃ) উচ্চৈঃস্বরে নির্দেশ করিবেন এবং পানিরাশি নিশ্চিহ্ন হইয়া যাইবে, যেন দুনিয়াতে কখনও পানি ছিল না। তারপর পর্বতসমূহের নিকট আজরাইল (আঃ) উপস্থিত হইয়া বলিবেন, “হে পর্বতমালা! তোমাদের মেয়াদ ফুরাইয়া গিয়াছে। অতএব তোমরা ধ্বংস হইয়া যাও।” পর্বতমালা চীৎকার করিয়া বলিবে, “কোথায় আমার বিশাল শৃঙ্গ ও শক্তি বল। অবশ্যই আল্লাহর নিকট হইতে ধ্বংসের সংবাদ আসিয়াছে।” তারপর আজরাইল (আঃ) পর্বত শীর্ষে ভীষণ গর্জন করিবেন। ফলে সমস্ত পর্বতমালা আগুনের তাপে বিগলিত সীসার ন্যায় গলিয়া যাইবে। তারপর আজরাইল (আঃ) পৃথিবীকে বলিবেন, “হে পৃথিবী! তোমার মেয়াদ ফুরইয়া গিয়াছে; সুতরাং তুমি আল্লাহ তা'আলার নির্দেশে ধ্বংসপ্রাপ্ত হও।” পৃথিবী ক্রন্দন করিবার আরজ করিয়া অনুমতি লাভ করতঃ বলিবে, “হে আমার গচ্ছিত ধনরাশি, বৃক্ষ-লতা, নদী-সাগর ও লতাপাতা, তোমরা কই?” তারপর আজরাইল (আঃ) ভূমিতলে প্রচণ্ড গর্জন করিলে এই পৃথিবী ধ্বংসপ্রাপ্ত হইয়া যাইবে। সুউচ্চ দেওয়ালগুলি ধ্বসিয়া যাইবে এবং পানিরাশি অতলগর্ভে বিলীন হইবে। পরিশেষে আজরাইল (আঃ) আকাশে আরোহণ করতঃ ভীষণ নাদে গর্জন করিলে চন্দ্র-সূর্যে পূর্ণ গ্রহণের সূচনা হইবে এবং তারকাপুঞ্জ খসিয়া পড়িতে থাকিবে। অতঃপর আল্লাহ তায়ালা আজরাইল (আঃ)-কে জিজ্ঞাসা করিবেন, “হে আজরাইল! সৃষ্টজগতে আর কাহারা বাকী রহিয়াছে?” প্রত্যুত্তরে আজরাইল (আঃ) বলিবেন, “হে আল্লাহ! আপনি চিরস্থায়ী, চিরঞ্জীব। আপনি ব্যতিত হযরত জিবরাইল (আঃ), হযরত মিকাইল (আঃ), হযরত ইস্রাফীল (আঃ), আরশবাহী ফেরেশতাগণ ও এই নিকৃষ্ট বান্দা অবশিষ্ট রহিয়াছে।” তখন আল্লাহ তা'আলা নির্দেশ করিবেন, “হে আজরাইল! তুমি কি আমার এই ঘোষণা শ্রবণ কর নাই যে, আমি নূতন দিন এবং তোমার আমলের সাক্ষ্যদাতা, প্রতিটি প্রাণীই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করিবে। তুমি আমারই সৃষ্ট পদার্থ; সুতরাং তোমাকেও মরিতে হইবে।” তারপর আজরাইল (আঃ) হযরত জিব্রাইল (আঃ) ও অন্যান্যদের জান কবজ করিবার পর স্বয়ং নিজের রূহ কবজ করিয়া মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করিবেন।
অপর এক হাদীসে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ তা'আলা হযরত আজরাইল (আঃ)-কে নির্দেশ দিবেন, “হে আজরাইল! উঠ এবং হেহেশত ও দোযখের মাঝখানে মৃত্যুমুখে পতিত হও।' সেই সময় আল্লাহ্ তা\আলা ছাড়া অন্য কেহই জীবিত থাকিবে না! তারপর আল্লাহ্ তা'আলার রেজামন্দি অনুসারে দীর্ঘকাল পর্যন্ত জীবজগৎ ও বস্তুজগৎ বিলুপ্ত হইয়া থাকিবে। মোট কথা, আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছুই অবশিষ্ট থাকিবে না।

পরবর্তী পর্ব
সৃষ্ট জগতের পুনরুত্থান

দাকায়েকুল আখবার- (২৭) সিঙ্গা ফুৎকারে প্রাণী জগতের অস্থিরতা



📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ২৭)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

সিঙ্গা ফুৎকারে প্রাণী জগতের অস্থিরতা-
হযরত ইস্রাফীল (আঃ)-এর প্রথম ফুৎকারের ভীষণ শব্দে সমস্ত প্রাণী অস্থির, বেকারার হইয়া যাইবে; কিন্তু যাহাদিগকে আল্লাহ পাক রক্ষা করিবেন, তাহারা অস্থির হইবে না। প্রথম ফুৎকারের সাথে সাথে পাহাড়-পর্বত উড়িয়া যাইবে, নভোমণ্ডলও নদীবক্ষে আন্দোলিত নৌকার মত প্রকম্পিত ও দুলিতে থাকিবে। গর্ভবতীদের গর্ভ নষ্ট হইয়া যাইবে। মাতা স্বীয় দুগ্ধপোষ্য শিশুর কথা বিস্মৃত হইবে। আর শয়তানগণ এদিক সেদিক পলায়ন করিতে থাকিবে এবং তারকাপুঞ্জ তাহাদের উপর বর্ষিতে থাকিবে। চন্দ্র-সূর্য গ্রহণ আরম্ভ হইবে ও তাহাদের উপর নভোমণ্ডলকে বিস্তৃত করিয়া দেওয়া হইবে। বালক বৃদ্ধ হইয়া যাইবে। যেমন আল্লাহ পাক ঘোষণা করিয়াছেন- (“ইন্না যাল্যালাতুছ্ ছাআতি শাইউন্‌ আজীম”।) “অবশ্যই প্রলয় কম্পন অত্যন্ত ভয়াবহ জিনিস”। এই অবস্থা চল্লিশ বৎসর পর্যন্ত দীর্ঘ হইবে।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এই আয়াত পাঠ করিলেন যে, “হে মানব সকল! তোমাদের প্রতিপালককে ভয় কর, নিশ্চয়ই কিয়ামতের কম্পন অতি ভীষণ।” তারপর তিনি সাহাবাদিগকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “এই অবস্থা কখন হইবে বলিতে পার?” সাহাবাগণ আরজ করিলেন, “আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূল অধিকতর জ্ঞানী।” তিনি বলিলেন, “এই অবস্থা সেইদিন হইবে, যেদিন আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম (আঃ)-কে ডাকিয়া বলিলেন-'হে আদম উঠ এবং তোমার গোনাহগার সন্তানদিগকে দোযখে প্রেরণ কর। তখন হযরত আদম (আঃ) ফরিয়াদ করিবেন, হে আল্লাহ! প্রতি হাজার হইতে কি পরিমাণ প্রেরণ করিব?' আল্লাহ তা'আলা বলিবেন, 'হে আদম! প্রতি হাজার হইতে একজনকে বেহেশতের জন্য রাখিয়া অবশিষ্ট নয়শত নিরানব্বইজনকে দোযখে পাঠাও।' এইকথা সাহাবাদের নিকট অত্যন্ত ভারী মনে হইল এবং তাঁহারা বিষণ্নচিত্তে কাঁদিতে লাগিলেন। তারপর হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করিয়া সাহাবাদিগকে উদ্দেশ্য করিয়া বলিলেন, “আমার আশা, অবশ্যই তোমরা এক-চতুর্থাংশ বেহেশ্তী হইবে।” আঁ হযরত (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) পুনরায় বলিলেন, “আমি আশা করি নিশ্চয়ই তোমাদের অর্ধাংশ বেহেশ্তী হইবে।” ইহা শ্রবণ করিয়া সাহাবাগণ সন্তুষ্ট হইলেন। হুযুর করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আরও বলিলেন, “তোমরা খোশ খবরী গ্রহণ কর যে, তোমরা অন্যান্য উম্মতের তুলনায় একপাল উটের ভিতর একটি বকরী তুল্য হইবে এবং তোমরাই হাজারের মধ্যে একজন হইবে।”

হযরত আবু হোরাইরা (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করিয়াছেন, “আল্লাহ পাক তাঁহার একশত রহমতের একভাগ মাত্র জগতের কীট-পতঙ্গ, পশু-পক্ষী, মানব-দানব ইত্যাদিকে দান করিয়াছেন।” এই একভাগের ফলেই তাহারা পরস্পরে স্নেহ-মমতা, প্রেম-প্রণয় ও ভালবাসায় মত্ত হয়। আর আল্লাহ তা'আলা স্বীয় অবশিষ্ট নিরানব্বই রহমত দ্বারা রোজ কিয়ামতে বান্দাদের প্রতি রহমত ও দয়া করিবেন। তারপর আল্লাহ পাক হযরত ইস্রাফীল (আঃ)-কে মৃত্যুর জন্য সিঙ্গা ফুঁকিবার নির্দেশ দিবেন। অমনি তিনি, হে উলঙ্গ রূহ সকল! যথাশীঘ্র আল্লাহর হুকুমে বাহির হইয়া যাও, বলিয়া জোরে সিঙ্গার ফুৎকার প্রদান করিবেন। তখনই নভোমন্ডলের ও ভূমণ্ডলের সবকিছু মৃত্যু-মুখে পতিত হইবে; কিন্তু শহীদগণ আল্লাহর অভিপ্রায়ে রক্ষা পাইবে। যেমন এরশাদ হইয়াছে- (“ওয়ালা তাছাবান্নাল্লাজিনা কুতিলু ফী ছাবিলিল্লাহি আওয়াতা, বাল্ আহইয়াউন্ ইন্দা রাব্বিহিম ইউরযাকুন!”) "যাহারা আল্লাহর পথে নিহত হইয়াছে, তাহাদিগকে মৃত মনে করিও না, বরং তাহরা স্বীয় প্রতিপালকের নিকট জীবিত থাকিয়া উপজীবিকা আস্বাদন করিতেছে"। হাদীস শরীফে আছে যে, আল্লাহ তা'আলা শহীদগণকে পাঁচটি শ্রেষ্ঠ মর্যাদা প্রদান করিতেছেন, যাহা নবীগণকেও দান করেন নাই। এই প্রসঙ্গে হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করিয়াছেন – (১) সমস্ত শহীদগণের রূহ আল্লাহ তা'আলা কবজ করেন, কিন্তু আমার ও অন্যান্য নবীগণের রূহ আজরাইল (আঃ) কবজ করিয়া থাকেন। (২) মৃত্যুবরণের পর সমস্ত নবীগণকে গোসল দেওয়া হয়, এমন কি আমাকেও গোসল দেওয়া হইবে, কিন্তু শহীদগণকে গোসল দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। (৩) আমার এবং অন্যান্য নবীগণের জন্য ভিন্ন কাফন দিতে হয়, কিন্তু শহীদগণের ভিন্ন কাফনের দরকার হয় না। (৪) আমাকে এবং অন্যান্য নবীগণকে মৃত বলিয়া অভিহিত করা যায়, কিন্তু শহীদগণকে মৃত বলিয়া আখ্যায়িত করা যায় না। (৫) আমি এবং অন্যান্য নবীগণ আল্লাহ তা'আলার নিকট নিজ নিজ উম্মতের জন্য সুপারিশ করিবেন, কিন্তু শহীদগণ রোজ কিয়ামতে সমস্ত উম্মতের জন্য শাফায়াত করিবেন। 
আরও বর্ণিত আছে যে, রোজ কিয়ামতে আল্লাহ তায়ালা বারজনকে মৃত্যুর হাত হইতে রক্ষা করিবেন। তাহারা হইবেন -(১) হযরত জিব্রাইল (আঃ), (২) হযরত মিকাইল (আঃ), (৩) হযরত ইস্রাফীল, (আঃ) (8) আজরাইল (আঃ) এবং আরশ বহনকারী আটজন (৫-১২) বিশিষ্ট ফেরেশ্তা। তখন সৃষ্টজগতে জ্বিন-ইন্‌সান, পশু-পক্ষী ও মানব, শয়তান বলিতে কিছুই থাকিবে না। তারপর আল্লাহ তায়ালা আজরাইল (আঃ) কে উদ্দেশ্য করিয়া হুকুম করিবেন, “হে আজরাইল (আঃ)! আমি তোমার নিমিত্ত পূর্ববর্তী ও পরবর্তী মানুষের সমতুল্য সাহায্যকারী পয়দা করিয়াছি আর তোমাকে সাত আকাশ ও ভূমণ্ডলের সৃষ্ট পদার্থের সমতুল্য শক্তি প্রদান করিয়াছি। আজ তোমাকে গজব ও ক্রোধের লেবাছে সাজাইতেছি। যাও, এই মুহূর্তে ইবলিস্ শয়তানের উপর ভীমনাদে আক্রমণ কর এবং পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত মানব-জ্বিনের দ্বিগুণ, চতুগুণ কষ্ট সহকারে তাহার রূহ কবজ কর আর তোমার সহকারী সত্তর হাজার দোজখের ফেরেশতাকে 'লজ্জা' নামক দোজখ হইতে সত্তর হাজার জিঞ্জির সঙ্গে লইতে নির্দেশ কর।” তারপর আজরাইলের নির্দেশক্রমে দোযখের দরওয়াজা খুলিয়া যাইবে এবং সত্তর হাজার দোযখের ফেরেশ্তা সমসংখ্যক জিঞ্জির লইয়া তাঁহার সামনে উপস্থিত হইবে। তখন আজরাইল এমন ভয়ঙ্কর মূর্তি ধারণ করিবেন যে, যদি সাত আকাশ ও ভূমণ্ডলের অধিবাসীবৃন্দ তাঁহার সেই মূর্তি অবলোকন করিত, তবে সকলেই মরিয়া যাইত। আজরাইল (আঃ) অভিশপ্ত ইবলিসকে দেখিয়াই এমন জোরে ধমক দিবেন যে ইহাতে সে বেহুঁশ হইয়া যাইবে এবং ভয়ঙ্কর শব্দ করিতে শুরু করিবে। যদি নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের অধিবাসীগণ তাহার সেই বিকট শব্দ শ্রবণ করিত তবে সকলেই বেহুঁশ হইয়া যাইত।
অতঃপর আজরাইল (আঃ) তাহাকে রুদ্ররোষে বলিবেন, 'হে পাপিষ্ট! অপেক্ষা কর! এখনই তোকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করাইতেছি। তুই দীর্ঘদিন জীবমান ছিলি, আর তোর দ্বারা অনেক লোক পথভ্রষ্ট হইয়াছে।” ইহা শ্রবণ করিয়া ইবলিস্ পূর্ব প্রান্তে পলায়ন করিতে ছুটিয়া যাইবে, কিন্তু সেখানেও হযরত আজরাইল (আঃ) কে দেখিতে পাইবে। পুনরায় সে পৃথিবীর পশ্চিম প্রান্তে গিয়া আত্মগোপন করিতে চেষ্টা করিবে কিন্তু সেখানেও আজরাইল (আঃ)-কে দেখিতে পাইবে। পরিশেষে নিরুপায় হইয়া পৃথিবীর মধ্যস্থলে হযরত আদম (আঃ) এর কবরের পার্শ্বে উপস্থিত হইয়া বলিবে- 'হে আদম! তোমারই জন্য আমি লাঞ্ছিত ও অপমানিত হইয়াছি এবং আল্লাহর করুণা হইতে বঞ্চিত হইয়াছি। তারপর আজরাইল (আঃ) কে জিজ্ঞাসা করিবে, “হে আজরাইল! বল কিরূপে তুমি আমার প্রাণ বধ করিবে?" আজরাইল (আঃ) বলিবেন, 'হে দুরাত্মা ইবলিস! সায়ীর নামক জাহান্নামের শাস্তি ও আগুনের পাত্র দ্বারা তোর পাপাত্মাকে সংহার করিব।" তারপর ইবলিস্ ভূমিতে গড়াগড়ি দিতে থাকিবে। তখন দোযখের ফেরেশতাগণ কালালিবের অস্ত্র দ্বারা তাহাকে চতুর্দিক হইতে আঘাত করিতে থাকিবে এবং তীর ও বর্শার দ্বারা তাহাকে ক্ষত-বিক্ষত করিবে। আবশেষে জীবনপাতের কঠিন যন্ত্রণা ভোগ করিয়া ইবলিস্ মৃত্যুমুখে পতিত হইবে।

পরবর্তী পর্ব
মাখলুকাতের লয়প্রাপ্তি

দাকায়েকুল আখবার- (২৬) সিঙ্গায় ফুৎকার, পুনরুত্থান ও হাশরের বিবরণ



📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ২৬)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

সিঙ্গায় ফুৎকার, পুনরুত্থান ও হাশরের বিবরণ-
সিঙ্গার তত্ত্বাবধানকারী হইলেন হযরত ইস্রাফীল (আঃ)। আল্লাহ তা'আলা লৌহে মাহফুজকে আকাশ ও পৃথিবীর মাঝখানের দূরত্বের সাতগুণ বেশী প্রশস্ত সাদা মণিমুক্তা দ্বারা তৈরী করিয়া আরশের সহিত ঝুলন্ত রাখিয়াছেন। রোজ কিয়ামত পর্যন্ত যাহা কিছু সংঘটিত হইবে, সবকিছুই ইহাতে লিখা রহিয়াছে।

হযরত ইস্রাফিল (আঃ)এর চারিটি পাখা রহিয়াছে। প্রথমটি পূর্বদিকে, দ্বিতীয়টি বিস্তৃত রহিয়াছে। আর তৃতীয়টির উপর তিনি নিজে অধিষ্ঠিত আছেন। চতুর্থটি দ্বারা তিনি আল্লাহ তা'আলার ভয়ে নিজ মুখমণ্ডল এবং মাথা আচ্ছাদিত রাখিয়াছেন। আল্লাহ তা'আলার ভয়ে তিনি এতই ভীত ও লজ্জিত যে, নিজ পাখায় মাথা ঢাকিয়া আরশে মোয়াল্লার খাম্বা বুকে রাখিয়া আনত মস্তকে পড়িয়া রহিয়াছেন আর আল্লাহ তা'আলার ভযে ক্ষুদ্র পাখীর মত সংকুচিত থাকেন। আল্লাহ তা'আলা যখন ‘লৌহে মাহফুজে' কোন আদেশ-নিষেধ জারী করেন, তখন তিনি নিজ মুখের পর্দা খুলিয়া উহার দিকে লক্ষ্য করেন। হযরত ইস্রাফিল (আঃ) অন্যান্য ফেরেশ্তাদের তুলনায় আরশের অতি নিকটে রহিয়াছেন। তবুও তাঁহার এবং আরশের মধ্যে সত্তর হাজার পর্দা রহিয়াছে। একটি হইতে অন্যটির দূরত্ব পাঁচশত বৎসরের রাস্তা। অনুরূপ হযরত ইস্রাফিল (আঃ) ও হযরত জিব্রাইল (আঃ) এর মধ্যে সত্তর হাজার পর্দা রহিয়াছে এবং দুই পর্দার দূরত্ব পাঁচশত বৎসরের রাস্তা। তিনি স্বীয় দক্ষিণ রানের উপর সিঙ্গা সংস্থাপন করতঃ উহার অগ্রভাগ মুখে দিয়া আল্লাহ তা'আলার নির্দেশের অপেক্ষায় সতর্ক রহিয়াছেন। আল্লাহর নির্দেশে তিনি উহাকে সজোরে ফুৎকার দিবেন। যখন পৃথিবীর আয়ু শেষ হইয়া আসিবে, তখন উহা তাহার কপালের সন্নিকট হইবে। তারপর তিনি আল্লাহর নির্দেশে নিজ পাখাগুলি দেহের উপর একত্রিত করতঃ খুব জোরে সিঙ্গা বাজাইবেন। এমন সময় হযরত আজরাইল (আঃ) সাত যমিনের নীচে একহাত ও আকাশের উপরে অন্যহাত রাখিয়া ইহাদের বাসিন্দাদের প্রাণ সংহার, করিবেন। পরিশেষে পৃথিবীতে ইবলিস্ মরদুদ ও আকাশে হযরত জিব্রাইল (আঃ), হযরত মিকাইল (আঃ) হযরত ইস্রাফিল (আঃ) ও হযরত আজরাইল (আঃ) এবং আল্লাহ তা'আলা যাহাদিগকে রক্ষা করিবেন, তাহাদের ব্যতীত অন্য সকলেই মৃত্যুবরণ করিবে। যেমন পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করা হইয়াছে,- (“ওয়া নুফিখা ফিছ্ছুরী ফাছাইক্বা মান্ ফিছ ছামাওয়াতি ওয়াল্ আরদ্বি ইল্লা মান্ শাআল্লাহ্”)  "সিঙ্গা ফুৎকারের সাথে সাথে নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের সকলেই বেহুঁশ হইয়া পড়িবে; কিন্তু আল্লাহ তা'আলা যাহাদিগকে মর্জি করিবেন, তাহারা নিরাপদ থাকিবে"।

হযরত আবু হোরায়রা (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, বিশ্বনবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিয়াছেন—“আল্লাহ তা'আলা হযরত ইস্রাফিল (আঃ)-এর সিঙ্গাকে চারি শাখাবিশিষ্ট তৈরী করিয়াছেন। সিঙ্গার দুই শাখা পূর্ব-পশ্চিমে প্রলম্বিত রহিয়াছে। তৃতীয় শাখা সাত যমিনের নীচে ও চতুর্থ শাখা সাত 'আকাশের উপরে স্থাপিত। উহাতে রূহের আকারানুসারে অসংখ্য ছিদ্র রহিয়াছে; যেমন নবীগণের রূহের জন্য একটি, জ্বিনদের রুহের জন্য একটি, মানবাত্মার জন্য একটি, শয়তানের জন্য একটি ইত্যাদি। তাহা ছাড়া জীব-জন্তু, পোকা-মাকড় এমনকি মশা-মাছির জন্যও এক একটি ছিদ্র রহিয়াছে। হযরত ইস্রাফিল (আঃ)-কে আল্লাহ তা'আলা সেই কাজে নিয়োগ করিয়াছেন। অতএব তিনি সর্বদা সিঙ্গা মুখে করিয়া আল্লাহ তা'আলার নির্দেশের অপেক্ষায় আছেন। আল্লাহ তা'আলার হুকুম মাত্র তিনি সজোরে সিঙ্গা ফুৎকার দিবেন। হযরত ইস্রাফিল (আঃ) তিনবার সিঙ্গায় ফুৎকার দিবেন। প্রথমবারে সমুদয় সৃষ্টজীব ভীত ও আতঙ্কগ্রস্ত হইবে। দ্বিতীয় বারে সকলেই মৃত্যুবরণ করিবে। তৃতীয়বারে সবাই পুনরুত্থিত হইবে।”

হযরত হোজায়ফা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-কে জিজ্ঞাসা করিলেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)! সিঙ্গার ফুৎকারে মানুষের অবস্থা কিরূপ হইবে?" প্রত্যুত্তরে হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিলেন, “হে হোজায়ফা! আমার রূহ যাহার হাতে রহিয়াছে তাঁহার শপথ করিয়া বলিতেছি, সিঙ্গা ফুৎকার দেওয়া মাত্রই কিয়ামত সংঘটিত হইবে। এমন অবস্থা হইবে যে, মুখের নিকটে উঠানো লোকমা খাইবার অবসর মিলিবে না-ইহা হস্ত হইতে পড়িয়া যাইবে, পরিধেয় বস্ত্র সামনে থাকিবে সত্য কিন্তু পরিধান করিবার সাহস ও শক্তির অভাব হইবে। পানির পাত্র সামনে থাকিলেও উহা হইতে পানি পান করা অসম্ভব হইবে।

পরবর্তী পর্ব
সিঙ্গা ফুৎকারে প্রাণী জগতের অস্থিরতা-






দাকায়েকুল আখবার- (২৫) জান কবজের পর রূহের কবরে ও গৃহে আগমন



📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ২৫)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

জান কবজের পর রূহের কবরে ও গৃহে আগমন-
হযরত রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করিয়াছেন, “কোন বনী আদম মৃত্যুবরণ করিলে তৃতীয় দিন তাহার রূহ ফরিয়াদ করে, “হে আল্লাহ ! আমাকে নিজের দেহ-খাঁচা ও গৃহ পরিদর্শন করিবার অনুমতি প্রদান করুন।”  তারপর অনুমতি লাভ করিয়া রূহ কবরের দিকে ধাবিত হয় এবং দূর হইতে প্রত্যক্ষ করে যে, তাহার শরীর, মুখ, নাসিকা হইতে পানির স্রোত বহিতেছে। তখন সে অনেকক্ষণ পর্যন্ত ক্রন্দন করতঃ আরজ করে, ‘আমার প্রিয় অসার দেহ! তোমার বিগত জীবনের কথা স্মরণ হইতেছে কি? হায়! এই সমাধিস্থল কত না দুঃখ-বেদনা, আপদ-বিপদ, লজ্জা-অপমান ও চিন্তা-ভাবনার নির্জন নিবাস।' অতঃপর রূহ ফিরিয়া যায়।  পুনরায় রূহ পঞ্চম দিনে ফরিয়াদ করে, হে আল্লাহ! আমাকে নিজের পরিত্যক্ত দেহ-খাঁচা দর্শন করিবার অনুমতি দান করুন। আল্লাহর অনুমতির পর রূহ গোরস্থানে আগমন করতঃ দূর হইতে অবলোকন করে যে, তাহার শরীর, নাক ও মুখ হইতে রক্ত, গলিত পুঁজ ও পচা রক্ত ইত্যাদি বহিয়া পড়িতেছে। তখন রূহ চীৎকার করিয়া বলে, “হে আমার অসহায়, নিঃস্ব দেহ বন্ধু তোমার অতীত জীবনের সুখ ও শান্তির কথা মনে পড়িতেছে কি? হায়! এইস্থান কত না ভীতিপ্রদ! এইস্থান কেবল দুঃখ-কষ্ট, দুশ্চিন্তা, অপমান, কষ্ট-শ্রম, বিভিন্ন প্রকার পোকা-মাকড় ও শ্বাপদ সঙ্কুলের আড্ডা। পোকার দংশনে তোমার দেহ ক্ষত-বিক্ষত ও চামড়া আলগা হইয়া গিয়াছে এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের জোড়া শিথিল হইয়া পড়িয়াছে।' অতঃপর রূহ সেই স্থান হইতে ফিরিয়া যায়। অধিকন্তু সপ্তম দিবসে রূহ পুনরায় আরজ করে, ‘হে আল্লাহ! আমাকে আমার দেহ দর্শন করিবার অনুমতি দান করুন! আল্লাহ তা'আলার অনুমতি লাভ করিয়া রূহ গোরস্থানে গমন করতঃ দূর হইতে আবলোকন করে যে, এইবার সমস্ত শরীরে পোকা পড়িয়া আছে৷ তখন রূহ অত্যন্ত দুঃখ ভারাক্রান্ত হইয়া চীৎকার করিয়া বলে, 'হে আমার নিঃস্ব শরীর! তোমার অতীত জীবনের সুখ-দুঃখের কথা স্মরণে পড়িতেছে কি? আজ তোমার ছেলে-মেয়ে, বাপ-মা, ভাই-বন্ধু, ঘর-দুয়ার, সহায়-সম্পদ ও প্রতিবেশি স্বজনেরা কই? পৃথিবীর জীবনে ইহারা তোমার প্রতি সুপ্রসন্ন ছিল। অদ্য হইতে রোজ কিয়ামত পর্যন্ত উহারা তোমার ও আমার জন্য বিলাপ করতে থাকিবে।
হযরত আবু হোরায়রা (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, হযরত রাসূলে মাকবুল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করয়াছেন- “কোনও বিশ্বাসী বান্দার এন্তেকালের পর তাহার রূহ দীর্ঘ একমাস পর্যন্ত তাহার ঘর-বাড়িতে ঘুরিয়া ফিরিয়া প্রত্যক্ষ করে যে, তাহার পরিবার-পরিজনের সদস্যগণ তাহার পরিত্যক্ত ধন-সম্পদ কেমনভাবে নিজেদের মধ্যে বন্টন করিতেছে এবং কিরূপে তাহার দায়-দেনা আদায় করিতেছে। এইভাবে এক মাসের পর হইতে সুদীর্ঘ এক বৎসর পর্যন্ত রূহ্ শরীর ও গোরের মধ্যে ঘুরিয়া ফিরিয়া অবলোকন করে যে, কোন ব্যক্তি তাহার জন্য প্রার্থনা করিতেছে এবং কে তাহার জন্য চিন্তার ভিতর কাল যাপন করিতেছে।” তারপর ইস্রাফিলের সিঙ্গার ফুৎকার দেওয়া পর্যন্ত মুমিন বান্দার রূহ আত্মার যথার্থ স্থানে তুলিয়া রাখা হয়। এই প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা এরশাদ করিয়াছেন “তানায্যালুল মালাইকাতু ওয়াররূহু ফীহা বিইজনি রাব্বিহিম” অর্থাৎ লাইলাতুল কদরে ফেরেশতাগণ ও রূহ তাহাদের প্রতিপালকের অনুমতিক্রমে অবতীর্ণ হন। এইখানে রূহ শব্দের অর্থ হইল রহমত বা শান্তি, যাহা পৃথিবীর অধিবাসী বান্দাদের উপর নাযিল হয়। অতএব উক্ত শব্দটি রূহ্ কিংবা 'রাউহুন' উভয়ই ধরা যাইতে পারে; তখন ইহার প্রকৃত তাৎপর্য এই দাঁড়ায় যে , ফেরেশ্তাগণের সহিত রূহ অর্থাৎ আল্লাহ পাকের রহমত ও করুণা নাযিল হইয়া থাকে। মতান্তরে বলা যায় যে, রূহ হইল এক মর্যাদাশীল ফেরেশ্তার নাম। যিনি মুমিন বান্দার উপর আল্লাহর রহমত নাযিল করিয়া থাকেন। এই প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা এরশাদ করিতেছেন - “ইয়াউমা ইয়াকুমুর রূহ ওয়াল মালাইকাতু ছাফ্‌ফা” “সেইদিন রূহু এবং ফেরেশ্তামণ্ডলী কাতারবন্দী অবস্থায় দণ্ডায়মান হইবে। কিংবা রূহ্ অর্থ হইল বণি-আদমের রূহ্; অথবা রূহ অর্থ হযরত জিব্রাইল (আঃ)।” আরও বর্ণিত আছে যে , “হযরত মুহাম্মদ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর পবিত্র রূহ আরশের নিম্নদেশ হইতে লাইলাতুল কদরে দুনিয়াতে অবতরণ করিয়া তাঁহার প্রিয় মুমিন উম্মত নারী-পুরুষদিগকে সালাম ও দোয়া করিবার নিমিত্ত আল্লাহ পাকের নিকট অনুমতি প্রার্থনা করিয়া থাকেন। "আরও বর্ণিত আছে যে, রূহ অর্থ হইল মৃত বিশ্বাসী মুসলমানদের আত্মীয়-স্বজনদের রূহ, যাহারা দোয়া করিয়া থাকে, “হে আল্লাহ ! আমাদিগকে নিজেদের নিবাসস্থলে প্রত্যাবর্তন করতঃ নিজ পরিবার-পরিজনদের হালত দর্শন করিবার জন্য অনুমতি প্রদান করুন?”
সুতরাং আল্লাহ তা'আলার অনুমতি লাভ করতঃ তাহারা লাইলাতুল কদরে পূর্ব নিবাসস্থলে উপস্থিত হয়।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, মৃত লোকজন ঈদের দিন অথবা আশুরার দিন অথবা রাত্রিতে অথবা জুমআর দিন অথবা রজব মাসের প্রথম শুক্রবারে অথবা সাবান মাসের পনেরই তারিখের রাত্রে স্বীয় কবর হইতে বহির্গত হইয়া পরিবার-পরিজনদের সন্নিকটে উপস্থিত হইয়া বলে, “হে আমার পরিবার-পরিজনগণ! আজ কিছু টাকা-পয়সা অথবা খাদ্য সামগ্রী দান করিয়া আমার উপকার করিতে সচেষ্ট হও। আজ আমি ভিখারীর মত হইয়াই তোমাদের সমীপে আরজ করিতেছি। যদি তোমরা দান-খয়রাত করিতে সমর্থ না হও, তাহা হইলে এই পবিত্র রাত্রে অন্ততঃ দুই রাকায়াত নামাযে আমার কথা মনে কর!” তারপর রূহ অতিশয় দুঃখ সহকারে বলিয়া থাকে, “হায় ! হায় ! আমাদের জন্য কেহ দোয়া করিবার আছে কি? আমাদের নাম মনে করিবার মত কি কেহই নাই? হে আমাদের গৃহবাসীগণ! হে আমার ভার্যা! হে আমার সুবিশাল দালানের বাসীন্দাগণ! তোমাদের মাঝে আমাদের জন্য কোনও স্মরণকারী ও প্রার্থনাকারী আছে কি? আমরা আজ কবরে পড়িয়া রহিয়াছি। হে আমাদের অর্থ-সম্পদ বন্টনকারী ও সন্তান-সন্ততিদের হেয়কারী! আমাদের এই দুঃখ-বেদনা, অভাব-অভিযোগ ও দৈন্য-দুর্দশা সম্বন্ধে তোমাদের কেহই কি চিন্তা করে না? আমাদের কর্মানুষ্ঠান চিরতরে যদিও বন্ধ হইয়া পড়িয়াছে কিন্তু তোমাদের আমলনামা এখনও বন্ধ হয় নাই। হে প্রিয় বন্ধুগণ! আমাদের জন্য সামান্য রুটি দান বা প্রার্থনা করিতে বিস্তৃত হইও না। কারণ আমরা চির দরিদ্র হইয়া গিয়াছি।” মৃত ব্যক্তি যদি কিঞ্চিত দান, সদ্‌কাহ ও নেক লাভ করিতে পারে তাহা হইলে সে সুখী ও আনন্দিত হইয়া কবরে প্রত্যাবর্তন করে, অন্যথায় চিন্তিত ও বিমর্ষভাবে কবরে প্রবেশ করে।

হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, রূহ হৃদয়ে অথবা দেহস্থ কোন অংশে অবস্থান করে। ইহার প্রমাণস্বরূপ বলা যায় যে, কোন লোক নির্মম প্রহার অথবা কঠিন যন্ত্রণায়ও মৃত্যুমুখে পতিত হয় না আবার অন্য লোক সামান্য আঘাতেই মৃত্যুবরণ করে। ফলে বুঝা যায় যে, সেই আঘাতের স্থানেই রূহ তখন অবস্থান করিয়াছিল। অতএব স্পষ্টতঃই প্রমাণিত হয় যে, রূহ সর্বাবস্থায় শরীরের বিস্তীর্ণ অংশ জুড়িয়া বিরাজ করে না। তবে রূহ যদি কখনও সমস্ত শরীরে অবস্থান করে তাহা হইলে মৃত্যু সমস্ত শরীরে বিকাশ লাভ করিয়া থাকে। আল্লাহ তা'আলার এই নির্দেশই ইহার উজ্জ্বল প্রমাণঃ - “কুল ইউহয়ী হাল্লাজি আন্‌শাআহা আউয়্যালা মাররাহ্” হে নবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)!  আপনি “বলে দিন, যে আল্লাহ প্রথম সৃষ্টি করিয়াছেন, তিনিই পুনর্বার জীবিত করিবেন।” আর যদি ‘রূহ’ ও ‘রূহুয়ান’ এর প্রভেদ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়, তাহা হইলে উত্তরে বলিব যে, এই দুইয়ের মধ্যে কোনই পার্থক্য নাই উভয়ে একই বস্তু। যেমন হাত, পা শরীর হইতে আলাদা বস্তু নহে। উহার শরীরের সাথে যেখানে সেখানে বিচরণ করে, কিন্তু পার্থক্য শুধু এই যে, রূহ নড়াচড়া করে না আর ইহার কোন নির্দিষ্ট জায়গা নাই। আর‘ রূহুয়ান'-এর অবস্থানস্থল হইল ভ্রূযুগলের মধ্যস্থল। রূহ বাহির করিলে মানুষ মারা যায়, আর রূহুয়ান বাহির করিলে মানুষ নিদ্রার কোলে ঢলিয়া পড়ে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে, যদি একটি স্থির পানিপূর্ণ পাত্রে ছিদ্রপথে আলোক রশ্মি পতিত হয়, তবে উহার প্রতিবিম্ব স্পন্দন করিতে থাকে । অনুরূপভাবে রূহ বান্দার শরীরে প্রবেশ করিবার সাথে সাথে ইহার ছায়া আরশে প্রতিফলিত হয় এবং তখন বান্দা খাব দেখে। ইহাকে বলা হয় 'রূহুয়ান।' আর বান্দা যখন নিদ্রাচ্ছন্ন হয়, তখন 'রূহুয়ান' নাসিকার ছিদ্রপথে স্বর্গে আরোহণ করে এ ‘আলমে মালাকুতে' রূহের সান্নিধ্যে হাজির হয়। যদি প্রশ্ন করা হয় যে, ঈমানদার বান্দার রূহ আকাশে উত্থিত হইয়া আত্মার সন্নিধানে উহার খেদমতে ব্যাপৃত হয়, কিন্তু কাফেরের আত্মা তখন কোথায় অবস্থান করে? ইহার উত্তরে বলা হইয়াছে যে, কাফেরের আত্মাও ঊর্ধাকাশে আরোহণে সচেষ্ট হয়, কিন্তু শয়তান কর্তৃক বিকৃত হইয়া ইহারই সহিত ঘুরিতে আরম্ভ করে। যদি জিজ্ঞাসা করা হয় যে আত্মা যখন আকাশে উঠিয়া যায়, তখন শরীরে শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয় না কেন? উত্তর হইবে যে, যদিও রূহ শরীর হইতে পৃথক হইয়া যায় কিন্তু জীবনী শক্তি ও শ্বাস-প্রশ্বাস প্রক্রিয়া বাকী থাকে। কারণ এইগুলি রূহের মধ্যে শামিল নহে। যেমন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, “মানুষ, জিন, ফেরেশতা ও শয়তান এই চারি সম্প্রদায় হইল রূহসম্পন্ন জীব। তাহা ছাড়া অন্যান্য প্রাণী ও জীবের রূহ নাই, কেবল জীবনীশক্তি বা শ্বাস-প্রশ্বাস ক্রিয়া আছে।"

হযরত মুহাম্মদ ইবনে তিরমিজি (রাঃ) বলিয়াছেন যে, রূহ হইল দুই প্রকার। প্রথম প্রকার রূহ শ্বাস-প্রশ্বাস এবং জীবনীশক্তি পরিচালিত করে এবং দ্বিতীয় প্রকার রূহ চলাফেরা ও নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণ করে। এইজন্য নিদ্রিতাবস্থায় চলাফেরার শক্তি লোপ পায় এবং জীবনীশক্তি শ্বাসক্রিয়া সচল থাকে। আর রূহের স্থান সম্বন্ধে বলা হয় যে, রূহ কবজের পর ইহা হযরত ইস্রাফিল (আঃ) শিঙ্গার মধ্যে থাকেন। তাঁহার শিঙ্গায় আদি পিতা হযরত আদম (আঃ) হইতে শুরু করিয়া কিয়ামত পর্যন্ত সৃষ্টজীবের সংখ্যা অনুসারে ছিদ্র রহিয়াছে। সেখানে প্রবেশ করিবার পর পুরস্কারপ্রাপ্তকে পুরস্কার দেওয়া হইবে এবং তিরস্কারপ্রাপ্ত ব্যক্তি তিরস্কৃত হইবে।
হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, মুমিনের রূহ্ বেহেশতের মধ্যে সবুজ পক্ষীর শরীরে পুরিয়া রাখা হয় আর কাফেরের রূহ্ দোযখের সিজ্জিন নামক স্থানে অথবা দোযখের মধ্যস্থিত কালো পাখীর মধ্যে রাখা হয়। আরও বর্ণিত আছে যে, মুমিন বান্দার রূহ কবজ হইবার সাথে সাথে রহমতের ফেরেশতাগণ উহা অত্যন্ত সম্মান ও শ্রদ্ধা সহকারে সপ্তাকাশে উঠাইয়া লইয়া যায়। তখন আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হইতে ঘোষণা করা হয়, “হে ফেরেশতাগণ ! তোমরা তাহার নাম ‘ইল্লিন’ নামক পবিত্র গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করিয়া পুনর্বার শরীরের সঙ্গে সংযুক্ত করিবার জন্য পৃথিবীতে প্রেরণ কর।" নির্দেশানুসারে ফেরেশতাগণ তাহার রূহকে কবরের মধ্যে শরীরের সহিত সংযুক্ত করিয়া বেহেশতের দিকে একটি দরওয়াজা খুলিয়া দেয়। উক্ত দ্বারপথে সে স্বীয় বেহেশত অবলোকন করিতে করিতে রোজকিয়ামত পর্যন্ত সুখে অতিবাহিত করে। 
অপরদিকে কাফেরদের রূহ কবজ করিবার সঙ্গে সঙ্গে আযাবের ফেরেশতা সেই রূহসহ প্রথম আকাশে আরোহণ করিতে সচেষ্ট হইলে, আকাশের দ্বার বন্ধ হইয়া যায় এবং বলা হয় যে, ‘হে ফেরেশতাগণ! তাহার পাপাত্মাকে শরীরের সহিত সংযুক্ত করিয়া দাও।' সুতরাং ফেরেশতাগণ পাপাত্মাকে কবরে দেহের সহিত সংযুক্ত করিয়া দোযখের দিকে একটি দ্বার উন্মুক্ত করিয়া দেয়। ফলে সে দোযখের দুঃখাবাস অবলোকন করিতে করিতে রোজ কিয়ামত পর্যন্ত দুঃখে অতিবাহিত করিবে। এই প্রসঙ্গে মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করিয়াছেন যে, “মৃত ব্যক্তিরা তোমাদের পায়ের আওয়াজ বা জুতার শব্দ শ্রবণ করে কিন্তু তারা কিছুই বলিতে পারে না।”

কোন একজন আলেমকে প্রশ্ন করা হইয়াছিল যে, “হুযুর ! মৃত্যুর পর মানবাত্মার অবস্থান স্থল কোথায়?” উত্তরে তিনি বলিয়াছিলেন যে, নবীদের আত্মা জান্নাতুল আদনে এবং কবরের মধ্যে নিজ শরীরের জন্য শোকাকুল ও আল্লাহ পাকের জন্য সিজদাহ রত থাকে৷ শহীদের আত্মা বেহেশত রাজ্যের মধ্যস্থলে জান্নাতুল ফেরদাউসে সবুজ পাখীর দেহে অবস্থান করে। তাহারা স্বেচ্ছায় বেহেশৃতে বিচরণ করে এবং আরশের নিম্নস্থ ঝুলায়মান ফানুসে বিশ্রাম লাভ করে। আর মুসলমান শিশুদের রূহ বেহেশতি পাখীদের দেহে মেশাক পর্বতের সন্নিকটে কিয়ামত পর্যন্ত অপেক্ষা করে। আর মোশরেক ও মোনাফেকদের শিশুদের রূহ বেহেশতের আনাচে কানাচে পরিভ্রমণ করিতে থাকিবে, কিয়ামত পর্যন্ত তাহাদের নির্দিষ্ট কোন বাসস্থান থাকিবে না। তারপর তাহারা মুমিনদের খাদেম হইবে। ঋণগ্রস্ত ও পরদ্রব্য গ্রাসকারী মুমিনের আত্মা আকাশ ও বাতাসের মাঝে ঝুলন্ত অবস্থায় থাকে৷ ঋণ ও অন্যের হক আদায় না করা পর্যন্ত তাহাদের রূহ আকাশে উঠিতে সক্ষম হয় না অথবা বেহেশতে প্রবেশ করিতে পারে না। পাপে আকৃষ্ট ফাসেক মুসলমানদের আত্মাকে কবরের মধ্যে শরীরের সহিত আযাব করা হয় এবং বিধর্মী, কাফের ও মোনাফেকদের আত্মাকে জাহান্নামে সিজ্জিন নামক স্থানে আজীবন আযাব করা হয়।

আরও বর্ণিত আছে যে, রূহ্ একটি সূক্ষ্মদেহ সৃষ্টজীব। এইজন্য আল্লাহ তায়ালাকে “জিরূহ” বলা যায় না। কারণ সুনির্দিষ্ট গণ্ডিতে আল্লাহ তা'আলার বিরাজ করা কিছুতেই সম্ভব নহে। আরও বলা হইয়াছে যে, রূহ অস্তিত্বহীন; কিন্তু শরীরের অস্তিত্বের সঙ্গে ইহার মিল আছে। হাদীস শরীফে আছে যে, ইহুদীগণ নবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-উনাকে 'রূহ', 'আসহাবে কাহাফ' ও 'জুলকারনাইন' সম্বন্ধে প্রশ্ন করিয়াছিল৷ তাহাদের প্রশ্নের উত্তরে আল্লাহ তা'আলা সূরায়ে কাহাফ নাযিল করেন। উক্ত সূরায় রূহ্ সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা এরশাদ করিয়াছেন, - “হে নবী ! ইহুদীগণ আপনাকে রূহ্ সম্পর্কে প্রশ্ন করিতেছে, উত্তরে আপনি বলিয়া দিন যে, রূহ আমার প্রতিপালকের নির্দেশে নিয়ন্ত্রিত হয়। অর্থাৎ রূহ সম্বন্ধে আমি সম্পূর্ণ অজ্ঞাত৷ সে সম্বন্ধে আল্লাহই সুপরিজ্ঞাত। আর ইহাও বলা হইয়াছে যে, রূহ সৃষ্ট জীব নহে। মূলতঃ ইহা আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ বা বাণী মাত্র আল্লাহ তা'আলার “কুন” শব্দ হইতেই রূহের সৃষ্টি। বস্তুতঃ আল্লাহ তা'আলার আদেশ দুই শ্রেণীতে বিভক্ত। প্রথম শ্রেণীর আদেশকে ‘আমারে এলজমি' বলে। নামায, রোযা ইত্যাদি এবাদতের নির্দেশসমূহ এই শ্রেণীর আদেশের অন্তর্ভুক্ত। দ্বিতীয় শ্রেণীকে ‘আনরে তাকবীন' বলে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলিবেন- “তোমরা প্রস্তর কিংবা লৌহ অথবা অন্য কোনও বস্তুতে পরিণত হইয়া যাও,” আর তখনই তাহা হইয়া যায়। যেমন এরশাদ হইয়াছে “নায্যালা বিহি রূহল্ আমীন” অর্থাৎ পবিত্র কোরআন রুহুল আমিন ফেরেশতার মাধ্যমে নাযিল করিয়াছেন। তিনি আরও এরশাদ করিয়াছেন “ইয়াউমা ইয়াকুমুর রূহু ওয়াল মালাইকাতু ছাফ্‌ফ্ফাল্লা ইয়াতা কাল্লামুন৷ ইল্লা মান আজিনা লাহুর রাহমানু ওয়া কালা ছাওয়াবা ” 
অর্থাৎ : "যেদিন রূহ ও ফেরেশতাগণ নির্বাক অবস্থায় শ্রেণীবদ্ধভাবে দণ্ডায়মান থাকিবেন, কিন্তু যাহারা আল্লাহ কর্তৃক আদিষ্ট হইবেন এবং সত্য বলিবেন, তাহারাই সত্য বলিবেন ও সুপারিশ করিতে সক্ষম হইবেন"। এখানে রূহ অর্থ হযরত জিব্রাইল (আঃ)। যিনি একাই কাতারবন্দি হইয়া দণ্ডায়মান হইবেন। আল্লাহ তা'আলা আরও এরশাদ করিয়াছেন, “যখন আদম (আঃ)-এর সৃষ্টি সমাপ্ত করিলাম এবং আমার রূহ তন্মধ্যে ফুঁকিয়া দিলাম। ”এখানে রূহের অর্থ সৃষ্টির সম্মান প্রদান করিলাম। যেমন বলা হয় যে, “নাকাতুল্লাহ” অর্থাৎ আল্লাহর উষ্ট্রী এবং “বাইতুল্লাহ” অর্থাৎ আল্লাহর ঘর। উল্লিখিত সম্বন্ধও তেমন অর্থেই ব্যবহৃত নয়। আর আল্লাহ তা'আলা আরও এরশাদ করিয়াছেন, “আমি মরিয়মের বক্ষদেশে আমার রূহ ফুঁকিয়া দিলাম৷” এই সম্বন্ধও উপরোক্ত সম্মানাত্মক সম্বন্ধের অন্তর্ভুক্ত। আর ইহাও বলা হইয়াছে যে , “আমি মরিয়মের প্রতি হযরত জিব্রাইলের (আঃ) রূহ ফুঁকিয়া দিয়াছি।” এই কারণেই হযরত ঈসা (আঃ) কে আল্লাহ পাকের রূহ বলা হয়।

পরবর্তী পর্ব
সিঙ্গার ফুৎকার পুনরুত্থান ও হাশরের বিবরণ-

দাকায়েকুল আখবার- (২৪) জামাতে নামায আদায়ের ফজীলত



📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ২৪)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

জামাতে নামায আদায়ের ফজীলত- 
হযরত ছিদ্দিক ইবনে ওনায়েছ (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলিয়াছেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-তিনি এরশাদ করিতে শুনিয়াছি যে, একদিন হযরত জিব্রাইল (আঃ) তাঁহাকে বলিলেন, “হে মুহাম্মদ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)! আল্লাহ তা'আলা আপনাকে সালাম দিয়া আপনার উম্মতদিগকে এই খবর জানাইতে নির্দেশ করিয়াছেন যে, যাহারা জামাত বর্জন করিয়া মৃত্যুমুখে পতিত হইয়াছে তাহারা বেহেশতের সুগন্ধ পাইবে না, যদিও তাহাদের আমল সমস্ত পৃথিবীর মানুষ হইতে অধিক হইয়া থাকে। রোজ কিয়ামতে আল্লাহ তা'আলা তাহাদের কোন ফরজ ও নফল এবাদত কবুল করিবেন না। জামাত বর্জনকারী আপনার নিকট এবং সমস্ত ফেরেশতা ও মানবকুলে অভিশপ্ত। তাহা ছাড়া তৌরাত-জব্বুর ও ইঞ্জিল তাহার প্রতি অভিসম্পাত বর্ষণ করিয়া থাকে। এমনকি জামাত পরিত্যাগকারীর কোন প্রার্থনা কবুল হইবে না এবং সে ইহকালে ও পরকালে আল্লাহ তা'আলার রহমত হইতে বঞ্চিত থাকিবে। এই লোকেরাই আপনার উম্মতের মধ্যে নিকৃষ্ট এবং তাহারা মদ্‌খোর, দস্যু এবং সহস্র জ্ঞানী হত্যাকারী হইতেও অধম!”
হযরত নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করিয়াছেন, “তোমরা নাসারা এবং ইহুদীগণকে সালাম করিও, কিন্তু আমার উম্মতের ইহুদীগণকে সালাম করিও না।” 
হযরত সাদ্দাদ (রাঃ) আরজ করিলেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার উম্মতের ইহুদী কাহারা?” মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উত্তর করিলেন, 'যাহারা আযান শুনিয়াও জামাতে উপস্থিত হইল না, তাহারাই আমার উম্মতের মধ্যে ইহুদী।” তিনি আরও এরশাদ করিয়াছেন, “যে ব্যক্তি জামাত ভঙ্গকারীকে অল্প-বিস্তর খাদ্য বা রুটি দিয়া সাহায্য করিল, সে যেন নবীগণের হত্যায় সহায়তা করিল। সে মৃত্যুবরণ করিলে তাহাকে গোসল, জানাযা ও মুসলমানদের কবরস্থানে সমাহিত করিও না। এমন কি জামাত বর্জনকারী একাই যদি সমস্ত উম্মতের সমতুল্য নামায পড়ে, সকল আসমানী কিতাব পাঠ করে এবং সারা বৎসর রোযা রাখে আর সমস্ত উম্মতের সমতুল্য দান-খয়রাত করে, তবু সে বেহেশতের সুগন্ধ হইতে বঞ্চিত-হইবে। আল্লাহ তা'আলা জীবিত অথবা মৃত কোন অবস্থায়ই তাহার দিকে রহমতের দৃষ্টি নিক্ষেপ করিবেন না!”
জনাব হুযুর করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করিয়াছেন, “যে ব্যক্তি অজু করতঃ নামাযের জন্য মসজিদে প্রবেশ করিবে এবং জামাতের সহিত নামায আদায় করিবে, আল্লাহ তা'আলা তাহার গুনাহসমূহ মাফ করিয়া দিবেন।" অন্য এক বর্ণনায় আছে, 'যে ব্যক্তি নির্দিষ্ট সময়ে যথাযথ সুন্দররূপে রুকু-সিজদাহ করতঃ নামায আদায় করিবে, তাহার সম্মানার্থ আল্লাহ তা'আলা বিভিন্ন সময়ে তাহাকে পনরটি পুরস্কার প্রদান করিবেন। তন্মধ্যে ইহকালে তিনটি, মৃত্যুমুহূর্তে তিনটি এবং আল্লাহ তা'আলার দীদারে তিনটি। 
ইহকালে -
(১) ইহকালে আল্লাহ তা'আলা তাহার বয়স, খাদ্য-দ্রব্য বাড়াইয়া দিবেন এবং তাহার ও তাহার পরিবার পরিজনের রক্ষণাবেক্ষণ করিবেন। 
(২) মৃত্যুকালে তাহাকে ভয়-ভীতি হইতে নিরাপত্তা, শান্তি এবং বেহেশতে প্রবেশের সুসংবাদ প্রদান করিবেন।' যেমন পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তা'আলা ঘোষণা করিয়াছেনঃ - “নিশ্চয়ই যাহারা বলিয়াছে যে, আল্লাহই আমাদের প্রতিপালক তারপর ៖ উহাতে মৃত্যু পর্যন্ত স্থির রহিয়াছে, তবে মৃত্যুলগ্নে বেহেশতের ফেরেশ্তাগণ নাযিল হইয়া তাহাদিগকে ভয়-ভীতি হইতে নিরাপত্তা এবং অঙ্গীকারকৃত বেহেশত রাজ্যে প্রবেশের সুসংবাদ দান করিয়া থাকে।” 
(৩) আর কবরের মধ্যে মনকির নকীরের প্রশ্নোত্তর সহজ করিয়া দিবেন, কবরকে সুপ্রশস্ত করিবেন এবং বেহেশতের দিকে কবরের দরজা খুলিয়া দিবেন।

আর হাশরে -
(১) আল্লাহ তা'আলা তাহার চেহারাকে পূর্ণিমার চন্দ্রের মত সমুজ্জ্বল করিয়া উত্থিত করিবেন । যেমন পবিত্র কোরআনে এরশাদ হইয়াছে— “তাহাদের অগ্রে এবং পশ্চাতে নূর দৌড়াদৌড়ি করিতে থাকিবে। 
(২) আর তাহার আমলনামা ডান হাতে প্রদান করিবেন এবং 
(৩) তাহার হিসাব-নিকাশ অত্যন্ত সহজভাবে গ্রহণ করিবেন।

আর আল্লাহ তা'আলার দীদারে
(১) আল্লাহ তা'আলা তাহার উপর রাজী ও সন্তুষ্ট থাকিবেন, 
(২) আল্লাহ তা'আলা তাহাকে সালাম জানাইবেন এবং 
(৩) তাহার প্রতি রহমতের দৃষ্টি নিক্ষেপ করিবেন। যেমন পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করা হইয়াছে- “ছালামুন কাউলাম মির রাব্বির রাহীম্।” অর্থাৎ : “আল্লাহ তা'আলা তাহাদিগকে ছালাম প্রদান করিবেন।" আর সেইদিন কাহারও মুখমণ্ডল তরুতাজা থাকিবে এবং তাহারা আল্লাহ তা'আলার প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করিয়া থাকিবে। আর পাঞ্জেগানা নামাযে যাহারা অলসতা প্রদর্শন করিবে আল্লাহ তাহাদিগকে পনরটি শাস্তির ভাগী করিবেন। 
ইহলোকে- (১) তাহার হায়াত কমিয়া যাইবে, (২) তাহার আহার্য বস্তু হইতে বরকত উঠিয়া যাইবে এবং (৩) তাহার চেহারা হইতে নেককারের চিহ্ন মুছিয়া যাইবে।

মৃত্যুর সময়- 
(১) ক্ষুধা এবং তৃষ্ণায় সে বড়ই কাতর হইবে, আর নেহায়েত অপমান ও অপদস্থ করিয়া তাহার রূহ কবজ করা হইবে।

কবরের মধ্যে- 
(১) তাহার কবর এতই সংকীর্ণ করা হইবে যে, তাহার এক বাহু অন্য বাহুতে মিশিয়া যাইবে। 
(২) আর জাহান্নামের দিকে তাহার কবরের দ্বার খুলিয়া দেওয়া হইবে এবং 
(৩) বেহেশতে প্রবেশের সুসংবাদ হইতে সে বঞ্চিত হইবে এবং তাহাকে দোযখে প্রবেশের দুঃসংবাদ প্রদান করা হইবে।

আর হাশরের মাঠে –
(১) তাহার মুখমণ্ডল ঘোর কালবর্ণ করিয়া কবর হইতে উঠানো হইবে। 
(২) আল্লাহ তা'আলার রহমত হইতে নিরাশার চিহ্ন তাহার কপালে লিখিয়া দেওয়া হইবে এবং 
(৩) তাহাকে পিছনের দিক হইতে আমলনামা দেওয়া হইবে। আর,

আল্লাহ তা'আলার সাক্ষাতে-
(১) আল্লাহ তা'আলা তাহার সহিত কালাম করিবেন না, 
(২) আল্লাহ তা'আলা তাহার প্রতি নজর করিবেন না, 
(৩) তাহাকে শাস্তি হইতে রেহাই দিবেন না বরং তুলনামূলক কঠোর শাস্তিদান করিবেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা তিনি কোরআন শরীফে ঘোষণা করিয়াছেন- “ফাখালাফা মিম বা'দিহিম খালফুন আদ্বাউছ ছালাতা ওয়াত্তাবাউশ শাহাওয়াতি ফাছাউফা ইয়াল্‌ক্কাউনা পাইয়্যা।”
অর্থাৎ: “তাহাদের পশ্চাতে একদল লোক আসিয়াছিল যাহারা নামায বিনষ্ট করিয়াছিল, অতএব শীঘ্রই তাহারা স্বীয় পথভ্রষ্টতার শাস্তি ভোগ করিবে।”

হযরত আনাস (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, জনাব রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করিয়াছেন, “বান্দা যখন উত্তমরূপে অজু এবং বিশুদ্ধভাবে নিয়ত করতঃ নামায পড়িতে দণ্ডায়মান হয় এবং ‘আল্লাহু আকবার' বলে, তৎক্ষণাত সে সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশুর ন্যায় নিষ্পাপ হইয়া যায়। আর যখন সে 'আউজুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম' বলে তখন তাহার শরীরের অগণিত পশমতুল্য এক বৎসরের এবাদত লেখা হয়। আর সে যখন সূরা ফাতেহা পাঠ করে তখন সে যেন পবিত্র ‘হজ্জ ও ওমরাহ' সমাপ্ত করে। আর সে যখন ‘রুকু' করে তখন যেন সে তাহার ওজনের সমতুল্য স্বর্ণ আল্লাহ তা'আলার রাস্তায় খরচ করে। আর যখন সে 'ছামিআল্লাহু লিমান হামিদাহ্' বলে, তখন আল্লাহ তা'আলা তাহার প্রতি রহমতের নজর নিক্ষেপ করেন। সিজদাহর হালতে সে যখন 'ছোব্‌হানা রাব্বিয়াল আলা' পাঠ করে, তখন যেন সে একটি গোলাম আযাদ করে। আর যখন সে ‘তাশাহ্হুদ’ পাঠ করে তখন আল্লাহ তা'আলা তাহাকে সহস্র আলেম ও শহীদের পুণ্য প্রদান করেন। আর সালামান্তে নামায শেষ করিবার সাথে সাথে তাহার জন্যে বেহেশতের আটটি দরওয়াজা খুলিয়া দেওয়া হয়, সে বিনা হিসাবে নির্ভয়ে খুশীমত যে কোন দরওয়াজা দিয়া উহাতে প্রবেশ করিতে পারে।”

হযরত নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করিয়াছেন, “কুকুরের পাঁচটি স্বভাব প্রত্যেক বান্দার মধ্যে থাকা দরকার। যেমন- (১) কুকুর সদা-সর্বদা ক্ষুধার্ত ও অভুক্ত থাকে, সুতরাং সৎলোকেরও তদ্রূপ থাকা দরকার। (২) কুকুরের কোন নির্দিষ্ট বাসস্থান থাকে না, অতএব সৎলোকদেরও থাকা উচিত নহে। (৩) কুকুর সারারাত্র বিনিদ্রভাবে স্বীয় প্রভুর গৃহ পাহারা দেয়, তদ্রূপ সৎলোকেরও অহোরাত্র জাগ্রত থাকিয়া আল্লাহ পাকের এবাদত করা দরকার। (৪) কুকুর উত্তরাধিকারীদের জন্য কিছুই রাখিয়া যায় না, তেমনি সৎলোকেরও রাখা উচিত নহে। (৫) কুকুর স্বীয় প্রভুর দুয়ার হইতে শত সহস্রবার তাড়া খাইয়াও বিতাড়িত হয় না, অনুরূপভাবে বান্দাদেরও নানারকম দৈব দুর্বিপাকে পড়িয়া আল্লাহ পাকের নাম স্মরণ রাখা দরকার।”

হযরত আলী (রাঃ) বলিয়াছেন, যাহার জীবনযাত্রা কুকুরের ন্যায় তাহার জন্য সু-সংবাদ রহিয়াছে। কুকুরের মধ্যে দশটি অভ্যাস দেখিতে পাওয়া যায়। যেমন – (১) কুকুরের কোন ধন-সম্পদ নাই, (২) বিশ্বের কোথাও তাহার মান-সম্মান নাই, (৩) সমস্ত দুনিয়া জুড়িয়াই তাহার বাসস্থান, (৪) আর ইহা অধিকাংশ সময় চুপচাপ থাকে, (৫) অধিকাংশ সময়ই ইহা ক্ষুধার্ত থাকে, (৬) কুকুর দিবারাত্র ইহার প্রভুকে স্মরণ করিয়া থাকে, (৭) সে যাহা পায় তাহাতেই সন্তুষ্ট থাকে, (৮) শত সহস্র বেত্রাঘাত খাইয়াও সে প্রভুর দুয়ার পরিত্যাগ করে না, (৯) সে প্রভুর শত্রুকে আক্রমণ করে কিন্তু প্রভুর বন্ধুকে আক্রমণ করে না আর (১০) মৃত্যুকালে সে কিছুই পরিত্যাগ করিয়া যায় না। ইহাই হইল কুকুরের জীবনযাত্রার কতিপয় নিয়মাবলী। এই সকল স্বভাব সৎলোকদের মধ্যে থাকা দরকার।

পরবর্তী পর্ব
জান কবযের পর রূহের  কবরে ও গৃহে আগমন-

দাকায়েকুল আখবার- (২৩) কিরামান কাতেবীনের বিবরণ



📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ২৩)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

কিরামান কাতেবীনের বিবরণ-
হাদীস শরীফে বর্ণিত রহিয়াছে যে, প্রত্যেক মানুষের ডাইনে এবং বামে দুইজন ফেরেশতা রহিয়াছেন। তাহাদের মধ্যে দক্ষিণ পার্শ্বের ফেরেশতা তাঁহার সহকর্মীর অনুমতি ছাড়াই বান্দার নেক আমলগুলি লিপিবদ্ধ করেন; কিন্তু বামপার্শ্বের ফেরেশতা তাহার সহকর্মীর অনুমতি ছাড়া বান্দার পাপ কর্মগুলি লিপিবদ্ধ করিতে পারেন না। আল্লাহ তা'আলার বান্দা যখন উপবেশন করে তখন তাঁহারা তাহার ডাইনে এবং বামে উপবেশন করেন। আর মানুষ যখন চলাফেরা করে তখন একজন তাহার সামনে এবং অন্যজন তাহার পিছনে ও নিদ্রিত অবস্থায় মস্তক পার্শ্বে ও পদ-প্রান্তে থাকিয়া বান্দার তত্ত্বাবধান করেন।

অন্য এক হাদীসে আছে যে, বান্দার তত্ত্বাবধান করিবার জন্য পাঁচজন ফেরেশতা রহিয়াছেন। তন্মধ্যে দুইজন রাত্রিতে, দুইজন দিবাভাগে ও একজন সদাসর্বদা তাহার সহিত অবস্থান করেন। দিবাভাগের ফেরেশ্তাদ্বয় বান্দাকে দিবাভাগে মানব-দানব, শত্রু ও শয়তানের অনিষ্টকারিতা হইতে রক্ষা করেন। 
অন্য এক রেওয়ায়েতে আছে যে, বান্দার উভয় কাঁধে দুইজন ফেরেশতা  অবস্থান করেন। তাঁহারা তর্জনী অঙ্গুলিকে কলমরূপে, মুখগহ্বরকে দোয়াতরূপে, মুখের থুথুকে কালিরূপে এবং অন্তরকে কাগজরূপে ব্যবহার করিয়া বান্দার সারা জীবনের কাজকর্ম লিপিবদ্ধ করিয়া থাকেন। 
হযরত নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করিয়াছেন যে, দক্ষিণ পার্শ্বের ফেরেশতা নেতা হিসাবে কাজ করেন। বান্দার পাপকাজ করিবার সাথে সাথে বামপার্শ্বের ফেরেশতা উহা লিখিতে মনস্থ করেন। আর তখনই নেতা ফেরেশতা তাহাকে বলেন, “হে প্রিয় বন্ধু! অন্ততঃ সাত ঘন্টার জন্য তোমার লিখা বন্ধ রাখ।” ইতিমধ্যে বান্দা তাওবাহ করিলে কিংবা মৃত্যুবরণ করিলে উহা আর লিপিবদ্ধ করা হয় না। অন্যথায় কেবলমাত্র একটি পাপ লিপিবদ্ধ করা হয়। আর মৃত্যুর পর বান্দাকে কবরের মধ্যে রাখা হইলে উভয় ফেরেশতা আল্লাহ তা'আলার নিকট ফরিয়াদ করেন, “হে আল্লাহ ! আপনি আমাদিগকে আপনার বান্দার নেক-বদ লিপিবদ্ধ করিবার কাজে নিয়োজিত করিয়াছিলেন, কিন্তু এখন আপনি তাহার রূহ কবজ করিয়া লইয়াছেন। অতএব আমাদিগকে আকাশে আরোহণ করিবার অনুমতি প্রদান করুন।” উত্তরে আল্লাহ তা'আলা বলেন, “হে ফেরেশতাগণ! তোমরা অবগত আছ যে গগনমণ্ডল অজস্র স্বর্গীয় ফেরেশ্তায় ভরপুর। তাহারা সদা-সর্বদা আমার তাসবীহ, তাহলীল পাঠে মশগুল রহিয়াছে। তোমরাই বল, আমি তোমাদের দ্বারা কি করিব?” ফেরেশ্তাগণ পুনরায় আরজ করেন, “হে বারে এলাহী! তবে আমাদিগকে দুনিয়াতেই বাস করিবার অনুমতি প্রদান করুন।' তখন আল্লাহ তা'আলা বলেন, “পৃথিবীও আমার অজস্র সৃষ্ট জীবে ভরপুর। আমি পৃথিবীতে তোমাদের দ্বারা কি করাইব?” পরিশেষে আল্লাহতায়ালা তাহাদিগকে নির্দেশ দেন, “ওহে ফেরেশ্তাগণ! তোমরা ঐ বান্দার কবরে বসিয়া রোজ কিয়ামত পর্যন্ত তাসবীহ তাহলীল পাঠ কর এবং তাহার আমলনামায় ঐগুলি যোগ করিয়া দাও।” যেমন পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তা'আলা এরশাদ করিয়াছেন-
উচ্চারণ : “ওয়া ইন্না আলাইকুম লাহাফিজি-না কিরা-মান্ কাতিবী না ইয়ালামু-না   মা তাফ্ আলুন্।"
অর্থাৎ “নিশ্চয়ই তোমাদের তত্ত্বাবধানের নিমিত্ত কিরামান কাতিবীন নামক দুইজন ফেরেশতা রহিয়াছেন, যাহারা তোমাদের আমলনামা সম্বন্ধে সম্যক পরিজ্ঞাত আছেন।” আর তাহাদিগকে কিরামান কাতেবীন নামে আখ্যায়িত করার কারণ হইল এই যে তাহারা বান্দার কৃত নেককাজে আনন্দে উৎফুল্ল হইয়া আকাশমণ্ডলে আরোহণ করতঃ আল্লাহ তা'আলার দরবারে প্রার্থনা করে, “হে আল্লাহ! আপনার ঐ বান্দা আপনার রেজামন্দির উদ্দেশ্যে এইরূপ নেক আমল করিয়াছে এবং আমরা ইহার সত্যতার সাক্ষ্য দিতেছি।” তবে বান্দা যখন কোন পাপ করে তখন ফেরেশতাদ্বয় বিমর্ষ, চিন্তান্বিত ও সলজ্জ অবস্থায় গগনমণ্ডলে আরোহণ করিয়া থাকে। তারপর আল্লাহ তা'আলা তাহাদিগকে প্রশ্ন করেন,- “হে কিরামান কাতেবীন! আমার বান্দা কিরূপ আমল করিয়াছে?” তখন তাহারা নিরুত্তর থাকে। অনুরূপভাবে তৃতীয়বার তাহাদিগকে জিজ্ঞাসা করা হইলে তাহারা বলে, “হে আল্লাহ! আপনি সর্ব পরিজ্ঞাত, গোপনকারী এবং বান্দাদের দোষ গোপনের নির্দেশদাতা । হে আল্লাহ! আপনার বান্দা প্রতিদিন আপনার পবিত্র কালাম পাঠ করিয়াছে এবং আপনার স্তুতিগান করিয়াছে।” তারপর তাহারা আবার আরজ করে, “হে পরম দয়াময় আল্লাহ! আপনি তাহাদের আয়েব-ত্রুটি গোপন করুন।" এইজন্যই তাহাদিগকে কিরামান কাতেবীন অর্থাৎ 'মর্যাদাশীল লেখক' নামে অভিহিত করা হইয়াছে।

পরবর্তী পর্ব-
জামাতে নামায আদায়ের ফজীলত-

দাকায়েকুল আখবার- (২২) মনকির নকীরের সওয়ালের বিবরণ



📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ২২)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

মনকির নকীরের সওয়ালের বিবরণ-
হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, মৃত ব্যক্তিকে যখন কবরের মধ্যে রাখা হয়, তখন বিভৎস, কুৎসিত ও ঘোর লোহিত বর্ণ নয়নবিশিষ্ট দুইজন ভয়ঙ্কর মূর্তিধারী স্বর্গীয় ফেরেশতা তাহার কবরে আগমন করে। তাহাদের গলার স্বর মেঘের গর্জনের মত এবং দৃষ্টিশক্তি এতই প্রখর যেন চক্ষুর দৃষ্টিশক্তি হরণকারী বিজলী। উক্ত ফেরেশতাদ্বয় নিজ নিজ দাঁতের দ্বারা মাটি ভেদ করিয়া যখন মৃত ব্যক্তির মাথার নিকট আগমন করিবে, তখন মাথা তাহাদিগকে বাধা দিয়া বলিবে, “হে ফেরেশ্তাগণ! এইদিক হইতে আমাকে কোনরূপ আঘাত করিও না। আমি অহর্নিশি এই স্থানের ভয়ে যথেষ্ট পরিমাণে নামায আদায় করিয়াছি।”
তারপর ফেরেশতাদ্বয় তাহার পদদ্বয়ের দিক হইতে আক্রমণ করিতে সচেষ্ট হইলে পদদ্বয় বলিবে, “এই নেক বান্দা আমার সহায়তায় জুমআ নামায আদায় করিয়াছে এবং জামাতে নামায আদায় করিবার জন্য দৌড়াইয়াছে আর আমার সাহায্যেই নামায আদায় করিতে পারিয়াছে।” 
এইবার দক্ষিণ দিক হইতে আক্রমণ করিবার জন্য অগ্রসর হইতে চাহিলে দক্ষিণ হস্ত বাধা দিয়া বলিবে, “হে স্বর্গীয় ফেরেশ্তা! তোমরা এইদিক হইতে আক্রমণ করিও না, কেননা এই নেক বান্দা আমার দ্বারা প্রচুর দান-খয়রাত করিয়াছে।” 
অতঃপর তাহারা উত্তর দিক হইতে আক্রমণ করিতে প্রবৃত্ত হইবে, কিন্তু সেই পথেও বাধাপ্রাপ্ত হইবে। পরিশেষে তাহারা বান্দার মুখের দিকে আক্রমণ করিতে উদ্যত হইবে, তখন মুখ বাধা দিয়া বলিবে, “হে ফেরেশতাগণ! এইদিক হইতে আক্রমণ করিও না । এই নেকবান্দা আমার সাহায্যে ক্ষুধা-তৃষ্ণা নিবারণ করিয়াছে এবং পবিত্র রোযাব্রত পালন করিয়াছে।
পরিশেষে ফেরেশতা নিরুপায় হইয়া ঘুমন্ত ব্যক্তির মত মৃতকে জাগ্রত করিয়া জিজ্ঞাসা করিবে, “হে আল্লাহর বান্দা! হযরত মুহাম্মদ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর সম্বন্ধে তোমার কিরূপ ধারণা রহিয়াছে?” প্রত্যুত্তরে সে বলিবে, “আমি সাক্ষ্য দিতেছি যে, তিনি আল্লাহ তা'আলার রাসূল ও বান্দা ছিলেন।” তখন ফেরেশ্তাগণ বলিবে, “হে বান্দা! তুমি পৃথিবীতে বিশ্বাসী ছিলে এবং সেই অবস্থায়ই মৃত্যুবরণ করিয়াছ।” [এটাই হল ঈমানের মূল তথা রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উনাকে আল্লাহর অনুগত বান্দা ও চুড়ান্তপর্যায়ে আল্লাহ্ তা'আলার রসূল হিসেবে চিনতে ও জানতে হবে।] 
মনকির নকীর ফেরেশ্তাদ্বয়ের সওয়াল করার রহস্য এই যে, আল্লাহ তা'আলা যখন মানবকুল সৃষ্টি করিবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিয়াছিলেন, তখন ফেরেশতাগণ হযরত আদম (আঃ)-কে দর্শন করিয়া বিদ্রূপ করতঃ বলিয়াছিল, “হে আল্লাহ ! আপনি কি এমন মানবকুল সৃষ্টি করিতে চান, যাহারা সেখানে কলহ-বিবাদ ও বিসম্বাদে নিমগ্ন হইবে এবং পরস্পর রক্তারক্তি করিয়া পৃথিবীতে অশান্তির সৃষ্টি করিবে।” 
প্রত্যুত্তরে আল্লাহ তা'আলা বলিয়াছিলেন, “হে ফেরেশতাগণ ! আমি যাহা জানি তোমরা তাহা জান না।” এই জন্য আল্লাহ তায়ালা সর্বপ্রথমে কবরের মধ্যে দুইজন ফেরেশতা প্রেরণ করিয়া মুমিন বান্দার তৌহিদ ও রেসালত সম্বন্ধে সওয়াল করিয়া পরীক্ষা করিবার ব্যবস্থা করিয়াছেন। আর তাহাদিগকে পুনরায় ফেরেশ্তার সম্মুখে মুমিন বান্দার কথিত বিষয় জ্ঞাপন করিতে নির্দেশ দান করিয়াছেন। কেননা সাক্ষ্যের জন্য দ্বি-বচনই যথেষ্ট বলিয়া পরিগণিত। পরিশেষে আল্লাহ তায়ালা ফেরেশতাগণকে উদ্দেশ্য করিয়া বলেন, 'হে ফেরেশতাগণ! আমি কেবলমাত্র তাহার আত্মা কবজ করিয়াছি, অথচ তাহার দাস-দাসী, স্ত্রী-পুত্র ধন-রত্ন সবকিছুই অন্যের জন্য রাখিয়াছি এবং সে বন্ধু-বান্ধবহীন একাকী কবরের মধ্যে পড়িয়া রহিয়াছে। সেখানে আমি ছাড়া তাহার অন্য কোন সহায়-সম্বল নাই; সুতরাং এমতাবস্থায় তোমরা তাহাকে জিজ্ঞাসা করিয়া দেখ, “তোমার প্রতিপালক কে? তোমার নবী কে? আর তুমি কোন ধর্মাবলম্বী?” তখন সে নিঃসঙ্কোচে বলে, 'আমার সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তায়ালা, আমার নবী হযরত মুহাম্মদ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এবং আমার ধর্ম ইসলাম। আর আমার অধিক জ্ঞানের বিষয় হইল ইহাই।

পরবর্তী পর্ব
কিরামান কাতেবীনের বিবরণ-

দাকায়েকুল আখবার- (২১) মনকির নকীরের পূর্ববর্তী ফেরেশতার বিবরণ



📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ২১)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

মনকির নকীরের পূর্ববর্তী ফেরেশতার বিবরণ-
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেন, একদা আমি রাসুলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-উনাকে জিজ্ঞাসা করিলাম, “হে আল্লাহর রসূল ! মনকির নকীরের পূর্বে কোন ফেরেশতা কবরে আগমন করে কি”? 
প্রত্যুত্তরে আল্লাহর রসূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিলেন, “হে ইবনে সালাম ! মনকির নকীরের পূর্বে সূর্যের মত উজ্জ্বল চেহারা বিশিষ্ট রোমান নামক একজন ফেরেশ্তা কবরের মধ্যে আগমন করিয়া মৃত ব্যক্তিকে উঠাইয়া বসান এবং উক্ত বান্দাকে তাহার পাপপূর্ণ লিপিবদ্ধ করিতে নির্দেশ করেন। তখন উক্ত বান্দা আরজ করে, “হে স্বর্গীয় ফেরেশতা ! আমি কি দিয়া লিখিব? কাগজ, কলম, কালি কোন কিছুই ত আমার নিকট নাই।” তখন ফেরেশ্তা বলেন, “স্বীয় অঙ্গুলিকে কলমরূপে, মুখকে দোয়াতরূপে আর থুথুকে কালিরূপে ব্যবহার কর।” তখন বান্দা বলিবে, “কাগজ ছাড়া কিসে লিখিব বলুন?” ফেরেশ্তা তাহার কাপড়ের একখণ্ড ছিঁড়িয়া দিয়া বলিবেন, “এখন তোমার যাবতীয় পাপ ও পুণ্য ইহাতে লিপিবদ্ধ কর।” তখন সে তৎক্ষণাত অকুণ্ঠচিত্তে তাহার কৃত পুণ্য কর্মগুলি লিপিবদ্ধ করিবে, কিন্তু পাপকর্মগুলি লিখিতে লজ্জিত হইয়া বসিয়া পড়িবে। তখন উক্ত ফেরেশতা তাহাকে শাসাইয়া বলিবেন, “হে পাপিষ্ঠ নরাধম! দুনিয়ার জীবনে পাপকাজ ও অসৎকর্ম করিতে কোন রকমের লজ্জাবোধ কর নাই, কিন্তু এখন উহা আমার সম্মুখে লিখিতে লজ্জা করিতেছ কেন?” এই বলিয়া তাহাকে প্রহার করিবার জন্য হাতুড়ী উত্তোলন করিলে সে আরজ করিবে, “হে স্বর্গীয় ফেরেশতা ! আমাকে আঘাত করিবেন না, আমি এখনই আনুপূর্বিক সবকিছুই লিখিয়া দিতেছি।” তারপর সে সবকিছুই লিপিবদ্ধ করিবে। তখন ফেরেশতা তাহাকে সেই লেখাগুলি মোহরাঙ্কিত করিতে নির্দেশ দিবেন ।`সে ব্যক্তি পুনরায় বলিবে, “হে স্বৰ্গীয় ফেরেশতা ! আমার নিকট কোন উপকরণ নাই। আমি সীলমোহর করিব কি দিয়া?” ফেরেশতা উত্তর করিবে, “তুমি তোমার নখের সাহায্যে এই কাজ সমাধা কর ।” অতঃপর সে তদনুরূপ করিবে এবং ফেরেশতা তাহার স্বহস্ত লিখিত আমলনামা তাহার গলায় ঝুলাইয়া দিয়া বিদায় হইয়া যাইবেন আর সেই আমলনামা কেয়ামত পর্যন্ত অক্ষত অবস্থায় তাহার গলদেশে শোভা পাইতে থাকিবে। যেমন আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে ঘোষণা “এবং আমি প্রত্যেক মৃত ব্যক্তির গলদেশে তাহার আমলনামা টাঙ্গানোর ব্যবস্থা রাখিয়াছি।”
উক্ত 'রোমান' ফেরেশতার প্রস্থানের পর 'মনকির' ও 'নকীর' সে কবরে প্রবেশ করিবে। কেয়ামতের দিন যখন সে তাহার নিজের আমলনামা প্রত্যক্ষ করিবে এবং আল্লাহ তা'আলার নির্দেশে উহা পাঠ করিতে বাধ্য হইবে, তখন সে তাহার পুণ্যকাজের বিবরণাদি পাঠ করিয়া যাইবে। আল্লাহ তা'আলা উহার কারণ জিজ্ঞাসা করিলে সে উত্তর করিবে, 'হে আল্লাহ! বাকী অংশ পাঠ করিতে আমি লজ্জাবোধ করিতেছি।” আল্লাহ তা'আলা বলিবেন, “হে বান্দা! দুনিয়াতে এইরূপ কাজ করিতে কেন লজ্জাবোধ কর নাই?” তখন সে লজ্জিত হইবে ও নির্বাক হইয়া যাইবে; কিন্তু তাহাতে কোন উপকার সাধিত হইবে না। তখন আল্লাহ তা'আলা আদেশ করিবেন, “ওহে ফেরেশতাগণ ! তাহাকে ধরিয়া জিঞ্জির (শিকল) পরাইয়া দাও এবং জাহান্নামের অনলকুণ্ডে তাহাকে নিক্ষেপ কর।”

পরবর্তী পর্ব
মনকির নকীরের সওয়ালের বিবরণ-

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...